অপ্রকাশিত সাক্ষাত্কার
গোলাম কাসেম ড্যাডি
গোলাম কাসেম ড্যাডি
পূর্ববাংলার ফটোগ্রাফি

রাজসাক্ষী গোলাম কাসেম ড্যাডি

গোলাম কাসেম ড্যাডির জন্ম ১৮৯৪ সালের ৫ নভেম্বর, ভারতের জলপাইগুড়িতে। তিনি বর্তমান বাংলাদেশের প্রবীণতম আলোকচিত্রী ও প্রথম বাঙালি মুসলমান ছোটগল্পকার। তাঁর জন্মের কয়েক ঘণ্টা পরেই মায়ের মৃত্যু হয়। তিনি তাঁর খালার কাছে বড় হন। তিনি হাওড়া থেকে ১৯৯২ সালে ম্যাট্রিক পাস করেন। সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে আইএ। ১৯১৫ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যোগদানের কারণে লেখাপড়া সমাপ্ত হয়ে যায়। ১৯১৯ সালে সাব-রেজিস্ট্রার পদে যোগদান করেন। সেখানে তাঁর সর্বশেষ পদবি ছিল ডেপুটি রেজিস্ট্রার ভূমি। ফটোগ্রাফিতে হাতেখড়ি হয় ১৯১২ সাল। তিনি পূর্ব পাকিস্তানে প্রথম ফটোগ্রাফি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ট্রপিক্যাল ইনস্টিটিউট অব ফটোগ্রাফি ১৯৫১ সালে প্রতিষ্ঠা করেন। ফটোগ্রাফি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি মাত্র দু বছর চালু ছিল। ১৯৬৩ সালে ক্যামেরা রিক্রিয়েশন ক্লাব নামে একটি ফটোগ্রাফি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। এই ক্লাবটি ঢাকার ইন্দিরা রোডের গোলাম কাসেম ড্যাডির নিজস্ব বাসভবন থেকে পরিচালিত হতো। তাঁর লেখা ছোটগল্প সওগাত পত্রিকায় নিয়মিত প্রকাশিত হতো। পরবর্তী সময়ে আলোকচিত্র নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ায় ছোটগল্পের আলাদা কোনো বই প্রকাশ করতে পারেননি। তবে ফটোগ্রাফি নিয়ে লিখেছেন একাধিক বই। যার মধ্যে রয়েছে ১৯৭১ সালে প্রকাশিত ‘ক্যামেরা’, ১৯৮৬ সালে ক্যামেরা রিক্রিয়েশন ক্লাব কর্তৃক প্রকাশিত ‘এক নজরে ফটোগ্রাফী’ এবং ২০০২ সালে পাঠশালা দৃক কর্তৃক প্রকাশিত ‘সহজ আলোকচিত্রণ’। তিনি সম্মানসূচক ফেলো বাংলাদেশ ফটোগ্রাফিক সোসাইটি, ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল ফটোগ্রাফিক কাউন্সিল (ফটোগ্রাফি), নাসিরউদ্দিন স্বর্ণপদক (সাহিত্য) অর্জন করেন। ৯ জানুয়ারি, ১৯৯৮ তে ১০৩ বছর বয়সে তিনি সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল, ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন।

তাঁর ফটোগ্রাফি বা ছবি নিয়ে এ যাবত্ বিস্তারিত আলোচনা হয়নি কোথাও। জীবিতকালে তাঁকে নিয়ে উত্সাহী হয়ে কেউ এগিয়ে আসেননি তাঁর আলোকচিত্রমালার সৌরভ ও গুরুত্ব উদ্ঘাটন করতে। নিঃশব্দ চরিত্রের মানুষটি উপস্থিত থেকেও তাই থেকে গেছেন অনাবিষ্কৃত। আমরা তাঁকে আবিষ্কার করতে পারিনি। তিনি যে আমাদের পূর্ব বাংলার ফটোগ্রাফির ইতিহাসের প্রথম সফল প্রবক্তা—এ বিষয়টি প্রচারিত হয়নি। তাঁর ভেতরে আমাদের অতীতের যে অপার মহিমা বন্দি অবস্থায় ছিল তা তিনি নিজেও ওয়াকিবহাল ছিলেন না। তাঁর সাক্ষাত্কার নেওয়ার সময় এসব কথাগুচ্ছ তীব্রভাবে মনে হয়েছে একালের খ্যাতিমান আলোচিত্রী নাসির আলী মামুনের। পূর্ব বাংলার ফটোগ্রাফির বিশাল প্রান্তরের যে ঘটনাগুলো প্রত্যক্ষ করেছেন ড্যাডি দীর্ঘ বর্ণাঢ্য জীবনে তা অন্যদের বিস্তারিত বলে যাননি। তাঁর সাফল্য এবং মহিমান্বিত সময় এখনো অনাবিষ্কৃত রয়ে গেছে। কারণ বাঙালি মুসলমানের এই ভূখণ্ডে তাঁর অবস্থান এবং ফটোগ্রাফির মান সম্পর্কেও তিনি নিজেই ছিলেন ঘুমন্ত। নিজের বিশাল ভূমিকাটিকে আড়াল করে রেখেছিলেন প্রচারবিরুদ্ধ এই মানুষটি, জীবনের শেষদিন পর্যন্ত। নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখে তাঁর কর্মময় জীবনের ফটোগ্রাফগুলোকে স্ক্যান করতে হয়। কী আছে তাঁর তোলা ছবিতে? আমাদের না দেখা বিস্মৃত সময়ের সামাজিক ইতিহাস আছে তাঁর তোলা ফটোগ্রাফে। এমন একজন কৃতী ব্যক্তিত্বকে কোনোদিন স্বীকৃতি দেইনি আমরা। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কোনো সম্মাননা বা পুরস্কার দেয়া হয়নি তাঁকে। ১৯৯৩ সালে জ্যাডির জন্মশতবার্ষিকীতে বাংলাদেশ ফটোগ্রাফিক সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা মনজুর আলম বেগ তাঁকে নিয়ে অনুষ্ঠানে সম্মানিত করেন। ড. শহীদুল আলম ২০০৪ সালে ছবিমেলায় আজীবন সম্মাননা প্রদান করেন আমাদের ফটোগ্রাফির ইতিহাসের এই পুরোধা ব্যক্তিত্বকে। এই বাংলার ফটোগ্রাফির ইতিহাস পরিপূর্ণভাবে রচনার ক্ষেত্রে তিনি আমাদের কালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আলোকচিত্রশিল্পী। তাঁর দীর্ঘ ও দুর্লভ এই সাক্ষাত্কার নিয়েছেন নাসির আলী মামুন

 

 

অপ্রকাশিত সাক্ষাত্কার

নাসির আলী মামুন : আপনার পরিবার, বেড়ে ওঠা সম্পর্কে বলুন।

গোলাম কাসেম ড্যাডি : অনেক আগেকার পূর্ব-পুরুষদের কথা আমি ঠিক জানি না এবং অন্য কারো কাছে সেটা শুনিনি। কাজেই আমি পূর্বপুরুষ বা বেশি আগেকার কথা বলতে পারছি না। যতটা আগের কথা বলতে পারি সেটা হলো আমার দাদার কথা। তাও খুব কমই বলতে পারব। আমার দাদার নাম মোহাম্মদ আমিন এবং তিনি পুলিশ ডিপার্টমেন্টে সাব ইন্সপেক্টরের কাজ করতেন। সে-সময় সরকারি কাজকর্ম ফার্সিতে হতো। তারপর তাঁর এক ছেলে, আমার আব্বা, উনিও পুলিশ ডিপার্টমেন্টের সাব ইন্সপেক্টর ছিলেন। আমার যদ্দুর মনে হচ্ছে, একেবারে গোড়ার দিকে, সেটা হলো জলপাইগুড়ির কথা। বাবা তখন জলপাইগুড়িতে ছিলেন এবং আমার জন্ম জলপাইগুড়িতেই হয়। তবে জলপাইগুড়ির ঠিক সদরে নয়। টাউনে হয়নি।

আব্বা যখন বদলি হয়ে বাইরে মফস্বলে এক জায়গায় যাচ্ছেন সেই সময় আমার মা আমাকে জন্ম দেন এবং সেটা হিমালয় পাহাড়ের পাদদেশে, শীতকাল, নভেম্বর মাস। জন্ম হয়েছিল ৫ নভেম্বর ১৮৯৪ সালে। আমার জন্মের সময়ের যে অবস্থাটা সেটা খুবই শোচনীয়। হিমালয় পাহাড়ের ওখানে শীত এবং ভয়ংকর বরফ পড়ছে। তারপরে গরুর গাড়ি আস্তে আস্তে যাচ্ছে। সেখানে কোনোরকম সাহায্য নেই, লোকের বসতি নেই! এই অবস্থায় আমার সেখানে জন্ম হয়। জন্ম হবার পরে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে মা মারা গেলেন। কোনো সাহায্য না পেয়ে তিনি মারা গেলেন। আমি কিন্তু বেঁচে গেলাম। সেখানে বরফের মধ্যে গরুর গাড়িতে খড় বিছানো ছিল। সেগুলো জ্বালিয়ে তাতিয়ে আমাকে ও মাকে গরম করা হয়েছিল এবং সেই অবস্থাতে আমার জন্ম হলো। তা, মা তো মারা গেলেন আমি রয়ে গেলাম।

ভাগ্যক্রমে আমার খালা, আমার মায়েরই আপন বোন, তারও একটা ছেলে মারা গিয়েছিল। আমি তার বুকের দুধ খেয়ে মানুষ হলাম। এভাবেই মানুষ হতে থাকলাম। তিনি আমাকে তিন বছর সাড়ে তিন বছর পর্যন্ত মানুষ করলেন। তারপরে উনি আমার আব্বাকে খবর দিলেন যে তোমার ছেলে এত বড় হয়েছে এখন দেখে-শুনে নিয়ে যাও। যত্ন করতে হবে, তাকে মানুষ করতে হবে, লেখাপড়া শেখাতে হবে। তো তুমি এখন তাকে নাও। তখন আমার ফাদার আমাকে নিয়ে গেলেন।

ইতিমধ্যে... এখন আমাকে মানুষ করতে হবে, কী করে মানুষ করবেন আমার ফাদার। আমারই এখন খালাকে, অন্য এক খালাকে উনি বিয়ে করলেন। তো আমার জন্ম হবার সময় মা মারা গেলেন, ফাদার খুব দুঃখ পেয়েছিলেন। এত দুঃখ পেয়েছিলেন, কষ্ট পেয়েছিলেন যে তিনি আমাকে আর দেখতে চাননি। বলেছিলেন ও মরে গেলেও ভালো ছিল। যা-ই হোক, আমি আর ওকে মানুষ করতে চাই না। আর কে-ইবা মানুষ করবে ওকে। আমি কী করে ওকে মানুষ করব। তখন আমার খালা আমাকে উনার কাছে নিয়ে গেলেন এবং আমার যখন তিন সাড়ে তিন বছর বয়স। আমার আব্বা আরেক খালাকে বিয়ে করলেন। তিনি মা’র মতো আমাকে বুকে তুলে নিলেন এবং মানুষ করতে লাগলেন। তো মায়ের দিক থেকে আমার সবই ভালো ছিল। খালা খুবই ভালো ছিলেন। তিনি আমাকে আপন মায়ের মতো স্নেহ করতেন। যতদিন পর্যন্ত তিনি বেঁচে ছিলেন আমি বুঝতাম না যে তিনি আমার সত্মা। তো এইভাবেই মানুষ হয়েছি।

আমি প্রথমে, আমার যতদূর মনে হয় আব্বা যখন জলপাইগুড়ি থেকে বদলি হয়ে মালদহ এলেন। মালদহ এসে নরমাল স্কুলে, বাংলা স্কুলে আমাকে ভর্তি করানো হলো। আমার তখন কত হবে... পাঁচ বছর হবে। এরকম সময়তে ভর্তি হলাম। পড়াশোনা করতে লাগলাম, তারপরে ওখান থেকে পাসটাস করে আমি মালদহ জেলা স্কুলে ভর্তি হলাম। ওখানে আব্বা বহুদিন ছিলেন, প্রায় দশ বছর।

তারপরে মালদহ থেকে ট্রান্সফার হয়ে পাবনার সিরাজগঞ্জে এলাম। ওখানে ভর্তি হলাম সিরাজগঞ্জের এক স্কুলে। ফাদার সিরাজগঞ্জে প্রায় দু বছর ছিলেন। ওখান থেকে বদলি হলেন পাবনা শহরে। পাবনা জেলা স্কুলে আমি কিছুদিন পড়লাম। সেখান থেকে বদলি হয়ে আবার সিলেট। আমি আবার সিলেট জেলা স্কুলে ভর্তি হই। ওই সময় ফাদারের অসুখ হয় এবং তিনি ছুটি নিয়ে চলে যান হাওড়াতে। ফাদারের বড় বোনের... ভগ্নিপতি, তিনি উঠেছিলেন ওখানে। ওঁর চেষ্টাতে ফাদার ওখানে একটা বাড়ি করলেন, হাওড়া টাউনে। তো ওখানে আমরা থাকতাম এবং ওখানে  থেকেই আমার পড়াশোনা হয়। হাওড়া জেলা স্কুলে ভর্তিও হয়েছিলাম। আমি নাইনটিন হানড্রেড টুয়েলভে ম্যাট্রিক দিই।

এই ম্যাট্রিক দেবার সময়ে আমার একজন ক্রিশ্চিয়ান বন্ধু, তার সঙ্গে আমার বিশেষ আলাপ হয়েছিল। আমাদের বাড়ির পাশে থাকত তারা। তার ফাদার ছিল একজন ডাক্তার। তো, আমার বন্ধু তার নাম ধীরেন দে। ও আমার সঙ্গে হাওড়া জেলা স্কুলে পড়ত। প্রায়ই তাদের বাসায় যেতাম, গল্প করতাম। পড়াশোনা নিয়ে আলাপ করতাম। একদিন তাদের বাসায় গিয়ে দেখি যে তার পড়ার টেবিলের ওপর একটা কালো রঙের বাক্স। আমি বললাম, দেখো তো ধীরেন, এটা কী, কিসের বাক্স?

ও একটু হাসল। হেসে বলল, এটা ক্যামেরা। আমি বললাম, ক্যামেরা! ক্যামেরা তো ফটোগ্রাফাররা ব্যবহার করে, এটা দিয়ে তুমি কী করবে? তুমি তো ফটোগ্রাফার নও। সে বলে যে আমি শিখব, আমি ফটোগ্রাফি শিখে সকলের ছবি তুলব। আমি জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কি শিখতে পারবে? বলে যে হ্যাঁ, এটা যে-কেউ শিখতে পারবে। আমি কিছু আর বললাম না। দু-একদিন পর দেখা সে বলে, দেখ কাসেম, তুমি এসেছ তোমারও ছবি তুলব। সে ক্যামেরাটি দিয়ে তার মা, ভাই-বোন এবং আমারও ছবি তুলল। প্লেট ক্যামেরা, ভেতরে একটা প্লেট আছে দেখলাম। ছ’খানা প্লেট থাকে। প্লেট ক্যামেরায় ছবি-টবি তোলা হয়, তারপর...

* নাসির আলী মামুন :এই প্রথম আপনার ছবি তোলা হলো?

* ড্যাডি :হ্যাঁ, তার কয়েকদিন পর বলল, কাসেম তোমার ছবি তোলা হয়েছে। ছ’খানা ছবি তোলা হয়ে গেছে। তুমি আজকে রাতে এসো ডেভেলপ করব। আমি তো কিছুই বুঝি না, ডেভেলপ আবার কী! বলল, প্লেটগুলোকে ডেভেলপ করতে হয়। আমি বললাম, কোথায় করবে? বলল, বাড়িতেই করব। কয়েকদিন পর গেলাম। সন্ধ্যার পরে। পড়ার ঘরের পাশে ছোট্ট একটা ঘর ছিল, সেটায় আমাকে নিয়ে গেল। একটা লাল বাত্তি জ্বালাল। দেখলাম কয়েকটা ডিশ রয়েছে, প্লেট রয়েছে এবং কিছু জিনিসপত্তর রয়েছে। তারপরে ঘর বন্ধ করে লাল আলোতে প্লেট ধুলো। তারপর দেখলাম সাদা প্লেটে আস্তে আস্তে কালো হয়ে আবছা আবছা ছবি বের হলো। খুব আশ্চর্য মনে হলো! আমি অপার আনন্দে অবাক হলাম! তারপরে খুব খুশি আমি!

ও বলল যে, ছবি আরও গাঢ় হবে, কালো হবে, এর পরে সাদা হবে। বললাম, তা হয় নাকি! বলল, হ্যাঁ, তা হয়। আচ্ছা ঠিক আছে, পরে আরেকটা ট্রেতে দিল। পরে দেখলাম, প্লেট থেকে একটা পাতলা মতো জিনিস আস্তে আস্তে গলে গলে পড়ে যাচ্ছে। সব পড়ে যাচ্ছে। আমি আশ্চর্য হয়ে যাই, এটা কী ব্যাপার হলো! ছবিগুলো গলে গলে সব পড়ে যাচ্ছে, ব্যাপারটা কী হলো! ও খুব একটা চিন্তায় পড়ে গেল। যাইহোক, আবার আরেকটা প্লেট নিল, কিন্তু ওই একই অবস্থা। ছবি বের হচ্ছে, কিন্তু আস্তে আস্তে গলে যাচ্ছে। তারপর বলল, ভাই, এটা তো বুঝতে পারছি না কী হচ্ছে। আরেকটা জানি, দেখি জেনেশুনে কী হয়। আমিও বাসায় চলে গেলাম।

আবার কয়েকদিন পরে গেলাম। জিজ্ঞেস করলাম, ওই ছবিগুলো হয়েছে। বলল, ঘটনা হচ্ছে সব গলে যাচ্ছে। কেন এমন হচ্ছে ধরতে পারছি না। তো এই সময় আমার ওই বন্ধুর বোন ওখানে বসেছিল। ও যখন বলল, আমার ছবি উঠেছে, কিন্তু ধুতে গিয়ে গলে যাচ্ছে। আমি বললাম, বোধহয় ফিক্সিং করতে হয়, ফিক্সিং সলিউশনে। ওর বোন বলল, তুমি ছবি তুলতে পারলে না। অনেকগুলো প্লেট নষ্ট হলো। কিছুই করতে পারলে না। হঠাত্ কী আমার মাথায় খেলল... আমার মুখ থেকে বেরিয়ে গেল যে, আমি করব। ওর বোন বলল, তুমি করবে! বললাম, হ্যাঁ। তুমি কেমন করে করবে? আমি বললাম, হ্যাঁ, আমি করব। বোন টিটকারি মেরে বলল, মনটা আমার খুব খারাপ হলো! তখন জোর করে বললাম, আমি নিশ্চয় করব। ছবি কেন হবে না। নিশ্চয় কোথাও ভুল হয়েছে। আমি দেখব কোথায় কী হয়েছে। বন্ধুর বোন বলল, তুমি বড় বড় কথা বললে, যদি না পার তোমাকে আর ঘরে ঢুকতে দেব না। আমি বললাম ঠিক আছে। তারপরে আমি মহা চিন্তায়, কী করা যায়। এমন কোনো চেনা লোক নেই যাকে জিজ্ঞেস করি। পরিচিত কোনো অ্যামেচার বন্ধু নেই যারা ফটোগ্রাফি করে। প্রফেশনাল যারা আছে, তাদের কার কাছে যাব। কেউ কি আমার কথা শুনবে। তারা হয়তো কেউ আমাকে বলবে না যে কী হচ্ছে ব্যাপারটা। তারা বলবে, আমার কাছে নিয়ে আসো, ডেভেলপ করে দেব।

গেলাম ধর্মতলায়, কলকাতায়। সেখানে ফটো স্টুডিও ছিল। একটা ছিল ডাস কো. (Das Co.), আরেকটা ছিল ক্যামেরা স্টোর। আর ছিল চৌরঙ্গী স্টোর। এরকম কতগুলো ফটোর দোকান ছিল। এদের প্রত্যেকের কাছে গিয়ে বললাম যে এই রকম ব্যাপার... প্লেট ছিল, ওটা ডেভেলপ করতে গিয়ে ফিক্স করার সময় সব গলে গলে পড়ে যাচ্ছে। তো, যার কাছে গেলাম, সে বলল, দেখুন এগুলো আপনারা পারবেন না। এগুলো খুব কষ্টের কাজ। যাইহোক, এক্সপোজার হয়ে গেলে আমাদের কাছে দেবেন, আমরা যা করার সব করে দেব। তিন-চার জায়গা ঘুরলাম, সকলে ওই কথাই বলল। তো মনে খুব দুঃখ হলো, কী করা যায়... কী করা যায়? কেউ তো কোনো কথা বলে না। এসব ধর্মতলাতে দাঁড়িয়েই চিন্তা করছি। হঠাত্ মনে হলো, ওখানে গভর্নমেন্ট হাউসের কাছে ওল্ড কোর্ট হাউস স্ট্রিটে বড় একটা ওষুধের দোকান ছিল সেখানে যাই। দেখি, সেখানে কোনো অ্যাডভাইস পাই কি না। সেখানে ফটোর কাজ হতো। আমি ফটোগ্রাফি সেকশনে গেলাম। সেখানে একটা মোটাসোটা ছেলে ছিল। আমি তাকে বললাম। সেও ওই কথাই বলল... এই এই ব্যাপার... আমিও খুব একটা চিন্তায় পড়ে গেলাম। তিনি আমাকে বললেন, তুমি জানো এখন টেম্পারেচার কত চলছে? আমি জানি না বললাম। সে বলল, টেম্পারেচার এখন হান্ড্রেডের ওপরে। হান্ড্রেড ফারেনহাউট। তুমি ফিক্স করার সময় অ্যালাম ব্যবহার করেছিলে? অ্যালাম! এটা আবার কী? আমি বললাম, না এটা ব্যবহার করিনি। তখন বললেন, এই গরমেতে ইউ শুড ইউজ অ্যালাম অ্যাট দ্য টাইম অব ফিক্সিং। কী করে সেই অ্যালাম দিতে হবে? অ্যালাম দিয়ে না করলে অতিরিক্ত গরমে সেটা নরম হয়ে গলে যায়। ইমালশন নরম হয়ে গলে গিয়ে প্লেট নষ্ট হয়ে যায়। আমি বললাম, স্যার, আমি এখন কী করব, আমি তো জানি না কিছু। সে বলল, জাস্ট ওখানে বস। বলে ভেতরে গিয়ে একটা কাগজে পুরিয়া করে আনল পাউডার টাইপের কেমিক্যাল। বলল, এতটা পানিতে দিয়ে এটা ব্যবহার করবে। গরম পানি ব্যবহার কোরো না। এটা করে দেখ কী হয়।

অনেক ধন্যবাদ-টন্যবাদ দিলাম। পুরিয়ার পয়সাকড়ি কিছুই নিল না। আমি বাসায় এলাম। তারপরে আমার বন্ধুকে বললাম যে, আমি এটা ডেভেলপ করব আজকে। ও বলল, ঠিক আছে। তারপর ছবি নিলাম ওদের। আবার ছ’খানা প্লেটে ছবি নিলাম। ১৯১২ সাল, প্রথম ক্যামেরায় ছবি তুললাম। উত্তেজনা এবং বিস্ময় দুটোই আমার মনে, তারপর ভীষণ আনন্দ হতে লাগল। সন্ধ্যার পরে লাল বাতি জ্বালিয়ে ডেভেলপ করলাম। ডেভেলপ করার পরে ফিক্সিং করলাম। উনি যে কেমিক্যাল দিয়েছিল, তা ইউজ করলাম। অ্যাহ, একদম সুন্দর ছবি হলো! পরিষ্কার ঝকঝকে ছবি হলো। তারপর ওয়াশ-টোয়াশ করে খুব খুশি লাগল। বন্ধুর বোন ডার্করুমের সামনে দাঁড়িয়েছিল। সে বলল, কী কাসেম খবর কী? তাকে দেখালাম (হাসি) এটা নেগেটিভ, পজেটিভ হবে। পজিটিভ কে করবে? আমি নিজেই করব। আমি প্রিন্ট করব ছবি। আমি তোমাকে প্রেজেন্ট করব, ছবি উপহার দেব। তারপর ছবি তো তৈরি হয়ে গেল। ছবি ভালোই হলো। তারপর আমি কাগজ কিনে আনলাম। ছবি হলো কোয়ার্টার সাইজের। কাগজের গায়ে লেখা থাকত, তখন প্রিন্টিং হতো ডেলাইটে। রোদের আলোতে... নির্দিষ্ট ফ্রেম ছিল তাতে নেগেটিভ দিয়ে ফটো কাগজ দিয়ে রোদে এরকম করতে হতো। তখন ডেভেলপ করতে হতো না। এটা সলিউশনে দিলে সিপিয়া টোন হতো। এটাকে সেলফ টোনিং পেপার বলত। মানে টোনটা নিজে নিজেই হতো।

ছবিগুলো হাতে দিলে বন্ধুর মা-বোন-ভাই সবাই খুব খুশি হয়ে গেল। এই যে নিজের হাতে সব করলাম, আমার আগ্রহ বেড়ে গেল। তখন ভাবলাম ফটোগ্রাফি তো আমাকে করতে হবে। তখন গিয়ে একটা ক্যামেরা কিনে আনলাম। এনসাইন ক্যামেরা (Ensign) ছটাকা দিয়ে। প্লেট ক্যামেরাও কিনলাম একটা। এনসাইন ক্যামেরা যে কিনলাম বক্স ক্যামেরা ওটার কোয়ার্টার সাইজ। তো ক্যামেরাটা কেমন ছিল? একটা খাতা ছিল, নগ খাতা। ডার্করুমে গিয়ে ছখানা প্লেট বাক্স থেকে বার করে খাতার মধ্যে নির্দিষ্ট জায়গায় সেটে দিয়ে সেটা ক্যামেরার মধ্যে আলাদা জায়গা ছিল, ওই জায়গায় রেখে দিতে হতো খাড়া করে। তারপরে ক্যামেরা বন্ধ করে বাইরে নিয়ে আসা হতো। একখান করে ছবি তোলা হলে একটা লিভার ছিল, সেটা টানলে পট করে প্লেট মানে নেক্সট প্লেট হয়ে গেল, খালি হয়ে গেলে তখন প্লেটগুলো বার করে নিয়ে ডেভেলপ করা ইত্যাদি। এইভাবে কাজ হতো। এই যে ছ’খানা প্লেট, আমি যা পেতাম, চার আনা ছ’আনা কখনো আট আনা পয়সা পেতাম। সে-দিয়ে এই যথেষ্ট। এই পয়সা জমিয়ে ফটোগ্রাফি করতাম। তাতেও কখনও কুলায়নি। মাকে বললাম যে আমি একটা ক্যামেরা কিনেছি। মা বলল, তুই ক্যামেরা দিয়ে কী করবি? আমি ছবি তুলব বললাম (হাসি)। তুই কি পারবি, এটা তো ফটোগ্রাফারদের কাজ। বললাম, আমি চেষ্টা করব, আমি তো ছবি তুলেছি। আমার বন্ধুদের ছবি তুলে দিয়েছি আমি। বলল, তাই নাকি। হ্যাঁ। ঠিক আছে।

মা কিছু টাকা দিয়েছিল। মা’র কাছ থেকে গোটা কয়েক টাকা নিয়ে আমি বক্স ক্যামেরা কিনেছিলাম। বক্স ক্যামেরার লিভারটা টানলেই ঝপাং করে এক্সপোজ প্লেটটা পড়ে যেত। এভাবে আলো এসে লাগত। এরকম করে ছ’খান প্লেট হয়ে যাবার পর ডার্করুমে বার করে ডেভেলপ করে প্রিন্ট করা হতো। ডেভেলপার সব রেডিমেড কিনতাম। তখন গোড়ার দিকে সবকিছু রেডিমেড কিনতাম। ডেভেলপিং সলিউশন, ফিক্সিং—যা কিছু সব রেডিমেড। তো, এইভাবে আমি প্রথমে কাজ আরম্ভ করি।

তার কিছুদিন পরেই ম্যাট্রিক এক্সামিনেশন হলো। নাইন্টিন টেন পর্যন্ত এনট্রান্স ছিল। নাইন্টন টেনের পর থেকে হলো ম্যাট্রিক এক্সামিনেশন। তা আমি দিয়েছিলাম নাইন্টিন টুয়েলভে। নাইন্টিন টুয়েলভেই আমার ক্যামেরায় হাতেখড়ি। তারপরে বছর দুয়েক ওই ক্যামেরা ইউস করলাম। ওই ক্যামেরার একটা সাটার। ওয়ান টোয়েন্টি সেকেন্ড হচ্ছে আটটি সাটার। টি-তে দিলে বিভিন্ন জায়গায় রেখে... টেবিলের ওপর রেখে ছবি তোলা যেত। এইভাবে কাজ করতে করতে... মুশকিল হতো এই যে অনেক সময় ভুল হয়ে যেত। এই ভুলটা হবার কারণ ছিল, সেকালে বইপত্র খুব কম ছিল। ম্যাগাজিন ছিল না। বইপত্রে তেমন ফটোগ্রাফি ছিল না। খুব অসুবিধা হতো, ভুলভ্রান্তি খুব বেশি হতো। বারোখান প্লেটের মধ্যে হয়তো তিনখান ভালো হলো, নয় খান হয়তো নষ্ট হয়ে যেত। কখনো বেশি এক্সপোজার হচ্ছে, কখনো কম এক্সপোজার হয়ে যাচ্ছে, কখনো হাত নড়ে যাচ্ছে। সাটার তো খুব স্লো, ওয়ানটোয়েন্টিস সেকেন্ড। হাত নড়ে যায়, তাতে ঝাপসা হয়ে যেত।

বক্স ক্যামেরা ব্যবহার করার ফলে এর সীমাবদ্ধতার জন্য আমার নানান রকম কষ্ট! একটা পয়সার প্রশ্ন, ছবি তুলতে গেলে পয়সা লাগে, প্লেট কিনতে পয়সা লাগে, ওষুধপত্র কেমিক্যাল কিনতে পয়সা লাগে। অনেক জিনিসপত্র নষ্টও হয়ে যায়। প্লেট নষ্ট হয়েছে, ফিল্ম নষ্ট হয়েছে, কাগজপত্র নষ্ট হয়েছে। তো নষ্ট হলেও বারোখান প্লেটের একখান-দুখানা ভালো হলে মনটা খুব ভালো লাগত। খুব খুশি লাগত। তো, এইভাবে আমার দুই-তিন বত্সর চলল এই বক্স ক্যামেরায়। ছয় টাকার এনসাইন বক্স ক্যামেরাটায় অনেক ছবি—আত্মীয় স্বজন, বন্ধু-বান্ধব এমনকি রাস্তাঘাটে বাইরের ছবি, কলকাতায় কিছু কিছু নিয়েছি। কলকাতায় বন্ধু-বান্ধবের ছবি, চৌরঙ্গীর রাস্তার ছবি, ট্রামের ছবি, এটার ছবি-ওটার ছবি—নানা রকম ছবি তুলেছি। যাইহোক, এটার পরে আমি এই প্লেট ক্যামেরাটি বাদ দিলাম।

টু কোডাকের ফিল্ম ক্যামেরা রয়েছে। কোডাক এ ব্রাউনি (Kodak Brownie QA) ক্যামেরা কিনলাম। ওটা কিনেছিলাম দশ টাকা বা বারো টাকায় ওই সময়ে। রোলফিল্ম ক্যামেরা। তো ওইটাই ব্যবহার করতে লাগলাম। ওইটার সাটারস্পিড ছিল ওয়ানটোয়েন্টি থেকে বেশি ছিল। আর ওটায় টাইম ছিল। ফিল্ম ক্যামেরাটা ব্যবহার করতে করতে এটাও দু’তিন বছর হলো। এই ক্যামেরা যখন ব্যবহার করা হয়ে গেল তার পরেতে আমি আবার আরেকটা কোডাক ক্যামেরা কিনলাম, সেটা আমার ভাই আমাকে দিয়েছিল। এটার দামটা খুব বেশি। এই ক্যামেরাটির নাম ছিল থ্রি এ ফটোগ্রাফিক কোডাক। এটার পোস্টকার্ড সাইজ ছবি হতো। ছ’খানা ছবি হতো—অনলি সিক্স। এটা খুবই আমার ভালো লেগেছিল। আমার ব্রাদার তখন ওই চৌরঙ্গীর একটা দোকান থেকে সত্তর টাকা দিয়ে ক্যামেরাটি কিনে দিয়েছিলেন, উনি ছিলেন ইনস্পেক্টর অব পুলিশ। উনি আমাকে খুবই সাহায্য করতেন। ছবি খারাপ হয়ে গেলে আমাকে উত্সাহ দিতেন। পয়সাকড়ি কখনও দরকার হলে দিতেন। ওর থেকে আমি অনেকটা সাহায্য পেয়েছি। তা-না হলে আমার আরও অসুবিধা হয়ে যেত। আমি বলেছিলাম, ভাই, আমার ভালো ক্যামেরা দরকার যদি তুমি আমাকে সাহায্য করতে। সে বলেছিল, কী রকম টাকা লাগবে? আমি কোডাকের ক্যাটালগ দেখে থ্রি এ ফটোগ্রাফিক কোডাক কিনেছিলাম। অ্যাপারচার এইট পর্যন্ত ছিল। ওয়ানসিক্সটিয়েথ সাটার, ওয়ানটোয়েন্টিয়েথ ছিল একটা সাটার আর টাইম ছিল। বড় বড় ছবি হতো, পোস্টকার্ড সাইজ ছবি।

১৯১৫ সাল হবে, এই ক্যামেরা নিয়ে ছবি তুলছি বেশ খুশি হয়ে। ইতিমধ্যে আমি যেটুকু শিখতে পেরেছিলাম সেটা তো... আমি ফটোগ্রাফিতে কাউকে পাইনি। তখনকার পেশাদারি ফটোগ্রাফাররা কাউকে কিছু বলে না। কোডাক ম্যাগাজিন ছিল, সেটা মাসে মাসে একটা করে বের হতো। এই ম্যাগাজিনটা পড়তাম। তাতে আমার অনেক উপকার হতো। আর ওই ফিল্মের সঙ্গে যে কাগজ বের হতো, পেপারের সঙ্গে কাগজ পেতাম, সেগুলো পড়ে পড়ে শিখতাম। ভুল করে করেই শিখেছি।

* মামুন :প্রথমে কী ধরনের ছবি তুলতেন? কারা আপনার ক্যামেরার বিষয় হয়েছিল?

* ড্যাডি :প্রথমে সব ধরনের ছবিই তুলতাম। ক্যামেরা হাতে থাকলে যা ভালো লাগত তাই তুলতাম। তখনও আমার সাবজেক্ট ঠিক হয় নাই। একদিন ঘুরতে ঘুরতে দেখি শোকেসে চৌরঙ্গীতে কতগুলো বাচ্চাদের ছবি। বাচ্চাদের ছবি, এমন জীবন্ত ছবি, মনে হচ্ছিল বাচ্চারা ঝাঁপিয়ে আমার উপর পড়বে। এত সুন্দর এত লাইফলাইভ ছবি। ছবি এত ভালো হতে পারে! কোনোটা পোস্টকার্ড সাইজ, কোনোটা হাফ সাইজ বেশি বড় ছবি না। সব সাজানো রয়েছে। তিন-চার বছর থেকে শুরু করে সাত-আট বছর পর্যন্ত সব বাচ্চাদের। মেয়ে-ছেলে সব। এমন ছবি যদি তুলতে পারতাম! ভাবছি। এমন সময় একজন চাপরাশি এসে বলল, ভেতরে আসুন। আমি বললাম, কী ব্যাপার। বলল, মেম সাহেব আপনাকে ডাকছে। মেমসাহেব কে? ওই তো, নিজেই ফটোগ্রাফার। উনার এইটা দোকান। মিসেস এডনা। আমি ভাবলাম, এডনা আমাকে ডাকছে! চমকে উঠে, ভয়ে ভয়ে গেলাম। খুশিও হলাম। তখনকার দিনে ওরা সাধারণত আমাদের ঘেন্নাই করত। ব্রিটিশরা আমাদের ভারতবাসীদের ঘেন্না করত। শাসকের জাত তো, আমাদেরকে নিচু মনে করত। আমি ভাবলাম, আমাকে বকবে-সখবে না তো। ধমকাবে না কী করবে! ভয়ে ভয়ে গেলাম, মেমসাহেবের মুখে হাসি দেখে একটু সাহস হলো। আমাকে ইংরেজিতে জিজ্ঞেস করল, আমি দেখলাম, তুমি অনেকক্ষণ থেকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ছবিগুলো আমার দেখছিলে। তোমার ঘাড়েও দেখছি একটা ক্যামেরা রয়েছে, তুমি কি ফটো তোলো? আমি বললাম, হ্যাঁ, ফটো তুলি, আমি নতুন শিখেছি, ভালো জানি না। তো আপনার ছবিগুলো দেখে আমি মুগ্ধ হয়েছি একেবারে। বাচ্চাদের এত সুন্দর ছবি আমি আগে কখনো দেখিনি। আমাকে ভেতরে নিয়ে তার স্টুডিওতে সব দেখালো। ক্যামেরা এলার্জার-টার্জার সব জিনিস দেখালো। যত্ন করে বেচারি বিদেশি আমাকে দেখালো। আমি খুব আশ্চর্য হয়ে গেলাম, জীবনে এরকম দেখিনি। একজায়গায় দেখি বহু যত্নে বাচ্চাদের খেলনা, পুতুল আছে, সারি সারি আছে, নানা রকমের খেলনা-টেলনা ভর্তি একদম। ফটোগ্রাফির স্টুডিওতে এত জিনিস কী ব্যাপার। তো আমি জিজ্ঞেস করলাম, দেখুন, আপনি ফটোগ্রাফার, আপনার স্টুডিও দেখে বড় খুশি হলাম। কিন্তু এইগুলো তো বাচ্চাদের খেলনা...। বলল, হ্যাঁ, এগুলো কাজে লাগে আমার। ওরা যখন ছবি তুলতে আসে, ওদেরকে এগুলো দেই, খেলতে দেই। কথা বলি, আলাপ-সালাপ করি। করে করে যখন ওরা খুব আমার সঙ্গে মিশে যায়, আমি তখন ওদের ছবি তুলি। আসলেই চট করে ছবি তুলি না। এরকম কথা এই প্রথম শুনি। বেশ মজার কথা। আবার দেখলাম লজেন্স-টফি রাখা আছে বাচ্চাদের জন্য। বলল, দেখো বাচ্চারা মা নিয়ে আসে। আমি দেখি বাচ্চাদের মুড কী রকম। আমি আরও দেখি অনেক বাচ্চা ভয় পাচ্ছে বা আমি অপরিচিত লোক বলে সে আমার কাছে আসতে চায় না। তাদের ছবি তুলি না। আমি তাদের খেলনা হাতে দিয়ে বলি খেলো। ওদের মাকে বলি খেলা করেন। তারপর অপেক্ষা করতে করতে ওদের মুড যদি ভালো হয় তাদের ছবি তুলি, নাহলে বলি আরেকদিন আসো বাবা। এরকম করে যতদিন আমার সাথে সম্পর্ক বা খেলা করতে না চায় ততদিন ছবি তুলি না। এজন্যই তাদের ভোলাবার জন্য লজেন্স বা খেলনা রাখি। এডনা সেদিন আমাকে পোর্ট্রেটের সৌন্দর্যের কতগুলো কথা বলল। আমার আজ পর্যন্ত মনে আছে যে, পোর্ট্রেট ন্যাচারাল হতে হবে। তুমি তোমার সাবজেক্ট নিয়ে বেশি ঘাটাঘাটি কোরো না। যদ্দুর পার যেন স্বাভাবিক রাখা যায়। ছবি সার্প হতে পারে কিন্তু মুড যদি ভালো না হয় ন্যাচারাল ছবি তুমি পাবে না—এটা আজ পর্যন্ত আমি বজায় রেখেছি।

আমি যখন কারো ছবি তুলি, তখন গল্প করি। কী অবস্থা, কেমন পরীক্ষা হলো পড়াশোনার কথা জিজ্ঞেস করি। ততক্ষণে কিন্তু আমার ক্যামেরা চলছে। ন্যাচারাল ছবির জন্য এরকম করি। এটা আমার এডনার কাছ থেকে শেখা। পোর্ট্রেট ফটোগ্রাফি সম্পর্কে এডনার কাছ থেকে শিখেছি। যাইহোক এসব কথা, বই পাওয়া যায় না। শেখাবার কেউ নেই। নিজে কষ্ট করে অনেক ভুলভ্রান্তি করে আস্তে আস্তে ফটোগ্রাফি আমার শেখা হয়। তো থ্রি এ ক্যামেরা কিছুদিন ব্যবহার করে দেখলাম জিনিসটা ভারী, হেভি। ছোট ক্যামেরা হলে ভালো হয়। ছোট ক্যামেরা কিনি আগে। কোডাকের আরেকটা ক্যামেরা কিনলাম। ওটার দাম আবার খুব বেশি। সিক্স টোয়েন্টি ডুও কোডাক (620 Duo Kodak), ডুও মানে দুই। সেদিন ওটার দাম দেড়শ টাকা না কত ছিল জানি। ওটা থার্টিফাইভের চাইতে কিছুটা বড়। কোডাকের এই ক্যামেরাটা বহুদিন ব্যবহার করেছি। এরকম করে আস্তে আস্তে আমি বহু ক্যামেরা ব্যবহার করি। ১৯১৪ সাল এসে পড়ল।

* মামুন :আপনি আগে ১৯১৫ সালের কথা বলছিলেন। কী করতেন তখন এবং ভবিষ্যত্ জীবনে কোন দিকে যাবেন ঠিক করেছিলেন?

* ড্যাডি :প্রথম মহাযুদ্ধ আরম্ভ হয়ে গেল। জার্মানির সঙ্গে যুদ্ধ। জার্মানি সমস্ত দেশের সঙ্গে যুদ্ধ বাঁধিয়ে দিল। ইংরেজদের সাথেও যুদ্ধ আরম্ভ করেছে। সেই যুদ্ধের প্রভাবটা ইন্ডিয়াতেও এলো। তখন ভারতবর্ষের কলকাতায় থাকতাম। কলকাতায় দেখতাম যে সমস্ত বড় বেলুন, খুব বড় বেলুন, যাতে নাকি যুদ্ধজাহাজ না আসতে পারে, অ্যারোপ্লেন না আসতে পারে, অ্যাটাক না করতে পারে—বড় বড় বেলুন উপরে আকাশে ছেড়ে দেওয়া হতো। লাল নীল নানা রঙের বেলুন উড়ত। রাতের বেলায় ব্ল্যাকআউট হতো মনে আছে আমার এখনও। আলো-ফালো কিছু জ্বলত না। এইভাবে দিন কাটাতে হতো। তারপরে এই সময়তে ইন্ডিয়াতে বেঙ্গল রেজিমেন্ট হলো, বেঙ্গল রেজিমেন্টে অনেকে ভর্তি হলো। আমি তখন ম্যাট্রিক পাস করে ইউনিভার্সিটিতে ঢুকেছি, আইএ-তে ঢুকেছি।

* মামুন :তখন কি বেঙ্গল রেজিমেন্ট ছিল?

* ড্যাডি :এই সময়তে ছিল... তো, আরও দুই বছর পরে আমি দেখলাম অনেকেই ঢুকছে। তখন ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটি ইনফ্যানট্রি কোর বলে একটা দল বেরুলো। তো, সেটা খালি ইউনিভার্সিটি স্টুডেন্টদের জন্য। আরেকটা বেরলো বেঙ্গল রেজিমেন্ট। বেঙ্গল রেজিমেন্টে সকলেই যেতে পারত। ইউনিভার্সিটি কোর যেটা, সেটা অনলি ফর দ্য ইউনিভার্সিটি স্টুডেন্টস। এতে আমি নাম দিলাম। ক্যামেরা কিন্তু আমার ঠিক আছে। ক্যামেরায় বরাবর আমি ছবি তুলি। যেখানেই গিয়েছি ছবি তুলেছি। তো এটায় আমার সুবিধা হয়েছিল যেসব জায়গায় কেউ যেতে পারত না, আমি সেসব জায়গায় ছবি তুলতে পারতাম। অ্যাজ অ্যা সোলজার, সৈনিক হিসেবে আমি ফোর্ট উইলিয়ামে গিয়েছি ছবি তুলবার জন্য। ওরা কিছু বলত না। আমরা কলকাতার ফোর্ট উইলিয়ামে অনেকদিন ছিলাম। আমরা যখন যুদ্ধে নাম দিলাম, তখন ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটি কোরে আমাদের ইউনিফর্ম ছিল। আমাদের যারা অফিসার ছিল, তারাও ইউনিভার্সিটির অফিসার। প্রফেসার সব। ইন্সট্রাক্টর যিনি ছিলেন, তিনি ছিলেন ইংলিশ। ইন্সট্রাক্টর ক্যাপ্টেন গ্রে উনি আমাদের... তো আমরা সাহেবকে বন্ধু পেয়ে গিয়েছিলাম। আমাদের ট্রেনিং হলো ছয় মাস মধুপুরে। ওখানে আমরা ক্যাম্প করেছিলাম। বেঙ্গলের বাইরে, ওটা বিহারের মধ্যে। মধুপুর, ওটা খুব স্বাস্থ্যকর জায়গা। সংক্ষিপ্ত সময়ে প্রায় সব ধরনের ট্রেনিং দেয়া হতো। বন্দুক চালানো এবং যুদ্ধের মধ্যে কীভাবে শত্রুকে আক্রমণ করতে হয়, সেগুলোর ট্রেনিং দেয়া হয়েছিল আমাকে।

* মামুন :তখন ট্রেনিংয়ের সময় ছবি তুলেছিলেন?

* ড্যাডি :ছবি তুলেছি, তাও খুব বেশি নয়। কারণ ট্রেনিংয়ে ব্যাস্ত থাকতে হতো আমাদের। ক্যামেরা সব সময় সাথে রেখেছি।

মানুন :কাজী নজরুল ইসলাম প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ট্রেনিংপ্রাপ্ত সৈনিক ছিলেন। ওই সময় তার সঙ্গে পরিচিত ছিলেন?

* ড্যাডি :তিনি আমার অনেক পরে যোগদান করেছিলেন, নিয়মিত সৈনিক ছিলেন এবং থাকতেন করাচিতে। ১৯২০ সালে যখন ফিরে এসেছিলেন, যুবকটির সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল। তাকে মাঝেমধ্যে কলকাতায় দেখতাম। ওর সঙ্গে একবার সামনাসামনি দেখাও হয়েছে। অনেক মিটিংয়ে দেখা হয়েছে। আমি নাসিরউদ্দীন সাহেবকে চিনতাম। তিনি আমার সমসাময়িক ছিলেন। তার সওগাত অফিসেও কাজী নজরুলকে দেখেছি।

আমি যখন ক্যালকাটায়, তখন উনি বেঙ্গল রেজিমেন্টে চলে গিয়েছিলেন, তখন চিনতাম না। সেই সময় আমি একদিন শুনলাম কাজী নজরুল যুদ্ধ থেকে অনেক কবিতা লিখছেন। সেগুলো তখন ছাপা হচ্ছে কলকাতার কাগজে। মেয়েদের সম্পর্কে কবিতা লিখেছেন... এসব করছেন এবং পরে নাসিরউদ্দীন সাহেবের কাছে দেখেছি অনেকবার।

* মামুন :আপনিও তো লিখতেন। কী লিখতেন তখন?

* ড্যাডি :আমি গল্প লিখতাম—ছোটগল্প। নাসিরউদ্দীন ওগুলো ছাপাতেন। তার তাগাদায় গল্প লিখেছি। লেখা দেয়ার পরের সংখ্যাতেই ছাপাতেন। বাঙালি মুসলমানরা তখন সবাই কবিতা লেখে। গল্প লেখক ছিল না। আমিই প্রথম বাঙালি মুসলমান ছোটগল্প লেখক।

* মামুন :কী লিখছিলেন প্রথম?

* ড্যাডি :ওসব আমার মনে নেই। আমি রাখিওনি। ওই সওগাত-টওগাতে আছে। ছড়াও লিখেছি কিছু।

* মামুন :আপনার ছবি ছাপা হতো কোথায়?

* ড্যাডি :মুসলমানদের কাগজ তখন খুব একটা ছিল না। সওগাত ছিল। মোহাম্মদি ছিল, আরও দু-চারটা অনিয়মিত পত্রিকা ছিল। তারা লেখা চাইত, ছবি চাইত না। আমার প্রথম ছবি কোথায় ছাপা হয়েছে স্পষ্ট মনে নেই। তবে সওগাতে ছাপা হবার কথা।

মধুপুরে ট্রেনিং শেষে ফিরে আসব। তার আগে ওখানে ঘুরে-ফিরে বেড়ালাম। রাস্তায় প্যারেড হতো ওখানে। তো সে সময় ওই ক্যামেরাতে অনেক ছবি তোলা হয়েছিল। তারপরে এইভাবে চলতে চলতে আইএ পাস করলাম। ম্যাট্রিক আমি থার্ড ডিভিশনে পাস করেছিলাম। আইএ পাস করতে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল। আর একবার ম্যালেরিয়া হয়েছিল ক্যাম্প ছাড়ার পর। দু’বছর আমি কষ্ট করেছি। ওই দুই বছর কিছু করতে পারিনি, আইএ ক্লাস করতে পারিনি। আইএ পাস করে যখন বেরোই, তখন টোয়েন্টিফাইভ ইয়ার হয়ে যাচ্ছে। প্রায় চব্বিশ বছর হয়ে যায়। ফাদার আমাকে বললেন, দেখ তোমার তো চব্বিশ বছর হয়ে যাচ্ছে, পঁচিশ বছর গিয়ে পড়বে। এখন বিএ পড়তে যাবে। বিএ পড়লে দু’বছর পড়তে হয়। পাস করবে, টিউশনি করবে। তারপর বিয়ে করবে, বিয়েশাদি। বয়স বেড়ে গেলে আর তো চাকরি পাবে না। আমি থাকতে থাকতে একটা চাকরি কর। আমি বলি, যা আপনি ভালো মনে করেন তাই করেন। তো ওই হিসাব করলেন কি নাইন্টিন নাইন্টিনে, ১৯১৯ সালে আমাকে সাব-রেজিস্ট্রারের চাকরিতে ঢুকিয়ে দিলেন।

* মামুন :প্রায় চব্বিশ বছরে সাব-রেজিস্ট্রারের চাকরি, ক্যামেরাটা গেল কোথায়?

* ড্যাডি :ক্যামেরাটা বরাবর আছেই। বদলির চাকরি। এক বছর দু’বছর পরপর বদলি। ক্যামেরা ছাড়তে পারলাম না। এদিকে ছ’মাস তো ট্রেনিং হয়ে গেল। ছয়মাস ট্রেনিং হয়ে যাবার পর প্রথম মহাযুদ্ধ শেষ হয়ে গেল এবং আমার আর ট্রেনিং হলো না। আমাদের সব ছেড়ে দিল। যখন ট্রেনিংয়ে ছিলাম ইউনিফর্ম দিয়েছিল, সার্টিফিকেট দিয়েছিল। মিলিটারি ট্রেনিংয়ে খাওয়া-দাওয়া, চলাফেরা এবং জীবনকে কন্ট্রোল করা—এটা আমি শিখেছিলাম। ঠিক সময়ে খাওয়া, ঠিক সময়ে ওঠা, জীবনকে উপভোগ করা ক্যাম্প থেকে আমি শিখেছিলাম। এখন আমার মনে হয় এইজন্য হেলথটা ভালো আছে।

* মামুন :ক্যাম্পে কী ধরনের ট্রেনিং ছিল? আপনি ছাড়া অন্য কেউ ওখানে ফটোগ্রাফি করত?

* ড্যাডি :ক্যাম্পের জীবনে অনেক ছবি তুলেছি। ক্যাম্পের জীবনটা অন্যরকম জীবন। অনেক সময় মনে হতো আমাদের কত শক্তি, কত ক্ষমতা, কাউকে কোনো পরোয়া করি না, এইরকম একটা ভাব চলে আসত। মিলিটারির জীবন কাউকে কোনো পরোয়া নেই। আমি ক্যাম্পে আরেকটা ছেলে পেয়েছিলাম। সাড়ে পাঁচশোর মধ্যে আর একটি ছেলে ছিল, সেই ছেলেটি ছিল এডুকেটেড ছেলে। ইস্ট বেঙ্গলের ছেলে। তার একটি ক্যামেরা ছিল। সে অ্যামেচার ফটোগ্রাফার। একটি মাত্র ছেলে—পূর্ব বাংলার ছেলে। নামটি আমার মনে নাই। খুব সুন্দর মতো ছেলে। খুব লম্বা চওড়া। খুব হেলদি ছেলে। তার একটা কইলস ক্যামেরা ছিল, নামটি কেন যেন মনে আছে। সেইটা ফিল্ম ক্যামেরা। বি’টু সাইজের ক্যামেরা। তার সঙ্গে আমার খুব ভাব হয়েছিল।

* মামুন :তখন তো বাঙালি মুসলমানরা শিক্ষায় অগ্রসর ছিল না। চাকরিতে সংখ্যায় কম। আপনি চাকরি করতে শুরু করলেন।

ড্যাডি :১৯১৯ সালে আমার চাকরি হলো। সাব-রেজিস্ট্রারের চাকরি। চাকরি আরম্ভ হয়েও আমার ফটোগ্রাফিটা ঠিকই চলছিল। যতদিন চাকরি করেছি, ভালো ভালো ক্যামেরা ব্যবহার করেছি। চাকরিজীবনে বহু লোকের ছবি আমাকে তুলে দিতে হয়েছে। আমাকে অনেকে জিজ্ঞেস করে, আপনি যে সারাজীবন ফটোগ্রাফি করলেন, এতে আপনার লাভ কী হলো? পয়সাকড়ির দিকে আমার কিছুই হয়নি। বরং আমার ক্ষতি হয়েছে আর্থিক। কিন্তু সেদিক দিয়ে ক্ষতি হলেও অন্যদিক দিয়ে আমার অনেক কিছু শেখা হয়েছে। যেমন এমন সব লোকের সঙ্গে আমার আলাপ-পরিচয় হয়েছে ফটোগ্রাফির জন্য, যেটা অন্য কিছুতে হতো না। যদি ছবি না থাকে, ফটোগ্রাফি না থাকে, অনেক বড় বড় লোক যাদের সঙ্গে আমার আলাপ হয়েছে, বন্ধুত্ব হয়েছে, সেটা হতো না। এটা থেকে আমি খ্যাতি পেয়েছি। সে যুগে অ্যামেচার ক্যামেরাম্যান খুবই কম ছিল। কাজেই দু-একজন যারা থাকত, তাদেরকে লোকে খুব আদর করত, খুব খাতির করত।

* মামুন :আপনি কী কী ক্যামেরা ব্যবহার করেছেন?

* ড্যাডি :আমি একটা ক্যামেরা ব্যবহার করিনি। আমি এইভাবে পর্যায়ক্রমে একটা ক্যামেরার পর আরেকটা ক্যামেরা—বহু ব্যবহার করেছি। ফিল্ম ক্যামেরা ব্যবহার করেছি। ফোল্ডিং ফিল্ম ক্যামেরা ব্যবহার করলাম। তারপর প্লেট ক্যামেরা অনেকরকম ব্যবহার করেছি। একটা প্লেট ক্যামেরা কিনেছিলাম ডাবল এক্সটেনশন প্লেট ক্যামেরা আগফার। সেই ক্যামেরা দিয়ে আমি ডে-লাইটে দিনের আলোতে এনলার্জ পর্যন্ত করতাম।

* মামুন :ক্যামেরা দিয়ে এনলার্জ করতেন মানে?

* ড্যাডি :ক্যামেরাটা ছিল ওভাবে তৈরি, ডাবল এক্সটেনশন। তখন ইলেকট্রিসিটি ছিল না। অনেক জায়গায় ইলেকট্রিসিটি পেতাম না। তখন এই ক্যামেরাটা ব্যবহার করতাম এনলার্জ কাজ করার জন্য। এমনকি ঢাকাতে শেষ পর্যন্ত আফটার রিটায়ারমেন্ট আমি এই ক্যামেরাতে অনেক এনলার্জ করেছি। তো, আমি জীবনে বহু রকমের ক্যামেরা ব্যবহার করেছি।

* মামুন :সাব-রেজিস্ট্রারের চাকরি নিয়ে প্রথম কোথায় গেলেন?

ড্যাডি: :সাব-রেজিস্ট্রারের চাকরি নিয়ে আমি হাওড়া গিয়েছিলাম। কলকাতার পাশে হাওড়াতে ছিলাম। তারপর পাদুং থেকে আমি বাঁকুড়া গেলাম। বাঁকুড়া ডিস্ট্রিক্টও আমি বহুদিন ছিলাম। তারপরে বাঁকুড়া থেকে আমি মেদিনীপুরে গেছি। সেখান থেকে মেদিনীপুর হয়ে নদীয়া ডিস্ট্রিক্টে গেছি। হুগলী ডিস্ট্রিক্টে গিয়েছি। তারপর ময়মনসিংহে গিয়েছি। তারপর রাজশাহীতে গিয়েছি। তারপর যশোরে গিয়েছি। অ্যাজ এ সাব-রেজিস্ট্রার বহু জায়গায় চাকরি করেছি। ঘুরবার পর... পার্টিশনের আগে তো আমি ওয়েস্ট বেঙ্গলেই থাকতাম। পার্টিশনের পরে আমি ইস্ট বেঙ্গলে চলে এলাম।

* মামুন :আপনি পূর্ব বাংলায় আসলেন কেন?

* ড্যাডি :সেখানে আমাদের ক্ষতি হয়েছে অনেক। ওয়েস্ট বেঙ্গলে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি আমরা। অনেক সময় দাঙ্গা হয়েছে, হিন্দু মুসলমানের রায়ট হয়েছে। রায়টে আমাদের ঘরবাড়ি নষ্ট হয়েছে, লোক মারা গিয়েছে। আমাদের আত্মীয়-স্বজন কারো জীবনহানি হয়নি, তবে মালপত্র ঘরবাড়ি নষ্ট হয়েছে। তারপর আমাকে জিজ্ঞেস করা হলো সাব-রেজিস্ট্রার হিসেবে তুমি এখানে থাকবে না ওদিকে যাবে। আমি দেখলাম যে সকলে ইস্ট বেঙ্গল যাচ্ছে যখন আমিও চলে যাই। তো এইখানে রাজশাহীতে চাকরি করলাম। আফটার পার্টিশন প্রথম রাজশাহীতে চাকরি করলাম। রাজশাহীর পরে গেলাম ফরিদপুর। ফরিদপুর থেকে আমি রিটায়ার করলাম নাইন্টিন ফরটিনাইনের নভেম্বরে। রিটায়ার করে ঢাকায় চলে এলাম। আমার শাশুড়ি থাকত ওখানে, তার বাড়িতে উঠলাম। দুই বছর পরে এইখানে এলাম। ইন্দিরা রোডে বাড়ি কিনে এখানে থাকতে লাগলাম।

* মামুন :সাতচল্লিশে ভারত বিভাগ-দাঙ্গা, তার আগে প্রথম মহাযুদ্ধ, অসহযোগ আন্দোলন এবং তখনকার তীব্র রাজনৈতিক পরিবর্তনে আপনার ক্যামেরা নীরব থাকল কেন?

* ড্যাডি :আমি তো ব্রিটিশদের সাব-রেজিস্ট্রারের চাকরি করতাম। খুব ব্যস্ত থাকতে হতো অফিসের কাজে। তাছাড়া রাজনীতির গণ্ডগোল থেকে দূরে থাকতাম আমি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় বিভিন্ন জায়গায় গেছি, ইমনিকের ট্রেনিং নিয়েছি—এসব কিছু আমার ছবিতে আছে। আমার তো মনে হয় না কোনো বাঙালি মুসলমান প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ভারতবর্ষে এত ছবি তুলেছে। চাকরির সিংহভাগ টাকাই আমি ফটোগ্রাফিতে খরচ করেছি। তুমি দাঙ্গার কথা বলছ, তার সরাসরি কোনো ছবি আমি তুলতে পারিনি। কিন্তু ওই সময়টা আছে আমার ছবিতে।

* মামুন :আপনি আসলে কীসের ফটোগ্রাফার, মানে কী নিয়ে আপনি ছবি তুলতে চেয়েছেন?

* ড্যাডি :প্রকৃতিই আমার বেশি ভালো লাগত। আবার মানুষের ছবিও তুলেছি। আমি খুব সচেতনভাবে ফটো সাংবাদিকতা করিনি। ওটা আমার সাবজেক্ট ছিল না। প্রাকৃতিক দৃশ্য গভীরভাবে আমাকে আকৃষ্ট করত। আমি যখন ছবি তোলা আরম্ভ করি, তখন মুসলমানরা ছবিই তুলত না। হিন্দুরা এতে আগ্রহী হয়ে ওঠে। আমার আশপাশে তখন কোনো মুসলমান ফটোগ্রাফার পাইনি। কোনো বাঙালি মুসলমানকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় কলকাতায় ক্যামেরা হাতে দেখিনি। তখন কোনো বইপত্তর নাই, দিকনির্দেশনা নাই আমার সামনে। কী ছবি তুলব, কোথায় কীভাবে তুলব—নিজে নিজেই সব করেছি। আমার কোনো শিক্ষক ছিল না। তুমি যদি ওই সময় আর ঘটনাগুলো দেখো অবাক হয়ে যাবে। কীভাবে প্রতিকূল অবস্থায় একজন তরুণ ক্যামেরা হাতে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, আজকাল কে বুঝবে। রাজনৈতিক হানাহানি-মারামারির মধ্যে আমি ফটোগ্রাফি করিনি। ওগুলো আমাকে আকর্ষণ করেনি। প্রকৃতির সৌন্দর্য আমাকে টেনেছে। আমি তাতেই মুগ্ধ হয়েছি। ঢাকায় এসেও আমি প্রকৃতিকে খুঁজেছি। ও আরেকটা কথা, আমার ফটোগ্রাফির শুরুর দিকে যন্ত্রের নানান সীমাবদ্ধতার মধ্যে কাজ করেছি। তারপরে এমন কাউকে পাইনি, যিনি ছবি বোঝেন বা সমলোচনা করতে পারেন। কাজেই আমি ছিলাম একা।

* মামুন :আপনার শুরুর দিকে কারা আলোকচিত্রী ছিলেন?

* ড্যাডি :এ-এ-রে যা, আমি তো এদিকে খেয়াল করিনি। কিছু নাম তো জানতাম। দু’চারজনের নাম জানতাম। তারা কেউ বাঙালি মুসলমান ছিলেন না। আমি মনে করতে পারছি না নামগুলো। অনেক পেশাদার ফটোগ্রাফার ছিল সেসময়। তাদের স্টুডিও ছিল। নাম-ধাম মনে নেই। আমি নিয়মিত কোডাক ম্যাগাজিন কিনতাম। সেখানে ওদের নাম পাওয়া যাবে। সব ইন্ডিয়ান ফটোগ্রাফার, সাহেবদের ছবিই বেশি ছাপা হতো সেখানে।

* মামুন :আপনার প্রথম ছবি কবে ছাপা হয়?

* ড্যাডি :মনে নেই। একদম মনে নেই। তবে সে সময়তে পত্রিকায় ম্যাগাজিনে ছাপা হয়েছে। কিন্তু কবে বলতে পারব না।

* মামুন :ইন্দিরা রোডে কবে বাড়িটা কিনলেন?

* ড্যাডি :তারিখটা আমার ঠিক মনে নাই। জানি না কোথাও যদি লেখা থাকে তোমাকে দেব। তারপর নাইন্টিন সিক্সটিটুতে এটা হলো। ট্রপিক্যাল ইনস্টিটিউট অব ফটোগ্রাফি (Tropical Institute of photography)। ইনস্টিটিউটটা ছিল, আবার স্টুডিও হিসাবে কাজ করতাম। কেউ যদি এসে বলত ছবি তুলে দেন, তাদের ছবিও তোলা হতো। আবার ট্রেনিং দিতাম। কেউ যদি ফটোগ্রাফি শিখতে চাইত, শেখানো হতো। তার নাম ছিল ট্রপিক্যাল ইনস্টিটিউট অব ফটোগ্রাফি।

* মামুন :সেখান থেকে আপনার কোনো আয় হতো?

* ড্যাডি :এটা কোনোদিন হয়নি। অনেকে ছবি তুলতে আসত। কেউ প্রিন্টের পয়সা দিত, কেউ ছবি পেয়ে খুশি মনে চলে যেত, পয়সা দিত না। ওরা খুশি হলে আমিও খুশি হতাম। আর ট্রেনিং দিতাম অত্যন্ত নগণ্য টাকায়। ছাত্রদের নিয়ে চা-নাস্তা খাওয়ার পয়সাই হতো না। আমার উদ্দেশ্য ছিল আয় করা নয়, তোমাদের মতো তরুণদের ফটোগ্রাফির ট্রেনিং দেয়া, যাতে শিল্প হিসেবে বা পেশা হিসেবে এটাকে তারা গ্রহণ করে। কেউ ছবি তোলা শিখতে পারলেই আমার আনন্দ। এর চাইতে বড় শিল্প আর কী হতে পারে।

* মামুন :প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কথা আপনি বলেছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কিছু বলেননি।

* ড্যাডি :বিশ্বযুদ্ধের সময় ওই একই অবস্থা। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ যেমন হয়েছিল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ছিল আরও ব্যাপক ও ভয়াবহ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আমাদেরকে আর ডাকেনি। কারণ আমরা তখন স্বাধীনতার জন্য প্রাণপণ আন্দোলন করছি ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে। আমাদেরকে ইংলিশরা আর আগের মতো বিশ্বাস করতে পারছে না। আমাদেরকে আর তখন মিলিটারিতে যেতে হয়নি। যার যার নিজের কাজ করে গেছি। চাকরিতে কোনো অসুবিধা হয়নি। যুদ্ধের সময় যেসব নিয়ম-কানুন ছিল, সেভাবেই কাজকর্ম হতো। ব্ল্যাকআউট হতো, সাইরেন বাজত। যুদ্ধের ছবি তোলা হয়নি। অ্যাকচুয়ালি আমরা তো কেউ যুদ্ধক্ষেত্র যাইনি।

* মামুন :রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে দেখা হয়েছিল আপনার?

* ড্যাডি :সে তো কবি মানুষ (হাসি)। ফাংশান হতো শুনতাম, ওখানে রবি ঠাকুর যাবেন। কয়েকবার গিয়েছি। দেখা করেছি তার সঙ্গে।

* মামুন :তাঁর ছবি তুলেছেন?

* ড্যাডি :না, তাঁর ছবি তোলার সুযোগ হয়নি।

*মামুন :নাকি আপনি এসব বিখ্যাত মানুষদের ছবি তুলতে আগ্রহী ছিলেন না?

* ড্যাডি :কথাটা মিথ্যে নয়। আমার আগ্রহ প্রকৃতিতে। সেই যুগে তো ছবি তোলার এত সুবিধা ছিল না। সেই গোড়ার দিকে নাইন্টিন টুয়েলভে বন্ধুবান্ধবদের ছবি তুলেছি। সেরকম বিখ্যাত লোকের ছবি তোলা হয়নি। সে সুযোগ আমি পাইনি।

* মামুন :আপনি কী হতে চেয়েছিলেন?

* ড্যাডি :ফটোর দিকে একটা ঝোঁক হয়েছিল। কিন্তু ভবিষ্যতে শেষ পর্যন্ত কী হতে পারব, সেটা আমি বুঝতে পারিনি। তবে প্রফেশনাল ফটোগ্রাফির দিকে আমার কখনো ঝোঁক ছিল না। ব্যবসা করব বা টাকা করব, এটা আমার মনে হয়নি। অ্যামেচার ফটোগ্রাফার হিসেবেই জীবনটা কাটাব—এইটা কিন্তু মনে হয়েছিল। রিটায়ার করার পরেও মনে করলাম যে, দোকান করব, স্টুডিও করব, আমি ওদিকে যাইনি। ওটা মনে কখনো হয়নি। আমার বরাবর মনে ছিল যে, আমি রিটায়ার করে এমনভাবে থাকব যে, পরকে শিক্ষা দিব যেন লোকে শিখে। আমি বহু কষ্ট করেছি ফটোগ্রাফি শিখতে। আমি যদি দশটা লোককেও শিখাতে পারি, মানসিক প্রশান্তি পাব, যে ক’টা লোককে আমি ফটোগ্রাফি শেখালাম। এইটার জন্যই ট্রপিক্যাল ফটোগ্রাফি, আমি কিছু করে খাব এটা আমার উদ্দেশ্য ছিল না। আমার ছেলেবেলায় তো ছিলই না। একটা কিছু করে যেতে হবে, দরকারও আমার। আমি সেটার ওয়ান্টটা ফিল করিনি। হয়তো ওয়ান্ট হলে আমি এদিকে যেতাম। ব্যবসার দিকে যেতাম, কিন্তু ওয়ান্টটা আমার হয়নি।

* মামুন :তখন আপনার আয় কী রকম ছিল?

* ড্যাডি :তখনকার যুগে জিনিসপত্র সব সস্তা ছিল এবং আমার যা আয় ছিল, তা আমার যথেষ্ট হয়ে যেত। এটা কোনো ব্যাপার ছিল না। কাজেই ব্যবসায় হিসেবে নয়, বরাবর ওই অ্যামেচার বা সৌখিন ফটোগ্রাফার এই হিসেবেই আমি কাজ করেছি।

* মামুন :আপনার ট্রপিক্যাল ইনস্টিটিউটে কারা আসত?

* ড্যাডি :ওই-যে বললাম নাইন্টিন হান্ড্রেড ফিফটিটুতে... তখন মেম্বার খুবই অল্প। দশ-বারজন থাকত। আসত যেত, আসত যেত—এইভাবে। আমার শ্বশুরবাড়িতেই করলাম। ওখানে দিনের আলোতে এনলার্জ  করতাম। জানালাতে প্লেট ক্যামেরাটা লাগিয়ে একটা ফ্রেম... ইজেল করেছিলাম, সেইটা সরিয়ে ই-করে ফোকাস করা খুব অসুবিধা হতো। বিটা সাইজ করতাম। আরও দু-একটা সাইজ হতো ।

* মামুন :ভারত বিভাগের আগে ফটোগ্রাফি করত কারা?

* ড্যাডি :সব সাহেবরা। বিদেশিরাই ফটোগ্রাফার ছিল তখন। ভারতীয়দের কিছু স্টুডিও ছিল। কিন্তু অ্যামেচার ফটোগ্রাফার হাতে গোনা। মুসলমান তো ছিল না। বিদেশি যারা উঁচুপদে ছিলেন, তারা কেউ কেউ সৌখিন ফটোগ্রাফার ছিল।

* মামুন :তাদের কারো সাথে যোগাযোগ ছিল আপনার?

* ড্যাডি :না, ছিল না। যোগাযোগ আমি করতাম না। ওরাও ভারতীয়দের সাথে খুব একটা মিশত না। ঘৃণা করত। ক্যাম্পজীবনে আমার ইন্সট্রাক্টর ক্যাপ্টেন গ্রের সাথে বন্ধুত্ব হয়েছিল। সে খুব মজার মানুষ ছিলেন। যুদ্ধের সময় যেকোনো জায়গায় ছবি তোলার জন্য তিনি আমাকে মৌখিক অনুমতি দিয়েছিলেন। তাছাড়া সে ছবি বুঝত। মিসেস এডনার কথা বলেছি। এছাড়া কারো কথা মনে পড়ে না। আমি বেশ লাজুক ছিলাম। কারো সাথে গিয়ে আলাপ করা আমার স্বভাবে ছিল না। আমি নিজেকে আড়াল করে এতকাল ফটোগ্রাফি করেছি। মানুষ আমাকে চিনুক, এটা আাামর উদ্দেশ্য নয়। ফটোগ্রাফি করব এবং অন্যদের এই শিক্ষাটা দেব, উত্সাহিত করব—এইটাই আমার মুখ্য উদ্দেশ্য। আমি নিজের জন্য কিছু করতে চাইনি। এই যে এটা একটা মস্ত বড় শিল্প, তা তোমাদের মধ্যে বিতরণ করতে চেয়েছি।

* মামুন :আপনি আমাদেরকে ফটোগ্রাফিতে উত্সাহিত করতে পেরেছেন?

* ড্যাডি :অনেক অগ্রগতি হয়েছে। পঞ্চাশ বছর আগে এদেশে ফটোগ্রাফার পাওয়া যেত না। অ্যামেচার ফটোগ্রাফার চোখে পড়ত না। আর বর্তমানে প্রায় একশ ফটোগ্রাফার কাজ করছে। এরা কীভাবে এল? ভালো ভালো ছবি তুলছে! এক্সিবিশন হচ্ছে! পুরস্কার পাচ্ছে! ক্যামেরা রিক্রিয়েশন ক্লাব (Camera Recreation Club) থেকে আমরা এক্সিবিশন করেছি। বহু ভালো ছবি জমা পড়েছে। সব ইয়াং ফটোগ্রাফার্স। আমি তো খুব আশাবাদী। এরা অনেকদূর এগিয়ে যাবে। অনেক নাম করবে। সেটাই আমার সান্ত্বনা।

* মামুন :আপনার মায়ের কথা শুনিনি।

* ড্যাডি :মায়ের কথা তো মনে নেই। মা তো মারাই গেলেন। পরে শুনেছি দেখতে ভালোই ছিলেন। কেননা মা’র যে বোন আমার খালা, সে দেখতে ভালো। কাজেই আমার মনে হয়, উনিও দেখতে শুনতে ভালোই ছিলেন। আমরা ভাই-বোন যারা হয়েছি, আমরা দেখতে খারাপ হইনি। তখনকার ছবি-টবি ছিল না। তবে পরে আব্বা যাকে বিয়ে করেন, তার নাম জোবেদা খাতুন। তিনিও দেখতে ভালো ছিলেন। আর আমার নানা, উনি সেকালে ডাক্তার ছিলেন। অসাধারণ জ্ঞানশক্তি ছিল তার। অমানুষিক শক্তি ছিল, যে শক্তি সাধারণ মানুষের হয় না। উনি অনেক সময়ে মানুষের চেহারা দেখে বলতেন, দেখো সাবধানে থেকো, তোমাদের বিপদ আসছে। অনেক সময় উনি ভবিষ্যতের কথা বলতেন। খালি চেহারা দেখে বলতেন। অদ্ভুত শক্তি ছিল। আমার ছোটবেলার ঘটনা আছে, বলব?

 

* মামুন :বলেন ড্যাডি, আপনার কথাই তো জানতে আসছি।

* ড্যাডি :এটা খুব ইন্টারেস্টিং কিন্তু। আমার ছোটবেলায় বছর চারেক মতো বয়স হবে, আমি তখন শান্তিপুরে। শান্তিপুরে বাড়ির মস্ত কম্পাউন্ড, একতলা বড় বাড়ি। সেকালের পাকা বাড়ি। আব্বা সেটা তৈয়ার করেছিলেন। আমরা থাকতাম, আর আব্বা তো পুলিশের কাজে বাইরে বাইরে ঘুরে বেড়াতেন। সেজন্য মা কাছে থাকত, আত্মীয়-স্বজনও থাকত টাকত। আমি বেশিরভাগ সময় মায়ের সঙ্গে থাকতাম। আব্বার সঙ্গে ঘুরতাম না। মা আমাকে নিয়ে এখানে থাকতেন। তো, একদিন হলো কি, ছেলেবেলাকার ব্যাপার—মেইন বিল্ডিং থেকে পাকঘরটা বেশ দূরে। অনেকটা দূরে। সন্ধ্যার আগে, আম্মা আমি একটু দুধভাত খাব। দুধভাত মাখিয়ে মাখিয়ে পাকঘরে খাওয়াচ্ছেন। তা আমি একবার করে ভাত মুখে নিচ্ছি আর লাফিয়ে জানলাতে উঠছি। জানালার শিক ধরে দোল খাচ্ছি। ছেলেমানুষ তো, খেলা করছি। এরকম করতে করতে হাত ফসকে গেল। শিক থেকে হাতটা খুলে গেল এবং মেঝেতে রাখা বটিতে পড়ে গেলাম। বটির উপর পড়াতে পা কেটে রক্তাক্ত হলো। অনেকদিন ভুগেছি, মনে আছে।

* মামুন :আপনার বিয়ে হয়েছিল কবে কীভাবে?

* ড্যাডি :আমার বিয়ে হয়েছিল, আমার তখন বয়স বোধহয় টোয়েন্টিএইট, এটুকু মনে আছে। অ্যাট দ্য অ্যাইজ অব টোয়েন্টিএইট আই ম্যারেড। ওইসময় ফাদার ঠিক করলেন বিয়ে করতে হবে। আমি তো বিয়ে সম্বন্ধে কিছু জানিও না। ফাদার ঠিক করেছেন। উনি বললেন, একটা মেয়ে ঠিক করেছি, তুমি বিয়ে কর। আমি বিয়ে করলাম। তখন আমি বাকুড়ায় থাকি। আমার বিয়ে করার ইচ্ছাও ছিল না। উনি বললেন, তোমার বয়স হয়ে যাচ্ছে। তোমার বিয়েটা যদি দেখে যেতে পারি, আমার মনটা ভালো লাগবে। ঠিক আছে, আমার কোনো আপত্তি নেই। উনি ঠিক করলেন। আমি নাইন্টিন নাইন্টিনে সাব-রেজিস্ট্রারে ঢুকি। তখনও একই পদে ছিলাম। ১৯১৯ সালে আমার চাকরি আরম্ভ হয়। আমার স্ত্রী নাম হোসনে আরা। উনি আছেন, এখানেই আছেন। ওই বাসায় (পেছনে ভাড়া বাসা দেখিয়ে) গেছেন।

* মামুন :তিনি ফটোগ্রাফি পছন্দ করেন?

* ড্যাডি :ফটোগ্রাফি পছন্দ করে, নিজে ছবি তোলে না। শুধু শুধু সন্দেহ করে, সন্দেহ (হাসি)।

* মামুন :আপনি যখন অখণ্ড ভারতের পশ্চিম বাংলায় ফটোগ্রাফি করতেন, তখন কোন ধরনের লোকেরা ফটোগ্রাফারদের কাছে ছবি তুলতে আসত?

* ড্যাডি :সেকালে ছবিতে ব্যবসা ছিল না। আজকাল যেমন কথায় কথায় ছবি তোলে লোকেরা। তখন কিচ্ছু না। ছবির কোনো ব্যাপার না। মুসলমানরা তো ছবিই তুলত না। ধর্মীয় কারণে ছবি তুলতে তারা ভয় পেত। এটা গুনার কাজ ছিল। তিরিশের দশক পর্যন্ত কোনো নিম্নবিত্ত শিক্ষিত মুসলমান ফ্যামিলিতে ঘরের দেয়ালে আমি কোনো ছবি দেখিনি।

* মামুন :মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন তাঁর সওগাত পত্রিকায় মুসলমান মেয়েদের ছবি ছাপতেন।

* ড্যাডি :কলকাতাতে সম্ভবত তার পত্রিকাতেই প্রথম মুসলমান মেয়েদের ছবি ছাপা হয়। কিন্তু ওসব ছবি, আমার যদ্দুর মনে পড়ে বাঙালি মুসলমান মেয়েদের ছবি নয়। তুরস্ক বা ইরানী মেয়েদের ছবি ছাপাতেন। ভারতবর্ষে মেয়েদের ছবি তোলা, মুসলমান মেয়েদের... সাংঘাতিক কাণ্ড! কোনো মুসলমান মেয়ে স্বেচ্ছায় ক্যামেরার সামনেই আসত না। তারা পর্দায় থাকত, চেহারা ভালোভাবে দেখা যেত না।

* মামুন :ঊনবিংশ শতাব্দীতে এবং বিংশ শতাব্দীর শুরুতে খুব বেশি মুসলমান মেয়েদের ছবি দেখা যায় না।

* ড্যাডি :তার ঘর থেকে বের হতো না। শিক্ষাও ছিল না। পর্দায় থাকতে থাকতে মেয়েদের কোনো মনোবল ছিল না। ছবি তোলা ধর্মীয় কারণে তার গ্রহণ করেনি। ভারতবর্ষে হিন্দু ও খ্রিষ্টান মেয়েদের অনেক ছবি আছে। ছবি তুলতে তাদের কোনো বাধা ছিল না। আমি খ্রিষ্টান মেয়েদের ছবি তুলেছি ১৯১২ সালে, বন্ধুর বোন। পরে হিন্দু ফ্যামিলির মেয়েদের ছবি তুলেছি ঘরের ভেতরে। এটা মুসলমান মেয়েদের বেলায় কল্পনাও করা যেত না। আমার আত্মীয়দের ছবি তোলার চেষ্টা করতে গিয়ে দেখেছি তারা অনেকেই মুখ ঢেকে রাখত। ছবি তুলতে দেবে না। শুরুতে একটি মুসলমান মেয়েকেও পাইনি যে স্বেচ্ছায় ছবি তুলতে সম্মত হতো। কাজেই গত শতকে মুসলমান মেয়েদের মুখের ছবি খুব অল্প। এই শতকে অবশ্য সামান্য কিছু ছবি পাওয়া যায়।

* মামুন :তখন প্রফেশনাল ফটোগ্রাফারদের স্টুডিও কেমন ছিল?

* ড্যাডি :কলকাতায় এই শতকের শুরুতে বেশ কয়েকটি স্টুডিও ছিল। কয়েকটি ভেতরে ঢোকার সুযোগ আমার হয়েছিল।

* মামুন :কী কী ছিল স্টুডিও ভেতরে?

* ড্যাডি :একখানা প্লেট ক্যামেরা থাকত কাঠের স্ট্যান্ডের ওপর। পর্দা ঝোলানো থাকত বিভিন্ন ধরনের। সেটা প্রয়োজনে পরিবর্তন করতে পারত। স্ট্যান্ড লাইটা ছিল এবং কয়েকটি স্টুডিওতে দেখেছি ডে-লাইট ছবি তোলার ব্যবস্থা আছে। দুপাশে বা মাথার ওপরে খোলা রাখা যায়, সেখান থেকে আলো আসছে। স্টুডিওতে ফার্নিচার ছিল। চেয়ার-টেবিল অবশ্যই থাকত। তারপরে থাকত ফুলদানি। দামি স্টুডিওগুলোতে কার্পেট থাকত। কাস্টমাররা এলো চা-কফি খাওয়াত। ছোট বাচ্চারা ছবি তুলতে আসলে লজেন্স বা খেলনা দিত। সুন্দর সুন্দর ছবি ঝোলানো থাকত কাচের ভেতর। বাইরে থেকে এসব ছবি আমি উপভোগ করতাম।

* মামুন :ওইসময় স্টুডিওতে গিয়ে ছবি তুলেছেন?

* ড্যাডি :প্রফেশনাল স্টুডিওতে গিয়েছি কয়েকবার। খুব কম গিয়েছি, কোয়াটার ছবি তোলার জন্য। প্লেট ক্যামেরায় তোলা কোয়াটার সাইজ। সেম সাইজ কনটাক্স প্রিন্ট দিনের আলো দিয়ে করতে হতো।

* মামুন :ছবিটা এখন কোথায়?

* ড্যাডি :খুঁজে পাচ্ছি না। কোথায় হারিয়ে গেছে, এত বদলির চাকরি। তারপরে তো ১৯১২ সাল থেকে আমি নিজেই ক্যামেরার মালিক।

* মামুন :নিজের ছবি তুলেছেন কখনো—সেল্ফপোর্ট্রেট?

* ড্যাডি :হ্যাঁ, উঠিয়েছি কয়েকবার। বেশ ভালো স্পষ্ট হয়েছিল। সেল্ফপোর্ট্রেট ভালো লাগত।

* মামুন :সেল্ফ পোর্ট্রেটগুলো কোথায়?

* ড্যাডি :তোমাকে সেদিন দিলাম নেগেটিভগুলো। ওর মধ্যেই পাবে। পুরোনো সব ছবি সংরক্ষণ করতে পারি না। তোমরাই পারবে এগুলো সংরক্ষণ করতে। আরেকটা কথা—আগে বিয়েশাদির ছবি, ফাংশানের ছবি এসব ছিল না। আমাদের যুগে এসব তখন ছিল না (হাসি)। এসব কিচ্ছু না।

* মামুন :আপনাদের বিয়ের, মানে আপনাদের দুজনের প্রথম ছবি কখন তোলেন?

* ড্যাডি :অ্যা...

* মামুন :আপনাদের দুজনের ছবি কোন সালে প্রথম তোলেন?

* ড্যাডি :বিয়ের পরে বোধহয় এক একটা নেয়া হয়েছিল। আফটার ম্যারেজ।

* মামুন :সেটা কি বাকুড়াতেই?

* ড্যাডি :বোধহয় বাকুড়াতেই, হ্যাঁ।

* মামুন :সেই ছবি কি এখনও আছে?

* ড্যাডি :না নষ্ট হয়ে গেছে। কী হয়েছে জানি না।

* মামুন :আপনাকে খুব একটা ব্যক্তিগত প্রশ্ন করি। আপনাকে বাংলাদেশের সব ফটোগ্রাফাররা ‘ড্যাডি’ বলে। ড্যাডি অর্থ হলো পিতা। কিন্তু আপনার নিজের কোনো ছেলেমেয়ে নেই। এজন্য আপনার দুঃখ হয় না?

* ড্যাডি :বিশেষ হয় না। আমি এইটা জানি যে আমাকে যে সৃষ্টি করেছেন, সৃষ্টিকর্তা যে সে যা করেছে আমি সেটা মেনে নিয়েছি। সে যদি আমাকে ছেলে না দিয়ে থাকে ব্যস... আমার বলবার কিছু নেই। আমি সবসময় যেকোনো ঘটনাই হোক না কেন, আমি এভাবেই ওটাকে মনে করি। আমি খুব একটা দুঃখ বা কষ্টটা মনে করি না। সেটা আমি সহ্য করার চেষ্টা করি। কেননা এমন একটা জিনিস আছে শক্তি, যেই শক্তিটায় সারা বিশ্ব চলছে। আমি যে চলছি সেই শক্তির জোরেই চলছি। প্রত্যেক জিনিস সেই শক্তিতে সেই নিয়মে চলছে। কাজেই এতে আমার বলবার কিছু নেই। আমার করবার কিছু নেই। এইজন্যে আমার যা আছে, আমি সেটা মেনে নিয়েছি। আমার তাতে কোনো আপত্তি নেই। এই হলো আমার কথা।

* মামুন :কিন্তু আপনার যদি কোনো ছেলে থাকত, আপনার পাশে দাঁড়াত। আপনার ছবি প্রিন্ট করে দিত। আপনার সাথে আউটিংয়ে যেত। কী মনে হয়?

* ড্যাডি :এইটা অবশ্য কখনও কখনও মনে হয়। কিন্তু তার সঙ্গে এটাও মনে হয় যে, আজকাল ছেলেপেলেরা বাপ-মাকে খুব কষ্ট দিচ্ছে। পাশাপাশি মনে হলে আমার মনে হয়, আমি ঠিক আছি। আমি এমনও লোকের কাছে বলতে শুনেছি, আমার যদি ছেলে না হতো তাহলে ভালো ছিল। আমি তাদের মুখে শুনেছি, অনেকের কাছে যে, আপনার ছেলে হয়নি আপনি ভালো আছেন। কিন্তু আমাদের ছেলে আছে, ছেলে হওয়ায় যে আমরা কষ্ট পাচ্ছি, সে বলবার কথা নয়। কাজেই তখন আমার মনে সান্ত্বনা হয়। যেটুকুই অসুবিধা মনে হতো সেটুক আর থাকে না।

* মামুন :তো আপনি মনে করেন আল্লাই সবকিছু...

* ড্যাডি :মানুষের করবার কিছু নেই।

* মামুন :বাংলাদেশের অগণিত ছেলেরা ছবি তোলে, যারা আপনাকে ড্যাডি বলে ডাকে। আপনি কি মনে করেন তারা আপনার সন্তান?

* ড্যাডি :হ্যাঁ, এটা আমার মনে হয়। এটা কিন্তু আমাকে দিয়েছিল বেগ।

* মামুন :বেগ সাহেব...

* ড্যাডি :এই যে ‘ড্যাডি’ কথাটা, এটা ফার্স্ট দিল বেগ।

* মামুন :কোন বছরে?

* ড্যাডি :বছর পনের-ষোল আগে।

* মামুন :মানে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগে না পরে?

* ড্যাডি :না পরে। আমার মনে হয় পাকিস্তান আমলের শেষের দিকটায়।

* মামুন :সেটা কি এই ৭৩ ইন্দিরা রোড নাকি অন্য কোথাও?

* ড্যাডি :এইখানে, এইখানে। ক্লাব হবার পরে। উনি একদিন হঠাত্ বললেন... ড্যাডি বললেন আমাকে। আমি বললাম, তুমি আমাকে যে ড্যাডি বললে। আপনি ড্যাডিই তো। আপনি সকলের ড্যাডি।

* মামুন :এই থেকে ড্যাডি শুরু হয়ে গেল।

* ড্যাডি :সেই থেকে সকলেই বলে ড্যাডি (হাসি)।

* মামুন :আপনার ছেলে থাকলে হয়তো একটা দুইটা পাঁচটা থাকত। কিন্তু এখন আপনার ছেলেমেয়ে কিন্তু অগণিত। বাংলাদেশে আমাদের বয়েসি ফটোগ্রাফাররা সবই তো আপনার ছেলেমেয়ে...

* ড্যাডি :বেগ সাহেব ওইজন্যই আমাকে ড্যাডি বলেছে। ওই কারণেই, আমার কোনো ছেলেমেয়ে নেই। এবং তারা সব আমার ছেলের মতো। এই যে ড্যাডি কথাটা সে বলেছিল, এইটা সকলেই এখন বলে। ড্যাডি কথাটার উত্পত্তি এইভাবেই হয়েছিল।

* মামুন :নিঃসন্তান বলে আপনার স্ত্রী কখনও দুঃখ করে না?

* ড্যাডি :না, সে কিছু বলে না।

* মামুন :আপনি যখন বিয়ে করলেন তখন আপনা শ্বশুর বেঁচে।

* ড্যাডি :না, শ্বশুর না, শ্বশুড়ি। শ্বশুর মারা গেছেন।

* মামুন :ড্যাডি আপনার শ্বশুর কী করতেন?

* ড্যাডি :উনি ছিলেন জেলার। বাংলায় ছিলেন না। বিহার জেলার ছিলেন।

* মামুন :আপনার বিয়ে হয়েছিল বাকুড়ায় না বিহারে?

* ড্যাডি :বিয়ে? বিয়ে হয়েছিল কলকাতায়।

* মামুন :ও কলকাতায়। কত নাম্বার...

* ড্যাডি :আমার ওয়াইফের মামা তার ওখানে থাকত আমার শ্বশুড়ি ওখানেই থাকত। শ্বশুর মারা গিয়েছিলেন। আমার শ্বশুড়ি বিয়ে দিল। সে পড়াশোনা করেনি। একমাত্র সন্তান—ছেলেমেয়ে বলতে ওই একটিই মেয়ে।

* মামুন :বিয়েটা হয়েছিল কোথায়?

* ড্যাডি :বিয়েটা হয়েছিল কলকাতার ভবানীপুরে।

* মামুন :বিয়েতে আত্মীয়স্বজন সবাই ছিলেন। আপনার আব্বা ছিলেন?

* ড্যাডি :হ্যাঁ, আব্বাই তো বিয়ে দিলেন।

* মামুন :তখন আপনার আব্বা কী চাকরি করতেন?

* ড্যাডি :সুপারিনটেন্ডেন্ট অব পুলিশ। হাওড়ায় ও কলকাতায়।

* মামুন :বললেন যে, বিয়ের পরে প্রথম ছবি তুললেন। সেটা কি স্টুডিওতে গিয়ে তোলা?

* ড্যাডি :না, স্টুড়িও আমি কখখনও ছবি তুলিনি।

* মামুন :আপনি স্টুডিওর ছবি পছন্দ করেন না?

* ড্যাডি :স্টুডিওর ছবি আমি পছন্দ করি না। ওই ওরা রং করবে। কী করবে, ওটা আমার ভালো লাগে না। আমি চাই ন্যাচারাল ছবি সবসময়। মানুষের যা চেহারা, তা যদি অতিরঞ্জিত করে... খুব সাদা করে দেবে, কী করবে, নষ্ট করবে, আমি চাই না। ওই কারণেই ট্রপিক্যাল ইনস্টিটিউট বন্ধ করে দিলাম। আমি ছবি তুলতাম তো। ওর সব চাইত সাদা।

* মামুন :ট্রপিক্যাল ইনস্টিটিউট অব ফটোগ্রাফি একটা স্টুডিওর মতোই ছিল?

* ড্যাডি :হ্যাঁ। স্টুডিওর কাজও হতো কিছু কিছু। ছবিও তুলতাম। যারা অ্যামেচার ফটোগ্রাফি সম্পর্কে আগ্রহী তারা আসত। তাদেরকে ফটোগ্রাফি শিক্ষা দিতাম, উপদেশ দিতাম।

* মামুন :ড্যাডি, আপনার বয়স এখন প্রায় ছিয়ানব্বই। এই বয়সে জীবনের অনেক কিছু দেখলেন। আপনার চোখের সামনে দিয়ে ইতিহাসের অনেক ঘটনা পেরিয়ে গেল। আমাদের দেশের যে সামাজিক অবস্থা, আপনার বিয়ের প্রেক্ষিতে বলছি, আপনি যখন বিয়ে করেছেন, তখন ভারতবর্ষে ছিল পর্দাপ্রথা। মানে মুসলমান মেয়েরা পুরুষদের সামনে বের হতো না। এখন যেমন বাংলাদেশের ছেলেমেয়েরা অনেক ফ্রি। ছেলেমেয়েদের অবাধে মেলামেশা এটাকে আপনি কীভাবে দেখেন?

* ড্যাডি :এটা কিন্তু আমি পছন্দ করি না।

* মামুন :কেন করেন না আপনি?

* ড্যাডি :না করার কারণ হলো বিদেশে তো এরকম আছে। বিদেশে ওদের হয় কি ছেলেমেয়েরা সবসময় একসঙ্গে মেশে এবং তার পরিণতি ভালো হয় না। ওদের দেশের ছেলেমেয়ে প্রায়ই আন্তরিকভাবে মেশে। খুব ইনটিমেটভাবে মিশে যায়, এটার ফল খুব খারাপ হয়। তো আমাদের দেশ আস্তে আস্তে ওরকম হয়ে যাচ্ছে। আমাদের মরাল স্ট্যান্ডার্ডটা খুব খারাপ হয়ে যাচ্ছে। এর সামাজিক যে রেজাল্ট, তা ভালো হয় না। পর্দা সিস্টেম তো একদিকে দিয়ে ভালো ছিল। কিন্তু একেবারে পর্দা না থাকলে হয় কি বেহায়া হয়ে যায়।

* মামুন :তো পর্দা সিস্টেমের আরেকটা অসুবিধাও ছিল যে মুসলমান নারীরা পিছিয়ে ছিল?

* ড্যাডি :এটা আগে যে রেস্ট্রিকশন ছিল বিয়েশাদির, বাপ-মা ভেবেচিন্তে ছেলেপুলের বিয়ে দিত এবং ছেলেপুলেরা তাই করত। এখন তো আর সেটা নেই। এখন ছেলেমেয়েরা নিজেরা পছন্দ করে বিয়ে করে। ছেলেমেয়েদের মন আর বয়স্ক লোকের মন অনেক তফাত। ছেলেরা যেটা করে সেটা ক্ষণিক একটা উত্তেজনা থেকে করে। কিন্তু বৃদ্ধ লোক, মানে যার বয়স হয়েছে, সে যেটা করবে, অনেক ভেবেচিন্তে করবে। এটা ভালো হবে কি না। ভবিষ্যতে কী হবে না হবে। কিন্তু আপনার বয়স কম, একটা ছেলের বয়স কম, হঠাত্ করে একটা মেয়েকে দেখে তার ভালো লাগল। তাকে বিয়ে করে ফেলল। সেটা ভালো হয় না। আসলে তারা মনের অবস্থা বুঝে না। বুঝতে পারে না। সে একটা মুহূর্তের উত্তেজনাতে তাকে ভালো লেগেছে। তাকে বিয়ে করে ফেলেছে। কিন্তু যাদের নাকি বয়স হয়েছে, সংসারে যাদের অভিজ্ঞতা আছে, তারা কিন্তু সেভাবে দেখবে না। তারা অনেক কিছু চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নেবে। ছেলেরা এখন যদি জোর করে বলে আমি বিয়ে করব। বাপ মা আর কী করবে। করো বাবা, তুমিই বুঝবে।

* মামুন :অতিরিক্ত মেলামেশা যেমন ভালো না, অতিরিক্ত পর্দাপ্রথাও তেমন ভালো না। আপনি কি একমত?

* ড্যাডি :হ্যাঁ, কিছুটা কন্ট্রোল থাকা ভালো, এইটাই হলো আমার কথা।

* মামুন :১৯১২ সালে আপনি যখন ছবি তোলা শুরু করলেন, আপনি তখন আঠার বছরের টগবগে যুবক। যারা শিল্পী—ছবি আঁকেন বা বিভিন্ন শিল্পকলার মাধ্যমে বিচরণ করেন, তারা সাধারণত রোমান্টিক হয়। তারা কাউকে দেখে ভালো লাগলে ভালোবাসে। আপনার জীবনের এইরকম কোনো ঘটনা...

* ড্যাডি :না, এইরকম কিছু হয়নি।

* মামুন :কেন হয়নি ড্যাডি? আপনার কাছে কেউ...

* ড্যাডি :এটা কেন হয়নি, আমি বুঝতে পারি না। কিন্তু আমার ওদিকে কোনো খেয়ালই হয়নি। আমি বহু মেয়েছেলের বহু ছবি তুলেছি, বহু। অনেক। এবং অবাধ আমার গতিবিধি ছিল হিন্দু বাড়িতে। হিন্দুদের সাথে মেলামেশা আমি খুব করেছি। তাদের মেয়েদের সঙ্গে মিশেছি। বাবা-মায়ের সঙ্গে যেমন মিশেছি, ছেলেমেয়েদের সঙ্গে তেমন মিশেছি। কিন্তু এরকম কখনো ভাব হয়নি যে, একটা ভালোবাসব বা ইয়ে করব। সবাই তো একরকম হয় না।

* মামুন :এইটার কারণটা কী?

* ড্যাডি :সে আমি বুঝতে পারি না। কারণ হলো—হয়নি।

* মামুন :আমি তো আপনাকে দেখছি সেই তেহাত্তর সাল থেকে, প্রয়ে পনের বছর যাবত। এই সময়ে আপনাকে দেখলাম নিভৃতচারী। নিজে একা একা থাকতে পছন্দ করেন। কম কথা বলেন এবং নিজের সম্পর্কে আপনি মানুষকে বলেন না। আপনার প্রচার আপনি কখনই করেন না। আপনি কি ইয়াং লাইফেও এরকম নিভৃতচারী ছিলেন?

* ড্যাডি :চিরকালই এইরকম। প্রচারটা আমি ভালোবাসি না। আমার জীবনের উদ্দেশ্য হলো আমি লোকের উপকার করব। কেউ বিপদে পড়লে সাহায্য করব। কারো যদি কিছু লাগে আমার সাধ্যমতো তাকে সাহায্য করব। লোকে যে আমাকে বলবে, এই লোকটা খুব ভালো, এটার জন্য আমি কাজ করি না। নিজের প্রচার করতে—ওই সেদিন এসেছিল কি বলে টেলিভিশনের লোকেরা। তারা এসে আমার ছবি তুলল। এক ভদ্রলোক আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি নিজের কথা বলতে পছন্দ করেন না? লোকে আমার সম্পর্কে প্রচার করুক—এটা আমার ভালো লাগে না। এইজন্য আমি ছবি দিই না। ছবি এক্সিবিশনে দিই না। ছবি কনটেস্টে দিই না। লোক আমাকে এই নিয়ে হই-হই করবে—আমি তা চাই না। কিন্তু আমি চাই, কেউ যদি শিখতে আসে, তাহলে বলি এটা কর, ওটা করলে ভালো হয়। নিজের প্রচারটা করব, চাই না। অনেকে এটা চায় তো। ছেলেবেলাও আমি এরকম (হাসি)। মেয়ে- ছেলের দিকে আমি চাইনি। আমি বহু মেয়ের সঙ্গে মিশেছি। তাদের সঙ্গে গল্প করেছি। কিন্তু তাদের সঙ্গে খুব ইন্টিমিটলি মিশতে পারতাম না।

* মামুন :মেয়েদের সাথে পরিচয় ছিল, বন্ধুত্ব ছিল, কিন্তু দূরত্ব বজায় রাখতেন।

* ড্যাডি :সবসময় দূরত্ব বজায় রাখতাম। অনেক মেয়ের ছবি তুলেছি এবং ছবি তোলার সময় তারা হয়তো আমার সাথে ইচ্ছা করেছে মেশার জন্য। কিন্তু আমি সেটা অ্যাভয়েড করেছি।

* মামুন :ড্যাডি আপনার এখন ছিয়ানব্বই বছর। কিন্তু ফটোগ্রাফি করেন প্রায় ছিয়াত্তর বছর হয়ে গেল। এই যে আপনার দীর্ঘ ছিয়াত্তর বছরের আলোকচিত্রী জীবন—আপনি কখনও আপনার ছবির প্রদর্শনী, মানে একক প্রদর্শনী করলেন না কেন?

* ড্যাডি :ওই তো, বললাম তো। কারণটা ওই।

* মামুন :রবীন্দ্রনাথের ভাইপো অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিল্পকর্ম আছে পৃথিবীর অনেক বড় মিউজিয়ামে। তিনি কখনো একক প্রদর্শনী করেননি। উনি বলতেন, এগুলো করে কী হবে!

* ড্যাডি :আমারও ওই একই রকম। এইসব করে কী হবে!

* মামুন :আমার তো মনে হয় আপনার যদি একটা ছবির প্রদর্শনী হয় কখনো তাহলে অনেক মানুষ আমাদের দেশের পায়োনিয়ার ফটোগ্রাফারের কাজ দেখতে পারবে। আমার মনে হয়, আপনার একটা প্রদর্শনী এখন হওয়া দরকার। আপনি বেঁচে থাকতে...

* ড্যাডি :অন্য লোকে করুক, আমার বলবার কিছু নেই। আমার একটা প্রচার হবে, আমি তো চাই না। তুমি যদি করতে চাও, আমি ‘না’ করলে দুঃখ পাবে। আমি তা করব না।

* মামুন :আমি যদি আপনার প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করি, আপনার তো আপত্তি নেই?

* ড্যাডি :অন্যলোকে যদি আমার জন্য কিছু আনন্দ পায়, আমার বলবার কিছু নেই। করুক, ঠিক আছে। আপত্তি নাই।

* মামুন :এ পর্যন্ত আপনি যত ছবি তুলেছেন, আপনার কি মোটামুটি একটা হিসাব আছে? আপনি কতগুলো এক্সপোজার করেছেন? কতগুলো ছবি তুলেছেন?

* ড্যাডি :তা-ও অনেক হবে। সব মিলিয়ে আট-দশ হাজার হবে।

* মামুন :প্রায় দশ হাজার।

* ড্যাডি :হুঁ।

* মামুন :এই দশ হাজার ছবির মধ্যে কতগুলো নেগেটিভ আপনার কাছে এখন আছে?

* ড্যাডি :এখন খুব কম আছে। পাঁচ-ছয়শো হয়তো আছে।

* মামুন :আরগুলো সব নষ্ট হয়েছে না হারিয়ে গেছে?

* ড্যাডি :এগুলো হারিয়ে গেছে, ড্যামেজ হয়ে গেছে। বদলির চাকরি ছিল—ওখান থেকে ওখানে গেছি, ওখান থেকে সেখানে গেছি। ঘুরেফিরে বেড়াতে হয়েছে তো সবসময়। সেই সময় অনেককিছু নষ্ট হয়ে গেছে। পানিতে ভিজে নষ্ট হয়ে। তারপরে কোথাও ধাক্কা খেয়েছে, ঠাক্কা খেয়ে প্লেট নেগেটিভ অনেক ভেঙে গেছে। এইরকম সব কাণ্ড হয়েছে।

* মামুন :এজন্য আপনার দুঃখ হয় না। এত কষ্ট করে ছবিগুলি.....

* ড্যাডি :না দুঃখ হয় না। এই যে হাজার হাজার ছবি তুলেছি, আমি যখন প্রচার করি না, আমি যখন ফটো তুলে বাইরে দেখাই না, গেল তো গেল। তো কী হলো! আমার যদি কোনো সাধ থাকত যে এক্সিবিশন করব, এগুলো কনটেস্ট করব, এগুলো আমার লোক দেখুক, তাহলে পরে মনে লাগত—আমার ক্ষতি হয়ে গেল। কিন্তু আমার তো পড়েই আছে পড়েই আছে। কোনটা ভাঙছে, কোনটা খারাপ হচ্ছে কোনো খেয়ালই নেই (হাসি)।

* মামুন :আপনার কোনো অনুশোচনা নেই?

* ড্যাডি :না, কোনো দুঃখ নেই। যেটা আছে থাক, ঠিক আছে।

* মামুন :বাংলাদেশের কোনো ব্যক্তি যদি আপনার ছবি প্রিজার্ভ করতে চায়, আপনি রাজি হবেন?

* ড্যাডি :নিয়ে গেছে তো।

* মামুন :কে কে নিয়েছে?

* ড্যাডি :নিয়ে গেছে তো। ওই চিটাগাং ফটোগ্রাফিক সোসাইটি, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ফটোগ্রাফি সোসাইটি নিয়েছে। তারপরে সিনেসিক নিয়েছে।

* মামুন :ওরা কি নেগেটিভ নিয়েছে?

* ড্যাডি :হ্যাঁ। ফেরতও দিয়েছে। এক-দুজনের কাছে ফেরত পাইনি। আর সকলেই ফেরত দিয়ে যায়। আনোয়ার হোসেন নিয়ে গেল ‘ল্যান্ড অ্যান্ড পিপল’ বলে যেটা গভমেন্ট থেকে বেরুলো, আনোয়ার হোসেন এডিটর ছিল। আরও কোথায় কী করেছে জানি না। ও নেগেটিভ নিয়ে ফেরত দিয়েছে আমাকে। ওই একটা নিউজ লেটার বার করেছে ‘আয়নাটা নিয়ে মেয়ে বসে আছে’, ওটা আমারই ছবি তো।

* মামুন :এই যে কাভারের। গত সংখ্যার প্রচ্ছদে?

* ড্যাডি :হ্যাঁ, এই যে। এইটা এইটা।

* মামুন :এই যে বিপিএস নিউজ লেটার বৈশাখ ১৩৯৫, এই ছবিটা আপনি কখন তোলেন?

* ড্যাডি :এইটা ঢাকায়, এইখানে তোলা। এই বাসায় তোলা।

* মামুন :এইটা কীভাবে তুললেন, এই যে আয়নার মধ্যে কালো ব্যাকগ্রাউন্ড একটা মেয়ের মুখ, কীভাবে তুললেন?

* ড্যাডি :এটা আসলে মেয়ের একটা ছবি ছিল। ওই ছবিটা এনলার্জ করা হয়। খালি ফেসটা ঠিক করলাম। করে আমি একটা পিজবোর্ডের আয়না বানালাম। এই যে ফ্রেমটা, এইটা পিজবোর্ডের। মুখের ছবিটা পিজবোর্ডের ফ্রেমে রেখে ছবি তুললাম। তারপর বড় সাইজ করলাম।

* মামুন :অরিজিন্যাল ছবিটা এখন আছে?

* ড্যাডি :থাকতে পারে। মনে থাকে না তো কোনো কথা। এটা হয়ে গেল বোধহয় কুঁড়ি বছর বাইশ বছর প্রায়। পাকিস্তান আমলে।

* মামুন :আপনি ছবি তোলেন, তারপরে কি নিজে ডেভেলপ করেন?

* ড্যাডি :নিজেই করি। আমি কিন্তু বাইরে দিই না। নিজে সব করি।

* মামুন :কোনো স্টুডিওতে দেন না?

* ড্যাডি :নিজে প্রিন্ট করি।

* মামুন :তাহলে কি বলতে পারি স্টুডিওতে ডেভেলপ করা, প্রিন্ট করা, আপনি পছন্দ করেন না?

* ড্যাডি :খুব কম। নেহায়েত হয়তো আমার অসুখ হয়েছে, চলতে পারছি না, তাড়াতাড়ি কাজ দরকার তখন স্টুডিওতে দেই।

* মামুন :এই বয়সে এখনও আপনি এনলার্জারে ছবি প্রিন্ট করেন?

* ড্যাডি :এখনও মাঝে মাঝে করি।

* মামুন :চোখে অসুবিধা হয় না?

* ড্যাডি :নাহ, বেশি অসুবিধা হয় না। এই সেদিনও প্রিন্ট করেছি।

* মামুন :একদিন দেখব আপনি কীভাবে প্রিন্ট করেন।

* ড্যাডি :(হাসি) সেই সময় দেখবে?

* মামুন :সেই সময় আমি আপনার ছবি তুলব। এই রুমের মধ্যে করেন?

* ড্যাডি :এই তো এই রুমের মধ্যে করি। সব বন্ধ করে দেই।

* মামুন :ড্যাডি, আপনার মতো কিন্তু এক্সজাকটলি আমারও একই অবস্থা। আমার কোনো ডার্করুম নাই। আাামর এনলার্জার মেশিন একজায়গায় রেখে তারপর জানালার কাচ কাপড় দিয়ে বন্ধ করি, তারপর কাজ করি বহু কষ্টে। রাত্রি এগারটার পর সবাই যখন ঘুমিয়ে যায়, আমি কাজ শুরু করি শোবার ঘরেই। ডিস খাটের নিচে রাখি।

* ড্যাডি :তুমি নিজে কর না বাইরে দাও?

* মামুন :আমি স্টুডিওতে সাধারণত সাদা-কালো ফিল্ম বা প্রিন্ট করতে দেই না। নিজে করার চেষ্টা করি। অন্তত নেগেটিভটা নিজের হাতে ডেভেলপ করে ভালোমতো ওয়াশ করি।

* ড্যাডি :ওটার ওয়াশিংটাই আসল। নিজে করতে পারলে সবচাইতে ভালো।

* মামুন :ছিয়াত্তর বছরের ফটোগ্রাফি জীবনে আপনি কয়টা ভালো ছবি তুলেছেন?

* ড্যাডি :খুব কম। ভালো ছবি খুব কম। এই দুই-চারটা।

* মামুন :সেরকম দু-চারটা ছবির বর্ণনা দেন।

* ড্যাডি :(হাসি) দু-চারটা ছবিই তো আছেই। ছবি তো তুলেছি অনেক, কিন্তু মনের মতো ছবির সংখ্যা খুবই কম।

* মামুন :দু-একটা ছবির কথা বলেন।

* ড্যাডি :মনে নেই তো কিছু। তবে মনে আছে এইটুকু যে, বেশ ভালোই লেগেছে।

* মামুন :ছবি তুলতে গিয়ে বাধার সম্মুখীন হয়েছেন কোথাও?

* ড্যাডি :বাধা, বাধা কী রকম পেয়েছি, আমি তো জানি না। একাত্তরের যুদ্ধের সময় সংসদ ভবনের ছবি তুলতে গেছি, সেখানে ছবি তোলা নিষেধ। ছোট ক্যামেরা কোডাকের। ওখানে গিয়ে ছবি তোলা দেখে দুজন পাকিস্তান আর্মি আমাকে জানাল এখানে ছবি তোলা নিষেধ। তারপর বলল, আপনি ছবি তুলেছেন? আমি বললাম, গাছের ছবি তুলতে যাচ্ছিলাম, তুলিনি। ক্যামেরাটা আমার হাত থেকে নিল। তারপরে হয়তো আমার বয়স দেখে দিয়ে দিল। বলল, অন্য লোক হলে আমরা ছাড়তাম না (হাসি)। কী মনে করে আমাকে ছেড়ে দিল।

আরেকবার চট্টগ্রামে, পাকিস্তান হবার পরপর, আর্মিরা কুচকাওয়াজ করছিল। আমি তাদের কাছে গিয়ে ছবি তুলতে ক্যামেরা ফোকাস করতেই একজন দৌড়ে এসে আমাকে নিয়ে গেল একজন মেজরের কাছে। সে বলল, এখানে তো ছবি তোলা নিষেধ। আপনি কী করেন। যখন বললাম সাব-রেজিস্ট্রারের চাকরি করতাম, তখন ছেড়ে দিল।

* মামুন :মশা, মশা।

* ড্যাডি :এগুলো যে কী করব! পাকিস্তান আমলের একটা ঘটনা বলছি...

* মামুন :কোন বছরের ঘটনা?

* ড্যাডি :স্বাধীনতার দু-এক বছর আগে সেইসময় কাদের সাহেব নামে এক ভদ্রলোক ছিলেন অ্যাডভোকেট। দিলরুবা বলে একখান বই বের করেছিল। ম্যাগাজিন দিলরুবা। মাসিক পত্রিকা।

* মামুন :কবি আবদুল কাদির?

* ড্যাডি :হ্যাঁ, বোধহয়। ওর ওয়াইফের নাম ছিল দিলরুবা। ওয়াইফের নামে ম্যাগাজিন বার করলেন দিলরুবা, ওর নাম। আমার সাথে যথেষ্ট আলাপ ছিল। ইন্দিরা রোডে থাকতেন। অ্যাডভোকেট।

* মামুন :তাহলে অন্য কেউ। কবি না।

* ড্যাডি :মণিপুরী পাড়ায় থাকতেন। কবি না, অ্যাডভোকেট। উনি একদিন আমার কাছে আসলেন। কাসেম সাহেব চিফ মিনিস্টার সাহেবের কয়েকটা ছবি তুলতে হবে। আমি বললাম, আর কোনো প্রফেশনার ভালো লোক পেলেন না, কোনো ভালো লোককে নিয়ে যান। বলল, উনি বলেছেন প্রফেশনাল স্টুডিওতে যাবেন না। আমি আপনার কথা বলেছি, আপনি আমার বন্ধু মানুষ। তারপরে উনি বলেছেন, ঠিক আছে তাকে নিয়ে আসুন। আমার যখন অবসর হবে আমি ছবি তুলব। ডেট ঠিক হয়ে আছে, সেই ডেটে অমুক সময়ে গিয়ে আপনি ছবি তুলে আসবেন। আমি আপনাকে সাথে করে নিয়ে যাব। আমি বললাম, আচ্ছা, ঠিক আছে। তো নির্ধারিত ডেটে আমার ক্যামেরা নিলাম, রোলফিল্ম ক্যামেরা। ক্যামেরাটার মজা আছে। ক্যামেরাটা আমাকে প্রেজেন্ট করেছিল। আগফা-র ফটো কম্পিটিশন হয়েছিল সেই  পাকিস্তান আমলে, সেই সময়তে কম্পিটিশনে আমি এই ছবিটা দিয়েছিলাম—আমার ভাগ্নি কাপড় কাচছে। সেই ছবিটায় আমি ফার্স্ট হয়েছিলাম।

* মামুন :এটা কি সারা পাকিস্তানে কনটেস্ট হয়েছিল?

* ড্যাডি :সারা পাকিস্তানে, হ্যাঁ। আগফা-র কম্পিটিশন।

* মামুন :একটু আগে বললেন আপনি কোনো কম্পিটিশনে ছবি দেন না।

* ড্যাডি :খুব কম। ওই একটাই আমি ছবি দিয়েছিলাম। তারপরে তো ওই ক্যামেরা নিয়ে ফিল্ম নিয়ে আমি গেলাম। গিয়ে চিফ মিনিস্টার সাহেবের কয়েকখানা ছবি তুলে নিয়ে আমি বাড়ি চলে এলাম। চিফ মিনিস্টার সাহেবের ছবি, খুব সাবধানে—এই আমার ডার্করুম ছিল। ছোট্ট ঘরটা। চিফ মিনিস্টারের ছবি যদি খারাপ হয় মুশকিলে পড়ে যাব। সব ঠিক করে সন্ধ্যার পরে ডার্করুমে ঢুকলাম। একদম ডার্ক, প্যানকরমেটিক ফিল্ম। ফিল্মটা খুলে নিয়ে ওখন ওয়াশিংয়ে দিলাম। তারপর ডেভেলপ করে ওয়াশিং করে ফিক্সিং সলিউশনে দিলাম। দুই মিনিট পরে সাদা লাইটটা দিলাম দেখবার জন্য কী হচ্ছে। সাদা লাইট যখন জ্বালালাম আমার সমস্ত গা থরথর করে কাঁপতে লাগল। তার কারণ হচ্ছে ফিল্মটায় কিছু নেই সাদা। পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে। ভাবলাম, এ কী ব্যাপার! আন্ডার এক্সপোজার বা ওভার এক্সপোজার হলে বুঝতাম, কিছু না। ছবিই নাই। কী ব্যাপার হলো! খালি বুকে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম চুপ করে। তারপরে একটুখানি যখন স্থির হলাম, তখন কেমিক্যালের ডিমগুলো দেখলাম। এখন হয়েছে কি, অন্ধকারে আমি যখন কাজ করি, তখন হয়েছে কি একটা ডিস ধাক্কা লেগে সরে গিয়েছিল। আমি সেই সময়ে টেনে আবার ঠিক করেছিলাম। আসলে যখন টেনেছি ভুল ডিসটা টেনেছি। ফল হয়েছে, ফিল্মটা ফার্স্ট ফিক্স হয়েছে। তার ফলে হয়েছে কি সমস্ত ছবি পরিষ্কার সাদা। মনে বড় আঘাত লাগল। পরে আমি কাদের সাহেবকে বললাম, ভাই এই অবস্থা... আমি আরেকবার গিয়ে ছবি তুলে দেব।

* মামুন :শুরুর দিকটা জানতে চাই ড্যাডি। আপনার জন্মের পর তো মা মারা গেলেন। হিমালয়ের পাদদেশে প্রতিকূল আবহাওয়ায়...

* ড্যাডি :আমি তো জন্ম নিলাম। তাকে আর কোথায় নিয়ে যাবে। ওই জলপাইগুড়িতে তার কবর হয়েছে। জলপাইগুড়ি ডিস্ট্রিক্টের কোন জায়গায় কবরটা আমি ঠিক বলতে পারব না। আর আমাকে কেউ গল্প করেনি। আমিও ফাদারকে জিজ্ঞাসা করিনি কোনোদিন। ফাদারকে আমরা খুব ভয় করতাম। ফাদারের সাথে কথাবার্তা খুব কম করতাম। উনি লোক ছিলেন খুব ভালো। কিন্তু আমার খুব ভয় করত।

* মামুন :আপনার পরিবার সম্পর্কে কেউ কিছু জানে না।

* ড্যাডি :এটা বলছি। আমরা ভাই ছিলাম তিন ভাই। তিন ভাইয়ের মধ্যে বড় উনিও পুলিশ ইন্সপেক্টর ছিলেন। আমার বড় ভাইয়ের নাম ছিল গোলাম কাদের। তিনি বোধহয় সাতচল্লিশ-আটচল্লিশ বয়সে অসুখে মারা যান। হাওড়াতেই মারা যান। উনি আমাকে ফটোগ্রাফিতে অনেক সাহায্য করতেন। পয়সাকড়ি দিয়ে নানারকম সাহায্য করতেন। তারপরে আমি এবং আমার পরে ছোট। ওকেও শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় পাকিস্তান আর্মি গুলি করে মেরে ফেলল। আর আমরা পাঁচ বোন। বড় বোন মারা গেছেন। এখন আমরা চার বোন আছি। চার বোনের মধ্যে তিন বোন এখানে আছি। আর সেজোজন কলকাতাতেই আছে, ও আসেনি। আমরা তিন ভাই এবং পাঁচ বোন, সব শুদ্ধ আট। সবার ছেলেপুলেরা আছে। আমার বড় ভাইয়ের নাম গোলাম হোসেন, আমি গোলাম কাসেম আর ও হলো গোলাম হোসাইন। এই তিন ভাই। বড় বোন রাবেয়া খাতুন, মেজো বোনের নাম রাশিদা খাতুন, তারপরে হলো রাজিয়া খাতুন, ফয়জুন্নেছা খাতুন এবং সবশেষে সাইজন্নেছা খাতুন। আমাকে সবাই বলত আল্লারাখা। ওই থেকে ছোট বোন আমাকে বলত রাকু। রাকু আমার ডাকনাম (হাসি)।

* মামুন :আপনি প্রথম নিজের ছবি তুলেছিলেন কবে মনে আছে?

* ড্যাডি :ওই আমার ক্যামেরাতেই, এনসাইন বক্স ক্যামেরায় আমার কোনো বন্ধু দুই-একটা তুলেছিল। ১৯১২ সালে তুলেছিল, খুব বেশি না, দু-একটা ছবি।  তারপরে আমার নিজের ছবি খুব বেশি নেই। যা ছিল এখন সব নষ্ট হয়ে গেছে। নেগেটিভ প্রথম দিককার নেই।

* মামুন :ছাত্রজীবনে কী পোশাক পরতেন?

* ড্যাডি :কলকাতায় থাকতাম, যখন স্কুলে পড়তাম, কলেজে পড়তাম, ধুতি ছিল তখন। ধুতি-কামিজ-শার্ট আর শীতের সময় কোট পরতাম। তারপর শেষের দিকটায় যখন কলেজ যেতাম, তখন প্যান্ট থাকত। জামা থাকত। কখনও কখনও পাজামা থাকত।

* মামুন :কেমন ছাত্র ছিলেন আপনি?

* ড্যাডি :ম্যাট্রিক পাস করি ফার্স্ট ডিভিশনে। ইন্টারমিডিয়েট পাস করি সেকেন্ড ডিভিশনে। আর পড়তে পারিনি অসুখের জন্য। ফাদার বললেন বয়স বেড়ে গেলে গভমেন্ট চাকরিতে আর ঢুকতে পারব না। পঁচিশ বছরে চাকরি নিলাম। ঘরে আমি পড়াশুনা করেছি। বইটই পড়াশুনায় আমার খুব ঝোঁক।

* মামুন :ড্যাডি, ছোটবেলার কথা মনে আছে?

* ড্যাডি :পাঁচ-ছয় বছর পর্যন্ত মালদহ ছিলাম। ফাদার সেখানে চাকরি করতেন। না আরও বেশি। ওখানে প্রায় দশ বছর ছিলাম।

* মামুন :আপনার সত্ মা আপন মায়ের জায়গাটা পুরোপুরি পূরণ করতে পেরেছিল?

* ড্যাডি :সেটা বুঝতাম না। আমার যে মা ছিল, তাকেই আপন মা মনে করতাম। মায়ের অভাব মনে হতো না। বড় হয়ে মনে হতো। মা কেমন ছিল, দেখতে

কী রকম, এসব মনে হতো। বড় হয়ে দুঃখ পেয়েছি—মা যদি দেখতাম। ছেলেবেলায় ওসব মনে হতো না কিছু। ফাদারের সঙ্গে বেশি কথাই বলতাম না। কাছেই যেতাম না বেশি। ভয় লাগত। ফাদার খুব লম্বা ছিলেন। ছ’ফুটের মতো লম্বা। তাকে দেখেই ভয় লাগত। আমি সবচেয়ে ছোট। আর সবাই লম্বা। ফাদার মারা গেলেন সম্ভবত নাইন্টিন ফরটি। হাওড়াতে একটা মসজিদ ছিল, ওই মসজিদের খুব বড় একটা জায়গা ছিল ওখানে তার কবর। আরও আত্মীয়স্বজনের কবর আছে ওখানে।

* মামুন :আপনার প্রথম ছবি তোলার অভিজ্ঞতার কথা আমাদের ফটোগ্রাফির ইতিহাসে প্রয়োজনে জানা দরকার।

* ড্যাডি :এসসাইন ক্যামেরা দিয়ে বন্ধু, তার বোনেরও একটা ছবি তোলা হয়েছিল। অত আগেকার কথা সব মনে করতে পারছি না। আমার স্মৃতি আগের মতো আর নেই। প্রথমে বাড়িতেই ছবি তুলেছি। ক্যামেরা নিয়ে বাইরে বেরোতে ভয় হয়েছিল। ভয় মানে একটু সংকোচ। তারপর আস্তে আস্তে সেটা কেটে যায়। সঠিক আমার প্রথম ছবিটা কী ছিল... কী ছিল... অ্যা অ্যা...। ওই বন্ধুর ছবিই ছিল।

* মামুন :তার পরের ছবি তোলার কথা মনে করতে পারেন?

* ড্যাডি :প্রথম যখন গোড়ার দিকে ছবি তুলি, তখন ফোল্ডিং ফিল্ম ক্যামেরা, আগফা কোম্পানির ক্যামেরা ছিল। ওটা বক্স ক্যামেরার মতো কাজ করত। ওটায় ছবি তুললাম কিছুদিন। সিঙ্গেল লেন্স সিম্পল সাটার। ওয়ান টোয়েন্টিফিফথ পর্যন্ত এক্সপোজার দিত আর আরেকটা ওয়ান ফিফটি হয়তো দিত—যাই হোক, অনেক সিম্পল ক্যামেরা। তো একদিন ওই ফিল্মটাকে শেষ করলাম। কলকাতায় ঘুরে ঘুরে রাস্তার ফটো, ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের ফটো, ক্যালকাটা মনুমেন্টের ফটো,  চৌরঙ্গির রাস্তাঘাটের ছবি, চিড়িয়াখানা এসবের কিছু কিছু ছবি তুলেছিলাম।

ওরকম ছবি কতগুলো নিয়ে ফিল্মটা শেষ করার পরে আমি আগফাদের ওখানে নিয়ে গেলাম। সব বিদেশি লোক। বেশিরভাগ বিদেশি, দেশি লোক খুব কমই কাজ করে। তাদের ওখানে গিয়ে একটা কাণ্ড দেখে আমি খুব আশ্চর্য হলাম যে, ওই  ফিল্মটা কী ফিল্ম প্রত্যেক ছবিতে কী রকম সময় এক্সপোজার দিয়েছি, আলো-ছায়ার কী অবস্থা, সে ডেভেলপ করে সবকিছু বলে দিল। আমি তাকে কিছু বলিনি। যখন ডেভেলপ হয়ে গেল, সে আমাকে বলল। জার্মান সাহেব। সে আমাকে বলল, ইজ দিস ইওর ক্যামেরা। এই ক্যামেরা আপনার। আপনি এই সময়ে ছবি তুলেছেন। এতটার সময় ছবি তুলেছেন। আরেকটা নেগেটিভ নিয়ে... এটা এতটার সময় তুলেছেন। আমি একেবারে হা হয়ে গেলাম। লোকটা ম্যাজিক জানে নাকি? বলে, নটা অ্যা ম্যাজিক। ফিল্ম দেখে আমি সব বলে দিতে পারি। এটা ফিক্স ক্যামেরা, এতে বেশি সাটার-ফাটার নেই। ওই একটাই সাটার। তো আমি, ছবি যা হয়েছে লাইট দেখে আমি বলে দিতে পারি ক’টার সময় ছবি তোলা হয়েছে। সকালে বা বিকালে ক’টার সময় ছবি তোলা হয়েছে এসব আমি বুঝতে পারি। এই বলে সব বলল। তারপর কোন কোন ফিল্টার তুমি ইউজ করেছ... ইয়েলো ফিল্টার তুমি ইউজ করেছ সেটা বলতে পারি। কারণ আজকাল প্যানকরমেটিক ফিল্ম পাওয়া  যায়। তখন ছিল অর্ডিনারি ফিল্ম। ডেফথ টেফথ কিছু আসত না। ইয়েলো ফিল্টার ইউজ করতে হতো (হাসি)। তারপর সে বলল, হোয়েন ইউ লার্ন ফটোগ্রাফি হাউ উইল আন্ডারস্ট্যান্ড এভরিথিং। নাও ইউ ওন্ট আন্ডারস্ট্যান্ড এনিথিং ইট সিমস টু ইউ সামথিং লাইক ম্যাজিক। সাহেবটা... মনে আছে ওর কথাগুলো।

তো এই জীবনে অনেকের সঙ্গে... সেদিন ডেভেলপ করতে যেয়ে ওদের একটা জিনিস আমি লক্ষ করেছি, বিদেশিরা তারা যত সিনসিয়ারলি আমাকে হেল্প করেছে, আমার নেটিভ ভাইরা তা করেনি। তাদের সবসময় একটা হিংসে ভাব। ও শিখে যাবে একটা স্টুডিও খুলবে, আমার ভাত মারবে। ওই যে বললাম, এলাম ইউজ করতে হবে গরমের সময়, ‘স্মিথ সায়েন্টিফিক কোম্পানি’ ওদের ওখানে জানলাম। ধর্মতলা স্ট্রিটে তিন চারটি দোকানে কেউ বলেনি।

* মামুন :ওই সময় স্টুডিওগুলোর সঙ্গে কেমন খাতির ছিল আপনার?

* ড্যাডি :বাইরে থেকে দোকান দেখেছি। স্টুডিওর ভেতরে বেশি ঢুকিনি। এডনার কাছে গিয়েছি আমি। ও আমাকে ডেকে নিয়ে গেছে। ইউ আর স্টিল ভেরি ইয়াং, বাট ইউ আর টেকিং ইন্টারেস্টড ইন ফটোগ্রাফি, সে বলত। আমি তোমাকে দু-একটা কথা বলতে চাই। ও আমাকে দেখিয়েছিল ‘হফটোন অ্যান্ড বুচার’ প্রকাণ্ড ক্যামেরা। এনলার্জিং ক্যামেরা, প্রকাণ্ড ক্যামেরা। আর এনলার্জ হতো মস্ত বড়। পোস্টার সাইজ এনলার্জ হতো। সিক্স ফিট বাই এইট ফিট এই ফিট বাই টেন ফিট—সাংঘাতিক অবস্থা। মস্তবড় ঘরে এটা রাখা ছিল। ওসব দেখিয়েছিল, দিস ইস দ্য এনলার্জার, দিস ইজ দ্য ইজেল। এত বড় লেন্স (হাসি)। ওর কাছে থেকে আমি মস্ত ইন্সপিরেশন বা অনুপ্রেরণা পেয়েছি আমি এডনার কাছ থেকে।

তারপর ঢাকায় এসে সিনিয়র জায়দি, পুরনো জায়দি আগেকার ও আমাকে এনকারেজ করত। জায়দিদের কাছ থেকে আমি খুব এনকারেজমেন্ট পেয়েছি।

* মামুন :মহাত্মা গান্ধীকে সামনাসামনি দেখেছিলেন কয়েকবার, কিন্তু ছবি তোলেন নাই কেন?

* ড্যাডি :কলকাতাতেই দেখেছি কয়েকবার। মাহাত্মা গান্ধী বিরাট পুরুষ ছিলেন। দুনিয়ার বিখ্যাত লোক, ফকিরের মতো। আধা ন্যাংটা। শীতের সময়ও খালি গায় থাকত। লন্ডনে গিয়ে একটা চাদর গায়ে দিত (হাসি)। কখনও স্যান্ডেল পায়ে দিত। এই পর্যন্ত ধুতি। একটা ঘড়ি থাকত। ঘড়ি খুব ব্যবহার করত। সময়মতো কাজ করা, সময়মতো খাওয়া... এইসবের জন্য ঘড়ি ছিল। ঘড়িটা একবার চুরি হয়েছিল। মহাত্মা গান্ধী—বেচারাকে মেরে ফেলল খামাখাই। তিনি লেকচার দিচ্ছেন, আমি বার ফিট চৌদ্দ ফিটের মধ্যে কয়েকবার ছিলাম, কেন যেন ছবি তোলা হয়নি।

* মামুন :এতকিছু হয়ে যাচ্ছে আপনার সামনে, ইতিহাসকে ধরতে পারলেন না কেন?

* ড্যাডি :চাইলে নিশ্চয় পারতেন। কিন্তু আমার সেদিকে ঝোঁক ছিল না। আমি সুন্দর দৃশ্যের ছবি তুলতাম। আমার বিশেষ কোনো অ্যামবিশন ছিল না। তবে ফটোগ্রাফিতে হাতখড়ি হওয়ার পর থেকে এটার দিকে ঝোঁক ছিল যে এটাকে ভালো করে শিখতে হবে। অ্যামবিশন যদি বলা যায় এইটাই। ফাদার খুব ডিজঅ্যাপয়েন্টেড হয়েছিলেন। তার ইচ্ছা ছিল যে তারচেয়ে আমরা বড় হব। উনি রিটায়ার করেছিলেন অ্যাজ অ্যা পুলিশ সুপারিনটেনডেন্ট ওখানকার। ক্যালকাটা আইজিতে ছিলেন উনি। যখন নাকি স্বদেশি আন্দোলন হচ্ছিল ওখানে বলেছিলেন, তোমাকে মেরে ফেলব আমরা। এর থেকে হার্টের অসুখ হয়ে গেল। সে দুঃখ পেয়েছিলেন। যা আশা করেছিলেন, ছেলেরা তা হয়নি।

* মামুন :ভারত বিভাগের আগে এত আন্দোলন দেখেও আপনার রাজনীতি করতে ইচ্ছে হয়নি?

* ড্যাডি :না, আমি কখনো রাজনীতির ব্যাপারে যেতাম না। কেননা এসব ভালো লাগত না। আমার মনে হতো রাজনীতির ব্যাপারটাই একটা ডার্টি জিনিস, খারাপ জিনিস। ওটায় থাকলেই চুরি চর্চা, মিথ্যে কথা বলা এসব করতে হতো। এসবে আমি থাকতাম না। কখনই অংশগ্রহণ করতাম না। আমার অনেক বন্ধুবান্ধবরা রাজনীতিতে অংশ নিত, আমি থাকতাম না। মহাত্মা গান্ধী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মওলানা মোহাম্মদ আলীকে দেখেছি। নেতাজী সুভাষ বসুকে দেখেছি। কলকাতায় সবাইকে দেখেছি। হা, সরোজীনি নাইডু, তাকে দেখেছি। উনি ইংলিশ খুব ভালো জানতেন। আবার উনি কবি। পোয়েট ছিলেন তিনি। বাংলা বক্তৃতা দিতে পারতেন না। কিন্তু ওর ইংরেজি এত ভালো লাগত আমার। ওর পায়ের তলায় গিয়ে বসে থাকতাম।

* মামুন :রাজনীতির প্রতি অনীহা কেন?

* ড্যাডি :মানুষ নিজেকে হত্যা করছে। মানুষ নিজেকে মারছে—এ কী রকম! খোদা তো আমাদের পাঠিয়েছে সুখে শান্তিতে থাকবার জন্য। তা কোনো কিছুই করছি না। খালি মারপিট। এতে নিজেরা ধ্বংস হচ্ছি, কী কাজ হচ্ছে। এই যে বর্তমান সিচুয়েশন, এটা আমার ভাল্লাগে না। আধুনিক সভ্যতা, কোথায় মানুষের সুখ হয়েছে। কিচ্ছু হয়নি। ভাল্লাগে না আমার ওগুলো। আমার মনে খুব কষ্ট হয় এসব দেখে। এজন্য আমি রাজনীতি পছন্দ করি না। আমার ফটোগ্রাফিটা খুব ভালো লাগে। আর্ট ফটোগ্রাফিটা আরও ভাল্লাগে। একটা সৌন্দর্য থাকবে, মানুষের আকর্ষণ থাকবে। মানুষের মন খুশি হবে। এইরকম একটা ছবি খুব ভালো।

* মামুন :আর কী ধরনের ছবি ভালো লাগে আপনার?

* ড্যাডি :বললাম আর্ট, ফটোগ্রাফি। ন্যাচারাল ছবি খুব ভালো একটা আকর্ষণ আছে, এমনি ছবি ভালো লাগে। আমার খুব ভালো লাগে তোমার পোর্ট্রেটগুলো। তুমি ল্যান্ডস্কেপ তোলো না কখনও?

* মামুন :আমি ল্যান্ডস্কেপ করি না কখনও। আমার সবই সেলিব্রেটি পোর্ট্রেট। বিভিন্ন ক্ষেত্রের যারা বিখ্যাত লোক, শুধু এদের পোর্ট্রেট করি আমি।

* ড্যাডি :এই পোর্ট্রেট তুমি ক্যামেরা হাতে পাবার পর করছ। নাকি আগে কখনও তুলতে?

* মামুন :না না, আমি আগেও কখনও ল্যান্ডস্কেপ করিনি। আমি যখন ফটোগ্রাফি শিখতে শুরু করি, তখন থেকে পোর্ট্রেট করি বিখ্যাত মানুষদের, বাহাত্তর সাল থেকে। এরমধ্যে অনেকে মারা গেছেন, প্রত্যেকের ছবি আমি ধরে রেখেছি।

* ড্যাডি :এটা একটা মস্ত কাজ।

* মামুন :যারা বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিখ্যাত লোক, তাদের সম্পর্কে আমার একটা সাংঘাতিক শ্রদ্ধা এবং সফট কর্নার আছে। নয়তো ঘণ্টার পর ঘণ্টা আপনার সামনে আমি বসে থাকতে পারতাম না। এই যে আপনে একজন বৃদ্ধ লোক, আপনাকে শ্রদ্ধা করব, আপনের কাছ থেকে আমি কিছু নিব এবং এই যে নিলাম এত টাকা খরচ করলাম ক্যাসেটের তো অনেক দাম। একটা দুইটা ক্যাসেটে হবে না। চার-পাঁচটা ক্যাসেট দরকার। এইগুলো তো আমার নিজের জন্য না। আমার কাছ থেকে নিয়ে অনেকে...

* ড্যাডি :বহু লোক। হ্যাঁ নিশ্চয়ই।

* মামুন :এগুলি নিয়ে... এই যে আপনার আজকে, ৭ জুলাই ১৯৮৮ সালের আপনার কথা টেপ করলাম আমি, একদিন আমাদের দেশে গবেষণা হবে। ফটোগ্রাফির উপরে পিএইচডি করবে। তখন আপনার এইসব জীবনী, আপনার তথ্য কাজে লাগবে।

* ড্যাডি :আমি তো এটা করিনি। এটা আমার হয়ে তুমি করলে।

* মামুন :আপনি হলেন এই দেশে বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে প্রথম পাইওনিয়ার।

* ড্যাডি :এইটা ঠিক, এটা ঠিক...

* মামুন :এই ক্ষেত্রে আপনি পাইওনিয়ার। কাজেই আপনাকে আমাদের দাম দিতে হবে এবং আপনি যা জানেন, আপনার কাছ থেকে নিতে হবে। এবং সেগুলো রেকর্ডেড থাকতে হবে। তাহলে পরের জেনারেশনরা জানবে। কারণ আপনি ফট করে মরে গেলে আপনি কী করেছেন কোথায় কোন সনে এগুলি যদি আমরা ধরে না রাখি, যাঁরা আপনাকে চিনি আমরা পরের জেনারেশন যারা আসছে ফটোগ্রাফিতে তারা কিছু জানবে না। আমাদের কিন্তু দোষারোপ করবে।

* ড্যাডি :না কাজে আসবে। জিনিসটা কাজে আসবে।

* মামুন :খুবই কাজে আসবে।

* ড্যাডি :তাদের শিক্ষা হবে। অনুপ্রেরণা পাবে।

* মামুন :আপনি এখন ছিয়ানব্বই বছরের একজন গ্র্যান্ড ওল্ডম্যান। আপনার কাছ থেকে অনেক কিছু শেখার আছে এই সমাজের এই দেশের, এই দেশে যারা সংস্কৃতি করে ফটোগ্রাফি করে সবার। আপনি যে কথাগুলো বললেন, এগুলো সাংঘাতিক মূল্যবান। এগুলি একদিন আমাদের দেশের ইতিহাসের বিষয়বস্তু হয়ে থাকবে। আমি কালকে এসে আপনার সাথে আবার আরও কিছু কথা বলব।

* ড্যাডি :ধর আমার থেকে যদি কিছু উপকার হয় সমাজের আমিও খুব খুশি হব নিশ্চয়ই। কেননা মানুষের জীবনে মানুষ কী করতে আসে। এসব যদি না করে মানুষ তাহলে তো জন্তুর মতো জানোয়ারদের মতো। আল্লাহতায়ালা বুদ্ধি দিয়েছে আমাদের, সেটার সদ্ব্যবহার করা দরকার। না তুমি করছ এটা, আমি তোমার কথা ভাবি অনেক সময়।

* মামুন :আর ড্যাডি, ভবিষ্যতে আমার একটা ইচ্ছা আছে কি আমাদের দেশের যারা ন্যাশনাল ফিগার, বিভিন্ন ক্ষেত্রের যারা ইম্পর্টেন্ট ফিগার এদের পোর্ট্রেট দিয়ে একটা আর্কাইভ করব আমি। এটা আমার নিজের প্রাইভেট আর্কাইভ হবে। দোয়া করেন আমার জন্য। ওটা ফটোগ্রাফির আর্কাইভ হবে কিন্তু।

আমাদের দেশের যারা ইম্পর্টেন্ট ফিগ্যার ওই আর্কাইভে ওদের পোর্ট্রেট থাকবে এবং তাদের কণ্ঠস্বর টেপ করা ক্যাসেট, তাদের হাতের লেখা থাকবে এবং তাদের ব্যবহার করা সামগ্রীও থাকবে। আর্কাইভটা হবে মূলত ফটোগ্রাফির আর্কাইভ। তো ওই আর্কাইভে আমার ইচ্ছে আছে, আমি দশ-পনের বছর পরে শুরু করব। কাজ এখন আমি করছি। গত ষোল-সতের বছর যাবত আমি কাজ করে যাচ্ছি। সেই আর্কাইভে একটা গ্যালারি অথবা একটা রুম থাকবে, আপনাকে এখনই বলে যাই, আপনি তখন থাকেন বা না থাকেন, আমি চাই আপনি থাকেন দীর্ঘজীবী হন—ওই আর্কাইভে ‘গোলাম কাসেম গ্যালারি’ নামে কোনো রুম বা গ্যালারি থাকবে। সেটাতে শুধু আপনার তোলা ফটোগ্রাফ, আপনার নিজের ছবি আমার তোলা এবং আপনার ব্যবহার করা কিছু সামগ্রী হাতের লেখা ক্যাসেট সেটাতে থাকবে। মানুষ আসলে দেখবে আমাদের দেশের যে একজন পাইওনিয়ার ফটোগ্রাফার ছিল। সে কেমন ছিল, তাঁর ব্যবহার করা জিনিস, তাঁর লেখা—এগুলি আমি রাখব। আমার জন্য একটু দোয়া করবেন এবং সহযোগিতা করবেন।

* ড্যাডি :যাক, দোয়া তো করি। একটা জিনিস, আমার দুঃখ হয়—এখন কনটেস্ট হচ্ছে, এক্সিবিশন হচ্ছে, অনেক অরগানাইজেশন হচ্ছে এবং ফটোগ্রাফাররা ভালো কাজ করছে। বেশ ভালো কথা। একটা কলেজ নেই, স্কুল নেই, ফটোগ্রাফির ভালো কোনো ট্রেনিং সেন্টার নেই। প্রাইভেট সংস্থা যাও আছে, তারা স্টুডেন্টদের অতটা হেলপ করতে পারে না। তা সত্ত্বেও তারা যা করছে দেশে ও বিদেশে অলরেডি সুনাম হয়ে গিয়েছে। বাংলাদেশের দু-একজন ভালো ফটোগ্রাফারের নাম হয়েছে। এই যে আনোয়ার হোসেন, বেগ আছে। কিছু কিছু নাম হচ্ছে। কিন্তু আমার দুঃখ হয় কখন যখন দেখি একটার সঙ্গে আরেকটার বিষয় নিয়ে গণ্ডগোল করে। অর্গানাইজেশনগুলোর মধ্যে সদ্ভাব নেই। আমরা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছি। ফটোগ্রাফির জন্য সরকারি প্রতিষ্ঠান দরকার, খুব দরকার।

* মামুন :ছবি তুলবার সময় মানুষের মুখে আপনি কী দেখেন?

* ড্যাডি :আমি একটা মানুষ। আমার মনে একেক সময় একেকটা ভাব হচ্ছে এবং সেইভাবে আমার চেহারাটা বদলাচ্ছে। আমাদের চেহারা সবসময় ঠিক থাকে না। চেহারা পরিবর্তন হয়। মানুষের মনের যে ভাব যখন যেমন হচ্ছে ঠিক সেইভাবে তৈরি হতে হয় ফটোগ্রাফারকে। আমি মানুষের মুখের পরিবর্তনটা আগে খেয়াল করি। এটা খুবই ইন্টারেস্টিং জিনিস—একটা লোকেরই চেহারা একেক সময় একেক রকম হচ্ছে। কখনও তার দুঃখ এবং কখনও আনন্দ, সবকিছুই সে চেহারায় প্রকাশ করে। ফটোগ্রাফার তার প্রত্যাশা অনুযায়ী চেহারার যেটা দরকার সেই সময়কে ক্যামেরায় ধরে রাখে। আমিও তাই করি।

* মামুন :কী ধরনের আলো আপনি ছবি তুলবার জন্য ব্যবহার করেন?

* ড্যাডি :ডে লাইটটা আমি পছন্দ করি। আমার পোর্ট্রেট করার সময় আমার ইনডোর-আউটডোর সবরকম আলো ভালো লাগে। বেশি ফ্ল্যাশ আমি ভালোবাসি না। প্রাকৃতিক আলো আমার পছন্দ। ডে-লাইটটা আমি বেশি পছন্দ করি। আমার ক্যামেরার অ্যাপারচার খুব বড় হওয়ায় আমি সবসময় অ্যাভেলঅ্যাভেল লাইট ব্যবহার করি।

* মামুন :গত বিশ বছরে ফটোগ্রাফি করার জন্য কী ধরনের ফিল্ম বেশি ব্যবহার করেছেন?

* ড্যাডি :ফিল্ম? ফিল্ম আমি বেশি স্লিডের ব্যবহার করি না। খুব কমও না। এই হান্ড্রেড, হান্ড্রেড টোয়েন্টি এইরকম। কখনও কখনও টুহান্ড্রেড স্লিডের ব্যবহার করি।

* মামুন :ব্ল্যাক-অ্যান্ড-হোয়াইট না কালার—কোনটা বেশি প্রেফার করেন?

* ড্যাডি :আমি কালার একদম ব্যবহার করি না। তার কারণ হচ্ছে—কালারে আসল জিনিসটা আসে না। ব্ল্যাক-অ্যান্ড-হোয়াইটে যেটা আমি পাচ্ছি, কালারে সেটা পাচ্ছি না। কালার তো ফলস হয়। এই যে এই রংটা আছে এটা লাল নয়। কিন্তু কালার ফিল্মে ছবি তুললে এটা লাল হয়ে যাবে। তবে কালার ফটোগ্রাফি কয়েকটা কালার সাবজেক্টের জন্য ভালো। লাল ফুল, হলদে ফুল, বেগুনি ফুল—এটার জন্য ভালো। অনেক কালারের সাবজেক্টের জন্য কালার ফিল্ম ভালো। একটা মেয়ে-ছেলে আছে তার নানা রঙের ড্রেস আছে, এখানে কালার ফিল্ম ভালো। ফর দ্য আর্ট ব্ল্যাক-অ্যান্ড-হোয়াইটই সবচেয়ে ভালো।

* মামুন :এই পর্যন্ত থারটিফাইভ নাকি ওয়ানটোয়েন্টি বেশি তুলেছেন?

* ড্যাডি :থারটিফাইভ বেশি তুলেছি। এটা এখনও চলছে। তবে আরেকটা ক্যামেরা আছে বড়। খরচ বেশি পড়ে যায়।

* মামুন :ওয়ানটোয়েন্টি ফিল্মের রেজাল্ট থার্টিফাইভের চাইতে ভালো।

* ড্যাডি :আগে থারটিফাইভ ক্যামেরা ভালো ছিল না। উন্নত ছিল না। বেশিরভাগ বড় ক্যামেরা ছিল। বড় ক্যামেরার বড় ফিল্মে রেজাল্ট ভালো হয়। থারটিফাইভের লেন্সটা ও ফিল্মটা খুব ভালো হতে হয়। লেন্স ও ফিল্মের কোয়ালিটি ভালো না হলে কোয়ালিটি ছবি পাওয়া যায় না। আজকাল ছোট ফিল্মের যে উন্নতি হয়েছে তাতে আর বড় ফিল্মের ব্যবহার করার দরকার পড়ে না। আমার মনে হয়। সেজন্যে এখনকার স্টুডিওতেও থারটিফাইভ ফিল্ম ব্যবহার করা হয়। এখন থারটিফাইভ থেকে এনলার্জমেন্ট করলে বড় ছবি প্রিন্ট করা যায়। এই হলো কথা।

* মামুন :কতগুলো ধরনের ক্যামেরা আপনি ব্যবহার করেছেন?

* ড্যাডি :এই একশ-দেড়শ হবে।

* মামুন :একশ-দেড়শ ইউজ করেছেন। কিন্তু কয়টা কোম্পানির ক্যামেরা?

* ড্যাডি :আগফা ইউজ করেছি, কোডাকের ইউজ করেছি।

* মামুন :কিন্তু প্রথম ক্যামেরা তো এনসাইন।

* ড্যাডি :তখন এনসাইন ইউজ করেছি। এনসাইন ওই একটিই করেছি। বক্স ক্যামেরা। কারণ এনসাইন বেশি ক্যামেরা বের হয়নি।

* মামুন :এনসাইনের পরে কোডাক।

* ড্যাডি :কোডাক তারপরে। তারপরে আগফা।

* মামুন :এনসাইন তো ব্রিটিশ ক্যামেরা।

* ড্যাডি :হ্যাঁ, এটা ব্রিটিশ। কোডাক আমেরিকার। আগফা ভগল্যান্ডারম রোলি জার্মানির। পুরনো ক্যামেরার মধ্যে জাইস, জাইসের লেন্স খুব ভালো। তারপর লাইকা ইউজ করেছি। রোবট ইউজ করেছি, বাহাত্তরখানা ছবি দিত। এটা খুব ভালো ক্যামেরা, রোবট ক্যামেরা। এটা অটোমেটিক ক্যামেরা। ফিল্মের ক্যামেরার মতো কাকাক, কাকাক করে সাউন্ড দিত (হাসি)। লাইকা কো পাইওনিয়ার থারটিফাইভে...

* মামুন :আপনি কোন বছরে প্রথম লাইকা ব্যবহার করলেন?

* ড্যাডি :লাইকা ব্যবহার করেছি... সেও হয়ে গেল নাইন্টিন হান্ড্রেড অ্যান্ড ফরটি হবে।

* মামুন :মানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়।

* ড্যাডি :হ্যাঁ। সেই সময়। লাইকা...

* মামুন :ফটোগ্রাফির উন্নতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। পৃথিবীর অন্যান্য দেশে অনেক আগেই ফটোগ্রাফি আমাদের চাইতে উন্নতির শিখরে উঠে গিয়েছিল। দেরিতে হলেও আমাদের ফটোগ্রাফির সাফল্য আপনার কেমন লাগে?

* ড্যাডি :আমি তো সবার ড্যাডি। আমার খুব ভালো লাগে। উন্নতি হচ্ছে। আগে তো ফটোগ্রাফির দিকে মানুষের ঝোঁকই ছিল না। না থাকার কারণ, বড় বড় ক্যামেরা... এখন ক্যামেরা ছোট হয়ে গেছে। মানুষের নাগালের মধ্যে চলে এসেছে। সবচে মজার ব্যাপার হচ্ছে অটোমেটিক ক্যামেরা হয়ে গেছে। যারা কখনও ফটো তুলেনি, ফটো তোলা খুব শক্ত জিনিস। শিখতে হবে, না শিখলে ফটো তোলা যায় না। তারা এখন অটোমেটিক ক্যামেরাতে ছবি তুলছে। খুব সুবিধা হয়ে গেছে। এখন তো ঘরে ঘরে ক্যামেরা হয়ে গেছে। থারটিফাইভ মিলিমিটার ক্যামেরার জন্য ফটোগ্রাফির প্রসার হয়েছে। ছেলে-বুড়ো সকলেই ছবি তুলতে পারে।

* মামুন :বড় বড় দেশে ফটোগ্রাফির জন্য আলাদা আর্কাইভ, আলাদা গ্যালারি এবং মিউজিয়াম আছে। যেমন আমেরিকার কোডাক মিউজিয়াম, মিউজিয়াম অব  মর্ডান আর্ট ও ফটোগ্রাফির সেকশন আছে আলাদা এবং সেটা খুব রিচ সেকশন। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ফটোগ্রাফগুলো ওখানে রাখা আছে। আমাদের দেশে ফটোগ্রাফির কোনো আর্কাইভ, মিউজিয়াম বা সংগ্রহশালা হলে আপনি খুশি হতেন না?

* ড্যাডি :হ্যাঁ, খুব খুশি হতাম। কিছু নেই তো এখানে।

* মামুন :আমি সেজন্য কাজ করে যাচ্ছি।

* ড্যাডি :বিদেশে যা দেখি এবং যা শুনি—এই হচ্ছে সেই হচ্ছে, আমাদের দেশে কিছুই নেই, মনটা তখন খুবই খারাপ হয়ে যায়। অন্তত স্কুলটা তো থাকার দরকার ছিল। কিছুই করল না এই দেশে। তাও যে আমাদের ফটোগ্রাফাররা এতটা নাম করতে পারছে, বিদেশেও নাম করছে। এটা তো বাহাদুরি বলতে হবে, মস্ত ক্রেডিট এটা। তো আমাদের দেশে ট্যালেন্ট আছে। যেকোনো কাজে দেয়া যাক ভালো করবে সেটা। এই ট্যালেন্ট যদি সুযোগ পেত আরও ভালো কাজ করতে পারত। এজন্য গভমেন্ট থেকে একটা ইনস্টিটিউট হওয়ার বিশেষ দরকার ছিল। হলে পরে অনেক লোকে শিখত। ফটোগ্রাফির মর্যাদা বাড়ত। গভমেন্ট প্রতিষ্ঠান থেকে যে ডিগ্রিটা পেত, তার সম্মানটা বেশি হতো। প্রাইভেট ইনস্টিটিউট থেকে ডিপ্লোমা দিয়ে বেগ সাহেবের ওখান থেকে দিলে তেমন মর্যাদা হতো না। কিন্তু সরকারি ইনস্টিটিউট থেকে একটা ডিগ্রি বা ডিপ্লোমা পেলে তার দামটা সকলে বেশি দেবে। তাই না? তো এটা হওয়াটা বেশি দরকার ছিল। ফটোগ্রাফির স্ট্যান্ডার্ডটা বাড়ত।

* মামুন :আপনি বেঁচে থাকতে এমন একটা ফটোগ্রাফির প্রতিষ্ঠান দেখে গেলে...

* ড্যাডি :আমি শান্তিতে মরতে পারতাম। আমার মনে খুব আনন্দ হতো তাহলে।

* মামুন :ড্যাডি, আপনি কলকাতা থেকে ঢাকায় আসলেন ১৯৪৮ সালে, নাকি রাজশাহী থেকে?

* ড্যাডি :আমি এসেছি রাজশাহী থেকে। চাকরি জন্য রিটায়ার করলাম তখন এখানে চলে এলাম।

* মামুন :এর আগে বলেছিলেন ফরিদপুর থেকে রিটায়ার করেছেন।

* ড্যাডি :রাজশাহী। নাইন্টিন ফোরটিনাইনে।

* মামুন :এই ৭৩ ইন্দিরা রোডে?

* ড্যাডি :না, ইন্দিরা রোডে এলাম নাইন্টিন ফিফটিওয়ানে। তার আগে দুই বছর মণিপুরী পাড়ায় আমার শাশুড়ির ওখানে ছিলাম। বাড়ি খুঁজছিলাম, তারপরে এই বাড়িটা পেলাম।

* মামুন :এই বাড়িটা কিনলেন না ভাড়া নিলেন?

* ড্যাডি :আমি কিনলাম।

* মামুন :কত টাকা দিয়ে কিনলেন তখন?

* ড্যাডি :ছ’হাজার টাকা মাত্র। বাড়ি এবং জমি মাত্র ছ’হাজার টাকায়।

* মামুন :কতটুকু জমি ছিল এখানে?

* ড্যাডি :জমি ছিল এক বিঘা। এক বিঘা জমি আর এই বাড়ি।

* মামুন :গাছগাছালি ছিল না আপনি লাগিয়েছেন?

* ড্যাডি :না। গাছগাছালি তখন নয়। নিজে হয়ে গেছে। এক-একটা লাগিয়েছি। গাছগাছালি ছিল না। দুই-একটা ছিল। এখন বেশি হয়ে গেছে।

* মামুন :আপনার বাড়িতে এখন যেসব গাছ-টাছ দেখা যায়, যেমন পেয়ার গাছ... এগুলো নিজের হাতে করা বোধহয়।

* ড্যাডি :এই যে আমগাছ-বেলগাছ আপনিই হয়ে গেছে।

* মামুন :ঢাকায় আসার পরে আপনি কী করা শুরু করলেন ফিফটি ওয়ানের পর থেকে?

* ড্যাডি :কোন সাল থেকে?

* মামুন :একান্ন সালের পরে থেকে এখানে।

* ড্যাডি :ও-ও

* মামুন :আপনি ট্রপিক্যাল ইনস্টিটিউট অব ফটোগ্রাফি করলেন কোন বছরে?

* ড্যাডি :নাইন্টিন ফিফটি টু আরম্ভ হলো।

* মামুন :সেটা কোন মাসে?

* ড্যাডি :মাসটা বোধহয় ফেব্রুয়ারি মাসে হবে।

* মামুন :১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে ভাষা আন্দোলনের জন্য বড় সংগ্রাম হয়। ওই দিন ভাষার জন্য সংগ্রাম করতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন। আপনার ট্রপিক্যাল ইনস্টিটিউট অব ফটোগ্রাফির জন্মলগ্ন, এটা আপনার...

* ড্যাডি :তখন কোনো ক্লাব বা অ্যাসোসিয়েশন কোনো কিছুই ছিল না। এমনকি ফটোর দোকানও খুব কম ছিল। ছিল ডাস কোম্পানি ওই নবাবপুরে। আর একটা ছিল ক্রিসেন্ট। ক্রিসেন্ট ছিল নবাবপুরে। ক্রিসেন্টের যে প্রোপাইটর আমার বিশেষ বন্ধু। আর একটা ছিল করনেশন। করনেশন, ক্রিসেন্ট আর ডাস কোম্পানি। তখন নিউ মার্কেট হয়নি। নিউ মার্কেট হবার পরে আসক হলো সিকো হলো বম্বে স্টুডিও—এরা সব হলো।

* মামুন :মাত্র তিনটা স্টুডিও ছিল?

* ড্যাডি :মাত্র তিনটা আমি দেখেছি তখন।

* মামুন :স্টুডিও মালিকরা আপনার কাছে আসা-যাওয়া করত না?

* ড্যাডি :হ্যাঁ, খুব আসা-যাওয়া ছিল। অনেক যেতাম। আমিই যেতাম। ওরা আসতে পারত না। সব ফটোগ্রাফি করত। স্টুডিওতে যেয়ে আমি বসতাম।

* মামুন :ট্রপিক্যাল ইনস্টিটিউট অব ফটোগ্রাফি করলেন কোথায়, এই রুমের মধ্যে?

* ড্যাডি :না, না আমার শাশুড়ির ওখানে।

* মামুন :আপনি তো এখানে আসলেন একান্ন সালে।

* ড্যাডি :না, বাসাটা কিনেছিলাম কিন্তু নাইন্টিন ফিফটিওয়ানে। এখানে প্রথমে কিনে তখনো আমি আসিনি। আমার এক আত্মীয়... আমার মামাতো বোনও থাকত এখানে।

* মামুন :আপনার প্রথম কয়জন মেম্বার ছিল?

* ড্যাডি :ও খুব কম। এই পাঁচ-সাতজন।

* মামুন :নাম মনে আছে আপনার কারা কারা ছিল?

* ড্যাডি :না, নাম মনে নেই। ওরা সব হয়তো মরেও গেছে। আর তাদের সাথে যোগাযোগ নেই, কিছুই নেই।

* মামুন :ওই সময়ের কোনো কাগজপত্র নেই?

* ড্যাডি :কাগজপত্তর কিছু নেই।

* মামুন :প্যাডের পাতাটাতা, এখনকার ক্লাবের মতো?

* ড্যাডি :খুঁজে পাই না। একটা যাও ছিল সেগুলো হয়তো নেই। এই খুঁজে দেখতে হবে। হারিয়ে গেছে, পুরনো কাগজ যারা নেয়, তারা সব নিয়ে গেছে।

* মামুন :একদিন খুঁজব এগুলো আপনার সাথে।

* ড্যাডি :হয়তো কিছু থাকলেও থাকতে পারে। খুঁজে দেখতে হবে।

* মামুন :ওটা কত বছর চালালেন আপনি?

* ড্যাডি :অনলি ফর টু ইয়ারস। মাত্র দু’বছর ছিল।

* মামুন :মানে বাহান্ন ও তিপ্পান্ন। তিপ্পান্নতেই শেষ।

* ড্যাডি :ওখানেই শেষ।

* মামুন :শেষ হয়ে গেল কীসের জন্যে?

* ড্যাডি :বন্ধ হবার কারণ হলো এই, এক তো হলো যেটা প্রিন্টের কাজ হতো কাজটা ভালোভাবে করতে পারতাম না। কেননা ইলেকট্রিসিটি ছিল না। ডেলাইটে ঠিকমতো কাজ করা যেত না। অসুবিধা হতো। আর সকলে চায় সাদা মুখ। আমি রিটাচ-টিটাচ করতাম না। আমি যেমন ছবি তুলি, সেভাবেই দিয়ে দিতাম। তা অনেকের সেটা পছন্দ করত না। খুব কম লোকই পছন্দ করত।

* মামুন :তখন কাজ আপনি নিজেই করতেন?

* ড্যাডি :হু, নিজেই করতাম সব।

* মামুন :কোনো কর্মচারী ছিল না?

* ড্যাডি :না, নিজেই সব। তো কেউ আমার ছবি পছন্দ না করার জন্য তারপর দেখলাম এইটা করে লাভটা কী, থাকগে। ইলেকট্রিসিটি নেই, হেন নেই তেন নেই। দুই বছর চালিয়ে আমিই বিরক্ত হয়ে গেলাম। বিরক্ত হয়ে ছেড়ে দিলাম।

তারপরে নাইন্টিন সিক্সটি টুতে দেখলাম একা একা ভালো লাগে না তো। একটা কিছু করতে হবে। চেষ্টা করতে করতে তারপরে একটা ক্লাব করা হলো। নাইন্টিন সিক্সটি টুতে ক্লাবটা করলাম। বেগ সাহেব ছিলেন তাকে বললাম।

* মামুন :তারিখ মনে আছে আপনার?

* ড্যাডি :হ্যাঁ, আগস্ট মাসে।

* মামুন :কত তারিখ?

* ড্যাডি :লেখা আছে, পড়তে পারবে। বর্ষার সময়। বেগ সাহেব, গোলাম মোস্তফা ছিল, বিজন সরকার ছিল, তারপরে অনেকে ছিল। তারপরে ইয়ে সাহেব ছিলেন। তারপরে গাজী বোধহয় ছিল। এইরকম কতসব ছিল। মেয়ে-ছেলেদের মধ্যে সাজেদা বেগম ছিল, ব্যান্সডকে কাজ করত। এখন কাজ করে কি না জানি না, ওই বয়স হয়ে গেছে। এই কতগুলা লোককে নিয়ে খুঁজে খুঁজে বার করলাম, একটা ক্লাব করছি তোমরা একটু এসো। তো ওদের নিয়ে ফার্স্ট ক্লাস করলাম নাইন্টিন সিক্সটি টুতে আগস্ট মাসে।

* মামুন :বাষট্টি সালের আগস্ট মাসে এই ৭৩ ইন্দিরা রোডে সেই প্রথম দিনের কথা আপনার মনে আছে?

* ড্যাডি :হ্যাঁ, হ্যাঁ। আগস্ট মাসে একটা ছোটখাটো মিটিং হলো। যাদেরকে নিয়ে আরম্ভ করলাম, তাদেরকে নিয়ে মিটিং করলাম। ক্লাবের কী হবে, কী নিয়ম-কানুন হবে, এইসব সম্বন্ধে ফার্স্ট মিটিংয়ে তাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা হলো। কোনো একটা নিয়ম তৈরি করলাম। এমন একটা কতগুলো নিয়ম করেছিলাম খসড়া সেটা ওদের দেখালাম। আপনি করেছেন, কোনো অসুবিধা নেই এভাবেই চলুক এখন। তো, প্রথম ক্লাবে মিটিংয়ে এভাবেই আলোচনা হলো। ক্লাবটা কীভাবে চলবে, কত ফি রাখা যাবে, কীভাবে পয়সাকড়ি আসবে এইসব সবাই মিলে আলাপ-আলোচনা করলাম।

তারপরে মাসে দুইটা সিটিং হতো, মেম্বারদের মিটিং। তারা আসত একজায়গায় বসত, ফটোগ্রাফি সম্পর্কে আলাপ হতো। কোশ্চেন থাকলে করত, যারা অ্যানসার দেবার ইচ্ছা হতো অ্যানসার দিত। এইভাবে কাজ শুরু করল। আর তখন আমরা ইয়ে করতাম, মাসে একটা করে প্রতিযোগিতা হতো মেম্বারদের জন্য। এই বাইরের জন্য না। অনলি ফর মেম্বারস। কিছু প্রাইজ দিতাম। এই বিশ টাকা, দশ টাকা, পনের টাকা প্রাইজ দিতাম। তারপরে যখন কিছু বছর পরে অনেক মেম্বার হয়ে গেল, প্রায় চল্লিশ-পয়তাল্লিশ। জায়গা হয় না খুব অসুবিধা। অনেকে দাঁড়িয়ে থাকত। এই অবস্থা।

ক্লাবটা চলছিল ঠিকই। কিন্তু মার্শাল ল হয়ে গেল। এটা কোন সালে হলো, ওই ইয়ে এলেন যখন, এরশাদ সাহেব এলেন, তখন থেকে কী একটা মানুষের মনে ভাব হলো, আবার আস্তে আস্তে কমতে আরম্ভ করল। অনেক মেম্বার আসে না। এইরকম করে করে করে তারপরে যে এমন হলো মেম্বার কেউ আসে না। এইরকম অবস্থা হয়ে গেল। যার ফলে আমরা রইলাম মাত্র তিনজন চারজন। আর বর্তমানে তো তাও নাই। এখন আমি আছি, আনিস সাবে আছে, একটা মেয়ে আছে লাইক মেম্বার পারভীন বলে। সেও আসেটাসে না। জানে যে কাজ হয় না। মিটিংটিটিং হয় না  তো সে আসে না। এখন আমি করেছি কি ক্লাবটা রেখেছি ঠিকই। মিটিং হয় না কনটেস্টটা রেখেছি, একটা করটেস্ট হয় বসন্তের সময় আরেকটা হয় অক্টোবর মাসে। সেটা হয় বার্ষিক কনটেস্ট। কিছু একটা করতে হবে তো, যাতে ওরা উত্সাহিত হয়। কনটেস্টটা এভাবেই চলছে। তো আমি আশা করি, আনিস সাহেব আসলে পরে তখন উনি ঘোরঘুরি করে আবার ক্লাবটা ঠিক করবেন।

আমি তো যেতে পারি না কোথাও। অসুবিধা হচ্ছে এই। ঘরে বসে তো এসব কাজ হয় না। লোককে জানানো এইসব করতে হয়।

* মামুন :অনেক আগে দেখতাম আপনি রাস্তায় আস্তে আস্তে হেঁটে একটা ইনভেলপ নিয়ে পোস্ট অফিসে যাচ্ছেন অথবা ব্যাগ নিয়ে বাজারে যাচ্ছেন।

* ড্যাডি :ডেইলি বাজার করতাম তো। এই দু-তিন বছর আগেও আমি বাজারে গিয়েছি।

* মামুন :বাজার আপনে করতেন কেন, ভালো লাগত?

* ড্যাডি :খুব ভালো লাগত। জিনিসপত্র কিনতে ভালো লাগত। অন্য লোককে দিয়ে কিনলে দাম হয়তো বেশি বা জিনিসপত্র পছন্দ হতো না।

* মামুন :কিন্তু রান্না করত কে?

* ড্যাডি :রান্না ওই কাজের মেয়ে করত।

* মামুন :আপনার স্ত্রী রান্না করত না?

* ড্যাডি :না। আমার স্ত্রী যখন এখানে ছিল তখন রান্না করত। বয়স হয়ে গেছে। বাতের অসুবিধা আছে।

* মামুন :দীর্ঘ বিবাহিত জীবনে স্ত্রীর সহযোগিতা কী রকম পেয়েছেন?

* ড্যাডি :তিনি সেরকম বাধা দেননি। কোঅপারেশনও করত না। বাধাও দিত না। মানে ইনডিফারেন্ট।

* মামুন :বাধা দিলে অসুবিধা।

* ড্যাডি :(হাসি) বাধা দিলে অসুবিধা।

* মামুন :তিনি কি ফটোগ্রাফি বুঝতেন?

* ড্যাডি :না, কোনোদিনও না। তার ছবি তুলতে চাইলে বলত, না আমার ছবি তুলো না। তবে বিয়ের সময় ছবি তোলা হয়েছিল দু-একটা। আমি তুলে দিয়েছিলাম। কিন্তু বেশি বয়স হওয়ার পর ছবি তোলে না। পোজ দিয়ে ছবি তুলতে চাইলে রাজি। এটা তার স্বভাব, ছবি তুলতে দেয় না।

* মামুন :উনি কি ভালো ছবি দেখলে বুঝতে পারতেন?

* ড্যাডি :হ্যাঁ, ভালো হয়েছে তা বলত। তো বাধা আমার আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে পাইনি। আমার ফাদার বাধা দেয়নি। আমার মা বাধা দেয়নি। আমার ওয়াইফ বাধা দেয়নি।

* মামুন :আপনি পৃথিবীর কোন কোন দেশে গেছেন?

* ড্যাডি :আমি কোথাও যাইনি। আমি এই বাংলাদেশে শুধু... বাইরে বেড়ানো হয়নি।

* মামুন :কেন হয়নি?

* ড্যাডি :অপরচুনিটি পেলেও যাইনি। একবার লন্ডন যেতে বলেছিল, যাইনি। আমার আত্মীয়স্বজনরা বাইরে গেছে। আমার কোথাও যেতে ইচ্ছাও করে নাই।

* মামুন :আপনি দীর্ঘ আলোকচিত্রী জীবনে এত সার্ভিস দিয়ে গেলেন বাংলাদেশের ফটোগ্রাফির জন্য। আলোকচিত্র আন্দোলনের আপনি একজন অগ্রণী। আপনার মৃত্যুর পরে... এই যে সার্ভিস দিয়ে গেলেন দেশের জন্য ফটোগ্রাফারদের জন্য আলোকচিত্রশিল্পীদের উন্নতির জন্য, মৃত্যুর পরে আপনার মূল্যায়ন কেমন হবে বলে মনে হয়?

* ড্যাডি :আমি চলে গেলে?

* মামুন :হ্যাঁ, আপনি চলে গেলে?

* ড্যাডি :আমি চলে গেলে কী হবে সেটা তো বলা শক্ত। তবে আমার কাজ দেখবে। আমার সম্পর্কে আলাপ-সালাপ করবে। যারা উত্সাহ পেয়েছে, অনুপ্রাণিত হয়েছে যারা—অনেক হয়েছে, অনেক লোক। তাদের মধ্যে কেউ যদি মনে যে হ্যাঁ ড্যাডির এটা থাক, তাঁর ইয়ে মতো ফটোগ্রাফির করার যে একটা ইচ্ছা ছিল তাঁর দেখাদেখি তাকে আমরা ফলো করি আমরাও এই চেষ্টাটা করি। এটা যদি মনে করে সেটা ভালো। তাহলেও ভালো। এমন লোক দুই-একটা থাকে এবং তারা যদি আমার উপর কাজ করে, ফটোগ্রাফির উন্নতির জন্য কাজকম্ম করে তাহলেই ভালো হবে। অনেক লোক তো আছে, আমি চলে গেলে আরও বহু লোক থাকবে। জানি না তাদের মধ্যে কেউ সেরকম করবে কি না। করবে, ফটোগ্রাফির উপর কাজ করবে নিশ্চই। ওরকম লোক আছে নিশ্চই। শত শত লোকের মধ্যে দু-একটা লোক তো আছেই। আমি সেটা আশা করি।

* মামুন :আপনার মৃত্যুর পরে এই ক্যামেরা রিক্রেয়েশন ক্লাব-এর (Camera Recreation Club) কী অবস্থা হবে? আপনার চিন্তাভাবনা আছে কোনো?

* ড্যাডি :এটার সম্বন্ধে একেক সময় চিন্তা করি। একেক সময় ভাবি যাতে এটা থাকে তার জন্য বন্দোবস্ত করে যাই। যারা নাকি সিনসিয়ার এরকম লোক আছে দুই-একজন, আমার দিকে যাদের টান আছে, ক্লাবের দিকে যার টান আছে এইরকম দুই-চারজনকে দিয়ে তাদেরকে বলব তোমরা এটা চালাও। আমার হয়ে... আমি তো চলে যাচ্ছি, তোমরা যদি পার তোমরা এটা চালাও। এটা মনে হয় আমার। দেখা যাক কতদূর কী করতে পারি। হয়তো কিছু টাকা দিয়ে গেলাম, কাজ যাতে কিছুদিন চলে। মেম্বাররা আসবে, তাদের কাছে কিছু পাওয়া গেল, আমি যেভাবে চালাচ্ছি সেভাবে চলতে রইল।

অনেকে এই কথা বলে আমাকে, আপনি চলে গেলে এতদিনকার জিনিস একটা নষ্ট হয়ে গেলে কেমন হবে। অনেকে মনে করে এটা। দেখা যাক...

* মামুন :আপনি কতদিন বাঁচতে চান?

* ড্যাডি :সেটা আমি কী করে বলব (হাসি)। তবে আমার যা শরীর এখন পর্যন্ত ভালোই আছি অনেকটা।

* মামুন :আপনার স্বাস্থ্য এখন ভালো আছে?

* ড্যাডি :ভালোই মনে হয়, হ্যাঁ।

* মামুন :পুরোপুরি সুস্থ আছেন?

* ড্যাডি :খালি একটুখানি দুর্বলতা মনে হয়। মনে হয় আরও পাঁচ-সাত বছর তো আছি। মনে হয় এইরকম। জানি না।

* মামুন :আমরা চাই, নাসিরউদ্দীন সাহেবের একশ বছর পার হয়ে গেল। এত দীর্ঘসময় আমাদের দেশের শিল্প-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে কোনো লোক থাকেনি। আমরা চাই আপনিও শতায়ু হউন। আর চার বছর পার হলে আপনারও একশ বছর হবে।

* ড্যাডি :(হাসি) দেখা যাক তাঁর হুকুম কী হয়।

* মামুন :আপনি সারাদিন... আপনার রুটিন বলেন, কী করেন আপনি? সকাল থেকে কী করেন? কয়টার সময় উঠেন?

* ড্যাডি :ভোরবেলা ব্যায়াম করি আমি এখনও।

* মামুন :কয় ঘণ্টা।

* ড্যাডি :ব্যায়াম করি দশ মিনিট। এইখানে করি। খুব ভোরে উঠি তো, চারটেয় সাড়ে-চারটার সময় উঠে পড়ি। তারপরে উঠে হাত-মুখ ধুয়ে নেই। সকালের কাজকর্ম শেষ করে ব্যায়াম করি। ব্যায়াম এই পাঁচটা সোয়া পাঁচটা খুব জোর সাড়ে পাঁচটা। ব্যায়াম শেষ হয়ে গেলে তারপরে সাতটার সময় খাই। নাস্তা করি। ভোরবেলায় উঠে সামান্য কিছু চা বা রুটি খেয়ে নেই। চা খাওয়া পাঁচটার মধ্যে শেষ হয়ে যায়। সাড়ে পাঁচটার মধ্যে ব্যায়াম। সাতটার সময় আরেকবার খাই। আবার এগারোটার সময় খাই। তারপরে দুটোর সময় খাই। আবার চারটের সময় কিছু একটা খেয়ে নেই।

* মামুন :দুইটার সময় কী খান?

* ড্যাডি :দুইটার সময় চা খাই আর রুটি টোস্ট করে মাখন দিয়ে খাই।

* মামুন :আপনি ভাত খান না দুপুরে?

* ড্যাডি :ভাত দুপুরে খাই, ওই এগারোটার সময় যা তরকারি টরকারি থাকে খাই। খাই খুব কম।

* মামুন :ভাতের সাথে কী খেতে পছন্দ করেন?

* ড্যাডি :তরকারি খাই, সবই খাই। যখন যা পাই তাই খাই।

* মামুন :মাছ-মাংস খান?

* ড্যাডি :মাছ খাই। মাংসটা খুব কম খাই। মাংসটা ভালো লাগে না। মাছ তরি-তরকারি ভেজিটেবল এগুলো খাই। লংকাটা খুব কম খাই। মরিচ একটা পেটে সহ্য হয় না। সবই খাই। ডিম খাই। দুধ খাই। ফলটল যা পাই, কলা খাই। কলা তো সবসময় থাকে। ফলের মধ্যে এখানে আর কী খাব, কলা খাই। কখনও কখনও আনারস খাই। পাকা পেঁপে খাই। পেঁপের তরকারিতে দিয়ে কখনও খাই।

* মামুন :আপনি কি মাছ বেশি খান?

* ড্যাডি :মাছ? মাছ আমি ছোটটা বেশি খাই। ওই মোলপি মাছ। পাবদা মাছ। এখন তো মাছের দাম এত বেশি কিনতে পারা যায় না। রুই মাছ কাতল মাছ ভীষণ দাম। কখনও কখনও ইলিশ মাছ কিছুটা সস্তায় যদি পাওয়া যায় তাহলে ভাগ কিনে আনি। সে এখন তো অনেক দাম হয়ে গেছে। আমি বেশিরভাগ মোলপি মাছটা খাই। আর ছোট ছোট চিংড়ি। ওই বড়াটরা করে দেয়। চিংড়ি মাছের বড়া, এটা খাই। আর ডাল জিনিসটা খুব পছন্দ করি। সবসময় ডাল।

* মামুন :দুইটার পরে কী করেন?

* ড্যাডি :দুইটার পরে চা খাওয়া হয়ে গেলে বইটই পড়ি। ফটোগ্রাফির বই পড়ি বা কোনো ভালো গল্পের বই পড়ি। পড়াশুনার ঝোঁকটা আমার খুব বেশি।

* মামুন :তারপরে বিকেলে কী করেন?

* ড্যাডি :বিকেলে ওই যে বললাম বসে থাকি। তারপরে এটা পড়ি ওটা পড়ি। তুমি আসলে কথা বলছি, গল্প করছি। বনফুলের লেখা, বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়, ইন্ডিয়ার খুব বিখ্যাত লেখক। ওরি একটা বই পেলাম। আমার নিজের নয়, অন্য লোকের বই। হাটে বাজারে রবীন্দ্র পুরস্কার পেয়েছে। এই বইটা খুব ভালো লাগছে, পড়ছি। ডাক্তারের লাইফস্টাইল। পড়তে পড়তে মনে হচ্ছে যে সত্যি ঘটনা।

* মামুন :বিকেলের পরে সন্ধ্যায় কী করেন?

* ড্যাডি :সন্ধ্যা হয়ে গেলে আমি সাথে সাথে শুই। খাই। আজকাল সাড়ে সাতটার সময় খাই।

* মামুন :কী খান রাতে?

* ড্যাডি :সাড়ে সাতটার সময় খেয়ে আটটার মধ্যে শুয়ে পড়ি। রাতে ভাত খাই। যখনই খাই খুব নরম ভাত। মাঝে মাঝে ডাল-চালের খিচুরি খাই।

* মামুন :বৃদ্ধ বয়সে মানুষের নানা ধরনের অসুখ আছে। যেমন ব্লাড প্রেসার, ডায়বেটিস...

* ড্যাডি :আমার এসব কিছু নেই। অসুখ নেই। মাঝে মাঝে পেটের গোলমালটা হয়। আমাশা হলো বা একটু অ্যাসিড ভাব হলো, এইটা হয়। চোখে কম দেখি। আর কানেও কম শুনি।

* মামুন :কিন্তু লিখতে তো পারেন আপনি, হাত তো কাঁপে না?

* ড্যাডি :না কাঁপে না।

* মামুন :আপনার স্মৃতিশক্তি কেমন?

* ড্যাডি :মেমোরি? মেমোরি, অনেক আগেকার কথা মনে হয় আবার ভুলেও যাই। হয়তো সামান্য কোনো জিনিস সেটা এখনও মনে আছে। আবার অনেক কথা ভুলে গেছি। আবার বহুকাল আগের ছোট ঘটনা এটা মনে আছে। মেমোরি আছে কিছু।

* মামুন :কী ধরনের পোশাক পরতে আপনার ভালো লাগে?

* ড্যাডি :প্যান্ট-শার্ট বেশি পরি। কোট খুব কম। শীতকালে গরম শার্ট গায়ে দেই।

* মামুন :কাল সুতো দিয়ে বাধা আপনার গলায় এই বাঁশিটা কীসের জন্য?

* ড্যাডি :বাঁশি বাজাই তো। ওরে (কাজের মেয়ে) ডাকার জন্য। অনেক সময় শুনতে পায় না তো, পাকঘরে থাকে। বাঁশি ডাকলে আসে। সাধারণত এরকম দেখা যায় না। আমার খুবই দরকারি।

* মামুন :আপনার জীবনটা কালারফুল এবং ফুল-অব-ট্র্যাজেডি। ট্র্যাজেডির মধ্য দিয়ে জন্ম আপনার। আপনার ওপর ফিল্ম করা যায়। এত তথ্য আমি নিলাম এগুলো কেউ জানে না। নিঃসঙ্গ জীবন আপনার কেমন লাগে?

* ড্যাডি :অভ্যেস হয়ে গেছে। এখন আর খারাপ লাগে না। খারাপ লাগে কখন যখন অসুখ হয়, শরীর খারাপ হয়। তখনা খুব ফিল করি একটা লোক পাশে থাকলে উপকার হতো। তখন খুব অসহায় মনে হয়। কিন্তু আনিস সাহেবের ওয়াইফ রয়েছে, একা মনে হয় না। কিন্তু যখন কেউ নেই, কাজের মেয়েটিও নেই তখন খারাপ লাগে। ওরা বলে আপনি হুইসেল বাজাবেন আমরা চলে আসব।

* মামুন :হাসপাতালে কয়বার গেছেন আপনি?

* ড্যাডি :একবার পা ভেঙে গেল, হলি ফ্যামিলিতে ছিলাম। আমার লাইফটা ফুল অব অ্যাকসিডেন্ট। ষোল সতের বছর আগে হয়েছিল। ফার্মগেটের ওখান থেকে সাইকেলে করে বাজার নিয়ে আসছি...।

* মামুন :আপনার সাইকেল আছে?

* ড্যাডি :আছে, ওটা ভেঙেচুড়ে শেষ হয়ে গেছে। ইস্পাহানির গাড়ি। এয়ারপোর্ট থেকে আসছিল, আমাকে ধাক্কা মারে। ধাক্কা মারলে সাইকেল যায় ভেঙে আর পা’টাও ভেঙে গেল। তারপর চলে গেল আমাকে নিয়ে হলি ফ্যামিলিতে। ওখানে আমাকে চার-পাঁচদিন থাকতে হয়েছিল। প্লেট দিয়ে স্ক্রু দিয়ে পরে হাড্ডি জোড়া লাগলে খুলে দেয়। হাড্ডি সহজে জোড়া লাগল না বলে আপনার বয়েস হয়ে গেছে তো। এখন ঠিক আছি। অনেক কষ্ট হয়েছে।

* মামুন :আর কয়বার গেছেন হাসপাতালে?

* ড্যাডি :এরপর পেশাব বন্ধ হয়ে গেল। পেশাপ বন্ধ হয়ে গেলে ক্যাথিডার দিয়ে পেশাপ করাত। তারপরে আমাকে নিয়ে গেল ক্যান্টনমেন্ট হসপিটালে, এই সিএমএইচে। ব্রিগেডিয়ার সিরাজ জিন্নাত অপারেশন করল। আমি কিছু বুঝতে পারিনি। আমার জ্ঞান আছে কথা বলছি, তারমধ্যে অপারেশন হয়ে গেল। পরে জিজ্ঞাসা করলাম আমার অপারেশন হয়ে গেছে। বলল, হ্যাঁ, অপারেশন হয়ে গেছে। হয়ে গেছে মানে, হাত দিয়ে দেখি কিছু সাড়া নেই। কাঠের মতো। কোমড় থেকে লোয়ার পর্যন্ত অবশ করে দিয়েছিল। ঠিক হতে দু-তিন ঘণ্টা লাগল। চারদিন ওখানে ছিলাম। ওখানে তো আতিক-উর রহমানের সাথে দেখা হলো।

* মামুন :আগে অনেক গল্প লিখতেন। প্রথম গল্প লেখার সময়টা জানা হয়নি।

* ড্যাডি :ওই যখন সওগত বেরোল, নাইন্টিন টোয়েন্টি টু বোধহয় হবে। আমার চাকরি হলো নাইন্টিন নাইন্টিনে। এই সময়ে হবে। কুড়ি একুশ হবে আমার মনে হচ্ছে।

* মামুন :১৯২০ বা ১৯২১ সালের দিকে?

* ড্যাডি :নাইন্টিন টোয়েন্টিও হতে পারে।

* মামুন :নাসিরউদ্দীন সাহেবের সঙ্গে আপনার পরিচয় কীভাবে?

* ড্যাডি :পরিচয় গল্প একটা দিয়ে। আমাকে সে বলল যে সওগাতে গল্প বেরোচ্ছে। আমি গল্প দিলাম। এই ব্যাপার নিয়ে চিঠিপত্র চলল। তারপরে আমি ঠিক করলাম ওর সাথে দেখা করব। ওয়েলেসলি স্ট্রিটে থাকতেন কলকাতা, সেখানেই আমি গেলাম। গিয়ে আমি ওর সঙ্গে দেখা করলাম। গল্পস্বল্প হলো। উনি বললেন আপনার গল্প তো সকলে পছন্দ করে আপনি যদ্দুর পারেন গল্প দেবেন। আমার অনেক গল্প বেরিয়েছে, প্রায় ষাট-সত্তরটা গল্প বেরিয়েছিল।

* মামুন :আপনার প্রথম প্রকাশিত গল্পের নাম কী?

* ড্যাডি :সেগুলো মনে নেই। আমার এক ভাগ্নি জামাই উনি একজন লেখক। উনি সেগুলো নিয়ে গেছেন। তার নাম গ্রুপ ক্যাপ্টেন। এয়ারে কাজ করতেন। সম্প্রতি রিটায়ায় করেছেন, আমার একটা গল্পের বই সে প্রকাশ করতে চায়। উনি বললেন মামা আপনার গল্পগুলো আমি বই হিসাবে বার করতে চাই। কালেকশন করে বার করতে চাই। আমাকে আবার নিয়ে গেল নাসিরউদ্দীনের বাসাতে। আলোচনা হলো। বলল, বড় বই হবে, অনেক গল্প। বললাম, আমি যাবার আগে যেন দেখে যেতে পারি।

* মামুন :কী ধরনের গল্প লিখতেন বেশি?

* ড্যাডি :অ্যাডভেঞ্চার ভাব থাকে। হিউম্যান ক্যারেক্টর, লোকের চরিত্র সম্বন্ধে থাকত।

* মামুন :সেটা কি কিশোর উপযোগী গল্প না সবার জন্য?

* ড্যাডি :সবার জন্য।

* মামুন :সিরিয়াস গল্প আপনি লিখতেন না?

* ড্যাডি :না, সিরিয়াস গল্প লিখতাম না। যেগুলো হয় সাধারণত লাইট গল্প।

* মামুন :সওগাত ছাড়া অন্য কোনো পত্রিকায় আপনার লেখা ছাপা হয়েছে?

* ড্যাডি :অন্য পত্রিকায় খুব কম দিয়েছি। কারণ তার ওই... ‘মৌচাক’ সেটা বোধহয় শিশুদের জন্য, সেটায় দিতাম। ‘সন্দেশ’ বলে একটা ছিল।

* মামুন :সুকুমার রায় সম্পাদিত সন্দেশ।

* ড্যাডি :হ্যাঁ হ্যাঁ। তারপরে আরও দুই-একটায় দিতাম। এখানেও ঢাকায় কি একটা মাসিক পত্রিকায় দিয়েছিলাম।

* মামুন :কলকাতায় আর কী কী পত্রিকায় লেখা দিয়েছিলেন মনে নেই?

* ড্যাডি :সন্দেশ, মৌচাক, তারপরে বড়দের জন্য পত্রিকা ছিল একটা, তাতে দিয়েছিলাম দু-একটা। সওগাতে সব দিয়েছি। সমস্ত গল্প। নাসিরউদ্দীনের সঙ্গে আলাপ হওয়ার পর সব ওকে দিতাম।

* মামুন :আপনি ছবি আঁকতেন কখনও?

* ড্যাডি :সওগাতে যে বার্ষিকী বার করেছে এই রকম বড় বই তাতে আমার ছবি দিয়েছে। নাসিরউদ্দীন আমার অনেক ছবি বার করেছে।

* মামুন :সেগুলো আপনি দিয়েছেন নাকি তারা...

* ড্যাডি :আমার কাছ থেকেই নিত।

* মামুন :আপনার এত গল্প ছাপা হলো তখনকার সব বিখ্যাত পত্রিকায়, কিন্তু আপনার আলোকচিত্র ছাপা হলো না কেন?

* ড্যাডি :আমি বলতাম না। দু-চার জায়গায় ছাপা হয়েছে। আমি নিজের কথা কাউকে বলতাম না। তুমিই আমার সবকিছু বের করে নিলে।

* মামুন :আপনি ইন্টারমিডিয়েট পাস করেছিলেন কোন কলেজ থেকে?

* ড্যাডি :সেন্ট জেভিয়ারস থেকে। ওটা মিশনারিদের কলেজ। সেকেন্ড ডিভিশনে পাস করি যুদ্ধের পর পর।

* মামুন :কলেজের প্রিন্সিপাল কে ছিলেন?

* ড্যাডি :ফাদার কী যেন ছিলেন।

* মামুন :আপনার ঘনিষ্ঠ বন্ধুবান্ধব ছিল না?

* ড্যাডি :ঘনিষ্ঠ বন্ধু তেমন কেউ ছিল না। এমনি বন্ধুবান্ধব তেমন ছিল না। এমনি জানশোনা ছিল সামান্য কিছু।

* মামুন :আপনি প্রথম থেকেই নিভৃতচারী, মানে নিজের মধ্যেই নিজে থাকেন। আমার মনে হয় জন্মের সময় আপনার মায়ের মৃত্যু। একা থেকেছেন আর বদলির কারণে আপনার আব্বাকেও কাছে পাননি। এই দুইয়ের কারণে কি আপনি নিভৃতচারী?

* ড্যাডি :এটা খুবই স্বাভাবিক। সিনসিয়ার বন্ধু আমি পাইনি। খুব কম পেয়েছি। আমার খুব একা একাই ভালো লাগে।

* মামুন :আপনার গান আমি শুনেছি।

* ড্যাডি :গান গাইব না। তবুও জোর করে গাওয়াবে। আমি যে বুড়ো হয়েছি।

* মামুন :আপনার নাটকে অভিনয়ও দেখেছি আমি।

* ড্যাডি :ওই যে দেখ।

* মামুন :কী ধরনের গান গাইতেন আগে?

* ড্যাডি :আমি সবই গাই। আমি বেশিরভাগ আধুনিক গানগুলি গাই, আর নজরুল সংগীত।

* মামুন :আপনার লেখা দু-একটা গান গেয়েছেন কখনও?

* ড্যাডি :না, আমি নিজের লেখা কোনো গান গাইনি। আমি পঙ্কজ মল্লিকের গান গেয়েছি, নামকরা যেসব আছে ওদের গান করেছি। পংকজ মল্লিক, সন্তোষ সেনগুপ্ত, তারপরে হলো জগন্ময় মিত্র, অন্ধ গায়ক মারা গেছে, কুমারী সুধা বন্দ্যোপাধ্যায়, দিলীপকুমার রায়, তারপরে নজরুল...।

* মামুন :নজরুরের গান আপনার ভালো লাগে?

* ড্যাডি :নজরুলসংগীত আমার খুব ভালো লাগে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

 * মামুন :নজরুলের গানের কয়েকটা লাইন গেয়ে শোনান ড্যাডি।

* ড্যাডি :আমার যাবার সময় হলো দাও বিদায়

মোছো আঁখি দুয়ার খোল দাও বিদায়...

* মামুন :আপনি কি আগে হারমোনিয়াম বাজিয়ে গানের চর্চা করতেন?

* ড্যাডি :হারমোনিয়াম বাজাই খুব কম। বেশিরভাগই খালি গলায় গাই।

* মামুন :কীভাবে এদের গানগুলি শিখলেন?

* ড্যাডি :কেউ শেখায়নি। ওই রেকর্ড থেকে শিখতাম।

* মামুন :নাটকে অভিনয় শিখলেন কার কাছে?

* ড্যাডি :কলকাতায় মিনার্ভায় ভালো ভালো অভিনয় হতো। তখন নাটক দেখে শিখতাম।

* মামুন :ড্যাডি কবিতা লিখতেন?

* ড্যাডি :লিখেছি। ছড়া লিখেছি বেশি। বেগম সুফিয়া কামাল আমাকে লিখতে বলে।

* মামুন :আপনি একজন লেখক নাকি আলোকচিত্রশিল্পী, এই দুটোর কোনটা আপনার ভালো লাগে?

* ড্যাডি :আমার দুটোই খুব ভালো লাগে। ফটোগ্রাফিটা একটু বেশি ভালো লাগে।

* মামুন :কেন বেশি ভালো লাগে ফটোগ্রাফি?

* ড্যাডি :আমি যেহেতু ছবি তুলি। এটা আমার জীবনের সঙ্গে একেবারে মিশে গেছে। গল্প তেমন লেখা হয় না।

* মামুন :আপনি ছবি তুলেছেন প্রায় দশ হাজার। গল্প লিখেছেন প্রায় সত্তরটি। কবিতা লিখেছেন কিছু। আপনার মৃত্যুর পর ফটোগ্রাফি এবং লেখা, কোনটার স্থায়ীত্ব দীর্ঘ হবে?

* ড্যাডি :সেটা আমি নিজে বলতে পারব না। মানুষ কোনটা কীভাবে নেবে জানি না। যারা ফটোগ্রাফি বোঝে তারা ফটোগ্রাফি ভালো বলবে। আর যারা লেখার পাঠক তারা হয়তো লেখাকে ভালো বলবে। আমার জীবন থেকে কেউ যদি এইটুকু অনুপ্রেরণা পায় এর থেকে বড় কথা মস্ত কথা কিছু নয়। তবে আমি ফটোগ্রাফির মানুষ।

* মামুন :আপনার বিড়ালগুলোর নাম কি?

* ড্যাডি :একটার নাম সোনা। ওই আরেকটার নাম মোনা। ওদের নাম আমি দিয়েছি। আচ্ছা, আমানুল হকের শরীর খারাপ ছিল শুনেছি। ভালো হয়েছে এখন?

* মামুন :এখন একটু ভালো। উনি মাঝে মাঝে অসুস্থ থাকেন।

* ড্যাডি :অসুখ কী?

* মামুন :পেটের ট্রাবল, যদ্দুর জানি আমি। ড. নওয়াজেশ এবং নাইবউদ্দীন আহমেদ ভালো আছেন।

* ড্যাডি :ওরা ভালো আছেন। d

 

 

 

 

 

 

 

এই পাতার আরো খবর -
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
২১ জুন, ২০১৮ ইং
ফজর৩:৪৩
যোহর১২:০০
আসর৪:৪০
মাগরিব৬:৫১
এশা৮:১৬
সূর্যোদয় - ৫:১১সূর্যাস্ত - ০৬:৪৬
পড়ুন