আর নয় ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি
ইমরান নাজির১৩ আগষ্ট, ২০১৭ ইং
আর নয় ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি
এই আগস্টে ৭২ বছর আগে প্রথমবারের মতো পরমাণু বোমার ধ্বংসলীলা দেখেছিল পুরো বিশ্ব। জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে সভ্যতার যে কলঙ্করেখা আঁকা হয়েছিল, সেই বর্বরতার তুলনা হয় না। অনেকটা পথ পাড়ি দিয়ে আজ আমরা এই সময়ে এসে পদার্পণ করেছি। বিশ্ব এক মুহূর্তের জন্যও ক্ষমতা ও দ্বন্দ্বের প্রতিযোগিতা থেকে দূরে থাকেনি। কোথাও না কোথাও যুদ্ধ চলছেই। আর গ্লোবালাইজেশন তথা বিশ্বায়নের ফলে যুদ্ধগুলোও হয়েছে মাল্টিপল অর্থাত্ বহুদলভিত্তিক।

নিউক্লিয়ার বোমার উদ্ভাবন এই হিরোশিমা-নাগাসাকিকে কেন্দ্র করেই এবং বিশ্বের প্রথম অ্যাটম বোমা এই দুই শহরেই ফেলা হয়। এরপর অবশ্য শীতল যুদ্ধের সময় কিউবার মিসাইল সংকটকে কেন্দ্র করে অনেক উত্তেজনা ছড়ালেও কোনো অঘটন বিশ্ব দেখেনি। সেবার সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট ক্রুশভের অপরিসীম বুদ্ধিমত্তা এবং ইউএস প্রেসিডেন্ট কেনেডির অসীম ধৈর্য পৃথিবী আরেকটা বিপুল ধ্বংসযজ্ঞের হাত থেকে রক্ষা করেছিল। হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে বোমা ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়ে ট্রুম্যান যে অপরিণামদর্শিতার প্রমাণ দেন—তার অভিশাপ আজও বয়ে বেড়াতে হচ্ছে জাপানের শহর দুটিকে। বিশ্ব এরপর আর কোথাও নিউক্লিয়ার যুদ্ধ না দেখলেও একে একে এখন আটটি দেশ পারমাণবিক শক্তিধর হয়েছে। সবাই যুদ্ধ আর্সেনাল বা অস্ত্রভাণ্ডার সমৃদ্ধ করেছে নানান ধরনের বোমার সংমিশ্রণে। এখন আর দুই মেরুকেন্দ্রিক বিশ্ব ব্যবস্থা নেই, যা কিনা ভারসাম্য রক্ষার জন্য উপকারী ছিল। কিন্তু এখন বিশ্ব এমন এক জটিল অবস্থার মধ্যদিয়ে পরিচালিত হচ্ছে যেখানে কিনা শৃঙ্খলা রক্ষা করা বেশ কষ্টসাধ্য। আন্তর্জাতিক সম্পর্কগুলো যেন খুব বেশিই অনিশ্চয়তার মধ্যে নিপতিত হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ের আন্তঃমহাদেশীয় কোন্দল তুঙ্গে। আবারো যেন নিউক্লিয়ার বোমার রাজনীতি শুরু হয়েছে। চীন-ভারতের মধ্যে যে উত্তেজনা বিরাজমান তা সমগ্র এশিয়ার জন্যই হুমকিস্বরপ বিরাজ করছে। আর সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি সেটা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র-উত্তর কোরিয়া সংকট—যা কিনা বিশ্বের অস্তিত্বই হুমকিতে ফেলে দিতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র এবার এমন প্রেসিডেন্ট পাননি যে কিনা স্যার জন এফ কেনেডির মতো বুদ্ধিমত্তা রাখেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যেই উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট কিম জং উনকে নিউক্লিয়ার বোমা হামলার হুমকি দিয়েছেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প মাঝেমধ্যেই এমন ভাব প্রকাশ করেন যে, এত মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার খরচ করে এই পারমাণবিক বোমা তো শুধু আর সাগরের নিচে কিংবা পাহাড়ের গুহায় লুকিয়ে রাখার জন্য নয় বরং এর যথাযথ ব্যবহার করাই যৌক্তিক কাজ। ওদিকে উত্তর কোরিয়াও ক’দিন বাদে বাদেই নতুন ব্যালিস্টিক মিসাইল উেক্ষপন করে তার ঔদ্ধত্যের জানান দিচ্ছে। এমনকি ওয়াশিংটন ডিসিকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেবার মতো হুঁশিয়ারি দিতেও একটু ভাবেন না। জাতিসংঘের একাধিক নিষেধাজ্ঞা তোয়াক্কা না করেই উত্তর কোরিয়া তার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।

স্নায়ুযুদ্ধের সময়কার একটা বিখ্যাত মুভির কথা মনে পড়ছে। মুভিতে দেখা যায় একজন উন্মাদ নেতার হাতের কাছেই দুটো সুইচ থাকে, একটু চাপ দিলে কফি বেরিয়ে আসে আর আরেকটি চাপ দিলে নিউক্লিয়ার বোমা লাঞ্চ হয়। বিশ্ব ঠিক এখন এমন একটা অবস্থাতেই আছে। দেখা যাচ্ছে যে, পুরো ব্যাপারটাই খুব সহজে এই সামান্য উন্মাদনা থেকে ভয়াবহতার রূপ নিতে পারে—যা কিনা অনায়াসেই আমাদের পৃথিবীর ভবিষ্যেক সংকটাপন্ন করে দিতে পারে আর নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারে সমগ্র মানবজাতিকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে জাপানি শাসকগোষ্ঠীর বিশ্ব গ্রাস করার যে মানসিকতা জন্মেছিল তার সমাপ্তি ঘটেছিল প্রায় দুই লক্ষাধিক নিরীহ মানুষের জীবনের বিপন্নতার মধ্যদিয়ে। বিশ্ব চাইবে না আরেকবার এমন ঘটনার সাক্ষী হতে।

বর্তমান সময়ে সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ হয়ত আর সম্ভব নয়। এনটিপি চুক্তির মাধ্যমে যে পারমাণবিক বোমা সীমাবদ্ধ করার রূপরেখা করা হয়, তা অনেকটা হাস্যকর আর অবাস্তবও প্রায়। তাই আমাদের সুষ্ঠু ও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনার মাধ্যমে প্রতিরোধ করতে হবে এই নিউক্লিয়ার হুমকিকে।  বাস্তববাদী এবং বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিতে বুঝতে হবে পারমাণবিক বোমার ধ্বংস ক্ষমতা। পারমাণবিক বোমা তামাশা করার বিষয় নয়। আমাদের পৃথিবীকে যেন দ্বিতীয়বারের জন্য হিরোশিমা কিংবা নাগাসাকির মতো ক্ষত বয়ে বেড়াতে না হয়।

n লেখক :আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যাল

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
১৩ আগষ্ট, ২০১৭ ইং
ফজর৪:১৩
যোহর১২:০৪
আসর৪:৩৯
মাগরিব৬:৩৭
এশা৭:৫৪
সূর্যোদয় - ৫:৩৩সূর্যাস্ত - ০৬:৩২
পড়ুন