ভ্রমণ
স্কাইলাইন ড্রাইভ ও ওল্ডর্যাগ মাউন্টেন
মঈনুস সুলতান২১ জুন, ২০১৭ ইং
স্কাইলাইন ড্রাইভ ও ওল্ডর্যাগ মাউন্টেন
এক.

শ্যানানডোয়া ন্যাশনাল পার্কের সবুজ বানানীতে ধূসর বর্ণের শ্যাওলা মাখানো বিশাল সব পাথরের সংখ্যা অঢেল। তাদের একটির ওপর বসে আমার শরীর ছুঁয়ে চারদিকে চাদরের মতো উড়ে যাওয়া কুয়াশার দিকে তাকাই। আমার ক্রস করে রাখা দু’পায়ের ওপর ছড়ানো হাইকিং ম্যাপ ও ছোট্ট একটি কম্পাস। আমি বসে আছি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে কমসে কম হাজার তিনেক ফুট ওপরে। ওয়াশিংটন ডিসি’র পশ্চিম দিকে ব্লুরিজ মাউন্টেনের ভেতর এক লক্ষ ছিয়ানব্বই হাজার একরের ভালুক চরা তীব্র উয়িল্ডারনেস নিয়ে শ্যানানডোয়া ন্যাশনাল পার্কের বিস্তার। এখানে পর্যটক ও হাইকাররা হরহামেশা এসে থাকে—দিগন্তে লেগে থাকা বনানীর নীলাভ রেখায় শুভ্র মেঘের তৈরি হওয়া দেখতে। এ মুহূর্তে আমার চারপাশে কারা যেন অদৃশ্য ধুনি জ্বেলে গরুর বাথানে মশা তাড়াচ্ছে। এ ধোঁয়াচ্ছন্নতার ভেতর বসে থেকে আমি আর্দ্র কুয়াশা সূর্যস্নাত বাতাসে উবে যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করি। ল্যান্ডমার্কগুলো পরিষ্কারভাবে দৃশ্যমান না হওয়া অব্দি ওল্ডর্যাগ মাউন্টেনের দিকে হাইকিংয়ের বউনি করা যাচ্ছে না।

মেঘের মৃদু ধোঁয়া বারবার অদৃশ্য বাতাসে উড়ে এসে আমাকে চাদরের মতো প্যাঁচিয়ে ধরে। শীতে অল্পবিস্তর কাঁপতে কাঁপতে দেখি আশপাশে জঙ্গল দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। বেশ কয়েক জোড়া কাঠঠোকরা খুটখুট করে খোঁড়ল বানাচ্ছে গাছের ডালে। আমি পাথরের ওপর দাঁড়িয়ে পড়ে তাদের তালাশে এদিক-ওদিক তাকাই। একটি ওক গাছের আধশুকনা ডালের খোঁড়ল থেকে ঠোঁট ফাঁক করে তীব্র স্বরে ডেকে ওঠে দুটি শাবক। সাদাকালোর ওপর মাথাতে লাল পালকের ঝিলিক পেড়ে কুয়াশা কেটে উড়ে আসে মা কাঠঠোকরা। সে তার গলা থেকে খাবার বের করে বাচ্চাদের দিতে শুরু করলে আমিও ব্র্যাকফাস্ট সেরে নেয়ার কথা ভাবি।

আমি এ মুহূর্তে ওল্ডর্যাগ মাউন্টেনের সামিট অব্দি ডে-হাইক করার প্রস্তুতি নিয়ে বেরিয়েছি। আমার সাথে খাবার কিছু আছে বটে, তবে তা পর্যাপ্ত নয়। আমি আরো দিন কয়েক শ্যানানডোয়ার গভীর বনানীতে ব্যাককান্ট্রি ক্যাম্পিং করে কাটাব। খাবারের সীমিত সাপ্লাই আমার মূলধন। সুতরাং, খাবার ব্যবহার করতে হবে খুবই কৃপণভাবে। আমি সাতপাঁচ ভেবে খানিক অউটমিল, চীনা বাদাম ও কিসমিসে তৈরি শুকনা গ্রোনলা-বার চিবাই।

ব্যাককান্ট্রি ক্যাম্পিংয়ের বিষয়টি সচরাচর একটি জঙ্গলে তাঁবু খাঁটিয়ে ক্যাম্পিং করা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। গড়পড়তা ক্যাম্পিংয়ে আমেরিকার বনজঙ্গলময় পার্কগুলোতে তাঁবু ফেলার জন্য নির্দিষ্ট ক্যাম্প-গ্রাউন্ড আছে। ওখানে বাথরুম ব্যবহারের বন্দোবস্ত ও ক্ষেত্রবিশেষে ক্যাম্প-স্টোরস-এ শুকনা খাবার-দাবার ও ক্যাম্প-ফায়ারের জন্য কাঠ কেনার ব্যবস্থা আছে। ব্যাককান্ট্রি ক্যাম্পিংয়ে হাইকার বা ট্র্যাকাররা তাঁবু খাটায় গভীর জঙ্গলের ভেতর। সচরাচর বনানীর অত্যন্ত ভেতর-মহলে ঢুকে যেতে হয় ট্র্যাকিং করে। ওখানে কোনো ফেসিলিটি নেই। অসুখবিসুখ, ভালুকের আক্রমণ, সর্পাঘাত বা অন্য কোনো ইমার্জেন্সিতে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে রেসকিউ করতে ছুটে আসে না পার্ক রেঞ্জার। ব্যাককান্ট্রি ক্যাম্পিংয়ের নিয়ম-কানুনের মধ্যে একটি হচ্ছে—রান্না করলে খাবার দড়ি দিয়ে গাছের অনেক ওপরে ঝুলিয়ে রাখতে হয়; যাতে গন্ধে ভালুক তাঁবুর ভেতরে ঢুকে না পড়ে। আর পরিবেশের বিশুদ্ধতা রক্ষার জন্য শরীরের বর্জ্য  খন্তা দিয়ে গর্ত খুঁড়ে পুঁতে ফেলতে হয়।

গতকাল জঙ্গলের ভেতর দিয়ে ট্র্যাকিং করে পছন্দমতো ব্যাককান্ট্রি ক্যাম্পিংয়ের সাইট খুঁজে পেতে সন্ধ্যা হয়ে আসে। স্কাইলাইন ড্রাইভের প্রান্ত থেকে একটি সরোবরের রুপালি জলকে নিশানা করে আমি ট্র্যাকিং শুরু করি। কিন্তু গাছপালার ভেতর দিয়ে গভীরে ঢুকে যাওয়ার পর সরোবরের রেখা সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয়ে যায়। তারপর কম্পাসের ওপর ভরসা করে, বাঁয়ে ওল্ডর্যাগ মাউন্টেনের সামিটকে নজরে রেখে একটি সাইটে এসে পৌঁছাই। বারবার মাথার ওপর দিয়ে কানাডিয়ান গিজ বলে হাঁসের ঝাঁক উড়ে গেলে আন্দাজ করি আমি হ্রদের কাছেই এসেছি। কোনোক্রমে তাঁবু খাটানোর পর পাখিদের কলঙ কলঙ ডাকে বুঝতে পারি জলাশয়ের কাছেই আছি। ট্র্যাকিং করার ফলে শরীরে ক্লান্তি ছিল প্রচুর। উপরন্তু, ফার্ন ও ঝোপঝাড় মাড়িয়ে এসেছি বলে মোজার ভেতর ডিয়ার-টিক বলে একধরনের পোকা চামড়ায় খামচে বসেছে। ডিয়ার-টিকের কামড়ে লাইম ডিজিজ হয়। সুতরাং সারা শরীর চেক করে ডিয়ার টিক-কে টিপে মেরে ফেলে চমড়ায় দিয়াশলাইয়ের পোড়া কাঠি দিয়ে ছ্যাঁকা দেই। তাই, এসব ঝামেলায় রাতে খাবার-দাবার সুসার করে উঠতে পারিনি। ভেবেছিলাম খুব ভোরে উঠে হ্রদের পাড়ে গিয়ে জোগাড় করব কানাডিয়ান গিজের ডিম। কিন্তু কুয়াশা কেটে ওদিকে যেতে উত্সাহ পাই না।

গতকাল বার্ক লেইক থেকে শ্যানানডোয়াতে হিচ-হাইক করে আসতেও ঝামেলা হলো বেশ। প্রায় পঁচিশ-ত্রিশ পাউন্ডের সাপ্লাই ব্যাকপ্যাকে ভরে সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে বৃদ্ধাঙ্গুলি ঊর্ধ্বে তুলে হিচ-হাইকে লিফ্ট পাওয়ার চেষ্টা করি। আমার দীর্ঘ চুল ও অগোছালো দাড়ি অথবা বাদামি গাত্র বর্ণের জন্য কেউ আমাকে লিফ্ট দিতে চায় না। কোনো কোনো গাড়ি স্লো করে ড্রাইভার আমার মুখের দিকে তাকিয়েই স্পিড তুলে ফিরে যায় সড়কের চলমান যানবাহনের স্রোতে। প্রায় ঘণ্টা তিনেক দাঁড়িয়ে থাকায় হঠাত্ পাশে এসে থামে খুব উঁচু চাকার প্রশস্ত একটি জিপ জাতীয় গাড়ি। তা থেকে ক্রুকাট চুলের বয়স্ক এক লোক দুয়ার খুলে দিয়ে বলেন—ওয়েলকাম জেন্টোলম্যান, হপ অনবোর্ড, উঠে পড়ো জলদি। ভদ্রলোকের আচার-আচরণ দেখে মনে হয় না সড়কে ফিরে যাওয়ার তার কোনো তাড়া আছে। ডিটেকটিভ ইন্সপেক্টররা যেভাবে সন্দেহভাজন ক্রিমিনালকে দেখে এরকম তিনি আমাকে খুঁটিয়ে দেখে বলেন—ইউ আর নট ফ্রম ইন্ডিয়া, বাট আই গেস্ ইউ আর ফ্রম পাকিস্তান। অ্যাম আই রাইট? নো, আই অ্যাম ফ্রম বাংলাদেশ স্যার, জবাব দিলে তিনি তাঁর গলকম্বল কাঁপিয়ে হেসে বলেন—দ্যাট ওয়াজ ইস্ট পাকিস্তান, তুমি ভালো আছো? এখন তুমি কোথায় যাবে? ভদ্রলোক তো দেখি দিব্যি বাংলা বলেন। জানতে চাই—বাংলাদেশে গিয়েছেন কখনো? আরে, যাব না কেন? ঢাকা থেকেই তো পঁচিশে মার্চের ম্যাসাকারের রাতে আমি ওয়াশিংটন ডিসিতে রিপোর্ট পাঠাই, বলে আমার দিকে তাকিয়ে যেন দৃষ্টিতে সামান্য মাপজোখ করেন। তাঁর গাড়িটিও একটু অন্য রকমের, অত্যন্ত হেভি দেখতে। স্টিয়ারিং হুইলের পাশে স্ট্যান্ডে আটকানো ছোট্ট ল্যাপটপ কম্পিউটার। তিনি  বিড়বিড় করে বলেন—আমার এনালিসিস ছিল কর্নেল ওসমানী মার্শাল ল দিয়ে দেশে ডিক্টেটরি শাসন কয়েম করবেন। আই ওয়াজ সো রঙ। দিস ওল্ড মিলিটারি গাই টার্ন আউট টু বি এ ফাইন ডেমোক্রেট। পাকিস্তান আর্মির সাবেক অফিসার হয়েও ওসমানীর ছিল ডেমোক্রেটিক ভ্যালুজ। ভদ্রলোকের কথায়বার্তায় একধরনের ক্ষমতার দাপট ছড়াচ্ছে। এসব আলোচনা বাদ দিয়ে আমি জানতে চাই—আমি কি মার্কিন দূতাবাসের ঢাকায় কাজ করা সাবেক কনসাল জেনারেলের সাথে কথা বলছি? তিনি হেসে বলেন—ইউ আর কোয়াইট ক্লোজ। আমি একাত্তর সালে ঢাকায় সিআইএ’র দায়িত্বে ছিলাম। পাকিস্তান আর্মি ডিড টেরিবোল থিং টু অল বেঙ্গলিজ। টেরিবোল... টেরিবোল থিং।

সিআইএ’র এ সাবেক অ্যাজেন্ট আমাকে লিফ্ট দিয়ে নিয়ে আসেন শ্যানানডোয়া পার্কে ঢোকার মুখের একটি ভিজিটর সেন্টারের সামনে। ভদ্রলোক কথা বলতে খুবই ভালোবাসেন। আমি তাঁকে ব্যক্তিগত কিছু প্রশ্ন করতে চাইলে তিনি আপত্তি তোলেন না একেবারেই। চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন বেশ কয়েক বছর আগে। স্ত্রী পরলোকগতা। এক মেয়ে মিলিটারি ইন্টেলিজেন্সের হয়ে কুয়েত সিটিতে কাজ করছে। ছেলেও মিলিটারি অফিসার। জার্মানির অভারসিজ বেইসে কাজ করে। অনেক বছর হয় বাপের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নেই। বাতে কষ্ট পাচ্ছেন, ফিজিক্যাল এক্সারসাইজ করতে পারেন না বলে শরীর খুব ভারী হয়ে যাচ্ছে। সিআইএ’র হেডকোয়ার্টার ল্যাংলির কাছাকাছিই তাঁর বাড়ি। সারাদিন বাড়িতে বসে থেকে সময় কাটে না। তাই গাড়ি হাঁকান। পথেঘাটে হিচ-হাইকাররা যদি হেল্পলেস্ হয়ে হাত তোলে, বা অন্য কারো লিফেটর দরকার হয়, তিনি নিজে থেকেই তাদের পৌঁছে দেন গন্তব্যে। আমাকে নামিয়ে দিয়ে প্রকাণ্ড একটি সেলুলার ফোন দেখিয়ে বলেন—স্কাইলাইন ড্রাইভে দাঁড়িয়ে ঘণ্টাখানেক লিফেটর জন্য চেষ্টা করো। কিছু না জুটলে একটু হেঁটে ভিজিটরস্ সেন্টারের দেয়ালে ঝোলানো পে-ফোন থেকে আমাকে রিং দেবে। আমি এ দিকের কোনো হাইওয়েতে সার্কোল দেবো। ফিরে এসে আবার তোমাকে লিফ্ট দিতে অসুবিধা কিছু হবে না। আমি তাঁকে ধন্যবাদ দিতে গেলে তিনি বলেন—টেক ইট ইজি জেন্টোলম্যান, ইউ বেঙ্গলিজ মেইক ভেরি গুড মিষ্টি। আই লাভ মরণচান্দস্ রাসগালা।

স্কাইলাইন ড্রাইভের পাশে বৃদ্ধাঙ্গলি তুলে দাঁড়াতেই মিনিট দশেকের মাঝে মিলে যায় রাইড। হার্ললি ডেভিডসনের ভারী মোটর বাইক হাঁকিয়ে এক কাপোল আমাকে লিফ্ট দিতে রাস্তার পাশে দাঁড়ান। চামড়ার ভেস্ট ও প্যান্ট পরা মাসোল কিলবিলানো পুরুষের পেছনে বসা তরুণী হ্যালমেট খুলে তার তাম্রবর্ণের চুল চারদিকে ছড়িয়ে দিয়ে আমার দিকে তাকায়। তার গম্ভীর মুখ যেন ঝামা পাথর কেটে কুঁদে তৈরি করা। তার পুরুষ সাথী নেমে এসে মোটরবাইকের পেছনে এক্সট্রা দু’চাকায় বসানো ট্রেইলার-সিট দেখিয়ে বলেন—গেল সাত মাস ধরে এ সিটে কেউ চড়েনি। ফ্যান্টম, আমার গোল্ডেন রিট্রিভার ডগ এ সিটে বসে আমার সঙ্গে ক্যাম্পিংয়ে যেত। টোটাল নয় বছর তিন মাস সাত দিন সে আমার সঙ্গে বাস করেছে। আমি ট্রেইলারের পেছনে আমার ব্যাকপ্যাক রাখতে রাখতে জানতে চাই—হোয়াট হ্যাপেনড্ টু ফ্যান্টম? তিনি জবাব দেন—ক্যাম্পিংয়ের সময় ডিয়ার টিকের কামড়ে তার লাইম ডিজিজ্ হয়। কমপ্লিকেশনে খুব কষ্ট পাচ্ছিল। সো উই হ্যাভ টু পুট হিম টু স্লিপ। আমিই ডাক্তারকে বললাম পুওর অ্যানিমেল, রোগে বড় কষ্ট পাচ্ছে, ঘুম পাড়িয়ে দাও ইনজেকশন দিয়ে। আমি সিটে বসে বেল্ট বাঁধতে গেলে বাইকার তার কব্জি ও চামড়ার জ্যাকেটে গাঁথা অনেকগুলো স্টেনলেস স্টিলের আংটায় ধাতব শব্দ তুলে বলেন—সো ইউ ওয়ান্ট টু ফাইন্ড এ লোকেশন ফর ব্যাককান্ট্রি ক্যাম্পিং? রাইট? আমরা প্রথমে বিগ মেডোতে একটু থামব। তারপর তোমাকে ওল্ডর্যাগ মাউন্টেনের কাছাকাছি ড্রপ করে দেবো। ওপর থেকে একটি লেইকের আউটলাইন নিশানা করে তুমি ঢুকে যেতে পারবে ফরেস্টের ডিপে। তারপর সানসেটের আগে ব্যাককান্ট্রি ক্যাম্পিংয়ের একটি লোকেশন খুঁজে বের করতে তোমার অসুবিধা কিছু হবে না।

স্কাইলাইন ড্রাইভ ব্লুরিজ মাউন্টেনের একদম কিনার ঘেঁষে সারা শ্যানানডোয়া ন্যাশনাল পার্কের ভেতর দিয়ে চলে গেছে এক শ পাঁচ মাইলের মতো। প্রায় একুশ শ ফিটের এলিভেশনে সড়কটি এঁকেবেঁকে মারাত্মক কার্ভ তৈরি করে নীল পাহাড়ের এমন কার্নিশ ছুঁয়ে ছুটেছে যে পাথরে বাঁধানো গার্ডরেলের ওপর দিয়ে উপত্যকার দৃশ্যপট দেখতে অসুবিধা হয় না একটুও। যেতে যেতে খোলা মোটরবাইকের বাতাসে মনে হয় আমরা যেন মেঘের ভেতর দিয়ে চলছি। পুঞ্জ পুঞ্জ মেঘ পাশের বনানীতে বাড়ি খেয়ে ধোঁয়ার কুণ্ডলী পাকিয়ে পাড়ি দিচ্ছে সড়ক। মোটরবাইক হেডলাইট জ্বালিয়ে সাবধানে ধোঁয়াশা কেটে পথ করে নিলে জলকণার আর্দ্রতায় ভিজে ওঠে জামাকাপড়।

স্কাইলাইন ড্রাইভে পর্যটকদের পাহাড়ি দৃশ্যপট দেখার সুবিধার জন্য কিছু দূর পরপর আধখানা চাঁদের মতো স্যান্ডস্টোনের নিচু দেয়াল ঘেরা লুকআউট। আমাদের বাইকটি পিনাকোল লুকআউটে এসে দাঁড়ায়। তার পাথরে বাঁধানো গার্ডরেলের পাশে পার্কিংলটে দাঁড় করানো পর্যটকদের কয়েকটি গাড়ি। আমরা নেমে উপত্যকার পরিষ্কার ভিউ পাওয়ার জন্য একটু হেঁটে সামনে গিয়ে স্টোন-ওয়ালের ওপর উঠে দাঁড়াই। বেশ নিচ দিয়ে ভেসে যাচ্ছে মেঘ। তার ছায়ায় দাঁড়িয়ে আছে তিনতিনটি পাহাড়। এ উচ্চতা থেকে সবুজে সবুজে সম্পূর্ণ সয়লাব পাহাড় তিনটিকে পূর্ণাঙ্গভাবে দেখা যায়। জ্যাকেটের ধাতব আংটাগুলো ঝনঝনিয়ে শোল্ডার শ্রাগ করে বাইকার নিচের পাইন বনের দিকে নির্দেশ করে বলেন—হিয়ার দে আর, দ্য হৌল ফ্যামিলি। আমিও এবার তাকিয়ে পরিষ্কারভাবে দেখি—নিচে পাহাড়ের ঢালে হলেও খুব একটা দূরে নয়, দুটি শাবক নিয়ে চরছে মা ভালুক। ক্যামেরার শাটার টিপতে গেলে ভিউফাইন্ডার থেকে একটি শাবক ছুটে ঝোপের আড়ালে লুকালে অন্য বাচ্চাসহ ভালুক জননী ধরা পড়ে অস্পষ্ট ছবিতে। আমাকে পসিবোল সাইটিংয়ের সম্ভাবনার ইশারা দিয়ে বাইকার আরো বলেন—ব্যাককান্ট্রি ক্যাম্পিংয়ে বেশ কিছু কালো ভালুক দেখতে পাবে। দিস ইজ ট্রুলি অ্যা ব্ল্যাক-বেয়ার কান্ট্রি। মানুষকে এরা সচরাচর আক্রমণ করে না। তবে ট্র্যাকিং করতে গিয়ে এদের চমকে দেয়াও ঠিক হবে না। আই অ্যাম শিওর ইউ হ্যাভ অ্যা বেয়ার-বেল। আমি বুঝতে না পেরে বলি—বেয়ার-বেল! হোয়াট ইজ ইট? তিনি জবাব দেন—টিংটিং আওয়াজ করে একধরনের ঘণ্টা। বেয়ার-বেলের শব্দ পেলে সচরাচর ভালুকরা ট্র্যাক ছেড়ে সরে দাঁড়ায়। টু ব্যাড ইউ ডোন্ট হ্যাভ অ্যা বেয়ার-বেল। ইটস্ অ্যা বিট রিস্কি টু গো ফর ব্যাককান্ট্রি ক্যাম্পিং উইদাউট অ্যা বেয়ার-বেল। ভালুক-ঘণ্টি ছাড়া এভাবে যাওয়াটা ঠিক হবে না।

উই হ্যাভ টু বেয়ার-বেলস্ সুইটি। রাইট...? ক্যান উই গিভ দিস ম্যান ওয়ান? বলে বাইকার তার বান্ধবীর দিকে তাকালে নারীটি ঠোঁট কুঁচকে বিচিত্র মুখভঙ্গি করে হেঁটে গিয়ে ঢুকে পড়ে জঙ্গলের ভেতর। তার লেদার প্যান্টের হিপে জড়ানো সোনালি চেনের দোদুল্যমান টুংটাং করা জিংগোলগুলোর দিকে তাকিয়ে বাইকার ডিসয়েপোয়েন্টেড্ হয়ে বলেন—ওয়েল, শি ডাজ নট হ্যাভ দ্য রাইট মুড টুডে। সে তোমাকে আমাদের বেয়ার-বেল দিতে চাচ্ছে না। হোয়াট টু ডু? ও-কে, আমি তোমাকে একটি বেয়ার-বেল তৈরি করে দিচ্ছি এখনই। জাস্ট লুক... হাউ আই ডু, হাউ আই মেক দ্য বেয়ার-বেল। বলে তিনি গার্বেজ বিন থেকে তুলে নিয়ে আসেন কোকাকোলার একটি খালি ক্যান। তাতে তিনটি নুড়িপাথর ঢুকিয়ে টুলবক্স থেকে হেভিডিউটি ডাকটেইপ বের করে ক্যানের মুখ আটকে দেন। তারপর তা বাজিয়ে জানতে চান—হাউ ডাজ দিস সাউন্ড? তা থেকে শব্দ বের হয় বেশ ভালোই। একটু পর তার বান্ধবী জঙ্গল থেকে ফিরলে আমরা আবার বাইকে চাপি।

মিনিট পনেরোর ভেতর আবার আমাদের থামতে হয়। বাইকারের বান্ধবীর কী কারণে জানি বিবমিষা পেয়েছে। আরেকটি পাথরে বাঁধানো লুকআউটে ব্রেক কষতেই তরুণী ওয়াক ওয়াক করে ছুটে যায় পাহাড়ের কার্নিশ ঘেঁষা ঝোপের দিকে। বাইকার আমাকে ইশারায় বলেন যে, মিনিট পনেরো লেগে যাবে মেয়েটির ধাতস্থ হতে। তো তাদের প্রাইভেসি দেয়ার জন্য আমি লুকআউটের অন্য দিকে হাঁটি।

ভারী মোটরবাইক থামিয়ে গার্ডরেলের পাশে দাঁড়িয়ে আরেক বাইকার তরুণ। খুব চেনাজানা মানুষের মতো সে হেসে আমার সঙ্গে কথা বলতে আসে। আমি অন্য বাইকে লিফ্ট নিচ্ছি শুনে বলে—আমি একা বাইক হাঁকাচ্ছি, চলে এসো আমার বাইকে। আই উইল টেইক ইউ হোয়ারএভার ইউ ওয়ান্ট টু গো। গল্প করতে করতে বাইক হাঁকাব। একটু সন্দেহ হয়। তখনই দেখি এ বাইকারের ডান কান ছেঁদা করে ঝুলছে রুপার রিং। আমি জানি যে—সমকামী পুরুষরা এ রকমের রিং পরে থাকে। তাই সাবধান হয়ে তাকে থ্যাংক ইউ বলে ফিরতে গেলে তরুণটি পকেট থেকে ক্র্যাক-কোকেনের পাইপ বের করে ইশারায় যেন বলতে চায়—চলে এসো আমার সাথে, স্ফুর্তি করে স্মোক করা যাবে। আমি মাথা হেলিয়ে অসম্মতি জানালে নিঃসঙ্গ বাইকারকে বিষণ্ন দেখায়।

তরুণীর শরীর ধাতস্থ হতেই আমরা স্ট্রেইট বাইক হাঁকিয়ে চলে আসি বিগ মেডো বলে বিস্তীর্ণ এক বাদামি ঘাসে ছাওয়া প্রান্তরে। কেবলমাত্র একটি শুকনা গাছ দুপুরের ঝলমলে আলোয় দাঁড়িয়ে আছে একাকী নীল আকাশের নিচে। ঘাসফড়িং ওড়া খোলামেলা এ বিশাল মাঠের দিকে তাকালে হূদয় আপনাআপনি হয়ে পড়ে প্রশস্ত। আমরা ময়দানের দিকে তাকিয়ে দেখি খুরে দীঘল ঘাস মাড়িয়ে এলোপাথাড়ি ছুটছে কিছু হরিণ। খুব কাছে চিত্রল বাচ্চা হরিণের সঙ্গে ঘাস খেতে খেতে অনমনা হয়ে দিগন্তের দিকে তাকায় একটি মা-হরিণী। আমরা হাঁটতে হাঁটতে চলে আসি বিগ মেডোর ভিজিটর সেন্টারের খোলামেলা কাঠে তৈরি ডেকে।

খিদা লেগেছে তাই লাঞ্চের প্রসঙ্গ ওঠে। আমাদের মাঠের ভিউ এনজয় করার জন্য কাঠের ডেকে দাঁড় করিয়ে রেখে বাইকারের বান্ধবী যায় লাঞ্চ কিনতে। যাওয়ার আগে তরুণী জানতে চায়—হোয়াট উড ইউ লাইক টু হ্যাভ ফর লাঞ্চ? আমি বিশ ডলারের নোট তার হাতে দিয়ে আমার জন্য চিজ স্যান্ডউইচ ও কোক আনতে বলি। তরুণী চলে গেলে পেছন থেকে তার ধাতব ঝালরওয়ালা সোনালি চেনে জড়ানো নিতম্বের দিকে নির্দেশ করে বাইকার বলেন—ইজ নট শি লুক সুপার কুল ফ্রম দ্য ব্যাক? তার এ প্রশ্নের রেসপন্সে আমি জানতে চাই—তাকে খুঁজে পেলেন কীভাবে? তিনি দু’আঙুলে তুড়ি বাজিয়ে বলেন—জাস্ট লাইক দিস। আই টুক এ ডাইরেক্ট অ্যাপ্রোচ। একটি বারে সে প্রায়ই আসত। খেয়াল করেছি বার-কাউন্টারের এককোণে বসে সে একা একা ড্রিঙ্ক করছে। আমার সামনে দিয়ে হেঁটে গেলে আমি তাকে থামিয়ে দিয়ে বলি—সুইটি, কোমরে এ রকমের ক্রেজি দোল নিয়ে তুমি কেন একা বসে পান করবে? ইট জাস্ট ব্রেক মাই হার্ট। কামঅন, হ্যাভ এ রাইড ইন মাই বাইক। আই উইল পার্ক ইউ আপ। খোলা হাওয়ায় কয়েক মুহূর্তে চাঙ্গা হয়ে যাবে তুমি। এ পর্যন্ত বলে তিনি আমার দিকে তাকালে আমি আবার জানতে চাই— এ রিলেশনশিপ কত দিনের? তিনি আঙুলে কী একটা হিসাব করে বলেন এখনো একুশ সপ্তাহ হতে দিন তিনেক বাকি আছে। বাট শি ইজ প্রেগনেন্ট। এজন্য এবার আমি আর ব্যাককান্ট্রি ক্যাম্পিং করছি না। এখন রাফ কিছু করা ঠিক হবে না। আমরা কেবিনে দিন কয়েক থাকব।

সো, ইউ আর অ্যান এক্সপিরিয়েন্সড্ ব্যাককান্ট্রি ক্যাম্পার? বলে প্রশংসাসূচক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকালে তিনি রেসপন্সে বলেন—লিসেন, কানাডা ও আমেরিকার অনেক বন-জঙ্গল পাহাড়ে আমি ব্যাককান্ট্রি ক্যাম্পিং করেছি। অনেক বছর ধরে আমি লোউনার, একাকী জীবনে কুকুর ফ্যানটম আর মোটরবাইক ছাড়া আমার আর কিছু ছিল না। ব্যাককান্ট্রি ক্যাম্পিংই ছিল আমার বিচরণক্ষেত্র। আই অ্যাম নট রিয়েলি অ্যা হান্টার। খাবারের প্রয়োজনে কখনো বুনোহাঁস বা হরিণ শিকার করেছি। কানাডিয়ান গিজ শুট করলে ছুটে গিয়ে ঝোপঝাড় থেকে রক্তাক্ত হাঁস খুঁজে বের করতে ফ্যান্টম খুব পছন্দ করত। সামনের এ বিশাল ময়দান বিগ মেডোতে আমি শত বছর আগে ঘাসে পড়ে থাকা নেটিভ আমেরিকান যোদ্ধাদের এরোহেড বা শার্প পাথরে তৈরি তীরের অগ্রভাগ কালেক্ট করেছি ফ্যান্টমকে নিয়ে। আই রিয়েলি মিস মাই ডগ ফ্যান্টম। নাউ লাইফ ইজ সো ডিফরেন্ট। এই যে গার্লফ্রেন্ড জুটেছে, তার মুডের সাথে হামেশা অ্যাডজাস্ট করতে হয়। সে প্রেগনেন্ট হয়ে পড়ার পর হাত খুলে বাইক চালানোরও কোনো উপায় নেই। মাইল দশেক পরপর থামতে হয় বাথরুমের প্রয়োজনে। ব্যাককান্ট্রি ক্যাম্পিং লাটে উঠেছে। কোথাও যেতে চাইলে প্রথমে চিন্তা করতে হয় বাজেট, তারপর তা দিয়ে রিজার্ভ করতে হয় এক্সপেনসিভ কেবিন। মাই লাইফ ওয়াজ এ হৌল লট ইজিয়ার উইথ অ্যা সুইট লিটিল ডগ, অ্যান্ড টু টেল ইউ দ্য ট্রুথ...ইট রিয়েলি বিকাম কমপ্লিকেটেড অ্যাজ আই অ্যাম ট্রাইং টু লিভ উইথ অ্যা গার্ল।

মেয়েটি লাঞ্চ নিয়ে ফিরলে আমরা ডেক থেকে নেমে হরিণ চরা বিশাল প্রান্তরের দিকে তাকিয়ে গাছের ছায়ায় ঘাসে বসি। এখানে বনানীর সবুজ পত্রালী পাড়ি দিয়ে মেঘের ভেলায় যেন ভেসে এসেছে বিপুল আকাশ। তার দুর্দান্ত দিগন্তের ঘেরাটোপে চক্রাকারে ওড়ে অনেকগুলো চিল। একটি চিল দলছুট হয়ে আমাদের বেশ কাছাকাছি নিচে নেমে এসে ঘাস থেকে ছোঁ মেরে তুলে নিয়ে যায় আস্ত কাঠবিড়ালী। দিস ইজ হোয়াট উই আর আফটার, বলে চিল-ভাসা আকাশের দিকে নির্দেশ করে বাইকার বলেন—এখন চিল মাইগ্রেসনের ঋতু। চিলগুলো এ মাঠে জড়ো হচ্ছে। আজ কিংবা কাল তারা পরিযায়ী হয়ে দল বেঁধে উড়ে যাবে দক্ষিণ আমেরিকার পেরুর দিকে। উই ওয়ান্ট টু অবজার্ভ দিস।

লাঞ্চের পর তরুণী ওয়াশরুমে গেলে বাইকার স্টোরে ঢোকেন কিছু প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র কিনতে। আমাকে বলেন মিনিট বিশেক পরে পার্কিংলটে এসে তাদের সঙ্গে যোগ দিতে। ডেক থেকে কাঠের একটি ব্রিজ চলে গেছে সরাসরি জঙ্গলের দিকে। তার ওপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে দেখি এক পর্যটক জুমলেন্সে তুলছেন লতানো পত্রালীর গাঢ় সবুজে লুকানো রঙিন পাখির ছবি। তাকে ছাড়িয়ে ব্রিজ ধরে আরো খানিকটা এগিয়ে গেলে ঘন ঝোপঝাড় সরে গিয়ে দেখা দেয় নির্জন এক বনপথ। দেখি শর্টস পরা নিঃসঙ্গ এক নারী হাইকার একাকী হেঁটে যাচ্ছে গভীর অরণ্যের দিকে।

কাঁটায় কাঁটায় মিনিট বিশেক পর পার্কিংলটে ফিরতেই দেখি বাইকার ও তার বান্ধবী প্রস্তুত। আধ ঘণ্টা বাইক চালিয়ে এ দম্পতি আমাকে ওল্ডর্যাগ মাউন্টেনের কাছে ঘন বনানীতে নামিয়ে দিয়ে বলেন—নাও গো ফর অ্যা ট্র্যাক, পাহাড়ি ঝোরা যেমন বনজঙ্গল কেটে চলে আসে সরোবরে, সেরকম এ গাছপালার ভেতর দিয়ে লতাপাতা কেটে ঝোপঝাড় সরিয়ে পথ করে এগিয়ে যাও। তোমার নিশানা দূরের এই সিলভার লাইনিং হ্রদ। আর... লিসেন, কিপ অ্যান আই অন দি স্কাই। চিলগুলো পরিযায়ী হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। হয়তো আসমানে দেখতে পাবে তরঙ্গের মতো বয়ে যাচ্ছে তাদের ঝাঁক।

 

দুই.

মেঘের গাঢ় কুয়াশা কেটে গিয়ে গাছের পাতা থেকে টুপটাপ ঝরছে ফোঁটা ফোঁটা জল। তাদের মৃদু শব্দে একধরনের সম্মোহন আছে। কিন্তু এখানে ধূসর পাথরে বসে থেকে গতকাল কীভাবে কেটেছে এ নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করলে তো চলবে না। ওল্ডর্যাগ মাউন্টেনের দিকে হাইকিং শুরু করতে হয় এখনই। ট্রেইল-হেডে পৌঁছাতে পারলে আর চূড়ায় ওঠার সরাসরি পথ খোঁজাখুঁজি করতে হবে না। ব্যাককান্ট্রি ক্যাম্প থেকে এ পর্যন্ত কুয়াশার ভেতর ট্র্যাক করে আসতে এমন কিছু অসুবিধা হয়নি। এদিকের বনানীতে উঁচু গাছপালা হাজার-বিজার হলেও তা দাঁড়িয়ে নেই গা ঘেঁষাঘেঁষি করে। তাদের মধ্যকার ফাঁক দিয়ে হাঁটা যায় অনায়াসে। নিচের আন্ডারগ্রোথে ঝোপঝাড় নেই বললেই চলে। তবে ফরেস্ট-ফ্লোর ঢেকে আছে নরোম সবুজ ফার্নের বৃহত্ পত্রালীতে। বুট জুতায় তাদের মাড়িয়ে যাওয়া কঠিন কিছু না। তবে জঙ্গলে ছড়ানো ছোট-বড়-মাঝারি সাইজের অনেক পাথর। একটু খেয়াল করে উস্টাবিস্টা থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে সামলে সুমলে চলতে হয়। পাথর থেকে ব্যাকপ্যাক পিঠে নিয়ে ওঠে খানিকটা পথ আগ বাড়তেই বাঁ পাশে পড়ে হলুদ ফুলে ভরা খোলামেলা ওপেনিং। একটি মস্তবড় শিংগাল মুস প্রজাতির হরিণ আরামসে ঘাস খাচ্ছে ওখানে। প্রাণীটি তরতাজা দামড়া গরুর চেয়ে বড়। আমার সরসর করে হেঁটে যাওয়াতে সে বিরক্ত হয় না একবিন্দু।

মিনিট চল্লিশেক হাঁটতেই টপোগ্রাফি বদলে যেতে থাকে পুরাপুরি। গাছপালার সংখ্যা কমে আসছে। পায়ের নিচে ফার্নের দেখা পাওয়া যাচ্ছে না। তবে নরোম ঘাসে মাঝে মাঝে চরতে দেখা যায় ছানাপোনা-সহ হরিণের পুরা পরিবার। এদিকে বোল্ডারের আকার বড় হতে হতে পায়ে চলার ট্র্যাকের ওপরে তৈরি করেছে প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধক। তাদের এড়িয়ে সামনে বাড়তে গেলেই দেখি একটি-দুটি দলছুট লাজুক গোছের হরিণ লুকিয়ে পড়ছে পাথরের আড়ালে। আমি আরো মিনিট বিশেক হাঁটি।

সমগ্র ভূ-ভাগ এখন সম্পূর্ণ পাথরের। তার ওপরে ছড়ানো আলগা বোল্ডারগুলো এদিকে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে দাঁড়িয়ে আছে বলে তাদের আর ঘুরে অ্যাভোয়েড করা যায় না। এখন বেয়ে উঠে এগুলো অতিক্রম করে আগ বাড়তে হয়। এতে এনার্জি ব্যয় হয় প্রচুর। আবার ক্লইমবিংয়ের জন্য ব্যালেন্সও রক্ষা করতে হয় হুঁশিয়ার হয়ে। আমি একটি ট্র্যাকিং-স্টিকের ওপর ভর দিয়ে বোল্ডারগুলোর ওপরে উঠছি। মনে হয় সাথে জোড়া ট্র্যাকিং-স্টিক হলে ভালো হতো। কিন্তু এ মুহূর্তে এদিকে গাছপালা এত কম যে শুকনা ডাল জোগাড় করে আরেকটি ট্র্যাকিং-স্টিক বানানোরও কোনো উপায় দেখি না। তাই গায়ে জোশ সৃষ্টি করার জন্য হেইয়া হো বলে শরীর একদিকে বাঁকিয়ে রীতিমতো কুচকাওয়াজ করি। বেশ কিছুক্ষণ হয় দরদর করে ঘামছি। ঘামের ধারায় ভিজে চোখে জ্বালা করে। কিন্তু দাঁড়িয়ে পড়লে মোমেন্টাম নষ্ট হবে ভেবে পাথুরে ভূমিতে চোখ রেখে সামনে বাড়ি।

কিন্তু দম ফেলতে একটু দাঁড়াতেই হয়। পানি খেয়ে চোখ মুছে তাকাই। ইন্দ্রের ঐরাবতের পিঠের মতো সামনে কালচে ধূসর বেজায় জগদ্দল গোছের একটি মস্ত পাথর। কাঁধে অনেকগুলো ক্যামেরা ঝুলিয়ে, পিটে স্ট্র্যাপ দিয়ে ট্রাইপড বেঁধে যমজ হাইকার জোড়া ট্র্যাকিং-স্টিকে ভর দিয়ে অতিক্রম করছে সামনের জাম্বুবান জগদ্দল। আমি হাত বাড়িয়ে হ্যালো বলতে গেলে তাদের দাঁড়িয়ে পড়ে আমার সাথে সম্ভাষণ বিনিময়ের কোনো ফুরসত হয় না। বুঝতে পারি এ যাত্রায় যুদ্ধ আমাকে একলা করতে হবে। তাই মন শান্ত করে মোগল ফৌজদাররা যেরকম রণদামামা বাজলে হাতির পিঠে চড়তেন, এরকম কায়দায় খানিক কসরত করে উঠে আসি পাষাণ পাথরের বাঁকানো পিঠের ওপর। এখান থেকে ওল্ডর্যাগের সামিটের পরিষ্কার ভিউ পাওয়া যায়; ট্রেইলের পাথরে পেইন্টের রঙদার তীরচিহ্নের মার্কিং দেখে বেয়ে ওঠার ক্লিয়ার নিশানাও পাওয়া যায়।

না, আর সামনে বাড়া যাচ্ছে না। একটু ব্রেক নিয়ে এনার্জি ফিরিয়ে আনতে হয়। বড় একটি বোল্ডারের শ্যাওলা মাখানো শরীরে হেলান দিয়ে কফির মগে চুমুক দেই। আরো ঘণ্টাখানেক পাথর মাড়িয়ে হাইক করে আমি রীতিমতো লবেজান। কী কারণে জানি আজ থেকে থেকে খুব ক্ষুধা হচ্ছে। দিন কয়েক হলো মূলত ড্রাইফুড, বাদাম ও কিসমিস খেয়ে পথ চলছি। শরীরে হয়তো প্রোটিনের ঘাটতি হয়েছে। এক টুকরা মাছ কিংবা মাংস, সঙ্গে খানিকটা ভাত বা রুটি পেলে ভালো হতো। হাঁটতে গিয়ে হাইকারদের সামিটে ওঠার প্রচলিত ট্রেইল থেকে সরেও এসেছি বেশ কিছুটা।

বেয়ার সাইটিং বা ভালুক দেখা নিয়ে সমস্যা হয়েছে। প্রথমবার লোম এলোমেলো করা উত্কট গন্ধ ছড়ানো মা ভালুকের ঠিক ট্রেইলের ওপর দেখা পেলে আমি ট্রাকিং-স্টিক বগলে পুরে প্রচলিত পথ ছেড়ে বেঁকে চলে যেতে থাকি দূরে। আমার বেল্টের সঙ্গে বাঁধা বেয়ার-বেলে টুংটাং করে বাজে নুড়িপাথর। তাতে ভালুক জননীর রাস্তা ছেড়ে সরে দাঁড়ানোর কোনো আগ্রহ হয় না। এ প্রাণী আমার বিষয়ে সম্পূর্ণ নির্লিপ্ত থাকলেও আমার হাঁটু কেঁপে গলা শুকিয়ে সামনে বাড়া মুশকিল হয়ে ওঠে।

ওপরের এ এলিভেশনে হরিণ বা খরগোশ আর তেমন একটা দেখা যায় না। তবে আরেকবার আমি পথে ভালুকের সাক্ষাত্ পাই। এদিকে সামান্য জায়গা জুড়ে পাথুরে ভূ-ভাগ বদলে গিয়ে সবুজ ঘাসের তালাশ পাওয়া যায়। দাঁড়িয়ে পড়তেই জল ঝরার শব্দ শুনে ভাবি বোতল ভরে নেবো কি? সামনে যেতেই দেখি সবুজ কিছু ঝোপঝাড় এখানে ছড়াচ্ছে তীব্র সতেজতা। তখনই শোনা যায় মৃদু ড্রামবাদ্য, সঙ্গে সিংসং ভয়েসে কারা যেন কিছু জপছে। ঘাস মাড়িয়ে দৃঢ় পদক্ষেপে তারা উঠে আসে। অবাক হয়ে দেখি—পুরুষ ও নারী মিলিয়ে দুই শ্বেতকায় বৌদ্ধ সন্ন্যাসী। দু’জনের গায়ে সেফটিপিন দিয়ে জড়ানো গৈরিক বসন। তার নিচে পুরুষ শ্রমণের পরনে জিন্স ও মহিলা ভিক্ষুর গায়ে লুজ স্কার্ট। তারা পাখার মতো কিছুকে কাঠি দিয়ে মৃদুমৃদু বাড়ি মেরে ‘না মু মোইয়ো..’ মন্ত্র জপতে জপতে আগ বাড়ছেন। শ্রমণ দু’জন আমার দিকে ফিরেও তাকান না। তবে তাদের বাদন ও জপে হাই অ্যালিভেশনের এ নির্জনতায় যেন ছড়ায় দিব্য জাদু। একটু দূরত্ব রেখে তাদের পেছন পেছন আমিও পা চালাই। আর দেখি পাশের সবুজ পাতার ফাঁক দিয়ে অবাক হয়ে ভিক্ষু সাজা হাইকারদের দেখছে তরুণ বয়সের এক ভালুক। এবার আমি ভয় না পেলেও ঠিক রিস্ক নিতে চাই না। আবার বেঁকে অন্য পথ ধরলে পেটে খা খা করে জ্বলে ওঠে খিদা।

স্রেফ কপাল জোরে বড়বড় বোল্ডারের ছায়ায় পেয়ে যাই পড়ে থাকা কিছু শুকনা ডালপালা। সঙ্গে সলিড খাবার বলতে আছে ভারী একটি পোয়াটাক ওজনের ইয়াম। আগুন জ্বেলে তা পোড়াই। মিষ্টি আলুর মতো সুস্বাদু ইয়াম খেতে ভালোই লাগে। তারপর অ্যালুমিনিয়ামের মগে পানি ফুটিয়ে ফ্রেঞ্চ রোস্টের গ্রাউন্ড করা কফির সক্স চোবাতেই নির্জনতা ভরে ওঠে ব্রাজিলের কালো কফির চনমনে সৌরভে। মগে কফির সিপ নিতে নিতে চেষ্টা করি উদ্দীপনা ফিরিয়ে আনতে। আই হ্যাভ অ্যাটলিস্ট অ্যানাদার মাইল টু গো। যেতে হবে নির্ঘাত্ আরো মাইল খানেক খাড়াই পথে। কিন্তু ছায়ায় শান্তিতে বসে কফি পান দুরূহ হয়ে ওঠে।

হাইক করে ওঠার পথে অন্তত দু’বার মাথার ওপরে নিচু ফ্লাইটে আট-দশটি চিলের জোট বাঁধা ঝাঁক দেখেছি। এবার একটি-দুটি করে অত্যন্ত ভারী সব পাখি তাদের ধূসর ডানা মেলে পাষাণময় জমিনে ছায়ার চলন্ত চিত্রকলা এঁকে ঝুপঝুপ করে বসে পড়ছে আশপাশের বোল্ডারগুলোর ওপর। তারা বারবার চঙ্গলের নখে ডানার প্রান্ত চেপে ধরে চীনা পাখার মতো পালক প্রসারিত করে তীব্র পাখসাটে অস্থিরতা ছড়ায়। দেখতে দেখতে পাথরে ল্যান্ড করা চিলগুলোর সংখ্যা হয়ে দাঁড়ায় বেশ কতগুলো। এদের অনেকেই শিকার করে খাবার নিয়ে এসেছে। একটি ঢাউস চিল সদ্য মরা বাচ্চা খরগোশের রান তার পায়ের তীব্র নখে ছিঁড়ে ফেলে চিত্কার করে প্রান্তরের নির্জনতাকে হুঁশিয়ার করে দেয়। হালকা-পাতলা দুটি নওল চিল রবিন পাখির মাংস টানাহেঁচড়া করতে করতে প্রচণ্ড কোঁদল বাধিয়ে দিলে বিরক্ত হয়ে গোটা পাঁচেক চিল তাদের পাথুরে ঠেক ছেড়ে লো ফ্লাইটে আমার চারপাশে ঘুরপাক করে ত্যাগ করে বর্জ্য। আমি ট্র্যাকিং-স্টিক নিয়ে উঠে দাঁড়াতেই পরস্পরের পালকে ঠোঁট ঘঁষে কাছাকাছি হওয়া একটি যুগল বেজায় চিল-চিত্কার দিয়ে ফ্লাই করে। আমি মাথার ওপর ট্র্যাকিং-স্টিক ঘোরাতে ঘোরাতে—গো ব্যাক টু স্কাই ইউ ব্লাডি চিল, বলে আমি আবার ট্রেইল হিট করি।

আমি কেবলই পাথর ভাঙছি। এলিভেশন ক্রমশ হাই হচ্ছে বলে পায়ের মাসোল ও কোমরে খুব চাপ পড়ে। বাট, আই নো আই হ্যাভ টু প্রসিড। এখন থেমে পড়ে রেস্ট নেয়ার উপায় নেই। আমি হাঁটু মুড়ে, দু’হাতে পাষাণের খাঁজ খামচে ধরে, কখনো কখনো ট্র্যাকিং-স্টিকে ভর দিয়ে বিশাল সব রক টপকাচ্ছি। অতিকায় মাশরুমের মতো এ বোল্ডার ছড়ানো ভূ-ভাগ অতিক্রম করা খুবই চ্যালেঞ্জিং মনে হচ্ছে। ভারী জিন্সের ভেতর হাঁটুর চামড়া ছিঁড়ে গিয়ে রক্ত বেরুচ্ছে। নিক্যাপ জাতীয় কিছু থাকলে ভালো হতো। ড্রামের মৃদু বাদনে আমি ঘাড় বাঁকিয়ে তাকাই। খানিক দূরে গোলাকার একটি রকের ওপর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে শ্রমণ যুগল। তাদের বাসন্তী বর্ণের উত্তরীয় বাতাসে উড়ছে। দু’জনের মাথায় হলুদ রঙের বেইসবল ক্যাপে আটকাচ্ছে সূর্যের তেরছা কিরণ। তাঁরা পরস্পরের দিকে তাকিয়ে এমনভাবে পাখায় কাঠি দিয়ে বাজাচ্ছেন—যেন একটু আগে তাঁরা কাকতালীয়ভাবে কোনো গুহায় অমিতাভ গৌতমের যুগে আঁকা দেয়ালচিত্রের তালাশ পেয়েছেন।

আমি নিরেট একটি রকওয়ালের সামনে এসে দাঁড়াই। ট্রেইল এখানে একটু বেঁকে গেছে। খানিক ঘুরে আসতেই দেখি রকওয়াল দু’ভাগ হয়ে ভেতরের সংকীর্ণ ফাঁকা স্পেস দিয়ে উঠে গেছে ওপরে যাওয়ার ধাপে ধাপে ছড়ানো সোপান। পাথরের এ সিঁড়ির মতো আকৃতি কি সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক, নাকি এতে মানুষের হাত আছে? ঠিক বুঝতে পারি না। বাতাসের শন শন শব্দে এখানে ছড়াচ্ছে অনেক যুগ আগে পাথরে বন্দি হওয়া মগ্নতা। আমি মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিই। মনে হয়—রাইট অ্যাহেড অব মি ইজ দ্য এসকেইপ লেডার। জীবনযাপনের জমে ওঠা ক্লেদ, প্রতিদিন পথ চলার ক্লান্তি এবং অজানা কিছু একটা পাওয়ার চঞ্চলতা :শুধু সোপান বেয়ে উপরে উঠতে পারলে মুক্তি পাওয়া যাবে এসব ঝুটঝামেলা থেকে।

ইয়াহু বলে আমি রকওয়ালের ফাটলের ফাঁকা স্পেসে ঢুকে পড়ি। তারপর ধীরে ধীরে...সেই পুরোনো আমলের সিঁড়ি বেয়ে শাহি মিনারের একদম ওপরের বুরুজে উঠে যাওয়া মোয়াজ্জিনের মতো কদম-কে-কদম আগ বাড়ি। শ্বাস-প্রশ্বাস খুব ভারী হয়ে আসছে বলে আমাকে থামতে হয় পথিমধ্যে। ফাটলের মাঝামাঝি মাথার ওপরে ঝুলে বিশাল একটি আলগা রক। কোথা থেকে হামাগুড়ি দিয়ে এসে সিঁড়িতে পথ আগলে বসে এক অজানা হাইকার। তাকে অতিক্রম করে যেতে গিয়ে সংকীর্ণ পরিসরে আমি হাই-ফাইভের ভঙ্গিতে তার হাতের তালুতে আমার তালু বাজাই।

না, আর সামনে আগ বাড়া যাচ্ছে না। মস্ত বড় একটি বোল্ডার ঝুলে আছে রীতিমতো শূন্যে। তার তলায় দাঁড়িয়ে আমি পানি খাই। শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক হয়ে আসতেই একটু হেঁটে কিনার ঘেঁষে দাঁড়ালে দূরে ওল্ডর্যাগ পাহাড়ের লোয়ার রিজের আসাধারণ ভিউ দেখা যায়। এত উঁচুতে গাছপালা কিছু নেই, তবে সম্ভবত উপত্যকার ঝড়ো বাতাস উড়িয়ে এনে ফেলেছে বেশ কিছু শুকনা পাতা ও ছোট ছোট মরা ডাল। একটু নিরিখ করতেই খুঁজে পাই পাথরের গায়ে ছোট ছোট গর্তে পাখির বাসা। আর সরসর করে পাতা মাড়িয়ে খানিক দূরে সরে আমার দিকে অবাক হয়ে তাকায় ইঁদুরের মতো ছোট্ট একটি প্রাণী। আর তখনই স্পষ্ট শুনি শ্রমণ যুগলের যৌথ জপ। তারা আকুল হয়ে জপছেন—‘না মু মোইয়ো হো রেনগে কেও।’ তাদের এ মন্ত্র পাখার বাদনে তাল রেখে প্রতিধ্বনিতে ছড়াচ্ছে আদিযুগে গুহাগাত্রে চিত্র আঁকার প্রগাঢ় আচ্ছন্নতা।

শূন্যে ঝুলে থাকা বোল্ডারের ছায়াময় শেল্টার পেছনে ফেলে একটি ফাটলের ভেতর দিয়ে বেরিয়ে এসেও আমাকে অতিক্রম করতে হয় আরেক ধাপ কালচে খয়েরি পাষাণের স্তর। এখান থেকে ওল্ডর্যাগ পাহাড়ের সামিট পরিষ্কার দেখা যায়। একজন অজানা হাইকার ওখানে মস্ত বোল্ডারে ডান হাতের ঠেক দিয়ে পোজ দিচ্ছে। কিছু জায়গা আমি গিরিগিটির মতো চার হাতে-পায়ে হামাগুড়ি দিয়ে দু’আঙুলে তুড়ি বাজিয়ে—হেই, ইউ হ্যাভ টু ওভারকাম দ্য রকস্ জাস্ট লাইক দিস, বলে অত্যন্ত জোশের সঙ্গে উঠে আসি সামিট রকের চাঁদিতে।

আমি এখন সি-লেভেল থেকে তিন হাজার দু শ’ একানব্বাই ফিট ওপরে চলে এসেছি। ইয়াহু, দ্যাটস্ অ্যা লিটিল অ্যাচিভম্যান্ট ফর দ্য ডে। মনে হয় খুব কঠিন ইন্টারভিউ সামলিয়ে ড্রিম-কাম-ট্রু চাকরির অ্যাপোয়েন্টমেন্ট লেটার পেয়ে গেছি। খোলা হাওয়ায় এক্সপোজড্ হওয়া রক সামিটের চাতালে জানু বিছিয়ে বসে শিকারের পেছনে ছুটে ক্লান্ত হাওয়া চিতার মতো হাঁপিয়ে নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের তোড়কে সামলাই।

আমার সামনে শূন্যতায় কোনো রাজকুমারীর কুরুশ কাঁটায় বোনা শুভ্রলেসের ককটেল গাউনের মতো ভাসে কিছু মেঘ। আর তাতে জলকণা সূর্যকিরণে ছড়ায় জ্যামস্টোনের বর্ণাঢ্য বিভা। এবং এসব কিছু ছাড়িয়ে, সবুজ বনানীর পত্রময় লাবণ্যের সতেজ আভার ওপর দিয়ে চোখ বুলিয়ে, আরো বেশ কিছু দূরে দূরে উপত্যকায় ঝিলিক পাড়ে জলের গোলাকার ও অবলঙ শেইপের স্বতন্ত্র সব আকৃতি। এ হ্রদগুলোর ওপরে ছলকে যাওয়া রুপালি আভাকে রাজস্থানী ট্যাপেস্ট্রিতে গাঁথা আয়নার মতো দেখায়। আমি এবার একটু ঘুরে বসে অন্যদিকে গাঢ় সবুজে গাছপালা নিয়ে প্রান্তরে গড়িয়ে যাওয়া উপত্যকার দিকে তাকাই। ওপরে—আকাশের ভাসমান জমিনে যেন চাষবাস হচ্ছে তুষারের। খণ্ড খণ্ড বিচ্ছিন্ন কিছু মেঘকে দেখায় মেরু সমুদ্রে ভেসে থাকা আইসবার্গের মতো। আমি আবার ঘুরে বসি। মনে হয় সমান্তরাল দুটি পাহাড়ি রেঞ্জের মাঝ বরাবর অনেক নিচে জমিন কেটে বয়ে যাচ্ছে শ্যানানডোয়া নদী। আমি তার বহমান জলের প্রবাহ ঠিক দেখতে পাই না, তবে তার পরিষ্কার রেখা নিশানা করে কাতারে কাতারে উড়ছে চিলের ঝাঁক। ওয়েল, হক মাইগ্রেশন হ্যাজ স্টার্টেড, চিলের পরিযায়ী হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হলো।

এ বনাঞ্চলের অন্য কোথাও কেবিনের ব্যালকনিতে বসে নিশ্চয়ই বাইনোকুলারে তাদের নজর করছেন আমাকে লিফ্ট দেয়া বাইকার মানুষটি। পাশে বসে তার ক্রেইজি কোমরের বান্ধবী বোধ করি চাইল্ড বার্থের ওপর পড়ছেন কোনো পুস্তিকা। এদিকে তো খাবার প্রচুর, নীড় বাঁধার জন্য প্রসারিত ডালপালাও অজস্র। ঠিক বুঝতে পারি না চিলগুলো পরিযায়ী হচ্ছে কেন? কোথায় যাচ্ছে তারা? পেরু কিংবা ইকুইডরে আছে হয়তো নতুন করে নীড় গড়ার সুস্মিত বন্দোবস্ত।

সামিট রকের তীব্র নির্জনতায় সারা গায়ে মেঘভেজা আউলা ঝাউলা বাতাস মেখে খুব কনফিউজড্ লাগে। এত ওপরে উঠে এলাম কেন? এখনই আবার নেমে যেতে হবে নিচে। সময়ের হিসাব করে আবার ট্রেইল ভেঙে সুরুজ ডোবার আগে ফিরে যেতে হবে ব্যাককান্ট্রি ক্যাম্পের কফিনের মতো ছোট্ট তাঁবুতে। হোয়াই অ্যাম আই ডুয়িং অল দিস? হোয়াট ইজ রিয়েলি দ্য পারপাস? ঠিক বুঝতে পারি না কেন এসব কষ্টসাধ্য হাইকিং করছি এবং এর পেছনে উদ্দেশ্যই বা কী? d

 

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
২১ জুন, ২০১৮ ইং
ফজর৩:৪৩
যোহর১২:০০
আসর৪:৪০
মাগরিব৬:৫১
এশা৮:১৬
সূর্যোদয় - ৫:১১সূর্যাস্ত - ০৬:৪৬
পড়ুন