ভ্রমণ
মঠের সোনালি শহর বাগানে
ফারুক মঈনউদ্দীন২১ জুন, ২০১৭ ইং
মঠের সোনালি শহর বাগানে
সকালে মান্দালয় হিল রিসোর্ট হোটেলে বেশ আয়েশী ভঙ্গিতে যখন নাস্তা সারছিলাম, তখন লাল লুঙ্গির মধ্যে সাদা শার্ট ইন করে পরা মোটাসোটা এক লোককে জানালার বাইরে হেঁটে যেতে দেখি, তখনই মনে কু-ডাক দিচ্ছিল, এই লোক আমাদের গাইড নয়তো! দুদিনের সান্নিধ্যের পর সুন্দরী গাইড জিন কাল রাতে বিদায় নিয়েছে। আজ আমাদের মান্দালয় থেকে সড়ক পথে বাগান যাওয়ার কথা। দীর্ঘ এই যাত্রায় জিনের মতো অন্য কাউকে আশা করছিলাম। কিন্তু নাস্তা সেরে লবিতে নামতেই সেই লাল লুঙ্গি আর সাদা শার্ট পরা পেট মোটা লোকটি আমাকে পাকড়াও করে। তার হাতের যে দলিল দস্তাবেজ সে দেখায় তাতে আমার আর আপত্তি বা অস্বীকার করার কিছুই থাকে না যে এর সাথেই আমাদের মান্দালয় থেকে বাগানের দীর্ঘ পথ এবং বাগান নগরীতে দুটো দিন কাটাতে হবে। আমরা ভ্রমণসূচি পরিবর্তন করতে পারি, কিন্তু ভ্রমণসঙ্গী বদলাতে পারি না বলেই মিনমিন নামের গাইডটির সাথে শুরু হয় আমাদের বাগানযাত্রা।

সেদিন ছিল ঈদুল আজহার দিন, ভেবেছিলাম মান্দালয় থেকে বাগানের দীর্ঘ পথে চোখে পড়বে মুসলমানদের পশু কোরবানির পরিচিত দৃশ্য, কিন্তু প্রায় চার ঘণ্টার রাস্তায় এরকম কোনো কিছুই চোখে পড়ে না। ঘণ্টা দেড়েক চলার পর একটা ছোট বাজারের একপ্রান্তে একটা চায়ের দোকানে যাত্রাবিরতি করি আমরা। গ্রামের দোকানের মতো শনের ঘর, ভেতরে টেবিল ঘিরে সস্তা প্লাস্টিকের চেয়ার। সামনের দিকটা পুরো খোলা। আমরা ছাড়া দোকানে আর কোনো খদ্দের নেই। বৃদ্ধ মালিক একটা হেলান দেওয়া চেয়ারে আধশোয়া হয়ে আমাদের দিকে নিস্পৃহ দৃষ্টিতে তাকায়। এক মহিলা এসে মিনমিনের কাছ থেকে চায়ের ফরমায়েশ নিয়ে যাওয়ার পর আরেক তরুণ টেবিলে রেখে যায় জগভর্তি পানি এবং গ্লাস। চা পানে কিছুটা চাঙ্গা হয়ে আবার যাত্রা করি আমরা। ঘণ্টাখানেক চলার পর একটা বাজারের মধ্যে সামনের কিছু একটা ঝামেলায় আমাদের বহনকারী গাড়িটি যখন প্রায় আধা ঘণ্টাখানেক আটকে থাকে, ভাবছিলাম হয়তো রাস্তা বন্ধ করে ঈদের নামাজ হচ্ছে, যা প্রায়ই আমাদের দেশে হয়ে থাকে। আমাদের গাইড মিনমিন কিংবা ড্রাইভার কারোরই কোনো ধারণা নেই কী কারণে রাস্তা বন্ধ। রাস্তায় জটলা করা একজনের কাছ থেকে জিজ্ঞেস করে মিনমিন জানতে পারে সামনের রাস্তা একটা স্থানীয় শোভাযাত্রার কারণে রাস্তা বন্ধ হয়ে আছে। সেটি কীসের শোভাযাত্রা, তা আর জানা হয় না আমাদের। এই জটলা ছাড়তে কত সময় লাগবে কেউ বলতে পারছে না। তাই গাড়ির চালক আমাদের দেশের এলজিইডির স্থানীয় সড়কের মতো একটা বিকল্প রাস্তা ধরে আবার মান্দালয়—বাগান হাইওয়েতে উঠে আসে।

দৃষ্টিসীমার মধ্যে বাড়িঘর কিংবা রাস্তায় মানুষজন চোখে পড়ে না একেবারেই। দূরে কোথাও পাহাড়-সারি, আর কিছুদূর পর পর তালবাগান দূর আকাশের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়ানো। কোথাও বা তালগাছের মাথা ঠেকেছে সাদা মেঘের গায়ে। এসব দৃশ্য দেখতে দেখতে মিনমিন আমাদের জানায় আমরা বাগান নগরীর উপকণ্ঠে পৌঁছে গেছি। পথের ধারে আচমকা দুয়েকটা পলেস্তরা খসা স্তূপ দেখে সেটা বোঝা যাচ্ছ। বাগানকে বলা যায় স্তূপ আর প্যাগোডার নগরী। মিনমিন জানায় বাগান নগরীর ৪২ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের মধ্যে তিন হাজারেরও বেশি প্যাগোডা ও স্তূপ ছিল। তবে এতগুলো এখন আর নেই, কালের আবর্তনে এবং ভূমিকম্পে অনেকগুলো ধ্বংস হয়ে গেলেও দুই হাজারের মতো টিকে আছে এখনো। মিনমিন আরেকটা প্রয়োজনীয় তথ্য জানায় এখানকার স্তূপগুলো মূলত দুই ঘরানার :শ্রীলঙ্কান ও বার্মিজ। শ্রীলঙ্কান ধাঁচেরগুলোর ভেতর ঢোকা যায়, বার্মিজ ধাঁচেরগুলো কেবলই নিরেট স্তূপ, ভেতরে ঢোকার কোনো ব্যবস্থা নেই।

এসব শোনাতে শোনাতে রাস্তা ছেড়ে একটা সমতল জায়গার ঝাঁকড়া একটা নিম গাছতলায় নিয়ে আমাদের হাজির করে মিনমিন। গাছের নিচের পাতা আছে বিশাল মাদুর, তার ওপর কিছু গোল বসার আসন। মিনমিন জানায় এখানে আমাদের জন্য বনভোজনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। আমাদের বিস্ময়ে তাক লাগার অবস্থা। ভারী চুপচাপ ছায়াঘেরা জায়গাটা থেকে যেদিকেই তাকাই চোখে পড়ে অনুচ্চ গাছপালা আর ঝোপঝাড়ের আড়াল থেকে উঁকি দেওয়া অতি প্রাচীন স্তূপ কিংবা প্যাগোডার চূড়া। এসব দেখতে দেখতে অন্য একটা ছোট গাড়িতে আমাদের খাবার এসে পৌঁছায়। বড় বেতের ঝুড়ির ভেতর থেকে কয়েকটা বড় টিফিন ক্যারিয়ার নামিয়ে প্লেট-বাটি সাজাতে শুরু করে দুজন লোক। টিফিন ক্যারিয়ার দেখে আমাদের সবার চোখ অতীতাশ্রয়ী হয়ে পড়ে। আজকাল এই জিনিস শহর-গঞ্জে আর খুব বেশি একটা দেখা যায় না, আউটডোর খাবারের সবই আসে কাগজের বোর্ডের বাক্সে। দীর্ঘ চার ঘণ্টার পথযাত্রায় সবাই বেশ ক্ষুধার্ত থাকলেও এমন অভাবনীয় পরিবেশে কারোরই যেন খাবারের গরজ নেই। আমাদের উসখুস ভাব দেখে মিনমিন বলল, ‘পথের মাঝে চায়ের দোকানে যে বোতল খুললেন, তেমন সমস্যা ছিল না, কিন্তু এখানে একটু রেখে ঢেকে...। চারপাশে এত মঠ, তাই কেউ দেখলে আপত্তি করলেও করতে পারে।’ আপত্তি করার মতো কোনো জনমনিষ্যি আশপাশে দেখা যায় না। এক রাখাল বালক এবং আরেক বালিকা দুজন দুই পাল গরু চরাচ্ছিল খুব কাছেই। কিন্তু তারা আমাদের দেখার পর থেকে যেভাবে পেছন ফিরে রয়েছে, তাদের যুতসই কোনো ছবি তোলার সুযোগই পাচ্ছি না। এই মুখ ফিরিয়ে রাখার উদ্দেশ্য দু রকম হতে পারে, এক ভিনদেশি টুরিস্টদের প্রতি সম্মান দেখিয়ে তাদের প্রাইভেসি বজায় রাখা, কিংবা ভিনদেশি টুরিস্টের ফটোর বিষয়বস্তু না হওয়া। আমাদের খাওয়া শেষ হওয়ার আগেই রাখাল দুজন ঘাস খেতে থাকা গরুর পালের সাথে ধীরে ধীরে এগোতে এগোতে একসময় দৃষ্টির আড়ালে চলে যায়। এই পুরো সময়টাতে তারা একবারের জন্যও আমাদের দিকে ফিরে বা চোখ তুলে তাকায়নি।

আমাদের খাওয়া শুরু করার তাগাদা দিয়ে মিনমিন বলল, ‘আজকের আইটেমের মধ্যে বার্মার একটা স্পেশাল খাবার আছে, আগে অন্য কোথাও হয়তো খাওয়ার সুযোগ হয়নি আপনাদের। সেটা হলো চা পাতার সালাদ—‘লাপেতো’। গাছ থেকে সবুজ পাতা তোলার পর সেখান থেকে সালাদের পাতা বাছাই করে আলাদা করে ফেলা হয়। সেই পাতার সাথে চিনা বাদাম কিংবা কাজুবাদাম, রসুন, শিমের বিচি, টমেটো ইত্যাদি মিশিয়ে তৈরি করা হয় চাপাতা সালাদ।’ মিনমিনের কথাই ঠিক, আইটেমটা আমাদের জন্য যেমন ছিল অভূতপূর্ব, তার স্বাদটিও অনাস্বাদপূর্ব। মেন্যুতে আরও ছিল মাংস, সবজি, সাদা ভাত ও নুডলস। তাকে আমাদের সাথে খেতে বললে সে তার সাহায্যকারী দুজনকে নিয়ে দূরে গাড়ির কাছে চলে যায়, সেখানেই খাবে ওরা। এরকম খোলা মাঠের হালকা বাতাসে গাছের ঘন ছায়ায় অভিনব ধরনের খাবার খাওয়ার পর আমাদের আরও কিছুক্ষণ বসে গুলতানি মারতে ইচ্ছে করে। কিন্তু গাইডদেরও ডিউটির নির্দিষ্ট সময় এবং বিশ্রাম দরকার বলে মিনমিন বিনীতভাবে আমাদের উঠে পড়তে বলে। অগত্যা এরকম চমত্কার পরিবেশে আমাদের খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে ওকে মুহুর্মুহু ধন্যবাদ জানিয়ে আমরা রওনা হই।

একটা আদর্শ মফস্বল শহরের মতো বাগানের ছায়াঘেরা রাস্তাঘাট ধরে যেতে যেতে চোখে পড়ে সাধারণ দোকানপাট, দোকানের সামনে ঝুলিয়ে রাখা সস্তা কাপড়-চোপড়, নানা সামগ্রী, রাস্তায় হালকা যানবাহন। আধাঘণ্টার মধ্যে আমরা পৌঁছে যাই আমাদের দু রাতের আবাস অরিয়াম প্যালেস রিসোর্টে। হোটেলের রিসেপশন থেকে শুরু করে সবগুলো কটেজ বর্মি তথা চীনা স্থাপত্যবৈশিষ্ট্য সম্পন্ন। পুরো ২৭ একর জায়গার মধ্যে একটিও দোতলা ঘর নেই, সবক’টি একতলা কটেজ। এখানে আমাদের হাওলা করে দেওয়ার পর সেদিনের মতো মিনমিনের ছুটি, আজ ট্যুর কোম্পানির ভ্রমণসূচির ভাষায় আমাদের ফ্রি টাইম। রাতে আমাদের খাবার ব্যবস্থা কটেজের দূরপ্রান্তের একমাত্র দশতলা উঁচু টাওয়ারের ওপর রেস্তোরাঁয়।

চেক ইন করার পর আমাদের কিছু করার নেই বলে আমি ক্যামেরা হাতে বেরিয়ে পড়ি গাছগাছালি ঘেরা বিশাল এলাকাটার মধ্যে—যদি কিছু ভালো ছবি তোলা যায়। কিন্তু আমার পিছু নিয়ে দুই মহিলা সাজগোজ করে বেরিয়ে এলে আমার ছবি তোলা মাথায় ওঠে। সিদ্ধার্থ হক কিছুক্ষণ গড়িয়ে নেবার পাঁয়তারা করছিল, কিন্তু রূপালী চৌধুরীও যখন আমাদের সাথে যোগ দেয়, তখন ও আর ঘরে বসে থাকে কীভাবে? মাথায় কাঠগোলাপ ফুল গুঁজে, কখনোবা গাছের বাঁকানো ডালের পেছন থেকে মাথা হেলিয়ে নানা ভঙ্গিমায় মহিলাদের ছবি তুলতে তুলতে সুইমিংপুলের পশ্চিম দিকে কাটা পেন্সিলের মতো মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকা তিনটি প্রাচীন প্যাগোডার চূড়ার পেছনে সূর্য দিগন্তের ওপর ঢলে পড়ে। পড়ন্ত বিকেলের তীব্র আলোকচ্ছটার সোনালি কিরণ পুলের জলের আয়নায় স্নানরতা বালিকার মতো ভেসে থাকে। তার পেছন দিকে একটা বড় দিঘির মতো জলাশয়ের পাশে ছবির মতো তালগাছের সারি, সেগুলোর প্রতিবিম্ব জলের আয়নায় ঠিকরে পড়ে। পড়ন্ত সূর্যের আলো অপার্থিব লাল রং গায়ে মেখে পড়ে থাকে গাছের গোড়ায়। আমরা সুইমিংপুলের প্রান্তে বসে দ্রুত পরিবর্তনশীল আলোর খেলা দেখি। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই দূরের প্যাগোডার অবয়ব সিল্যুয়েট হয়ে যায়। চারপাশ অন্ধকারে ঢেকে গেলে ডিনারের আগে পর্যন্ত আমাদের আর কিছু করার নেই। ঘরে ফিরে ইন্টারনেটে বাগানের ওপর কিছু পড়াশোনা করতে গিয়ে কিছু চমকপ্রদ তথ্য পাওয়া যায়। ইতিহাসের বেশি পেছনে না গিয়ে বাগানের সমৃদ্ধ সময়টাকেই উল্লেখযোগ্য মনে হয়।

ক্ষমতা দখল করে ১০৪৪ সালে সিংহাসনে বসা রাজা অনরাথার সময় থেরবাদী বৌদ্ধধর্মের উত্কর্ষের কারণে বাগান মূলত উল্লেখযোগ্য বৌদ্ধ নগরীতে পরিণত হয়। বাগানের বিশাল শোয়েজিগন প্যাগোডাটা এসময়ই নির্মিত হয়েছিল। এসময় বার্মার মন জাতির কাছে গচ্ছিত ছিল পবিত্র ত্রিপিটকের মূল খণ্ডগুলো। এই মনরা ছিল একটা সমৃদ্ধ জাতি, তাই রাজা তার প্রজাদের উত্সাহিত করতেন মনদের কাছ থেকে বিভিন্ন বিদ্যা আহরণ করার জন্য। একপর্যায়ে রাজা অনরাথা মনদের কাছ থেকে ত্রিপিটকের মূলখণ্ডগুলো হস্তগত করতে চাইলে মন রাজা মানুবা সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। মরিয়া অনরাথার কাছে তখন শক্তিপ্রয়োগ ছাড়া আর বিকল্প কিছু ছিল না। ফলে ১০৫৭ সালে পাগান রাজা মনদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে তাদের পরাজিত করেন।

বিজয়ী অনরাথা ৩২টি সাদা হাতির পিঠে করে মূল পালি ত্রিপিটকের সাথে বৌদ্ধ ধর্মের বিভিন্ন নিদর্শন এবং মূল্যবান ধনরত্ন বাগানে নিয়ে এসেছিলেন। বিজয়ী বাহিনী তাদের সাথে নিয়ে আসে ৩০ হাজার মন যুদ্ধবন্দী, যাদের মধ্যে ছিল দক্ষ কারিগর, চিত্রশিল্পী, রাজমিস্ত্রী, কামার, রৌপ্যকার, তাম্রকার, চিকিত্সক, হাতি এবং ঘোড়ার প্রশিক্ষক, কামান তৈরির কারিগর, সুগন্ধি প্রস্তুতকারী এবং আরও নানা বিষয়ে দক্ষ লোকজনকে। এই বিশাল দক্ষ জনশক্তির কারণে পরবর্তী দুইশ বছর ছিল বাগানের স্বর্ণযুগ।

এখানে নির্মিত হয় বিভিন্ন আকার ও আকৃতির দশ সহস্রাধিক মঠ ও স্তূপ। মার্কো পোলো ১২৮২ সালে বার্মা ভ্রমণ করেছিলেন। বাগান সম্পর্কে লিখতে গিয়ে এই নগরীকে তিনি উল্লেখ করেছিলেন ‘ঘণ্টার টুংটাং আর ভিক্ষুদের বস্ত্রের খসখস শব্দের সোনালি শহর’ হিসেবে। বৌদ্ধ ধর্মের পীঠস্থান হিসেবে সেসব সময় বৌদ্ধধর্ম চর্চার জন্য বাগানে আসতেন চীন, থাইল্যান্ড, নেপালসহ বিভিন্ন বৌদ্ধপ্রধান দেশের পণ্ডিত ও ভিক্ষুরা। বাগান রাজ্যকে বিজিত মানুষদের দিয়ে সমৃদ্ধি এনে দিলেও রাজা অনরাথার মৃত্যু হয়েছিল মোষের শিঙে গেঁথে।   

রাজা নারাথিপাতির (১২৩৫-১২৮৬) সময় থেকে বাগানের ক্ষয়িষ্ণু অবস্থার শুরু। অতিমাত্রায় উত্সাহী রাজা ১২৭৪ সালে নির্মাণ করান বিশাল মিঙ্গালাজেদি প্যাগোডা। এটা তৈরির খরচ জোগাতে গিয়ে বাগানের রাজকোষের অবস্থা সঙ্গীন হয়ে পড়ে। ঠিক যেমন করে তুরস্কের সুলতান প্রথম আবদুল মেজিদ ইউরোপীয় ধাঁচে দোলমাবাচে প্রাসাদ নির্মাণ করতে গিয়ে দেশটিকে দেউলিয়াত্বের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দিয়েছিলেন। এছাড়াও ধারণা করা হয়, চাষযোগ্য জমি অধিগ্রহণ করে এত বেশি মঠ আর প্যাগোডা তৈরি করা হয়েছিল যে, রাজা নারাথিপাতির সময়ে ফসল উত্পাদন কমে গিয়ে রাজ্যের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে যায়। পঞ্চদশ শতাব্দী নাগাদ বাগান প্রায় পরিত্যক্ত নগরীতে পরিণত হয়। মঠগুলোর দুর্দশাও ওঠে চরমে। তবে তীর্থযাত্রীদের কল্যাণে বাগানের কয়েকটা প্যাগোডা এখনও স্বমহিমায় টিকে আছে।

জুডিথ গ্রেগরি স্মিথের ভ্রমণস্মৃতি গ্রন্থ ‘মিয়ানমার :অ্যা মেমোয়ের অব লস অ্যান্ড রিকভারি’ অনুযায়ী রাজা অনরাথার সময় থেকেই চীন সম্রাটকে কর দেওয়ার হতো, কিন্তু নারাথিপাতি করদ রাজ্য হিসেবে থাকতে না চেয়ে কর দিতে অস্বীকার করেন। স্মর্তব্য এসময় চীনও ছিল মঙ্গোল শাসনাধীন, কুবলাই খান তখন চীন সম্রাট। তিনি এক হাজার অশ্বারোহী সৈনিকসহ ১০ জন দূত পাঠান পাগান রাজার কাছে কর দাবি করার জন্য। বার্মার প্রাচীন শিলালিপি থেকে উদ্ধারকৃত বর্ণনায় জানা যায়, এই দাবির মধ্যে ছিল সোনার চালভাণ্ড, ভাপে রান্না করার জন্য সোনা ও রুপার হাঁড়ি, সোনা ও রুপার হাতা বা বড় চামচ ইত্যাদি। ভিন্নসূত্রে প্রকাশ, দাবির মধ্যে সাদা হাতিও ছিল। এই দূতেরা নাকি রাজার সামনে পৌঁছার পর সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করেনি। তাদের দাবিগুলো শোনার পর মন্ত্রীদের উপদেশ উপেক্ষা করেই রাজা নারাথিপাতি এই অসম্মানের প্রতিবিধান করতে দূতদের হত্যা করার নির্দেশ দেন। চীন সম্রাটের কাছে এই দুঃসংবাদ পৌঁছালে তিনি একের পর এক অভিযান পরিচালনা করেন পাগান রাজার বিরুদ্ধে। কিন্তু চীনা বাহিনীকে কোনোবারই ইরাবতী নদী পার হতে দেয়নি বর্মি সেনারা। তবে দীর্ঘ প্রতিরোধে ক্লান্ত হয়ে একপর্যায়ে পর্যুদস্ত হয় তারা, ফলে চীনা বাহিনী ইরাবতী অতিক্রম করার সুযোগ পায়।

রাজা নারাথিপাতি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য নগরীর রক্ষা প্রাচীরকে আরও উঁচু করে দৈর্ঘ্য বাড়ানোর নির্দেশ দেন। এই কাজের জন্য প্রচুর ইটের প্রয়োজন ছিল বলে দ্রুততম সময়ে ইটের যোগান নিশ্চিত করার জন্য ভেঙে ফেলা হয় এক হাজার বড় এবং ১০ হাজার ছোট মঠ এবং ইটের তৈরি ৩০০ আশ্রম। এই ভাঙচুরের সময় এক প্যাগোডায় লাল তামার একটা ফলক পাওয়া যায়, যেখানে ভবিষ্যদ্বাণী লেখা ছিল যে, পাগান রাজ্য ধ্বংস হবে যমজ সন্তানের পিতা এমন কোনো রাজার হাতে। খোঁজ নিতে গিয়ে জানা গেল রাজা নারাথিপাতির এক রক্ষিতার গর্ভে জন্মেছে যমজ সন্তান। এই খবরে রণে ভঙ্গ দিয়ে পালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন রাজা।

তবে বর্মি বাহিনী ঠিক কীভাবে পরাজিত হয় সে সম্পর্কে একাধিক মত আছে। মার্কো পোলোর ভাষ্যে জানা যায়, চীনারা বার্মা দখল করে কেবল বাজিকর আর ভাঁড়দের দিয়ে। অন্যদিকে বর্মি ইতিহাস দাবি করছে চীনারা ৬ লক্ষ সেনা নিয়োজিত করেছিল এই যুদ্ধে। তবে বেশিরভাগ ইতিহাসবিদ মনে করেন চীন-মঙ্গোল বাহিনীর ছিল ১২ হাজার অশ্বারোহী সৈনিক এবং কয়েক হাজার পদাতিক।

রাজভাণ্ডারের যাবতীয় সোনাদানা এবং অন্যান্য মূল্যবান সম্পদের জন্য এক হাজার, রাজার পরিবার ও আমাত্যবর্গের পরিবারের জন্য এক হাজার এবং সঙ্গে করে ধান নিয়ে ইত্যাদি খোরাকি পরিবহনের জন্য এক হাজার নৌকা ব্যবহার করা হয়েছিল। কিন্তু রাজার শ তিনেক রক্ষিতার জন্য আর কোনো নৌকার ব্যবস্থা না থাকায় রাজা নাকি নির্দেশ দিয়েছিলেন তাদের হাত-পা বেঁধে নদীতে ফেলে দিতে। শেষাবধি রাজগুরুর হস্তক্ষেপে তাদের প্রাণ রক্ষা পেয়েছিল। ভিক্ষু এবং সাধারণ লোকজনকে হরিলুটের মতো তাদের পছন্দমতো যেকোনো মেয়েকে পছন্দ করে নিয়ে যাওয়ার পাইকারি অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।

রাজা নারাথিপাতির কোনো এক সন্তান তাকে বিষ প্রয়োগে হত্যা করার পরের বছর (১২৮৭) কুবলাই খানের তাতার বাহিনী নগরীতে আক্রমণ চালিয়ে পাগান রাজত্বের বড় অংশ দখল করে নিয়েছিল। তবে যে রকম আশঙ্কা করা হয়েছিল সেরকমভাবে তাতাররা পাগানে লুণ্ঠন চালায়নি। কারো মতে বার্মার প্রচণ্ড গরম সইতে না পেরে ছয় মাসের মাথায় বার্মা ছেড়ে চলে যায় ওরা। অন্য ভাষ্যমতে কুবলাই খান বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন বলে তাঁর বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছিলেন যাতে রাজ্যের মঠ বা অন্যান্য ধর্মীয় স্থাপনাগুলো ধ্বংস করা না হয়। এটিই হয়তো সত্য, তা না হলে এখন বাগানে এত সব মঠ আর স্তূপ দেখা যেত না।

আগের রাতে আমাদের ডিনার হয়েছিল হোটেলের একপ্রান্তের দশতলা টাওয়ারের ওপরের রেস্তোরাঁয়। চারপাশে গ্রামের মতো পরিবেশ বলে রাতের অন্ধকারে অত ওপর থেকে কিছুই দেখা যায় না। সকালে আমাদের নিয়ে বের হয় মিনমিন। মফস্বলী চেহারার বাগান শহরের রাস্তা দিয়ে আমাদের দেশের মতো নাসিমন ধরনের গাড়ি চলতে দেখে অবাক হই না। পথে যেতে মিনমিন আমাদের বলে বাগানের এখানে সেখানে অনেক প্যাগোডা আর স্তূপ দেখতে পাচ্ছেন, এগুলোর অনেকগুলোই ১৯৭৫ সালের ভূমিকম্পে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ১৯৯০-এর দশকের শেষদিকে বাগানের পুরনো অংশ থেকে বাসিন্দাদের উত্খাত করে নতুন বাগান নামের বসতিতে পুনর্বাসন করে সরকার। এটা নিয়ে হাঙ্গামাও কম হয়নি, কিন্তু সেনা শাসিত সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলবে কে? পুরানো বাগানের ঐতিহ্য এবং পুরাকীর্তিগুলো সংরক্ষণের জন্যই সরকারের এই পদক্ষেপ। নতুন আধা-গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় আসার পর বার্মায় টুরিস্টের আগমন বেড়েছে, তার সাথে বেড়েছে আবাসিক হোটেলের চাহিদা এবং নির্মাণ। ২০১২ সালে পুরোনো বাগানে যেখানে হোটেলের সংখ্যা ছিল মাত্র দুটি, তিন বছরের মাথায় সেখানে এই সংখ্যা ৮০ ছাড়িয়ে গেছে। সরকার টুরিস্টের আমদানিতে একদিকে যতখানি খুশি, অন্যদিকে জমির দাম বেড়ে যাওয়ায় ততটুকুই উদ্বিগ্ন।

মিনমিনের এসব বর্ণনার মাঝে আমরা পৌঁছাই বাগানের বিখ্যাত লেকার ভিলেজে। এখানকার এই শিল্পটি না দেখলে আমাদের কোনো ধারণাই হতো না কী পদার্থ দিয়ে শক্ত প্লাস্টিকের মতো হালকা বিভিন্ন ধরনের জিনিস তৈরি হয়। সরু একটা রাস্তা দিয়ে শহরতলীর লোকালয়ের ভেতর দিয়ে যেতে যেতে এক জায়গায় আমাদের নামিয়ে একটা বাড়ির ভেতর নিয়ে যায় মিনমিন। যে বড় ঘরটিতে আমরা ঢুকি সেটা একটা কারখানা, কিন্তু কীসের কারখানা ঠিক বুঝে উঠতে পারি না। ঘরটির একপাশে বসে লাজুক চেহারার এক তরুণ বাঁশের কঞ্চি দিয়ে ছোট ছোট ঝুড়ি বানাচ্ছিল, ঠিক যেমন করে বিভিন্ন এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে আমাদের গ্রামের দরিদ্র মহিলারা ঝুড়ি, ধামা ইত্যাদি বানায়। তবে এখানে বানানো জিনিসগুলো আমাদের বানানো ঝুড়ি ইত্যাদির চেয়ে ঢের নিখুঁত ও মসৃণ, বলে না দিলে মনে হবে যেন বেতের তৈরি। ঘরটির অন্য মাথায় পাঁচজন কিশোরী বা তরুণী একটা বড় চৌকির ওপর পাশাপাশি বসে চকচকে বাটি, বাক্স ইত্যাদির গায়ে লম্বা পেন্সিলের মতো ধারালো ধাতব সুঁই দিয়ে নকশা ফোটাচ্ছে।

আমাদের জন্য পেতে দেওয়া চেয়ারে সবাই বসার পর মূল শিল্পীর মঞ্চে আসার মতো বেজায় স্মার্টদর্শন সুন্দরী এক রমণী এসে আমাদের মুখোমুখী নির্দিষ্ট চেয়ারে বসে। বর্মি পোশাকের জায়গায় তার গায়ে বিদেশিনী কর্পোরেট এক্সিকিউটিভের মতো জংলী ছাপের সিল্কের শার্ট আর কালো ট্রাউজার। দাঁতে ব্রেস লাগানোর কারণে মহিলার চেহারায় অন্য একধরনের আবেদন ফুটে ওঠে। ওখানে যাওয়া এবং অপেক্ষা করার জন্য শুদ্ধ চোস্ত ইংরেজিতে আমাদের এক প্রস্থ ধন্যবাদ জানিয়ে বলল, ‘আমার নাম মঅ। আমি আপনাদের দেখাব কীভাবে ল্যাকার দিয়ে আমরা নানা ধরনের জিনিসপত্র বানাই।’

এখানে উল্লেখ করা দরকার ল্যাকার এক ধরনের বার্নিশ। এই বার্নিশ তৈরি হয় বিশেষ এক প্রজাতির গাছ থেকে নিঃসৃত স্বচ্ছ রঙিন রজন থেকে। বর্মি ভাষায় এই গাছের নাম থিট সি। বার্মার বিভিন্ন অঞ্চলে এই গাছ জন্মালেও বাগানে এই গাছ প্রায় সর্বত্র পাওয়া যায়। আমাদের দেশে রাবার গাছ থেকে যেভাবে কষ সংগ্রহ করা হয়, থিট সি গাছের কাণ্ড থেকে রজন সংগ্রহ করা হয় ঠিক একই কায়দায়। রজনের গুণ হলো এটি উজ্জ্বল মসৃণ এবং জল ও পোকামাকড়রোধী। বাতাসের সংস্পর্শে এলে এটি কঠিন পদার্থে রূপান্তরিত হয়। তিন হাজার বছর আগে রজনশিল্পের উদ্ভব হয়েছিল চীনে। সেখান থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে এই শিল্প বিস্তার লাভ করে। দ্বাদশ শতাব্দীতে বাগানে প্রথম এই শিল্প চালু হয়।

মঅয়ের বর্ণনা থেকে জানা যায়, বাঁশের কঞ্চি দিয়ে তৈরি পাত্রের গায়ে চড়ানো হয় এই বার্নিশ। প্রথম দফায় যখন বার্নিশ চড়ানো হয় সেটির সাথে মেশানো থাকে ছাই, কোনো স্তরে বিশেষ গাছের কয়লার গুঁড়ো। এই স্তর শুকিয়ে নেওয়ার পর শিরিষ কাগজ ঘষে মসৃণতা বাড়ানো হয়। তারপর ধুয়ে আরেক প্রস্ত বার্নিশ লাগানো হয়। তার পর আবারও শুকানোর জন্য রেখে দেওয়া হয় দ্বিতীয় স্তরের জন্য। এভাবে একের পর এক স্তর বার্নিশ লাগানো হয় প্রত্যেক স্তর শুকিয়ে নেবার পর। মোট কত স্তর বার্নিশ লাগানো হবে তা নির্ভর করে বার্নিশের মান এবং কী তৈরি হচ্ছে তার ওপর। প্রত্যেক স্তরের বার্নিশ লাগানো হয় হাত দিয়ে, কোনো যন্ত্র বা স্প্রে দিয়ে নয়। শুকানোর নিয়মও প্রাকৃতিক, কৃত্রিম ড্রায়ার দিয়ে নয়। প্রত্যেক স্তরে সপ্তাহ থেকে মাসখানেক পর্যন্ত একটা স্যাঁতসেঁতে অন্ধকার ঘরে রেখে দিয়ে এই কাজটা করা হয়, যাতে শুকানোর কাজটা প্রাকৃতিক নিয়মেই হয়। যদি ঘরে আর্দ্রতা থাকলে হয়তো শুকিয়ে যাবে ঠিকই কিন্তু কাজের মান ভালো হবে না। সব শেষে চূড়ান্ত স্তরে লাগানো হয় বিভিন্ন রঙের পরত। এই রং তৈরি হয় বার্নিশের সাথে পারদগুঁড়ো মিশিয়ে। তারপর শুকিয়ে গেলে ধাতব পেন্সিলের ডগা দিয়ে সম্পূর্ণ হাতের দক্ষতায় ফুটিয়ে তোলা হয় নানা নকশা। এই অবিশ্বাস্য সূক্ষ্ম কাজটি করা হয় কোনো নকশা সামনে না রেখে, কেবল বালিকা ও তরুণী শিল্পীদের স্মৃতির ওপর নির্ভর করে।

মঅ তার উপস্থাপনা শেষ করে বলল, ‘আমাদের শোরুমে ঢুকলে বুঝতে পারবেন কত ধরনের জিনিস আমরা বানাই।’ শোরুমে ঢোকার আগে ওকে জিজ্ঞেস করি, ওর এত ভালো ইংরেজি বলার রহস্য কী? জবাবে ও জানায়, রেঙ্গুন ইউনিভার্সিটি থেকে পাস করে বাপ-দাদার ব্যবসায় হাল ধরেছে ও। ধারণা করি বিদেশে কয়েক বছর পড়াশোনা করে এসেছে ও, তা না হলে দেশে থেকে ইংরেজির এই বাচনভঙ্গি রপ্ত করা সম্ভব নয়। মহিলা বেশ চাল্লু এবং উচ্চ শিক্ষিতা বলেই পুরো বংশের সব খুড়তুতো-পিসতুতো ভাই-বোনদের এখানে কাজে লাগিয়ে দিয়ে রমরমা ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। লেকারশিল্পে যারা কাজ করে, তারা পুরুষানুক্রমে এই কারিগরিতে হাত পাকিয়েছে। মঅদের কারখানাটিও চলে আসছে বংশ পরম্পরায়।

বিশাল শোরুমে ঢুকে থরে থরে সাজিয়ে রাখা বিভিন্ন জিনিস দেখে বিশ্বাস করা কঠিন হয়ে পড়ে এই সমস্ত কাজ বাঁশের কঞ্চির ওপর পরতের পর পরত বার্নিশ চড়িয়ে কোনো যন্ত্রের সাহায্য ছাড়াই তৈরি করা যায়। গ্লাস, থালা, বাটি, চায়ের কাপ, টি পট, টিফিন ক্যারিয়ার, ফুলদানি, ভাণ্ড, গয়নার বাকশো, টেবিল, বড় সিন্দুক, ছোট আলমারি, চেস্ট অব ড্রয়ার, ঘরের অস্থায়ী পার্টিশন, এমনকি পানের বাটা পর্যন্ত তৈরি করছে এরা। মঅ বলল, ‘আজকাল ম্যালামাইন আর প্লাস্টিকের সস্তা জিনিসপত্রের কাছে হেরে যাচ্ছে আমাদের লেকার শিল্প, তার ওপর আছে চীনামাটির ক্রোকারিজ। তাই ছোটখাটো অনেক লেকার ফ্যাক্টরি বন্ধ হয়ে গেছে। সবার তো আমাদের মতো বড় শোরুম, বিদেশি বায়ার নেই। এখনও আমাদের লক্ষ্মী হচ্ছে আপনাদের মতো টুরিস্টরা। তাছাড়া আমরা বিদেশেও রফতানি করি। আমাদের মূল বাজার প্যারিস, বছরে প্রায় এক লাখ ডলারের মতো রফতানি হয় আমাদের।’

আমরা কয়েকটা গৃহসজ্জার আইটেম পছন্দ করলে মঅ আগ বাড়িয়ে তাতে কিছুটা ডিসকাউন্ট দিয়ে দেয়। বুঝতে পারি এটাও তার একধরনের বিক্রয়দক্ষতা। বর্মি নারীরা পুরুষদের তুলনায় পরিশ্রমী জানতাম, মঅকে দেখে বুঝতে পারি, তাদের পরিশ্রম কেবল কায়িক নয়, ব্যবসাবুদ্ধিতেও তারা এগিয়ে।

গাড়িতে ওঠার পর মিনিমিন জানায় আমাদের এবারের গন্তব্য বাগানের আনন্দ মঠ। ১১০৫ খ্রিষ্টাব্দে রাজা অনরাথার পুত্র ও উত্তরাধিকারী রাজা কিয়ানসিত্ত্বার আমলে তৈরি এই মঠ বাগানের অবিকৃত এবং অক্ষত গোটা চারেক মঠের একটি। এটার গঠনশৈলীর কারণে এটাকে বার্মার কোনো মঠ বলে মনে হয় না। এমনকি নামটিকেও ভারতীয় মনে হয়। কেউ কেউ এটিকে ওড়িষ্যার উদয়গিরি মন্দির এবং বাংলাদেশের পাহাড়পুর মহাবিহারের সাথে তুলনা করেছেন। কারো মতে এটির আকৃতি হলো ক্রুশাকার, অর্থাত্ খ্রিস্টানদের ক্রুশের মতো, তাই লন্ডনের হাজার বছরের পুরোনো গির্জা কলেজিয়েট চার্চ অব সেন্ট পিটার অ্যাট ওয়েস্ট মিনিস্টারের সাথে তুলনা করে কেউ কেউ এটিকে বার্মার ওয়েস্টমিনিস্টর অ্যাবে বলেও অভিহিত করে।

আনন্দ মঠের পশ্চিম দিকের দরজা দিয়ে ঢুকে করিডোর পেরিয়ে মিনমিনের সাথে ডানদিকের এক প্রশস্ত চাতালে পৌঁছি আমরা। ঢোকার মুখে বাইরে জুতা খুলে রেখে আসতে হয় বলে সবাই নগ্নপদ। সেখানে বড় এক শিরিষ গাছের নিচে সিমেন্টে বাঁধানো বেদির ওপর বসিয়ে আমাদের আনন্দ মঠের ইতিহাস এবং বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য নিয়ে একটা নাতিদীর্ঘ ভূমিকা দেয় মিনমিন। ওর কাছ থেকে জানা যায় ১৯৭৫ সালের ভূমিকম্পে মঠটির যথেষ্ট ক্ষতি হয়েছিল। ভেঙে পড়েছিল ওটার চূড়া। পরে মেরামতি করে প্রায় আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হয়েছে। ছোট বুদ্ধমূর্তিগুলো রাখা হয়েছে ভেতরের বিভিন্ন কুলুঙ্গিতে। আমরা যেদিন যাই (২০১৬) তখনও রক্ষণাবেক্ষণ কাজ চলছিল, প্যাগোডার কেন্দ্রের ঠিক ওপরে যে উঁচু ছত্রীটা আছে ওটা বিশাল পলিথিনে মোড়া, সেই চূড়া পর্যন্ত বাঁশের প্রশস্ত সিঁড়ি তৈরি করা হয়েছে নির্মাণ শ্রমিকদের ওঠানামার জন্য। মঠটির ৯০০ বছর পূর্তি উদযাপন করার জন্য ১৯৯০ সাল এটির চূড়াগুলোকে স্বর্ণপত্রে মোড়ানো হয়। সেই চূড়া মেরামতির জন্য ঢাকা থাকায় আমরা সোনালি চূড়াগুলো দেখতে পাই না।

প্যাগোডা নির্মাণের ইতিহাস থেকে জানা যায় আটজন ভিক্ষু একবার রাজার প্রাসাদে গিয়ে উপস্থিত হন ভিক্ষা চাইতে। তারা জানান যে এখানে আসার আগে তারা হিমালয়ে নন্দমূল গুহা মন্দিরে থাকতেন। রাজা তাদের প্রাসাদে থাকার আমন্ত্রণ জানালে তারা তাদের আধ্যাত্মিক ক্ষমতায় রাজাকে নন্দমূল মন্দিরের প্রতিবেশের দৃশ্য দর্শন করান। সেই দৃশ্যে অভিভূত হয়ে রাজা বাগানের কেন্দ্রে একটা মঠ নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন। নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার পর রাজা নাকি স্থপতিকে হত্যা করেছিলেন যাতে এই মঠের স্থাপত্যশৈলী আর কোথাও তৈরি না হয়।

মঠের যে দরজা দিয়ে আমরা ঢুকি সেটা একটা করিডোর, তার দুপাশে স্যুভেনির বিক্রেতাদের পশরা সাজানো। মালা, স্কার্ফ, বার্মার বিখ্যাত লেকার সামগ্রী, বই এসব নিয়ে উপচে পড়া বিভিন্ন জিনিসে ঠাসা দোকানগুলো। এখানে আসার আগে যে লেকার কারখানায় গিয়েছিলাম, সেটির শোরুম থেকে সুন্দরী মালকিন মঅয়ের সম্মোহনী বিক্রয়কৌশলে কাবু হয়ে যে কয়েকটা জিনিস কিনেছিলাম, এখানে সেগুলোর দাম অনেক কম দেখে আমাদের একপ্রস্থ তুলোধুনা করে আমাদের সাথের মহিলারা। তাদের আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য আমি দোকানে বিক্রির জন্য রাখা জর্জ অরওয়েলের উপন্যাস ‘বার্মিজ ডেজ’ উল্টেপাল্টে দেখার ভান করি। বার্মার চমত্কার ফটোগ্রাফি নিয়ে উ মং মং নামের এক ফটোগ্রাফারের একটা বই খুব পছন্দ হলেও কেনা হয় না।

সেই পণ্যঠাসা করিডোরের ভেতর দিয়ে প্রায়ান্ধকার একটা গলিপথে মিনমিন আমাদের যেখানে হাজির করায় সেখানে উত্তর মুখো দাঁড়ানো প্যাগোডাটির প্রায় সমসাময়িক বয়সের ত্রিশ ফুট লম্বা কুকুসন্ধ বুদ্ধমূর্তি। এটির দিকে দূর থেকে তাকালে দেখা যায় তার স্মিতহাস্যে ভরা মুখ, কাছে এসে ওপর দিকে তাকালে তার ঠোঁটের গড়ন পাল্টে যায়, হাসিমুখ উধাও, সেই মুখে ভর করে আছে পরম গাম্ভীর্য। মূর্তি গড়ার এই কৌশলটি রাজা কিয়ানসিত্ত্বার কারিগরদের একান্তই নিজস্ব। মঠটির স্থপতিকে যদি নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার পর খুন করে ফেলা হয়, তাহলে এরকম কৌশল জানা কারিগরকেও যে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে, সেকথা নিশ্চিত করে বলা যায় না।

ওখান থেকে এগিয়ে হাতের ডানে গেলে পূর্বদিকে মুখ করে দাঁড়ানো কোনাগমন বুদ্ধের ত্রিশফুটি মূর্তি। এটি নাকি একবার এক অসতর্ক পূজারির অর্ঘ্যপ্রদীপ থেকে ঘটা অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে গিয়েছিল। রাজা মিন্ডনের সময় ক্ষতিগ্রস্ত মূর্তিটির জায়গায় নতুন মূর্তি স্থাপন করা হয়। ঊনবিংশ শতাব্দীতে তৈরি বলে মূর্তিটির চেহারা আগেরটির চেয়ে আধুনিক। এটির ডান হাতের দুই আঙ্গুলের মধ্যে ধরা একটা ভেষজ বড়ি, ধারণা করা হয় এটি বৌদ্ধ দর্শনের দুঃখভোগের নিরাময় ইঙ্গিত করছে।

এখান থেকে এগিয়ে গেলে করিডোরের দেয়ালে দেখা যায় বুদ্ধের জীবন ও ঘটনা নিয়ে ম্যুরাল আর ফ্রেসকো। দেয়ালের বিভিন্ন অংশে নানা আকার ও আকৃতির কুলুঙ্গির ভেতর মূর্তি ও নিদর্শন, অপর্যাপ্ত আলোতে সব ভালোভাবে দেখা যায় না। এগুলো একসময় ইচ্ছাকৃত বা অজ্ঞানতাবশত চুনকাম করে ঢেকে ফেলা হয়েছিল। প্রত্নতত্ত্ববিদেরা বহু কষ্টে উদ্ধার করেছেন সেসব, তবে কালের গ্রাস থেকে সবগুলো ঠিকভাবে উদ্ধার করা যায়নি। কোনো কোনোটিতে দেখা যায় আনাড়ি হাতের তুলির টান। এসব দেখে ভ্যাটিকানের ভেতরের শিল্পকর্মগুলোর কথা মনে পড়ে, তবে ওসব ছিল বিশ্ববিখ্যাত ওস্তাদ শিল্পীদের হাতের কাজ।

আরও সামনে আগে বাড়লেই দক্ষিণমুখী দাঁড়ানো কশ্যপ বুদ্ধের মূর্তি। একটিমাত্র পাইনের গুঁড়ি থেকে তৈরি করা হয়েছে ত্রিশ ফুট লম্বা এই মূর্তিটি। এটির সাথে কুকুসন্ধ বুদ্ধমূর্তিটির যথেষ্ট মিল রয়েছে, দুটোর হাতের ধর্মচক্র মুদ্রার, এমনকি মুখের স্মিত হাসিটিরও। উল্লেখ্য, বৌদ্ধ চিত্রকলায় বুদ্ধের হাতের বিভিন্ন মুদ্রার রয়েছে বিভিন্ন তাত্পর্য। তেমনিভাবে ধর্মচক্র মুদ্রা তিনি তার বুদ্ধত্ব প্রাপ্তির পর প্রথম অভিভাষণে ব্যবহার করেছিলেন।

প্যাগোডার ভেতরের করিডর দিয়ে পুরো একপাক ঘুরে এলে দেখা পাওয়া যায় পশ্চিম দিকে মুখ করে দাঁড়ানো গৌতম বুদ্ধের। এটিও মূল মূর্তির জায়গায় প্রতিস্থাপিত। মূলটি স্বর্ণ, রুপা এবং অন্যান্য মূল্যবান ধাতু দিয়ে তৈরি ছিল বলে সম্পদ চোররা সেটি ভেঙে সব লুট করে নিয়ে গিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ১৯ শতাব্দীর শেষভাগে, উ সান নেইন নামের এক স্থানীয় ব্যবসায়ী মূলটির অনুরূপ কাঠের এই মূর্তিটি তৈরি করিয়ে দিয়েছিলেন। এই মূর্তিটির হাতে পরিচিত বরাভয় মুদ্রা। এখানে রয়েছে রাজা কিয়ানসিত্ত্বা এবং থেরবাদী বৌদ্ধধর্মের প্রতিষ্ঠাতা ভিক্ষু শিন আরাহানের দুটো অপেক্ষাকৃত ছোট মূর্তি। গৌতম বুদ্ধের মূর্তির সামনে ঘিরে রাখা খোলা একটা গোলাকার মঞ্চের ওপর বিভিন্ন অংকের বর্মি মুদ্রার নোটের একটা ছোট স্তূপ। সুরক্ষিত নয় বলে নোটের স্তূপ বড় হয়ে গেলে নিশ্চয়ই টাকাগুলো সরিয়ে রাখা হয়, তা না হলে দানের পরিমাণ এত কম হওয়ার কথা নয়।  

চতুর্থ মূর্তিটির সামনে পৌঁছার পর মঠটির ভেতরের বিন্যাস পরিষ্কার হয়। মঠের ঠিক কেন্দ্রে চতুষ্কোণ ক্ষেত্রের চার বাহুতে চার দিকে মুখ করে দাঁড়ানো চারটি বুদ্ধ মূর্তি। প্রত্যেক মূর্তির সামনে থেকে একটা বাহু সোজা বেরিয়ে গেছে চারটি প্রবেশদ্বারের দিকে। কিন্তু কেবল পশ্চিমমুখী তোরণটাই খোলা, যেদিকে মুখ করে দাঁড়ানো গৌতম বুদ্ধ। বাকি তিনটি কুকুসন্ধ বুদ্ধ, কোনাগমন বুদ্ধ, এবং কশ্যপ বুদ্ধ যথাক্রমে উত্তর, পূর্ব এবং দক্ষিণ দিকে মুখ করে দাঁড়ানো।

এই চার বুদ্ধ মূর্তি প্রসঙ্গে একটা বিষয় ব্যাখ্যা করা দরকার। বৌদ্ধ ধর্মমতে পৃথিবীর জন্মলগ্ন থেকে এযাবত মোট ২৮ জন বুদ্ধ গত হয়েছেন। সর্বশেষ অর্থাত্ ২৮তম বুদ্ধ গৌতমের ধর্মকাল ৫০০০ বছর, এই ধর্মকালের পর আরও একজন বুদ্ধের আবির্ভাব ঘটবে, তিনি হবেন ২৯তম বুদ্ধ, অমিতাভ বুদ্ধ। এই ২৮ জনের মধ্যে সর্বশেষ চারজনের মূর্তিই আনন্দ মঠের ভেতর স্থাপন করা আছে।

চার বুদ্ধের দিকে চারটি গলিপথ এসে মঠটিকে দিয়েছে সুষম একটা ক্রশের আকৃতি। গলিপথগুলো দিয়ে হাওয়া ঢুকে অন্যদিক দিয়ে বের হয়ে যেতে পারে বলে ভেতরে সবসময় একটা হালকা হাওয়ার শীতল আবেশ বজায় থাকে। প্রত্যেকটি মূর্তির সামনে রয়েছে ত্রিশ ফুট উঁচু নকশা খোদাই করা কাঠের বিশাল দরজা। এগুলো বন্ধ করে দিলে চারটি বুদ্ধমূর্তির প্রত্যেকটিকে সামনের গলিপথ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা যায়।

প্যাগোডার ভেতরের পুরো চক্কর শেষ করে আবার পশ্চিম গেট দিয়ে বের হয়ে এলে আমাদের সবার জুতো স্যান্ডেল যথাস্থানে পাওয়া যায়, অবশ্য আমরা এগুলো চুরি যাওয়ার কথা একবারের জন্যও ভাবিনি। এসময় দুই কিশোর আর এক কিশোরী আমাদের পিছু নেয়। ছেলে দুটোর হাতে বিভিন্ন দেশের টাকার নোট, ভিনদেশি টুরিস্টদের কাছ থেকে তাদের নিজ নিজ দেশের কারেন্সি নোট চেয়ে নেয় এরা, ওগুলো দিয়ে কী করে কে জানে। আমার কাছ থেকে চাইলে দুজনকেই দশ টাকার দুটো নোট দিয়ে বিদায় করি। ওদের সাথে সর্দার গোছের যে কিশোরীটি ছিল, তাকে জিজ্ঞেস করি, তুমি কী করছ এখানে? মেয়েটি বলে এদের সাথে এমনিই এসেছি। পড়াশোনা করে কি না জানতে চাইলে মেয়েটি জানায়, সে দূরশিক্ষণ ব্যবস্থায় দর্শনশাস্ত্রে ডিগ্রি নেবে। ওর কথায় তাজ্জব বনে গেলেও শুদ্ধ ইংরেজি শুনে মেয়েটার কথাটা অবিশ্বাস করতে ইচ্ছে হয় না।

দুপুরে আমরা লাঞ্চ করি এক রেস্তোরাঁর বাইরে গাছের ছায়ায় পেতে দেওয়া টেবিলে। বাইরে গাছের নিচে বসে খাওয়ার সুবিধা আমাদের দেশে কয়েকটা তারকাখচিত হোটেল ছাড়া তেমন কোথাও নেই বললেই চলে। রাতের বেলায় মিনিমিন আমাদের নিয়ে যায় ইরাবতীর তীরে এক রেস্তোরাঁয়, এখানেও বাইরের লনে বসে খাওয়ার ব্যবস্থা আছে। কিন্তু বসার কিছুক্ষণের মধ্যে হালকা টিপটিপ বৃষ্টি শুরু হলে আমরা ভেতরে চলে যাই। আরেক টেবিলে বসেছিল একদল শ্বেতাঙ্গ টুরিস্ট। আমরা ভেতরে চলে এলেও ওরা সেই বৃষ্টি উপেক্ষা করে বসে থাকে। ভাবছিলাম বৃষ্টিটা আর একটু জোরে নামুক, তখন বাছারা বুঝবে মজা। আসলে ওদের বাইরে বসা দেখে খানিকটা ঈর্ষা হচ্ছিল। তবে আমাদের অভিশাপ ফলেনি, তাই বৃষ্টি তো বাড়েই না, বরং একসময় থেমে যায়। ইরাবতীর তীরে এরকম আরও অনেক রেস্তোরাঁর সারি দেখে আমাদের দেশে কোনো নদীর তীরেই এমন একটি রেস্তোরাঁও নেই কেন ভেবে আমাদের ঈর্ষা আরও বাড়ে। d

 

 

 

 

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
২১ জুন, ২০১৮ ইং
ফজর৩:৪৩
যোহর১২:০০
আসর৪:৪০
মাগরিব৬:৫১
এশা৮:১৬
সূর্যোদয় - ৫:১১সূর্যাস্ত - ০৬:৪৬
পড়ুন