শকুনের জন্য হাহাকার
১৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং
শুনিতে অবাক লাগিতে পারে, শকুনের জন্যও একটি আন্তর্জাতিক দিবস রহিয়াছে। প্রতিবত্সর ৯ সেপ্টেম্বর পালন করা হয় আন্তর্জাতিক শকুন রক্ষা দিবস। কিন্তু কেন? শকুন রক্ষার দরকার কী? যুগে যুগে শকুনকে অশুভশক্তির প্রতীক হিসাবে কল্পনা করা হইত। কিন্তু মানুষের কুসংস্কার অনুযায়ী তো জীবজগত্-প্রকৃতি পরিচালিত হয় না। সুতরাং গল্প-কবিতায় শকুন যতই অপ্রাকৃত-রূপে উদ্ভাসিত হউক, মৃত্যুদূত হিসাবে শকুনের যতই বদনাম থাকুক এবং শকুনকে যতই বীভত্স-কদাকার চেহারার পাখি হিসাবে লোককথায় খলপক্ষী বানানো হউক—শকুনের মতো উপকারী পাখি খুব কমই আছে।

এইজন্য শকুনের সংখ্যা যখন আমাদের দেশসহ পুরো উপমহাদেশে ব্যাপকহারে হ্রাস পাইতে শুরু করিল, এমনকী শকুন যখন বিলুপ্তপ্রায় প্রাণীর লাল তালিকায় নাম লেখাইল—তখন নড়িয়া চড়িয়া বসিলেন পরিবেশ বিজ্ঞানীরা। গত দুই দশকে আমাদের দেশে ৯৯ শতাংশের অধিক শকুন হারাইয়া গিয়াছে। আর এই কারণে বিস্তার হইতেছে রোগব্যাধির। বিশেষ করিয়া প্রাণঘাতী অ্যানথ্রাক্স, জলাতঙ্ক ও অন্যান্য পশুপাখি-কীটপতঙ্গবাহিত বা জুনোটিক রোগ ছড়াইয়া পড়িবার অন্যতম প্রধান কারণ হিসাবে ধরা হইতেছে শকুনের বিলুপ্তিদশাকে। শকুন মূলত পরিবেশে পড়িয়া থাকা মৃত গবাদিপশু, ময়লা-আবর্জনা খাইয়া জীবনধারণ করে। কিন্তু যেইদিন হইতে গবাদিপশুর শরীরে ডায়ক্লোফেনাক ও কিটোপ্রোফেন নামক ওষুধের ব্যবহার শুরু হইল, সেইদিন হইতেই ধ্বংসের শুরু শকুন প্রজাতির। আশ্চর্য কথা হইল, শকুনের পাকস্থলীর ক্ষমতা বিস্ময়কর, যেকোনো ধরনের খাদ্যই শকুন হজম করিবার ক্ষমতা রাখে। কিন্তু এই ডাইক্লোফেনাক ও কিটোপ্রোফেন নামক ঔষধ এতটাই বিষাক্ত যে, ইহা পশুদের উপর প্রয়োগের ফলে সেই পশুর মৃত-মাংস ভক্ষণ করিয়া বিষক্রিয়ায় মারা যাইতে শুরু করে শকুনের দল। মাত্র দুই দশকের মধ্যেই শকুনের সংখ্যা কয়েক লক্ষ হইতে নামিয়া মাত্র আড়াই শতকের ঘরে চলিয়া আসে। অতঃপর শকুন রক্ষায় দেশে ২০১০ সালে পশু চিকিত্সায় ডাইক্লোফেনাক ও শকুনের নিরাপদ এলাকায় ২০১৭ সালে কিটোপ্রোফেন নিষিদ্ধ করা হয়। এই দুই ওষুধের পরিবর্তে পশু চিকিত্সায় মেলেক্সিকান প্রয়োগের পরামর্শ দেওয়া হয়। কিন্তু ইতোমধ্যে ক্ষতি এতদূর সমপ্রসারিত হইয়া যায় যে, শকুনকে রক্ষার জন্য জাতিসংঘের ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন নেচারকেও (আইইউসিএন) বিশেষভাবে মনোযোগী হইতে হয়। আইইউসিএন-এর গবেষণায় বলা হইয়াছে, শকুনের সংখ্যা দ্রুত কমিয়া যাইবার ফলে পশুর মৃতদেহ হইতে প্রকৃতিতে দূষণ ছড়াইয়া পড়িতেছে। শকুনের খাবার খাইতেছে শিয়াল ও কুকুর। ইহার কারণেও মানুষ ও গবাদিপশুর মধ্যে জলাতঙ্ক, অ্যানথ্রাক্স, খুরা রোগ, কলেরাসহ নানা ধরনের সংক্রামক রোগ বৃদ্ধি পাইতেছে।

আশার কথা হইল, আমাদের দেশের আবাসিক পাখি শকুনের বিলুপ্তির বিষয়টি বেশ কয়েক বত্সর ধরিয়া বর্তমান সরকার অতি গুরুত্বের সহিত গ্রহণ করিয়াছে। তবে শকুন রক্ষার বিষয়টি কেবল যেন ইহার সচেতনতা দিবসের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, শকুনকে যাহাতে স্বরূপে ও স্বভূমিকায় ফিরাইয়া আনা যায়, তাহার জন্য কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করিতে হইবে।

এই পাতার আরো খবর -
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
১৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং
ফজর৪:২৮
যোহর১১:৫৫
আসর৪:২১
মাগরিব৬:০৮
এশা৭:২১
সূর্যোদয় - ৫:৪৪সূর্যাস্ত - ০৬:০৩
পড়ুন