ঢাকা বুধবার, ২০ মার্চ ২০১৯, ৬ চৈত্র ১৪২৫
৩১ °সে

বিশ্ব কবে শিশুর বাসযোগ্য হইবে?

বিশ্ব কবে শিশুর বাসযোগ্য হইবে?

‘চলে যাব তবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ/প্রাণপণে পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল, এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য ক’রে যাব আমি/নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।’ গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় জন্মগ্রহণকারী অকালপ্রয়াত কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য (১৯২৬-১৯৪৭) তাঁহার বিখ্যাত ‘ছাড়পত্র’ কবিতায় উপর্যুক্ত অঙ্গীকার করিবার পর কমপক্ষে দীর্ঘ ৭০টি বত্সর অতিক্রান্ত হইয়া গিয়াছে। এই সময়ে বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তিসহ জ্ঞানবিজ্ঞানের নানা শাখায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটিয়া গেলেও যদি প্রশ্ন করা হয় যে, আমরা কি এই বিশ্বকে শিশুর বাসযোগ্য করিতে পারিয়াছি—তাহা হইলে অবনত মস্তকে আমাদের একবাক্যে স্বীকার করিতে হইবে যে—না, পারি নাই। বরং যত দিন যাইতেছে পৃথিবী নামক এই গ্রহটি ততই অনিরাপদ হইয়া উঠিতেছে শিশুদের জন্য। ভূমধ্যসাগরের সৈকতে মৃত পড়িয়া থাকা ফুটফুটে শিশু আয়লান কুর্দি বিশ্ববাসীকে চোখে আঙুল দিয়া তাহা দেখাইয়া দিয়াছিল। কিন্তু তাহা যে বিশ্বমোড়লদের বিবেকে বিন্দুমাত্র আঁচড় কাটিতে পারে নাই, শুক্রবার প্রকাশিত আন্তর্জাতিক সংস্থা সেভ দ্য চিলড্রেনের এক প্রতিবেদনে উঠিয়া আসিয়াছে তাহার হূদয়বিদারক চিত্র—যাহা সভ্য সমাজের জন্য গ্লানিকর বলিলে কমই বলা হয়।

প্রতিবেদনটিতে বলা হইয়াছে, কেবল যুদ্ধের কারণে বিশ্বে প্রতিবত্সর প্রাণ হারাইতেছে লক্ষাধিক শিশু। কখনো বিমান হইতে নিক্ষিপ্ত বোমা কিংবা কামানের গোলার আঘাতে ছিন্নভিন্ন হইয়া যাইতেছে শিশুর শরীর। আবার কখনো-বা যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট বা আরোপিত অবরোধের পরিণামে ক্ষুধা-পিপাসায় মৃত্যুর কোলে ঢলিয়া পড়িতেছে লক্ষ লক্ষ শিশু। বলা বাহুল্য, ইয়েমেনই ইহার একমাত্র উদাহরণ নহে। ইহা সুবিদিত যে কোনো এলাকায় সশস্ত্র সংঘাত শুরু হইলে তাহার প্রথম ও সর্বাপেক্ষা নাজুক ভিকটিমে পরিণত হয় শিশুরা। প্রতিবেদনমতে, ২০১৩ হইতে ২০১৭ সালের মধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে যুদ্ধের ফলে প্রাণ হারাইয়াছে ৫ লক্ষাধিক শিশু, যাহাদের বয়স এক হইতে ৫ বত্সরের মধ্যে। ইহার দায় অনিবার্যভাবে সেইসকল মহাপরাক্রান্ত মোড়লদের উপর বর্তায় যাহারা নিজেদের হীন স্বার্থে পৃথিবীটাকে শুধু যে অশান্ত করিয়া তুলিয়াছেন তাহাই নহে, সেই আগুনে নিরন্তর ঘৃতাহুতিও দিয়া চলিয়াছেন। যদি প্রশ্ন করা হয়, সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যকে কে অগ্নিকুণ্ডে পরিণত করিয়াছে? সিরিয়া-ইরাকের মতো সুখী সচ্ছল দেশগুলিকে লণ্ডভণ্ড করিয়া সেইসকল দেশের লক্ষ লক্ষ নিরপরাধ মানুষকে কাহারা সর্বহারা করিয়া ভিক্ষার পাত্র হাতে অনিশ্চিত পথে ঠেলিয়া দিয়াছে? বিশ্বের শান্তিকামী মানুষ তাহাদের ভালো করিয়াই চেনে। সর্বাপেক্ষা উদ্বেগের বিষয় হইল, বিশ্বের লক্ষ লক্ষ মানুষকে সর্বস্বান্ত করিয়াও তাহাদের বোধোদয় হইতেছে না। এখনো তাহারা ভেনিজুয়েলাসহ বিশ্বের নানা প্রান্তে নূতন করিয়া অশান্তির আগুন প্রজ্বলিত করিবার কূটকৌশল চালাইয়া যাইতেছে।

সেভ দ্য চিলড্রেনের প্রধান নির্বাহী বলিয়াছেন, বর্তমানে প্রায় প্রতি পাঁচজন শিশুর একজনই সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে বাস করিতেছে। এই সংখ্যা গত কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। লক্ষণীয় বিষয় হইল, বিশ্বব্যাপী হিংসা ও সংঘাতের এই আগুন যাহারা প্রজ্বলিত করিয়াছে, সেই আগুন এখন তাহাদের ঘরেও ছড়াইয়া পড়িয়াছে। তাহাদের উদ্দেশে আমরা বরাবরই বলিয়া আসিতেছি যে, আপনারা নিজেরা শান্তিতে থাকুন, বিশ্বের মানুষকেও শান্তিতে থাকিতে দিন। আনন্দে বড় হইতে দিন আমাদের শিশুদের।

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
২০ মার্চ, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন