বিশেষ রচনা
আধুনিক বাংলা গানের উত্তর প্রজন্ম
আসলাম আহসান২১ জুন, ২০১৭ ইং
আধুনিক বাংলা গানের উত্তর প্রজন্ম
আধুনিক বাংলা গানের উত্তর প্রজন্মের কথা বলতে গেলে অনিবার্যভাবে আসবে ব্যান্ড সংগীতের কথা। কিন্তু ব্যান্ড সংগীত আমাদের আলোচনার মুখ্য বিষয় নয়। বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতের ইতিহাস নিয়ে লেখা লতিফুল ইসলাম শিবলীর একটি বই আছে। আগ্রহী পাঠক বইটি পড়তে পারেন। মূলত আশি ও নব্বই দশকের বেসিক আধুনিক গানকে কেন্দ্র করে বর্তমান আলোচনা আবর্তিত হবে। যোগ্য পূর্বসূরিদের পথ ধরে উত্তর প্রজন্ম কতটা এগিয়েছে, কোন পথে এগিয়েছে কিংবা আদৌ এগিয়েছে কি-না, তার বিচার করতে গেলে নিবিড় পাঠ দরকার।

নিবিড় পাঠেও সমস্যা আছে। সমস্যাটি মনস্তাত্ত্বিক। অতীতকে মূল্যায়ন করা, বিশ্লেষণ করা তুলনামূলকভাবে সহজ। কিন্তু ঘটমান বর্তমান সম্পর্কে আমরা দ্বিধাগ্রস্ত। খানিকটা দূরে সরে না গিয়ে যেমন খুব কাছের জিনিসও স্পষ্ট করে দেখা যায় না, এও ঠিক তেমনি। বর্তমানকে কখনও আমরা করি অতি মূল্যায়ন, কখনও করে বসি অবমূল্যায়ন; সবই আবেগের বশে। এই বাস্তবতা মাথায় রেখেই যতটা সম্ভব নির্মোহভাবে নিকট অতীত ও সমকালীন বাংলা গানের একটি অবয়ব আঁকার চেষ্টা করা হলো এই নিবন্ধে। 

 

শত গানের গান মেলা

শুরু করা যাক সদ্য পড়া একটি বইয়ের কথা দিয়ে। বইয়ের নাম ‘শত গানের গান মেলা’। প্রকাশকাল জানুয়ারি ২০১৭। বইটির লেখক সুধীর চক্রবর্তী সুদীর্ঘকাল ধরে সংগীতের নানা দিক নিয়ে লিখছেন। উক্ত বইয়ে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে ৮৭টি বাংলা, ১০টি হিন্দি এবং ৩টি ইংরেজি গান। এটি সংকলন গ্রন্থ নয়, এতে আছে বিভিন্ন সময়ে বাংলা হিন্দি ও ইংরেজি ভাষায় রচিত ১০০টি গান সম্পর্কে লেখকের নিজস্ব বিশ্লেষণ, মূল্যায়ন। অন্তর্ভুক্ত ৮৭টি বাংলা গানের মধ্যে ঘটনাচক্রে ৬টি গান বাংলাদেশের। এই অন্তর্ভুক্তি কতটা আন্তরিক, কতটা তাচ্ছিল্যসূচক আর কতটা ভারসাম্যমূলক সে চিন্তা থেকেই বইটির উল্লেখ। লেখক প্রদত্ত শিরোনাম ও ক্রম অনুসারে গান ৬টি হলো— 

‘আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম’

‘আজি শিক্ষিত লোকে গবেষণা করে’

‘আমার ভিতরে বাহিরে অন্তরে অন্তরে’

‘ও টুনির মা তোমার টুনি কথা শুনে না’

‘তোমার ঘরে বসত করে কয়জনা’

‘নামাজ আমার হইল না আদায়’

এত এত বাংলা গান থাকতে এই বইয়ে ১০টি হিন্দি গান এবং ৩টি ইংরেজি গান অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়োজন কেন পড়ল, সে প্রশ্ন উঁকি দিলেও আপাতত আমরা মনোযোগ দিতে চাই বাংলাদেশের গান ৬টির দিকে। ষষ্ঠ গানটি নিয়ে আমাদের বলবার কিছু নেই। কারণ, দুর্বিন শাহ্ (১৯২০—১৯৭৭) রচিত এই গান বেশ আগে থেকেই পশ্চিমবঙ্গে জনপ্রিয়। ঋত্বিক ঘটক তাঁর একটি সিনেমাতেও এ গান ব্যবহার করেছেন। গানগুলো বর্ণানুক্রমিকভাবে সাজানা হলেও লক্ষ করা যায়, পশ্চিমবঙ্গীয় গানের আলোচনা শুরু হয়েছে চল্লিশের দশক থেকে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে (৬ নং গানটি আলোচনার বাইরে রাখলে) কেন বিশেষভাবে সাম্প্রতিক সময়ের এমন কিছু গান অন্তর্ভুক্ত করা হলো যা এদেশের সাম্প্রতিক বাংলা গানের প্রতিনিধিত্ব করে না? বিশেষ করে তৃতীয় শ্রেণির গান হিসেবেও যে গানটি আমাদের আলোচনায় আসে না, সেই ‘ও টুনির মা’ সুধীর বাবুর মতো বিদগ্ধ মানুষের কান পর্যন্ত পৌঁছল কী করে এবং সেটা তিনি এ বইয়ে লিরিকসহ বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করলেন কেন? ১২৫ পৃষ্ঠায় এ গানের উপ শিরোনামে লেখা হয়েছে—‘গানের কী অধোগতি।’ প্রশ্নটা আমাদেরও। অধোগতিটা প্রকৃতপক্ষে কার :পশ্চিমবঙ্গের শ্রোতাদের? না বিশ্লেষকদের? 

দ্বিতীয় গানটি সায়ানের প্রথম অ্যালবামের। বেরিয়েছিল ১৬ মে ২০০৮-এ। রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের যথাযথ মূল্যায়নে আমরা যে জাতীয়ভাবে ব্যর্থতার প্রমাণ দিয়েছি, সেই আক্ষেপ ও ধিক্কার এ গানের প্রতিপাদ্য বিষয়। গানটির অংশবিশেষ উদ্ধৃত করা যায়—

আজ শিক্ষিত লোকে গবেষণা করে কার চেয়ে কে বড়

কাজী নজরুল, নাকি রবীন্দ্রনাথ বলো কে বেশি বড়

এলো নজরুল, এলো রবীন্দ্রনাথ বাঙালি তোমার জন্য

তবু গেলো না গেলো না, এখনও গেলো না বাঙালি মনের দৈন্য

কোথায় সঞ্চয়িতা আর সঞ্চিতাই বা কোথায়

সঞ্চিতা আর সঞ্চয়িতা আজ দাঁড়িপাল্লায়।...  

বিভিন্ন অনুষঙ্গে বাঙালি মনের দৈন্যের পরিচয় দেবার পর রবীন্দ্র-নজরুল প্রসঙ্গের ইতি সায়ান টেনেছেন এভাবে—

রবীন্দ্রনাথ শান্ত সমুদ্র/নজরুল তাতে টালমাটাল জোয়ার

রবীন্দ্রনাথ মুক্ত মহাকাশ/নজরুল সেই মহাকাশজুড়ে/ তুফান-ডাকা বজ্রহুংকার।

সায়ানের বক্তব্যে কোনো অত্যুক্তি আছে বলে তো মনে হয় না। কিন্তু সুধীর চক্রবর্তী এ গানে আবিষ্কার করেছেন ‘মৌলবাদের ক্ষয়িষ্ণু পরিবেশ’-এর চিত্র! প্রশ্ন রেখেছেন :‘মৌলবাদের ক্ষয়িষ্ণু পরিবেশ কি তাদের এ সব অবান্তর প্রশ্নের গান রচনা করাল?’ সুধীর বাবুর ভাষ্য অনুযায়ী গানটি তিনি শুনেছেন ২০১৫ সালে স্বয়ং সায়ানের কণ্ঠে, সামনে বসে। বিব্রতকর বিষয় হলো, এ গানের শিল্পীকে তিনি বলছেন ‘শায়ান নামের সদ্য তরুণ’! মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন। রচনার ইতিবৃত্ত, প্রকাশকাল ও আনুষঙ্গিক তথ্যসহ ১০০টি বাংলা নিয়ে একটি তথ্যনিষ্ঠ বই প্রকাশ কঠিন কোনো কাজ নয়। সুধীর চক্রবর্তীর উন্নাসিকতার যথার্থ উত্তর দিতে গেলে অনুরূপ একটি বই বাংলাদেশ থেকে প্রকাশ করা জরুরি হয়ে পড়ে। কে নেবে সেই দায়িত্ব? 

 

সোনালি যুগের রূপকারগণ

ঢাকায় বেতার নিজস্ব কার্যক্রম শুরু করেছে ১৯৩৯ সালের ১৬ ডিসেম্বর থেকে। টেলিভিশন এলো ১৯৬৪ সালে। এরই মাঝে ১৯০২ সাল থেকে কলকাতায় এইচএমভি কোম্পানি গ্রামোফোনে গান শোনানোর যে মোহনীয় ও মহার্ঘ যন্ত্র বাজারে ছাড়ে, সেটি আমাদের নাগালে আসতে বেশ সময় লেগেছে। সার্বিকভাবে বাংলা গানের স্বর্ণযুগ হিসেবে চিহ্নিত করা হয় চল্লিশ, পঞ্চাশ ও ষাটের দশককে। কিন্তু স্বাধীনতাপূর্ব ও স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে রুচিশীল গানের স্বাভাবিক স্রোতধারা বহমান ছিল যে সময়টাতে—তা পঞ্চাশ, ষাট ও সত্তরের দশক। কাব্যধর্মী বাণী, মেলোডিয়াস সুর এবং বাদ্যযন্ত্রের পরিমিত ব্যবহার; এই ছিল তখনকার গানের বৈশিষ্ট্য। কাদের জামেরী (১৯১০—১৯৮৪), আবদুল আহাদ (১৯১৮—১৯৯৪), সমর দাস (১৯২৫—২০০১), ধীর আলি মিয়া (১৯২০—১৯৮৪), সুবল দাস (১৯২৭—২০০৫), দেবু ভট্টাচার্য (১৯৩০—১৯৯৪), আলতাফ মাহমুদ (১৯৩০—১৯৭১), সত্য সাহা (১৯৩৪—১৯৯৯) প্রমুখ সুরস্রষ্টাগণ তাঁদের মাস্টার পিস সৃষ্টি করে গেছেন উক্ত তিন দশকেই। 

গীতিকার বা গীতিকবিদের প্রসঙ্গে জনা-দশেক নাম ঘুরে ফিরে আসে : আজিজুর রহমান (১৯১৪—১৯৭৮), সৈয়দ শামসুল হক (১৯৩৫—২০১৬), মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান (১৯৩৬-২০০৮), আবু হেনা মোস্তফা কামাল (১৯৩৬—১৯৮৯), কে জি মোস্তফা (১৯৩৭), মাসুদ করিম (১৯৩৬-১৯৯৬), ফজল-এ-খোদা (১৯৪১), মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান (১৯৪৩), গাজী মাজহারুল আনোয়ার (১৯৪৪)। তাঁদের সৃষ্টিমুখর সময় ওই তিন দশক ঘিরেই। এরই ধারাবাহিকতায় পূর্বাপর আরও কিছু নাম হয়তো আসবে। কিন্তু মোটা দাগে সংগীতে তাঁরাই আমাদের সোনালি সময়ের রূপকার। ফজল-এ-খোদা, মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান, গাজী মাজহারুল আনোয়ার গানের জগতে এখনও সক্রিয়। এখনও লিখে চলেছেন মনিরুজ্জামান মনির, হাল ধরে আছেন মুন্সী ওয়াদুদ। সমান্তরালে নতুন আইডিয়া নিয়ে নতুন প্রজন্ম মেতে উঠেছে সৃষ্টি সুখের উল্লাসে। নতুন প্রজন্মের এই সৃষ্টিশীলতা সম্পর্কে বিশদ আলোচনায় যাবার আগে একটু ফিরে তাকানো দরকার অতীতের দিকে।

১৯৬১ সালে ৯/এইচ মতিঝিলে এইচএমভি কোম্পানি তার একটি শাখা খুললেও বেশি দিন সেটি টেকেনি। গান রেকর্ডিং এবং এর বাজারজাতকরণ সংক্রান্ত সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসেন চলচ্চিত্র পরিচালক প্রযোজক সালাহ্উদ্দিন। ঢাকার ইন্দিরা রোডে ১৯৬৮ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম কর্পোরেশন লি.। এ সংস্থা থেকে যে রেকর্ড প্রকাশিত হত, তার নাম ছিল ঢাকা রেকর্ড। গান রেকর্ডিংয়ের জন্য স্বাধীনতা পরবর্তীকালে ১৯৭৫ সালের দিকে সাফাত আলী কাকরাইলে প্রতিষ্ঠা করেন ইপসা। ১৯৭৯ সালে খান আতাউর রহমান ও আজাদ রহমান যথাক্রমে প্রতিষ্ঠান করেন শ্রুতি ও মুভিটোন। আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে এসে কালের অমোঘ নিয়মে বন্ধ হয়ে যায় গ্রামোফোন রেকর্ড। কিছু শৌখিন ভদ্রলোক এখনও তাদের ড্রয়িং রুমে গ্রামোফোন সাজিয়ে রাখলেও কার্যত গান শোনার জনপ্রিয় মাধ্যমে হিসেবে ক্যাসেট প্লেয়ার বাজার দখল করে ফেলে ১৯৮১ সাল থেকেই। সামান্য ভিন্নমত থাকলেও এমএ শোয়েবকে বলা হয়ে থাকে এ দেশের প্রথম অডিও ক্যাসেটের শিল্পী। এমএ শায়েবের প্রথম ক্যাসেট প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৮১ সালের দিকে। ক্যাসেট প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান হিসেবে পৃথিকৃত্ ডিস্কো রেকর্ডিংয়ের কর্ণধার শাহীন রহমান। কমপেক্ট ডিস্কও (সিডি) প্রথম বের করেছিল ডিস্কোই। ডিস্কোর পর আসে সারগাম-এর নাম। পরবর্তীকালে চেনাসুর, সংগীতা, সাউন্ড টেক-এর জনপ্রিয়তার ধারায় প্রচুর অডিও কোম্পানি গড়ে উঠতে থাকে। আশির দশক থেকে আধুনিক গানের রূপ বদল ঘটতে শুরু করে। অবশ্য স্বাধীনতারও আগে ১৯৬৩ সালেই জিঙ্গা শিল্পগোষ্ঠী শুরু করে দিয়েছিল অন্য ধারার গান যার সঙ্গে আমাদের তেমন একটা পরিচয় ছিল না। বনি এম ও অ্যাবা ছিল তাদের আইকন। টেলিভিশনে জিঙ্গা গোষ্ঠী প্রথম পারফর্ম করে ১৯৬৫ সালে। সত্তর দশকে নাজমা জামানের জনপ্রিয়তা ওঠে তুঙ্গে। কিন্তু রেডিওতে শুরু থেকে তখন পর্যন্ত (অনেকাংশে এখনও) হারমোনিয়াম, বেহালা, বাঁশি, তবলা, অ্যাকর্ডিয়ানের অবিকল্প ব্যবহার চলছে। সিনেমার গানে মিউজিক এরেঞ্জমেন্টের চিত্রটাও তখন এরকমই। এখন, এই সময়ে দাঁড়িয়ে ভাবতে অবাকই লাগে, এই সব ‘সাদামাটা’ বাদযন্ত্র দিয়েই কালক্রমে তৈরি হয়েছে কালজয়ী সব গান :

১. সেই চম্পা নদীর তীরে (১৯৫৫) (কথা:আবু হেনা মোস্তফা কামাল, সুর ও শিল্পী :আবু বকর খান)

২. আকাশের ঐ মিটিমিটি তারার সাথে (১৯৬০) (কথা-সুর :মোসলেহ উদ্দিন, শিল্পী :নাহিদ নিয়াজী)

৩. বাঁশি বাজে ঐ দূরে (১৯৬০) (কথা-সুর-শিল্পী :মোহাম্মদ আলী সিদ্দিকী)          

৪. আমি সাগরের নীল নয়নে মেখেছি (১৯৬২) (কথা :আবু হেনা মোস্তফা কামাল, সুর :আবদুল আহাদ, শিল্পী :ফেরদৌসী রহমান)

৫. কলসী কাঁখে ঘাটে যায় (১৯৬৪) (কথা :ফজল-এ-খোদা, সুর :মোহাম্মদ আবদুল জব্বার)    

৬. সব কিছু মোর উজাড় করে (১৯৬৫) (মাসুদ করিম, সুর :রাজা হোসেন খান, শিল্পী :সৈয়দ আব্দুল হাদী)           

৭. হারানো দিনের কথা মনে পড়ে যায় (১৯৬৭) (কথা-সুর :মোহনলাল দাশ, শিল্পী :মেহেদী হাসান)                   

৮. তন্দ্রাহারা নয়ন আমার (১৯৬৭) (কথা :মাসুদ করিম, সুর :সমর দাস, শিল্পী :ইসমত আরা)                        

৯. তোমার স্বপ্ন দিয়ে যাক দোলা (১৯৬৮) (কথা :আল-কামাল আব্দুল ওহাব, সুর :মসিহ-উল আলম, শিল্পী :ফওজিয়া খান)     

১০. যদি নয়নে আবেশ লেগে থাকে মোর (১৯৬৮) (কথা :জেব-উন-নেসা জামাল, সুর :খবির উদ্দীন, শিল্পী :জীনাত রেহানা)   

১১. গানের লগন এলো তুমি এলে কই (কথা :সৈয়দ শামসুল হুদা, সুর :আতিকুর রহমান, শিল্পী :আঞ্জুমান আরা বেগম)                     

১২. আমি চোখের জলে লিখেছিলাম (১৯৬৯) (কথা :লোকমান হোসেন ফকির, সুর :কামের জামেরী, শিল্পী :ইসমত আরা)      

১৩. জীবন সে তো পদ্মপাতায় শিশির বিন্দু (১৯৬৯) (কথা-সুর :খান আতাউর রহমান, শিল্পী :নীলুফার ইয়াসমীন)

১৪. তোমার আগুনে পোড়ানো এ দুটি চোখে (কথা-সুর :খান আতাউর রহমান, শিল্পী :শাহনাজ রহমতউল্লাহ)          

১৫. তোমার কাজল কেশ ছড়াল বলে (১৯৬৯) (কথা :আবু হেনা মোস্তফা কামাল, সুর :আবদুল আহাদ, শিল্পী :বশির আহমদ)

১৬. নিমন্ত্রণের বকুলগুলো (কথা :গাজী মাজহারুল আনোয়ার, সুর :খোন্দকার নূরুল আলম, শিল্পী :খন্দকার ফারুক আহমেদ)

১৭. লিখেছ আর না আসিতে (১৯৭৪ (কথা-সুর-শিল্পী :আপেল মাহমুদ)

১৮. দুঃখ আমার বাসর রাতের পালঙ্ক (১৯৭৬) (কথা :মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান, সত্য সাহা, শিল্পী :সাবিনা ইয়াসমীন)         

১৯. বৈশাখী মেঘের কাছে (১৯৭৬) (কথা :আবুল হায়াত্ মোহাম্মদ কামাল, সুর :অনুপ ভট্টচার্য, শিল্পী :রফিকুল আলম)          

২০. তোমার চন্দনা মরে গেছে (১৯৭৮) (কথা :মুনশী ওয়াদুদ, সুর :শেখ সাদী খান, শিল্পী :মিতালী মুখার্জী) 

২১. ভালোবাসলেও সবার সাথে (১৯৮০) (কথা :মাহফুজুর রহমান মাহফুজ, সুর :শেখ সাদী খান, শিল্পী :শাম্মী আখতার)

ওপরে যাদের কথা বলা হয়েছে, একাধারে তারা কাজ করেছে রেডিও, টেভিশিন ও চলচ্চিত্রের গানে।

 

পুনঃনির্মাণের প্রাক্কালে অনিবার্য ভাঙচুর

মনোযোগ দেয়া যাক আশির দশক থেকে নব্বই দশক ও ২০০০ সাল পরবর্তী বাংলা গানের চালচিত্রে। পুলক বন্দোপাধ্যায় (১৯৩৪-১৯৯৯) ও গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার (১৯২৫-১৯৮৬)-এর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে পশ্চিমবঙ্গে একটি অধ্যায়ের যবনিকাপাত ঘটে। শৈলেন রায় (১৯০৫-১৯৬৩), অজয় ভট্টাচার্য (১৯০৬-১৯৪৩), সুবোধ পুরকায়স্থ (১৯০৭-১৯৮৪), প্রণব রায় (১৯১১-১৯৭৫), মোহিনী চৌধুরী (১৯২০-১৯৮৭), শ্যামল গুপ্ত (১৯২২-২০১০), সলিল চৌধুরীর (১৯২৩-১৯৯৫) গানে একটি বিশেষ প্যাটার্ন ছিল। প্যাটার্ন ভাঙার কাজটা শুরু করেছিল মহিনের ঘোড়াগুলি, ১৯৭৬ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই।

নতুন ধারার সংগীত সৃষ্টির পথে সাহসী ও মেধাবী একটি নাম কবির সুমন; কবি সুমনও বলা যায় তাকে—তার লিরিকের যে কাব্যগুণ! সুমনের প্রথম ক্যাসেট বের হয় ১৯৯২ সালে। শিরোনাম ‘তোমাকে চাই’। সুমন এগোলেন স্বনির্মিত পথে, কিন্তু বিস্মৃত হলেন না সলিল চৌধুরীর ফেলে আসা গান, চৌরাশিয়ার বাঁশি, ভুলে যাওয়া হিমাংশু দত্তের সুর, সেই কবেকার অনুরোধের আসরের স্মৃতি।

সুমনের পথ ধরে এলেন অঞ্জন দত্ত। এলেন তেজি যুবক নচিকেতা। বিপ্লব ঘটে গেল। একই ব্যক্তি গীতিকার, সুরকার ও কণ্ঠশিল্পী। হালের অনুপম রায় ও রূপম ইসলাম একই পথের পথিক। ঐতিহ্যকে ধারণ করে তারা পুরোনো প্রেমের রাগ-রাগিনী বাজাতে শুরু করলেন নতুন সুরে তালে। রেকর্ড যুগের শুরুর দিকে গানের সময়সীমা ছিল অল্প। আত্মস্মৃতিতে পুলক বন্দোপাধ্যায় লিখেছেন :‘মাত্র তিন মিনিট দশ সেকেন্ড। হ্যাঁ। এই ছিল ডিস্ক রেকর্ডের সময়সীমা।’ প্রযুক্তির সুবিধার হাত ধরে গানের দৈর্ঘ্য বড় হতে লাগল। আধুনিক গানের কাঠামো তো আগেই দাঁড় করিয়ে দিয়ে গেছেন রবীন্দ্রনাথ, যুক্ত করেছেন সঞ্চারী যা হয়ে ওঠেছিল আধুনিক গানের একটি বড় সৌন্দর্য। সুধীরলাল চক্রবর্তী দেখিয়েছেন, গানে সঞ্চারীর ব্যবহার কতটা মধুর হতে পারে। দীর্ঘকায় গান রচনা করেছেন সলিল চৌধুরীও। কিন্তু তাঁর যুগ থেকেই গান হতে থাকল সঞ্চারীবর্জিত। গানের দেহে অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচার কি সলিল চৌধুরী নিজেই শুরু করেছিলেন? মনে হয় না। সঞ্চারীসমৃদ্ধ কত গান আছ তার রচনাভাণ্ডারে। নিজের দুই মেয়ের নামও তিনি রেখেছেন গানের অনুষঙ্গ থেকে :অন্তরা ও সঞ্চারী।  

সুমন-অঞ্জন-নচিকেতা-অনুপম-রূপমের যুগে এসে গান আবার বড় হতে লাগল দৈর্ঘ্যে। সুমনের ‘তোমাকে চাই’, ‘জাতিস্মর’-এর দৈর্ঘ্য তো রীতিমতো মহাকাব্যিক। ছন্দের ভিতরে থেকেই ভাঙা শুরু হলো ছন্দ। বাংলা গানে আরবি উর্দু শব্দের যথার্থ ব্যবহার আমরা দেখেছি নজরুলের সৃষ্টিতে। অনুপম-রূপমদের গানে একটু অন্যভাবে ফিরে এলো সেই ধারা। কোনো কোনো গানে ঢুকে পড়ল জনপ্রিয় হিন্দি গানের আস্ত একটা মুখড়া। জানি ‘দেখা হবে’ (২০১১) ছবির একটি গান :

মেলেছ চুল খুলেছ ডানা/জানি আঙুল ছোঁয়ানো মানা

তবু আজি আমি রাজি/চাপা ঠোঁটে কথা ফোটে

...জো ওয়াদা কিয়া ওহ নিভানা পড়েগা

রোকে জমানা চাহে রোকে খুদায়ী/তুমকো আনা পড়েগা

কবি শ্রীজাত বন্দোপাধ্যায় তার বাণীতে লীন করেছেন তাজমহল (১৯৬৩) ছবিতে লতা-রফি জুটির অবিস্মরণীয় গানের অংশ যার গীতিকার ছিলেন সাহির লুধিয়ানভী, সুরকার রোশান। ইন্দ্রদীপ দাশগুপ্তের সুরের সঙ্গে রোশানের সুর এমন সাবলীলভাবে মিশে গেছে, মনেই হয় না দুটি দুই সময়ের দুই ভাষার গান। অভিনব অদ্ভুতুড়ে অ্যাবস্ট্রাক্ট শব্দ আসছে গানে। কিছু শব্দ আবার একেবারেই আটপৌরে; গানে যে তা ব্যবহার করা চলে, আমাদের চিন্তাতেই তা আসেনি। শ্রেয়া ঘোষালের কণ্ঠে তুলে দেওয়া গানগুলোতে এ ধরনের সফল নিরীক্ষা অধিক পরিলক্ষিত। অটোগ্রাফ (২০১০) ছবিতে শ্রীজাত বন্দোপাধায়ের একটি গানের অংশ:

চল রাস্তায় সাজি ট্রাম লাইন আর কবিতায় শুয়ে couplet

আহা উত্তাপ কত সুন্দর তুই thermometer-এ মাপলে

হিয়া টুপটাপ জিয়া নস্টাল (নস্টালজিয়া), মিঠে কুয়াশায় ভেজা আস্তিন

আমি ভুলে যাই কাকে চাইতাম আর তুই কাকে ভালোবাসতি।...

পোষা বালিশের নিচে পথ-ঘাট, যারা সস্তায় ঘুম কিনত

তারা কবে ছেড়ে গেছে বন্দর, আমি পাল্টে নিয়েছি রিং টোন।

তবু বার বার তোকে ডাক দিই একি উপহার নাকি শাস্তি

আমি ভুলে যাই কাকে চাইতাম আর তুই কাকে ভালোবাসতি

‘কপলেট’-এর সঙ্গে ‘মাপলে’, ‘আস্তিন’-এর সঙ্গে ‘বাসতি’, ‘কিনত’-র সঙ্গে ‘রিং টোন’; কেমন তরো অন্ত্যমিল? শ্রীজাতের কবিতার সঙ্গে যারা পরিচিত, তারা জানেন যে, শব্দের শেষ ব্যঞ্জন ধ্বনি/বর্ণটি উহ্য রাখা তার নিজস্ব স্টাইল। শেষ ধ্বনিটি উচ্চারণে আসে না, কিন্তু চিন্তনে খেলা করে সন্তর্পণে। চাইলে যে অনায়াসে নিখুঁত অন্ত্যমিল বজায় রাখা যেত উক্ত লাইনগুলোতে, সে তো বলাই বাহুল্য। কিন্তু ট্রাম লাইন সাজার খেয়ালি সাধ, কবিতার couplet-এ শুয়ে থাকতে চাওয়া, thermometer-এ সৌন্দর্যের উত্তাপ মাপার প্রকৌশল, ‘নস্টালজিয়া’ কথাটিকে ভেঙে, উল্টে দিয়ে ‘জিয়া নস্টাল’ উচ্চারণের খামখেয়ালিপনা, একঘেয়েমি কাটানোর জন্য মোবাইলের রিং টোন পাল্টানো... একটিমাত্র গানে এই সব সংগতিহীন বিচিত্র খণ্ডচিত্রের সমাবেশ; এর কি সত্যিই কোনো মানে আছে? হ্যাঁ, সবকিছু মিলে একটা ছবি অবশ্য দেখা যাচ্ছে অস্থির বর্তমানের। উন্নত রেকর্ডিং সিস্টেম, নিখুঁত উচ্চারণ, রেওয়াজি সুরেলা কণ্ঠ... সব মিলিয়ে গানগুলো নিঃসন্দেহে শ্রবণসুখকর। শ্রেয়ার কণ্ঠে ‘অন্তহীন’ (২০০৯) ও ‘নটবর নট আউট’ (২০১০) ছবির দুটি গানের অংশবিশেষ—

১. যাও পাখি বলো হাওয়া ছল ছল

আবছায়া জানালার কাচ

আমি কি আমাকে হারিয়েছি বাঁকে

রূপকথা আনাচ-কানাচ।

২. মেঘের পালক চাঁদের নোলক, কাগজের খেয়া ভাসছে

বুক ধুকপুক চাঁদপনা মুখ চিলেকোঠা থেকে হাসছে

            [...] [...]

তুমি আমি তিন সত্যি হয়ে বাকি সব আজ মিথ্যে

মম চিত্তে... নৃত্যে... নাচে

দ্বিতীয় গানটিতে কি চমত্কারভাবে আত্মীকরণ করা হয়েছে রবীন্দ্রনাথকে। ‘সবার হূদয় রবীন্দ্রনাথ/চেতনাতে নজরুল’ থাকলেও নবীন গীতিকারগণ এখন আর ‘চাঁদমুখ-ঝরাফুল-প্রদীপ’ জাতীয় শব্দ ব্যবহার করতে চাচ্ছেন না। এটা যুগের অনিবার্য দাবি। নতুন শব্দ, নতুন চিত্রকল্প তৈরি করা না গেলে আইডেন্টিফিকেশন আসবে কী করে? আইডেন্টিফিকেশন তাদের এসেই গেছে। জাতিস্মর (২০১৪) ছবির নায়িকা স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায়ের একটি অনবদ্য সংলাপে উঠে এসেছে এইসব বুদ্ধিদীপ্ত গীতরচয়িতাদের যথার্থ মূল্যায়ন :

‘বাংলা গানকে ভালোবাসতে হলে তো মহিনের ঘোড়াগুলির সঙ্গে রামপ্রসাদটাও শুনতে হবে। কারণ নচিকেতা চক্রবর্তী যেমন আমার কথা বলেছে, নচিকেতা ঘোষও বলেছে। কারণ, অঞ্জন দত্ত যেমন আমার ভাষায় গান লিখেছে, মুকুল দত্তও লিখেছে। কারণ অনুপম রায় যেমন আমার, অনুপম ঘটকও আমার। রূপম ইসলাম যেমন আমার, নজরুল ইসলামও।’

 

লাকী আখান্দ ‘লাকি’ ছিলেন?

বাংলাদেশ পর্বটা শুরু করা যায় লাকী আখান্দকে দিয়ে। তার আগে পথিকৃতদের স্মরণ করতেই হয়। আজম খান, পিলু মমতাজ, ফেরদৌস ওয়াহিদ, ফিরোজ সাই, ফকির আলমগীর। আধুনিক বাংলা গানের নতুন বাঁকে এই পাঁচ অগ্রপথিককে পঞ্চপাণ্ডব নামেই অভিহিত করা যায়। এদেশে পপ সংগীত জনপ্রিয় হয়েছে মূলত তাদের কণ্ঠবাহিত হয়ে। তাদেরকে নিয়ে পৃথকভাবে অল্প করে লিখতে গেলেও অনেক কথা চলে আসবে। তাদের নিয়ে স্বতন্ত্র আলোচনা করা সঙ্গত হবে অন্যত্র। 

আধুনিক গানের ‘আধুনিকত্ব’ বজায় রেখে বাণীর সৌন্দর্য ও সুরের মাধুর্য এক সূত্রে বাঁধতে প্রয়াসী হয়েছেন যে কজন মিউজিশিয়ান, তাদের মধ্যে অগ্রগণ্য লাকী আখান্দ (১৯৫৪-২০১৭)। লাকী আখান্দ, হ্যাপী আখান্দ, এসএম হেদায়েত এই ত্রয়ীর হাতে সৃষ্টি হয়েছে বেশ কিছু স্মরণীয় গান। ‘এই নীল মনিহার’, ‘চল না ঘুরে আসি’, ‘কে বাঁশি বাজায় রে...’ কালের স্রোতে হারিয়ে যাবার মতো গান নয় এসব। লাকী আখন্দের সঙ্গে মিতালি ছিল কাওসার আহমেদ চৌধুরীর। সামিনা চৌধুরী কণ্ঠে লাকী আখান্দের সুরে কাওসার আহমেদের চৌধুরীর লেখা ‘কবিতা পড়ার প্রহর’ উত্তীর্ণ হয়েছে ক্লাসিকে। ‘পলাতক সময়ের হাত ধরে’ (শিল্পী :লাকী আখান্দ), ‘সখি চলো না জলসা ঘরে এবার যাই’ (শিল্পী :সৈয়দ আব্দুর হাদী), ‘এই রুপালি গিটার ফেলে’ (শিল্পী :আইয়ুব বাচ্চু), ‘যেখানে সীমান্ত তোমার’ (শিল্পী :কুমার বিশ্বজিত্), ‘এই দেশে এক শহর ছিল’ (শিল্পী :নাফিজ কামাল), ‘গভীর হয়েছে রাত এখন গভীর কিছু বলো’ (শিল্পী :আগুন) এমন আরও বহু গানের গীতিকার কাওসার আহমেদ চৌধুরী কেন অসময়ে গান লেখা থামিয়ে দিলেন, এই আক্ষেপ স্রোতাদের থেকেই যাবে। মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে এইচএমভিতে (পাকিস্তান) সুরকার হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়ে উপমহাদেশের সর্ব কনিষ্ঠ সুরকারের রেকর্ড করেছিলেন লাকী। লাকীই বলা যায় তাকে। কিন্তু সার্বিক অর্থে? হ্যাপীও সুখি হতে পারেননি। ব্যক্তিগত আলাপচারিতায়, টিভি সাক্ষাত্কারে, পত্রিকায় বার বার তিনি আক্ষেপ করেছেন, ‘আমি আমার যোগ্যতা প্রমাণের উপযুক্ত ক্ষেত্র পাইনি। ...ভেবে খুব কষ্ট পাই, হ্যাপীকে এ প্রজন্ম চিনতেই পারল না!’ এত সুর আর এত গান উপহার দিয়ে দুই দুঃখী রাজকুমার বিদায় নিলেন নিভৃতে।

 

বাবার অবাধ্য (?) বরেণ্য সন্তানেরা

একটা ব্যাপার আমরা বার বার লক্ষ করেছি, গুণী বাবার সন্তানেরা সবসময় তাদের বাবার মতো পরিচিতি পাননি। ব্যাপারটা ঘটেছে বিশেষ করে সংগীত ও অভিনয়শিল্পের ক্ষেত্রে। এমন ঘটনা তো প্রচুর; বাবা ছিলেন উচ্চাঙ্গ সংগীতের বড় ওস্তাদ, আর তার সন্তানেরা বড় হয়ে সংগীতেই এলেন না। যদিও বা কেউ এলেন, অবস্থান নিলেন বাবার ঠিক বিপরীত মেরুতে। লোকসংগীতের প্রবাদপুরুষ মোমতাজ আলী খানের (১৯১৫-১৯৯০) মেয়ে পিলু মমতাজ যেমন প্রতিষ্ঠিত হলেন পপ শিল্পী হিসেবে। উপমহাদেশের প্রখ্যাত কম্পোজার কমল দাশগুপ্তের সন্তান শাফিন বা হামিন কেউ বাবার পদাঙ্ক অনুসরণ করেননি, বরং নিজেরাই তৈরি করেছেন জনপ্রিয়তার নতুন সংজ্ঞা। বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতে শাফিন আহমেদের অবস্থান অনেক উঁচুতে। শাফিনের বহু গান এ প্রজন্মের শ্রোতার মুখে মুখে। ‘আর কত কাল খুঁজব তোমায়’ গানটিতে অন্তহীন অপেক্ষার যে হাহাকার-ধ্বনি, তার তুলনা সত্যি বিরল। খান আতাউর রহমানের ছেলে আগুনও সংগীতে আদর্শ হিসেবে বাবাকে শিরোধার্য করেননি। গান করেছেন, সুর করেছেন নিজস্ব ধারায়, নতুন ভঙ্গিতে। আগুনের গাওয়া গান ‘আমার স্বপ্নগুলো কেন এমন স্বপ্ন হয়’ বেদনাক্লিষ্ট প্রশ্নাকারে গুঞ্জরিত হয় বহু যুবকের কণ্ঠে। আগুন হাঁটেননি খান আতার পথে, আগুনের ছেলে মিছিল কি হাঁটবে আগুনের পথে? খালিদ হাসান মিলুর ছেলে প্রতীক হাসান ভালো গাইছেন। আশা করা যায়, প্রতীক ভালো কিছু গান উপহার দেবেন।   

বাবার পথে না-হাঁটা আরেক স্বানমধন্য কম্পোজার আশিকুজ্জামান টুলু। টুলুর উত্থান নব্বইয়ের দশকে। বাবা ওস্তাদ মুন্শী রইসউদ্দিন (১৯০১-১৯৭৩) কাছে সে সময়ে তালিম নিয়েছেন যারা (আবদুল আলীম, ফেরদৌসী রহমান প্রমুখ) পরিণত বয়সে তাদের অনেকেই স্ব-স্ব ক্ষেত্রে হয়ে উঠেছেন একেকজন দিকপাল। টুলু তখন নিতান্তই বালক। সে কারণেই বাবার কাছে তালিম নেয়ার সুযোগই হয়নি। ভাইয়ের গানের সঙ্গে এক সময় তবলা, বঙ্গো বাজিয়েছেন। কৈশোরে সঙ্গী হয়ে ওঠে ড্রাম গিটার কিবোর্ড। নব্বই দশকের যে সময়টায় ব্যান্ড সংগীতের তুমুল জোয়ার, তিনি তখন পুরো দস্তুর মিউজিশিয়ান। ওয়েস্টার্ন ধাঁচের গান যেমন কম্পোজ করেছেন, ক্লাসিকেল ধাঁচের গান করেছেন সমান দক্ষতায়। নিজে গেয়েছেন অল্পই। অন্যকে গাওয়ানোর দিকে, নতুন নতুন সুর সৃষ্টির দিকেই মূলত তার ঝোঁক ছিল। ‘ঐ দূর আকাশে তারা গুনি আকাশে আকাশে’ (কথা :আসিফ ইকবাল), ‘ভেবো না এই কান্না’ (কথা :সাঈফ), ‘কোনো এক সুন্দরী রাত্রে’ (কথা :সিজান মাহমুদ), ‘নিজেই নিজের কাছে গল্প বলে’ (আহমেদ ইউসুফ সাবের), ‘আমার দুচোখে অনন্ত মেঘ’ (কথা :শিমুল মোহাম্মদ) এমনই আরও বহু জনপ্রিয় গানের কথা উল্লেখ করা যায়, যা আশিকুজ্জামান টুলুর সুর ও সংগীতের জাদুতে মোহনীয়।

 

সেই নাজির মাহমুদ, এই নাজির মাহমুদ

সংগীতজীবনের শুরুতে ঢাকা বেতারে জিঙ্গেলে কণ্ঠ দিয়েছেন প্রচুর। প্রস্তুতিপর্বে সঙ্গী হিসেবে পেয়েছিলেন ভিন্ন ধারার গানের শিল্পী হায়দার হোসেনকে। নাজির মাহমুদ কাজ করেছেন নীরবে নিভৃতে। আইয়ুব বাচ্চু, মিতালী মুখার্জী, সাবিনা ইয়াসমীন, তপন চৌধুরী, ন্যান্সি, বাদশাহ বুলবুলসহ এ সময়ের আলোচিত প্রায় সব শিল্পী তার সুর করা গানে কণ্ঠ দিয়েছেন। সুরকাররা খুব ভালো গাইতে পারেন, এমন ধারণা বাস্তবে বহুলাংশে ভুল প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু অনুপ ভট্টাচার্যের কণ্ঠে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বা ঘরোয়া আয়োজনে যারা গান শুনেছেন, তারা জানেন কী মিষ্টি আর দরদী তার কণ্ঠ। সুরকার ও সংগীত পরিচালক নাজির মাহমুদ সম্পর্কেও একই কথা প্রযোজ্য। ন্যান্সির সঙ্গে তার দ্বৈত গান ‘চোখের আকাশ মনের আকাশ’ একটু মনোযোগ দিয়ে শুনলে বোঝা যায় এই প্রজন্মের শ্রোতাদের কাছে গানটি কেন এতটা পছন্দের। প্রতিটি নোট নিখুঁতভাবে ফুটে ওঠে নাজির মাহমুদের কণ্ঠে। তার একক অ্যালবাম ‘পিরিতির বাজার ভালো না’ প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৯৪ সালে। গান গাওয়ার চেয়ে সুরসৃষ্টিতেই এখন মগ্নতা বেশি। ২০১৬ সালে ‘বাহান্ন’ শিরোনামে তার গাওয়া একটি গান শুনে সমঝদার শ্রোতা নড়েচড়ে বসেন। গানের প্রথম দুটি লাইন—‘ওরা ইংরেজিতে বললে কথা নিজেকে ভাবে ধন্য/আমি হাসব না কাঁদব ওরে ও বাহান্ন, তোর জন্য।’ নব্বই দশক থেকেই নাজির মাহমুদ সুপরিচিত নাম। কিন্তু হঠাত্ করে এই গানটি সবাইকে এতটা নাড়িয়ে দিল ঠিক কী কারণে? গানটির জনপ্রিয়তার মূল কারণ এর হূদয়স্পর্শী সুর এবং অবশ্যই অন্তর্ভেদী লিরিক। এ গানের গীতিকার লালন লোহানীর নাম ক’জন জানেন?

 

প্রিন্স মাহমুদ এলেন, প্রিন্সের মতোই

প্রিন্স মাহমুদ এলেন। কিন্তু এলেন, দেখলেন, জয় করলেন—এ কথা বলার সুযোগ নেই তার ক্ষেত্রে। সংগ্রাম করতেই হয়েছে। হতে চেয়েছিলেন কণ্ঠশিল্পী, কিন্তু সময় তাকে পৌঁছে দিয়েছে গীতিকার ও সুরকারের সারিতে। পরিবারের কোনো সমর্থন ছিল না ছেলে গান করবে। কিন্তু রক্তের ভিতরে যে অন্তর্গত প্রেরণা, তাকে রুখবে কে! গাওয়া ছেড়ে মনোনিবেশ করলেন গান লেখা ও সুর করায়। একটা সময় ছিল যখন প্রিন্স মাহমুদের কথা ও সুরে গান গাওয়া সমকালীন শিল্পীদের জন্য ছিল গর্বের ব্যাপার। আইয়ুব বাচ্চু, শাফিন আহমেদ, হাসানসহ অনেকেই তার কম্পোজিশনে গেয়েছেন। শাফিন আহমেদের গাওয়া ‘আজ জন্মদিন তোমার’ বহুল শ্রুত ও আলোচিত গান। জেমসের কণ্ঠে ‘তুমি মিশ্রিত লগ্ন মাধুরী’ বিগত ২০ বছরে রচিত অন্যতম সেরা দেশাত্মবোধক গান। কম্পোজিশন তার মৌলিক। কিন্তু তার লেখা গান শুনলে বোঝা যায়, পশ্চিমবঙ্গের বাংলা গান তিনি প্রচুর পরিমাণে শুনেছেন এবং এই শ্রবণের প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে তার গানে। হাসানের গাওয়া ‘তুমি নিজে নিজে প্রশ্ন করে দেখো’ গানটি শোনার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের মনে পড়ে পুলক বন্দোপাধ্যায়ের লেখা মান্না দে গাওয়া সেই হূদয়স্পর্শী গান :তুমি অনেক যত্ন করে/আমায় দুঃখ দিতে চেয়েছ, তুমি পারোনি/কী তার জবাব দেবে— যদি বলি আমিই হেরেছি/তুমিও কি একটুও হারনি (রেকর্ড :১৯৭৪)

রবীন্দ্রনাথকে আত্মস্থ করার স্থুল প্রক্রিয়া দেখা গেছে একটি গানে :

আমি বার মাস তোমায় ভালোবাসি/তুমি সুযোগ পাইলে বন্ধু বাসিও

আমি বার মাস তোমায় আশায় আছি/তুমি অবসর পাইলে আসিও।

কবিগুরু লিখেছিলেন—

আমি নিশিদিন তোমায় ভালোবাসি/তুমি অবসর মতো বাসিয়ো।

নিশিদিন হেথায় বসে আছি,/তোমার যখন মনে পড়ে আসিয়ো (রচনাকাল :১৮৮৯)

২০১৬ সালে প্রকাশিত খেয়ালপোকা অ্যালবামে তাহসান ও কনার কণ্ঠে প্রিন্স মাহমুদের একটি গানের লিরিক শুনে মনে হলো, দারুণ তো!—

আমার ছিপনৌকোয় এসো, ও ‘অন্য মেয়ে’

আড়াল দেয়াল রেখো না.../লাজুক লিরিক আর কল্পনা...

আমি অতি সাধারণ, অনিন্দ্য কিছু নই

তোমার দেখার চোখটাই অবাক/তাই এমন মনে হয়।

গানের কথায় নতুনত্ব দেখা যাচ্ছে। কিন্তু দুর্বল অন্ত্যমিলের খামতিটা ঘুচল না। ‘নই’-এর সঙ্গে জোর করে ‘হয়’ মেলাতে হলো কেন? সুর ও তালের ছন্দে যিনি এত নিপুণ, বাণীর ছন্দেও তিনি দক্ষ হবেন—এ প্রত্যাশা সমঝদার শ্রোতা করতেই পারেন।

 

বাপ্পা মুজমদার এলেন ১৯৯৫ সালে, তখন ‘ভোর বেলা’

পণ্ডিত বারীন মজুমদারের (১৯২১-২০০১) ছেলে বাপ্পা মজুমদারের আত্মপ্রকাশ তখন ‘ভোর বেলা’ (১৯৯৫) অ্যালবামের মাধ্যমে। পুরোপুরি বাবার ধারা অনুসরণ না করলেও বাপ্পার গায়ন ও কম্পোজিশনে লক্ষ করি ক্লাসিক্যাল মিউজিকের একটা প্রচ্ছন্ন রেশ। অনুদাত্ত কণ্ঠ, ছোট ছোট কারুকাজ, রিদমের বৈচিত্র্য মিলিয়ে বাপ্পাকে উত্তর প্রজন্মের প্রতিনিধিত্বশীল মিউজিশিয়ানদের একজন হিসেবে চিহ্নিত করা চলে নির্দ্বিধায়। তার গাওয়া শুরুর দিকের গানগুলোতে উচ্চারণে অস্পষ্টতা ছিল, সেটা সম্ভবত ইন্সট্রুমেন্ট ও ভোকালের ভারসাম্যহীনতার কারণে। কম্পোজিশনে তিনি নিপুণতার পরিচয় দিয়েছেন শুরু থেকেই। সুরে করেন নিজের গানে, অন্যের গানেও। অনুদাত্ত কণ্ঠ সত্ত্বেও গাওয়ার ক্ষেত্রে বাপ্পা এখন সচ্ছন্দ। ফাহমিদা নবীর সঙ্গে তার গাওয়া বেশ কিছু দ্বৈত গান শ্রোতারা ভালোভাবে গ্রহণ করেছেন। ‘ধুলোপড়া চিঠি’ (২০০১) অ্যালবামের ‘পরী’ শিরোনামের ‘আজ তোমার মন খারাপ মেয়ে’ গানটি এ প্রজন্মের পরীরা মন খারাপ থাকলেও শোনে, মন ভালো থাকলেও শোনে। ‘সূর্যস্নানে চল’ (২০০৮) অ্যালবামের ‘কাঁদছে আকাশ কাঁদছে মন’ গানটি প্রতীতি জন্মায়—এই গানের শিল্পী বিশুদ্ধ ক্লাসিক্যাল নিয়ে মগ্ন থাকলেও মন্দ হতো না। গীতিকার এই গানের শেষ অন্তরায় যা লিখেছেন, একই সঙ্গে তা মনকে প্রশান্ত ও জিজ্ঞাসু করে তোলে—‘ও আকাশ কি আমারই মতো/স্বপ্ন বেচেও স্বপ্নহীন?’ স্বপ্ন বিক্রেতা আকাশ নিজেই স্বপ্নহীন!

 

উত্তর প্রজন্মের একগুচ্ছ গান

গানগুলো কালানুক্রমিকভাবে সাজানো। বিশুদ্ধ ব্যান্ড সংগীত এগুলো নয়। একেবারে নিখাদ আধুনিক গানও বলা যাবে না। বরং দুটি ধারার মিশেলে যে গানগুলো প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের পথে ধাবমান, এমন কিছু গানের প্রথম লাইন— 

১. কে বাঁশি বাজায় রে (১৯৭৩) (কথা :এসএম হেদায়েত, সুর :লাকী আখান্দ, শিল্পী :আফরোজা মামুন)

২. আবার এলো যে সন্ধ্যা (১৯৭৫) (কথা :এসএম হেদায়েত, সুর :লাকী আখান্দ, শিল্পী :হ্যাপী আখান্দ)

৩. এই নীল মণিহার (১৯৭৭) (কথা :এসএম হেদায়েত, সুর ও শিল্পী :লাকী আখান্দ)

৪. আচ্ছা, কেন মানুষগুলো এমন হয়ে যায় (১৯৮৪) (কথা :ডা. মোহাম্মদ আরিফ, সুর ও শিল্পী :নকিব খান)

৫. চলেই যদি যাবে তুমি (১৯৮৪) (কথা :ইকবাল মাহবুব, সুর :রকেট, শিল্পী :জুয়েল)

৬. তুমি আমার প্রথম সকাল (১৯৯৩) (কথা :লতিফুল ইসলাম শিবলী, সুর :আশিকুজ্জামান টুলু, শিল্পী :শাকিলা জাফর, তপন চৌধুরী)

৭. যেখানে সীমান্ত তোমার (১৯৮৩) (কথা :কাওসার আহমেদ চৌধুরী, সুর :লাকী আখান্দ, শিল্পী :কুমার বিশ্বজিত্)

৮. পলাশ ফুটেছে শিমুল ফুটেছে (১৯৮৪-৮৫) (কথা-সুর :তাজুল ইমাম :শিল্পী :তপন চৌধুরী)

৯. আমি হ্যামিলনের সেই বাঁশিওয়ালা (১৯৮৪) (কথা ও সুর :প্রণব ঘোষ, শিল্পী :শুভ্রদেব)

১০. তুমি আকাশের বুকে বিশালতার উপমা (কথা-সুর :প্রিন্স মাহমুদ, শিল্পী :খালিদ)

১১. নীলাঞ্জনা নামে ডেকো না (১৯৮৬) (কথা :আহমেদ ইউসুফ সাবের, সুর :মইনুল ইসলাম খান, শিল্পী :কনকচাঁপা)

১২. নীলাঞ্জনা ঐ নীল নীল চোখে (১৯৮৬) (কথা :কাজী আলী তৌফিক, সুর :মকসুদ জামিল মিন্টু, শিল্পী :শেখ ইশতিয়াক)

১৩. মহুয়া বনে দেখেছি তারে (ব্যান্ড :ওডেসি, অ্যালবাম :মন কি যে চায়, শিল্পী :বাবু)

১৪. শ্রাবণের মেঘগুলো জড়ো হলো আকাশে (১৯৯০) (ব্যান্ড :ডিফরেন্ট টাচ, শিল্পী :মেসবাহ) 

১৫. আমি কষ্ট পেতে ভালোবাসি (১৯৯৫) (কথা :লতিফুল ইসলাম শিবলী, সুর ও শিল্পী :আইয়ুব বাচ্চু)

১৬. লিখতে পারি না কোনো গান (১৯৯৮) (কথা :গোলাম মোর্শেদ, সুর :লাকী আখান্দ, শিল্পী :জেমস)

১৭. আজ তোমার মন খারাপ মেয়ে (২০০১) (কথা :রানা, সুর ও শিল্পী :বাপ্পা মজুমদার)

১৮. ব্যস্ততা আমাকে দেয় না অবসর (কথা :কবির বকুল, শিল্পী :পার্থ)

১৯. আমি তোমাকেই বলে দেব (২০০০) (কথা-সুর-শিল্পী :সঞ্জীব চৌধুরী)

মাঝে মাঝে চমকে উঠি; এই উত্তপ্ত অস্থির যুগেই সৃষ্টি হয়েছে এমন কাব্যিক গান! কীভাবে?—

১. ঐ ঝিনুক ফোটা সাগর বেলায় (১৯৮৬) (কথা :ডা. মোহাম্মদ আরিফ, সুর :নকিব খান, শিল্পী :সামিনা চৌধুরী)

২. আজ এই বৃষ্টির কান্না দেখে (১৯৮৬) (কথা :কাওসার আহমেদ চৌধুরী, সুর :লাকী আখান্দ, শিল্পী :নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরী)

৩. মাঝরাতে চাঁদ যদি আলো না বিলায় (১৯৮৬) (কথা :এহসান, সুর :অবসকিউর, শিল্পী :টিপু)

৪. মন শুধু মন ছুঁয়েছে (১৯৭৮) (কথা :নকিব খান, সুর :নকিব খান ও জিল্লু খান, শিল্পী :তপন চৌধুরী)

৫. এই রূপালি চাঁদে তোমারই হাত দুটি (১৯৮৩) (কথা :সৈয়দ জামান, সুর :আনিসুর রহমান তনু, শিল্পী :তপন চৌধুরী, শম্পা রেজা)

৬. নীল চাঁদোয়া নীল চাঁদোয়া (১৯৮৭) (কথা :নজরুল ইসলাম বাবু, সুর :লোকমান হাকিম, শিল্পী :শুভ্রদেব, সাবিনা আক্তার রুনা)

৭. ছিলে হূদয়ে, ছিলে ভালোবাসায় (১৯৯৪) (কথা :আহমেদ রিজভী, সুর :প্রণব ঘোষ, শিল্পী :ডলি সায়ন্তনী)

৮. পারব না গড়তে তাজমহল (১৯৯৭) (কথা :নূর হোসেন হীরা, সুর ও শিল্পী :রবি চৌধুরী) 

৯. চাঁদেরও ঈর্ষা হবে তোমায় দেখে (১৯৯৮) (কথা :মিল্টন খন্দকার, সুর :শহীদুর রহমান, শিল্পী :আরিফুল ইসলাম মিঠু)

১০. চোখের ভেতর স্বপ্ন থাকে (২০০৪) (কথা :জুলফিকার রাসেল, সুর :বাপ্পা মজুমদার, শিল্পী :হাসান আবিদুর রেজা জুয়েল, কনকচাঁপা)

১১. শহরে এসেছে এক সুরের জাদুকর (২০০৬) (কথা-সুর-শিল্পী :সানী জুবায়ের)

১২. মেঘের গায়ে নূপুর পায়ে (২০০৮) (কথা :শাহান কবন্ধ, সুর :ফুয়াদ নাসের বাবু, শিল্পী :কনা)

১৩. সোনার মেয়ে তোমায় দিলাম (২০১২) (কথা-সুর :প্রিন্স মাহমুদ, শিল্পী :তপু, ন্যান্সি)

১৪. তোমায় দেখে বেদনার নীল রঙ (২০১২) (কথা :সেজান মাহমুদ, সুর ও শিল্পী :মনিকা রশিদ)

১৫. যদি শেষ দেখায় এ হাত ধরে (২০১২) (কথা :তুষার হাসান, সুর ও শিল্পী :মিফতাহ্ জামান)  

ডা. মোহাম্মদ আরিফের লেখা ‘ঐ ঝিনুক ফোটা সাগর বেলায়’ শুনলে বা শুধু বাণীটা পড়লে কী বলবে এটা কোনো কবির রচনা নয়? জুলফিকার রাসেলের লিরিক বেশ পরিচ্ছন্ন। ছন্দ ও অন্ত্যমিলের বিষয়ে তিনি সচেতন। ‘চোখের ভেতর স্বপ্ন থাকে’ গানটায় কেমন একটা ঘোরলাগা স্বপ্ন স্বপ্ন ভাব আছে। পুরো গানটাই কাব্যিক। প্রথম অন্তরা—

আঁধারেও ওড়ে ধুলি খালি চোখে যায় না দেখা তাকে

চাঁদের আলোয় জোছনা ভাঙে তোমায় নিয়ে স্বপ্ন দেখার ফাঁকে

আঁধার ঘরে যায় না পাওয়া স্বপ্নের বুনোহাঁস

মানসম্মত গান লেখেন গোলাম মোরশেদ। জেমসের কণ্ঠে গোলাম মুর্শিদের লেখা ‘লিখতে পারি না কোনো গান’ গানটি তুমুল জনপ্রিয়তা পায়। এই গানের—‘আকাশে চাঁদ ছিল একা/পাহাড়ি ঝরনা ঝরা/তাদের মনেতে ব্যথা ছিল কি-না বুঝিনি’—কথাগুলো অনেকটা সঞ্চারীর মতো শোনায়। সঞ্চারীর ব্যবহার তো বহু আগেই উঠে গেছে। তাহলে এ গানে সঞ্চারীর মতো অংশটা কি অনিচ্ছাকৃত ভুল? বাস্তব সত্য এই যে, নতুনের ভিতরে আদি ও চিরন্তের ছোঁয়া-ছায়া থেকেই যায় এবং সেটাই স্বাভাবিক। আকাশের নিঃসঙ্গ চাঁদ, অবিরাম বয়ে চলা ঝরনার মনেও ব্যথা থাকতে পারে। কী সেই ব্যথা? বুঝতে চান গীতিকার, বোঝাতে চান শ্রোতাকেও। আসিফ ইকবালের লিরিক যুগের মতোই স্মার্ট। ওদিকে শ্রোতাদের চাহিদা মেটাচ্ছেন মিলন খান, প্রদীপ সাহা, জাহিদ আকবর, অনুরূপ আইচ, শহীদুল্লাহ ফরায়েজী। গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে কামরুজ্জামান কামু, মারজুক রাসেলের গান। মিফতাহ্ জামানের সুর ও কণ্ঠে তুষার হাসানের ‘যদি শেষ দেখায় এ হাত ধরে’ গানটি শুনে আক্ষরিক অর্থেই আবিষ্ট হয়ে পড়ি। এমন সুলিখিত গানের কবিতা বহু দিন পর পড়ার, শোনার সুযোগ হলো—

যদি শেষ দেখায় এ হাত ধরে ওই চোখ জলে ভরে

যদি বাঁচতে ইচ্ছে হয় আরও কিছুক্ষণ

তবে রেখো না অভিমান মনে অকারণ

[...] [...]

এ রাতের আকাশে নেই আজ কথা সান্ত্বনার

আগামী ভোরে আমাকে দেখবে না তুমি আর

তবু কপালের এ কালো টিপ দেখবে চেয়ে যখন

ভেবো যত দূরে থাকি, করবো স্মরণ

ভালোবাসা রয়ে যাবে আগের মতন

সময়ের দুজন গুরুত্বপূর্ণ গানের মানুষের কথা বলা হয়নি :আসিফ ও হাবিব। আসিফের কথায় আগে আসি। প্রথম অ্যালবাম ‘ও প্রিয়া তুমি কোথায়’। ৬ জানুয়ারি ২০০১-এ প্রকাশিত এই ক্যাসেট ৬০ লক্ষ কপি বিক্রি হয়েছিল বলে জানা যায়। আসিফের উত্থানের পিছনে মুখ্য ভূমিকা ছিল ইথুন বাবুর। আসিফের স্মৃতিচারণ থেকে জানা যায়, প্রথমবার আসিফের কণ্ঠ শুনেই ইথুন বাবু বলেছিলেন, ‘তোমার গলায় ফিল্মি আমেজ আছে। আমি তোমাকে এমন কিছু গান গাওয়াব, তোমাকে আর পিছনে তাকাতে হবে না।’ ইথুন বাবুর ভবিষ্যদ্বাণী এক অর্থে সত্য হয়েছে। ২০০১ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত একক অ্যালবাম তার ৩০টি। দ্বৈত ও মিশ্র অ্যালবাম মিলে গানের সংখ্যা সময়ের অনুপাতে বিশাল। এমন লাউড অথচ সুরেলা কণ্ঠ বাংলাদেশে সত্যি বিরল। ২০০৬ এর পর থেকে তার একচ্ছত্র আধিপত্যে যে আচমকা ভাটা পড়ল, তা আরেটু বিলম্বিত হতে পারত আসিফ যদি একটু রয়ে সয়ে, বেছে বেছে, ধীরে সুস্থে গান গাইতেন। গান তো গাওয়া হয়েছে প্রচুর। কালের করাল গ্রাস এড়িয়ে কয়টা গান টিকে থাকবে, সেটা মহাকালই জানে।

হাবিব বাবা ফেরদৌস ওয়াহিদের পদাঙ্ক তিনি অনুসরণ করেছেন। বাড়তি যেটা করেছেন তা হলো সংগীতায়োজনে প্রযুক্তির ব্যবহার। লোকসুরের সঙ্গে আধুনিক সুরের সম্মিলনে আমাদের সংগীতে যে সাংঘাতিক ব্যাপারটা ২০০৩ সালে ঘটেছিল কৃষ্ণ অ্যালবামে মধ্য দিয়ে, তার রেশ চলছে এখনও। ভালো মন্দ দুরকম সমালোচনাই হয়েছে। ঠিক হাবিব প্রসঙ্গে নয়; গানে অতিমাত্রায় প্রযুক্তির ব্যবহার বিষয়ে জেমস বলেছেন, ‘সবই প্লাস্টিক মিউজিক হয়ে গেছে।’ প্রতিধ্বনি করে কুমার বিশ্বজিত্ বলেছেন, ‘এগুলোকে আমি বলি মেশিননির্ভর গান। সহজ ভাষায় মেশিন গান।’ যে যা-ই বলুক, হাবিবের মিউজিকে মুন্সিয়ানা আছে মানতে হবে। দাদরা আর কাহারবা ছাড়া অন্য কোনো তালে এ সময়ে আধুনিক গান হতে পারে তাও আবার পপ ধাঁচের, সেটা হাবিব দেখালেন, গেয়ে শোনালেন। তেওড়া তালে নিবদ্ধ বৃষ্টির গান ‘একটু দাঁড়াবে কি এখনই নামবে বৃষ্টি’ শুনে অনেক সিরিয়াস শ্রোতাও মুগ্ধ হয়েছেন। এছাড়া, কণ্ঠশিল্পী ও সুরকার—একই সঙ্গে উভয় পরিচয়ে সমান প্রসিদ্ধি পেয়েছেন এমন কিছু অগ্রগণ্য নাম :নকিব খান, মাকসুদ, কুমার বিশ্বজিত্, বাপ্পা মজুমদার, এসআই টুটুল, তপু। পশ্চিমবঙ্গে ‘জীবনমুখী গান’ বলে যে বিশেষ ধারার সৃষ্টি হয় সুমনের হাত ধরে, বাংলাদেশে এ ধারার সার্থক শিল্পী সঞ্জীব চৌধুরী, হায়দার হোসেন, মাহমুদুজ্জামান বাবু, সায়ান।           

 

সাজানো জলসায় ম্রিয়মাণ এ কালের তানসেন

আমাদের দেশে উচ্চাঙ্গ সংগীতের শিল্পী যেমন হাতে গোনা, শ্রোতার সংখ্যাও তেমনই। লাইট ক্লাসিক্যালের শ্রোতা আছে। স্বাভাবিক কারণে সেসব গানের অধিকাংশ শ্রোতা বয়সে প্রবীণ। লাইট ক্লাসিক্যালের সঙ্গে আধুনিক সুরের মিশ্রণ ঘটিয়ে কীভাবে সব বয়সী শ্রোতাদের মোহিত করা যায়, দেখিয়েছেন নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরী। ওসমান শওকতের লেখা ও লাকী আখান্দের সুরে নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরীর কণ্ঠে পুনর্জীবন লাভ করল ‘কবিতায় পড়া সেই বনলতা সেন, ফিরে এলেন জীবনানন্দ দাশ’। ১৯৮৬ সালের গান এটা। একই বছর তিনি গাইলেন কাওসার আহমেদ চৌধুরীর লেখা আরেকটি গান ‘আজ এই বৃষ্টির কান্না দেখে মনে পড়লো তোমায়’। ১৯৯৫ সালের দিকে আহমেদ ইউসুফ সাবেরের কথা ও আশিকুজ্জামান টুলুর সুরে তাঁর গাওয়া ‘নিজেই নিজের কাছে গল্প বলে/কত আর সময় কাটাই’ গানটিও দারুণ জনপ্রিয় হয়। গানটির বাণী বেশ গভীর। সারাজীবন বয়ে বেড়ানো সীমাহীন ক্লান্তি যেন ভর করে আছে এতে। ‘জীবনের সন্ধ্যা চলে গেছে সেই কবে/রাতটাও বলে যাই যাই।’ দিন ফুরিয়েছে, সন্ধ্যাও চলে গেছে সেই কবে। সঙ্গী এখন রাত। কিন্তু রাতও আর সঙ্গ দিতে নারাজ। রাতটাও বলে—যাই যাই। নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরীর গাওয়া ‘কেঁদে কেঁদে কী হবে’ গানটি যে বাণিজ্যিক ধারার কোনো ছায়াছবির গান, এ তথ্য অনেকের কাছেই বিস্ময়কর মনে হয়। আনোয়ারুল করিমের কথা ও মোস্তাক আহমেদের সুরে গানটি তিনি গেয়েছিলেন ‘সুন্দরী মিস বাংলাদেশ’ (১৯৯৭) ছবিতে। তরুণ বয়সে ১৯৭০ সালের ২ এপ্রিলে ঢাকার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে অনুষ্ঠিত ‘নিখিল পাকিস্তান সংগীত সম্মেলন’-এ ওস্তাদ নাযাকত-সালামত, ওস্তাদ আমানত-ফতেহ, মেহেদী হাসান, ফরিদা খানমের তো প্রখ্যাত শিল্পীদের সঙ্গে একই মঞ্চে উচ্চাঙ্গ সংগীত পরিবেশনা করেছিলেন যিনি, সিনিয়র শিল্পীদের কাছে যিনি ‘ওস্তাদ’ হিসেবে স্বীকৃত, পরিণত বয়সে তার ‘আধুনিক গানের শিল্পী’ পরিচয়টাই যেন মুখ্য হয়ে দাঁড়াল! সাধারণ শ্রোতার কাছে বিষয়টা আনন্দদায়ক হলেও শিল্পীর নিজের কাছে সেই অনুভূতিটা কেমন?

সানী জুবায়ের এলেন ধ্রুপদী সুরের পথ ধরে, খানিকটা নিঃশব্দে। যে অ্যালবামটি তাকে শ্রোতাদের আগ্রহের কেন্দ্রে নিয়ে আসে, সেটি তার তৃতীয় উদ্যোগ। সারা নামে প্রথম অ্যালবামটি ছিল টিপিক্যাল ব্যান্ড প্যাটার্নের। দ্বিতীয় অ্যালবাম ‘আপনা খেয়াল’ উর্দু গজলের। যথাযথভাবে এটি বাজারে আসেনি। তৃতীয় অ্যালবাম নির্জন ‘স্বাক্ষর’ (২০০৩)-এর মাধ্যমে সানী জুবায়ের রাখলেন স্বকীয়তার স্বাক্ষর। কথা ও সুর শিল্পীর নিজের রচনা। তারপর এলো ‘অজস্র কবিতা’ (২০০৬)। উত্তর আধুনিক যুগে এমন কাব্যময় গান শ্রোতারা বহুকাল শুনেননি। ‘অজস্র কবিতা’ অ্যালবামের একটি গানের অংশবিশেষ উদ্ধত না করলেই নয়। গানের শিরোনাম ‘সুরের জাদুকর’ :

যার চোখে নেমে আসে যখন তখন

চির বরষায় ঢাকা মেঘের মাতন

তাকে এনে দেবে সোনা রোদের স্বপন

আরও দেবে ক্লান্তিতে বিনম্র অবসর

(শহরে এসেছে এক সুরের জাদুকর)

গজল সম্রাট মেহেদী হাসানের ইমেজ ও আমেজ নিয়ে এলেন আরিফুল ইসলাম মিঠু। সানী জুবায়েরের বেশ আগেই ১৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৮ সালে ‘তোমার দুটি নয়ন’ অ্যালবামের মাধ্যমে আবির্ভাব মিঠুর। কণ্ঠ তার কারুকার্যমণ্ডিত, সুরেলা। যেমন অভিব্যক্তি, তেমনই গায়কী। প্রথম অ্যালবামে মিল্টন খন্দকারের লেখা ও শহীদুর রহমানের সুরে মিঠুর গাওয়া ‘চাঁদেরও ঈর্ষা হবে তোমায় দেখে’ অনবদ্য গান। এ গানের একটি লাইন ‘বিধাতাও বিভোর হবে সৃষ্টি দেখে’ স্মরণ করিয়ে দেয় একটি পৌরাণিক চিত্রকল্প :ত্রিভুবনের সমস্ত সৌন্দর্যের নির্যাস নিয়ে তিল তিল যত্নে বিশ্বকর্মার যাকে তৈরি করেছিলেন, সেই তিলোত্তমার দিকে অপলক তাকিয়ে আছেন স্বয়ং ব্রহ্মা!    

 

তুমি-আমিই সব নয়, আছে বিস্তৃত জীবন—   

উত্তর প্রজন্মের গান সারাক্ষণ প্রেমের সংলাপ আওড়ায় না। কত বিচিত্র অনুভূতির প্রকাশ তাতে। পারিবারিক বন্ধনের কথা যেমন আছে, আছে শ্রেণিসংগ্রাম, বিক্ষুব্ধ প্রতিবাদ, মৃত্যুচিন্তার ছায়া। কিছু উদ্ধৃতি থেকে বিষয়টি পরিষ্কার হতে পারে। 

সেই রিকশাওয়ালা ও তার সখিনার অন্তহীন শ্রেণি সংগ্রাম—

ও সখিনা গেছস কিনা ভুইলা আমারে

আমি অহন রিশ্কা চালাই ঢাহা শহরে

সে বার বানে সোনাফলা মাঠ হইল ছারখার

দেশ গেরামে শেষে নামে আকাল হাহাকার

আমরা মরি কী আসে যায়

মহাজনে পাওনাটা চায়

বেবাক ফসল তুইলা দিলাম 

আমরা তাগোর খামারে

(কথা :আলতাফ আলী হাসু)

মায়ের জন্য চিত্কার করে কান্না—

দশ মাস দশ দিন করে গর্ভে ধারণ

কষ্টের তীব্রতায় করেছে আমায় লালন

হঠাত্ কোথায় না বলে হারিয়ে গেল

জন্মান্তরের বাঁধন কোথা হারালো

সবাই বলে ঐ আকাশে লুকিয়ে আছে

খুঁজে দেখো পাবে দূর নক্ষত্র মাঝে।

(কথা :প্রিন্স মাহমুদ)

মনে পড়ে মায়ের কথা, গাঁয়ের কথা—

কত দিন দেহি না মায়ের মুখ

শুনি না সেই কোকিল নামের কালা পাহির গান

হায় হায় রে পরান (কথা :নূরুজ্জামান শেখ)

শুধু কি গ্রাম, শহর ছেড়ে যারা পড়ে আছে বিদেশ-বিভূঁইয়ে, তাদের কষ্টটাও কি কম?

কবে যাব ফিরে—

বুড়িগঙ্গার তীরে আমার শীতলক্ষ্যার তীরে

সাঁতার কেটে করব গোসল ঘোলা ঘোলা নীরে

(ব্যান্ড :ভাইব)

এত রক্ত ঝরল। স্বাধীনতার ‘তিরিশ বছর পরেও’ তবু কেন খুঁজতে হয় স্বাধীনতা?—

আজ নেই বর্গি, নেই ইংরেজ নেই পাকিস্তানি হানাদার

আজ তবু কেন আমার মনে শূন্যতা আর হাহাকার

আজ তবু কি লাখ শহীদের রক্ত যাবে বৃথা,

আজ তবু কি ভুলতে বসেছি স্বাধীনতার ইতিকথা

(কথা :হায়দার হোসেন)

 

হঠাত্ ডেকে ওঠে নাম না-জানা পাখি। জীবন ফুরালো নাকি!

এমনি করে সবাই যাবে যেতে হবে

দেহের মাপের মাটির ঘরে শুতে হবে

কেউ যাবে না তখন সাথে যারা ছিল দিনে রাতে

চোখের আলোর ঝাড়বাতিটা নিভিয়ে দেবে

(কথা :কাজী রোজি)

অতি সম্প্রতি যারা গান লিখছেন, যে কোনো অর্থেই তাদের পড়াশোনা অল্প বলে মনে হয়। এত ক্ষুদ্র শব্দভাণ্ডার নিয়ে তারা গানের পর গান লিখে যাচ্ছেন! হিন্দি-উর্দু গানে ‘তু’ এবং ‘আপ্’ স্বাভাবিক শোনায়। আধুনিক বাংলা গানে আপনির উপযুক্ত ব্যবহার বিরল। ‘তুই’-এর অল্প বিস্তর ব্যবহার আগে থেকেই ছিল। কিন্তু ইদানীংকালের গানে ‘তুই’ সম্বোধনটার যথেচ্ছ ব্যবহার প্রায় ‘তুই-তোকারি’র পর্যায়ে নেমে গেছে। আরেকটা বিষয় ভাবায় :নগর বাউল জেমসের এত ‘হিট’ গানের গীতিকার দেহলভী এখন এতটা নীরব কেন? ‘ইত্যাদি’খ্যাত আকবর এখন কোথায়, পথিক নবীর কী হলো, মুরাদ কি এখনো আগের ঠিকানাতেই আছেন? জবাবে নীরব থাকা ছাড়া গত্যন্তর নেই।

 

উত্তর প্রজন্মের উত্তর প্রজন্ম

পাঁচ বছরের একজন শিশুও আগ্রহ ভরে শোনাতে চায় ওর তিন বছর বয়সের ‘ফেলে আসা দিনগুলো’র কথা। সোনালি যুগের গান তো আমাদের নস্টালজিক করবেই। এই মুগ্ধতা চিরকালের। কিন্তু ড্রামস-গিটারের ক্ষিপ্র বাদনের ভিতর দিয়েও তো মানসম্মত কিছু গান তৈরি হয়েছে। সেগুলো কেন অপাঙক্তেয় থেকে যাবে জ্ঞানী আর গুণীদের আসরে? আমরা চেষ্টা করেছি চেষ্টা করেছি সেই সব আশ্চর্য লিরিক, একই সঙ্গে সেইসব গানের স্রষ্টাদের প্রসঙ্গ তলে আনার। লিখতে গিয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্যসূত্রের বড় অভাব বোধ করেছি। সে কারণেই অনেক গীতিকার সুরকার ও শিল্পীদের নামই অনুক্ত থেকে গেল। সংগীতব্যক্তিরা যদি নিজেদের কথা লিখে যেতেন বই আকারে, ভালো হতো। অতীতের স্মরণীয় শিল্পীই আত্মস্মৃতি/আত্মজীবনী লিখেছেন। বাংলাদেশে এই প্রবণতা কম। কনকচাঁপা লিখেছেন স্থবির যাযাবর। নব্বই দশকের জনপ্রিয় শিল্পী সাহেদের আত্মস্মৃতির শিরোনাম ‘আত্মজীবনী লেখা যায় না’। আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল লিখতে শুরু করেছেন জীবনের কথা। মোহাম্মদ রফিকউজ্জামানও লিখেছেন বিভিন্ন প্রবন্ধে নিবন্ধে। আত্মস্মৃতি ও সংগীতভাবনা প্রকাশিত হয়েছে ফজল-এ-খোদার কয়েকটি বই। এই চর্চাটা বাড়ুক।

কোথায় হারালেন মিকি মান্নান, নাফিস কামাল! ঝিনুক সংগীতজগত্ ছেড়ে দিলেন ভালো করে গান গাওয়া শুরু করার আগেই। আশা জাগিয়েই উধাও মাহাদী। হ্যাপী-ইশতিয়াক-জুয়েল-মিলু-সঞ্জীবের মতো শিল্পীরা যদি অকাল প্রয়াত না হতেন! সাবিনা ইয়াসমীন-রুনা লায়লাকে প্রতিস্থাপন করার মতো শিল্পী এখনও আসেননি। তবে ন্যান্সী ও কনার কণ্ঠ শুনে, আশান্বিত হতে ইচ্ছে করে। কিন্তু একজন আদর্শ গীতিকবির আবির্ভাবে আশ্বস্ত হতে আরও সময় লাগবে মনে হচ্ছে। d

 

 

 

 

 

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
২১ জুন, ২০১৮ ইং
ফজর৩:৪৩
যোহর১২:০০
আসর৪:৪০
মাগরিব৬:৫১
এশা৮:১৬
সূর্যোদয় - ৫:১১সূর্যাস্ত - ০৬:৪৬
পড়ুন