পাহাড়ে এখনো কেন মৃত্যুর আতঙ্ক?
২১ জুন, ২০১৭ ইং
বাংলার বর্ষার রহিয়াছে বিচিত্র রূপ। কাহারও জন্য তাহা রোমান্টিক কাব্যভাবনার জোগানদার, কাহারও জন্য তাহা দুর্বিষহ জীবনের হুমকি। ঢাকা ও চট্টগ্রামবাসী বর্ষার প্রারম্ভেই সংকটে পড়িয়াছে। জলাবদ্ধতা ও স্বল্পস্থায়ী প্লাবনে রাস্তাঘাট, বিপণিবিতান, ঘরবাড়ি ডুবিয়া যাইবার উপক্রম হইয়াছে। রাস্তায় সৃষ্টি হওয়া খানাখন্দ ডাকিয়া আনিতেছে নানান দুর্ঘটনা। ঈদ উপলক্ষে নগরবাসী বাড়ি ফিরিতে শুরু করিয়াছে, কিন্তু প্রায় সকল মহাসড়কেই তাহারা নানান বিপর্যয়ের মুখোমুখি হইতেছে। গন্তব্যস্থলে পৌঁছাইতে দ্বিগুণ-তিনগুণ সময় লাগিতেছে। কিন্তু সবকিছু ছাপাইয়া উঠিয়াছে প্রথম বর্ষণেই পাহাড় ধসিয়া দেড়শত মানুষের মৃত্যুর খবর। কেবল মানুষের মৃত্যুই নহে, রাঙ্গামাটি দেশের বাকি অংশ হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া পড়িয়াছে। মৃত্যুর খবর আসিতেছে খাগড়াছড়ি ও মৌলভীবাজার হইতেও। এই কয়েকটি জেলায় মৃত্যুর ধরন একই, পাহাড় ধসিয়া মানুষের গৃহের উপর আছড়াইয়া পড়িতেছে, অপ্রস্তুত মানুষ হঠাত্ মৃত্যুর কোলে ঢলিয়া পড়িতেছে। অনেকে রাত্রে ঘুমন্ত অবস্থায়ই মৃত্যুবরণ করিয়াছে।

প্রশ্ন হইল, এই নিদারুণ মৃত্যু কেন ঘটিবে? পাহাড় কেন ধসিয়া পড়িবে? এই ধসের কারণ কতটুকু প্রাকৃতিক আর কতটুকু মনুষ্যসৃষ্ট? অল্প অনুসন্ধানেই জানা যাইতেছে, এই ধসের কারণ মূলত মনুষ্যসৃষ্ট। পাহাড়ের বৃক্ষ নিধন করা হইয়াছে, মৃত্তিকা কর্তন করা হইয়াছে। তাই বর্ষায় আক্রান্ত পাহাড় নিজেকে ধরিয়া রাখিতে পারিতেছে না, আলগা হইয়া ধসিয়া পড়িতেছে। এখন বৃক্ষ কেন নিধন হইতেছে? মৃত্তিকা কেন কর্তন করা হইতেছে? কতক ক্ষেত্রে সরকারি নানান উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করিতে গিয়া পাহাড় কাটিয়া সমতল করা হইতেছে। আবার বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই চোরাকারবারি কিংবা ভূমিদস্যুরা বৃক্ষ কর্তন করিতেছে, পাহাড় কাটিয়া আবাস গড়িয়া তুলিতেছে। সেইসব আবাস নিম্ন আয়ের মানুষের নিকট ভাড়া দেওয়া হইতেছে। কিছু ক্ষেত্রে গৃহহীন মানুষ পাহাড়ের নিচে কুঁড়েঘর বানাইয়া থাকিতেছে। আর বহুকাল ধরিয়া পাহাড়ের গায়ে বাস করিতেছে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষেরা। ফলে প্রত্যাবাসিত বাঙালি কিংবা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষ— পাহাড়ধসে সকলেই মরিতেছে। লক্ষ করার বিষয় হইল, আক্রান্তরা সকলেই দরিদ্র মানুষ। প্রভাবশালীরা প্রকৃতি ও পাহাড় ধ্বংস করিতেছে, আর জীবন দিয়া তাহার ফল ভোগ করিতেছে দরিদ্র মানুষ।

জানা কথা যে প্রবল বর্ষণে পাহাড় ধসিয়া পড়িবে এবং মানুষের মৃত্যু ঘটিবে। দেড় শতাধিক মানুষের মৃত্যুর পরও কেন অনভিপ্রেত এই মৃত্যু এড়ানো যাইতেছে না? সরকারের প্রশাসন ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা উদ্ধারকার্যে প্রবৃত্ত রহিয়াছেন, আগাম সতর্কবার্তা মাইকে মাইকে ঘোষণা করা হইতেছে, ঝুঁকিপূর্ণ স্থান হইতে মানুষকে সরিয়া যাইতে বলা হইতেছে। কিন্তু বহু মানুষ তবুও সরিয়া যাইতেছে না। তাহাদের বক্তব্য, গৃহ হইতে সরিয়া যাওয়াও তো মৃত্যুরই নামান্তর। কারণ এই দরিদ্র মানুষগুলির কোনো সঞ্চয় নাই, যাইবার অন্য কোনো স্থান নাই বা অন্যত্র বাসা ভাড়া করিবার সামর্থ্য নাই। সেই ক্ষেত্রে সরকারকেই ঝুঁকির মধ্যে থাকা মানুষগুলির পুনর্বাসনের দায়িত্ব লইতে হইবে। আশ্রয় কেন্দ্র খুলিয়া থাকিবার ও খাইবার সুব্যবস্থা করিয়া দরিদ্র মানুষগুলিকে আস্থায় আনিতে হইবে। ব্যবস্থা করিতে হইবে বিকল্প কর্মসংস্থানের। আর জরুরি যেই কাজটি করা প্রয়োজন, তাহা হইল পাহাড়ের বৃক্ষরাজি নিধন ও মৃত্তিকা কর্তন পুরাপুরি বন্ধ করা। সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পগুলির সাইট নির্বাচনের ক্ষেত্রেও প্রতিবেশের হুমকি ও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবের বিষয়টি বিবেচনায় লইতে হইবে।

 

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
২১ জুন, ২০১৮ ইং
ফজর৩:৪৩
যোহর১২:০০
আসর৪:৪০
মাগরিব৬:৫১
এশা৮:১৬
সূর্যোদয় - ৫:১১সূর্যাস্ত - ০৬:৪৬
পড়ুন