বিশেষ রচনা
তাঁদের কি মনে রেখেছি?
ফরিদ আহমেদ২১ জুন, ২০১৭ ইং
তাঁদের কি মনে রেখেছি?
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ এবং চট্টগ্রাম মেট্টোপলিটন পুলিশ সংস্থা দুটির নাম সেই শহরের লোকজনের কাছে পরিচিত ছিল, কিন্তু দেশের বাইরের শহরগুলো এ সম্পর্কে খুব একটা জানত না। বাংলাদেশ পুলিশ সারা দেশের পুলিশের কার্যক্রম পরিচালনা করত। থানায় থানায় পুলিশের জন্য আলাদা পোশাকের প্রচলনও হয়নি। পুলিশের কেন্দ্রীয় অফিস ঢাকায়। কেন্দ্রের পুলিশ যে রঙের পোশাক পরেন সারা দেশের পুলিশের পরিধানের পোশাকের রংও তা-ই। পুলিশের বড় একজন কর্মকর্তা আবুল খায়ের মুসলেহউদ্দিন। দেশের বিভিন্ন থানায় দায়িত্ব পালন করেছেন। অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার সমৃদ্ধ। বড় পুলিশ অফিসারের পাশাপাশি তাঁর আর একটি পরিচয় আছে—তিনি একজন লেখক, ঔপন্যাসিক ও গল্পকার। তরুণ বয়সে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল ঘুরে বেড়িয়েছেন। প্রচুর অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছেন এবং এই অভিজ্ঞতার একটি অংশ ঢেলে দিচ্ছেন সাহিত্যে। চোর, ডাকাত, খুনি, অসামাজিক কার্যকলাপের সঙ্গে সম্পৃক্ত মানুষদের খুব ভালো করে কাছ থেকে দেখেছেন তিনি। তাদের চাল-চলন, আচার-ব্যবহার, সুখ-দুঃখ, প্রেম-ভালোবাসা—এগুলোই মুসলেহউদ্দিন সাহেবের লেখার মূল উপজীব্য ছিল।

হোসেইন মুহম্মদ এরশাদের শাসনামলের শেষের দিক। পুলিশের গুরুত্ব দেশে বৃদ্ধি পেয়েছে। ১৯৭৫ সালের পট পরিবর্তনের পর দেশে আর্মির গুরুত্ব বৃদ্ধি পেয়েছিল বলে শুনেছিলাম। তবে গত শতাব্দীর নব্বই দশকের শেষ বছর দুটিতে এরশাদ-বিরোধী আন্দোলনের সময় পুলিশের ব্যস্ততা সবাই দেখেছে। ওই আন্দোলনের সময়টা খুব ভালো করেই উপলব্ধি করেছিলাম। কিছুটা উপভোগও করতাম। ঢাকার আজিমপুরের শেখ সাহেব বাজারে তখন আমার প্রেস কাম প্রকাশনা অফিস। হরতাল-অবরোধের কারণে অনেক ফ্রি সময় কাটত আড্ডা দিয়ে। আড্ডার ফাঁকে ফাঁকে ওই এলাকা থেকে পরদিনের আন্দোলনের পরিকল্পনাগুলো শুনতাম। আবার নিজের প্রকাশনা নিয়েও পরিকল্পনা করতাম। এক-দু বছর হলো ‘সময় প্রকাশন’ যাত্রা শুরু করেছে। কোন কোন লেখকের বই প্রকাশ করা উচিত সে-রকম একটি সংক্ষিপ্ত তালিকাও তৈরি করা হয়েছে। এই তালিকায় আবুল খায়ের মুসলেহউদ্দিন নামটাও আছে। তখন তিনি বাংলাদেশ পুলিশের অতিরিক্ত মহা-পরিচালক। বসেন সচিবালয়ে বাংলাদেশ পুলিশের সদর দপ্তরে। সেই সময়ে আমার লেখক শিকারে সহযোগী শিকারি ছিলেন শিশু-সাহিত্যিক আমীরুল ইসলাম। কী কারণে যেন এই অ্যাডভেঞ্চারে আমীরুল আমাকে সঙ্গ দিলো না বা দিতে পারল না। পরিচিতদের কাছ থেকে মুসলেহউদ্দিন সম্পর্কে খোঁজ-খবর নিলাম। কেউ কেউ বেশ ভীতিমূলক কথাবার্তাও বললেন। একজন একটি গল্পও শোনালেন। গল্পর মূল উত্স একজন সাহিত্য সম্পাদক। একটি দৈনিক পত্রিকার একজন সাহিত্য সম্পাদক। একদিন তিনি টেবিলের ওপর অনেকটা উপুড় হয়ে মনোযোগ দিয়ে কাজ করছেন। হঠাত্ বিকট শব্দে চমকে গেলেন। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখেন পাশে অ্যাটেনশন হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন খাকি পোশাকের এক পুলিশ সদস্য। কোমরে গোঁজা পিস্তল। এই সদস্য মেঝেতে জোরে বুটের বাড়ি দিয়ে সম্পাদক সাহেবকে সেল্যুট ঠুকেছেন। আর এই শব্দেই চমকে গিয়ে সম্পাদক সাহেব কিছুটা ভয়ও পেয়েছেন। পুলিশ সদস্যের দিকে তাকাতেই সম্পাদক সাহেবের দিকে একটি খাম এগিয়ে ধরলেন তিনি। খাম খুলে দেখেন একটা গল্প। তখনকার মতো ড্রয়ারে রেখে দিলেন। দু দিন পর আবারও জোরে বুটের শব্দ। ‘স্যারের লেখাটা কবে ছাপা হবে?’ বুটের শব্দের ভয়ে লেখা ছাপা হয়ে গেল। তবে তখনকার বিভিন্ন পত্রিকার সাহিত্য বিভাগ-সহ ঈদসংখ্যাতেও তাঁর লেখা বেশ গুরুত্ব দিয়েই ছাপা হতো।

আমি তাঁর সঙ্গে দেখা করলাম। বই বের করতে চাই বললাম। অল্প কিছু কথাবার্তার পরই তিনি আরেক দিন আসতে বললেন। সেদিন একটা আস্ত উপন্যাসের পাণ্ডুলিপি হাতে ধরিয়ে দিলেন। নতুন ব্যবসা, পুঁজি কম বিধায় কর্মচারীও কম। তার ওপর সচিবালয়ে পাঠানোর মতো উপযুক্ত কাউকে না পেয়ে আমি নিজেই যেতাম। প্রধান ফটকে গিয়ে আবুল খায়ের মুসলেহউদ্দিনের নাম বললেই এক সেল্যুট ঠুকে ভেতরে নিয়ে যেত। পরিপাটি রুমের এক কোণে বেতের ফলস মুভিং পার্টিশন দিয়ে আড়াল করা স্থানে বসার স্থান। সোফায় গা এলিয়ে বসতাম। ঝকঝকে কাপ-পিরিচে চা-বিস্কুট আসত। চা পান করতে করতেই কখনও লেখক এসে আমার সঙ্গে চা পানে যোগ দিতেন। অতিরিক্ত ব্যস্ততার কারণে কখনও দেরি হতো। কিন্তু দেখা করতেন। প্রকাশককে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি ভালো লাগত। আমি তখন খুবই তরুণ এবং নতুন প্রকাশক। ফেব্রুয়ারি ১৯৯০ বইমেলায় সময় প্রকাশন থেকে আবুল খায়ের মুসলেহউদ্দিনের লেখা উপন্যাস ‘অসতী’ বের হলো। নতুন বই নিয়ে তাঁর অফিসে যাবার পর মিষ্টি এনে খাওয়ালেন। খুব আস্তে করে শুধু বললেন, ‘বইটা ভালোই হয়েছে। ফন্টটা আর একটু ভালো হলে ভালো হতো।’

আরও অন্তত এক দশক আগে থেকে এই লেখকের বই বের হচ্ছে। প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যাও অর্ধ শতক ছাড়িয়ে গেছে। পাঠক ও লেখক-মহলে একটি ভালো পরিচিতি আছে। কোনো কোনো বই ভালো বিক্রি হয়েছে। একসময় তিনি পুলিশের মহাপরিদর্শক পদে আসীন হয়ে অবসরে যান। এর পরও আরও অনেক বছর তিনি দেশেই ছিলেন কিন্তু সাহিত্যাঙ্গনে তাঁর উপস্থিতি ছিল না। অনেকে বলতেন তিনি ইচ্ছা করেই নিজেকে সরিয়ে রেখেছেন। কেউ কেউ বলতেন তাঁর পরিচারিকার সঙ্গে নতুন সংসার করায় পরিবার আত্মীয়দের থেকেও নিজেকে সরিয়ে রেখেছিলেন। তবে তখনকার লেখকদের সঙ্গে খুব একটা ওঠা-বসা তাঁর ছিল না। হয়তো বা নিজেদের সার্কেলেই সীমাবদ্ধ রেখেছিলেন নিজেকে। আস্তে আস্তে আমাদের স্মৃতি থেকেও মুছে যেতে লাগলেন আবুল খায়ের মুসলেহউদ্দিন। এখনকার পাঠক কেউ কি পড়েছেন তাঁর বই? নতুন প্রজন্মের প্রকাশকরা ক’জনাই বা জানেন তাঁর নাম?

 

২.

প্রচারে যেমন প্রসার। পণ্যের পর্যাপ্ততা তেমন বাজার সৃষ্টির সহায়ক। নতুন লেখকের নতুন বই সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে দেওয়া হলে বিক্রি হয়। এরকম একটা উদাহরণ আমাদের সম্মুখে রেখে গিয়েছিলেন এক প্রকাশক কাম লেখক। ১৯৯১ সালের পরের ঘটনা। ‘নিশাত চৌধুরী’ নামের এক লেখকের বই ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ হতে লাগল ‘বাংলাদেশ বুক হাউস’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান থেকে। এটার কর্ণধার ছিলেন গোলাম আলী। মধ্য বয়স্ক ভদ্রলোকের মাথায় চুল ছিল না বললেই চলে। সামনের অংশের টাক বেশ দৃশ্যমান ছিল। বেশ সামাজিক ছিলেন তিনি। মানুষজনের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারতেন। সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দরপত্রের মাধ্যমে বই সরবরাহ ছিল এই প্রতিষ্ঠানের মূল ব্যবসা। সরবরাহের পাশাপাশি ডিস্ট্রিবিউশন চ্যানেলও গড়ে তোলেন তাঁরা। বাংলাবাজারে একটি বিক্রয়কেন্দ্রও ছিল। এরপর শুরু করেন প্রকাশনা। জনপ্রিয় অনেক লেখকের বই তখন বের হয় ওই প্রতিষ্ঠান থেকে। তরুণ, প্রবীণ, নতুন, জনপ্রিয়—সব ধরনের লেখকের একটা আড্ডাস্থলও ছিল ওই প্রতিষ্ঠানের অফিস। সারা বাংলাদেশে বই মার্কেটিংয়ের একটি ভালো চ্যানেলও গড়ে তোলেন। এই প্রকাশনা থেকে বের হচ্ছে নতুন লেখক ‘নিশাত চৌধুরী’র বই। বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ছড়িয়ে পড়ছে বইয়ের দোকানগুলোতে। পর পর অনেকগুলো বই বের হয়ে গেল একই প্রতিষ্ঠান থেকে। এটা কোনো লেখকের জন্য সুনামের নয়—সম্ভবত এই ধারণা থেকেই তাঁরা নিশাত চৌধুরীর বই ছড়িয়ে দিতে লাগলেন। কয়েকজন প্রকাশকও পেয়ে গেলেন যারা নিশাত চৌধুরীর বই বের করলেন। আমার কাছে অফার (প্রস্তাব) এল। এক সিনিয়র প্রকাশক ভাই ফোন করে বললেন, ‘ফরিদ, নিশাত চৌধুরীর দুটি বই আপনার প্রকাশনা থেকে বের হবে।’ কী বলব বুঝতে পারছিলাম না। আমার নীরবতা দেখে উনি বললেন, ‘আপনাকে কিছু করতে হবে না। বাঁধাই করা দুই শত বই আপনার বিক্রয়কেন্দ্রে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। কোনো খরচপাতি দিতে হবে না। বই বিক্রি করে যদি ইচ্ছা হয় তবে বইয়ের দাম দিয়েন।’ এখনও আমি নিশ্চুপ। ‘দুটি আইএসবিএন নম্বর পাঠিয়ে দিয়েন।’ আইএসবিএন নম্বর প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের জন্য আলাদা আলাদা হয়ে থাকে। এমনকি প্রতিটি বইয়ের জন্যও শেষের সংখ্যাগুলো ভিন্ন ভিন্ন হয়। নিশাত চৌধুরীর বই বের করার ইচ্ছা আগেও আমার ছিল না এখনও আগ্রহ তৈরি হলো না। যে লেখককে কোনোদিন দেখিনি, পরিচয় জানি না তার বই কেন প্রকাশ করব? আমি নয় কেউই তখন পর্যন্ত নিশাত চৌধুরীকে দেখেনি। নামে মহিলা মনে হয়, কিন্তু মহিলা না পুরুষ তাও কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারে না। হয়তো বা কেউ কেউ তাকে চিনত, কিন্তু তারা এই লেখকের পরিচয় গোপন রেখেছিল। এমন রহস্যময় লেখকের বই না-ই-বা বের করলাম। সেই বড় ভাইকে আইএসবিএন নম্বর আর দেওয়া হয়নি।

লেখককে চোখে না দেখলেও তাঁকে নিয়ে সৃষ্ট গল্প চলছিল ভালোই। কেউ কেউ বলছিলেন ওই প্রকাশনার নিয়োগকৃত কিছু লেখক আছেন যাঁরা বই লেখেন পারিশ্রমিকের বিনিময়ে। বই লিখে প্রকাশককে পাণ্ডুলিপি হস্তান্তর করে নিজের পাওনা নিয়ে বিদায় হন। প্রকাশক নিজের আবিষ্কৃত অদৃশ্য লেখকের নামে ওইসব বই বাজারে ছাড়েন। প্রথম দিকে নিজের প্রকাশনা থেকে এককভাবে বের করেন। পরে নিজের বলয়ে অন্তর্ভুক্ত করে নেওয়া বেশ কয়েকটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান থেকেও ওই লেখকের বই বাজারে ছাড়তে থাকেন। নিজেদের বুদ্ধিমত্তা, মার্কেটিং এবং প্রচারের কারণে প্রসার ঘটতে লাগল। বই বিক্রি বৃদ্ধি পেল। আমার মতো দুয়েকজন ছাড়া আমার পরিচিত প্রায় সব প্রকাশকই ওই লেখকের বই বের করলেন। প্রথম দিকে ফ্রি বই পাওয়া গিয়েছিল পরে যখন লেখকের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পেল তখন অগ্রীম রয়েলটি পরিশোধ করে পাণ্ডুলিপি এনে নিজের খরচায় বই প্রকাশ করতে হতো অন্য প্রকাশকদের। ব্রিটিশদের ফ্রি চা পান করাবার গল্পের মতো। প্রথমে প্রকাশকের ঘরে ঘরে বই পাঠিয়ে দেওয়া হতো পরে এই প্রকাশককেই অগ্রিম রয়েলটি পরিশোধ করে পাণ্ডুলিপি নিয়ে আসতে হলো।

বাংলাদেশ বুক হাউসের কর্ণধার গোলাম আলী বড় পার্টি দিলেন। নিশাত চৌধুরীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হবে অতিথিদের। মিরপুর রোডে তার কার্যালয়ের উন্মুক্ত স্থানে প্যান্ডেল তৈরি করা হলো। লেখক-প্রকাশক-বিক্রেতারা আমন্ত্রিত। পোলাউ-কোর্মার ডিনার। রীতিমতো ভূরিভোজন। সেই পার্টিতেই গোলাম আলী নিজেকে পরিচয় করালেন নিশাত চৌধুরী হিসেবে। সবাই জানলেন গোলাম আলী নিজেই এতদিন এতগুলো বই লিখেছেন আর বিনয়ের সঙ্গে নিজেকে আড়াল করে রেখে নিশাত চৌধুরী নামে বই বাজারে ছেড়েছেন। কোনো কোনো মাসে দুই-তিনটি বইও প্রকাশ পেয়েছে। এত ক্ষতমাধর একজন লেখক আমাদের মাঝেই ছিলেন? কিন্তু আমরা চিনতে পারিনি? ঘোষণা দেওয়ার মুহূর্তটি কেমন ছিল তা দেখার সৌভাগ্য আমার হয়নি, কারণ আমি আমন্ত্রিতদের তালিকা থেকে বাদ পড়েছিলাম। বাদ পড়াই উচিত, যে প্রকাশক শুধুমাত্র আইএসবিএন নম্বর প্রদান করেও বইয়ের প্রকাশক হতে রাজি হননি তাকে নিমন্ত্রণ করার কোনো যুক্তিই থাকতে পারে না।

নিশাত চৌধুরী আত্মপ্রকাশ করলেন পুরুষ লেখক হিসেবে। কিন্তু এরপর থেকে ক্রমেই তাঁর বই বিক্রি কমে যেতে লাগল। একসময় দেখলাম বাংলাবাজারের বিক্রয়কেন্দ্র বিক্রি করে দেওয়া হলো। তারও কিছুদিন পর জানতে পারলাম প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। নিশাত চৌধুরী হারিয়ে গেলেন। এক দশকের মধ্যে শুরু, উত্থান এবং পতন। বর্তমান প্রজন্মের লেখকরা কি নিশাত চৌধুরীর বই পড়েছেন বা দেখেছেন? আর নতুন প্রজন্মের প্রকাশকরা কি কেউ এই নামটির সঙ্গে পরিচিত?

 

৩.

বইয়ের প্রচারের নতুন কৌশল দেখে স্তম্ভিত হয়ে গেলাম প্রকাশক ও লেখককুল। পোস্টারে পোস্টারে ছেয়ে দেওয়া হয়েছে বইমেলা প্রাঙ্গণ। বাংলা একাডেমির বাউন্ডারি দেয়াল থেকে শুরু করে মেলা প্রাঙ্গণের যেখানেই পোস্টার সাঁটানোর জন্য খালি দেয়াল বা ওই ধরনের জায়গা পাওয়া গেছে সেখানেই লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। মেলা প্রাঙ্গণের বাইরে যাতায়াতের পথও বাদ যায়নি। লেখকের সুদর্শন বিশাল মুখাবয়বের ছবি আর দুটি বইয়ের প্রচ্ছদপট সম্বলিত পোস্টার।

সিলেট শহরের সন্নিকটেই লাক্কাতুরা চা-বাগান। ঢাকার বাইরে বইমেলা করতে হলে প্রকাশকদের প্রথম পছন্দ থাকত সিলেট শহর। রথ দেখা আর কলা বেচা একসঙ্গে। সিলেট পর্যটন শহর। এখানে ঘুরে বেড়াবার আনন্দই আলাদা। আর সিলেট শহরে বেড়াতে গিয়ে চা-বাগান না দেখে ফিরে আসা কি চলে? শহরের উপকণ্ঠেই আছে মালিনিছড়া ও লাক্কাতুরা চা-বাগান। যেকোনো একটায় তো যেতেই হবে! ১৯৯১ সালের নভেম্বর মাসে সিলেটে বইমেলা। প্রকাশক সমিতির আয়োজনে। ঢাকা থেকে মেলা পরিচালনার মূল দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বিদ্যাপ্রকাশের প্রকাশক মজিবর রহমান খোকাকে। তার সঙ্গে সহযোগিতায় আছি আমি আর অনন্যার প্রকাশক মনিরুল হক। আমরা সিলেট শহরের হোটেলে থাকি, মেলার দেখভাল করি। অনুষ্ঠানের আয়োজন করি। ঢাকা থেকে লেখক আসেন তাঁদের আতিথেয়তার ব্যবস্থা করি। আর অবসর সময়ে স্থানীয় সাহিত্যপ্রেমীদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাত্ আড্ডাবাজি চলে। অবসর সময়ে ঘুরেও বেড়াই। সাহিত্যপ্রেমীরা নিজেদের থেকেও অনেকে আমাদের সঙ্গ পছন্দ করে মেলামেশা করেন। সে-সময় লাক্কাতুরা চা-বাগানের ম্যানেজার ছিলেন ওয়াদুর রহমান (নামের বানানে কিছুটা ত্রুটি হতে পারে। অনেক পুরনো ঘটনা, সঠিক বানান মনে নেই। আবার এটাই সঠিক বানান হতে পারে। নাম যাচাই করার জন্য এক প্রকাশক-বন্ধুকে ফোন করলাম যে নিজে ওই লেখকের একটি বই প্রকাশ করেছেন। বইটা খুঁজে না পাওয়ায় সঠিক বানান সেও বলতে পারল না। তবে ওয়াদুর রহমান বলেই আমরা দুজন মনে করছি)। ম্যানেজার সাহেব খুব সাহিত্যপ্রেমী। নিজেও লেখালেখি করেন। যদিও সিলেটের ওই সফরের আগ পর্যন্ত আমি তাঁর নাম জানতাম না। মেলা উপলক্ষে ঢাকা থেকে লেখক আসছেন সিলেট। ভোর রাতে ট্রেন আসবে। সিলেটে তখন নভেম্বর মাসেই বেশ শীত পড়ত। স্টেশন থেকে লেখককে আনার জন্যে গাড়ি প্রয়োজন আবার রাতে স্টেশনে পৌঁছে দেবার জন্যেও গাড়ি দরকার। ওয়াদুর রহমানের চা-বাগানের সেই আমলের নিশান জিপ গাড়ি শেষ রাতে আমাদের হোটেলের সামনে এসে হাজির। হাফ প্যান্ট পরা ড্রাইভার শীতের মধ্যে পা সোজা করে দাঁড়িয়ে আছে। লেখক সময় দিতে রাজি হলে তাদের ওই বাগানে ডিনারের দাওয়াতও খাওয়ানো হতো উপযুক্ত পানীয় ও জম্পেশ আড্ডা সহযোগে। চা-বাগানে কঠিন পানীয় অনুমোদিত এবং পর্যাপ্ত। সুতরাং শৌখিন পানাসক্তদের একটা আড্ডা সেখানে থাকত। চা-বাগানের ম্যানেজার হিসেবে নয়, সৃজনশীল লেখক বা একজন ঔপন্যাসিক হিসেবে তিনি আমাদের প্রকাশক ও লেখকদের অনেক খাতির-যত্ন করলেন। একসঙ্গে অনেক প্রকাশক ও লেখকের সঙ্গে পরিচয় হলো, এটা ছিল তাঁর প্রাপ্তি। যা বুঝতে পেরেছিলাম পরবর্তী বইমেলাগুলোতে।

এক বছর বইমেলার আগে দুয়েকবার তাঁর সঙ্গে দেখা হলো হুমায়ূন আহমেদের বাসায়। আগে এই বাসায় তাঁকে কখনও দেখিনি। এসেছেন হুমায়ূন ভাইয়ের কাছ থেকে একটা লেখা নেওয়ার জন্যে। তাঁর উপন্যাসের প্রত্যায়নপত্র বলা যেতে পারে। শুধু হুমায়ূন আহমেদ নয়, এরকম বেশ কয়েকজন লেখকের কাছ থেকে কয়েক লাইনের প্রত্যয়ন নিয়েছিলেন তিনি। সম্ভবত সেই লেখাগুলোও স্থান পেয়েছিল তাঁর মুখাবয়ব ও প্রচ্ছদপটের সঙ্গে পোস্টারে। বইমেলায় তখন প্রতিদিন যাতায়াত করতেন লেখকরা। বিকেলের পর থেকে মেলা জমে উঠত লেখকদের পদচারণায়। হুমায়ূন আহমেদ সন্ধ্যার পরে আসতে ভালোবাসতেন। এক সন্ধ্যায় মেলায় হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে দেখা করতে এলেন ওয়াদুর রহমান। তাঁকে দেখে হুমায়ূন আহমেদ তাঁর স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে বললেন, ‘কী ভাই! আপনি লাক্স সাবান না কি? নিজেকে মোড়কে মুড়ে দিয়েছেন সারা মেলাজুড়ে!’ তখন ওই লেখক কী উত্তর দিয়েছিলেন বা আদৌ কোনো উত্তর দিয়েছিলেন কি-না তা মনে নেই। এমনকি তাঁর মুখের ভাবভঙ্গি তখন কেমন ছিল তাও মনে নেই।

খুব অল্প কয়েকজন প্রকাশক আর নিজস্ব গণ্ডির কিছু পাঠক ছাড়া ওই লেখককে কে আর মনে রেখেছে?

 

৪.

আমরা ভুলে গেছি শিরিন মজিদকে। তিনিও ছিলেন স্বল্পসংখ্যক প্রকাশকের লেখক। নওরোজ কিতাবিস্তানের কর্ণধার কাদির খানের প্রচেষ্টায় তাঁদের সমসাময়িক কয়েকজন প্রকাশক একত্রিত হয়ে এই লেখকের বেশকিছু বই বের করেছিলেন। তাদেরই একজনকে ফোনে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনাদের ঘনিষ্ঠ একজন মহিলা লেখক ছিলেন তাঁর নামটা যেন কী?’ কিছুটা সময় নিয়ে মনে করে বললেন, ‘শিরিন মজিদ’। ‘তিনি এখন কোথায়? তাঁর বই এখন পাওয়া যায় কি?’ এরকম আরও কিছু প্রশ্নের সঠিক উত্তর প্রায় চল্লিশ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন প্রকাশকের কাছেও নেই। তিনি বললেন, ‘কাদির খানের আগ্রহে আমরা তাঁর বই বের করেছিলাম। কাদির ভাই মারা যাওয়ার পর আর খোঁজ রাখা হয়নি।’

নওরোজ কিতাবিস্তান, স্টুডেন্ট ওয়েজ, খান ব্রাদার্স, কাকলী প্রকাশনী থেকে একযোগে এক বইমেলায় শিরিন মজিদের চারটি বই বের হয়েছিল। কাদির খানের উদ্যোগে সম্মিলিত ফান্ডের মাধ্যমে বেশ বিজ্ঞাপনও করা হয়েছিল। তাঁরা প্রকাশকের সংখ্যা বৃদ্ধি করে এই লেখকের জনপ্রিয়তা সৃষ্টির জন্য বেশ চেষ্টা করেছিলেন। অল্প সময়ের জন্য কিছু বই বিক্রি হয়ে থাকতেও পারে, কিন্তু বেশিদিন এই লেখককে পাঠক মনে রাখেননি।

 

৫.

সরকারি কর্মকর্তা, বিশেষ করে কাস্টমস কর্মকর্তাদের লেখালেখির আগ্রহ একসময় দেশে খুব বৃদ্ধি পায়। ফিকশন, নন-ফিকশন উভয় শাখাতেই পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন তাঁরা। ফকির আশরাফের নাম অনেকেরই মনে আছে। বিপুলভাবে সোনা চোরাচালান পাকড়াও করে প্রথম মিডিয়ার মাধ্যমে দেশবাসীর আলোচনায় আসেন। আমার যতদূর মনে পড়ে চোরাচালান পাকড়াও করেছিলেন অনেকগুলো, কিন্তু চোরাচালানি একজনকেও পাকড়াও করেছিলেন কি-না মনে করতে পারছি না। সে-সময়ের জনপ্রিয় বিনোদন সাপ্তাহিক ‘বিচিত্রা’য় সোনা চোরাচালান নিয়ে তাঁর লেখা অনেক বড় এক প্রতিবেদন ছাপা হয়। তখন তিনি এদেশে মোটামুটি ‘হিরো’তে পরিণত হয়ে যান। পরে এ নামে তাঁর একটি বইও বের হয়েছিল বলে আমার মনে হচ্ছে।

সাপ্তাহিক বিচিত্রাতে ওই সময় লেখা ছাপা হওয়া মানে সৃজনশীল মহলে তাঁর কদর বেড়ে যাওয়া। বিচিত্রা, রোববার, ছাড়াও আরও কয়েকটি দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য বিভাগ তখন খুব জনপ্রিয়। আর তাই এসব পত্রিকায় গল্প ছাপানোও কাঙ্ক্ষিত হওয়াই স্বাভাবিক। সে-সময়েই শোনা যেত লেখার মানের সঙ্গে সঙ্গে লেখকের দামও বিবেচ্য বিষয় অনেকের কাছে। সংশ্লিষ্ট একজন তরুণ সাংবাদিকের কাছ থেকে শুনেছিলাম কোনো কোনো পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদকদের বাসায় ভিসিপি আর সোনার চেইন চলে যায়। ভিসিপি (ভিডিও ক্যাসেট প্লেয়ার) যন্ত্রটি তখন একরকম অতি জরুরি পণ্যে রূপ পেতে চলেছিল। প্রতিটি মধ্যবিত্ত বাসায় এ যন্ত্রটি যেন থাকতেই হবে। বিনোদনের অনেক বিকল্প তখন না থাকায় এরকমটি হয়ে থাকতে পারে। যন্ত্রটির দাম খুব বেশি না থাকলেও সকলের কেনার সাধ্য ছিল না। আর ফ্যাশনের জন্য বিদেশি মেশিনে তৈরি সোনার চেইনের কদরও তখন প্রায় কিংবদন্তিতুল্য ছিল। দুবাই বা সিঙ্গাপুরের তৈরি সোনার চেইন গলায় পরে জামার ওপরের কয়েকটা বোতাম না লাগিয়ে খোলা বুকে চেইন দেখিয়ে হেঁটে বেড়ানো সবচে জনপ্রিয় ফ্যাশন ছিল। ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রায়ই এসব পণ্যের চোরাচালান ধরা পড়তে দেখতাম। বিটিভির খবরে দেখা যেত চকচকে মুখের শুল্ক কর্মকর্তারা নায়কসুলভ ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছেন আর তাঁদের সামনে সারি করে রাখা হয়েছে পণ্যগুলো। এগুলো তারাই পাকড়াও করেছেন। এই পণ্যের কোনো মালিক পাওয়া যায়নি।

উপঢৌকন দেওয়া এবং নেওয়া অনেকটা ছোঁয়াচে রোগের মতো। অমুক লেখক সম্পাদককে গিফট দিয়েছে, আমিও দেই এবং ওটার চেয়ে উন্নত কিছু। পাওয়াটাও এরকমই প্রভাব ফেলে। ওই সম্পাদক নিয়েছেন, আমি নিলে অসুবিধা কী? এই রোগের প্রকোপ ছড়িয়ে পড়েছিল বাংলাবাজারেও। কোনো কোনো লেখকের বই প্রকাশ করলে রয়্যালটি তো দিতে হয়ই না বরং বিদেশি গিফট পাওয়া যায়। লেখার মান নিয়ে এত ভাবনা করে কী হবে? তাছাড়া লেখার মান যে খুব খারাপ তাও নয়। অনেক ভালো ভালো লেখক-সম্পাদকরাই তাদের লেখাগুলো কারেকশন, সম্পাদনা ইত্যাদি ইত্যাদি করে দিচ্ছেন। সমালোচকরা বলতেন, কারেকশন বা সম্পাদনা নয়, তাঁরাই লিখে দিচ্ছেন। এই ‘তাঁদের’ তালিকায় যাঁদের নাম শোনা যেত তাঁদের নিজের নামে লেখা বই কিন্তু বাজারে তেমন বিক্রি হতো না। আর তাঁরা যাঁদের লেখাটা লিখে দিয়েছেন বলে শোনা যেত ওই সব লেখকের বই একসময় বেশ চলেছে।

ফেব্রুয়ারি বইমেলা সব সময় লেখক-প্রকাশক-পাঠকের জন্য উত্সবের মতো। মেলার স্টলে বসে গল্প করা, আড্ডা দেওয়া, আনন্দ করা নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার ছিল। ২০০৩-০৪ সালের কথা। ‘সময় প্রকাশন’-এর স্টলে নিয়মিত বসেন লেখক আনিসুল হক। বইমেলা জুড়ে বিরাজ করে নতুন বইয়ের ক্রেজ। অফিস থেকে বের হয়ে সোজা বইমেলায় চলে আসেন আনিসুল হক। কোথাও সময় নষ্ট করেন না। কোনো কোনো দিন মেলায় ঘুরতে হয়, কারণ পত্রিকার জন্য প্রতিবেদন লিখবেন। তবে অধিকাংশ দিনই এ দায়িত্ব থাকে না। তখন স্টলে বসে অটোগ্রাফ দেন। তাঁর ঠিকানা হয়ে গিয়েছিল ‘সময় প্রকাশন’। সন্ধ্যার পর মেলায় আসতেন লেখক প্রণব ভট্ট। পত্রিকার পাতায় ব্যাপকভাবে নিজের বইয়ের বিজ্ঞাপন ছাপিয়ে সবার নজর কেড়েছেন অনেক আগে থেকেই। কাস্টমস কর্মকর্তা এই লেখকের বন্ধুর সংখ্যা ছিল বিশাল। খুব বন্ধুবত্সল লোক ছিলেন। বন্ধুদের উপহার দিতে ভালোবাসতেন। প্রয়োজনে পরিচিতদের সাহায্য সহযোগিতাও করতেন একজন দানবীরের মতো। খোলা মনের মানুষ। হো হো করে মুখ খুলে হাসতেন আর বুক খুলে কথা বলতেন। বইমেলায় তিনিও একটি নির্দিষ্ট স্টলে বসতেন। তবে প্রতিদিনই একবার করে ‘সময়’-এর সামনে এসে আনিসুল হককে বলতেন, ‘প্রতিযোগিতা চলছে আপনার আর আমার মধ্যে। হুমায়ূন ভাইয়ের পর আর কারো বই চলে না। আমার আর আপনার মধ্যে দ্বিতীয় আর তৃতীয় স্থান।’ আমার দিকে তাকিয়ে বলতেন, ‘সামনের বার আপনাকে একটা বই দেবো। ‘সময়’ থেকে আমার আর আনিসুল হকের বই একসঙ্গে বের হবে। আপনাকে আমার খুব ভালো লাগে।’ যেদিনই আসতেন সেদিনই এই কথা বলতেন এবং প্রতি বছরই একাধিকবার বলেছেন। কিন্তু মেলার শেষে অনুষ্ঠানাদি ছাড়া এই ভদ্রলোকের সঙ্গে আমার দেখা হতো না। আমি কোনোদিন তাঁর সঙ্গে দেখা করিনি বা তাঁকে ফোন করিনি। এই দুঃখটা একবার তিনি প্রকাশ করলেন। এবং এটাও জানিয়ে দিলেন যে অনেকদিন ধরে এই তথ্যটি আমাকে বলবেন বলবেন করে ভেবেছেন, কিন্তু বলতে পারেননি।

বাংলাবাজারে প্রকাশকের ঘরে সরাসরি বই চলে গেছে। এরকম উদাহরণ এই লেখকের ক্ষেত্রেও শুনেছি। শুনেছি অনেক কিছুই, কিন্তু আমি যা চোখে দেখেছি তা সবাই দেখেছে। ততদিনে মিডিয়ার সংখ্যা বেড়ে গেছে। দৈনিক পত্রিকার সঙ্গে সঙ্গে টিভি চ্যানেলও হয়েছে বেশ কয়েকটা। সাপ্তাহিক, পাক্ষিক তো আছেই। প্রায় সবগুলো হার্ড প্রিন্ট মিডিয়ায় ফেব্রুয়ারি মাস জুড়ে নিয়মিতভাবে অনেক বড় আকারে বিজ্ঞাপন দেখা যেত তাঁর বইয়ের। এই বিজ্ঞাপন কাজে দিয়েছিল। তাঁর একটি পাঠকশ্রেণি গড়ে উঠেছিল। নতুন বইয়ের ১ম, ২য়, ৩য় মুদ্রণও শেষ হচ্ছিল বইমেলায়।

একদিন একটি অনুষ্ঠান থেকে পাকড়াও করে শান্তি নগরের অ্যাপার্টমেন্টে নিয়ে গেলেন আমাকে। খুবই আবেগপ্রবণ মানুষ। অতিথির আদর-যত্ন করতে খুব ভালোবাসেন। একদিন শান্তি নগর কাঁচা বাজারে গেছেন। বেশ ভালো তাজা ছোট মাছ পেয়ে গেলেন অনেকগুলো। এত ভালো ছোট মাছ সচরাচর পাওয়া যায় না। তাই সবগুলো কিনে ফেললেন। যে যে বন্ধু ছোট মাছ পছন্দ করেন তাঁদের বাসায় পাঠিয়ে দিলেন। এরকম অনেক বন্ধুবাত্সল্যের গল্প তাঁর মুখেই শুনেছি। সেদিন রাতেই আমাদের কথা ফাইনাল হলো, ‘সামনের বইমেলায় আমার প্রথম বইটা আপনাকে দেবো।’ আমিও বললাম, ‘এই মেলায় আপনার বই আমি বের করবই।’ হাসিঠাট্টার মধ্য দিয়ে বিদায় নিলাম। এরপর আরও কয়েকদিন যেতে হয়েছে তাঁর বাসায়। ৯টা-৫টা অফিস শেষ করে বাসায় এসে ঘুমিয়ে পড়েন। সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত ঘুমান। এটা তাঁর বিশ্রাম। এরপর কোথাও বের হন অথবা বাসায় অতিথি এলে গল্প করেন। রাতে লিখতে বসেন। জীবন-যাপনে শৌখিনতার ছাপ ছিল স্পষ্ট। আলাদা লেখার রুম ছিল। আলাদা টেবিলে বসে কাগজে কলমে লিখতেন। যদিও তাঁর হাতের লেখা পাণ্ডুলিপি আমি কখনও পাইনি বা দেখিনি। অন্য প্রকাশকদেরও তিনি হাতে লেখা পাণ্ডুলিপি দিতেন না। তাঁর নিজস্ব একজন লোক ছিল তাকে দিয়ে কম্পিউটার কম্পোজ করিয়ে প্রুফ দেখিয়ে সম্পাদনা করিয়ে ফাইনাল ট্রেসিং প্রকাশকের হাতে ধরিয়ে দিতেন।

প্রণব ভট্টর সঙ্গে আমার জার্নিটা দীর্ঘ হতে পারেনি। তবে অন্তরঙ্গতা হয়েছিল। ২০০৭ সালে হঠাত্ করেই তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। সকালেও একবার নর্সিং হোমে গিয়ে চেক আপ করিয়ে এসেছিলেন। বিকেলে আবার যাওয়ার কথা ছিল। গিয়েও ছিলেন কিন্তু পায়ে হেঁটে ফিরতে পারেননি। খাটিয়া করে বাসায় ফিরতে হয়েছে। অনেকে বলতেন—সে-সময়কার তত্বাবধায়ক সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড এবং পদক্ষেপের কারণে খুব চাপের মধ্যে ছিলেন এই লেখকও। আত্মসম্মান রক্ষার মানসিক চাপ হয়তো আর সহ্য করতে পারেননি। বিল্ডিংয়ের নিচতলার লবিতে শুয়ে থাকা নিসাড় দেহ দেখে ফিরে আসার আগে কথা হলো একজন খুব পরিচিত সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও রাজনীতিবিদের সঙ্গে। তিনিও লেখককে দেখতে এসেছেন। বলছিলেন, মাঝেমধ্যেই তাঁর হাতে প্যাকেট ধরিয়ে দিয়ে বলতেন, ‘এলাকায় যাচ্ছেন তো, এটা রাখেন। কাজে লাগবে।’ পরোপকার িএই সৃজনশীল লেখক আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন দশ বছর আগে। এই স্বল্প সময়েই আমাদের স্মৃতি ঝাঁপসা হয়ে আসছে। ফেব্রুয়ারি বইমেলায় কোনো পাঠক কি খুঁজে বেড়ায় এই লেখকের কোনো বই? কিংবা আমরা যে-সব প্রকাশক তাঁর কাছের মানুষ ছিলাম, আমাদের হয়ে, তাঁর বইয়ের নামের সঙ্গে আমাদের প্রকাশনার নামকেও পরিচিত করার জন্য অনেক অনেক বিজ্ঞাপন করেছেন নিজ উদ্যোগে, এখন আমরা কি তাঁর কোনো বইয়ের বিজ্ঞাপন বা প্রচারের জন্য কোনো কিছু করি? d

 

 

 

 

 

 

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
২১ জুন, ২০১৮ ইং
ফজর৩:৪৩
যোহর১২:০০
আসর৪:৪০
মাগরিব৬:৫১
এশা৮:১৬
সূর্যোদয় - ৫:১১সূর্যাস্ত - ০৬:৪৬
পড়ুন