উপন্যাস
আলতা
ইমদাদুল হক মিলন২১ জুন, ২০১৭ ইং
আলতা
অলঙ্করণ :অভিজিত্ চৌধুরী

টগর ও টগর, কোথায় গেলি রে?

মুরগির মাংসটা মাত্র কসানো হয়েছে, কড়াইতে পরিমাণমতো পানি ঢেলে এখন সরা দিয়ে ভালো করে ঢেকে দিলেই হলো। মিনিট দশেকের মধ্যে চমত্কার রান্না হয়ে যাবে। ভাত এবং অন্যান্য তরকারি আগেই হয়ে গেছে। মুরগির মাংসটা শেষ রান্না। দুপুর ঢলে পড়েছে। মাংসটা রান্না হলে হাতের কাজ শেষ হয় টগরের। এসময় ফুফু অমন টগর টগর করে ডাকছে কেন? কী হয়েছে?

রান্নাঘর থেকেই সাড়া দিল টগর। কোথায় আর যাব! এই তো রান্না ঘরে।

বড় ঘর থেকে গলা উঁচিয়ে হাজেরা বেগম বললেন, এখনো রান্না ঘরে! কাজ শেষ হয়নি?

সরা দিয়ে বেশ যত্নে কড়াইটা ঢেকে দিতে দিতে টগর বলল, না।

কেন, শেষ হয়নি কেন?

এ কথায় টগর একটু রাগল। শেষ না হলে আমি কী করব? মুখের কথায় সব শেষ হয়? সময় লাগে না?

দুপুর ঢলে গেছে, কাজলের আসার সময় হয়ে গেল। এসে যদি দেখে এখনো রান্না শেষ হয়নি, ভীষণ রাগ করবে। খুবই রাগী স্বভাবের ছেলে।

হাজেরা বেগম যাতে শুনতে না পায় এমন স্বরে গজগজ করতে লাগল টগর। ইস, কী আমার রাগী স্বভাবের ছেলেটারে! রাগী হয়েছ না ঘোড়া হয়েছ তাতে আমার কী! আমি কি ওরটা খাই না পরি যে ওর রাগ আমাকে দেখতে হবে! আর তাছাড়া আমারই কি রাগ কম! রাগ করে কত কি ছেড়ে দিলাম!

হাজেরা বেগম আবার ডাকলেন টগরকে। টগর, ও টগর।

টগর গলা উঁচিয়ে সাড়া দিল। কী?

চুলোর জ্বাল কমিয়ে রেখে তুই না হয় গোসল করে আয়। তোর গোসল হতে হতে মাংসটাও রান্না হয়ে গেল, এসে সব গোছগাছ করে দিলি।

টগর গম্ভীর গলায় বলল, না।

কেন?

আমি একবারেই যাব।

কথাটা বুঝতে পারলেন না হাজেরা বেগম। বললেন, একবারে মানে?

এই তো মুরগিটা হলে। সব কিছু বড় ঘরে পৌঁছে দিয়েছি, এখন মুরগিটা দিলেই শেষ। সবকিছু তোমার হাতের কাছে গুছিয়ে দিয়ে যাব। তুমি তোমার বোনপোকে সামনে বসে খাওয়াবে। আমি বাড়ি গিয়ে গোসল টোসল করে খেয়ে একটা ঘুম দেবো। সকাল থেকে হাড়খাটনি গেছে আজ। এখন আর শরীর বইছে না। বোনপো আসবে তোমার, আর ধকল যাচ্ছে আমার।

হাজেরা বেগম দুঃখী গলায় বললেন, কী করব মা বল! আমার শরীরটা আগের মতো নেই, চোখে ভালো দেখি না, ভালোমতো হাঁটাচলা করতে পারি না। কাজের ঝি যেটা আছে ওর হাতের রান্না আমি না হয় কষ্টে সিষ্টে মুখে দিই, কাজল কি দিতে পারবে! এজন্যই তো তোকে ডেকেছি।

ডেকেছ ভালো করেছ। আমি রান্না করে দিয়ে গেলাম, এখন কোনো ঝামেলা নেই, তুমি শুধু বেড়ে খাওয়াবে।

না মা, আমি পারব না।

কেন পারবে না?

চোখে ভালো দেখি না, কী দিতে কী তুলে দেবো পাতে, কাজল রেগে যাবে। রেগে হয়তো খাবেই না। কালই ফিরে যাবে ঢাকায়।

হাজেরা বেগমের কথায় আবার রাগ হলো টগরের। ঝাঁঝাল গলায় বলল, তুমি তাকে এত ভয় পাচ্ছ কেন ফুফু? সে কি বাঘ ভালুক? খেয়ে ফেলবে তোমাকে! দশ-বারো বছর পর খালার সঙ্গে দেখা করতে আসছে, এদিকে খালা তার ভয়ে অস্থির, আশ্চর্য ব্যাপার!

হাজেরা বেগম গদগদ কণ্ঠে বললেন, এই ভয়ের মধ্যে অন্যরকম একটা মায়া আছে মা। তুই তো বুঝবি না।

কেন বুঝব না? আমি কি কচি খুকি?

সরা তুলে মাংসটা পরীক্ষা করল টগর। করে খুশি হলো। একদম ঠিকমতো হয়েছে রান্নাটা। চমত্কার গন্ধ বেরোচ্ছে। ফুফুর বোনপো খেয়ে একেবারে পাগল হয়ে যাবে।

চুলো থেকে মাংস নামিয়ে চুলো নিভিয়ে দিল টগর। তারপর মোটা ন্যাকড়া দিয়ে ধরে বড় ঘরে নিয়ে এল মাংসের কড়াই। এই তোমার শেষ পদ। এবার যত পার খাওয়াও বোনপোকে।

কাত হয়ে পালঙ্কে শুয়ে ছিলেন হাজেরা বেগম। মাংসের কড়াই নিয়ে টগরকে ঢুকতে দেখে উঠে বসেছেন। মুখটা আনন্দে ঝলমল করছে তাঁর। সেই আনন্দিত মুখ সামান্য ম্লান করে তিনি বললেন, সবই যখন করলি মা, শেষ কাজটাও করে দে।

টগর গ্রীবা বাঁকা করে ফুফুর দিকে তাকাল। শেষ কাজটা কী?

কাজল এলে তাকে একটু বেড়ে খাওয়াবি।

ইস, বেড়ে খাওয়াবে! আমার যেন আর কোনো কাজ নেই।

কী কাজ তোর?

গোসল করব, খাব, ঘুমোব।

সবগুলোই এই বাড়িতে কর। তুই গোসল করতে করতে কাজল এসে পড়বে। তারপর তাকে খাইয়ে তুই খাবি। খাওয়া দাওয়ার পর ওই পাটাতন ঘরে বসে আমি কাজলের সঙ্গে গল্প করব, আর তুই আমার পালঙ্কে শুয়ে ঘুমোবি।

কেন, আমাদের বাড়িঘর নেই?

থাকবে না কেন?

ছেলেটা এতদিন পরে আসবে!

তাতে কী হয়েছে! আচ্ছা শোন, সে কি আজ এসে কালই চলে যাবে?

হাজেরা বেগম একেবারে হা হা করে উঠলেন। না না, তা যাবে কেন? দশ পনেরো দিন থাকবে!

এই দশ পনেরো দিনই কি তাকে আমি রান্না করে খাওয়াব! সামনে বসিয়ে জামাই আদরে বেড়ে খাওয়াব! এটা ওঠা তুলে দেবো?

না, তা কেন, শুধু আজকের দিনটাই। প্রথম দিন তো, তুই একটু দেখে শুনে খাওয়ালি আর কি। কাল থেকে আমি যেভাবে যা পারি করব। ঝি যা রান্না করবে তা-ই খাবে।

কিন্তু তোমার সেই আদরের ঝিটা কোথায় এখন? ঘণ্টাখানেক ধরে তো দেখছি না তাকে।

মির্জা বাড়ি গেছে।

কেন?

চাল কুটতে। ছেলেটা যে ক’দিন এখানে থাকে, মানে পিঠা খেতে খুব ভালোবাসে তো। এজন্য চালটা আগেই কুটিয়ে রাখছি।

বুঝেছি। আমি এখন যাই।

হাজেরা বেগম হতাশ গলায় বললেন, কিন্তু আমি যে তোকে বললাম!

আমি পারব না। আমার ভাল্লাগছে না।

হাজেরা বেগমকে আর কোনো কথা বলার সুযোগ দিল না টগর, বেরিয়ে গেল।

 

দুই

নৌকার দুলুনিতে ঘুম এসে যাচ্ছে কাজলের। পায়ের কাছে রাখা ব্যাগটা মাথায় দিয়ে ঘুমিয়ে পড়বে নাকি! ঘণ্টা দেড়ঘণ্টা যা-ই লাগুক খালার বাড়ি পৌঁছুতে, এই ফাঁকে একটা ঘুম তার হয়ে গেল।

না, এখন ঘুমোন ঠিক হবে না। তারচে’ বাড়ি পৌঁছে গোসল টোসল করে খেয়ে তারপর ঘুম দেবে। যতক্ষণ ইচ্ছে ঘুমোবে, কোনো তাড়া নেই।

পকেট থেকে সিগ্রেটের প্যাকেট বের করে সিগ্রেট ধরাল কাজল। নৌকোর সামনের দিককার গলুইয়ের দিকে এগিয়ে গিয়ে বাইরে তাকিয়ে সিগ্রেট টানতে লাগল।

বাইরে ঝাঁ ঝাঁ করছে দুপুরের রোদ। খালের দু পাশে সবুজ শস্যের মাঠ। সেই মাঠ যেন রোদে পুড়ে ধূসর হয়ে যাচ্ছে। মৃদু একটা হাওয়াও আছে, মাঝে মাঝে টের পাওয়া যায়। বেশ নির্জন চারদিক। এই নির্জনতা ভেঙে একই লয়ে একটা শব্দ হচ্ছে, খালের জলে বৈঠা পড়ার শব্দ। যন্ত্রের মতো বৈঠা বাইছে মাঝি।

কাজল মাঝির দিকে তাকাল।

মধ্য বয়সী, বেশ প্রসন্ন চেহারার মাঝি। মুখে ঘন কালো দাড়িগোঁফ, পেশিবহুল শরীর। লুঙ্গির ওপর কোমরের কাছে লাল একখানা গামছা বাঁধা। গায়ে  ছেঁড়াখোড়া স্যান্ডো গেঞ্জি, মাথায় বাঁশের তৈরি মাথলা। খুবই উদাস হয়ে নৌকো বাইছে সে।

কাজলের ইচ্ছে হলো লোকটির সঙ্গে কিছু কথা বলে। কথা বললে সময়টা ভালো কাটবে। কোন ফাঁকে খালার বাড়ি পৌঁছে যাবে টের পাবে না।

ঠোঁট সরু করে সিগ্রেটের ধোঁয়া ছাড়ল কাজল। ও মাঝি, তোমার নাম কী?

মাঝি হাসিমুখে বলল, হেকমত।

বাড়ি কোথায়?

আপনের খালার বাড়ির কাছেই।

কথাটা শুনে বেশ অবাক হলো কাজল। আমার খালার বাড়ির পাশে মানে? আমার খালাকে তুমি চেন নাকি! আমি যে খালার বাড়ি যাচ্ছি জান?

হেকমত হাসল। জানুম না কেন? আপনের খালায়ই তো আমারে পাঠাইছে আপনেরে বাড়িত নিয়া যাইতে।

বলো কী! তুমি যে এতক্ষণ তাহলে কিছু বললে না?

কী কমু কন?

আহা, আমাকে বলবে না আমাকে বাড়ি নেয়ার জন্য খালা তোমাকে পাঠিয়েছেন। তুমি বামুনগাঁ থেকে এসেছ! আমি যদি অন্য নৌকোয় চড়ে বসতাম।

না, তা কেমনে বসবেন। লঞ্চ থিকা নামনের লগে লগেই তো আমি গিয়া আপনের হাতের ব্যাগটা ধরলাম। আমার নাওয়ে আইন্না আপনেরে তুললাম।

তুমি আমাকে চিনলে কী করে?

আপনের খালায় বইলা দিছিল।

কী বলে দিয়েছিল? তুমি তো আমার নামও জিজ্ঞেস করলে না?

আপনের নাম আমি জানি।

কিন্তু আমাকে চিনলে কী করে?

আপনের খালায় আপনের চেহারা যেমুন বলছে আপনে তো তেমুনই। চিনুম না কেন?

সিগ্রেটে শেষ টান দিয়ে সিগ্রেটটা জলে ছুড়ে ফেলে দিল কাজল। তুমি তো খুব ইনটেলিজেন্ট লোক হে।

ইনটেলিজেন্ট কথাটা বুঝল না হেকমত। বলল, কী লোক?

বুদ্ধিমান লোক।

হেকমত হাসল। আমগো মতন মানুষের আর বুদ্ধি!

কাজল বলল, কেন, তোমাদের মতো মানুষদের বুদ্ধি থাকতে নেই নাকি! বুদ্ধি কম বেশি সব মানুষেরই থাকে। পৃথিবীর সবচাইতে বুদ্ধিমান জীবের নাম মানুষ। হেকমত, সংসারে কে কে আছে তোমার?

মানুষ আছে আল্লার রহমতে। ছেলেমেয়ে চাইর জন। বুড়া মা আছে। তিনডা বইন আছিল, বিয়া দিয়া ফালাইছি।

এই রোজগারে তোমার সংসার চলে?

না সাহেব, চলে না।

তবে?

সামান্য কিছু ধানিজমি আছে, কিছু ধান হয়, দিন কোনো রকমে চইলা যায় সাহেব।

কোনো রকমে যে তোমার দিন চলে এটা কিন্তু তোমার মুখ দেখলে মনে হয় না হেকমত। মনে হয় তুমি বেশ সুখেই আছ।

হেকমত আবার হাসল। সুখে তো আছিই সাহেব, ম্যালা সুখে রাখছে আল্লায়। কোনো অসুখ-বিসুখ নাই, ঝুট-ঝামেলা নাই। কোনোদিন পেড ভইরা খাইলাম, কোনোদিন খাইলাম না, হাড়ভাঙ্গা খাটনির কাম করি, বিছানা বালিশ লাগে না, শুইলেই ঘুমাইয়া যাই, এইডাই তো সুখ।

হেকমতের কথা শুনে বেশ অবাক হলো কাজল। বাহ্, সুন্দর কথা বললে তো তুমি। আসলেই সুখ যার যার নিজের কাছে। মন পরিষ্কার থাকলে যেকোনো মানুষ সুখী হতে পারে।

একটু থেমে কাজল বলল, বাড়ি পৌঁছাতে আর কতক্ষণ লাগবে হেকমত?

আরও আধাঘণ্টার ওপরে লাগব।

বলো কী!

কাজল বেশ হতাশ হলো। তারপর আবার সিগ্রেট বের করল। সিগ্রেট ধরিয়ে বলল, অভ্যাস আছে নাকি?

জি আছে।

খাবে একটা?

না সাহেব।

কেন?

এত দামি সিগ্রেট খামু না। আমার কাছে বিড়ি আছে, সেইটাই খাই।

কোচড় থেকে বিড়ি বের করে ধরাল হেকমত। বলল, গেরামে কয়দিন থাকবেন সাহেব? 

দশ-পনেরো দিন।

সিগ্রেট বেশি কইরা লইয়াছেন?

দু প্যাকেট এনেছি। কেন বলো তো?

দিনে কয়ডা সিগ্রেট খান?

এক প্যাকেট লাগে।

দুই প্যাকেটে তাইলে দুই দিন যাইব। তারবাদে খাইবেন কী?

কেন, সিগ্রেট পাওয়া যাবে না?

এই সিগ্রেট পাওয়া যাইব না।

হেকমতের কথা শুনে কাজল একেবারে স্তব্ধ হয়ে গেল। সিগ্রেট ছাড়া সে থাকবে কী করে? চিন্তিত গলায় বলল, এদিককার বাজারে বিদেশি সিগ্রেট পাওয়া যায় না?

না। এত দামি সিগ্রেট গেরাম অঞ্চলের মানুষ খায় না। তারা খায় অল্প দামি সিগ্রেট। সেই সিগ্রেট পাওয়া যায়। আপনের বেশি কইরা সিগ্রেট নিয়া আসন উচিত আছিল। আপনে ভুল করছেন সাহেব।

কাজল চিন্তিত চোখে হেকমতের দিকে তাকিয়ে রইল।

 

তিন

নীল ডুরে শাড়ি পরা কে একজন এসে ঢুকল বড় ঘরে।

হাজেরা বেগম আনমনা ভঙ্গিতে শুয়েছিলেন পালঙ্কে, ঠিক বুঝতে পারলেন না কে ঢুকল। চোখে ভালো দেখতে পান না তবু তীক্ষ চোখে তাকালেন মানুষটির দিকে। উতলা গলায় বললেন, কে, কে রে ঢুকল ঘরে?

মানুষটি পেছন ফিরে দাঁড়িয়ে ছিল। এবার মুখ ফেরাল। ঝাঁঝাল গলায় বলল, তুমি কি একেবারেই অন্ধ হয়ে গেছ! আমাকে পর্যন্ত চিনতে পার না।

হাজেরা বেগম ফোকলা মুখে হাসলেন। ও টগর! বুঝতে পারিনি যে তুই এসেছিস।

অমন রাগ দেখিয়ে চলে গেলি, তারপর যে আবার আসবি একথা কে ভাবে বল!

টগর খুবই অবাক হলো। রাগ দেখিয়ে আবার কখন গেলাম!

ওই যে তখন।

রাগ দেখিয়ে যাইনি তো! তুমি বলেছ থাকতে, আমি থাকিনি।

তাহলে এখন আবার এলি কেন?

তোমার জন্য।

হাজেরা বেগমের পাশে পালঙ্কে বসল টগর। বাড়ি গিয়ে গোসল করতে করতে ভাবলাম সকাল থেকে এত কাজ করে দিলাম ফুফুর, শেষ পর্যন্ত অমন করে চলে এলাম! এত অনুরোধ করল ফুফু, শেষ কাজটাও করে দিয়ে আসি। এজন্য এলাম। আমি আসলে তোমাকে খুব ভালোবাসি ফুফু। তোমার সঙ্গে ঝাঁঝাল গলায় কথাটথা বলি ঠিকই, কিন্তু তোমার জন্য আমার খুব মায়াও লাগে। শুধু তোমার জন্য নয়, সব মানুষের জন্যেই আমার মায়া একটু বেশি।

তারপরই যেন হঠাত্ মনে পড়েছে এমন স্বরে টগর বলল, কিন্তু তোমার বোনপো কই?

হাজেরা বেগম বললেন, এখনো এল না তো! দেখ তো কী কাণ্ড!

ক’টার লঞ্চে আসার কথা?

সকালের লঞ্চে।

তাহলে সাড়ে বারোটা-একটায় আলমপুর এসে পৌঁছার কথা। সেখান থেকে নৌকোয় এক-দেড় ঘণ্টা। এই হিসেবে অনেক আগেই বাড়ি চলে আসার কথা। এখনো আসছে না কেন? কাকে পাঠিয়েছ আনতে?

হেকমতকে।

সর্বনাশ করেছ। হেকমত নৌকো বায় জমিদারি চালে। শুধু বিড়ি খায় আর উদাস হয়ে এদিকে তাকিয়ে থাকে। তোমার বোনপোর আজ আসতে দেখবে বিকেল হয়ে গেছে। ধুত্, বাড়ি থেকে খেয়ে এলেই পারতাম।

তোর কি খিদে লেগেছে?

লাগবে না! দুপুর শেষ হয়ে গেল।

তুই তাহলে খেয়ে নে মা।

হ্যাঁ, আমি এখন খেতে বসি আর তোমার বোনপো এসে উঠুক।

এলে আসবে, তোর অসুবিধা কী!

অসুবিধা আছে। ঘরে ঢুকে দেখবে একটা ধিঙ্গি মেয়ে বসে গপগপ করে ভাত খাচ্ছে! ছি! আমার লজ্জা করবে।

হাজেরা বেগম আবার হাসলেন। তোর যে কতপদের লজ্জা!

বা রে মেয়েদের এরকম লজ্জা থাকবে না!

তাহলে এখন কী করবি, না খেয়ে বসে থাকবি?

বসে তো থাকতেই হবে। তুমি খেয়েছ ফুফু?

না।

তোমার খিদে পায়নি?

না, কি খিদে পাবে?

আচ্ছা শোন, তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করি তোমার তো অনেক বয়স হয়ে গেছে, বুড়ো হয়ে গেছ তুমি, বুড়ো হলে কি খিদে কমে যায়? বুড়ো মানুষরা কি অনেকক্ষণ না খেয়ে থাকতে পারে?

না। খিদে সবসময় এক রকমই থাকে মানুষের। খিদে কখনো বুড়ো হয় না। খিদের কখনো বয়স বাড়ে না।

এ কথায় টগর হঠাত্ করে উদাস হয়ে গেল। পালঙ্কের খোলা জানালা দিয়ে বারবাড়ির দিকে তাকিয়ে রইল সে। গোসল করার পর বেশ সতেজ লাগছে টগরকে। শ্যামলা মিষ্টি মুখখানি আরও মিষ্টি দেখাচ্ছে। নীল চমত্কার ডুরে শাড়ি পরেছে, পিঠময় ছড়ান লম্বা ঘন কালো চুল এখনো পুরোপুরি শুকোয়নি। কেমন ভেজা ভেজা। এই ভেজা চুল যেন আরও সুন্দর করে তুলেছে টগরকে। টগরের নাকে কোনো নথ নেই। ডানপাশের নাকে ছোট্ট ছিদ্র কেন যেন বেশ চোখে পড়ে। বোধহয় নথ নেই বলে।

হাজেরা বেগম তাকিয়ে ছিলেন টগরের দিকে। খানিক তাকিয়ে থাকার পর মেয়েটির জন্য আশ্চর্য এক মমতায় মন ভরে গেল তাঁর। শীর্ণ হাত বাড়িয়ে টগরের একটা হাত ধরলেন তিনি। তুই খেয়ে নে মা। অযথা কষ্ট করিস না।

টগর হাসিমুখে ফুফুর দিকে তাকাল। তুমিও তো কষ্ট করছ।

আমার কষ্ট কষ্ট না রে মা। আনন্দ। আমি তো একজনের জন্য অপেক্ষা করছি।

অপেক্ষা আমিও করছি।

তোর কিসের অপেক্ষা! তুই তাকে চিনিস নাকি! কখনো দেখেছিস?

না দেখিনি। তবে তোমার মুখে এত গল্প শুনেছি, শুনতে শুনতে একেবারে মুখস্থ করে ফেলেছি। এবার সামনাসামনি মিলিয়ে দেখব তোমার গল্পের সঙ্গে তার কতটা মিল।

সবই মিলে যাবে দেখবি।

তারপর একেবারেই অন্যরকম একটি কথা বলল টগর। ফুফু, আমার মনে হয় কি জান, তোমার নিজের যদি ছেলেমেয়ে থাকত তাহলে এই বোনপোর জন্য এত টান তোমার থাকত না।

হাজেরা বেগম হাসিমুখে বললেন, ঠিক বলিসনি। কাজলের জন্য টান আমার থাকতই। ওকে আমি নিজের ছেলের মতো করেই রেখেছিলাম।

কতদিন ছিল তোমার কাছে?

আট বছর।

এতদিন মা-বাবাকে ফেলে কেন সে তোমার কাছে পড়ে ছিল?

ওরা অনেকগুলো ভাইবোন। ওর মা একা সব সামলাতে পারত না, এই জন্য কাজলকে দিয়ে দিয়েছিল আমার কাছে। কাজল তখন ক্লাস থ্রিতে পড়ে। তোর ফুফা চাকরি করতেন খুলনায়। আমরা খুলনায় ছিলাম। সেখানকার স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিয়েছিলাম কাজলকে। আমাদের ওখানে থেকে ম্যাট্রিক পাস করে সে। তারপর মা-বাবার কাছে চলে যায়। তবে তিন বছর ঢাকায় ছিল সে। তারপরই তো আমেরিকায় চলে যায়। আইএ পাস করার পর।

আমেরিকায় গিয়েছিল কেন?

পড়াশুনা করতে।

সেই পড়াশুনো এতদিনে শেষ হলো?

না, অনেক আগেই শেষ হয়েছে।

তাহলে এতদিন দেশে আসেনি কেন?

কে জানে কেন।

আমেরিকায় বিয়েশাদি করেনি তো?

হাজেরা বেগম হাসলেন। আরে না, কাজল অমন ছেলে নয়।

এ কথায় টগর একেবারে মুখিয়ে উঠল। বিয়ে করলে কেউ খারাপ ছেলে হয়ে যায়?

না, তা হবে কেন? তবে আমি বেঁচে থাকতে আমাকে না বলে কাজল কখনো বিয়ে করবে না। আমি যেমন কাজলের জন্য পাগল কাজলও তেমন আমার জন্য।

তাহলে সে যখন এতদিন পর এল তুমি ঢাকায় গেলে না কেন?

আমার শরীরের অবস্থা তো তুই দেখছিসই। এই শরীর নিয়ে কেমন করে চলাফেরা করব আমি? এজন্যই তো এই গ্রামে আমার কাছে এসে এত দিন থেকে যাবে কাজল। কিন্তু তুমি এই অজ পাড়াগাঁয়ে কেন পড়ে আছ ফুফু? তোমার ছেলেমেয়ে নেই, স্বামী নেই, একা মানুষ, কেন এতবড় একটা বাড়িতে পড়ে আছ?

আমি না থাকলে এইসব দেখবে কে বল! এত জায়গা সম্পত্তি বাড়িঘর কাক চিলে খাবে।

খেতে তুমি দেবে কেন? সব বিক্রি করে ঢাকায় তোমার বোনের ওখানে চলে যাবে।

স্বামীর ভিটেমাটি কেউ বিক্রি করে, বল? প্রতিটি মেয়েই চায় স্বামীর ভিটেয় বসবাস করতে, স্বামীর ভিটেয় মরতে।

হাজেরা বেগমের কথা শুনতে শুনতে উদাস হয়ে গেল টগর। জানালা দিয়ে আবার তাকাল বারবাড়ির দিকে। ঠিক তখুনি ব্যাগ হাতে হেকমত মাঝি আর তার পিছু পিছু সাহেবের মতো ঝকঝকে একজন মানুষ এসে ঢুকল বাড়িতে। তাকে দেখে উত্তেজনায় উঠে দাঁড়াল টগর। চাপা গলায় বলল, ওই তো তোমার বোনপো এসে গেছে ফুফু। 

 

চার

ঘরে ঢুকে কোনোদিকে তাকাল না কাজল। পালঙ্কে বসা হাজেরা বেগমকে দু হাতে জড়িয়ে ধরল। শিশুর মতো অবোধ গলায় বলতে লাগল, সোনাখালা, ও সোনাখালা এই যে দেখ আমি তোমার কাছে ফিরে এসেছি। এই যে দেখ।

হাজেরা বেগমও দু হাতে জড়িয়ে ধরেছেন কাজলকে। কোন ফাঁকে জলে চোখ ভরে গেছে। উদ্গত কান্নায় বুজে গেছে গলা। পাগলের মতো কাজলের পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে জড়ানো গলায় তিনি বলতে লাগলেন, ওরে আমার সোনা রে, ওরে আমার মানিক রে! এতদিন পর খালার কাছে তুই ফিরে এলি!

অদূরে দাঁড়িয়ে এই দৃশ্য দেখে চোখ ছলছল করে উঠল টগরের। অদ্ভুত এক আবেগে বুক ভরে গেল।

হেকমত মাঝি ব্যাগ হাতে দাঁড়িয়ে আছে বাইরে। টগর একবার তার দিকে তাকাল। তারপর এগিয়ে গিয়ে ব্যাগটা হেকমতের হাত থেকে নিল।

হেকমত বলল, আমি তাইলে যাই এখন?

টগর নিচুগলায় বলল, ভাড়া নিয়েছ?

না।

তাহলে একটু দাঁড়াও, ভাড়াটা নিয়ে যাও।

টগর এবং হেকমতের কথা কানে গেছে খালা বোনপো দুজনেরই। খালাকে ছেড়ে প্যান্টের পকেটে হাত দিয়েছে কাজল, মানিব্যাগ বের করবে, হাজেরা বেগম চোখ মুছতে মুছতে বললেন, এখন যা হেকমত। ভাড়া পরে নিস।

হেকমত কথা বলার আগেই কাজল বলল, পরে নেবে কেন? এক্ষুনি নিয়ে যাক। ভাড়া কত?

আমি জানি না। ও হেকমত, ভাড়া কত রে তোর?

হেকমত বিনীত গলায় বলল, দেন আপনাদের যা মনে চায়। আপনাদের কাছ থেকে ভাড়া চেয়ে নেব নাকি! কোনোদিন নিয়েছি?

মানিব্যাগ থেকে পঞ্চাশ টাকার একটা নোট বের করে হেকমতের হাতে দিল কাজল। চলবে না?

জি চলবে। কিছু বেশিই দিয়েছেন।

কাজল হেসে বলল, বেশি দিয়ে থাকলে ওটা তোমার বখশিস।

বখশিসের কথায় হেকমতও হাসল। ঠিক আছে।

তারপর দ্রুত হেঁটে বারবাড়ির দিকে চলে গেল। ঠিক তখুনি টগরকে দেখতে পেল কাজল, কী রকম চোখ করে তার দিকে তাকিয়ে আছে। বেশ অবাক হলো সে। মেয়েটি কে?

কিন্তু কথাটা খালাকে জিজ্ঞেস করল না কাজল। অদ্ভুত ছটফটে গলায় বলল, তাড়াতাড়ি খেতে দাও খালা, খিদেয় একেবারে মরে গেলাম।

হাজেরা বেগম বললেন, জামাকাপড় ছাড়, হাত মুখ ধো, তারপর খেতে বস।

না, ওসব এখন করতে পারব না। আগে খেয়ে নিই, তারপর।

হাজেরা বেগম হাছড় পাছড় করে পালঙ্ক থেকে নামলেন। তুই একেবারে আগের মতোই আছিস বাবা। একটুও বদলাসনি।

তারপর টগরের দিকে তাকালেন তিনি। ও টগর, তাড়াতাড়ি সব রেডি কর মা। দেখছিস না খিদেয় কেমন ছটফট করছে!

ঘরের মেঝেতে ততক্ষণে পাটি বিছিয়েছে টগর। নিজে বসে গেছে হাঁড়িকুড়ির সামনে। পুরোনো আমলের রেকাবি জগ গ্লাস পেয়ালা পিরিচ চটপটে হাতে সাজাচ্ছে এখন। একটা পেতলের চিলমচি রেখেছে সামনে, কাজল হাত ধোবে। যেন চোখের পলকে সব তৈরি হয়ে গেল।

তারপরই প্রথমে চিকন চালের মুক্তোদানার মতো ভাত বেড়ে দিল পুরোনো আমলের চিনেমাটির তৈরি সুন্দর কারুকাজ করা একটি গামলায়। ভাত তোলার বড় চামচ দিল এবং ছোট-বড় নানারকম পেয়ালায় নানারকমের তরকারি। কোনো মানুষ যে এরকম চটপটে হাতে এত নিখুঁতভাবে এসব কাজ করতে পারে আজকের আগে কোনোদিন কাজল তা দেখেনি। সে খুবই অবাক হলো। কয়েক মুহূর্ত টগরকে দেখে খালার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল, মেয়েটি কে খালা?

হাজেরা বেগম হাসলেন। ও তো টগর। তুই চিনিস না?

আমি কী করে চিনব! আমি কি তোমাদের গ্রামে কখনো এসেছি!

তা-ই তো! তুই টগরকে কী করে চিনবি? তুই তো এখানে কখনো আসিসনি। তুই আমার কাছে ছিলি খুলনায়।

টগর তোমাদের কী হয়?

অত কথা এখন বলা যাবে না। তুই খেতে বস।

কাজল প্রায় সঙ্গে সঙ্গে আসন করে পাটিতে বসল। খালাকে হাত ধরে বসাল তার পাশে। তুমি খেয়েছ খালা?

না।

কেন? এতবেলা পর্যন্ত না খেয়ে আছ কেন?

তুই আসবি সেই অপেক্ষায় আছি। তোকে রেখে আগে খেয়ে ফেলব?

ইস করেছ কী! তাড়াতাড়ি আমার সঙ্গে খেতে বসো।

অন্য একটা রেকাবি নিয়ে খালার সামনে রাখল কাজল।

হাজেরা বেগম বললেন, তুই আগে খেয়ে নে বাবা, আমি পরে খাব।

পরে খাবে কেন?

টগরও তো খায়নি, টগর আর আমি পরে খাব।

কাজলের রেকাবিতে ভাত তুলে দিতে লাগলেন হাজেরা বেগম।

কাজল বলল, তোমরা দুজনই আমার সঙ্গে বসে যাও না। সব খাবার বাড়া আছে, শুধু প্লেট নিলেই হলো।

তারপর টগরের দিকে তাকাল কাজল। এই যে শুনুন, এতক্ষণ না খেয়ে থাকা ঠিক নয়। প্লেট নিন, আমার সঙ্গে খেতে বসে যান।

এ কথায় খিলখিল করে হেসে উঠল টগর। তারপর মুখে আঁচল চাপা দিয়ে হাসতে লাগল। টগরের হাসিতে খালা বোনপো দুজনেই খুব অবাক হলো। বোকা বোকা মুখ করে কাজল বলল, এতে হাসির কী হলো?

টগর তবু থামে না, মুখে আঁচল চেপে হাসতেই থাকে।

হাজেরা বেগম বললেন, কী হলো রে টগর! হাসছিস কেন?

হাসতে হাসতে টগর বলল, ও ফুফু, তোমার বোনপো আমাকে আপনি করে বলে গ! 

এবার কাজল হাসল। চিলমচিতে হাত ধুতে ধুতে বলল, অচেনা মানুষদের সঙ্গে প্রথমে আপনি আপনিই করতে হয়।

সঙ্গে সঙ্গে টগর বলল, অচেনা মানুষকে সঙ্গে বসে খেতে বলে কী করে?

সে ভদ্রতা করে বলা যায়।

যে মানুষটি সামনে বসে খাওয়াচ্ছে, ভাত তরকারি বেড়ে দিচ্ছে, অচেনা হলেও বয়সে যদি সে ছোট হয় তাকে তুমি করে বলা যায়।

কাজল খেতে খেতে বলল, খালা, তোমার টগর তো দেখি বেশ মুখরা। গ্রামের মেয়েরা এমন হয়!

হাজেরা বেগম কথা বলবার আগেই কাজলের চোখের দিকে তাকাল টগর। কিছু একটা বলতে যাবে কিন্তু বলতে পারল না। কাজল অপলক চোখে তাকিয়ে আছে তার দিকে। নিজের অজান্তে টগরও তাকিয়ে রইল কাজলের দিকে। কয়েক মুহূর্ত কেটে গেল এই ভাবে। তারপরই ব্যস্ত ভঙ্গিতে চোখ সরিয়ে নিল টগর। অন্য কাজে ব্যস্ত হয়ে গেল। কিন্তু বুকের ভেতর তার কী রকম যেন করছে তখন। বিকেল প্রায় হয়ে গেছে। সেই কোন দুপুরে খিদে লেগেছে কিন্তু এখনো খাওয়া হয়নি কিছু, তবু খিদেটা এই মুহূর্তে আর টের পেল না টগর। কি রকম অবশ লাগছে তার শরীর। একেবারেই অচেনা একটি অনুভূতি। এমন লাগছে কেন টগরের? কিছুতেই আর কাজলের দিকে তাকাতে পারছে না কেন সে!

হাজেরা বেগম বললেন, ও কাজল, তুই এবার কতদিন থাকবি দেশে?

খেতে খেতে খালার দিকে তাকাল কাজল। কতদিন থাকলে খুশি হও তুমি?

আমি তো চাই কোনোদিনও আর বিদেশে যাসনে তুই। সব সময়ই দেশে থাক।

এবং তোমার কাছে, না?

হাজেরা বেগম একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তা তো চাইই। কিন্তু আমার কপাল কি তেমন! আমি কি চিরকাল তোকে আমার কাছে ধরে রাখতে পারব!

কাজল বুঝে গেল পরিবেশটা এখুনি বেশ গম্ভীর হয়ে যাবে। খালা হয়তো চোখ মুছতে শুরু করবেন। খেতে বসে কান্নাকাটি দেখা যায় না। পরিবেশটা হালকা করার জন্য কাজল বলল, তবে এবার ইচ্ছে করলে অনেকদিন আমাকে তুমি তোমার কাছে রাখতে পারো।

হাজেরা বেগম উত্সাহী গলায় বললেন, কী করে?

আমি আমেরিকার সিটিজেন হয়ে গেছি। এখন ইচ্ছে করলে বছরে এগারো মাস আমি দেশে থাকতে পারি, এক মাস শুধু আমেরিকায়। ওই এগারো মাস আমি তোমার কাছে রইলাম। তবে এই অজ পাড়াগাঁয়ে থাকতে পারব না। ঢাকায় গিয়ে আমাদের বাড়িতে তোমায় থাকতে হবে।

তারপর একটু থেমে কাজল বলল, তোমার সঙ্গে আমার অনেক কথা আছে খালা।

কী কথা রে?

বলব বলব। খেয়ে নিই, দাঁড়াও।

খালা বোনপো কথা বলছে, সেই ফাঁকে টগর আবার তাকিয়েছে কাজলের দিকে। তাকিয়ে আবার মনের ভেতরটা কী রকম হয়ে গেছে তার। তখুনি কাজলও তাকাল তার দিকে। সঙ্গে সঙ্গে চোখ ফিরিয়ে নিল টগর। ব্যস্ত ভঙ্গিতে হাঁড়িকুড়ি নাড়াচাড়া করতে লাগল। তারপর হাজেরা বেগমকে বলল, শুধুই তো গল্প করছ, পাতে যে কিছু নেই সেদিকে খেয়াল করছ না। তুলে দাও।

হাজেরা বেগম চমকালেন। তা-ই তো! ও কাজল, পাতে তো কিছু নেই বাবা। ওই মাছটা নে, না হয় মুরগির মাংস নে। আর একটু ভাত নে।

কাজল একেবারে হা হা করে উঠল। আরে না না, আর খেতে পারব না। পেট একদম ভরে গেছে।

এইটুকু খেয়ে?

এইটুকু কই? প্রচুর খেয়েছি।

কই প্রচুর খেলি? সবই তো রয়ে গেছে। আর খেলি কখন, আমি তো দেখতে পেলাম না!

ঢক ঢক করে পানি খেল কাজল। তারপর শিশুর মতো নির্মল মুখ করে হাসল। তুমি দেখবে কী করে? তুমি তো আমার সঙ্গে কথা বলছিলে। কথা বলার সময় অনেক কিছুই দেখা যায় না।

এক পলক কাজলের দিকে তাকাল টগর, তারপর তাকাল হাজেরা বেগমের দিকে। ঝাঁঝাল গলায় বলল, সকাল থেকে আমাকে দিয়ে রান্না করিয়েছ ফুফু, এত সব রান্না করেছি আর কিছুই তার খাওয়া হচ্ছে না, তুমি তাহলে আমাকে এত খাটালে কেন?

হাজেরা বেগম কথা বলবার আগেই কাজল বলল, এসব রান্না আপনি করেছেন? বাহ্ আপনি তো খুব কাজের মেয়ে। রান্না চমত্কার হয়েছে। যা খেয়েছি এরচে’ বেশি খেলে, আপনার রান্নার যে স্বাদটা মুখে লেগে আছে তা নষ্ট হয়ে যাবে।

কাজল তাকে আবার আপনি আপনি করছে শুনে মাত্র হাসতে যাবে টগর, তার আগেই উঠোনে দাঁড়িয়ে টগরের ছোটবোন বুলবুলি ডাকল, বুবু বুবু, বাবা ডাকছে। তাড়াতাড়ি এস।

বুলবুলির গলা শুনে ছটফটে ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়াল টগর। হাজেরা বেগমের দিকে তাকিয়ে বলল, আমি যাই ফুফু, বাবা ডাকছে।

হাজেরা বেগম খুবই অবাক হলেন। সে কী রে! খেয়ে যাবি না?

না। দেরি হলে বাবা রাগ করবে!

কত আর দেরি হবে! খেয়ে যা মা। দরকার হলে আমি তোর বাবাকে বলব।

না থাক। কী দরকার ঝামেলা করার!

মুহূর্তের জন্য কাজলের দিকে তাকাল টগর, তারপর দৌড়ে বেরিয়ে গেল।

খালার দিকে তাকিয়ে কাজল বলল, এভাবে চলে গেল কেন?

হাজেরা বেগম বললেন, ওর বাবা ডাকছে।

বাবাকে খুব ভয় পায় মনে হয়?

বাবার চে’ ভয়টা বেশি পায় মাকে। সত্মা তো!

সত্মা?

হ্যাঁ, টগরকে খুব ছোট রেখে ওর মা মারা যায়। বাপ তারপর বিয়ে করেছে। সত্মা টগরকে একদম দেখতে পারে না। এজন্য সারাক্ষণই আমার কাছে পড়ে থাকে মেয়েটি।

তোমাকে দেখি ফুফু বলে! কেমন ফুফু হও তুমি?

ওর বাবা আমাকে বোন ডাকে, সেই হিসেবে টগর ডাকে ফুফু। কোনো আত্মীয় নয়।

তারপর বেশ চিন্তিত গলায় হাজেরা বেগম বললেন, আহা রে, মেয়েটার আজ আর খাওয়াই হবে না! বিকেল হয়ে গেছে, এসময় কি আর ভাতটাত আছে ওদের বাড়িতে! থাকলেও তো খেতে বসতে পারবে না। সত্মা তাহলে রাগারাগি করবে। তারা তো ধরেই নিয়েছে টগর আমার বাড়িতে খাবে।

খালার কথা শুনে কাজলও বেশ মন খারাপ করল। এটা খুব খারাপ হলো। সকাল থেকে এই বাড়িতে বসে এত রান্নাবান্না করল আর তার নিজেরই খাওয়া হলো না!

তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছে পালঙ্কে উঠে বসল কাজল। বসে টের পেল একসঙ্গে দুটো ব্যাপার হচ্ছে তার। প্রথমত, খুব সিগ্রেট খেতে ইচ্ছে করছে, দ্বিতীয়ত, চোখ বেশ টানছে। ক্লান্ত লাগছে এবং ঘুম পাচ্ছে। খালার এই পালঙ্কে শুয়ে ঘুমটা না হয় দিতে পারল কাজল, কিন্তু খালার সামনে সিগ্রেট খেতে পারবে না।

কাজল বলল, খালা, আমি কি এই ঘরেই থাকব নাকি?

হাজেরা বেগম তখন থালাবাসন গোছগাছ করছেন। সেই অবস্থায়ই বললেন, না। তোর জন্য তো দক্ষিণের পাটাতন ঘরটা গুছিয়ে রাখা হয়েছে।

সঙ্গে সঙ্গে উঠল কাজল। আমি তাহলে ওই ঘরে যাই, কাপড় চোপড় ছেড়ে একটু রেস্ট নিই। ঘুমিয়ে পড়লে সন্ধ্যার দিকে তুমি আমাকে ডেকে দিও।   

 

পাঁচ

খাওয়া দাওয়া সেরে দাওয়ায় বসে তামাক খাচ্ছেন মতি মিয়া।

এসময় ব্যস্ত ভঙ্গিতে বাড়ি ঢুকল বুলবুলি এবং টগর। মুখটা কেমন শুকনো শুকনো দেখাচ্ছে টগরের। পাশাপাশি বেশ একটা ভয়ের ছায়াও আছে মুখে। একপলক বাবার দিকে তাকিয়ে মাথা নিচু করল সে। মৃদু গলায় বলল, ডেকেছ বাবা?

তামাক টানা বাদ দিয়ে মেয়ের দিকে তাকালেন মতি মিয়া। কোথায় ছিলি এতক্ষণ?

ফুফুর বাড়ি।

সারাক্ষণ ওই বাড়িতে কী রে তোর?

ফুফুর বোনপো এসেছে ঢাকা থেকে, ফুফু একা কিছু পারে না, কাজের ঝিটারও রান্নাবান্না ভালো না, এজন্য সকাল থেকে ওই বাড়িতে ছিলাম আমি। ফুফুর রান্নাবান্না করে দিলাম।

মতি মিয়া এবং টগরের অদূরে কখন এসে দাঁড়িয়েছেন টগরের সত্মা খোদেজা, টগর কিংবা মতি মিয়া কেউ তা খেয়াল করেনি। খোদেজার কথায় দুজনেই তা টের পেল, প্রায় একইসঙ্গে তাকাল খোদেজার দিকে।

মুখ ঝামটে খোদেজা বলল, নিজেদের বাড়ির এত কাজ পড়ে আছে সেদিকে খেয়াল নেই। সকাল থেকে সে পড়ে আছে ফুফুর বাড়ি। ফুফুর বোনপো আসবে, তার রান্নাবান্না করে দিচ্ছে। কোন বাড়িতে কে আসবে না আসবে তাতে তোর কী রে? কেমন ফুফু হয় তোর যে সারাক্ষণ ওই বাড়িতে গিয়ে পড়ে থাকতে হবে? তাও যদি আপন কেউ হতো না হয় গিয়ে পড়ে থাকতি।

টগর কথা বলবার আগেই মতি মিয়া মিনমিনে গলায় বলল, এটা তুমি আবার ঠিক বললে না বুলবুলির মা।

খোদেজা সঙ্গে সঙ্গে মুখ ঝামটালো। ঠিক বলব না কেন? হাজেরা বুবু কি তোমাদের রক্ত সম্পর্কের কেউ?

না, তা নয়। রক্ত সম্পর্কের না হয়েও কোনো কোনো মানুষ আপন আত্মীয়ের চে’ বেশি আপন হয়। আত্মীয় মানে হচ্ছে আত্মার সঙ্গে যার সম্পর্ক। রক্ত সম্পর্কের চে’ আত্মার সম্পর্ক অনেক বেশি খাঁটি, অনেক বেশি মূল্যবান।

এত বড় বড় কথা বলবার দরকার নেই। বড় বড় কথা ছাড়া তোমার আর কিছু নেই।

কথাটা বুঝতে পারল না মতি মিয়া। বলল, কী নেই?

কী আছে বলো? জায়গাজমি টাকাপয়সা ব্যবসা-বাণিজ্য।

জায়গাজমি থাকবে না কেন? যা আছে ভালো ফসল হয়, বছর চলে যায় আমাদের। টাকাপয়সা তেমন নেই মানলাম, ব্যবসা-বাণিজ্য নেই মানলাম, কিন্তু আমি একটা লেখাপড়া জানা লোক। ম্যাট্রিক পাস করেছি। এলাকার সবচেয়ে নামকরা বড় লোকের আড়তে হিসাব কিতাবের চাকরি করি। কিছু নেই মানে কী? আমরা তো আর পথের ফকির নই!

যা আছে গল্প তার চে’ অনেক বেশি তোমার।

টগরের পাশে আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বুলবুলি। দুজনেই তারা বুঝে গেছে মা-বাবার ঝগড়াটা আস্তে ধীরে বাড়বে এখন। সুতরাং এখানে থাকা তাদের ঠিক হবে না।

আলতো করে টগরকে একটা চিমটি দিল বুলবুলি। মুখ ঘুরিয়ে বুলবুলির দিকে তাকাল টগর। বুলবুলি চোখ ইশারায় বোঝাল, চল এখান থেকে যাই। এখানে থাকা ঠিক হবে না।

মাত্র পা বাড়িয়েছে দুজন, খোদেজা গম্ভীর গলায় বলল, বুলবুলি, তুই যা। টগর থাক। টগর বুঝে গেল আজ তার ওপর দিয়ে বেশ একটা ঝড়-ঝাপটা যাবে। ভয়ে সিটিয়ে গেল সে।

বুলবুলি একবার টগরের দিকে তাকাল, তারপর আস্তে ধীরে হেঁটে ঘরে ঢুকে গেল।

খোদেজা বলল, তোমার মেয়েকে জিজ্ঞেস করো জীবন এভাবে চলবে কি-না।

কথাটা বুঝতে পারল না মতি মিয়া। তিনি তামাক খাচ্ছিলেন হাতাওয়ালা একটা চেয়ারে বসে। তামাকটা বোধহয় শেষ হয়ে গেছে, ধোঁয়া উঠছিল না। নলটা হুঁকোর গায়ে প্যাঁচ দিয়ে ফ্যাল ফ্যাল করে স্ত্রীর মুখের দিকে তাকালেন তিনি। এভাবে নয় তো কীভাবে চলবে?

এবার খোদেজা একেবারে তেলে বেগুনে জ্বলে উঠল। এতবড় একটা ধিঙ্গি মেয়ে ফ্যা ফ্যা করে সাড়া পাড়া চড়ে বেড়াবে, বাড়ির কোনো কাজ করবে না, সংসারের দিকে তাকাবে না, বাপ হয়ে তুমি আবার তা মেনে নিচ্ছ। কেমন বাপ তুমি?

এবার খুবই নরম গলায় টগর বলল, আমি পাড়া বেড়াই না। ফুফুর বাড়ি ছাড়া অন্য কোথাও আমি যাই না।

তুমি চুপ করো। তুমি আমার সামনে দাঁড়িয়ে কখনো কথা বলবে না।

আবার স্বামীর দিকে তাকাল খোদেজা। আমি কোনো কথা বললে তুমি ভাববে সত্মা বলে আমি সারাক্ষণ তোমার মেয়ের পেছনে লেগে আছি, তোমার মেয়েকে নিয়ে কথা বলছি। কিন্তু তুমি ভেবে দেখো তো, যেভাবে সে চলছে, এভাবে কতদিন চলবে? বয়স হচ্ছে না! গ্রামের মেয়েদের জীবন এভাবে চলতে পারে! ঝোঁকের মাথায় ওখান থেকে না হয় চলে এসেছে সে, তাই বলে ওখানে আর কোনোদিনও ফিরে যাবে না, এটা হয় নাকি? পুরুষমানুষ কত রকম হয়, তাদের ঠিক করা মেয়েদের দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব না নিয়ে দূরে সরে থাকলে হবে?

এসব কথা শুনতে শুনতে রাগে ক্রোধে চোখ ফেটে কান্না এল টগরের। খোদেজার মুখের দিকে তাকিয়ে চাপা গলায় সে বলল, আমার আপন মা হলে এমন কথা তুমি বলতে পারতে না।

খোদেজা সঙ্গে সঙ্গে বললেন, এই এক অছিলা পেয়েছ। ভালো কথা বললেও সত্মার দোষ, খারাপ কথা বললেও সত্মার দোষ।

এটা কোনো ভালো কথা হলো! আমার জায়গায় যদি বুলবুলি হতো তুমি কি তাকে কখনো আর ওখানে পাঠাতে? তুমিও তো একটি মেয়ে। তুমি নিজে হলে কখনো যেতে?

খোদেজা বেশ থতমত খেল। মুখে খানিক্ষণ কোনো কথা জুটল না তার। নির্বিকারভাবে দুজনেরই কথা এতক্ষণ ধরে শুনে যাচ্ছিলেন মতি মিয়া। দুজনেই থেমে গেছে দেখে এখন কথা বললেন তিনি। ঠিক আছে, ঠিক আছে, এসব নিয়ে আর কথা বলবার দরকার নেই। যা হওয়ার হয়ে গেছে। ওরা যদি আমার কাছে আসে আমি কথাটথা বলে দেখব। ছেলেটি যদি ঠিক হয় তো হলো, না হলে টগরকে আমি ছাড়িয়ে নেব। অন্য জায়গায় বিয়ে দেবো।

বিয়ের কথা শুনে এক মুহূর্ত আর ওখানে দাঁড়াল না টগর। ছটফটে ভঙ্গিতে ঘরে গিয়ে ঢুকল। তবে কান পেতে রাখল বাইরের দিকে মা-বাবা দুজনের কথাই যেন শুনতে পায়।

খোদেজা বললেন, একবার বিয়ে হওয়া মেয়ে বিয়ে দেয়া এত সোজা?

মতি মিয়া সরল গলায় বললেন, বিয়ে হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সংসার তো করেনি।

সংসার না করুক, শ্বশুরবাড়ি তো গিয়েছে, স্বামীর সঙ্গে থেকেছে, বাসররাত কাটিয়েছে।

বাজে কথা বলো না। বাসররাত কাটাল কোথায়? তুমি জান না সব?

আমি জানলেই কী না জানলেই কী? লোকে কি বিশ্বাস করবে?

লোকের বিশ্বাস অবিশ্বাসে কিছু যায় আসে না।

এবার আবার মুখ ঝামটালেন খোদেজা। এত বড় কথা বলো না। লোকের বিশ্বাস অবিশ্বাসে যাবে আসবে না কেন? মেয়ের আবার বিয়ে দিতে হলে লোকের সঙ্গে কথা বলতে হবে না!

একটু থেমে খোদেজা বললেন, তোমার মেয়ে নিয়ে আমার অবশ্য তেমন মাথাব্যথা নেই, আমি চিন্তা করি আমার মেয়েটা নিয়ে। বয়স হয়ে গেছে বুলবুলির। বছর খানেকের মধ্যে ওর বিয়ে দিতে হবে। এর মধ্যে টগরের কিছু না হলে ভালো ঘরে বুলবুলির আমি বিয়েই দিতে পারব না। অবশ্য টগরের যদি অন্য জায়গায় বিয়েও হয়, তাও বুলবুলির বিয়ে নিয়ে ঝামেলায় পড়তে হবে। লোকে মনে করবে বড় বোন এমন করেছে, বুলবুলিও হয়তো অমনই করবে।

সব কিছু নিয়ে তুমি একটু বেশি ভাব। এত কিছু ভেবে জীবন চলে না। আমি বাড়ি ফেরার পর শুরু করলে এক কথা, টগর বাড়ি থাকে না, টগর সারাক্ষণ ফুফুর বাড়ি থাকে, তাকে ডেকে এনে শাসন করো, বাড়ি থেকে বেরোতে মানা করো, মনোযোগ দিয়ে যেন বাড়ির কাজটাজ করে, আস্তে ধীরে সে কথা ভুলে গেলে তুমি। এখন বলছ সম্পূর্ণ অন্য কথা। মা-বাবার মুখে এইসব কথা শুনলে ছেলেমেয়েদের মন খুব ছোট হয়ে যায়। তারা ভাবে তারা খুব অসহায়। তাদের কোথাও দাঁড়াবার জায়গা নেই।

তোমার এই ধরনের কথাবার্তায়ই কিন্তু এই ক্ষতিটা হয়েছে টগরের। এরকম কাজ করার সাহস সে পেয়েছে। দেখবে, বুলবুলিও এই ধরনের কিছু একটা করবে। দুটিতে যা খাতির!

বোনে বোনে খাতির হবে না?

সত্ বোনে বোনে এত খাতির কোথাও হয় না। বুলবুলিরও টগরের সঙ্গে এত খাতির না হলে ভালো হতো।

এসব কথা আস্তে বলো।

কেন আস্তে বলব? খারাপ কিছু বলছি নাকি? আমার জীবনের সবচে’ বড় দুঃখ কী জান, আমার একটি মেয়ে হয়েছে। যদি মেয়েটি না হতো, যদি আমার একটি ছেলে হতো, এসব নিয়ে আমার তাহলে মাথা ঘামাতে হতো না। যে যার মতো চলত, আমার কী! ছেলে হলে নিশ্চয় টগরের সঙ্গে তার এমন গলায় গলায় ভাব হতো না।

ঘরের ভেতর কখন বুলবুলি এসে দাঁড়িয়েছে টগরের পাশে, টগর যেমন শুনছে মা-বাবার কথা, বুলবুলিও শুনছে, শুনে মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেছে তার। কাতর চোখে টগরের মুখের দিকে তাকিয়েছে সে। তাকিয়ে চমকে উঠেছে। টগরের গাল বেয়ে নেমেছে কান্নাধারা। বুক ভেসে যাচ্ছে গভীর কান্নায়। দেখে বুলবুলিরও খুব কান্না পেল। আলতো করে টগরের একটা হাত ধরল সে। সঙ্গে সঙ্গে ঝটকা মেরে বুলবুলির হাত ছাড়িয়ে দিল টগর। কান্না জড়ানো গলায় বলল, তুই আর কখনো আমার সামনে আসবি না। তুই আর কখনো আমার সঙ্গে মিশবি না। আমি খারাপ মেয়ে, আমার সঙ্গে মিশলে তুই খারাপ হয়ে যাবি।

বুলবুলি থতমত খেয়ে টগরের দিকে তাকিয়ে রইল। এমনিতেই টগরের কান্না দেখে কান্না পাচ্ছিল বুলবুলির, এবার টগরের কথায় সেই কান্না আর ধরে রাখতে পারল না সে। দু হাতে চোখ মুছতে মুছতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।   

   

ছয়

দক্ষিণের ঘরে ঢুকে অবাক হলেন হাজেরা বেগম।

সন্ধ্যা হয়ে গেছে অনেকক্ষণ, কাজল এখনো মুখ গুঁজে ঘুমোচ্ছে। হাজেরা বেগমের সঙ্গে আছে এবাড়ির বহুকালের পুরনো ঝি রাবেয়া। রাবেয়ার হাতে স্বচ্ছ চিমনির হারিকেন। ঘরটি এতক্ষণ অন্ধকার ছিল, হাজেরা বেগম এবং রাবেয়া ঘরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে হারিকেনের আলোয় কেটে গেল অন্ধকার। তবে কাজলকে ওভাবে ঘুমোতে দেখে নিজের অজান্তেই হাজেরা বেগমের মুখ দিয়ে অস্ফুট স্বর বেরোল, ওমা, এখনো ঘুমোচ্ছে!

পালঙ্কের একপাশে কাজলের মাথার কাছে বসলেন হাজেরা বেগম। নরম মায়াবী হাত রাখলেন কাজলের মাথায়। কাজল, ও কাজল, কত ঘুমোস বাবা! সন্ধ্যা বসে গেছে। ওঠ। উঠে হাত মুখ ধো।

প্রথমে মৃদু শব্দে আড়মোড়া ভাঙল কাজল তারপর চোখ মেলে তাকাল।

হাজেরা বেগম আবার বললেন, ওঠ। এখন এত ঘুমোলে রাতে সহজে ঘুম আসবে না।

কাজল তবু উঠল না। শুয়ে থেকেই খালার একটা হাত ধরল। স্বপ্নের ঘোর লাগা গলায় বলল, কতকাল পর এইভাবে তুমি আমার ঘুম ভাঙালে খালা!

হ্যাঁ, অনেক কাল পর। চৌদ্দ পনেরো বছর হবে।

কিন্তু আমার কী মনে হলো জান? মনে হলো আমি এখনো সেই চৌদ্দ-পনেরো বছরের আমিই আছি। তোমার কাছে থাকছি, বিকেলবেলা ঘুমিয়ে পড়েছি, সন্ধ্যা হয়ে গেছে তবু ঘুম ভাঙছে না দেখে তুমি আমাকে ডেকে তুলছ।

এ কথায় হাজেরা বেগমের বুক কাঁপিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ল। তোকে দেখার পর থেকে আমারও এরকম মনে হচ্ছে বাবা। আমার শরীরটা তেমন ভালো না। চোখে ভালো দেখতে পাই না, ভালোমতো হাঁটাচলা করতে পারি না, কিন্তু তুই আসার পর, তোকে এক পলক দেখার পর থেকে হঠাত্ করে আমার মনে হচ্ছে চোখে যেন কোনো অসুবিধা নেই আমার, আমি যেন পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি সবকিছু। হাঁটাচলা করতে অসুবিধা ছিল, সেই অসুবিধাটাও আর নেই। এই যে দেখিস না রাবেয়ার সঙ্গে হেঁটে এই ঘরে চলে এলাম!

রাবেয়া কে?

আমার কাজের ঝি।

কোথায় ছিল সে? তখন যে দেখলাম না!

চাল কুটতে পাঠিয়েছিলাম।

এখন কোথায়?

ওই তো দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে।

কাজল মুখ ঘুরিয়ে রাবেয়ার দিকে তাকাল। রাবেয়া, তুমি চা বানাতে পারো?

কাজলকে তাকাতে দেখেই মাথায় ঘোমটা দিয়েছে রাবেয়া। মধ্যবয়সী গ্রাম্য মহিলা, তবে বেশ চটপটে ধরনের। কাজলের কথার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে বলল, কন কী! চা আবার মাইনষে না বানাইতে পারে?

তাহলে আমার জন্য এক কাপ চা বানিয়ে আন। চিনি কম দেবে। একটু তাড়াতাড়ি করো। ঘুম থেকে উঠে চা না খেলে আমার ঘুম ভাব সহজে কাটতে চায় না।

হাজেরা বেগম বললেন, চায়ের সঙ্গে পিঠাও দিস।

আইচ্ছা।

রাবেয়া আর দাঁড়াল না। চলে গেল।

কাজল বলল, কী পিঠা খালা?

কাটাপিঠা।

কাটাপিঠা যেন কোনটা?

হাজেরা বেগম খুবই অবাক হলেন। ওমা, কাটাপিঠা চিনিস না!

কাজল সরল মুখ করে হাসল। ভুলে গেছি।

ওই তো চালের গুড়ো রুটির মতো করে, গুড় কিংবা চিনি নাড়া নারকেল দিয়ে, আঙুলের মতো সরু করে।

হাজেরা বেগমের কথা শেষ হওয়ার আগেই কাজল বলল, বুঝেছি বুঝেছি। শেষ পর্যন্ত ডুবো তেলে ভাজতে হয়। কাটাপিঠা আমি খুব পছন্দ করি। তুমি আমার জন্য প্রায়ই বানিয়ে রাখতে। বানিয়ে পটে ভরে রাখতে, আমি ঘুরে ফিরে খেতাম।

এবারও বানিয়ে রেখেছি। তুই ঘুরে ফিরে খাবি।

এখন কি আর আমি অত ছোট আছি! এখন কি আর খেতে সেই আগের মতো ভালো লাগবে!

হাজেরা বেগম আবার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। বয়স মানুষকে খুব বদলে দেয়।

তারপর একটু থেমে বললেন, আমেরিকায় তুই কী করিস রে কাজল?

চাকরি বাকরি করি।

পড়াশুনো শেষ করেছিস?

সত্য কথাটা তোমাকে বলব খালা?

একথায় হাজেরা বেগম বেশ চমকালেন। শুয়ে থাকা কাজলের মুখের দিকে তীক্ষ চোখে তাকালেন তিনি। তুই কি আমার সঙ্গে কখনো মিথ্যে বলেছিস?

কাজলও তাকাল খালার দিকে। তারপর বিছানায় উঠে বসল। গম্ভীর গলায় বলল, না বলিনি। এই পৃথিবীর একজন মাত্র মানুষ তুমি যার সঙ্গে আমি কখনো মিথ্যে বলিনি খালা। আমার মা’র সঙ্গে বলেছি, বাবার সঙ্গে বলেছি, ভাইবোন বন্ধুবান্ধব পরিচিত-অপরিচিত সবার সঙ্গে বলেছি, কেবল তোমার সঙ্গে বলিনি। জীবনে বলবও না।

গভীর আবেগে কাজলের মাথায় একটা হাত রাখলেন হাজেরা বেগম। খুব খুশি হলাম বাবা! খুব খুশি হলাম!

কাজল বলল, আমেরিকায় আমি গিয়েছিলাম পড়াশুনা করতেই, প্রথম দেড় বছর পড়াশুনা করেছি, তারপর আর পড়িনি। ওখানে পড়াশুনা করা বেশ খরচের ব্যাপার। কাজ করে পড়াশুনা করা কী যে পরিশ্রমের ব্যাপার খালা, এই দেশে বসে অনেকেই তা কল্পনা করতে পারে না। দেড় বছর পর আমার আর শরীরে কুলোয়নি। ছেড়ে দিয়েছি। কিন্তু দেশে কাউকে তা জানাইনি।

কেন জানাসনি?

আমি পড়াশুনা করছি না শুনলে মা-বাবা বড় ভাই আপা এমনকি ছোট ভাইবোনগুলোও খুব দুঃখ পাবে। দুঃখটা তাদের আমি দিতে চাইনি খালা। তারা এখনো জানে আমি পড়াশুনা করছি। আরও বছর দুয়েক লাগবে শেষ হতে।

হাজেরা বেগম কথা বলতে যাবেন, তার আগেই পেয়ালায় করে বেশ কিছু কাটাপিঠা এবং পুরনো আমলের বড় একটি চায়ের কাপে করে চা নিয়ে এলো রাবেয়া। কাজল আনমনা ভঙ্গিতে খেতে শুরু করল।

হাজেরা বেগম বললেন, কিন্তু এই মিথ্যেটা তো চিরকাল চাপা থাকবে না। কোনো না কোনোদিন সবাই জানবেই।

কাজল বলল, তা জানবে। ভাবছি, তোমার এখান থেকে গিয়ে সবাইকে এবার বলেই দেবো। যে যেটুকু দুঃখ পাওয়ার পাক।

তা-ই করিস। মিথ্যে বেশিদিন চাপা দিয়ে না রাখাই ভালো।

কাজল চায়ে চুমুক দিল।

হাজেরা বেগম বললেন, চিনি ঠিক আছে?

একটু বেশি হয়েছে।

কাল থেকে আমি তোকে চা বানিয়ে দেবো।

আরে না, তার দরকার নেই। রাবেয়ার চা দিব্যি খাওয়া যাচ্ছে।

চা খুব ভালো বানায় আমাদের টগর।

তা-ই নাকি?

হ্যাঁ, খুব ভালো বানায়। রান্নাবান্নাও চমত্কার করে মেয়েটি। খুব লক্ষ্মী মেয়ে। দেখতে শুনতে যেমন কাজেকামেও তেমন।

তারপর একটু থেমে হাজেরা বেগম বললেন, ও কাজল, তুই বিয়েশাদি করবি না বাবা?

কাজল হেসে বলল, করব তো। তুমি কি মেয়ে পছন্দ করেছ? টগরের সঙ্গে আমার বিয়ে দেবে নাকি?

হাজেরা বেগম মন খারাপ করা গলায় বললেন, তা কি আর সম্ভব?

কেন সম্ভব নয়? টগরদের ফ্যামিলি ট্যামিলি কেমন? পড়াশুনা জানে না টগর?

ফ্যামিলি ভালো, পড়াশুনাও জানে টগর। আইএ পর্যন্ত পড়েছে।

তাতেই চলবে। আমিই বা কোন হাতি ঘোড়া শিক্ষিত! ইন্টারমিডিয়েট পাস করে আমেরিকায় চলে গিয়েছিলাম, তারপর আর পড়াশুনাই হয়নি। এখন আমেরিকায় থাকি, চাকরি বাকরি করি, টাকাপয়সা ভালো রোজগার করি, এজন্য মানুষে খানিকটা মূল্য দেয়। নয়তো আমার মতো ছেলে এদেশে থাকলে কে পাত্তা দিত তাকে?

হাজেরা বেগম কথা বললেন না, আনমনা হয়ে রইলেন।

একপলক খালার দিকে তাকিয়ে কাজল ভাবল, টগরকে নিয়ে এত সরলভাবে এসব কথা বলা বোধহয় পছন্দ করেননি খালা। সে তো আসলে কিছু ভেবে বলেনি। কথা প্রসঙ্গে টগরের নাম উঠেছে বলে বলল।

চায়ের কাপ নামিয়ে রেখে কাজল বলল, তুমি হঠাত্ এমন গম্ভীর হয়ে গেলে কেন খালা? আমি এমনিতেই এসব বললাম। মজা করলাম তোমার সঙ্গে। তাছাড়া এমন অজপাড়াগাঁয়ে কে বিয়ে করে বলো। টগরকে আমি ভালো করে চিনি না শুনি না, চেনাশোনা না হলে আজকাল কেউ কাউকে বিয়ে করে বলো?

হাজেরা বেগম গম্ভীর গলায় বললেন, টগরকে আমি এই এতটুকু বয়স থেকে চিনি। অসম্ভব ভালো মেয়ে সে। আমি টগরকে যেমন ভালোবাসি, টগরেরও তেমন টান আমার জন্য। আমার একদিকে তুই আরেকদিকে টগর। তোদের বিয়ে হলে আমি সবচে’ খুশি হতাম।

কাজল আবার সরল গলায় বলল, তাহলে বিয়ে দিয়ে দাও। আমি রাজি।

হাজেরা বেগম দুঃখের হাসি হাসলেন। এখন আর তা সম্ভব নয়। টগরের বিয়ে হয়ে গেছে।

একথায় ভেতরে ভেতরে বেশ বড় রকমের একটা ধাক্কা খেল কাজল। স্তব্ধ হয়ে গেল। তার খুব সিগ্রেট খেতে ইচ্ছে করল। কিন্তু খালার সামনে সিগ্রেট খাওয়া যাবে না।

পরিবেশটা হালকা করার জন্য কাজল বলল, কতদিন হলো বিয়ে হয়েছে টগরের?

সাত-আট মাস।

বর কী করে?

বেশ অবস্থাপন্ন ঘর। কিন্তু ছেলেটা ভালো না। নেশাভাঙ করে। এজন্য সংসার করেনি টগর।

কাজল খুবই অবাক হলো। বলো কী!

হ্যাঁ। বিয়ের রাতেই স্বামীর সংসার ছেড়ে এসেছে টগর। ছেলেটি বদ্ধ মাতাল হয়ে ঢুকেছিল বাসরঘরে, ঢুকেই ঘুমিয়ে পড়েছে। নেশার ঘুম। কোনোরকমে রাতটা সেই ঘরে বসে কাটিয়েছে টগর, তারপর ভোর হতে না হতেই পালিয়ে বাপের বাড়ি চলে এসেছে। আর কখনো ফিরে যায়নি।

ফ্যাল ফ্যাল করে খালার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল কাজল।

হাজেরা বেগম বললেন, টগরের বিয়ে হওয়ার পর আমি ভেবেছিলাম এখানকার পাট চুকিয়ে ঢাকায় তোদের কাছে চলে যাব। এখানে আর আমার কে আছে! সে আর হলো না। মেয়েটি ফিরে আসার পর মনে হলো, ওকে ফেলে চলেই বা যাব কেমন করে! এমন টান আমার জন্য, এমন করে আমার জন্য, সারাক্ষণ আমার সঙ্গে সঙ্গে, ওকে আমি কার কাছে ফেলে যাব? একটা সময় তোর জন্য এরকম টান ছিল আমার। তুই আমাকে ছেড়ে চলে গেলি, তারপর থেকে টানটা হলো টগরের জন্য। নিজের ছেলেমেয়ে নেই তো, এজন্য বোধহয় তোদের জন্য এমন টান আমার। তোকে মনে হয় আমার ছেলে। ছেলে তো বড় হলে দূরে যাবেই, কাছে রয়ে গেল মেয়েটি, টগর। তারও যখন বিয়ে হয়ে গেল, ভাবলাম আমার আর রইল কী! কেন আমি এখানে পড়ে থাকব? কিন্তু কপালটা এমন বিয়ে হওয়ার পরও আমাকে ছেড়ে যেতে পারল না টগর। নিয়তি ওকে আবার আমার কাছে ফিরিয়ে আনল। দুপুরবেলা মেয়েটি না খেয়ে চলে গেল, আমারও আর খাওয়া হলো না। শুধু মনে হলো টগর না খেয়ে আছে, এই অবস্থায় আমার গলা দিয়ে ভাত নামবে কী করে! আমি খেতে পারলাম না।

কাজল অবাক হয়ে বলল, তার মানে তুমি এখনো না খেয়ে আছ?

হ্যাঁ, টগরও তো না খেয়ে আছে।

রাতে সে নিশ্চয় খেয়ে নেবে। তুমি তাড়াতাড়ি রাবেয়াকে ডাকো। খাবার দিতে বলো। আমার সামনে বসে ভাত খাবে তুমি।

সে আর একটু পরে খেলেও অসুবিধা নেই। এখন আর খিদে নেই আমার। তোর কি খিদে পেয়েছে?

আরে না। এইমাত্র এতগুলো পিঠে খেলাম চা খেলাম।

তাহলে দুজনেই আমরা পরে খাব। এখন তোর সঙ্গে বসে কথা বলি। তুই বলেছিলি কী নাকি কথা আছে আমার সঙ্গে।

হ্যাঁ, আছে। কিন্তু আমি ঠিক বুঝতে পারছি না তুমি আমার কথা শুনবে কি-না।

হাজেরা বেগম হেসে বললেন, আগে বল তো শুনি, তারপর ভেবে দেখব।

কাজল একটু গলা খাঁকারি দিল। আমি এবার তোমাকে ঢাকায় নিয়ে যাব।

সে দু-চার দিনের জন্য না হয় গেলাম।

দু-চার দিনের জন্য নয়। পাকাপাকিভাবে। তুমি এখন থেকে ঢাকায় আমাদের সঙ্গে থাকবে।

সে কী করে সম্ভব? এই সব ঘরবাড়ি, জায়গাজমি এসব কে দেখবে?

এসব থাকবেই না। সবকিছু বিক্রি করে টাকাপয়সা নিয়ে চলে যাবে।

হাজেরা বেগম ফ্যাল ফ্যাল করে কাজলের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর মৃদু হেসে বললেন, তা হয় না।

কেন হবে না? এখানে তো তোমার কোনো পিছুটান নেই। খালু মারা গেছেন অনেকদিন হলো। তোমার কোনো ছেলেমেয়েও নেই। আমরা ছাড়া সত্যিকার অর্থে তোমার কেউ নেই। তোমার শ্বশুরপক্ষেরও কেউ গ্রামে থাকে না, তোমার বয়স হয়েছে, এই অবস্থায় কেন তুমি একা একা এখানে পড়ে থাকবে? তোমার কোনো অসুবিধা হলে কে দেখবে তোমাকে? অসুখ-বিসুখ হলে কে দেখবে? হঠাত্ করে যদি মরে যাও তোমার এই সব ঘরবাড়ি, জায়গা-সম্পত্তি যে যেভাবে পারে দখল করে নেবে। তারচে’ এসব বিক্রি করে বিশ-পঁচিশ লাখ টাকা যা-ই পাও সে টাকা ব্যাংকে রেখে শেষ বয়সে একটু সুখ করো।

হাজেরা বেগম মৃদু হেসে বললেন, টগরও প্রায়ই আমাকে এরকম কথা বলে। ওকে আমি বলি, স্বামীর ভিটে ছেড়ে কোনো মেয়েই যেতে চায় না। প্রতিটি মেয়েই চায় স্বামীর ভিটেয় মরতে। এজন্যই এখান থেকে যাচ্ছি না আমি।

আমাকেও কি এই কথাই বলতে চাচ্ছ তুমি?

না, ঠিক এই কথা তোকে আমি বলতে চাই না। এটা খানিকটা সত্য, তবে পুরো সত্য নয়।

কাজল শিশুর মতো অস্থির গলায় বলল, পুরো সত্যটা কী, বলো তাহলে।

একা একা এখানে পড়ে থাকতে আমারও যে খুব একটা ভালো লাগে তা নয়। এখন আমি এখানে পড়ে আছি আসলে টগরের জন্য। আমি চলে গেলে মেয়েটির কোনো দাঁড়াবার জায়গা থাকবে না। তারপরও আমি যেতাম তুই যদি বিদেশে না থাকতি, তুই যদি দেশে থাকতি। তুই থাকলে তোদের সঙ্গে থাকতে আমার কোনো অসুবিধা ছিল না। তোর মুখ দেখে টগরের কথা ভুলে যেতাম আমি। অথবা যদি এমন হতো টগরের সঙ্গে তোর বিয়ে হতো, ঢাকায় টগর থাকত তোদের বাসায়, তুই বিদেশে থাকলেও তখন আমার কোনো অসুবিধা হতো না, টগরের মুখ দেখে আমি তোকে ভুলে থাকতাম। ভাবতাম, ছেলে আমার কাছে নেই তো কী হয়েছে, মেয়ে তো আছে!

হাজেরা বেগমের কথা শুনতে শুনতে বুকের ভেতরটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠল কাজলের। হঠাত্ করে দু হাতে খালাকে সে জড়িয়ে ধরল। খালা, খালা গো, তুমি খুব ভালো মানুষ খালা, তুমি খুব ভালো মানুষ! মানুষের জন্য মানুষের এত মায়া আজকালকার পৃথিবীতে দেখা যায় না। উপায় থাকলে টগরকে আমি চিরকাল তোমার কাছে রাখার ব্যবস্থা করে দিতাম। কিন্তু সে উপায় তো এখন আর নেই!

হাজেরা বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, তা-ই তো। তবে টগরের এসব কথা যে আমি তোকে বলেছি একথা যেন টগরের কানে না যায়। ও যদি কোনোভাবে টের পায় ওর জন্য আমি এখানে এভাবে পড়ে আছি তাহলে কাউকে কিছু না বলে ওই মাতাল স্বামীর ঘর করতে চলে যাবে।

খালার মুখের দিকে তাকিয়ে কাজল বলল, না, যাবে না। 

 

সাত

পালঙ্কের পাশের জানালাটি সাধারণত বন্ধ করে শোয় টগর।

বুলবুলি শোয় তার পাশে। রাতেরবেলা খোলা জানালার দিকে তাকাতে ভয় পায় বুলবুলি। এজন্য জানালাটা রাতেরবেলা কখনো খোলা রাখে না টগর, কিন্তু আজ রেখেছে। রেখেছে মানে উঠে যে বন্ধ করবে সে কথা তার একবারও মনে হয়নি। সেই যে বিকেলবেলা বিছানায় এসে শুয়েছে আর ওঠেনি। কখন সন্ধ্যা হয়েছে, কখন রাত, কখন সবাই খেয়েদেয়ে শুয়ে পড়েছে, কখন গভীর হয়ে গেছে রাত, কিছুই খেয়াল করেনি সে। তবে খাওয়ার সময় অনেকক্ষণ তাকে ডেকে গেছে বুলবুলি, ধাক্কাধাক্কি করেছে, টগর নড়েনি। শেষ পর্যন্ত চোখ পাকিয়ে একটি ধমক দিয়েছে বুলবুলিকে। ভয়ে বুলবুলি আর বাড়াবাড়ি করেনি। মা-বাবাকে গিয়ে বলেছে, বুবু ঘুমিয়ে পড়েছে। ওই নিয়ে আর কোনো কথা হয়নি। কিন্তু ঘুম টগরের আসেনি। অন্ধকারে বিছানায় শুয়ে জানালার দিকে তাকিয়ে আছে সে।

গভীর রাতে আকাশে আজ বাঁকা হয়ে চাঁদ উঠেছে। টগরদের বাড়ির গাছপালা ভেদ করে চাঁদের এক টুকরো আলো এসে পড়েছে খোলা জানালাটির পাশে। সেই আলোর দিকে তাকিয়ে মনটা কেমন করছে টগরের। ছেলেবেলায় মা মারা গেছে। মায়ের কথা পরিষ্কার মনে নেই টগরের, চেহারাও মনে নেই, তবু কোনো কারণে খুব দুঃখ পেলে মায়ের কথা মনে পড়ে যায়। আজও বিকেল থেকে খুব মনে পড়েছে। মা বেঁচে থাকলে জীবনটা হয়তো এরকম হতো না তার। জীবনটা হয়তো অন্যরকম হতো। সুখের হতো, সুন্দর হতো। এখন এই গভীর রাতেও সেই কথাটিই আবার মনে হলো টগরের। মনে হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দীর্ঘ একটা শ্বাস পড়ল তার। বুকের ভেতর ঠেলে উঠল গভীর এক কান্না।

ঠিক তখুনি আলতো করে গলার ওপর একটি হাত রাখল বুলবুলি। মৃদু গলায় ডাকল, বুবু!

টগর সাড়া দিল না, নড়ল না।

বুলবুলি বলল, বুবু, তুমি আমার ওপর রাগ করেছ?

টগর কথা বলল না। বুলবুলি বলল, আমার কোনো দোষ নেই বুবু। তুমি বিশ্বাস করো, আমি তোমাকে ডাকতে যেতে চাইনি। মা আমাকে জোর করে পাঠিয়েছে।

বুলবুলির দিকে মুখ ফেরাল না টগর তবে কথা বলল। তুই এখনো ঘুমোসনি?

না আমার ঘুম আসছে না।

অনেক রাত হয়েছে, ঘুমিয়ে পড়।

তুমি আমার ওপর রাগ করে থাকলে আমার কখনো ঘুম আসে না বুবু।

একথায় বুলবুলির জন্য অদ্ভুত এক মমতায় মন ভরে গেল টগরের। বুলবুলির দিকে পাশ ফিরল সে। আলতো করে একটা হাত রাখল বুলবুলির পিঠে।

বুলবুলি বলল, আমি জানি তোমার খুব খিদে পেয়েছে বুবু। সারাদিন তুমি কিছু খাওনি। আমি তোমাকে একটু গুড়মুড়ি এনে দিই?

না।

কিচ্ছু হবে না। আমি এনে দিই। পাশের ঘরে গিয়ে নিয়ে আসব, কেউ টের পাবে না।

অন্ধকারে বুলবুলির খুব ভয়। কিন্তু এখন টগরের জন্য গভীর অন্ধকারে পাশের ঘরে গিয়ে গুড়মুড়ি নিয়ে আসতে চাইছে, আশ্চর্য ব্যাপার!

টগর বলল, অন্ধকারে তুই ভয় পাবি না?

না, একটুও ভয় পাব না। তোমার জন্য কোনো কিছু করতে আমার একদম ভয় লাগে না। এখন তুমি আমাকে বলো তোমার জন্য ফুফুর বাড়ি যেতে হবে, আমি ঠিক চলে যাব। মরে গেলেও চলে যাব।

বুলবুলির কথা শুনে গভীর আবেগে গলা বুজে এল টগরের। দু হাতে বুলবুলির মাথাটা বুকের কাছে টেনে আনল সে। কথা বলতে পারল না।

বুলবুলি বলল, আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি বুবু। খুব ভালোবাসি। মা যা-ই বলুক, আমি তোমাকে কখনো আমার সেবান মনে করি না। আমি মনে করি তুমিই আমার আপন, তুমিই আমার সব। দিই তোমাকে একটু গুড়মুড়ি এনে?

টগর নরম গলায় বলল, না, এখন আমার খিদে নেই।

আমি জানি তোমার খিদে আছে। আমার কষ্ট হবে বলে মানা করছ। কিন্তু আমার কোনো কষ্ট হবে না বুবু। আমি যাই।

তারচে’ তুই আমার সঙ্গে কথা বল, আমার ভালো লাগবে। মা আজ হঠাত্ করে এমন করল কেন রে?

মা চাইছে যেমন করে হোক শ্বশুরবাড়ি পাঠাবে তোমাকে। এজন্য ইচ্ছে করে এসব ঝগড়াঝাটি লাগাচ্ছে। সংসারে অশান্তি হলে বাধ্য হয়ে একদিন শ্বশুরবাড়ি চলে যাবে তুমি।

তুই এসব কী করে বুঝলি?

মা’র সবকিছু আমি একদম পরিষ্কার বুঝতে পারি। কিন্তু বুবু তোমাকে আমি একটা কথা বলে দিই, মা যত যা-ই করুক, যা ইচ্ছে বলুক, তুমি কিছুতেই ওই বাড়ি যেতে আর রাজি হবে না। যেখান থেকে একবার চলে এসেছ সেখানে আর যেতে পারো না তুমি। তাহলে শ্বশুরবাড়িতে তোমার আর কোনো দাম থাকবে না। ওই মাতালটা দেখবে আরও মাতলামি করবে। জীবনটা ছারখার হয়ে যাবে তোমার। আর যেভাবে আছ এভাবেই যদি থাক তাহলে নিশ্চয় ওখান থেকে বাবা তোমাকে ছাড়িয়ে আনবে। ভালো ছেলে দেখে অন্য জায়গায় বিয়ে দেবে। মা যা ইচ্ছে করুক, মাকে তুমি পাত্তা দেবে না। বুলবুলির কথা শুনে ভেতরে ভেতরে খুবই অবাক হয়েছে টগর।

মেয়েদের জীবনের কত কিছু পরিষ্কার বুঝে গেছে বুলবুলি।

বুলবুলি বলল, তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করি বুবু?

কী?

হাজেরা ফুফুর বোনপোর নাম কী?

কাজল।

কাজল ভাই দেখতে খুব সুন্দর, না?

তুই দেখলি কোথায়?

ওই যে তোমাকে ডাকতে গিয়ে দেখলাম।

হ্যাঁ, খুব সুন্দর। বিদেশে থাকে তো। বিদেশে থাকলে সব মানুষই সুন্দর হয়ে যায়।

কোন দেশে থাকে?

আমেরিকায়।

বিয়ে করেছে?

না।

তুমি যখন সামনে বসে কাজল ভাইকে বেড়ে খাওয়াচ্ছিলে, এটা ওটা এগিয়ে দিচ্ছিলে, তোমাকেও তখন এত ভালো লেগেছে দেখতে!  নীল ডোরা শাড়িটা পরলে এমনিতেই তোমাকে খুব সুন্দর লাগে, আজ আরও বেশি সুন্দর লাগছিল। মনে হচ্ছিল কাজল ভাই যেন তোমার বর। তুমি যেন তোমার বরকেই ভাত বেড়ে খাওয়াচ্ছ। তোমার যদি বিয়ে না হতো বুবু, আমি তাহলে বাবাকে বলতাম কাজল ভাইর সঙ্গে তোমার বিয়ে দিতে।

টগরের ইচ্ছে হলো ছোটখাটো একটা ধমক দেয় বুলবুলিকে। কী সব বলছিস বুলবুলি!

কিন্তু ধমকটা সে দিল না। কাজলকে নিয়ে বলা কথাগুলো তার খুব ভালো লাগছিল। বুকের ভেতর অদ্ভুত এক অনুভূতি হচ্ছিল। বুলবুলির দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে খোলা জানালা দিয়ে চাঁদের আলোর দিকে তাকিয়ে রইল টগর। 

 

আট

হাজেরা বেগম উতলা গলায় বললেন, কী রে বুলবুলি, টগর কোথায়? টগরকে যে সকাল থেকে একবারও দেখলাম না?

বুলবুলি বলল, বুবু বাড়িতে।

কী করে?

কিছু না।

তাহলে এল না কেন?

বুবু দু-তিন দিন আসবে না।

বলিস কী!

হ্যাঁ। এটা বলতেই আমাকে পাঠাল।

কেন আসবে না?

কাল বিকেলে মা-বাবা দুজনেই বুবুকে অনেক কথা শুনিয়েছে। রাতেরবেলা ভাত খায়নি বুবু, ঘুমোয়নি, খুব কেঁদেছে। সকালবেলা আমাকে বলল, ফুফুকে গিয়ে বলে আয় দু-তিন দিন আমি তাঁর বাড়ি যেতে পারব না।

আজ সকালবেলাও খায়নি টগর?

খেয়েছে।

কী খেয়েছে?

গুড়মুড়ি।

পুরো একটা দিন না খেয়ে থেকে শুধু গুড়মুড়ি খেয়েছে?

তাও খেতে চায়নি, আমি জোর করে খাইয়েছি।

তুই একটা কাজ কর বুলবুলি, টগরকে গিয়ে বল, ঠিক আছে এই বাড়িতে তার আসবার দরকার নেই। কিন্তু আমি বলেছি ও যেন ঠিকঠাক মতো খাওয়া দাওয়া করে। না খেয়ে যেন থাকে না।

আচ্ছা।

বলবি, যদি আমি শুনি টগর না খেয়ে আছে তাহলে আমি কিন্তু তোদের বাড়ি যাব। আমি যদি তোদের বাড়ি যাই তাহলে কিন্তু তোর মা-বাবার সঙ্গে আমার ঝগড়া লেগে যাবে।

এ কথায় হাসল বুলবুলি। আচ্ছা, আমি বলব।

কাজল ছিল উঠোনে, হঠাত্ই এই ঘরে এসে ঢুকল সে। বুলবুলির দিকে তাকিয়ে বলল, তোমার নাম কী?

বুলবুলি লাজুক গলায় বলল, বুলবুলি।

বাহ্, ভারি সুন্দর নাম তো! তোমাদের দু বোনের একজন হচ্ছ পাখি, আরেকজন ফুল। কিন্তু পাখিটিকে দেখছি, ফুলটিকে দেখছি না। ব্যাপারটা কী? টগর কই?

বাড়িতে।

কী করছে?

কিছু না।

আমার খালাকে না দেখে সে নাকি থাকতে পারে না। কিন্তু কাল বিকেল থেকে তো দিব্যি তাঁকে না দেখে আছে। কী করে পারছে?

বুলবুলি হাসল। আমি জানি না।

কী জান তুমি?

কথাটা বুঝতে পারল না বুলবুলি। চোখ তুলে কাজলের দিকে তাকাল। কী বললেন?

বললাম, কী জান তুমি?

কাজলের কথার মজাটা এবার ধরতে পারল বুলবুলি। সেও মজা করে বলল, আমি জানি বুবু দু-তিন দিন এই বাড়িতে আসবে না।

কাজল খুবই অবাক হলো। কেন?

কেন আসবে না তা কিন্তু আমি সত্যি সত্যি জানি না। 

কিন্তু তাকে আসতে হবে। তুমি গিয়ে টগরকে বলবে, আমি তাকে আসতে বলেছি।

আচ্ছা বলব।

আর বলবে আমি শুনেছি টগর খুব ভালো চা বানায়। তার চা না খাওয়া পর্যন্ত চায়ের নেশা আমার মিটছে না।

তারপর হাজেরা বেগমের দিকে তাকাল কাজল। খালা, তুমি যদি আমাকে একটা অনুমতি দাও তাহলে আমি বুলবুলির সঙ্গে যাই।

খালা অবাক হয়ে বললেন, কোথায়?

টগরদের বাড়ি।

কেন?

টগরকে নিয়ে আসি।

বুলবুলি বলল, পারবেন না।

তুমি আমাকে চেন না বুলবুলি, আমি ঠিকই পারব।

আপনিও বুবুকে চেনেন না। বুবু একবার যা না করবে সেটা কখনো হ্যাঁ হবে না।

ঠিক আছে, এস বাজি ধরি।

ক টাকা?

দশ টাকা। তোমার দশ টাকা, আমার একশো টাকা। অর্থাত্ তুমি জিতলে আমি তোমাকে একশো টাকা দেবো, আর আমি জিতলে তুমি আমাকে দেবে দশ টাকা।

ঠিক আছে।

তাহলে চল।

হাজেরা বেগম বললেন, না রে কাজল, থাক।

কেন থাকবে খালা?

ওদের বাড়িতে অনেক অশান্তি হয়েছে।

তা-ই নাকি? তাহলে থাক।

তারপর বুলবুলির দিকে তাকিয়ে হাসল কাজল। খালা বলেছেন, এজন্য তোমাকে আজ ছেড়ে দিলাম। বাজিটা ধরলাম না। তবে একদিন নিশ্চয় ধরব। টগর যেটা না করবে সেটা আমি হ্যাঁ করাব।

বুলবুলিও হাসল। দেখা যাবে।

তারপর একটু থেমে বলল, আমি তাহলে এখন যাই।

যাও। তবে টগরকে গিয়ে বলবে আমি তাকে আসতে বলেছি। দুপুরবেলা আমি ঘুমোই, ঘুম থেকে উঠে ফার্স্টক্লাস এক কাপ চা আমার চাই। ঘুম ভেঙেই আমি যেন দেখতে পাই গরম চমত্কার এক কাপ চা নিয়ে আমার বিছানার সামনে দাঁড়িয়ে আছে টগর। ঠিক আছে?

বুলবুলি মিষ্টি হেসে বলল, আমি এক্ষুনি গিয়ে বুবুকে বলব। 

 

নয়

টগর ভুরু কুঁচকে বলল, কী?

বুলবুলি উচ্ছল গলায় বলল, হ্যাঁ বুবু, তোমাকে যেতে বলেছে।

আমাকে সে যেতে বলবে কেন?

কাজল ভাই নাকি শুনেছে, তুমি খুব ভালো চা বানাও। তার খুব চায়ের নেশা। বলেছে, সে দুপুরবেলা ঘুমোয়, ঘুম থেকে উঠে যেন দেখে তুমি তার জন্য চা তৈরি করে চায়ের কাপ হাতে তার বিছানার সামনে দাঁড়িয়ে আছ।

বুলবুলির কথা শুনতে শুনতে চোখের সামনে ওরকম একটি দৃশ্য দেখতে শুরু করেছে টগর। ফলে সে একেবারেই আনমনা হয়ে গেছে। ব্যাপারটা খেয়াল করল না বুলবুলি। সে তার কথা বলেই চলল। তুমি যাবে না শুনে ফুফু তেমন কিছু বলেনি। ফুফু শুধু বলেছে তুমি যেন ঠিকঠাক মতো খাওয়াদাওয়া করো। যদি না খাও তাহলে ফুফু চলে আসবে আমাদের বাড়ি। মা-বাবার সঙ্গে ঝগড়াঝাটি লাগিয়ে দেবে।

টগর তবু কোনো কথা বলল না। আগের মতোই আনমনা হয়ে রইল।

এবার ব্যাপারটা খেয়াল করল বুলবুলি। সে খুবই অবাক হলো। বলল, কী হলো বুবু? তুমি আমার কথা শুনছ না?

বুলবুলির দিকে তাকিয়ে হাসল টগর। শুনছি, বল।

বুবু, কাজল ভাই খুব মজার লোক! কী সুন্দর করে কথা বলে!

আর কী কী বলল?

কত কথা!

দুয়েকটা বল না শুনি।

ফুফুকে বলল, খালা তুমি পারমিশান দিলে টগরের বাড়ি গিয়ে টগরকে নিয়ে আসব আমি।

যাহ্!

সত্যি। আমি বলেছি, পারবেন না। বুবু কোনোকিছু না করলে সেটা আর হ্যাঁ করে না। এই নিয়ে আমার সঙ্গে বাজি ধরতে চেয়েছে।

তুই বাজি ধরতি?

আমি তো ধরতে চেয়েছি। ফুফু বলল, এখন ওসব করবার দরকার নেই। টগরদের বাড়ির পরিস্থিতি ভালো না। এজন্য বাজিটা কাজল ভাই ধরেনি। তবে তোমাকে নিয়ে বাজি সে আমার সঙ্গে একটা ধরবে।

কবে?

তা জানি না। নিশ্চয় চলে যাওয়ার আগে।

কাজল এখান থেকে চলে যাবে কথাটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল টগরের। কালই জীবনে প্রথমবারের মতো দেখেছে একজন মানুষকে। একবার দেখার পরই এমন লাগতে শুরু করেছে কেন টগরের! কেন মনে হচ্ছে মানুষটিকে সে যুগ যুগ ধরে দেখছে! মানুষটি তার বড় আপন। এরকম আপন মানুষ কেন চলে যাবে এখান থেকে?

বুলবুলি বলল, বিকেলবেলা তুমি যাবে না বুবু?

টগর আনমনা গলায় বলল, না।

কেন?

দু-তিন দিন ওই বাড়িতে যাব না আমি।

কেন?

শুনলি না কাল মা-বাবা দুজনেই আমাকে নিয়ে কত কথা বললেন?

বাবা তেমন কিছু বলেনি। মা বলেছে। মা’র কথা ধরে লাভ কী? সে তো সব সময়ই তোমার পেছনে লেগে আছে। সত্মারা এমনই হয়। সে যা বলবে তা-ই শুনতে হবে নাকি? তুমি তোমার মতো চলবে। কাজল ভাই অত করে বলেছে, তুমি অবশ্যই যাবে। নাহলে তার মন খারাপ হবে না? তুমি যাবে, আমি এদিকে সব সামলাব।

কী করে সামলাবি?

সে আমার ব্যাপার। বাবা-মা দুজনকেই উল্টোপাল্টা বুঝাব।

তারপরই বুলবুলি বলল, কিন্তু তারা তো কেউ তোমাকে বাড়ি থেকে বেরোতে মানা করেনি, ফুফুর বাড়ি যেতে মানা করেনি, তুমি নিজে নিজেই ঠিক করেছ যাবে না। এখন আবার ঠিক করো যাবে। কে তোমাকে মানা করবে?

টগর গম্ভীর গলায় বলল, তা ঠিক।

কেন তুমি ওই বাড়িতে যাবে না ঠিক করেছ?

মা’র ধারণা আমি সারাক্ষণই ফুফুর বাড়ি পড়ে থাকি, বাড়ির কোনো কাজটাজ করি না, এজন্য ভেবেছি দু- তিন দিন বাড়ি থেকে আর বেরোব না।

এটা ঠিক হবে না। কাজল ভাই থাকবেই বা ক’দিন। সে যে ক’দিন থাকে সে ক’দিন যাবে, পরে না হয় কম গেলে।

এ সময় কী কাজে উঠোনের দিকে যাচ্ছিলেন খোদেজা, টগর এবং বুলবুলিকে বাংলা ঘরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে কথা বলতে দেখে ভারি বিরক্ত হলেন তিনি। মুখ ঝামটে বললেন, দুজনে সারাক্ষণ শুধু গুজুর গুজুর ফুসুর ফুসুর। এত কিসের গল্প, এ্যাঁ!

বুলবুলি বলল, বোনে বোনে কথাও বলতে পারব না?

না পারবি না।

কেন পারব না?

 

সঙ্গে সঙ্গে চোখ পাকালেন খোদেজা। আবার মুখে মুখে প্রশ্ন!

এ কথায় হঠাত্ করে প্রচণ্ড রেগে গেল বুলবুলি। অত্যন্ত নিরীহ গোবেচারা ধরনের মেয়ে সে, কখনো কারও সঙ্গে ঝগড়া করে না, উঁচু গলায় কথা বলে না। জীবনে প্রথমবারের মতো আজ ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল সে। চোখ মুখ লাল করে বলল, তুমি কোন লাট বেলাট যে তোমাকে কোনো প্রশ্ন করা যাবে না? আমরা বোনে বোনে কথা বলব তাতেও তোমার চোখ টাটাবে! আমরা কোনো খারাপ কথা বলেছি, তোমার নামে কুটনামি করছি যে আমাদের দুজনকে একসঙ্গে দেখলেই তোমার গা জ্বলে! বুবুকে তুমি তোমার সেময়ে মনে করতে পারো, আমি কখনো আমার সেবান ভাবি না। আমি তাকে আমার আপন বোন মনে করি। আমি তোমার মতো বদ নই। কোনোদিন তোমার মুখের ওপর কোনো কথা বলিনি, এখন থেকে বলব। দেখব তুমি আমার কী কর। আমি বড় হয়েছি, বিএ পড়ি, ইচ্ছে করলেই যখন তখন যা ইচ্ছে তাই আমাকে শোনাবে, তুমি সেটা আর পারবে না। বেশি বাড়াবাড়ি করলে তোমার একটা কথাও আমি শুনব না। কী করবে, আমাকে তুমি মারবে? মারো তো দেখি। মেরে দেখ। গায়ে একবার হাত তুলে দেখ, আজ রাতেই গলায় দড়ি দেবো, চিঠি লিখে যাব, আমার মৃত্যুর জন্য তুমি দায়ী, তোমাকে জেল খাটিয়ে ছাড়ব।

বুলবুলির চিত্কার করে কথা বলা এবং মারমুখো ভঙ্গি দেখে খোদেজা এবং টগর দুজনেই স্তব্ধ হয়ে গেছে। এই নিরীহ মেয়েটি হঠাত্ করে এমন ক্ষিপ্ত হলো কী করে! কোনোদিন তো এমন করেনি সে! টগর কিংবা খোদেজা কথা বলবে কী, ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইল বুলবুলির দিকে।

বুলবুলি কিন্তু তখনো থামেনি, সমানে চালিয়ে যাচ্ছে। তুমি ভেবেছ আমি একেবারে ছোট্ট মেয়ে, দুনিয়ার কিচ্ছু বুঝি না আমি। বুবুর সঙ্গে আমার এত ভাব এটা তোমার সহ্য হয় না। দুই বোনের মাঝখানে বিষ ছড়িয়ে দিচ্ছ তুমি। বার বার বলে আমাকে বোঝাচ্ছ বুবু আমার সেবান। তার সঙ্গে ভাবটা আমার না থাকে। তুমি তো মানুষ না, তুমি একটা শয়তান। তুমি মানুষ হলে আমাকে আর বুবুকে দুই চোখে দেখতে না। দুজনেই তোমার কাছে সমান হতো। তুমি যদি বুবুকে আসল মায়ের মতো মায়া করতে, বুবু তাহলে কোনোদিন ফুফুর বাড়ি গিয়ে অমন করে পড়ে থাকত না। ফুফুর জন্য জান দিয়ে দিত না, জান দিত তোমার জন্য। সত্মা হলেই খারাপ হবে মানুষ, এসব তুমি কোত্থেকে শিখেছ?

এই প্রথম স্তব্ধতা কাটিয়ে বুলবুলির একটা হাত চেপে ধরল টগর। ধমকের স্বরে বললে, কী হচ্ছে বুলবুলি! মা’র সঙ্গে কেউ এই ভাষায় কথা বলে! চুপ কর।

বুলবুলি আগের মতোই চিত্কার করে বলল, আজ আর চুপ করব না। চুপ করে থাকি বলে লাই পেয়ে গেছে।

বুলবুলির কথাটথা শুনে এবং ভঙ্গি দেখে ভেতরে ভেতরে খোদেজা আসলে খুব ঘাবড়ে গেছেন। মুখ চোখ শুকিয়ে ফ্যাকাশে হয়ে গেছে তাঁর। এই প্রথম কোনোরকমে তিনি বললেন, আসুক তোর বাপ এসবের বিচার যদি না করি তো কী বললাম!

সঙ্গে সঙ্গে বুলবুলি বলল, কী বিচার করবে আমার, এ্যাঁ, কী বিচার করবে? বাবা তো কোনো পুরুষ মানুষ না। মেনিমুখো। পুরুষ মানুষ হলে তুমি এত লাই পেতে না। তুমি একদম সোজা হয়ে থাকতে। তোমার সবচে’ বড় আক্রোশ কোথায় তা কি তুমি মনে করেছ আমি বুঝি না? বুঝি। তোমার সবচে’ বড় আক্রোশ হচ্ছে বুবুর ওপর। বিয়ের রাতে ওভাবে চলে এসেছে বুবু, এটা তুমি এখনো মেনে নিতে পারছ না। এখনো সারাক্ষণই তুমি চাচ্ছ বুবু আবার ওই মাতালটার সংসারে ফিরে যাক। নানা রকমের চালাকি করছ, অত্যাচার করছ বুবুকে যাতে এই সংসারে সে না থাকতে পারে, যাতে মাতাল স্বামীর সংসারে ফিরে যেতে সে বাধ্য হয়। বুবুর জায়গায় যদি আমি হতাম এমন তুমি করতে না। কারণ আমি তোমার আপন মেয়ে। তুমি নিজেকে দিয়ে ভাবো তো, বুবুর জায়গায় যদি তুমি হতে, ওরকম স্বামীর সংসার তুমি করতে? বাসররাতে যে লোকটা বদ্ধ মাতাল হয়ে ঘরে ঢোকে, বউর মুখ দেখার ক্ষমতা থাকে না যার, মেঝেতে উপুড় হয়ে পড়ে নেশার ঘুম ঘুমোয়, তুমি তার সংসার করতে?

তারপর একটু থেমে বুলবুলি বলল, আজ থেকে আমাদের দু বোনের ব্যাপারে কোনো রকমের কোনো চালাকি তুমি করবে না। যদি কর আমি গলায় দড়ি দিয়ে তোমাকে ফাঁসিয়ে দিয়ে যাব।

এবার বুলবুলিকে আর কথা বলতে দিল না টগর। হাত ধরে টেনে হিঁচড়ে নিজেদের ঘরের দিকে নিয়ে গেল। আয় আমার সঙ্গে, আয়। আয়, দেখি কী হয়েছে তোর!

ঘরে ঢুকে ধপাস করে পালঙ্কে বসল বুলবুলি। মুখটা গোঁজ করে রাখল। রাগে উত্তেজনায় ফোঁস ফোঁস করে শ্বাস পড়ছে তার।

বুলবুলির মুখের দিকে তাকিয়ে টগর বলল, এ কী হলো তোর! হঠাত্ করে এমন রেগে গেলি? তোকে তো জীবনে কোনোদিন এমন করতে দেখিনি! কী হয়েছে বুলবুলি?

বুলবুলি টগরের দিকে মুখ ফেরাল না। বলল, আমি নিজেও বুঝতে পারিনি এমন রাগ হয়ে যাবে আমার। আসলে কাল দুপুর থেকে মা’র ওপর খুব রেগে আছি আমি।

কেন?

ওই যে তোমাকে ডাকতে পাঠাল। বাড়িতে কোনো কাজ নেই, তাও বাবার সামনে দাঁড়িয়ে যতসব কথা শোনাল তোমাকে। সারাটা দিন সারাটা রাত না খেয়ে থাকলে তুমি। আর মা হয়ে কেন চাইবে ওরকম একটি স্বামীর সংসারে তুমি ফিরে যাও! তাঁর তো উচিত উল্টো বাবাকে বোঝানো যে ওই স্বামীর কাছ থেকে তোমাকে ছাড়িয়ে এনে অন্য ভালো জায়গায় ভালো ছেলে দেখে তোমার বিয়ে দেয়া। তুমি দেখতে সুন্দর, ভালো ছেলের কাছে তোমাকে বিয়ে দেয়া কি কোনো কঠিন কাজ! তাছাড়া আমাদের অবস্থা খুব একটা খারাপ নয়। দরকার হলে কিছু জমি বিক্রি করে তোমার বিয়ে দেবে। আসলে বাবা মানুষটা ভালোই। বোঝালে যেকোনো কিছুই বোঝেন। খারাপ হচ্ছে মা। মা’র বুদ্ধিতে চলে ভুল করছে বাবা।

টগর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। না রে, অন্য অসুবিধাও আছে। একবার বিয়ে হয়ে যাওয়া একটি মেয়েকে ইচ্ছে করলেই আবার বিয়ে দেয়া যায় না।

কে বলেছে যায় না? কত মেয়ের অমন হয়। তাছাড়া স্বামীর সঙ্গে তুমি তো থাকনি। সেই লোকটা তোমাকে ছুঁয়েও দেখতে পারেনি।

এ কথা কেউ বিশ্বাস করবে না। নতুন করে যার সঙ্গে বিয়ে হবে সে তো করবেই না। এসব ব্যাপারে পুরুষ মানুষরা খুব সন্দেহপ্রবণ হয়।

যা ইচ্ছে হোক গে, বিয়ে তোমার অন্য জায়গায়ই হবে। ওই বদমাসটার সংসারে তুমি কখনো ফিরে যাবে না। এই যে মা’র সঙ্গে আজ ঝগড়া করলাম, দেখবে মা এখন থেকে ঠিক হয়ে যাবে। এই ধরনের মানুষরা হচ্ছে শক্তের ভক্ত নরমের যম। তুমি যত নরম হয়ে থাকবে তত তোমার ওপর চেপে বসবে। শক্ত হলে দেখবে তোমার সামনে দাঁড়িয়ে ভয়ে কথা বলবে না।

তারপর একটু থেমে টগর বলল, বুবু, তুমি কিন্তু বিকেলে ফুফুর বাড়ি যেয়ো। চা টা বানিয়ে কাজল ভাইকে খাইয়ে এসো। নয়তো বেচারা মনে কষ্ট পাবে।

টগর হাসিমুখে বলল, না গেলে তুই কি আমার সঙ্গে ঝগড়া করবি, এখন যেমন মা’র সঙ্গে করলি?

গভীর আবেগে টগরের একটা হাত ধরল বুলবুলি। না বুবু, তোমার সঙ্গে আমি কখনো ঝগড়া করব না। কোনোদিন করব না। তোমাকে আমি খুব ভালোবাসি।

দু হাতে বুলবুলির মাথাটা বুকে চেপে ধরে টগর বলল, আমিও তোকে খুব ভালোবাসি।

 

দশ

এই যে সাহেব, আপনার চা।

কাত হয়ে শুয়ে আছে কাজল। তার মুখটা দেখা যাচ্ছে না। তবে সে যে গভীর ঘুমে এটা বোঝা যায়। শ্বাস-প্রশ্বাসের মৃদু শব্দ হচ্ছে।

বিকেল শেষ হয়ে যাচ্ছে। সূর্য ঢলে পড়েছে পশ্চিমে। ফলে রোদ উঠে গেছে গাছপালার মাথায়। ছায়াময় একটা পরিবেশ তৈরি হয়েছে চারদিকে। ঘরের ভেতর আবছা অন্ধকার।

টগর আবার বলল, কী হলো? চা তো ঠাণ্ডা হচ্ছে।

এবার আলতো করে টগরের দিকে মুখ ফেরাল কাজল। ঘুমভাঙা চোখে প্রথমে ভুরু কুঁচকে তাকাল। তারপর ধড়ফড় করে বিছানায় উঠে বসল। আপনি!

সঙ্গে সঙ্গে খিলখিল করে হেসে উঠল টগর। এমা, আবার আপনি করে বলে রে? আমি না বলেছি আমাকে আপনি করে বলা যাবে না!

কাজল সে-কথা খেয়াল করল না। বলল, সত্যি সত্যি আপনি চা নিয়ে আসবেন এ আমি ভাবতেই পারিনি। খালা বলল আপনি খুব চমত্কার চা করেন, এজন্য বুলবুলির সঙ্গে আমি ফাজলামো করেছিলাম।

কাজলের চোখের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় টগর বলল, চা-টা কিন্তু আমি ফেলে দেবো। আপনি যতদিন থাকবেন এই বাড়িতে আমি কিন্তু আর আসব না। আমি যা বলি তা-ই করি কিন্তু।

কাজল ভাবল সে চায়ের কাপটা নিতে দেরি করছে বলে হয়তো রাগ করেছে টগর। তাড়াতাড়ি হাত বাড়িয়ে কাপটা নিতে চাইল সে। দিন।

টগর সঙ্গে সঙ্গে হাত সরিয়ে নিল। না দেবো না। আগে বলতে হবে।

কী?

তুমি। তুমি করে না বললে আমি আপনার সঙ্গে কথা বলব না।

তুমি করে তো মানুষ খুব কাছের মানুষকে বলে, আপন মানুষকে বলে। আমরা কি তেমন আপন?

আপন না ভেবে আপনি আমাকে ডেকেছেন কেন?

ডেকেছি আপন ভেবেই।

আমিও এসেছি আপন ভেবেই।

তাহলে তুমিও আমাকে তুমি করে বলো।

একথা শুনে গভীর লজ্জায় চোখ নত হয়ে গেল কাজলের। মৃদু গলায় সে বলল, না। লোকে খারাপ বলবে।

কাউকে তুমি করে বললে লোকে খারাপ বলবে কেন? আমি যে তোমাকে তুমি করে বলছি এজন্য কি লোকে আমাকে খারাপ বলবে?

না আপনাকে বলবে না। পুরুষ মানুষদের সহজে কেউ খারাপ বলে না। পুরুষদের সাতখুন মাফ। খারাপ সবকিছু শুধু মেয়েদের। আপনি আমাকে তুমি করে বললে এটা কেউ গায়েই মাখবে না। কিছু ভাববেই না। কিন্তু আমি যখন আপনাকে তুমি করে বলতে যাব তখনই চোখ বড় বড় করে তাকাবে সবাই। ভাববে এই বয়সী একটি মেয়ে এই বয়সী একটি ছেলেকে তুমি করে বলছে, নিশ্চয় এর ভেতর কোনো কিন্তু আছে। আপনাকে আমাকে নিয়ে তখন নানারকমের কথা রটাতে থাকবে লোকে।

মানুষের কথাকে তুমি খুব ভয় পাও, না?

পাব না!

কিন্তু তোমাকে দেখে মনে হয় না লোকের ফালতু কথাটথা তুমি খুব একটা পাত্তা দাও।

ফালতু কথা পাত্তা দিই না। সত্য কথা হলে দিই।

আমাকে যদি তুমি তুমি করে বলো, আর ওই নিয়ে কেউ কোনো কথা বলে সেটা কি সত্য কথা হবে?

একথা শুনে অপলক চোখে কাজলের চোখের দিকে তাকিয়ে রইল টগর। কাজলও তাকিয়েছিল টগরের দিকে, খানিকটা সময় কেটে গেল, কেউ টের পেল না।

তারপর হঠাত্ করেই যেন বাস্তবে ফিরল টগর। এখনো চায়ের কাপটি হাতে ধরা তার। কাজলকে দেয়া হয়নি। একেবারেই ঠাণ্ডা হয়ে গেছে চা। এই চা কেউ মুখে দিতে পারবে না। ব্যস্ত হয়ে টগর বলল, যাহ্ আপনার সঙ্গে গল্প করতে করতে তো সব গেছে।

কথাটা বুঝতে পারল না কাজল। উদগ্রীব হয়ে বলল, কী হয়েছে?

চা-টা একেবারে ঠাণ্ডা জল হয়ে গেছে।

তাতে কিছু হবে না, দাও।

চায়ের কাপের দিকে হাত বাড়াল কাজল। টগর হাত সরিয়ে নিল।

না।

কেন? আমার জন্য আনলে এখন দেখি আমাকেই দিতে চাচ্ছ না।

ঠাণ্ডা চা খেতে আপনার ভালো লাগবে না।

তোমার হাতের চা তো, লাগবে।

না, আপনি একটু বসুন, আমি গরম করে আনছি।

কেন অযথা কষ্ট করবে?

কোনো কোনো কষ্ট করতে কেউ কেউ খুব পছন্দ করে।

টগর আর দাঁড়াল না। চায়ের কাপ হাতে বেরিয়ে গেল। 

 

এগারো

চায়ে চুমুক দিয়ে মুখটা উজ্জ্বল হয়ে গেল কাজলের। উচ্ছ্বসিত গলায় বলল, অপূর্ব!

টগর তাকিয়েছিল কাজলের মুখের দিকে। কাজলের মুখ উজ্জ্বল হতে দেখে খুব খুশি হলো সে। লাজুক নরম গলায় বলল, ভালো হয়েছে?

শুধু ভালো না। অপূর্ব। এত ভালো চা বহুকাল খাইনি আমি।

আমাকে খুশি করার জন্য বলছেন না তো!

তোমাকে খুশি করে কী লাভ আমার?

টগর দুষ্টুমির হাসি হেসে বলল, আমি যদি আপনার ওপর খুশি থাকি তাহলে লাভ কিন্তু আপনার আছে।

কাজল আবার চায়ে চুমুক দিল। কী লাভ বলো?

মাঝে মাঝে চা করে খাওয়ালাম।

আমি এত স্বার্থপর নই।

এতে স্বার্থপর হওয়ার কী হলো?

তুমি মাঝে মাঝে চা করে খাওয়াবে বলে অকারণে তোমাকে খুশি করতে হবে আমি তেমন লোক নই। চা দরকার হলে খাব না, মিথ্যে বলব কেন?

কাজলের কথায় মুগ্ধ হয়ে গেল টগর। অদ্ভুত চোখ করে তাকিয়ে রইল কাজলের দিকে। কিন্তু কাজল তাকাতেই দ্রুত সরিয়ে নিল চোখ। মাথা নিচু করে বলল, একবার ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়া চা গরম করে আনলেও আগের স্বাদটা আর থাকে না।

এটাতে আছে।

এটা কিন্তু আগের চা নয়। আগের চা-টা ফেলে দিয়েছি আমি।

বল কী! কেন?

এমনি। ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়া চা আবার গরম করে কেন খাওয়াব? তারচে’ নতুন করে তৈরি করলাম। কারও জন্য কিছু করলে ভালো করেই করা উচিত। ফাঁকি দেয়া উচিত নয়। আমি কোনো কিছুতে ফাঁকি দিতে পারি না।

টগরের কথায় চায়ে চুমুক দিতে ভুলে গেল কাজল। অপলক চোখে তাকিয়ে রইল টগরের দিকে। টগরও তাকিয়েছিল। খানিক তাকিয়ে থেকে বলল, চা ঠাণ্ডা হচ্ছে।

কাজল চায়ে চুমুক দিল। তারপর বলল, আজ আমি বুঝেছি সোনাখালা তোমাকে কেন এত ভালোবাসে।

টগর বলল, কেন ভালোবাসে বলুন তো?

তুমি যে কোনো কিছুতে ফাঁকি দিতে শেখনি এজন্য। তোমার ভালোবাসা এবং মায়ামমতায় কোনো ফাঁকি নেই, কোনো স্বার্থ নেই, এজন্য।

টগর দুঃখী গলায় বলল, কিন্তু এমন হয়ে কী লাভ হলো!

কথাটা বুঝতে পারল না কাজল। বলল, এতে লাভ লোকসানের কী আছে?

টগর নিজেকে সামলাল। আমার মতো মানুষদের কপাল খুব খারাপ হয় জানেন। তারা জীবনে সুখী হয় না। জীবনে নানা রকমের ঝামেলা যায় তাদের।

এবার টগরের ব্যাপারে খালার মুখে শোনা কথাগুলো মনে পড়ল কাজলের। জীবনে যে বেশ বড় একটা দুর্ঘটনা ঘটে গেছে টগরের, আভাসে ইঙ্গিতে সে-কথাই যেন কাজলকে বোঝাল টগর। কিন্তু ফুফু কাজলকে বলে দিয়েছে সে যে এসব কথা শুনেছে তা যেন কিছুতেই টগরের কানে না যায়। সুতরাং এ প্রসঙ্গে কথাই তুলল না কাজল। বলল অন্য কথা। তুমি কিন্তু আমার বেশ একটা ক্ষতি করেছ।

হঠাত্ করে সম্পূর্ণ অন্যরকম একটি কথা, টগর একেবারে হকচকিয়ে গেল। চমকে কাজলের দিকে তাকাল সে। মুখটা ম্লান হয়ে গেল।

আমি আপনার ক্ষতি করেছি? বলেন কী! কী ক্ষতি করলাম? কীভাবে করলাম?

বসো, বলছি।

না আমি বসব না। আপনি বলুন।

বলতে বেশ অনেকক্ষণ সময় লাগবে। তুমি কি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুনবে?

হ্যাঁ দাঁড়িয়েই শুনব। আপনি বলুন।

তোমার কি বসতে কোনো অসুবিধা আছে?

হ্যাঁ আছে।

কী অসুবিধা?

বলা যাবে না।

কেন বলা যাবে না?

শুনলে আপনার মন খারাপ হতে পারে।

টগরের চোখের দিকে তাকিয়ে কাজল বলল, আমার মন খারাপ হলে তোমার কী?

একথার উত্তর টগর দিতে পারল না। মাথা নিচু করে বলল, আপনি বলুন।

না তুমি আগে বলো।

আপনি একেবারে ছেলেমানুষ। কোনো কিছুই বুঝতে চান না। এরকম সন্ধ্যাবেলা একটি ঘরে শুধু আপনি আর আমি, এই ঘরে একটি পালঙ্ক ছাড়া আর কিছু নেই, এই পালঙ্কে আপনার পাশে বসা কি আমার ঠিক হবে? কেউ দেখলে কী ভাববে?

এই বাড়িতে সোনাখালা আর রাবেয়া ছাড়া কেউ নেই।

না থাক। যারা আছে তারাও ভাবতে পারে।

তারা কিছু ভাববে না। সোনাখালা আমাকে যেমন ভালোবাসে তোমাকেও তেমন ভালোবাসে।

হয়েছে। এবার আপনি বলুন আমি আপনার কী ক্ষতি করেছি।

কাজল হেসে বলল, তা কিন্তু আমি এর মধ্যে বলে ফেলেছি।

টগর চোখ বড় করে বলল, কখন বললেন?

এই মাত্র।

আমি তাহলে শুনলাম না কেন?

শুনেছ।

তাহলে বুঝতে পারিনি। আবার বলুন।

ওই যে বললাম, সোনাখালা আমাকে যেমন ভালোবাসে তোমাকেও তেমন ভালোবাসে।

এতে আপনার কী ক্ষতি হলো?

একসময় খালার সব ভালোবাসা ছিল শুধু আমার জন্য এখন সেই ভালোবাসা ভাগ হয়ে গেছে। অর্ধেক চলে গেছে তোমার দিকে আর অর্ধেক রয়ে গেছে আমার। এটা আমার ক্ষতি না, বলো?

টগর একটা হাঁপ ছাড়ল, তারপর মিষ্টি করে হাসল। ইস যা ভয় পাইয়ে দিয়েছিলেন! আমি আপনার ক্ষতি করেছি এরকম কিছু যদি কোনোদিন ঘটে আমি তাহলে মরেই যাব। কিন্তু এই যে ক্ষতিটা করেছ এটার কী হবে?

ফুফুকে আমি বলে দেবো আমাকে তার ভালোবাসার দরকার নেই সে যেন শুধু আপনাকেই ভালোবাসে।

বালিশের তলা থেকে সিগ্রেটের প্যাকেট বের করল কাজল, লাইটার বের করল। টগর, আমি একটা সিগ্রেট খাই?

টগর চোখ তুলে কাজলের দিকে তাকাল। খান। তবে তার আগে কাপটা দিন, আমি যাই।

কেন?

সিগ্রেটের গন্ধ আমার ভালো লাগে না।

তাহলে খাব না।

বাহ্ আমার ভালো লাগা না লাগায় আপনার কী যায় আসে? আপনি খান, আমি চলে যাই।

না, তুমি থাকো। শোন, খালাকে তুমি তাহলে আর একটি কথাও বলে দাও। খালা যেন আমার সঙ্গে ঢাকায় চলে যায়। এখানে একা একা সে কেন পড়ে থাকবে বলো! বয়স হয়েছে, চোখে দেখতে পায় না, ঠিকঠাক মতো হাঁটাচলা করতে পারে না, বড় রকমের কোনো অসুখ-বিসুখ হলে কে তাকে দেখবে? তারচে’ এখানকার বাড়িঘর জায়গাজমি সব বিক্রি করে ঢাকায় গিয়ে আমাদের বাড়িতে থাকলে কত সুখে থাকবে। আমিও মাঝে মাঝে আমেরিকা থেকে খালার সঙ্গে ফোনে কথা বলতে পারি।

কাজলের কথা শুনে মুখ চোখ একেবারেই অন্যরকম হয়ে গেছে টগরের। কিন্তু কাজল তা খেয়াল করল না।

টগর বলল, আমি বললে কি ফুফু যাবে?

নিশ্চয় যাবে। খালা তো যেতে চায় না তোমার জন্য।

আমার জন্য কেন?

খালা তোমাকে খুব ভালোবাসে। তোমারও খুব টান খালার জন্য। এজন্যই তোমাকে ফেলে যেতে চায় না সে।

নিজেই হাত বাড়িয়ে চায়ের কাপটা কাজলের সামনে থেকে হাতে নিল টগর। বিষণ্ন গলায় বলল, আমার কথায় ফুফু যদি এখান থেকে সব গুটিয়ে চলে যায় আমি তাহলে নিশ্চয় ফুফুকে বলব।

টগর আর দাঁড়াল না। 

 

বারো

হাজেরা বেগম বললেন, কী বললি?

তাঁর গলার স্বর সামান্য চড়েছে, ভুরু কুঁচকে গেছে। একবার তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে অন্যদিকে মুখ ফেরাল টগর। ঝাঁঝাল গলায় বলল, এই এক মুশকিল তোমাকে নিয়ে, কোনো কথাই তোমাকে বলা যায় না। কথা শুরু করতে না করতেই, পুরোটা না শুনেই না বুঝেই চেঁচামেচি শুরু করে দাও।

তুই যা বলেছিস আমি কি তা বুঝিনি?

কী বুঝেছ বলো তো?

তুই বলছিস আমার বয়স হয়েছে, চোখে দেখতে পাই না, চলাফেরা করতে পারি না এ অবস্থায় কেন আমি এখানে পড়ে থাকব!

ঠিক বলিনি?

ঠিক তো বলেছিসই।

তাহলে যাবে না কেন?

কেন যাব না সেকথা তোকে একদিন বলেছি।

যা বলেছ আজকালকার দিনে ওসব পুরনো ব্যাপার ধরে কেউ বসে থাকে না। স্বামীর ভিটে বলে নিজে কষ্ট পেয়ে মরে যাবে, তাও সেখানকার মাটি কামড়ে পড়ে থাকবে এটা কোনো কথা নয়। আজকাল এসব জিনিস কেউ মানে না।

হাজেরা বেগম হেসে বললেন, আমি তোদের মতো না।

টগর মুখ ঘুরিয়ে ফুফুর দিকে তাকাল। মানে?

মানে আমি তোদের মতো আজকালকার ছেলেমেয়ে নই। আমি পুরনো দিনের মানুষ। এসব ব্যাপার আমার কাছে খুব মূল্যবান।

কথাটা ঘোরালে কেন তুমি?

কোথায় কথা ঘুরিয়েছি?

তুমি আসলে অন্য কথা বলতে চেয়েছিলে। পরে আর বললে না।

হাজেরা বেগম একটু বিরক্ত হলেন। কী বলছিস টগর?

টগর মুখ গোমরা করে বলল, ঠিকই বলছি। তুমি আসলে আমার কথা বলতে চেয়েছ। আমি ওভাবে শ্বশুরবাড়ি থেকে চলে এসেছি, এই ভেবে তুমি বলেছ, তুমি কি আমার মতো?

টগরের কথায় হাজেরা বেগম একেবারে স্তব্ধ হয়ে গেলেন। ফ্যাল ফ্যাল করে টগরের মুখের দিকে খানিক তাকিয়ে রইলেন তিনি। তারপর খুবই মন খারাপ করা গলায় বললেন, তুই আমাকে এই ভাবলি টগর! ছি ছি ছি! তোর সবচাইতে কষ্টের জায়গায় আঘাত করব আমি! তুই জানিস, তোর কথা ভেবে রাতেরবেলা ঘুমোতে পারি না আমি, তুই সেদিন না খেয়ে চলে গেছিস, তোর কথা ভেবে আমারও আর খাওয়া হয়নি। সত্য কথাটা আজ বলি, আমার তো এখান থেকে যাওয়াও হয় না তোর কথা ভেবে। সেই তোকে এই কথা বলব আমি! টগর, তুই আমাকে এ কী কথা বললি!

শেষ দিকে গলা ধরে এল হাজেরা বেগমের। চোখ ছলছল করে উঠল। কিন্তু টগর তখন আর তাঁর দিকে তাকাচ্ছে না। তারা দুজন বসে আছে রান্নাঘরে। টগর দুপুরের রান্নাবান্না করছে আর জলচৌকি নিয়ে হাজেরা বেগম বসে আছেন তার সামনে। চুলোয় পাঙাস মাছ রান্না হচ্ছে। মৃতের মতো সেই রান্নার তদারক করছিল টগর। এখন বেশ খানিকক্ষণ ধরে রান্নার দিকে খেয়াল নেই তার। মুখ ভার করে বসে আছে।

হাজেরা বেগম বললেন, ঠিক আছে, তুই যদি চাস আমি তাহলে এবারই চলে যাব। কাজলের সঙ্গেই চলে যাব।

এবার ঝট করে হাজেরা বেগমের দিকে মুখ ফেরাল টগর। চোখের জলে গাল ভেসে যাচ্ছে তার। কান্না জড়ানো গলায় সে বলল, কেন তুমি আমার জন্য এই কষ্ট করবে? আমি কি চিরকাল তোমার কাছে থাকতে পারব?

অন্য সময় হলে টগরের কান্না দেখে খুবই দিশেহারা হতেন হাজেরা বেগম, এখন অতটা হলেন না। তাঁর নিজের ভেতরও উথলে উঠেছে অন্য রকমের এক কান্না, অন্য রকমের এক কষ্ট, অভিমান। ফলে টগরের কান্না খুব একটা বিভ্রান্ত করল না তাঁকে। গভীর কষ্টের গলায় তিনি বললেন, তোর বিয়ে হলো আমি ভাবলাম আমারও এখানকার পাট চুকাবার সময় হলো। কাজলের মা-বাবা ভাইবোন সবাই তাড়া দিচ্ছিল। কাজল ঘন ঘন চিঠি লিখছিল আমেরিকা থেকে। আমিও ভাবলাম টগর শ্বশুরবাড়ি চলে গেছে, এখন আর কোন টানে এখানে পড়ে থাকব আমি? কার জন্য পড়ে থাকব? কিন্তু পরদিনই তুই ফিরে এলি। তুই ফিরে এসেছিস এই ভেবে একদিকে আমি একটু আনন্দিতই হয়েছিলাম। স্বার্থপরের মতো ভেবেছিলাম, যাক টগরকে আবার আমি আগের মতো করে আমার কাছে পাব। তারপর মনটা আবার খারাপও হয়েছে। এই ভেবে, তোর মতো এত ভালো একটি মেয়ের কপাল এমন হলো কেন! কত রাত তোর কথা ভেবে আমি তারপর ঘুমোতে পারিনি। প্রতি ওয়াক্ত নামাজের সময় আল্লাহর কাছে আমি দোয়া করি, হে আল্লাহ, আমার টগরের জীবনটা তুমি ঠিক করে দাও। ওর জীবনটা কেন তুমি এমন করলে!

টগরের ইচ্ছে হলো দু হাতে ফুফুকে জড়িয়ে ধরে। ফুফুর কোলে মুখ রেখে অনেকক্ষণ ধরে কাঁদে। কিন্তু টগর তা করল না। নিজের আবেগ বেশ কষ্টে দমাল সে। আঁচল টেনে চোখ মুছল। তবে ফুফুর দিকে তাকাল না। বলল, সবকিছুর পরও আমার জীবন এই ভাবে কাটবে না ফুফু। কোনো না কোনো একটা ব্যবস্থা আমার হবেই। মা-বাবা দুজনেই আমাকে নিয়ে খুব চিন্তিত। বুলবুলি বড় হয়ে গেছে। আমার কোনো একটা ব্যবস্থা না হলে বুলবুলির বিয়ে হবে না। সুতরাং দু-চার মাসের মধ্যে কিছু একটা উপায় হবেই আমার। হয় ওই ছেলের কাছ থেকে ছাড়িয়ে এনে অন্য জায়গায় বিয়ে দেবে আমার, নয়তো ওখানেই ফিরে যেতে হবে।

টগরের কথা শুনে আঁতকে উঠলেন হাজেরা বেগম। ওখানে ফিরে যাওয়ার কথা ভাবছিস তুই? এটা কোনো কথা হলো!

এবার হাজেরা বেগমের দিকে মুখ ফেরাল টগর। তাঁর চোখের দিকে তাকিয়ে স্পষ্ট গলায় বলল, তুমি যদি সব গোছগাছ করে এবার কাজল ভাইর সঙ্গে না চলে যাও তাহলে কাজল ভাই যেদিন চলে যাবে তার পরদিন আমিও ওই বাড়িতে চলে যাব। কোনোদিন এই গ্রামে আর আসব না। কোনোদিন আমার মুখ তুমি আর দেখতে পাবে না। কথা বলতে বলতে শেষদিকে গলা বুজে এল টগরের, চোখ ফেটে যেতে চাইল। অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে রান্নাঘর থেকে বেরোল সে। জড়ানো গলায় বলল, রান্নাবান্না সব করে দিয়ে গেলাম। তুমি না পারলে রাবেয়াকে বোলো বেড়ে দেবে।

টগর আর দাঁড়াল না। দ্রুত পায়ে বারবাড়ির দিকে চলে গেল।

 

তেরো

দূর থেকে টগরকে দেখতে পেল কাজল। কী রকম মন খারাপ করা ভঙ্গিতে হেঁটে যাচ্ছে। এ সময় কোথায় যায় টগর! দুপুর হয়ে গেছে, তাকে খেতে দেবে না? ভারি খিদে পেয়েছে কাজলের।

হাত তুলে টগরকে ডাকল কাজল। টগর, এই টগর!

টগর ছিল আনমনা হয়ে। কাজলের ডাকে চমকে মুখ তুলল। অদূরে কাজলকে দেখতে পেল। নিজের অজান্তেই দাঁড়িয়ে পড়ল।

কাজল এগিয়ে এসে বলল, কোথায় যাও?

ধীর শান্ত গলায় টগর বলল, বাড়ি।

কেন?

বাহ্, বাড়ি যাব না!

এ সময় যাবে কেন? আমাকে খেতে দেবে না?

চোখ তুলে মুহূর্তের জন্য কাজলের দিকে তাকাল টগর। তারপর অন্যদিকে তাকিয়ে বলল, রান্নাবান্না করে দিয়ে এসেছি।

শুধু রান্না করলে হবে, খাওয়াতে হবে না?

ফুফু খাওয়াবে।

খালা পারবে না। তাঁর শরীর খারাপ।

তাহলে রাবেয়া আছে।

ধুত্ কাজের ঝিদের হাতে কে খায়!

তাহলে আমি কী করব বলুন।

কথাটা শুনে একটু চমকাল কাজল। কী হয়েছে টগরের। এমন করে কথা বলছে কেন! কিন্তু এ প্রসঙ্গে কিছু বলল না কাজল। স্বভাব অনুযায়ী হালকা গলায় বলল, কী করবে মানে? সামনে বসে আমাকে খাওয়াবে। সেদিন যেভাবে খাইয়েছিলে। জান, সেদিনের পর খেয়ে আমার আর পেট ভরেনি। খাওয়া তো শুধু হুমহাম করে খেলেই হয় না, পরিবেশের ব্যাপার আছে, পরিবেশনের ব্যাপার আছে। তুমি সামনে বসে থাকলে অল্প খেয়েও আমার পেট ভরে যাবে।

টগর ধীর গলায় বলল, এখান থেকে চলে যাওয়ার পর কে খাওয়াবে আপনাকে? আমাকে তো আপনি আর পাবেন না, তখন আপনার পেট ভরবে কী করে?

এবার টগরের কথায় সত্যি সত্যি চমকাল কাজল। অপলক চোখে তাকাল টগরের দিকে। মুখটা কেমন থমথমে, চোখ দুটো ফোলা ফোলা, লালচে। টগর কি কেঁদেছে! কী হয়েছে টগরের?

কাজল তারপর একেবারেই অন্যরকম করে ফেলল নিজেকে। এতক্ষণকার চাঞ্চল্য আর রইল না তার। গম্ভীর গলায় বলল, তোমার কী হয়েছে টগর?

টগর কাজলের দিকে তাকাল না। অন্যদিকে যেমন তাকিয়েছিল তেমনি তাকিয়ে রইল। কিছু হয়নি।

আমার কাছে কিছু লুকোবে না।

সঙ্গে সঙ্গে কাজলের দিকে মুখ ফেরাল টগর। বেশ রূঢ় গলায় বলল, কেন লুকোব না? কেন আপনাকে সব কথা বলব? আপনি আমার কে?

টগরের এই ধরনের আচরণ একদমই আশা করেনি কাজল। সে একেবারে থতমত খেয়ে গেল। টগরের চোখের দিকে খানিক তাকিয়ে থেকে বলল, তা ঠিক, ঠিকই বলেছ তুমি! আমি কে, কেন আমার কাছে সব কথা তুমি বলবে! আসলে নিজের অধিকারের সীমা আমি অতিক্রম করে গিয়েছিলাম। ভুলে গিয়েছিলাম তুমি আমার কেউ নও। মনে করে দিয়ে ভালোই করেছ।

কাজল আর কথা বলল না। চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়াল।

টগর বলল, শুনুন।

কাজল থমকে দাঁড়াল।

উদাস দুঃখী গলায় টগর বলল, আপনার কাজটা আমি করে দিয়েছি।

কথাটা বলেই ভাবল, এই বুঝি কাজল তার স্বভাবসুলভ চপল গলায় বলে, কী কাজ?

কিন্তু কাজল কোনো প্রশ্ন করল না।

খানিক থেমে থেকে টগর বলল, ফুফুকে আমি রাজি করিয়েছি। তিনি আপনার সঙ্গে চলে যাবেন।

তারপর আর দাঁড়াল না টগর। দ্রুত হেঁটে নিজেদের বাড়ির দিকে চলে গেল।

 

চৌদ্দ

বুলবুলি দিশেহারা গলায় ডাকল, বুবু ও বুবু, কী হয়েছে? কী হয়েছে তোমার? কাঁদছ কেন? ও বুবু!

বালিশে মুখ গুঁজে ফুলে ফুলে কাঁদছে টগর। বাড়ি ফিরেই ঘরে ঢুকেছে সে। বিছানায় লুটিয়ে পড়েছে। বুলবুলি ছিল বাংলাঘরে। সেখান থেকে দেখতে পেয়েছে বাড়ি ঢুকে কোনোদিকে না তাকিয়ে দ্রুত পায়ে ভেতর বাড়ির দিকে চলে যাচ্ছে টগর। টগরের এই ভঙ্গিটি বুলবুলির চেনা। গভীর দুঃখ পেলে এমন করে টগর।

বুলবুলি তারপর টগরের পিছু পিছু এসেছে। এসে দেখে বালিশে মুখ গুঁজে কাঁদছে টগর। বুলবুলি আবার ডাকল, বুবু ও বুবু!

টগর সাড়া দিল না। কান্নাও থামাল না।

এবার টগরের পাশে বসল বুলবুলি। দু হাতে টানাটানি করতে লাগল টগরকে। কী হয়েছে আমাকে বলো। কাঁদছ কেন? বুবু ও বুবু!

কান্নার প্রাথমিক ধকলটা ততক্ষণে সামলেছে টগর। তবু কথা বলতে পারছে না। গলা বুজে আছে তার।

বুলবুলি বলল, কে কী বলেছে আমাকে বলো। কী হয়েছে আমাকে বলো।

প্রায় জোর করে টগরকে তুলল বুলবুলি। টগরের মুখের দিকে তাকাল। তাকিয়ে চমকে উঠল। অনেকক্ষণ ধরে কাঁদলে যেমন হয় মুখ, টগরের মুখ তেমন। কিন্তু এখন তো খুব একটা বেশি সময় ধরে কাঁদেনি টগর। এই সামান্য সময়ে, সামান্য কান্নায় তো মুখ এমন হওয়ার কথা নয়। তাহলে কি আগেও টগর কেঁদেছে! অনেকক্ষণ ধরে কেঁদেছে?

কেন, কী হয়েছে?

বুলবুলি আবার বলল, কী হয়েছে বুবু?

আঁচলে চোখ মুছে বড় করে একটা শ্বাস ফেলল টগর। আমি ওর সঙ্গে খুব খারাপ ব্যবহার করেছি।

কার সঙ্গে?

কাজল ভাইর সঙ্গে।

কেন?

আমার মনটা ভালো ছিল না। ফুফুর সঙ্গেও উল্টোপাল্টা কথা বলেছি।

কেন? ফুফু তোমার কী করেছে?

আমার জন্য এখানে পড়ে আছে কেন সে? কেন চলে যায় না? কাজল ভাই আমাকে বলেছিল আমি যেন ফুফুকে চলে যেতে বলি। আমি বলেছি, বলতে আমার খুব কষ্ট হয়েছে, তবু বলেছি।

তার মানে ফুফু এখান থেকে চলে যাবে?

হ্যাঁ সবকিছু বিক্রি করে চলে যাবে। আর কখনো এখানে আসবে না।

কথা বলতে বলতে জলে আবার চোখ ভরে এল টগরের। কিন্তু বুলবুলি তা খেয়াল করল না। বলল, কাজল ভাইর কথায় ফুফুকে যখন এসব বলেছই তাহলে আবার কাজল ভাইর সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করতে গেলে কেন?

করতে আমি চাইনি। হয়ে গেছে। আমি কেন রোজ রোজ তাকে সামনে বসে খাওয়াতে যাব, বল! আমার কষ্ট হয় না? সে এখান থেকে চলে যাওয়ার পর এই কষ্ট আমি সহ্য করব কী করে! এমনিতেই কত কষ্ট আমার, তার ওপর কেন সে আমার কষ্ট আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে? আবার বলে আমি সামনে বসে না খাওয়ালে তার পেট ভরে না। সব জেনে শুনে সে কেন এমন করছে আমার সঙ্গে!

বুলবুলি চোখ বড় করে বলল, সব জেনে শুনে মানে?

আমার বিয়ে হয়ে গেছে, শ্বশুরবাড়ি থেকে ওভাবে চলে এসেছি আমি।

এসব সে জানবে কী করে? তুমি বলেছ নাকি?

না আমি বলিনি। ফুফু নিশ্চয় বলেছে।

আমার মনে হয় না এসব কথা কাজল ভাইকে বলবে ফুফু।

না বললেই বা কী! আমার যে বিয়ে হয়েছে তা তো সত্য।

বিয়ে হয়েছে ঠিকই কিন্তু বরের সঙ্গে তুমি থাকনি! সংসার করনি। সুতরাং ওটা কোনো বিয়েই নয়।

তারপর একটু থেমে বুলবুলি বলল, বুবু আমি তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করব? তুমি রাগ করবে না তো? ভাববে না তো ছোট বোন হয়ে কেন তোমার সঙ্গে আমি এই ধরনের কথা বলছি? আসলে আমিও বড় হয়েছি, বয়সের ব্যবধান থাকলেও কিন্তু বোনে বোনে খুব বন্ধুত্ব হয়। আমাকে এখন আর তুমি ছোট বোন ভাববে না, ভাববে তোমার বন্ধু। সেভাবেই আমার কথার জবাব দেবে।

এই অবস্থায়ও বুলবুলির কথা শুনে খুব অবাক হলো টগর। আশ্চর্য ব্যাপার, বুলবুলি কোন ফাঁকে এত বড় হয়ে গেছে! পাশাপাশি থেকেও বুলবুলির বড় হয়ে যাওয়াটা টের পায়নি সে। তবে বুলবুলির কথা শুনে তাকে খুব ভালো লাগল টগরের। বুলবুলি বড় হয়েছে—এটা তার জন্য ভালোই হয়েছে। অনেক কথাই বুলবুলিকে এখন থেকে বলতে পারবে সে।

কান্নার একটা হেঁচকি উঠল টগরের। সেই হেঁচকি সামলে বলল, বল। আমি কিছু ভাবব না।

কাজল ভাইর জন্য তোমার কি খুব মন কেমন করে?

চোখ তুলে বুলবুলির দিকে তাকাল টগর। তারপর আস্তে করে বলল, হ্যাঁ। ফুফুর মুখে তার কথা শুনতে শুনতে নিজের অজান্তেই তাকে নিয়ে অনেক কিছু অনেকদিন ধরে ভাবতে শুরু করেছিলাম আমি। ফুফুর কাছে তার ছবি দেখেছি। ছবি দেখে এত ভালো তাকে আমার লেগেছে, এত আপন তাকে আমার মনে হয়েছে, আমার ভেতরটা কী রকম যেন হয়ে গিয়েছিল তার জন্য। মনে মনে কতদিন চেয়েছি সে আসুক, অন্তত একবার সে এখানে আসুক, খুব কাছে থেকে তাকে একটু দেখি। সেই আসা এল, কিন্তু এমন সময় এল আমার জীবনটা ততদিনে ছারখার হয়ে গেছে।

জলে আবার চোখ ভরে গেল টগরের।

আশ্চর্য রকমের শান্ত গলায় বুলবুলি বলল, এমন কোনো ছারখার তোমার জীবন হয়নি বুবু। এর চেয়েও কত বড় বড় ঘটনা ঘটে মানুষের জীবনে! তুমি সরাসরি কাজল ভাইর সঙ্গে কথা বলো।

কী বলব?

তোমার কথা। তোমার ভালোলাগার কথা। তাকে নিয়ে তুমি যা যা ভেবেছ সব তাকে খুলে বলো।

না না আমি তা পারব না। আমি তা কিছুতেই পারব না।

কেন পারবে না? আজকাল আর সেই দিন নেই মেয়েদের, ‘বুক ফাটবে তো মুখ ফুটবে না’। আজকাল সব কথা সরাসরিই বলতে হয়।

আমি বলতে পারব না। বললে সে আমাকে লোভী ভাববে। একবার বিয়ে হয়ে যাওয়া একটি মেয়ে একথা কাউকে বলতে পারে না। না আমি বলব না, আমি কিছুতেই বলব না। সারাজীবন তার কথা ভেবে কষ্ট পাব, মরে যাব, তবু বলব না। আমার কপালে যা আছে তা-ই হবে।

টগর আবার কাঁদতে লাগল।    

 

পনেরো

হাজেরা বেগম বললেন, আমি তোর কথা শুনতে পারি কিন্তু তোকেও আমার একটা কথা শুনতে হবে।

এ কথার মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারল না কাজল। বোকার মতো চোখ করে খালার মুখের দিকে তাকাল। কথা তো একসঙ্গে দুটো বললে। কোনোটাই আমি বুঝতে পারিনি। আমার কোন কথা শুনতে পারো তুমি?

এখানকার সব কিছু বিক্রি করে তোর সঙ্গে ঢাকায় চলে যাওয়া।

তা-ই নাকি!

হাজেরা বেগমের পালঙ্কে তাঁর কোলের কাছে শুয়েছিল কাজল, তড়াক করে উঠে বসল, দু হাতে খালাকে জড়িয়ে ধরল। তুমি খুব ভালো খালা, তুমি খুব ভালো। আমি অবশ্য জানতাম আমার কথা তুমি না রেখে পারবে না। ইস, বাড়ির সবাই যা খুশি হবে!

হাজেরা বেগম গম্ভীর গলায় বললেন, কিন্তু আমার কথাটাও তোকে শুনতে হবে।

কী কথা বলো! তোমার সব কথা আমি শুনব।

বিয়ে করতে হবে।

হঠাত্ করে এরকম একটি কথা বলবে খালা—এ স্বপ্নেও ভাবেনি কাজল। সে বেশ থতমত খেল। কাকে বিয়ে করতে হবে?

তোর যাকে পছন্দ তাকেই করবি। 

আমার কোনো পছন্দ নেই!

তাহলে মেয়ে দেখব আমরা।

তোমরা মানে কী?

তোর মা, বাবা, আমি। দরকার হলে ঘটক লাগাব।

কিন্তু বিয়েটা করতে হবে কবে?

যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। আমেরিকায় যাওয়ার আগে। তুই কাছে না থাকলে ঢাকায় গিয়ে তোদের বাড়িতে আমার মন টিকবে না। বিয়ে করে বউ যদি আমার কাছে রেখে যাস, বউ দেখে তোর কথা ভুলে থাকব আমি।

বাহ্, বিয়ে করে বউ আমি দেশে ফেলে রাখব কেন?

তাহলে তুইও দেশে থাকবি।

দেশে থেকে করব কী! বউকে খাওয়াব কী!

চাকরি বাকরি করবি।

বিদেশে থেকে হাত এত বড় হয়ে গেছে খালা, দেশে থেকে পাঁচ-সাত হাজার টাকা মাইনের চাকরি করে আমার পোষাবে না। ওই টাকায় আমার নিজের খরচই চলবে না। তাহলে ব্যবসা-বাণিজ্য করবি।

ব্যবসা করতে টাকা লাগবে না! টাকা আমি কোথায় পাব?

এতদিন ধরে বিদেশে আছিস, লেখাপড়া করছিস না, চাকরি বাকরি করছিস, তোর হাতে ভালো টাকা থাকার কথা।

কিন্তু আমার হাতে একদম টাকা-পয়সা নেই খালা। একটি পয়সাও জমাতে পারিনি। এক নাগাড়ে তিন-চার মাসের বেশি কাজ করতে পারি না আমি। কাজগুলো সব কষ্টের তো, তিন-চার মাস করে কিছু টাকা হাতে জমলে তিন-চার মাস বসে খাই আমি। তারপর টাকা ফুরিয়ে গেলে আবার কাজে ঢুকি। তুমি যে এবার আমাকে বিয়ে করতে বলছ, বিয়েই বা কী করে করব! বিয়ে করতে আজকাল প্রচুর টাকা লাগে। আমার হাতে টাকা নেই। কী করে বিয়ে করব! বাবার কাছেও চাইতে পারব না। বিদেশ থাকা একটি ছেলে কী করে বিয়ের টাকা বাবার কাছে চায়!

হাজেরা বেগম গম্ভীর গলায় বললেন, টাকার অসুবিধা হবে না। টাকার ব্যবস্থা আমি করব। কিন্তু বিয়ে তোকে এবার করে যেতে হবে।

কাজল সুন্দর করে হাসল। করব।

আর বিদেশে থেকে তুই যখন তেমন কোনো সুবিধা করতে পারছিস না তাহলে বিদেশে না হয় আর না-ই বা গেলি। এদেশে থেকেই ব্যবসা-ট্যবসা করলি। এখানকার সবকিছু বিক্রি করলে ভালো টাকা পাওয়া যাবে। ওই টাকা ব্যাংকে রাখার দরকার কী। ওই টাকা দিয়ে ব্যবসা কর।

তুমি তোমার সব কিছু আমাকে দিয়ে দেবে?

তোকে ছাড়া আর কাকে দেবো! তুই ছাড়া আর কে আছে আমার?

কথাটা বলার সঙ্গে সঙ্গে টগরের কথা মনে পড়ল হাজেরা বেগমের। বুকটা তোলপাড় করে উঠল। খানিকক্ষণ উদাস হয়ে রইলেন তিনি। কথা বলতে পারলেন না।

কাজল তখন নতুন এক স্বপ্নে বিভোর হয়েছে। খালার বিশ-পঁচিশ লক্ষ টাকা নিয়ে যদি বিজনেস করা যায় তাহলে আমেরিকায় যাওয়ার আর প্রশ্নই ওঠে না। বছরে একবার গিয়ে গ্রিনকার্ড রিনিও করিয়ে এলেই হবে। টাকা থাকলে বসবাসের জন্য এদেশ সবচে’ ভালো দেশ।

কাজল কিছু একটা বলতে যাবে, তার আগেই হাজেরা বেগম বললেন, এসব ব্যাপারে টগরকে কি তুই কিছু বলেছিস?

কাজল একটু থতমত খেল। তারপর বলল, বলেছি।

কী বলেছিস?

টগরের জন্য তুমি এখানে পড়ে আছ, এই সব।

কেন বলতে গেলি?

বাহ্ বলব না। আমি তো চাইব যেমন করে পারি তোমাকে এখান থেকে নিয়ে যাই। টগরের জন্য তুমি যাচ্ছ না—এসব টগরকে আমি বলেছি। টগর তোমাকে কী বলল?

খুব কান্নাকাটি করল। আমাকে জোর দিয়ে বোঝাল কেন আমি এখানে পড়ে থাকব। এখন এখান থেকে আমি যেমন তোর জন্য যাচ্ছি তেমনি টগরের জন্যও যাচ্ছি। একদিকে টগর যেমন নরম মনের মেয়ে অন্যদিকে তেমন জেদিও। এখন তোর সঙ্গে না গিয়ে আমার আর উপায় নেই। আমি না গেলে যা ইচ্ছে তা-ই করে ফেলবে সে।

কী করবে?

আমার ওপর জেদ করে ওই মাতাল স্বামীর ঘর করতে চলে যাবে।

বলল তোমাকে?

না তা অবশ্য বলেনি। আমি বুঝেছি। টগরকে আমি খুব ভালো করে চিনি।

তবে টগর নিজে যদি ঠিক থাকে খালা তাহলে কিন্তু ওই মাতাল স্বামীকে সে ঠিক করে ফেলতে পারবে। মেয়েরা ইচ্ছে করলে যেকোনো খারাপ পথ থেকে ফিরিয়ে আনতে পারে স্বামীকে।

টগরের স্বামীর কথায় এবার অন্য একটি কথা মনে পড়ল হাজেরা বেগমের। বেশ চিন্তিত হলেন তিনি। ও কাজল, টগরকে কি তুই ওর বিয়ে টিয়ের ব্যাপার নিয়ে কিছু বলেছিস নাকি?

কাজল অবাক হয়ে বলল, না তো!

তারপর একটু থেমে বলল, তুমি না বললে আমি যেন ওকে কখনো ওসব কথা না বলি। তুমি মানা করেছ সে-কথা আমি বলতে যাব কেন?

হাজেরা বেগম আশ্বস্ত গলায় বললেন, ভালো করেছিস। তোর মুখ থেকে ওসব কথা শুনলে মেয়েটি খুব লজ্জা পেত। মেয়েদের জন্য এই ধরনের ব্যাপার খুব লজ্জার।

কেন, লজ্জার হবে কেন? টগর খারাপ কিছু করেনি। লোকটি একটি ইতর, বাসরঘরে ঢুকেছে বদ্ধ মাতাল হয়ে। তার সঙ্গে ঘর টগর করবে কেন? টগর যা করেছে একদম ঠিক করেছে।

হাজেরা বেগম একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। কিন্তু জীবনে বড় রকমের একটা দাগ পড়ে গেল মেয়েটির!

এ অমন কিছুই না। টগর দেখতে খুব সুন্দর, মা-বাবা চেষ্টা করলে যেকোনো ভালো ছেলের কাছে বিয়ে দিতে পারবে টগরকে।

আমাদের দেশের ছেলেরা একবার বিয়ে হয়ে যাওয়া মেয়েকে সহজে বিয়ে করতে চায় না, সেই মেয়ে যতই সুন্দর হোক। যদিও বিয়ে টগরের হয়েছে নামমাত্র, স্বামীর সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক হয়নি। তবু টগরকে কেউ বিয়ে করতে চাইবে না।

যারা না চাইবে তারা বোকা। এসব কোনো ব্যাপারই না।

কাজলের চোখের দিকে তাকিয়ে হাজেরা বেগম বললেন, তুই করবি?

কাজল আশাই করেনি খালা এই ধরনের একটি কথা বলবে। সে একেবারে থতমত খেয়ে গেল। মুখে কোনো কথা জুটল না তার।

হাজেরা বেগম বললেন, মুখে অনেক কথাই বলা যায়, কিন্তু কার্যক্ষেত্রে সেটা করা বেশ কঠিন। বাদ দে ওসব, টগরের কপালে যা আছে তা-ই হবে। আমাদের গ্রামে রসিকলাল নামে একজন দালাল আছে, ঘরবাড়ি জায়গাজমি এসব বেচাকেনা করে, তাকে খবর দিয়েছি, কাল সকালে আসবে। তার সঙ্গে কথা বলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সবকিছু বিক্রির ব্যবস্থা কর। যেতে যখন হবেই তখন আর দেরি করে লাভ কী!

কাজল এখন আর কোনো কথা বলছে না। আনমনা হয়ে কী ভাবছে!   

 

ষলো

টগর নরম গলায় বলল, আপনার চা।

কাজল চমকে টগরের দিকে তাকাল। আজ দুপুরে আর ঘুমোয়নি সে। শুয়েছিল ঠিকই কিন্তু ঘুম আসেনি। অনেকক্ষণ গড়াগড়ি করে বিকেলবেলা বিছানায় উঠে বসেছে। বিছানার সঙ্গে যে জানালা সেই জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে উদাস হয়ে সিগ্রেট টানছিল। কখন এসে ঘরে ঢুকেছে টগর টের পায়নি।

কিন্তু টগরের দিকে তাকাল কাজল ঠিকই, চায়ের কাপটা ধরল না। সিগ্রেটটা জানালা দিয়ে ছুড়ে ফেলে বলল, চা খাব না।

টগর চমকাল। কেন?

এবার টগরের চোখের দিকে তাকাল কাজল। কাল দুপুরে টগর যেমন করে বলেছিল ঠিক তেমন করে বলল, তুমি আমার কে যে তোমার হাতের চা আমি খাব।

টগর বুঝে গেল গভীর অভিমানে এই কথাটা বলেছে কাজল। বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল তার। অন্যমনস্ক চোখে কাজলের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল সে। তারপর শান্ত গলায় বলল, রাগ করেছেন?

কাজল টগরের দিকে তাকাল না। বলল, না রাগ করব কেন? রাগ তো মানুষ আপন মানুষের সঙ্গে করে। তুমি কি আমার আপন যে তোমার সঙ্গে আমি রাগ করব!

আসলে আমার মনটা তখন খুব খারাপ ছিল। আমি এমন করে আপনাকে বলতে চাইনি। বলা হয়ে গেছে। ফুফুকে অনেক রকম ভাবে বোঝাবার চেষ্টা করেছিলাম তো, এজন্য ফুফুর সঙ্গে অনেক কথা কাটাকাটি হয়েছে, ঝগড়া হয়েছে। শেষ পর্যন্ত ফুফু যখন চলে যেতে রাজি হলো তখন আবার অন্য রকম কষ্ট। মা মারা যাওয়ার পর থেকে ফুফুকে ছাড়া কিছু বুঝিনি আমি, ফুফুকে ছেড়ে দু-তিনটে দিন একসঙ্গে কোথাও থাকিনি, সেই ফুফুকেই যখন বুঝিয়ে সুঝিয়ে চিরতরে দূরে সরিয়ে দিচ্ছি আমি, আমার মনের অবস্থাটা কী হতে পারে আপনি একবার ভেবে দেখুন।

টগরের কথা শুনতে শুনতে টগরের জন্য অদ্ভুত এক মায়ায় মন ভরে গেল কাজলের। চোখ তুলে টগরের দিকে সে তাকিয়ে রইল।

টগর তখন অন্যদিকে তাকিয়ে আছে। চোখ ছলছল করছে তার। তবু আগের মতো গভীর দুঃখের গলায় টগর বলল, আমার কপালটাই এমন, খুব আপন ভেবে যাকে আঁকড়ে ধরি সে আমার কাছে থাকে না। ছোটবেলায় মাকে ছাড়া কিছু বুঝতাম না। একটু বড় হয়েছি, মা আমাকে ছেড়ে চলে গেল। তারপর থেকে ফুফুকে মা ভাবতে শুরু করেছি। যদিও ফুফুর সঙ্গে আমার কোনো রক্তের সম্পর্ক নেই, তবু মনে হয় ফুফু ছাড়া এই পৃথিবীতে আমার কোনো আপনজন নেই, সেই ফুফুকে আমি আপনার কথায় দূরে সরিয়ে দিচ্ছি, মন তো আমার খারাপ হবেই! ফুফুকে ছেড়ে আমি কেমন করে থাকব!

কাজলের জন্য এত বড় একটা ত্যাগ স্বীকার করছে টগর—এই ভেবে কাজল একেবারেই অভিভূত হয়ে গেল। কোনো কিছুই ভাবল না সে, হাত বাড়িয়ে টগরের একটা হাত ধরল। তুমি বসো টগর, বসো। তোমার সঙ্গে আমার অনেক কথা আছে।

টগর কোনো বাধা দিল না, প্রতিবাদ করল না, নরম ভঙ্গিতে কাজলের পাশে বসল। জলে কখন চোখ ভরে গেছে তার। মাথা নিচু করে চোখের জল সামলাতে লাগল সে। চায়ের কাপের দিকে হাত বাড়িয়ে কাজল বলল, দাও চা দাও।

সঙ্গে সঙ্গে হাত সরিয়ে নিল টগর, না এই চা খেতে আপনার ভালো লাগবে না। একটু বসুন আমি আবার চা করে আনছি।

দরকার নেই। এটাই দাও তুমি। তুমি নিয়ে এসেছ, এই চা ঠাণ্ডা হোক কিংবা গরম তাতে কিছু এসে যায় না। তুমি হাত দিয়ে ছুঁয়ে দিলে বিষ খেতেও আমার ভালো লাগবে। প্রায় জোর করে টগরের হাত থেকে চায়ের কাপটা নিল কাজল।

টগর বলল, কেন এভাবে বলছেন। আমার কষ্ট বাড়িয়ে কী লাভ আপনার!

কাজল চায়ে চুমুক দিল না। চায়ের কাপ হাতে ধরে টগরের মুখের দিকে তাকাল। আমার কখনো কোনো কষ্ট ছিল না। এই প্রথম কারও জন্য বুকের ভেতর অদ্ভুত এক কষ্ট তৈরি হয়েছে। কেন আমার জন্য তোমার ফুফুকে তুমি এভাবে ছেড়ে দিচ্ছ? এ কোন অপরাধের মধ্যে আমাকে তুমি ফেলে দিলে! আমার জন্য এতটা তুমি কেন করলে!

কোনো কোনো মানুষ থাকে যাদের জন্য সব করা যায়। নিজের জীবনটাও দিয়ে দেয়া যায় সেই মানুষটির জন্য।

তারপরই যেন খেয়াল হলো টগরের কাজল চায়ে চুমুক দেয়নি, চা-টা একেবারেই ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। টগর প্রায় ছটফটে ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়াল। এই চা মুখে দেয়া যাবে না। কাপটা দিন।

কাজল বলল, না।

তারপর চায়ে চুমুক দিল। দু-তিন চুমুকে পুরো কাপের চা শেষ করে কাপটা নামিয়ে রাখল।

টগর বলল, কেন অযথা ঠাণ্ডা চা খেলেন!

টগরের চোখের দিকে তাকিয়ে কাজল বলল, অনেক কষ্ট তোমাকে আমি দিয়ে ফেলেছি টগর, আর কত কষ্ট দেবো!

টগর মনে মনে বলল, কষ্ট দেয়ার আর বাকি আছে কী! নিজের অজান্তে যে কষ্টের মধ্যে আমাকে তুমি ফেলে দিয়েছ সেই কষ্টে চিরকাল ডুবে থাকব আমি। আমার সেই কষ্টের কথা আমি ছাড়া কেউ জানবে না, কেউ অনুভব করবে না। তুমি তো দু দিন পর চলে যাবে, জীবনে আর কখনো এখানে তুমি ফিরবে না, নিয়তির টানে আমিও ভেসে যাব কোথায় কে জানে, এই জীবনে তোমার মুখখানি আমার আর কখনো দেখা হবে না, তুমি জানবেই না একজন মানুষ বহুদূরের মানুষ হয়েও তোমার জন্যে ধুঁকে ধুঁকে মরছে।

কাজল বলল, বড় অদ্ভুত এক সময়ে তোমার সঙ্গে আমার দেখা হলো।

টগর চোখ তুলে কাজলের দিকে তাকাল। কাজলও তাকাল। তারপর কী বলবে বলতে ভুলে গেল। টগরের নাকে নথ নেই, নথ পরার জন্য কবে ছিদ্র করা হয়েছিল নাক, আজ বিকেলের ম্লান আলোয় কাজল দেখতে পেল নথহীন নাক টগরের কী রকম বিষণ্ন দেখাচ্ছে। আশ্চর্য, টগর যে নথ পরে না কাজল তা কেন খেয়াল করেনি!

টগর নরম গলায় বলল, কী দেখছেন?

তোমাকে। তুমি কখনো নথ পরো না?

পরেছিলাম।

তারপর?

খুলে ফেলেছি।

কেন?

সে-কথা আপনাকে বলা যাবে না।

তারপর একটু থেমে টগর বলল, কী যেন বলতে চেয়ে থেমে গেলেন?

কাজল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আরও আগে তোমার সঙ্গে দেখা হলে ভালো হতো। এমন সময়ে তোমার সঙ্গে আমার দেখা হলো যখন তুমি অনেক দূরের মানুষ।

দূরের মানুষ কথাটা বুঝতে পারল না টগর। বলল, দূরের মানুষ বলছেন কেন?

সঙ্গে সঙ্গে খালার কথা মনে পড়ল কাজলের। খালা বলেছিলেন টগরের ব্যাপারে সবকিছু যে কাজল জানে একথা যেন টগর কিছুতেই না জানে। ভেতরে ভেতরে সাবধান হয়ে গেল কাজল।

টগর বলল, দূরের মানুষ হলে কেউ এত কাছে আসে! দূরের মানুষের জন্য কেউ এমন করে কষ্ট পায়! দূরের মানুষের সঙ্গে কেউ অমন অভিমান করে, আপনি যেমন করলেন!

কাজল ম্লান হেসে বলল, না না দূরের মানুষ তুমি নও। দূরের মানুষ হলে আমার জন্য এতবড় ত্যাগ তুমি কখনো করতে না। পৃথিবীর কেউ তা করে না। তুমি আমার কাছের মানুষ, কত যে কাছের মানুষ সে কেবল আমি জানি।

টগর তারপর মুখে কোনো কথা বলতে পারল না, কাজলের চোখের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল, এমন করে আরও বলো। আরও অনেক কথা বলো। তুমি চলে যাওয়ার পর আমি একেবারে নিঃস্ব হয়ে যাব, আমার আর কিছুই থাকবে না, এমন করে তুমি যেসব কথা বলবে সেসব কথাই আমার হূদয়ের সম্পদ হয়ে থাকবে। এসব কথা মনে করে কেটে যাবে আমার সারাবেলা। কোনো দুঃখ-বেদনা আমাকে স্পর্শ করতে পারবে না। বলো, আরও বলো তুমি।

কাজল বলল, তোমার কথা আমার খুব মনে পড়বে টগর, খুব মনে পড়বে। তোমাকে আমি কখনো ভুলতে পারব না। এখান থেকে চলে যাওয়ার পর ঢাকায় থাকব কিছুদিন, তারপর হয়তো আমেরিকায় চলে যাব কিংবা এমনও হতে পারে আমেরিকায় আপাতত গেলাম না, খালা বলেছেন, তাঁর টাকায় বিজনেস করতে, যদি বিজনেস শুরু করি তাহলে প্রতি বছর একবার মাসখানেকের জন্য আমেরিকায় যাব কাগজপত্র ঠিক রাখতে। খালা খুব চাইছেন ঢাকায় গিয়েই বিয়ে করি আমি, সংসারী হই, হয়তো তা-ই করব। একেবারেই ব্যস্ত জীবন হয়ে যাবে আমার। বউ-সংসার, টাকাপয়সা, অন্য দশটি সাধারণ মানুষের মতো জীবন। তবুও সেই জীবনে আমার সবচে’ আনন্দের স্মৃতি হয়ে থাকবে তুমি। ভালো লাগার স্মৃতি হয়ে থাকবে।

কাজলের কথা শুনতে শুনতে বুকের ভেতর উথাল পাথাল করে উঠছিল টগরের। দুঃসহ এক বেদনায় চোখ ফেটে যাচ্ছিল গভীর এক কান্নায়। অনেকক্ষণ কান্নাটা ধরে রাখল টগর, তারপর আর পারল না, ডুকরে কেঁদে উঠল সে। তারপর মুখ চেপে ছুটে বেরিয়ে গেল।

 

সতেরো

মতি মিয়া বাড়ি ফিরে গদগদ কণ্ঠে বললেন, শুনছ, ভালো একটা খবর আছে। খুব ভালো খবর।

খোদেজা তাচ্ছিল্যের গলায় বললেন, তোমার আর ভালো খবর! কী ভালো খবর তুমি দেবে আমার জানা আছে।

পালঙ্কের একপাশে বসে মতি মিয়া বললেন, এটা তুমি জান না।

খোদেজাও বসলেন পাশে। অন্যদিকে তাকিয়ে বললেন, বলো তাহলে শুনি।

হামেদের বাবা খবর পাঠিয়েছে।

কোন হামেদ?

আরে হামেদকে চিনতে পারছ না? তোমার মেয়েজামাই।

খরচোখে এবার স্বামীর মুখের দিকে তাকালেন খোদেজা। গম্ভীর গলায় বললেন, আমার মেয়েজামাই নয়, তোমার মেয়েজামাই। টগর আমার মেয়ে নয়, সে তোমার মেয়ে। আমার মেয়ে হচ্ছে বুলবুলি।

খোদেজার কথা শুনে মতি মিয়া একটু দমে গেলেন। ইস, তুমি সব সময় এমনভাবে কথা বলো, মানুষের ভালো মন খারাপ করে দাও। কোনো কথা বলতে শুরু করলে তা আর বলতে ইচ্ছে করে না।

ইচ্ছে না করলে বোলো না। কে বলেছে বলতে?

কেউ বলেনি, নিজের গরজেই বলছি।

কিন্তু আমার কোনো গরজ নেই তোমার বড় মেয়ের ব্যাপারে কথা শোনার। আগে যা-ও একটু ভালো জানতাম, ওর ব্যাপারে চিন্তাভাবনা করতাম, সেদিনের পর থেকে সেটুকুও করছি না। একেবারেই বাদ দিয়ে দিয়েছি।

কিন্তু সেদিন টগর তোমাকে কিছু বলেনি, বলেছে বুলবুলি। তোমার মেয়ে।

বুলবুলিকে টগর সব শিখিয়ে দিয়েছে, নয়তো বুলবুলির কখনো সাহস হতো না আমার মুখের সামনে দাঁড়িয়ে আমার সঙ্গে ওই ভাষায় কথা বলে, আমাকে শাসায়। এসব টগরের চাল। বুলবুলি টগরের খুব বাধ্য, এজন্য বুলবুলিকে দিয়ে সে আমার ওপর প্রতিশোধ নিল।

কিসের প্রতিশোধ?

ওই যে সেদিন হাজেরা বুবুর বাড়ি থেকে তোমার নাম করে ডেকে আনালাম। ওটা কিছুতেই মেনে নেয়নি টগর। ওই বাড়িতে তো মধু। এতদিন শুধু ফুফু ফুফু করত, সেদিন থেকে জুটেছে আরেকজন, হাজেরা বুবুর বোনপো কাজল। এখন শুধু কাজল কাজল করে তোমার মেয়ে। সারাক্ষণ পড়ে থাকে ওই বাড়িতে। দেখো এই নিয়ে কোনো না কেলেংকারি হয়।

তা হবে না। কেলেংকারি হওয়ার আগেই বিদেয় হয়ে যাচ্ছে টগর।

কোথায় বিদেয় হবে?

শ্বশুরবাড়ি।

মানে? তোমার মেয়ে শ্বশুরবাড়ি যাবে? পাগল হয়েছ? তোমার মেয়েকে তুমি চেন?

চিনি, ভালো করে চিনি। এখন যে ধরনের ব্যবস্থা হচ্ছে তাতে সে যাবে।

কী ব্যবস্থা হচ্ছে?

এটাই বলতে শুরু করেছিলাম, তুমি কথা নিয়ে গেলে অন্যদিকে।

ঠিক আছে, এখন বলো।

হামেদ তার বাবাকে নিয়ে এসেছিল আড়তে। বেপারি সাহেবও ছিলেন। হামেদ আমার হাতে-পায়ে ধরে মাফ চাইল, সাংঘাতিক অন্যায় হয়ে গেছে স্বীকার করল, ওর বাবাও নানা রকমভাবে মাফটাপ চাইল, এ রকম আর কখনো হবে না বলল।

বুঝলাম। আসল কথাটা বলো।

আসল কথা হচ্ছে টগরকে তারা ফিরিয়ে নিতে চায়। বেপারি সাহেবও বললেন, যেহেতু অন্যায় স্বীকার করেছে, এখন আর মেয়ে আটকে রাখা আমাদের ঠিক হবে না। এত করে যখন বলছে, মেয়ে দিয়ে দাও। এরপর মদটদ হামেদ আর খাবে না। ভালো হয়ে যাবে।

বেপারি সাহেবকে তুমি বলবে, মেয়ে আমি আটকে রাখিনি, মেয়ে নিজেই যাচ্ছে না।

বলেছি। শুনে বেপারি সাহেব বললেন, এখন মেয়েকে বুঝিয়ে শুনিয়ে পাঠিয়ে দাও।

তোমার মেয়ে এসব মেনে নেবে না। সহজে কোনো কিছু মেনে নেয়ার মতো মেয়ে সে নয়।

মতি মিয়া হতাশ গলায় বললেন, কিন্তু আমি যে ওদের কথা দিয়েছি।

খোদেজা তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলেন। তোমার কথা কি তোমার মেয়ে পাত্তা দেবে! মা-বাবার কষ্ট বোঝার মতো মেয়ে কি সে?

না না, এটা সে না শুনে পারবে না। আমি ওদের কথা দিয়েছি। আমার মান-সম্মানের প্রশ্ন। এই জামাইর সঙ্গেই তার সংসার করতে হবে।

মতি মিয়া উঠে দাঁড়ালেন—টগর কোথায়? আমি নিজে ওর সঙ্গে কথা বলব।

হাত ধরে স্বামীকে থামালেন খোদেজা। এখন না, পরে।

কেন এখন অসুবিধা কী?

তুমি চুপ করে বসো, আমার কথা শোন, আমি যেভাবে বলছি সেভাবে করো, দেখবে টগর শ্বশুরবাড়ি যেতে রাজি হয়ে যাবে।

মতি মিয়া আবার বসলেন। বলো।

হাজেরা বুবুর কথা শুনেছ?

না, কী হয়েছে তাঁর?

সে তো এখান থেকে চলে যাচ্ছে। বাড়িঘর জায়গাজমি সব বিক্রি করে বোনপোর সঙ্গে ঢাকায় চলে যাচ্ছে। ঢাকায়ই থাকবে। এখানে আর কোনোদিন আসবে না। রসিকলাল আছে না, দালাল, তাকে কাজে লাগিয়ে দেয়া হয়েছে। পাঁচ -সাত দিনের মধ্যে সব বিক্রি হয়ে যাবে। শুন, এটা তোমার জন্য ভালো হলো। টগরকে বোঝাতে তোমার এখন সুবিধা হবে। আগে সে চলত ফুফুর বুদ্ধিতে, এখন বুদ্ধি দেয়ার কেউ থাকবে না। তুমি বলবে, হামেদ ভালো হয়ে গেছে, আমার কাছে এসে মাফ চেয়ে গেছে। এখন থেকে সুখেই থাকবি তুই। তারপর চালাকি করে বলবে, অবশ্য তুই যদি একান্তই না যেতে চাস তাহলে আমি হয়তো বাধ্য হয়ে অন্য জায়গায় বিয়ে দেবো তোর, কিন্তু তোর মতো মেয়ের দুটো বিয়ে হওয়া কি ঠিক হবে? লোকে সারাজীবন খোটা দেবে, সারাজীবন লোকের কাছে তুই ছোট হয়ে থাকবি। তারচে’ হামেদের সংসারেই যদি মানিয়ে চলতে পারিস সেটা ভালো না? দেখবে কাজ হয়ে যাবে।

খোদেজার কথা শুনে মতি খুব খুশি হলো। ঠিক বলেছ, একদম ঠিক বলেছ তুমি। টগর কই?

শুয়ে আছে।

এসময় শুয়ে আছে কেন? শরীর খারাপ?

না মন খারাপ। ফুফু চলে যাবে, বোঝ না?

বুঝেছি। খেতে দাও, খিদে পেয়েছে।

 

আঠারো

দুপুরবেলা পুকুরঘাটে এসেছে কাজল, গোসল করবে। কাপড় চোপড় ঘাটের বাঁধান সানের ওপর রেখে জলের দিকে তাকিয়ে বসে আছে। হঠাত্ই ইচ্ছে হলো একটা সিগ্রেট ধরায়। অনেকক্ষণ বসে সিগ্রেট টেনে তারপর গোসল করবে। শার্টের পকেটে সিগ্রেটের প্যাকেট এবং লাইটার ছিল। কাজল সিগ্রেট ধরাল। ধরিয়ে মাত্র টান দিয়েছে, বুলবুলি এসে পাশে দাঁড়াল। বুলবুলিকে দেখে খুশি হলো কাজল। যাক বুলবুলির কাছ থেকে টগরের খবরটা পাওয়া যাবে। পরশু সন্ধ্যার পর টগরের সঙ্গে আর দেখা হয়নি কাজলের। সেই যে মুখে আঁচল চেপে কাঁদতে কাঁদতে বেরিয়ে গেল এই বাড়িতে তারপর আর আসেইনি। কাজলের মনটাও তারপর থেকে খুব খারাপ হয়ে আছে। নিজের অজান্তে কোন দুঃখ যে টগরকে সে দিয়ে ফেলল!

বুলবুলির দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে কাজল বলল, কী খবর বুলবুলি সাহেব, ভালো?

বুলবুলি কোনো কথা বলল না। ঘাটের বাঁধানো বেঞ্চে কাজলের মুখোমুখি বসল।

বুলবুলির আচরণে কাজল একটু অবাকই হলো। এত গম্ভীর হয়ে আছে কেন বুলবুলি? কী হয়েছে?

কাজল সিগ্রেটে টান দিয়ে বলল, টগর কই বুলবুলি? টগরকে দু দিন ধরে দেখছি না।

বুলবুলি গম্ভীর গলায় বলল, বাড়ি।

আসে না কেন?

এবার বেশ রাগী চোখে কাজলের দিকে তাকাল বুলবুলি। কেন আসবে?

কাজল বুবুকে আপনি এত কষ্ট দিচ্ছেন কেন?

বুলবুলির কথাটা বুঝতে পারল না কাজল। ফ্যাল ফ্যাল করে তার মুখের দিকে তাকাল। আমি কষ্ট দিচ্ছি টগরকে? বলো কী!

ঠিকই বলছি। আপনি বুঝতে পারছেন না আপনি যে বুবুকে কষ্ট দিচ্ছেন?

না, না তো!

আশ্চর্য মানুষ আপনি! এত বড় হয়েছেন, বিদেশে থাকেন আর এই সামান্য ব্যাপারটা বুঝতে পারছেন না? আমার মনে হয় বুঝেও আপনি না বোঝার ভান করছেন।

সিগ্রেটের পরপর দুটো টান দিল কাজল। সিগ্রেটটা পুরো শেষ হয়নি তবু সেই সিগ্রেট আর খেল না সে, ফেলে দিল। অনুনয়ের গলায় বলল, তুমি বিশ্বাস করো বুলবুলি, সত্যি আমি কিছু বুঝতে পারছি না, সত্যি আমি কোনো ভান করছি না। ভান আমি করতে পারি না। ভান করতে আমি শিখিনি। তুমি আমাকে পরিষ্কার করে সব বলো।

আপনি জানেন মা মারা যাওয়ার পর বুবু সবচে’ ভালোবাসে ফুফুকে। ফুফু তার জান। সেই ফুফুকে সে এখান থেকে চলে যেতে বাধ্য করছে শুধুমাত্র আপনার কথায়, আপনার জন্য। কেন বলুন তো?

কথাটার কোনো জবাব দিতে পারল না কাজল, চিন্তিত চোখে বুলবুলির মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।

বুলবুলি বলল, মেয়েরা কার জন্য নিজের প্রিয় মানুষদের ত্যাগ করে বোঝেন আপনি? কাউকে ভালোবেসে একটি মেয়ে অন্য কোনোদিকে না তাকিয়ে, অন্য কারও কথা না ভেবে ভালোবাসার মানুষের হাত ধরে পথে নামে। একবারও সে তার মা-বাবার কথা ভাবে না, ভাইবোন কিংবা অন্যান্য প্রিয়জনের কথা ভাবে না। অথচ মা-বাবার চে’ প্রিয় মানুষ মানুষের আর কেউ থাকে না। সেই প্রিয় মানুষদেরও মেয়েরা ত্যাগ করে ভালোবাসার জন্য। ফুফুকেও বুবু ত্যাগ করছে এই একটা কারণে।

বুলবুলির কথা শুনে বুকটা হিম হয়ে গেল কাজলের। গলাটা শুকিয়ে গেল। আমতা গলায় সে বলল, কিন্তু টগরের সঙ্গে তো আমার তেমন কিছু নয়।

আপনার দিকে থেকে না হতে পারে।

টগরের দিক থেকেই বা হবে কেন? সে আমাকে কোনোদিন দেখেনি, তার সঙ্গে আমার কোনোদিন কথা হয়নি। মাত্র তো ক’দিন হলো আমাদের দেখা হয়েছে!

তাতে কী! বড় হয়ে ওঠার পর থেকে প্রতিদিন ফুফুর মুখে আপনার কথা শুনেছে সে। শুনতে শুনতে নিজের অজান্তেই আপনার জন্য একটা টান তৈরি হয়ে গেছে তার। আপনাকে সে যেমন কল্পনা করেছে হয়তো বাস্তবেও সে দেখেছে। আপনি অনেকটাই তেমন। সুতরাং এই অবস্থায় যা হয় তা-ই হয়েছে।

বলো কী তুমি? টগর তোমাকে এসব বলেছে?

বলতে চায়নি। বুবু খুব চাপা স্বভাবের মেয়ে। আমি খানিকটা আঁচ করেছিলাম। একদিন খুব কান্নাকাটি করছিল, তখন খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে জেনে নিয়েছি।

কাজল কী বলবে কী করবে কিছুই বুঝতে পারল না। ভেতরে ভেতরে দিশেহারা হয়ে গেল।

বুলবুলি অনুনয়ের গলায় বলল, কাজল ভাই, বুবুকে আপনি বিয়ে করুন।

এই ধরনের একটি কথা বুলবুলি বলতে পারে, কাজল কল্পনাও করতে পারেনি। সে একেবারে শিউরে উঠল। ফ্যাল ফ্যাল করে বুলবুলির মুখের দিকে তাকাল।

বুলবুলি বলল, বুবু খুব ভালো মেয়ে। আপনি তো তাকে দেখেছেনই। নিজের বোন বলে বলছি না, বুবুর কোনো কিছুর কমতি নেই। সে দেখতে যেমন সুন্দর, তার মনটাও সুন্দর, সবকিছুই সুন্দর। আপনার সঙ্গে তাকে খুব মানাবে। সবচে’ বড় কথা নিজের চেয়েও বেশি ভালো সে আপনাকে বাসে। বুবুকে বিয়ে করলে আপনি খুব সুখী হবেন।

এবার কাজলের মনে পড়ল, টগরের বিয়ে হয়েছিল, কিন্তু স্বামীর ঘর সে করেনি। ওসব কথা সবই খালা তাকে বলেছেন এবং নিষেধ করেছেন তিনি যে কাজলকে এসব বলেছেন একথা যেন কিছুতেই টগরের কানে না যায়। গেলে মনে খুব কষ্ট পাবে টগর। কিন্তু আজ এই মুহূর্তে কেমন করে খালার কথা সে রক্ষা করবে। তার তো কোনো উপায় নেই।

কাজল ম্লান গলায় বলল, তোমাকে আমি কিছু বলতে চাই বুলবুলি, কিন্তু টগরকে সে-কথা তোমার বলা ঠিক হবে না। যেহেতু তুমি এ প্রসঙ্গে কথা তুলেছ এজন্য কথাগুলো তোমাকে আমি বলছি, নয়তো কোনোদিনও বলতাম না। কেমন করে টগরকে আমি বিয়ে করব?

বুলবুলি একটু চমকাল। কেমন করে মানে, বিয়ে যেমন করে করে লোকে তেমন করেই করবেন।

কিন্তু টগরের যে আগে বিয়ে হয়েছিল!

বুলবুলি বেশ চমকাল, তারপরই নিজেকে সামলে নিল। ও সে-কথা আপনি তাহলে জেনেছেন! জানবার কথাই। এসব কথা লুকোন থাকে না। তবে বুবুর বিয়ের কথা কতটুকু জেনেছেন আপনি তা আমি জানি না, সব যদি জেনে থাকেন তাহলে ওটা কোনো সমস্যা নয়।

সবই জেনেছি। মাতাল স্বামী দেখে বাসর রাত কাটিয়েই চলে এসেছে টগর।

বাসর রাত কাটিয়ে মানে? স্বামীটি ছিল বদ্ধ মাতাল। নেশার ঘোরে অচেতন হয়েছিল সে। বুবু সারারাত বসে থেকেছে, ভোরের আলো ফুটে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ি চলে এসেছে।

হ্যাঁ এরকমই শুনেছি আমি।

যা ঘটেছিল তা-ই শুনেছেন।

কিন্তু একটি বিবাহিতা মেয়েকে কেমন করে বিয়ে করব আমি?

আপনি রাজি হলে ওখান থেকে বুবুকে আমরা ছাড়িয়ে আনব। অবশ্য এমনিতেই বুবুকে ছাড়িয়ে আনার কথা ভাবছে সবাই। ওই সংসারে বুবুকে আর পাঠাবে না, অন্য জায়গায় বিয়ে দেয়ার চেষ্টা করবে।

কাজল কথা বলল না। চুপচাপ অন্যদিকে তাকিয়ে রইল।

বুলবুলি বলল, যে বিয়ে বুবুর হয়েছে ওটা আসলে কোনো বিয়ে নয়। সত্যিকার অর্থে বুবু এখনো  অবিবাহিতা মেয়ে। কুমারি। তাছাড়া ভালোবাসার সঙ্গে এসব ব্যাপারের সম্পর্ক কী! ভালোবেসে তিন সন্তানের জননীও অবিবাহিত যুবকের সঙ্গে ঘর বাঁধে, কিশোরী হাত ধরে পিতার বয়সী পুরুষের। ভালোবাসাটাই বড় কথা। বুবু আপনাকে ভালোবাসে। আমি মনে করি আপনার স্ত্রী হওয়ার এটাই তার সবচে’ বড় যোগ্যতা।

কাজল তবু কোনো কথা বলল না।

বুলবুলি বলল, আপনি কিছু একটা বলুন কাজল ভাই। আমার বুবুর ভালোবাসার মূল্যটা আপনি দিন। বুবুকে বাঁচান। আপনার জন্য মরে যাবে বুবু।

কাজল অসহায় গলায় বলল, আমি এখন কী করব?

আপনি ফুফুকে সব বলুন। ফুফু আমার বাবার সঙ্গে কথা বলে সব ঠিকঠাক করুক। বুবুকে ছাড়িয়ে আনুক। দরকার হলে ফুফুকে নিয়ে আপনি ঢাকায় যান। আপনার গার্জিয়ানদের সঙ্গে কথা বলে বিয়ের ব্যবস্থা করুন। আসলে কাউকেই কিন্তু লাগে না। আপনি ইচ্ছে করলেই হয়। কেউ রাজি না হলেও আপনি ইচ্ছে করলে বুবুকে বিয়ে করতে পারেন। ভালোবাসার জন্য কত কি করে মানুষ!

কাজল শেষ পর্যন্ত বলল, দেখি কী করা যায়। আমার সঙ্গে যে তোমার এসব কথা হয়েছে টগরকে এখন তুমি তা বোলো না। আমি আগে খালার সঙ্গে কথা বলি, টগরের সঙ্গে কথা বলি, তারপর যা করার করব।

বুলবুলি উচ্ছ্বসিত গলায় বলল, ঠিক আছে।

 

ঊনিশ

বালিশে মুখ গুঁজে শুয়ে আছে টগর। মতি মিয়া এসে তার মাথায় হাত দিলেন। কী রে মা, এসময় শুয়ে আছিস কেন? শরীর খারাপ?

বাবার গলা শুনে নরম ভঙ্গিতে বিছানায় উঠে বসল টগর। শাড়ি গোছগাছ করল, কিন্তু বাবার মুখের দিকে তাকাল না। মাথা নিচু করে বসে রইল।

মতি মিয়া তীক্ষ চোখে মেয়ের মুখের দিকে তাকালেন। তাকিয়ে চমকে উঠলেন। মুখটা টগরের কেমন থমথমে হয়ে আছে। চোখ দুটো ফোলা ফোলা। সারাদিন সারারাত ধরে থেকে থেকে কাঁদলে এমন মুখ চোখ হয় মানুষের। টগর কি সারাদিন সারারাত ধরে কাঁদছে!

মেয়ের পাশে বসলেন মতি মিয়া। তোর মুখ দেখে আমি বুঝতে পারছি তুই খুব কান্নাকাটি করছিস। কান্নাকাটি করারই কথা, মন খুবই খারাপ হওয়ার কথা তোর। ছোটবেলা থেকে যে তোকে এত আদর করছে, তুই যার জন্য জান দিয়ে দিচ্ছিস সেই মানুষ যদি সব ছেড়ে এখান থেকে চলে যায়, আর কোনোদিন এখানে ফিরে না আসে, মন খারাপ হবারই কথা। কিন্তু মা, কোনো মানুষই চিরকাল থাকে না। মানুষ মরে যাওয়ার পরও সেই মানুষের ছেলেমেয়ে এবং অন্যান্য প্রিয়জন বেঁচে থাকে। কষ্ট তারা পায় ঠিকই, কান্নাকাটি করে ঠিকই, কিন্তু তারপর আবার উঠেও দাঁড়ায়। তুই খুব নরম মনের মেয়ে। ফুফুর জন্য কষ্টটা তোর একটু বেশিই হচ্ছে, তবু এভাবে জীবন চলবে না মা। উঠে দাঁড়াতেই হবে। নিজের জীবনের দিকে তাকাতেই হবে।

অন্য সময় হলে বাবার এই ধরনের কথায় হু হু করে কাঁদতে থাকত টগর। কিন্তু এখন কাঁদল না। চোখের জল যেন শুকিয়ে গেছে তার।

খোদেজা দাঁড়িয়ে ছিলেন দরজার সামনে। এবার তিনিও এসে বসলেন টগরের পাশে।

মতি মিয়া বললেন, আমি জানি হাজেরা বুবু এখান থেকে চলে যাওয়ার পর তুই কিছুতেই এখানে থাকতে পারবি না। কান্নাকাটি করে অস্থির হয়ে যাবি। বুবুর চলে যাওয়ার সময় তোকে শান্ত রাখা কঠিন হবে। এই কষ্ট পাওয়ার আগেই তোকে এখান থেকে আমি সরিয়ে দিতে চাই মা।

এ কথায় মুহূর্তের জন্য চোখ তুলে বাবার দিকে তাকাল টগর, তারপর মাথা নিচু করল।

মতি মিয়া বললেন, তোর জামাই এবং শ্বশুর দুজনেই আড়তে এসেছিল। তারা খুব অনুরোধ করল। নানা রকমভাবে মাপ টাপ চাইল। হামেদ এখন একদম ভালো হয়ে গেছে। ওখানে তুই সুখেই থাকবি। এরপর হামেদ আর খারাপ হওয়ার সাহসই পাবে না। ওর বাবাই ওকে শাসনে রাখবে। এবার আর তুই অমত করিস না মা। তুই শ্বশুরবাড়ি চলে যা। আমার অবস্থা তুই বুঝিসই। আমাদের মতো মধ্যবিত্ত পরিবারে কত ধরনের সমস্যা থাকে। এক জায়গা থেকে ছাড়িয়ে আরেক জায়গায় তোকে বিয়ে দেয়া খুব কঠিন হবে। টাকাপয়সার ব্যাপার তো আছেই, তার ওপর ভালো ছেলে পাওয়া মুশকিল। দেখা গেল অন্য জায়গায় বিয়ে তোর দিলাম ঠিকই, যার সঙ্গে বিয়ে হলো সে হামেদের চেয়েও খারাপ। জীবনটা তোর তখন আরও নষ্ট হবে। তখন আর কিছুই করার থাকবে না আমাদের। তবে আমি মনে করি তুই নিজে যদি ঠিক থাকিস তাহলে হামেদকে ঠিক করা তোর জন্য কঠিন হবে না। কত মেয়ে তার খারাপ স্বামীকে ভালো করে তোলে। তুই কেন পারবি না হামেদকে তোর মনের মতো করে তুলতে? তুই রাজি হয়ে যা মা। আমি ওদেরকে খবর পাঠাই, ওরা পালকি পাঠিয়ে তোকে নিয়ে যাবে। আর একটা কথাও তোর বোঝা উচিত, বুলবুলি বড় হয়েছে, বুলবুলিকেও বিয়ে দেয়ার সময় হয়ে গেছে, তুই এভাবে বসে থাকলে বুলবুলির বিয়ে হবে না। বুলবুলিকে নিয়েও সমস্যায় পড়ব আমি।

মতি মিয়া দু হাতে টগরের একটি হাত আঁকড়ে ধরলেন। তুই রাজি হয়ে যা মা। রাজি হয়ে যা।

টগর তবু কোনো কথা বলল না। চুপচাপ মাথা নিচু করে বসে রইল।

এবার কথা বললেন খোদেজা। বিয়েশাদি ভাগ্যের ব্যাপার। ভাগ্যে যেখানে আছে বিয়ে সেখানে হবেই। প্রতিটি মেয়েরই উচিত ভাগ্যকে মেনে নেয়া। তোর ভাগ্যে যেখানে আছে সেখানেই বিয়ে হয়েছে। এটা না মেনে নিয়ে উপায় কী! কেন অযথা মা-বাবাকে কষ্ট দিচ্ছিস মা! এখন বুঝবি না, বাচ্চাকাচ্চা হলে, তারা বড় হলে বুঝবি এই ধরনের যন্ত্রণা মা-বাবাকে কী রকম ভোগায়, কত অশান্তিতে থাকে তারা। তারচে’ ভাগ্যকে মেনে নে। তুইও সুখে থাকলি, আমরাও সুখে থাকলাম।

টগর মাথা তুলল না। কারও দিকে তাকাল না। নিষ্প্রাণ গলায় বলল, আমি যাব।

 

বিশ

রাতের খাওয়াদাওয়া সেরে নিজের ঘরে গেল না কাজল। হাজেরা বেগমের পালঙ্কে হাত-পা তুলে বসল। ঘরের ভেতর টুকটাক কাজ করছে রাবেয়া। হাজেরা বেগম আছেন আনমনা হয়ে। যেদিন চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, সবকিছু বিক্রি করে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সেদিন থেকেই তিনি একদম চুপচাপ হয়ে গেছেন। প্রয়োজন না হলে কোনো কথাই বলেন না। আজ রাতেরবেলা খানওনি  তিনি। কাজল জোরাজোরি করছিল। বলেছেন, শরীর ভালো লাগছে না, খেতে ইচ্ছে করছে না। তখন থেকেই কাত হয়ে শুয়ে আছেন পালঙ্কে। হারিকেনের আলোয় মুখটা খুব উদাস দেখাচ্ছে তাঁঁর।

কাজল বলল, খালা, তোমার সঙ্গে আমার কিছু কথা আছে।

হাজেরা বেগম নড়লেন না। কাজলের দিকে তাকালেনও না। আস্তে করে বললেন, আর কী কথা! তোর কথা তো আমি শুনেছিই। তুই যা চেয়েছিস তা-ই তো করছি।

তা করেছ। তবু আমার আরও কথা থাকতে পারে না?

কী কথা, বল।

কাজল সামান্য দ্বিধা করল। তারপর বলল, টগরের ব্যাপারে।

টগরের নাম শুনে বেশ চমকালেন হাজেরা বেগম। বিছানায় উঠে বসলেন। কী হয়েছে টগরের?

না কিছু হয়নি।

চোখ ইশারায় রাবেয়াকে দেখাল কাজল। হাজেরা বেগম বুঝতে পারলেন রাবেয়ার সামনে কথাটা বলতে চায় না কাজল। রাবেয়াকে তিনি বললেন, এই রাবেয়া, তুই এখন রান্নাঘরে যা। রান্নাঘরের কাজ-টাজ সেরে পরে এই ঘরের কাজ করিস।

রাবেয়া কোনো কথা বলল না, নিঃশব্দে বেরিয়ে গেল।

হাজেরা বেগম বললেন, কী বলবি, বল।

এই ফাঁকে ভেতরে ভেতরে নিজেকে গুছিয়ে নিয়েছে কাজল। তবে হাজেরা বেগমের মুখের দিকে তাকাল না সে, মাথা নিচু করে বলল, টগরের জন্য যখন এত টান তোমার, টগরের মা-বাবার সঙ্গে তাহলে কথা বলো।

কাজলের কথা বুঝতে পারলেন না হাজেরা বেগম। বললেন, কী কথা বলব?

বিয়ের কথা।

হাজেরা বেগম তবু বুঝতে পারলেন না। অবাক হয়ে বললেন, কার বিয়ের কথা?

এবার হাজেরা বেগমের দিকে চোখ তুলে তাকাল কাজল। টগরকে তোমার খুব পছন্দ, আমারও ভালো লেগেছে তাকে, টগরের মা-বাবার সঙ্গে তুমি কথা বলো, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিয়ে করব আমি।

কাজলের কথা শুনে হাজেরা বেগম একেবারে স্তব্ধ হয়ে গেলেন। ফ্যাল ফ্যাল করে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। কথা বলতে ভুলে গেলেন।

কাজল বলল, টগর তোমার কাছে থাকলে আমার কথা তুমি ভুলে থাকতে পারবে। যতদিন বেঁচে থাকবে টগরের সেবাযত্নে বাঁচতে পারবে। টগর পাশে থাকলে কখনো তোমার মনে হবে না তুমি নিঃসন্তান।

হাজেরা বেগম গম্ভীর গলায় বললেন, আমার কথা তোর ভাবতে হবে না, তুই তোর নিজের কথা ভাব। টগরকে তোর যদি ভালো লেগে থাকে, তুই যদি সত্যি সত্যি মনে করিস টগরকে তুই বিয়ে করবি, তাহলেই টগরের মা-বাবার সঙ্গে কথা বলব আমি। আমার জন্য নয়। আমি আর ক’দিন বাঁচব! সংসার করতে হবে তোর। তুই যদি মনে করিস টগরকে বিয়ে করলে সুখী হবি তবেই করতে পারিস।

তুমি কথা বলো।

তুই কি ভালো করে সব ভেবে দেখেছিস? টগর একটি বিবাহিতা মেয়ে, যদিও সংসার সে করেনি তবু বিবাহিতা তো। আগের স্বামীর কাছ থেকে তাকে ছাড়িয়ে নিতে হবে, তারপর তোর সঙ্গে তার বিয়ে হবে। এসব লুকোছাপার ব্যাপার নয়। সবাই জানবে টগরের আগে একটি বিয়ে হয়েছিল। তোর মা-বাবা কি এটা মেনে নেবে?

না মেনে নেয়ার কী আছে! বিয়েটা করছি আমি, সংসার করব আমি, আমি যদি টগরকে বিয়ে করে সুখী হই তো তাঁদের অসুবিধা কী?

এসব কথা বেশ সহজে বলা যায়, কিন্তু বাস্তব বড় কঠিন। সংসার করতে যাওয়ার পর দেখবি কত রকমের কথা হচ্ছে এই নিয়ে। ওসব শুনতে তোর ভালো লাগবে না, টগরও মনে কষ্ট পাবে।

তাহলে টগরকে নিয়ে আমি আমেরিকায় চলে যাব।

পুরো ব্যাপারটাই নির্ভর করে তোর ওপর। তুই যদি মনে করিস বিয়ে তুই টগরকে করবিই তাহলে কোনো অসুবিধা নেই। প্রয়োজনে আমিও না হয় তোর মা-বাবার সঙ্গে কথা বলব। তবে তারা আমাকে খুব দোষারোপ করবে। আমাকে আর ভালো চোখে দেখবে না। ধরেই নেবে টগরকে আমি যেহেতু খুব ভালোবাসি আর তুইও আমাকে ছাড়া কিছু বুঝিস না, এটা আমার জন্যই হয়েছে, আমিই টগরের সঙ্গে তোর বিয়ে দিয়েছি।

তাতে কি তোমার কিছু যাবে আসবে খালা?

নিশ্চয় যাবে আসবে। আমাকে এখন থেকে তোদের সংসারেই থাকতে হবে। সবাই যদি ওরকম ভাবে আমাকে আমি তাহলে কী করে থাকব ওখানে!

এসব তুমি ভেবো না খালা। যদি তেমন দেখি তাহলে আমার মা পরিচয় দিয়ে তোমাকেও আমাদের সঙ্গে আমেরিকায় নিয়ে যাব।

এসব একধরনের আবেগের কথা। তুই আরও দুয়েকদিন ব্যাপারটা নিয়ে ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তাভাবনা কর।

কাজল অস্থির গলায় বলল, চিন্তাভাবনা অনেক করেছি আমি। তুমি শুধু বলো তুমি কথা বললে টগরের মা-বাবা রাজি হবে কি-না?

তা হবে।

তাহলে কালই তুমি কথা বলো।

হাজেরা বেগম সামান্য চুপ করে থেকে বললেন, এসব নিয়ে তুই কি টগরের সঙ্গে কথা বলেছিস?

না। বুলবুলির সঙ্গে অনেক রকমের কথা হয়েছে আমার। সরাসরি বিয়ের কথা হয়নি, তবে টগর যে রাজি তা আমি জানি। বুলবুলিও আমাকে তা বলেছে।

তবুও টগরের সঙ্গে তুই নিজে কথা বল।

ঠিক আছে বলব।

তারপর একটু থেমে কাজল বলল, রসিকলালও বেশ অনেক দূর এগিয়েছে। বলল, দিন দশেকের মধ্যে সব হয়ে যাবে। কোনো এক বেপারি সাহেব আছেন এখানে, তিনি নাকি একাই সব কিনে নেবেন। জায়গাজমি বাড়িঘর সব। আমি বলেছি, দামটাম ঠিক হয়ে গেলে প্রথমে একটা বায়নাপত্র হবে, তারপর এক মাসের মধ্যে পুরো টাকা দিয়ে রেজিস্ট্রি করে নেবে। বায়না হলেই এখান থেকে চলে যাব আমরা। অন্যান্য কাজ, লেনদেন সব হবে ঢাকায়। বেপারি সাহেবের বড়ছেলে থাকে ঢাকায়, সে নাকি সব করবে।

হাজেরা বেগম কোনো কথা বললেন না। চুপ করে রইলেন।

কাজল বলল, এখন আবার গম্ভীর হয়ে গেলে কেন খালা? এখানকার পাট চুকিয়ে যে দুঃখ তুমি পেয়েছ টগরকে পেলে সেই দুঃখ তোমার থাকবে না। আমি কালই টগরের সঙ্গে কথা বলব।

হাজেরা বেগম তবু কোনো কথা বললেন না।    

 

একুশ

টগর বিষণ্ন গলায় বলল, ডেকেছেন?

মুখের খুব একটা মজাদার ভঙ্গি করল কাজল। না ডাকলে আসতে না?

টগর কথা বলল না।

কাজল হাত বাড়িয়ে টগরের একটা হাত ধরল। বসো।

নিষ্প্রাণ ভঙ্গিতে কাজলের পাশে বসলো টগর। এই প্রথম তীক্ষ চোখে টগরকে লক্ষ করল কাজল। এ ক’দিনে টগর যেন কেমন শুকিয়ে গেছে, ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। সেই টগর আর নেই। টগরকে দেখলে বোঝা যায়—গভীর এক দুঃখে ডুবে আছে সে। মুখটা সর্বস্ব হারানো মানুষের মতো।

টগরের মুখ দেখে বুকটা মুচড়ে উঠল কাজলের। গভীর গলায় কাজল বলল, কী হয়েছে টগর!

এ কথায় চোখ ছলছল করে উঠল টগরের। চোখের জল সামলাতে অন্যদিকে তাকাল সে।

টগরের চিবুকে হাত দিয়ে আলতো করে তার মুখটা নিজের দিকে ঘোরাল কাজল। কেন এত মন খারাপ করে আছ? খালার সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। সব ঠিক হয়ে যাবে। তোমাকে কোনো কষ্ট আমি পেতে দেবো না।

কথাটা টগর বুঝতে পারল না। চোখের জল সামলে বলল, কী কথা হয়েছে ফুফুর সঙ্গে?

এবার কাজল আবার তার আগের চপল স্বভাবে ফিরে গেল। হালকা মজাদার গলায় বলল, বলছি তার আগে অন্য একটা কথা আছে। আমি আজ দিঘলি বাজারে গিয়েছিলাম। সিগ্রেট ফুরিয়ে গেছে, সিগ্রেট আনতে গিয়েছিলাম। তোমার জন্য একটা জিনিস এনেছি, যদি তুমি সেটা নাও তাহলে আমি তোমাকে খুব সুন্দর একটি কথা বলব। আর যদি না নাও তাহলে সেই কথাটি আমি জীবনেও তোমাকে কোনোদিন বলব না। তোমার সঙ্গে আমার যত গভীর সম্পর্কই হোক ওই কথাটি আর বলব না।

টগর ম্লান হেসে বলল, আমাকে আপনি পাবেন কোথায় যে বলবেন!

পাব পাব। কেমন করে পাব এই মুহূর্তেই তা বলছি না। একটু পরে বলব। তার আগে বলো জিনিসটা নেবে কি-না।

টগর কথা বলল না। অসম্ভব মায়াবী এক চোখ করে কাজলের দিকে তাকিয়ে রইল। বুক পকেটে হাত দিয়ে কাগজে জড়ানো ছোট্ট একটা জিনিস বের করল কাজল। কাগজ খুলে জিনিসটা ধরল চোখের সামনে। ঘরের ভেতরকার ম্লান আলোয় ঝকমক করে উঠল জিনিসটি। টগর বলল, কী?

নথ। তোমার জন্য এনেছি। নাকটা খুব খালি খালি লাগে তোমার। নথ আমার খুব প্রিয়। এই নথ পরলে তোমাকে খুব সুন্দর লাগবে। আমি যেদিন এলাম সেদিন যে নীল ডুরে শাড়িটা পরেছিলে তুমি, সেই শাড়ি পরে, নাকে এই নথ দিয়ে তুমি আমার সামনে এসে দাঁড়াবে। আমি তোমাকে তখন সেই কথাটি বলব।

কিন্তু নথটা টগর ধরল না। আগের মতোই কাজলের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, নথ কে কাকে দিতে পারে জানেন?

জানি। কেউ যদি কারও বউ হতে যায় সেই মেয়েটিকে তার হবু বর নথ দিতে পারে। আমিও ওই ভেবে দিচ্ছি।

সঙ্গে সঙ্গে আর্তচিত্কার করে উঠে দাঁড়াল টগর। না না, এ হয় না! এ হয় না!

কাজল বলল, আমি সব জানি। জেনে বুঝেই খালার সঙ্গে কথা বলেছি। খালা তোমার বাবার সঙ্গে কথা বলবেন।

না না আমার বিয়ে হয়ে গেছে, আমি একটি বিবাহিতা মেয়ে। এ হয় না, এ কিছুতেই হয় না!

কাজল দৃঢ় গলায় বলল, হয়। যে বিয়ে তোমার হয়েছে ওটা কোনো বিয়ে নয়। খালা তোমার বাবার সঙ্গে কথা বলবে, তোমার বাবা ওখান থেকে তোমাকে ছাড়িয়ে নেবেন, তারপর আমাদের বিয়ে হবে।

টগর এবার একেবারে ভেঙে পড়ল। আকুল হয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল, না না এ হয় না! এ হয় না! লোকে আপনাকে খারাপ বলবে। আপনার মা-বাবা এ বিয়ে মেনে নেবে না। কেন আমার জন্য নিজের জীবন আপনি নষ্ট করবেন? আমি আপনার জীবন নষ্ট হতে দেবো না। আমার কপালে যা আছে তা-ই হবে। আমি কালই এখান থেকে চলে যাব। কালই চলে যাব।

দু হাতে মুখ ঢেকে হু হু করে কাঁদতে লাগল টগর।

টগরের কান্না দেখে কাজল একেবারে স্তব্ধ হয়ে গেছে। খানিক টগরের দিকে তাকিয়ে থেকে উঠে দাঁড়াল সে, দু হাতে টগরকে টেনে আনল বুকের কাছে। টগর তুমি একটু শান্ত হও, তুমি একটু বোঝার চেষ্টা করো।

টগর কান্না জড়ানো গলায় বলল, না না এ হয় না, এ হয় না। আমি মরে যাব তবু আপনাকে কারও কাছে ছোট হতে দেবো না। আপনি জানেন না আপনি আমার কে!

আমি জানি, আমি তোমার সব জেনেছি টগর। জেনে বুঝেই তোমাকে আমি চেয়েছি।

টগর তবুও ছটফট করতে লাগল। তবুও বলতে লাগল, না না এ হয় না! আমি মরে যাব তবুও এ হবে না!

কাজল বুঝতে পারল না কী করবে সে, কীভাবে শান্ত করবে টগরকে, কীভাবে রাজি করাবে। টগরের মাথাটা বুকের কাছে ধরে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল সে।

অনেকক্ষণ কেঁদে শান্ত হলো টগর। নিজেকে সরিয়ে নিল কাজলের কাছ থেকে, তারপর আঁচলে চোখ মুছল। কান্না ভেজা চোখ তুলে কাজলের দিকে তাকাল। আমার কথা ভেবে আপনি কখনো মন খারাপ করবেন না। আমার সঙ্গে যে আপনার কখনো দেখা হয়েছিল, ভুলেও সেকথা মনে করবেন না। যেভাবে যা ভেবে রেখেছেন ঢাকায় গিয়ে সেভাবেই সব করবেন। আপনি ভালো আছেন, বিয়ে করে সুখী হয়েছেন শুনলে আমি খুব শান্তি পাব। আমার কপালে যা আছে তা-ই হবে। কালই এখান থেকে চলে যাব আমি।

কাজল জড়ানো গলায় বলল, কোথায়, কোথায় যাবে তুমি?

শ্বশুরবাড়ি। স্বামীর সংসারে।

না না, ওখানে তুমি যেতে পারো না টগর। ওখানে তুমি যেতে পারো না।

ওখানেই আমাকে যেতে হবে। এ আমার কপালের লেখন!

ধীর শান্ত ভঙ্গিতে দরজার দিকে পা বাড়াল টগর, কিন্তু দু-তিন পা গিয়েই ফিরে এল। কাজলের দিকে হাত বাড়িয়ে বলল, আমার নথটা দিন। আপনার সেই কথাটি শোনার জন্য সারাজীবন এই নথ আমি নাকে পরে রাখব।

কাজল মৃতের মতো নথটা এগিয়ে দিল টগরের দিকে।

 

বাইশ

বুলবুলি আকুলি বিকুলি করে কাঁদতে লাগল। এ তুমি কী করলে বুবু, এ তুমি কী করলে!

পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে পালঙ্কে বসে আছে টগর। কাঁদতে কাঁদতে বুলবুলি তার হাত ধরে নাড়া দিল। নিজের জীবনটা এভাবে ধ্বংস করে দিলে! এ তুমি কেন করলে?

ধীর শান্ত গলায় টগর বলল, এছাড়া আমার কোনো উপায় ছিল না।

উপায় থাকবে না কেন? আমার সঙ্গে কাজল ভাইর কথা হয়েছে, পরে আমি শুনেছি সে তোমাকে বিয়ে করতে রাজি হয়েছে, তুমি কেন রাজি হলে না?

ওর কথা ভেবেই হইনি। ওর জীবন নষ্ট করার কোনো অধিকার আমার নেই।

তোমার সঙ্গে বিয়ে হলে কাজল ভাইর জীবন নষ্ট হবে—এ তোমাকে কে বলেছে? কেন নষ্ট হবে তার জীবন?

একটা কথা কেন ভুলে যাস তুই, আমার একবার বিয়ে হয়েছে। কাজলের মতো একটি ছেলে বিয়ে হওয়া একটি মেয়েকে কেন বিয়ে করবে?

তুমি তাকে ভালোবাস, সে তোমাকে ভালোবাসে এজন্য করবে। ভালোবাসার জন্য কত কী করে মানুষ!

সে আমাকে ভালোবাসে কি-না আমি তা জানি না। আমি শুধু আমারটা জানি। আমি তাকে ভালোবাসি। ভালোবাসি বলেই সে হাজার বললেও আমি তাকে বিয়ে করব না। ভালোবাসার মানুষকে কেন অযথা এক কষ্টের মধ্যে ফেলে দেবো! আমাকে বিয়ে করলে নানারকমের অশান্তি হবে তাদের বাড়িতে। মা-বাবা ভাইবোনরা মেনে নেবে না। নানারকমের কথা বলবে। ফুফুকে দোষারোপ করবে। কাজলের আত্মীয়-স্বজনরা খারাপ জানবে কাজলকে। বন্ধু-বান্ধবরা হাসাহাসি করবে। আমার ভালোবাসার জন্য কেন আমি তাকে সব জায়গায় ছোট করব! যদি আমি বিবাহিতা না হতাম তাহলে এ জীবন অন্যরকম হতো। কাজলের হাত ধরে রানির মতো তাদের বাড়িতে গিয়ে উঠতাম আমি। কেউ আমাকে ঠেকাতে পারত না।

টগর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এই পৃথিবীতে কোনো কোনো মানুষ জন্মায় শুধু দুঃখ পাওয়ার জন্য। সুখ বলে কোনো জিনিস তাদের জীবনে থাকে না। আমি তেমন এক মানুষ। ছেলেবেলায় মা আমাকে ছেড়ে গেল, সত্মা এল সংসারে, জীবনটা দুঃখে ভরে গেল। সুখের আশায় আঁকড়ে ধরলাম ফুফুকে, ফুফুর মুখে শুনে শুনে না দেখে ভালোবেসে ফেললাম একজনকে, তার সঙ্গে দেখা হওয়ার আগেই বিয়ে হয়ে গেল অন্য জায়গায়, সে এক নরক। স্বামী নামের মানুষটি মানুষই না। তারপর দেখা হলো মনের মানুষের সঙ্গে, কিন্তু কী কপাল, সেই মানুষের হাত ধরে বলতে পারলাম না আমাকে তুমি তোমার করে নাও! বরং সে বলল, সে চাইল, আমি তার হাত ছাড়িয়ে দিলাম। মানুষের ভয়ে, সমাজের ভয়ে জীবনের যাবতীয় সুখ বিসর্জন দিলাম। মানুষের তৈরি সমাজ মানুষের পবিত্র ভালোবাসার মূল্য দেয় না। মানুষকে ঠেলে দেয় নরকের দিকে।

কথা বলতে বলতে শেষদিকে গলা বুজে এল টগরের। বুলবুলি তখনো কাঁদছে। টগর আলতো করে তার মাথায় হাত দিল। তুই এত মন খারাপ করিস না। তুই এত কাঁদিস না। বাবাকে দেখিস, মাকে দেখিস। এই বাড়িতে আমি হয়তো আর কোনোদিন ফিরব না। যে নরকে যাচ্ছি সেই নরকেরই বাসিন্দা হয়ে যাব। জীবনের যাবতীয় সুখ এবং আনন্দের কথা ভুলে যাব, বেঁচে থাকতে হবে বলে বেঁচে থাকব। তুই বাবাকে দেখিস, মাকে দেখিস। আর দেখিস নিজেকে। তোর জীবন যেন আমার মতো দুঃখের না হয়।

একথায় কান্না আরও বাড়ল বুলবুলির। শিশুর মতো অবোধ ভঙ্গিতে টগরের গলা জড়িয়ে ধরল সে, মুখ গুঁজে দিল টগরের বুকের কাছে। টগরেরও তখন বুক ভেঙে যাচ্ছে গভীর কান্নায়।

 

আঁচলে চোখ মুছতে মুছতে হাজেরা বেগম বললেন, আমার ওপর রাগ করে তুই এই করলি মা? শেষবেলায় এই কষ্টটা আমায় দিলি?

পায়ে হাত দিয়ে হাজেরা বেগমকে সালাম করল টগর। তারপর তাঁর মুখের দিকে তাকাল। না ফুফু না, তোমার ওপর কোনো রাগ নেই আমার। তোমার ওপর কোনো অভিমান নেই। তুমি কষ্ট পেয়ো না। এছাড়া আমার কোনো উপায় ছিল না। একদিকে আমরা মা-বাবা আর সমাজ, আরেকদিকে তোমরা দুজন। তোমাদেরকে কোথাও ছোট করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। এজন্য মা-বাবার কথা শুনেছি আমি, সমাজের দিকে চেয়েছি। কপাল মানুষকে যেখানে টেনে নেয় সেখানেই সে যাবে। চিরকাল তোমার কাছে থাকা আমার কপালে নেই। আমার কপাল আমাকে টেনে নিচ্ছে এক নরকে। সেখানে না গিয়ে আমার উপায় কী! আমার কথা ভেবে মন খারাপ কোরো না তুমি।

টগর ধীরপায়ে বেরিয়ে গেল।

হাজেরা বেগম তখনো আঁচলে মুখ চেপে কাঁদছেন।

 

তেইশ

জানালার সামনে দাঁড়িয়ে উদাস হয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে কাজল। টগর এসে পেছনে দাঁড়াল, টের পেল না। কয়েক মুহূর্ত কাজলের পেছনে দাঁড়াল টগর, তারপর আলতো করে কাজলের বাহুর কাছটা ধরল। চমকে পেছনে ফিরে তাকাল কাজল। তারপর টগরকে দেখে আর চোখ ফেরাতে পারল না। সেই নীল ডুরে শাড়িটা আজ পরেছে টগর, নাকে পরেছে কাজলের দেয়া নথ। মুখখানা খুব বিষণ্ন টগরের, চোখ দুটো দুঃখী, তবু কী অপূর্ব সুন্দর লাগছে টগরকে! স্বপ্নের মতো ঘোরলাগা চোখে টগরের দিকে তাকিয়ে রইল কাজল।

টগরও তাকিয়ে ছিল কাজলের দিকে। কী ছিল দুজনার চোখে, কেন কেউ কারও দিক থেকে চোখ ফেরাতে পারে না!

একসময় গভীর দুঃখের গলায় টগর বলল, আমি এসেছি আপনার সঙ্গে শেষ দেখা করতে। ওরা পালকি পাঠিয়েছে। আমি এখন চলে যাব।

কাজল কোনো কথা বলতে পারল না। বুক কাঁপিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ল তার।

কাজলের চোখের দিকে তাকিয়ে টগর বলল, এই যে আপনার দেয়া নথ আমি পরেছি, এই যে সেই শাড়ি, এখন আপনি সেই কথাটি বলুন।

দু হাতে টগরের ফুলের মতো মুখখানা তুলে ধরল কাজল। বুকের গভীর থেকে বলল, আমি তোমাকে ভালোবাসি।

এ কথা শোনার পর কী যে উজ্জ্বল হলো টগরের বিষণ্ন মুখখানি, কী যে স্বপ্নময় হলো চোখ! দু হাতে পাগলের মতো কাজলকে জড়িয়ে ধরল সে। কাজলের বুকে মুখ ঘষতে ঘষতে বলল, আমার আর কিছু চাই না, আর কিছু চাই না আমার। এই তো আমি তোমাকে পেয়ে গেছি। তোমার ভালোবাসা আমার সারাজীবনের সম্পদ। তোমার ভালোবাসা পেলে আর কী চাওয়ার থাকে আমার! এই পৃথিবীর যেখানেই থাকি আমি, যত কষ্টে থাকি, কোনো কষ্টই কষ্ট মনে হবে না। আমার হূদয়ে কোনো কষ্ট কখনো ঠাঁই পাবে না। সেই হূদয়ে জুড়ে থাকবে তুমি, তোমার ভালোবাসা। আমার চোখ কখনো কোনো খারাপ দৃশ্য দেখতে পাবে না। আমার চোখের কাজল হয়ে থাকবে তুমি, তোমার ভালোবাসা। এই নাকে আমি কেবলই তোমার গায়ের গন্ধ পাব, এই কানে শুনব তুমি কেবলই বলছ, আমি তোমাকে ভালোবাসি ভালোবাসি ভালোবাসি।

টগরকে জড়িয়ে ধরে হু হু করে কাঁদতে লাগল কাজল।

 

চব্বিশ

সড়কের অদূরে, মাঠপারে একটা বকুল গাছ। হাঁটতে হাঁটতে সেই গাছটির তলায় এসে দাঁড়াল কাজল। বেশ খানিকটা বেলা হয়েছে। চারদিক ঝকঝক করছে রোদে। দূরের মাঠ-প্রান্তর কেমন উদাস, নির্জন হয়ে আছে। বকুল গাছের পাতার আড়ালে বসে বিষণ্ন সুরে ডাকছে কি একটা পাখি। সেই ডাকে বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠল কাজলের। একটি পাখি আরেকটিকে ছেড়ে গেলে এমন স্বরে ডাকে একাকী পাখি। কেন একজন আরেকজনকে এভাবে ছেড়ে যায়!

ঠিক তখুনি টগরদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে সড়কে উঠল একটি পালকি। চার জন বেহারা যন্ত্রের মতো ছুটতে লাগল পালকি কাঁধে। কাজলের ইচ্ছে হলো ছুটে গিয়ে পালকির পথ রোধ করে দাঁড়ায়। হাত ধরে পালকি থেকে নামিয়ে আনে টগরকে। দু হাতে বুকে জড়িয়ে ধরে বলে, আমাকে ছেড়ে কোথায় চলে যাচ্ছ তুমি! কার কাছে চলে যাচ্ছ!

কিন্তু নড়তে পারে না কাজল, ছুটতে পারে না। সমাজের অদৃশ্য শেকলে তার পা বাঁধা। অসহায় চোখে টগরের পালকির দিকে তাকিয়ে থাকে সে।

পালকির ভেতর থেকে তখন বকুলতলায় কাজলকে দেখতে পায় টগর। তারও ঠিক একই রকমের অনুভূতি হয়। ইচ্ছে করে চিত্কার করে বলে, এই পালকি থামাও। কোথায় নিয়ে যাচ্ছ আমাকে! কার কাছে নিয়ে যাচ্ছ! তারপর পালকি থামবার সঙ্গে সঙ্গে পালকি থেকে লাফিয়ে নেমে ছুটে যায় বকুলতলায়। দু হাতে কাজলকে জড়িয়ে ধরে বলে, আমাকে তুমি তোমার বুকের কাছে ধরে রাখো। আমাকে তুমি কোথাও যেতে দিও না।

কিন্তু এসবের কিছুই করা হয় না টগরের। পালকি নামের এক খাঁচার ভেতর সমাজ তাকে আটকে দিয়েছে। বেহারারূপী চার সমাজপতি তাকে নিয়ে ছুটে যাচ্ছে নরকের পথে।

বকুলতলায় দাঁড়িয়ে থাকা কাজলের দিকে তাকিয়ে নিঝুম হয়ে কাঁদে টগর। কাজলের মাথার ওপর বকুলের ডালে বসা পাখিটা তখন আরও গভীর দুঃখের ডাকে মগ্ন হয়। সূর্যের তলায় এসে দাঁড়ায় ঘন কালো এক টুকরো মেঘ। পৃথিবী বিষণ্ন হয় মেঘের ছায়ায়। d

 

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
২১ জুন, ২০১৮ ইং
ফজর৩:৪৩
যোহর১২:০০
আসর৪:৪০
মাগরিব৬:৫১
এশা৮:১৬
সূর্যোদয় - ৫:১১সূর্যাস্ত - ০৬:৪৬
পড়ুন