দীর্ঘ সাক্ষাত্কার
একজন নন-আর্টিস্ট লোকের কাছেও শেখার আছে
একজন নন-আর্টিস্ট লোকের কাছেও শেখার আছে
মনিরুল ইসলাম। বাংলাদেশের প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী। দীর্ঘদিন ধরে তিনি স্পেনের মাদ্রিদে বসবাস করছেন। জন্ম : ১৭ আগস্ট, ১৯৪৩-এ বাংলাদেশের চাঁদপুর জেলায়। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে চারুকলার পাঠ শেষে এখানেই শিক্ষকতা শুরু করেন ১৯৬৬ সালে। ১৯৬৯ সালে স্পেন সরকারের বৃত্তি নিয়ে সেদেশে যান উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণের জন্য। এরপর থেকে স্পেনেই স্থায়ীভাবে বাস করে শিল্পচর্চা করছেন। স্পেনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তাঁর বহু একক ও যৌথ প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়েছে। এছাড়া তিনি স্পেন ও মিশরে বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক চারুকলা প্রদর্শনীতে বিচারক হিসেবে কাজ করেছেন। মনিরুল নিজেই রান্না করেন। রান্নায়ও তাঁর বিশেষ সুনাম রয়েছে। তাঁর রান্নার বিশেষ বৈশিষ্ট্য কম তেল আর কম মসলার ব্যবহার। আঁকাআঁকির জন্য দেশ-বিদেশের অজস্র পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। পেয়েছেন রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ পুরস্কার একুশে পদকও। জীবনের একটা বড় অংশ কাটিয়েছেন স্পেনে। স্পেনের অন্যতম সর্বোচ্চ মর্যাদাপূর্ণ সম্মাননা ‘দ্য ক্রস অব দ্য অফিসার অব দ্য অর্ডার অব কুইন ইসাবেলা’ পদক পেয়েছেন। সম্প্রতি দেশে ফিরে এসেছেন মাটির টানে। বছরের অর্ধেকটা সময় এখন দেশেই কাটান। তিনি বিশেষ খ্যাতিমান তাঁর ছাপচিত্রের জন্য। এচিংয়ে তিনি এমন একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য অর্জন করেছেন, যা স্পেনে ‘মনির স্কুল’ বলে পরিচিত। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের মাধ্যমে যে শিল্পকলা চর্চার সূচনা বাংলাদেশে, পরবর্তীকালে প্রতিভাবান শিল্পীদের হাতে বৈচিত্র্য ও বৈভবে আজ এক গৌরবময় ইতিহাস হয়ে উঠেছে। জয়নুলোত্তর শিল্পীদের মধ্যে মনিরুল ইসলাম বিশ্বব্যাপী সর্বাধিক পরিচিতদের একজন। এই পরিচিতি নানা মাধ্যমে তাঁর কাজের নিজস্ব ধরন ও সৃষ্টিশীলতার জন্য। জয়নুল আবেদিন, সফিউদ্দিন আহমেদ, আমিনুল ইসলাম, মোহাম্মদ কিবরিয়া তাঁর সরাসরি শিক্ষক ছিলেন। সম্প্রতি এই শিল্পীর আঁকাআঁকি, শিল্পভাবনা, ব্যক্তি ও সমাজভাবনা নিয়ে কথা হয়।

 

অনুলিখন : মাসউদ আহমাদ 

মঈনুদ্দীন খালেদ : আপনার বাবা কী করতেন?

মনিরুল ইসলাম : আমার বাবা চাকরি করতেন। তিনি সেনেটারি ইন্সপেক্টর ছিলেন, জামালপুরে। পাবলিক হেলথে। তখন তো প্রচুর লোক মারা যেত বসন্ত, ডাইরিয়া, ম্যালেরিয়া এবং কলেরায়। ওয়ার্ল্ডের হেড কোয়ার্টার ছিল বাংলাদেশ। ওখানে তিন মাস ছিলাম।

খালেদ : জামালপুর মানে কি জামালপুর শহর?

মনিরুল : না, শহরই। ইসলামপুরে। এরপরে আর আমি যাই নাই।

খালেদ : সেই তিন মাসের কোনো স্মৃতি আছে আপনার?

মনিরুল : না। অসম্ভব। তিন বছর বয়সের স্মৃতি নাই...

খালেদ : এটা তাহলে জামালপুরের লোকের কাছে জানছেন পরে?

মনিরুল : হ্যাঁ। আমাদের এক বন্ধু ছিল আনোয়ার, আর্ট কলেজে।

খালেদ : এই জন্য আপনি জামালপুরের কথা বলছেন। আচ্ছা, এরপরে কি কিশোরগঞ্জে চলে আসলেন?

মনিরুল : হ্যাঁ।

খালেদ : আপনার বাবা-মা দুই জনই কি চাঁদপুরের? 

মনিরুল : না। বাবা চাঁদপুরের। আমার নানাবাড়ি ছিল কুমিল্লায়, দাউদকান্দিতে। খুব নামকরা বাড়ি। মাথাইয়া বলে। মিয়া বাড়ি।

খালেদ : শৈশবে আপনারা ভাইবোন কয়জন ছিলেন?

মনিরুল : আমরা ৯ জন ছিলাম। ৬ ভাই ৩ বোন। এখন ৬ জন আছি। সিরিয়ালি ৩ জন মারা গেছে।

খালেদ : আপনার বাবার সাথে আপনার মায়ের বিয়ে হলো কেমন করে? যোগাযোগটা হলো কীভাবে?

মনিরুল : এটা ঠিক জানি না। তখন তো অন্যরকম ব্যাপার ছিল। এখন বাবা-মায়েরা বলে দেয়। এখন তো মেয়েরা ছেলে দেখে, ছেলেরা মেয়ে দেখে। তখন এসব  ছিল না। আয়নায় দেইখা নাকি বিয়ে হয়েছিল। ছোটবেলায় শুনছি আরকি। কোথাও গেছে একটা কাজে, তখন আয়নাতে দেখছে। দেখেই পছন্দ। এরপর অ্যারেঞ্জমেন্ট বিয়ে। আমার দাদা কিন্তু তিনটা বিয়ে করেছে। আমি দেখছি প্রত্যেকটা। এখন আমি চিন্তা করি, এটা কীভাবে সম্ভব। বিবাহিত জীবনে যেটা হয়, দাদার যে এতগুলো বউ, বউ হিসেবে একজন আরেকজনকে জেলাস করবে। কিন্তু তাদের দেখলে সেটা বোঝাই যেত না। কিন্তু দে আর ওয়ার্কিং। তারা একসাথে উঠোনে বসে মাছ কুটতেছে। কাজ করছে। গল্প করছে। আমার দাদাদের কিন্তু জমিদারি ছিল। যদিও সেটা নেগেটিভ অ্যাপ্রোচ হয়েছে। দাদা ঘোড়া চালাত। আলাদা একটা ব্যাপার ছিল। আমার চাচাত ভাইয়েরা খুব টাউট ছিল। লেখাপড়া করেনি। যার জন্য দাদাকে এত বিয়ে করতে হইছে, বিশাল সংসারের দেখভালের জন্য। লাস্ট টাইমে দেখা গেল, তারা উইদাউট লেখাপড়ায় এটা করে সেটা করে জীবন পার করেছে। তারা যে লেখাপড়া করে নাই, তবু নানারকম কাজ করছে টাউটগিরি দিয়েই। এজন্য আমি পরে ভাবছি, বাবা কেন ফোরটি ইয়ারসেও আমাদেরকে চাঁদপুরে আনে নাই।

খালেদ : আপনার চল্লিশ বছরে কোনোদিন বাবা চাঁদপুরে আসেননি?

মনিরুল : বাংলাদেশের ভেতরেই তো, কিশোরগঞ্জ থেকে চাঁদপুরে যেতে আর কত সময় লাগে। প্রবাবলি মাই ফাদার, আই ওয়ান্ট টু সে, এসব সিনারি বাবা আমাকে দেখাতে চায় নাই। এই অবস্থা।

খালেদ : আচ্ছা। আপনার বাবা তাহলে সচেতনভাবেই কাজটি করেছেন?

মনিরুল : কিন্তু মায়ের ফ্যামেলির দিককার লোকজন হাইলি এডুকেটেড। অল। একজন বড় প্রতিষ্ঠানের ডাইরেক্টর। আরেকজন ডক্টর। আরেক মামাকে দেখলাম—যে একজন জুট মিলের ম্যানেজার। এর ভেতরেও আবার আস্তে আস্তে ওই একই ব্যাপার—আপস অ্যান্ড ডাউন। এই যে এত উচ্চশিক্ষিত মানুষ, পরে সেখানেই সেই ফ্যামেলিতে আবার এমন দেখা গেল যে, ছেলেমেয়েরা পড়াশোনা করে না।

খালেদ : আপনার মা কতদূর পড়ালেখা করছেন?

মনিরুল : মা ক্লাস এইট পর্যন্ত পড়েছেন। কিন্তু আই থিংক, যাকে বলে থার্ড আই, সি হ্যাজ অ্যা থার্ড আই।  কিন্তু দ্য হেলথ অল দ্য ডিসিশন, আমাদের ফ্যামেলিতে কেউ বিজনেস ওরিয়েন্টেড বা জমিজমার সাথে যুক্ত ছিল না; বাবা ছিলেন চাকুরে, সিভিল ইন্সপেক্টর, লিমিটেড ইনকাম, এত বড় ফ্যামেলি, মায়ের বুদ্ধি ও বিবেচনায় সারভাইব করতেন। দ্যাট মিনস, সীমিত আয়ে বৃহত্ ফ্যামেলি মেইনটেনের যে ব্যাপার, সেটা তিনি ভালোভাবে করতেন। সাকসেসফুলি। আমাদের বাড়ির পাশে একটা কনফেকশনারি ছিল ‘ঢাকা বেকারি’। মাকে দেখেছি ৫০ বছর আগে, স্টিল নাও, সংসারটাকে ভালোমতো সারভাইব করতেন।

খালেদ : ‘ঢাকা বেকারি’ কি আপনাদের ছিল?

মনিরুল : না। ঢাকার লোকের ছিল, চাঁদপুরের। পাশের বাড়ির। মা সেখান থেকে লাল চিনি কিনতেন। বেকারির মালিকের নাম ছিল ইউসুফ আলি পাটোয়ারি। লাকিলি, আমার বাবার নামও একই ছিল—ইউসুফ আলি পাটোয়ারি।

খালেদ : সেনেটারি ইন্সপেক্টরদের দৃষ্টিশক্তি খুব প্রখর হয়। দূর থেকে গন্ধ শুঁকেই বলে দিতে পারে—এখানে এনিথিং রং আছে।

মনিরুল : হাঃ হাঃ হাঃ...

খালেদ : না, আমি কিছুদিন কাজ করেছি বলে ব্যাপারটা মার্ক করতে পেরেছি।

মনিরুল : তখন খুব এক্সপেরিমেন্ট করতাম। বেলিটা আমার খুব ভালো লাগতো। কারণ আর্টিস্টদের অ্যাকাডেমিক্যালি শেখানো হতো। আমার খুব ভালো লাগতো যে, কিছু পোস্টার আসতো। অনেক রকম পোস্টার। কলেরা বা জলবসন্ত থেকে বাঁচতে এই উদ্যোগ নিন। সেবা গ্রহণ করুন। বিশুদ্ধ পানি পান করুন। টিকা নিন। এই রকম। তখন স্লাইড আসতো। রঙের গন্ধটা ভালো লাগতো। এখনো কাগজ প্রিন্ট করলে একটা গন্ধ আসে। এটা আমি তখন থেকেই পছন্দ করতাম।

খালেদ : ছোটবেলায় যে জামালপুর থেকে কিশোরগঞ্জে চলে এলেন, ওখানে ঠিক কোথায় এলেন?

মনিরুল : কিশোরগঞ্জ শহরেই, নরসুন্দা নদীর পারে। জায়গাটির নাম আক্রাবাজার। মনে আছে, নদীর ধার দিয়ে কিছুদূর হেঁটে গেলে একটা রাজবাড়ি ছিল। রাজবাড়িটা তখন ঠিক ছিল না, কিন্তু একটা ঘাট ছিল। অনেক সিঁড়ি ছিল। ওই ঘাটে আমি সময় কাটাতাম। মাছ ধরা বা ছেলেমেয়েদের ঝাঁপ দেওয়া দেখতাম। নদীর যে পরিবর্তন, মরা নদী একটা; কোথাও চর পড়ে গেছে তখন। কচুরিপানা দেখা যাচ্ছে। সেসব দেখতাম। আমার অভ্যেস ছিল ছোট মাছ ধরা।
খালেদ : স্কুলের নাম কী ছিল?

মনিরুল : রামানন্দ স্কুল। সেখানে পরে গেলাম। সেই স্কুল ছিল বিরাট। স্যার জগদীশ চন্দ্র রায় ছিলেন হেডমাস্টার।

খালেদ : তাহলে আপনার প্রথম স্কুল কোনটা?

মনিরুল : সেটা একটা মাইনর স্কুল। সেই মাইনর স্কুলের যিনি হেড টিচার, তিনি ছিলেন আমাদের ফ্যামেলি টিচার। তিনি বাসায় আসতেন। সকালে এসে আমাদের সব ভাইবোনকে পড়াতেন। আমরা ভাইবোনেরা তাঁর কোলে বড় হয়েছি।

খালেদ : কিশোরগঞ্জেই আপনারা নয় ভাইবোন হয়ে গেছেন? মানে আপনার জন্ম আর আপনার বড়দের জন্ম ইসলামপুরে। আর বাকিদের জন্ম কিশোরগঞ্জে?

মনিরুল : রাইট।

খালেদ : ছবি আঁকাটা শুরু হলো কখন? মাইনর স্কুলে থাকতেই?

মনিরুল : স্কুলে থাকতেই। ঝালর আঁকতে পছন্দ করতাম। তখন সাপ্তাহিক ওয়াল পেপার ছিল, সেই প্রথম স্কুলে। হাতের কাজ করতে ভালো লাগতো, বিশেষ করে ঈদের সময়। ঝালর কাটতে ভালো লাগতো। কিন্তু ততদিনে, তখন তো মাইনর স্কুল ছেড়ে এসেছি। অন্য স্কুলে ক্লাস সেভেনে পড়ি। ওই স্কুলে সংস্কৃতির চর্চাটা বেশ স্ট্রং ছিল। তখন সব বিখ্যাত টিচার ছিলেন। যেমন স্যার জগদীশ চন্দ্র রায়। একটা কিছু দেখে কপি করে ফেলতাম।

খালেদ : তিনি স্যার? মানে স্যার ডাকাটা কেন?

মনিরুল : স্যার উপাধিটা ব্রিটিশদের দেওয়া।

খালেদ : তখন কি ঘুড়ি উড়াইছেন?

মনিরুল : অনেক। ঘুড়ি বানাতে পারতাম। এক কাগজের সাথে অন্য কাগজ জুড়ে দিয়ে বানাতাম। ঢাউস ঘুড়ি বানাতাম। কালার ও ডিজাইন ব্যালান্স করতাম। কমন ঘুড়ি, ঢাউস ঘুড়ি করতাম।

খালেদ : ঘুড়ির নাম মনে আছে?

মনিরুল : হ্যাঁ। মনে আছে।  ঘুড়িতে মাঞ্জা দিতাম। কীভাবে সুতা কাটে বেশি, সেগুলা শিখে ফেলেছিলাম তখন।

খালেদ : তখন তো আপনাদের এলাকায় খুব ঘুড়ি ওড়ানোর চল ছিল?

মনিরুল : হ্যাঁ। ঢাউস একটা ঘুড়ি ছিল। খুব আওয়াজ হতো। মানুষের মাথায় পড়লে খবর হয়ে যেত।

খালেদ : ঘুড়ি ওড়ানো ছাড়া আর কী কাজ করতেন?

মনিরুল : ঘুড়ি ওড়ানো ছাড়া মাছ ধরতে পছন্দ করতাম। ছোট মাছ। কিন্তু ভরা নদীতে না। কম পানিতে।

খালেদ : মাছ কীভাবে ধরতেন? ছিপ দিয়া?

মনিরুল : ছিপ দিয়া ধরতাম। ছোট ছিপ। ছোট মাছ।

খালেদ : এমনে হাতে মাছ ধরছেন কখনো?

মনিরুল : না।

খালেদ : মাছ ধরতে কেমন লাগতো?

মনিরুল : মাছ ধরাটা নেশা। কোনো কাজ নাই। একটা মানুষ মাছ ধরা দেখতেছে, তার বোর লাগেতেছে না। এটা একটা প্যাশন। হিসেব করলে হয়তো সাইকোলজিক্যাল কোনো কজ পাওয়া যাবে। এটা একটা নেশার মতো। প্যাশন ছাড়া সম্ভব নয়। বর্ষায় যখন বৃষ্টি হতো, চারপাশে পরিষ্কার পানি। এসব দেখে ভালো লাগতো। মাছ ধরারও কৌশল আছে। গোবর, খৈল ইত্যাদি হাবিজাবি দিয়ে মাছকে প্রভাবিত করতে হয়। ঘুড়ি কাটার মতো ব্যাপার। অন্যেরা তোমার ঘুড়ি কাটতে পারবে না। কিন্তু তুমি সুতা কেটে নেবে কট করে। এটার পেছনে একটা লজিক আছে। সুতাটা করতে হয় কী, কাচ গুঁড়া কইরা, আঠা দিয়া প্রসেস করে রোদে শুকাতে হতো। এটার মধ্যে কিন্তু লজিক আছে। দশ টাকা করে বাজি ছিল। সারা শহরে ঘুড়ি উড়তেছে, মানুষ দৌড়াইতেছে ঘুড়ি ধরার জন্য।

খালেদ : তার মানে কি ঘুড়ির সাথে ১০ টাকা লাগানো থাকতো?

মনিরুল : হ্যাঁ। মানুষ অপেক্ষা করতেছে, কখন ঘুড়ি কাটবে। ঘুড়িটা ধরে টাকাটা পাবে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে ঘুড়ি নিয়া বংলাদেশে তেমন ডেভেলপ করে নাই। আমি ঠিক জানি না। কিন্তু বিদেশে দেখছি, বিভিন্ন রকম ঘুড়ি। রঙবেরঙের ঘুড়ি। বাকসোর মতো ঘুড়ি। ঢাকায় সেভাবে ঘুড়ি দেখিনি।

খালেদ : ছোটবেলায় স্কুলে আপনার কোন সাবজেক্ট পড়তে ভালো লাগতো?

মনিরুল : তখন তো পড়াশোনাটা তেমন করতাম না। অ্যাজ অ্যা স্টুডেন্ট, ফ্রাঙ্কলি, স্কুলে আমি খুবই বাজে স্টুডেন্ট ছিলাম বলা যায়। পড়তে চাইতাম না। তবে অঙ্কটা ভালো লাগতো। ক্লাসে কোনোরকমে গড়ায় গড়ায় মাইনরটা পার করেছি। ক্লাস সেভেনে স্কুল পরিবর্তন হলো। সেই স্কুলে এসে ড্রইংটা পছন্দ করতাম। কিন্তু স্কুলে ড্রইং ক্লাস ছিল, সেটার তেমন গুরুত্ব ছিল না। সাবজেক্ট হিসেবে ছিল, কিন্তু ভ্যালু তেমন ছিল না। তখন আর্ট বলতে শহরের যারা আর্টিস্ট তারাও খুব ভালো কাজ করতো, তা নয়। তারা দু-একটা ছবি আঁকতেছে। তারা নিজেরাই জানে না, আর্টিস্টরা কী আঁকে। আর শহরে কাজই ছিল কম। যারা শহরের সচেতন আর্টিস্ট তারা সিনেমার পোস্টার বা বিশেষ কোনো কাজ করছে। অনেকের তেমন কাজই দেখা যেত না। যেটা হতো, দোকানের সাইনবোর্ড, রিক্সার পিছনের ছবি, ব্যানার; এ রকম কিছু লেখা—এসব ছিল। কখনো বাড়ির নাম, দোকানের হেডিং—এসব লেখা হতো। এসব যারা করতো, তারাই আর্টিস্ট। এখানে তো তখন শিল্পের প্রাথমিক অবস্থা। কিছু কাজ হতো ইমেজের। গ্লাস ফিটিংয়ের কাজ হতো। ওয়েল কালারের কাজ। তখন ভিজ্যুয়েবল কাজ কিছু হতো। সায়েন্সের সময়ে কিছু লোক এল, আমি বিদেশে দেখেছি, ফিফটি-সিক্সটি সেঞ্চুরিতে যেসব কাজ হয়েছে, কালচারাল লেখা এবং লেখা বলতে আল্পনা; সেসব কাজ শিল্পীরা ধরার চেষ্টা করছে।

খালেদ : দেশভাগের কোনো স্মৃতি মনে আছে?

মনিরুল : তখন তো আমি খুব ছোট। দেখছি, মানুষ খুব দৌড়াদৌড়ি করতেছে। আমার বয়স তখন পাঁচ বছর। কী হচ্ছে। আই হ্যাভ নো আইডিয়া। সেই স্মৃতি কিছু আছে, কিন্তু তখন খুব একটা ধারণা ছিল না। ১৯৫২ সালের কিছু স্মৃতি মনে আছে। ভাষা আন্দোলন হলো। ছাত্ররা মিছিল মিটিং করেতেছে। ছাত্ররা আন্দোলনে মারা গেল। শেখ মুজিব সাহেবকেও দেখছি, কিশোরগঞ্জে। তিনি মিটিংয়ে যাচ্ছেন সোহরাওয়ার্দী সাহেবের সাথে। সোহরাওয়ার্দী সাহেবকে দেখলাম ইয়া মোটা লাল টকটকে একটা মানুষ দেখতে। পেছনে শেখ মুজিব। কিশোরগঞ্জে তখন খেলার মাঠ ছিল একটা, সেখানেই সবকিছু হইতো।

খালেদ : এটা কখনকার কথা বলছেন?

মনিরুল : বায়ান্ন সালের পরেই দেখেছি বলে মনে পড়ে।

খালেদ : স্কুলে আপনি কিশোরগঞ্জে থাকতে সুচিত্রা সেনের ছবি আঁকছিলেন না একটা?

মনিরুল : হ্যাঁ। সুচিত্রা সেন আর মীনা গোনাইয়ের ছবি আঁকছি। অ্যালুমিনিয়ামের বডিতে না, তখন আঁকছিলাম রিকসায় ফুল বডিতে।

খালেদ : রিক্সার পেছনের বডিতে?

মনিরুল : হ্যাঁ, এটা মনে আছে। তখন আমি ক্লাস টেনে পড়ি বা ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেবো।

খালেদ : মীনা কুমারীর ছবিটা কেমন ছিল?

মনিরুল : সেই ছবিটা ছিল ‘বহুত দিন হোয়ে’ সিনেমার। খুব নামকরা ছবি। হাজার হাজার হাতি নিয়ে আসে। এটাকে কী যেন বলে, পৌরাণিক ছবি। মিথিক্যাল ছবি আরকি।

খালেদ : ‘বহুত দিন হোয়ে’ সিনেমাটি আপনি কীভাবে দেখলেন?

মনিরুল : ফিল্ম ফেয়ার থেকে। তখন তো খুব যত্ন করে দেখানো হতো। সাংঘাতিক। কিশোরগঞ্জে তখন সেই সুযোগ ছিল।

খালেদ : বাড়িতে কি সিনেমা দেখার সুযোগ ছিল?

মনিরুল : না, বাড়িতে সেই সুযোগ ছিল না। বাবা খুব কঠোর ছিলেন। খুব ডিসিপ্লিন ছিল। বাবা বলতেন, লেখাপড়া করো। মানুষ হও ইত্যাদি। ছবি আঁকাও পছন্দ করতেন না। বইয়ের নিচে লুকিয়ে ছবি আঁকতাম। কারণ তাঁর ধারণা ছিল—লেখাপড়া করলে তুমি সামবডি। না করলে নো বডি। এমন করে ভাবতেন তিনি। এমনকি কথা না শুনলে তিনি মারতেনও। তখন মায়ের কাছে গিয়ে আশ্রয় নিতাম। আমার ফ্যামেলির যারা বড় হইছে, সবাই মার খাইছে। মা ছিল একটা ভরসার জায়গা আরকি। এটা অন্য কেউ করেনি। তো আর্ট হচ্ছে সেল্ফ রানিং ওয়ে। নিজের কাজ।

খালেদ : আপনি যে স্পেনে গেলেন, স্টোরিটা তো—এয়ারপোর্টে গিয়ে বিমানে চড়ে গেলেন। কিন্তু সময়টা মনে পড়ে? কোন এয়ারলাইন্সে গেলেন?

মনিরুল : সুইস এয়ারলাইন্সে।

খালেদ : সুইস এয়ারলাইন্স কি ঢাকায় আসতো?

মনিরুল : হ্যাঁ। ঢাকা থেকে যাওয়ার এয়ারলাইন্স ছিল অনেক। রফিকুন নবী তখন কোর্স করতেছে, আমি তখন টিচার। নবী বলল, যাবা নাকি বিদেশে? ১২ বছর না পনেরো বছর ধরে শুধু ফরমই পূরণ করতেছি। সুযোগ পাই না। তো, এত বড় অফার, না যাওয়ার কোনো কারণ নাই। তখন ৫ দিনের না ৩ দিনের চেষ্টায় ভিসা পেয়ে চলে গেলাম। পাকিস্তান সরকারই পাবলিসিটিটা দিয়েছিল। তখন ১৫ দিনের নিচে যাওয়ার কথা ভাবাই যেত না। মেডিক্যাল সার্টিফিকেট, স্টেশন লিভ ইত্যাদি কয়েকদিনের মধ্যে জোগাড় করে ফেললাম। একটা অ্যাপ্লিকেশন ড্রাফট করে পাকিস্তান আর্ট কাউন্সিল থেকে মোনায়েম খানের পিএসের মাধ্যমে সত্যায়িত করে পাঠিয়ে দিলাম। তারা দেখে বলল, এত আর্জেন্ট কেন? বললাম, একটা কাউন্সিল আছে। পরে টিকিট পেয়ে চলে গেলাম। চার হাজার টাকা ভাড়া ছিল তখন। দুইটা টিকিট দিয়েছিল যাওয়ার। আমি বললাম, দুইটাই যাওয়ার কেন? পরে আমি বলে, একটা যাওয়ার এবং একটা আসার টিকিট করে নিলাম।

খালেদ : তার মানে আপনি প্রথমেই স্পেনে যান নাই?

মনিরুল : না। প্রথমে গেলাম পাকিস্তান আর্ট কাউন্সিলে। করাচি হয়ে পরে সেখান থেকে গেলাম স্পেনে।

খালেদ : আপনি এই যে ঢাকা আর্ট কলেজে পড়লেন, পরে এখানে টিচার হলেন; তো এখানে আপনার প্রেম-ভালোবাসার কোনো ব্যাপার ঘটেনি?

মনিরুল : না, সিনথেটিক প্রেম তো হয়েই থাকে কেমিক্যালের সঙ্গে। কেমিক্যাল প্রেম। আর আমার আসলে কোনো ডিটারমিনেশন নাই। একটা বাঙালি যখন প্রেম করে নাই, দুটো ছেলেমেয়ে কথা বলল, কফি খেল দেখলেই মনে হয় প্রেম হয়ে গেল। ব্যাপারটা এমন ছিল। আমাদের এখানে তো দেখা করে কথা বলে সহজ হতেই দিন সপ্তাহ মাস পার হয়ে যায়। তারপরেই না অন্তরঙ্গতার ব্যাপার। পরিবেশটাই এমন। কিন্তু স্পেনে প্রেম ট্রেম একদিনেই সব হয়ে যায়। কারণ তাদের তো কোনো ট্যাবু নাই। তারা আসে বসে। অন্তরঙ্গ হয়ে যায়। আর এখন তো সবকিছু চেঞ্জ হচ্ছে। ছেলেমেয়েরা ইন্টারনেট ব্যবহার করছে। অনেক পরিবর্তন এখানে এসেছে। ঢাকায় যেটা রিয়েলিটি, ট্যাবু হিসেবে ঢাকায় ছিল, সেই ঢাকাও পরিবর্তন হচ্ছে। ঢাকা এখন মোর ওপেন। এখন প্রায় সব জায়গায় একই ব্যাপার। ফিলিংসটাই বড় কথা। হ্যাপেনিং, মোরালিটি ব্যাপারগুলোও আছে। তা-ই না।

খালেদ : স্পেনে যে গেলেন, প্রথম প্রথম কেমন ফিলিংস কাজ করলো? কেমন বোধ করলেন?

মনিরুল : অনুভূতিই অন্যরকম। স্বপ্নের মতো। চিন্তার বাইরে। হঠাত্ করে ইউরোপে। ভাবাই যায় না। গ্রিন ব্লু স্কাই। সব ফকফকে। ভয়ও আছে। আমি ইন্টারন্যাশনাল হোস্টেলে থাকতাম। সবাই ফরেনার। মনে হতো আই হ্যাভ গেট লস্ট। আমারও তেমন ভয় ছিল। নতুন পরিবেশ। ইঁদুর যেমন ঘর থেকে বের হয়ে আবার গর্তে ঢুকে পড়ে, ভয়ে। সেই রকম মনে হতো।

খালেদ : স্পেনে গিয়ে যে কাজ করলেন, আপনি তো ম্যুরাল এবং প্রিন্টিংয়ে কাজ করেছেন। সেসব নিয়ে কিছু বলেন?

মনিরুল : আমার ইচ্ছে ছিল প্রিন্টিংয়ের ওপর একটা ভালো কোর্স করার। ক্ল্যাসিকাল প্রিন্টিং। আমরা তো প্রথমে নয় মাসের জন্য যাই। প্রিন্টিংয়ের ওপর করতে চাইলাম, যেটা রশীদ চৌধুরী করতে গিয়েছিল। সে চলে আসছে। স্পেনে থাকেনি। প্যারিসে চলে আসছিল। এখানে একটা আর্ট কলেজ ছিল, ওম্যান; সেখানে কিছু প্রিন্টিংয়ের কাজ ছিল। সেগুলো পরে জাদুঘরে দেওয়া হয়েছে। জয়নুল আবেদিন চাইছিল বাংলাদেশে একটা প্রিন্টিং কলেজ হোক। এখন পর্যন্ত সেটা এখানে নাই কিন্তু। লাইফ নিয়ে চরিত্র নিয়ে কাজ করতে হয়। সেটা এখানে নাই। তার দুইটা প্রিন্টার ছিল। একটা হচ্ছে স্কাল্পচার প্রিন্টার, আরেকটা পোর্ট্রেট প্রিন্টার।

খালেদ : আপনি কি স্পেনে গিয়ে ম্যুরাল করেছিলেন? এটা তো আপনার সাবজেক্টও ছিল?

মনিরুল : হ্যাঁ। দুই বছর কাজ করেছি। আমি তো ওটার জন্য ইউনিভার্সিটির অ্যাওয়ার্ডও পেয়েছিলাম। ওটা দিয়ে আমি স্কলারশিপের জন্য অ্যাপ্লাই করেছি। ওখানে গিয়েও করেছি। কিন্তু ইউনিভার্সিটির ভেতরে না, বাইরে। বিরাট ওয়াল আছে। সেখানে কাজ করতাম।

খালেদ : কিন্তু আপনি তো কন্টিনিউ করেননি?

মনিরুল : না। আমি করছি তো। আমি তিনটা করেছিলাম। ফিনিশড ম্যরাল। কিন্তু ওরা তো ভাইঙ্গা ফেলে। ১৮টা রেখে সব ভেঙে ফেলে। রশীদ চৌধুরী চেষ্টা করেছিলেন আর্ট কলেজে। পারেন নাই। ভাইঙ্গা পড়ে। চুন দেওয়া লাগে। বালু লাগে। বালুটাকে মারতে হবে নোনা ছাড়া। কিন্টিনিউ করা যায় না। সবকিছু চিন্তা করে এখানে করা যায় না। এখানকার পরিবেশ ও ম্যাটেরিয়াল অনুকূল না।

খালেদ : পরে আর ম্যরাল করলেন না?

মনিরুল : বাংলাদেশে ম্যরাল করাটা অসম্ভব। এখানে ম্যরাল করাটা কঠিন।

খালেদ : আপনি যে নয় মাসের জন্য গেলেন স্কলারশিপ নিয়ে, এই সময়ের ভেতর সব কাজ শেষ করতে পারলেন?

মনিরুল : না। কাজ শেষ হয় নাই। পরে তো সময় এক্সটেনশন করলাম।

খালেদ : আপনার সময় নিয়ে তো পরে ঝামেলা হয়েছিল?

মনিরুল : অ্যাম্বেসি ঝামেলা করেছিল কোন দেশ থেকে এসেছি তা নিয়ে। তারা বলছে, তুমি তো বাংলাদেশের লোক, পাকিস্তানের না। কিন্তু আমি বললাম, পাকিস্তানই বাংলাদেশ। তারা মানতে চাইলো না। অ্যাম্বেসি তো দাওয়াত দিয়ে আমাদের দেখালো যে, বাঙালিরা কীভাবে পাঞ্জাবিদের গলা কেটে হত্যা করছে। এসব দেখিয়ে অসহযোগিতা করলো। কিন্তু জীবনের কিছু ক্ষেত্রে আমার লাক ফেভার করেছে। আমি যে হোস্টেলে থাকতাম, ইন্টারন্যাশনাল হোস্টেলে, তাদের সহযোগিতা পেয়েছি। তো আমি বললাম যে, আমার যে স্কলারশিপ, সেটার টাকা দাও। পরে আমাকে টাকা দিয়ে দিল। পাসপোর্টও পেয়ে গেলাম।

খালেদ : পাসপোর্ট পেতে কোনো সমস্যা হলো না?

মনিরুল : না। তখন তো স্পেনে ফরেনার তেমন ছিল না। বাঙালি তো ছিলই না। মাদ্রিদে আমি একমাত্র বাঙালি। মাসখানেক পর, আমার এক বান্ধবীর সাথে আলাপ করতেছি, সে একটাও ইংরেজি জানে না। আমিও একটাও স্প্যানিশ জানি না। কিন্তু দুই ঘণ্টা আলাপ করলাম। এমন অবস্থা।

খালেদ : ১৯৭১ সালে আপনি ছবি আঁকছেন। একটা হচ্ছে ‘বার্থ অব অ্যা ন্যাশান’। একটা জাতির পিতার ছবি। দেয়ালের মধ্যে রক্তের দাগ...

মনিরুল : হ্যাঁ। সেই ছবিগুলো এখনো আছে আমার কাছে। ব্ল্যাক গয়ার—বীভত্স ছবি আরকি। আর একটা করেছিলাম ‘হোম ইজ টু বাংলাদেশ’।

খালেদ : এগজিবিশনটা কোথায় করেছিলেন?

মনিরুল : মাদ্রিদে।

খালেদ : আপনার ছবিতে ওয়াটার কালার, বাংলাদেশের মানুষ ও প্রকৃতি ইত্যাদি ব্যাপারগুলো ছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে স্পেনে যাওয়ার পর, ছবিতে স্পিরিচুয়ালের মাত্রাটা হঠাত্ এত বেড়ে গেল কেন?

মনিরুল : আমি যখন স্পেনে যাই, কিছু কাজ নিয়ে গিয়েছিলাম। ড্রইং। ওয়াটার কালার, প্রকৃতি। কিন্তু ওখানে যাওয়ার পর, হুমায়ূন কবীরের সাথে আলাপ হলো। তিনি খুশী কবীরের খালাত ভাই। স্পেনের অ্যাম্বেসিতে কাজ করতেন। মাদ্রিদের ফার্স্ট সেক্রেটারি। খুবই ভালো মানুষ। তখন আমি কিছু কাজ করছিলাম ওখানে। অল্প সময়ের জন্য গেছি। কিছু কাজ না করলে কেমন হয়। পরে তো আমি অ্যাওয়ার্ড পেলাম যুগোস্লাভিয়া থেকে। তারপর একটা, একবার ইস্তাম্বুলের একটা গ্যালারিতে গিয়েছি এগজিবিশনে। ওই গ্যালারিটা এখনো আছে। ওখানে আমাকে একজন আর্টিস্ট জিজ্ঞেস করে যে, তোমার মধ্যে কোনো সেক্ট ব্যাপার আছে নাকি? থাকে না যেমন—হরেকৃষ্ণ বা সুফিজম—এরকম। আমি বললাম, না। তারপর যখন ওয়ার্কশপ হলো, আস্তে আস্তে এক্সটেন্ডিং হচ্ছে আমার কাজ। তারপর তাইওয়ানের রক। এভাবে নানা জায়গায়। অ্যাওয়ার্ড পাচ্ছি।

খালেদ : এটা কি সেভেনটি ওয়ানের পরে?

মনিরুল : হ্যাঁ। তখন দে আর সেলিং মাই পেইন্টিং। নতুন কিছু তৈরি হতে থাকলো। কতগুলো ব্যাপার আছে না, যখন তুমি গো অ্যাহেড, তখন একটা সিস্টেমের ব্যাপার আছে। আমি তো এথিস্ট না। আই অ্যাম সামওয়ান বিলিভার, সামথিং। কসমিক ওয়ার্ল্ড আছে।

খালেদ : কসমিক ওয়ার্ল্ভ্র তো প্লিসেন্ট?

মনিরুল : না, নেপচুন, প্লেটো এরকম যে বারোটা জিনিস আবিষ্কার হয়েছে; এগুলো তো আবিষ্কার হয়েছে। এসব তো রিয়েল। এখানে মিথ্যার কিছু নাই। এখানে কিছু ফিগার কাজ করেছে। মানুষ তো ক্রাউডের ভেতর থাকলে লোনলি ফিল করে।

খালেদ : এতগুলো ফিগারে আপনি কী বলতে চাচ্ছেন? এই যে নানা রকমের ফিগার...

মনিরুল : ফিগার নিয়ে আমি নানারকম চিন্তা করছি। ধরো, এই কিছুদিন আগে শুনলাম যে, ৫ জন মানুষ মারা গেছে আমাদের বন্ধুদের মধ্যে। যেমন খালিদ একজন, খালিদ মাহমুদ মিঠু; স্কাল্পচার। খালাত ভাই মারা গেল। আমাদের বন্ধু পিয়ারু, আনোয়ারুল হক পিয়ারু।

খালেদ : মনির ভাই, আমি বিশেষ করে জানতে চাচ্ছি যে, স্পেনে যাওয়ার পর আপনার কাজে মৌলিক কিছু পরিবর্তন এসেছে, যেটা আগে ছিল না। আরও প্রচুর বিষয় এসেছে হিউম্যানেটিক অ্যাপার্চার। যেমন ঈশ্বরের লীলা, বার্থ অব নেশন, কম্পাস, ইমাজিনেশন। এগুলো কীভাবে এল?

মনিরুল : কম্পাস তো একটা সিম্বলিক ব্যাপার। এসব তো মাপা যায় না। আমার বাসার দেয়ালে টানায়া রাখছি। কিন্তু ফর্মটা, একেকটার একেক রকম হাত ও পা আছে। এসব সিম্বলিক জিনিস। আবার টাইমেরও ব্যাপার আছে।

খালেদ : টাইমের স্পেস নিয়ে আপনার কী বক্তব্য?

মনিরুল : টাইমের স্পেস এবং ইনফিনিটি থাকবে। এটার কোনো ভ্যালিডিটি নাই। আমি মেঘনায় গিয়ে অনেক ছবি আঁকছি। টেকনিক্যালি কিছু জিনিস আছে। তারপর ওয়াচটা একটা ব্যাপার। এটা এমনি এমনি হয়নি। মানুষ বানাইছে। এগুলো ইনফিনিট। স্পেসও নাই জায়গাও নাই। কিন্তু আমরা কোথায় যাব, কী করব। একজন ফ্রেঞ্চ লেখক লিখছেন যে, ৩০০ লোকের ইন্টারভিউ নেওয়া হয়। মেডিক্যালের স্টুডেন্টের জন্য এটা গুরুত্বপূর্ণ। সময়টা। এই সময়টায় সে কী দেখেছে? মেডিক্যালের জন্য ৩ সেকেন্ড বা ৫ সেকেন্ড গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এটার কোনো সায়েন্টিফিক এভিডেন্স নাই। কাজেই প্রত্যেকে একেকটা জিনিস দেখছে, নিজের মতো। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, সবাই একটা কমন জিনিস দেখছে। সেটা হচ্ছে সুড়ঙ্গের ভেতর একটা লাইট। এটার কোনো ব্যাখ্যা নাই। এটা একটা হ্যাপেনিং ঘটনা। আমি হয়তো সেটাকে ইন্ডিভিজুয়্যালি একটা স্টোরি করে নিলাম। এটার হয়তো ওয়াচও নাই, টাইমও নাই।

খালেদ : এই যে আপনি নানাকিছু ব্যবহার করছেন, ছবিতে ফ্রি লাইন, ফ্রি স্পেস, নাম্বার—

মনিরুল : নাম্বার আছে। কিন্তু এগুলো বেসিক্যালি সিম্বলিক জিনিস। এমন শূন্যতা থেকেও ফিগার আসতে পারে। পারসোনাল চিন্তা থেকে ইমাজিনারি এসব আসছে।

খালেদ : আপনি কীভাবে মানে করেন, যখন স্পেসের মধ্যে বলেন যে, এটা একটা সি-বিচ। কিন্তু সি-বিচ তো থাকে না...

মনিরুল : সবকিছুর মানে থাকে না। এটা একটা হ্যাপি এন্ডিং থিম। কিন্তু তাতে একটা স্টোরি থাকে। ইন্ডিভিজুয়্যালি একটা মানে করে নিই। এটার কোনো মানে নেই? কেউ বলতে পারবে না যে, কারণ এটার কোনো এভিডেন্সও নাই। তবে একটা চিন্তা থাকে। চিন্তা নিয়ে ভেতরে ঢোকা যায়। এসব তো থাকেই।

খালেদ : এমন কি হয় যে, আপনি একটা কাঠামো ব্যবহার বরলেন, রঙ দিলেন, রঙটা একটু বেশি করে দিলেন?

মনিরুল : দেখো, এই যে ছবি আঁকাটা, ন্যুড ছবি আঁকতে হলেও দু বছর ছবি আঁকতে হবে। উইদাউট শরীর। ভালো হলো না খারাপ হলো ছবি, সেটা দেখার টাইম নাই। আনসার টু ইউ। এত সহজ নয়। মানুষ বোর্ড কিনবে। সিজন ধরবে, ছবি করবে। তারপর প্যারিসে, নিউ ইয়র্কে, টোকিওতে ফেয়ার হবে। দেন ছবি বিক্রি করবে। পাবলোকেই মানুষ স্বীকার করে নাই। বোর্ড বিক্রি করে বইসা রইছে। হাঃ হাঃ হাঃ। আছে না, প্রবাদ আরকি। তারপর আমরা পাইলাম জয়নুল আবেদিনকে। তাকে পাইলাম, টিপটপ। একটা গ্রিন অলিভ ওয়েলের হাওয়াই শার্ট। এলিগ্যান্ট। একটা হোয়াইট রঙের প্যান্ট পরে আসতেন। ইস্ত্রি করা। সবকিছু দেখতেন। বাগানে ঘুরতেন। ওয়াচ করতেন। তার ওয়াচ করার মিনিং হলো, সবকিছু গ্রিন এবং ঠিকঠাক আছে কি-না। তিনি ক্লাসে এসে কখনো বসতেন না। একটা সিম্বল হিসেবে থাকতেন। তার ধমকে কেউ রাগতো না—ধুর মিয়া, কাজ নাই, বসে আছ। বাগান পাড়াইবা না। বাগানে যেন ঠিকমতো ফুল আসে। তিনি আসতেন। তারপর তিনি চলে যেতেন। কোনোদিন ক্লাস নিতেন না। অ্যাডমিনিস্ট্রেশন দেখতেন।

খালেদ : সিগারেট খেতেন কখনো?

মনিরুল : না। কখনো সিগারেট খেতে দেখিনি। তখন কিবরিয়া, তারপর বাশার সাহেব আমরা একসঙ্গে কাজ করছি।

খালেদ : তখন রফিকুন নবী টিচার হয়ে গেছেন?

মনিরুল : হ্যাঁ। আমার আগেই। আমার এক-দেড় বছর আগে।

খালেদ : কামরুল হাসানকে আপনারা পাইছেন?

মনিরুল : না। কামরুল হাসান কোনোদিনই টিচার হয় নাই।

খালেদ : টিচার হয় নাই। কিন্তু কিছুদিন ক্লাস নিয়েছিলেন অনারারি টিচার হিসেবে?

মনিরুল : না বোধহয়। ডি সেকশনে হতে পারে। কিন্তু আর্ট কলেজে উনি কোনোদিন কিছু করেননি।

খালেদ : একজন ছিলেন হাবিবুর রহমান?

মনিরুল :  গ্রাফনেসের টিচার। আর্টের।

খালেদ : আর একজন ছিল খাজা...

মনিরুল : খাজা শফিউদ্দিন।

খালেদ : খাজা শফিউদ্দিন তো আর্টিস্ট ছিলেন?

মনিরুল : উনি কমার্শিয়াল ছবি আঁকতেন। তখন তো পোস্টার হাতে করা হতো। কিছু টেকনিক্যাল ব্যাপার ছিল, তিনি দেখতেন। পোস্টার এবং এরকম কাজে উনি ভালো ছিলেন।

খালেদ : তখন আপনার সঙ্গে কারা টিচার হয়ে আসলো আর্ট কলেজে, রফিকুন নবী এবং হাশেম খান ছাড়া?

মনিরুল : মীর মোস্তফা আলী। তারপর বুলবন ওসমান আসলো। তারপরে তো পাঁচজন টিচার আসলেন ইউনিভার্সিটি থেকেই। ইংরেজি থেকে আসলো। পরে এল আর একজন মতিউর রহমান।

খালেদ : তখনকার সময়টা কেমন ছিল?

মনিরুল : আমি, রফিকুন নবী এবং কয়েকজন মিলে সাভারের প্রপারেই একটা জমি কিনছিলাম। আমি তো অত বৈষয়িক ছিলাম না। জায়গাটা কেনা হয়েছিল সাড়ে তিন হাজার টাকায়। এখন কত দাম! পরে আমাকে বলে যে, তুমি তো লেফটিস্ট। জমি দিয়া কী করবা। আমি আর যাই না। জানিও না। বাইরে থাকি। আমার তো সবই আছে। তখন এখানে কে ফাইট করবে আমার জন্য? পরে আরও দু-একজন ভাগিদার জুটলো। এবং দখল করেই নিয়েছে সবাই। সাভার বাজারের ওপরেই জায়গাটা ছিল।

খালেদ : আচ্ছা, আপনার রেজাল্ট কেমন হতো?

মনিরুল : আমি কিন্তু ফার্স্ট ক্লাস সেকেন্ড হয়েছিলাম। যৌথভাবে প্রথম শ্রেণি পেয়েছিলাম।

খালেদ : আপনার ছাত্রজীবনের ছবির কোনো কালেকশনে আছে এখনো?

মনিরুল : কেউ কেউ বলে এখনো মাঝে মাঝে। বলে যে, আপনার একটা ছবি আছে আমার কাছে। একবার এসএম কবির আমাকে একটা ছবি এনে দিয়েছিল। কারণ তার বাড়ি থেকে সব ছবি খুলে ফেলেছে তার স্ত্রী। সে নিজে আর্কিটেক্ট। সে এখনো স্কয়ারের আর্টের কাজের সাথে ইনভলব আছে।

খালেদ : এবার অন্য প্রসঙ্গে আসি। মনির ভাই, আপনি শিক্ষক হলেন কীভাবে?

মনিরুল : শিক্ষক হলাম ফাইনাল ইয়ারে যাওয়ার পরে। এটা ১৯৬৬ সালের কথা। ফাইনাল ইয়ারটা আমার খুব ট্রাজেডি গেছে। কারণ তখন আমার বাবা মারা গেছে। আমি কিন্তু ফার্স্ট ক্লাস সেকেন্ড হয়েছিলাম। মিটিং হলো। অনেক কথা। তারা বলল যে, এটা তো  নিয়মে নাই। ফার্স্ট ক্লাস পেয়েছিল নাসির। পরে আমাদের দুজনকেই যৌথভাবে ফার্স্ট ক্লাস দেওয়া হয়। পরে আমি দেলোয়ারের কাছে গেলাম।

খালেদ : সে তো মারা গেল পরে...

মনিরুল :  হ্যাঁ। হি ওয়াজ মাই ফ্রেন্ড অ্যান্ড হি ইজ অ্যান এক্সিলেন্ট পারসন। তাকে আমি রুমমেট হিসেবে পেয়েছিলাম। খুব ভালো মানুষ ছিলেন।

খালেদ : কোথায় থাকতেন আপনারা?

মনিরুল : ওই যে শুক্রবাদে থাকতাম মেস কইরা। হোস্টেলে, সে আমার রুমমেট ছিল।

খালেদ : তখন জয়নুল আবেদিনের বাড়িতে খুব আড্ডা হতো?

মনিরুল :হ্যাঁ, দেলোয়ার আমাকে নিয়ে যেত।

খালেদ : উনি কি অ্যালাও করতেন?

মনিরুল : হ্যাঁ, করতেন।

খালেদ : আপনি কি তখন টিচার?

মনিরুল : না। তখনো আমি ছাত্র।

খালেদ : জয়নুল আবেদিন কী বললেন?

মনিরুল : তাঁর বাসায় গেলাম। তিনি বললেন, কিছু চিন্তা করছ? আমি বললাম, না এখনো কিছু চিন্তা করিনি। কোথায় কার কাছে যোগাযোগ করব, জানি না। তিনি বললেন, কাজ করার জন্য তো অনেক জায়গা আছে। টেলিভিশন আছে। অমুক কোম্পানি আছে। কিন্তু যদি টিচিং প্রফেশানে যেতে চাও, ইউ ক্যান কন্টিনিউ পেইন্টিং। তিনি ইনডাইরেক্টলি কথা বলে গেলেন। সরাসরি কিছু বললেন না বা প্রতিশ্রুতিও দিলেন না। তিনি বললেন না যে, আর্ট কলেজে টিচিং করবা? তারপরে তিনি একদিন বললেন, তুমি থাকো। দেখি কী করা যায়।

খালেদ : তারপর কী হলো?

মনিরুল : এক সপ্তাহ পরে উনিই বললেন, থাকো। তিনি নিজেই আমাকে ক্লাসরুমে নিয়ে গিয়ে ইনট্রুডিউস করিয়ে দিলেন, ফার্স্ট ইয়ারের ক্লাসের ছেলেমেয়েদের সাথে। উনি কিন্তু তুমি করে বললেন না আমাকে। আপনি করে বললেন। ছাত্রদের উদ্দেশে বললেন, তোমাদের নতুন শিক্ষক। তার কাছে যা জানার, শিখতে চাও, শিখে নেবে। সবক নেবে। ওই বছরই তো আমি বাইরে গেলাম। তখন আমি সব রঙ কিনে ফেলেছি। ওয়াটার কালার। ক্লিন পেপার।

খালেদ : কোথায় থেকে কিনলেন?

মনিরুল : গুলিস্তান থেকে।

খালেদ : এরপর অনেক কাজের মধ্যে নেমে পড়লেন?

মনিরুল : তখন তো পুরোপুরি কাজ এবং পেইন্টিং নিয়ে মেতে থাকলাম। কত রকমের কাজ করেছি। নানা মাধ্যমে কাজ করেছি। মডার্ন ড্রইং। একই কাজ কয়েকদিন ধরে করতাম।

খালেদ : এই যে আপনার দীর্ঘ শিল্পীজীবন, এই পর্যন্ত আসতে স্পেনের কোনো শিল্পী বা ব্যক্তি কি আপনাকে অনুপ্রাণিত করেছে?

মনিরুল : হ্যাঁ অবশ্যই। যেমন এখানে থাকতে বই দেখছি। ছবি দেখছি। কত ছবি আঁকছি। প্রত্যেকটা শিল্পীর একটা সাইড আছে। একটা পেইন্টারের সাইড, সেটা কোনোদিন যাবে না।

খালেদ : আমাদের এখানে ছবি নিয়ে যে কাজ হয়, আপনার বিবেচনা বলুন?

মনিরুল : পেইিন্টিংয়ে আমরা যে স্টেজে আছি, বাংলাদেশের পেইন্টিং এখন যে জায়গায় গেছে, কিছু একটা করতে গেলে ওরা বলবে, এটা হয়ে গেছে। এখন কত বিচিত্র ধরনের কাজ হচ্ছে, এটার জন্য একটা সমাজের ব্যক্তির ইমাজিনেশন এবং সাহস লাগে। ওই লেভেলে আমরা তো যেতে পারি নাই। এখন ডিজিটাল প্রিন্ট বা ইলেক্ট্রনিকের কারণে ছবি যে জায়গায় গেছে, এসব অবশ্য সেভেন্টিতেও কিছুটা ছিল। কিন্তু ধরো ওই টাইমে, মেইলি উইনারের যে ইন্টারেস্টিং ফর্ম, সেটার কিন্তু হিস্ট্রি আছে। তাকে বলা হয় ফাদার অব দ্য অ্যাবস্ট্রাকশন; এবং হিটলার ওদের ছবি গ্যালারি থেকে নিয়া পোড়াইছে। ওরা কিন্তু ওয়াটার কিংবা সাধারণ সিস্টেমে কাজ করেছে। কিন্তু আমরা করতে গেলে বলবে, এটা কত আগেই তো হয়ে গেছে। তো ওখানে ওই পরিবেশ ও টাইম ছিল বলে ম্যাচ করে গেছে। কিন্তু বলার মতো যে কথা তা হচ্ছে, এই যে এত আগে ওরা চিন্তা করছে এবং এত আগে তারা এটা ছবিতে দাঁড় করানোর চেষ্টা করছে, তাদের হবে না তো হবে কার! তা-ই না? ওরা ছিল ফিউচারিস্ট। ওরা বর্তমান নিয়া চিন্তা করে নাই, ভবিষ্যত্ নিয়া চিন্তা করেছে। কাজ করেছে। আর্টিস্টদের মধ্যে নানা রকম আছে। আজকের জন্য আর্টিস্ট আছে, কালকের জন্য আছে, ভবিষ্যতের জন্য আছে। ফলে আমরা যা-ই করি না কেন, সামবডি ইজ দেয়ার। এটা তো অনেক আগেই হয়ে গেছে। ফলে নতুন করে কিছু করা সো মাচ টাফ। আর্টিস্টকে হোল দুনিয়াটা ঘুরতে হবে। যত ভালো আর্টিস্টই হোক না কেন, সে হয়তো ভালো পেইন্টিং করতে পারে, নাম করতে পারে, কিন্তু তার নিজের দুনিয়াটা নাই। নিজের ছবিটা আঁকতে হলে তাকে ঘুরতে হবে। পেইন্টিং ভালো হোক খারাপ হোক, পারসোনাল দুনিয়া তৈরি করাটা খুব ইমপোর্ট্যান্ট। পেইন্টারকে নিয়ে তখনই আলাপ, যখন হি ইজ অ্যা পেইন্টার।

খালেদ : ইদানিং আমি দেখছি যে, নানা ধরনের কাজ করেছেন। আমি আপনাকে নাইনটি থেকে ফলো করছি। জয়নুল আবেদিনকে নিয়ে কথা বললাম, তিনি আপনার গুরু; আমাদের শিল্পাচার্য। সেটা তো হলো। কিন্তু এখন বাংলাদেশের যাঁরা মাস্টার শিল্পী, তাঁদের সম্পর্কে মোটামুটিভাবে আপনার বিবেচনা কী?

মনিরুল : তোমাকে বলি, ওই টাইমে যে ছবি আঁকা হয়েছে, আমাদের এখানে তা হয়নি। শফিউদ্দিন সাহেবের যে কাজ, প্রদর্শনী হয়ে গেল, দিস ইজ দ্য টাইম অব ফুল। কিন্তু ওই টাইমের বাইরে কিন্তু তারা যায় নাই। সেইম টাইম সেইম থিম নিয়ে তারা কী অসাধারণ কাজ করেছে। তারা ফ্রেমটা ভাঙে নাই নতুন করে। তুমি লক্ষ করো যে, শফিউদ্দিন সাহেব ছিল ম্যাথেটিক আর্টিস্ট। খুব ডিসিপ্লিনড। উনি ছাড়া এই কাজ কেউ করতে পারতো না। ম্যাথেটিক না হলে ওই ধরনের কাজ করা সম্ভব নয়। ওই গ্রুপের মধ্যে এই ব্যাপারটা ছিল। কারণ আর্টিস্টের মেন্টালিটি হচ্ছে দ্য ওয়ার্ল্ড ইজ ভেরি বিগ। আর্টিস্টকে হতে হবে তার সময়ের বিগ মাস্টার। তাহলেই ভালো কিছু সম্ভব।

খালেদ : বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ কোনো শিল্পীর কাজ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য?

মনিরুল : বাংলাদেশের শিল্পীদের নিয়ে, আমি শাহাবুদ্দিন আহমেদ সম্পর্কে বলব, হি ইজ অ্যা ভেরি গুড পেইন্টার। কিন্তু কাজের ব্যাপারে তার ডিসিপ্লিন বা ভ্যারাইটিজ কম। সে নানা বিষয়ে কাজ করছে। কিন্তু চেঞ্জেবল ব্যাপার কম। সময়কে নিয়ে কাজ করতে হয়। ছবি আঁকার জন্য সময়ের দরকার। শিল্পীদের কাজ করতে করতে  থামতে হয়, সময়টা ধরার জন্য। কন্টিনিউ কাজ করতে করতে স্টপ করা চাই। কাজ করলে তো কাজ হবেই। আমরা ব্রাশ দিয়ে কাজ করতেছি, কাজ তো হবেই। কিন্তু থামতে হয় কেন, কাজটাতে ডিফারেন্ট আনার জন্য। যেমন আমাদের কিবরিয়া সাহেব ছিলেন। তিনি ছিলেন সাধুর মতো একজন আর্টিস্ট। তিনি তাঁর মতো করে স্লো স্টাইলে কাজ করে গেছেন। তিনি নীরবে কাজ করে গেছেন। কারণ তাঁর এক্সপোজারের দরকার ছিল না। তিনি কাজ নিয়ে স্যাটিসফাইড ছিলেন। কিন্তু এক কথায়, হি ইজ অ্যান অনেস্ট আর্টিস্ট।

খালেদ : বাংলাদেশের আর কোনো শিল্পীর কাজ সম্পর্কে...

মনিরুল : আমাদের এখানে কনটেম্পরারি সুযোগ-সুবিধা ও কাজের যে ঘাটতি, এটা একটা সমস্যা। এখন তো কম্পিউটারে সব বানানো হয়। আমাদের আর্টিস্টরা এখন করছে তো। তবে আমি মনে করি, কাইয়ুম চৌধুরী বেস্ট। কিন্তু আমাকে যদি হেল্প করে ছবি, আমি বিভিন্ন সাপোর্ট দিতে পারি বা নানা ওয়েতে দেখতে পারি। কিন্তু কম্পিউটার তো ইমেজ দেয়। সে নিজে কিছু করতে পারে না। আমাকেই প্রেস এবং প্রে করতে হবে তারপর প্রিন্ট নিতে হবে।

খালেদ : আপনি যে একটা অ্যাওয়ার্ড পেলেন, নন-স্প্যানিশ হিসেবে, কী যেন নাম?

মনিরুল : ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড। আর একটা ‘অর্ডার অব দ্য অফিসার অব উইনি সেভেন’। এই যে কিছুদিন আগে পেল শাহাবুদ্দিন, একই পুরস্কার।

খালেদ : এই পুরস্কারটা কারা পায়, কেন দেয়?

মনিরুল : এই পুরস্কারটা পায় যারা কালচারালি ওয়ার্ল্ভ্র ওয়াইড কন্ট্রিবিউশন রাখে তাদের দেওয়া হয়।

খালেদ : আপনি তো একজন চিত্রশিল্পী হিসেবে স্পেনে খুবই পরিচিত। ওখানে গেলে মানুষ আপনাকে খুব রেসপেক্ট করে। আমি আপনার সাথে গিয়েছি, দেখেছি, তারা আপনাকে খুব পছন্দ করে। দাঁড়িয়ে স্যালুট দেয়। আমাদের মনির বলে। বাংলাদেশেও আপনি ব্যাপক জনপ্রিয়। এটা নিশ্চয়ই আপনি উপভোগ করেন। স্পেন এবং বাংলাদেশ—কিন্তু আপনার মাতৃভূমি কি দুইটা হয়ে গেছে? বা দুইটা দেশ কি আপনি ওউন করেন?

মনিরুল : দুইটা দেশের কথা বলছ তুমি, আমি মনে করি, মানুষ হিসেবে আমি হয়তো বিশ্ব নাগরিক। 

রবীন্দ্রনাথ যখন কাজ করেন তখন অবনীন্দ্রনাথের সাথে টক্কর দিয়েছেন। একজন শিল্পী যখন পৃথিবীর এক প্রান্তে কাজ করেন তখন তিনি নিজের মতো করে কাজ করেন। কিন্তু শিল্পীর কাজটা তখনই সার্থক হয়, যখন পৃথিবীর অন্যপ্রান্তের মানুষও সেটা দেখে এনজয় করতে পারে। একটা টাইম আসে যখন সে একীভূত হয়ে যায়।

ইমেজ অলয়েজ ইজি ফর অ্যান অ্যাক্টর। কিন্তু কাজের মধ্যে এমন কিছু থাকতে হয় যাতে সাধারণ মানুষ ইনভলব হয়। আমরা বেশিরভাগ শিল্পীরা আরম্ভ করি—মানুষ ও প্রকৃতি বা ন্যাশনাল কোনো ফিগার নিয়ে। এসব বিষয় সাধারণ মানুষের সাথে রিলেট করে। কিন্তু একটা সময়ে এসে বড় শিল্পী হতে গেলে তাকে বড় কিছুর দিকে যেতে হয়। সেটা সাধারণ মানুষ বুঝুক বা না বুঝুক, তার কিছু যায় আসে না। এখন আর্টিস্ট যদি ফিগার পায়, পপুলারিটি পায় সেটা অন্য ব্যাপার। কিন্তু শিল্পীর কাজের সাথে এসব থাকে। শিল্পী সাধারণ মানুষের পছন্দ বা রুচিকে প্রাধান্য দেবেন কি-না, সেটাও ভাববার বিষয়। ইমেজ নট রিসকি আর্ট। ইমেজ অলয়েজ ইজি টু অ্যাবস্ট্রাক্ট। এখন তো কত ধরনের অ্যাবস্ট্রাক্ট হচ্ছে তা-ই না? তুমি যেটা বলছ, দুটো দেশের কথা। আমি স্পেনে গেলে অ্যাডাপ্ট হয়ে যাই। স্পেন যেহেতু ইউরোপের সাথে মোর ক্লোজার দেন আদার কান্ট্রি।

ইসলামি আর্টের ডেভেলপমেন্ট স্পেনেই হয়। এটাই শেষ। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে আমরা এগিয়ে, যেমন—ইসলামি কালচার বা আর্ট ওদের থেকে আমরা বেশি জানি। ওরা আমাদের মতো জানে না। ওখানে গেলে ঘরে বা গ্যালারিতে কাজ করলে তো একরকম। কিন্তু বাইরে যখন মাটির কাজ থাকে, সেটা বাংলাদেশের সাথে তুলনা হয় না। আমার দেশের মাটির সাথে যতটা ইনভলব বোধ করি, মাটি হাতে নেবার যে মানসিক টান বা বোধ থেকে, সেখানে তা হয় না। সেদিক থেকে কিছুটা আলাদা ব্যাপার তো আছেই। সৃষ্টিটাই হয়তো এমন মানুষের।

খালেদ : স্পেনে তো আপনি প্রেম করে বিয়ে করেছেন। অনেক নারীর সাথে মিশেছেন?

মনিরুল : এমন অনেক আছে। যেটা বলছিলাম, সৃষ্টিটাই হয়তো এমন মানুষের। আমি নিজে দেখছি, যারা মাউন্টেনে জন্ম নেয় তারা দূরে কোথাও যায়। যারা বিচের পাশে থাকে, তারা সাগরে যায়। একটা ম্যাগনেটিক কিছু আছে। তারপর আছে কালচারাল রীতি-নীতি ও আচার, যেগুলো বাপ-মায়ের সূত্রে পাওয়া যায়। এসব ফ্যাক্ট আসলে। ম্যাটার করে। আমরা অনেক সময় ইমোশনাল থাকি। কিন্তু অ্যালার্ট থেকে জীবনযাপন করা যায় না। ক্যালকুলেট করে সবকিছু ভাবাও যায় না বা সম্ভবও না। হ্যাপেন যখন হ্যাপেন। এটা কেউ আগে থেকে বলতে পারবে না। থার্টি ইয়ারে আমি যেটা চিন্তা করি, সিক্সটিতে তা ভাবি না। আবার সেভেনটিতে এসে জীবনকে আরেকভাবে উইশ করি।

খালেদ : জীবনে প্রেম থাকা না থাকা এবং প্রেমের প্রয়োজনীয়তা, এগুলো নিয়ে ভাবেন?

মনিরুল : প্রেম অবশ্যই থাকা দরকার। কারণ প্রেম না থাকলে জীবনটা হান্টিং টাইমে কাজ করবে না। তখন মানুষের মধ্যে বিরহ কাজ করে। এটা হবেই।

খালেদ : প্রেম না থাকলে কি আপনার কষ্ট হয়?

মনিরুল : না। এটার দুটো দিক আছে, প্রেম না থাকলেও মানুষ বাঁচতে পারে। কিন্তু তখন তার মধ্যে স্যাডনেস কাজ করবে। বিরহ আসবে। এটা সহজাত ব্যাপার।

খালেদ : আপনার মধ্যে কি বিরহ কাজ করে?

মনিরুল : হ্যাঁ, কাজ করে। তবে প্রেম না থাকা বা সরোনেস কিন্তু মানুষকে বড় করে দেয়। লাস্টলি প্রেমটা অবজেক্টলি ননঅবজেক্টিভের ওপর চলে যায়।

খালেদ : একজীবনে আপনার এই যে এত অর্জন ও প্রাপ্তি। সুখী বোধ করেন? সুখটাকে আপনি কীভাবে দেখেন?

মনিরুল : হ্যাপিনেসের কোনো ডেফিনেশন নাই। এটা কোনো ব্যাখ্যা হয় না। আমি দেখছি, একজন মানুষ বড় একটা শুকনা পাথর বুকে চেপে বসে আছে। আরেকজন বারে বসে ঢাব ঢাব করে মদ ঢালতেছে, খাচ্ছে। সুতরাং কে যে কোথায় সুখী, বলা মুশকিল। মানুষ যে যার মতো সুখী। প্রত্যেকটা মানুষ ইনডিভিজুয়্যালি একক। পৃথিবীতে এত মানুষ, বিলিয়ন বিলিয়ন মানুষ, কারো হাতের ফিঙ্গার প্রিন্টের সাথে কারো মিল নাই। এত ভেরিয়েশন। বিস্ময়কর! হাউ ইজ ইট পসিবল। দুইটা চোখ, একটা নাক, ভয়েস। কীভাবে কান দিয়ে শুনতেছে। মুখ দিয়ে আওয়াজ কেমনে বাইর হইতেছে। এগুলো যখন ভাবি, বিস্মিত হতে হয়। একটা লোক কথা বললেই শোনা যায়। বোঝা যায় যে, অমুক লোক কথা বলতেছে। বিস্ময়কর না?

খালেদ : মনে করুন, এমন একটা সময় এল যখন আপনার জীবনে কোনো নারী নাই, নারীসান্নিধ্য নাই, কোনো নারী আপনার সাথে যোগাযোগ করছেন না, নারীবিহীন পৃথিবী; কেমন বোধ করবেন? খারাপ লাগবে?

মনিরুল : অবশ্যই খারাপ লাগবে। আমি নিজের জীবন দিয়ে দেখেছি। যে জিনিসের সাধ আমি পেয়েছি, অনুভব করেছি, ফিল করেছি, সেটার বিরহ আমাকে পোড়াবে না? এটার দরকারও আছে। সময় ও মনের যে ফিলিং, এক্সাইটমেন্ট সেটা অস্বীকার করা যায় না। শোনো, কোনো প্রেমিক-প্রেমিকার মধ্যে প্রেমটা যখন চলে, তখন যে সময় সেই সময়টা মধুর মতো মনে হয়। কিন্তু যত প্রেম হোক আর মধুর মতোই হোক, মধুর ভাষাটা একসময় মধুর মতো লাগে না।

খালেদ : মধু যখন আসে তখন কি ছবির ভাষা চেঞ্জ হয়?

মনিরুল : অফকোর্স চেঞ্জ হয়। মানুষের জীবনটাই তার ব্রেনে ও নিউরনে সারকনফার্সেসে কাজ হয়। এগুলো  মানুষের সহজাত অনুভূতি বা ফিলিংসয়ের ব্যাপার।

খালেদ : আরমান ইসলাম। আপনার ছেলে। সে কেমন আছে?

মনিরুল : হ্যাঁ, ভালো আছে।

খালেদ : ছেলের ওপর আপনি কি ডিপেন্ড করেন? কখনো কি মনে হয়, ছেলেই এখন আপনার বাস্তব বা মনোজগতের আশ্রয়?

মনিরুল : আমার মনে হয়, ছেলেটা হয়তো ঠিক তেমন নয়। আর আমরা আর্টিস্টরা একটু আলাদা এই কারণে যে, আর্টিস্টদের হয় কী, সব আর্টিস্টদের এমন হয় না। কারণ সব আর্টিস্ট কিন্তু আর্টিস্ট না। যারা ফুলটাইম অ্যাক্টিভ আর্টিস্ট, আমার ক্ষেত্রে যেটা হয়, কাজ নিয়ে থাকলে আর সবকিছু অনেক সময় গৌণ হয়ে যায়। আর্টিস্টরা যখন ক্রিয়েটিভিটির জন্য চব্বিশ ঘণ্টা সময় দেয়, তারা তখন অপেক্ষা করে, কিছু একটা ঘটে যাওয়ার। এজন্য আমরা কাজ করি তো। এখন ফ্যামেলি লাইফ আর আর্টিস্টের ফ্যামেলি লাইফ, দুইটা লাইফ কিন্তু এক না। এটা ভাগ করাও কঠিন। সেভাবে কোনো নিয়ম নাই যে, আর্টিস্ট হতে হলে এভাবে থাকতে হবে। বোহেমিয়ান হতে হবে। আর্টিস্টদের বই বের হতে হবে। এইরকম করতে হবে। অনেকে ফ্যামেলি লাইফে গিয়ে ডিসিপ্লিনের মধ্যে থেকেও ভালো কাজ করেছে। পিকাসো  কিন্তু ফ্যামেলি লাইফ লিড করেও ভালো ছবি আঁকছে। ফলে কে কীভাবে নেয়, সেটা হচ্ছে বিষয়। এটার কোনো বাউন্ড নাই। রবীন্দ্রনাথ তো ডিসিপ্লিনড ছিলেন। নজরুল ছিলেন প্রায় বাউণ্ডুলে। রবীন্দ্রনাথের আটটা বাড়ি। কিন্তু কখনো তিনি প্রভার্টি ফিল করেন নাই।

খালেদ : কিন্তু আপনি কি ফ্যামেলি  লাইফের চেয়ে একাকী জীবন এনজয় করেন?

মনিরুল : এনজয় তো করতেছি। আবার সারকামস্ট্যান্সেস, আই বিলিভ ইন ফ্রেন্ডশিপ। বন্ধুত্ব আমি পছন্দ করি। গুড ফ্রেন্ড। সেটা মোর অ্যাবাউট পিওর। খুব রেয়ার হতে হবে। ভালো বন্ধু দুই বা তিনজন থাকতে পারে। গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের একটা কথা আছে, তিনি তাঁর বন্ধুকে বলছেন, তোমার কি কোনো বন্ধু আছে? সে বলল, বন্ধু তো অনেক আছে আমার। মার্কেস হেসে বললেন, তোমার তো কোনো বন্ধুই নেই। কাজেই ফ্রেন্ডশিপ ইজ ভেরি ইম্পর্ট্যান্ট। এবং এটা রাখাও দরকার। ঢাকা শহরে বন্ধুত্ব একটু জটিল। কারণ এখানে ফ্যামেলি প্রোগ্রাম ছাড়া তো বাইরে খুব কম যাওয়া হয়। জন্মদিন বা বিয়ে এমন কোনো অকেশনে যাওয়া হয়।

খালেদ : আপনি তো জীবনের দীর্ঘ সময় ইউরোপে কাটিয়েছেন এবং বাইরের অনেক দেশেও থেকেছেন, আড্ডা দিয়েছেন। অনেক নারী-পুরুষ আপনাকে পছন্দ করে। ইয়াং জেনারেশন আপনাকে খুবই ভালোবাসে। সমাজে মিশছেন। দুটো সমাজ। আপনি তো দুটো আলাদা সমাজে মিশছেন এবং আড্ডা দিয়েছেন। কেমন বোধ করেছেন? বাংলাদেশে বলতে গেলে, আমি যদি আমার কথা বলি, সত্যি কথা বলতে গেলে এখানে পরচর্চা খুব প্রবল; যেটা ইউরোপে নেই। এটা আমাকে ব্যক্তিগতভাবে খুব আহত করে...

মনিরুল : আমি এটা এনালাইসিস করেছি। এ ব্যাপারে সিম্পলি একটা কথাই শুধু বলব, কালচারাল অ্যাটিচিউড গ্রো করে নাই। সর্বশেষ যে ইকনোমিক পরিসংখ্যান দিয়েছে, তাতে বিস্মিত হওয়ার কিছু নাই। এখন কিন্তু সময়টা আগের মতো নাই। বাংলাদেশের আর্টিস্টরা ট্যুরে যায় নিজের পয়সায়। যদিও আমাদের আর্টিস্টদের ৮০% ছবি বিদেশে বিক্রি হয়। এখন আর্ট এবং আটির্েস্টর সংখ্যা বেড়ে গেছে। অনেক প্রতিষ্ঠানে আর্টিস্ট দরকার বা কাজ করে যাচ্ছে। বাংলাদেশে যারা রেমিটেন্সে গ্রো করেছে বা প্রধান ভূমিকা রাখছে তিনটা শ্রেণি : ইমিগ্রান্ট, গার্মেন্ট সেক্টর এবং কৃষক। গত দশ বছরে আর্টিস্টদের কাজ কিন্তু সেভাবে অতদূর যায় নাই। বিদেশি বায়ার সেভাবে কাজ নিচ্ছে না। অনেক আর্ট ক্যাম্প হচ্ছে। তুমি যেটা বলছ পরচর্চা, সেটা হচ্ছে ফাস্ট্রেশন থেকে। একজন ভালো আর্টিস্ট যখন ছবি আঁকে, ভালো ছবি আঁকলো। সেখান থেকে যদি কোনো ছবি বিক্রি না হয়, তাহলে তার ছবি আঁকাটা কমে যায়। তখন যেটা হয় তার ফ্যামেলি আছে, পয়সা নাই। কাজের স্পিরিট বা উত্সাহ কমে যায়। আমি বলি কী, আর্টিস্টদের রিল্যাক্স হচ্ছে সবচেয়ে ড্যাঞ্জারাস। এটা দরকার আছে, কিন্তু কমফোর্ট করতে পারলে ভালো। আমার যত ইচ্ছা কমফোর্ট করলাম, কিন্তু রিলাক্সে পেয়ে গেলেই ক্ষতি। আর্টিস্ট অনেক রকম আছে। অনেকে আছে ছবি আঁকে, পয়সা পায়, কোনো অনুষ্ঠানে গেলে তালি দেয়। আনন্দ পায়। এরা কনশাসলি আর্টিস্ট না। অ্যাক্টিভ আর্টিস্ট যেমন আছে, নন-অ্যাক্টিভ আর্টিস্টও আছে।

খালেদ : আপনি মনিরুল ইসলাম কিশোরগঞ্জ-জামালপুর-চাঁদপুর থেকে এসেছেন, আপনার যখন খারাপ লাগে, কী মনে হয়, কোথায় গেলে ভালো লাগবে?

মনিরুল : অনেকে আমাকে বলে, আমার বাইরে যাওয়া দরকার। আমার ছবি এখন এতটা ম্যাগনেফাইট হয়ে গেছে; এখন অনেক কিছুই মনে হয়। মনে হয়, আমার বন্ধুরা এই মুহূর্তে কাজ করছে। আমি ফিল করি, আমার জার্নি দরকার। ছবির কাজের জন্য কোথাও যাওয়া দরকার। কিন্তু আমি বসে আছি। আবার এটাও ঠিক যে, আমি এখনো বাঁইচা আছি, সুস্থ আছি, ছবি আঁকতেছি; থ্যাংকস মাই গড। সাধারণত ছবি আঁকার সময় আমি দাঁড়িয়ে আঁকি এবং আমি কোনো হেল্পার রাখি না। হোমওয়ার্কে আমি বেশ সময় দেই। আমি সবসময় আমার কাজ একা করি। পাতিল মাজা, আইরন করা, ঘর পরিষ্কার করা, বাজার করা—এসব কাজ আমি একাই করি। কিন্তু এর মধ্যেই আমি চিন্তা করি আমার ছবি নিয়ে। ফলে রান্নাঘরে কাজ করলেও আমার ভাবনা থাকে ছবি নিয়েই।

খালেদ : ঘরের এই কাজগুলো আপনাকে ডিস্টার্ভ করে না?

মনিরুল : না। বরং সাইন্টিফিক্যালি প্রুভড যে, কাজের মাধ্যমেও রিল্যাক্স হয়। আমি পাকের ঘরে কাজ করতেছি, ভাবতেছি।

খালেদ : আপনি কি কোলাহল পছন্দ করেন, নাকি একা থাকতে পছন্দ করেন?

মনিরুল : এটা আমার হ্যাবিট যে, আমি একা খাই না। অনেকে একা থাকতে পছন্দ করে। আমি সবার সাথে মিলেমিশে খেতে এবং আনন্দ করতে পছন্দ করি। আই এনজয় ইট। মানুষ হিসেবে তোমরা হয়তো একা থাকতে পছন্দ করো। কিন্তু আমি মানুষ ডাইকা আনি। কথা বলি। কারণ তার কম্যুনিকেশন একান্ত দরকার। কারণ আমার কম্পানি দরকার। ভালো শব্দ দরকার। হাসি-ঠাট্টা পলিটিক্স ইকনোমিক্স ইত্যাদি দরকার। তুমি ভাবলে যে, কিছুদিন আমি ছবি আঁকবো না, ঘুরে বেড়াব। এটা ঠিক নয়। দিস ইজ রং। কারণ আর্টের মধ্যে অনেক ফিলোসফি আছে। লট অব ফিলোসফি। কিছুদিন আগে আমি দেখছিলাম যে, আর্টিটেকচার হচ্ছে লিকুয়িড আর্ট। কারণ একটা বাড়িতে ঢোকা, একটা বাগান বা ফার্ম বা অফিসে যাওয়া—নট সেম মাইন্ড। তখন তোমার মাইন্ড চেঞ্জ হয়ে গেছে। এটার দরকার আছে। মানুষ তাই চিন্তা করতেছে, শহরে স্পেস নাই। যতই আমরা বাড়ি তৈরি করি, স্পেস কমতেছে। ঢাকার মোড়গুলো আমরা বন্ধ করে দেই। মোড়ে গাড়ি ঘোরার জন্য স্পেস দরকার। সেসব না থাকলে কেমন করে চলবে। তারপর এই যে ফুড কালচার, এটা খুব ইম্পর্ট্যান্ট। এটার জন্য সেন্সিবলিটি দরকার। গত ৫০ বছরে কী ঘটেছে, তা তো আমরা দেখছি। কিন্তু ভবিষ্যতে কী আছে আই ডোন্ট নো।

খালেদ : মনির ভাই, শেষ প্রশ্নটা করি। আপনি এই যে খোলামেলা মানুষ, নানা শ্রেণির নানা ঘাটের মানুষের সাথে আপনার সম্পর্ক। আপনার কাজের সময়ও যে কেউ এসে পড়তে পারে আপনার ঘরের দরজায়। একজন আর্টিস্ট তো চায় যে, আমি সময় পেলে কাজ করব। আপনার মনটা অনেক ওপেন। আপনি সময় দেন, গল্প করেন—এই যে চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, এটা কীভাবে তৈরি করলেন?

মনিরুল : স্পেনে যাওয়ার আগে এটা আমার মধ্যে ছিল না। ওখানে গিয়ে যেটা পেয়েছি যে, ফ্রেন্ডশিপ, টকিং এবং ট্যুরিজম—এই জিনিসগুলো পেয়েছি। ওদের কালচারে এসব আছে। একটা ভালো রেস্টুরেন্টে যাওয়া, খাওয়া, বন্ধুর সাথে আলাপ করা—এসব আমি অর্জন করেছি। তোমাকে সিলেক্ট করতে হবে, তুমি কার সাথে মিশবা, কার সাথে খাবা। কারণ একজন নন-আর্টিস্ট লোকের কাছেও তোমার শেখার আছে। d

 

 

 

 

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
২১ জুন, ২০১৮ ইং
ফজর৩:৪৩
যোহর১২:০০
আসর৪:৪০
মাগরিব৬:৫১
এশা৮:১৬
সূর্যোদয় - ৫:১১সূর্যাস্ত - ০৬:৪৬
পড়ুন