গল্প
নিশির নৈঃশব্দে
হেনা সুলতানা২১ জুন, ২০১৭ ইং
নিশির নৈঃশব্দে
সকাল বেলাটায় ঘুম থেকে উঠে এত ছোটাছুটি করতে ইচ্ছে করে না তার। এমনিতেই সে ঘুমকাতুরে। বিদেশি এনজিওর চাকরি। নিয়মের বাঁধাবাঁধি। সকালবেলায় সবকিছু সেরে অফিসের উদ্দেশে রাস্তায় নামা মানেই একরকম ঘোড়ার রেসে নামা। ছোটার যুদ্ধটাও কম নয়। যানজটের কারণে একটা দিনও ঠিক সময়মতো বাস পাওয়া যায় না। দৌড়ঝাঁপ করে বাসে উঠলেও সিট পাওয়া দুষ্কর। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আধাঘণ্টার রাস্তা পার করতে হয় দেড় ঘণ্টায়। বাসের ভিতরের লোকগুলোও যেন অসভ্যতার সীমা ছাড়ায়! পুরুষ যাত্রী থেকে শুরু করে বাসের হেলপার-কন্ডাক্টর কারো হাত থেকে রেহাই নেই, যেন বাসে উঠা নারী এজমালি সম্পত্তি। প্রতিবাদ করে দেখেছে। লাভ হয় না। উল্টো বাজে কথা শুনতে হয়। যাদের কোনো উপায় নেই তারাই তো বাসে ওঠে! আর তাতেই সকালবেলাতেই মেজাজ খিঁচড়ে যায়। সেই খিঁচড়ানো মন নিয়ে কতক্ষণ কাজ করা যায়? ফেরার পথটা তো আরও প্রাণান্তকর। আর বর্ষা-বাদল থাকলে তো কথাই নেই, একেবারে ল্যাজে-গোবরে অবস্থা। যেদিন সময় থাকে, ফেরার পথে বাসে না উঠে হাঁটতে শুরু করে। উপমা তাই দশটা-পাঁচটার চাকরিটা ছেড়ে দিয়ে থম ধরে বাসায় বসে থাকে বেশ কিছুদিন। কী করবে তখনো ঠিক করতে পারছিল না। কিন্তু কিছু তো একটা করতেই হবে। দুটো মাত্র পেট তাদের। সেই দুটো পেট নিয়ে সে যে খুব চিন্তিত, তা নয়। চালিয়ে নেয়া যাবে সে যেকোনো রকমে হোক। দিন তো থেমে থাকে না, কতভাবেই তো দিন কেটে যায় মানুষের।

—উপু... উপু, কোথায় থাকিস আমাকে ছেড়ে?

এরপর আর কোনো কথা নেই। গলার ভিতর থেকে ঘড়ঘড় করে শব্দ হচ্ছে, সেই সঙ্গে বড় বড় নিঃশ্বাস। বেলকনি থেকে আসতে যতক্ষণ, এর ভিতরেই খাটের উপর উবু হয়ে বমি করতে শুরু করেছে মা। দেখে খুব ভয় পেয়ে যায় উপমা।

— মা, মা এই তো আমি।

বলতে বলতে মায়ের বুক পিঠ চেপে ধরে রাখে কিছুক্ষণ। মা বড় বড় শ্বাস নিতে থাকে। মায়ের এ অবস্থা দেখলে উপমার বড় কষ্ট হয়। চোখে মুখে পানি দিয়ে সব পরিষ্কার করে এক ঢোঁক জল খাইয়ে দেয় মাকে। মায়ের তাতে মন ভরে না। আরও খেতে চায়। জলের গ্লাস ছাড়ে না। কিন্তু মাকে জল খেতে হয় খুব হিসাব করে। প্রতিবারই কথাটা বোঝাতে হয়। মা যে বোঝে না, এমন নয়। বিছানার চাদর পাল্টে ছোট বাচ্চা মেয়ের মতো আদর করে বিছানায় শুইয়ে দেয় মাকে। তারপর মায়ের কাছে বসে আস্তে আস্তে তার বুকে পেটে হাত বুলাতে থাকে উপমা। মাকে ছেড়ে সে এক মুহূর্তের জন্য কোথাও যেতে চায় না। কোলবালিশটা মায়ের কোলের কাছে দিয়ে ও খুব আস্তে ধীরে উঠে পড়ে খাট থেকে।

মায়ের বোধহয় এখন একটু আরাম বোধ হচ্ছে। চোখ বুজে আছে। পাণ্ডুর মুখটার দিকে অপলক তাকিয়ে থাকে সে। একটু পরপর বড় বড় নিঃশ্বাস ছাড়ে মা। গত মাসে চেকাপে ধরা পড়ল বাকি কিডনিটাও অকেজো হতে বসেছে। ভিতরে ভিতরে কেঁপে উঠেছিল উপমা। কিন্তু মাকে সে কিছু বুঝতে দেয়নি। সে খুব ঠাণ্ডা মাথার মানুষ। তখনই সিদ্ধান্ত নিয়ে ছিল আর নয়টা-পাঁচটার চাকরি নয়। মাকে প্রপার ট্রিটমেন্ট, দেখাশোনা করতে হলে এভাবে চলবে না। সংসারে তো আর কেউ নেই। ওকেই দেখতে হবে।

উপমা চাকরিটা ছেড়ে দিয়ে ছিল সেই সময়ই। নিজের উপর ভরসা ছিল তার। এই লাইনে অভিজ্ঞতা থাকলে চাকরির অভাব হয় না। লেখালেখির হাতটা সে জন্মগতভাবেই পেয়েছে। একটা স্বাভাবিক গতি আছে তার লেখায়। আছে বিষয় বিশ্লেষণের ক্ষমতাও। দেখার চোখ দুটোই বা কম কীসে! তাই একটা সমাজ উন্নয়ন চিন্তক গবেষণামূলক প্রতিষ্ঠানের ত্রৈমাসিক পত্রিকার সম্পাদক হতে তাকে বিশেষ বেগ পেতে হয়নি। পত্রিকার সম্পাদকীয় লেখা থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের লেখকদের দিয়ে লিখিয়ে নেয়া লেখা সম্পাদনা, প্রেসে দেয়া, আবার তা ডেলিভারি নেয়া পর্যন্ত সব দায়িত্ব তার। এসবের জন্যে ফ্রেমে বাঁধা সময়ের কোনো প্রয়োজন হয় না। এই শ্রমের বিনিময়ে সে ভালো অংকের একটা সম্মানী পায়। তা দিয়ে মা-মেয়ের দিন চলে যায় জলের মতো। কিন্তু জল আটকে যায় মায়ের এই অসুখটার পর থেকেই।

একটা ঠিকে কাজের লোক আছে। সে কাপড় ধোয়া, ঘর মোছাসহ আরও দু-একটা কাজ সেরে চলে যায়। থাকে কাছে পিঠেই। সময়ে অসময়ে ডাকলে ছুটে আসে। আজকাল ঢাকা শহরে নাকি কাজের লোকদের গৃহকর্মী ইউনিয়ন-টিউনিয়ন হয়েছে। ওসব ধান্দা নেই তার। উপমার আজ অফিস থেকে ফিরতে দেরি হয়। আসলে অফিস নয়। অফিসে সে যায়নি। কিন্তু বাসা থেকে বের হওয়ার সময় মাকে অফিস যাওয়ার কথা বলেই সে বেরিয়েছিল। অফিস থেকে কোনো কোনো দিন ফিরতে দেরি তো হতেই পারে। ঢাকার রাস্তাঘাটের যে অবস্থা, তাতে কেউ সময়ের কাজ সময়ে করতে পারে না। পারবে কী করে? যেমন বেড়েছে গাড়িঘোড়া, তেমনি তার স্টিয়ারিংয়ের মালিকদের নিয়ম ভাঙার প্রতিযোগিতা। এই যাঁতাকলে পড়ে সাধারণ মানুষের প্রাণান্ত অবস্থা।

উপমারা যে বাসায় থাকে, সেটি এক বন্ধুর দূরসম্পর্কের আত্মীয়ের। সে-ই যোগাড় করে দিয়েছে। বাড়িওয়ালা থাকে বিদেশে। পুরোনো বাড়ি। এদিকে মালিক কখনও তাকিয়ে দেখে বলে মনে হয় না। বয়স কত হবে কে জানে। বিশ ইঞ্চির গাঁথুনীর উপর পলেস্তরা খসা জায়গাগুলো সিমেন্ট দিয়ে প্লাস্টার করে দিয়েছে বাড়ির কেয়ারটেকার। তাতে চুনকাম না হওয়ায় মানচিত্রের মতো বিচিত্র আকৃতি হয়ে আছে। সিমেন্ট কম দেয়ায় সে প্লাস্টারও কোথাও কোথাও খসে পড়ছে, ঝুরঝুরে বালিতে ঘর ভরে থাকে। উপমা এত কিছু না দেখেই বাসায় উঠে পড়েছিল। একটাই কারণ, অফিস থেকে বাসাটা খুব দূরে নয়। এই যা প্লাস পয়েন্ট বাসাটার। দোতলায় থাকে ওরা। বাইরে থেকে ওঠার সময় চোখে পড়ে বয়সের ভারে তার ক্ষমতাটা সত্যিই কমে গেছে। সানসেট ঘেঁষে এক পাকুড় গাছ বীরদর্পে শিকড় চালিয়ে দিয়েছে। উপমা সময় করে একদিন লেবার ভাড়া করে সেসব ছেটেছুটে বাড়িটাকে ভদ্রস্ত করেছে। ঘরগুলো ভালো করে হোয়াইট ওয়াস করে নিয়েছে, তাক-টাক লাগিয়েছে। ফলে ভিতরটা চমত্কারই বলা চলে।

ঘরগুলো বলতে যা বোঝায়, তা নয়। একটা মাত্র ঘর ওদের। তাতে পুরোনো ডিজাইনের রেলিং দেয়া এক চিলতে বারান্দা। ঘরের দু’দিকে মাঝারি সাইজের দুটো জানালা। ঘর থেকে প্রকৃতির সঙ্গে যোগাযোগের ওই যা মাধ্যম। একটা রান্নাঘর। খুব বেশি নড়াচড়া করার উপায় নেই সেখানে। থাকার মধ্যে ঘরটাই যা বড়। ঘরের এক পাশে একটা টেবিল আর দুটো চেয়ার ফেলে ডাইনিং স্পেস করে নিয়েছে উপমা। মাকে সঙ্গ দেয়ার পাশাপাশি সারাদিন ল্যাপটপে লেখালেখি, টুকটাক ঘরের কাজ করে বলে বোঝাই যায় না একটা ঘরেই ওদের সব প্রয়োজন মিটে যায়। মাঝে মাঝে সে ভাবে কত কম জিনিস নিয়ে মানুষের একটা জীবন কেটে যেতে পারে খুব সহজেই। তাতে কারো কোনো অসুবিধা হওয়ারই কথা নয়। অথচ সেই একটা জীবনে মানুষের কত কিছু চাই। চাহিদার শেষ নেই, লোভেরও শেষ নেই, ছোটাছুটির শেষ নেই, খুনোখুনি করতেও পিছপা হওয়া নেই। কোথায় যে তার শেষ তারও ঠিক নেই। জীবনটা কী গো? উপমা যখন নিজের সঙ্গে নিজে কথা বলে তখন এরকম প্রশ্ন করে। অন্য কাউকে এ প্রশ্ন করার সাহস পায় না। এমনিতেই আত্মীয়-স্বজন থেকে শুরু করে পরিচিত জনেরা তাকে একটু অন্যরকম ভাবে। তাকায় বাঁকা চোখে। মা বলে, যমেও বোধহয় তাকায় একটু ভেবেচিন্তে। এ বলেই মজা করে হাসে। উপমারও হাসি পায় সে কথা শুনে। 

খাটের এক পাশে একটা ওয়ারড্রোব। বাক্স-পেটরা, ছোটখাটো কৌটা, থালাবাসন, তরিতরকারির ঝুড়ি—সব খাটের নিচে থরে থরে সাজানো; যেন খাটের নিচে আসল সংসারটা, সে সংসার ঢাকা থাকে মেঝে পর্যন্ত ঝুলানো বেডকভারে। বেডকভারটাই একটা পার্টিসনের কাজ করছে। আর যা কিছু দৃশ্যগ্রাহ্য, সে হলো ঘরময় বই আর বই। পুরানো বাড়ি, তার ভিতরেই দেওয়ালে কাঠের তাক বানিয়ে বই পত্রপত্রিকা গুছিয়ে রাখা, ঝেড়ে মুছে যত্ন করা, সে কম বড় যন্ত্রণার কাজ নয়। তবে উপমার ওকাজে কোনো ক্লান্তি নেই। বইয়ের আলমারি আছে গোটা দুই-তিন। আছে খানকতক ট্রাঙ্ক, সেগুলো ভর্তি বইপত্রে। মেঝেতেও ঢিবি করে রাখা বই। বেশির ভাগই মায়ের। তারপরেও প্রতি মাসে দু-একখানা বই কিনে বাড়ি ফেরে উপমা। মা-মেয়ের বিনোদনের ওই একটা জায়গা।

উপমা খুব গোছানো স্বভাবের মেয়ে। সংসার করলে খুব গুছিয়ে সংসার করতে পারত। কিন্তু ওপথ মাড়ানোর সাহস পায়নি। ইচ্ছে যে ছিল না, তা নয়। সংসার তো আর এক জনে হয় না। সংসার করতে গেলে দুজন নারী-পুরুষের প্রয়োজন। তাদের হতে হয় সমমনা। না হলেই অনাসৃষ্টি। কিন্তু জীবনে সেই সমমনা মানুষটিকে পাওয়া হয়ে ওঠেনি উপমার। ভালোলাগার মানুষটির যখন পরিচয় পেল, দাড়ি-পাল্লায় ওজন করা সে মনের সঙ্গে সে যে পেরে উঠবে না তা বুঝতে পেরে নিজ থেকেই সরে এসেছিল। কিন্তু বড্ড দেরি হয়ে গিয়েছিল। ডিগ্রির মোড়কে পরিপাটি অপূর্বকে চেনা যায়নি অনেক দিন পর্যন্ত। যৌতুকের বিরুদ্ধেই তার লড়াই আর যৌতুক লোভী কোনো পুরুষকে সে বিয়ে করবে স্রেফ ভালোবাসার দোহাই দিয়ে তা সে মেনে নিতে পারেনি। একটু একটু করে যখন সে বুঝতে পারছিল অপূর্বের অনেক টাকার দরকার, বাড়ি দরকার, গাড়ি দরকার। আরও যে কত কত তার চাহিদা, তার ঠিক নেই। সেসব চাহিদার ফুলের পাপড়ি একটু একটু করে মেলতে শুরু করেছিল। সম্পর্কের শুরুতে একটুও বোঝা যায়নি। যখন বুঝতে পেরেছে, তখন ধীরে ধীরে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে। সে সম্পর্ক ভেঙে দিতে তার একটুও কষ্ট হয়নি। হ্যাঁ, উপমার কষ্ট হয়েছে ভালোবাসার জন্য। গোপনে চোখের জল ফেলেছে, কোনো কোনো রাত কেটেছে নির্ঘুম। বুকের ভিতরে কষ্ট হতো খুব, কিন্তু কাউকে বুঝতে দেয়নি। ভিতরে ভিতরে নিজেকে শক্ত করেছে। চারদিকে দাম্পত্যজীবনের চিত্র দেখেশুনে সে মনে মনে নিজেকে ভাগ্যবান মানে। মা-বাবার জীবনেই কী সে কম দেখেছে! সংসারের জন্য তাই উপমার কোনো হায়-আফসোস নেই। মাকে নিয়ে আছে—এই ওর বড় পাওয়া, এটাই ওর বড় শান্তি। কত বাধা-বিপত্তির মধ্যে শুধু ওকে মানুষ করার জন্য মা তার জীবনটাকে কত তুচ্ছ করে তুলেছিল, সে তো ও নিজের চোখেই দেখেছে।

—মা!

খাটের কাছে গিয়ে ছোট্ট করে এবার ডাক দেয় উপমা।

সাড়াশব্দ নেই। নিথর ঘুম তাকে ঘিরে ধরেছে। মায়ের কপালে হাত রাখে উপমা। কপালটা ঘেমে গেছে। গায়ে পাতলা চাদরটা টেনে দিয়ে হালকা করে ফ্যানটা ছেড়ে দেয়। শরীরের উপর দিয়ে ওইসব হুলুস্থূল হওয়ার আগে মা একটা বই পড়ছিল। জীবনানন্দ তার বড় পছন্দের। ‘মাল্যবান’ পড়ে আছে বালিশের পাশে।

কার্তিকের হিম হিম দিন, দেখতে দেখতে বেলা ফুরিয়ে যায়। সন্ধ্যে গড়িয়ে রাতের আঁধার ঘন হতে শুরু করেছে। মা জেগে গেছেন।

—ফের তুই জানালা বন্ধ করেছিস?

মা জানালা বন্ধ একদম সইতে পারে না।

—সন্ধ্যায় ঠাণ্ডা বাতাস ছেড়েছিল তাই বন্ধ করে দিয়েছি। তাছাড়া তোমার শরীরটাও ভালো নেই।

—তাতে কী?

এক রকম ধমকেই উঠলেন। জানালাগুলো খুলে দে। ঘরটা আলগা হোক।

—মশা আসে যে।

—আসুক।

—শ্যামা পোকা ঢুকে ঘর নোংরা করছে।

—করুক না।

—মা, কী যে পাগলামি কর না... তার ঠিক নেই! কিছু বুঝতে চাও না তুমি। এই হলো তোমার এক দোষ।

মুখে বলল ঠিকই, কিন্তু উপমা খাটে উঠে হাঁটু মুড়ে মায়ের মাথার কাছের জানালাটা আস্তে করে খুলে দেয়। জানালাটা ঠিক যেন মস্ত এক বইয়ের পাতা। খুলতেই কার্তিকের আকাশ। সরল অন্ধকারে আধখানা নিরীহ চাঁদ ঝুলে আছে। যতদূর চোখ যায় উপমা আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। সেই অন্ধকারেই দেখা যায় জোনাক পোকার মতো নক্ষত্ররা জেগে উঠেছে লক্ষ আলোকবর্ষ দূরে। কতকাল ধরে ওরা জ্বলছে কে জানে! বোধহয় পৃথিবীতে ওরই চেখে পড়ল আজ। অথবা পড়েছে আরও কারো চেখে। ওদের কেউ নিভে গেছে বহুদিন আগে, আলোর বিন্দুটুকু শুধু ধরে রেখেছে, হারায়নি এখনও। সত্যিই চোখ জুড়িয়ে যায় তার।

—এমন একটা চাঁদ উঠেছে। জানালা বন্ধ রাখলে দেখবি কী করে?

—মা, তুমি বড্ড ছেলেমানুষ! এবার মশার কামড় খাও। তারপর জ্বর আসুক। তখন দেখবে কে শুনি?

—কেন, তুমি আছ কী করতে?

আহ্লাদি গলায় কথাটা বলেই জানালার দিকে মুখ ঘুরিয়ে মা পাশ ফেরে। কথাটা বলে ফেলে মা বোধহয় খানিকটা লজ্জাই পেল। ঠিকই তো, উপমা ছাড়া মায়ের আছেই বা কে! উপমার একটা সংসার থাকতে পারত, ছেলেপুলে থাকতে পারত। মায়ের কারণেই হয়তো উপমা বিয়ে করেনি। একথা ভেবেই মা কষ্ট পায়।

এ এলাকার একেবারে শেষ প্রান্তে উপমাদের বাড়িটা। সামনের দিকে গণ্ডায় গণ্ডায় বিশাল বিল্ডিং, কিন্তু পুরোনো বাড়িটার পিছন দিকটা এখনও মুক্ত। কর্পোরেশনের খোলা মাঠ। সেখানে ছেলেমেয়েরা খেলাধুলা করে। দেখতে ভালো লাগে। মা সে দৃশ্য দেখে খুব মনোযোগ দিয়ে। মাঠের ওদিকটায় একটা কলোনির মতো। সেখানকার নারী-পুরুষ দলবেঁধে হেঁটে আশপাশের কোনো কারখানায় কাজ করতে যায়। আবার সন্ধ্যায় ফেরে একইরকম পদযাত্রায়। বাড়িটার সামনের দিকের চাইতে পিছনের দিকটা সম্পূর্ণ অন্য এক জগত্। বড় রাস্তা থেকে একটু ভিতরে এ বাড়িটার সবচেয়ে শান্তির দিক হলো গাড়িঘোড়ার কান ঝালাপালা করা শব্দ খুব একটা পৌঁছায় না এদিকে। সহনীয় ভাড়ায় ঢাকা শহরে এরকম একটি বাসা পাবে, উপমা সেটা ভাবতেই পারেনি।

মাঠের প্রান্ত ঘেঁষে এক সারিতে দশ-বারোটা নারকেল গাছ। খোলামাঠে জোর হাওয়া লেগে সেই নারকেল গাছের লম্বা চিরল পাতাগুলো উড়তে থাকে। মা বলে, ওই দেখ রবীন্দ্রনাথের দাড়ি উড়ছে। মা ওই রকম মজার কথা বলে মাঝেমধ্যে। সন্ধ্যার মুখে নীড়ে ফেরা ক্লান্ত পাখিদের ঘরে ফেরা দেখে বড় মায়া লাগে। দক্ষিণ দিকের হাফ কমপ্লিট একটা বহুতল বাড়ি। শুধু ইটের পর ইট সাজানো, দূর থেকে মনে হয় ভুতুড়ে বাড়ি। পড়ে আছে অনেক দিন ধরে। বাড়িটার পাশেই একটা ল্যাম্পপোস্ট। কিন্তু কখনও লাইট জ্বলতে দেখেনি উপমা। সেই ল্যাম্পপোস্টের মাথায় একটা নীলাভ আলোর টুকরো ভাসছে, ঠিক যেন ঝুলন্ত তারা। উপমা ভাবে কেউ বুঝি আকাশ প্রদীপ জ্বালিয়ে রেখেছে। হতে পারে চেখের ভুল অথবা ওর মনের কল্পনা। ছেলেবেলায় দেখেছে মামাবাড়িতে কার্তিক মাসে আকাশ ভরে প্রদীপ জ্বলতে। হঠাতই তার বুকের ভিতরটা ধক করে কেঁপে উঠল, সে বোধহয় ওই আকাশ প্রদীপের মতো কিছু একটা দেখে। কী যেন মাথার ভিতরে জ্বলে উঠে দপ করে। মুহূর্তেই নিভে যায়। সে পরিষ্কার দেখতে পেল, আকাশ থেকে তারা ছুটে কোথাও পড়ল। কোথায় পড়ল কে জানে! উপমা কোথায় বেশ শুনেছিল তারা খসার সময় মনের ইচ্ছে প্রকাশ করে প্রার্থনা করলে তা পূরণ হয়। হঠাত্ মনে পড়ল সে কথা, সেই বিশ্বাসে চট করে মনে মনে প্রার্থনা করে সে—একটা তারা খসল। যে তারাটা আছে, সেটি যেন অটুট থাকে—ঈশ্বর, তোমার কাছে এই আমার একমাত্র প্রার্থনা।

দেয়ালে ঝুলানো একটা লম্বা প্রমাণ সাইজের আয়না। এটাই উপমার ড্রেসিং আয়না। জানালার কাছ থেকে সরে আয়নার সামনে এসে দাঁড়ায় উপমা। নিজেকে দেখে অবাক হয়ে যায় সে। আয়নায় প্রতিবিম্ব দেখতে পাওয়া জীবনের সঙ্গে লড়াই করা আত্মপ্রত্যয়ী একটি ত্রিশ বছরের মেয়েকে, যে কিনা অচলায়তন ভাঙতে ভাঙতে পথচলার পথ করে নিয়েছে। সদ্য একটা মৃত্যুর শোক ভিতরে ভিতরে তাকে ভেঙেচুরে তছনছ করে দিয়েছে। কিন্তু উপরের খোলস ভাঙেনি। খোলসটা ভাঙলেই মায়ের সামনে দাঁড়ানো বড় বিপদ হয়ে যাবে। তাকে যে শক্ত থাকতেই হবে।

উঠে বসার জন্য মা উসখুস করছে। খাটের পিছনে আরও দুটো বালিশ দিয়ে উপমা মাকে আরাম করে বসিয়ে দিল।

—আজ ফিরতে এত রাত হলো যে?

—দু-একদিন তো হয়ই এরকম। কাজের চাপ ছিল।

—তাই বলে এত রাত তো কখনও করিস না। এদিকে আমি ভেবে ভেবে হয়রান। একটা টেলিফোন তো করতে পারতিস।

—টেলিফোন? হ্যাঁ, টেলিফোন তো করাই যেত।

এরপর কথা হারিয়ে ফেলে উপমা।

—চার্জ ছিল না বুঝি?

একটু ভেবে উপমা বলল, ‘হ্যাঁ মা চার্জই ছিল না মোবাইলে। জানো তো স্মার্টফোনের চার্জ বড্ড তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যায়।’

মেয়েকে খানিকক্ষণ নিরীক্ষণ করে মা। আজ ওকে অন্য রকম লাগছে মায়ের চোখে। সে যেন কী হারিয়ে ফেলেছে। উপমার কাঁধ দুটো যেমন শক্ত দেয়ালের মতো দেখায়, আজ তা দেখে মনে হচ্ছে না। কিছুটা ভাঙাচোরা লাগছে। বললেন, ‘কী এত ভাবছিস বল তো?’

—কী ভাবব মা, ভাবনার সবকিছুই তো শেষ।

কণ্ঠটা খসখসে লাগে, কোথায় যেন তার সবকিছু আটকে গেছে। হঠাত্ উপমা সচেতন হয়ে উঠে, এসব সে কী বলছে মায়ের সামনে। প্রসঙ্গ পাল্টাবার জন্য জিজ্ঞেস করে, ‘সারাদিন ওষুধ-টসুধ কিছুই বোধহয় খাওয়া হয়নি তাই না?’

—হ্যাঁ রে, খেয়েছি। ওষুধ না খেলে তুই যে রাগ করবি সেই ভয়ে খাই।

—সে কি আর আমি জানি না? তাহলে তুমি ওষুধ খাও আমর ভয়ে, অসুখ সারবার জন্য নয়।

 

উপমা ভাবে এই রাতে মাকে কোনো দুঃসংবাদ দেয়া ঠিক হবে না। তাছাড়া বাবার মৃত্যু সংবাদ সে কীভাবে নেবে ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। দীর্ঘ বিশ বছর মুখ দেখাদেখি দূরের কথা, কোনো যোগাযোগ পর্যন্ত নেই। সেই দূরত্ব তাদের একদিনে তৈরি হয়নি। দিনে দিনে একটু একটু করে বেড়েছে। বহুদিনের বহু অপমান-অবহেলার যন্ত্রণা দেয়াল তুলেছে একটু একটু করে। বাবা কোনো বোঝাবুঝির ধার ধারত না। রেগে গেলে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করত। ছোট-বড় কেউ বাদ যেত না তার সেসব খিস্তি-খেউড় থেকে। অভিজাত পরিবারের মেয়ে মায়ের রুচিতে বড় লাগত। সহ্য করতে পারত না। আবার বাবা যখন ভালো তো খুব ভালো। মা বলত, ‘ওরকম ভালোতে আমার কাজ নেই!’ লাথি মেরে ফুল-চন্দনে পূজা দেয়া—ওসব মা একেবারেই নিতে পরে না। মানুষের মতো বেঁচে থাকতে হলে সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে হবে। মায়ের এক কথা, সম্মান ধুলোয় মিলিয়ে দিয়ে বাঁচতে পারব না। উপমার অভিমানী মা এক কাপড়ে বেরিয়ে এসেছিল নিজের হাতে গড়া সংসার থেকে। সে সময়ে তার একমাত্র সম্বল ছিল উপমার কচি হাতটি। সংসার থেকে বেরিয়ে এসে সে যেন এক অথৈই সাগরে পা রাখা। চারদিকে বাধার দেয়াল। হাতে টাকা-কড়ি নেই। মায়ের বয়সটাই বা কী তখন! আত্মীয়-স্বজনের বিরোধের মুখেই তো সে বিয়েটা করেছিল। ফলে ওপক্ষের কারো কাছে যাওয়ারও মুখ ছিল না, মায়ের নিজেরও সে ইচ্ছে ছিল না। এই যে এত অপমান-অবহেলা-যন্ত্রণা সয়েছে, কিন্তু উপমা আবাক হয়ে ভাবে, একটা দিনের জন্যও বাবার বিরুদ্ধে কোনো কটু কথা শোনেনি মায়ের মুখে। সে কি বাবাকে ভালোবাসার জন্য?

পছন্দের বিয়ে ছিল। মায়ের লেখাপড়ার খুঁটির জোর ছিল বেশ শক্ত। মায়ের বাপের বাড়ির লোকজনের আচার-আচরণ, চাল-চলন, কথাবার্তা বাবার পরিবারের সঙ্গে একবারেই মেলে না। দুই পরিবার যেন আকাশ আর পাতাল। তবু কোন ভালোবাসার মায়ার ডোরে জড়িয়ে ছিল মা, সে রহস্য আজও উপমাকে ভাবায়। মাকে জিজ্ঞেস করলে বলতেন, ‘জন্ম-মৃত্যু-বিয়ে এই তিন বিধাতাকে নিয়ে। জানিস তো এসব বিষয়ে কারো কোনো হাত থাকে না রে।’ এত লেখাপড়া করা মানুষটি যখন এরকম কথা বলে, তখন তার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে উপমা। বাবার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার জোর কম থাকলেও প্রতিভার জোর ছিল, ছিল নানা বিষয়ে পড়াশোনার গভীরতা। থাকলে কী হবে, এক ধরনের চাষাঢ়ে ভাবসাবও ছিল তার ভিতরে। বড় বড় খবরের কাগজের মালিকরা বলতে গেলে বাবাকে একরকম ডেকে নিয়েই চাকরি দিতেন। বসাতেন সম্পাদকের চেয়ারে, সে তার লেখার গুণেই। মায়েরও লেখার হাত ছিল, লিখতেন ছেলেবেলা থেকে, প্রতিদিন ডায়েরি লিখতেন। একটা সময় চমত্কার সব ছোট গল্প লিখেছেন, লিখেছেন প্রচুর প্রবন্ধ-নিবন্ধ। সেসব নিয়মিত পত্রিকায় ছাপা হতো। দুজনের যোগসূত্র ছিল ওই লেখা।

উপমা শুনেছে, বাবার সঙ্গে তার উচ্চশিক্ষিত মায়ের বিয়েটা বাবার অনেক বন্ধুবান্ধবকে ঈর্ষান্বিত করেছিল। সত্যিই তো মায়ের মতো রূপে গুণে পরিপূর্ণ নারী যে কারো কাঙ্ক্ষিত হওয়ারই কথা। কিন্তু সে দেখেছে মায়ের কোনো অহংকার নেই। কোনো চাহিদা নেই। অল্পেই তুষ্ট থাকা একজন মানুষ। অসম্ভব কষ্ট সহ্য করতে পারে এবং তা মুখ বুজেই। বাবার সংসারে এসে মা কোনোদিন না পেয়েছে সম্মান, না যোগ্য মর্যাদা, এ দুঃখই তার বড় বাজত।

                উপমা পোশাক পাল্টে বিছানায় যায়। বিছানায় গিয়েই সে বুঝতে পারে সারাদিন তার শরীর ও মনের উপর দিয়ে কী ধকলটাই না গেছে। গাড়িতে আসার পথে ঘুমে চোখ ভেঙে আসছিল। বিছানায় এসে সে ঘুম কোথায় উবে গেল কে জানে। সারা দিনের ঘটনা তার চোখের সামনে রিভিউ হতে থাকে সিনেমার রিলের মতো। বেলা এগারোটার দিকে উপমার মোবাইলে দিনের প্রথম কলটা বেজে ওঠে। মোবাইলের স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখে অচেনা নম্বর।

—হ্যালো?

—তুমি কী উপমা?

—হ্যাঁ। কে বলছেন, প্লিজ?

—আমি তোমার বড় পিসি। তোমার বাবার অবস্থা ভালো নয়। হাসপাতালে অক্সিজেন দেয়া হচ্ছে। উপমা জানতে চাইল কোথায়, কোন হাসপাতালে? কিন্তু ওদিক থেকে টেলিফোনের ওপারে যিনি আছেন, তিনি হাসপাতালের নাম-ঠিকানা কিছুই বলতে পারলেন না। সে তখন তাকে অনুরোধ করে কারো কাছ থেকে হাসপাতালের ঠিকানা ও ওয়ার্ড নম্বর ভালো করে জেনে জানাতে। পাঁচ মিনিটের মধ্যে ফের ফোন এলো। অন্য একটি কণ্ঠ, একেবারেই যান্ত্রিক। সেই কণ্ঠেই উপমা শুনলো বাবা আর নেই। হার্ট এ্যাটাক। শাহজাহনপুরে প্যান প্যাসিফিক হাসপাতালে কিছুক্ষণ আগে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন তিনি। খবরটা জানিয়েই টেলিফোনটা কেটে দিল।

এরপর যে অবস্থায় ছিল সেই অবস্থাতেই ছুটে বেরিয়ে যেতে যেতে ফিরে একবার মাকে দেখে নিল। সেও মুহূর্তের জন্য। তারপর ছুটে বেরিয়ে গিয়েছিল সে। সবই যখন শেষ তখন এত তাড়াহুড়ো না করলেও চলত, কিন্তু কে যেন তাকে টেনে ছুড়ে রাস্তায় ফেলে দিল। বেরোবার সময় মাকে কেবল বলতে পেরেছিল অফিসের জরুরি কাজে বেরোচ্ছি। মাকে সে কখনও মিথ্যে বলে না। কিন্তু আজ বলে ফেলল। না বললেও উপায় ছিল না।

রাস্তায় বেরিয়ে দেখল প্রচণ্ড জ্যাম। কড়কড়া রোদে ভেসে যাচ্ছে ঢাকা শহর। দেশের একটি বৃহত্তম রাজনৈতিক দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। পথে পথে রঙিন ব্যানার-ফেস্টুনে সাজানো আনন্দ মিছিলের জোয়ারে ভয়াবহ অবস্থা যেন জল আটকে গেছে বদ্ধ জায়গায়। ঘরে থেকে কিছুই বোঝা যায়নি। বোঝা গেলেই বা সে কী করতে পারত? তাকে তো বের হতেই হতো। বড় রাস্তায় গিয়ে চট করে একটা বাসে উঠে বসেছিল সে। সেখান থেকেই দেখছিল যতদূর চোখ যায় গাড়িঘোড়া দাঁড়িয়ে আছে পাথরের মতো যেন আগ্নেয়গিরির লাভায় থমকে যাওয়া পম্পেই শহর। কোনো দিকে যাওয়ার যায়গা নেই। এর ভিতরেই বারবার হাসপাতাল থেকে ফোন আসছে তাড়াতাড়ি পৌঁছানোর জন্য। কিন্তু সে নিরুপায়। উপমার মনে হচ্ছিল বাস থেকে নেমে হাঁটা শুরু করে। হাঁটবে যে তারও তো উপায় নেই। চারদিক লোকে লোকারণ্য। থিক থিক করছে মানুষের কালো মাথা। নামতে গিয়েও বাস থেকে নামার সাহস পেল না। অথচ অস্থিরতায় ছটফট করতে থাকে। থেমে থাকা গাড়িগুলোর অকারণ তীব্র হর্ন। আটকে থাকা অ্যাম্বুলেন্সের বুকে কাঁপন ধরানো আর্তনাদ চলছে একটানা। সেদিকে কারো ভ্রূক্ষেপ নেই। শুনতে শুনতে সবার কান বোধহয় বধির হয়ে গেছে এখন। অস্থিরতার তাড়নায় সে এক সময় বাস থেকে নেমে পড়ে। তারপর কোনো রকমে একটা সিএনজি ধরে, ছোট গাড়ি অলিগলিতে ঢুকে ঠিক পৌঁছে যাবে জায়গামতো এই ভরসায়।

সিএনজিতে বসে উপমা অনুভব করে এর আগে কখনও এতটা অসহায় বোধ করেনি। ঠিক এই সময় তার তিথি আপার কথা মনে পড়ে। প্রাক্তন সহকর্মী বন্ধু তিথি আপা হাইকোর্টে প্র্যাকটিস করে। সিএনজিতে বসেই খবরটা জানিয়ে তাকে একটা এসএমএস পাঠাল। তিথি আপা শাহজাহানপুরের ওদিকটায় থাকে।

উপায়ান্তর না দেখে শেষটায় সিএনজি ছেড়ে অনেকটা পথ হেঁটে কোনো রকমে হাসপাতালে পৌঁছে দেখল উপমার পিতৃকুলের সবাই অপেক্ষা করছে ওর জন্য। হাঁটার শ্রমে বুকের ভিতরটা হাপরের মতো হাঁসফাঁস করতে থাকে। বুকের ভিতর থেকে বড় বড় ভারী নিঃশ্বাস বেরিয়ে আসতে থকে। ব্যাগে সবসময় এক বোতল জল রাখে সে। খুব তৃষ্ণা পেলে দু-এক ঢোঁক করে গলাটা ভেজায়। তখন গলা ভেজাবার কথা ভুলেই গিয়েছিল। ক্ষুধা তৃষ্ণা যেন ব্লটিং পেপারের মতো তার শরীর থেকে কে যেন শুষে নিয়েছে।

উপমা পৌঁছানোর কিছুক্ষণ পর বাবার মরদেহ নিয়ে সবাই হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে আসে। তারপর নয়াপল্টনে ছোটপিসির বাড়িতে। সেখানে ঠাকুরমা, অন্যান্য আত্মীয়স্বজনরা বাবাকে চিরবিদায় জানায়। তারপর পোস্তগোলা মহাশ্মশানের সাজানো চিতায় বাবাকে তুলে দেয়া, এই যে ব্যাপারগুলো—সবকিছু বড় যান্ত্রিকভাবে ঘটেছে। একমাত্র সন্তান হিসেবে উপমা মুখাগ্নি করে। মুখাগ্নি করতে গিয়ে সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। ভিতর থেকে বেরিয়ে আসা বাধভাঙা কান্না সবইকে ভিজিয়ে দেয়। তার কান্নায় আপনজন হারানোর যে নাড়ি ছেঁড়া ব্যথা, তা সংক্রামিত হতে থাকে, এতক্ষণে একে অন্যকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দিতে থাকে।

তিথি আপা হাসপাতালে আগেই গিয়ে পৌঁছে ছিল। ওর জীবনের এই সংকটপূর্ণ সময়ে পিতৃকুলের আত্মীয়-স্বজন ছাড়া তিথি আপাই একমাত্র মানুষ যিনি হাসপাতাল থেকে শ্মশান পর্যন্ত ওর সঙ্গে সশরীরে উপস্থিত থাকার মানবিক তাগিদটুকু অনুভব করেছিল। কৃতজ্ঞতা জানানোর মতো সম্পর্ক নয় তাদের। সে কেবল অনুভবের। তিথি আপা জড়িয়ে ধরে শোকের তাপে কেঁপে কেঁপে উঠা উপমাকে শান্ত করতে থাকে। তখন মায়ের কথা একবারো কেন মনে পড়ে না তার? উপমা তার কোনো কারণ খুঁজে পায় না। বাবার শেষকৃত্যের কাজ শেষ হতে হতে রাত প্রায় ১০টা। ফেরার পথে এই প্রথম তার মনে পড়লো বিষয়টি। যদিও মা যে ধরনের ব্যক্তিত্বের মানুষ তাতে এই মৃত্যুসংবাদে তার ভিতরের ভাবান্তর বোঝা বড় শক্ত হবে। উপমা জানে এ সংবাদ শোনার পর আর যাই হোক ভিতরে ভিতরে তার মন বাবার বিদেহী আত্মার শান্তির জন্য প্রার্থনা করবে। যতদিন বেঁচে থাকবে এই মানবিক বোধ সে কখনও হারাবে না।

গাড়িটা সিগনালে দাঁড়িয়ে আছে। গাড়ির জানালায় চোখ রেখে উপমা পথচারীদের দেখে। কোত্থেকে এক ঝটকা দমকা হাওয়া ছুটে এলো, তারই ঝাপটা মুখে এসে লাগে। মাথা ভর্তি ছোট ছোট চুল এলোমেলো হয়ে যায়। উদভ্রান্তের মতো লাগে নিজেকে। দিনের সেই বর্ণীল উন্মাদ জনস্রোত এখন আর নেই। গুটিকয়েক লোক বাড়ি ফেরার পথে, দু-একজনের হাতে বাজার সদাই। একটি লোক সাবধানে রাস্তা পার হয়। তার কাঁধে পাঁচ-ছ’বছরের একটি মেয়ে। মেয়েটির এক হাতে একঝোপা রঙিন বেলুন, বাতাসে উড়ছে। আর একটি হাত জড়িয়ে আছে বাবার গলা। দৃশ্যটি দেখতে দেখতে চোখ ভিজে উঠে নিজেরই অজান্তে। বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারে না। আকাশের দিকে চোখ ফেরায়। নীরব নিস্তব্ধ আকাশের বুকে কী যেন খোঁজে। সেই ছেলেবেলার মতো উপমার মনে হয় বাবা নিশ্চয় সেখানে কোনো নতুন তারা হয়ে তারই দিকে তাকিয়ে আছে।

আজকাল উপমার বাবার জন্য বড্ড মন কেমন করত। অনেক খুঁজে পেতে বাবার ঠিকানা বের করেছিল। বাবার প্রতি তার পাহাড় সমান অভীমান ছিল। সেসব ঝেড়ে ফেলে দিয়েছে কবেই। যেমন করে ছোট বেলায় ধুলোবালির ভিতর পড়ে গেলে বাবা বলত, ‘কিচ্ছু হয়নি, হাত-পা ঝেড়ে উঠে দাঁড়াও, সব ঠিক হয়ে যাবে,’ ঠিক তেমনি করে। তার কাজের চাপ থাকুক চাই না থাকুক মন চাইলেই ছুটে যেত বাবার কাছে।

উপমা নামটা বাবারই দেয়া। এই নামেই একটা প্রেস তৈরি করেছিলেন তিনি। দীর্ঘদিন নানা অসুখ-বিসুখে ভুগেছেন। প্রেসটা বিক্রি হয়ে গেছে। সংসারটাও ভেঙে গেছে। অভাব-অনটনে সুখের পায়রারাও দূরে সরে গেছে। শেষটায় ছোট বোনের কাছে উঠে ছিলেন। গত কয়েক মাসে বাবার সঙ্গে তার বেশ ক’বার দেখা হয়েছে। বাবার কাছে কিছুক্ষণ বসলেই তার মন ভালো হয়ে যেত। দেখলেই বোঝা যেত, বাবাও খুশি হতেন। ওইটুকু সময়ে সে তার ছেলেবেলায় ফিরে যেত। ওটাই বোধহয় তার জীবনের সবচাইতে সুন্দর সময় ছিল। বাবার সঙ্গে গল্প, কত আনন্দ, কত বেড়ানো, সিনেমা দেখা, কত কত স্মৃতি—এই সব এত তাড়াতড়ি শেষ হয়ে গেল কেন? উপমা প্রশ্নটা ছুড়ে দেয় আকাশের দিকে। কোনো উত্তর খুঁজে পায় না। বাবার কাছে ছুটে ছুটে যাওয়ার একটা কারণ ছিল তার। ওর খুব ইচ্ছে হতো ছেলেবেলার মতো ছোট ছোট কথায় রূপকথার ডালাটা বাবা তার সামনে মেলে ধরবে, সেসব গল্প বেশিটাই তার বানানো ছিল। আর উপমা তার বড় বড় চোখদুটোর অবাক চাউনিতে শুনবে সেই গল্প। থ্রি মাসকেটিয়ার্স, রবিনসন ক্রশোর গল্প যে কতবার শুনেছে তার ঠিক নেই। লোভটা তার রয়ে গেছে এখনও। এই এতটা বয়সে এখনও সে ইচ্ছেটা এতটুকু কমেনি। কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। অনেক সময় বাবা উপমাকে চিনতেই পারতেন না। স্ট্রোক হওয়ার পর কথা জড়িয়ে গিয়েছিল।

এই তো সেদিন এত এত ব্যস্ততার বোঝা দু’হাতে ঠেলে ছুটে গিয়েছিল বাবার কাছে নয়া পল্টনে। উপমা ভ্যাজানো দরজা একটু ফাঁক করে দেখে নিল বাবা জেগেই আছে। পা টিপে টিপে উপমা গিয়ে দাঁড়ায় তার মাথার কাছটিতে। বাবার কপালে হাত রাখে সে। হাতের স্পর্শ পেতেই চোখ তুলে দেখে নিল মেয়েকে। সেই হাতের উপরে বাবার স্নেহময় একটা হাত এসে পড়ে ধপ করে।

—বলো তো আমি কে?

কোনো উত্তর নেই। পিতা কন্যার হাতের স্পর্শে রক্তে রক্তে কথা হয়। না বলা কথাগুলো শুধু অনুভব করে উপমা। আর নিঃশব্দে অঝরে বাবার চোখের জল ঝরে। তাকে এ অবস্থায় দেখলে উপমার বড় অস্থির লাগত। মাঝেমধ্যে এমন হতো উপমাকে তিনি চিনতে পারতেন না। ব্যথার জন্য শক্ত পেইন কিলার খেতেন। হয়তো সেই অসুধের ঘোরে অচেতন হয়ে থাকতেন। কিছুক্ষণ বসে থেকে খুব মন খারাপ করে ফিরে আসত উপমা। এরকম সময়ে খাওয়াদাওয়া করতেন না, স্নান করতেন না। সারা দিন কেবল শুয়ে থাকতেন। কথাবার্তা তো নয়ই। জীবনের শেষ দিকে তিনি নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে ছিলেন সবার কাছ থেকে। শেষ যেদিন বাবার সঙ্গে উপমা দেখা করতে গেল, সেদিন তার মুখের দিকে তাকিয়ে মনে হয়েছিল এবার বুঝি সত্যিই তিনি জীবনের প্রতি আগ্রহ হারিয়েছেন। দু’হাতে জীবন থেকে লুটে নেয়া সমস্ত আনন্দ ছড়িয়ে দিতেন মানুষের মাঝে। অথচ শেষ জীবনে একটি মানুষ ছিল না তাকে সঙ্গ দেওয়ার জন্য। সংসারে এমন কে আছে যে তাকে সঙ্গ দেবে? সবারই তো কাজ আছে। কেবল কাজ নেই ওই মানুষটার যে কিনা সংবাদপত্র অন্তপ্রাণ ছিলেন। সাংবাদিকতাই ছিল তার ধ্যান-জ্ঞান। কাগজ কলমের সঙ্গেই ছিল তার সখ্য। কত নামীদমি কাগজে লিখেছেন, সম্পাদনা করেছেন নিপুণ শিল্পী হাতে, সে হাত এখন এতটাই ভারী যে বিছানায় পড়ে আছে অসাড়।

বাবার এই যে চলে যাওয়া, এই যে শূন্যতা—উপমাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে কোন অজানায়, কোন অতলে, কোন গহ্বরে। সে নিজেকে আটকাতে পারছে না। তবে একটু স্বস্তি অনুভব করছে। কেননা বাবার এই যে বিছানায় পড়ে থাকা সে কিছুতেই সহ্য করতে পারছিল না।

শিশুর মতো সরলতায় তাকিয়ে আছে মা জানালার দিকে। সেখানে অন্ধকার থৈথৈ করছে। শেষ কার্তিকের নিশ্চুপ অন্ধকারে ভাসমান নীল আকাশ প্রদীপটি নিশ্চয় মায়ের চোখে পড়েছে। হিম হিম হওয়া বাতাসে ওড়া ধুলোর মতো ছড়িয়ে পড়ছে ঘরে। একটা পাতলা চাদর টেনে দেয় মায়ের গায়ে। কাজটা করতে গিয়ে লক্ষ করল মায়ের পলকহীন চোখের দৃষ্টি দূর-সীমানায়, যেখানে সেই ভাসমান নীল আকাশ প্রদীপটি মিটমিট করে জ্বলছে। তার বুকের ভিতরে নিশ্চয় কিছু একটা হচ্ছে।

মা কিছু কী বুঝতে পেরেছে? ভাবতে ভাবতে উপমা রান্নাঘরের দিকে যায় এক কাপ চায়ের তাড়নায়। ভিতরে ঢুকতেই বুকটা কেঁপে ওঠে তার। টুলি দেয়ালে হেলান দিয়ে ঘুমাচ্ছে।

—কীরে তুই বাড়ি যাসনি?

—একলা বাড়ি। ওই রোগা মানুষটারে ফেলে কী করে যাই বল তো?

এই বোধটা টুলির খুব টনটনে। উপমার কখনও ফিরতে দেরি হলে সে থেকে যায়। মায়ের সঙ্গে গল্প করে, ওষুধ খাওয়ায়। এসবের জন্য তার কোনো বাড়তি চাহিদা নেই। সেও টুলিকে নিজের পরিবারের একজন করেই নিয়েছে। উপমা ভাবে, এই যে আমরা চিত্কার করি—স্বাভাবিক মানবিকতাগুলো হারিয়ে মানুষ একেবারে যান্ত্রিক হয়ে গেছে। মানুষের ভিতরে দয়া-মায়া বলতে কিছু নেই। না, এসব কথা সব ঠিক নয়।

টুলি বলল, ‘চা খাবে তো। ঘরে গিয়ে বসো। করে আনছি।’ চা খেতে খেতেই ওর কাছ থেকে জানা গেল রহমান চাচা এসেছিলেন। রহমান চাচা কিডনি বিশেষজ্ঞ ডাক্তার। তিনি ওদের পরিবারের একজন অভিভাবকের মতোই। হাসপাতালে আসা-যাওয়ার পথে প্রায় মাকে দেখে যান। ডায়ালাইসিস করতে হবে, এসময়টা রোগীর বড় কষ্টের। শরীরটা ফুলে গেছে। ফোলা মুখে ভাসা ভাসা চোখদুটো পদ্মফুলের মতো ভাসছে। হাত-পাগুলো ছোট বাচ্চাদের মতো টসটসে যেন কোলবালিশ। কাশিও হয়েছে। গলার ভিতরে কী ঘড়ঘড়ে শব্দ! ঘুমের ভিতরেই শ্বাস টানতে টানতেই হাঁপিয়ে ওঠেন। শরীরে হাত দিয়ে উপমা আনুভব করে গাটা একটু যেন গরম। থার্মমিটার বার করে জ্বর মেপে দেখল তেমন কিছু নয়। গোপনে লুকিয়ে থাকা শরীরের অভ্যন্তরে নাড়ি জড়ানো তাপ। অসুখটা তো আজকের নয়, বেশ পুরোনো হলো। এত কষ্ট হয় তার তবু অসুখটাকে যেন গা সওয়া করে নিয়েছে।

এতক্ষণে মনে হয় মায়ের চোখ লেগে এসেছে। আলগোছে জানালাটা বন্ধ করে দেয় উপমা। ওপাশে গভীর অন্ধকার থমকে আছে। মায়ের পাশে এসে শুয়ে পড়ে উপমা। চারদিক নিরিবিলি। দেওয়াল ঘড়ির টিক টিক শব্দ মা একদম পছন্দ করে না। তাই রাতে ওটা বন্ধ করে রাখে। সেই নিস্তব্ধতা ভেঙে কোথা থেকে পালা করে ঝিঁঝিঁ পোকারা ডাকছে। দূরের কোনো কারখানার ভেঁপুর শব্দ শোনা যায়। ঘরে একটা নীল আলো জ্বলছে। রাত কতো হলো কে জানে। কিছুতেই ঘুম আসছে না উপমার। অথচ কিছুক্ষণ আগেও মনে হচ্ছিল বিছানায় একবার পড়তে পারলে হয়—ঘুমে তার শরীর ভেঙেচুরে পড়ছিল।

উপমা মায়ের কথা ভাবে। তার মনে হয় মায়ের স্থিমিত কণ্ঠস্বর তার কানে এসে লাগে। মা কী বলবেন তাও যেন ওর জানা। মা বলবেন, ‘এই যে রাজরোগ ধরেছে, এর চিকিত্সার তো কোনো শেষ নেই। প্রতিদিন কাড়ি কাড়ি টাকা লাগছে। এত টাকা কোথেকে আসবে বল তো, আমাদের কী জমিদারি আছে? আর ভালো যে হবো তারও তো কোনো লক্ষণ নেই। শরীরের কষ্ট, টাকার কষ্ট। তার চেয়ে বাদ দে তো, অনেক হয়েছে। আর চিকিত্সা ফিকিত্সা করতে হবে না, এভাবেই যে ক’দিন চলে চলবে। তা ছাড়া একদিন যন্ত্র তো বন্ধ হবেই, তাই না?’ মা আরও কী কী বলবে উপমার জানা আছে। কিন্তু সত্যিই মায়ের কণ্ঠস্বর শোনা গেল। তাকে অবাক করে দিয়ে মা বললেন,

‘মানুষটা চলে গেল? সব শেষ করে তবেই এলি!’ উপমার মনে হলো কোনো অশরীরী আত্মা কথা বলছে তার সঙ্গে। মায়ের এই ফিসফিস করে বলা কথাগুলো কানে যেতেই সে চমকে ওঠে। শরীর হিম হয়ে আসে উপমার। তারপর মাকে জড়িয়ে ধরে হু-হু করে কেঁদে ওঠে সে। মাও জড়িয়ে ধরলেন প্রবল টানে। না, তিনি আর কোনো শব্দ করেননি। শুধু তার বুকের ভিতরের ধুক-ধুকানিটা বারবার প্রকম্পিত করে উপমাকে উত্তাল ঝড়ের মুখে পড়ার মতো। সেটুকু কেবল উপলব্ধি করে উপমা। ঝড়টা থামে ভোরের দিকে। মাঠের ওপারের মসজিদ থেকে আজান ভেসে আসে। ফরসা রঙ আকাশটা ঝুলে আছে—বিষণ্ন, সূর্য উঠতে এখনও বেশ দেরি। মাথা খানিকটা উঁচু করে আকাশ দেখে মা। উপমা উঠে বসে বিছানায়। সারারাত মা ঘুমায়নি, চোখদুটো ফুলে আছে।

অনেকক্ষণ দুজনে চুপচাপ। গোছা গোছা লম্বা চুলগুলো মা দুর্বল হাতের শাসনে একটু আয়ত্তে নিয়ে আসে। অসুখটা তো অনেক দিনের। সময়মতো ডাক্তার দেখালে সেরে যেত। কিন্তু তা তো করেনি। খামখেয়লি মানুষেরা যেমন হয়। দেখারও তো কেউ ছিল না। সুদিন ফুরিয়েছে, দুধের মাছিরাও উড়ে গেছে। কোনো শাসন-বারণের তোয়াক্কা করেনি। মা যেন নিজের সঙ্গেই নিজে কথা বলছে। উপমা জানে মায়ের সব কথাই ঠিক। বাবার একমাত্র সন্তান হয়েও বাবার কাছে থাকতে পারেনি এ যে তার জীবনের কত বড় কষ্ট তা সে কখনও কাউকে বুঝতে দেয়নি। বুঝতে দেয়নি মাকেও, তাহলে যে কষ্ট পায় মা। মায়ের কষ্ট সে কিছুতেই নিতে পারে না।

—বাবার দাহ শেষ করে অস্থিটা আমি বাড়ি নিয়ে এসেছি মা।

—কী করবি ও দিয়ে?

উপমা কোনো উত্তর দেয় না। এরপর আবার অনেকক্ষণ চুপচাপ। চুপচাপ থাকে দুজনেই। কোনো কথা খুঁজে পায় না ওরা। বিছানা থেকে নামতে নামতে শাসনের সুরে উপমা বলল, ‘আর তুমি? ভালো ডাক্তার দেখিয়ে শরীরটা চেকআপ করিয়ে নিতে আমারই কী কম ঝক্কি পেহাতে হয়েছে? আমার কথার কোনো গুরুত্ব দাওনি।’

—তোর অভিযোগ মিথ্যে নয়। শুধু ভয়ে ভয়ে থাকতাম। বিছানায় শুয়ে থাকতে কার ভালো লাগে বল?

উপমা কোনো উত্তর দেয় না। দুজনে আবার চুপচাপ। দুজনেই যেন কথা হারিয়ে ফেলছে বারবার। এই নীরবতার ভিতরে পরস্পরের গোপন দৃষ্টি দুজনের দিকে লুকোচুরি খেলছিল। তারপর বাইরের অনন্ত আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে মা। একসময় খুব ভাঙা কণ্ঠস্বরে ফ্যাসফেসে কিছু শব্দ বেরিয়ে আসে মায়ের গলা থেকে, ‘উপু, তুই আমাকে ছেড়ে কোথাও চলে যাবি না তো মা?’

চমকে ওঠে উপমা। এ প্রশ্নের কী যে উত্তর তার জানা নেই। বুকের ভিতরটা তার ধক ধক করতে থাকে। ঘড়ির পেন্ডুলামটা ভিতরে অনবরত দুলছে। দুলতে দুলতে সময়ের নৌকা পার করছে আপন মনে। বাড়ির পিছনে নারকেল গাছের বাসিন্দা দুটো কাক প্রথম প্রহরের ডাক ছেড়ে বাসা থেকে বেরিয়ে গেল ডানা মেলে। কত দূরে যাবে ওরা! যেখানেই যাক সন্ধ্যায় ঠিক ফিরে আসবে বাসাতে। বাসায় সদ্য ডিম থেকে বেরোনো দুটো ছানা আছে। ওদু’টোর টানেই ঠোঁটে করে কত কিছু নিয়ে আসে কাক বাবা-মা তার ঠিক নেই। এদৃশ্য দেখে তার ছেলেবেলার কথা মনে পড়ে যায়। কোনো দিন-তারিখ মনে পড়ে না। কোনো রং দেখতে পায় না। তবু উপমা সেখানে পৌঁছে যায়। সেখানে বাবাকে ঘিরে হাজার স্মৃতির ঘুড়ি উড়ছে। কোনোটা জ্বলজ্বল করছে, কোনোটা বা সুতোয় ছাড় পেয়ে দূরে সরে গেছে। সে ঘুড়ির মেলা দেখতে দেখতে উপমার মাতালের মতো লাগে।

চোখ বুজলেই উপমা দেখতে পায় ওদের জোহরা মার্কেটের ভাড়া বাড়িতে নাওয়া-খাওয়া ভুলে সিগারেট মুখে বাবা পেস্টিং করছেন, আর মা ময়দা গুলে গাম তৈরি করে দিচ্ছেন। গোপীবাগে পত্রিকা অফিসে প্রেসের ঘ্যাটর ঘ্যাটর শব্দের মধ্যেও বাবা পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা লিখে চলেছেন কিংবা সহকর্মীদের সঙ্গে জম্পেশ আড্ড দিচ্ছেন আর ভরা কাপ চা সেও সিগারেটের ধোঁয়ার মতো উড়ে যাচ্ছে।

বাবার কোনো দিকে খেয়াল নেই। কে বাজার করে কে ঘাট করে—সে সব দেখার ফুরসত নেই তার। অথচ অতিথি নিয়ে ঠিক খেতে বসে যেতেন। মা যে কেমন করে সব সামলাতো কে জানে। উপমা সেই তখন থেকেই বুঝতে পারত মায়ের কষ্টা। একদিকে স্কুলের কাজ আর একদিকে বাড়ির এই বেসামাল অবস্থা। মায়ের চাকরিটা ছিল বলেই শেষ রক্ষা হতো।

মানুষকে খুব অনুকরণ করে দেখাতে পারতেন বাবা। বাবার সেই সব ক্যারিকেচারের কথা মনে হলে উপমা এখনও নিজের অজান্তেই হেসে ওঠে। উপমা সত্যি সত্যিই হেসে ওঠে এখন।

—কীরে পাগলের মতো একা একা হাসছিস যে বড়?

মায়ের কথায় উপমার স্মৃতির উঠনে পরত পড়া ধুলো উড়ে যায় বাউরি বাতাসে। হাসতে হাসতে সে বলে, ‘দাঁড়াও বলছি, আগে চা করে আনি।’ কিছুক্ষণের মধ্যেই চা করে এনে মায়ের সামনে বসে উপমা।

—মা, তোমার মনে পড়ে বাবার একটা টেপরেকর্ডার ছিল। মজা করে সেটাকে বলত গানের বাক্স।

—মনে আছে, তার সংগ্রহে কত যে বই ছিল। ছিল বাংলা গানের বিশাল সংগ্রহ। ইলেকট্রনিক জিনিসপত্রের প্রতি খুব আগ্রহ ছিল। টাকা পেলেই ওই সব জিনিস কেনা চাই তার। কোথায় গেল সেসব?

—ধুলো হয়ে উড়ে গেছে মা!

উপমার মিনির কথা মনে পড়ে। রবীন্দ্রনাথের কাবুলিওয়ালা গল্পের লেখক আর তার এক রত্তি মেয়ের সম্পর্কটা যেন ছবি হয়ে আছে তার চেখের সামনে। তার সঙ্গে বাবার সম্পর্কটা তো ওই রকমই ছিল। ছবিটা ঠিক ওইখানেই দাঁড়িয়ে আছে। এই সব ছবির খোঁজেই উপমা ছুটে ছুটে যেত বাবার কাছে। ওর মনে পড়ে একবার বাবার হাঁস-মুরগি পালার খুব শখ হলো। যে কথা সেই কাজ। প্রথমেই হাস-মুরগির বাড়ি বানানো হলো। তাদের আবার নাম দেয়া হলো। ফার্ম থেকে মুরগির বাচ্চা আনার আগে পশু হাসপাতাল থেকে রোগ প্রতিষেধক নানা ইনজেকশন দিয়ে আনতেন। মুরগিগুলোর কোনো অসুখ-বিসুখ হলে সব কাজকর্ম বাদ দিয়ে পশু হাসপাতালে পাগলের মতো ছোটাছুটি হতো। মুরগি ডিম পাড়া শুরু করলে কী যে খুশি হতেন সে বলে শেষ করা যাবে না। মহানন্দে সেই ডিম বন্ধুবান্ধবকে বিলাতেন। নতুন নতুন বাচ্চা ফুটলে তাদের মিষ্টি মিষ্টি নাম রাখতেন।

—যেবার তুমি পিএইচডি করতে গেলে বরদায়, সেবারই আমরা তিনজন আলাদা হলাম। কলকাতা থেকে ট্রেন। ট্রেন প্রায় ছেড়ে দেয় দেয় অবস্থা অথচ তুমি কিছুতেই আমার হাত ছাড়ছিলে না। একদিকে বাবা আমার একটা হাত ধরে আছে আর একদিকে তুমি আরেকটা হাত, সে কী অবস্থা এখনও মনে পড়লে বুকের ভিতর কেমন করে।

—ওই রকম বাউণ্ডুলে বাপের কাছে তোকে একলা রেখে যেতে আমার মন চাই ছিল না কিছুতেই।

—একলা কোথায়? তোমরা তো আমাকে মির্জাপুরে ভারতেশ্বরী হোমসে ভর্তি করে হোস্টেলে দিয়েছিলে।

—সে ঠিক আছে। কিন্তু তুই কত ছোট ছিলি বলত?

—টেলিভিশনে হোমসের ছাত্রীদের শরীর চর্চার দৃশ্য দেখে ওখানে যাওয়ার বায়না ধরতাম। ওখানে গিয়ে তোমাদের জন্য দু’চারদিন খারাপ লেগেছে, তার পরে ঠিক হয়ে গেছে। ওখানে থাকতে আমার খারাপ লাগত না মা। কত বন্ধু-বান্ধব-টিচার সবার সঙ্গেই আমার খাতির হয়ে গিয়েছিল। পড়াশোনা, ড্রিল, ড্রামা, মাঝে মাঝে দেশ-বিদেশের বিখ্যাত সব মানুষজন বেড়াতে আসেন। একবার তো সেই স্বপ্নের রানি রোমান হলিডে সিনেমার নায়িকা অড্রে হেপবার্ন এলেন বেড়াতে। আমাদের নাচ গান দেখে তিনিও পাগল প্রায়। জানো মা, খুব মজা করেছি ওই সময়টায়। বরং ছুটিতে গিয়ে আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে থাকতেই খারাপ লাগত। তখনই শুনতে পেতাম বাবার নামে সবাই আজে বাজে কথা বলছে।

আর আগায় না উপমা। তখন তো আর মোবাইলের যুগ নয়। কোনো এক উঠতি নায়িকার সঙ্গে বাবার সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। 

উপমা জানে মায়ের কাছেও মন খারাপ করা খবরগুলো রং চড়িয়ে চিঠির মাধ্যমে পৌঁছে যেত। খবরগুলো মায়ের মনকে বিষিয়ে তুলত। অথচ ভালোবেসেই দুজনে ঘর বেঁধে ছিল। বিয়ের পর বাপের বাড়ির সঙ্গে সম্পর্কটা মায়ের খুব খারাপ হয়ে গেল। সে সম্পর্ক তেমন করে আর কোনো দিন জোড়া লাগেনি। জীবনে ঠিক মানুষটিকে চিনে নিতে পারেনি বলেই আচমকা নদীর মাঝে ঝড়ে পড়া নৌকার মতো অবস্থা হলো মায়ের। সব ছেড়েছুড়ে যাকে ভালোবেসে সংসার করতে এলো তার আত্মীয়-স্বজন মাকে আপন করে নিতে পারেনি। এ যে মায়ের কত বড় বেদনা, তা সহজে প্রকাশ করত না। ঘরে এলে বাবার আচরণও অচেনা মানুষের মতো মনে হতো। মা চিরদিন চেয়েছিলেন মাথা উঁচু করে চলতে। কিন্তু সংসারের ভিতরে তাকে অপমানে লজ্জায় কুঁকড়ে থাকতে হতো। অনাহুতের মতো মরমে মরে থাকতেন।

উপমা হওয়ার পর মা যেন একটা অবলম্বন খুঁজে পেলেন। কন্যার ভিতরেই সবটুকু নিয়ে ঢুকে যেতে চেয়েছিলেন। জ্বলতে জ্বলতে একটা স্থিমিত প্রদীপ—এখনও রোগজীর্ণ শরীরের ফ্যাকাশে দুটো চোখ সব সময় উপমার দিকেই তাকিয়ে থাকে। ও-ই তো মায়ের একমাত্র ভরসা। সংসার থেকে পাওয়া কষ্টটা তখন মায়ের অনেকটাই ফিকে হয়ে এসেছিল। আর উপমার বেঁচে থাকার শক্তিও যে মা। লতার মতো জড়িয়ে আছে একে অন্যকে ঘিরে। কে কাকে ছেড়ে কোথায় যাবে?

ভারত থেকে পিএইচডি করে আসর পর মা আর তার সংসারে ফিরে যেতে পারেননি। অথবা ফিরে যাবার রুচিটাই হারিয়ে ফেলেছিলেন। মায়ের অভিমানটাই বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ওখানে থাকতেই মা ওর চিন্তায় প্রেসারটা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারত না। তারই সূত্র ধরে ডায়াবেটিস। বাংলাদেশে আসার পর কিডনি ইফেক্ট করল। মা তো কিছুই পাত্তা দিত না। হন্নে হয়ে একটা চাকরি খোঁজা শুরু করল। পেয়েও গেল একটা কলেজের চাকরি। টিচারদের সঙ্গে ম্যানেজিং কমিটির দলাদলির কারণে চাকরিটা বেশি দিন করা গেল না। কিছুদিন পর একটা স্কুলে ঢুকল। উপমা তখন সবে স্কুল পাশ করেছে। দুটো মানুষের খরচ কীভাবে চলবে। বাসা ভাড়া, মেয়ের কলেজের খরচ। সব মিলিয়ে একটা বড় রকম ফাঁপরের মধ্যে পড়ে গেলেন মা। অবসরে টিউটিউশনি করতে শুরু করলেন। হাজারটা কাজের ফাঁকে হাতে সেলাই করে মেয়ের জামা-কাপড় নিজের ব্লাউজ-পেটিকোট হাতে সেলাই করে তৈরি করত। তাতে দর্জিবাড়ির পয়সা বাঁচত। মেয়ে কলেজ থেকে ফিরলে তার পড়াশোনার খোঁজখবর করত। বলত, ‘কোনো দিকে তাকানো চলবে না, পড়াশোনা চাই। পড়াশোনা করেই বাঁচতে হবে আমাদের।’ তার অবসর বলে কিছু ছিল না। একবেলা না খেয়ে থাকবে, তবু কারো কাছে হাত পাতার কথা ভাবতেই পারত না। মায়ের স্বভাবটাই ওই রকম। উপমাকেও তৈরি করেছে নিজের মতো করে। স্কুল থেকে ফিরে প্রায় বমি করত। শ্বাস কষ্টটাও শুরু হলো তখন থেকে। অমানুষিক পরিশ্রম করে চলেছে মা। আর একটার পর একটা অক্টোপাসের মতো অসুখগুলো তাকে ঘিরে ধরছে। কিন্তু অসুখগুলোকে গুরুত্ব দেয়নি। যখন দিয়েছে, ততদিনে হাতছাড়া হয়ে গেছে অক্টোপাসের নিয়ন্ত্রণ। শরীরে পানি জমতে শুরু করেছে। ডায়াবেটিকের কারণে দুর্বলতা বাড়ছে। ধীরে ধীরে কর্মক্ষমতা লোপ পাচ্ছে।

উপমা পড়াশোনা শেষে ভালো বেতনের চাকরি পেয়েছে। মা খুব খুশি। এবারে মাকে নিয়ে শুরু হয় উপমার সংগ্রাম। সে প্রস্তুতি নেয় মাকে ভালো করে তুলতেই হবে। মা-মেয়ে দুজনের সংসার। খরচ তেমন কিছুই নয়। কিন্তু মায়ের চিকিত্সা খরচ সে এক বিরাট ধাক্কা। সোনা গয়না মা কখনও তেমন পরেনি। দিদিমার দেয়া ওগুলো বাক্সবন্দি হয়েই ছিল। মা হয়তো মনে মনে ভাবতেন ঘটা করে উপমার বিয়ে দেবেন। সাজিয়ে দেবেন মনের মতো করে। ওর একটা সুন্দর সুখী সংসার হবে, যা দেখে নিজের অপূর্ণ সাধ পূরণ হবে। এমন অদিনে সেই সোনার গয়না খুব কাজে লেগেছে তার। মায়ের ডায়ালাইসিস করাতে হয় সপ্তাহে দুবার। হাসপাতালে প্রায় চার ঘণ্টা থাকতে হয়। আকাশচুম্বী খরচ। তার কাছের বন্ধুরাও এগিয়ে এসেছে তার মায়ের জন্য। মায়ের এ অবস্থায় তার বাপের বাড়ির বলতে গেলে সবাই ঝাঁপিয়ে পড়েছে। কিন্তু মূল স্রোতের মুখে বাঁধ তুলে ধরতে হচ্ছে তো তাকেই।

মা যেন দিন দিন ছোট বাচ্চার মতো হয়ে যাচ্ছে। বিছানায় ঘুমিয়ে থাকেন ছোট্ট একটা মেয়ের মতো। তখন শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ থাকে না এ ঘরে। সেদিন বলছিল, ‘বাড়িটাকে তো একেবারে হাসপাতাল বানিয়ে তুলেছিস। চারদিকে ওষুধের গন্ধ, আর ভালো লাগছে না। কোথাও বেড়াতে নিয়ে চল না। সাগরের কাছে যেতে ইচ্ছে করে বড়।’

উপমা জানে মায়ের ভ্রমণের খুব শখ ছিল। কোথাও থেকে বেড়িয়ে এলে ভ্রমণকাহিনি লিখত। চমত্কার সব ভ্রমণকাহিনি ছাপা হতো খবরের কাগজে। উপমা সিদ্ধান্ত নেয় মাকে নিয়ে সে কোথাও বেড়াতে যাবে যেখানে গেলে মায়ের মন ভালো হয়ে যাবে। তার মনে হয় মায়ের এখন শরীরের যা অবস্থা, তাতে মন ভালো রাখা দরকার আগে।

মাকে এখন আর হাসপাতালে নেয় না। ডাক্তার চাচার পরামর্শেই দক্ষ নার্স দিয়ে বাসাতে সিএপিডি মানে কনটিনিউয়াস পেরিটোনিয়ার ডায়ালাইসিস করানো হয় মাকে। বেশি অসুবিধা হলে তবেই হাসপাতালে নেয়। বিষয়টি সহজ কিন্তু জলের মতো টাকা যায়। উপমার ছেলেবেলার কথা মনে পড়ে ওর কোনো ইচ্ছের কথা মা যদি জানতে পারতেন সেটা তিনি যেভাবেই হোক পূরণ করতেন। এখন তার মনে হয়, মা তো সেই তার মতোই ছোট্ট শিশু হয়ে গেছে, উপমাকে তাই একদম চোখের আড়াল হতে দিতে চায় না। ছোটবেলায় মা যেমন করে তাকে বুকের ভিতরে নিয়ে ঘুমাত, মায়ের কষ্ট হলে উপমা ঠিক তেমনি করে মাকে বুকের মধ্যে নিয়ে ঘুম পাড়াবার চেষ্টা করে।

না, গেল রাতে একদম ঘুমায়নি মা। এই সকালের দিকে উপমা ভেবে ছিল মা এবারে বোধহয় একটু ঘুমাবে। কিন্তু ঘুম কোথায়! নিচের তলার প্লাস্টার খসা দেয়ালের ফাঁক দিয়ে একটা সরু অশ্বথের কিছু শিকড়ের মুখ বেরিয়ে আসার মতো ছোট ছোট কথা শুরু করে আর তাতেই যেন প্রাণরস খুঁজে পায় মা। আজ যেন তাকে কথায় পেয়ে বসেছে। এই যে বাবার কাছ থেকে এত কষ্ট পেয়েছে মা, দিন-রাত পরিশ্রম করে করে জীবনটাকে অনিশ্চিতের দিকে ঠেলে দিয়েছে। ঘৃণা ছিল প্রচণ্ড তবু কোনোদিন বাবা সম্পর্কে অশ্রদ্ধা করে ভালো মন্দ কোনো কথা বলতে শোনেনি উপমা। আজ যেন কী হয়েছে তার।

—জানিস তো, লোকটা যে কী বিচিত্র স্বভাবের ছিল সে বলে শেষ করার নয়। ওর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে ছিল প্রচুর বৈপরীত্য। সাংবাদিক মানুষ তো, বন্ধু-শিষ্যের অভাব ছিল না। তাদের সঙ্গে কখনও রুক্ষ আবার কখনও তাদের উপর এতটাই বিগলিত যে মনে হবে ওনার মতো আপন ওদের আর কেউ নেই। জানিস তো মানুষকে হাসাতেও পারত।

—মা, আমি সব জানি। কাল রাতে একটুও ঘুমাওনি। নাস্তা খেয়েছ, এখন একটু ঘুমাবার চেষ্ট করো তো।

—শোন, শোন একটা মজার কথা বলি।

—আজ আর নয়, কাল শুনব।

—তোর বাবার ছোট-বড় কোনো বাছ-বিচার ছিল না। সবাইকে ‘হালার পুত’ বলত।

বলেই কুল কুল করে এমন হাসতে শুরু করলেন যে হাসতে হাসতে চোখে জল চলে এলো। কাশি উঠে গেল। কাশতে কাশতে চোখের জল মুছতে লাগলেন আঁচল দিয়ে।

—পুরান ঢাকার মানুষ তো, ওই রকম করে কথা বলে ওরা।

মায়ের দিকে এক অদ্ভুত বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে থাকে উপমা। কাল যখন পোস্তগোলা মহাশ্মশানে বাবার দাহ কাজ সেরে সবাই স্নান করে ফিরছিল তখন সে তাকিয়ে ছিল শূন্য চিতাটার দিকে। চিতার উত্তপ্ত পোড়া কাঠের উপর জল ঢেলে ঢেলে কারা যেন পরিষ্কার করছিল। নালা বেয়ে সেই গরম জল গিয়ে মেশে নদীর নরম মাটি আর জলের সঙ্গে। কালো জল—ছাই রং জল—কোথাও তার চিহ্ন নেই। সানবাঁধানো শ্মশানের পাটাটা ততক্ষণে ঝকঝক করছে। কে বলবে কিছুক্ষণ আগে এখানে দাউ দাউ আগুন জ্বলেছে। এখন সমস্ত তাপ ঠাণ্ডা হলো। মাকে দেখে তার সেই শ্মশান ঘাটের কথা মনে পড়ছে। তার ভিতরের যত অপমান, ঘৃণা, জ্বালা-যন্ত্রণার পাপ ছিল এই মৃত্যুসংবাদে সব যেন ধুয়ে মুছে নিয়ে নদীর জলে গিয়ে পড়ে ওমন করে। তাই এমন করে মা স্মৃতি রোমন্থন করতে পারছে, হাসতে পারছে নির্মল শিশুর মতো। আজ যেন তার কাছে বাবার কোনো ত্রুটি নেই, কোনো অন্যায় নেই, সে যেন এক অন্য জগতের মানুষ।

’৭১-এ মায়ের পুরো পরিবার শরণার্থী হয়ে ভারতে গিয়েছিলেন। বাবাও। মন দেয়া-নেয়া তো ছিল আগে থেকেই। ওখানেই ওরা বিয়ে করেন। ঢাকায় ফিরে বাবা আবার তার আগের কাজের জায়গায় যোগ দিতে পেরেছিলেন। যদিও বিধ্বস্ত অবস্থা চারদিকে। ওই সময়ে একটা কাজ জোগাড় করা সে বড় সৌভাগ্যের ব্যাপার ছিল। সে সময়ে ওরা থাকতেন আজিমপুর গোরস্থানের পিছনে পিলখানা ৩ নম্বর বিডিআর গেইটের কাছে সুফিয়া ভবনের একটা টিন শেড ঘরে। ভাড়া ছিল ১০০ টাকা। প্রতিদিন বাবা সকাল ১০টায় বেরিয়ে যেতেন আর ফিরতেন সেই গভীর রাতে। তখন সাংবাদিকতার আরেক নাম অনিশ্চিত জীবন। এখনকার মতো নয়। সাংবাদিকতার চাকরি মানেই তখন জীবনের সঙ্গে দৈনদশাকে মেনে নেয়া।

—তখন এমনও হয়েছে মাসের পর মাস বেতন নেই। কিন্তু তোর বাবা কাউকে তার দারিদ্র্য দেখাতে চাইত না। এমনকি তার বাবা-মা-ভাই-বোনকেও না। আমি কোনো রকমে একটা ছোটখাটো স্কুলে ঢুকেছিলাম, বেতন সামান্যই। জানে সংসারের এই টানাটানির অবস্থা তারপরেও বলা নেই কওয়া নেই প্রায়ই অতিথি নিয়ে হাজির হতেন। এ কোন বিবেচনার কাজ বল তো?

মায়ের কথা শুনে মনে হয় এখনও যেন ওরা একসঙ্গে আছে। সুযোগ পেয়ে মেয়ের কাছে বাবার বিরুদ্ধে নালিশ শুনিয়ে দিচ্ছে।

উপমা বলল, ‘আমার মা যে সংসারের দণ্ডমুণ্ডের মালিক সেই সংসারে যত অভাবই থাকুক না কেন, কেউ যে সেখান থেকে খালি মুখে ফিরবে না এই ভরসায় বাবা ওই কাজটা করত।’

—ও তাই বুঝি?

—তুমি তো শরত্চন্দ্রের নায়িকাদেরও হার মানিয়েছ। আচ্ছা বল তো সংসারের এত অশান্তি, ঝামেলা তার মধ্যেও পড়াশোনা, লেখালেখি কী করে করত বলত?

—ওইটুকু ধরে রেখেছি বলেই বেঁচে ছিলাম। নইলে কবেই মরে যেতাম।

—না না, তা ঠিক নয়, তুমি কেবল আমার মা হওয়ার জন্যই বেঁচে আছ। তুমি চিরকাল মাথা উঁচু করে বাঁচতে চেয়েছ। আমাকেও সেই শিক্ষা দিয়েছ। আজ তোমাকে বলি কাল যখন মোবাইলে বাবার মৃত্যুসংবাদ পেয়ে বেরিয়ে গেলাম। তখন আমি তোমাকে নিয়ে যেতে পারতাম। কিন্তু ভাবলাম যে মানুষটি বেঁচে থাকতে তোমাকে সম্মান দিতে পারেনি, দায়িত্ব নিতে পারেনি তার একমাত্র সন্তানের, তার মৃতদেহের কাছে তোমাকে টেনে নিয়ে যাওয়ার মানে তোমাকে অপমান করা। আমি সে কাজটা করতে পারিনি মা।

মা পাথর চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলো উপমার দিকে।

বেশ কিছুদিন থেকে মা আবার চুপচাপ। শুধু বই পড়ছেন। একদিন দুপুরে খাওয়া শেষ করে মা বললেন, ‘উপু, আমার না খুব সাগর দেখতে ইচ্ছে করছে। সৈকতে বসে একটার পর একটা ঢেউ এসে লুটিয়ে পড়বে আমার কাছে। পা ধুইয়ে আবার ওরা ফিরে যাবে সাগরে। তুই তখন হোসনি, আমরা কক্সবাজার গিয়েছিলাম। অনেক রাত অবধি সৈকতে বসে থাকতাম। অন্ধকারে ঢেউয়ের মাথায় ফসফরাস জ্বলতে দেখে কী যে ভালো লাগত। মনে হতো ঢেউগুলো যেন চমকে চমকে উঠছে। আবার খুব ইচ্ছে করছে ওই রকম ঢেউ দেখতে। নিয়ে যাবি আমাকে সমুদ্র দেখাতে?

ছোট বাচ্চাদের মতো আবদার করে মা।

—সমুদ্র কেন? পাহাড় দেখতে ইচ্ছে করে না তোমার? তুমি তো পাহাড় দেশের মেয়ে। এই সুযোগে সিলেটে বাপের বাড়িটাও ঘুরে আসা হবে।

—তোর যেমন কথা। ওখানে আর কেউ আছে নাকি যে যাব? আর পাহাড় দেখতে আমার ভালো লাগে না। চোখের দৃষ্টি প্রসারিত হতে বাধা দেয় পাহাড়। সমুদ্র ভালো, যতদূর চোখ যায় একেবারে বাধা বন্ধনহীন—অসীম। সেই অসীমের মাঝে আমি যেতে চাই।

আরও একদিন বলেছিল মা। মনে মনে উপমা রাজি হয়ে যায়।

মুখে বলল, ‘তোমার শরীরের এই অবস্থায় কোথাও যেতে ভয় লাগে যে আমার। যদি পান থেকে চুন খসে তখন তো তোমার আত্মীয়-স্বজনরা আমাকেই ধরবে।’ মা উপমার কথা শুনে হেসে ফেলে।

—ও আমার আত্মীয়-স্বজন বুঝি তোমার কেউ হয় না?

—হয়, হয় অনেক কিছু হয়। কিন্তু...

—কোনো কিন্তু নয়, আমি তো এখন ভালোই আছিরে। ভয় তো ওই মরণের? সে তো একদিন মরতেই হবে। মানুষ চিরকাল কি আর বাঁচতে আসে দুনিয়ায়? আজ মরলে কাল দুই দিন।

মায়ের মুখে এই সব কথা শুনতে শুনতে হূদপিণ্ডটা তার থর থর কেঁপে উঠে।

—খুব তো কট কট করে জ্ঞানের কথা বলছ। মরা মরা কোরো না তো। চুপ করো এখন। কখন থেকে বকে চলেছ।

উপমা এক রকম ধমকেই ওঠে মাকে।

—মরতে তো চাই না উপু, তোকে রেখে আমি কোথাও যেতে চাইনারে, কোথাও যেতে চাই না। এমন হয় না কোনো অলৌকিক হাতের ছোঁয়ায় আমার সব অসুখ ভালো হয়ে গেল।

বলতে বলতে ঝর ঝর করে কেঁদে ফেলেন মা।

উপমা মাকে নিয়ে কক্সবাজার যাওয়ার সিদ্ধান্তটা পাকা করার আগে ডাক্তার চাচার সঙ্গে কথা বলে।

—আপনি ভরসা দিলে... মা খুব জেদ করছে...

—দুদিনের জন্য, তো যাও না ঘুরে আসো। দিদির ইচ্ছে তুমি ছাড়া আর কে পূরণ করবে? তাছাড়া একটু হাওয়া বদল হলেও ভালো হয়।

সত্যিই তো ধুলোবালির ঢাকায় এই একটা ঘরে থেকে মা একেবারে হাঁপিয়ে উঠেছেন। মাথার ধারের জানালায় খণ্ড আকাশটুকু ছাড়া মায়ের জগতটা তো এই এতটুকু হয়ে আছে। সেখানে দমবন্ধ হয়ে আসারই কথা। তাই বোধহয় মায়ের মনটা ছুটেছে প্রকৃতির পানে। ডাক্তার চাচার গ্রিন সিগনাল পেয়েই উপমা প্লেনের দুটো টিকেট বুক করে ফেলে।

কার্তিকের শেষ। ধোঁয়া ধুলোয় রাতের আকাশটা ঢাকা পড়ে আছে আর তারই ভিতরে চাঁদ উঠেছে শতবর্ষীর ঘোলা চোখের মতো। কক্সবাজারে এসে সেই একই চাঁদ কেমন তরুণ চোখে ঝলমলিয়ে হাসছে। কটেজে বারান্দায় বসে মা সেই চাঁদ দেখছেন। দেখছেন খণ্ড খণ্ড সাদা মেঘ সমুদ্র থেকে স্থলভূমির দিকে মন্থর গতিতে যেন ফুলের ঝাপি নিয়ে এগিয়ে আসছে। পাশে বসে আছে উপমা। মা বললেন, ‘গান করত উপু, আজ জ্যোস্না রাতে সবাই গেছে বনে।’

গান শেষ করে উপমা বলল, ‘এবার খুশি তো!’

মা হেসে ফেলেন। মায়ের হাসিটা এমন মিষ্টি, সে হসিতে উপমার মন ভরে যায়। মায়ের মুখে এমন তৃপ্তির হাসি সে বহুদিন দেখেনি।

—উসু, আজ আমি সারা রাত এখানে বসে থাকব।

—তুমি পাগল হয়েছ? ঠাণ্ডা লেগে যাবে যে!

—কেন, এই যে গরম কাপড় চাদর পরে আছি যে, ঠাণ্ডা লাগবে না।। আরেকটু রাত বাড়লে সৈকতে হাঁটতে যাব।

—মা, আর কী কী করতে চাও বল তো?

—এই নীল জ্যোস্নায় সমুদ্র আমার পা ধুয়ে দেবে। আর আমি আমার দু’চোখের যত নোনা জল তাকে উপহার দেবো।

—তার দরকার হবে না মা। এমনিতেই সমুদ্রের জল যথেষ্ট নোনা।

বলেই উপমা হেসে ফেলে।

—উপু তুই তো জানিস না আমার দিদিমা বলতেন এই রকম মরাল জ্যোস্নায় সমুদ্রের জল মিষ্টি হয়ে যায়।

—তাই বুঝি? এরকম একটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এতদিন জানতাম না তো।

—জানবি কী করে, তোরা তো সব ডিজিটাল যুগের মানুষ। বুড়ো-বুড়িদের কথা তো বিশ্বাস করিস না তোরা।

মা-মেয়েতে এই রকম খুনসুটি করতে করতে রাত প্রায় সাড়ে ন’টা বেজে যায়। উপমা মাকে রাতের খাবার খাইয়ে দিয়েছে আটটার দিকে। প্রয়োজনীয় ওষুধগুলোও খাইয়ে দিয়েছে। সে জানে মায়ের চোখে ঘুমের ঘোর লেগে আসছে। আর একটু বসে থাকলেই ইজিচেয়ারেই ঘুমিয়ে পড়বে।

—একটু জল খেতাম রে মা।

উপমা এক গ্লাস জল এনে মায়ের হাতে দেয়। খানিকটা খেয়ে আস্তে আস্তে কখন যে ঘরে গিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ে উপমা বুঝতেই পারেনি। যখন খেয়াল হয় গিয়ে দেখে মা ঘুমিয়ে পড়েছেন। মাকে অনেকটাই সুস্থ লাগছে।

মায়ের গায়ে চাদর টেনে দিয়ে সে আবার বারান্দায় এসে দাঁড়ায়। তারপর মায়ের চেয়ারটাতে গিয়ে বসে। নীল জ্যোস্নায় নিঃঝুম হয়ে আছে আকাশটা। দু’চোখে সীমাহীন জ্যোত্স্না, জলের বিন্দুতে বিন্দুতে স্থির হয়ে আছে। একটু একটু করে রাত বাড়ছে। সমুদ্রের একটানা ঢেউয়ের পর ঢেউ আছড়ে পড়ার শব্দ ছাড়া আর কিছু শোনা যায় না। একটানা তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাত্ উপমা চমকে ওঠে। দূরে সমুদ্রের পাড় ধরে মা একলা হেঁটে যাচ্ছে। জ্যোত্স্নালোকে এ দৃশ্য এতটাই স্পস্ট যে সে নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না। তাহলে সত্যি সত্যিই মা এই রাত্রে সমুদ্রের জলে পা ভেজাবে! আচ্ছা, মা যখন বেরিয়ে গেলেন, উপমা ভাবে তাকে এবারও ডাকল না কেন? সে বাধা দেবে বলেই হয়তো ডাকেনি। তাই বলে এরকম লুকিয়ে লুকিয়ে বেরিয়ে যেতে হবে? এটা একদম ঠিক করেনি মা। বললে কি সে সঙ্গে যেত না? মায়ের উপর খুব রাগ হলো তার। কিন্তু রাগ করে বসে থকতে পারে না। সেও মায়ের পিছনে পিছনে হাঁটবে ঠিক করল। বের হওয়ার আগে ঘরের দরজা লাগাতে গিয়ে সে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আর একবার চমকে যায়। মা তো ঘরেই শুয়ে আছেন। তবে সে কি ভুল দেখেছে? ঘুমন্ত মুখটা দেখে তার মনে হয় কোনো কালে মায়ের কোনো অসুখ করেনি। দিব্বি ভালো মানুষ শুয়ে আছে।

বিছানার কাছে গিয়ে মায়ের গায়ে তার আদরের হাতটা বুলাতে থাকে। হাত বুলাতে বুলাতেই সে বুঝতে পারে মা সত্যি সত্যিই সমুদ্রের ধারে হাঁটতে গেছেন। তার নিঃশ্বাস বরফ হয়ে জমতে থাকে বুকের কাছে। বিছানায় যিনি শুয়ে আছেন সে তার খোলস। খোলসটা পড়ে আছে নিথর ঠাণ্ডা বরফ। সেই ঠাণ্ডা খোলসটাকেই অবুঝের মতো একটা ঝাঁকুনি দিয়ে জানতে চাইল, ‘যাবার আগে একবারও ডাকোনি কেন আমাকে? কেন ডাকোনি?’ বলতে বলতে উপমা বারান্দায় এসে দাঁড়ায়। সে মুহূর্তের জন্য। তারপর ছুটে যায় সৈকতের ওই দিকটায় যে দিকটায় সে মাকে হেঁটে যেতে দেখেছিল। আতিপাতি করে খুঁজল। না, কেউ কোথাও নেই। চারদিক শূন্য। নির্জন। জলের বিন্দুরা গিয়ে মিশছে আকাশের সীমানায়, নীল জ্যোত্স্না ছড়ানো চাঁদটাকে ঘিরে ধরেছে ওরা। চলছে লুকোচুরি খেলা। দূর আকাশের তারারা দেখছে সে দৃশ্য। এসবের ভিতরেই একটা তারা দলছুট হয়ে কোথায় পড়ল কে জানে? হয়তো ছুটে আসা নোনাজলের বিরাট ঢেউয়ের মাথায়। ঢেউটা তিরে এসে উপমার পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়ে।

উপমা একলা ফিরে যায় নোনা জলে ভেজা পায়ে নিশির নৈঃশব্দ্যে। d

 

 

 

 

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
২১ জুন, ২০১৮ ইং
ফজর৩:৪৩
যোহর১২:০০
আসর৪:৪০
মাগরিব৬:৫১
এশা৮:১৬
সূর্যোদয় - ৫:১১সূর্যাস্ত - ০৬:৪৬
পড়ুন