আত্মস্মৃতি
একজন আত্মভোলা কবি
নির্মলেন্দু গুণ২১ জুন, ২০১৭ ইং
একজন আত্মভোলা কবি
১৯৬৫-’৬৬ সালের কথা। আজাদ তখন খুবই জনপ্রিয় দৈনিক পত্রিকা। বলা যায় জনপ্রিয়তার শীর্ষে। পাঠকের হাতে-হাতে আর হকারদের মুখে-মুখে; ট্রেনে-বাসে-লঞ্চে তখন আজাদ। আবুল কালাম শামসুদ্দিন-শামসুর রাহমান-হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত পাক স্বৈরশাসক ফিল্ড মার্শাল মুহম্মদ আইয়ুব খানের সৃষ্ট প্রেস ট্রাস্টের পত্রিকা  দৈনিক পাকিস্তান, জহুর হোসেন চৌধুরী-শহীদুল্লাহ কায়সার-রণেশদাশ গুপ্ত সম্পাদিত বামপন্থি পত্রিকা সংবাদ, তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া সম্পাদিত ইত্তেফাক আর পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর মোনায়েম খান সাহেবের একান্ত নিজস্ব পত্রিকা দৈনিক পয়গাম—সবার সার্কুলেশনই তখন আজাদের নিচে। সবার উপরে আজাদ সত্য তাহার উপরে নাই।

আজাদের সাহিত্য বিভাগের সম্পাদক, মুকুলের মাহফিলের প্রতিষ্ঠাতা কবি হাবীবুর রহমান। চিফ রিপোর্টার ফয়েজ আহমদ। সহকারী সম্পাদক আবদুল গাফফার চৌধুরী, আজিজ মিসির, আনম গোলাম মোস্তফা, কাদের মাহমুদ প্রমুখ। 

মওলানা আকরম খাঁ সাহেব তখনও বেঁচে আছেন। তিনি পত্রিকার সম্পাদক। আজাদ-অফিস সংলগ্ন নিজ-বাসায় তিনি থাকেন। সম্পাদক হলেও তিনি আফিসে আসেন না, বারান্দায় বসে ফরসি হুঁকায় খাম্বিরামাখানো সুগন্ধি তামাক সেবন করেন। কর্মরত সাংবাদিকরা প্রয়োজনবোধে তাঁর কাছে ছুটে যান। তিনি তামাকের কুণ্ডলী পাকানো ধোঁয়ার আড়াল থেকে সাংবাদিকদের প্রয়োজনীয় বুদ্ধি-পরামর্শ দেন। আমি তাঁকে এভাবেই দেখেছি। আমি তাঁকে কোনো অনুষ্ঠানে, বা দাঁড়ানো অবস্থায় কখনও দেখিনি। আমার চোখে ওই দৃশ্যটাই আজও গেঁথে রয়েছে।

লালবাগের বালুর মাঠের উল্টোদিকে, রাস্তার ওপারে আজাদ পত্রিকার অফিস। পাশের রাস্তায় আজাদ বাস স্টপ। আজিমপুর-গুলিস্তান-সদরঘাট-মিরপুর রুটের বাসগুলি আজাদ অফিস হয়ে যাতায়াত করে। এই বাস রুটটি তখন ঢাকার একটি খুব চালু রুট।

খুব সম্ভবত আমার অকালপ্রয়াত বন্ধু শিশু-সাহিত্যিক মলয় ভৌমিকই আমাকে আজাদ অফিসে নিয়ে গিয়েছিলেন সাহিত্য সম্পাদক কবি ও শিশু-সাহিত্যিক হাবীবুর রহমানের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে, যাতে তিনি আমার লেখা কবিতা আজাদের সাহিত্য মজলিসে ছাপেন। মলয় ভৌমিক তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে পড়েন। তাঁর পিতা জয় গোবিন্দ ভৌমিক ছিলেন নেত্রকোনার মুন্সেফ। সেই সুবাদেই জন্মসূত্রে বগুড়ার মলয় পিতার কর্মসূত্রে নেত্রকোনার মলয়ে পরিণত হয়।

লাহোর জাম্বুরিতে অংশগ্রহণ করে পশ্চিম পাকিস্তান ঘুরে এসে ইত্তেফাক পত্রিকায় ‘নতুন চোখে দেখা’ শিরোনামে ধারাবাহিক ভ্রমণকাহিনি লিখে মলয় প্রেসিডেন্ট পুরস্কার লাভ করে রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে গিয়েছিল। পাকিস্তানের লৌহমানব প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের হাত থেকে সে পরস্কার গ্রহণ করে। ওই সচিত্র সংবাদ প্রতিটি দৈনিক পত্রিকার প্রথম পাতায় ঘটা করে ছাপা হয়। মলয় ছিল কবি ও শিশুসাহিত্যিক হাবীবুর রহমানের বিশেষ প্রিয়পাত্র। সেকারণেই মলয়কে আমি আমার জ্যাক হিসেবে ব্যবহার করি। মলয়ের বন্ধু তাজুল ইসলামও (প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রাক্তন প্রেস সচিব) আমার আজাদ অভিযানে সহযাত্রী ছিল কি-না, ঠিক মনে করতে পারছি না—, তবে নাজিমুদ্দিন রোডের একটি লাল ইটের বাড়িতে (ফেনী হাউস) কবি হাবীবুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত একটি সাহিত্যসভায় তাজুল ইসলামই যে আমার সঙ্গী ও পথপ্রদর্শক ছিল—সে কথা আমার বেশ মনে আছে।

কবি হাবীবুর রহমানের মন জয় করতে গিয়ে, ওই আজাদ অফিসেই আমি সন্তোষ গুপ্তকে প্রথম দেখি। রাশভারী প্রকৃতির জীর্ণ-শীর্ণকায় ওই মানুষটির সঙ্গে আমার সেদিন কোনো কথা হয়নি। আমরা সেদিন শুধুই কবি হাবীবুর রহমানের মন জয়ে ব্যস্ত ছিলাম। কেননা তিনিই তখন আজাদের সাহিত্য সম্পাদক। তিনি চাইলে আমার কবিতা আজাদের পাতায় ছাপা হবে, তিনি না চাইলে হবে না। আজাদ হাউস থেকে প্রকাশিত মাসিক মোহাম্মদীও তখন বেশ জনপ্রিয় সাহিত্য পত্রিকা।

আমাদের আজাদ অভিযানের উদ্দেশ্য সফল হয়েছিল। কিছুদিনের মধ্যেই কবি হাবীবুর রহমানের বিশেষ পক্ষপাতিত্বের কারণে আমার কবিতা আজাদের সাহিত্য মজলিসে ছাপা হতে শুরু করেছিল।

কবি হাবীবুর রহমান সম্পর্কে একটা খুব মজার ঘটনা আমার খুব মনে পড়ে। ঘটনাটি এরকম। আমি তাঁর টেবিলের সামনে ভেজা বিড়ালের মতো বসে আছি। তিনি কী একটা গুরুত্বপূর্ণ লেখা লিখছেন। কবিতা বা গানও হতে পারে। কী লিখছেন? একথা প্রশ্ন করে জানার সাহস তখন আমার থাকবার কথা নয়। কোনো তরুণ লেখকের তা থাকা উচিতও নয়। কবি হাবীবুর রহমান একজন খুব ভালো গীতিকারও ছিলেন। ফলে মনে করি তিনি গান রচনাতেই ব্যস্ত ছিলেন হয়তো।

তিনি একপর্যায়ে তাঁর টেবিলে রাখা ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়া এক কাপ চা পান করলেন লেখার এক ফাঁকে। তিনি আত্মমগ্ন হয়ে লিখছেন, পছন্দ হচ্ছে না বলে লেখা কাগজ ছিঁড়ে দুমড়ে-মুচড়ে ফেলে দিচ্ছেন ঝুড়িতে। আর আমাকে মাঝে মাঝে অভয় দিয়ে বলছেন, ‘বসো, লেখাটা শেষ করে নিই। পরে কথা বলবো।’

আমি তাঁকে মুগ্ধচিত্তে দেখছি। ভাবছি হয়তো তিনি আমার ধৈর্যের পরীক্ষা নিচ্ছেন। লেখককে রচনাকর্মে কীভাবে নিমগ্ন হতে হয়, আমি এটাও লক্ষ করছিলাম। ঠিক এরকম একটি মুহূর্তেই তিনি হঠাত্ ব্যাঘ্রহুংকার ছেড়ে তাঁর বেয়ারাকে ডাকলেন।

‘তোকে কখন থেকে বলছি, আমাকে চা দিতে। শুনতে পাস না?’

কবির ধমকে ছেলেটি খুব ভয় পেয়ে গিয়ে বলল, ‘স্যার, আপনাকে তো চা দিয়েছি। আপনি তো একটু আগেই চা খেয়েছেন।’

তিনি চেয়ারে হেলান দিয়ে ছেলেটির দিকে সন্দেহের চোখে তাকালেন, তারপর দৃষ্টি ফেরালেন আমার দিকে। ছেলেটির কথা বিশ্বাস করলেন না। আমার কাছে জানতে চাইলেন, তাঁকে চা খেতে আমি দেখেছি কি-না। নাকি ছেলেটি মিথ্যা বলছে।

আমি বললাম, ‘জি স্যার, আপনি একটু আগেই চা খেয়েছেন।’

তিনি আমার কথা বিশ্বাস করলেন। বললেন, ‘মনে থাকে না। মনে থাকে না। লেখার মধ্যে একবার ঢুকে গেলে আর কিচ্ছু মনে থাকে না।’

আমি কণ্ঠস্বরে যতটা সম্ভব বিনয়ভাব ফুটিয়ে বললাম, ‘জি স্যার।’

তখন ছেলেটি বলল, ‘স্যার, আপনেরে আরেক কাপ চা দিমু?’

তিনি মাথা নাড়লেন। ছেলেটিকে ধমক দিয়ে বললেন, ‘যা এখান থেকে। তোকে বলেছি না, আমি যখন লিখবো, তখন আমার সামনে আসবি না?’

ছেলেটি আস্তে করে রুম থেকে কেটে পড়ল।

সেদিনই আমি স্থির করলাম, বড় হয়ে আমিও তাঁর মতোই হব। আমিও তাঁর মতো আত্মভোলা হব। কবি হতে হলে নিশ্চয়ই এরকম আত্মভোলা হতে হয়।

ভেবেছিলাম বটে বড় হয়ে করব—কিন্তু বড় হওয়ার জন্য খুব বেশিদিন অপেক্ষা করা আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি। কিছুদিনের মধ্যেই আমি আত্মভোলা কবির চরিত্রে অভিনয় করতে গিয়ে নিজের বিপদ ডেকে আনি। আমার আত্মভোলা কবি-চরিত্রে অভিনয়ের ডোজটা একটু বেশি হয়ে গিয়েছিল।

ঘটনাটি আমি ঘটাই এভাবে—

একদিন আমি গভীর রাতে আমার মাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলি, আমাকে রাতের খাবার দেবার জন্য। অথচ কিছুক্ষণ আগেই আমাদের সব ভাই-বোনকে খাইয়ে মা ঘুমিয়েছেন।

কাঁচা ঘুম ভাঙার ফলে অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে মা বললেন, ‘তোর পেটে কি রাক্ষস ঢুকছে? একটু আগেই না ভাত খাইলি?’

কৃত্রিম রাগ দেখিয়ে আমি বললাম, ‘যা তা বলো না তো, মা। ভাত দাও...।’

এবার আমার মা সত্যি-সত্যি ভয় পেয়ে গেলেন।

কপাল চাপড়ে বললেন, ‘তুই কি পাগল হইয়া গেলি নাকি?’

আমি তখন কবি হাবীবুর রহমানের চরিত্রে অভিনয় করছি। ডোজটা বেশি হয়ে যাচ্ছে বুঝতে পেরেও আমি আমার না-খাওয়ার সিদ্ধান্তে তখন অটল। 

আর আমার এই অটলভাব দৃষ্টে মা ভয় পেয়ে আমার বাবাকে ঘুম থেকে ডেকে তুললেন। আমার আচরণে বাবাও চিন্তিত হয়ে পড়লেন। তারপর কী ভেবে বললেন, ‘ঠিক আছে, ওকে খেতে দাও। ঘরে কি ঠাণ্ডা ডাল-ভাত নেই?’

মা বললেন, ‘হ্যাঁ, তা আছে।’

আছে শুনে আমি ভড়কে গেলাম। বুঝলাম, এই শীতের রাতে, আমাকে এখন ঠাণ্ডা ডাল দিয়ে ঠাণ্ডা ভাত খেতে হবে।

মধ্য রাতে চেঁচামেচির শব্দে আমার ভাই-বোনরাও উঠে গেল।

আমার খুব নেওটা একটা ছোট বোন ছিল। নাম সোনালি। ওর কাছে আমি অনেক সময় আমার অনেক গোপন পরিকল্পনার কথা বলতাম।

ঘুম থেকে জেগেই চোখ কচলাতে কচলাতে ছোট বোন সোনালি বলল, ‘আমি জানি মেজদা এইরকম করতাছে কেন? মেজদা এইডা ঢাকার একজন কবির কাছ থিক্যা শিখ্যা আইছে। আমারে কইছে, কবি হইতে হইলে, খাইয়াও ভুইল্যা যাইতে হয়।’

আমি আমার ওই বিশ্বাসঘাতিনী সহোদরার দিকে খুব লাল-চোখে তাকাই।

তাতে শেষ রক্ষা হয় না। আমার চোখে চোখ রেখে, নাক কুঁচকে সোনালি আমাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে, ‘ইস, আমারে কও নাই, কও নাই তুমি একদিন এইরকম করবা? কবি হইতে হইলে এইরকম করতে হয়। কও নাই?’

আমি তখন রণে ভঙ্গ দিতে বাধ্য হই এবং মায়ের হাতে প্রহূত হওয়ার আগেই আমার পড়ার ঘরে ফিরে গিয়ে ভিতর থেকে দরোজা বন্ধ করে দিই।

আমার ঘুম আসে না। আজাদ পত্রিকার একটি নির্জন কক্ষে রচনানিমগ্ন কবি হাবীবুর রহমান ও তাঁর লেখার টেবিলের ওপরে রাখা চায়ের পেয়ালাটি আমার চোখে ভাসতে থাকে। d

 

 

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
২১ জুন, ২০১৮ ইং
ফজর৩:৪৩
যোহর১২:০০
আসর৪:৪০
মাগরিব৬:৫১
এশা৮:১৬
সূর্যোদয় - ৫:১১সূর্যাস্ত - ০৬:৪৬
পড়ুন