গল্প
যোদ্ধা
মাহমুদা সুলতানা২১ জুন, ২০১৭ ইং
যোদ্ধা
ধলপহরে ঘুম থেকে ওঠা রাহেলার চিরদিনের অভ্যেস। সেই ছেলেবেলা থেকেই এই অভ্যেসটা গড়ে উঠেছে। সেই কৈশোরে বিছানা থেকে উঠে পড়ত রাহেলা। মার সঙ্গেই উঠত। নামাজ পড়ার প্রস্তুতি নিয়ে মা ব্যস্ত হতেন। রাহেলা ছুটত উঠোনে। শিউলিগাছ তলায়। উঠোন ভরা শিউলি ফুল। কী অপরূপ দৃশ্য। ডালাভরে ফুল কুড়াত রাহেলা। তারপর শুরু হতো মালা গাঁথার পাট। মালা গাঁথা সাঙ্গ করে তবেই রাহেলার অন্য কাজ। বড় বোন রেহানা পড়তে বসত। রাহেলাকেও ডাকত। ছোটভাই দুটো তখনো ঘুমে।

এখনো এই বৃদ্ধ বয়সেও ঘুম থেকে উঠে পড়ে। অবশ্যই ধলপহরে। আজকাল ভালো ঘুম হয় না। স্মৃতি রোমন্থনে আপ্লুত হয়ে পড়ে রাহেলা। স্বামী আনসারের মৃত্যুর পর আরও স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েছে রাহেলা। বড় বোন রেহানার বিয়ের পর বোন চলে গেল স্বামীর কর্মস্থল ঢাকায়। রাহেলা তখন ক্লাস টেনের ছাত্রী। একদিন ঢাকা যাওয়ার সুযোগ এলো। মামাতো ভাই আরিফের সঙ্গে ঢাকায় এলো। সঙ্গে ছোট ভাই জাকির। রেহানা ওদের দেখে অবাক। তখন উত্তাল মার্চ মাস, ১৯৭১ সাল। রেসকোর্স মাঠে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ হবে। রাহেলা জেদ ধরল সেও ভাষণ শুনতে যাবে। সবার আপত্তির মুখেও অবশেষে রাহেলার জেদই হলো জয়ী। সেই বিশাল জনসমুদ্রে ভাষণ শুনতে এলো রাহেলা। সাতই মার্চের ভাষণ শুনে রাহেলা একেবারে অভিভূত। বাসায় ফিরেও রাহেলার ঘোর কাটে না। রাহেলা সারাদিন গুনগুন করে—এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।

ক’দিন পর গ্রাম সুখীপুরে ফিরে এলো রাহেলা। এখন রাহেলা যেন অন্যমানুষ। অনেক বড় হয়ে গেছে যেন। এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে মুক্তিযুদ্ধ। গ্রামের অনেক ছেলেই চলে গেছে সীমান্ত পার হয়ে। পরশুদিন যাবে আরিফ ভাইদের একটা দল। এবার আরও কঠিন জেদ ধরল রাহেলা। সেও যুদ্ধে যাবে। সবাই অবাক। মা তো রেগে অস্থির। মেয়ের কথা শুনে মায়ের অবস্থা অনেকটা পাগলের মতো। এক কথায় ‘না’ করে দিলেন মা। রাহেলা নাছোড়বান্দা। তার একটাই কথা—ছেলেরা যুদ্ধ করতে পারলে মেয়েরা কেন পারবে না? তারা কি দেশের নাগরিক নয়? সেও তো দেশের স্বাধীনতা চায়। আরিফ অনেক বোঝাল, দ্যাখ ঘরে থেকেও যুদ্ধ করা যায়। সবার যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ার দরকার নেই। রাহেলার স্পষ্ট কথা, ‘আমার দরকার আছে।’

বাবা তখন না-ফেরার দেশে। মা যেন রাহেলাকে বাধা দেওয়ার শক্তি হারিয়ে ফেলেছেন। এখন মা করছেন কান্নাকাটি। অবশেষে আরিফকে রাজি হতেই হলো। এরমধ্যে সুখীপুরে মিলিটারি ক্যাম্প হয়েছে। রাজাকাররা সানন্দে সারা গ্রাম টহল দিচ্ছে। নানারকম অপকর্ম করে বেড়াচ্ছে। যেন এখন চলছে ওদের রাজত্ব।

অনেক কষ্ট সহ্য করে রাহেলারা অবশেষে সীমান্ত পার হলো। ওদের গ্রামের বাদল ভাই-টুলু ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হলো। রাহেলাকে দেখে ওরাও খুব আশ্চর্য হলো। বাদল বলল, ‘কী রে রাহেলা তোর তো খুব সাহস।’ রাহেলা হাসল। উত্তর দিল দৃপ্ত ভঙ্গিতে, ‘সাহস বুঝি শুধু তোমাদেরই আছে? আমরাও সব পারি।’ মুক্তিযোদ্ধাদের দু-একটা ক্যাম্পও চোখে পড়ল। রাহেলা রীতিমতো শিহরিত।

রাহেলা এখন ট্রেনিংকেন্দ্রে। আরও তিনটি মেয়ের সঙ্গে দেখা হলো রাহেলার। রাহেলার মনোবল বেড়ে গেল। আরিফ লক্ষ করল রাহেলার সবকিছুই ঠিক আছে, শুধু ভারী বন্দুক তুলতে বেশ কষ্ট হচ্ছে রাহেলার। আরিফ চিন্তিত হলো। ওদের কমান্ডারের সঙ্গে কথা বলল আরিফ। তিনি বললেন, ‘দেখি কী করা যায়। মেয়েটি তো খুব সাহসী। এখন শুরু হয়ে গেছে জনযুদ্ধ।’

ওদের ক্যাম্প থেকে বেশ দূরে দুটি নার্সিংকেন্দ্র স্থাপিত হয়েছে। আহত মুক্তিযোদ্ধাদের ওখানে আনা হচ্ছে। রাহেলাকে ওখানে নিয়ে এলো আরিফ। একজন মাত্র ডাক্তার আর দুজন নার্স ওখানে কাজ করছেন। আরিফ বলল, ‘তুই এখানে কাজ কর রাহেলা। মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা করবি। খুব মহত্ কাজ।’ একটু ভেবে রাহেলা রাজি হয়ে গেল। ডাক্তার সাহেব রাহেলাকে ট্রেনিং নিতে সাহায্য করলেন। রাহেলা খুব চটপটে মেয়ে। নার্সের কাজ মোটামুটি শিখে ফেলল রাহেলা। ডাক্তার বললেন, ‘মনে রেখো, তুমিও একজন মুক্তিযোদ্ধা।’ একদিন আরিফ এলো। রাহেলার প্রশংসা শুনে খুশি হলো আরিফ। বলল, ‘রাহেলা আমি অন্য সেক্টরে চলে যাচ্ছি। ক’দিন পরই বড় একটা অপারেশন আছে।’ রাহেলা বলল, ‘তুমি নিশ্চিন্তে যাও আরিফ ভাই।’

রাহেলার কাজে সবাই মুগ্ধ। অনেক যত্ন নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা করে রাহেলা। এই কাজে আত্মতৃপ্তি আছে। সবই ভালো লাগে রাহেলার। শুধু মাঝে মাঝে মন খারাপ হয়। চারদিকে এখন ভয়ংকর যুদ্ধ চলছে। বাদল ভাইরা কে যে কোথায় যুদ্ধ করছে। ওরা ভালো আছে তো? হঠাত্ করে একদিন শহিদ ভাই এসে হাজির। এখানে রাহেলাকে দেখে অবাক হলো। খুশিও হলো। যাওয়ার সময় শহিদ ভাই অনেক সান্ত্বনা দিয়ে গেল। বলল, ‘সবসময় মনে সাহস রাখবি। তুই একজন মুক্তিযোদ্ধা। শুধু চোখ-কান খোলা রেখে চলবি। ভাবিস না রাহেলা, জয় আমাদের হবেই।’ সে কথা জানে রাহেলা। তার আত্মবিশ্বাস প্রবল। মাঝে মাঝে মায়ের কথা আর ছোটভাই দুটোর কথা মনে পড়ে।

ভালো খবর খারাপ খবর দুটোই কানে আসে। একদিন খবর পেল সুখীপুর গ্রামের বেশ কিছু ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছে মিলিটারিরা। বেশ কিছু মানুষও মারা গেছে। আত্মবিশ্বাস হারায় না রাহেলা। সে শুধু দিন গোনে কবে আসবে স্বাধীনতা? সবাই বিজয় পতাকা নিয়ে মিছিল করবে। আনন্দে আত্মহারা হয়ে গাইবে বিজয়ের গান। দেশে আসবে শান্তি, স্বস্তি। মিলিটারিরা সব ধ্বংস হবে। রাজাকাররা নির্মূল হবে।

 

ওদিকে সুখীপুর গ্রামে রাহেলার মায়ের দিন কাটে অশান্তিতে, নির্ঘুম কাটে রাত। রাতে একটু শব্দ হলেই চমকে ওঠেন রাহেলার মা। শেয়ালের ডাক মনে হয় বাঘের ডাক। ক’মাস হলো ঢাকা থেকে রেহানাও চলে এসেছে। কোলে দু’বছরের ছেলে। স্বামী আশফাক যুদ্ধে চলে গেছে। হঠাত্ এক গভীর রাতে এলো মারুফরা। সাত-আট জন। অনেকদিন পর ওদের কাছে পেল রাহেলার খবর। মারুফ বলল, ‘জানিস রেহানা, রাহেলা এখন পুরোদস্তুর একজন নার্স। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে হাসপাতালে যোগ দিয়েছে। ভালো কাজ করছে।’ রাহেলার মা কেঁদে আকুল। রেহানা বলল, ‘আঃ মা কাঁদছ কেন? রাহেলা তো ভালো আছে।’

রেহানা মারুফদের জন্য রান্না বসিয়েছে। খিচুড়ি আর ডিম ভাজি। বেশি সময় নেই। তাড়াহুড়া করে খেয়ে মারুফরা বিদায় নিল। যাওয়ার সময় বলে গেল, ‘খালাম্মা, চিন্তা করবেন না। শত্রুদের ধ্বংস হওয়ার সময় ঘনিয়ে এলো বলে।’ নীরা-বীণাদের খবর শুনে মারুফরা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হলো। রাজাকারদের অত্যাচারে মেয়েদের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। পরশুদিন পাওয়া গেছে বীণার লাশ। ক্ষত-বিক্ষত লাশটা পড়েছিল ধানক্ষেতে। মারুফরা আশ্বাসের সুরে বলে, ‘ত্যাগ-তিতিক্ষা ছাড়া কি আর বিজয় আসবে?’ রেহানা ওদের গমনপথের দিকে তাকিয়ে থাকে একদৃষ্টে।

দেশ স্বাধীন হয়েছে। বিজয় পতাকা উড়ছে। রাহেলাকে পেয়ে সবাই খুব খুশি এবং গর্বিত। রেহানার স্বামী ফেরেনি। বাদল ফেরেনি। আরও কতজন যে নিখোঁজ তার হিসাব নেই। তবু আনন্দের সীমা নেই। স্বাধীনতা এসেছে। লাল-সবুজের পতাকা দেখে ছোট বাচ্চা ছেলেমেয়েরা হেসে ওঠে খিলখিল করে। শুধু রেহানাবুবুর দিকে তাকাতে খুব কষ্ট হয় রাহেলার। সুন্দর মুখটা বিপদে ম্লান হয়ে থাকে। মা আরও ভেঙে পড়েছেন। মেয়ের অকাল বৈধব্য সহ্য করা খুব কঠিন।

দিন তো থেমে থাকে না। সময় চলে আপন গতিতে। রাহেলা ম্যাট্রিক পাস করে কলেজে ভর্তি হয়েছে। মায়ের শরীর ভালো যাচ্ছে না। রাহেলার বিয়ের জন্য খুব তোড়জোড় শুরু করলেন মা। রাহেলার খুব মন খারাপ। যদিও তার পছন্দের আনসার ভাইয়ের সঙ্গেই বিয়ে ঠিক হয়ে আছে। আনসারও একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। রেহানাই অনেক অনুরোধ করে রাহেলাকে রাজি করাল। রাহেলার ইচ্ছা ছিল ইন্টারমিডিয়েট পাস করে তবেই বিয়ের কথা ভাববে। আনসার বাড়িতে এসে বলে গেল, ‘রাহেলা পড়াশোনার জন্য চিন্তা করিস না। আমি দেখব। আমার তাড়া ছিল না। খালাম্মার জন্য রাজি হয়েছি।’ এবার একটু লজ্জিত হলো রাহেলা। 

 

পাশের গ্রামের ছেলে আনসার। অবশেষে বিয়েটা হয়ে গেল অনাড়ম্বরভাবে। রেহানাবুর জন্য কোনো অনুষ্ঠান করতে রাজি হলো না রাহেলা। শ্বশুরবাড়িতে  চলে এলো রাহেলা। শ্বশুর নেই। শাশুড়ি খুব ভালো মানুষ। উনি সবার কাছে গর্ব করে বলেন, আমার ছেলে ও ছেলেবৌ দুজনেই মুক্তিযোদ্ধা। সবাই হাসে। আত্মীয়স্বজনরা পুলকিত বোধ করে। আনসার তার কথা রেখেছে। কলেজের পড়া সুন্দরভাবেই চালিয়ে যাচ্ছে রাহেলা। সংসারও থেমে নেই। এরই মধ্যে রাহেলার মা চলে গেলেন না-ফেরার দেশে। সব দায়িত্ব এখন রেহানাবুর। ভাই দুটো এখনো তেমন বড় হয়নি।

বিয়ের পর জীবনের নিয়ম-রীতিগুলো বেশ কিছু বদলেছে। কিন্তু একটা জিনিস বদলায়নি। খুব ভোরে উঠে শিউলি ফুল কুড়ানো। যুদ্ধের ক’টা মাস ফুল কুড়াতে পারেনি রাহেলা। সেজন্য কোনো ভাবনা নেই। বাবার বাড়িতে একটা সুন্দর ডালা ছিল রাহেলার। এখানে সে ডালা নেই। কিন্তু রান্নাঘরে ঢুকে একটা ডালা জোগাড় করে নিল রাহেলা। আনসার জিজ্ঞেস করল, ‘ডালা দিয়ে কী হবে?’ রাহেলা উত্তর দিল, ‘সকালে উঠে তোমায় দেখাব।’ আনসার একটু বেলা করে ওঠে। উঠে দেখল টেবিলে ডালা ভরা শিউলি ফুল। পাশে ফুলের মালা। আনসার উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলল, ‘বাহ!’ রাহেলা মিষ্টি হেসে বলল, ‘আমার ভাগ্যটা খুব ভালো, এখানেও শিউলি ফুল পেলাম।’

অনেকটা বছর পার হয়ে গেছে। আনসারও চলে গেছে ক’মাস আগে। রেখে গেছে ভরা সংসার। দুটি ছেলে আর একটি মেয়ে। মেয়ের বিয়েটা আনসারই দিয়ে গেছে। রাহেলা ভাবে, ছেলে দুটির বিয়ে তাকেই দিতে হবে। বড় ছেলের জন্যে পাত্রীও জোগাড় হয়। তাদের গ্রাম এখন উপজেলা হয়েছে। অনেক উন্নত হয়েছে সেই ফুলতলি গ্রাম। বড় ছেলে এমএ পাস করে এখানকার একটা ব্যাংকে কাজ করছে। বড় ছেলের বিয়েটাও হয়ে যায়। ছোট ছেলের পড়া এখনো শেষ হয়নি।

রাহেলা ভাবে, সেই ছেলেবেলার সুখীপুর গ্রাম আর কিছুদিন আগেকার ফুলতলি গ্রামের মধ্যে অনেক তফাত। স্মৃতিবিজড়িত সেই গ্রামের মায়াময় রূপের কথা এখনো মন কাড়ে রাহেলার। অজস্র পাখির কলতান, হাজারো গাছগাছালির অপরূপ দৃশ্য—সবই এখন হারানোর পথে। এক ধরনের কষ্ট আর ব্যথা নিয়ে অনেক কথাই মনে পড়ে রাহেলার। ইছামতি নদীর পাড়ে দীর্ঘসময় নিয়ে সময় কাটানোর স্মৃতিটাও বড় বেশি উজ্জ্বল। আনসারের কথা খুব মনে পড়ে। বড় ভালোমানুষ ছিল। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে রাহেলাকে খুব সম্মান করত, ভালোবাসত।

হঠাত্ করেই ছোট ছেলের বিয়েটাও হয়ে গেল। মেয়েটি ছোট ছেলের পছন্দের। অনেকটাই নিশ্চিন্ত বোধ করল রাহেলা। বাজারে দুটো কাপড়ের দোকান করে গেছে আনসার। চাকরি পাওয়া সত্ত্বেও বাবার ইচ্ছানুযায়ী দোকান দুটোর দায়িত্ব ভার নিল ছোট ছেলে। দোকান ভালোই চলছিল। কিন্তু সমস্যা বাঁধল এখানে। অর্থাত্ দোকানদার হওয়াটা ছোট বৌমার মোটেই পছন্দ নয়। সে প্রচণ্ড আপত্তি জানাল। ছোট ছেলেকে চাকরি করতে হবে। রাহেলার কাছে নালিশ পর্যন্ত এলো। রাহেলা বোঝাল, ‘দেখো স্বাধীন ব্যবসা করা তো খারাপ কিছু নয়। বরং আত্মমর্যাদা বাড়ে।’ কাজ হলো না। অশান্তি বাড়ল। শুরু হয়ে গেল খিটিমিটি। তারপর কথায় কথায় ঝগড়া। রাহেলার কানে সবই পৌঁছায়। ওদিকে বড় বৌমাও শুরু করল তর্ক-বিতর্ক। তার প্রধান আপত্তি—তাকে তিনবেলা রান্না করতে কেন হবে? ছোট বৌমা রান্নাঘরের দিকে যেতে আগ্রহী নয়। রাহেলার মনে হলো যুদ্ধক্ষেত্রের কথা। তার ঘরেই এখন যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। সে শুয়ে-বসেই গ্রেনেডের গন্ধ পাচ্ছে। বন্দুকের আওয়াজ পাচ্ছে। একদিন ননদ রীনা এসে হাজির। তার বাড়িও কাছেই। তখন দুই বৌমা তারস্বরে চিত্কার করছে। রিনা রাহেলার কাছে এসে বলল, ‘ভাবি কী ব্যাপার? এভাবেই চলছে নাকি? তোর বাড়িতে তো কাকপক্ষীও বসবে না।’ রাহেলা মৃদু গলায় বলল, ‘আর বলিস না। এভাবেই চলছে। রীতিমতো যুদ্ধক্ষেত্র।’ হেসে ফেলল রাহেলা। রিনাও হাসল। রিনার সঙ্গে কথা বলতে ভালোই লাগছিল রাহেলার। দু’বান্ধবী ওরা। একাকীত্ব কিছুটা ঘুচল।

রাহেলার শরীর আজকাল ভালো যাচ্ছে না। বয়স তো কম হলো না। শরীরের কী দোষ। ছেলেরা রোজই এসে মায়ের সঙ্গে দেখা করে যায়। বসে কিছুক্ষণ গল্প করে। বৌমারাও আসে। এতেই খুশি রাহেলা। মাঝে মাঝে শরীর একটু ভালো লাগলে উঠোনে আসে রাহেলা। কিছুক্ষণ পায়চারী করে। চেয়ারে কিছুক্ষণ বসে। সেই অতি পরিচিত উঠোন, ঘরবাড়ি। সব কি আগের মতো আছে? নিজেকেই প্রশ্ন করে রাহেলা।

 

বিজয়ের মাস শুরু হয়েছে। সামনে বিজয় দিবস। হাজারো স্মৃতির মাঝে আবর্তিত হয় রাহেলা। হারিয়ে যায় ফেলে আসা দিনগুলোর মাঝে। অনেক ছেলে আসে একদিন। বড় ছেলে মাকে এসে বলে, ‘তোমার সঙ্গে সাজেদ চাচারা দেখা করতে এসেছে।’ ছেলের সঙ্গে বসার ঘরে আসে রাহেলা। সবই পরিচিত মুখ, দু-চার জন অপরিচিত। মঈন বলে, ‘খালা, আগামীকাল বিজয় দিবস। আপনাকে আমরা সংবর্ধনা দেব ঠিক করেছি।’ হাসে রাহেলা, ‘বাবা তোমরা তো আমাকে আগেও অনেক সম্মান জানিয়েছ। আর কি দরকার আছে?’ সবাই বলে, ‘আছে খালাম্মা, অবশ্যই আছে। আপনারাই তো দেশের গর্ব, অহংকার। বাদল চাচা তো নেই। শরীফ চাচাও চলে গেলেন।’ রাহেলা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, ‘হ্যাঁ, সবাইকেই চলে যেতে হবে। আমারও তো সময় হলো যাওয়ার।’ রাহেলা স্পষ্ট দেখতে পায়, স্বামী এবং মুক্তিযোদ্ধা আনসার এসে কাছে দাঁড়িয়েছে। মুগ্ধ গলায় বলে, ‘রাহেলা, তুমি বারবার সম্মানিত হবে। তুমি যে একজন যোদ্ধা।’ ফিসফিস করে দৃঢ় গলায় বলে রাহেলা, ‘ঠিক বলেছ। ঘরে বাইরে সর্বত্রই আমি একজন যোদ্ধা। আমি অনেক ভেবে দেখেছি জীবনের যুদ্ধ থামে না। নিরন্তর চলে এর কর্মকাণ্ড।’ d

 

 

 

 

 

 

 

এই পাতার আরো খবর -
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
২১ জুন, ২০১৮ ইং
ফজর৩:৪৩
যোহর১২:০০
আসর৪:৪০
মাগরিব৬:৫১
এশা৮:১৬
সূর্যোদয় - ৫:১১সূর্যাস্ত - ০৬:৪৬
পড়ুন