অসমাপ্ত আত্মজীবনী:বলিষ্ঠ নেতৃত্বের ঐতিহাসিক দলিল
আয়শা সিদ্দিকা১৩ আগষ্ট, ২০১৭ ইং
অসমাপ্ত আত্মজীবনী:বলিষ্ঠ নেতৃত্বের ঐতিহাসিক দলিল
মধুমতির জলকল্লোলে স্নাত হয়ে বেড়ে উঠেছিল দুরন্ত এক বালক। নদী তীর ঘেঁষা প্রতিটি তরুলতা তাঁর চেনা, প্রতিটি বালুকণা তাঁর অকৃত্রিম বন্ধু,  প্রতিটি প্রাণী যেন তাঁর সহচর। বয়োজ্যেষ্ঠ থেকে ছোট্ট শিশু সবাই পরম আত্মীয়। দেশের দক্ষিণাঞ্চলের একটি ক্ষুদ্র গ্রামের নির্মল আলো-বাতাস তাঁকে বড় করেছে। প্রকৃতির ছন্দের মতোই ছিল তাঁর জীবন। তিনি থামতে শেখেননি। অবিরাম কর্মপরিধিতে নিমগ্ন থেকেছেন। দু’বাহুর শক্ত বন্ধনে আগলে রেখেছিলেন স্বভাষা, স্বজাতি ও স্বদেশকে। তিনি আমাদের মহান নেতা, বাংলাদেশের স্থপতি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। শারীরিক অসুস্থতায় কিছু দিন বিরতির পর ১৯৩৭ সালে তিনি গোপালগঞ্জ মিশন স্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি হন। ১৯৪১ সালে এখান থেকেই দ্বিতীয় বিভাগে ম্যাট্রিক পাস করেন। পরে তিনি কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে ভর্তি হন এবং সেখান থেকে ডিগ্রি পাস করেন। পরবর্তীকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হন। একাডেমিক শিক্ষাজীবন অসমাপ্ত রেখে তিনি পুরোপুরিভাবে দেশের কাজে আত্মনিয়োগ করেন। কে জানতো দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ক্ষুদ্র গ্রাম টুঙ্গীপাড়ার সেই চঞ্চল, ডানপিঠে ছেলেটি বিশ্ব নেতা হবেন? তবে ছোটবেলা থেকেই মানুষের প্রতি দরদ ও অন্যায়ের প্রতিবাদ করায় সবার চোখে পড়েছিলেন। স্ত্রী শেখ ফজিলাতুন্নেছা ও তাঁর শুভাকাঙ্ক্ষীদের অনুরোধে ১৯৬৭ সালে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে থাকা অবস্থায় আত্মজীবনী লেখা শুরু করেন, যা দীর্ঘকাল পরে তার জ্যেষ্ঠ কন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ তত্ত্বাবধানে ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ নামে প্রকাশিত হয়। গ্রন্থটি তাঁর বলিষ্ঠ নেতৃত্বপূর্ণ জীবনের ঐতিহাসিক দলিল।

স্কুল জীবন থেকেই শুরু হয় রাজনীতির হাতে-খড়ি। ১৯৩৮ সালে গোপালগঞ্জে পূর্ব বাংলার প্রধানমন্ত্রী শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক এবং শ্রমমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী সাহেবের আগমন উপলক্ষে বিরাট সভার আয়োজন করা হয়। তখন সেচ্ছাসেবক বাহিনীর নেতৃত্ব দেওয়ায় শেখ মুজিব নজরে আসেন এই দুই জনপ্রিয় নেতার। এরপর থেকে চিঠির মাধ্যমে তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ হতো।

অক্লান্ত পরিশ্রম ও সাধনা তাঁকে পৌঁছিয়ে দিয়েছে সাফল্যের দোর গোড়ায়। ১৯৪১ সালে ম্যাট্রিক পাসের পর কলকাতায় গিয়ে রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। প্রথম থেকেই তিনি নেতৃত্বের পেছনে থেকে কাজ করেছেন, কোনো পদের জন্য নয়। প্রবল দেশপ্রেমই তাঁকে সকলের থেকে স্বতন্ত্র করেছে। একটা সময় দেখলেন ক্ষমতা ব্যতীত সকল কাজে সফল হওয়া যায় না, দাবি আদায় করা যায় না। ১৯৪৩ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের সময়ই প্রথম তিনি প্রাদেশিক মুসলিম লীগ কাউন্সিলের সদস্যপদ লাভ করেন। ছাত্রলীগের সঙ্গেও তাঁর নিবিড় সম্পর্ক ছিল। পঞ্চাশের মনন্বতরের সময় অন্যান্য নেতৃত্বও স্থানীয় নেতারা হাতগুটিয়ে নিলেও তিনি সেচ্ছায় রিলিফ কাজের দায়ভার বহন করেন। দ্বারে দ্বারে ঘুরে বহু কষ্টে দুর্দশাগ্রস্ত মানুষের সাহায্যের ব্যবস্থা করেন। মূলত তাঁর জীবনের বীজমন্ত্র ছিল বাবার উক্তি, ‘Sincerity of purpose and honesty of purpose’ ।

স্বদেশী আন্দোলন, দেশ বিভাগের ক্ষেত্রে জনমত গঠন, পরবর্তীতে স্বপ্ন ভঙ্গের পাকিস্তান শাসক চক্রের ষড়যন্ত্রের প্রতিবাদ, সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের সঙ্গে কেন্দ্রের যোগাযোগ, ঢাকা, দিল্লি ও পাকিস্তানে যাতায়াত, যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনে মুসলিম লীগের সফল অংশগ্রহণ, মন্ত্রিসভা গঠন, রাষ্ট্র ভাষা বাংলা করার দাবিতে প্রাথমিক প্রতিবাদ সভা, ছয় দফা আন্দোলন, অত্যাচারী শাসক শ্রেণির অন্যায় কাজের প্রতিবাদ ও স্বাধীন বাংলাদেশের দাবি আদায়ের আন্দোলন প্রতিটি ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন। এ দেশের সমর্থন সংগ্রহে তিনি শুধু দেশের মধ্য নয় বিদেশেও গিয়েছিলেন। তিনি চীন সফর করেছেন বাংলাদেশ জন্মের পূর্বে একটি শান্তি কমিটির কনফারেন্সে। আর স্বাধীনতা পরবর্তীকালে জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের শীর্ষ সম্মেলনে আলজেরিয়া ও পরে জাপানে যান। জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভের জন্য আমেরিকাও গিয়েছিলেন। এমন বর্ণাঢ্য কর্ম জীবনে তিনি শুধু দেশকে ও জনগণকে দিয়েই গেছেন বিনিময়ে কিছু প্রাপ্তির আশা করেননি। তাইতো ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনের পর তাঁকে মন্ত্রিত্ব দিতে চাইলে তিনি বলেছেন, ‘আমি মন্ত্রিত্ব চাই না, পার্টির অনেক কাজ আছে বহু প্রার্থী আছে দেখে শুনে তাদের করে দেন।’ তাঁর একমাত্র লক্ষ্য এদেশকে স্বাধীন করা, একটি সোনার বাংলা গড়ে তোলা। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ তাঁর সেই স্বপ্ন আর সংগ্রামী জীবনের অকাট্য প্রমাণ।

বাঙালি জাতি তাঁর মূল্য বোঝেনি। তাঁর জীবনের লক্ষ্যে ভাঙন ধারিয়েছে, তাঁর যোগ্য প্রাপ্তিতে বাধা সৃষ্টি করেছে যার পরিচয় তিনি নিজেও পেয়েছেন। তিনি নিজেই বলেছেন, ‘আমাদের বাঙালির মধ্যে দুইটা দিক আছে। একটা হল আমরা মুসলমান, আর একটা হল আমরা বাঙালি। পরশ্রীকাতরতা এবং বিশ্বাসঘাতকতা আমাদের রক্তের মধ্যে রয়েছে। বোধ হয় দুনিয়ার কোনো ভাষায়ই এই কথাটা পাওয়া যাবে না। পরশ্রীকাতরতা। ভাই, ভাইয়ের উন্নতি দেখলে খুশি হয় না। এই জন্যই বাঙালি জাতির সকল রকম গুণ থাকা সত্ত্বেও জীবনভর অন্যের অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছে। সুজলা, সুফলা বাংলাদেশ সম্পদে ভর্তি। এমন উর্বর জমি দুনিয়ার খুব অল্প দেশেই আছে। তবুও এরা গরিব। কারণ যুগ যুগ ধরে এরা শোষিত হয়েছে নিজের দোষে। নিজেকে এরা চেনে না, আর যতদিন চিনবে না এবং বুঝবে না ততদিন এদের মুক্তি আসবে না।’ সত্যিকারের মুক্তি আমাদের  আজও হয়নি। তাঁকে আমরা ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি দিয়েছিলাম কিস্তু এমন মহান নেতাকে ক্ষুদ্র স্বার্থে হত্যা করা হয়েছিল। সান্ত্বনা এতটুকু যে, হত্যাকারীদের বিচার হচ্ছে। তাঁর সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁরই প্রদর্শিত পথ ধরে এদেশ ও দেশবাসীর সাচ্ছন্দ্যে জীবনযাপনের জন্য কাজ করে চলেছেন। নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়েও এদেশের মানুষকে শান্তিতে রাখার চেষ্টা করছেন। সালাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে, সালাম প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে।

লেখক :এমফিল গবেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ই-মেইল: [email protected]

 

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
১৩ আগষ্ট, ২০১৭ ইং
ফজর৪:১৩
যোহর১২:০৪
আসর৪:৩৯
মাগরিব৬:৩৭
এশা৭:৫৪
সূর্যোদয় - ৫:৩৩সূর্যাস্ত - ০৬:৩২
পড়ুন