কবিতাসমূহ
২১ জুন, ২০১৭ ইং
 

উপহাসে কাক ডাকে

সৈয়দ শামসুল হক

 

উদ্যানে ছিলো গোলাপ, আমি তো গোলাপ তুলতে পারিনি।

গোলাপের বনে ছিলো একজন— ছিলো উদ্যানচারিণী।

বলে সে আমাকে, তুলবে গোলাপ? দ্যাখোনি কি চোখ মেলে

গোলাপের চেয়ে গাঢ় লাল আমি, কবি কি দু’চোখ খেলে!

ফেলে সে গোলাপ তখন আমার হাত বাড়ালাম যেই—

ইন্দ্রজালের মতো সে হঠাত্ মিলিয়েছে— আর নেই!

তারপর থেকে একাকী আমার গোলাপের উদ্যানে—

অবিরাম খোঁজা— জানি না সে আছে কোথায় বা কোনখানে।

যদি পাই তাকে জামার বোতামে তুলে গেঁথে রাখি তাকে।

বোতামের ঘর শূন্য এখনো! উপহাসে কাক ডাকে।

কা কা রবে ভরে ওঠে দশদিক— আমাকে শোনায়, ওরে

যাকে চাস তুই সে এখানে নেই— নীলিমায় আজ ওড়ে।

পলাতক পাখি ফাঁকি দিয়ে গেছে— উদ্যানে যত ফুল

ফুটছে ঝরেছে— জেনে রাখ তুই— ভালোবাসাটাই ভুল

 

 

তোমার স্তুতি খুব করি, সামার

জাহিদুল হক

 

১.

সামার, তোমার স্তুতি খুব করি। কেন? বলি, শোনো,

এ এক আশ্চর্য বিপ্লবতা, কী মহান গৃহযুদ্ধ!

(তোমার অতীত নেই; ভবিষ্যতও অন্ধকারে বোনো!)

তুমি যেন আমাকে উদ্বুদ্ধ করো, কিছুটা বা শুদ্ধ

বৃষ্টিতে ক্লেদাক্ত দিন জবুথবু, শীতে ঠাণ্ডা প্রাণ

ওষ্ঠাগত; এ জীবন স্যাঁতসেঁতে—কবে দেখা হবে?

আলোকের সৈন্যদের সেনাপতি তুমি, অভিযান

শুরু করো; ফের তুমি ফিরে এসো বন্ধু, সবান্ধবে!

 

২.

আমাদের চারিদিকে খেলা করে তপ্ত সামার

আর খেলা করে দুঃখ তোমার আমার।

দীপ্র দিনটি ছিঁড়ে-খুঁড়ে ফেলে বিষদাঁত কার?

টেম্পারেচার নামবে হঠাত্—সামার!

 

 

গাছের পায়ের কাছে

ফারুক মাহমুদ

 

ভালোবাসা সমবেত হলে

             যথেষ্ট পেছনে পড়ে ঘৃণালব্ধ বিষ

মারণাস্ত্র যত দূর..., তার চেয়ে বেশি যায় দোয়েলের শিস

 

কাঁটা ও কীটের পাশে, তবু

              হেসে ওঠে কুসুমের সহমর্মী হাসি

সুখের সমাধি-ঘাসে লিখতে হয় ‘দুঃখ ভালোবাসি’

 

অজুহাত দ্রুত বেড়ে যায়

               অপপ্রয়োগের ভুলে ছিঁড়ে যায় যুক্তিতর্করশি

কথা না-বাড়িয়ে এসো গাছের পায়ের কাছে হাতে হাত বসি

 

 

 

আগুন

মহাদেব সাহা

 

আগুনের দুই মাত্রা, দহন ও শান্তি,

গ্রাস করে, গ্রহণও করে, সর্বভুক সে

                               সর্বগ্রহীতা;

আগুন সবই নেয়, পাপপুণ্য কাউকে ফেলে না,

কিন্তু এ আগুনের জীবনী কেউ কখনো লেখেনি।

 

আগুন আলো, আবার আগুনই অন্ধকার

তার দেহে দাহ, মর্মে দাহমুক্তি

আগুন পোড়ায়, আগুনই জুড়ায়,

এ আগুনের জন্ম কবে কেউ জানে না।

 

আগুন সবখানেই আছে, কোনোখানেই নেই

জল দ্যাখা যায়, বাতাস অনুভব করা যায়

আগুন দ্যাখাও যায় না, বোঝাও যায় না

আগুনের এক নাম বিচ্ছেদ, এক নাম বিবাহ।

 

 

 

তাঁতির মায়াবী হাত

রুবী রহমান

 

ঈদ সমাগত। তাই শ্রান্তি নেই তাঁতিদের হাতে

পাবনায় টাঙ্গাইলে মাকু চলে দিনে আর রাতে

তাঁতির মায়াবী হাত বুনে তোলে রকমারি শাড়ি

বালুচরি জামদানি—শহরে বন্দরে যত নারী

সকলেই অপরূপা হয়ে ওঠে শাড়ির বাহারে

 

আরো কারো কারো হাত বুনে তোলে শব্দ সম্ভারে

অন্যকিছু। শব্দের গূঢ় রং সকরুণ ঘ্রাণ

শব্দের মমর্তলে গুঞ্জরিত স্তব্ধতার গান

রাঙা উত্তরীয়খানি বুনে তোলে কবির আঙুল

শাড়ির মতন সেও ঢেকে দ্যায় মানুষের শোক-তাপ-ভুল।

 

 

তবু ব্লেডেরা ভালো থাক

মিনার মনসুর

 

নাড়ি কাটতে কাটতে মা-ই সম্ভবত বলেছিল, ‘বুঝলি বাছা, এটা হলো ব্লেড। দু দিকেই ধার। তোকে তার ওপর দিয়েই হাঁটতে হবে।’

আমি মা’র কথা কখনো অমান্য করিনি। ব্লেডের ওপর দিয়েই হেঁটে চলেছি জন্মাবধি; যদিও পায়েরা অফিসের দলবাজ পিয়নের মতো ইতর ও উদ্ধত। আমি তাই কেঁচোদের কাছে বুকে হাঁটা রপ্ত করেছি।

এখন দেখি ব্লেডও বিগড়ে গেছে। স্বাধীনতা ও সমঅধিকারের এই মাহেন্দ্রক্ষণে কে-বা আর পদতলে থাকে! আমি বিক্ষত বুক পেতে দেই।

তবু ব্লেডেরা ভালো থাক।

 

 

 

 

 

 

 

গণিতের উল্টোপথে

ইকবাল হাসান

 

সবকিছু ব্যাকরণসম্মত হবে— আমাদের

চারদিকে এমন উজ্জ্বল সম্ভাবনা ক্ষীণ বলে

উপহাসে বিদ্ধ হয় বিনয়ের নমিত গণিত।

বিফল প্রত্যাশাগুলো অর্জুনের লক্ষ্যভ্রষ্ট তীরে

বিদ্ধ আপেলের ন্যায় ঝরে পড়ে, বস্তুত আমরা

ধারাপাত ও মুখস্থ নামতার কাছে নতজানু

 

প্রতিটি সূর্যের চারপাশ ঘিরে তারারা রয়েছে।

সে হিসেবে অতি তুচ্ছ আমাদের এই গ্রহখানি

বিশাল পৃথিবী বলে যাকে জানি— গণিত নিয়মে

সেও কিন্তু কক্ষচ্যুত নয়, ব্যাকরণসম্মত সূর্য

কেন্দ্রমূলে যথাযথ স্থির হয়েছে। আমরা কিন্তু

গণিতের উল্টোপথে চলাতেই অভ্যস্ত রয়েছি।

 

 

 

হাওয়া-বাতাস

সরকার মাসুদ

 

ওই কাশফুল মেঘ রওনা দেওয়ার জন্য তৈরি হয়ে আছে

শুধু আমার সম্মতির অপেক্ষা!

এই ঝিরিঝিরি লম্বা ঘাস, পানির ওপরের,

দোল খাওয়ার জন্য রেডি হয়ে আছে...

খালি আমার সংকেতের জন্য যা একটু দেরি!

 

হাওয়া কী দেয় আমাদের

হাওয়া উস্কে দেয় বিশ্বাস আর সংশয়

ছিন্নবৈচিত্র্যের দিন হাওয়া আবার

যোগসূত্র তৈরি করে হূদয় ও জলছবির মাঝে!

 

বাতাস বয়ে নিয়ে যাবে এই পলিথিন মেঘ

কিন্তু কোথায়?

পানিবর্তী লম্বা ঘাস, ছিটপোকা,

ছোটগল্পের জীবনছবি ফুটবে আঁধারে!

 

শরতে রঙপাগলের মন পাল তুলে দিয়েছে মেঘের নদীতে

হাওয়া তৈরি করেছে সাঁকো

হাওয়া ভেঙে দিয়েছে সাঁকো

ভাদ্রের লুকোচুরি রোদে

হাওয়া আনে ভালোবাসার ভুয়া আশ্বাস

ডালপালার ফাঁকে ছেঁড়া আশা ঝুলে থাকে সুতাকাটা ঘুড়ি।

 

 

 

 

শুধু শীতকাল

নাসির আহমেদ

 

শীতের সকাল। পুকুরের ঘাট। উড়ছে কুয়াশা...

কুয়াশায় ভাসে আমার মায়ের মায়াময় মুখ

মা আমাকে নিয়ে পুকুরের ঘাটে সেই কবে যেন

হাতমুখ ধুয়ে দিয়েছেন খুব শীতের সকালে

 

এক দুই তিন... স্মৃতি হয়ে যায় ধোঁয়া-কুয়াশারা

 

তিন চার পাঁচ... বাঁশঝাড় আর কলার ঝোপের

আড়ালে ছড়ানো মায়ের সবুজ আঁচল এখনো

উড়ে উড়ে যায় ভোরের হাওয়ায় মায়ের আঁচল

ছয় সাত আট... পুকুরের ঘাট, হায় ছেলেবেলা...

 

সুতোছেঁড়া ঘুড়ি লাল-নীল ঘুড়ি কোথাও হারায়

 

পুকুরের জলে কুয়াশারা ভাসে, ভেসে ভেসে যায়

আমার মায়ের স্মৃৃতি নিয়ে ওই কুয়াশা ছড়ায়

মমতার মতো কোমল আদর হূদয়-বাড়িতে

কুয়াশা এখন মা আমার ওই পুকুরের জলে

 

জোছনা রাতের আলো নিভে যায় শাদা কুয়াশায়

 

সেই কবেকার বাঁশঝাড় থেকে শনশন হাওয়া

শীতের সকালে মায়ের আঁচল ছুঁয়ে ছুঁয়ে যায়

পুকুরের পাড়ে সবুজ পাতারা ঝরে ঝরে পড়ে

মায়ের কবরে এখানে এলেই মাকে পেয়ে যাই

 

স্মৃৃতির জোনাকি শীত মওসুমে পিপাসা ছড়ায়

 

মায়ের আদর নরম কুয়াশা ঠাণ্ডা পুকুর

স্মৃতিজুড়ে আর কোনো ঋতু নাই। শুধু শীতকাল।

 

 

 

 

নিরাশারটুকু হবে

সুজাউদ্দিন কায়সার

 

কুষ্ঠরোগীর মতো বিশীর্ণ দিন

কুণ্ঠিত মানুষের শরীর

হাঁপায় বিফলতা—দাপায় তপ্তরেখা

জীবনের বিবমিষায় বলো, ও ভাবনা ও কল্প

                        এসেছিলো কী অনিতা!

তোমার হতাশা আর অবেলা শুধুই কি ভণিতা!

যাই—অনিবার্য সময় ঘিরে, জরা-ব্যাধি যতো

                        কুষ্মাণ্ডকাল—

                        ততো—আশালতা নিয়ে

জড়াই বিদীর্ণ বুকের ছায়ায়—

নিপীড়নের দরোজা খুলে চলে গেছে সন্তের মতোন

দিব্য বিছায়ে মর্ম আলো, সরল রীতি-অন্ধ নীতি দিয়ে
            ঢাকে স্বচ্ছতার সোনালি ভুবন

এ অবসানের সেইদিন হবে বাধাহীন বিস্তার

            হবে রোগহীন জীবন জোয়ার

তোমার নিরাশাটুকু সপ্রতিভ আনন্দ ফোটাবে

                        আঁধারে আলো।

 

 

 

 

অবিশ্বাস

চৌধুরী ফেরদৌস

 

না, এখন আর কোনো কিছুকে বিশ্বাস করা যায় না।

বাগানের গাছগুলোকেও না—

খুব বেশি কাছাকাছি হলে

সবুজ আস্তিন থেকে হয়তো হঠাত্

বেরিয়ে পড়বে দ্রুত একঝাঁক লুকানো কুঠার।

 

পায়রাগুলোকে, আহা, মুক্ত সাদা পায়রাগুলোকে

শান্তির দূত ভেবে কাছে টানতেও ভয়—

হয়তোবা তারা এক লহমায়

যাবজ্জীবন কয়েদি বানিয়ে ফেলবে আমাদের।

 

না বৃষ্টি, না নদী;

না ফুল, না আকাশ...

কাউকেই আমরা আর

বিশ্বাস করতে পারছি না।

 

ইদানীং প্রতিটি প্রাপ্তিকেই মনে হয় দুঃস্বপ্ন;

প্রতিটি স্বপ্নকে মনে হয় সর্বনাশ।

আজকাল আমাদের সব বিশ্বাসের আগেভাগে

একটা আকাশ-সমান ‘অ’ জেঁকে বসে থাকে—

কোনো ক্রমে সরাতে পারি না।

 

তবু আমরা বীজ বুনি—

পায়রা ওড়াই;

বৃষ্টি, নদী, ফুল এবং আকাশের প্রেমে পড়ি।

প্রতীক্ষায় থাকি—

স্বপ্ন দেখে যাই।

 

 

 

 

ফ্ল্যাটের বিড়াল

মারুফ রায়হান

 

স্বজন স্বজাতি থেকে বিচ্ছিন্ন বিদগ্ধ এক প্রাণ

বসে থাকে দিনভর সূর্যের থাবায় পিঠ দিয়ে

ভঙ্গিটি আয়েশি নয়, ঋজু, উত্সুক, গভীর চিন্তাশীল

নিজ শব্দ নেই কোনো, সাড়া নেই সশব্দ সংস্রবে

তার চোখ দুটো দেখি— নিপাট বিড়াল-চোখ

এই গ্রহ ভেদ করে দূর কোনো নির্জন নক্ষত্রে

ছড়িয়ে পড়েছে দৃষ্টি, সেখানে রয়েছে বুঝি

কাঙ্ক্ষিত আরাধ্য স্বস্তি, ভাব-

বিনিময়যোগ্য বিড়ালজনম

 

এই শহরের ব্যস্ত ত্রস্ত ইঁদুরজীবন

যতো প্রতারণা, রুদ্ধশ্বাস ছোটা, প্রভূত তাড়না

কোনোদিকে নেই তার সাগ্রহ ভ্রূক্ষেপ

তবু সব দ্যাখে, জানে সমস্তই, বোঝে সবিশেষ

বসে থাকে স্থানু, প্রশান্ত সুস্থির, যেন

সুদক্ষ শিল্পীর ক্যানভাসে চিরসমাসীন

ধূসর রোমশ লেজ তার সূক্ষ্ম তরঙ্গপ্রবণ

বলে দিচ্ছে তুলিতে ফুটিয়ে তোলা জীব নয় কোনো

বরং সে আঁকে মগ্নমোহে অজ্ঞাত জীবনচক্র

সেইখানে মনুষ্যসমাজ নেই, নেই নৃশংসতা

বেজি-দন্তে নেই সুদর্শন সাপের মসৃণ, আর

সাপ-মুখে নেই কোনো শাপগ্রস্ত মুমূর্ষু মূষিক

 

‘ধ্যানী দার্শনিক’ সম্বোধন যথাযথ হবে নাকি

বিড়ালের আড়ালে সে নয় বুঝি

আমারই অপর সত্তা!

 

 

 

 

ভূর্জপত্র

আলমগীর রেজা চৌধুরী

 

ভূর্জপত্রে দূরগামী বার্তায় দৈবজ্ঞ নেই।

অন্ধের পথচলা; সীমারেখা ধরে পরিক্রমণ

ঘূর্ণায়মান সেই বর্ণমালার সাংকেতিক চিহ্নে

কত মহাজন মগজ বিলিয়ে দিয়ে

বলে, তুমি যেখানে দাঁড়িয়ে, আমি তোমার জন্য...

তোমার জন্য বহন করছি মগজ, ঘৃণা, লিপসা।

নৃশংস যুদ্ধপ্রান্তর

রক্ত, খুলি, ফসিল, জেনেটিক কোষ।

টলটলায়মান জীবন,

শুধু নাকফুল হারানোর গল্প ভুলে গেছি।

দ্রাবিড় সম্ভূত জনপদজুড়ে অশ্বখুর কদমতালে দৌড়ে যায়

তাম্রলিপিতে যা লেখা, তা জ্ঞান

পৃথিবীর রৌদ্রছায়ায় বিছিয়ে রাখি

আমি ও আমার মতো কত কত জন।

 

 

 

 

তুমি আমার জলতুতো বোন

গোলাম শফিক

 

তুমি আমার জলতুতো বোন, মমতাময়ী দিদি আমার

কিন্তু কী যে হলো আজকাল তোমার

মুখে নেই সেই লাবণ্যপ্রভা

প্রভাতের আলো নেই, নেই সাঁঝবেলার মায়াও।

 

গজলডোবায় বাধ পড়েছে কবে

সেই থেকে তিস্তার মতো দিদির মুখটাও শুকালো

আর তিস্তা নিয়ে লিখতে লিখতে ফুরালো কতো

                                    দিস্তা দিস্তা কাগজ।

 

তোর্সা, কালচিনি, ধানসিঁড়ি, মানসিঁড়ি

সবই তো নারীর মতো কথা কয়

রমণীয় ধেয়ে চলা ছলাত্ ছলাত্

এইখানে দেখি তাই তোমার উজ্জ্বল মুখ

ধরলা, দুধকুমার ও জলঢাকার নূপুরের নিক্কনে।

 

ভাইফোঁটা তো দিয়েছিলে আমারও কপালে

দিদি, তবে কেন মুখটি ফেরাও অন্যদিকে?

তুমি আমার জলতুতো বোন, জলের জন্য তোমায় ডাকি

আজলা ভরে জল দিলে না, তাই তো অনেক কষ্টে আছি।

 

ছিটমহলের দুঃখ গেছে, মাথায় আর নেই আমাদের ‘ছিট’

তবে জলের দুঃখে সবচেয়ে বড়ো দিদি

জানি সেই দুঃখে তোমারও ঝরে চোখের জল

সেই জলটাই মোছাতে আমরা খাড়া রয়েছি যে

চোখ বন্ধর আগে তাই তিস্তা খুলে দিও।

প্রতীক্ষায় আছি দেখো ভাইবোনেরা মঙ্গলসূত্রে গাঁথা...।

 

 

 

সুরভি

আসিফ নূর

 

সুরভির খেলাঘর পড়শি-বাগান।

 

সুরভি লাজুক মেয়ে—প্রজাপতি-ভ্রমরের ভয়ে

অতনু নিজেকে ঢেকে লাল-নীল পাপড়ির কম্বলে,

গুটিসুটি শুয়ে থাকে পাতার চাঁদোয়া ছাওয়া ফুলের পালঙ্কে।

 

সুরভি জাদুর রানী— ফুলের পরানঘরে ঘুমিয়ে থেকেই

অনিলবাহনে চড়ে সখিসঙ্গে ঘুরে দেখে মনুষ্যসংসার।

 

সুরভি থাকে না বেশিক্ষণ লোকালয়ে, উড়ে যায় পরীরাজ্যে;

সুরভির রং ছাড়া আর কোনও প্রসাধন পরীরা মাখে না।

 

 

 

ভুবনের কোলে

সেলিম মাহমুদ

 

চাকায় চলেছে জীবনযাপন; ঢেঁকিছাঁটা চাল প্রয়োজন

থাকার পরেও প্রাপ্তির হিসাবে স্থান নেই তার।

ইলিশ নিয়েছে লম্বা ছুটি;

বন্ধনের দিন হারিয়েছে পথ; ছেঁড়া পালে দিশাহারা

বজ -বৃষ্টির ছোট্ট তরী।

পাতায় পড়েছে প্রথম বৃষ্টির নৃত্যপর ছন্দ,—

ঘুরে দাঁড়ালাম নতুন আশার বালিয়াড়িতে।

যদি পাই সিকিভাগ তার—

থামবো না কোনো সিঁড়ি ভেঙে

গ্রাউন্ডে ফেরার তাড়াহুড়া দরকারে।

 

বজ্রপাতে বাড়ি ফিরি, চলাচলে নেই তাড়া

চাকা খুলে প্রকৃতির পাঠ নিই

পাই যদি ঠাঁই কিছু ভুবনের কোলে!

 

 

 

না

সোহরাব হাসান

 

তুমি চাইলেই আমাকে না করতে পারো।

তোমার এই না নিয়ে সমাজ-সংসারে কেউ সামান্য রা করবে না

সবাই ধরে নেবেন নিশ্চয়ই আমার মস্ত দোষ ছিল

কিন্তু আমি চাইলেই তোমাকে না করতে পারব না

ঈশ্বরের বানানো আইন আমাকে কিছুটা অধিকার দিলেও

সমাজ প্রতি পদে আগলে রাখে পথ

অনেকেই ‘গেল গেল’ বলে চিত্কার করে উঠবেন

ঈশ্বরও নারীকে এক হাতে দেন, আরেক হাতে কেড়ে নেন।

 

তুমি চাইলেই তোমার ঘরে আমার প্রবেশ বন্ধ করে দিতে পারো

কিন্তু আমার তো ঘরই নেই। পৃথিবীর সব ঘর পুরুষের

সব সন্তানের মালিকও তারা। নারী অসহায় গর্ভধারিণী ছাড়া কিছু নয়।

 

তুমি চাইলেই আমার সঙ্গে সম্পর্ক চুকিয়ে অন্য কারও সঙ্গে

নতুন সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারো; কাবিননামায় যেসব ঠুনকো

অধিকার দিয়েছিলে ‘তিন তালাক’ উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে তা হাওয়া হয়ে যাবে

আর সমাজের কাছে সেটি বিবেচিত হবে তোমার পৌরুষ হিসেবে।

 

কিন্তু আমি সেই অধিকার প্রয়োগ করতে গেলেই সবাই রই রই করে উঠবেন

তাই, আমি না চাইলেও আমাকে সারা জীবন হ্যাঁ বলতে হবে

তোমার  ইচ্ছে হলে এক বিছানায় শোয়ার অধিকার পাব

ইচ্ছে না হলে বিছানা আলাদা করে নেবে।

 

তুমি না চাইলে এক লহমায় সাফ জবাব দিয়ে দিতে পারো

ঔচিত্যবোধের নানা শর্ত নিয়ে সমাজ তোমার পাশে দাঁড়াবে।

 

আসলে আমাদের সম্পর্কটি মোটেই সমতার নয়,

দাতা-গ্রহীতা কিংবা মহাজন-খাতকের।

আমার কর্তব্য হবে তোমার মনের ভেতরে লুকিয়ে রাখা

না-টিকে ঘুম পাড়িয়ে রাখার জন্য অহোরাত্রি কোশেশ করে যাওয়া।

যদি সফল হই, পতিঅন্তপ্রাণ নারী হিসেবে জগত্ আমার প্রশংসা করবে

আর যদি ব্যর্থ হই চারপাশ থেকে সবাই নিন্দামন্দ ছুড়তে থাকবে।

এমনকি অসতী, কুলটা বিশেষণে ভূষিত করতেও দ্বিধা করবেন না।

 

তুমি আমাকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে বলছ 

অথচ আমি দেখছি আমার পা-দুটোই নেই।

 

 

 

মূর্ছা খায় হারানো জীবন

মোশাররফ হোসেন ভূঞা

 

ঘূর্ণি বাতাসের মতো উড়ে যায় বিবর্ণ অতীত

মেঘের বিষণ্নতায় ঢেকে যায় মনের আকাশ

বক-সাদা বিকেলের বুকে কালো কষ্ট-কোলাহলে

লক্ষীপেঁচা ডেকে ওঠা হিজলের পাতায় পাতায়

নামে ঢল সুদূরিকা বালিকার মেঘলা চুলের।

মেঠোপথে ধূলিমেখে ছুটে চলা দুরন্ত তরুণ

সায়াহ্নের ধূলিঝড়ে ক্ষতদ্বগ্ধ স্মৃতির জীবন

সংগোপনে বিধ্বস্ত করে তার ভেতর বাহির।

 

কারা যেন হেঁটে যায় মৃদুস্বরে কথা বলে বলে

কালোহাতে ঢেলে দেয় বেদনার কুয়াশা-চাদর

শ্বাসরোধী শব্দে কাঁদে গৃহত্যাগী নর্তকী নূপুর।

কল্পনায় হেঁটে যায় দেবদারু জারুলের বনে

নাভিমূলস্পর্শী শ্বাসে উড়ে যায় পাতার মর্মর

সেইসব দিনগুলো এখনও কি থমকে দাঁড়ায়?

 

সাইকেলের দু’চাকায় লেগে থাকা পুরনো ফিতায়

ভেতরের শুদ্ধ সত্তা খুঁজে ফেরে অবাক দৃষ্টিতে

গৃহদ্বারে বারে বারে মূর্ছা খেয়ে হারানো হূদয়—

শুধু দেখে যাযাবর জীবনের ভাঙা খেয়াঘাট।

 

 

 

অপেক্ষা

মোহাম্মদ নাদিম

 

হুইসেল শুনে প্লাটফর্মে দাঁড়ালাম

নাহ! এটাও নয়,

সেই কবে থেকে ঠায় বসে।

 

গোটা স্টেশন জনমানবহীন

তবে কি একাই আমি

এই ট্রেনের যাত্রী?

 

যতদূর চোখ যায় ধু ধু মাঠ

চৈত্রের দুপুরে নিঃসঙ্গ হাওয়া

উড়ে যায় অজানা দিগন্তে—

 

কখন আসবে গাড়ি?

কখন বাজবে হুইসেল;

আজন্ম চেনা গন্তব্যের!

 

 

 

 

 

 

ক্ষণিকের উপলব্ধি

নাহার আহমেদ

 

কবিগুরু তোমার লেখনীতে নিঃসন্দেহে

কস্তুরীর মাদকতা বিরাজমান

তুমি মিশে আছ চিন্তায় চেতনায়

ভাবনার মেঘে দাও উঁকি।

জীবনের মেঘলা আকাশে

একটু আলোর ঝলকানি হয়ে

তুমি আলোকিত করো আমার

ভাবুক প্রহরগুলোকে।

কত কাব্যিক উপমার আশ্রয় নিয়ে।

কত ছন্দের মালা গেঁথে

হূদয়ের ফুলদানিটা সাজিয়ে রাখি।

শিশিরের চুমকিগুলো এখনো জমে আছে

রোমাঞ্চিত আবেগ আর অনুভূতি নিয়ে

একদিন সোনাঝুরির পথে পথে

তোমারই সন্ধানে হারিয়ে গেলাম

তোমার সেই শান্তি নিকেতনে।

তোমারই অন্বেষণে।

মনে হলো তোমাকে খুঁজে পেয়েছি

যখন এক শিরশিরে মিষ্টি পরশ।

আমার সারা অঙ্গে দোল দিয়ে গেল।

আবির রাঙা গোধূলির শূন্যতাকে

মেখে নিলাম দু চোখের কাজলে।

 

 

 

 

কেউ একজন

রোকেয়া ইসলাম

 

কৃষ্ণচূড়ার কাছে চাইলাম ঠিকানা

সে দিল মন খারাপের ভিসা

বৃষ্টিকে দিলাম প্রথম দোলনচাঁপা

দু চোখ ভেজাল গভীর বরিষণে

শিশিরের কাছে চাইলাম একটু উষ্ণতা

একরাশ হিমেল পরশ দিল দু হাত ভরে

অবশেষে বসন্তকে দিলাম প্রেমবার্তা

সে দিল ঝরা পাতার কাব্যগন্ধি রুমাল

আমি কবিতাকে ভালোবাসলাম

সে চাইল অন্তরে বাহিরে এই আমাকে

এই প্রথম কেউ চাইল...

 

 

 

 

শ্রাবণ সন্ধ্যায়

জুনান নাশিত

 

সভ্যতার ঝলমলে আবরণগুলো

ভিজিয়ে রেখেছি মন খারাপের জলে

আজ সারাদিন বৃষ্টি

আজ সারাদিন মেঘলা আকাশ

তোমার বানানো সত্যিগুলো থেকে

অনেক দূরের আমি

যেন বর্ষার নদীর বুকে সূর্য ছেঁড়া মায়া

শুধু হাতছানি দেয়, জড়ায় না বুকে।

মন খারাপের জলে দিগন্ত চিহ্নের বাঁক

মুছে দিতে চায় সভ্যতার আবরণ

সবুজের পাপে পুড়ে পুড়ে

শ্রাবণ সন্ধ্যায় নামে ঝড়

তুমি কৌতূহলী?

আমি দীর্ঘশ্বাসে বাড়াই দু’হাত।

 

 

 

 

সুতোদের লাল শৈশব

আহমেদ বাসার

 

আমি আসছি, আসছি—

খুঁড়ে রাখো সেইসব শস্যভূমি

গর্ভে যাদের সবুজ নয়, ঝরে যাওয়া

হলুদের ভ্রূণ, কণ্ঠে বহুল কর্ষিত

মৃত্তিকার গান, তবু নিষ্ফলা যাদের আজানুজনন

তুলে রাখো সেই অতলের জল

শরীরে যার দূরগামী সমুদ্রের নুন

শুকিয়ে যাওয়া নদী যার হারানো মাতা

চোখে যার এখনো আঁকা লুপ্তখাল

আর মাছেদের প্রাচীন তৈলচিত্র

 

আমি আসছি—

মুড়ে রাখো সেই সোনামুখি সুঁই

ঠোঁটে যার নকশিকাঁথার বুনো ঘ্রাণ

কোমরে গাঁথা সুতোদের লাল শৈশব

খুলে রাখো সেইসব পত্রালি

বুকে যার মিতালির অভিমানী নীল

আর ক্ষরণের বর্ণমালায় ভরা যার সমূহ শরীর

খুলে রাখো—

আমি আসছি, আসছি...

 

 

 

পরাভূত ঘোড়া

রুদ্র আরিফ

 

ভেবেছিলে তুমি এস্রাজের সুরে, হেরে যাওয়ার গল্পগুলো আলতো জুড়ে দেবে; ভেবেছিলে অন্ধ ষাঁড়ের কাঁধে, দেবে চাপিয়ে কফি ও কফিনের ভার : তবু তোমাকেই ডাকা হলো মঞ্চে; হলো দেখানো করতালির আঁধার...

 

হেরে যেতে চেয়ে বিজয়ের আলিঙ্গনে, পঙ্গু পৃথিবীর তোতেনখামেন তুমি, জীবাশ্মের মায়ায় ছারখার আবার!

 

 

 

সম্ভাব্য মৃত্যুদৃশ্য

তানিম কবির

 

রাত্রি হয়তো তিনটা বেজে পঁয়তিরিশের ঘর

একটা ট্রেন তো দাঁড়িয়ে রইবে, অন্যটা ফরফর

ঢুকেই ভীষণ বেরিয়ে যাবে খুব গতিশীল মনে

দুইটা ট্রেনের ক্রসিং হবে কসবা ইস্টিশনে

 

আমি থাকবো একলা যেন ঘরহারা মন ভাবুক

অল্প ভেবেই ক্লান্ত দশায় পড়বে কারো চাবুক

ভগ্নপিঠে, চোখ উঁচিয়ে দেখবো ফিরে তাকে

শাশ্বত প্রেম, সত্যিকারের অতীত মগ্নতাকে

 

আউটারে এক চিরকালীন শিয়াল দিতেই ডাক

অন্য প্রান্তে হুড়মুড়িয়ে গজিয়ে উঠবে চাঁদ

সামান্য দূর অতিক্রমেই সালদা নদীর পানি

চিকচিকাবে ডিউটিরত লোহার বিরিজখানি

 

সকল প্রকার শিহরণের সর্বদা এক টের

ভাসিয়ে নিবে হঠাত্ আমার সমস্ত হেরফের

রাত্রি হয়তো তিনটা বেজে বেয়াল্লিশে প্রায়

ট্রেনের ভিতর মৃত্যু হবে নিশুতি কসবায়

 

 

 

শিরোনামহীন-৬

জুননু রাইন

 

গত কয়েকটি দিন ফিরে এল

যাদের স্পর্শ করতে চাইনি

তবুও;

খুলে খুলে যাচ্ছিল

নদী ভাঙছিল

জ্যোত্স্নার পাড় ভাঙা

ভেজা বিধবা শাড়ি

ঘোলাটে জীবন

হাসছিল

 

গত কয়েকটি দিন

শৈশবের সন্ধ্যায় হেলান দেয়া

কালো কালো অন্ধ ভয়ের গর্ত

আব্বার মারের ভয়

খেলার নেশা কেটে যাওয়ায়

স্বপ্নের প্রজাপতি পকেটে ঘুমোতে যাওয়া

 

এদের একটা দিন এসে বলল—

‘সহস্র পাখির হতাশার ঝুম বর্ষায়

আজ তোমার খিচুরি খেতে ইচ্ছে হবে’

 

গত কয়েকটি দিন আকাশে উড়ে উড়ে

ফিরে আসা ঝড়ের রাতে ঘুঘুর হূদয়

ঘুরে ঘুরে ফিরে এসে

           কী যেন বলতে চায়!

 

 

 

 

আখেরাত

রওশন আরা মুক্তা

 

তারপর আমি পাখির মুখ চেপে রাখব ধরে

গান, ও ফুল ফোটানোর গান

সে যেন আর গাইতে না পারে

যেন না ফোটে কোনো লাল গোলাপ বরফের রাত্তিরে

সতর্ক থাকব আমি সদা সতর্ক থাকব ওগো এই ধরায়

দেখব আর একটা প্রেমের স্পর্শও যেন ধুলায় না গড়ায়

মরে মরে গিয়ে জেগে জেগে যাব আবার

প্রতিদিন প্রতিদিন প্রতি প্রতি বছর

বছর বছর হাজার বছর পরেও শুধাব তারে

একটিমাত্র কথা!

 

 

 

 

 

 

নদী

নূর কামরুন নাহার

 

ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে চলে আসলাম ঘাটে।

জেগে দেখি পাশেই নদী।

যাত্রীরা একে একে নেমে পড়েছে

আগেই চলে গেছে নদীর কাছে।

আমিই শুধু রয়ে গেছি।

পাশেই নদী। অথচ নদীর কাছে যাবার জন্য

কতকাল অপেক্ষা করেছি,

কত প্রস্তুতি; কত যাত্রা; যাত্রাবিরতি।

নদী না দেখেই ফিরে আসা।

 

এখন এই নদী তার ভরাট সৌন্দর্য আর

মায়াবতী ইশারায় আমাকে বিবস করে দিচ্ছে।

মেঘভাঙা রোদের আলতো আলোয় রহস্যময়ীর

চাপা হাসিতে বলছে—তোমার নদীটাকে ডাকো।

তবে কি আমারও একটা নদী আছে?

যে আমাকে ডেকে নিয়ে যাবে ঢেউয়ের উত্সবে,

খলবলিয়ে হেসে উঠবো আলোর মোহনায়।

 

গন্তব্যে যাবার আশায় যাত্রীরা

একে একে ফিরে গেছে নির্দিষ্ট আসনে।

শুধু আমিই একটা নদী নিয়ে

ঘাটে বসে আছি একা।

 

 

 

পরসমাচার এই
রুদ্র হক

 

সব প্রেম ভেঙে গেছে
উচ্ছন্নে গেছে হাওয়া
দুপুরের মেঘ, দূরের আকাশ

আস্ত শহর
কাত হয়ে পড়ে আছে
স্টেশনে

সব গন্তব্য
আছড়ে পড়ছে পথে পথে

দিগন্তের দেয়ালে
এঁকে দেখেছি
               দুয়ার-জানালা

সহসা কোনো জাদুর পৃথিবী নেই

 

 

 

 

ঘরের ঋতু

অথির চক্রবর্তী

 

ওইদিন এক জল্লাদের হাতে হার্মোনিকা দেখে বুঝলাম তারও প্রেমিক হওয়ার আবেদন ফুরিয়ে যায়নি; বন্য হাওয়ার মতো ছড়িয়ে পড়েছে সবখানে ঘরের ঋতু; ঘরের জন্যই মানুষ ফুলের রেণু হয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে... বারবার ফিরে আসার জন্যই হয়তো একেকটি ঘরের জন্ম। ঘুমের চোখে কেউ কাজল পরিয়ে বলে, এটাই প্রেম। বুকের চামড়া দিয়ে বাঁধাই বই আর তার পৃষ্ঠাখোলা আকুতি-প্রতিটি শব্দ প্রতিটি অর্থকে বয়ে চলেছে সারাক্ষণ...

ঘরে এলেই ঝুলে থাকে শার্ট; হেলমেট, একদিকে পড়ে থাকে জুতো। বাহির ঘরে ঢুকে আর দিশা পায় না খুঁজে। বাইরে তালা লাগিয়ে দিয়ে দুজন দুজনকে খুলে দাও; নদীর মতো বয়ে যাক শাড়ি; তার ওপর কচুরিপানা হয়ে ভাসুক ট্রাউজার। ট্রাউজার বাইরে গেলেই ফেরতযোগ্য ঠোঁট ও স্তন, ঊরু ও জংঘা এবং আরো নিচেকার অন্ধকার চাঁদ। ঘরে থাকলে ফেরতযোগ্য নয় এর কোনোটাই; বরং চোখ দখল দেবে চোখকে, ভরে দেবে মিহি তন্তুর মতো

আশ্বাসে...

সুন্দর চিত্কারের মতো ঝরা রক্তে দেখতে দেখতে মদপাত্র ভরে যাবে বেহেশতি মৌসুমে।

 

 

 

 

 

ক্ষুধা

তামান্না জেসমিন

 

সেই জন্ম মুহূর্ত থেকেই এক অসীম ক্ষুধা নিয়ে

প্রতিদিন বেড়ে উঠছি।

ভূমিষ্ঠ হবার পর চোখ খুলবার আগেই আমার

ক্ষুধার্ত চিত্কারধ্বনি।

অতপর মায়ের বুক থেকে দুধ শুষে নিতে নিতে

চোখ খুলতে লাগলো।

যত্ন, জল, খাদ্য এরপর থেকে ক্ষুধার ধরন

বদলাতে থাকে ক্রমাগত।

তখন থেকেই শুধু ক্ষুধা, তৃষ্ণা, প্রবৃত্তিরা

প্রবাহিত রন্ধ্রে রন্ধ্রে চোখে মুখে।

শৈশবের কুসুম স্বপ্ন, পৃথিবীর সব সবুজ মাঠ

পেরিয়ে যৌবন ছুঁতে থাকে।

কামনার অগ্ন্যুত্সব খেলা, দেহের কামকলায়

ক্ষুধার্ত নেকড়েরা অবাধ্য।

ক্ষুধারা নিবৃত্ত হয় না কিছুতে; এর ডালপালা

পত্র-পল্লব বিস্তৃত হতে থাকে।

তার ক্ষিপ্রতা স্রোতের মতন, গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে ,

মহাজগতে ভ্রাম্যমাণ।

ক্ষুধার্ত আগ্নেয়গিরি দাউ দাউ জ্বলে; কৃষ্ণগহবর,

বৈষয়িক তীব্র চেতনা।

জন্মকাল থেকে আজ, মৃত্যুর কাছাকাছি এসে

স্বর্গ লাভের অসীম ক্ষুধা।

অতপর মৃত্যুর শেষ মুহূর্তে স্বর্গলাভের ক্ষুধা

নিয়ে চলে যাই চিরনিদ্রায়।

 

 

 

 

 

অমরাবতী

মেহেদি রাসেল

 

এই নির্ঝরে সারাদিন ঝরে লাল সাদা ফুল

কোমল বাতাসে শুয়ে থাকে ঘাসে শিউলি বকুল

দুপুরের বনে ছায়া নির্জনে পাতাগুলো দোলে

কথা বলে তারা, জানায় ইশারা—ভাব গাঢ় হলে

দূরে বয় নদী ছোট মধুমতি যেন তার জল

কিশোরীর চোখে ক্ষণিকের ঝোঁকে মায়াবী কাজল

শালিকের বউ বুঝি লখনৌ থেকে আনে দানা

সুষম খাবার ঠিক চাই তার ঘরে ছোট ছানা।

ঝিরিঝিরি আলো যেন উপচালো বুনো ঝোপটাতে

এত রূপ তার ধর্মাবতার এই অমরাতে!

 

কত পাখি আসে ফল পাকা মাসে গাছে গাছে ওড়ে

মানুষের দল নেবে সব ফল? ছিঁড়বে সজোরে?

কিছু যেন থাকে পাখিদের ভাগে, সবটা নিও না—

পাখিদের কাছে ঢের বাকি আছে—

সমতার গান শোনা।

 

 

 

 

 

ধৃত কলম

মিন্টু হক

 

বিমূর্তের চরমে পৌঁছেছে

ধৃত কলম!

ষোড়শীর গালে রক্তমুখো ব্রন

হিংস্রতার দাগ,

যেন শিকারির মূর্ত চেহারা;

লুকানো অবিরত চেষ্টায়

নিকষ অন্ধকারে

চরমপত্র লেখে বিমূঢ় কলম

কেবল অশুভ আত্মারাই বোঝে সে ভাষা।

 

আনত ঘাড়ে কলম

ইস্পাত-কঠিন জোয়াল

নারকীয় হাতে ধরা হাল

সাহসের শস্যখেত চৌচির

শুভ্রতার ক্যানভাসে ডোরাকাটা কালো দাগ

কুশলতার অস্থিমজ্জার কাদা শুকানো তুষ।

 

প্রভুর মর্ত্য আসনে প্রেতাত্মার উল্লম্ফন

কালের খুঁটিতে বাঁধা এখন

কিম্ভূত কলম!

মসিহার পথ চেয়ে অসহায় কলম।

 

 

 

 

 

শত্রুতা

মুনা চৌধুরী

 

শুরুটা যদিও যেমন তেমন চলছিল বটে বেশ

নথিতে চলে নিত্য-নতুন ফরমায়েশের পেশ।

বছর দুয়েক ঘুরতেই পেলাম, বিদেশ যাওয়ার ডাক

প্রস্তুতির পালা চলে তখন, হতে হবে ফিটফাট।

দেশ-বিদেশে বহুবার গিয়েছি প্রশিক্ষণে

শেখার সুযোগ যা পেয়েছি, নিজ কর্মগুণে।

সহকর্মীরা আড়চোখে চায়, ফন্দি আঁটে শত

সুযোগ পেলেই হুল ফুটাবে সেই ভাবনায় রত।

সদাই ব্যস্ত কর্মক্ষেত্রে ছিলাম বীরের বেশে

সার্থক হলো মীরজাফর, হুল ফুটালোই শেষে।

এমনি করে এক দশকের হলো যবনিকাপাত

মীরজাফররা বুঝলো শেষে, এখন তো কপালে হাত।

তাই তো দেখি ফেসবুকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠায়।

বন্ধু ভেবে যাদের জন্য খাটলাম দিবানিশি

তারাই কিনা হুল ফুটালো তাই তো দুঃখে ভাসি।

 

 

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
২১ জুন, ২০১৮ ইং
ফজর৩:৪৩
যোহর১২:০০
আসর৪:৪০
মাগরিব৬:৫১
এশা৮:১৬
সূর্যোদয় - ৫:১১সূর্যাস্ত - ০৬:৪৬
পড়ুন