ভ্রমণ
একদিন ভুল সুমাইয়ায়
ইকতিয়ার চৌধুরী২১ জুন, ২০১৭ ইং
একদিন ভুল সুমাইয়ায়
দ্বিতীয়বার কায়রো এলাম। ২০১১ সালে। মাদ্রিদ থেকে। সঙ্গে  বউ আর দু ছেলে। পুরো পরিবার। প্রায় বিশ বছর পর। সেবার একা ছিলাম। তখন আমি পররাষ্ট্র সার্ভিসের নবীন কর্মকর্তা। কায়রো আর আলেকজান্দ্রিয়া মিলিয়ে ইজিপ্টে থাকার মেয়াদ ছিল দু মাস। প্যারিসে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে পড়াশোনার অংশ হিসেবে ওই সময় ফরাসি দূতাবাসে শিক্ষানবিশ অফিসার ছিলাম। আজ অবধি তা আমার স্মরণীয় প্রবাস জীবনের একটি অধ্যায়। বিশ বছর আগে এক সন্ধ্যায় প্যারিস হতে কায়রোতে নেমেছিল আমার প্লেন। আসার আগে মিশরে ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত মসিয়্যু লেকলার্ক আমাকে অনুগ্রহ করে লিখেছিলেন, ‘তুমি ইচ্ছে করলে কায়রোতে দূতাবাসের অ্যাপার্টমেন্টে থাকতে পারবে।’ শেরাটন হোটেলের কাছে ফিনি স্কোয়ারে তার কথামতো জায়গা হলো আমার। বারতলা ভবনের আটতলায় চার বেডরুমের বিশাল ফ্লাট। বাসিন্দা একমাত্র আমি। বহুদিন হলো এখানে কেউ বসবাস করছে না। আমার আগমন উপলক্ষে কিচেনসহ একটি বেডরুম এবং বসবার ঘর পরিষ্কার করা হলেও বাকি ঘরগুলো ধুলোয় ঠাসা। ফ্রিজ, গ্যাস ওভেন ও প্রয়োজনীয় তৈজসে কিচেনটি ছিল সজ্জিত।

ওই সফরে আমাকে বিছানাপত্র ধার দিয়েছিলেন দূতাবাসের কাউন্সেলর মসিয়্যু স্টেফান গোমপার্দের ইতালীয় বউ ক্রিস্টিনা। বিছানা বলতে একজোড়া চাদর আর দুটো করে তোয়ালে ও বালিশ। বিমান বন্দর থেকে ফিনি স্কোয়ারের ফ্লাটে পৌঁছে দেয়ার আগে ফরাসি দূতাবাসের চ্যান্সেরি প্রধান আমাকে গোমপার্দের বাসায় নিয়ে আসে। ওর ঘরে তখন অনেক গেস্ট। ডিনারের শেষ পর্যায়ে ছিল তারা। কেউ কেউ এরমধ্যে শেষ করে কনিয়াক কিংবা কফি পান করছিল। গোমপার্দ দম্পতি বেরিয়ে এসে তাদের সঙ্গে যোগ দিতে বলল আমাকে। ক্লান্ত ছিলাম। সবিনয়ে তাদের অনুরোধ ফিরিয়ে দিলাম। ক্রিস্টিনা বলল, ‘আমরা আশা করেছিলাম তুমি এখানে ডিনার করে ফিনি স্কোয়ারে যাবে। ওখানে বিছানাপত্র তেমন কিছু পাবে না। তোমার জন্য তাই জরুরি দু-চারটে জিনিস আমি গুছিয়ে রেখেছি।’

 রাতে ফিনি স্কোয়ারের নির্জন বাসায় গা ছমছম করত।

এবার অবশ্য সে সমস্যা নেই। সপরিবার আতিথেয়তা নিয়েছি আমার ব্যাচমেট ইজিপ্টে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মিজানুর রহমানের বাসা বাংলাদেশ হাউজে। মিজান ও ওর স্ত্রী মিথুন ভাবির দু সন্তান। বড় জন আনিকা। থাকে বস্টন ইউএসএতে। পড়ছে আইন শাস্ত্র। ছেলে ইহাব, সপ্তম গ্রেডের ছাত্র। চশমা চোখে ইহাবকে দেখলেই বোঝা যায়, তার মাথার মধ্যে অংকের সমাধান গিজগিজ করছে। আনিকাও খুব মেধাবী মেয়ে। আমার বড় ছেলে অনত’র বন্ধু। সেও এখন কায়রোতে। পুরো দশ দিন আমরা মিজান-মিথুন পরিবারের সঙ্গে কাটাব। মাদ্রিদ থেকে রওয়ানা হওয়ার আগে একটি সফরসূচি পাঠিয়েছি তাদের। মতামত ও প্রয়োজনীয় করণীয়র জন্য। যাতে করে প্রথমবারের তুলনায় এবারকার ভ্রমণ আরও মনোগ্রাহী হয়ে ওঠে।

পড়াশোনার কারণে প্যারিসে পরিশ্রম থাকত প্রচণ্ড। সে অর্থে কায়রোতে কোনো চাপ নেই। ন’টা-একটা দূতাবাস করি। বাকি সময় প্রায় নিজের মতো করে কাটাই। রাষ্ট্রদূত লেকলার্ক তার বাসায় প্রতি সপ্তাহেই একটা-দুটো পার্টি হোস্ট করেন। অতিশয় সজ্জন ব্যক্তি তিনি। অতিথিদের তালিকায় প্রতিবারই আমার নাম থাকে। তার বাসভবন গিজা স্ট্রিটের দূতাবাস প্রাঙ্গণে। পাশ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে নাইল। নাইল পৃথিবীর দীর্ঘতম নদ। দৈর্ঘ্য ছয় হাজার ছয় শ সত্তর কিলোমিটার। বুরুন্ডিতে উত্পত্তি হয়ে উগান্ডা, ইথিওপিয়া ও সুদানের মধ্য দিয়ে মিশরে পড়েছে। মিশরের মধ্য দিয়ে গিয়ে মিশেছে ভূ-মধ্যসাগরে। প্রচলিত ধারণা নাইল মিশরের নদ। যা একেবারেই ভ্রান্ত বলা যায়। কারণ নাইলের মাত্র বিশ- বাইশ ভাগ দেশটির অন্তর্গত। 

রাষ্ট্রদূতের বাসভবনের বারান্দায় দাঁড়ালে নাইল দেখা যায়। বারান্দা থেকে নামলেই বাগান। নানা ধরনের ফুল আর সবুজ ঘাসে তা খুবই মনোরম। অতিথিরা এই বারান্দা আর বাগানকেই ঘরের চেয়ে বেশি পছন্দ করেন। লেকলার্কের বাসার সান্ধ্য আসরে উত্তেজনা আসে মন্থর পায়ে। প্রথম প্রহরে সবার স্বরগ্রাম নিচুতে থাকলেও সময়ের সঙ্গে তা বেড়ে যায়। আরবীয় পোশাকে সজ্জিত তিন-চার জন খানসামা একাধিক পদের পানীয়, স্নাকস হাতে ঘুরতে থাকে অতিথিদের জটলায়। এই পোশাকে ইউরোপীয়দের আসরে এদের কাজের ধরন আর অনুগত ভাবটি দেখে আমার মনে হয় শ্বেতকায়রা বাদামিদের চিরকাল গৃহপালিত বানিয়েই রাখল।

যতদূর মনে পড়ছে রাষ্ট্রদূত লেকলার্ক নোবেল প্রাইজ প্রত্যাখ্যানকারী ফরাসি লেখক জ্যঁ পল সার্ত্রের আত্মীয়। তা আমি জেনেছিলাম কায়রো আসার দ্বিতীয় দিন তার বাসায় ঘরোয়া মধ্যহ্নভোজে। লেকলার্ক তার প্রথম বিবাহজাত ছেলে এবং বর্তমান স্ত্রীর আগের ঘরের মেয়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। তারা বয়সে তরুণ। তার বউ কায়রোর বাইরে থাকায় আলাপ হলো না। রাষ্ট্রদূতের প্রিয় পানীয় জিন। তিনি আমাকে জিন টনিকে আপ্যায়িত করলেন। আমাদের অল্প সময়ের গল্পে রাজনীতি, সাহিত্য, মিসরের ঘনায়মান সামাজিক অবস্থা এবং বাংলাদেশ কিছুই বাদ গেল না।

চারজনে খেতে বসলাম। মেন্যুতে ফিশ, বিফ—দু পদই থাকায় ফরাসি খাবার রীতি অনুযায়ী ক্ষুধা বর্ধনকারী জিনের পর সাদা ও লাল ওয়াইন এলো। কায়রোতে তখন ‘টক অব দি টাউন’ একটি ধর্ষনের ঘটনা। বাসস্ট্যান্ডে অনেক লোকের সামনে একটি মেয়েকে ধর্ষণ করা হয়েছে। অবগুণ্ঠনহীন তরুণীটি আধুনিক পোশাকে সজ্জিত ছিলেন। তাকে যখন বলত্কার করা হয় কেউ এগোয়নি। মিসরের মতো রক্ষণশীল মুসলিম সমাজে এ ধরনের ঘটনা খুবই অস্বাভাবিক। তার চেয়ে অচিন্তনীয় বিষয় হলো মেয়েটির সাহায্যে কারো এগিয়ে না আসা। লেকলার্ক আর তার সত্ মেয়ে এ নিয়ে খোলাখুলি কথা বললেন। অনেকের ধারণা, এই জঘন্য কাজটি ঘটিয়েছে মৌলবাদীদের কেউ। কারণ তারাই মেয়েদের প্রকাশ্য হয়ে চলা অনুমোদন করছে না।

রাষ্ট্রদূত লেকলার্ক আমার কাজে সন্তুষ্ট ছিলেন কিনা জানি না, তবে তিনি আমাকে বেশ পছন্দ করতেন। প্রতি সকালে তার কক্ষে অফিসারদের যে সমন্বয় বৈঠক হতো সেখানে আমার থাকতে হতো। আমার বিদায় উপলক্ষে চ্যান্সেরি ভবনে তিনি যে পার্টির আয়োজন করেছিলেন, তার উষ্ণতা আজও আমি অনুভব করি। আসলে কর্মজীবনে যা যা প্রয়োজন হতে পারে, তার অনেকটাই তিনি আমাকে প্রত্যক্ষ করিয়েছেন। ওই অনুষ্ঠানে তিনি যখন জানলেন মিশরের ফারাও সভ্যতার সমৃদ্ধ ভূমি লুক্সর আমি ভ্রমণ করিনি, তখন তিনি দুঃখ পেয়েছিলেন—কেন তিনি আমাকে সেখানে যাওয়ার সুযোগ করে দেননি!

এবার তাই সপরিবার মিসর ভ্রমণে লুক্সরের জন্য দুদিন সময় রেখেছি।

অবশ্য লুক্সর ছাড়াও মিশরে দেখার মতো বহু জায়গা রয়েছে। যে দেশের ইতিহাস খ্রিষ্টপূর্ব তিন হাজার পঞ্চাশ বছর ধরে চলমান এবং সভ্যতাও সমৃদ্ধ, সে রকম একটি দেশে ঘুরে দেখার মতো নিদর্শন সেইসঙ্গে অনুসন্ধানের মতো ঐতিহাসিক পরম্পরার অভাব নেই। লুক্সর কায়রো থেকে প্রায় পাঁচশ কিলোমিটার দূরে। এখানকার প্রাচীন নগর তেবিসে রয়েছে কয়েক সহস্র বছরের পুরোনো বিখ্যাত কারনাক মন্দিরমালা। নাইল নগরটিকে দু ভাগ করেছে। নদটির পশ্চিম পাড়ে ভ্যালি অব দ্য কিংস ও ভ্যালি অব দ্য কুইন্স। ভ্যালিতে পাহাড় কেটে এর অভ্যন্তরে করা হয়েছে ফেরাউনিক বাদশাহদের কবর। কবরে রাজাদের দেহাবশেষ মমি করে রাখা। সেখানে এরকম ছাব্বিশটি মমি রয়েছে। তাদের মধ্যে তুতেনখামেন, রামেসিস দ্য গ্রেট ও তুতমোসিস বিখ্যাত। ফেরাউনিক শাসনামলে মৃত রাজাদের কবরে অনেক মনি-মুক্তা ও স্বর্ণালঙ্কার রাখা হতো। প্রচলিত ধারণা এই যে, ওইসব মূল্যবান বস্তু মৃত ব্যক্তিদের প্রয়োজন হতে পারে। তবে কালক্রমে কবরস্থান থেকে সেসব যখন চুরি হতে থাকল, তখন ফারাওরা তা ঠেকাতে পাহাড়ের অভ্যন্তরে চোরা পথের সমাধিতে লাশ সমাহিত করতে থাকে। এইভাবে ভ্যালি অব দ্য কিংসে যে সব ফারাও বাদশার কবর রয়েছে, তারা আঠার থেকে বিশতম বংশলতিকার।

সারা মিসরেই ছড়ানো রয়েছে কয়েক সহস্র বছরব্যাপী বিকশিত সভ্যতার চিহ্ন। কায়রো থেকে আটশ পঞ্চাশ কিলোমিটার দূরের আবু সিম্বেল বিস্ময়কর এক প্রত্নতাত্ত্বিক ভূভাগ। খ্রিষ্টপূর্ব  ত্রয়োদশ শতাব্দীর নানা নিদর্শনে স্থানটি সমৃদ্ধ। তেমনি দক্ষিণ মিশরের আসিউতে দেখা পাওয়া যায় ফেরাউনিক যুগের ঐতিহাসিক ইমারত এবং প্রাচীনকালের মসজিদের। জ্ঞানলোভী পর্যটকেরা ইতিহাসের চটি বই হাতে এসব স্থানে তাদের আকর্ষণের বিষয়গুলো মিলিয়ে মিলিয়ে দেখে।

বিনোদনমুখী পর্যটনের জন্য মিশরের জনপ্রিয় গন্তব্য সিনাই পেনিনসুলার শার্ম আল শেখ, আসোয়ান আর ভূ-মধ্যসাগর তীরবর্তী শহর আলেকজান্দ্রিয়া। আলেকজান্দ্রিয়ার গ্রন্থাগারটি পৃথিবীর অন্যতম বৃহত্ পাঠাগার। এই শহরটিতে প্রথম দফা ইজিপ্ট ভ্রমণকালে দশ দিন কাটিয়েছি আমি। প্রতিদিন বিকেলে সাগরের পাড় ধরে বাঁধানো রাস্তায় আমি যখন হাঁটতাম, তখন পাড়ে আছড়ে পড়া নোনা জল ছলকে আমার শরীরে এসে লাগত।  

স্পেনের আগে আমার অ্যাসাইনমেন্ট ছিল ফিলিপাইনে। ওই সময় ম্যানিলায় মিশরের  রাষ্ট্রদূত মাদাম সুমাইয়া ছিলেন আমাদের ভালো একজন বন্ধু। তিনি খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী। ফোর্বস পার্কে তার বাসায় সস্ত্রীক আতিথেয়তা নেয়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। তখন আমি থাকতাম পাশের দাসমারিনাস ভিলেজে। দাসমারিনাসে অনেক দূতাবাস এবং রাষ্ট্রদূতের বাসা। সুমাইয়ার চ্যান্সেরিও ছিল সেখানে। তিনি এখন কায়রোতে। সদর দপ্তরে ডিজি হিসেবে কাজ করছেন। আমি তার সঙ্গে দেখা করতে চাই জেনে মিজান রঁদেভু করে রেখেছে। মিজান এও জানাল সুমাইয়া ওই দিন আমাদের লাঞ্চেও আপ্যায়িত করতে চান।

ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহ। কায়রোতে বেশ শীত। শরীর গরম রাখতে প্রয়োজনীয় কাপড় আমরা সঙ্গে এনেছি। তা ছাড়া শীত আমাদের কতটা সওয়া হয়ে গেছে। এক নাগাড়ে না হলেও অনেক বছর হলো ঠাণ্ডা প্রধান ইউরোপে রয়েছি। প্যারিস ও ইংল্যান্ডের পর এবার মাদ্রিদে। আমার মতোই বউ লীনা এবং ছেলে অনত আর অলভ্যও শীত ঠেকানোয় অভ্যস্ত। ইজিপ্ট এয়ারে মাদ্রিদ-কায়রোর পথে যথেষ্ট আপ্যায়নের মধ্যে ভ্রমণ করলেও শরীর ক্লান্ত ছিল। প্রথম দিনটায় তাই সুমাইয়ার সঙ্গে দেখা আর গিজার পিরামিড এলাকায় শুষ্ক হাওয়া সেবন ছাড়া দূরে কোথাও বেড়ানো হলো না। মিজান বলল, ‘আমারও ফরেন অফিসে অ্যাপয়েন্টমেন্ট রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়া ডেস্কের ডিজির সঙ্গে। একসঙ্গেই যাওয়া যেত কিন্তু ওরা আমাকে সময় দিয়েছে আপনার আধ ঘণ্টা পর।’

—মোটে তো আধ ঘণ্টা। একসঙ্গে গেলে কি খুব অসুবিধা হবে?

—না, তা হয়তো হবে না। তবে তার দরকার পড়বে না। আপনাকে অন্য গাড়ি নামিয়ে দেবে। ফেরার সময় দুজন এক গাড়িতে ফিরব।

মিজান লাঞ্চের পর একসঙ্গে ফেরার কথা বলছে। কায়রোতে আমি তার হাউস গেস্ট। তদুপরি তার পরিকল্পনায় যে গড়বড় থাকে না, তা আমাদের অজানা নয়। বললাম, ‘তথাস্ত।’

সকাল সাড়ে এগারটায় আমি ইজিপ্ট ফরেন অফিসে পৌঁছলাম। নাইলের পাড়ে আকাশচুম্বী এক দৃষ্টিনন্দন ভবন। এর স্থাপত্য সৌন্দর্য সমগ্র মিশরে পতাকা ফলক হয়ে আছে। অনুমান করি ভবনটি পয়ত্রিশ তলার মতো উঁচু। শুনেছি জনাব আমর মুসার মতো একজন হাই প্রোফাইল ডিপ্লোম্যাট ও পলিটিশিয়ানের সুবাদে এমন একটি দৃষ্টিনন্দন বিশাল ইমারতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তার সদর দপ্তর করতে পেরেছে। এটি মিসর সরকারের সচিবালয় হতে পারত। মুসা ১৯৯১-২০০১ পর্যন্ত পররাষ্ট্র মন্ত্রী এবং ২০০১-২০১১ সময়কালে আরব লীগের সেক্রেটারি জেনারেল ছিলেন। গত দশকের মাঝামাঝি তাকে প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারকের উত্তরসূরিও ভেবেছেন অনেকে। ম্যাগনেটিক আর্চের সামনে নিরাপত্তা রক্ষী জিজ্ঞেস করল, ‘বাংলাদেশ অ্যাম্বাসেডর?’

—ইয়েস, বাংলাদেশ অ্যাম্বাসেডর টু স্পেন।

আমার পরিচয় একটু খোলাশা করতে চাইলাম, কারণ একটু পর রাষ্ট্রদূত মিজান এখানে দক্ষিণ এশিয়া ডেস্কের প্রধানের সঙ্গে দেখা করতে আসবেন, আর নিরাপত্তা রক্ষীরা আমাদের দুজনকে গুলিয়ে না ফেলেন। আর্চের পিছনে একজন মহিলা অপেক্ষা করছেন। বয়স মধ্য তিরিশ। তার কাছে আমাকে হস্তান্তর করা হলে জানতে চাইলেন, ‘বাংলাদেশ অ্যাম্বাসেডর?’

—ইয়েস, বাংলাদেশ অ্যাম্বাসেডর টু স্পেন। অ্যাম্বাসেডর সুমাইয়ার সঙ্গে দেখা করতে এসেছি।

আমি পূর্বের জবাবের পুনরাবৃত্তি করি। মহিলাকে একটু দ্বিধান্বিত মনে হয়। তিনি কি আমার উত্তর শুনতে পাননি। কয়েক মুহূর্ত। তাকে অনুসরণ করতে বললে আমি মহিলাটির পিছু নেই। লিফটে আমরা সুমাইয়ার দপ্তরে আসি। আমার তো ওই রকম ধারণা করাই স্বাভাবিক। কিন্তু পরে বোঝা যায় ধারণায় ভালো রকম গড়বড় হয়ে আছে। দপ্তরে একজন কর্মকর্তা আমাকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, ‘এক্সসেলিন্সি, দয়া করে একটু বসুন। মাদাম সুমাইয়া আসছেন।’

আমার জন্য সেদিনের সংবাদপত্র আর আরবীয় চা আসে। চায়ে চুমুকের সঙ্গে সঙ্গে আমি সুমাইয়াকে ভাবি। খুব বেশি দিন নয়। মাত্র বছর দেড়েক আগে আমরা ম্যানিলায় এক পাড়ায় থাকতাম। কারণ ততদিনে আমি দাসমারিনাস ভিলেজ থেকে ফোর্বস পার্কে নতুন বাসায় উঠেছি। দু-তিন মিনিট। বেশি ভাবার সময় পেলাম না। ভিতরের রুম থেকে বেরিয়ে এলেন এক মহিলা। বয়স মধ্য পঞ্চাশে বা তার চেয়ে কম। সুন্দরী। পরনে স্কার্ট। মহিলাকে যথেষ্ট স্মার্ট  মনে হচ্ছে। স্মার্ট বলেই হয়তো আমাকে দেখে একটু থতমত খেলেও হাত বাড়িয়ে বললেন, ‘স্বাগতম। কেমন আছেন?’

—ধন্যবাদ। ভালো আছি।

তার হাত স্পর্শ করে উত্তর দিই। ভিতরে ভিতরে আমি নিজেও কম অপ্রস্তুত নই। আমার বন্ধু সুমাইয়াও এমনি স্মার্ট মেয়ে। তার প্রিয় পোশাকও স্কার্ট। তবে বয়স এর চেয়ে সামান্য কম। আমি বুঝতে পারছি কোথাও ভুল হচ্ছে। মহিলা আমাকে জিজ্ঞেস করেন, ‘আপনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত?’

—হ্যাঁ।

আমার পরিচয় আরও একটু বলার আগে মুখের দিকে তাকিয়ে মহিলাকে এবার সত্যিই বিচলিত পাই। তাতে ভালোই বোঝা যাচ্ছে তার প্রত্যাশিত ব্যক্তি আমি নই। এই আমাকে তিনি চেনেন না। আর তার অধিক্ষেত্রাধীন এলাকায় নতুন কোনো রাষ্ট্রদূত এলে সবার আগে তো তারই জানার কথা। তাকে বললাম, ‘মাদাম, আমাদের কোথাও যেন ভুল হচ্ছে। আমি স্পেনে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত।’

—ও! অ্যাম্বাসেডর।

কণ্ঠে তার বিস্ময়। বলতে থাকেন, ‘এও কি সম্ভব? আমার অপদার্থগুলো কোথায় পেল আপনাকে।’

—সুমাইয়ার সঙ্গে দেখা করতে এসেছি। ম্যানিলায় আমরা একটা সময়...

আমাকে শেষ করতে দেন না তিনি। বলেন, ‘বুঝেছি। আপনাদের এখানকার রাষ্ট্রদূত আজ আমার সঙ্গে দেখা করবে। আর ওরা বাংলাদেশ শুনেই আপনাকে ধরে আনল। সব বোকার দল।

—কিন্তু তাই বা হয় কী করে? পরিচয় দিয়ে আমি বলেছি মাদাম সুমাইয়ার কাছে যাব।

মহিলা এবার হাসেন। হাসতে হাসতে যোগ করেন, ‘নাহ? ভুল হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে দেখছি। আমার নামও সুমাইয়া। দক্ষিণ এশিয়া ডেস্কের ডিজি। কিছুদিন আগে অ্যাম্বাসেডরিয়াল অ্যাসাইনমেন্ট শেষ করে সদর দপ্তরে ফিরেছি।’

—আমি খুবই দুঃখিত মাদাম। আমাকে কি এবার ঠিক জায়গায় পৌঁছে দেয়া যায়?

—অবশ্যই। তবে তার আগে এক কাপ কফি হোক। আর ততক্ষণে ইজিপ্টে আপনাদের অ্যাম্বাসেডর আসতে থাকুন।

—আমার তো সময় করা আছে। দেরি হয়ে যাবে।

‘যাবে না,’ জোর দিয়ে বলেন সুমাইয়া। সোফার পাশে ইন্টারকম। তাতে কল দেন, ‘সুমাইয়া, আর ইউ ওয়েটিং ফর সামওয়ান? চিন্তা কোরো না। তোমার গেস্ট এখন আমার হেফাজতে। কফি শেষ হলে পাঠাচ্ছি।’

আমরা কফিতে চুমুক দিই আর নানা বিষয়ে কথা বলতে থাকি। d

 

 

 

 

 

 

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
২১ জুন, ২০১৮ ইং
ফজর৩:৪৩
যোহর১২:০০
আসর৪:৪০
মাগরিব৬:৫১
এশা৮:১৬
সূর্যোদয় - ৫:১১সূর্যাস্ত - ০৬:৪৬
পড়ুন