নির্বাচিত অনুবাদ গল্প
ষাঁড়
বঙ্গানুবাদ :কাজী আখতারউদ্দিন
মো ইয়ান২১ জুন, ২০১৭ ইং
ষাঁড়
পশু জবাইয়ের পর এর ফুসফুসের ধমনীতে কীভাবে চাপ প্রয়োগ করে পানি ঢুকাতে হয়, এর বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিটি প্রথম লাও লান আবিষ্কার করেছিল। এই পদ্ধতিতে একটি দুশো জিন (১ জিন=৫০০ গ্রাম) ওজনের শুকরের ধমনীতে এক বালতি পানি ঢেলে খালি করা যায়, অথচ পুরোনো পদ্ধতিতে কেবল এর অর্ধেক পানি একটি মৃত গরুর শরীরে ঢোকানো যেত। বছরের পর বছর ধরে শহরের ধূর্ত লোকেরা কী পরিমাণ টাকা মাংস মনে করে পানির পেছনে খরচে করছে, তা কোনোদিনই হয়তো জানা যাবে না। তবে আমার নিশ্চিত ধারণা এটা সাংঘাতিক রকমের বিরাট একটা অংক হবে। 

লাও লানের ভুঁড়িটা বিশাল আর গালগুলো গোলাপি; আর খুব জোরে ঘণ্টা বাজালে যেরকম শব্দ হয়, তার কণ্ঠস্বরেও সেরকম শব্দ হতো। এককথায় বলা যায় তার জন্ম হয়েছিল খুব উঁচুপদের একজন আমলা হওয়ার জন্য। গ্রাম্য প্রধান হওয়ার পর, সে নিঃস্বার্থভাবে গ্রামের লোকদেরকে পানি ইনজেকশন করার পদ্ধতিটা শিখিয়ে দেয়। আর এই চাতুরী ও ধোঁকাবাজির ব্যবসার মাধ্যমে সে স্থানীয় ধনীলোকদের নেতায় পরিণত হয়। গ্রামের কিছু লোক অবশ্য রেগে গিয়ে তার বিরুদ্ধে নিজেদের মত প্রকাশ করতে থাকে আর কেউ কেউ তাকে আক্রমণ করে দেয়ালে পোস্টার সাঁটে। এর দ্বারা তারা দুর্ব্যবহারের জবাব দুর্ব্যবহারের মাধ্যমে দিয়ে তাকে ভূস্বামী শ্রেণির একজন সদস্য হিসেবে চিহ্নিত করল, যারা গ্রামের প্রলেতারিয়েত বা বিত্তহীন শ্রেণির শাসন উত্খাতের জন্য সবসময় সচেষ্ট ছিল। তবে এধরনের জবাব আজকাল অবশ্য চলে না। লাও লান গ্রামের লাউডস্পিকারের মাধ্যমে ঘোষণা করল, ‘ড্রাগন ড্রাগনের জন্ম দেয়, ফিনিক্স পাখি ফিনিক্স পাখির জন্ম দেয় আর ইঁদুরের জন্ম হয় কেবল গর্ত খোঁড়ার জন্য।’ কিছুদিন পর আমরা বুঝতে পারলাম যে, সে ছিল একজন কুংফু মাস্টারের মতো, যে তার সব কৌশল শিষ্যদেরকে শেখায় না—বরং নিরাপত্তা বলয় হিসেবে কিছু কৌশল নিজের কাছে রেখে দেয়। লাও লানের মাংসে সবার মতোই ইনজেকশন করে পানি ভরা থাকে, তার মাংস দেখতে বেশ টাটকা আর একটা মিষ্টি মিষ্টি গন্ধ থাকে। দুদিন রোদে রেখে দিলেও নষ্ট হয় না, অথচ অন্যদেরটা প্রথম দিন বিক্রি না হলেই পোকায় ধরে। কাজেই সাথে সাথে মাংস বিক্রি না হলে দাম কমাবার কথা ভেবে লাও লানকে কখনও উদ্বিগ্ন হতে হয় না; তবে এরকম টাটকা দেখতে মাংস কখনও অবিক্রিত পড়ে থাকারও ভয় নেই। 

আমার বাবা লাউ টং আমাকে বলেছিলেন, পানি নয়, লাও লান তার মাংসে ফরম্যালডিহাইড ইনজেকট করে। আমার বাবা লাও লানের চেয়েও অনেক চালাক ছিলেন। তিনি কখনও পদার্থবিদ্যা পড়েননি, কিন্তু পজিটিভ আর নেগেটিভ ইলেকট্রিসিটির ব্যাপারে সবকিছু জানতেন, কখনও বায়োলজি বা জীববিদ্যা পড়েননি অথচ শুক্রাণু আর ডিম্বকোষের বিষয়ে একজন বিশেষজ্ঞ ছিলেন; আর কোনোদিন রসায়ন না পড়লেও তিনি বেশ ভালো করেই জানতেন ফরম্যালডিহাইড জীবাণু ধ্বংস করে, মাংস নষ্ট হওয়া থেকে বাঁচায় এবং প্রোটিনের মাত্রা বজায় রাখে। আর এ থেকেই তিনি অনুমান করেছিলেন যে, লাও লান তার মাংসে ফরম্যালডিহাইড ইনজেক্ট করে। বড়লোক হওয়ায়ই যদি তার উদ্দেশ্য হতো, তাহলে আমার বাবা অতি সহজেই গ্রামের সবচেয়ে ধনী লোক হতে পারতেন, এটা আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি। তবে তিনি ছিলেন পুরুষের মধ্যে একজন ড্রাগন আর সম্পদ আহরণের প্রতি ড্রাগনের কোনো আগ্রহ থাকে না। আপনারা দেখেছেন, কাঠবিড়ালি গাছের ফোঁকরে আর ইঁদুর মাটিতে গর্ত খুঁড়ে খাদ্য জমিয়ে রাখে, কিন্তু কেউ কি কখনও দেখেছে যে পশুরাজ বাঘ সেরকম কিছু করে? বাঘ বেশিরভাগ সময় তার গুহায় ঘুমিয়ে কাটায়, আর ক্ষুধার্ত হলেই কেবল বাইরে এসে শিকার করে। ঠিক একইভাবে আমার বাবাও বেশিরভাগ সময় ঘরে থেকে খাওয়া-দাওয়া আর আরাম-আয়েশেই কাটান, আর যখন ক্ষুধায় টিকতে পারেন না, তখন রোজগারের উপায় খুঁজতে বের হন। তবে এক মুহূর্তের জন্যও লাও লান বা তার সমগোত্রীয় লোকদের সাথে তার তুলনা করা যায় না, যারা রক্তের বিনিময়ে ধন অর্জন করে, পরিষ্কার সাদা ছুরি চালিয়ে লাল করে বের করে আনে। গ্রামের অতি সাধারণ কিছু লোকের মতো ট্রেন স্টেশনে গিয়ে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে কুলিগিরি করতেও তিনি আগ্রহী ছিলেন না। বাবা বুদ্ধি খাটিয়ে জীবিকা বা অর্থ উপার্জন করতেন।

প্রাচীন আমলে পাও ডিং নামে একজন বিখ্যাত বাবুর্চি ছিলেন, যিনি গরু কাটতে ওস্তাদ ছিলেন। আর এই আমলেও গরুর মাংস কাটার বিষয়ে একজন ওস্তাদ লোক ছিলেন আমার বাবা। পাও ডিংয়ের দৃষ্টিতে গরু বলতে কেবল হাড় আর খাওয়ার উপযুক্ত মাংস। আমার বাবার দৃষ্টিতেও তাই ছিল। পাও ডিংয়ের চোখ ছিল একটা ছুরির মতো শাণিত; আর আমার বাবার চোখ ছিল একটি ছুরির মতোই ধারালো আর একটি দাঁড়িপাল্লার মতো নির্ভুল। অর্থাত্ আমি বলতে চাই যে, আপনি যদি একটা জ্যান্ত গরু আমার বাবার কাছে আনেন, তাহলে তিনি এর চারপাশ ঘিরে দুই কি বড়জোর তিনবার চক্কর দেবেন, মাঝেমধ্যে গরুটার সামনের ঠ্যাংয়ের নিচ দিয়ে হাত ঢুকিয়ে উপরের দিকে একটু চাপ দেবেন—এমনি লোক-দেখানো ভাবে, তারপর বেশ আস্থার সাথে গরুটার মোট ওজন আর কতটুকু মাংস হবে তার একটা ধারণা দেবেন। আর তিনি যে ওজনটা আন্দাজ করে জানাবেন, তা ইংল্যান্ডের সবচেয়ে বড় কসাইখানায় ব্যবহূত ডিজিটাল ওজন যন্ত্রে যা হবে তার এক কিলোর মধ্যেই হবে। প্রথম প্রথম লোকে মনে করত আমার বাবা কেবল একজন বাকসর্বস্ব ব্যক্তি, তবে কয়েকবার পরীক্ষা করার পর ওরা তার কথা বিশ্বাস করল। গরুর ব্যাপারী আর কসাইদের মধ্যে কেনাবেচার সময় তার উপস্থিতিকে দুই পক্ষই সমানভাবে মেনে নিত আর এটা একটা ন্যায্যতার ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত করল। আর একবার তিনি কর্তৃত্ব নিয়ে আসন গেড়ে বসতেই গরু ব্যাপারী আর কসাইরা তার কাছ থেকে একটু সুবিধা আর সুনজরে আসার জন্য তাকে তোয়াজ করতে শুরু করল। তবে দূরদৃষ্টির অধিকারী একজন ব্যক্তি হিসেবে ছোটখাটো লাভের কারণে তিনি কখনও তার সুনাম নষ্ট করেননি, কারণ এতে তার উপার্জনের পথ বন্ধ হয়ে যেতে পারে। যদি কোনো পশু বিক্রেতা মদ ও সিগারেট উপহার নিয়ে আমাদের বাসায় আসত, তবে আমার বাবা সাথে সাথে সেগুলো রাস্তায় ছুঁড়ে ফেলে দিতেন আর বাগানের পাচিলের উপর চড়ে চিত্কার করে শাপশাপান্ত করতেন। আর যদি কোনো কসাই একটা শুকরের মাথা উপহার হিসেবে বাসায় নিয়ে আসত, তখন আমার বাবা সেটাও রাস্তায় ছুঁড়ে ফেলতেন, তারপর বাগানের পাচিলে চড়ে গালাগালি করতেন। পশু বিক্রেতা আর কসাই উভয়ে বলত লাউ টং একজন বোকা লোক, তবে তাদের জানা সবচেয়ে পক্ষপাতহীন ব্যক্তি।

লোকজন তাকে নিঃসংশয়ে বিশ্বাস করত। দর কষাকষি বা বেচাকেনার কোনো এক পর্যায়ে অচলাবস্থা সৃষ্ট হলে উভয় পক্ষই তার দিকে তাকিয়ে একটা মীমাংসা পাওয়ার আশায় বলত, ‘তর্কাতর্কি বাদ দিয়ে চল শুনি লাউ টং কী বলে!’ ‘ ঠিক আছে, চল তাই করা যাক। লাউ টং তুমিই বিচার কর!’ বেশ একটু আত্মগর্বসম্পন্ন ভাব নিয়ে ক্রেতা কিংবা বিক্রেতার দিকে একবারও না তাকিয়ে আমার বাবা পশুটার চারপাশ ঘিরে দুইবার চক্কর দিতেন, তারপর আকাশের দিকে তাকিয়ে পশুটার মোট ওজন, মাংসের পরিমাণ আর এর একটা দামও ঘোষণা করতেন। তারপর একটু সরে গিয়ে একটা সিগারেট ধরাতেন। ক্রেতা আর বিক্রেতা উভয়েই এগিয়ে হাত মিলিয়ে বলত, ‘চমত্কার! তাহলে এই ব্যবস্থাই ঠিক হলো!’ বেচাকেনা শেষ হওয়ার পর ক্রেতা আর বিক্রেতা আমার বাবার কাছে এসে প্রত্যেকে একটা দশ ইউয়ানের নোট দিয়ে তার পরিশ্রমের জন্য ধন্যবাদ জানাত। এখানে একটা বিষয় পরিষ্কার হওয়া দরকার যে, গবাদিপশুর নিলামে আমার বাবা উপস্থিত হওয়ার আগে, বেচাকেনার কারবার হতো পুরোনো রীতির দালালের মাধ্যমে। কালো, রোগা, বিশ্রী দেখতে কতগুলো বুড়োমানুষ, কারো কারো পেছনে মানুষের দীর্ঘ একটা সারি দেখা যেত। জামার চওড়া আস্তিনের ভেতরে লুকানো আঙুলের ইশারায় দরকষাকষিতে এরা পটু ছিল আর এসব করে ওরা এই পেশায় একটা রহস্যময় আচরণের আবহ সৃষ্টি করেছিল। আমার বাবা সত্যিকার অর্থে এসব ধড়িবাজ দালালকে ইতিহাসের এই দৃশ্যপট থেকে তাড়ালেন। একটু বাড়িয়ে বললে পশু কেনাবেচার বিষয়ের এই উল্লেখযোগ্য অগ্রগতিকে—একটি বৈপ্লবিক ব্যাপার বলা যেতে পারে। আমার বাবার তীক্ষ নজর শুধু গবাদিপশুর দিকে সীমাবদ্ধ ছিল না, এটা শুকর ও ভেড়ার উপরও কার্যকর ছিল। একজন দক্ষ কাঠমিস্ত্রী, যেমন একটি টেবিল বানাতে পারে, তেমনি সে একটা চেয়ারও বানাতে পারে। আর যদি বিশেষভাবে মেধাবী হয় তবে একটি কফিনও তৈরি করতে পারবে। এমনকি একটা উট সম্পর্কে ধারণা দিতেও আমার বাবার তেমন অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।

গ্রীষ্মের এক সকালে বাবা আমাকে কাঁধে চড়িয়ে নিয়ে শস্য মাড়াইখানার দিকে চললেন। আমরা তখন দাদুর কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া তিন কামরার চালাঘরে থাকতাম। চালাঘরটার চর্তুদিকে লাল টালির ছাদসহ নতুন নতুন কতগুলো বাড়ি উঠে যাওয়ায় এখন এটাকে দেখতে আরও জরাজীর্ণ আর জঘন্য মনে হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল যেন, সিল্ক আর সাটিনের পোশাকপরা এক ঝাঁক জমিদার আর ধনী ব্যবসায়ীর সামনে একটা ভিক্ষুক হাঁটুগেড়ে বসে ভিক্ষা চাচ্ছে। আমাদের উঠানের চারদিকের কোমর সমান দেয়ালটার উপরে আগাছায় ভরে গিয়েছিল। আর আমাদের আলসে আর পেটুক বাবার কারণে আমরা চরমভাবে জীবন যাপন করতাম। সুদিনে চুলায় হাড়িভর্তি মাংস থাকত আর খারাপ দিনে শূন্য হাঁড়ি পড়ে থাকত। যখনই মা ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে লক্ষ্য করে অভিশাপ দিতে শুরু করতেন, তখন বাবা বলতেন, ‘দ্যাখো, শিগগিরই যেকোনো দিন দ্বিতীয় ভূমি-সংস্কার অভিযান শুরু হবে, আর এটা শুরু হলে তুমিই আমাকে ধন্যবাদ দেবে। আর এক মিনিটেরও জন্য লাও লানকে দেখে ঈর্ষা করো না। কারণ একদিন তার অবস্থাও ওই জমিদারগুলোর মতোই হবে। গুলি করে মারবার জন্য গরিব কৃষকের সর্বহারা দল তাকে টেনে ওই সেতুর মাথায় নিয়ে যাবে।’ তারপর মায়ের মাথা লক্ষ্য করে একটা কাল্পনিক রাইফেল তুলে ধরে এক রাউন্ড গুলি ছোঁড়ার শব্দ করতেন :গুড়ুম! আর সাথে সাথে মাও দুই হাতে মাথা চেপে ধরতেন আর আতঙ্কে তার মুখ বিবর্ণ হয়ে যেত। তবে সেই দ্বিতীয় ভূমি-সংস্কার অভিযান আর এলো না তো এলোই না, আর বেচারি আমার মা লোকের ফেলে দেওয়া পচা আলু কুড়িয়ে এনে শুকরগুলোকে খেতে দিতেন। আমাদের ছোট ছোট শুকরদুটো কখনও পেটভরে খেতে পেত না, আর বেশিরভাগ সময় ক্ষুধার জ্বালায় এরা দীর্ঘক্ষণ তীক্ষ চিত্কার করত। খুবই বিরক্তিকর ছিল ব্যাপারটা।  

সেদিন সকালে বাবা ভীষণ রেগে গিয়ে শুকরদুটোকে গালাগালি করে বললেন, ‘এই বেজন্মার দল! কেন এত চেঁচামেচি করছিস? এরকম চিল্লাচিল্লি করতে থাকলে তোদের দুজনকে কেটে আজ রাতে রান্না করে খেয়ে ফেলব!’ কথাটা শুনেই মাংস কাটার ভারী ছুরিটা হাতে নিয়ে মা তার দিকে চোখ পাকিয়ে বললেন, ‘স্বপ্নেও একথা কল্পনা করো না। ওগুলো আমার শুকর। আমিই এগুলোকে পেলেপুষে বড় করেছি আর কেউ ওদের গায়ের একটা পশমও ছিঁড়তে পারবে না। আজ হয় মাছ মরবে আর নয়তো জাল ছিঁড়ে যাবে।’     

বাবা হেসে বললেন, ‘অস্থির হয়ো না, শান্ত হও! ওই পশুদুটোর গায়ে শুধু হাড্ডি আর চামড়া লেগে আছে, কোনো কিছুর বিনিময়েই আমি ওগুলোকে ছুঁয়ে দেখব না।’

আমি এবার শুকরদুটোর দিকে বেশ কিছুক্ষণ তাকালাম—কথাটা সত্যি যে, এগুলোর গায়ে তেমন মাংস নেই, কেবল ওই চারটে মাংসল কান দিয়ে নাস্তা খাওয়ার মতো কিছু রান্না করা যেতে পারে। আমার কাছে শুকরের মাথার মধ্যে শুধু কানদুটো পছন্দ। খুব একটা তেল চর্বি নেই আর ছোট ছোট হাড় চিবিয়ে খেতে বেশ আরাম। এর সাথে কিছু শসা, তিল তৈল আর কিছু রসুন পিষে দিয়ে খেতে পারলে খুব চমত্কার হবে। আমি বললাম, ‘আমরা কানগুলো খেতে পারি!’

মা বললেন, ‘আগে তোর কান কেটে নিয়ে আমি খাব, শয়তান বেজন্মা কোথাকার!’ একথা বলে তিনি খুব জোরে আমার কান মুচড়ে টেনে ধরলেন, আর বাবা আমার ঘাড় ধরে ছাড়াতে চেষ্টা করলেন—আর এদিকে কান ছিঁড়ে যাবে এই ভয়ে আমি তারস্বরে চিত্কার শুরু করলাম। গ্রামে কোনো শুকর কাটার সময় শুকরগুলো যেরকম তীক্ষ চিত্কার করত, আমার চিত্কারটাও সেরকম শোনাল। যাই হোক শেষপর্যন্ত বাবার গায়ের জোর বেশি থাকায় হঠাত্ জোরে একটা টান দিয়ে তিনি আমার কানটা মায়ের কবল থেকে ছিনিয়ে আনতে পারলেন।

প্রচণ্ড রাগে মায়ের মুখ তখন মোমের মতো সাদা আর ঠোঁটদুটো বেগুনি হয়ে গিয়েছিল; চুলার পাশে দাঁড়ানো অবস্থায় তার মাথা থেকে পা পর্যন্ত কাঁপছিল। মায়ের হাত থেকে বাবা আমাকে রক্ষা করায় আমি তখন সাহস পেয়ে মায়ের পুরো নাম উচ্চারণ করে বললাম, ‘ইয়াং উঝেন, তুমি একটা নোংরা গন্ধওয়ালা বুড়ি, আমার জীবনকে একটা জীবন্ত নরক বানিয়ে ছেড়েছ!’

আমার মুখ থেকে এসব কথা বের হতেই, স্তম্ভিত হয়ে মা শুধু আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। আর এদিকে বাবা শুধু একবার মুখ টিপে হেসে আমাকে কাঁধে তুলে নিয়ে ঘর থেকে ছুটে বের হয়ে গেলেন। আমরা যখন বের হয়ে উঠানে চলে এসেছি, তখন পেছন থেকে মায়ের তীক্ষকণ্ঠের আহাজারি শোনা যাচ্ছিল। ‘আরে ও খুদে বেজন্মা! রাগের চোটে তো আমি মরে যেতেও পারতাম...’

বাবা আমার মাথায় আলতো করে কয়েকবার ঠোক্কর মেরে আস্তে আস্তে বললেন, ‘এই শয়তানের বাচ্চা, নিজের মায়ের পুরো নাম কি করে জানলি?’

আমি তার শ্যামবর্ণ, মলিন মুখের দিকে তাকিয়ে বললাম, ‘তোমার মুখে বলতে শুনেছি!’

‘আমি আবার কখন তোকে বলেছি যে, তার নাম ইয়াং উঝেন?’

‘তুমি বুনো খচ্চর আন্টিকে একথা বলেছ। তুমি বলেছিল, ওই নোংরা গন্ধওয়ালা বুড়ি ইয়াং উঝেন আমার জীবনকে একটা জীবন্ত নরক বানিয়ে ছেড়েছে!’

বাবা সাথে সাথে তার হাত আমার মুখে চাপা দিয়ে বললেন, ‘চুপ কর, বোকার হদ্দ! আমি সবসময় একজন ভালো বাবা হতে চেষ্টা করেছি। এখন এসব কথা উচ্চারণ করে আমার সুনাম নষ্ট করিস না।’

এদিকে মাংস কাটার ভারী ছুরি হাতে মা বাড়ি থেকে বের হয়ে এসেছেন। তিনি চিত্কার করে বললেন, ‘লাউ টং, লাউ জিয়াওটং, তোরা দুইজন কুকুরের বাচ্চা, বেজন্মা, আজ আমার প্রাণ যায় যাক, তবু তোদের দুজনকে সাথে নিয়ে মরব। আজই এই পরিবারের শেষ দেখতে চাই আমি!’

তার চেহারার এই ভয়ঙ্কর রূপ দেখে আমার মনে হলো তিনি রসিকতা করছেন না। বাবা আমার সারাক্ষণ শুধু আমোদ-ফুর্তিতে জীবন কাটালেও, তেমন বোকা নন। একজন চতুর লোক সবসময় বিপদ এড়িয়ে চলে। তিনি আমাকে এক টানে মাটি থেকে তুলে বগলদাবা করলেন, তারপর ঘুরে পাঁচিলের দিকে ছুট লাগালেন। রণরঙ্গিণী আর ক্রোধোন্মত্ত মা আর তার সাথে একগাদা বিপদ-আপদ পেছনে ফেলে এক লাফে পাঁচিল ডিঙিয়ে এপারে চলে এলেন। আমরা যেভাবে পাঁচিল ডিঙিয়েছি, মায়েরও যে তা করার ক্ষমতা আছে, সে বিষয়ে আমি মোটেই সন্দেহ পোষণ করিনি। তবে তিনি তা করলেন না। উঠান থেকে আমাদেরকে বের করে দেওয়ার পর তিনি তাড়া করা থামালেন। পাঁচিলের কাছে এসে কয়েকবার লাফালেন, তারপর ভেতরে ফিরে গিয়ে পচা আলুগুলো কাটা শেষ করতে লাগলেন আর চেঁচিয়ে গালাগাল করতে করতে পুরো এলাকা মাথায় তুললেন। রাগ ঝেড়ে ফেলার এটা একটা উত্তম পন্থা—কোনো রক্তপাত নেই, বিশৃঙ্খলা নেই, আইনভঙ্গ করা নেই, তারপরও আমি জানতাম এই আলুগুলোর উপর দিয়েই তিনি তার তিক্ত শত্রুর বিরুদ্ধে ঝাল ঝাড়ছেন।

এখন পরবর্তীতে ব্যাপারটা নিয়ে যখন ভাবতে বসেছি, তখন বুঝতে পারলাম, মায়ের আসল শত্রু বাবা অথবা আমি নই। এটা হচ্ছে সেই পাগলি বা বুনো খচ্চর মহিলাটি, যে গ্রামে একটা মদের দোকান চালায়। আমার মা নিশ্চিত ছিলেন যে, সেই নোংরা মেয়েমানুষটা আমার বাবাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে কুকর্মে প্ররোচিত করেছে। তবে আমি ঠিক বলতে পারব না পরিস্থিতির এটাই সঠিক মূল্যায়ন কি না। বাবা আর বুনো খচ্চরীর সম্পর্কে শুধু এটুকু বলা যায়, কেবল ওরা দুজনেই বলতে পারবেন, কে কাকে প্ররোচিত করেছে আর কে প্রথম কার দিকে প্রথম ছেনালি দৃষ্টিতে বা ফষ্টিনষ্টির চোখে তাকিয়েছিল।

মাড়াই করার উঠানে পৌঁছে আমরা দেখলাম, সাত-আটজন গরু ব্যাপারী উবু হয়ে বসে সিগারেট টানছে আর কসাইদের জন্য অপেক্ষা করছে। (একসময় আমাদের পুরো গ্রামই একটা কসাইখানায় পরিণত হয়েছিল। উদ্দেশ্যমূলকভাবে কৃষি জমিগুলো পতিত করে রাখা হয়েছিল আর শস্য মাড়াইয়ের উঠানটি গবাদিপশু কেনাবেচার স্থান হয়ে দাঁড়িয়েছিল) গরুবাছুরগুলো একপাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে। একটু পরই যে ওদের সর্বনাশ হতে যাচ্ছে সে বিষয়ে সম্পূর্ণ অচেতন হয়ে একমনে জাবর কাটছিল। গরুর ব্যাপারীরা অধিকাংশই পশ্চিমের জেলাগুলো থেকে আসত, আর রেডিও নাটকের অভিনেতার মতো মজার উচ্চারণে কথা বলত। দশ দিন অন্তর অন্তর ওরা আসত। আর প্রত্যেকে দুটো কি তিনটি করে গরু নিয়ে আসত। অধিকাংশ সময় ওরা একটা ধীরগতির মাল ও যাত্রীবাহী—মিক্সড ট্রেনের একই বগিতে মানুষ আর গরু গাদাগাদি করে আসত আর প্রায় সূর্যাস্তের সময় গ্রামের সবচেয়ে কাছের স্টেশনে ট্রেনটা এসে পৌঁছাত। তবে মধ্যরাতের আগে ওরা গ্রামে পৌঁছাত না, যদিও এখান থেকে স্টেশনের দূরত্ব দশ লি’র বেশি ছিল না। গরুসহ হেঁটে এখানে আসতে এই ব্যবসায়ীদের বড়জোর দুই ঘণ্টা লাগার কথা। তবে ওরা কেন মধ্যরাতে গ্রামে পৌঁছাতে পছন্দ করে? এটা একটা রহস্য। আমি যখন ছোট ছিলাম তখন আমার বাবা-মা আর পাকা দাড়িওয়ালা কয়েকজন গ্রামবাসীকে এই প্রশ্নটা করেছিলাম। তবে ওরা কেবল পাথরের মূর্তির মতো আমার দিকে তাকিয়েছিল, যেন আমি ওদেরকে জীবনের কী অর্থ তা জানতে চেয়েছি কিংবা এমন একটা প্রশ্ন করেছি, যার উত্তর সবাই জানে। 

গবাদিপশুর আগমন গ্রামের কুকুরগুলোর জন্য একটা সংকেত ছিল, কারণ ওরা পৌঁছানোর সাথে সাথে কুকুরগুলো একযোগে ঘেউ ঘেউ শুরু করত। যার ফলে গ্রামের সমস্ত মানুষ—নারী, পুরুষ, ছেলেবুড়ো সবাই জেগে উঠত আর জানত যে গরু ব্যাপারীরা এসেছে। আমার ছোটবেলার স্মৃতিতে এরা ছিল রহস্যময় একটি গোষ্ঠী আর এই রহস্যবোধের অনুভূতিটা নিশ্চয়ই মধ্যরাতে ওদের গাঁয়ে ঢোকার সাথে জড়িত ছিল। কোনো কোনো চাঁদনি রাতে কুকুরের একযোগে ঘেউ ঘেউ চিত্কারে যখন রাতের নীরবতা ভেঙে খান খান হয়ে যেত, তখন মা গায়ে লেপ জড়িয়ে জানালার কাছে মুখ নিয়ে বাইরের দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে থাকতেন। বাবা যখন আমাদের ফাঁকি দিয়ে চুপি চুপি বুনো খচ্চরীর কাছে যেতেন, তার আগে এটা হতো। তবে এমন অনেক রাত ছিল যে, যখন তিনি আর বাড়ি ফিরে আসতেন না। আমিও নিঃশব্দে উঠে পড়তাম আর মায়ের পাশ দিয়ে জানালার বাইরে তাকিয়ে দেখতাম, গরু ব্যাপারীরা আমাদের বাড়ির পাশ দিয়ে নিঃশব্দে গরুগুলোকে খেদিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। চাঁদের আলোয় চকচক করা সদ্যস্নাত গরুগুলোকে দেখে কাচের মতো চকচকে প্রলেপ দেওয়া দানবাকৃতির মাটির পাত্র মনে হতো। কুকুরগুলোর একনাগাড়ে ঘেউ ঘেউ চিত্কারটা না শুনলে আমি হয়তো ভাবতাম যে, আমি একটি সুন্দর স্বপ্নের দৃশ্য দেখছি।

আমাদের গ্রামে বেশ কয়েকটা সরাইখানা ছিল, তবে গরুব্যাপারীরা কখনও এগুলোতে ঘুমাত না; ওরা বরং পশুগুলোকে তাড়িয়ে নিয়ে সোজা মাড়াইখানায় পৌঁছে ভোর হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করত। ঝড়, বৃষ্টি, কনকনে ঠাণ্ডা হাওয়া কিংবা গনগনে গরম, যাই হোক, যেকোনো আবহাওয়ায় ওরা সোজা তাই করত। কোনো কোনো ঝড়ের রাতে সরাইখানার মালিকরা বাইরে বের হয়ে ওদেরকে ভেতরে আসতে আমন্ত্রণ জানাত, তবে যতই ফুলেল আহ্বান হোক না কেন, গরুর ব্যাপারী আর পশুগুলো সেই বিরূপ আবহাওয়ার মধ্যেই মূর্তির মতো বসে থাকত, কোনো নড়াচড়া করত না। সামান্য টাকা খরচ করতে হবে সেই ভয়েই কি ওরা সরাইখানায় আশ্রয় নিত না? না। তবে লোকজন বলাবলি করত যে, গবাদিপশু বিক্রির পর ওরা শহরে গিয়ে মদ আর পতিতার পেছনে টাকা উড়াত। আর বাড়ি ফিরে যাওয়ার জন্য সেই ধীরগতির ট্রেনের টিকেট কেনার মতো টাকা থাকা পর্যন্ত স্ফূর্তি চালিয়ে যেত। ওদের জীবনযাত্রাও কৃষকদের জীবনযাত্রা থেকে খুব বেশি ভিন্নরকম হওয়ার কথা নয়। আর চিন্তাভাবনাও সেরকম। আমি যখন ছোট ছিলাম, তখন বেশ কয়েকবার গ্রামের গণ্যমাণ্য ব্যক্তিদের একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মন্তব্য করতে শুনেছি, ‘হায়, এরা কী ধরনের মানুষ? ওদের মাথার মধ্যে কি চিন্তা ভাবনা চলে?’ ওরা যখন বাজারে আসত, তখন ওরা বাদামি আর কালো, বলদ আর গাই গরু, পূর্ণবয়স্ক গরু আর বাছুরও আনত। এমনকি একবার ওরা বাছুর ছাড়েনি তেমন একটা গাইগরুও বাছুরসহ এনেছিল। এর বাটগুলো দেখতে ছিল পানির জগের মতো। আর এই গরুটার দাম আন্দাজ করতে বাবার বেশ ঝামেলা হয়েছিল, কারণ গাভিটার ওলান খাওয়া যায় কি না তিনি তা জানতেন না।

বাবাকে দেখা মাত্রই গরুর ব্যাপারীরা দাঁড়িয়ে যেত। ভোরবেলাতেই ওরা আয়নার মতো সানগ্লাস চোখে দিত, যা দেখলে বেশ ভুতুড়ে মনে হতো, তবে ওরা তাকে সম্মান দেখিয়ে মৃদু হাসত। বাবা আমাকে কাঁধ থেকে নামিয়ে ব্যাপারীদের কাছ থেকে দশ ফুট আন্দাজ দূরত্বে উবু হয়ে বসতেন। তারপর একটা তোবড়ানো সিগারেটের প্যাকেট বের করে, সেখান থেকে একটা বেঁকে যাওয়া ভেজা সিগারেট বের করতেন। এদিকে গরুর ব্যাপারীরা ওদের প্যাকেট বের করত আর দশ-বারোটা সিগারেট বাবার পায়ের কাছে মাটিতে উড়ে এসে পড়ত। তিনি ওগুলো কুড়িয়ে নিয়ে সুন্দর করে মাটিতে সাজিয়ে রাখতেন। ব্যাপারীদের মধ্য থেকে একজন হয়তো বলত, ‘আরে ও বুদ্ধু বুড়া লাও লাউ, খাও, সিগারেটগুলো খাও। তোমার কি মনে হয় একটা-দুটো সিগারেট খাইয়েই আমরা তোমার কাছ থেকে সুবিধা আদায় করার চেষ্টা করছি?’ বাবা কেবল মৃদু হেসে তার সস্তা সিগারেটটা ধরাতেন।

এরপর গ্রামের কসাইরা একজন দুজন করে হাজির হতে শুরু করত। ওদের সবাইকে দেখে মনে হতো, সদ্য গোসল করে এসেছে, যদিও শরীর থেকে আমি রক্তের গন্ধ ঠিকই টের পাচ্ছিলাম। এতে বোঝা যাচ্ছে—গরু কিংবা শুকর যারই রক্ত হোক না, তা ধুয়ে সাফ করা যায় না। কসাইদের গা থেকে রক্তের গন্ধ পেয়ে গবাদি পশুগুলো গা ঘেঁষাঘেঁষি করে দাঁড়াল, ওদের চোখে আতঙ্ক ফুটে উঠেছে। অপেক্ষাকৃত কমবয়সী গরুগুলো ছড়াত্ করে তরল লাদি ছাড়তে শুরু করল আর পূর্ণবয়স্ক গরুগুলোকে দেখে মনে হচ্ছিল এখনও ওরা নিজেদের সামলে রেখেছে। তবে আমি জানি এটা কেবল বাইরের চেহারা, কারণ বিষ্ঠা যাতে বের না হয়, সেজন্য এরা লেজগুলো উঁচু করে নিতম্বের নিচে টেনে রেখেছে। তবে হঠাত্ হওয়া বইলে পুকুরে যেরকম ছোট ছোট ঢেউ উঠে, সেরকমভাবে গরুগুলোর পা থর থর করে কাঁপছিল।

কসাইরা আসার সাথে সাথে দরকষাকষি শুরু হলো। ওরা যখন পশুগুলোর চারপাশ ঘুরে ঘুরে দেখছিল, তখন কেউ দেখলে হয়তো ভাববে যে, কোনটা কিনবে সে সিদ্ধান্ত নিতে ওদের সমস্যা হচ্ছিল। তবে ওদের মধ্যে যেকোনো একজন যখন এক হাত বাড়িয়ে খপ করে একটা পশুর গলার রশি আঁকড়ে ধরবে, তার তিন সেকেন্ডের মধ্যেই অন্যরাও একই কাজ করবে। আর নিমিষের মধ্যে সব গরুই ক্রেতা পেয়ে যাবে। কেউ কোনো দিন বলতে পারবে না যে, এক গরু নিয়ে দুজন কসাইয়ের মধ্যে টানাহেঁচড়া হয়েছে, তবে সেকরম কিছু হলে, অতি দ্রুতই তার একটা নিষ্পত্তি হয়ে যেত। অধিকাংশ পেশায় প্রতিযোগীরা পরস্পরের প্রতিপক্ষ হয়, তবে আমাদের গ্রামের কসাইরা বন্ধুত্বের বন্ধনে একতাবদ্ধ হয়ে একটি ভ্রাতৃসংঘের মতো যেকোনো ধরনের এবং সকল প্রতিপক্ষকে মোকাবিলা করতে প্রস্তুত। সবাই হাতে হাতে একটা করে গরুর রশি নেওয়ার পর, গরুর ব্যাপারীরা ধীরে সুস্থে এগিয়ে আসবে এবং এরপর দরকষাকষি শুরু হবে। তবে এখন যেহেতু আমার বাবার কর্তৃত্ব দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে, তাই এসব দরকষাকষি কেবল একটা আনুষ্ঠানিকতা মাত্র, কেবল একটা নিয়মরক্ষার ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ সবকিছু এখন তার হাতে—শেষ রায়টি তিনিই দেবেন। লোকগুলো কিছুক্ষণ কেবল আগুপিছু করবে, তারপর গরু টেনে নিয়ে বাবার কাছে এগোবে। যেন বিয়ের লাইসেন্সের জন্য আবেদনকারীরা টাউন হলে হাজিরা দিয়েছে।

তবে আজকের এই দিনটিতে বিশেষ কিছু ঘটল :সোজা গরুর দিকে না গিয়ে কসাইরা উঠানের সীমানা ঘেঁষে সামনে পেছনে পায়চারী করতে লাগল, আর ওদের অর্থপূর্ণ হাসি যেই দেখছিল সেই অস্ব্বস্তিবোধ করছিল। আর যখন ওরা আমার বাবার সামনে দিয়ে যাচ্ছিল, তখন মনে হচ্ছিল ওই হাসির পেছনে যেন কিছু একটা লুকিয়ে আছে, যা কোনো অপ্রীতিকর কোনো ব্যাপার বা কলহের ইঙ্গিত দিচ্ছিল। যেন একটা ষড়যন্ত্র পাকিয়ে উঠছে, যা যেকোনো মুহূর্তে বিস্ফোরিত হবে। ভয়ে ভয়ে একবার বাবার দিকে তাকালাম, তিনি তখন অনড় হয়ে একটা কাঠের মূতির্র মতো ঠায় বসে থেকে তার সস্তা সিগারেট ফুঁকে যাচ্ছেন, যে রকম রোজ করেন। ব্যাপারীরা তার দিকে দামি দামি যে সিগারেটগুলো ছুঁড়ে ফেলেছিল, সেগুলো এখনও কেউ ছুঁয়ে দেখেনি, এখনও সেগুলো মাটিতে পড়ে রয়েছে। বেচাকেনা শেষ হয়ে যাওয়ার পর সাধারণত কসাইরা এসে সিগারেটগুলো কুড়িয়ে নিয়ে টানতে শুরু করবে। আর সিগারেটে সুখ টান দিতে দিতে ওরা বাবার সততার প্রশংসা করবে। কেউ হয়তো একটু ঠাট্টার ভঙ্গিতে বলবে, ‘লাও লাউ, চীনারা সবাই যদি তোমার মতো হতো, তবে দশ বছর আগেই কমিউনিজম বাস্তবায়িত হতো।’ তিনি মৃদু হাসতেন, তবে কিছু বলতেন না। আর ঠিক সেই মুহূর্তে আমার বুক গর্বে ফুলে উঠত আর আমি তখন শপথ নিতাম যে, এভাবেই আমি কাজকারবার করব, তিনিই সেই ধরনের মানুষ, যার মতো আমি হতে চাই। ব্যাপারীরাও পরিষ্কার বুঝতে পারছিল যে, আজ কিছু একটা ঘটছে এবং ওরা ঘুরে ঘুরে বাবার দিকে তাকাচ্ছিল। শুধু কয়েকজন ব্যাপারী ঠাণ্ডা দৃষ্টিতে কসাইদের পায়চারী করা লক্ষ করছিল। সবাই যেন একটা মৌন বোঝাপড়া করেছে :কী হতে যাচ্ছে তার জন্য সবাই অপেক্ষা করছিল, যেন একটি নাটক শুরু হওয়ার জন্য দর্শকরা অপেক্ষা করছে।

পুব দিকে মাঠের উপর উজ্জ্বল লাল টকটকে সূর্য উঠে এসেছে। অবশেষে এবার নাটকের মুখ্য অভিনেতা মাড়াইখানায় প্রবেশ করল :লম্বা, পেশিবহুল দেহের অধিকারী রুক্ষ চেহারার লাও লান। বাদামি দাড়ি আর একই রঙের চোখের কারণে অনেক মনে করত যে, সে হয়তো বিশুদ্ধ হান বংশের একজন লোক। যে মুহূর্তে সে উঠানে এসে পৌঁছাল, সমস্ত দৃষ্টি তার উপর এসে স্থির হলো। রোদ পড়ে তার মুখ চকচক করছিল। সে বাবার দিকেই হেঁটে আসছিল, তবে তার দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল নিচু মাটির দেয়ালের ওপারে মাঠের দিকে। সেদিকে তাকালে ভোরের সূর্য কিরণে চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছিল। মাঠের শস্য জেড পাথরের মতো সবুজ; আর ফুটন্ত ফুলের সৌরভ হাওয়ায় ছড়িয়ে পড়ছে। গোলাপি-লাল আকাশে ভরতপাখি গান গেয়ে বেড়াচ্ছিল। যেহেতু লাও লানের চোখে আমার বাবাকে কিছুই মনে হচ্ছিল না, কাজেই তার মোটেই দেয়ালের ধারে বসা উচিত ছিল না। আর স্বভাবত আমার বাবাকে যদি তার কাছে কিছুই মনে না মনে হয়, তাহলে আমাকে তো তার কাছে আরও কম মনে হওয়ার কথা। হয়তো সূর্যের প্রখর কিরণে তার চোখ ধাঁধিয়ে গেছে—আর সেকথাই আমার কিশোর মনে প্রথম জাগল—তবে বেশ তাড়াতাড়ি বুঝতে পারলাম লাও লান আমার বাবাকে খেপিয়ে তোলার করার চেষ্টা করছে।

তারপর কসাই আর গরুর ব্যাপারীদের সাথে কথা বলার জন্য সে ওদের দিকে মাথা ঘুরাল, আর এদিকে প্যান্টের চেইন খুলে তার কালো পুরুষাঙ্গটা বের করে আমার বাবা আর আমার সামনে পেচ্ছাব করতে শুরু করল। হলুদ রঙের পেচ্ছাবের উষ্ণ দুর্গন্ধ আমার নাকে ঝাঁপটা মারল। অনেকক্ষণ ধরেই সে পেচ্ছাব করে চলছিল, সম্ভবত সারারাত পেচ্ছাব না করে জমিয়ে রেখেছিল, যাতে আমার বাবাকে অপমান করতে পারে। মাটিতে পড়ে থাকা সিগারেটগুলো তার প্রস্রাবের ধারায় ভিজে গিয়ে উল্টোপাল্টে গড়াগড়ি খেতে লাগল। আর তরলে ভিজে যাওয়ায় ফুলতে ফুলতে সিগারেটগুলো আকৃতি হারিয়ে ফেলল। লাও লান যখন তার পৌরুষদণ্ডটা বের করেছিল, তখন কসাই আর ব্যাপারীরা কেমন যেন অদ্ভুতভাবে হেসে উঠেছিল, তারপর হঠাত্ সেই হাসি এমনভাবে থেমে গেল, যেন একটা বিশাল হাত ওদের গলা চেপে ধরেছে। ওদের চোয়াল ঝুলে পড়ল আর হতবাক হয়ে ওরা আমাদের দুজনের দিকে তাকিয়ে রইল, মুখে রা-টি নেই। কসাইরা জানত যে, লাও লান আমার বাবার সাথে একটা বিবাদে জড়াতে চায়, তবে ওরাও ভাবতে পারেনি যে, সে এরকম কিছু একটা করবে। তার প্রস্রাব আমাদের পায়ের পাতা আর হাঁটু পর্যন্ত এসে পড়ছিল, এমনকি কিছু ছিটা নাকে মুখেও এসে পড়েছিল। রেগে গিয়ে আমি লাফিয়ে উঠলাম, কিন্তু বাবা তার একটি পেশিও নাড়লেন না। তিনি একটা পাথরের মতো বসে রইলেন। আমি লাও লানকে গালি দিয়ে উঠলাম, ‘তোর বুড়ির মুখে লাথি মারি... লাও লান!’ কিন্তু বাবা টু শব্দটিও উচ্চারণ করলেন না। লাও লানের মুখে একটা দাম্ভিক হাসি খেলে যাচ্ছিল। আর আমার বাবা চোখ ঢেকে বসেছিলেন।

লাও লানের পেচ্ছাব করা শেষ হলে, সে প্যান্টের চেইন লাগিয়ে যেখানে গরুগুলো দাঁড়িয়েছিল, সেদিকে গেল। শুনতে পেলাম কসাই আর ব্যাপারীরা লম্বা একটা শ্বাস ফেলল; তবে বুঝতে পারলাম না—কিছু হয়নি বলে ওরা ব্যথিত হয়েছে নাকি কিছু ঘটেনি সেজন্য খুশি হয়েছে। তারপর কসাইরা গরুর পালের মাঝে ঘোরাঘুরি করতে শুরু করল এবং কিছুক্ষণের মধ্যে যার যার পছন্দ মতো গরু বাছাই করল। এরপর ব্যাপারীরা এগিয়ে যেতেই দরকষাকষি শুরু হলো। তবে আমি বুঝতে পারছিলাম, ওদের মন মোটেই এদিকে ছিল না, দরকষাকষি ছাড়া অন্য কিছু একটা ওদের মনে ঢুকে বসেছিল। যদিও ওরা আমার বাবার দিকে তাকাচ্ছিল না, তবে আমি নিশ্চিত ছিলাম, ওরা তার কথাই ভাবছিল। আর তিনি তখন কী করছিলেন? তিনি দুই হাঁটু উঁচু করে তার মধ্যে মুখ সেঁধিয়ে বসেছিলেন। যেহেতু আমি তার মুখ দেখতে পাচ্ছিলাম না, তাই জানারও কোনো উপায় ছিল ন—সেই মুহূর্তে তার চেহারা কী রকম দেখাচ্ছিল। তবে যতটুকু দেখলাম তাতে মনে হলো ওটা দুর্বলতা আর এতে আমি মোটেই খুশি হতে পারলাম না। আমি একটা ছোট ছেলে হতে পারি, তবে এটা বুঝি লাও লান জঘন্যভাবে আমার বাবাকে অপমান করেছে আর এও জানি আমার বাবার মতো উপযুক্ত এবং কুশলী একজন মানুষ প্রতিবাদ বা লড়াই না করে এই অপমান সহজে হজম করবেন না; তবে আমি আমার গালি দিয়ে তা প্রমাণ করব। তবে আমার বাবা কিন্তু নিশ্চুপ হয়ে বসে রইলেন, যেন তিনি মরে গেছেন।

তার মধ্যস্থতা ছাড়াই সেদিনের দরকষাকষি, বেচাকেনা শেষ হলো। তবে সবকিছু শেষ হওয়ার পর সবাই হেঁটে এসে আগের মতোই তার পায়ের কাছে কিছু টাকা ছুঁড়ে ফেলল। প্রথমে এটা শুরু করল লাও লান। ওই দো-আঁশলা বেজন্মা কুত্তাটা আপাত মনে হয় আমার বাবার মুখের উপর পেচ্ছাব করে সন্তুষ্ট হয়নি, কড়কড়ে নতুন দশ ইউয়ানের দুটো নোট বের করে সে বাবার মনোযোগ আকর্ষণ করার জন্য দুই আঙ্গুলের মধ্যে নিয়ে টোকা দিতে লাগল। তবে এতে কাজ হলো না, কারণ তিনি তখন হাঁটুর মাঝে তার মুখ লুকিয়ে রেখেছিলেন, আর এতে লাও লান হতাশ হলো। সে চারপাশে দ্রুত একবার তাকিয়ে নোট দুটো আমার বাবার পায়ের কাছে ছুঁড়ে ফেলল। একটা নোট জমে থাকা প্রস্রাবের মধ্যে যেখানে সিগারেটগুলো ভিজে ফুলে উঠেছিল তার মাঝে এসে শুয়ে পড়ল। সেই মুহূর্তে আমার মনে হচ্ছিল আমার বাবা বরং মরে গেলেই ভালো হতো। তিনি তার নিজের এবং তার পূর্বপুরুষদের ইজ্জত নষ্ট করেছেন। তিনি আর মানুষ নন, মানুষের স্তর থেকে নিচে নেমে তার শত্রুর মূত্রের মধ্যে গড়াগড়ি খাওয়া ফুলে ওঠা সিগারেটের পর্যায়ে নেমে এসেছেন। লাও লান টাকা ছুঁড়ে মারার পর ব্যাপারী আর কসাইরাও তাকে অনুসরণ করল। ওদের মুখে সমবেদনা ফুটে উঠেছিল, যেন আমরা বাপ-বেটা একদল ভিক্ষুক—তাদের দয়ার পাত্র হয়েছি। সাধারণত যে পরিমাণ টাকা ওরা আমার বাবাকে দিত এখন তার দ্বিগুণ টাকা ছুঁড়ে ফেলল। সম্ভবত এটা তার জন্য একটা পুরস্কার স্বরূপ যে, তিনি কোনো প্রতিবাদ করেননি অথবা হয়তো ওরা লাও লানের উদারতার অনুকরণ করেছে।

পায়ের কাছে পড়ে থাকা মরা পাতার মতো ওই নোটগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে একসময় আমি কাঁদতে শুরু করলাম আর অবশেষে তখনই বাবা মুখ তুলে তাকালেন। তার মুখে রাগ কিংবা দুঃখের কোনো চিহ্ন নেই। মুখটা এক টুকরা শুকনো কাঠের মতো চকচক করছিল। ঠাণ্ডা চোখে হতবুদ্ধি হয়ে তিনি আমার দিকে তাকালেন, যেন তার কোনো ধারণা নেই কেন আমি কাঁদছি। আমি এক হাত বাড়িয়ে তার ঘাড় চেপে ধর বললাম, ‘দিয়েহ (প্রথাগত আদরের চীনা ডাক ড্যাডি), তুমি আর আমার বাবা নও। আমি লাও লানকে দিয়েহ বলে ডাকব আর কখনও তোমাকে দিয়েহ বলে বলব না।’ 

হঠাত্ আমার এরকম চিত্কারে আমাদের চারপাশের লোকজন মুহূর্তের জন্য হতবাক হলেও এরপর ওরা সবাই হাসিতে ফেটে পড়ল। লাও লান আমার দিকে বুড়ো আঙুল তুলে সাবাস করল। তারপর সে বলল, ‘জিয়াটং, তুমি সত্যিই একটা চিজ। ঠিক যেরকম ছেলে আমি চাই তুমি ঠিক সেরকম হয়েছে। এখন থেকে যেকোনো সময় তুমি আমার বাড়িতে আসতে পার। যদি শুকরের মাংস খেতে চাও পাবে আর যদি গরুর মাংস চাও তাও পাবে। আর যদি তোমার মাকেও নিয়ে আসতে চাও তবে আমি দুই হাত বাড়িয়ে তোমাদেরকে স্বাগত জানাব।’

এরকম চূড়ান্ত একটা অপমান আর সহ্য করা যায় না, আমি রেগেমেগে তার দিকে ছুটে গেলাম। সে সহজেই একপাশে সরে গিয়ে আমার আক্রমণটা এড়াল। আর আমি মুখ থুবড়ে মাটিতে পড়ে যেতেই আমার ঠোঁট কেটে গিয়ে রক্ত ঝরতে লাগল। 

প্রচণ্ড একটা অট্টহাসি দিয়ে সে বলল, ‘এই পিচ্চি শয়তান, দিয়েহ বলে ডেকে আবার আমাকে আক্রমণ করলি! কোনো সুস্থ মানুষ তোর মতো ছেলে চাইবে বল?’

যেহেতু কেউ আমার দিকে সাহায্যের হাত বাড়াল না, অগত্যা আমি নিজে নিজেই উঠে দাঁড়ালাম। তারপর হেঁটে বাবার কাছে গিয়ে তার পায়ে একটা লাথি মেরে আমার রাগ ঝাড়লাম। তবে এতে তিনি মোটেই রাগ করলেন না; এমনকি মনে হয় টেরও পাননি। শুধু তার বড় বড় নরম হাত দিয়ে মুখ মুছলেন। তারপর দুই হাত দুদিকে লম্বা করে ছড়িয়ে দিয়ে একটা অলস হুলো বেড়ালের মতো হাই তুললেন। তারপর নিচে মাটির দিকে তাকালেন এবং ধীরে ধীরে, সচেতনভাবে, বেশ সাবধানে লাও লানের মুতে ভেজা নোটগুলো কুড়িয়ে নিলেন। তারপর একটা একটা নোট আলোয় তুলে ধরলেন নিশ্চিত হওয়ার জন্য যে, এগুলো জাল নয়। সবশেষে লাও লান যে নতুন নোটগুলো ছুঁড়ে ফেলেছিল সেগুলো তুলে নিজের প্যান্টে মুছলেন। সবগুলো নোট হাঁটুর উপর সুন্দরভাবে সাজিয়ে রাখার পর তিনি বাম হাতের দুই আঙুলের মাঝে নোটগুলো ধরলেন। তারপর ডান হাতের বুড়ো আঙুল আর তর্জনিতে থুতু মিশিয়ে নোটগুলো গুণতে শুরু করলেন। আমি ছুটে গিয়ে নোটগুলো তার হাত থেকে কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করলাম। আমার উদ্দেশ্য ছিল এগুলো ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে লাও লানের মুখের উপর ছুঁড়ে মারি। আমাদের বাবা আর ছেলেকে সে যে ধরনের অপমান করেছে তার প্রতিশোধ নিই। কিন্তু তিনি আমার চেয়েও দ্রুত উঠে দাঁড়িয়ে বাম হাত উঁচু করে ধরে বিড় বিড় করে বললেন, ‘বোকা ছেলে, কী ভেবেছ তুমি, কী করতে চাচ্ছিলে? টাকা মানেই টাকা। টাকার কোনো দোষ নেই, মানুষের উপর দোষ দাও। টাকার উপর তোমার রাগ ঝাড়ার চেষ্টা করো না।’ বাম হাত দিয়ে তার কনুই ধরে আমি তার শরীর বেয়ে উঠে সেই লজ্জাকর টাকাগুলো তার হাত থেকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলাম। তবে একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের সাথে আমি পেরে উঠলাম না। প্রচণ্ড রাগে পাগলের মতো তার পাছায় মাথা দিয়ে ঢুঁ মারতে লাগলাম। কিন্তু তিনি শুধু আমার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলতে লাগলেন, ‘যথেষ্ট হয়েছে, বাপ। আবেগে ভেসে যেও না। ওদিকে দ্যাখো, ওই যে লাও লানের ষাঁড়ের দিকে তাকাও, দ্যাখো ওটা কেমন ক্ষেপে গেছে।’

খাড়া দুটো শিংসহ চর্বিতে ভরা বিশাল আকারের একটি লাক্সি প্রজাতির ষাঁড়, ঢেউ খেলানো মাংসপেশির উপর সাটিনের মতো চামড়া। এধরনের ষাঁড় আমি পরবর্তীতে টেলিভিশনে প্রদর্শিত খেলায় দেখেছি। সারা গা সোনালি-হলুদ রঙের, শুধু আশ্চর্যজনকভাবে মুখটা সাদা। সাদা মুখের ষাঁড় আমি জীবনে কখনও দেখিনি। একে দামড়া করা হয়েছিল। আর যেভাবে এক চোখের কোণ দিয়ে তাকাচ্ছিল, তাতেই গায়ের লোম খাড়া হয়ে যাওয়ার কথা। তবে এখন আমি ভাবি সেকারণেই হয়তো একজন খোজার সম্পর্কে বলার সময় লোকে এই ধরনের চাহনির কথা বলত। নপুংসকরণ করলে একটা মানুষের স্বভাব বদলে যায়; একই অবস্থা একটা ষাঁড়ের বেলায়ও হয়। আঙুল তুলে ষাঁড়টা দেখিয়ে বাবা আমাকে টাকার কথাটা ভুলিয়ে দিলেন, অন্তত সেই মুহূর্তের জন্য। আমিও ঠিক সময়ে দেখলাম উচ্চ কণ্ঠে বড়াই করতে করতে লাও লান ষাঁড়টার রশি ধরে টানতে টানতে উঠান থেকে বের হয়ে যাচ্ছে। যেভাবে সে আমার অপ্রতিরোধী বাবাকে অপমান করেছে, তারপর সে বড়াই করবে না তো কী করবে? গ্রামবাসী আর গরু ব্যাপারীদের কাছে নাটকীয়ভাবে এখন তার সম্মান বেড়ে গেছে। একমাত্র যে মানুষটি তাকে অবান্তর হিসেবে বাদ দিয়ে তাকে অগ্রাহ্য করেছিল, তার বিরুদ্ধে উঠে দাঁড়িয়ে সে জিতে গেছে; গ্রামের কেউ আর কখনও তার সামনে স্পর্ধা দেখাতে পারবে না। তবে এরপর যে চমকপ্রদ ঘটনাটা ঘটল, এত বছর পরও সেটা এখনও আমার বিশ্বাস হয় না।

তার লাক্সি প্রজাতির ষাঁড়টা চলার পথেই থেমে পড়ল। লাও লান গলার রশিটায় হেঁচকা টান মেরে তাকে নড়াবার চেষ্টা করছিল। তবে এটা কোনো সাড়া দিচ্ছিল না। কোনো চেষ্টা না করেই ষাঁড়টা লাও লানের শক্তির প্রদর্শনীর প্রতি বুড়ো আঙুল দেখাল। একজন পেশাগত কসাই হিসেবে তার গায়ে যে ধরনের গন্ধ বেরোত, তাতে একটা শান্ত বাছুর তার সামনে একটা গাছের পাতার মতো থরথর করে কাঁপার কথা, এমনকি যখন সে ছুরি হাতে সামনে এসে দাঁড়ায়, তখন অত্যন্ত একগুঁয়ে একটা পশুও নম্র ও ভদ্রভাবে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। আরেকবার হেঁচকা টান মেরে ষাঁড়টাকে নড়াতে না পেরে সে ঘুরে ষাঁড়টির পেছন দিকে গিয়ে কান ফাটা একটা চিত্কার করে হাত খুলে সশব্দে এর পাছায় একটা থাপ্পর মারল। এই ধরনের থাপ্পর আর চিত্কারের চোটে অধিকাংশ পশু লাদি আটকে রাখতে পারত না। তবে এই লাক্সি ষাঁড়টার কিছুই হলো না। আমার বাবার উপর যে বিজয় সে অর্জন করেছিল, তার গৌরবে তখনও লাও লান মত্ত ছিল আর আত্মগর্বে গর্বিত সৈনিকের মতো ভাব দেখিয়ে সে ষাঁড়টার পেটের নিচে একটা লাথি মারল। লাথিটা মারার সময় সে একবারও ষাঁড়টার দুর্দান্ত স্বভাবের কথাটা ভাবল না। ব্যস আর যায় কোথায়, এবার ষাঁড়টা পাছা ঘুরাল, তারপর প্রচণ্ড একটা গর্জনের সাথে মাথা নিচু করে শিং দিয়ে গুঁতিয়ে লাও লানকে এমনভাবে শূন্যে ছুঁড়ে মারল, যেন তার ওজন একটা খড়ের মাদুরের চেয়ে বেশি নয়। এটা দেখার সাথে সাথে গরুর ব্যাপারী আর কসাইরা স্তম্ভিত আর হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইল, তবে কেউই লাও লানের সাহায্যে এগিয়ে এলো না। ষাঁড়টা আবার মাথা নিচু করে তার দিকে তেড়ে গেল। তবে লাও লান যেমন তেমন কোনো মানুষ নয়, ষাঁড়টাকে আবার তেড়ে আসতে দেখে এক গড়ান দিয়ে সে তার সামনে থেকে সরে গেল। রাগে রক্তচক্ষু নিয়ে ষাঁড়টা আবার ঘুরে তেড়ে এলো আর লাও লান আবার গড়িয়ে এটার সামনে থেকে সরে দ্বিতীয় আর তৃতীয়বার তার চামড়া বাঁচাল।

অবশেষে হুড়াহুড়ি করে কোনোমতে যখন সে খাড়া হলো, তখন আমরা দেখলাম যে, সে সামান্য আহত হয়েছে। তারপর ওখানেই একদিকে পাছা বাঁকা করে দাঁড়িয়ে ষাঁড়টার মুখোমুখি হলো, এক সেকেন্ডের জন্যও পশুটার উপর থেকে চোখ সরালো না। ষাঁড়টা আবার মাথা নিচু করল, এর মুখের কিনারায় লালা জমে রয়েছে, তারপর নাক দিয়ে সজোরে ফোঁস ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলতে ফেলতে পরবর্তী আক্রমণের জন্য প্রস্তুত হলো। লাও লান হাত তুলে ষাঁড়টার মনোযোগ অন্য দিকে ফেরাবার চেষ্টা করল। তবে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছিল, নিজের বীরত্ব দেখাবার জন্য সে শুধু ভান করছিল। এখন তাকে দেখে একজন আতঙ্কিত বুল ফাইটার মনে হচ্ছিল, যে তার ইজ্জত বাঁচাবার জন্য যেকোনো কিছু করতে পারে। সে সতর্কভাবে সামনে এক পা এগোল; ষাঁড়টা নড়ল না। বরং মাথাটা আরও নিচু করল, এর অর্থ পরবর্তী আক্রমণ আসন্ন। পরিশেষে লাও লান রণে ভঙ্গ দিয়ে তার পৌরুষ দেখাবার দেহভঙ্গি ত্যাগ করল, তারপর শেষ একবার তর্জন-গর্জন করে পেছন ফিরে পাগলের মতো ছুটতে শুরু করল। এদিকে ষাঁড়টাও একটা লোহার রডের মতো লেজটা সোজা খাড়া করে তাকে ধাওয়া করল আর মেশিন গানের গুলির মতো খুরের আঘাতে চর্তুদিকে কাদা ছিটিয়ে চলল; এরমধ্যে প্রাণ বাঁচাবার জন্য বদ্ধপরিকর হয়ে লাও লানও দর্শকদের দিকে এই আশায় ছুটল যে, হয়তো ভিড়ের মধ্যে উদ্ধারের পথ খুঁজে পাবে। তবে তাকে রক্ষা করার কোনো চিন্তাই ওদের মনে ছিল না। চিত্কার করতে করতে ওরাও ঊর্ধ্বশ্বাসে প্রাণ নিয়ে ছুটতে লাগল, আর ছুটতে ছুটতে বাবা-মাকে অভিসম্পাত দিতে লাগল কেন ওদেরকে দুটোর বেশি পা দেয়নি। সৌভাগ্যবশত সবার কাছ থেকে লাও লানকে আলাদা করে দেখার মতো ষাঁড়টার যথেষ্ট বুদ্ধি ছিল আর অন্য কারো উপর রাগ ঝাড়ার কোনো ইচ্ছাই তার ছিল না। ব্যাপারী আর কসাইরাও হুড়াহুড়ি করে দেয়াল আর গাছের উপর চড়তে শুরু করল। ওদের পায়ের ছিটায় চারপাশে বালু উড়তে লাগল। বিপাকে পড়ে লাও লান এবার দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে আর স্বচ্ছভাবে চিন্তা করবার শক্তি হারিয়ে সোজা বাবা আর আমার দিকে ছুটে আসতে লাগল।

জঘন্য শয়তান সেই লাও লান আমার বাবার পেছনে লুকিয়ে আশ্রয় নেবার মাত্র কয়েক সেকেন্ড আগে পরিস্থিতির ভয়াবহতা উপলব্ধি করে বাবা এক হাতে আমার ঘাড় আর অন্য হাত দিয়ে প্যান্টের পেছনদিকটা জাপটে ধরে আমাকে একটানে ছুঁড়ে দেয়ালের উপর উঠিয়ে দিলেন। আর এদিকে লাও লান বাবার পেছনে লুকিয়ে তার জামা আঁকড়ে ধরল, যাতে তিনি ছুটে যেতে না পারেন এবং তেড়ে আসা ষাঁড়টার কাছ থেকে তাকে আড়াল করে রাখেন। বাবা পিছু হটতে লাগলেন; আর সেই সাথে লাও লানও, তারপর ওরা উভয়েই পিছু হটতে হটতে দেয়ালের গায়ে এসে ঠেকলেন। বাবা টাকাগুলো হাতে নিয়ে ষাঁড়টার দিকে তুলে নাড়তে নাড়তে বিড়বিড় করতে লাগলেন, ‘এই যে ষাঁড়... ষাঁড় বাবা, তোমার সাথে আমার কোনো খারাপ সম্পর্ক নেই, এখন যেমন নেই, আগেও তেমন ছিল না, কাজেই চল আমরা দুজনে মিলে ব্যাপারটা একটা সমাধান বের করি...’

তারপরের ঘটনাটা এত দ্রুত ঘটল যে তা ভাষায় বর্ণনা করা যায় না :টাকাগুলো ষাঁড়টার মুখের উপর ছুঁড়ে দিয়ে কী ঘটছে পশুটা তা বোঝার আগেই তিনি এক লাফে এর পিঠে চড়ে বসলেন। তারপর তিনি দুই আঙুল ষাঁড়টার নাকে ঢুকিয়ে দিয়ে, এর নাকের আংটাটা আঁকড়ে ধরে এক হেঁচকা টান মেরে মাথাটা উপরের দিকে উঁচু করলেন। গরুর ব্যাপারীরা পশ্চিমের জেলাগুলো থেকে যে গরুগুলো আনত সেগুলো ছিল খামারের গরু, কাজেই এগুলোর নাকে আংটা পরানো থাকত। এখন ব্যাপার হলো, একটা ষাঁড়ের দুর্বল জায়গা হলো নাক, আর আমার বাবা ষাঁড় সম্পর্কে যা জানেন, এমনকি সর্বশ্রেষ্ঠ খামারিও তার চেয়ে বেশি জানত না। যদিও তিনি নিজে কোনো খামারি ছিলেন না। দেয়ালে বসা অবস্থায় আমার চোখে পানি চলে এলো। হ্যাঁ বাবা, আমি তোমার জন্য গর্ববোধ করছি। যেভাবে তুমি তোমার বিচক্ষণতা আর সাহসের সাথে এ কাজটা করেছ, তা আমাদের সমস্ত অপমান ধুয়ে মুছে আমাদের হারানো গৌরব ফিরিয়ে এনেছে।

তারপর কসাই আর ব্যাপারীরা সবাই হাত লাগিয়ে সেই সাদা মুখের হলুদ ষাঁড়টাকে মাটিতে শোয়াতে বাবাকে সাহায্য করল; যাতে এটা আবার উঠে দাঁড়িয়ে আর কারো ক্ষতি করতে না পারে। এদিকে একজন কসাই এক ছুটে বাড়ি গিয়ে একটা ছুরি এনে লাও লানের দিকে বাড়িয়ে দিল। ভয়ে তখন তার মুখ সাদা হয়ে রয়েছে। লোকটার ছুরি ধরা হাতটা সরিয়ে দিয়ে সে এক পা পিছু হটল এবং কাজটা অন্য কাউকে করার জন্য বলল। কসাইটা ছুরি হাতে নিয়ে এদিক ওদিক তাকিয়ে বলল, ‘কে করবে কাজটা? কেউ না? তাহলে মনে হয় এটা আমাকেই করতে হবে।’ সে হাতা গুটিয়ে, ছুরিটা জুতার তলিতে মুছে নিল, তারপর উবু হয়ে বসে এক চোখ বন্ধ করল। ষাঁড়টার বুকের যে জায়গায় সামান্য একটা খাঁজ আছে, তা লক্ষ্য করে ছুরিটা ঢুকিয়ে দিল, আর যখন ছুরিটা বের করে আনল, তখন ফিনকি দিয়ে রক্ত ছিটকে পড়ে আমার বাবার মুখ লাল করে দিল।

ষাঁড়টা মারা যাওয়ার পর সবাই এর উপর থেকে নেমে পড়ল; একটা ফোয়ারা থেকে যেমন টগবগ পানি পড়ে, তেমনি ক্ষতস্থানটা থেকে কালচে-লাল রক্ত বগ বগ করে বয়ে চলেছে। আর সেই সাথে একটা উষ্ণ গন্ধ সকালের টাটকা বাতাসে ছড়িয়ে পড়ল। চুপসে যাওয়া বেলুনের মতো লোকগুলো কুঁকড়ে গিয়ে মনে হলো আকারে খানিকটা ছোট হয়ে চারপাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ওদের অনেক কিছুই বলার ছিল, কিন্তু কেউ একটি শব্দও উচ্চারণ করল না। একমাত্র আমার বাবা ছাড়া, তিনি ঘাড়ের নিচে মাথা গুঁজে দিয়ে, মুখ খুলে এক সারি হলুদ কিন্তু শক্ত দাঁত বের করে বললেন, ‘হে আকাশের ঈশ্বর, আমি ভীষণ ভয় পেয়েছিলাম!’

এটা শুনে সবাই লাও লানের দিকে তাকাল। সে তখন পরিষ্কার ভাবছিল যে, কোনোভাবে যদি হামাগুড়ি দিয়ে একটা গর্তে ঢুকে যাওয়া যেত। নিজের লজ্জা ঢাকার জন্য সে তখন মাটিতে পড়ে থাকা মৃত ষাঁড়টার দিকে তাকাল। পশুটার ঠ্যাংগুলো সোজা করে টেনে রাখা হয়েছিল আর রানের মাংসল অংশগুলো তখনও কাঁপছিল। একটা নীল চোখ খোলা ছিল, যেন এটা ভেতরের ঘৃণাটা উগড়ে দিতে চোখটা খুলে রেখেছে। মৃত পশুটার গায়ে একটা লাথি মেরে লাও লান বলল, ‘জাহান্নামে যা শালা! সারা জীবন বুনো রাজহাঁস শিকার করে বেরিয়েছিস আর এখন একটা হাঁসের বাচ্চাই ঠোঁট দিয়ে তোর চোখ ঠোকরাবে।’ তারপর সে মুখ তুলে আমার বাবার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এর জন্য আমার কাছে তোমার একটা পাওনা রইল, লাও টং। তবে তোমার আর আমার মধ্যে সবকিছু এখনও কিন্তু শেষ হয়নি।’

বাবা জিজ্ঞেস করলেন, ‘কোনো ব্যাপারটা শেষ হয়নি? আমার আর তোমার মাঝে তো আর কিছুই নেই।’

সে হিশ হিশ করে উঠল, ‘তুমি আর তাকে ছোঁয়ার চেষ্টা করো না!’

একটু গর্বের হাসি হেসে বাবা বললেন, ‘আমি কখনও তাকে ছুঁতে চাইনি—সেই আমাকে ছুঁতে বলেছিল। সে তোমাকে একটা কুত্তা বলেছে আর কখনও তোমাকে ছুঁতে দেবে না।’ 

তখন অবশ্য আমি বুঝতে পারিনি ওরা কী নিয়ে কথা বলছিল, তবে পরে অবশ্য অনেক ভেবে বুঝতে পেরেছিলাম ওরা বুনো খচ্চরী নামে মহিলাটিকে নিয়ে কথা বলছিল।

কিন্তু যখন আমি বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘দিয়েহ, তুমি কী নিয়ে কথা বলছ?’ তখন তিনি বললেন, ‘একথা ছোটদের জানার দরকার নেই।’

এবার লাও লান বলল, ‘বাছা, তুমি না বলেছিলে তুমি লান পরিবারের একজন সদস্য হতে চাও? তাহলে এখন কেন আবার তাকে দিয়েহ বলে ডাকলে?’  

আমি বললাম, ‘তুমি তো স্তূপ করে রাখা দুর্গন্ধ ছড়ানো কুত্তার বিষ্ঠা ছাড়া আর কিছু্ই নও।’

তখন সে বলল, ‘দ্যাখো বাছা, বাড়ি যাও আর মাকে বলো যে, তোমার বাবা অসভ্য খচ্চরীর গুহায় ঢুকে আর বের হওয়ার পথ খুঁজে পাচ্ছে না।’

এটা শুনে আমার বাবাও ষাঁড়টার মতোই ক্ষেপে উঠলেন; মাথা নিচু করে তিনি লাও লানের দিকে তেড়ে গেলেন। ওরা পরস্পরের গলা চেপে ধরার এক মুর্হূত পর অন্য সবাই ছুটে এসে দুজনকে আলাদা করে দিল। তবে সেই সামান্য সময়ের মধ্যেই লাও লান আমার বাবার কড়ে আঙুল ভেঙে দিতে পেরেছিল আর আমার বাবা লাও লানের এক কানের অর্ধেকটা কামড়ে ছিঁড়ে নিয়েছিলেন। রাগে থু থু করে ছেঁড়া কানের অংশটা ফেলে দিয়ে তিনি বললেন, ‘কুত্তার বাচ্চা, কোন সাহসে তুই আমার ছেলের সামনে একথা বলতে পারলি!’

 

[হাওয়ার্ড গোল্ডব্লাট কর্তৃক চীনা ভাষা থেকে অনূদিত ইংরেজির অনুবাদ]

(মো ইয়ানের আসল নাম গুয়ান মোয়ে। তিনি একজন চীনা ঔপন্যাসিক এবং ছোট গল্প লেখক। একজন লেখক হিসেবে ‘মায়ার বাস্তববাদের সাথে লোক-কাহিনি, ইতিহাস এবং সমসাময়িক বিষয় মিশিয়ে যে সাহিত্য তিনি সৃষ্টি করেছেন’, তার জন্য ২০১২ সালে তাঁকে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করা হয়েছে।

টাইম ম্যাগাজিনের ডোনাল্ড মরিসন তাঁর সম্পর্কে বলেছেন যে, ‘তিনি হলেন অন্যতম বিখ্যাত এবং প্রায়ই নিষিদ্ধ হন, এমন একজন চীনা লেখক। চীনের লেখকদের মধ্যে কেবল তার রচনা প্রায়ই চুরি করা হয়ে থাকে।’ মার্কিন কংগ্রেস সদস্য ও শিক্ষাবিদ জিমি লিচ বলেছেন, তিনি হলেন চীনের ফ্রাঞ্জ কাফকা কিংবা জোসেফ হেলার। 

চীনের পূর্বাঞ্চলের শ্যানডং প্রদেশের গুয়াম জেলার একটি কৃষক পরিবারে ১৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৫ সালে তাঁর জন্ম। চীনের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় মাউ সে তুংয়ের আমলে তাঁর সাহিত্যকর্মের অধিকাংশই একজন সমাজতান্ত্রিক বাস্তববাদীর দৃষ্টিভঙ্গিতে রচিত হয়েছিল, যার বিষয়বস্তু মূলত শ্রেণিসংগ্রামের উপর কেন্দ্রীভূত ছিল।

সাংস্কৃতিক বিপ্লবের পর ১৯৭৬ সালে তিনি পিপলস লিবারেশন আর্মিতে একজন সৈনিক হিসেবে যোগ দেন এবং সৈনিক থাকাকালীন লেখা চালিয়ে যেতে থাকেন। ১৯৮৪ সালে তিনি পিপলস লিবারেশন আর্মি আর্টস কলেজে ভর্তি হন এবং একই বছর পিএলএ ম্যাগাজিনের তরফ থেকে সাহিত্যে পুরস্কার লাভ করেন। তখন থেকেই তিনি প্রথম মো ইয়ান ছদ্মনামে লেখা শুরু করেন। চীনা ভাষায় মো ইয়ান নামের অর্থ ‘কথা বলো না’। এই নামে তিনি ‘অ্যা ট্রান্সপ্যারেন্ট র্যাডিশ’ নামে নভেলাটি প্রকাশ করেন। এরপর ১৯৮৭ সালে রেড সরগাম ক্ল্যান উপন্যাসটি রচনা করে পশ্চিমা জগতের পাঠকের কাছে পরিচিত হন।

১৯৯১ সালে তিনি বেইজিং নরমাল ইউনির্ভাসিটি থেকে সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।) d

 

 

 

 

 

 

এই পাতার আরো খবর -
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
২১ জুন, ২০১৮ ইং
ফজর৩:৪৩
যোহর১২:০০
আসর৪:৪০
মাগরিব৬:৫১
এশা৮:১৬
সূর্যোদয় - ৫:১১সূর্যাস্ত - ০৬:৪৬
পড়ুন