নির্বাচিত অনুবাদ গল্প
ট্রেন
এলিস মুনরো
ট্রেন
অলঙ্করণ :সোহেল আশরাফ

ট্রেনটা অবশ্য এমনিতেই বেশ ধীরগতির ছিল। আর বাঁকের কাছে এসে এর গতি আরো কমে এসেছিল। জ্যাকসনই ছিল এর একমাত্র যাত্রী আর পরবর্তী স্টেশন প্রায় বিশ মাইল সামনে। তারপরের স্টপেজ হচ্ছে রিপ্লে, এরপর কিনকার্ডিন আর লেক। ওর কপাল ভালো, কাজেই এই সুযোগটা নষ্ট করা যাবে না। সিটের ওপরে একটা খাঁজে যেখানে রেল কোম্পানি ওর টিকিটটা রেখেছিল, সেখান থেকে ইতোমধ্যেই সে ওর টিকিটের  অংশটা ছিঁড়ে নিয়েছে।

ব্যাগটা বাইরে ছুড়ে মারল, তারপর দেখল এটা বেশ সুন্দরভাবে দুই লাইনের মাঝে পড়েছে। অবশ্য এখন আর কোনো উপায়ও নেই—ট্রেন তো এর চেয়ে আস্তে আর চলতে পারে না।

সুযোগটা সে নিল। সুস্বাস্থ্যের অধিকারী একজন তরুণ হলেও সে কখনও ক্ষিপ্র বা চটপটে ছিল না। লাফ দিয়ে নামতেই হতাশ হলো। যা ভেবেছিল, তার চেয়েও বেশি সে আড়ষ্ট ছিল, একারণে একটু বেশি সামনের দিকে ছিটকে পড়েছিল। দুই হাতের তালু বেশ জোরে নুড়িপাথরের ওপর পড়তেই, হাতের চামড়া ছিঁড়ে গিয়েছিল। আর স্নায়ুও...।

ট্রেনটা এখন চোখের আড়াল হয়ে যাচ্ছে; বুঝতে পারল এর গতি একটু বেড়ে গেছে। তারপর ট্রেনটা বাঁক পার হয়ে গেল। হাতের যে জায়গায় ছিঁড়ে গিয়েছিল, সেখানে একটু থুথু দিয়ে সে হাতের তালুতে লেগে থাকা নুড়ি পাথরের টুকরাগুলো ফেলে দিল। তারপর ব্যাগটা তুলে নিয়ে যেদিক থেকে ট্রেনে করে এসেছিল, সেদিকেই হাঁটা শুরু করল। ট্রেনের পিছু পিছু গেলে সে সন্ধ্যার অনেক পর পরবর্তী স্টেশনে পৌঁছাত। তারপরও অবশ্য সে বলতে পারত যে, হঠাত্ ঘুমিয়ে পড়েছিল আর ঘুম থেকে ওঠার পর ভেবেছিল ওর স্টেশন হয়তো সে ঘুমিয়ে পার করে এসেছে, কিন্তু আসলে তো তা হয়নি আর সবকিছু গুলিয়ে যাওয়ায় সে চলন্ত ট্রেন থেকে লাফ দিয়ে নেমে পড়েছিল।   

হয়তো তার কথা ওরা বিশ্বাস করত। এতদূর থেকে, সেই জার্মানির যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সে এসেছে, কাজেই মানসিকভাবে ওর একটু বিভ্রান্ত হওয়ারই কথা কিংবা মাথায় একটু তালগোল পাকাতেই পারে। অবশ্য এখনও বেশি দেরি হয়নি। ওর যেখানে যাওয়ার কথা মাঝরাতের আগেই ওখানে সে পৌঁছে যেতে পারবে। কিন্তু সারাক্ষণ সে একথাই ভাবছিল যে, সে উল্টো দিকে হেঁটে চলেছে। খুব বেশি গাছের নাম সে জানে না। ম্যাপল সবাই জানে। তারপর পাইন। সে ভেবেছিল যেখানে সে লাফ দিয়ে নেমেছিল, সে জায়গাটা একটা বন, কিন্তু আসলে তা ছিল না। রেললাইনের পাশ দিয়ে গাছগুলো ঘন করে লাগানো হয়েছিল, তবে এর পেছনে মাঠগুলোর ছিটেফোঁটা অংশ দেখতে পাচ্ছিল। সবুজ, বিবর্ণ অথবা হলুদ মাঠ, পশুচারণভূমি, শস্যখেত আর গাছের মুড়া। সে এতটুকুই জানে। এখনও আগস্ট মাস চলছে।  

একবার ট্রেনের শব্দটা মিলিয়ে যেতেই সে বুঝতে পারল, যেরকম আশা করেছিল, চারপাশ সেরকম সম্পূর্ণ নিস্তব্ধ হয়নি। এখানে সেখানে প্রচুর বিশৃঙ্খলা দেখা যাচ্ছিল। আগস্টের শুকনো পাতা নড়ছিল, তবে বাতাসে নয়, যেন অজানা কেউ ছোটাছুটি এবং হৈচৈ করছিল আর অলক্ষে কোনো পাখি ডেকে ডেকে তাকে শাসন করছিল।

গত কয়েক বছরে যেসব মানুষের সাথে ওর দেখা হয়েছিল, ওরা মনে করত, তুমি যদি কোনো শহর থেকে না এসে থাক, তার মানে তুমি নিশ্চয়ই গাঁয়ের লোক। তবে তা সত্য নয়। জ্যাকসন নিজে একজন পানির কল মিস্ত্রির ছেলে। জীবনে কখনও সে কোনো গোয়ালঘর বা আস্তাবলে ঢোকেনি, গরু চরায়নি কিংবা শস্য মাড়াই করেনি। কিংবা এরকম একটা রেল লাইন ধরেও কখনও হাঁটেনি, তবে এখন মনে হচ্ছে—এই রেললাইনটা এর আসল উদ্দেশ্য অর্থাত্ মানুষ আর মালামাল বহন করার কাজ বাদ দিয়ে একটা বুনো আপেল গাছ, বেরি গাছের কাঁটাঝোপ আর মাটিঘেঁষে চলা আঙুরলতার এলাকায় পরিণত হয়েছে। উঁচু কোনো জায়গায় থেকে একটা কাক কা কা করছে, তবে কাকটা দেখা যাচ্ছে না। আর ঠিক এই মুহূর্তে লিকলিকে একটা সাপ রেললাইনের মাঝখান দিয়ে এঁকেবেঁকে চলেছে। আর সাপটা যেন বেশ নিশ্চিন্ত ছিল যে, সে এত দ্রুত তাকে পায়ে মাড়িয়ে মেরে ফেলতে পারবে না। সে বেশ জানে যে এটা ক্ষতিকর নয়, তবে সাপটার আত্মবিশ্বাস দেখে ওর বেশ রাগ হলো।

জার্সি প্রজাতির ছোট্ট গাভিটির নাম মার্গারেট রোজ, দেখা গেল নিত্যদিনের মতো এটা সকাল-বিকাল দিনে দুই বার দুধ দোয়াবার জন্য গোয়ালঘরের দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। বেলকে অনেকসময় তাকে ডাকতেও হয় না। তবে আজ সকালে মনে হলো পশুচারণভূমির ঢালের কাছে কিংবা বেড়ার অন্যধারে রেললাইন আড়াল করে যে গাছগুলো রয়েছে, তার মাঝে কিছু একটা নিয়ে সে বেশ ব্যস্ত রয়েছে। সে শুনতে পেল বেল গরুটাকে লক্ষ করে একবার শিস  দিল তারপর ডেকে উঠলো। ওর গলা শুনে জ্যাকসন একটু অনিচ্ছা নিয়ে ঘুরে চলল। কিন্তু তারপর কী মনে করে আরেকবার দেখার জন্য আবার এদিকে ফিরে তাকাল।

বেল ওর বালতি আর টুলটা মাটিতে রেখে ভোরের ভেজা ঘাস মাড়িয়ে হাঁটতে শুরু করল।

‘উস্স্স্স্, উস্স্স্স্’ মিষ্টি আদুরে শব্দে ভুলিয়ে সে গরুটাকে শান্ত করার চেষ্টা করছিল।

গাছের ফাঁকে কিছু একটা নড়ছিল। একজন লোকের গলা শোনা গেল, সে বলছিল কোনো সমস্যা নেই, সব ঠিক আছে।

হ্যাঁ, অবশ্যই সব ঠিক আছে। লোকটা কি মনে করেছে যে, সে মার্গারেট রোজের ওপর হামলা করবে, একথা ভেবে বেল ভয় পেয়েছে। আরে গরুটার মাথার ওপরে এখনও দুটো শিং আছে না?

রেললাইনের পাশে বেড়ার ওপর চড়ে সে আশ্ব্বস্ত করার ভঙ্গিতে হাত নাড়ল।

মার্গারেট রোজের জন্য এটা খুব বেশি হয়ে গিয়েছিল, এদৃশ্যটা দেখে তারও কিছু একটা দেখাবার প্রয়োজন ছিল। সে একবার এদিকে লাফ দিল, তারপর অন্যদিকে। ছোট ছোট শিংগুলো ঝাঁকাল। ব্যস এর বেশি আর কিছু না। জার্সি প্রজাতির গরুগুলো এদের দ্রুততা দিয়ে আর হঠাত্ মেজাজ হারিয়ে সবাইকে অবাক করে দিতে পারে। বেল আবার গরুটাকে ডেকে একটু ধমক দিয়ে তাকে শান্ত করার চেষ্টা করল।

বেল লোকটাকে বলল, ‘সে আপনার কোনো ক্ষতি করবে না। শুধু কোনোরকম নড়াচড়া করবেন না। এটা করলেই ওর স্নায়ু চড়ে যায়।’

এবার বেল লোকটার হাতে ধরা ব্যাগটা দেখল। এটাই যত সমস্যা সৃষ্টি করেছিল। সে ভেবেছিল লোকটা হয়তো এমনিই রেললাইনের পাশ দিয়ে হেঁটে বেড়াচ্ছিল, তবে এখন মনে হচ্ছে সে কোথাও যাচ্ছিল।

সে বলল, ‘ওটাই সমস্যা সৃষ্টি করছে। আপনার হাতের ব্যাগটা দেখে সে অস্থির হয়ে উঠেছে। আপনি যদি এক সেকেন্ডের জন্য এটা মাটিতে নামিয়ে রাখেন, তাহলে আমি গরুটার দুধ দোয়াবার জন্য পেছনে খামারে নিয়ে যেতে পারি।’ 

মেয়েটা যা বলল, সে তা-ই করল, তারপর এক ইঞ্চিও না সরে সেখানেই দাঁড়িয়ে ব্যাপারটা লক্ষ করতে লাগল।

মেয়েটি গোয়ালঘরের যেধারে বালতি আর টুলটা রেখেছিল, মার্গারেট রোজকে সেদিকে নিয়ে গেল। মেয়েটি এবার বলল, ‘এবার আপনি ওটা তুলে নিতে পারেন। তবে ওটা ওকে দেখিয়ে নড়াচড়া করবেন না। আপনি একজন সৈনিক, তা-ই না? দুধ দোয়ানো শেষ হওয়া পর্যন্ত যদি আপনি অপেক্ষা করেন, তবে আমি আপনাকে কিছু নাস্তা খাওয়াতে পারব। শুভ সন্ধ্যা, একেবারে হাঁপিয়ে উঠেছি। কী বোকার মতো নাম—মার্গারেট রোজ! এই নামে কি ওকে চিত্কার করে ডাকা যায়?’

ছোটখাটো আর বলিষ্ঠ গড়নের একজন মহিলা। মাথার চুলে সামান্য পাক ধরেছে, যা দেখতে খুব একটা খারাপ লাগছে না আর সামনের দিকের চুল ছোটদের মতো চৌকো করে কাটা।

তারপর একটু সামলে নিয়ে মহিলাটি বলল, ‘অবশ্য এর জন্য আমিই দায়ী। আমি রাজার একজন সমর্থক আছি কিংবা ছিলাম। সামান্য পরিজ রান্না করেছি, এর সাথে দুধ মেশাতে বেশি দেরি হবে না। আপনি যদি কিছু মনে না করেন, তবে গোয়ালঘরটা ঘুরে ওপাশে গিয়ে এমন জায়গায় অপেক্ষা করুন, যাতে সে আপনাকে দেখতে না পায়। খুব খারাপ লাগছে যে, আপনাকে একটা ডিম ভেজে দিতে পারছি না। আমরা মুরগি পালতাম, কিন্তু অনবরত শেয়াল হানা দিয়ে মুরগিগুলো নিয়ে যেতে শুরু করলে, একসময় আমরা অতিষ্ঠ হয়ে উঠলাম।’ 

‘আমরা মুরগি পালতাম’—তার মানে মেয়েটির সাথে একজন পুরুষও এখানে আশেপাশে কোথাও আছে।

‘পরিজ খুব ভালো। আমি খুশি হয়ে এর দাম দেবো।’

‘কোনো দরকার নেই। শুধু কিছুক্ষণের জন্য সামনে থেকে সরে দাঁড়ান। আপনাকে দেখে সে একটু বেশি অস্থির হয়ে উঠেছে, আর এতে আমার দুধ দোয়ার কাজে ঝামেলা করছে।’

সে গোলাঘরটা ঘুরে ওপাশে গেল। বেশ করুণ অবস্থা। কার্ডবোর্ডের বেড়ার ফাঁক দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখল ভেতরে কী ধরনের গাড়ি রাখা আছে। কিন্তু ভেতরে শুধু একটা পুরোনো ঘোড়ার গাড়ি আর ভাঙাচোরা কিছু যন্ত্রপাতির টুকরা পড়ে রয়েছে।

ঘরের সাদা রঙ জায়গায় জায়গায় উঠে গেছে আর বেশ বিবর্ণ হয়ে রয়েছে। পাশে একটা জানালায় কাচের বদলে পেরেক ঠুকে কার্ডবোর্ড লাগানো রয়েছে। আর ভেঙেপড়া যে মুরগির ঘরটার কথা সে বলেছিল, যেখানে শেয়াল এসে হানা দিত, সেটাও দেখা গেল। একজায়গায় কতগুলো ছোট ছোট তক্তা স্তূপ হয়ে পড়ে রয়েছে। 

এ জায়গায় কোনো পুরুষ থাকলেও সে নিশ্চয়ই পঙ্গু কিংবা অলসতার কারণে সম্পূর্ণ অক্ষম হয়ে রয়েছে।

পাশ দিয়ে একটা রাস্তা চলে গেছে। বাড়িটার সামনের দিকে বেড়া দিয়ে ঘেরা ছোট্ট একটি উঠান রয়েছে, এখানে একটা মাটির রাস্তাও দেখা যাচ্ছে। আর উঠানের মাঝে একটি নিরীহ চেহারার ঘোড়া দাঁড়িয়ে রয়েছে। ঘোড়াটার গায়ে ধূসর রঙের ওপর গাঢ় ছোপ ছোপ দাগ। একটা গরু রাখার কী কারণ হতে পারে সেটা সে দেখেছে, কিন্তু ঘোড়া? এমনকি যুদ্ধের আগে থেকেই কৃষি খামারের লোকজন ঘোড়া রাখা বাদ দিতে শুরু করেছিল, কারণ তখন থেকেই ট্রাক্টরের প্রচলন শুরু হয়েছিল। আর এই মহিলাটিকে দেখে মনে হয় না যে, শুধু মজা করার জন্য সে ঘোড়ায় চড়ে বেড়াবার মতো একজন মানুষ। তারপর একটা কথা ওর মনে পড়ল। গোলাঘরে যে ঘোড়ার গাড়িটা সে দেখেছে। ওটা আসলে কোনো ধ্বংসস্তূপ নয়। ওটাই তার একমাত্র সম্বল ছিল।

বেশ কিছুক্ষণ থেকেই সে আজব ধরনের একটা শুব্দ শুনতে পাচ্ছিল। রাস্তাটা একটা পাহাড়ের চূড়ার দিকে উঠে গেছে। আর সেই পাহাড়ের ওপর থেকে একটা টক টক শব্দ ভেসে আসছিল। আর টক টক শব্দটার সাথে মাঝে মাঝে টুংটাং কিংবা শিস দেওয়ার শব্দও ভেসে আসছিল।  

এবার দেখা গেল। পাহাড়ের ওপর থেকে  ছোট্ট দুটো ঘোড়ায় টানা চার চাকার ওপর বসানো একটা বাক্সের মতো গাড়ি নেমে এল। ঘোড়াগুলো বেশ ছোট, মাঠে যে ঘোড়াটা রয়েছে তার চেয়েও ছোট, তবে বেশ প্রাণবন্ত। আর সেই বাক্সের মতো গাড়িটায় পাঁচ-ছয় জন ছোট্ট মানুষ বসে রয়েছে। সবার পরনে কালো পোশাক আর মাথায় পোশাকের সাথে মানানসই কালো টুপি।

শব্দটা ওদের কাছ থেকেই ভেসে আসছিল। ওরা গান গাইছিল। উঁচু গলায় মিষ্টি সুরে গান গাইছিল। ওর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় একবারও ওর দিকে তাকাল না।

এটা দেখে তার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। আস্তাবলে যে ভাঙা ঘোড়ার গাড়ি আর মাঠে ঘোড়াটা সে দেখেছে, এর তুলনায় ওগুলো কিছুই না।

তখনও সেখানে দাঁড়িয়ে সে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছিল, এমন সময় মেয়েটির গলা শুনতে পেল। সে বসতবাড়িটার পাশে দাঁড়িয়ে তাকে বলছিল, ‘আসুন, সব হয়ে গেছে।’

পেছনের দরজাটা দেখিয়ে সে বলল, ‘এখান দিয়েই আসা-যাওয়া করতে হয়। সামনের দরজাটা গত শীতের সময় থেকে আটকে গেছে আর অনেক চেষ্টা করেও খোলা যাচ্ছে না। মনে হয় এখনও জমাট বেঁধে রয়েছে।’ 

মাটির অসমান মেঝের ওপর পাতা কাঠের তক্তার ওপর দিয়ে ওরা হেঁটে এগোল। জানালাটা হার্ডবোর্ড দিয়ে ঢেকে দেওয়ায় ঘরের ভেতরটা অন্ধকার হয়ে আছে। যুদ্ধক্ষেত্রে জ্যাকসন যে গর্তে ঘুমাত, সেজায়গাটাও এরকম ঠাণ্ডা ছিল। সেখানে সে বার বার জেগে উঠত আর মচ মচ শব্দে এপাশ-ওপাশ হয়ে শরীর গরমের জন্য একটা জুতসই অবস্থান খুঁজে নেবার চেষ্টা করত। অথচ এই মহিলাটি এখানে একবারও ঠাণ্ডায় কেঁপে ওঠেনি বরং তার শরীর থেকে নির্ভেজাল কায়িক পরিশ্রমের দ্যুতি আর একটা গন্ধ ভেসে আসছিল—সম্ভবত তা ছিল গরুর গায়ের প্রচ্ছন্ন গন্ধ।  

বড় একটা পাত্রে টাটকা দুধ ঢেলে পাশে রাখা এক টুকরা কাপড় দিয়ে ঢেকে দিল। তারপর তাকে বাড়ির মূল অংশের দিকে নিয়ে চলল। এখানে জানালায় কোনো পর্দা না থাকায় বাইরের আলো আসতে পারছিল। আর লাকড়ির চুলাটাও জ্বলছিল। হ্যান্ডপাম্পসহ একটা সিংক আর কয়েক জায়গায় ছেঁড়া একটা অয়েলক্লথ দিয়ে ঢাকা একটা টেবিল দেখা যাচ্ছে। আর একটা কৌচ ছাপছাপ পুরোনো একটা কম্বল দিয়ে ঢেকে রাখা রয়েছে।

আরেকটা বালিশও দেখা যাচ্ছে, যার ভেতর থেকে কিছু পালক খসে পড়েছে।

মোটামুটি চলনসই, তেমন খারাপ নয়, তবে বেশ পুরোনো আর জীর্ণ। যা দেখা যাচ্ছে সবই ব্যবহারযোগ্য। তবে চোখ তুলে তাকাতেই দেখা গেল কতগুলো তাকের ওপর স্তূপ করে রাখা খবরের কাগজ আর ম্যাগাজিন কিংবা কিছু কাগজ ছাদ পর্যন্ত ডাঁই করে রাখা হয়েছে।

সে তাকে জিজ্ঞেস করতে বাধ্য হলো, সে কি আগুন লাগার ভয় করে না? এখানে তো একটা লাকড়ির চুলাও রয়েছে।

‘ওহো, আমি সবসময়ই এখানে থাকি। মানে এখানেই ঘুমাই আর সবকিছু করি। ঠাণ্ডা বাতাস এড়াবার জন্য এখানে আর কোনো জায়গা নেই। তাছাড়া আমি খুব সতর্ক থাকি। এমনকি একটা চিমনিও নেই। কয়েকবার চুলাটা খুব গরম হয়ে যাওয়ায়, আমি শুধু কিছু বেকিং পাউডার এর ওপর ছিটিয়ে দেই। এর চেয়ে ভালো আর কিছু হয় না।’ 

তারপর সে বলে চলল, ‘আমার মাকে অবশ্য এখানেই থাকতে হতো। এছাড়া আর কোনো জায়গা ছিল না যেখানে তিনি আরাম পেতে পারতেন। তার জন্য এখানে একটা ক্যাম্পখাট পেতে রেখেছিলাম। সবসময় তার দিকে নজর রাখতাম। একবার অবশ্য ভেবেছিলাম সমস্ত কাগজপত্র সামনের ঘরে নিয়ে যাই, কিন্তু ওই ঘরটা আসলে ভীষণ স্যাঁতসেঁতে, কাগজগুলো সব নষ্ট হয়ে যেত। তিনি গত মে মাসে মারা যান। ঠিক যখন আবহাওয়া ভালো হতে শুরু করেছে। রেডিওতে যুদ্ধ শেষ হওয়ার খবর শোনা পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন। সবকিছু একেবারে সঠিকভাবে বুঝতেন। অনেকদিন আগে কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেললেও সবকিছু বুঝতে পারতেন। তার কথা না বলার ব্যাপারটায় আমি এমনই অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলাম যে, অনেক সময় আমি ভাবতাম তিনি হয়তো এখানেই আছেন, কিন্তু আসলে তো তিনি নেই।’ 

জ্যাকসন অনুভব করল এখন তার বলা উচিত যে, সে দুঃখিত।

‘হ্যাঁ, তবে এটা তো হতোই। তবে ভাগ্য ভালো যে শীতকালে হয়নি।’

সে জ্যাকসনকে যবের গুঁড়া দিয়ে তৈরি পরিজ আর চা দিল।

‘চা টা কি কড়া হয়নি?’

মুখভর্তি খাবার নিয়ে সে মাথা নাড়ল।

‘চায়ের ব্যাপারে কিন্তু আমি কখনও মিতব্যয়ী হই না। আর তাই যদি হতো তাহলে তো গরম পানি খেলেই চলে? গত শীতে আবহাওয়া যখন খুব খারাপ হয়েছিল তখন সবকিছু ফুরিয়ে গিয়েছিল। জলবিদ্যুত্ নেই, রেডিও নেই আর জোয়ারের পানিতে বন্যা হয়েছিল। আমি যখন দুধ দোয়াতে বের হতাম, তখন পেছনের দরজার সাথে একটা রশি বেঁধে সেটা ধরে ধরে এগোতাম। একবার ভাবলাম মার্গারেট রোজকে পেছনে রান্নাঘরে নিয়ে আসি, তারপর ভাবলাম ঝড়ের প্রকোপ বেড়ে গেলে সে ঘাবড়ে যেতে পারে আর তখন আমি তাকে সামলাতে পারব না। যা-ই হোক সে বেঁচে গেল। আমরা সবাই বেঁচে গেলাম।  

ওর কথার মাঝে একটু ফাঁক খুঁজে নিয়ে জ্যাকসন জিজ্ঞেস করল, আশে পাশে কোনো বামুনের দল থাকে কি-না?

 ‘না, তেমন কিছু তো আমি লক্ষ করিনি।’

‘একটা ঘোড়ার গাড়িতে?’

‘ওহো বুঝেছি। ওরা কি বসে ছিল? ওরা নিশ্চয়ই সেই মেনোনাইট খ্রিস্টান ছেলেগুলো। ওরা ওদের ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে গান গাইতে গাইতে গির্জায় যায়। মেয়েরা গাড়ির ভেতরে থাকে, তবে ছেলেরা বাইরে বসে।’

 ‘ওরা কিন্তু একবারও আমার দিকে তাকায়নি।’

‘তাকাবে না। আমি অনেকসময় মাকে বলতাম, আমরা ঠিক রাস্তায় বাস করছি, কারণ আমরাও মেনোনাইটদের মতো। ঘোড়া আর ঘোড়ার গাড়ি আর পাস্তুরিত না করেই দুধ পান করি, শুধু একটা ব্যাপার হচ্ছে যে, আমরা কেউই গান গাইতে পারি না।

‘যখন মা মারা গেলেন, তখন ওরা এত খাবার এনেছিল যে, আমি কয়েক সপ্তাহ ধরে সেই খাবার খেয়েছিলাম। ওরা হয়তো ভেবেছিল এখানে একটা দুর্ভিক্ষ বা সেরকম কিছু একটা হবে। আমার সৌভাগ্য যে, ওরা এখানে ছিল।

‘তবে ওরাও সৌভাগ্যবান, কারণ ওদের তো দানকর্ম চালিয়ে যাওয়ার কথা আর বলতে গেলে আমি তো এখানে ওদের দোড়গোড়ায় রয়েছি। আর আমাকে দেখলে দান করার জন্য উপযুক্ত মনে হতেই পারে।’

খাওয়াদাওয়া শেষ করার পর সে টাকা দিতে গেলে মেয়েটি হাত নেড়ে ওর টাকা সরিয়ে দিল।

সে বলল, তবে একটা কাজ আছে, যা সে করে যেতে পারে। যাওয়ার আগে সে ঘোড়ার জাবনা-ভাণ্ডটা ঠিক করে দিতে পারে।  

তবে এ কাজটা করতে গিয়ে তাকে আসলে নতুন একটা ঘোড়ার জাবনা-ভাণ্ড তৈরি করে দিতে হলো। আর এটা করার জন্য চারপাশে ঘুরে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র আর যন্ত্রপাতি খুঁজতে হলো। এটা করতেই সারাদিন লেগে গেল আর মহিলা রাতের খাবারের জন্য ওকে প্যানকেক আর মেনোনাইট ম্যাপল সিরাপ পরিবেশন করল। তারপর বলল, আর এক সপ্তাহ পর এলে সে তাকে টাটকা জ্যাম খাওয়াতে পারবে। রেললাইনের ধারে যে বুনো বেরি ফলের গাছ আছে, সেখান থেকে সে বেরি তুলে আনে।  

সূর্যাস্ত পর্যন্ত ওরা পেছনের দরজার বাইরের চেয়ার পেতে সেখানে বসে গল্প করতে লাগল। মহিলা তাকে শোনাচ্ছিল, কেমন করে ওরা এখানে এসেছিল আর সেও তার কথা শুনছিল। তবে সম্পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে শুনছিল না, কারণ তখন সে চারদিকে তাকিয়ে ভাবছিল কীভাবে এই জায়গাটা এই শেষ পর্যায়ে এসে পৌঁছেছিল। তবে কেউ যদি এখানে স্থায়ীভাবে থাকার চিন্তা করে সবকিছু ঠিকঠাক করে নিতে চায়, সেক্ষেত্রে এজায়গাটা একেবারে নৈরাশ্যজনক নয়। কিছু টাকা অবশ্যই লাগবে, তবে সময় আর শক্তিই খাটাতে হবে বেশি। এখান থেকে চলে যাচ্ছিল বলে সে প্রায় নিজের মনে আফসোস করতে শুরু করেছিল। 

মহিলা বলল, ওর বাবা—যাকে সে ড্যাডি বলে ডাকত, তিনি কেবল গ্রীষ্মকালে থাকার জন্য এই জায়গাটা কিনেছিলেন। তারপর সিদ্ধান্ত নিলেন ওরা সারাবছরই এখানে থাকবেন। তিনি যেকোনো জায়গায় থেকে কাজ করতে পারতেন, কারণ তিনি টরেন্টো টেলিগ্রামের একটি কলামের ওপর কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। (জ্যাকসন এক মুহূর্তের জন্য বোকার মতো এটাকে একটা আসল কলাম ধরে নিয়েছিল, যা একটা দালান ধরে রাখার কাজে ব্যবহূত হয়) তিনি যা লিখতেন, পোস্টম্যান তা নিয়ে ট্রেনে করে পাঠিয়ে দিত। যেসব ঘটনা ঘটত, তার সবকিছু নিয়ে তিনি লিখতেন। মাঝে মাঝে প্রিন্সেস কাসামাসিমা নাম ধরে ডেকে বেলের মায়ের কথা উল্লেখ করতেন। এটা ছিল একটা বইয়ের চরিত্র। সম্ভবত তার মায়ের কারণেই ওরা সারাবছর ধরেই এখানে থাকত। তার একবার ভয়ংকর ফ্লু হয়েছিল, ১৯১৮ সালের এই ফ্লুতে বহু মানুষ প্রাণ হারায়। যখন তিনি এই রোগ থেকে সেরে উঠলেন, তখন তিনি বোবা হয়ে গিয়েছিলেন। একেবারেই বোবা বলা চলে না, কারণ মুখ দিয়ে ঠিকই আওয়াজ বের করতে পারতেন, তবে মনে হয় কথা বলা ভুলে গিয়েছিলেন, কিংবা শব্দই তার কাছ থেকে হারিয়ে গিয়েছিল। তাকে আবার নতুন করে সবকিছু শিখতে হয়েছিল, যেমন—মুখে খাবার তুলে নেওয়া আর বাথরুমে যাওয়া, তবে একটা জিনিস তিনি আর কখনও শিখতে পারেননি। সেটা হলো গরমের সময় গায়ে কাপড় রাখতে। কাজেই বুঝতে পারছেন, লোকজনের হাসির খোরাক হিসেবে তাকে তো কোনো একটা শহরের রাস্তায় ঘুরে বেড়াতে দেওয়া যায় না। শীতকালে বেলকে স্কুলে যেতে হয়েছিল। বিশপ স্ট্রন বলতে সে যে একটা স্কুলের কথা বলেছে, এটা বুঝতে জ্যাকসনের একটু সময় লাগল। স্কুলটা ছিল টরেন্টোতে আর সে যে এর নাম শুনেনি—এটা জেনে বেল বেশ অবাক হলো। এই স্কুলে সব বড়লোকদের মেয়েরা পড়ত, তবে তার মতো মেয়েও ছিল, যারা সেখানে পড়ার জন্য ওদের আত্মীয় কিংবা উইল থেকে বিশেষ আর্থিক অনুদান পেত। সে বলল, ওখানে পড়াশোনা করে সে বেশ উন্নাসিক হতে শিখেছিল। তবে জীবিকা নির্বাহ করার জন্য কী করতে হবে সে বিষয়ে সেখানে কোনো ধারণা দেওয়া হয়নি। 

তবে একটা দুর্ঘটনা ঘটার পর ব্যাপারটার নিষ্পত্তি হলো। ওর বাবা মাঝে মাঝে রেললাইন ধরে হাঁটতে পছন্দ করতেন, গ্রীষ্মের এক সন্ধ্যায় এরকম হাঁটার সময় একটা ট্রেন তাকে ধাক্কা দিল। সে আর ওর মা ইতোমধ্যে বিছানায় শুয়ে পড়েছিল। বেল ভেবেছিল কোনো একটা পশু হয়তো ছাড়া পেয়ে রেল লাইনের ওপর এসে পড়েছে, তবে ওর মা ভীষণভাবে ককাতে শুরু করলেন এবং মনে হলো ব্যাপারটা তিনি প্রথমেই বুঝতে পেরেছিলেন।    

ওর স্কুলের এক বন্ধু মাঝে মাঝে ওকে চিঠি লিখে জিজ্ঞেস করত, ওই জায়গাটায় এমন কী আছে যে সে সেখানে পড়ে রয়েছে, তবে ওরা তো কিছুই জানত না। তাকে দুধ দোয়াতে হতো, রান্না করতে হতো, মায়ের যত্ন নিতে হতো আর সেসময়ে সে মুরগিও পালতো। সে শিখেছিল কেমন করে আলু কাটতে হয়, যাতে প্রতিটা অংশের একটা চোখ থাকে, তারপর বীজগুলো জমিতে রোপন করত আর পরবর্তী গ্রীষ্মে মাটি খুঁড়ে বের করত। সে গাড়ি চালাতে শেখেনি, তাই যুুদ্ধ শুরু হলে বাবার গাড়িটা বিক্রি করে দিল। মেনোনাইটরা ওকে একটা ঘোড়া দিল, কারণ এটা আর কৃষিকাজের জন্য উপযোগী ছিল না। আর ওদের একজন এসে ওকে শেখাল কীভাবে ঘোড়ার লাগাম পরাতে হয় আর ঘোড়ার গাড়িটা চালাতে হয়।  

একবার পুরোনো এক বান্ধবী বেড়াতে এল এবং সে মনে করল এভাবে ওর এখানে থাকার কোনো মানেই হয় না। সে বেলকে ওর সাথে টরেন্টোতে নিয়ে যেতে চেয়েছিল, কিন্তু তাহলে ওর মায়ের কী হবে? এতদিনে তিনি অবশ্য বেশ শান্ত হয়েছেন আর পরনের কাপড়ও ঠিক রাখেন, এছাড়া প্রতি শনিবার বিকেলে রেডিওতে অপেরা শুনতে পছন্দ করেন। অবশ্য টরেন্টো গেলেও তিনি তা করতে পারতেন, তবে একেবারে মূলসুদ্ধ উপড়ে এখান থেকে তাকে নিয়ে যেতে সে পছন্দ করছিল না। কিংবা হয়তো সে নিজের কথাই বলছিল, আসলে সেই হয়তো এখান থেকে মূলোত্পাটন করে চলে যেতে ভয় পাচ্ছিল। 

জ্যাকসনকে প্রথম যে কাজটি করতে হবে, সেটা হচ্ছে শীতের সময়ে শোয়ার জন্য রান্নাঘরের চেয়েও ভালো কয়েকটা কামরা তৈরি করা। ঠাণ্ডা এলাকা থেকে যেসব নেংটি আর ধাড়ী ইঁদুর আসে, সেগুলোর উত্পাত থেকে রেহাই পেতে হবে। সে যখন জিজ্ঞেস করলো, বেল কেন বিড়াল পুষে না তখন সে তার কাছ থেকে অদ্ভুত ধরনের যুক্তি শুনতে পেল। সে বলল, বিড়াল বিভিন্ন কিছু মেরে টেনে এনে তাকে দেখাবে, যা সে চায় না। কট করে একটা শব্দে ইঁদুর ধরার ফাঁদের দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ শোনার জন্য সে সবসময় কান খাড়া রাখত আর কী হয়েছে বোঝার পর সে ইঁদুরগুলো ছুড়ে ফেলে দিত। তারপর জ্যাকসন তাকে রান্নাঘরে স্তূপ করে রাখা কাগজগুলোর কারণে আগুন লেগে যাওয়ার সমস্যাটির কথা বলে লম্বা একটা বক্তৃতা দিল। বেল এগুলো সরাতে রাজি হলো, যদি সামনের কামরাটার স্যাঁতসেঁতে ভাবটা দূর করা যায়। এখন এটাই তার মূল কাজ হয়ে দাঁড়াল। সে একটা হিটারের ব্যবস্থা করল আর দেয়ালগুলো মেরামত করল। আর কাগজগুলো নিচে নামিয়ে বেলকে এগুলো পড়তে রাজি করালো, যাতে আবার পুনর্বিন্যাস করে, সে যে তাকগুলো বানিয়েছে তার ওপর সাজিয়ে রাখা যায়। 

বেল বলেছিল যে, কাগজগুলোতে তার বাবার বইও আছে। অনেকসময় সে এটাকে একটা উপন্যাস বলত। জ্যাকসন কখনও এই বইটি সম্পর্কে কিছু জিজ্ঞাসা করার কথা ভাবেনি, তবে একদিন বেল নিজেই ওকে বলল, এটা ম্যাটিল্ডা আর স্টিফেন নামে দুই জন মানুষের কাহিনি। একটা ঐতিহাসিক উপন্যাস।

বেল বলল, ‘তুমি যে ইতিহাস পড়েছিলে, সে কথা মনে আছে?’ জ্যাকসন হাইস্কুলে পাঁচ বছর পড়েছিল আর খুব ভালো নম্বর নিয়ে পাস করেছিল। ত্রিকোণমিতি আর ভূগোলে খুব ভালো করেছিল তবে ইতিহাসের কথা ওর তেমন একটা মনে পড়ল না। স্কুলের শেষ বর্ষে ওরা শুধু ভাবত যে, ওদেরকে যুদ্ধে যেতে হবে।

সে বলল, ‘খুব একটা মনে নেই।’  

‘সবটাই মনে পড়তো যদি বিশপ স্ট্রনে পড়তে। ওরা গলা দিয়ে এটা ঢুকিয়ে দিত। তবে সেটা ছিল ইংরেজদের ইতিহাস।’

তারপর বেল বলল যে, স্টিফেন ছিল একজন বীর। একজন সম্মানিত ব্যক্তি, তার সময়ের জন্য খুবই ভালো ছিলেন। তিনি ছিলেন সেই ধরনের বিরল এক ব্যক্তি, যিনি কেবল নিজের কথাই ভাবতেন না কিংবা একবার কাউকে কোনো কথা দিলে, যে মুহূর্তে তা ভঙ্গ করার একটা সুযোগ পান সাথে সাথে তা ভেঙে ফেলতেন না। একারণেই শেষপর্যন্ত তিনি জীবনে সফলতা লাভ করেননি।  

আর তারপর মাটিল্ডার কথা। সে ছিল উইলিয়াম দ্য কংকারারের সরাসরি একজন বংশধর আর এমন নিষ্ঠুর এবং অহংকারী ছিল, যা ভাবাই যায় না। তবে সে একজন নারী হওয়ার কারণে হয়তো কিছু বোকা মানুষ তারও সমর্থক ছিল।   

‘তিনি এটা লিখে শেষ করে যেতে পারলে এটা খুবই চমত্কার একটা উপন্যাস হতো।’

জ্যাকসন অবশ্যই একজন বোকা লোক ছিল না। সে জানে বই থাকার কারণ, কেউ না কেউ বসে এটা লিখত। ওরা শূন্য থেকে উড়ে আসে না। তবে প্রশ্নটা হলো, কেন? বই তো অনেক আছে, প্রচুর বই। স্কুলে সে দুটো বই পড়েছে। ‘অ্যা টেল অব টু সিটিস’ আর ‘হাকলবেরি ফিন’। আর প্রত্যেকটাই এমন ভাষায় লেখা যে একেবারে ধৈর্য নিঃশেষ করে দেয়, তবে বিভিন্নভাবে। এটা অবশ্য বোধগম্য। কারণ এগুলো অতীতে লেখা হয়েছিল। তবে একটা বিষয় তাকে হতবুদ্ধি করেছে যদিও সে তা হতে চায়নি। বর্তমানকালে কেন একজন মানুষ বসে বসে আরেকটা বই লিখবে? এখন।

বেল বলল, এটা একটা বিয়োগান্তক বিষয়। জ্যাকসন বুঝতে পারল না এটা সে তার বাবার সম্পর্কে বলছে নাকি বইয়ের পাত্রপাত্রীদের সম্পর্কে বলছে, যা এখনও লিখে শেষ করা হয়নি। যা-ই হোক কামরাটা যেহেতু এখন বাসযোগ্য হয়েছে, তাই এবার সে ছাদের দিকে মনোযোগ দিল। একটা কামরা মেরামত করে ঠিক করার পর, ছাদের অবস্থা যদি আগের মতো ফেলে রাখা হয়, তবে দুই-এক বছরের মধ্যে এটা বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে। সে ছাদে কয়েকটা জোড়াতালি দেওয়ার ব্যবস্থা করল, যাতে এটা বেশ কয়েকটা শীত পার করতে পারে, তবে এর বেশি নিশ্চয়তা সে দিতে পারল না। তারপরও সে বড়দিনের আগে চলে যাওয়ার পরিকল্পনা করে রাখল।   

পাশের খামারের মেনোনাইট পরিবারে বাড়ন্ত বয়সের কয়েকটা মেয়ে আর ছোট ছোট ছেলেদের সে দেখেছে। ভারী কাজ করার জন্য ওরা কেউ তেমন শক্তিশালী ছিল না। শীতের ফসল তোলার সময় জ্যাকসন ওদেরকে সাহায্য করল। ওদের পরিবারের সবার সাথে বসে খাওয়ার জন্য তাকে আমন্ত্রণ করা হলো আর সে অবাক হয়ে দেখল—ওকে খাবার পরিবেশন করার সময় মেয়েগুলো বেশ ছটফটানি আর অস্থিরতা দেখাচ্ছিল আর সে যেরকম আশা করেছিল, ওরা মোটেই সেরকম বোবা নয়। সে লক্ষ করল মায়েরা ওদের ওপর নজর রেখেছিলেন আর বাবারাও তার ওপর নজর রাখছিলেন। ব্যস সবকিছু নিরাপদ।  

আর এসব ব্যাপারে সে বেলকে কিছুই বলেনি। সে জেনেছিল—বেল তার চেয়ে ষোলবছরের বড়। কাজেই এ বিষয়টা উল্লেখ করা কিংবা এটা নিয়ে রসিকতা করলেও সবকিছু পণ্ড হবে। সে ছিল একধরনের মহিলা আর জ্যাকসন নিজে ছিল অন্য ধরনের একজন মানুষ।

যখন কোনো দরকার পড়ত তখন ওরা ওরিওল নামে একটি শহরে বাজার করত। যে শহরে সে বড় হয়েছে, এটা ছিল তার উল্টোদিকে। সে ইউনাইটেড চার্চের শেডে ওর ঘোড়া বেঁধে রাখল, কারণ বড় রাস্তায় ঘোড়া বেঁধে রাখার কোনো ব্যবস্থা আর অবশিষ্ট ছিল না। প্রথম প্রথম সে হার্ডওয়ার আর নাপিতের দোকানের দিকে আড় চোখে তাকিয়েছিল। তবে বেশ শিগগিরই ছোট শহরের বিষয়গুলো সে বুঝতে পারল, যা তার আগেই বোঝা উচিত ছিল, কেননা সে নিজেও তো একটা ছোট শহরে বড় হয়েছে। বলপার্ক কিংবা হকির মাঠে কোনো খেলা হওয়ার সময় ছাড়া শহরের অধিবাসীদের একে অপরের সাথে তেমন বিশেষ কিছু করার ছিল না। শুধু খেলার মাঠে ওরা বানিয়ে বানিয়ে চরম শত্রুতার মনোভাব দেখাত। নিজেদের শহরের দোকানে কোনো জিনিস না পেলে ওরা বড় শহর থেকে আনতে যেত। একইভাবে ওদের শহরের ডাক্তার যদি প্রয়োজনীয় চিকিত্সাসেবা দিতে না পারত, তখনও ওরা বড় শহরে যেত। শহরে কোনো পরিচিত মুখ ওর চোখে পড়েনি আর কেউ তার প্রতি আগ্রহও দেখায়নি, তবে ওর ঘোড়াটার দিকে ওরা অন্তত দুই বার তাকিয়েছিল। শীতের মাসগুলোতে রাস্তার বরফ পরিষ্কার না করা পর্যন্ত শহরের দুধ-মাখনের দোকানে যারা দুধ নিয়ে যেত কিংবা মুদি দোকানে যারা ডিম সরবরাহ করত তাদেরকে ঘোড়ার গাড়িতেই যাতায়াত করতে হতো।    

বেল সবসময় একবার থেমে দেখত কী সিনেমা চলছে, তবে তার কোনো সিনেমা দেখার ইচ্ছা ছিল না। সিনেমা আর চিত্রতারকাদের সম্পর্কে তার যথেষ্ট জ্ঞান ছিল, তবে সেগুলো বেশ কয়েক বছর আগের সিনেমার তারকাদের সম্পর্কে। যেমন সে বলতে পারত রেট বাটলার হওয়ার আগে বাস্তব জীবনে ক্লার্ক গ্যাবলের সাথে কার বিয়ে হয়েছিল।

শীঘ্রই জ্যাকসনের চুল কাটার প্রয়োজন হয়েছিল আর তামাক শেষ হয়ে যাওয়ায় ওর তামাকও কেনার প্রয়োজন হয়েছিল। এখন সে একজন কৃষকের মতোই সিগারেট খেতে শুরু করেছে। নিজের হাতেই বানিয়ে সিগারেট খেত, তবে কখনও ঘরের ভেতরে সিগারেট জ্বালত না। 

সে-সময়ে সেকেন্ডহ্যান্ড গাড়ি খুব একটা পাওয়া যেত না। অবশেষে নতুন মডেলের সেকেন্ডহ্যান্ড গাড়ি যখন বাজারে এল আর পয়সাওয়ালা কৃষকরা পুরোনো গাড়ি বিক্রি করতে শুরু করল, তখন সে বেলের সাথে এ ব্যাপারে আলাপ করল।

ঘোড়ার গাড়ির এই উদ্ভট ব্যাপারটা ঈশ্বরই জানেন কত বছরের পুরোনো আর এটা নিয়ে যে কোনো পাহাড়ে ওঠাই দুঃসাধ্য হয়ে পড়ত।   

সে দেখল গাড়িবিক্রেতা লোকটি কিছুদিন ধরে তাকে লক্ষ করলেও, গাড়ি বিক্রির ব্যাপারে কথা বলার জন্য এখনও তার কাছে আসেনি।

তারপর একসময় লোকটি বলল, ‘আমি সবসময় ভাবতাম আপনি আর আপনার বোনও মেনোনাইট খ্রিস্টান তবে আপনারা ভিন্ন ধরনের পোশাক পরেন।’

কথাটা শুনে জ্যাকসন একটা ধাক্কা খেল, তবে অন্তত স্বামী-স্ত্রী বলার থেকে তো এটা ভালো। এতে সে বুঝতে পারল, যে তাকে নিশ্চয়ই অনেক বয়ষ্ক দেখাচ্ছে আর গত কয়েক বছরে নিশ্চয়ই ওর মাঝে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। যে মানুষটি ট্রেন থেকে লাফিয়ে নেমেছিল, সেই লিকলিকে চোহারার স্নায়বিক দুর্বলতায় ভোগা সৈনিকটিকে এখন আর এই লোকের মাঝে খুঁজে পাওয়া যাবে না। তবে সে দেখতে পেল বেল জীবনের এমন এক সময়ে থেমে গিয়েছিল, যখন সে প্রায় বড় হয়ে যাওয়া একজন শিশু ছিল। আর বেলের কথাবার্তায় সে ধারণা আরো জোরদার হয়েছিল। অতীতের মাঝে লাফ দিয়ে ঢুকে আবার এমনভাবে সে বেরিয়ে আসত যে, মনে হতো, এবার শেষ যখন সে শহরে গিয়েছিল আর ওর বাবা-মা’র সাথে শেষবারের মতো সিনেমা দেখার ঘটনার মাঝে সে কোনো পার্থক্য খুঁজে পায় না।  কিংবা মার্গারেট রোজ যখন আতঙ্কিত জ্যাকসনের দিকে শিং উঁচিয়ে ধরে একটা হাস্যকর দৃশ্যের অবতারণা করেছিল তার সাথেও এগুলোর কোনো পার্থক্য সে খুঁজে পায় না। গরুটা অবশ্য বর্তমানে মৃত।  

দ্বিতীয় যে গাড়িটা ওরা কিনেছিল, সেটায় চড়ে ওরা ১৯৬২ সালের গ্রীষ্মে টরেন্টো বেড়াতে গেল। এই সফরের কথা ওরা আগে থেকে ভাবেনি আর এটা যখন ঘটল তখন জ্যাকসনের জন্য একটা বিব্রতকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হলো। প্রথমত সে তখন মেনোনাইটদের জন্য নতুন একটা ঘোড়ার আস্তাবল বানিয়ে দিচ্ছিল, কারণ ওরা তখন কৃষিকাজ নিয়ে ব্যস্ত ছিল, আর আরেকটি কারণ হলো তার নিজের সবজির ফলন তখন তোলার সময় হয়েছিল। ওরিওল শহরের একটা মুদিদোকানে বিক্রি করার পরিকল্পনা নিয়ে সে সবজির চাষ করেছিল। কিন্তু বেলের একটা টিউমার বা ফোঁড়া জাতীয় কিছু হয়েছিল এবং এটার দিকে মনোযোগ দেওয়ার জন্য তাকে রাজি করানো হয়েছিল। এখন টরেন্টোতে তার অপারেশন করার জন্য দিন ঠিক করা হয়েছে।

 বেল বার বার বলতে লাগল, আশ্চর্য কী পরিবর্তন হয়েছে। তুমি কি নিশ্চিত যে আমরা এখনও কানাডায় আছি? 

কিচেনার পার হওয়ার আগে সে একথা বলছিল। তবে নতুন হাইওয়েতে উঠতেই সে সত্যি সত্যি আতঙ্কিত হয়ে উঠেছিল, আর বার বার তাকে অনুরোধ করছিল ছোট একটা রাস্তা খুঁজে নিতে কিংবা গাড়ি ঘুরিয়ে বাড়ি ফিরে যেতে। জ্যাকসন নিজেও তার সাথে কঠোরভাবে কথা বলছিল—রাস্তায় এত গাড়ির চলাচল দেখে সেও অবাক হয়েছিল। এরপর বাকি পথটুকু বেল চুপচাপ বসে ছিল আর জ্যাকসনের জানারও কোনো উপায় ছিল না সে কি চোখ বুজে রয়েছে, হাল ছেড়ে দিয়েছে না কি প্রার্থনা করছে। অবশ্য সে কোনোদিন বেলকে প্রার্থনা করতে দেখেনি।

এমনকি আজ সকালেও সে টরেন্টো যাওয়ার বিষয়ে জ্যাকসনের মন পরিবর্তন করার চেষ্টা করেছিল। সে বলছিল টিউমারটা ছোট হচ্ছে, বড় নয়। আর বলেছিল সবার জন্য স্বাস্থ্যবীমা চালু হওয়ার পর থেকে সবাই ডাক্তারের কাছে ছুটছে। নিজেদের জীবনকে হাসপাতাল আর অপারেশনের একটা দীর্ঘ নাটকে পরিণত করছে। জীবনের শেষবেলাটিকে টেনে লম্বা করে একটা বিড়ম্বনা তৈরি করা ছাড়া আর কিছুই করছে না।

হাইওয়ে থেকে মোড় নিয়ে শহরে ঢোকার পর সে শান্ত হলো আর সেই সাথে চাঙ্গাও হয়ে উঠল। ওরা যখন অ্যাভিনিউ রোডে এল, তখন সবকিছুতে কীরকম পরিবর্তন হয়েছে, একথা বলে বিস্ময় প্রকাশ করার বদলে মনে হলো সে প্রতিটা ব্লকে তার পরিচিত কিছু একটা দেখে চিনতে পারছিল। ওই যে ওই অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিং-এ বিশপ স্ট্রনের একজন শিক্ষক থাকতেন (আসলে তার উচ্চারণে ভুল ছিল, নামটা আসলে হবে স্ট্রাখান, একটু আগেই একথাই সে জ্যাকসনকে বলেছিল)। এর বেইজমেন্টে একটা দোকান ছিল, যেখানে দুধ, সিগারেট আর খবরের কাগজ পাওয়া যেত। ব্যাপারটা খুব আজব হবে না, যদি ওই দোকানে গিয়ে এখনও টেলিগ্রাম পত্রিকাটি পাওয়া যায়, যাতে ওর বাবার শুধু নামই নয় চুল থাকা অবস্থায় তোলা একটা ঝাপসা ছবিও থাকার কথা।

তারপর সে চেঁচিয়ে উঠল, আর একটু সামনে রাস্তার ধারে সে সেই গির্জাটা দেখতে পেয়েছে—আর শপথ করে বলতে পারে এটাই সেই গির্জা—যেখানে ওর বাবা-মা’র বিয়ে হয়েছিল। গির্জাটা দেখাতে ওর বাবা-মা তাকে সেখানে নিয়ে গিয়েছিল, যদিও ওরা এই গির্জার সদস্য ছিল না। ওরা অবশ্য কখনও কোনো গির্জায় যেত না, এটা তো দূরের কথা। ওর বাবা বলেছিলেন, বিয়েটা বেইজমেন্টে হয়েছিল, তবে মা বলেছিলেন, না এটা গির্জার পোশাকঘরে হয়েছিল। 

ওর মা তখন কথা বলতে পারতেন, অর্থাত্ যখন তার কথা বলার ক্ষমতা ছিল। সম্ভবত তখন হয়তো আইন ছিল যে, বিয়ে শুধু গির্জায় হতে হবে, আর নয় তো এটা আইনসিদ্ধ হবে না।

এগলিংটন অ্যাভিনিউয়ে এসে সে সাবওয়ে স্টেশনের নাম লেখা ফলকটা দেখতে পেল।

‘জানো, আমি না কখনও সাবওয়ে ট্রেনে চড়িনি।’ 

কথাটা বলার সময় তার কথার সুরে গর্বের সাথে একটু বেদনারও আভাস পাওয়া গেল।

‘কল্পনা করতে পার, আমি কীরকম মুর্খ ছিলাম।’

হাসপাতালে পৌঁছার পর ওরা দেখল, হাসপাতালের লোকজন ওদের জন্য প্রস্তুত হয়ে অপেক্ষা করছিল। সে অবশ্য তখনও বেশ প্রাণবন্ত ছিল, আর ওদেরকে সে রাস্তায় কীরকম আতঙ্কিত হয়েছিল আর সবকিছুতে কীরকমের পরিবর্তন হয়েছে সে-সবের বর্ণনা দিচ্ছিল। আর জিজ্ঞেস করছিল—বড়দিনের সময় ইটন স্টোর কি এখনও আগের মতো সাজানো হয়? কেউ কি টেলিগ্রাম পত্রিকার কথা শুনেছে?

একজন নার্স বললেন, ‘আপনার চায়নাটাউনের ভেতর দিয়ে আসা উচিত ছিল। ওটাই এখন একটা বিশেষ কিছু হয়েছে।’

সে হাসতে হাসতে  বলল, ‘বাড়ি ফেরার সময় দেখার আশা রইল। অবশ্য যদি আদৌ বাড়ি ফিরতে পারি।’ 

‘এমন কথা বলবেন না।’

আরেকজন নার্স জ্যাকসনকে জিজ্ঞেস করছিল, গাড়িটা সে কোথায় পার্ক করেছে? তারপর সে বলল, ওখান থেকে সরিয়ে অন্য জায়গায় পার্ক করতে, যাতে ওর জরিমানা না হয়। তারপর ওকে বলল, শহরের বাইরে থেকে যারা আসে, তাদের থাকার জন্য হোটেলের চেয়ে কমখরচের থাকার জায়গা আছে, তা যেন সে খুঁজে নেয়।

ওরা বলল, বেলকে এখন বেডে নিতে হবে। একজন ডাক্তার এসে তাকে পরীক্ষা করবেন আর জ্যাকসন পরে এসে তাকে শুভরাত্রি জানাতে পারবে। তারপর ওরা জানাল, তবে তখন ওষুধের প্রভাবে বেল একটু তন্দ্রাচ্ছন্ন থাকবে।

ওদের কথা শুনতে পেয়ে বেল বলল, সে সবসময় তন্দ্রাচ্ছন্নই থাকে, কাজেই এতে জ্যাকসন অবাক হবে না। এটা শুনে সবাই জোরে হেসে উঠল।

যাওয়ার আগে নার্স জ্যাকসনকে ফর্মের একজায়গায় সই করতে বলল। যেখানে লেখা ছিল রোগীর সাথে কী সম্পর্ক, সে জায়গায় এসে সে একটু ইতস্তত করল। তারপর লিখল, ‘বন্ধু’।

সন্ধ্যায় ফিরে এসে সে একটা পরিবর্তন দেখতে পেল, যদিও তা বর্ণনা করল না, কারণ বেল তখন ওষুধের প্রভাবে তন্দ্রাচ্ছন্ন ছিল। ওরা তাকে বস্তার মতো সবুজ একটা পোশাক পরিয়েছে। পোশাকটির গলা আর হাতা খোলা ছিল। এরকম খোলামেলা অবস্থায় বেলকে সে খুব কমই দেখেছে আর লক্ষ করল, কয়েকটা নল তার গলার চারপাশে আর চিবুক থেকে ঝুলে রয়েছে।

মুখের ভেতরটা শুকিয়ে যাওয়ার কারণে সে বেশ রেগেছিল। 

‘ওরা আমাকে কয়েক চুমুকের বেশি পানি খেতে দিচ্ছে না।’

সে জ্যাকসনকে এক বোতল কোক কিনে আনতে বলল, অথচ সে যতদূর জানে এই জিনিস বেল জীবনে কখনও খায়নি।

‘আমার মনে হয় নিচতলার হলে নিশ্চয়ই একটা মেশিন আছে। আমি দেখেছি লোকজন হাতে হাতে একটা বোতল নিয়ে ঘুরছে আর এটা দেখেই আমার পিপাসা আরো বেড়ে যায়।’

 জ্যাকসন বলল, সে নির্দেশের বিরুদ্ধে কিছু করতে পারবে না।

একথা শুনে বেলের চোখে পানি এসে গেল। রুক্ষ মেজাজ নিয়ে সে অন্য দিকে মুখ ফেরাল।

 ‘আমি বাড়ি যেতে চাই।’  

‘শিগগিরই যাবে।’

‘তুমি আমার কাপড়গুলো খুঁজে এনে দাও।’

‘না, এটা আমি করতে পারি না।’

‘তুমি না পার তো, আমি নিজেই খুঁজে নেব । নিজে ট্রেন স্টেশন খুঁজে নিয়ে চলে যাব।’

‘এখন আর কোনো যাত্রিবাহী ট্রেন আমাদের ওখানে যায় না।’

তারপর হঠাত্ মনে হলো সে পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনার আশা ছেড়ে দিয়েছে।

এর কয়েক মুহূর্ত পর সে ওর বাড়িটার কথা আর এতে বিশেষত জ্যাকসনের কারণে যা যা উন্নতি হয়েছে সেগুলো নিয়ে স্মৃতিচারণ করতে শুরু করল। বাড়ির বাইরের দিকে চকচকে সাদা রঙ করা হয়েছিল আর এমনকি পেছনের রান্নাঘরেও চুনকাম করাসহ কাঠের তক্তার নতুন একটা মেঝে তৈরি করা হয়েছিল। ছাদে নতুন করে কাঠের তক্তি দিয়ে আস্তর করা হয়েছিল আর জানালাগুলো আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হয়েছিল এবং সবচেয়ে বড় কথা, পানির কল ঠিক করা হয়েছিল, শীতকালে যা সত্যি একটি আনন্দদায়ক ব্যাপার।

‘তুমি না এলে আমি হয়তো অতি শিঘ্রই পুরোপুরি আবর্জনার মধ্যেই থাকতাম।’

জ্যাকসন ওর মত প্রকাশ করে জানাল না যে, সে ইতোমধ্যে আবর্জনার মাঝেই আছে।

বেল বলল, ‘এখান থেকে বের হওয়ার পর আমি একটা উইল করব। সবকিছু তোমার হবে। এতদিন যে শ্রম দিয়েছ তা বৃথা যেতে দেব না।’ 

সে নিজেই অবশ্য এ ব্যাপারটা নিয়ে ভেবেছিল। তাছাড়া সম্পত্তির মালিক হবে এ ধরনের ভাবনা তার মনে একধরনের শান্ত সন্তুষ্টি এনে দেওয়ার কথা, তবে তাকে সত্যনিষ্ঠার সাথে এবং তার সমব্যথী হিসেবে আশ্বাস দিয়ে বলতে হবে যে, না তেমন কিছুই হবে না। তবে না। মনে হচ্ছে এসব চিন্তা মোটেই তাকে নিয়ে হচ্ছে না, হওয়া তো বহু দূরের কথা। 

বেল আবার অস্থিরভাবে ছটফট করতে লাগল।

‘ওহো, আমি যদি এখানে না থেকে ওখানে থাকতাম।’

‘অপারেশনের পর যখন তুমি জেগে উঠবে তখন তোমার অনেক ভালো লাগবে।’

তবে এ বিষয়ে সে যতটুকু শুনেছে, তাতে সে বুঝেছে এটা একটা ডাহা মিথ্যা। তারপর হঠাত্ সে ভীষণ ক্লান্তি অনুভব করল।

সে যা অনুমান করতে পেরেছিল, তার কাছাকাছিই সত্য কথাটা বলেছিল। অপারেশন করে পিণ্ডটা অপসারণ করার দুই দিন পর বেল অন্য একটা কামরার বিছানায় বসে তাকে স্বাগত জানাবার জন্য বেশ আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছিল। পাশের বেডে পর্দার আড়াল থেকে যে মহিলাটা গোঙাচ্ছিল, তা নিয়ে সে মোটেই বিরক্ত হচ্ছিল না। গতকালও বেল নিজেও প্রায় এরকমই করছিল, যখন সে একবারও তার চোখ খুলেনি কিংবা জ্যাকসনকে লক্ষও করেনি। 

বেল বলল, ‘ওদিকে মনোযোগ দিও না। সে পুরোপুরি এর বাইরে চলে গেছে। হয়তো কিছুই অনুভব করছে না। দেখবে কালকেই সে তরতাজা হবে। কিংবা হয়তো হবে না।’

বিছানায় বসে সে একটা বাঁকা স্ট্র দিয়ে একধরনের উজ্জ্বল কমলার রস খাচ্ছিল। মাত্র দু দিন আগে যে মহিলাটিকে সে হাসপাতালে এনেছিল সে তুলনায় এখন বেলকে যথেষ্ট কম বয়সী দেখাচ্ছে। 

বেল জানতে চাইল, জ্যাকসন ঠিকমতো ঘুমাচ্ছে কি-না, খাওয়ার জন্য মনমতো কোনো জায়গা খুঁজে পেয়েছে কি-না, হেঁটে বেড়াবার জন্য আবহাওয়া যথেষ্ট গরম কি-না আর বেল যে রয়েল অন্টেরিও মিউজিয়ামটা দেখেছিল, সেটা কি জ্যাকসন দেখেছে কি-না। 

তবে জ্যাকসন কী উত্তর দিচ্ছে, সেদিকে সে ঠিক মনোযোগ দিতে পারছিল না। মনে হচ্ছিল যেন ভেতরে ভেতরে সে একটা প্রচণ্ড বিস্ময়ের মধ্যে রয়েছে। একধরনের নিয়ন্ত্রিত বিস্ময়।

জ্যাকসন যখন তাকে ব্যাখ্যা করে কিছু বলছিল, তখন মাঝপথে তাকে থামিয়ে দিয়ে সে বলল, ‘হুঁ কথাটা আমার তোমাকে বলতেই হবে। তোমাকে দেখে মনে হয় না যে খুব একটা ভয় পেয়েছ। এরকম মুখ করে থাকলে কিন্তু আমার হাসি পাবে আর সেলাই ছিঁড়ে যেতে পারে। তাছাড়া হঠাত্ হাসার কথাই বা কেন আমি চিন্তা করছি? এটা একটা ভয়ংকর ধরনের দুঃখজনক বিষয়, একটা ট্রাজেডি। তুমি আমার বাবার সম্পর্কে জেনেছ, বাবার সম্পর্কে তোমাকে আমি যা বলেছি—’

সে লক্ষ করল যে ড্যাডি না বলে বেল এখন বাবা বলছে।

‘আমার বাবা আর আমার মা—’

মনে হলো সে কিছু একটা খুঁজে নিয়ে আবার নতুন করে কিছু বলতে চাচ্ছে।

‘তুমি প্রথম এসে যেভাবে দেখেছিলে, তার চেয়ে বাসাটা তখন কিন্তু বেশ ভালো অবস্থায় ছিল। অবশ্য থাকারই কথা। সিঁড়ির ওপরের কামরাটা আমরা বাথরুম হিসেবে ব্যবহার করতাম। অবশ্য পানি বয়ে নিয়ে যেতে হতো। কেবল পরে তুমি যখন এলে তখন আমি নিচের বাথরুমটা ব্যবহার করতে শুরু করি।   

‘যা-ই হোক পানি গরম করে ওপরে নিয়ে যেতাম। তারপর জামাকাপড় খুলে ফেলতাম। অবশ্য তা করারই কথা। সিঙ্কের ওপর একটা বড় আয়না ছিল, বুঝলে? সত্যিকার বাথরুমের মতো এতে একটা সিঙ্ক ছিল, শুধু গোসল সারার পর প্লাগটা খুলে দিলেই পানি নিচের বালতিতে পড়ে যেত। টয়লেট ছিল অন্য জায়গায়। ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছ নিশ্চয়ই। কাজেই আমি গা ধুয়ে স্পঞ্জ করতে শুরু করলাম আর তখন আমি স্বভাবতই পুরোপুরি নিরাবরণ ছিলাম। তখন প্রায় রাত নয়টা, কাজেই যথেষ্ট আলো ছিল। তখন গরমকাল ছিল আর ছোট্ট কামরাটা ছিল পশ্চিমমুখি।

‘তারপর কারও পায়ের আওয়াজ পাওয়া গেল, আর এটা ছিল ড্যাডি। আমার বাবা। তিনি হয়তো তখন মাকে ঘুম পাড়িয়ে এসেছেন। সিঁড়ি বেয়ে উঠে আসার শব্দ পেলাম আর লক্ষ করলাম শব্দটা বেশ ভারী মনে হচ্ছিল। কেমন যেন অস্বাভাবিক মনে হলো। মনে হলো যেন ইচ্ছাকৃতভাবেই শব্দটা এমন করা হচ্ছে। কিংবা পরবর্তী সময়ে এটা হয়তো কেবল আমার ধারণাই ছিল। কোনো একটা ঘটনা ঘটার পর সেটার একটা নাটকীয় রূপ দিতে আমরা বেশ পটু। পায়ের শব্দটা বাথরুমের দরজার ঠিক বাইরে এসে থেমে গেল। আর আমি হয়তো ভেবেছিলাম তিনি খুব ক্লান্ত ছিলেন। দরজাটার কোনো হুড়কা না থাকায় এটা শুধু ভেজানো ছিল। দরজা ভেজানো মানেই আমরা ধরে নিতাম যে, কেউ এর ভেতরে আছে।  

‘কাজেই তিনি দরজার ঠিক বাইরে এসে দাঁড়িয়ে ছিলেন আর এনিয়ে আমি তেমন কিছু ভাবিনি। তারপর তিনি দরজাটা খুলে সেখানে দাঁড়িয়ে আমার দিকে তাকালেন। আর আমাকে বলতে হবে একথাটা বলতে আমি কী বোঝাতে চাচ্ছি। শুধু আমার মুখ নয়, পুরো অবয়ব দেখলেন। আমার মুখ ছিল আয়নার দিকে আর তিনি আয়নায় আমার দিকে তাকালেন আর পেছনের দিকেও তাকালেন, যা আমি দেখতে পাচ্ছিলাম না। আর কোনো অর্থেই এটা স্বাভাবিক দৃষ্টি ছিল না।

‘আমি কী ভেবেছিলাম তোমাকে বলছি শোন। আমি ভেবেছিলাম, তিনি ঘুমের ঘোরে হাঁটছেন। তবে বুঝতে পারলাম না কী করব, কারণ ঘুমের ঘোরে কেউ হাঁটলে তাকে চমকে দিতে নেই।

‘তারপর তিনি বললেন, ‘এক্সকিউজ মি’, তখন আমি বুঝলাম তিনি ঘুমিয়ে নেই। তবে কেমন যেন অন্যরকম স্বরে কথাটা উচ্চারণ করলেন। আমি বলতে চাচ্ছি গলার স্বরটা কেমন যেন অদ্ভুত মনে হলো। মনে হচ্ছিল যেন তিনি আমার ওপর অত্যন্ত বিরক্ত হয়েছেন। কিংবা আমার ওপর প্রচণ্ড রেগে রয়েছেন, জানি না কী সেটা। তারপর দরজাটা খোলা রেখেই নিচে নেমে গেলেন। আমি গা মুছে নাইটগাউন পরলাম। তারপর বিছানায় গিয়ে সাথে সাথে ঘুমিয়ে পড়লাম। সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর দেখলাম গোসলের পানিটা তখনও রয়ে গেছে, ইচ্ছা হচ্ছিল না এর কাছে যেতে তবু গেলাম। 

‘তবে এরপর সবকিছু স্বাভাবিক মনে হলো এবং তিনিও ইতোমধ্যে টাইপের কাজে লেগে পড়েছিলেন। চিত্কার করে আমাকে সুপ্রভাত বললেন আর কিছু শব্দের বানান জিজ্ঞেস করলেন। যেরকম মাঝে মাঝে করতেন, কারণ আমি বানান খুব ভালো করতে পারতাম। কাজেই আমি বানানগুলো তাকে জানালাম আর বললাম, যদি তিনি মনে করেন তিনি একজন লেখক, তাহলে তাকে ভালোভাবে বানান শিখতে হবে, কারণ তিনি বানানে খুবই কাঁচা। তবে এরপর দুপুরে যখন আমি থালাবাসন ধুচ্ছিলাম, তখন তিনি আমার ঠিক পেছনে এসে দাঁড়াতেই আমার গা-হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে গেল। তিনি শুধু বললেন, ‘বেল, আমি দুঃখিত।’ আর আমি ভাবলাম, ইশশ, কথাটা তিনি না বললেও পারতেন। এটাই আমাকে ভয় পাইয়ে দিয়েছিল। আমি জানতাম, এটা সত্যি যে তিনি দুঃখিত হয়েছেন, তবে কথাটা এমনভাবে খোলাখুলি বললেন, যা আমি উপেক্ষা করতে পারলাম না। আমি শুধু বললাম, ‘ ঠিক আছে।’ তবে কথাটা সহজ কণ্ঠে বলতে পারলাম না।     

‘আমি পারিনি। আমার তাকে জানানো দরকার ছিল যে, তিনি আমাদের মাঝে একটা পরিবর্তন এনে দিয়েছেন। থালাবাসন ধোয়ার পর পানি বাইরে ফেলে দিয়ে আমি অন্যান্য কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম আর একটা কথাও বললাম না। পরে দিবানিদ্রা থেকে মাকে উঠালাম, রাতের খাবার রেডি করে বাবাকে ডাকলাম, কিন্তু তিনি এলেন না। মাকে বললাম, তিনি হয়তো হাঁটতে গেছেন। লিখতে লিখতে কোথাও আটকে গেলে তিনি এরকমই মাঝে মাঝে হাঁটতে চলে যান। আমি মায়ের খাবারগুলো টুকরা টুকরা করে কাটার কাজে সাহায্য করতে লাগলাম।

‘আমি জানতাম না কোথায় তিনি যেতে পারেন। এরপর মায়ের বিছানা ঠিক করলাম, যদিও এটা বাবার কাজ ছিল। তারপর ট্রেন আসার শব্দ শোনা গেল আর তারপর হঠাত্ একসাথে হৈচৈ আর ট্রেনের ব্রেকের ক্যাঁচ করে কানফাটা শব্দ ভেসে এল। আমি জানতাম নিশ্চয়ই কিছু একটা ঘটেছে, তবে যখন জানলাম তখন ঠিক বুঝতে পারলাম না ঠিক কী ঘটেছে।

‘কথাটা আগেই তোমাকে বলেছিলাম। বলেছিলাম তিনি ট্রেনে চাপা পড়েছিলেন। 

‘কিন্তু এখন আমি একথা বলছি না, শুধু যন্ত্রণাদায়ক মনে হওয়ার জন্য কথাটা এখন বলছি না। প্রথমে আমি এটা সহ্য করতে পারিনি আর সারাক্ষণ আমি আসলে ভেবে চলেছিলাম যে, মনে মনে কাজের কথা ভাবতে ভাবতে তিনি রেললাইন ধরে হাঁটছিলেন, আর তাই ট্রেনের শব্দ মোটেই শুনতে পাননি। এ পর্যন্ত কথাটা ঠিকই ছিল। আমি মোটেই ভাবার চেষ্টা করিনি এটা আমার কারণে হয়েছে কিংবা মূলত এর কারণ ছিল সেক্স।   

‘তবে মনে হলো মাত্র এক্ষুনি আমি আসল ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছি যে, এতে কারও দোষ ছিল না। একটা বিয়োগান্তক পরিস্থিতিতে এটা ছিল মানুষের যৌনতার পরিণাম। আমি ওখানে বড় হয়ে উঠেছি আর মায়ের যে অবস্থা হয়েছিল আর ড্যাডিরও স্বভাবত যেরকম হওয়ার কথা। তবে এটা আমার কিংবা তার দোষ নয়। 

‘আমি শুধু বলতে চাই যে, আমাদের এটা স্বীকার করা উচিত যে, বিশেষ একটা পরিস্থিতিতে মানুষ বিশেষ জায়গায় যেতে পারে। আর এর জন্য মোটেই লজ্জিত হওয়া কিংবা অপরাধবোধ থাকা উচিত নয়। তুমি যদি মনে করো আমি পতিতালয়ের কথা বলছি, তবে তুমি ঠিকই ভেবেছ। আর যদি পতিতার কথা ভাব, তাও ঠিক। কী বলেছি বুঝতে পেরেছ তো?’

জ্যাকসন ওর মাথার ওপর দিয়ে তাকিয়ে বলল, হ্যাঁ।

‘মনে মনে নিজেকে এখন বেশ মুক্ত অনুভব করছি। তার মানে এই নয় যে ট্রাজেডিটা আমি অনুভব করছি না, তবে আমি বলতে চাচ্ছি যে, কোনো এক দিক দিয়ে আমি ট্রাজেডির বাইরে চলে এসেছি। শুধু মানুষ যে ভুলগুলো করে সেগুলোই হচ্ছে ট্রাজেডি, আমি কী বলতে চাচ্ছি তুমি যদি তা বুঝতে চেষ্টা করতে। তবে আমার মুখে মৃদু হাসি দেখে অবশ্যই মনে করো না যে, আমার মনে সমবেদনা বা করুণা নেই। আমার মনে গভীর সমবেদনা আছে। তবে আমাকে স্বীকার করতে হবে যে, আমি ভারমুক্ত হয়েছি। আবার একইসাথে, একথাও বলতে চাই,  যেভাবেই হোক আমি খুশি হয়েছি। এসব কথা শুনে তোমার অস্বস্তি হচ্ছে না তো?’ 

‘না।’

‘তুমি বুঝতে পারছ যে আমি একটু অস্বাভাবিক অবস্থায় আছি। আমি জানি যে আমি এখন একটু অস্বাভাবিক হয়েছি। এটা অস্বাভাবিক পরিষ্কার। বলতে চাচ্ছি সবকিছুতেই। সবকিছুই অত্যন্ত পরিষ্কার। আর এর জন্য আমি অত্যন্ত কৃতজ্ঞতা বোধ করছি।’

এতকথা বলার সময় পাশের বেডের মহিলাটি কিন্তু একবার কাতরায়নি।

এমন সময় হল থেকে নার্সের জুতার মশমশ হাঁটার শব্দ শোনা গেল আর জ্যাকসন আশা করল যে, সে এই কামরায় ঢুকবে এবং আসলেই নার্স এল।

নার্স জানাল, এখন বেলের ঘুমের ওষুধ দেওয়ার সময় এসেছে। তবে সে ভয় পাচ্ছিল নার্স হয়তো তাকে শুভরাত্রি জানিয়ে বেলকে চুমু দেওয়ার কথা বলবে। কারণ সে লক্ষ করেছে হাসপাতালে বেশ চুমুর বাহার চলছিল। তবে যখন সে উঠে দাঁড়াল, তখন নার্স এ সম্পর্কে কিছু উল্লেখ না করায় সে খুশি হলো।

‘কাল আবার দেখা হবে।’ 

পরদিন জ্যাকসন বেশ আগেই ঘুম থেকে উঠে পড়ল, তারপর ঠিক করল প্রাতরাশের আগে একটু হাঁটবে। রাতে ঘুম ভালোই হয়েছিল, তবে নিজেকে বলল যে, হাসপাতালের পরিবেশ থেকে ওর এখন একটু বিরতি নেওয়া দরকার। তবে এর মানে এই নয় যে, বেলের মাঝে যে পরিবর্তন দেখা দিয়েছে সে ব্যাপারে সে খুব একটা উদ্বিগ্ন হয়েছে। সে ভাবছিল যে সম্ভবত আজকের মধ্যে কিংবা আরো কয়েকদিনের মধ্যেই সে আবার স্বাভাবিক হয়ে যাবে। তার হয়তো মনেই পড়বে না কী কী কথা সে জ্যাকসনকে শুনিয়েছিল। এটা হলে তো একটা আশীর্বাদই হবে।

সূর্য বেশ ওপরে উঠে এসেছে, বছরের এসময়ে এরকমই হয়। যাত্রী বোঝাই বাস আর ট্রাম রাস্তা দিয়ে চলতে শুরু করেছে। সে কিছুক্ষণ দক্ষিণ দিকে হেঁটে চলল, তারপর পশ্চিম দিকে ঘুরে ডানডাস স্ট্রিট ধরে হাঁটতে লাগল। তারপর যে চায়না টাউনের কথা শুনেছিল, একসময় সেখানে এসে পৌঁছাল। জানা-অজানা নানা ধরনের সবজি বিভিন্ন দোকানে গড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল আর চামড়াছোলা ছোট ছোট প্রাণী খাদ্য হিসেবে বিক্রির জন্য ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। রাস্তায় যত্রতত্র বেআইনিভাবে ট্রাক পার্ক করা রয়েছে আর চীনা ভাষায় অনেক নারী-পুরুষ বেপরোয়াভাবে চেঁচামেচি করছে। শোরগোল আর উচ্চ কলরব শুনে মনে হচ্ছিল যেন, এখানে একটা যুদ্ধ চলছে। তবে ওদের কাছে হয়তো এটা নিত্যদিনের ব্যাপার। যা-ই হোক সে এখান থেকে বের হয়ে যেতে চাচ্ছিল আর তাই একটা রেস্তোরাঁয় ঢুকল। চীনা মালিক হলেও এই রেস্তোরাঁয় সাইনবোর্ডে ওরা ডিম আর ব্যাকনের সাধারণ ব্রেকফাস্টের কথা লিখেছিল। ওখান থেকে বের হওয়ার পর একবার ভাবল ঘুরে পুরোনো পথে ফিরে যায়।

কিন্তু এর বদলে সে বরং আবার দক্ষিণ দিকে চলতে শুরু করল। হাঁটতে হাঁটতে একটা আবাসিক এলাকায় এসে পৌঁছাল। এখানে রাস্তার দুই ধারে উঁচু উঁচু এবং বেশ সরু ইটের বাড়ি দেখা যাচ্ছে। এই বাড়িগুলো যখন তৈরি করা হয়, তখন হয়তো লোকজন গাড়ি ঘোরাবার জায়গার প্রয়োজন বোধ করেনি কিংবা সম্ভবত তখন ওদের কোনো গাড়িও ছিল না। তার মানে যখন গাড়ির প্রচলন শুরু হয়নি তখন এই বাড়িগুলো তৈরি করা হয়েছিল। হাঁটতে হাঁটতে কুইন স্ট্রিটের সাইনবোর্ড ওর চোখে পড়লো। এই রাস্তার নাম সে শুনেছিল। এবার পশ্চিম দিকে ঘুরে কয়েকটা ব্লক পার হয়ে সে একটা প্রতিবন্ধকতার সামনে এসে দাঁড়াল। একটা ডোনাটের দোকানের সামনে লোকজনের ছোটখাটো একটা ভিড় জমেছে। একটা অ্যাম্বুলেন্স রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে আর এর পেছনদিকটা ফুটপাতের ওপর ওঠানো থাকায় কেউ পাশ কাটিয়ে যেতে পারছিল না। চলার পথে দেরি হওয়ার জন্য কেউ কেউ অভিযোগ করছিল আর চিত্কার করে জিজ্ঞেস করছিল ফুটপাথের ওপর অ্যাম্বুলেন্স পার্ক করা আইনত ঠিক কি-না। অন্যরা অবশ্য যথেষ্ট শান্ত ছিল আর কী হয়েছে, সে বিষয় নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছিল। কেউ হয়তো মারা গেছে একথা বলাবলি হচ্ছিল আর হয়তো সে-কারণেই গাড়িটা এখানে এমনভাবে রাখা হয়েছে।    

স্ট্রেচারে শুইয়ে যে লোকটাকে বের করে আনা হলো, সে অবশ্যই মৃত ছিল না, কারণ তাহলে হয়তো মুখটা ঢাকা থাকত। তবে লোকটাকে ডোনাটের দোকান থেকে বের করে আনা হয়নি, যা অনেকে ধারণা করেছিল। তাকে বিল্ডিং-এর মূল দরজা দিয়ে বের করে আনা হয়েছিল। এটা একটা পাঁচতলা সমান উঁচু, বেশ সুন্দর একটা ইটের অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিং। এখানে একটা লন্ড্রি আর একটা ডোনাটের দোকান ছিল। সদর দরজার ওপরে যে নামটা খোদাই করা ছিল, সেটা অতীতের একটা গর্ব আর সেই সাথে একধরনের মুর্খতার পরিচয় বহন করছিল।

বনি ডান্ডি নামের সেই বিল্ডিংটার ভেতর থেকে অ্যাম্বুলেন্সের কর্মীদের পেছন পেছন সবশেষে একজন লোক বের হয়ে এল। সে একটু উত্তেজিত হয়ে লোকজনের ভিড়ের দিকে তাকিয়েছিল। লোকজনের ভিড়ও অবশ্য তখন ভেঙে যাচ্ছিল। এখন শুধু অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন বাজাতে বাজাতে রাস্তা দিয়ে চলে যাওয়ার অপেক্ষা। 

যে-ক’জন লোক তখনও সেখান থেকে চলে যায়নি, জ্যাকসন তাদের মধ্যে একজন ছিল। সে অবশ্য ব্যাপারটা নিয়ে তেমন কৌতূহলী ছিল না, বরং সে অপেক্ষা করছিল একটা মোড়ের জন্য যেখান দিয়ে ঘুরে ফিরে যাবে যেখান থেকে রওয়ানা দিয়েছিল সেই জায়গায়। যে লোকটা বিল্ডিং থেকে বের হয়েছিল, সে ওর কাছে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল, তার কোথাও যাওয়ার তেমন তাড়া আছে কি-না। 

না। তেমন বিশেষ তাড়া নেই। লোকটি এই দালানের মালিক। যে লোকটাকে অ্যাম্বুলেন্সে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, সে এই দালানের কেয়ারটেকার আর তত্ত্বাবধায়ক ছিল।

‘আমার একবার হাসপাতালে গিয়ে দেখতে হবে তার কী হয়েছে। কোনো দিন সে কোনো সমস্যার কথা বলেনি। তার কোনো ঘনিষ্ট লোকের কথাও আমার জানা নেই, যাকে খবর দেওয়া যায়। সবচেয়ে খারাপ ব্যাপারটা হলো চাবিগুলো খুঁজে পাচ্ছি না। ওর সাথেও নেই আর সাধারণত যেখানে সে রাখে সেখানেও পেলাম না। কাজেই আমাকে এখন বাড়ি গিয়ে অন্য চাবিটা আনতে হবে আর তাই ভাবছিলাম, এই ফাঁকে আপনি কি এ জায়গাটার একটু নজর রাখতে পারবেন? আমাকে বাড়ি যেতে হবে আর হাসপাতালেও যেতে হবে। ভাড়াটেদের কাউকে বলতে পারতাম, কিন্তু আমি ওদের বলতে চাই না। বুঝতে পারছেন হয়তো আমি কী বোঝাতে চাচ্ছি। ওরা হয়তো সাধারণ কৌতূহল না দেখিয়ে বরং অন্যকিছু ভাবতে পারে।’

সে আবার জ্যাকসনকে জিজ্ঞেস করল, সে কিছু মনে করেনি তো। উত্তরে জ্যাকসন বলল, তার কোনো অসুবিধা নেই।   

‘শুধু লক্ষ রাখবেন কে ভেতরে যায় আর তার চাবিটা দেখতে চাইবেন। বলবেন এটা একটা জরুরি ব্যাপার। আমার বেশি দেরি হবে না।’ 

চলে যাওয়ার আগে আবার সে ঘুরে বলল, ‘আপনি বরং এখানে বসুন।’

ওখানে যে একটা চেয়ার ছিল, সেটা জ্যাকসন লক্ষ করেনি। অ্যাম্বুলেন্স পার্ক করার জন্য চেয়ারটা সরিয়ে ভাঁজ করে রাখা হয়েছিল। ক্যানভাসের চেয়ারটা যথেষ্ট আরামদায়ক আর বেশ শক্ত। ধন্যবাদ জানিয়ে জ্যাকসন চেয়ারটা এমন জায়গায় পাতলো যাতে লোকজনের যাতায়াতের পথে কোনো বিঘ্ন না ঘটে। সেও হাসপাতালের কথাটা উল্লেখ করে তার যে সেখানে শীঘ্রই ফিরে যেতে হবে, সে-কথাটা বলতে চেয়েছিল। কিন্তু লোকটির খুব তাড়া ছিল আর তার মাথায় ইতোমধ্যে অনেক চিন্তা ছিল। তাছাড়া সে তো ইতোমধ্যেই একথা বলেছে যে, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সে ফিরে আসবে। 

চেয়ারে বসার পরই জ্যাকসন বুঝল যে, অনেকক্ষণ হাঁটাহাঁটি হয়েছে।

লোকটা তাকে বলেছিল, সে ডোনাটের দোকান থেকে কফি কিংবা অন্য কিছু খেয়ে নিতে পারে।

‘শুধু আমার নাম বলবেন।’

কিন্তু জ্যাকসন তো ওর নামটা জানে না।

ফিরে এসে বাড়ির মালিক দেরি হওয়ার জন্য ক্ষমা চাইল। তারপর জানাল, যে লোকটাকে অ্যাম্বুলেন্সে করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল সে মারা গেছে। সেজন্য অনেক কিছু ব্যবস্থা করতে হয়েছিল। চাবির একটা নতুন গোছার প্রয়োজন ছিল। এই হলো সেই চাবির গোছা। এই বিল্ডিং-এ যারা অনেক দিন ধরে থাকছে, তাদেরকে নিয়ে একটা অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার আয়োজন করতে হবে। পত্রিকায় একটা শোকসংবাদ প্রকাশ করলে আরো কিছু মানুষ আসতে পারে। সবকিছু বন্দোবস্ত করে সমাধা করতে করতে অনেক সময় পেরিয়ে যাবে।

তবে সমস্যাটার একটা সমাধান করা যেতে পারে। যদি জ্যাকসন রাজি হয়। কিছু সময়ের জন্য। কেবল অস্থায়ীভাবে কিছুদিন চালানোর জন্য।

আচ্ছা ঠিক আছে। জ্যাকসন বলল, আমার কোনো অসুবিধা নেই।

কাজটা শুরু করার আগে এর প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য জ্যাকসনের যদি কিছু সময়ের প্রয়োজন হয়, তা চালিয়ে নেওয়া যাবে। অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া আর কিছু জিনিসপত্র বিলিবন্দোবস্ত করার পরই। এখানে চলে আসার আগে সবকিছু গুছিয়ে নেওয়ার জন্য ক’টা দিন সে নিতে পারে।

জাকসন বলল, তার প্রয়োজন নেই। তার সবকিছু গোছানো রয়েছে আর সমস্ত সম্বল ওর পিঠে রয়েছে।

স্বভাবতই এতে একটু সন্দেহ জাগল। জ্যাকসন অবাক হলো না যখন কয়েকদিন পর সে শুনতে পেল এই নতুন চাকরিদাতা পুলিশের কাছে গিয়েছিল। তবে আপাত মনে হলো সবকিছু ঠিক আছে। যারা একাকী জীবনযাপন করতে পছন্দ করে এবং গভীর কোনোকিছুতে ডুব দিয়ে থাকে, সে হয়তো তাদের মতোই একজন, তবে আইন ভঙ্গ করার মতো কোনো কাজ করে দোষী সাব্যস্ত হয়নি।

এতে মনে হলো তার ব্যাপারে খোঁজখবর নেওয়ার জন্য কোনো অনুসন্ধানী দল আর গঠন করা হয়নি। 

একটা নিয়ম মেনে জ্যাকসন বয়ষ্ক মানুষদেরকে এই বিল্ডিং-এ রাখতে চাইল। আর নিয়ম মেনে যেসব মানুষ একা থাকতে চায় সে-রকম লোককে সে ভাড়াটে হিসেবে থাকতে দিতে পছন্দ করত। মরালাশের মতো লোক নয়। গুণী লোক। প্রতিভাবান। যে প্রতিভা কোনো একসময় স্বীকৃতি পেয়েছিল এবং যার মাধ্যমে জীবন ধারণ করতে পেরেছিল। তবে তেমন যথেষ্ট ছিল না, যে তার ওপর নির্ভর করে সারা জীবন কাটাতে পারবে। যেমন একজন ঘোষক, যুদ্ধের সময় রেডিওতে যার কণ্ঠস্বর সবার কাছে পরিচিত ছিল, অথচ গুলির আঘাতে তার স্বরতন্ত্রী ভেঙে এখন খানখান হয়ে গেছে। বেশিরভাগ লোকের ধারণা সে মারা গেছে। অথচ সে এখানে একটা ব্যাচেলর স্যুটে থাকছে, খবর শুনছে আর গ্লোব আর মেইল পত্রিকার গ্রাহক হয়েছে। আর কৌতূহলোদ্দীপক কোনো খবর দেখতে পেলে সেটা সে জ্যাকসনের হাতে তুলে দিত।

একবার সেরকমই কিছু একটা দেখা গেল। 

উইলার্ড ট্রিস এবং হেলেনা (নি অ্যাবট) ট্রিসের কন্যা, মারজোরি ইসাবেলা ট্রিস বীরের মতো ক্যানসারের সাথে লড়াই করে মৃত্যুবরণ করেছেন। উইলার্ড ট্রিস দীর্ঘদিন টরেন্টো টেলিগ্রাম পত্রিকার একজন কলামিস্ট ছিলেন। ওরিয়ল পত্রিকাকে সংবাদটি লক্ষ করার জন্য অনুরোধ করা হলো। জুলাই ১৮, ১৯৬৫।   

কোথায় তিনি থাকতেন তা উল্লেখ করা হয়নি। সম্ভবত টরেন্টোতে ছিলেন। জ্যাকসন যা আশা করেছিল, তার চেয়ে বেশিদিন তিনি বেঁচে ছিলেন। তার বাড়ির কামরাগুলোতে সে যে কাজগুলো করেছিল, সেগুলোর কথা মনে করে সে একমুহূর্তও সময় নষ্ট করেনি। তা করারও প্রয়োজন ছিল না—এধরনের ব্যাপার কেবল মাঝে মাঝে স্বপ্নের মধ্যে মনে পড়ে বা ভেসে আসে। আর আকুল আকাঙ্ক্ষার বদলে সে তখন এমন বোধ করছিল যেন তার ধৈর্যচ্যুতি হয়েছে এবং তাকে এখুনি কোনো একটা কাজে ফিরে যেতে হবে, যা এখনও সমাধা হয়নি। 

যখন সে বনি ডান্ডি বিল্ডিং-এর পারিপার্শ্বিক অবস্থার রক্ষণাবেক্ষণ করতে চাইত তখন এর অধিবাসী মানুষগুলোর কথাও বিবেচনায় নিত। এখানকার মেয়েরা অবশ্য এই জায়গাটিকে ওদের নীড় বলে থাকে। তবে কোনো ধরনের উন্নয়নমূলক কাজ করা মানেই ভাড়া বাড়ানো, তাই পুরুষ ভাড়াটেরা পরিবেশ উন্নয়নের কথা শুনলেই সাধারণত অস্ব্ব্বস্তিবোধ করত। ভাড়া বাড়াবার ব্যাপারটা মাথায় রেখে অত্যন্ত সম্মানজনক আচরণ দেখিয়ে সে এমনভাবে ওদের সাথে কথা বলত যাতে ওরা তার কথায় রাজি হয়। আর এর ফলে স্থানটিতে নতুন ভাড়াটের জন্য আবার বিজ্ঞাপন দিতে হলো। বাড়ির মালিক বলল, ‘কোনো পাগলাটে ধরনের লোক না নিয়ে আমরা পুরো বিল্ডিং ভাড়াটে দিয়ে ভর্তি করতে পারি।’ তবে জ্যাকসন তাকে জানাল যে, যাদেরকে সে পাগল বলছে, গড়পড়তা মানুষের তুলনায় ওরাই সাধারণত ছিমছাম-ফিটফাট হয়ে থাকে, তাছাড়া ওরা হচ্ছে সংখ্যালঘু। এখানে একজন মহিলা ছিলেন, যিনি এককালে টরেন্টো সিম্ফনিতে অংশগ্রহণ করেছিলেন আর একজন আবিষ্কারক ছিলেন, যার অনেক আবিষ্কারের মধ্যে একটি আবিষ্কার থেকে একটুর জন্য সৌভাগ্য ফসকে গিয়েছিল। তবে তিনি এখনও হাল ছাড়েননি, যদিও তার বয়স এখন আশির ওপরে। আর হাংগেরি থেকে আসা আরেকজন অভিনেতা আছেন, উচ্চারণের কারণে যার তেমন চাহিদা আর নেই, তবে তার অভিনীত একটি বিজ্ঞাপনচিত্র এখনও পৃথিবীর অন্য কোথাও দেখানো হচ্ছে। এদের সবার আচরণ অত্যন্ত ভদ্র এবং এমনকি এদের মধ্যে যারা প্রতিদিন দুপুরে এপিকিউর বারে গিয়ে বার বন্ধ হওয়া পর্যন্ত সেখানে থাকেন, তারাও ভদ্র। এছাড়া এদের অনেক বিখ্যাত বন্ধুবান্ধব আছেন, যারা কালেভদ্রে এখানে পায়ের ধুলো দিতে পারেন। আর বনি ডান্ডিতে যে একজন ইন-হাউস ধর্মপ্রচারকও রয়েছেন, এ ব্যাপারটা নিয়ে হেলাফেলা করা উচিত নয়। নড়বড়ে শর্তে যে গির্জার সাথেই তিনি জড়িত হন না কেন, দরকার মতো ডাকলেই সর্বদা দায়িত্ব পালন করতে পারেন। 

বাড়িওয়ালার অফিস যতদিন প্রয়োজন বোধ করে, সাধারণত ততদিন পর্যন্ত ভাড়াটেরা এখানে টিকে থাকতে পারত। একমাত্র ব্যতিক্রম ছিল ক্যান্ডেস এবং কুইন্সি নামে এক তরুণ-তরুণী যুগল। ওরা ভাড়া না দিয়েই মধ্যরাতে এখান থেকে চম্পট দিয়েছিল। ওরা যখন কামরার খোঁজে এসেছিল, তখন বাড়ির মালিক দায়িত্বে ছিল। আর এদেরকে পছন্দ করার কারণ হিসেবে নিজের দোষ ঢাকার জন্য সে বলেছিল, এখানে একজন নতুন মুখের দরকার। সেই মুখ ছিল ক্যান্ডেসের। তার বয়ফ্রেন্ডের নয়। কারণ বয়ফ্রেন্ডটি ছিল অমার্জিত এবং নির্বোধ।

গ্রীষ্মের একদিন বেশ গরম পড়েছিল, তাই হাওয়া চলাচলের জন্য জ্যাকসন বাড়ির পেছন দিকের দুই পাল্লার দরজাটা খুলে দিল। এই দরজা দিয়েই মালামাল আনা নেওয়া হতো। সে তখন একটা টেবিলে বার্নিশের কাজ করছিল। সুন্দর এই টেবিলটা জ্যাকসন বিনিপয়সায় পেয়েছিল, কারণ এটার পলিশ উঠে গিয়েছিল। সে ভেবেছিল ঘরে ঢোকার পথে চিঠিপত্র রাখার জন্য এই টেবিলটা সুন্দরভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে।

সে তখন অফিস থেকে বের হতে পেরেছিল, কারণ বাড়ির মালিক তখন সেখানে বসে ভাড়া সংক্রান্ত বিষয়গুলো পরীক্ষা করছিল।

এমন সময় সামনের দরজার ঘণ্টির ওপর আলতো করে কেউ চাপ দিতেই ঘণ্টিটা বেজে উঠল। ব্রাশ রেখে জ্যাকসন নিজেই যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছিল, কারণ সে ভেবেছিল, ভাড়ার হিসাব পরীক্ষা করার কাজে ব্যস্ত বাড়ির মালিক হয়তো কাজে বিঘ্ন ঘটিয়ে উঠবেন না। তবে সবই ঠিক আছে, দরজা খোলার শব্দ শোনা গেল, সেই সাথে একজন মহিলার কণ্ঠস্বর। ক্লান্ত হলেও কণ্ঠস্বরটি তার মোহিনী শক্তি ধরে রেখেছিল আর এর মধ্যে এমন একটা নিশ্চিত আস্থা ছিল যেন, যেই এই মধুক্ষরা কণ্ঠস্বর শুনবে সেই তার কথায় মুগ্ধ হবে।

সম্ভবত এই গুণটি তিনি তার ধর্মপ্রচারক বাবার কাছ থেকে পেয়েছেন। জ্যাকসনের মনে পড়ল ইতোপূর্বে সে একথাটা একবার ভেবেছিল।

মহিলা বললেন, তার মেয়ের সর্বশেষ এই ঠিকানাই তার কাছে ছিল। তিনি তার মেয়ের খোঁজে এসেছেন। মেয়ের নাম ক্যান্ডেস। সে ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার কেলোওয়ানা থেকে এখানে এসেছিল। সেখানে তিনি আর তার মেয়ের বাবা থাকেন।

ইলেন। ওই মহিলাটি ছিল ইলেন।

জ্যাকসন শুনতে পেল মহিলাটি জিজ্ঞেস করছেন তিনি কি এখানে একটু বসতে পারবেন কি-না। বাড়ির মালিক জ্যাকসনের চেয়ারটা টেনে আনলো।

তার প্রত্যাশার চেয়েও টরেন্টোতে অনেক গরম। যদিও তিনি অন্টেরিও চেনেন আর সেখানেই তিনি বড় হয়েছেন।

এবার মহিলাটি জানতে চাইলেন, এক গ্লাস পানি পাওয়া যাবে কি-না। 

সম্ভবত মহিলা এবার তার মাথা নিচু করে দুই হাতের মধ্যে ধরে রেখেছেন, এজন্য তার কথা একটু চাপা শোনাচ্ছিল। বাড়ির মালিক হলে এসে মেশিনে কয়েকটা কয়েন ফেলে একটা সেভেন-আপ নিল। সে হয়তো ভেবেছিল একজন মহিলার জন্য কোকের চেয়ে সেভেন-আপই ঠিক হবে।

 চোখের কোণা দিয়ে বাড়িওয়ালা লক্ষ করল যে, জ্যাকসন ওদের কথা শুনছে। তাই সে তাকে ইশারা করে বলল, এবার জ্যাকসন যেন ব্যাপারটা সামলায়। কারণ ক্ষেপাটে ধরনের ভাড়াটে সামলাতে সে অভ্যস্ত ছিল। তবে জ্যাকসন প্রবলভাবে মাথা নাড়তে লাগল। না। 

মহিলা অবশ্য বেশিক্ষণ আর বিক্ষিপ্তচিত্ত রইলেন না।

তিনি বাড়িওয়ালার কাছে ক্ষমা চাইলেন আর বাড়িওয়ালা বলল, হয়তা গরমের কারণে এরকম হয়েছে। এবার ক্যান্ডেসের কথায় আসা যাক। ওরা এক মাসের মধ্যেই ঘর ছেড়ে চলে গিয়েছিল। এটা প্রায় তিন সপ্তাহ আগের কথা। না কোনো ঠিকানা দিয়ে যায়নি। 

‘এধরনের পরিস্থিতিতে সাধারণত—’

মহিলা ইঙ্গিতটা ধরতে পারলেন।

‘দেনাটা অবশ্য আমিই মিটিয়ে দিতে পারি—’

এরপর বিড়বিড় করে কিছু কথা আর কাগজের খসখস শব্দ শোনা গেল। তারপর তিনি বললেন, ‘যে ঘরে ওরা থাকত সেটা কি একবার আমাকে দেখাতে পারবেন?’

‘সেই ঘরের ভাড়াটে এখন নেই। আর থাকলেও আমার মনে হয় না সে রাজি হতো।’

‘অবশ্যই ঠিক বলেছেন। আসলে এটা একটা বোকামি। আপনি যথেষ্ট দয়া দেখিয়েছেন। আমি আপনার অনেক সময় নষ্ট করলাম। ’

‘আপনি কি আর কিছু জানতে চান?’

মহিলা এবার উঠলেন, ওরা অফিস থেকে বের হয়ে যাচ্ছিল। অফিস থেকে বের হয়ে কয়েকধাপ সিঁড়ি বেয়ে নেমে সামনের দরজার দিকে এগোল। তারপর দরজা খোলার সাথে সাথে রাস্তার কোলাহলের শব্দে তিনি যে বিদায় সম্ভাবষণ জানিয়েছিলেন, তা চাপা পড়ে গেল।

যা-ই হোক মহিলা পরাজিত হয়েছেন, অন্তত সম্মান নিয়ে বিদায় নিতে পেরেছেন।

বাড়িওয়ালা অফিসে ফিরে আসতেই জ্যাকসন লুকানো জায়গা থেকে বের হয়ে এল।

বাড়িয়ালা বলল, ‘অবাক কাণ্ড, আমরা আমাদের টাকা পেয়েছি।’

মূলত সে এমন একজন লোক, যার মাঝে অহেতুক কৌতূহল নেই, অন্তত ব্যক্তিগত ব্যাপারে তো নয়ই। তার এই গুণটা জ্যাকসন যথেষ্ট মূল্য দিয়ে থাকে।

তবে সে অবশ্যই মহিলাটিকে একবার দেখতে পারত। তার মেয়েটি সম্পর্কে তার তেমন একটা ধারণা ছিল না। তার চুল সোনালি হলেও খুব সম্ভব সেটা রঙ করা। বয়স আটাশের বেশি হবে না, তবে আজকাল অনেকসময় এবিষয়ে সঠিকভাবে কিছু বলা শক্ত। সবসময় তার বয়ফ্রেন্ডের কথায় ওঠাবসা করত। বাড়ি থেকে পালিয়েছে, ভাড়া না দিয়ে পালিয়েছে, বাবা-মায়ের বুক ভেঙে দিয়েছে, শুধু একটা গোমড়ামুখো, অসামাজিক অপদার্থ মানুষ—একজন বয়ফ্রেন্ডের জন্য।

কেলওয়ানা যেন কোথায়? পশ্চিমেই কোথাও হবে হয়তো। সেই ব্রিটিশ কলাম্বিয়া। অনেকদূর থেকে খুঁজতে এসেছেন। মহিলা অবশ্যই বেশ জেদি এবং আশাবাদী। সম্ভবত এটা তার মধ্যে এখনও রয়েছে। তিনি বিবাহিতা। অবশ্য যদি তার মেয়েটার বিবাহবহির্ভূত জন্ম না হয়ে থাকে, তবে সেরকম মনে হলো না। এরপরের বার তিনি নিশ্চিত হতে চাইবেন, ট্রাজেডি মেনে নেওয়ার মতো মানুষ নন তিনি। মেয়েটিও মনে হয় সে-রকমই হবে। যথেষ্ট অভিজ্ঞতা হওয়ার পর সে ঠিকই বাড়ি ফিরে যাবে। হয়তো সাথে একটা বাচ্চা নিয়ে ফিরবে, কেননা আজকাল এটাই স্টাইল হয়েছে।     

১৯৪০ সালে বড়দিনের কিছু দিন আগে হাইস্কুলে হঠাত্ একটা হৈচৈ-হট্টগোল পড়ে গিয়েছিল। এই হৈচৈয়ের শব্দ তিনতলা পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল। এখানে সাধারণত টাইপরাইটের খটখটানি আর এডিং মেশিনের শব্দে নিচতলার শব্দ চাপা পড়ে যেত। স্কুলের সবচেয়ে পুরোনো মেয়েরা এখন এখানে টাইপ শিখছিল। গতবছর ওরা ল্যাটিন, বায়োলজি আর ইউরোপের ইতিহাস শিখেছিল।

এই মেয়েদের মধ্যে একজন ইলেন বিশপ ছিল এক পাদ্রির কন্যা। যদিও তার বাবা যে গির্জার সদস্য ছিলেন, সেই প্রোটেস্টান্ট খ্রিস্টানদের সম্মিলিত গির্জায় কোনো যাজক ছিল না। নবম গ্রেডে পড়ার সময় ইলেন তার পরিবারের সাথে এখানে এসেছিল। ইংরেজি বর্ণানুক্রমিকভাবে বসার নিয়ম মেনে পাঁচ বছর ধরে সে জ্যাকসন এডামস-এর পেছনে বসতো। ইতোমধ্যে জ্যাকসনের অদ্ভুত লাজুক স্বভাব আর মৌনভাব ক্লাসের সবাই মেনে নিয়েছিল। তবে ওর কাছে ব্যাপারটা নতুন ছিল। পরবর্তী পাঁচ বছরে ব্যাপারটা স্বীকার না করেও সে জ্যাকসনের সাথে একটা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল। মাঝে মাঝে জ্যাকসনের কাছ থেকে ইরেজার, কলমের নিব এবং জ্যমিতির সরঞ্জাম ধার নিত, তবে এতে ওদের মাঝে সম্পর্কের বরফ গলানোর ব্যাপারে খুব একটা কাজ হতো না, কারণ প্রকৃতিগতভাবে সে নিজেও বিক্ষিপ্তচিত্ত ছিল। ওরা বিভিন্ন সমস্যার উত্তর নিজেদের মধ্যে বিনিময় করত আর একে অপরের পরীক্ষা মূল্যায়ন করত। রাস্তায় দেখা হলে ওরা হ্যালো বলত আর ওর কাছে জ্যাকসনের হ্যালো বলাটা আসলে অস্ফুটভাবে কিছু বলার চেয়ে একটু বেশি মনে হতো—এতে দুটো অক্ষর ছিল এবং এর ওপর সে একটু জোর দিত। এর বেশি আর কিছু ওদের মাঝে অনুমান করা যায়নি, কেবল মাঝে মাঝে ওরা নিজেদের মধ্যে নির্দিষ্ট কিছু ঠাট্টা-তামাশা করত। ইলেন লাজুক স্বভাবের ছিল না, সে বেশ বুদ্ধিমতী ছিল আর অন্যদের কাছ থেকে বেশ দূরে দূরে থাকত। আর ক্লাসেও সে খুব একটা জনপ্রিয় ছিল না আর এ ব্যাপারটা জ্যাকসনের জন্য উপযুক্ত ছিল। 

কেন হট্টগোল হচ্ছে দেখার জন্য বড় মেয়েরা যখন বের হয়ে এল, তখন অন্য মেয়েদের সাথে সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে ইলেনও অবাক হয়ে দেখল, যে দুটি ছেলে গোলমালটা করছিল, তাদের মধ্যে একজন ছিল জ্যাকসন। অন্য ছেলেটির নাম বিল ওয়াটস। মাত্র এক বছর আগেও এই ছেলেগুলো বইয়ের ওপর কুঁজো হয়ে বসে থাকত আর অনুগতভাবে এক ক্লাসরুম থেকে অন্য ক্লাসরুমে আসাযাওয়া করত। এখন সেনা ইউনিফর্মপরা অবস্থায় ওদেরকে স্বাভাবিকের চেয়ে দ্বিগুণ বড় দেখাচ্ছিল আর নেচে নেচে বেড়াবার সময় শক্তিশালী বুটজুতার প্রচণ্ড শব্দ হচ্ছিল। ওরা চিত্কার করে বলছিল, আজকের জন্য স্কুল বাতিল, কারণ সকলকে সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে হবে। ওরা সর্বত্র সিগারেট বিলি করছিল আর সিগারেটের প্যাকেটগুলো ছুড়ে মারছিল, যাতে ছোট ছোট ছেলে, যারা এখনও শেভ করেনি ওরা এগুলো কুড়িয়ে নিতে পারে। 

অসতর্ক যোদ্ধা, হাঁকডাক করা হানাদার। পুরোপুরি মাতাল।

ওরা চিত্কার করে বলছিল, ‘আমরা হেঁজিপেজি লোক নই।’

প্রিন্সিপাল ওদেরকে শাসন করার চেষ্টা করছিলেন। তবে সময়টা তখন ছিল যুদ্ধের প্রাথমিক অবস্থা আর যেসব ছেলেরা তথাকথিত মৃত্যুর পোশাক নিজেদের গায়ে জড়িয়ে সেনাবাহিনীতে নাম লিখিয়েছিল তাদের সম্পর্কে সমাজে খানিকটা ভয় ও শ্রদ্ধা-মিশ্রিত সম্মানবোধ থাকায় তিনি সে-রকমভাবে নির্মমতা দেখাতে পারেননি, যা এক বছর পর পেরেছিলেন।  

তিনি বললেন, ‘এই যে ছেলেরা, থামো।’

বিলি ওয়াটস তাকে বলল, ‘আমি কিন্তু যেনতেন লোক নই।’ 

সম্ভবত একই কথা বলার জন্য জ্যাকসনও মুখ খুলেছিল, কিন্তু সেই মুহূর্তে ইলেন বিশপের সাথে তার চোখাচোখি হতেই ওদের মাঝে বিশেষ একধরনের ভাবের বিনিময় হলো।

ইলেন বিশপ বুঝতে পারল, মনে হচ্ছে জ্যাকসন মদ খেয়েছে ঠিকই, তবে এর প্রতিক্রিয়ায় সে একজন মাতালের মতো আচরণ করতে বাধ্য হয়েছে, কাজেই মাতালের মতো যে ভাবটা সে দেখাচ্ছে, তা হয়তো নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। (বিলি ওয়াটস পুরোপুরি মাতাল হয়েছিল) এই উপলব্ধি হতেই মুখে হাসি নিয়ে ইলেন বিশপ সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এল, তারপর ওর হাত থেকে একটা সিগারেট নিয়ে দুই আঙুলে ধরলো। সে দুই হিরোর হাত বাহুতে নিয়ে ওদের সাথে মার্চ করতে করতে স্কুলের বাইরে চলে এল।

বাইরে পৌঁছার পর ওরা সিগারেট ধরাল। 

পরবর্তীকালে ইলেনের বাবার গির্জার সমাবেশে বিভিন্ন জনের মধ্যে ইলেনকে নিয়ে মতপার্থক্য দেখা দিয়েছিল। কেউ কেউ বলেছিল, ইলেন আসলে সিগারেট খায়নি, সে কেবল ছেলেগুলোকে শান্ত করার চেষ্টা করছিল, আবার অন্যরা বলেছিল সে নিশ্চয়ই ধূমপান করেছিল।

বিলি অবশ্য ইলেনকে দুই হাতে জড়িয়ে একটা চুমু দেবার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু আচমকা হোঁচট খেয়ে সে স্কুলের সিঁড়ির ধাপে বসে পড়ল এবং একটা পোষা মোরগের মতো কোঁ কোঁ করতে শুরু করল। এর দুই বছর পর অবশ্য সে মারা গিয়েছিল।

তাকে এবার বাড়ি নিয়ে যেতে হবে। জ্যাকসন তাকে টেনে দাঁড় করালো, তারপর তার দুই হাত ওরা নিজেদের কাঁধের ওপর তুলে তাকে টেনে নিয়ে চলল। সৌভাগ্যবশত তার বাড়ি স্কুল থেকে বেশি দূরে ছিল না। বাড়ির সামনের সিঁড়ির কাছে পৌঁছার পর সিঁড়ির ধাপেই শুয়েই সে বেহুঁশ হলো আর ওরা তাকে সেখানেই ছেড়ে চলে এল। এরপর ওরা নিজেদের মধ্যে আলাপআলোচনা শুরু করল।

জ্যাকসন বাড়ি ফিরে যেতে চাচ্ছিল না। কেন নয়? সে বলল, কারণ সেখানে ওর সত্ মা আছেন। সে তার সত্মাকে ঘৃণা করে। কেন? কোনো কারণ নেই।

ইলেন জানত, জ্যাকসন যখন খুব ছোট তখন ওর মা একটা মোটরগাড়ির দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছিলেন। অনেকসময় এটাকেই তার এমন লাজুক স্বভাবের কারণ হিসেবে ধরে নেওয়া হয়েছিল। ইলেন ভাবল, মদ খাওয়ার কারণে সম্ভবত এই বিষয়টায় সে একটু বাড়াবাড়ি করছে, তবে এটা নিয়ে ইলেন আর কোনো কথা বাড়াবার চেষ্টা করল না।

সে বলল, ‘ঠিক আছে, তুমি আমাদের বাড়িতে থাকতে পার। 

এখন ব্যাপার হলো কী, তখন ইলেনের মা বাড়িতে ছিলেন না। তিনি তখন ইলেনের অসুস্থ নানীকে সেবা করার জন্য নানীর বাড়িতে ছিলেন। ইলেন তখন তার বাবা আর ছোট দুই ভাইয়ের জন্য যেমনতেমনভাবে ঘরদোর দেখাশোনা করছিল। মা না থাকার ব্যাপারটা ওদের জন্য সৌভাগ্য বয়ে এনেছিল। তবে এ কারণে নয় যে ওর মা এটা নিয়ে হৈচৈ বা বাড়াবাড়ি করতেন, তবে তিনি হয়তো এই ছেলেটা কে আর তার বিষয়ে সবকিছু জানতে চাইতেন। আর ইলেনকে অবশ্যই যথারীতি স্কুলে যেতে দিতেন। একজন সৈনিক আর আরেকটি মেয়ে, হঠাত্ খুব কাছাকাছি হলো। অথচ এতদিন লগারিদম আর শব্দরূপ চর্চা ছাড়া আর কিছুই ওদের মধ্যে ছিল না। 

ইলেনের বাবা ওদের দিকে তেমন নজর দেননি। তিনি বরং যুদ্ধের ব্যাপারে বেশি আগ্রহী ছিলেন, যদিও তার গির্জার অনেকেই মনে করতেন একজন যাজকের জন্য এটা ঠিক নয়। আর বাড়িতে একজন সৈনিক থাকছে বলে তিনি বরং গর্বিত ছিলেন। এছাড়া একজন যাজকের সামান্য বেতনে মেয়েকে কলেজে পাঠাতে পারছেন না বলে তিনি খুবই অসুখী ছিলেন, কারণ ইলেনের ভাইদেরকে কলেজে পাঠাবার জন্য তাকে কিছু সঞ্চয় করতে হচ্ছিল। একারণে তিনি ওদের এ ব্যাপারটায় একটু উদার হয়েছিলেন। 

জ্যাকসন আর ইলেন সিনেমা দেখতে যেত না। নাচের আসরেও যেত না। যেকোনো আবহাওয়ায় এমনকি সন্ধ্যার পরও ওরা শুধু হাঁটতে যেত। অনেকসময় কোনো একটা রেস্টুরেন্টে গিয়ে কফি খেত, তবে কারও সাথে বন্ধুত্ব করার চেষ্টা করত না। কী হলো ওদের? ওরা কি প্রেমে পড়েছে নাকি?

একদিন জ্যাকসনের জিনিসপত্র আনার জন্য ইলেন নিজেই ওর বাড়ি গেল। জ্যাকসনের সত্মা তার চিকন ভুরু উঁচু করে মুখ খুলে হাসি হাসি ভাব করলেন, যেন একটা মজার ব্যাপার ঘটেছে। তার উজ্জ্বল নকল দাঁতগুলো দেখা গেল।

তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ওরা কী করতে যাচ্ছে?

তারপর হেসে বললেন, ‘তুমি ওর দিকে নজর রেখো।’ খুব জাঁক দেখিয়ে কথা বলার জন্য তিনি বিখ্যাত ছিলেন, তবে লোকজন বলত, কারও তেমন ক্ষতি কামনা করতেন না। তাকে খানিকটা বিরক্ত করার জন্য ইলেন একজন সংস্কৃতিবান এবং উচ্চবংশীয় ভদ্রমহিলার মতো আচরণ করছিল।

পরে সে খুব মজা করে ওদের দুজনের মাঝে কী কী কথা হয়েছিল সব জ্যাকসনকে খুলে বলল, তবে জ্যাকসন তার কথা শুনে হাসল না।

এতে সে ক্ষমা চাইল।

তারপর সে বলল, ‘আমার মনে হয় কী জানো, একজন যাজকের বাসায় থাকতে থাকতে লোকজনের আচরণ অনুকরণ করে ব্যঙ্গ-কৌতুক করার একটা বাজে অভ্যাস আমার হয়ে গেছে।’

 সে বলল, ঠিক আছে।

তখনকার মতো ওই যাজকভবন থেকেই জ্যাকসন বিদায় নিয়ে চলে গিয়েছিল। এরপর ওরা পরস্পর চিঠি লেখালেখি করত। ইলেন জানাল, সে ওর টাইপিং আর শর্টহ্যান্ড কোর্স শেষ করে একটা অফিসে টাউন ক্লার্ক হিসেবে চাকরি পেয়েছে। তবে সব কিছুই সে ব্যঙ্গাত্মক ভাষায় বর্ণনা দিত। সম্ভবত সে ভাবত, যে মানুষ যুদ্ধক্ষেত্রে রয়েছে, তার একটু কৌতুকের প্রয়োজন আছে। 

যেমন, কেরানির অফিসের মাধ্যমে খুব দ্রুত কোনো বিয়ে আয়োজন করা হলে, সেটাকে সে ‘ভার্জিন-ব্রাইড’ বলত।  

আর যখন কোনো গুরুগম্ভীর আর নিরস ধরনের পাদ্রি যাজকভবনে এসে পাশের কামরায় ঘুমাত, তখন সে মনে মনে ভাবত, বিছানার তোশক তাকে কোনো দুষ্টু স্বপ্ন দেখাচ্ছে কি-না কে জানে।

জ্যাকসন তাকে আইল দ্য ফ্রান্স বা প্যারিস অঞ্চলের ভিড়ের কথা লিখে জানাল। আর জার্মান ইউ-বোট এড়াবার জন্য কেমন করে পানিতে ডুবে ডুবে ঘুরে বেড়াত, চিঠিতে তার বর্ণনা দিত। তারপর যখন সে ইংল্যান্ড পৌঁছাল, তখন একটা বাইসাইকেল কিনে যেসব জায়গা ঘুরে বেরিয়েছিল, তার বর্ণনা দিল। 

তারপর মানচিত্র চেনার প্রশিক্ষণের জন্য তাকে নির্বাচিত করা হলো। এর মানে যদি কখনও প্রয়োজন হয়, তবে তাকে শত্রুর সীমান্তের পেছনে কাজ করতে হবে। সে মনে করে এটা অবশ্যই ডি-ডে-এর পর অর্থাত্ মিত্রবাহিনীর নরম্যান্ডিতে অবতরণের পর হবে।

ইলেনের চিঠির তুলনায় তার চিঠিগুলো অনেক গতানুগতিক বা গদ্যময় হলেও, সবসময় সে ভালোবাসা জানিয়ে চিঠি শেষ করত। যখন ডি-ডে এল তখন বেশ কিছুদিন জ্যাকসন চুপ ছিল, আর ইলেন এটাকে একটা যন্ত্রণাদায়ক নীরবতা বলত, তবে সে এর কারণটাও বুঝতে পেরেছিল। তারপর একসময় জ্যাকসন লিখে জানাল সবকিছু ঠিক আছে, যদিও বিস্তারিত বলা অসম্ভব।

এই চিঠিতে সে বিয়ের কথা বলল, যা ইলেন নিজেও ভাবছিল।

অবশেষে মিত্রশক্তির ইউরোপ বিজয়ের সেই ভি-ই ডে আর বাড়ি ফিরে আসার সফর। সে মাথার ওপর গ্রীষ্মের তারাভরা আকাশের কথা উল্লেখ করল।

ইলেন সেলাই শিখেছিল। সে জ্যাকসনের বাড়ি ফিরে আসা উপলক্ষে একটা নতুন সামার ড্রেস বানাচ্ছিল। লম্বা স্কার্ট আর ছোট্ট টুপি-হাতাসহ র্যায়ন-সিল্কের একটা লেবু-সবুজ রঙের পোশাক। কোমরে কৃত্রিম চামড়ার একটা সরু সোনালি বেল্ট। এছাড়া মাথার সামার স্ট্র হ্যাটের চারপাশ ঘিরে একইরকম সবুজ কাপড়ের একটা রিবন পেঁচিয়েছিল।

‘এগুলো এজন্য বর্ণনা দিচ্ছি যাতে, আমার প্রতি তোমার নজর পড়ে আর তুমি চিনতে পার যে, এটা আমি আর ট্রেন স্টেশনে হাজির হওয়া অন্য কোনো সুন্দরী মেয়ের সাথে পালিয়ে না যাও।’

হ্যালিফ্যাক্স থেকে জ্যাকসন ওকে চিঠি লিখে জানাল যে, শনিবার সন্ধ্যায় সে ট্রেনে চড়বে। আর জানাল যে, ইলেনের চেহারা ওর ভালো করেই মনে আছে আর ট্রেন স্টেশনে এ ধরনের প্রচুর সুন্দরী মহিলা থাকলেও অন্য কোনো মহিলাকে ভুল করে ইলেন মনে করার কোনো আশঙ্কা নেই।  

শেষদিন সন্ধ্যায় ওরা সবাই যাজকভবনের রান্নাঘরে অনেক রাত পর্যন্ত বসেছিল। সে-ঘরে রাজা ষষ্ঠ জর্জের একটা ছবি টাঙানা ছিল, সে-বছর সর্বত্র এ ছবিটা দেখা যেত। আর এর নিচে কয়েকটা শব্দ লেখা ছিল।

বছরের দুয়ারে যে লোকটি দাঁড়িয়ে রয়েছে তাকে আমি বললাম, ‘আমাকে একটি আলো দাও, যাতে আমি অজানার পথে নিরাপদে পথ দেখে চলতে পারি।’

আর সে উত্তর দিল, ‘অন্ধকারে এগিয়ে যাও আর ঈশ্বরের দিকে এক হাত বাড়িয়ে দাও। আলোর চেয়েও সেটা তোমার জন্য অনেক ভালো আর চেনা পথের চেয়েও নিরাপদ হবে।’  

তারপর ওরা সবাই নিঃশব্দে ওপরতলায় গেল আর জ্যাকসন তার জন্য বরাদ্দ করা কামরায় গেল। ইলেন যে ওর কাছে আসবে, এ ব্যাপারটা যেন ওদের মধ্যে আগে থেকে বোঝাপড়া করা ছিল, কারণ এতে সে মোটেই অবাক হয়নি।

কিন্তু পুরো ব্যাপারটা একটা বিপর্যয়ে পরিণত হল। ইলেন যেভাবে আচরণ করল, তাতে মনে হলো এখানে কী করতে হয় তা বোধ হয় সে কিছুই জানত না। বিপর্যয়টা আরো বেড়ে গেল, যখন তার চেপে রাখা আবেগের বহিঃপ্রকাশ আরো চরম আকার ধারণ করল। জ্যাকসন কোনোভাবেই তাকে থামাতে বা বোঝাতে পারছিল না। একটা মেয়ে এত কম জানবে এটা কী করে সম্ভব হতে পারে? তারপর ওরা যখন আলাদা হলো, তখন ওরা এমন ভাব করল যেন সবকিছু ভালোভাবেই হয়েছে। পরদিন সকালে ওর বাবা আর ভাইদের উপস্থিতিতে সে ইলেনের কাছ থেকে বিদায় নিল। কিছুদিন পর আবার চিঠি চালাচালি শুরু হলো আগের মতোই ভালোবাসা দেখিয়ে। সে একবার মদ খেয়ে সাউদাম্পটনে আরেকবার চেষ্টা করল। তবে মহিলাটি বলল, ‘যথেষ্ট হয়েছে ছোকরা। তুমি নিঃশেষ হয়ে নেতিয়ে গেছ।’  

মেয়েদের পোশাকআশাক আর সাজগোজ করাটা সে পছন্দ করত না। দস্তানা, টুপি, খসখস করা স্কার্ট, বিভিন্ন ধরনের চাহিদা আর এসব নিয়ে মাথা ঘামানো। কিন্তু ইলেন কী করে তা জানল? লেবুর মতো সবুজ, সে নিশ্চিত নয় এ রঙটা সে চেনে। এটা অনেকটা এসিডের মতো মনে হচ্ছিল। 

তারপর বেশ সহজেই ব্যাপারটা তার কাছে বোধগম্য হলো যে, একজন মানুষ হয়তো সে-রকম নাও হতে পারে।

ইলেন কি নিজেকে না কি অন্য কাউকে বলবে যে, সে নিশ্চয়ই ভুল সঙ্গী বাছাই করেছিল? সে মনে মনে ভাবল যে, ইলেন হয়তো একটা মিথ্যা সাজিয়ে নিতে পারবে, অবশ্যই পারবে— কারণ কোনো একটা উপায় খুঁজে বের করতে সে বেশ তত্পর।

আর এখন সে চলে যাওয়ার পর জ্যাকসনের তাকে একবার দেখার খুব ইচ্ছা হচ্ছিল। বিপদে পড়ার পরও তার কণ্ঠস্বর আশ্চর্যরকমভাবে একটুও বদলায়নি। একটা সংগীতের মতোই সমস্ত গুরুত্ব নিজের দিকে টেনে এনেছিল। সে বাড়িওয়ালাকে একবারও জিজ্ঞেস করতে পারেনি, সে দেখতে কীরকম ছিল। তার চুল কি কালো না কি পেকে সাদা হয়ে গেছে, শুকনো ছিল না মোটা হয়েছে। তার মেয়েটার দিকে সে বিশেষ নজর দেয়নি, শুধু তার বয়ফ্রেন্ডকে অপছন্দের বিষয়টা ছাড়া।  

সে নিশ্চয়ই বিয়ে করেছে। এমনি এমনি তো বাচ্চা জন্ম দেওয়ার কথা নয়। তার নিশ্চয়ই একজন বড়লোক স্বামী আর আরো সন্তানও আছে। শুধু এই মেয়েটাই তার বুক ভেঙে দিয়েছে।

এধরনের মেয়ে ফিরে আসবে। অতিরিক্ত প্রশ্রয়ে তার স্বভাব এমনভাবে নষ্ট হয়েছে যে, সে আর বেশিদিন দূরে সরে থাকতে পারবে না। দরকার পড়লে সে ঠিকই ফিরে আসবে। এমনকি তার মা—ইলেনও কি তার চতুর্দিকে এরকম একটা বখে যাওয়া আবহ তৈরি করেনি? সেও কি তার চারপাশের পৃথিবী আর সত্যকে নিজের মনমতো বা সুবিধামতো সাজিয়ে নেয়নি, যেন কিছুই তার পরিকল্পনা নিষ্ফল করতে পারবে না?

তার জীবন থেকে এই নারীটি চলে গেছে মনে করে সে যে স্বাচ্ছন্দ্য অনুভব করেছিল, পরদিন সে ধারণাটা মন থেকে উবে গেল। এজায়গাটা সে চিনেছে, কাজেই আবার হয়তো ফিরে আসতে পারে। কিছুদিনের জন্য কোথাও হয়তো ঘাঁটি গাড়বে, তারপর রাস্তা দিয়ে এদিকওদিক ঘোরাঘুরি করে তার পদচিহ্ন খুঁজে বের করার চেষ্টা করবে। তার সেই জাদুকরি কণ্ঠস্বর দিয়ে অত্যন্ত বিনয়ের সাথে, যা আসলে বিনয় নয়—কথা বলবে, আর লোকজনকে জিজ্ঞেস করবে। এমন সম্ভাবনাও আছে যে, এই দরজার বাইরেই সে তার মুখোমুখি হয়ে যেতে পারে।    

দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিলে যেকোনো ব্যাপারকে বন্ধ করে দেওয়া যেতে পারে। যখন তার ছয় কি সাত বছর বয়স, তখন তাকে বোকা বানানোর যে প্রচেষ্টা তার সত্মা করত তা সে থামিয়ে দিয়েছিল। তাকে গোসল করাবার কাজটাকে তিনি তার বোকামি বা বিরক্তিকর একটা কাজ বলতেন। সন্ধ্যা হতেই জ্যাকসন রাস্তায় ছুটে চলে যেত, পরে অবশ্য তিনি তাকে ফিরিয়ে আনতেন। তবে তিনি দেখলেন যে, যদি তিনি এটা বন্ধ না করেন, তাহলে সে সত্যি সত্যি পালিয়ে যাবে। কাজেই তিনি কাজটা বাদ দিলেন। তিনি বলতেন, সে মোটেই মজা করতে পারে না, কারণ তিনি এমন কাউকে জানেন না যে তাকে ঘৃণা করে। তবে তিনি জানতেন যে, জ্যাকসন তাকে ঘৃণা করে, যদিও এর কোনো কারণ তিনি পাননি, তাই তিনি তার সাথে ভাঁড়ামি করা বাদ দিলেন।    

বনি ডান্ডি নামে বিল্ডিংটিতে সে আরো তিন রাত কাটাল। বাড়িওয়ালার কাছে প্রতিটা অ্যাপার্টমেন্টের কার কী বাকি আছে, তার বিশদ হিসাবনিকাশ লিখল। তারপর বাড়িওয়ালাকে জানাল যে, তাকে ডেকে পাঠানো হয়েছে, তবে কে ডেকেছে কিংবা কোথায় সে যাচ্ছে সে-বিষয়ে কোনো ইঙ্গিত দিল না। ব্যাংক থেকে সব টাকা তুলে নিল আর সামান্য যা কিছু সম্বল ছিল সব গোছগাছ করল। সন্ধ্যার একটু পর ট্রেনে চড়ে বসল। রাতে মাঝে মাঝে ঘুমিয়ে পড়ছিল আর এই ক্ষণকালের ব্যাপ্তির ঘুমের মধ্যেই সে একবার দেখতে পেল, সেই মেনোনাইট ছেলেগুলো ওদের খোলা গাড়িতে চড়ে যাচ্ছে। ওদের সুমিষ্ট কণ্ঠের গানও শুনতে পেল।

এটা আগেও সে তার স্বপ্নে দেখেছিল।    

ভোরে কাপুসক্যাসিং স্টেশনে নেমে পড়তেই আটার কলের গন্ধ নাকে ভেসে এল আর ঠাণ্ডা হাওয়ায় মনে উত্সাহ জেগে উঠল।

 

২০১৩ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী এলিস অ্যান মুনরো কানাডীয় ছোটগল্প লেখিকা । তাঁর সাহিত্যকর্ম সম্পর্কে বলা হয় যে, তিনি ছোটগল্প নির্মাণকৌশলে একটি বৈপ্লবিক রূপ এনেছে, বিশেষত সময়ের সামনে এবং পেছনে যাওয়ার প্রবণতার কারণে। মার্কিন লেখিকা সিনথিয়া ওজিক তাঁর সম্পর্কে বলেন, ‘তিনি আমাদের চেখভ।’ তাঁর সাহিত্যকর্মের জন্য তিনি অনেক পুরস্কার লাভ করেছেন। ২০০৯ সালে ম্যান বুকার ইন্টারন্যাশনাল পুরস্কারসহ তিনবার কানাডার গভর্নর জেনারেলের পুরস্কার লাভ করেন। এছাড়া ১৯৯৬ সালে রাইটার্স ট্রাস্ট অব কানাডার মারিয়ান এনজেল পুরস্কার এবং তাঁর রচিত রানওয়ে গল্পের জন্য ২০০৪ সালে রজার রাইটার্স ফিকশন পুরস্কারে ভূষিত হন। d

 

 

 

 

 

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
২১ জুন, ২০১৮ ইং
ফজর৩:৪৩
যোহর১২:০০
আসর৪:৪০
মাগরিব৬:৫১
এশা৮:১৬
সূর্যোদয় - ৫:১১সূর্যাস্ত - ০৬:৪৬
পড়ুন