প্রবন্ধ
বাঙালি আশরাফ কারা
শেখ-সৈয়দ-মোগল-পাঠান ইতিবৃত্ত
ফিরোজ আহমেদ১৬ জুলাই, ২০১৫ ইং
বাঙালি আশরাফ কারা
তোমরা ভাল করিয়াই শুনিয়াছ ও বিচার করিয়া দেখিয়াছো যে, আমি আফ্রিসিয়াবের বংশধর। আমার বাপদাদার বংশধারা আফ্রিসিয়াব পর্যন্ত পৌঁছায়। আমি জানি আল্লাহতায়ালা আমার মধ্যে এমন একটি বৈশিষ্ট্য দান করিয়াছেন, যদ্দরুন আমি কোন নীচমনা, হীনচেতা ও কমিন কম জাতকে আমার রাজ্যের কোন কাজ বা পদ দান করিতে পারি না। এই শ্রেণির লোকের চেহারা দেখা মাত্রই আমার পায়ের রক্ত মাথায় উঠিতে থাকে এবং এমন একটি চাঞ্চল্য উপস্থিত হয়, যাহা তোমাদের নিকট সম্পূর্ণ বর্ণনা করিতে পারিব না। আল্লাহতায়ালা আমাকে যে নেয়ামত দান করিয়াছেন, তাহার মধ্যে কি আমি কোন নীচ ও হীন জাতির লোককে শরিক করিতে পারি! কিংবা কোন অঞ্চলের কর্তৃত্বভার তাহার ওপর ছাড়িয়া দিতে পারি!’

 

ঘনিষ্ঠ সভাসদগণের প্রতি ক্রুদ্ধ সুলতান গিয়াস উদ্দীন বলবন, উপলক্ষ্য কামাল মহিয়ার নামের এক নিচু কুলের অথচ উপযুক্ত হিসেবে বিবেচিত ব্যক্তিকে উচ্চপদে নিয়োগ দানের প্রস্তাব। তারিখ-ই-ফিরুজশাহী থেকে উদ্ধৃত, লেখক জিয়াউদ্দীন বারানী (১২৮৫-১৩৫৭), অনুবাদ গোলাম সামদানী কোরায়শী, বাংলা একাডেমি।

প্রস্তাবনা

তাত্ত্বিকভাবে ইসলাম ধর্মে সব মানুষ সমান, তাদের মর্যাদায় কোনো ভেদ নেই। কিন্তু কার্যকর রাজনীতিতে সঙ্গতকারণেই নবির বংশধররা যেমন, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ সাহাবি, পরবর্তীকালের নানান রাজবংশ, আমীর-ওমরাহসহ নানা উপায়ে বিখ্যাত ও প্রতিষ্ঠিত পরিবারগুলোর সদস্যরা বংশমর্যাদার সূত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগণ্যতাই পেতেন। যুদ্ধজয় শুধু নয়, গ্রন্থচর্চা ও পাণ্ডিত্য এবং ধর্মানুরাগের সূত্রেও শরাফতি অর্জন হতো। এর মানে এই নয় যে, সমাজের ওপরে ওঠার সিঁড়ি বাকি সকলের জন্য বন্ধ ছিল। বরং এই পুরোনো শরিফ পরিবারগুলোর পাশাপাশি প্রতিভা, যোগ্যতা, কৌশল এবং দক্ষতা অথবা বিদ্যার জোর সমাজের অন্য স্তরগুলো থেকেও কমবেশি নতুন নতুন মুখকে উচ্চস্তরে নিয়ে আসত।

আরবি শরীফ কথাটার আক্ষরিক মানে প্রাচীন; আভিজাত্য কিংবা কৌলিন্য বোঝাতে শরিফ ও বহুবচনে সমষ্টি আকারে শরাফত ব্যবহার করা হয়। ভারতবর্ষে কিন্তু শুধু আরব নন, খাইবারের ওপর থেকে ভাগ্যান্বেষণে আসা মুসলমানদের বংশধররাই শরিফ, হোক তারা ইরানি, তুর্কি কিংবা মোঙ্গল। নানান ঐতিহাসিক কারণে বাংলায় এই প্রক্রিয়াটি আরও একটু জটিলতর চেহারা নিয়েছে। এখানে শরিফ হিসেবে চিহ্নিত হবার ন্যূনতম শর্ত ছিল অন্তত বাংলার বাইরে থেকে আসার পরিচয়। যত দূর থেকে তার আগমন, তার শরাফতির জ্যোতি তত তীব্র। আরব মুল্লুকে সাধারণত হজরত আলীর জ্যেষ্ঠ পুত্র হজরত হাসানের বংশধরদেরই শরিফ বলা হতো, কনিষ্ঠপুত্র হজরত হোসেনের বংশধরদের বলা হতো সৈয়দ। মক্কার শরিফরা মক্কা ও মদিনার ওপর কর্তৃত্ব করেছেন ১৯২৫ সাল পর্যন্ত, খলিফারা তাদেরকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে স্বশাসন দিয়েছেন। এরপর ওয়াহাবি মতাবলম্বী ইবনে সৌদের আক্রমণে এরপর মক্কা ও মদিনার ওপর তাদের কর্তৃত্বের অবসান ঘটে।   

সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারীদের কোনো বিশেষ ঐশ্বরিক প্রতিভূর বংশধর হিসেবে সম্মান করাটা সকল প্রাচীন সমাজেই চালু ছিল। ভারতবর্ষে যেমন চন্দ্রবংশ আর সূর্যবংশ জাত ক্ষত্রিয়রা, গোটা দুনিয়াই তার ব্যতিক্রম নয়। কূলমানহীন অথচ সামরিক নৈপুণ্যে বিজয়ী শাসকরা তাদের প্রভাব বিস্তার করার জন্য সব সমাজেই সাধ্যমতো নিজেদের যুক্ত করতেন কোনো দেবতা বা পৌরাণিক চরিত্রের সাথে। ইরানিরা যেমন অতি নিচু চোখে দেখত তাদের চোখে সংস্কৃতিহীন, বর্বরতুল্য তুির্কদের। ওদিকে তুর্কি সমরপতিরা নিজেদের ভাবতেন তুরানি বাদশা আফ্রাসিয়াবের বংশধর, যদিও তুরানি আর তুির্কদের একাকার করে ফেলাটা মধ্যযুগের ইতিহাসবিদরা ভুলবশত করেছিলেন মাত্র! তুরানিরা মূলত আর্যজাতিগোষ্ঠীরই সদস্য, তাদের মাতৃভূমি বহু পরে তুর্কি গোত্রগুলোর শাসনে চলে আসে। উপরে গিয়াসউদ্দীন বলবনের আফ্রাসিয়াবের বংশধর হিসেবে হীনজাতভুক্তদের প্রতি ঘৃণার প্রকাশও সেই ভুলেরই ধারাবাহিকতা। কিন্তু ভুল করে হোক আর সঠিকভাবেই হোক, আভিজাত্যের দাবি বাকিদের কাছে এমন কিছু চায়, যা নিজের কর্ম দ্বারা অর্জিত না, বরং তা পাওয়া গিয়েছে উত্তরাধিকারসূত্রে, এবং তার ন্যায্যতা প্রকৃতি কিংবা ঈশ্বরের কাছ থেকে এসেছে।    

মুসলমানদের আগমনের আগে পর্যন্ত বাংলায় কার্যকরভাবেই একটি ব্রাহ্মণ্য প্রভাবিত আর্যীকরণের প্রক্রিয়া চালু ছিল। পশ্চিমবঙ্গের অধিকাংশ স্থানে শক্তিশালীভাবেই এটি একটি কৌলিন্য প্রথা এবং দৃঢ় সংস্কৃতি গড়ে তুলেছিল। মুসলমানদের বাংলা বিজয়ের সময়ে পূর্ববাংলার অল্প কয়েকটি স্থানেই এর শেকড় গাড়াটা সম্পন্ন হয়েছিল। মুসলমানদের আগমনের পর এই প্রক্রিয়াটি পুরোপুরি বন্ধ হয়নি, তবে তা দুর্বলতর একটি রূপ নেয়, কিন্তু আদিবাসী জনগোষ্ঠীর হিন্দু ধর্মের অন্তর্ভূক্ত হওয়া এর ফলে বন্ধ হয়নি। এইকারণেই কৌলিন্যপ্রথা পূর্ববঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের মতো এত শক্তিশালী না। এমনকি এখানকার কুলীন ব্রাহ্মণদেরও কম খাতির করা হয় রাঢ়ীয় ব্রাহ্মণদের তুলনায়। এই সময়েই বাংলার নতুন শাসক তুর্কিদের সূত্রে কুলীনত্বের নতুন ধারণা কায়েম হতে থাকে, পরবর্তীকালে মোগল আমলে তা ধীরে ধীরে আকৃতি পায়। ধর্মশাস্ত্রে এর অনুমোদন থাকুক বা না থাকুক, এর প্রায়োগিক বাস্তবতা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। 

দিল্লিকেন্দ্রিক সুলতানি ও মোগল শাসনকালে বাংলায় শাসনতান্ত্রিক অভিজাত হিসেবে যারা সর্বোচ্চ পর্যায়ে ছিলেন, তাদের বড় অংশই বাংলার স্থায়ী বাসিন্দা হননি। চাকরির বদলের সূত্রে, জায়গির বদলের কারণে তারা নানান স্থানে ঘুরে বেড়ালেও দিল্লি-আগ্রাসহ উত্তরভারতের নগরীগুলোতেই আবাস গাড়তে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন। এই জায়গিরগুলোর খুব কমই উত্তরাধিকারসূত্রে পাওনা হতো, বরং এগুলো মিলত রাজকীয় সেবা ও সুদৃষ্টির বিনিময়েই। বহুক্ষেত্রে জায়গিরদার এমনকি অনুপস্থিত থাকতেন, কর আদায়ের কাজটি তার স্থানীয় কর্মচারীই করতেন।

বাংলায় সংখ্যার দিক দিয়ে তুলনামূলকভাবে বেশি টিকে যাওয়া অভিজাতরা হলেন পরাজিত আফগান, পাঠান ও তুর্কি বিদ্রোহীরা। এরা মোগলদের আগে ভারতবর্ষ শাসন করতেন, এবং মোগলদের শাসন বিস্তৃত হবার সাথে সাথে প্রত্যন্ততর অঞ্চলগুলোতে বসতি গাড়তে বাধ্য হন। অবশেষে একসময় গোটা মুল্লুকই মোগলদের আয়ত্তে এল, পাঠানদেরও বিদ্রোহ করার সামর্থ্য ও আগ্রহ উভয়ই নিস্তেজ হলো। মোগলদের অনুল্লেখ্য স্থানীয় ছোট বা মাঝারি ভূস্বামী প্রজা হিসেবেই এদের বহু বসতি পশ্চিমবাংলার বহু অঞ্চলের মতো পূর্ববাংলার সাবেক যশোর, দিনাজপুর, ময়মনসিংহ, ঢাকা, কুমিল্লা প্রভৃতি সবগুলো জেলাতেই পাওয়া যায়।

মুসলমান উচ্চবর্গের সবচে বড় স্থায়ী অংশটির আগমন ঘটে আকবরের আমলে মোগলদের বঙ্গবিজয় সুসম্পূর্ণ হলে। একই সময়ে মধ্য এশিয়ায় মোঙ্গল হামলাজনিত বিপর্যয় ও অস্থিরতার কারণে হাজার হাজার অভিবাসী ভারতে এলেন, এবং তাদের কেউ কেউ জল-জঙলার পূর্ববাংলায়, যেখানে ইতিপূর্বে বড় অংশটাই ছিল অকর্ষিত ভূমি—কৃষি পত্তনের জন্য পাট্টা নিলেন। অভিবাসীদের এই ঢেউ তুলনামূলকভাবে অতীতেরগুলোর চেয়ে বড় ছিল, এবং এরাই বাংলাদেশে সবচে বড় অভিজাত বর্গ হিসেবে বংশপরম্পরায় চিহ্নিত হয়েছেন। বাংলাদেশের আদিবাসী, প্রাককৃষি কিংবা অস্থায়ী কৃষিজীবী মানুষগুলোকে এরাই স্থায়ী বসতি, আবাদ ও ইসলাম ধর্মের আওতায় নিয়ে এসেছেন, এমনটাই মত রিচার্ড এম ইটনের। পূর্ববাংলার আদিবাসী জনগোষ্ঠীর আর একটা বড় অংশ একই সময়ে একই প্রক্রিয়ায় হিন্দু ধর্মেরও আওতায় এসেছেন, হিন্দু পত্তনিদার ও জঙ্গলসাফকারীদের বদৌলতে। মোগল বাংলার শুরুর দিকে কবি কঙ্কন মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর (আনুমানিক ১৫৪০-১৬০০) রচিত ‘কালকেতু ফুল্লরা আখ্যান’কে এমন একটি অরণ্যভূমিতে আবাদ পত্তনের কাহিনি হিসেবেই বর্ণনা করেছেন ইটন। আদিবাসী শিকারি কালকেতু এখানে মা চণ্ডীর আশীর্বাদে কৃষিজীবীতে রূপান্তর ঘটিয়েছে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর।

কৌতূহলজনক যে নগর পত্তনের এই কাব্যে সাধারণ কর্মী মানুষদের আগমন ঘটেছিল নানা প্রান্ত থেকে, উত্তর দিক দিয়ে এল দাসেরা, তাদের মাঝে নায়ক বিলিয়ে দিলেন কাঠ-দা, কুঠার, টাঙ্গি আর বাণ, আর দিলেন পান-সুপুরি। অরণ্য সাফ হলো। দক্ষিণ দিক দিয়ে এল কৃষকরা। পশ্চিম দিক দিয়ে বাইশ হাজার লোক নিয়ে হাজির হলো জাফর মিয়া, জঙ্গল সাফ করে তারা বাজার পত্তন করল। কুঠারের শব্দে আতঙ্কিত বাঘ গর্জন করতে করতে পালাল। আরও এল ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়সহ নানান পেশার মানুষজন। মধ্যযুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এই কাব্যটিতে নগর সভ্যতা ও কৃষির বিস্তারের একটা চিত্রই অনুপুঙ্খ তুলে ধরেছেন মুকুন্দরাম।

ইটনের বিবেচনায় বাংলার অধিকাংশ হিন্দু কিংবা মুসলমান চাষি সমাজ স্থানীয় আদিবাসীদেরই বংশধর, যারা লৌকিক নানান দেবতার অনুসারী ছিলেন। ইটন মনে করেন বাংলার মুসলমানরা ধর্মান্তরিত হিন্দু নন। বরং উভয়কে কাছাকাছি সময়ে কৃষি আর নগরের বিস্তারের ভেতর দিয়ে হিন্দু ও ইসলাম এই দুটি বিকশিততর ধর্মের আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে। উল্লেখ্য যে, কাউকে জমি পত্তনিদারের জন্য মোগলরা ধর্মীয় উপাসনার স্থান নির্মাণের শর্ত প্রদান করত। সেই বিবেচনায় বলা যায়, হিন্দু এবং ইসলাম ধর্ম দুটোরই বিকাশ এই  প্রাকরাষ্ট্র লৌকিক জনগোষ্ঠীকে মোগল রাষ্ট্রেরও আওতায় নিয়ে এসেছিল। এভাবে অরণ্যসঙ্কুল পূর্ববাঙলার জুমচাষি, শিকারি ও ধীবর জনগোষ্ঠী একদিকে যেমন লাঙলচালিত কৃষির আওতায় এল, তেমনি লৌকিক ধর্ম ও সরল আদিবাসী অর্থনীতি থেকে উত্তরিত হলো জটিলতর ধর্মসংগঠন, কৃষি ও রাষ্ট্র নামের প্রতিষ্ঠানের আওতায়। মোগল দরবারে যুক্ত হলো রাজত্বের বিশাল এক উত্স। ইটন দেখিয়েছেন এভাবে আদি পত্তনিদারের তৈরি করা মসজিদ, মন্দির কিংবা আখড়াকে কেন্দ্র করে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর নির্ধারিত ধর্মীয় পরিচয় ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। পূর্ববাংলায় অধিকাংশ আদি পত্তনিদার মুসলমান ছিলেন বলেই স্থানীয় আদিবাসীরা বৃহত্সংখ্যায় ইসলাম ধর্মাবলম্বী হিসেবে মোগল সাম্রাজ্যের অধীনে রাষ্ট্র-খাজনা-শাসনের প্রক্রিয়ায় যুক্ত হন।

বাংলার আশরাফদের নিয়ে সংক্ষেপে ইটনের মূল্যায়নটি এমন :

‘বাংলার প্রেক্ষিতে, সাধারণভাবে আশরাফ বর্গের অন্তর্ভুক্ত ছিল সেই মুসলমানের যারা নিজেদেরকে খাইবারের ওপার থেকে আসা অভিবাসীদের বংশধর হিসেবে—অথবা অন্তত বাংলার বাইরে থেকে আসা বলে—দাবি করতো, যারা পারসি-ইরানি উচ্চসংস্কৃতি আর তার সাথে সংশ্লিষ্ট আরবি-ফারসি-উর্দুর চর্চা করতো। ১২০৪ সালে বঙ্গীয় বদ্বীপটি তুর্কী অধিকারে যাওয়ার পর থেকেই পশ্চিমের বহু অঞ্চল থেকে অভিবাসীরা গৌড়, পাণ্ডুয়া, সাতগাঁও, সোনারগাঁও এবং চট্টগ্রামে বসতি গড়ে, প্রধানত দূরগামী বণিক, প্রশাসনকি কর্মকর্তা, সৈনিক আর শাস্ত্রজ্ঞ হিসেবে। কিন্তু ১৩৪২ থেকে ১৫৭৪ সালে স্বাধীন পরপর অনেকগুলো মুসলিম রাজবংশের আমলে বাংলা উত্তর ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, এবং ওই এলাকাগুলো থেকে অভিবাসন বৃহদাংশে হ্রাস পায়। যাইহোক, ১৫৭৫ সালে মোগল বিজয়ের সুবাদে উত্তর ভারত থেকে অভিবাসীরা আবারো বদ্বীপে বসতি শুরু করে, এমন পরিমাণে যে ইসলাম বিষয়ে তাদের ধ্যানধারণাই আধুনিক বাংলার ইতিহাসে আশরাফদের ধর্মীয় ধ্যানধারণাকে সংজ্ঞায়িত করলো।’ (রিচার্ড এম ইটন, এসেজ অন ইসলাম অ্যান্ড ইনডিয়ান হিস্টরি, পৃষ্ঠা. ২৫১)

বাংলার মুসলমানদের যে কয়েকটি সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য সেগুলো পুরো লেখা জুড়ে দেখব :

১. তাদের অধিকাংশই স্থানীয় জুমচাষি, মত্স্যজীবী, বনচর প্রভৃতি লৌকিক জনগোষ্ঠীর বংশধর। সুলতানি আমলে এবং বিশেষ করে মোগল আমলে কৃষিবিস্তারের সময়টিতে তারা ইসলাম ধর্মের কাঠামোতে আসেন, একইসাথে তারা প্রাককৃষি গোষ্ঠী সমাজের স্তর থেকে বৃহত্তর রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার অঙ্গীভূত হন। খাজনা প্রদান, আনুগত্যের শপথ ও উপাসনার স্থানের সংস্কৃতির সাথে যুক্ত হন। এই পুরো কাজটির তত্ত্বাবধানকারী বহিরাগত মুসলমানরা প্রথম স্থানীয় অভিজাত শ্রেণি গঠন করেন। এর বাইরে কর আদায় ও সামরিক কাজে আগতদের একটা বড় অংশ উত্তরভারতেই ফেরত যেত, ক্ষুদ্র একটা অংশ রয়ে গিয়েছিল। এর কিছু আগ থেকেই প্রধানত বৈষ্ণব প্রচারকদের সূত্রে স্থানীয় আদিবাসী গোষ্ঠীসমূহের একটা বড় অংশ একই প্রক্রিয়ায় হিন্দু সমাজেরও অন্তর্ভুক্ত হতে থাকে এবং মোগল আমলে কৃষি সম্প্রসারণের সূত্রে তা ত্বরান্বিত হয়।

২. কোনো কোনো ক্ষেত্রে আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্যের সাথে সাথে স্থানীয় ক্ষমতাধররা সৈয়দ, মীর, মির্জা প্রভৃতি বিদেশি সম্মানসূচক উপাধি ধারণ করতে শুরু করেন। তবে সবচে বেশি ব্যবহূত বংশপরিচয় হলো খাঁ ও শেখ। শুরুতে এটি ব্যবহার করা হয়েছে স্থানীয় হিন্দুদের থেকে নিজেদের পৃথকতা বোঝাতে ধর্মীয় পরিচয়ের চিহ্ন হিসেবে, আফগানিস্তান কিংবা আরব থেকে আসার পরিচয় হিসেবে নয়। বহু ক্ষেত্রেই পরিবারের কেউ ক্ষমতাধর কিংবা অর্থশালী বা সুনামসম্পন্ন হয়ে উঠলে তেমন দাবি প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করা হয় বটে। এর বাইরে মণ্ডল ইত্যাদি উপাধি বহুল পরিমাণে ব্যবহূত হয়েছে সেগুলো হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে সকলেই গ্রহণ করেছে। ধর্মান্তরিত হিন্দু জনগোষ্ঠীর মাঝেও লক্ষণীয় আঠারো এবং উনিশ শতকে ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয় উপাধি ও উপবীত ধারণের সামাজিক আন্দোলন। জাতপাতের নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ আন্দোলনের একটা ধরন ছিল নিজেদের কুলীন ঐতিহ্য উদ্ভাবন।

৩. আতরাফ বা স্থানীয় মুসলমানদের প্রতি হীন ধারণা পোষণ করতেন আশরাফ বা বাইরে থেকে আসা মুসলমানরা, তাদেরকে আধাহিন্দুও ভাবতেন। জেলে প্রভৃতি পেশাকে নিচু চোখে দেখতেন। এর পরিণতিতে সত্যিকারের বিদেশাগত কিংবা স্থানীয়দের মাঝ থেকে সৃষ্ট অভিজাতরা তাদের খানদানের যথাযথ সহবত’ প্রকাশ করার জন্য পারস্যোদ্ভূত সংস্কৃতি ও ভাষা চর্চার চেষ্টা করতেন এবং কৃষিকাজ করতেন না, লাঙলে হাত দিতেন না।

যারা সুলতানি আমল আর মোগল আমল এই দুই দফায় বাংলায় বসতি গড়েছিল, প্রধানত এই দুই অংশই ছিল বাংলার স্থানীয় শরিফ। দিল্লির কেন্দ্র থেকে স্থায়ী সেনাশিবির পাঠিয়ে সুবাদারদের নিয়ন্ত্রণে প্রদেশগুলো শাসিত হতো। তাদের প্রধান কাজ ছিল কৃষক আর কারিগরদের কাছ থেকে খাজনা আদায় করে তা দিল্লিতে পাঠানো। সুবাদার, সেনাকর্মকর্তাসহ অন্যান্য অভিজাতদেরও দিল্লি-আগ্রাতে ফিরে যাবার প্রবণতাই প্রবল ছিল। এর ফলে স্থানীয় কুলীনকুলের গুরুত্ব বৃদ্ধি পাওয়া বা তাদের সামাজিক বর্গ আকারে আরেকটু বেশি দানা বেধে প্রভাবশালী স্থানীয় অভিজাত বর্গে রূপান্তরের প্রক্রিয়াটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বাংলা মোগল সাম্রাজ্যের সম্পদের অন্যতম প্রধান উত্স হলেও সামান্য সম্পদই স্থানীয়ভাবে অবশিষ্ট থাকত। খাজনা যেমন নিরাপদ সামরিক পাহারায় চলে যেত কেন্দ্রে, তেমনি ক্ষণবাসী বণিকদের লাভের একটা বড় অংশও নিরাপত্তার জন্যই ওই কেন্দ্রনগরগুলোতে চলে যেত। অস্থায়ী নিবাস হিসেবে বিবেচিত হতো বলেই নিরাপত্তা ও ধর্মীয় স্থাপনাগুলোর বাইরে তাই মোগল বাংলায় অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের অভাব খুবই প্রকট।

 

শাসনের অধিকার

ফলে সুবাটি যারা শাসন করতেন তাদের সাথে পোশাক-খাদ্য-সংস্কৃতিতে খুবই ভিন্নতর স্থানীয়দের সাথে সামাজিক সম্পর্ক স্থাপন হতো খুব কমই। ‘মাছ-ভাতের খাদ্যাভ্যাসের সাথে পাঞ্জাবের রুটি-মাংস এতটা বিপরীত ধাঁচের যে অভিবাসীদের জন্য একটা বিশেষ প্রতিবন্ধক হিসেবে ভূমিকা রাখতো।’ (পূর্বোক্ত : ১৫২)

আজকের খাদ্যবৈশ্বিকতার বাসিন্দাদের পক্ষে হয়তো খাদ্যাভ্যাস কেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক বিভাজনের গভীরতা আন্দাজ করা কঠিন। কিন্তু এমনকি মাত্র কয়েক দশক আগেও এর গুরুতর তাত্পর্য ছিল। ১৭৮৬ সালে রচিত গোলাম হোসেন সেলিমের রিয়াজ আল-সালাতিন গ্রন্থটির উদাহরণ ইটন দিয়েছেন ওই একই প্রবন্ধের পাদটীকায়। এই বইটি যেন ‘স্থানীয় আদমীদের মাঝে কিভাবে জান বাঁচাতে হবে’ সেই বিষয়ে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক নির্দেশিকা ধরনের হাতবই : ‘আর ওই রাজ্যের উঁচু থেকে নিচু বাসিন্দাদের খাদ্য হলো মাছ, ভাত, সরিষার তেল আর দই আর ফল আর মিষ্টান্ন। তারা প্রচুর লাল মরিচ আর লবণ খায়। দেশটির কোন কোন অংশে লবণ আক্রা। দেশটার বাসিন্দাদের রুচি যা তা, আচরণ যা তা, তাদের পোশাকও যা তা। তারা গম আর যবের রুটি খায় না একদমই। ছাগমাংস, মুরগী আর ঘি তাদের বন্দোবস্তে চলে না।’

সুলতানি ও মোগল কর্মকর্তারা স্থানীয় অধিবাসীদের প্রতি কতটা হীন দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করত, তার অজস্র উদাহরণ পাওয়া যাবে সমকালীন ইতিহাস ও স্মৃতিচারণাগুলোতে। তারিখ-ই-ফিরুজশাহীর লেখক জিয়াউদ্দীন বারানি তার অন্য একটি বিখ্যাত ধর্মীয় সংকলন ফতোয়ায়ে জাহানদারী-তে আশরাফ উচ্চশ্রেণি থেকে নিচু শ্রেণির আযলাফ বা হিন্দু থেকে ধর্মান্তরিত এবং অচ্ছুত্ আজরাল মুসলমানদের পৃথক রাখার পক্ষেও যুক্তি দিয়েছেন। এর পক্ষে যুক্তি ছিল সংস্কৃতি ও ধর্মের বিশুদ্ধতা রক্ষা। মির্জা নাথানের স্মৃতিকথা ‘বাহারিস্তান-ই গায়বী’র কথাও উল্লেখ করা যায়। বাহারিস্তান-ই গায়বী গ্রন্থটি জাহাঙ্গীরের আমল থেকে শাহজাহানের বিদ্রোহ ও বাংলায় আগমন পর্যন্ত বাংলার সুবাদার ইসলাম খার অন্যতম সেনাপতি মীর্জা নাথান-এর কোচবিহার-আসাম অঞ্চলে প্রধানত কোচ ও অহমীয়া এবং অন্যান্য জাতিগুলোর বাসভূমি দখলের যে আগ্রাসী অভিযান মোগলদের তরফ থেকে চলছিল, তার আত্মজীবনীমূলক বর্ণনা। এর বাইরে বিহার-বাংলায় নানান বিদ্রোহ, ত্রিপুরায় অভিযান আর মগ ও ফিরিঙ্গিদের উত্পাতের প্রতিকারের বহু বর্ণনাও এতে আছে। মোগল সাম্রাজ্যের সেনাপতি আর আমলাদের মাঝে রেষারেষি, ষড়যন্ত্রের বহু বিবরণ এতে পাওয়া যাবে, বহু ঘনিষ্ঠ উপলব্ধিরও। শাসকদের নিজেদের মাঝেই উচ্চনীচ বোধ ছিল প্রবল। যেমন হাঙ্গরাবাড়ী নামের একটি দুর্গ হস্তচ্যুত হবার বর্ণনায় পাচ্ছি আফগানদের প্রতি তার মনোভাব :

‘হাবীব খাঁ তার আফগানী মূর্খতার জন্য সৈন্যবাহিনীর অবস্থানস্থল বড় দুর্গটির রক্ষার দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে সৈন্যদের বিন্যস্ত করে পরিদর্শনের চল্লিশটি অশ্বারোহী এবং পাঁচশো পদাতিক সকলকেই নিয়ে দুর্গ থেকে বেরিয়ে আসেন। শত্রু একে ঈশ্বর প্রদত্ত সুযোগ মনে করে যুদ্ধের জন্য এগিয়ে আসে।’

পারস্যবংশদ্ভূত মীর্জা নাথান-এর আফগানদের প্রতি মনোভাব আমরা জানতে পারলাম। কিন্তু এদের সকলে যৌথভাবে কী দৃষ্টিতে দেখত যাদের বিজিত করার জন্য এত চেষ্টা, তাদেরকে? চাকরিতে নাথানের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন শেখ কামাল। কোচজাতির বিরুদ্ধে যুদ্ধে প্রধান সেনাপতি পদে তিনি মির্জা নাথানের স্থলাভিষিক্ত হন। নাথান সেই আদেশ পৌঁছুবার আগেই শত্রু দুর্গ দখল সম্পন্ন করে ফেলেন। এরপরও রাজা রঘুনাথ ও মির্জা বাকি নামের অন্য দুই মোগল কর্মকর্তা নাথানকে শেখ কামালের অধীনে কাজ করতে অনুরোধ করলে তিনি অস্বীকার করেন, এবং জানিয়ে দেন যে, ‘বিদ্রোহীদের নির্মমভাবে পরাজিত করার পর তাতে নাক গলাবার অধিকার আমি কাকেও দেব না।’ এতে মির্জা বাকি এবং রাজা রঘুনাথ ক্রুদ্ধ হয়ে যা বলেন, এবং তার প্রেক্ষিতে নাথান যা বলেন, উভয়টিই তাত্পর্যপূর্ণ : ‘জেলেপাড়ায় সামান্য প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিকারী একদল জেলে ছাড়া আর কোনো বিদ্রোহীকে আপনি দমন করেছেন?’ মির্জাও রাগান্বিতভাবে বলেন : ‘তাহলে তো আপনাদের এককালের প্রধান শত্রু সমগ্র বাংলাদেশের রাজা মসনদদ-ই-আলা ঈসা খাঁ ও মুসা খাঁও তো প্রসিদ্ধ মাছুয়া—মাছধরা (মাছুয়াগিরি) বা জেলে (মাহিগিরি) ছিলেন। আপনাদের খুশি করাতে সোলেমান কররানীর পুত্র আর একজন দাউদ কোথায় পাবো যুদ্ধ করার জন্য? যা হোক, আপনাদের প্রভু আমাকে পাঠিয়েছেন এসব শত্রুর হাত থেকে কোচ রাজ্যকে মুক্ত করার জন্য—হোক না সে মাছুয়া বা মুঘল বা আফগান। বলুন শুনি কার পরাজয়কে আপনারা শত্রুদের পরাজয়ের সমতুল্য বলে মনে করেন? আমি মাছুয়াদের উপর থেকে আমার হাত সরিয়ে নিচ্ছি। আপনাদের দেখিয়ে দেব কি করে শত্রুকে পরাজিত করা ও শাস্তি দেয়া হয় এবং আমাকে এইসব অযৌক্তিক অপবাদ থেকে মুক্ত হতে দিন...।’ (মির্জা নাথান, বাহারিস্তান ই-গায়বী, অনুবাদ : খালেকদাদ চৌধুরী, বাংলা একাডেমি, পৃষ্ঠা : ১৮২)

স্থানীয়দের সম্পর্কে এমন আরও অজস্র দৃষ্টান্ত সম্পর্কে ইটনের মূল্যায়ন হলো :

‘মোগল কর্মকর্তারা এভাবে নিজেদের দেশটির প্রাকৃতিক শাসক হিসেবেই মনে করতো, নিজেদের তারা শুধু বাঙালিদের থেকে খাজনা-দাতার বিপরীতে খাজনা-আদায়কারী মনে করতো না, বরং নিরীহ ধীবরদের বিপরীতে উত্তর ভারতীয় যোদ্ধা পুরুষ হিসেবেও পৃথক করতো।’

শাসনের এই অধিকারকে ন্যায্য ও যুক্তিসম্মত করার চেষ্টা আছে আবুল ফজল-এ। আকবরের সভাসদ আবুল ফজল-এর ১৫৮৯ সালের আইন-ই-আকবরীতে বাংলা সম্পর্কে তাঁর মূল্যায়নে সুবাটিকে তিনি পুরোনো লেখাপত্রের উল্লেখ করে কেন একে ‘বুলঘাক খানা’ বা ‘অশান্তির ঘর’ হিসেবে বলা হয়, তার কারণ হিসেবে নির্দেশ করেছেন এর জলবায়ুকে, যা ‘ইতরদের অনুকূল আবহওয়ার কল্যাণে বিদ্রোহের ধূলা সর্বদাই বাড়ন্ত। মানুষের শয়তানির কারণে খানদানগুলো ক্ষয় পেয়েছে, আর রাজত্ব ধ্বংস হয়েছে। তাই পুরোনো লেখাপত্রে একে বলা হয়েছে বুলঘাক খানা (বিদ্রোহের ঘর)। আবুল ফজল বস্তুত একটা তত্ত্বই হাজির করেছেন, ইটনের ভাষায় : শ্রান্তিকর একটি আবহওয়া মানুষকে কলুষিত করে, কলুষিত মানুষ সার্বভৌম রাজত্বকে ধ্বংস করে, এবং পরোক্ষে, ধ্বংসপ্রাপ্ত রাজত্ব আরও উদ্যমী, আরও ‘পৌরুষসম্পন্ন’ জাতির বিজয়ের রাস্তা তৈরি করে দেয়। বাসিন্দাদের অবক্ষয়িত আচরণের সাথে বাংলার জলবায়ুর সম্পর্ক স্থাপন করার আবুল ফজলকৃত এই তত্ত্ব সাথে সাথেই স্মরণ করিয়ে দেয় পরবর্তীতে বৃটিশ ঔপনিবেশিক কর্মকর্তাদের পালন করা সাদৃশ্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি।’ বাংলাকে বুলঘাক খানা হিসেবে উল্লেখ পাওয়া যাবে আরও কয়েক শতাব্দী আগেকার তারিখ-ই-ফিরুজশাহী গ্রন্থেই, জিয়া উদ্দীন বারানী (১২৮৫-১৩৫৭) সেখানে  জানিয়েছেন বাংলায় রাজপ্রতিনিধিদের মাঝে বিদ্রোহের প্রবণতার কথা।

এভাবে তুর্কি সুলতানি আমলের প্রধান প্রবণতা ছিল তুর্কিদের সামরিক শ্রেষ্ঠত্বে আস্থা। মোগল আমলে বহিরাগতদের প্রতি সেই ধারা অক্ষুণ্ন থাকে। তবে স্থানীয কয়েকটি জাতি গোষ্ঠী, যেমন রাজপুতরা মোগল প্রশাসনে অঙ্গীভূত হয়। এছাড়া উত্তর ভারতের কয়েকটি জাতি, যেমন পাঞ্জাবি এবং ভারতে ইতিমধ্যে কয়েকপুরুষ ধরে বসতি করা অনেকগুলো গোত্র ও পরিবারও সামরিক দায়িত্ব পাওয়া শুরু করে। ঢাকার বিখ্যাত সুবাদার ইসলাম খানও তেমনই একজন পাঞ্জাবি মুসলমান।

শাসিতদের প্রতি শাসকদের এই মনোভাব পরবর্তী ব্রিটিশ আমলেও বহাল ছিল সামরিক জাতি ও অসামরিক জাতির বিভাজনে তারই নিদর্শন মেলে। মোগলরা যেমন খাজনা দেয়া নিরীহ প্রজা হিসেবেই স্থানীয়দের দেখত এবং তাদেরকে সাধারণভাবে অবজ্ঞা করত, তার ধারাই অনেকাংশে বহাল থেকেছে। পাকিস্তান আমলেও সেই ধারণাটিরই পুনরুজ্জীবন ঘটাবার চেষ্টা করা হয়েছে, যার পরিণতি হলো রাষ্ট্রটির ছত্রখান হয়ে যাওয়া।

রবার্ট ওরামের ১৭৬৩ সালে লেখার উদ্ধৃতি দিয়েছেন ইটন ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকদের সাথে মোগল দৃষ্টিভঙ্গির সাদৃশ্য বোঝাবার জন্য : ‘সুযোগসুবিধার সুপ্রচুরতা যেটা এই দেশের বৈশিষ্ট্য’, লিখছেন তিনি, ‘অনেকগুলো প্রজন্ম ধরে এই জলবায়ুর বৈশিষ্ট্যসূচক আলস্যপ্রিয়তার সাথে সমপতিত হয়েছে যাতে মানব জাতিসুলভ সকল অত্যাবশ্যকীয় গুণাবলী ক্ষয়প্রাপ্ত হয়, এবং (মোগল) সাম্রাজ্য জুড়ে সকল ভারতীয়র মাঝে নারীসুলভ চরিত্র দৃশ্যমান হলেও বাংলার স্থানীয় বাসিন্দারা দুর্বলতর কাঠামোর এবং অন্য যে কোন প্রদেশের তুলনায় বেশি অবসন্ন ধরনের।’ (পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা. ২৫১, চতুর্থ পাদটীকা)

এই কথার ন্যায্যতা কিন্তু সম্পূর্ণ প্রতিপাদন করা মুশকিল। শারীরিক আকৃতির বিভিন্নতা জাতিগোষ্ঠীগুলোর মাঝে থাকেই, কিন্তু অতিরিক্ত এবং অমানবিক শ্রমের জন্য যারা মধ্য যুগে উল্লেখ্য ছিল, তাদের মাঝে অন্যতম ছিল বাঙালি কাহার সম্প্রদায়ের মানুষেরা। বাঙালি ডোম, চণ্ডাল এবং আরও অনেকগুলো জাতিগোষ্ঠীর বহু উল্লেখ তাদের শারীরিক শক্তিমত্তা, পালকি বহনের মতো শ্রমসাধ্য কাজে যুক্ত হওয়া প্রসঙ্গে পাওয়া যায়। যেমন আইন-ই-আকবরীতে : ‘বেহারারা সকলেই ভারতবাসী। ইহারা অত্যধিক বোঝা লইয়া পর্বতোপরি বা বন্ধুর ভূমিতে গমন করতে পারে। ইহারা পালকী, সুখাগার, চতুর্দ্দোল, ডুলী প্রভৃতি যানসকল বহন করিয়া থাকে। দক্ষিণদেশের এবং বঙ্গদেশের বেহারারাই সর্ব্বোত্কৃষ্ট।’ ফলত, দৈহিক অবসন্নতা বা শ্রান্তির আবহওয়া পরিশ্রমী মানুষ তৈরিতে বাধা দেয়নি বাংলায়, বরং এদেশের অধিকাংশ ভূমিজ পরিশ্রমী ও শক্তিমান জাতিগোষ্ঠী বহুক্ষেত্রে অধিকতর শ্রমসাধ্য অথচ সামাজিক দিক দিয়ে নিকৃষ্ট হিসেবে বিবেচিত কাজেই বাধ্য হয়েছেন। অন্যদিকে ঐতিহাসিক-সামরিক ক্ষমতাকাঠামোর সূত্রে পশ্চিম-উত্তরপশ্চিম ভারতীয়রা সামরিক বৃত্তির সুযোগ পেয়েছেন বেশি বেশি।

শ্রান্তিকর আবহওয়া শ্রমে বিরত থাকার সুযোগও এদেশবাসীকে খুব বেশি দেয়নি। জনসাধারণের অলসত্বের ঔপনিবেশিক প্রশাসক ও বুদ্ধিজীবীসুলভ ভাবনার  চেয়ে অনেক বেশি সত্ ও যথাযথ বলে মনে হয় অন্য একজন আন্তরিক পর্যটকের প্রজ্ঞার চোখকে, তিনি ফ্রাসোয়া বার্নিয়ের(১৬২০-১৬৮৮)। ফরাসি অর্থমন্ত্রী মশিঁয়ে কোলবার্টকে লেখা এক দীর্ঘ পত্রে তত্কালীন ভারতবর্ষের সামাজিক, রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি ভারতের আর্থিক অবনতি নিয়ে যা লেখেন, তা দৃষ্টান্তস্থানীয়। তার মতে, (জায়গিরদার, জমিদাররা) সাধারণত রাজধানী থেকে দূরে এক-একটি অঞ্চলের কর্তৃত্ব নিয়ে যথেচ্ছাচার করতে থাকেন এবং তার অধিকাংশই সম্রাটের কর্ণগোচর হয় না। সুতরাং যথেচ্ছাচারিতার সীমাও থাকে না। এই যথেচ্ছাচারিতার জন্য দরিদ্র চাষিদের বংশবৃদ্ধিও হয় না এবং হলেও ভবিষ্যত্ বংশধরদের তারা মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়ে যায়। অনেক সময় তারা গ্রাম ছেড়ে গ্রামান্তরে চলে যায় উদার ব্যবহারের প্রত্যাশায়... দেশের বসতবাড়ির অবস্থাও অত্যন্ত শোচনীয়, সবই জরাজীর্ণ এবং নতুন করে তৈরি করার সঙ্গতিও খুব অল্প লোকের আছে। মনে হয় হিন্দুস্থানের চাষি ও সাধারণ লোকের মনে এই প্রশ্নই জাগে : ‘কেন আমি একজন স্বেচ্ছাচারী জায়গীরদার বা জমিদারের জন্য হাড়ভাঙা খাটুনি খাটব? খাটুনির সার্থকতা কী? যে কোনদিন আমার সমস্ত সম্পত্তি ও অর্জিত ধন যদি খেয়ালখুশির বশে স্বেচ্ছাচারী প্রভুর কবলিত হতে পারে, তাহলে মেহনতের মূল্য কী? জীবনের সামান্যতম নিরাপত্তা নেই যেখানে, সেখানে মেহনতের সার্থকতা নেই। সুতরাং যেভাবে হোক, জীবনের ক-টা দিন কাটিয়ে দিতে পারলেই হলো। ফসল ফলিয়ে, সম্পদ বাড়িয়ে লাভ কী?’ (বাদশাহী আমল : বার্নিয়েরের ভ্রমণ কাহিনির বিনয় ঘোষকৃত সারানুবাদ, পৃষ্ঠা. ৯৫)

শিল্পী ও শিল্পকলার অবস্থা নিয়ে বার্নিয়ের জানিয়েছেন যে, খোদ দিল্লিতেই প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কোনো শিল্পকর্ম বা বিলাসপণ্য প্রয়োজন হলে পছন্দের শিল্পী কিংবা কারিগরকে পেয়াদা পাঠিয়ে ধরে আনা হতো, এবং প্রতাপশালীই তার দর ঠিক করে দিতেন। এর ফলে চিরদারিদ্র্য ছিল তন্তুবায়, কারিগর, শিল্পী ও আর সকল নিম্নবর্গের শ্রমজীবী মানুষের স্থায়ী নিয়তি। এটা সারা ভারতের জন্য প্রযোজ্য হলেও বাংলার জন্য ছিল আরও বেশি সত্য। মোগল বাংলায় ভ্রমণকারী প্রায় সকল ইউরোপীয় পর্যটকই লক্ষ করেছেন কাপড়ের প্রাচুর্য সত্ত্বেও বাংলায় কাপড়ের প্রবল আক্রা, গরিব মানুষের বড় একটা অংশ কেবল নেংটি পরিধান করে থাকে। যে বাংলা ছিল খাজনার অন্যতম প্রধান উত্স, সেখানকার দরিদ্র কারিগর ও শিল্পীদের পরিস্থিতি নিয়ে অজস্র রচনা রয়েছে। বার্নিয়ের জানাচ্ছেন :

‘শুধু হিন্দুস্তানের বা মোগল সাম্রাজ্যের নয়, প্রতিবেশী সমস্ত দেশের এবং ইয়োরেপেরও কাপড়চোপড়ের আড়ত্ হল বাংলাদেশ। সরু মোটা, সাদা রঙিন, নানা রকমের তাঁতের কাপড় তৈরি হয় বাংলায়। তাঁতের কাপড়ের এরকম প্রাচুর্য ও বৈচিত্র্য আমি কোথাও কখনো দেখিনি। দেখলে সত্যিই অবাক হয়ে যেতে হয়। ডাচরা এই সব কাপড় যথেষ্ট পরিমাণে জাপানে ও ইয়োরোপে চালান দেয়...পারস্য, সিরিয়া, সৈয়দ বা বৈরাটের সিল্কের মত বাংলাদেশের সিল্ক খুব সূক্ষ্ম না হলেও, এত সুলভ মূল্যে সিল্ক কোথাও পাওয়া যায় না... দেশের অভিজ্ঞ লোকদের মুখে শুনেছি, বাংলার তাঁতীদের প্রতি যদি আর একটু যত্ন নেয়া হত এবং তাদের দিকে নজর দেওয়া হত, তাহলে অনেক সস্তায় আরও অনেক ভাল ভাল তাঁতের ও রেশমের কাপড় তারা তৈরি করতে পারত’। (পূর্বোক্ত গ্রন্থ, পৃষ্ঠা. ২০৪)

বাঙালি চরিত্রের শঠতার দিকটি নিয়েও বারংবার উল্লেখ করেছেন ইউরোপীয় পর্যটকরা। বরং সেই তুলনায় আইন-ই আকবরী তাদের অনুগত খাজনাদাতা হিসেবেই উল্লেখ করেছে। ইউরোপীয়দের এই ধারণার কারণটাও সুস্পষ্ট। ইউরোপীয় বাণিজ্য বাংলায় একটা বেনিয়া শ্রেণি সৃষ্টি করেছিল এবং বেনিয়াবৃত্তির বহুগুণ বর্ধনও করেছিল। তাদের পরিচয়ও ছিল জনগোষ্ঠীর প্রধানত এই অংশেরই সাথে। কোম্পানির প্রতিনিধি, পরিচালক, কর্মচারীরা দুর্নীতি আর শঠতার জন্য বিশেষ খ্যাত ছিল। সেগুলোর বহু বিবরণও কিন্তু সমকালীন ইউরোপীয় রচনাগুলোতে পাওয়া যায়। ফলে এখানে বরং ঘটেছিল একটি উভমুখী শঠতা, দুয়েই পরস্পরকে এবং উভয়ে মিলে প্রজাসাধারণকে ঠকিয়ে যথাসম্ভব নিজেদের সম্পদ বৃদ্ধির চেষ্টায় ছিল। পার্থক্য কেবল এই যে, এই বাণিজ্যে ইউরোপ ক্রমাগত সম্পদশালী হতে থাকে, আর বাংলা রিক্ত হয়। এর সাথে যুক্ত হলো নগর, আদালত নানান সরকারি প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রিক প্রতারক চক্র, দেশ ও বিদেশে ছড়িয়ে থাকা ব্রিটিশদের নানান উপনিবেশ ও আবাদে শ্রমিক পাঠাবার জন্য মানব পাচারের আড়কাঠি চক্র। শঠতার প্রায় অধিকাংশ বৈশিষ্ট্যই ইউরোপীয়দের সংস্পর্শে উপনিবেশগুলোতে মহামারীর মতো বিস্তৃত হয়। অথচ শক্তিমানের শঠতা, শক্তির প্রয়োগ আর ক্রূরতা অনিবার্য এবং সভ্যতাবিস্তারে উপকারী বিবেচিত হতে থাকে। দেশীয় বেনিয়ারা এমনকি নিজের জাতির সাথেও প্রতারণার সম্পর্কেই লিপ্ত ছিল। পরিচয়ের প্রথম পর্বটি পার হবার পরই তাদের পরিচয় ঘটবে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এবং আরও সব মেরুদণ্ডসম্পন্ন ব্যক্তিত্বদের সাথেও।

 

বিচ্ছিন্নতায় বিকাশ

আমরা আবারো একটা পুরোনো প্রশ্নে ফেরত যাই। প্রাকমোগল বাংলার স্বাধীন সুলতানি আমলে কেন বাংলাভাষার কদর বৃদ্ধি পেলো, সেই বিষয়টি শরিফদের স্থানীয়করণের বিষয়টি বুঝতে আমাদের সহায়তা করবে। মোগল সাম্রাজ্যের শেষ দিকে যখন প্রাদেশিকতা প্রবলতর হয়েছিল, তখনো ফারসি ভাষার রাজত্ব অটুট থাকলেও একটা স্থানীয় ভিত্তিসম্পন্ন হিন্দু-মুসলিম অভিজাত শ্রেণি গঠনের সকল পাঁয়তারাও সম্পন্ন হয়েছিল। এই ঘটনাটাই বহুগুণে বর্ধিত আকারে ঘটেছিল প্রাকমোগল সুলতানি আমলে।

অতি সম্প্রতি গবেষক-চিন্তক সলিমুল্লাহ খান তাঁর একটি নাতিদীর্ঘ রচনায় বর্তমান বাংলাদেশের সকল সাম্প্রদায়িকতার সংকটের সাথে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং তাঁর সমমতালম্বী ব্যক্তিববর্গের সম্পর্ক বিষয়ে কৌতূহলোদ্দীপক আলোচনা উত্থাপন করেছেন ২০ অক্টোবর, ২০১২ তারিখে বণিক বার্তায় রচিত একটি প্রবন্ধে। রচনাটির নির্যাসতুল্য অংশটি এমন :

“ইংরেজি বিশ শতকের গোড়ার দিকে লিখিতে বসিয়া ভারতবর্ষের ইতিহাসের অব্যবহিত আগেকার সাতশত বছরকে ঠাকুর ‘বিদেশি শাসন’ বলিয়া রায় দিয়াছেন। ব্রিটিশ মহাজনেরা ততদিনে প্রায় দেড়শত বছর এই উপমহাদেশ শাসন করিয়াছেন। অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যখানে শুরু ধরিলে হিসাব তাহাই দাঁড়ায় বৈকি! এর আগের সাড়ে পাঁচশত বছরের মুসলিম শাসনকেও রবীন্দ্রনাথ ‘বিদেশি শাসন’ বলিতেছেন। সমস্যার গোড়া এই জায়গায়। ভারতবর্ষ যে মুসলমানদের শাসনাধীন ছিল বিদেশাগত হইলেও তাহারা মনেপ্রাণে ভারতবর্ষীয় হইয়া গিয়াছিলেন। ব্রিটিশ শাসকশ্রেণী এই সত্য অস্বীকার করিতেন। ভারতে ব্রিটিশ প্রবর্তিত সাম্প্রদায়িকতার মূলে ছিল সরকারের এই নীতি। সাম্প্রদায়িকতা শব্দটিও ঔপনিবেশিক শাসনের জের। প্রমাণস্বরূপ দুইটি কথা উল্লেখ করা যায়। এখন ভারতের ‘ইতিহাস ব্যবসায়ী’দের মধ্যে রবীন্দ্রনাথের সংখ্যাই বেশি। তাঁহারা সাড়ে পাঁচশত বত্সরের মুসলিম শাসনকে বিদেশি শাসনই মনে করেন। সাম্প্রদায়িকতার গোঁড়া এই জায়গায়।’’

মোগল ও মুসলমানি শাসনের উল্লেখ আছে রবীন্দ্রনাথের এমন যতগুলো রচনা পাওয়া যায়, সেগুলোতে যথাসাধ্য সন্ধান করে দেখা গিয়েছে, রবীন্দ্রনাথ সর্বদাই তাদের স্থানীয়কৃত শাসন হিসেবেই বিবেচনা করেছেন। এমনকি তিনি দিল্লিতে পঞ্চম জর্জের দরবার আয়োজনের বিরোধিতা করেছিলেন এই যুক্তিতে যে, মোগল দরবার জাতির সাথে সম্রাটের ঘনিষ্ঠতার নির্দেশক ছিল, অন্যদিকে ব্রিটিশ দরবার তার শাসনক্ষমতারই প্রতীক। আমাদের মনে কিন্তু বিপরীত প্রশ্নটিই জাগে, রবীন্দ্রনাথকে তো এভাবেই অভিযুক্ত করা উচিত যে, কেন তিনি মোগল শাসনকে বিদেশি মনে করতেন না। অথচ এই গোটা মোগল শাসন জুড়ে বাংলার সম্পদ রিক্ত হয়েছে, সম্পদের পাচার হয়েছে। ঐতিহাসিকভাবেই বিদেশিতুল্য মোগল শাসনের সাথে দীর্ঘস্থায়ীভাবে যুক্ত হওয়া বাংলা ভাষার জন্যও খুব কাজের হয়নি, এর পূর্ববর্তী স্বাধীন সুলতানি আমলে সেই বিকাশটি বরং কার্যকরভাবে ঘটেছিল। এ বিষয়ে খুবই গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন মমতাজুর রহমান তরফদার, তাঁর হোসেন শাহী বেঙ্গল (১৪৯৪-১৫৩৮) আ সোসিও পলিটিক্যাল স্টাডি গ্রন্থটিতে। তার কিছুটা উদ্ধৃতি আমাদের জন্য বিশেষ উপকারী হবে :

‘উত্তর ভারত ও মধ্য এশিয়া থেকে বিচ্ছিন্নতার ফলে বাংলা সাংস্কৃতিকভাবেও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ঐ বিচ্ছিন্নতাই, মনে হয়, বাংলার স্থানীয় সংস্কৃতির বিকাশ প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করেছিল। গুপ্ত সাম্রাজ্যের ভাঙনের পর দীর্ঘদিনের কলহ ও বিশৃঙ্খল অবস্থার শেষে পাল রাজারা একটি স্বাধীন শাসন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এ সময়েই চর্যাগীতিও রচিত হয়েছিল যা ছিল ইতোমধ্যে দীর্ঘ বিবর্তনের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বিকশিত দেশি ভাষায় প্রথম সাহিত্য সৃষ্টি। এগুলিতে ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরুদ্ধে যে বৈরীভাব প্রকাশ পায় তা থেকে শত শত বছর ধরে বাংলার জনজীবনে কর্তৃত্বকারী ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির বিরুদ্ধে জনগণের প্রতিক্রিয়ার নির্দেশ পাওয়া যায়। দরবারের ভাষা হিসেবে যে ফার্সিকে রাখা হয়েছিল তাতে কোন সন্দেহ নেই; কিন্তু এর পরিপূরক কোন উত্তর ভারতীয় কিংবা ইরানি স্রোতধারা না থাকায় এর জীবনীশক্তি শেষ হয়ে যায়। যে ফার্সি পঙিক্তগুলি রচনা করতে তিনি ব্যর্থ চেষ্টা করেছিলেন, সেগুলি পূর্ণাঙ্গ করতে ইরানি কবি হাফিজকে আজমশাহের আমন্ত্রণ এ রকম পূর্ব-প্রসঙ্গে তাত্পর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। বাংলার জনজীবনে ইরানি সংস্কৃতির প্রভাব সীমিত হওয়ায়, বাংলা ভাষা উন্নয়নের উপযুক্ত পরিবেশ পেয়েছিল।’

‘বিদেশি’বা উত্তর ভারতীয় শাসন থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার কল্যাণে পারসিক সংস্কৃতির ধারাটি প্রাণহীন হয়ে যাচ্ছিল, দরবারি ভাষা হিসেবে অটুট থাকলেও কাব্যর সৌন্দর্য নির্মাণ সম্ভব হচ্ছিল না, কবি হাফিজ আর সুলতান আজমশাহের আখ্যানটির এই অসাধারণ ব্যাখ্যা মনোমুগ্ধকর। মমতাজুর রহমান তরফদারের আরও অনুমান, ‘ভারতীয় উপমহাদেশের মধ্যেই জৌনপুর ও গুজরাটের দেশী স্থাপত্যশিল্প এবং দক্ষিণী উর্দু ভাষা ও সাহিত্যের বিকাশেও সম্ভবত একইরকম একটা অবস্থা আমরা লক্ষ করি। উত্তর ভারতীয় রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আধিপত্য থেকে মুক্ত হয়ে বাংলাসহ এ রাজ্যগুলি সাহিত্য, চারুকলা ও স্থাপত্যশিল্পের চর্চার মাধ্যমে স্বস্ব আঞ্চলিক ধীশক্তিপ্রকাশের সময় ও সুযোগ লাভ করে।’

আরও দেখা যাক : ‘চর্যাগীতি যদি পুরাতন বাংলার প্রতিনিধিত্ব করে, তবে আনুমানিক পঞ্চদশ শতাব্দীতে অনন্ত বড়ু চণ্ডীদাস রচিত শ্রীকৃষ্ণ-কীর্তন মধ্যযুগীয় বাংলার ধারক। কৃত্তিবাসের রামায়ণ ও মালাধর বসুর শ্রীকৃষ্ণ-বিজয়ের মত সংস্কৃত মহাকাব্য ও পৌরাণিক কাহিনীর বাংলা অনুবাদের দৃষ্টান্ত আলোচ্য সময়ের সাংস্কৃতিক জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য। কিন্তু পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষদিকে স্থানীয় দেব-দেবী সম্পর্কে যে আদি পাঁচালি কাব্যগুলি রচিত হওয়া শুরু হয়, সেগুলি প্রেরণা পেয়েছিল বাংলার সাংস্কৃতিক অবস্থা ও ভৌগোলিক প্রকৃতি থেকেই। দেশী সাহিত্যের শৈশব শেষ হয়ে গিয়েছিল। সুতরাং সুলতানি আমল একটি জাতীয় জীবনের বিবর্তন নির্দেশ করছিল বলে মনে হয় যেখানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সাহিত্যিক অভিব্যক্তির মাধ্যম হিসেবে ব্যবহূত শুধু ভাষার সমরূপতাই ছিল এমন নয়, রাজনৈতিক ঐক্য এবং ভৌগোলিক সান্নিধ্যও ছিল এর মৌলিক বৈশিষ্ট্য।’

বিচ্ছিন্ন থাকতে পারা বা না পারার তাত্পর্য ভালোভাবে বোঝা যায় মোগল দরবারে নিরন্তর ভারত-বহির্ভূত অভিজাত শ্রেণির সরবরাহের দিকে তাকালে। স্বয়ং আওরঙ্গজেব ‘আরবি আর ফারসি তিনি বলতে এবং লিখতে পারতেন একজন ওস্তাদের মতই। হিন্দি ছিল তাঁর মাতৃভাষা, মোগল প্রাসাদের ব্যক্তিগত জীবনে এই ভাষার ব্যবহার ছিল’ (এ শর্ট হিস্টরি অব আওরঙ্গজেব, যদুনাথ সরকার। পরেকার আওরঙ্গজেব বিষয়ক উদ্ধৃতিসমূহও সেখান থেকেই নেয়া।) যদিও মোগল আমলে সুলতানি আমলের তুলনায় স্থানীয়দের নিয়োগ কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছিল, তারপরও হিন্দুস্তানিতে পরিণত হওয়া মোগলদেরও আমলাতান্ত্রিক ও প্রশাসনিক কাজের সামান্য অংশই পূরণ হতো রাজপুত ও অন্যান্য স্থানীয় ‘সামরিকজাতি’ কর্তৃক। অধিকাংশ নিয়োগ পেতেন বহিরাগতরা, প্রধানত পারসিক-তুর্কি-আরব। আওরঙ্গজেবের একটি অন্তিম ইচ্ছাপত্রেই দেখা যায় :

“সপ্তম-মুত্সু্দ্দী হিসেবে পারসিকরা সব জাতের সেরা। যুদ্ধের মাঠেও, সম্রাট হুমায়ূনের আমল থেকে এখন পর্যন্ত তাদের তুলনা খুব কম। তারা কখনো যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালায়নি, কখনোই আতঙ্কে কাঁপেনি তাদের পা। আর কোন দিনই তাদের কাউকে অভিযুক্ত করা যায়নি তাদের প্রভুকে অমান্য করা কিংবা বিশ্বাসঘাতকতার দায়ে। কিন্তু তারা সব সময়েই খুব বড় মর্যাদা দাবি করে বলে একত্রে তাল মিলিয়ে তাদের সাথে কাজ করা কঠিন। তাদের মিষ্টি কথায় ভুলিয়ে রাখবে, প্রয়োজনে অবলম্বন করবে এড়ানোর কৌশল।

অষ্টম-তুরানিরা বরাবরই সেনা ছিল। শত্রুর ওপর প্রবল দুঃসাহসে ঝাঁপিয়ে পড়া, বাইরে থেকে আকস্মিক চড়াও হওয়া, নৈশ আক্রমণ, আর বন্দী করায় তারা অত্যন্ত দক্ষ। যুদ্ধ চলাকালিন পশ্চাদপসরণ করতে বললে তারা কোন রকম সন্দেহ, হতাশা বা লজ্জা অনুভব করে না, যে আদেশ মানার ব্যাপারে হিন্দুস্তানীরা কিনা ডাহা মূর্খ, যারা কিছুতেই অবস্থান ছেড়ে হটবে না, মাঝখান থেকে নিজের কল্লাটাই হারাবে। তুরানিদের দেবে যাবতীয় সুযোগসুবিধা, কারণ অনেক পরিস্থিতিতেই তারা এমন সেবা দেবে, যা আর কোন জাতির পক্ষেই অসম্ভব।

নবম-কখনোই মর্যাদা কিংবা অনুগ্রহ প্রদানে অবহেলা করবে না বরহার সাঈদদের, ঠিক যেমন কুরআনে বর্ণিত আছে, ‘তাঁর নিকট (মহানবীর) আত্মীয়দের জন্য আমি কেবল ভালবাসা চাই।’ সেই যে পবিত্র ছত্রে বর্ণিত আছে, ‘তোমার কাছে আমার আত্মীয়দের জন্য আমি কেবল ভালবাসা চাই, কোনো ক্ষতিপূরণ নয়,’ এই পরিবারটিকে ভালবাসার অর্থ নবুয়তের মজুরি দেওয়া, তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধার কার্পণ্য কোরো না, এটা তোমাকে এই পৃথিবীতে এবং পরকালে ফল লাভে সহায়তা করবে। কিন্তু বরহার সাঈদের সঙ্গে কাজ কোরো অত্যন্ত সাবধানে। তাঁদের জন্য হূদয়ে ভালবাসার অভাব রেখো না। কিন্তু তাদের দিয়ো না উচ্চ কোন পদ, কারণ, সম্রাটের শক্তিশালী সহকর্মী শিগগির নিজেই সম্রাট হতে চায়। তাদের হাতে যদি লাগাম তুলে দাও, পরিণতিতে তোমার হবে মর্যাদাহানি।”

সরকারি পদগুলোতে অব্যাহত দেশান্তরির ঢল ভারতে বহুকাল বংশানুক্রমিক স্থানীয় অভিজাতদের তৈরি হবার প্রক্রিয়াকে শ্লথ করে তুললেও পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতকে বিশেষ করে আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলন্দাজ বাহিনীর উত্কর্ষে এবং নৌযুদ্ধের নৈপুণ্যে ইউরোপীয়রা তুর্কি-পারসিক এবং ভারতীয় রাজপুতদের চেয়ে বহুগুণ বেশি দক্ষতার পরিচয় দিতে থাকে। ফলাফল হলো তাদের নিয়োগও ক্রমশ বৃদ্ধি পায়, ভাড়াটে সেনা হিসেবে। মোগল সাম্রাজ্যের ক্ষয়িষ্ণুতার যুগে স্থানীয় সবগুলো পক্ষই বিপুল হারে ইউরোপীয় গোলন্দাজ, নাবিক ও বিশেষজ্ঞদের সেবা গ্রহণ করেছে। ভাতৃঘাতী যুদ্ধে আওরঙ্গজেবের তুরুপের তাস ছিল মীর জুমলার গোলন্দাজ বাহিনী, যেখানে বেশ কিছু ইউরোপীয় কর্মকর্তা ছিলেন। অবশ্য এটাও উল্লেখ্য যে, ভারতবর্ষে যুদ্ধে কামানের ব্যবহার শুরু করেন মোগল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা বাবুর, ১৫২৬ সালের পানিপথের প্রথম যুদ্ধে এটিই ছিল ইব্রাহিম লোদীর বিরুদ্ধে নির্ধারক অস্ত্র। কিন্তু যন্ত্রকৌশলের উন্নতি ইউরোপকে বহুগুণ এগিয়ে নেয় এই ইউরোপীয়রা কিন্তু স্থানীয় অভিজাতকুলে যুক্ত হননি। এই সময়েই অভিবাসী মুসলমানদের ঢল বন্ধ হয়ে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মাঝ থেকে প্রশাসন, আমলা ও সামরিক দায়িত্বপ্রাপ্তদের নিয়োগ বৃদ্ধি পায়। বহুক্ষেত্রে বিদেশাগত কিন্তু স্থানীয়কৃত আশরাফ ব্যক্তিরাই আঞ্চলিক কর্তৃত্বে জেঁকে বসলেন। তাদের ভালোমন্দ এখন আঞ্চলিক বিকাশের স্বার্থের সাথে সম্পূর্ণরূপে জড়িয়ে পড়ে। এই অর্থে বৃহত্তম সংখ্যায় অঞ্চলভিত্তিক অভিজাত পরিবারগুলোর স্থানীয়করণ ঠিক এই মোগল সাম্রাজ্যের সাথে আঞ্চলিক বিচ্ছিন্নতার সময়েই ঘটেছিল। এই বিবেচনাতেই আরেকটি প্রসঙ্গ উত্থাপন করা যায় : মোগল শাসন ইংরেজের মতো না হলেও আপেক্ষিক দিক দিয়ে বিদেশি শাসন ছিল বটেই, অন্তত মোগল-পূর্ববর্তী বাংলার স্বাধীন সুলতানি আমল ও মোগল-পরবর্তী প্রায় স্বাধীন নবাব আমলের তুলনায় মোগলদেরকে বিদেশি না বলে উপায় থাকে না। সম্পদের আত্মসাত্ এর বিবেচনায় তা ছিল ভারতবর্ষের সবগুলো অঞ্চলের জন্যই বিদেশি। সদ্য বিদেশাগতদের গুরুত্ব প্রাপ্তির দিক দিয়ে থেকে হিসেব করলে তা এমনকি দিল্লিবাসীর জন্যও খানিকটা বিদেশি। বস্তুত এটা ছিল এমন একটা শাসন কাঠামো যার ধরনগত কারণে সামরিক-আমলাতান্ত্রিক-জ্ঞানগত প্রয়োজনে স্থানীয় প্রতিষ্ঠান ও দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলায় আগ্রহী ছিল না। এই সব চাহিদা মেটাবার জন্য মোগলরা প্রধানত নির্ভরশীল ছিল বাইরের সরবরাহের ওপর।

 

আবাসিক শরিফগণ

মোগল শাসনের শেষ দিকে অনেকটাই স্বায়ত্তশাসিত অথচ স্বল্পায়ু নবাবি আমলে কেন্দ্রের সাথে বেশ খানিকটা বিচ্ছিন্নতার সুযোগে একটা স্থানীয় জমিদার-জায়গিরদার-বণিক বর্গ তৈরি হতে থাকে। এরা সমাজের উচ্চমহলে আসীন ছিল, এবং এদের উত্তর ভারতে ফেরত যাবার তাগিদ কম ছিল, বরং স্থানীয় ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হবার বাসনাই ছিল প্রবলতর। অর্জিত অর্থ এরা দিল্লিতে পাচার করতেন না। শরাফত নিয়ে এদের নিজেদের ভেতর রেষারেষি থাকলেও বাকি দেশবাসীর জন্য এদের ভূমিকা প্রবল শরিফের। এমন একজন কীর্তিমান পুরুষ আবদাল হাকিমের কথাও বলা যাক।

কাশ্মীর থেকে ভাগ্যান্বেষণে ‘নবাব আলীবর্দী খানের রাজত্বকালে হাকিম পূর্বাঞ্চলের বহু জেলা জনপদ ঘুরে অবশেষে উপস্থিত হন সিলেটে। সিলেটে তিনি চামড়ার ব্যবসা শুরু করেন তখন দেশের চামড়ার ব্যবসা ছিল হিন্দুস্তানি মুর বা মুসলমান কর্তৃক একচেটিয়াভাবে নিয়ন্ত্রিত।’ কারণ ‘হিন্দুরা ধর্মীয় কারণে চামড়া স্পর্শ করবে না, স্থানীয় মুসলমানদের মধ্যে অনুরূপ সংস্কার। তা ছাড়া পুঁজি কোথায়? স্থানীয় মুসলমান মাত্রই গরীব ও অবহেলিত। হাকিম অল্পকালের মধ্যেই ব্যবসায় এত প্রসার লাভ করলেন যে দেশ থেকে তার ভাই আব্দুল্লাহ তাঁর সঙ্গে এসে যোগদান করেন... ব্যবসার বৃদ্ধিতে হাকিমের চাইতে তার ভাই অধিকতর দূরদর্শী। তিনি বুঝতে পারেন যে ব্যবসার আসল স্থান ঢাকা। কলকাতার যেসব দেশী লোক রাতারতি ধনকুবেরে পরিণত হয়েছে তারা সবাই ইংরেজ সাহেবেদের সহচর বেনিয়া মুত্সুদ্দী। অনুরূপ সহচর হবার সুযোগ ঢাকায়ও কিছুটা আছে; কিন্তু কোন ইংরেজ সাহেবের সান্নিধ্য লাভের সুযোগ তিনি পাননি। কারণ ইতিমধ্যেই সাহেবদের দালালী ঢাকার সিংহ, বসাক ও দাসদের মাঝে বাটোয়ারা হয়ে গেছে। সবাই ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়াচ্ছে সুযোগ সন্ধানে। কোম্পানি বাহাদুর খুলে দিয়েছে পলকে ধনী হবার অনেক পথ। এর অধীনে পাইকার, গোমস্তা, সেরেস্তাদার, মুনশী মহরার যে কোন একটা পদ পেলেই হলো। তখন সারাজীবনের সঞ্চয় এক বছরেই করা সম্ভব। আর কোন উচ্চপদস্থ ইংরেজ কর্মচারীর ব্যক্তিগত মুত্সুদ্দীহতে পারলেতো কথাই নেই। কলকাতার ঘোষাল পরিবার, ঠাকুর পরিবার, দেব পরিবার, মল্লিক পরিবার, দত্ত পরিবার সবাই কপর্দকহীন অবস্থা থেকে কোটিপতি হয়েছেন।’

নতুন একটা যুগ আমরা পেলাম যখন ইংরেজের রাজত্ব খুলে দিয়েছে টাকা কামাবার নিত্য-নতুন পথ। বাংলার সংখ্যাল্প পুরোনো অভিজাত পরিবারগুলোর অধিকাংশই ইতিমধ্যে বিলীন কিংবা ক্ষয়িষ্ণু। তাদের আভিজাত্য যে মোগল আর নবাবি পাট্টার জোরে প্রতিষ্ঠিত, তার কোনো বাস্তব ভার নেই, যদিও বনেদিপনার দায় রয়ে গেছে অনেকটাই। তো এই নতুন পরিস্থিতির সুযোগ অধিকাংশেই যারা গ্রহণ করেন, তাদের বড় অংশ নানান ঐতিহাসিক কারণে হিন্দু ধর্মাবলম্বী। খুব অল্প ক-জন মুসলমান যারা হাওয়া বদলের সাথে সাথে খাপ খাওয়াবার মতো বুদ্ধি আর সামর্থ্য রাখতেন, হাকিম আর আব্দুল্লাহ তাদের মাঝে অন্যতম। ইংরেজের সহচরের কোনো চাকরি পেতে ব্যর্থ হলেও কোম্পানির আইনে একচেটিয়া কারবারে পরিণত হওয়া লবণ ব্যবসার ঠিকাদার হিসেবে নিয়োগ পান। পরবর্তীকালে ‘আব্দুল্লাহর মুত্যুর (১৭৯৬) পর তাঁর পুত্র হাফিজুল্লাহ কয়েকজন আর্মেনিয়র সঙ্গে একটি যৌথ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গঠন করেন। এদের নাম কোজা জোহানেস, কোজা ডাকোস্তা, কোজা মাইকেল। কোজাদের সাথে ব্যবসা করতেন বলে হাফিজুল্লাহ নিজেও তার নামের আগে ‘কোজা ব্যবহার করতে শুরু করেন।’ পরের বাক্যটা অনবগতদের জন্য বেমাক্কা ধাক্কার মতো ঠেকতে পারে : ‘এ কোজাই পরে খাজায় রূপান্তরিত হয়।’ (সিরাজুল ইসলাম : ঐতিহাসিকের নোটবুক, পৃষ্ঠা. ১২, বাকি সকল খাজা পরিবার সম্পর্কিত বাকি সকল উদ্ধৃতিও একই প্রবন্ধ থেকে সংগৃহীত)

পরবর্তীকালে নবাব উপাধিধারী ঢাকার বিখ্যাত খাজা পরিবারের সূচনাটা এভাবেই, এই খাজার সাথে বোঝাই যাচ্ছে চিশতিয়া খাজা তরিকার কোনো সম্পর্ক নেই। চামড়ার ব্যবসা দিয়ে শুরু হলেও অচিরেই লবণে সমৃদ্ধি অর্জন করে তারা সুপারি, আফিম, গাঁজার ব্যবসায় হাত পাকায়। প্রাথমিক সমৃদ্ধির পর কোম্পানির দুর্নীতিবাজ শাসনে অব্যাহত লোকসানের মুখে এরা জমিদারি কেনে বাকেরগঞ্জ অঞ্চলে, ওই কোজা পরিবারের পরামর্শেই। সন্তানহীন হাফিজুল্লাহ মৃত্যুকালে তার ভাই আলীমুল্লাহকে বলেন :‘ভাই মনে রেখো, এটা জমিদারির যুগ, ব্যবসার যুগ নয়। ব্যবসার পুঁজি ও সুদে লগ্নি টাকা সব জড়ো করে যেখানে যে জমি পাও কিনে নাও। তবে হ্যাঁ, জমি কেনার সময় আবার দুটি উপদেশ মনে রেখো। প্রথম উপদেশ জমি যেন চরাঞ্চল হয়। দ্বিতীয় কৃষক যেন হয় মুসলমান, তবে নায়েব-গোমস্তা রাখবে সব হিন্দু।’

মুসলমান চাষাকে জমি দেয়ার কারণটা আমাদের আলোচনার সাথে প্রাসঙ্গিক খুবই : ‘হাফিজুল্লাহ লক্ষ্য করেছেন যে বিদেশী বিভাষী মুসলমানের প্রতি এদেশের সাধারণ মুসলমানের রয়েছে অগাধ ভক্তিশ্রদ্ধা। আজানুলম্বিত পিরান, পাগড়ি ও নাগড়া পরিহিত ফর্সা রং-এর ওসব উর্দু আরবী-ফার্সী ভাষী মুসলমান দর্শনে স্থানীয় মুসলমানেরা গর্ববোধ করতো। এরা যদি জমিদার হতো তবে মুসলমান প্রজারা সানন্দে তাদের কাছ থেকে পান-সুপারি গ্রহণ করে ধন্যজ্ঞান করতো। জমিদার প্রজার মধ্যে সম্পর্ক ভাল থাকলে জমিদারি পরিচালনায় খরচ হয় কম, আয় হয় বেশি। মুসলমান প্রজার ভক্তি অর্জনের জন্য স্থানীয় মুসলমান জমিদার তালুকদারেরাও সৈয়দ, মির্জা, মীর, বেগ, পাঠান প্রভৃতি উপাধি ধারণ করে ইরানি তুরানী বংশোদ্ভূত বলে ভান করে এবং সে ভান অভ্রান্ত প্রমাণের জন্য মাতৃভাষা পরিহার করে উর্দু ভাষার চর্চা করে, ফারসী আদব কায়দামতে চলতে চেষ্টা করে। অনেকে অভিযোগ করে যে খাজারা এতকাল এদেশে থেকেও বাংলা শিখতে চেষ্টা করেনি। করবে কেন? উদ্ভূত সামাজিক কারণে যেখানে বাঙালি হয়েও অনেকে উর্দু চর্চা করেছে, সেখানে খাজারা তাদের মাতৃভাষা উর্দু ছেড়ে বাংলা শিখবে কেন?’ 

পূর্ববঙ্গের প্রধান জমিদার বনে গেলেও, প্রজাদের মাঝে মিয়া উপাধি পাওয়া ‘কাশ্মীরি অভিজাত’ হিসেবে তিনি ভক্তি-শ্রদ্ধা যা-ই পান, ঢাকার অভিজাত সমাজে তার কোনো পাত্তা ছিল না। ‘পুরনো নবাব পরিবার ও অন্যান্য প্রাচীন আমীর ওমরাদের সদস্যবৃন্দ ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে সারা ঢাকা শহরে। তাদের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক প্রভাব শূন্য বটে, সামাজিক ক্ষেত্রে তাদের গুরুত্ব তখনও অম্লান। এসব পুরনো শরিফ পরিবরের চোখে আলীম মিয়া যে সেদিনের সুদখোর, চামড়া লবণ, আফিম, গাঁজার ব্যবসায়ী।’

‘আলীমুল্লাহর সাথে জুড়ি দিতে পারে একমাত্র গোপাল দাস যিনি জগত্ শেঠের পূর্বাঞ্চলের ব্যাঙ্কগুলো সব কিনেছেন। কিন্তু গোপাল দাস আভিজাত্য চায় না, চায় আরও টাকা। আর খাজা আলীমুল্লাহ এখন টাকা চান না, চান আভিজাত্য। আভিজাত্যের প্রথম সোপান ঘোড়া।’

আলীমুল্লহার এই অভিজাত হবার তাড়নায় সাবেকি বনেদিদের অস্থিরতার শেষ ছিল না। ভাঙা বাড়িটি মেরামতের সাধ্য নেই—এমন অভিজাতদের চোখের সামনে খাজা আলীমুল্লাহ লাহোর থেকে বারোটি আরবি ঘোড়া আনান। ‘যেদিন আলীমুল্লাহ আরব্য ঘোড়ায় চরে শহর প্রদক্ষিণ করেন এর পরের দিনই গুজব উঠে যে শহরের সেরা আমীর মীর কুতুবউদ্দীন সপরিবারে লখনৌ চলে যাচ্ছেন... তিনি লোক মারফত খবর পান যে আলীমুল্লাহ নাকি জবরদস্ত খানকে পরের মওসুমে আরও বারোটি ঘোরা সরবরাহ করার জন্য বলেছেন। তদুপরি স্বর্ণরৌপ্য খচিত তিনটি বিলাসবহুল ছয় চাকার ঘোড়াচালিত গাড়ি তৈরির জন্য ফরমাশ দিয়েছেন। আলীমুল্লাহকে এই শাহীশানে দেখার আগেই শহর ত্যাগ করা শ্রেয় মনে করলেন কুতুবউদ্দীন। স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি বিক্রি শুরু করেন তিনি।’

এই দাঁড়াল পরিস্থিতি। নবাবি আমলের ক্ষণকালীন অনুকূল পরিবেশে যে ভূমি ও চাকরি কেন্দ্রিক স্থানীয় অভিজাত শ্রেণির উদ্ভব ঘটল, অতি দ্রুতই কোম্পানি রাজের আমলে টাকা বানানো বণিকদের কাছে তাদের গরিমা ম্লান হলো। তাই বলে শরাফতের আকর্ষণ কমেনি। টাকাওয়ালা আলীমুল্লাহরাও আর টাকা বানাতে চান না, এবার তারা চান শরাফত।  সামন্ত আভিজাত্যের স্থায়ী পতন ঘটেছে, কিন্তু নতুন বণিক সংস্কৃতির ততটা বিস্তার ঘটেনি যাতে অর্থের কাছে সামাজিক মান তাত্পর্য হারায়। ফলে ‘আলী মিয়া প্রস্তাব করলেন কুতুবউদ্দীন যেন অন্তত বাদশা প্রদত্ত রুপোর ছড়িটি আর মুক্তোর মালাটি তার কাছে বিক্রি করেন। জবাবে কুতুবউদ্দীন জানান যে মীর পরিবারের সম্পত্তি ক্রয় করার প্রস্তাব আলী মিয়ার ধৃষ্টতা বৈ কিছু নয়। পরে জানা যায় কুতুবউদ্দীন ঐ জিনিসগুলি গোপাল দাসের কাছে বিক্রি করেছেন মাটির মূল্যে। মাত্র দুই হাজার টাকার বিনিময়ে গোপাল দাস এনটিক দুটি কিনে নেয়। আলী মিয়া পরে গোপাল দাসের কাছ থেকে ওগুলো কিনে নেন। মূল্য তেইশ হাজার টাকা। ... আরও ঘোষণা করা হয় যে ঢাকার প্রাচীন পরিবারের কেউ যদি কোনো প্রাচীন জিনিস বিক্রি করেন তবে যেন তারা খাজা আলীমুল্লাহর সাথে যোগাযোগ করেন। এ ঘোষণা ছিল পুরনো আভিজাত্যের জন্য কাটা ঘায়ে নুনের ছিটার মতো।’

খাজা পরিবারটি পরবর্তীকালে পূর্ববঙ্গের রাজনীতিতে প্রধান নিয়ামকই শুধু না, মুসলিম লীগ রাজনীতিরও অন্যতম প্রতিভূ হয়ে দাঁড়ায়। নানা ঐতিহাসিক বাস্তবতায় স্থানীয় মুসলমানদের বিকাশটিকে ভারতীয় মুসলমানের সম্প্রদায়গত বিকাশের সাথে যুক্ত করে দেখানোর ক্ষেত্রে এই পরিবারটি অগ্রগণ্য ভূমিকা রেখেছে। পাকিস্তান আন্দোলনে তাদের ভূমিকা ছিল প্রথম সারিতে। কিন্তু পাকিস্তান গঠিত হবার পর অচিরেই মুসলিম লিগে দুটো অংশ দেখা যায়, যাদের একাংশের নেতৃত্বে ছিলেন মধ্যবিত্ত-কৃষক-শ্রমিকদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিরা, বিপরীতে ছিলেন ‘খাজাগজারা’, তাদের স্বার্থ বরাবরই উর্দু ভাষা, নিখিল পাকিস্তান প্রভৃতির সাথে সংশ্লিষ্ট। বাংলাদেশের মুসলমানের ভোটে পাকিস্তানের জন্ম নিশ্চিত হয়েছিল বলে অন্য অনেকের মতোই গর্ব করে নিজের আত্মজীবনীতে লিখেছেন তখনকার তরুণ রাজনীতিবিদ শেখ মুজিবুর রহমান। কিন্তু পাকিস্তান রাষ্ট্রে সেই বাঙালি মুসলমানের প্রতি পশ্চিমাগত মুসলমান ভাইদের আচরণে দেখা গেল মোগলাই ঔদ্ধত্য, যেটা অচিরেই ভেঙে দিল পাকিস্তানের কল্পসৌধটিকে।

ভারতজুড়ে শরাফতির ধারণাটাকে ব্রিটিশ আমলে আরও বিস্তৃততর করে ১৮৬৬ সালে প্রতিষ্ঠিত ভারতবর্ষে সর্বপ্রাচীন ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অন্যতম দারুল উলুম দেওবন্দ মাদ্রাসা। বর্তমান উত্তর প্রদেশের দেওবন্দ শহরে অবস্থিত এই মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতাদের একটা বড় অংশ ছিলেন শরিফ পরিবারভুক্ত, শুরুতে শিক্ষার্থীদের বড় অংশও। কিন্তু ভারতবর্ষ জুড়ে ছড়িয়ে পড়া এর শিক্ষার্থীরা উর্দুভাষায় সাহিত্য-সংস্কৃতির বাহন হয়ে দ্রুতই ধর্মীয় নেতৃত্ব আকারে একটা নতুন সামাজিক বর্গও হাজির করেন। এর আগে এমন কোনো গোষ্ঠী বাংলায় তো দূরের কথা, ভারতবর্ষ জুড়েই অনুপস্থিত ছিলেন। উকিল ও জমিদার কূল থেকে আসা রাজনৈতিক নেতৃত্ব ময়দান দখলের আগ পর্যন্ত রাজনীতিতেও তারাই প্রধান ভূমিকা রাখেন। পরবর্তীকালে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে তারা শরিফ-রাজনীতিরই সহযোগী ছিলেন। নিজেরা কৃষকের সন্তান হলেও অভিজাত শিক্ষকদের সংস্পর্শে তারা শুধু ধর্মীয় ও জাগতিক জ্ঞানই আহরণ করতেন না, গৃহ থেকে বহু দূরে সার্বক্ষণিক আবাসিক শিক্ষার্থী হিসেবে দেওবন্দে অবস্থানের সূত্রে তারা শরিফ সংস্কৃতি, ভাষা, মূল্যবোধ ও মর্যাদার বোধেরও শিক্ষা গ্রহণ করতেন।

কিন্তু এই মাদ্রাসার সবচে বিখ্যাত ছাত্রদের অন্যতম, পরবর্তীকালে যিনি ব্রিটিশবিরোধী জাতীয় আন্দোলনের হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের অন্যতম স্তম্ভ হিসেবে বিবেচিত হন, বারবারা মেটকাফের বর্ণনা অনুযায়ী সেই সৈয়দ হাসান আহমেদ মাদানীর আত্মজীবনীতে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, পরিবারটির বিষয়ে সাধারণ প্রচলিত ধারণায় তারা পেশায় আদতে ছিলেন তন্তুবায়, ভারতবর্ষ জুড়ে সাধারণভাবে হীন সামাজিক মর্যাদার অধিকারী এরা। তার পিতা ধর্মীয় নেতার মর্যাদার অধিকারী হন, নিজেকে মৌলভি হিসেবে উল্লেখ করতেন এবং সৈয়দ হিসেবে দাবি করতেন। স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে তিনি নিজেকে মাওলানা ফজলুর রহমান গঞ্জমুরদাবাদী’র খলিফা উপাধিও ধারণ করেন। যদিও যে সম্মান তিনি চাচ্ছিলেন, তা পেতে ব্যর্থ হন। কেননা ইংরেজদের মনে প্রাণে প্রবলভাবে  ঘৃণা করলেও—এতটা যে তিনি ইংরেজি ভাষা শেখা শুরু করার পর স্বপ্নে মলমূত্র দেখতে পেতেন—তিনি সরকারি প্রথামিক বিদ্যালয়ে চাকরি নিতে বাধ্য হন। শেষ পর্যন্ত তিনি মদিনায় অভিবাসী হতে পেরে কিছুটা আত্মপ্রসাদ লাভ করেন।

আরবে ‘হিন্দি’দের প্রতি সাধারণ বিতৃষ্ণার আবহওয়া প্রবল থাকলেও, এবং শুরুতে প্রচণ্ড দারিদ্র্যের শিকার হলেও দেওবন্দে শিক্ষাপ্রাপ্ত তার তিন পুত্র হেজাজে অসাধারণ শিক্ষক হিসেবে পরিচিত পান। তিন পুত্র অচিরেই ভারতে প্রত্যাবর্তন করেন। ‘দেওবন্দ-শিক্ষিত, আরব-ফেরত, এবং পৈতৃকগ্রামের বাইরে বসতি করায় তাদের সৈয়দত্ব আর কোনো রকম প্রশ্নবিদ্ধ হলো না। এই মর্যাদার মূল্যও তারা দিতেন, যেমনটা লিখেছেন হোসাইন আহমেদ, ‘চূড়ান্ত অর্থে কেবল বিশ্বাস আর ব্যবহারেই পরিচয় বটে, তবে  উভয়েই ত্বরান্বিত হয় জন্মসূত্রে, এবং ‘ত্রুটিহীন শরীরের অধিকারী যেমন আনন্দ প্রকাশ করে, তেমনি উচ্চবংশে জন্মেও আনন্দিত হওয়া উচিত।’

দুটি স্বপ্নাদেশে ‘সাইয়েদ’ খান্দানভুক্ত হওয়া বিষয়ে তার দাবি সুনিশ্চিত হয়েছে বলে তিনি বিশ্বাস করতেন। প্রথমটিতে তিনি নবির কন্যা ফাতিমার দিকে সাঁতার কেটে যাচ্ছিলেন, আর ফাতিমা দৃশ্যমান হয়েছিলেন তার মাতৃমূর্তিতে। অন্য স্বপ্নটিতে তার একজন সৈয়দ পূর্বপুরুষ ছিল এটা দেখার বর্ণনা দিয়েছে তার শায়খ। একই ভাবে আমরোহীর অন্য একটি পরিবারের সৈয়দত্ব নিশ্চিত করেন শায়খ মোহাম্মদ কাসিম, যেটি এর আগে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে শেখ উপাধিধারী ছিল।

দেওবন্দ, এবং অন্য সকল ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শরাফতি বিষয়ে অভিজ্ঞতা আসলে বহুমুখী রাজনীতি ও সামাজিক পরিস্থিতির জটিল ব্যাকরণে নির্ধারিত হয়েছিল। উনিশ শতকের মধ্যভাগে প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠানগুলোই ভারতবর্ষীয় আলেম সমাজের জন্ম দেয়। এর আগে ক্ষুদ্র আকারে দিল্লি, লক্ষেৗসহ কয়েকটি নগরে তাদের ছোট ছোট ব্যক্তিগত শিক্ষাকার্যক্রম ছিল মাত্র। শুরুর দিকের আলিম সমাজের বৃহদাংশ শরিফ শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। অধিকাংশ সাবেকি আলিমের বংশতালিকা তাদের নিয়ে যায় সৈয়দ (নবির বংশধর), শেখ (নবির সহযোগীর বংশধর), মোগল আর পাঠান (পূর্ববর্তী শাসকদের বংশধর, যারা বাইরে থেকে ভারতে এসে বসতি গড়েছে)। ‘উলামাদের ক্ষেত্রে বিদেশাগতদের বংশধর এই দাবিটি তাদের ধর্মীয় কর্তৃত্বকে উজ্জীবিত করতো, কেননা এটা নবীর কিংবা তাঁর কর্মক্ষেত্রের সাথে নৈকট্যের ইশারা দেয়।’ (বারবারা মেটকাফ : ইসলামিক রিভাইভাল ইন বৃটিশ ইনডিয়া দেওবন্দ, ১৬৬০-১৯০০)

রাজনৈতিক ক্ষমতাহীন মুসলমান খানদানি পরিবারগুলো প্রাথমিকভাবে এভাবেই তার সামাজিক কর্তৃত্বকে অটুট রাখার চেষ্টা করে। এমনকি শাসক ইউরোপীয়দের মোকাবিলায় ধর্মীয় পরিচয়ের শ্রেষ্ঠত্বের আশঙ্কার মুখে ভারতীয় সামাজিক সংহতিকেও অটুট রাখার এটা ছিল একটা প্রয়াস, যার সামাজিক নেতৃত্ব তারা গ্রহণ করে। শেখ-সৈয়দ-মোগল-পাঠান—এই চার অভিজাতের গুরুত্ব তুলে ধরতে গিয়ে মুহাম্মদ কাসিম দেওবন্দ মাদ্রাসার কার্যবিবরণীতে লেখেন, ‘আল্লাহ এই চার কওমের ওপর ধর্মীয় শিক্ষা প্রদানের কাজ অর্পণ করেছেন।’

কিন্তু এটাও আমাদের স্মরণে রাখতে হয় যে, দেওবন্দ, আলীগড়, ফারাঙ্গীমহল প্রভৃতি উনিশ শতকী প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে ওঠা সম্ভব হয়েছিল কেবল ঔপনিবেশিক ভারতেই। এর প্রয়োজন কিংবা বাস্তবতা কোনোটিই আগেকার শাসনগুলোতে ছিল না। প্রথমে অভিজাদের সন্তানদের প্রাধান্য থাকলেও অচিরেই এখান থেকে শিক্ষিতদের অনেকেই কেবল ধর্মীয় বৃত্তি বা ভূমির ওপর আর টিকে থাকতে পারছিলেন না। তারা সরকারি চাকরি, শিক্ষকতা, ব্যবসা, চিকিত্সা ইত্যাদিতে যুক্ত হন। দেওবন্দের শিক্ষকদের মাঝে কাসিম এর বিরোধিতা করেননি, কেননা আলিম ‘কেবল গৌরব অর্জন করবে না, তাদেরকে জীবীকাও অর্জন করতে হবে।’ যদিও আনওয়র শাহ কাশ্মীরির মতো আরেকজন প্রভাবশালী ধর্মীয় নেতা মনে করতেন ধর্মীয় শিক্ষার প্রণোদনা হিসেবে অবক্ষয়ী জাগতিক লক্ষ্য হাজির করা হলো ‘জুতা মোছার জন্য দামি শাল কেনার মতো মূর্খামি।’ বাস্তবদর্শী ছিলেন দেওবন্দের অধিকাংশ প্রতিষ্ঠাতাই, ফলে জাগতিক বৃত্তিগুলো গ্রহণে উত্সাহই দেয়া হয়।

যা-ই হোক, উনিশ শতকের শেষ দিকে কিন্তু অভিজাত এবং একই সাথে ধনী পরিবারগুলো থেকে সন্তানদের আসা কমে যেতে থাকে, তাদের জন্য স্বদেশ এবং বিলেতের ইহজাগতিক শিক্ষার সুযোগ আরও আকর্ষণীয় বোধ হয়। অন্যদিকে দীনহীন অথচ খানদানি পরিবারগুলো থেকে শিক্ষার্থীরা আসতে থাকে—এটা তাদের বিত্তের ক্ষতিপূরণ হিসেবে ধর্মীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করছিল, একই সাথে বিনামূল্যে এমন একটা শিক্ষা পাওয়া যাচ্ছিল, যেটা উনিশ শতকে অনেকগুলো আকর্ষণীয় পেশায় প্রবেশের জন্য যথেষ্ট ছিল। সৈয়দ আহমদ মাদানীর ঘটনায় আমরা দেখেছি যাদের শরাফতি বিষয়ে সংশয় ছিল, সেটাকে কাটিয়ে ওঠা গেছে নতুন সামাজিক ভূমিকায়। খানদানের বাইরেও সাধারণ কৃষক পরিবারগুলো থেকেও বিপুল পরিমাণ ছাত্ররা আসতে থাকে। শরফাতির প্রতি উত্তরাধিকারসূত্রে কোনো দাবি না থাকলেও শিক্ষা যে নতুন সামাজিক বর্গে তাকে উত্তরিত করে, তার আকর্ষণও ছিল বিরাট। বাংলার মতো অঞ্চলে যেখানে শরাফতের প্রাবল্য ছিল কম সংগঠিত, অন্যদিকে উপনিবেশ নতুন সামাজিক নেতৃত্বের চাহিদা সৃষ্টি করেছে সমাজে, সেখানে এটা বলাই বাহুল্য। বস্তুত, দেওবন্দ মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের একেক অঞ্চল থেকে আগমনের কারণ একেক, কিন্তু দেওবন্দে ‘১৮৮৬ সালে শিক্ষার্থীদের মোটা দাগে এক তৃতীয়াংশ এসেছিল বাংলা থেকে।’

দেওবন্দে ‘বাংলা, সীমান্তপ্রদেশ বা মাদ্রাজ থেকে আগত শিক্ষার্থীরা সামান্য ধর্মীয় শিক্ষা নিয়ে আসে, এবং প্রায়ই তাদের কোন উর্দুজ্ঞান থাকে না’ এবং খলিল আহমেদ নামের একজন শিক্ষক নিজে প্রশিক্ষণ দিতেন বাঙালিদের ‘যাদের উচ্চারণ পরিষ্কার ছিল না’। ‘এদের অনেকেই উর্দুভাষী বাঙালি আশরাফ পরিবারের লোক, যারা নিজেদের আমমুসলিমদের থেকে স্বতন্ত্র রাখতে উর্দুর ব্যবহার করে এবং নিজেদের বিদেশাগতদের বংশধর হিসেবে দাবি করে।’ দেওবন্দ মাদ্রাসা এভাবে একদিকে প্রথম বারের মতো সাধারণ মানুষের মর্যাদাসীন হবার সুযোগ সৃষ্টি করে, অন্যদিকে শরাফতের ধারণাকেও খানিকটা আধুনিক আকারে পুনরুজ্জীবিত করে।

এই প্রসঙ্গে খুবই কৌতূহলোদ্দীপক একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করেছেন অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক, সরদার ফজলুল করিমের সাথে কথোপকথনে তিনি উল্লেখ করেছেন জাস্টিস আমীর আলীর আত্মীজীবনীর কথা। সেখানে আমীর আলী জানান, বাংলার বিখ্যাত সোহরাওয়ার্দী পরিবারের উপাধিটি পারিবারিক নয়, তাদের সাথে পারসিক সোহরাওয়ার্দীদের কোনো সম্পর্ক নেই। আমীর আলীর জন্য এই তথ্যটির উল্লেখ জরুরি, কেননা তিনি আবার বিখ্যাত একটি খানদানি শিয়া পরিবারের সন্তান। 

 

বাঙালি শরিফের আপদ

বাংলায় এই নতুন মুসলমান সমাজের নৃতাত্ত্বিক পরিচয় কী? তারা কারা? নিজেদের পরিচয় নিয়ে গুরুতর সন্দেহ, সংশয় আর হীনম্মন্যতা বাঙালি মুসলমানদের বহু বছর ভুগিয়েছিল। তুলনীয় বাংলার ব্রাহ্মণ জনগোষ্ঠীর ‘শুদ্ধতা’ নিয়ে প্রায় একই রকমের বিতর্ক। বাংলায় প্রথম যখন জানা গেল, মুসলমানরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ, তা একটা চমকই ছিল রীতিমতো। ১৮৭২ সালের প্রথম আদমশুমারিতে জানা গেল যে বাংলা এলাকার ৩৬,৭৬৯,৭৩৫ জন বাসিন্দার মধ্যে ১৬,৩৭০,৯৬৭ জন মুসলমান। এই আদমশুমারিরও কিছু মৌলিক ত্রুটির কথা বলেছেন ইতিহাসবিদ মোহর আলী, যার কারণে আদমশুমারিটিতে মুসলমান জনগোষ্ঠীর প্রকৃত সংখ্যা কম দেখা গিয়েছিল।

প্রথমত, বহু মুসলমান তাদের পরিচয় লুকিয়েছিলেন শাসকদের শুমারির উদ্দেশ্য নিয়ে ভীতির কারণে; দ্বিতীয়ত, শুমারিতে অনেক আদিবাসী গোষ্ঠীকে ভুল করে হিন্দু ধর্মাবলম্বী বলে গণনা করা হয়। তার পরও শুমারিতে মুসলমানের সংখ্যা এমনই আলোড়ন তৈরি করে যে এটা নিয়ে রীতিমতো হৈ চৈ পড়ে যায়। ওই আদমশুমারির প্রধান কর্তা বেভারলি ‘বাংলার প্রায়-উভচর’ আদিবাসীরা হিন্দুধর্মে তাদের হীনাবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য ইসলাম গ্রহণে বাধ্য হয়েছে বলে মন্তব্য করেন। এরপর ১০ বছরের ব্যবধানে ১৮৮১ ও  ১৮৯১ সালের দু-দুটো আদমশুমারিতেও দেখা যায় মুসলমানরা বাংলায় হিন্দুদের তুলনায় সংখ্যায় অনেক অনেক বেশি। ১৮৮১ সালেরটিতে ১৭,৮৬৩,৪১১ জন মুসলমানের বিপরীতে দেখা যায় ১৭,২৪৫,১২০ জন হিন্দু; আর পরেরটিতে ১৯,৫৮২,৪৮১ জন মুসলমানের বিপরীতে পাওয়া গেল ১৮,০৬৮,৬৫৫ জন হিন্দু। এবারও সংখ্যাবৃদ্ধির কারণ হিসেবে ধর্মান্তরকরণকেই দেখানো হলো।

আর ১৮৯২ সালে এইচ এইচ রিজলি তাঁর ‘ট্রাইবস অ্যান্ড কাস্টস অব বেঙ্গল’ গ্রন্থে এই হিন্দু নিম্নবর্ণের মানুষদের ইসলামে ধর্মান্তরকরণের তত্ত্বকেই (ক্ষুব্ধ মোহর আলীর ভাষায়) ‘নৃতাত্ত্বিক ছোঁয়া’ দিলেন। বিভিন্ন শ্রেণির বাঙালির ‘নাসিকার দৈর্ঘ্য’ পরিমাপ করে রিজলি রায় দিলেন যে বাঙালি মুসলমান ধর্মান্তরিত নিম্নবর্ণের হিন্দু ছাড়া আর কিছু নয়। ইরান-তুরানে নিজেদের শেকড়—সন্ধান করা অভিজাত মুসলমানদের মধ্যে আজ যেমন, ওই সময়েও একই রকম বিবমিষা জাগিয়েছিল এই তত্ত্বটি, আদিবাসী চাড়াল-চণ্ডালের বংশধর পরিগণিত হতে কে রাজি হয়! খন্দকার ফজলে রাব্বী ছিলেন মুর্শিদাবাদের নামমাত্র নবাবের দেওয়ান। ১৮৯৩ সালে রিজলির তত্ত্বের বিরোধিতা করে তিনি ফারসিতে ‘হাকিকত-ই-মুসলমান-ই-বাংলা’ নামের একটি কিতাব ছাপেন। দুই বছরের মধ্যেই এর ইংরেজি অনুবাদও আসে। কিতাবটি আমরা দেখিনি, তবে মোহর আলীর বরাতে তার মূল বক্তব্যটি জানা যাচ্ছে। উচ্চ-নিম্ন-নির্বিশেষে হিন্দুদের বল প্রয়োগে ধর্মান্তরকরণের তত্ত্বের বিরোধিতা করে তিনি বলেন, সে ক্ষেত্রে এই বল প্রয়োগটি উচ্চবর্ণের হিন্দুদের ওপরও করার কথা, তবে মুসলমান কেন শুধু অন্ত্যজ হিন্দুর বংশধর হতে যাবেন? ৫৬২ বছর ধরে বাংলার শাসক থাকা বিদেশি মুসলমানরা তাদের সামর্থ্য বৃদ্ধির জন্য স্বজাতির মানুষদের এনে বঙ্গে বসতি করাতেন, এ রকম বহু উদাহরণও তিনি হাজির করেন। স্পষ্টতই বঙ্গীয় মুসলমানরা প্রধানত নিম্নজাতির হিন্দুদেরই ধর্মান্তরিত বংশধর, এই সম্ভাবনায় রাব্বী কতটা আহত হয়েছেন, তার বক্তব্যে সেটি পরিষ্কার। নিম্নবর্ণের মানুষেরা ইসলামে দীক্ষিত হয়ে থাকলে তাদের বংশধরদের সম্পর্কে রাব্বীর বক্তব্য কী, মোহর আলী তা জানাননি।

রাব্বী নিজে একজন অভিজাত বলেই আতরাফ মুসলমানদের প্রতি যে নিচু ধারণা পোষণ করতেন, সেই গরিমা আহত হতো বলে সাম্যের আহ্বানে অন্ত্যজরা দলে দলে মুসলমান হতে উদ্বুদ্ধ হয়েছিল এই মত প্রচারে তার বাধত। এটা এমন একটা সঙ্কট যেখানে শরাফতের ইসলামি আভিজাত্যবোধ ইসলামের সাম্যের ধারণাকেই পরাভূত করেছিল।

ইটনের সাথে রাব্বী ও মোহর আলী, বেভারলি ও রিজলির প্রধান পার্থক্যের জায়গাটিও এই স্থলে পরিষ্কার করা দরকার : ইটনও মনে করেন অন্ত্যজ হিন্দু থেকে ইসলামে গণধর্মান্তর ঘটেনি। এমন ধর্মান্তরের কোনো লিখিত, মৌখিক বা অন্য কোনো বিবরণ কিংবা সূত্র নেই, এটা ঔপনিবেশিক আমলে বাঙালি মুসলমানের সংখ্যার ধাঁধাঁ সমাধানের চেষ্টায় ঔপনিবেশিক কর্তাদের একটা অনুমানমাত্র। বরং বাংলার অন্ত্যজ হিন্দু এবং মুসলমান উভয়েই স্থানীয় আদিবাসী প্রাককৃষি জনগোষ্ঠীর বংশধর।

রিজলির আবিষ্কৃত বাঙালি মুসলমানদের শারীরিক বৈশিষ্ট্য বিষয়ে রাব্বী (মোহর আলীর মারফতে যা আমরা জানতে পারছি) মন্তব্য করেন যে এটা অন্যান্য জাতির সঙ্গে মিশ্রণ, আবহওয়া, পেশা, খাদ্যাভ্যাস ও অন্যান্য শর্তের ফলাফল। এমনকি তিনি সত্যি সত্যিই রিজলির গবেষণাপদ্ধতির একটি মৌলিক ত্রুটি দেখিয়ে দেন, রিজলি যেখানে হিন্দুদের বেলায় ১২টি বর্ণ বা পেশায় শ্রেণিবিন্যস্ত করে দৈহিক বৈশিষ্ট্য পরিমাপ করেছেন, মুলমানদের বেলায় তিনি একটি গড় ছকে কাজটি করেছেন। ফলে তাঁর গবেষণার পদ্ধতিই সঠিক নয়। রাব্বী আরো অভিযোগ করেন, রিজলির গবেষণায় নামগুলো দেখলেই বোঝা যাবে সমাজের একদম নিচু স্তরের মুসলমানদের নিয়েই তিনি গবেষণাটি সেরেছেন এবং এর পেছনে রিজলির অসত্ উদ্দেশ্যের ইঙ্গিতও তিনি করেছেন। সম্ভবত সাবেকি নবাব আর অভিজাত মুসলমানদের প্রতি বিদ্বিষ্ট ঔপনিবেশিক কর্তার মনোভাবই খুঁজেছেন শরাফতিত্ব নিয়ে আক্রান্ত বোধ করা খন্দকার ফজলে রাব্বী, আর তার এই সন্দেহ অমূলক নাও হতে পারে।

ফজলে রাব্বির এই সূত্রটি যাঁর বরাতে পাওয়া, সেই মোহর আলীর ১৯৮৫ সালে প্রকাশিত ‘হিস্ট্রি অব দি মুসলিমস অব বেঙ্গল’-এর মূল সুরও একই, কিছু মুসলমান অন্ত্যজ হিন্দু জনগোষ্ঠী থেকে এলেও অধিকাংশ বাঙালি মুসলমানই বাইরে থেকে আসা। যদিও এই স্বল্প অন্ত্যজ জনগোষ্ঠীর মুসলমান হওয়ার পেছনে তিনি ইসলামের সাম্যদর্শনকেই গুরুত্ব দেন, তারপরও অধিকাংশ মুসলমানকে আশরাফকুলভুক্ত করার উদ্যোগ থেকে মোহর আলীর মধ্যেও শরাফতত্ত্বের গরিমা আন্দাজ করা যায়। সেই অর্থে অধ্যাপক মোহর আলী মুর্শিদাবাদের নামকাওয়াস্তে নবাবদের দেওয়ান ফজলে রাব্বীর আধুনিক সংস্করণ।

মোহর আলী কিন্তু একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণের কথা বলেছেন। সেটি হলো ধর্মান্তরকরণের ঘটনার প্রায় কোনো উদাহরণ নেই, যত্সামান্য যা আছে তা বাঙালি মুসলমানদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের হিন্দু কিংবা অন্ত্যজ উত্স প্রমাণে যথেষ্ট নয়। কিন্তু মোহর আলী এবং রাব্বীর বিপক্ষের যুক্তিটিও আবার সমানই শক্তিশালী, বাংলার বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান জনগোষ্ঠীর উত্পত্তির ব্যাখ্যা অভিবাসী আশরাফ মুসলমানদের দিয়েও করা সম্ভব নয়। রিচার্ড এম ইটন এই বিষয়টিরই একটি বিকল্প ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর মতে, তলোয়ারের জোরে বা সাম্যের মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ হয়ে গণধর্মান্তরকরণের ঘটনার তেমন উল্লেখ নেই, কারণ এমন ঘটনা ঘটেছে খুবই কম। পূর্ব বাংলা আর পশ্চিম পাঞ্জাবে ইসলাম গ্রহণ ঘটেছে বরং ভিন্ন আরেকটি পদ্ধতিতে। সেটি হলো কৃষি-সংস্কৃতির বিস্তারের মধ্য দিয়ে পাঞ্জাবের যাযাবর জাঠ জাতিগোষ্ঠী ইসলাম গ্রহণ করে, বাংলায়ও বনভূমি পরিষ্কার করে ধান আবাদের মধ্য দিয়ে ইতিপূর্বে হিন্দু ধর্মের আওতার বাইরে থাকা আদিবাসী আহরণজীবী এবং আদিম ধরনের কৃষিজীবী জনগোষ্ঠী ধীরে ধীরে ইসলামে দীক্ষিত হয়েছেন। এ কারণেই আগে থেকে তুলনামূলকভাবে অধিকতর আবাদি হয়ে যাওয়া পশ্চিমবঙ্গের তুলনায় পূর্ববঙ্গে মুসলমানদের সংখ্যা বেশি।

ইটন আরো দেখান যে মোগল আমলেই বরং সমগ্র পূর্ববাংলা প্রথমবারের মতো একটি একক সাম্রাজ্যিক শাসনের অধীনে আসে। এর আগেকার বাংলার সুলতানরা পূর্ববাংলার অধিকাংশ এলাকার ওপর কর্তৃত্ব ভোগ করতেন না। এখানেই আরেকটি জটিল প্রশ্ন সামনে আসে। অধিকাংশ মোগল শাসক ধর্মান্তরকরণের ঘোর বিরোধী ছিল। একটি বর্ণনায় যেমন শাহজাদপুরের জমিদার রাজা রাওয়ের পুত্রকে ধর্মান্তরিত করার জন্য বাংলার সুবাদার ইসলাম খাঁ তাঁর এক নৌ সেনাপতি তুকমান খাঁকে পদাবনতির শাস্তি দেন, আরেকটি ঘটনায় দেখা যায় মেদিনীপুরের এক স্থানীয় মুসলমান বিচারপতি (শিকদার) একজন মুসলমানকে শাস্তি দিচ্ছেন হিন্দু গ্রামের কয়েকটি ময়ূর হত্যা ও ভক্ষণ করার অপরাধে, কেননা সে হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায় প্রাণী হত্যা করে মোগল আইন ভঙ্গ করেছে।

এই পুরো দৃশ্যপটের একটা বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটও বর্ণনা করেছেন ইটন। ১৪৯২ সালে কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কার-পরবর্তী সময়ে পর্তুগিজরা তাদের আহূত বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ ও রৌপ্য ব্যবহার করে ভারতীয়দের কাছ থেকে পণ্য ক্রয় করে। এই বাণিজ্যের কর বাবদ মোগলদের হাতে আসা বিপুল অর্থ ব্যবহূত হয় পূর্ববঙ্গের তখনো অরণ্যাচ্ছাদিত এলাকায় নতুন নতুন আবাদি স্থাপনে। কাছাকাছি সময়েই হুগলী-ভগিরথী পথে গঙ্গায় পলি জমার ফলে সেটা অগম্য হয়ে পড়লে এবং গঙ্গার মূল স্রোত আবারও পদ্মায় প্রবাহিত হবার ফলে নৌপথে যোগাযোগও সহজতর হয়, মোগল শাসনামলে ইউরোপীয় মানচিত্রগুলো থেকে গঙ্গার এই গতিপথ পরিবর্তনের একটা ধারণা পাওয়া যায়। পদ্মায় নতুন করে স্রোতধারা ফেরত আসার ফলে কয়েক শতক পর দুর্গম পূর্ববঙ্গ উত্তর ভারতের রাজনৈতিক প্রভাবের সাথে নৌপথে দৃঢ়ভাবে যুক্ত হয়ে পড়ে। সুবাদার ইসলাম খানের অধীনস্থ মির্জা নাথানের অভিযানগুলোও এই কারণেই সহজতর হয়েছিল।

এই সূত্রেই বহুসংখ্যক মুসলমান বাইরে থেকে এসে স্থানীয় জনবল সংগঠিত করে নতুন নতুন আবাদ গড়ে তোলেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের উদ্যোগেও এই কাজটি পরিচালনা করা হয়। এমনকি একটা উদাহরণে রাজা জানকী বল্লভ মুর্শিদাবাদের নবাবদের কাছ থেকে দক্ষিণবঙ্গে জমিদারি স্বত্ব গ্রহণ করে পত্তনির কাজটি দিয়ে দেন শেখ গাজী নামের একজনকে। তিনিই জঙ্গল সাফ করে আবাদ করার দুরূহ কাজটি সম্পন্ন করেন। এভাবে অনুপস্থিত হিন্দু জমিদারের অর্থায়নে বাকেরগঞ্জ এলাকায় মুসলমান বসতি গড়ে ওঠে। পরবর্তী স্মৃতিতে এই পত্তনিদাররাই পবিত্র পুরুষ, পীর বা অলৌকিক শক্তিধর ব্যক্তি হিসেবে কল্পিত হতেন। শত শত মোগল নথিপত্রে অগম্য অরণ্য সাফ করে পূর্ববাংলার গহিন এলাকায় কৃষি আবাদ স্থাপনের নজির পাওয়া যায়। নোয়াখালী, বরিশাল, রংপুর, ঢাকা, ময়মনসিংহের নতুন নতুন এলাকায় মুসলমান বসতি গড়ে ওঠে। বহু পরে সাতচল্লিশ সালেও হিন্দু ও মুসলমান পত্তনিদারদের কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বসতিগুলোতে তাদের এই আদি সাম্প্রদায়িক চরিত্র অব্যাহত থাকে। ইসলাম বিস্তারের এই পর্বটি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সঙ্গে জড়িত। সেটি হলো জমির পত্তনির অধিকার পাওয়ার জন্য উপাসনালয় স্থাপন ছিল বাধ্যতামূলক। রাষ্ট্র ও বৃহত্ ধর্মের (ইটন এই পরিভাষাটি ব্যবহার করেছেন যা আদিবাসী সরল অনাড়ম্বর জীবন এবং ধর্মের বিপরীতে জটিলতর অর্থনৈতিক উত্পাদন-ব্যবস্থার উপযোগী জীবনাদর্শের জোগান দেয়, যেমন হিন্দু, ইসলাম ইত্যাদি ধর্ম) আওতামুক্ত পূর্ববাংলার আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে এই প্রক্রিয়ায় উপাসনালয়ে আসতে বাধ্য করার মধ্য দিয়ে তাদের আনুষ্ঠানিক ধর্ম ও রাষ্ট্রের আনুগত্যে নিয়ে আসা সম্ভব হয়।

এভাবে ধর্মান্তরকরণে বিরোধী মোগলদের আমলেই কৃষি বিস্তারের প্রক্রিয়ায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে আনুষ্ঠানিক ধর্মের আওতায় নিয়ে আসার মধ্য দিয়ে পূর্ববাংলায় নতুন মুসলিম জনগোষ্ঠীর আবির্ভাব ঘটে। এই প্রক্রিয়ায় হিন্দু জনগোষ্ঠীর তুলনায় মুসলমানদের সংখ্যা অধিকতর বৃদ্ধির কারণ কী? কারণ আদি উদ্যোগীরাই ধর্মপরিচয় নির্ধারণে নির্ধারক ভূমিকা রেখেছিলেন, এবং ওই সময় রাজনৈতিক বিপর্যয়ের কারণে মধ্য এশিয়া, পারস্য, আফগানিস্তান থেকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভাগ্যান্বেষী ভারতে আগমন করেন। তাঁদের অনেকেই প্রাচীন এই অরণ্য পরিষ্কার করার শ্রমসাধ্য কাজটিতে নেতৃত্ব দেন। এ কারণেই বহিরাগত মুসলমানেরা ইসলাম বিস্তারের নির্ণায়ক ভূমিকা রাখলেও সংখ্যাগত দিক দিয়ে তারা খুবই নগণ্য, বরং অধিকাংশ মুসলমানই স্থানীয় জনগোষ্ঠী থেকেই উদ্ভূত। এভাবে, ইটনের মতে, যে ঘটনাটি দুনিয়ার আরেক প্রান্ত আমেরিকা জুড়ে ইউরোপীয় ক্ষমতা আর খ্রিস্টান ধর্মের বিস্তার ঘটিয়েছে, সেই তারই আরেকটি পরোক্ষ পরিণতিতে পূর্ববাংলায় ইসলাম ধর্মের বিস্তার ঘটে। আরো গুরুত্বপূর্ণভাবে, প্রথম প্রজন্মের মুসলমানরা যেহেতু হিন্দু বা আর কোনো ধর্ম থেকে ধর্মান্তরিত নন, বরং তাঁরা আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্র আর বৃহত্ ধর্মের কাঠামোর বাইরে ছিলেন, ধর্মান্তরকরণের কোনো উপলব্ধি এ ক্ষেত্রে ঘটেনি। বরং নতুন কৃষিজীবী জীবনে তারা তাদের সাবেক গোত্রজীবনের বহু উপাদানই নিয়ে এসেছিলেন যেগুলো খুব সাংঘর্ষিক ছিল না কৃষিকর্মের সাথে। এ কারণেই ওই আমলের সাহিত্যে যে মুসলমানি জীবন আমরা পাই, তা অনেক বেশি স্থানীয়, বাংলার মাটির সঙ্গেই জৈবিক বন্ধনে আবদ্ধ। বাংলা সাহিত্যের বিকাশে মুসলমানদের আদি ভূমিকা তাই তাদের উত্পত্তির সঙ্গেই সম্পর্কিত।

তারপরও কথা থাকে। অরণ্য সাফ করে কৃষি পত্তনের এই প্রক্রিয়ার শুরু থেকেই যে আশরাফ মুসলমানরা এই কাজে নেতৃত্ব দেন, আর যাদের সংগঠিত করা হয়, এই দুই অংশের মাঝে যে সুবিশাল সাংস্কৃতিক পার্থক্য, তাই বাংলার আশরাফ আর আতরাফ মুসলমানদের মাঝে ঐতিহ্যগত পার্থক্য, এই বিভেদ সহজে মুছে যায়নি, বরং সক্রিয় থেকেছে। ইটনের মতে, এই পার্থক্যের ফলে আশরাফ সম্প্রদায়ের নেতৃত্বে পাকিস্তান রাষ্ট্রে পূর্ববাংলার অন্তর্ভুক্তি ঘটে, আর পরবর্তী সময়ে বিকশিত আতরাফ মুসলমানদের রাজনৈতিক নেতৃত্বের ফলাফল হলো স্বাধীন বাংলাদেশ। এভাবে আশরাফ আর আতরাফের মাঝেকার সুদূর অতীতের একটি সংঘাত বহু কাল পরে বাংলার রাজনৈতিক ভবিষ্যত্ নির্ধারণ করেছিল।

 

আশরাফ-আতরাফের লড়াই :পাকিস্তান পর্ব

পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় নেতৃত্ব দিয়েছিল ঢাকার নবাব পরিবার, কিন্তু এটা সম্ভব হয়েছিল সাম্প্রদায়িক রাজনীতির প্রবলতর হয়ে ওঠার যুগে মধ্যবিত্ত ও কৃষককূলকে পাকিস্তান আন্দোলনে যুক্ত করার মাধ্যমেই। পকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরপরই প্রাদেশিক নেতৃত্বের মাঝে ‘খাজাগজা’ নিয়ন্ত্রিত মুসলিম লীগের অগণতান্ত্রিকতা এবং পশ্চিম পাকিস্তানের, বিশেষ করে পাঞ্জাবিদের স্বার্থের কাছে আত্মসমর্পণ করে নিজেদের আধিপত্য টিকিয়ে রাখার চেষ্টার বিরুদ্ধে ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম হয়। অচিরেই মাওলানা ভাসানীকে সভাপতি ও শামসুল হককে সাধারণ সম্পাদক করে জন্ম নেয় আওয়ামী মুসলিম লীগ, যাদের অন্যতম আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু ছিলেন নবাব পরিবার। খুব দ্রুতই বাংলার রাজনীতি মুক্ত হয় শরাফতির হাত থেকে।  স্থানীয় শরিফরা রাজনীতিতে অকার্যকর হয়ে পড়লেও পূর্ব-পশ্চিমের মাঝে যে শোষণ অব্যাহত ছিল, তার মাঝেই সেই পুরনো মোগল আমলের শরাফতির ধারণাটা কার্যকর ছিল।

৫০ সালে পূর্ববঙ্গে ও পশ্চিমবঙ্গে সর্বশেষ দুটি বৃহত্ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়, কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ উভয়ের পৌরহিত্যে রাষ্ট্রীয় ইন্ধনে সংঘটিত হয়। দুটি দাঙ্গারই বিশেষ উদ্দেশ্য ছিল অবশিষ্ট ধর্মীয় পরিচয়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে যথাসম্ভব ঝেটিয়ে বিদায় করে ‘স্বধর্মভুক্ত’ উদ্বাস্তুদের জন্য জায়গা করা। বদরুদ্দীন উমর তাঁর ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস রচনা করতে গিয়ে এই সামাজিক নথিগুলো সংকলিত করতে ভোলেননি। সেই দাঙ্গার সময়ে পশ্চিম পাকিস্তানি আমলা, চিফ সেক্রেটারি আজিজ আহমদের বক্তব্য গ্রহণ করেন লন্ডনের ইকোনোমিস্ট ও ম্যাঞ্চেস্টার গার্ডিয়ান পত্রিকার প্রতিনিধি তায়া জিনকিন। আজিজ আহমেদ তার অসহায়ত্ব ব্যাখ্যা করে বলেন,

‘তার প্রশাসন ব্যবস্থার প্রায় কোন অস্তিত্ব নেই এবং স্থানীয়দের মাঝে যারা আছে তারা ভয়ানক অযোগ্য। অধিকাংশ কেরানিই ছিল হিন্দু এবং তারা সকলেই চলে গেছে। একজনই মাত্র উচ্চপদস্থ কর্মচারি ছিল যে বাঙালি। বাকিরা সব অন্যত্র থেকে এসেছে, অধিকাংশই পাঞ্জাব থেকে, এবং তারা কেউ বাঙলা বলে না, বলে উর্দু অথবা হিন্দি। সৈন্যবাহিনী ছোট এবং সীমান্ত বরাবর নিয়োজিত। বাঙালিরা পশ্চাত্পদ এবং উচ্ছৃঙ্খল; তারা আরবি জানে না বলে বাঙলাতে নামাজ পড়ে। তাদের এবং প্রশাসনব্যবস্থার মধ্যে কোন সাধারণ ভাষা নেই। এমনকি শপথ নেয়ার সময় তারা কালী ও দুর্গার (বাঙলাদেশের প্রিয় উপাস্য দেবী) নাম নেয়—তিনি বললেন গভীর বিতৃষ্ণার সাথে। যদিও তিনি পূর্ব বাঙলাকে পশ্চিম পাকিস্তানের একটা উপনিবেশ হিসেবে আখ্যায়িত করলেন না, তবু তার দৃষ্টিভঙ্গিটি ছিল একজন ঔপনিবেশিক প্রশাসকের। এ বিষয়ে তিনি একজন পাকা পশ্চিম পাকিস্তানি।’

জিনকিনের কাছ থেকে এর পর যা শোনা গেল, তা থেকে পশ্চিমসুলভ ঔদ্ধত্য কোন পর্যায়ের ছিল, তা টের পাওয়া যাবে, ‘আমি তার নিজেদের হিন্দুদের প্রসঙ্গে ফিরে এলাম : ‘আপনাদের এখানে থেকে উদ্বাস্তুদের বিপুল সংখ্যায় দেশত্যাগের সাথে নিশ্চয়ই গোয়ালপাড়ার কোনো সম্পর্ক নেই। আপনাদের প্রধানমন্ত্রী এ ধরনের একটা উত্তেজনাপূর্ণ বক্তৃতা দিলেন কেন?’ তার প্রধানমন্ত্রী নুরুল আমীনের উল্লেখমাত্রেই আজিজ ফেটে পড়লেন, ‘তার কাছ থেকে কি আশা করতে পারেন? তিনি একটা গাধা এবং বাঙালি! যাই হোক, তিনি যাই বলুন কলকাতার সংবাদপত্র মহল তাকে আরও খারাপভাবে দেখিয়েছে এবং ভারতের ডেপুটি হাই কমিশনার তাই নিয়ে শোরগোল ও নাচানাচি করছে। এবং তা-ই যদি হয় তা-হলে সর্দার প্যাটেলের হুমকিমূলক বক্তৃতা সম্পর্কে কি বলবেন?’

ওদিকে প্রধানমন্ত্রী নুরুল আমীন কিন্তু বাতের চিকিত্সার জন্য পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায়ের শরণাপন্ন হয়ে আজিজ আহমেদ প্রসঙ্গে তিক্তভাবে অভিযোগ জানান, ‘আজিজ আহমেদ তার সাথে এমন ব্যবহার করেন যেন তিনি একটি আবর্জনা এবং পূর্ব বাঙলার লোকদের সাথে এমন ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করেন যা ব্রিটিশরা কোনদিন করেনি।’

এটা ঘটা সম্ভব ছিল, কারণ পাকিস্তান রাষ্ট্রের ভিত্তিস্বরূপ শক্তি সেনাবাহিনীতে পূর্ববাংলার মানুষের প্রতি এই হীন ধারণাটি শক্তিশালীভাবে জারি ছিল। বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং পাকিস্তানি সেনাবাহিনীতে যে অল্প ক’জন বাঙালি কিছুটা উচ্চপদে যেতে পেরেছিলেন, তাদের অন্যতম কর্নেল কাজী নুরুজ্জামানের স্মৃতিচারণ ‘একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ : একজন সেক্টর কমান্ডারের স্মৃতিকথা’য় অন্তত তিনটি দৃষ্টান্ত হাজির করা হয়েছে যেখানে পূর্ববাংলার মানুষদের সম্পর্কে পশ্চিম পাকিস্তানি ব্যক্তিদের অতি হীন দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ ঘটেছে, তিনটি উদাহরণই কৌতূহলোদ্দীপক।

প্রথমবার ১৯৪৯ সালে কোয়েটায় একটি নৈশভোজে আইয়ুব খানের সাথে তরুণ প্লাটুন কমান্ডার কাজী নুরুজ্জামানের পরিচয় করিয়ে দেয়া হলে তাঁর পূর্বপাকিস্তানে বসতি শুনে বলেন, পূর্বপাকিস্তানের প্রথম সেনাপ্রধান থাকাকালীন তিনি ঢাকার নবাব বাহাদুরের পরিবার ছাড়া আর কোনো ভদ্র পরিবারের সন্ধান পাননি। এ মন্তব্যে ক্ষুব্ধ ও উত্তেজিত হয়ে কাজী নুরুজ্জামান বলেন যে, ভদ্রলোকেরাই তো কেবল ভদ্রলোকের সন্ধান পায়।

দ্বিতীয় ঘটনার সাল উল্লেখ নেই, ঢাকায় আরেকটি মধ্যাহ্নভোজে দুই বিখ্যাত বাঙালি প্রাক্তন আইজি ইসমাইল সাহেব ও আবুল হাসনাত সাহেবকে নিয়ে আইয়ুব খান ও তার পারিষদবর্গ পরচর্চায় মাতেন, উপরিউক্ত দুজনকে সম্পূর্ণ অযোগ্য হিসেবে মত দেন। ইউনিট কমান্ডার হিসেবে সেখানে কাজী নুরুজ্জামান উপস্থিত ছিলেন। ইসমাইল সাহেব সম্পর্কে পরবর্তী সময়ে নুরুজ্জামান জানতে পারেন যে তিনি নানাবিধ বিষয়ে গোটা চল্লিশেক গ্রন্থ রচনা করেছেন এবং তাকে সাহিত্য পুরস্কার দেয়া হয়েছিল। আবুল হাসনাত প্রথম বাংলায় যৌনবিজ্ঞান বিষয়ক গ্রন্থকার, সেটির একটি সমালোচনা লিখেছিলেন ঔপন্যাসিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। এই দুই ব্যক্তি সম্পর্কে আইয়ুব খান মন্তব্য করেন : ‘আবুল হাসনাতকে আমি আমার আর্মিতে ল্যান্সনায়েকেরও মর্যাদা দিতাম না।’

কাজী নুরুজ্জামান নিজের মনের মধ্যে এর প্রতিক্রিয়ার কথা উল্লেখ করেছেন : ‘চারদিক অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে। ঘটনাটি লেখার কারণ হচ্ছে এই আলোচনা আমার ওপর বেশ প্রভাব ফেলে। বাঙালি দালালরা যে কীভাবে পশ্চিম পাকিস্তানীদের কাছে মাথা হেঁট করে তা স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করলাম। আইয়ুবের কথাবার্তায় বাঙালীদের প্রতি ঘৃণা ও বিদ্বেষ প্রতিফলিত হচ্ছিল। আমি বিব্রতবোধ করতে থাকি কিন্তু জাকের হোসেন (ইনিও ছিলেন একজন প্রাক্তন বাঙালি আইজি) আইয়ুবের কথায় সায় দিয়ে হাসি ভরে উপভোগ করছিলেন মনে হল। এ ধরনের বাঙালি চাটুকারদের প্রতি আমার একটা ঘৃণা জন্মাল।’

তৃতীয় ঘটনাটিতে আরও কয়েক বছর পর প্রধান সেনাপতি হিসেবে আইয়ুব খান তোপখানা ইউনিট পরিদর্শনে এসে ইউনিট কমান্ডার কাজী নুরুজ্জামনকে অবাঙালি ভেবে তার সাথে অমায়িক ও স্নেহসুলভ ভঙ্গিতে কথা বলতে থাকেন। কফি পানের ফাঁকে তিনি তার দেশ জানতে চান এবং নুরুজ্জামান ভূমিপুত্র শোনামাত্র তার আসন ঘুরিয়ে অন্যদিকে মুখ করে বসেন। (নির্বাচিত রচনাবলী, কর্নেল কাজী নুরুজ্জামান)

আইয়ুব খানের স্মৃতিকথাতেও বাঙালি মুসলমানদের সম্পর্কে খোলাখুলি একই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ ঘটেছে, এবং এটা সাধারণভাবে যে উচ্চমন্যতার ধারণা পশ্চিম পাকিস্তানে প্রচলিত ছিল, তারই বহিপ্রকাশ। মোগল সাম্রাজ্যের ঔপনিবেশিক কর্মকর্তারাও এই অঞ্চলের মানুষের প্রতি একই দৃষ্টিভঙ্গিই পোষণ করতেন। ‘পশ্চিম পাকিস্তানের সাধারণ বৈশিষ্ট্যই একটু রূঢ়তা’, বাঙালিদের সাথে তাদের রুক্ষ আচরণের এই ‘পৌরুষসুলভ’ সাফাই দিয়ে আইয়ুব বলেন, ‘‘পশ্চিম পাকিস্তানিরা ফেরেশতা বা ধর্মপ্রচারক না। তাদের অধিকাংশই ছিল সরকারী চাকুরে, এরা বোধ করত যে পশ্চিম পাকিস্তানে তাদের জন্য জীবনের যে স্বাচ্ছন্দ্য ছিল, সেগুলো থেকে তাদের বঞ্চিত করা হয়েছে। তারা সবাই এসেছে মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে, সবারই পারিবারিক দায়দায়িত্ব ছিল...অদক্ষতাকে পূর্বপাকিস্তানের সাধারণ বৈশিষ্ট্যসূচক হিসেবেই তারা বিবেচনা করতো, আর খুবই ত্যক্ত হতো সেটাতে, আর ওই প্রদেশে চাকরি করতে অনিচ্ছার কথা কখনোই গোপন করতে চাইতো না। এটা ছিল একটা অদ্ভুদ দশা যেখানে ঢাকাতে গড়পড়তা পূর্বপাকিস্তানী মনে করতো যে পশ্চিম পাকিস্তানী কর্মকর্তারা কোন এক ধরনের ঔপনিবেশিকতার বহিঃপ্রকাশ, পশ্চিম পাকিস্তানীরা ছিল ওই কাল্পনিক ‘শাসন’ এর সবচে বেশি অনিচ্ছুক আর অসুখী হাতিয়ার। মনে পড়ে মজা করে কাউকে বলছিলাম, ‘কেন তোমরা আমার বিরুদ্ধে একটু আন্দোলন করে আমাকেও বাইরে ছুড়ে ফেল না? জানোই তো, আমি একটুকুও বাধা দেবো না।” এবং যখন আইয়ুব তো আইয়ুব, রাষ্ট্রটাকেই ছুড়ে ফেলার প্রশ্নটা আসল, পরিহাসতরল এই ভঙ্গিটিই রূপান্তরিত হলো পৈশাচিক হত্যালীলায়।

মুক্তিযুদ্ধের অব্যবহিত পূর্বে বাঙালি কর্মকর্তাদের মাঝে পদস্থতম ব্রিগেডিয়ার মজুমদার তাঁর স্মৃতিকথায় বলেছেন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীতে প্রচারিত একটি পত্রের কথা, যেখানে ২৬ মার্চের গণহত্যার জন্য পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে প্রস্তুত করার প্রেক্ষিতটা বর্ণিত আছে। তাদের আশঙ্কার ভিত্তিটা শাসনের সেই পুরনো অধিকার এবং জাতিগত যোগ্যতার ধারণার প্রতিচ্ছবি। শাসনের অধিকারে সাম্য এলে সেনাবাহিনীর গুণগত মান ক্ষুণ্ন হবে, মনোভঙ্গিটি কিন্তু সেই দিল্লির আমলের জাতিগত শরাফতির ধারণার ধারাবাহিকতা।

‘এ অবস্থার মধ্যে একদিন জিএইচকিউ থেকে দীর্ঘ দুই পাতার একটি টপ সিক্রেট চিঠি পেলাম। চিঠি পড়ে মর্মাহত হলাম। চিঠিতে লেখা হয়েছে, আওয়ামী লীগের ছয় দফার ভিত্তিতে প্রতিরক্ষা বাহিনীতে সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব মেনে নিলে বাঙালির প্রাধান্যে এটি একটি তৃতীয় শ্রেণীর সেনাবাহিনীতে পরিণত হবে। বিস্তৃতভাবে এসব কথা বর্ণনার পর উপসংহারে লেখা হয়েছে, এমতাবস্থায় শেখ মুজিবকে কিছুতেই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে দেওয়া যায় না।’

 

উপসংহার

বাংলাদেশে বসবাসকারী বাঙালি ভদ্রশ্রেণির একটা বড় অংশ ছিলেন ফার্সি-উর্দুভাষী, অন্যরা তাদের সামাজিক অবস্থান বিষয়ে সচেতনতা তৈরি হওয়া মাত্র প্রধানত উর্দুকে সাহিত্য-জ্ঞানচর্চার মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেন। এর পরিণাম ফল যেভাবেই হোক, বাঙালিত্বের যে ধারণাটি উনিশ শতক জুড়ে দাঁড়িয়েছিল, এবং সেটি হিন্দু বাঙালি। বিশ শতকেও নতুন গড়ে ওঠা মুসলমান মধ্যশ্রেণির মাঝে যে আত্মপরিচয়জিজ্ঞাসাটা বারংবার এসেছে, তার কারণ এটিই। এটা বাইরের লোকের কাছেও, নিজেদের কাছেও। যেমন—স্যার সৈয়দ আহমদ ১৮৮৪ সালে বলছেন : ‘আমাদের দেশে বাঙালীরাই হলো একমাত্র লোক যাদের সম্পর্কে আমরা যথার্থই গর্বিত হতে পারি এবং একমাত্র তাদের জন্যই জ্ঞান, স্বাধীনতা ও দেশপ্রেমের অগ্রগতি সাধিত হয়েছে।’ তখনও পর্যন্ত স্যার সৈয়দ আহমদ সাম্প্রদায়িক রাজনীতির পথে চলা শুরু করেননি।

এইখানে বাঙালি বলতে প্রধানত বাঙালি হিন্দুর কথাই বলা হয়েছে, কোলকাতা নগরকে কেন্দ্র করে এই সম্প্রদায়ের শিক্ষায়, সংস্কৃতিতে এবং অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্যে যে বিকাশটি ততদিনে ঘটেছে, ভারতের আর কোনো জাতির জন্য তা অশ্রুতপূর্ব।

সরাসরি নিয়োগের বদলে পরীক্ষার মাধ্যমে চাকরিতে নিয়োগের বিরোধিতার বেলায়ও বাঙালির বিরোধিতা করেছিল বাকি প্রায় সব জাতির তরফ থেকে, ‘আলীগড়ে, অক্সফোর্ডের বেলিয়ান কলেজে এবং ইনার টেম্পললে শিক্ষাপ্রাপ্ত এলাহাবাদের ব্যারিস্টার সৈয়দ হাবিবুল্লাহ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের কাছে এ বিষয়ে সাক্ষ্য দানের সময় বলেন, ‘মুসলমান অথবা হিন্দু কারও কোন সাফল্য আসবে না, কিন্তু শুধু বাঙালিরাই পাবে।’’

এখানেও হিন্দু বলতে কিন্তু বাঙালি বাদে ভারতীয় আর সব হিন্দুদের বোঝানো হয়েছে, ‘আর বাঙালি বলতে বাঙালি হিন্দুদের। একই ঘটনায় বাঙালিদের অগ্রগণ্যতার বিরুদ্ধে ‘বেনারষের রাজা শিব প্রসাদ কমিশনের কাছে বাঙালীদের বিরুদ্ধে বিষোদগার করে ঐ একই মত ব্যক্ত করেন। তিনি স্যার সৈয়দের সঙ্গে একযোগেই এ সময়ে কংগ্রেসকে আক্রমণ করেন।”

বাঙালি হিসেবে শুধু সম্প্রদায়গতভাবে বাঙালি হিন্দুকেই বিবেচনা করার সবচে মূর্ত রূপটি দেখা যায় ১৮৮৭ সালের ডিসেম্বরে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের মাদ্রাজে অনুষ্ঠিত তৃতীয় অধিবেশনের সময়, ইতিমধ্যেই কংগ্রেসের অনমনীয় মনোভাবে অতিষ্ঠ এবং প্রতিক্রিয়ায় নিজেও সাম্প্রদায়িক মোচড় নেয়া ওই সৈয়দ আহমেদ উত্তেজিতভাবে লাখনৌ-এর এক সভায় বলেন, ‘যদি তোমরা এটা স্বীকার করে নাও যে, দেশ বাঙালী শাসনের জোয়ালের চাপে আর্তনাদ করবে এবং তার জনগণ বাঙালীর জুতা চাটবে তাহলে আল্লাহর নাম নিয়ে লাফ দিয়ে ট্রেনে ওঠো, বসে পড়ো এবং মাদ্রাজে চলে যাও, মাদ্রাজে চলে যাও।’ এমনকি গোপালকৃষ্ণ গোখলের সেই বিখ্যাত উক্তি, ‘বাংলা আজ যা ভাবে, ভারত তা ভাবে পরদিন’—এই অগ্রগণ্যতাও প্রধানত হিন্দু বাঙালির জন্যই বরাদ্দ ছিল।

এর ফলে বাঙালি মুসলমান এক অদ্ভুদ বিচিত্র সঙ্কটের মুখোমুখি হয় গত শতকের মধ্যভাগ পর্যন্ত। তার অভিজাত ও নিয়ন্ত্রক অংশ নিজের বাঙালি পরিচয় ঢাকার প্রাণপণ চেষ্টায় রত ছিল। অন্যদিকে বাঙালিদের সম্পর্কে যে সাধারণ শ্রদ্ধার ধারণার বিকাশ ঘটেছিল উনিশ শতকে, তার সামান্যই কৃতিত্ব বাঙালি মুসলমানের। কোলতাকা কেন্দ্রিক এই নবজাগরণের ফলে যে বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ সারা ভারতকে আলোড়িত করল, তার সামান্যই ছোঁয়া প্রত্যক্ষভাবে বাঙালির বিপুল অন্য একটি অংশকে স্পর্শ করতে পেরেছিল। একদিকে বাঙালি মুসলমানের দিক দিয়ে যেমন ছিল নিজের পৃথকতা ও স্বাতন্ত্র্য (এবং শরাফতিও) প্রতিষ্ঠার জন্য তার আজন্ম প্রতিবেশী হিন্দু ভাইয়ের প্রতি বিদ্বেষ; বিপরীতে ছিল সর্বজনীন ভোটাধিকারের আমলে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের শাসনে হিন্দু মধ্যবিত্তের প্রবল বিতৃষ্ণা। জয়া চ্যাটার্জি তার বেঙ্গল ডিভাইডেড গ্রন্থে ৩০ দশকের সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতির যুগে মুসলমানদের প্রতি সাম্প্রদায়িক হিন্দু মধ্যবিত্তের মনোভঙ্গির উল্লেখ করেছেন, ‘‘১৯৩২ সালে যখন এটা প্রায় নিশ্চিত হয়ে যায় যে মুসলমানেরা নতুন আইন সভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করবে, তখন ‘দি বেঙ্গল মেনিফেস্টো’ নামক একটি বহু প্রচারিত পুস্তিকায় স্পষ্টভাবে বলা হয় :... অপর দিকে শিক্ষাগত যোগ্যতায় ও রাজনৈতিক কর্মক্ষমতায় হিন্দু সম্প্রদায়ের শ্রেষ্ঠত্ব, বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক অগ্রগতিতে তাদের অবদান এবং রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের প্রতিটি শাখায় তাদের অতীত সেবার রেকর্ড এতই সুবিদিত যে পুনরায় উল্লেখ করার দরকার নেই। শিল্প, সাহিত্য, বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে সমগ্র ভারতে হিন্দু বাঙালির সাফল্য সবার চেয়ে বেশি; অথচ বাঙলার মুসলমানেরা এসব ক্ষেত্রে সর্বভারতীয় পর্যায়ে সুনামের অধিকারী একটি ব্যক্তিকেও সৃষ্টি করতে পারেনি।”

এই দৃষ্টিভঙ্গিটি মূলত বাংলার ভূস্বামী জমিদারদের। ২০-৪০ দশক পর্যন্ত সাম্প্রদায়িক আবহাওয়ার এই রাজনীতি বরং জন্মেই দুর্বল এবং ইতিমধ্যেই ক্ষয়ে আসা বাঙালি শরফতি অংশকে আরও কিছুকাল রাজনৈতিক আয়ু দিলো। পাকিস্তান আন্দোলনের প্রচারকর্মটি চালাবার প্রয়োজনে বাংলা ভাষার ব্যবহারটি তাদের দরকার পড়লেও সচেতন একটি চেষ্টা ছিল সেটির মুসলমানি চেহারা দেয়ার। কিন্তু লক্ষ্যটি ছিল আপন অস্তিত্বের শেকড় আপন ভূমে সন্ধান না করে নিজের জন্মের হীনম্মন্যতাকে আড়াল করা। অন্যদিকে কিন্তু তার লক্ষ্য যা-ই থাকুক, চাষাভুষো মানুষকে আন্দোলনের হাতিয়ার হিসেবে যুক্ত করতে গিয়ে মাতৃভাষার যে ব্যবহার সে করতে বাধ্য হয়েছে, সেই ভাষার প্রশ্নেই তার আত্মানুসন্ধানের নতুন পর্যায়টি শুরু হয়েছিল ৪৭-এর পর।

ক্লাইভ আর হেস্টিংস—এই দুই ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সেনাকর্তার জীবনী লিখতে গিয়ে ম্যাকওলে দুই দফায় উল্লেখ করেছিলেন বাঙালিদের কথা, ভীরু আর কেবল শাসিত হবার উপযুক্ত জাতি হিসেবে। আপোষ আর টিকে থাকার দক্ষতাই তাদের শেষ কথা, প্রত্যাঘাতের স্বভাব তাদের মাঝে নেই। ফলে ব্যক্তিগত শত্রুতার দিক দিয়ে তারা নিষ্ঠুর হলেও সামষ্টিক রাজনৈতিক চেতনা এখানে ভীরু। শাসকরা আতঙ্কিত করে তুলতে পারলেই তারা স্তব্ধ হয়ে থাকে।

২৫ মার্চ রাতেও ঠিক তা-ই চেয়েছিল পাকিস্তানি সামরিক কর্তারা। আতঙ্কে বিমূঢ় করে দিতে চেয়েছিল জাতিটিকে, শুধু টের পায়নি মাঝের বিরাট সময়টাতে এই জাতির রসায়নে ঘটে গেছে বিপুল বদল। আরও অনেকের সাথে যেমন কর্নেল কাজী নুরুজ্জামানের ১৫ বছরের ছেলে নদিম রাত তিনটায় রক্তস্নাত নগরী ঘুরে কয়েক জন বন্ধুকে নিয়ে বাড়িতে ফেরত এসেছিল বন্দুক সংগ্রহ করতে। চলচ্চিত্র নির্মাতা জহির রায়হান নিজের গাড়িটি শিবপুরের বিপ্লবী কমিউনিস্টদের স্থানীয় প্রতিরোধ যুদ্ধের জন্য দিয়ে নিজে চলে যান সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বৃহত্তর যুদ্ধের প্রস্তুতিতে। মাওলানা ভাসানীর মতো ৮০ পেরুনো মানুষ টাঙ্গাইল থেকে রওয়ানা হন আসামের দিকে, অজস্র মানুষের ভিড়ে তিনি আশ্রয় পান, খাবার পান, কিন্তু কেউ তাকে ধরিয়ে দেয়নি হানাদার বাহিনীর হাতে; পাকিস্তানিরা তাঁর কুড়ে ঘরটি ছাই করে দিয়ে মনের জ্বালা মেটায়। বিপ্লবী রাজনীতির সাথে যুক্ত আরেকজন রুমী আমেরিকার উচ্চশিক্ষার মোহ ছেড়ে ক্রাকপ্লাটুনে নাম লেখায়। গণযুদ্ধের অকুতোভয় সৈনিকে পরিণত হন হাজার হাজার কৃষক শ্রমিক। বলা যায়, মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে শরাফতির রাজনীতির শেষ যুগটির অবসান ঘটে, শরিফ পরিবারের সন্তানরাও তাদের পদবী ভুলে আতরাফের কাতারে মিশে যান। যে আকাঙ্ক্ষার জন্ম দিয়েছিল একাত্তর, তাই তার বিনাশ নেই। এই চেতনা কেবল কোনো কাল্পনিক যোগসূত্র না, আজও প্রতিটা সংগ্রামে রসদ নিই মুক্তিযুদ্ধ যে অপরিমেয় সম্ভাবনা তৈরি করেছিল এই জাতির জন্য, সেই অফুরন্ত খনি থেকে। প্রতারিত, লাঞ্ছিত হয়েও বারংবার রুখে দাঁড়ানোই এই জাতির চরিত্রে পরিণত হয়েছে।

 

পুস্তকাদি
১. রিচার্ড এমন ইটন; রাইজ অব ইসলাম অ্যান্ড দা বেঙ্গল ফ্রন্টিয়ার। এরই একটি সংক্ষিপ্তসার-এর জন্য দেখতে পারেন হু আর বেঙ্গল মুসলিমস নামের প্রবন্ধটি। অক্সফোর্ড।

২. মমতাজুর রহমান তরফদার; হোসেনশাহী আমলে বাংলা : একটি সামাজিক পর্যেষণা । বাংলা একাডেমি।

৩. মির্জা নাথান; বাহারিস্তান ই গায়বী। বাংলা একাডেমী।

৪. সিরাজুল ইসলাম; ঐতিহাসিকের নোটবুক, কথাপ্রকাশ।

৫. ঊনিশ শতকে উর্দু শিক্ষার সাথে সাধারণভাবে ভারতীয় মুসলমান মধ্যবিত্তের গঠন বিষয়ে বারবারা মেটকাফ, ইসলামিক রিভাইভাল ইন বৃটিশ ইনডিয়া, দেওবন্দ, ১৮৬০-১৯০০

৬. বার্নিয়ের এর ভ্রমণকাহিনীর ভারত-সংশ্লিষ্ট অংশের বিনয় ঘোষকৃত সারানুবাদ বাদশাহী আমল। অরুণা প্রকাশনী, কলকাতা।

৭. বদরুদ্দীন উমর; ভারতীয় জাতীয় আন্দোলন। প্রতিভাস, কলকাতা।

৮. মোহর আলী, হিস্টরি অব দি মুসলিমস অব বেঙ্গল। ইসলামিক ফাউন্ডেশন। মুসলিম সাম্প্রদায়িকতাবাদী ব্যাখ্যার বিপরীতে বাংলায় জোরপূর্বক ধর্মান্তরকরণের হিন্দু সাম্প্রদায়িকতাবাদী ব্যাখার জন্য দেখুন : সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়-এর ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যান্ড লিটারেচারস অব মডার্ন ইনডিয়া, আর সি মজুমদার, হিস্ট্রি অব মেডহিভাল বেঙ্গল।

৯.  এ শর্ট হিস্টরি অব আওরঙ্গজেব, যদুনাথ সরকার। ঐতিহ্য প্রকাশনী

১০. আবুল ফজল, আইন-ই-আকরবী।

১১. জয়া চট্টপাধ্যায়, বেঙ্গল ডিভাইডেড।

১২. সাধারণভাবে পূর্ববাংলার মানুষদের প্রতি পাঞ্জাবী শাসকদের দৃষ্টিভঙ্গির অনেকগুলো উদাহরণ আলোচনা করেছে বদরুদ্দীন উমর, ভাষা আন্দেলন ও তত্ককালীন রাজনীতি। জাতীয় গ্রন্থ প্রকাশন।

১৩. বাবু শ্রেণীর চাকরিমুখীনতা এবং নমশূদ্র ও মুসলমান চাষার শ্রমনিষ্ঠা বিষয়ে অভিজ্ঞতার আলোচনা করেছেন আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়, আত্মচরিত।

১৪. পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ও আমলাতন্ত্র এবং অভিজাত অংশের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আলোচনা করেছেন কর্নেল কাজী নুরুজ্জামান, নির্বাচিত রচনাবলী। সংহতি প্রকাশন। এছাড়া অর্থনীতিক্ষেত্রে এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় পাওয়ার জন্য দেখা যেতে পারে অর্থনীতিবিদ আনিসুর রহমানের দি লস্ট মোমেন্ট, ইউপিএল।  n

 

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
১৬ জুলাই, ২০১৮ ইং
ফজর৩:৫৫
যোহর১২:০৫
আসর৪:৪৪
মাগরিব৬:৫১
এশা৮:১৪
সূর্যোদয় - ৫:২০সূর্যাস্ত - ০৬:৪৬
পড়ুন