উপন্যাস
রবিনের অ্যাডভেঞ্চার
রকিব হাসান২১ জুন, ২০১৭ ইং
রবিনের অ্যাডভেঞ্চার
এক.

টান দিয়ে সফট ড্রিংকসের ভারী আইস বক্সটা টেবিলে তোলার সময় ভাবলাম : ‘টেলিকাইনেটিক পাওয়ার’ ও ‘সোলার এনার্জি বিম’, কমিক বইয়ের এই দুটো মিউট্যান্ট চরিত্রের কার ক্ষমতাটা পেলে ভালো হয়?

প্রফেসর এক্স-এর আছে টেলিকাইনেটিক পাওয়ার। এটার সাহায্যে শুধু ব্রেইন ওয়েভ ব্যবহার করেই টেবিলে বাক্সটা তুলতে পারতাম, হাত দিয়ে তোলার কষ্ট করতে হতো না। আর সাইক্লপস-এর সোলার এনার্জি বিম পেলে চোখ দিয়ে ছোড়া রশ্মির সাহায্যে তুলতে পারতাম। তাছাড়া এই রশ্মি আরও অনেক কাজে লাগে। তাই, দুটোর মধ্যে দ্বিতীয়টাকেই আমার পছন্দ।

ধপ করে কোচ হেনরির চেয়ারটাতেই বসে পড়ে, সামনের টেবিলে রাখা আমার কমিক বুকটার দিকে হাত বাড়ালাম।

আমার সামনে, রকি বিচ জুনিয়র হাই স্কুলের তারকা কুস্তিগিররা কুস্তি বাদ দিয়ে বেআইনিভাবে পাঞ্জা লড়ছে আর মাদুরগুলো ছড়িয়ে ফেলছে। মাত্র পনেরো মিনিট আগে আমি কত কষ্ট করে বিছিয়েছি ওগুলো, গ্রাহ্যই করছে না কেউ।

‘অ্যাই, হাঁদা!’ জনি ড্রিলম্যান ডাকল আমাকে। টিমের বিশালদেহি কুস্তিগিরদের একজন ও। আমার শত্রু। ‘কোক আনো!’

জনি আমার সঙ্গে এমন ব্যবহার করে যেন আমি ওর গোলাম। কথা না শুনলে ধরে মারে। ওর গায়ে গরিলার জোর। তাই না শুনে পারি না।

স্কুল ছুটির পর প্রতি মঙ্গলবারে টিম ম্যানেজারের কাজ করতে হয় আমাকে এখানে। প্রিন্সিপালকে বলে বাবা এ ব্যবস্থা করে দিয়েছে। আমার রোগা শরীর তার ভালো লাগে না। বাবা চায়, আমি বলিষ্ঠ হই। সারাক্ষণ কমিক বুকে মুখ গুঁজে না থেকে অন্য কিছু করি। আর অন্য কিছু করার জন্য বাঘের গুহায় ঠেলে দিয়েছে আমাকে।

তেরো বছর বয়েসেই এক সুপারভিলেনে পরিণত হয়েছে জনি। নেকড়ের মতো ভয়ংকর চেহারা, নিঃশ্বাসে গা গোলানো দুর্গন্ধ। বয়সের তুলনায় অনেক বড় শরীর, কিশোর বয়েসেই যুবক মনে হয়।

আর আমি? রবিন মিলফোর্ড, কারও চোখে পড়ি না। বড় বড় দেহগুলোর কাছে আমি এতটাই ছোট, কেউ যেন দেখে না আমাকে।

‘অ্যাই, পোকামুখো! কোক আনতে দিন কাবার করবে নাকি?’

‘জাহান্নামে যাও,’ মনে মনে বললাম। ‘তোমার কোকে বিষ মিশিয়ে দিতে পারলে খুশি হতাম।’

দুর্বিষহ লাগছে আমার। কমিক বুকটা সরিয়ে রেখে বাক্স থেকে কোকের বোতল বের করলাম। রোজ একই কাজ করি, এতটা খারাপ লাগে না, কিন্তু আজ লাগছে। কারণ আজ আমি টিন-এজার হব, অর্থাত্ তেরোয় পা দেবো। তেরো মানে বড় হয়ে যাওয়া। কারও চাকর খাটার আর মানসিকতা নেই।

এর আগে বারোটি জন্মদিন পার করেছি। সবাই দেখি জন্মদিন এলে খুশি হয়, পার্টি দেয়, হই-হুল্লোড় করে, আমার ওসব কিছুই করতে ভালো লাগে না। একঘেয়ে নিরানন্দভাবে শেষ করেছি প্রতিটি জন্মদিন। তবে এবার কেন যেন একটু অন্যরকম লাগছে। হয়তো বড় হয়ে গেছি, এই কথা ভেবেই।

জনির কাছে গিয়ে কোকের বোতলটা বাড়িয়ে ধরলাম।

‘ছিপিটা কি তোমার বাবায় খুলবে?’ ধমকে উঠল ও।

রাগ ঝাঁ করে উঠল মগজের ভিতর। দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করলাম।

পিছনে ওর তিন চামচা টম, ডিক ও হ্যারি খিকখিক করে হাসছে আর কনুই দিয়ে একে অন্যকে গুঁতো মারছে।

পিচ্ছিল বোতলটা শক্ত করে চেপে ধরে মোচড় দিয়ে মুখটা খোলার চেষ্টা করলাম। কিন্তু ঘামে পিছলে যাচ্ছে আঙুল। আমার এই কসরত করা দেখে চামচাগুলো হাসছে। ভাবলাম : ইস, কমিক-বুকের উলভারিনের নখর যদি থাকত আমার! এক মোচড়েই যেকোনো বোতলের ছিপি খুলে ফেলতে পারতাম, ক্যানের মুখ কাটতে পারতাম; চিরে ফালাফালা করে দিতে পারতাম শত্রুর মুখ!

খালি হাতে খুলতে না পেরে টি-শার্টের ঝুল দিয়ে চেপে ধরে মোচড় দিলাম। এতক্ষণে ঘুরল মুখ। জনির দিকে বোতল বাড়িয়ে দিলাম। ভাবছি : দুষ্ট ড্রিলম্যানের ড্রিংকে ক্রিপ্টোমাম নাইট্রেড মিশিয়ে দিতে পারতাম যদি, পেটে গেলেই ওই মারাত্মক বিষ ওর স্নায়ু আর রক্তনালীগুলোকে মাকড়সার জালের মতো নরম করে গলিয়ে দিত। ভয়ানক এক শত্রুর হাত থেকে বাঁচতাম।

‘ওই কোক তুমি খাবে, জনি?’ হেসে বলল ওর এক মাথামোটা চামচা। ‘শার্টে সর্দি মুছেছে হাঁদাটা, বোতলের মুখে সর্দির জীবাণু লাগিয়ে দিয়েছে।’

‘ঠিক,’ সুর মেলাল আরেক চামচা, ‘একটু আগে নাক ঝাড়তে দেখেছি ওকে।’

মিথ্যে কথা বলেছে ও। সর্দি নেই আমার।

ভয়ংকর কুটিল হাসিতে ভরে গেল জনির মুখ। ‘চুমুক দিয়ে দেখি আগে। সর্দি আছে বুঝলে মুখ থেকে কুলি করে ওর চুলে ফেলব। চুলের স্টাইলটা বদলে যাবে।’

জনির স্থূল রসিকতায় হা-হা করে হাসল তিন চামচা। এ সময় ঝটকা দিয়ে খুলে গেল জিমনেসিয়ামের দরজা। কুচকাওয়াজ করে ঘরে ঢুকলেন কোচ হেনরি—আমার দ্বিতীয় শত্রু। তবে জনি ড্রিলম্যানের কবল থেকে বাঁচিয়ে দেয়ায় মনে মনে ধন্যবাদ দিলাম তাঁকে।

‘অল রাইট, মেন! লাইনে দাঁড়াও!’ ঢুকেই চেঁচানো শুরু করলেন তিনি। কমিক-বুকের ‘স্ক্রিমার’-এর মতো চেঁচিয়ে গলা ফাটান। ‘ড্রিলম্যান, এখন কোক রাখো!’ আমাকে বললেন, ‘অ্যাই ছেলে, মাদুর ঠিক করো। এভাবে ছড়িয়ে রাখে নাকি কেউ।’

তারকা কুস্তিগিরদের ‘মেন’ ডাকলেও আমাকে ‘ছেলে’ ডাকেন তিনি। সবার পেশিবহুল বিশাল দেহের তুলনায় আটানব্বই পাউন্ডের আমাকে দেখে নিশ্চয় ‘বালক’ মনে হয় তাঁর কাছে।

রেজিস্ট্রার টেনে নিলেন কোচ। খেলোয়াড়দের ব্যবহার করা তোয়ালেগুলো মেঝে থেকে তুলে নিলাম। মাদুরগুলো আবার ঠিক করে বিছাতে লাগলাম। জনির পিছনে গিয়ে মাদুরে হাত দিতেই পিছিয়ে এসে ইচ্ছে করে আমার হাত মাড়িয়ে দিল ও। এগারো-সাইজের নাইক জুতোর চাপে মড়মড় করে উঠল আমার আঙুল। কোচের চিত্কারে চাপা পড়ে গেল আমার অস্ফুট আর্তনাদ।

‘ডেইভ! ডেইভ!’ চিত্কার করছেন তিনি। ‘ওটা আবার গেল কোথায়?’

‘অসুস্থ হয়ে পড়েছে, কোচ,’ মিন মিন করে জবাব দিল একজন।

‘অসুস্থ? অসুস্থ আবার কী! আগামী হপ্তায় আমাদের প্রতিযোগিতা... এখন কারোরই অসুস্থ হওয়া চলবে না!’

কুচকাওয়াজ করে সারির এক মাথা থেকে আরেক মাথায় গেলেন। জ্বলন্ত চোখে সবাইকে পরীক্ষা করে দেখে যেন নিশ্চিত হলেন, ‘হুঁ, নেই। কিন্তু একজনও কম পড়তে দেয়া যাবে না। এই ছেলে, এদিকে এসো, তুমি এসে লাইনে দাঁড়াও।’

‘আমি!’ চমকে উঠলাম।

দুই ডজন রক্তলুলোপ চোখের দৃষ্টি ঘুরে গেল আমার দিকে।

‘হ্যাঁ, তুমি। এখানে ম্যানেজারকেও কুস্তিগির হতে হয়। একজন টিম-মেম্বার কম পড়ে গেছে, তোমাকেই তার জায়গা নিতে হবে। যাও, তোমাকে প্রমোশন দিয়ে কুস্তিগির বানিয়ে দিলাম। লাইনে দাঁড়াও!’

বিশ্বাস করতে পারছি না। তেরোতম জন্মদিনের চমক কি তাহলে এটাই? জন্মদিনেই মৃত্যুদিন? তা-ও আবার অপঘাতে?

হাতে জড় করা তোয়ালেগুলো কাছের বেঞ্চটায় ছুড়ে ফেলে সারির এক মাথায় গিয়ে দাঁড়ালাম। জনির পাশে।

হাঁটু কাঁপছে আমার। ভাঁজ হয়ে পড়ে যাওয়ার ভয় পাচ্ছি। জোড়ায় জোড়ায় লড়াই করবে কুস্তিগিররা। সারি থেকে জোড়া বাছাই করছেন কোচ। অবশেষে আমার সামনে এসে দাঁড়ালেন।

‘মিলফোর্ড! ড্রিলম্যান! তোমরা দুজন লড়বে। মাদুরে গিয়ে দাঁড়াও!’

খুশিতে শুয়োরের মতো ঘোঁত্-ঘোঁত্ করে উঠল জনি।

‘কিন্তু, কোচ,’ প্রতিবাদ জানাতে গেলাম আমি, ‘আমার তো কুস্তির পোশাক নেই...’

‘লাগবে না। এত কথা বলো কেন তুমি, অ্যাঁ? যা বলছি করো।’

কোচের উদ্দেশ্যটা বুঝতে পারলাম না। এমন কোনো অপরাধ করেছি কি-না, মনে করতে পারলাম না, যার শাস্তি হিসেবে জনিকে দিয়ে আমাকে মার খাওয়াতে চান।

মনমরা ভঙ্গিতে মাদুরে এসে দাঁড়ালাম। আমার সামনে টাওয়ারের মতো দাঁড়িয়েছে জনি। খেঁকখেঁক করে হাসছে। কমিক-বুকের আরেকটা চরিত্রের কথা ভাবলাম : আমি যদি ডক্টর ড্র্যাকোনিয়ান হতাম, রেডিওঅ্যাকটিভ প্রোটিন ট্যাবলেট খেয়ে এখন দেহটাকে তিন গুণ বড় করে ফেলে মাথায় তুলে আছাড় মারতাম প্রতিপক্ষকে।

‘অল রাইট, মেন!’ কোচ বললেন। ‘প্র্যাকটিস শুরু করো। পজিশন নাও!’ বাঁশি বাজালেন।

আমার চারপাশে লড়াইয়ে ব্যস্ত হলো আরও দশ জোড়া খেলোয়াড়। এদিকে তাকানোর সুযোগ নেই কারোর। এত মজার একটা লড়াই দেখতে না পারার দুঃখে নিশ্চয় আফসোস হচ্ছে ওদের।

আমাকে আগে আক্রমণের সুযোগ দিল জনি।

লাফ দিয়ে আগে বাড়লাম। ঝাঁপিয়ে পড়লাম ওর ওপর। মনে হলো দেয়ালে ধাক্কা খেয়েছি।

পর মুহূর্তে দেখলাম, পুরো ঘরটা বন বন করে ঘুরছে চোখের সামনে। ধড়াস করে মাদুরের ওপর আছড়ে পড়লাম।

‘এক... দুই... তিন!’ গণনা করছে জনি। হাসি হাসি কণ্ঠ। মনে হলো শয়তানের গলা।

মাথাটা দপ্ দপ্ করছে আমার। উজ্জ্বল আলো নেচে বেড়াচ্ছে চোখের সামনে।

‘চালাও! চালাও!’ কোচের আদেশ শোনা গেল। ‘চালিয়ে যাও!’

আমি দম নেয়ার আগেই আমাকে টান দিয়ে তুলে আবার আছড়ে ফেলল মাদুরের ওপর।

‘এক... দুই... তিন!’

এক সেকেন্ড পর টেনে তুলে আবার আছাড় মারল।

‘এক... দুই... তিন!’

আবার তুলল। আবার আছাড়।

‘এক... দুই... তিন!’

আর পারছি না। ভর্তা হয়ে গেছে যেন আমার শরীরটা। জনির ওপর দৃষ্টি স্থির রাখার চেষ্টা করলাম। পারছি না। সব কিছুই ঘোলাটে দেখছি। ‘আমাকে ছেড়ে দাও!’ বলতে চাইলাম, স্বর বের করতে পারলাম না গলা দিয়ে, মাদুরে ফেলে প্রচণ্ড শক্তিতে চেপে ধরেছে আমাকে জনি।

‘কী করলে!’ দাঁত বের করে হাসছে ও। ‘একটু ঘামও তো বের করতে পারলে না আমার শরীর থেকে।’

হঠাত্ কী যেন কী ঘটে গেল আমার দেহের ভিতর। জনির নিঃশ্বাসের তীব্র দুর্গন্ধ আর চারপাশে ওর চামচাদের বিশ্রী হাসির শব্দ যেন ঝাঁকি দিয়ে জাগিয়ে তুলল আমাকে। দেহের কোটি কোটি কোষ ঝাড়া দিয়ে উঠে যেন ব্যথা সরাল। স্বাভাবিক হয়ে এল বোধশক্তি। অদ্ভুত ক্ষমতা ছড়িয়ে পড়ল দেহের সমস্ত অঙ্গপ্রত্যঙ্গে। ঢিল করে দিলাম শরীরটা। তাকালাম জনির দিকে। বুঝতে পারছি, ওর ধরাটা ঠিক হয়নি। কুস্তির বিশারদ মনে হলো নিজেকে। এত কিছু জানলাম কী করে, কখন জানলাম, বুঝলাম না।

‘ইয়া-হু!’ আপনিই বেরিয়ে গেল চিত্কারটা।

চোখের পলকে কুস্তির প্যাঁচ মেরে আমার ওপর থেকে সরিয়ে দিলাম ওকে। পরক্ষণে স্প্রিঙের মতো লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ালাম। জনির ঠ্যাং ধরে বন্ বন্ করে ঘোরাতে ঘোরাতে ছুড়ে ফেললাম মাদুরে। চেপে ধরলাম।

‘এক... দুই... তিন!’ গুণতে আরম্ভ করলাম।

সমস্ত জিম-এ পিনপতন নীরবতা। বরফের মতো জমে গেছে যেন সবাই। চিত্কার থামিয়ে দিয়েছেন কোচ হেনরি। নিচের চোয়াল ঝুলে পড়েছে। আমি এ কাজ করেছি, বিশ্বাস করতে পারছেন না।

‘সরো! সরো!’ কাতর কণ্ঠে বলল জনি।

তাকিয়ে আছি ওর দিকে।

ছটফট শুরু করল দুষ্ট জনি। খানিকক্ষণ ওঠার চেষ্টা করে পুরোপুরি হাল ছেড়ে দিয়ে পরাজয় মেনে নিল।

আবার নিজের মধ্যে ফিরে এলাম যেন আমি। স্বাভাবিক এক দুর্বল রবিন। কীভাবে করলাম কাজটা বুঝতে পারছি না। জনির একটা পা উঁচু করারই সাধ্য নেই আমার, দুই পা ধরে এভাবে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ছুড়ে ফেলা— সে তো অসম্ভব! মনে হচ্ছিল যেন দানবের শক্তি ভর করেছিল আমার শরীরে।

সত্যিই পরাজিত করেছি জনিকে? নাকি এটাও আমার কল্পনা?

টিমের অন্যান্য খেলোয়াড়, কোচ, সবাই এখনো নিশ্চুপ। রাগে ফুঁসছে জনি।

না, কল্পনা নয়। বাস্তবেই করেছি কাজটা।

হয়তো আমার তেরোতম জন্মদিনের অবিশ্বাস্য উপহার!

ছেড়ে দিলাম জনিকে। কানের কাছে হিসিয়ে উঠল ও, ‘তুমি একটা মরা লাশ! তোমাকে আমি ছাড়ব না!’

উঠে দাঁড়ালাম।

এখনো স্তব্ধ হয়ে আছেন কোচ। তারপর যেন ঘুম থেকে জেগে উঠে প্র্যাকটিস থামাতে বললেন সবাইকে। গলায় জোর নেই। আমাকে বেরিয়ে যেতে বললেন।

টেবিল থেকে আমার কমিক বইটা তুলে নিয়ে বিল্ডিংয়ের বাইরে চলে এলাম। সামনের পার্কিং লটে এসে গাড়ি আসার অপেক্ষা করতে লাগলাম। বাবা আমাকে নিতে আসবে।

অস্থির হয়ে উঠছি ক্রমে। এখনো আসে না কেন বাবা?

প্রচণ্ড ভয় পাচ্ছি। জনিকে আছাড় দিয়েছি আমি, ও সেকথা ভুলবে না। আমাকে ছাড়বে না। ওর কথামতো : সত্যিই এখন আমি একটা মরা লাশ।

গায়ের জ্যাকেট ভেদ করে চামড়ায় এসে লাগল এক ঝলক কনকনে ঠাণ্ডা বাতাস। মাথার ওপর, ধূসর কালো আকাশের গায়ে তারা ফুটছে একটা দুটো করে। স্ট্রিটল্যাম্পের মৃদু আলোয় কমিক পড়ার চেষ্টা করলাম। কিন্তু মন বসাতে পারলাম না বইয়ে। বার বার ঘুরেফিরে চোখের সামনে ভেসে উঠছে ‘দুষ্ট ড্রিলম্যানকে জব্দ করার’ দৃশ্যটা।

কীভাবে করলাম কাজটা? অলৌকিক ব্যাপারে বিশ্বাস করি না আমি। নিশ্চয় এর কোনো বাস্তব ব্যাখ্যা আছে। হতে পারে জনির দেহের শক্তিকেই কাজে লাগিয়ে ওর বিরুদ্ধে ব্যবহার করে ওকে পরাজিত করেছি আমি, ‘দা টাইম লর্ড’স মিশন’-এর বিশপ-এর মতো। কিন্তু এভাবে অন্যের শক্তি নিজের কাজে ব্যবহার করার কৌশল কবে শিখলাম? কোথায়?

‘আসলে ওকে অসাবধান অবস্থায় বেকায়দায় পেয়ে গিয়েছিলে তুমি!’ বিড়বিড় করে নিজেকে বোঝালাম। জনির মতো শক্ত প্রতিপক্ষকে আছাড় মারার পর কী ঘটবে, এই দুশ্চিন্তা যেন মগজকে চুরমার করতে থাকল আমার।

‘তুমি এখানে,’ হঠাত্ পিছন থেকে জনির কণ্ঠ চমকে দিল আমাকে। ‘নিজেকে বাহাদুর ভেবে খুব পিঠ চাপড়াচ্ছ মনে মনে, তা-ই না? আসলে আমি পা পিছলে পড়ে গিয়েছিলাম। আর সেই সুযোগে তুমি আমার ওপর চেপে বসেছিলে।’

‘কিন্তু পা ধরে যে ঘোরালাম... ’ মিন মিন করে বলতে গেলাম।

ছায়া থেকে বেরিয়ে এল ওর বন্ধুরা। আমাকে ঘিরে ফেলল।

‘আরেকবার ঘোরাও তো দেখি,’ জ্যাকেটের পকেট থেকে দুই হাত বের করে আনল জনি।

‘এখানে তো মাদুর নেই,’ বাধা দিয়ে বললাম।

‘মাদুর নেই, সেটা তোমার দোষ,’ ধমকে উঠল জনি। ‘পাততে ভুলে গেলে কেন?’

হায়েনার মতো আমাকে ঘিরে ঘুরছে তিন চামচা টম, ডিক আর হ্যারি।

শার্টের কলার চেপে ধরে টান দিয়ে আমাকে শূন্যে তুলে ফেলল জনি। স্কুল বিল্ডিংয়ের দেয়ালে চেপে ধরল। মস্ত মুঠো তুলল আমার মুখ লক্ষ করে।

‘প্রথম ঘুষিতে কয়টা দাঁত ফেলব?’ খিকখিক করে হেসে বন্ধুদের জিজ্ঞেস করল ও।

এবার আর রক্ষা নেই আমার। পিটাতে পিটাতে যদি মেরে না-ও ফেলে, হাসপাতালে অন্তত মাস তিনেক কাটানোর ব্যবস্থা করে ছাড়বে জনি। এই ভয়ানক পরিস্থিতির মাঝেও কমিক-বুকের দৃশ্য খেলে গেল আমার মনে। ভাবলাম : প্রতিশোধের নেশায় মরিয়া এখন দুষ্ট ড্রিলম্যান আর ওর গুণ্ডা চামচারা। বেকায়দায় পেয়ে গেছে অসাবধান হিরোকে। আর কোনো আশা নেই হিরোর। কিন্তু ও মরে গেলে এখন অপরাধ, দুর্নীতি আর কারফিউ অমান্যকারীদের হাত থেকে কে বাঁচাবে মহাকাশের শহরটাকে?

‘অ্যাই! কেউ আসছে!’ ফিসফিস করে সাবধান করল এক চামচা।

‘ভাগো!’ বলল আরেকজন।

ঘুষিটা না মেরেই আমার কলার ছেড়ে দিল জনি। ধুপ করে পড়লাম শান বাঁধানো রাস্তায়। বিল্ডিংয়ের কোণ ঘুরে ছুটে হারিয়ে যেতে দেখলাম চারটে ছায়ামূর্তিকে।

পার্কিং লটে ঢুকল একটা গাড়ি। সেদিকে তাকিয়ে ভাবলাম : পুরো পরিস্থিতিই যখন হিরোর নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে, ঠিক সেসময় মহাকাশ থেকে নেমে এল একটা গ্যালাক্সি-ক্লাস রণতরী। বেঁচে গেল হিরো... মহাকাশযানে তুলে নেয়া হবে ওকে।

মাটি থেকে আমার কমিক বইটা তুলে নিয়ে উঠে দাঁড়ালাম।

এগিয়ে চললাম গাড়িটার দিকে।

টান দিয়ে প্যাসেঞ্জার সাইডের দরজাটা খুলে নীরবে উঠে বসলাম।

 

দুই.

‘তোমার প্র্যাকটিস কেমন চলছে?’ স্কুলের পার্কিং লট থেকে বেরিয়ে জিজ্ঞেস করল বাবা।

‘ভালো।’

‘আগামী হপ্তার প্রতিযোগিতায় যাচ্ছে তো তোমাদের টিম?’

‘মনে হয়।’

‘তোমার ক্লাস কেমন হলো আজ?’

‘ভালো।’ সিট বেল্টে হাত বোলালাম। কালো গাড়িটার মধ্যে বসে নিজেকে কেমন বন্দি মনে হচ্ছে আজ।

‘খিদে পেয়েছে তোমার?’ জিজ্ঞেস করল বাবা।

‘হ্যাঁ।’

‘তোমার মা খাবার রেডি করে বসে আছে।’

‘ভালো।’

‘আজ নুডলস করেছে। আর জন্মদিনের কেক।’

‘ও, তা-ই।’

‘রবিন, কী হয়েছে তোমার আজ?’

‘কই, না, কিছু না তো... ’

এ সময় গাড়ির রেডিও খড়খড় করে করে বাবার জেরা থেকে বাঁচিয়ে দিল আমাকে। ‘কার ফোরটিন! কার ফোরটিন! চিফ, শুনতে পাচ্ছেন?’

মাইক্রোফোন তুলে নিল বাবা। ‘পাচ্ছি, টিউনা। কী হয়েছে?’

‘আবার সেই ইউএফও। লেকের ওপরে নাকি অদ্ভুত আলো দেখা যাচ্ছে। যাবেন দেখতে? খুব একটা ভালো খবর হবে... ’

জানালা দিয়ে পশ্চিমের আকাশের দিকে তাকালাম। ওদিকের পাইনে ছাওয়া পাহাড়ের ওপাশেই রয়েছে লেকটা। আবারও অদ্ভুত আলো দেখা গেছে ওখানে? কিছুদিন থেকেই শুনে আসছি, ওখানকার আকাশে প্রায়ই ইউএফও দেখা যায়। লেকের ওপরের আকাশে আনআইডেন্টিফায়েড ফ্লাইং অবজেক্ট আর বিচিত্র আলোর আনাগোনা দেখতে দেখতে আজকাল বাড়ির টুলশেড ও গ্যারেজের ভিতরেও বিচিত্র চেহারার প্রাণী দেখা শুরু করেছে লোকে।

বাবার ধারণা, এ সবই অতিকল্পনা। এর জন্য দায়ী, সম্প্রতি প্রকাশিত একটা প্রবন্ধ। কয়েকজন বিজ্ঞানী গবেষণা করে জানিয়েছেন, ওই লেকের সৃষ্টি প্রাগৈতিহাসিক কালে, মস্ত এক উল্কাপাতের কারণে। বাবার মতে, এ সব বৈজ্ঞানিক কচকচানিও মানুষের মনকে বিভ্রান্ত করছে, কল্পনায় ইউএফও দেখাচ্ছে।

আমি অবশ্য ঘটনাটা সত্যি হলেই খুশি হই। ইউএফও দেখার প্রচণ্ড আগ্রহ আমার।

‘দরকার নেই, টিউনা,’ বাবা জবাব দিল। ‘জুজুর পিছনে ছোটার কোনো মানে নেই। ফোন করলে পাত্তা দেবে না।’

‘ও-কে, মিস্টার মিলফোর্ড।’ বার দুই খড়খড় করে নীরব হয়ে গেল রেডিও। আমি জানি, টিউনা বাবার সহকারী।

‘বাবা, আমরা গিয়ে একবার দেখে এলে অসুবিধে কী? বেশি দূরে তো নয়।’

‘উঁহু। অকারণ সময় নষ্ট।’

‘কিন্তু তোমার কি কোনোই কৌতূহল নেই?’ জিজ্ঞেস করলাম। ‘সত্যি যদি কিছু থাকে ওখানে? এত লোকে যেহেতু বলে... ’

‘না, কিছুই নেই ওখানে। যত্তসব ফালতু...’ কথাটা শেষ করল না বাবা। ‘আমার ধারণা, যারা এসব দেখে, মাতাল অবস্থায়ই দেখে।’

কিন্তু বাবার কথা মেনে নিতে পারলাম না। মনটা খুঁতখুঁত করতেই থাকল। জানালা দিয়ে তাকালাম আবার পশ্চিম আকাশের দিকে। ইস, আমার যদি টেলিবায়োনিক ভিশন থাকত। অতি উন্নত দৃষ্টিশক্তির সাহায্যে তাহলে রাতের আকাশে ভিনগ্রহ থেকে আসা অচেনা প্রাণীদের দেখতে পেতাম।

ডিনারে মা আমার জন্য আমার প্রিয় খাবার পেস্টি সস আর নুডলস করেছে, আর নিজেদের জন্য করেছে মিট সস।

সাধারণত এসব বাড়তি খাটুনি করে না মা। অন্য সময় হলে আমি চটকানো আলু আর কুচি কুচি করে কাটা বাঁধাকপি সেদ্ধ দিয়েই চালিয়ে দিই, আর ওরা তখন গোগ্রাসে কোনো একটা খুন করা প্রাণীর রান্না করা মৃতদেহ গিলতে থাকে। তবে আজ আমার জন্য বিশেষ দিন। তাই বিশেষ রান্না করা হয়েছে আমার জন্য।

‘রবিন, কেক নেবে আর?’ কেকের ওপর মাখন দিয়ে লেখা ‘হ্যাপি’ শব্দটার ওপর ছুরি বসিয়ে দুই টুকরো করে ফেলেছে মা। ফালি করে কাটছে কেকটাকে।

‘না।’

‘রোজার?’

‘দাও এক টুকরো,’ বলে নিজেই হাত বাড়িয়ে বড় একটা টুকরো তুলে নিল বাবা। হ্যাপির প্রথম দুটো অক্ষর রয়েছে টুকরোটার পিঠে।

ঠোঁট থেকে কেকের মাখন মুছে নিয়ে উঠে দাঁড়ালাম। এঁটো প্লেটগুলো তুলে নিয়ে এগোলাম বেসিনের দিকে।

‘রবিন, শোনো,’ মা ডাকল। ‘তোমার বাবা আর আমার তরফ থেকে একটা সারপ্রাইজ আছে তোমার জন্য। বাবার দিকে একবার তাকিয়ে বেশ গর্বিত ভঙ্গিতে আমার সামনে একটা বাক্স রাখল মা।

বাক্সটার আকার দেখে বুকের মধ্যে দুরুদুরু শুরু হলে আমার। ধমণীতে ছলকে উঠল রক্ত। বাক্সটা নয় বাই বারো ইঞ্চি। দুষ্প্রাপ্য কমিক বুকগুলোর আকার ঠিক এমনই হয়। তবে কি ‘দ্য এক্স ম্যান-১’! পুরো দুটো বছর যে বইটা কেনার জন্য টাকা জমাচ্ছি আমি?

কাঁপা হাতে কাগজের মোড়ক ছিঁড়ে ডালা ধরে টান দিলাম। উদ্বিগ্ন ভঙ্গিতে আমার আঙুলগুলো ডেবে গেল ভিতরের নরম টিস্যু পেপারে। কাগজ সরিয়ে দুই আঙুলে টিপে ধরে বের করে আনলাম বাদামি রঙের একটা বিজনেস কার্ড। উঁচু করে ধরে পড়লাম। বড় বড় অক্ষরে ইংরেজিতে লেখা কথাগুলোর মানে : ‘চিবা-কেনের কারাতে স্কুল’। আর কিছুই নেই বাক্সের ভিতর।

চুপসে গেলাম ফাটা বেলুনের মতো। হাত দুটো সীসের মতো ভারী লাগছে।

‘কারাতে?’ জিজ্ঞেস করলাম।

‘আত্মরক্ষা শেখার ক্লাসে ভর্তি করে দিয়েছি তোমাকে,’ মুখভর্তি কেক চিবোতে চিবোতে বাবা বলল। ‘প্রতিটি মানুষকেই তার নিজেকে বাঁচানো শেখা উচিত। দুনিয়া বড় বিপজ্জনক জায়গা। কিশোরের কথাই ভাবো।’

বাবার কথায় মনটা খারাপ হয়ে গেল। গত গ্রীষ্মে রহস্যজনকভাবে হারিয়ে যায় আমার বন্ধু কিশোর, কোনো চিহ্নই পাওয়া যায়নি আর। তন্নতন্ন করে খুঁজেছে লোকে। কোনো জায়গা বাদ রাখেনি। কয়েক সপ্তাহ ধরে খবরের কাগজের পাতায় প্রতিদিন ওর নিখোঁজ সংবাদ ছাপা হয়েছে। কেউ কেউ বলে, কিশোরকে ভিনগ্রহবাসীরা তুলে নিয়ে গেছে। কিন্তু বাবার ধারণা, ছেলেটা কোনো অপরাধীর হাতে মারা গেছে। লাশটা এমনভাবে গুম করে ফেলা হয়েছে, কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি আর।

‘ক্লাস শুরু হবে কাল বিকেল থেকে,’ বাবা বলল।

‘ভালো লাগবে তোমার, রবিন, দেখো,’ বাবার সঙ্গে সুর মেলাল মা।

‘হুঁ!’ মুখ নামিয়ে জবাব দিলাম।

ঠিক যে কাজটাকে আমি ঘৃণা করব, সেটাতেই পাঠাবে আমাকে ওরা। আরেকটা বিপদের মধ্যে ফেলার বুদ্ধি করেছে। কুস্তি থেকে সরিয়ে কারাতে। তপ্ত কড়াই থেকে জ্বলন্ত উনুনে। নতুন জায়গার তুচ্ছতাচ্ছিল্য সইতে হবে এবার। ইস্, ভিন্ন কোনো ডিমেনশনে যদি পালিয়ে চলে যেতে পারতাম! ছোটরা যেখানে শরীরচর্চা থেকে মুক্তি পায়, যেখানে মার্শাল কম্ব্যাটের নামে মরটাল কম্ব্যাট অর্থাত্ মরণঘাতী লড়াইয়ের ক্লাসে জন্মদিনের উপহার হিসেবে ভর্তি করা হয় না, নিজের জন্মদিনটা নিজের ইচ্ছেমতো কাটাতে পারে, কতই না ভালো হতো!

কার্ড থেকে মুখ তুলে বাবা-মা’র হাসিমুখের দিকে তাকালাম। দুঃখ দিতে চাইলাম না ওদের। জোর করে হাসার চেষ্টা করলাম। ‘থ্যাংকস।’

‘যাক, তোমার ভালো লেগেছে জেনে খুশি হলাম,’ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল মা। ‘নাও, আরেক গ্লাস দুধ।’

 

তিন.

পরদিনের সকালটা খুবই উজ্জ্বল, চমত্কার রোদ; কিন্তু আমার মনটা মেঘে ঢাকা, কালো। বাসে আমার সহযাত্রী সজীব, প্রাণচঞ্চল ছেলেমেয়েদের দিকে তাকাতে ইচ্ছে করছে না। ওদের হাসিমুখ আমার ঈর্ষা জাগাচ্ছে।

আহা, ব্যাটম্যানের মতো যদি বাঁচতে পারতাম! কালো পোশাক পরতাম, মুখে মুখোশ। একটা চমত্কার গাড়ি থাকত আমার, থাকত ঘরের কাজ সামলানোর জন্য একজন চাকর।

মনে হচ্ছে, স্কুলে না গিয়ে কোনো অন্ধকার গুহায় ঢুকে বসে থাকি।

স্কুলে পৌঁছাল বাস।

বাস থেকে নেমে স্কুল বিল্ডিংটার দিকে তাকালাম। যুদ্ধক্ষেত্র মনে হলো ওটাকে—যত ধরনের দুষ্ট আর নোংরা প্রাণীদের আস্তানা। ব্যাটম্যান হলে গায়ে আলখেল্লা জড়িয়ে এখন ওদের সঙ্গে লড়াই করতে পারতাম।

সকালের রোদ লাগছে চোখে। চোখ মিটমিট করে তাকালাম স্কুলের সামনের গেটটার দিকে। লাইব্রেরিতে আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু রিচি বুমার-এর সঙ্গে দেখা করার কথা। বিজ্ঞানের জাদুকর বলা যায় ওকে। মিস্টার গ্রেগরির সায়েন্স ক্লাসে টেস্ট পরীক্ষা দেয়ার ব্যাপারে আমাকে সাহায্য করবে ও।

মিস্টার গ্রেগরি খারাপ লোক নন। মানে, বলতে চাইছি, শুকনো খটখটে, রসকষহীন ওই জোম্বিগুলোর মতো নন, যাদের জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য আর আনন্দই হলো লেখাপড়ার অতিরিক্ত চাপে ফেলে শিক্ষার্থীদের যন্ত্রণা দেয়া। একঘেয়ে কণ্ঠে একটানা লেকচার দিয়ে যান তিনি। সে-লেকচার সারা ক্লাসে একমাত্র রিচিই মনোযোগ দিয়ে শোনে।

সায়েন্স ক্লাস নিয়ে আমার বিরূপতাও নেই, ভালো লাগাও নেই। দীর্ঘ লেকচারের অনেক কিছুই মাথায় ঢোকে না। ঢোকানোর তেমন চেষ্টাও করি না। মিস্টার গ্রেগরি হয়তো অ্যামিবার জন্মবৃত্তান্ত নিয়ে লেকচার দিচ্ছেন, আমি তখন ভাবতে থাকি কমিক বইয়ের ‘অ্যামিবা ম্যান’-এর অ্যাডভেঞ্চারের কথা। পুরো একটা শহরকে গিলে ফেলার ক্ষমতা রাখে অ্যামিবা ম্যান।

‘আরে আরে, ছুঁচোটা না?’ আমি স্কুলের চত্বর পেরোনোর সময় পাশ থেকে টিটকারি দিল জনি ড্রিলম্যান। ‘নাক দেখেছ? এক্কেবারে ছুঁচোর মতো।’

কাছাকাছিই রয়েছে ওর তিন চামচা।

‘তা যা বলেছ,’ হেসে বলল একজন।

র্যাকেট দিয়ে একটা টেনিস বলকে বাড়ি মেরে স্কুল বিল্ডিংয়ের দেয়ালে ছুড়ে দিচ্ছে জনি। ফিরে এলে আবার বাড়ি মারছে।

‘এই ছুঁচো, বাস থেকে নামলে কোনদিক দিয়ে?’ খিকখিক করে হাসল ও। ‘দরজার তলা দিয়ে?’

ওর সঙ্গে তাল দিয়ে তিন চামচাও গা জ্বালানো হাসি হাসল।

অন্যদিন সাধারণত এসব কথায় কান দিই না আমি, মাথা নিচু করে হেঁটে চলে যাই, কিন্তু আজ দাঁড়িয়ে গেলাম। প্রচণ্ড রাগ মাথাচাড়া দিচ্ছে মগজে।

আমাকে আরও খেপানোর জন্য সুর করে বলতে লাগল তিন চামচা : ‘ছুঁচো! ছুঁচো! ছুঁচো!’

হঠাত্ অদ্ভুত একধরনের শিরশিরে অনুভূতি হলো মাথার বাঁ দিকে। কী জানি কী ঘটে গেল দেহের ভিতরে। বিদ্যুত্গতিতে পাক খেয়ে ঘুরে দাঁড়ালাম।

আমাকে লক্ষ করে বল মেরেছিল জনি। অবিশ্বাস্য ক্ষিপ্রতায় আমার মুখের কয়েক ইঞ্চি দূরে থাকতেই থাবা দিয়ে ধরে ফেললাম বলটা। জনির দিকে তাকিয়ে শীতল কণ্ঠে বললাম, ‘বল মারার আগে আরও সাবধান হয়ো!’

তারপর ছুড়ে দিলাম বলটা। বুলেটের মতো শিস কেটে উড়ে গেল ওটা জনির কানের পাশ দিয়ে। দেয়ালে বাড়ি খেয়ে ঠাস করে ফেটে গেল।

স্তব্ধ হয়ে হয়ে গেল জনি আর ওর তিন চামচা।

*

‘ওটা দেখতে নাকি বনরুটির মতো, গা থেকে নীল আলো বিচ্ছুরিত হয়।’

‘না। পিরিচের মতো গোলাকার। ইউএফও সম্পর্কে কিছু জানো না নাকি তুমি?’

‘আমি শুনেছি ওটার গায়ে নাকি বড় বড় লাল আলো আছে।’

‘উঁহু, আলোগুলো সবুজ। ইউএফওর আলো সব সময়ই সবুজ হয়।’

লাঞ্চের সময় বারান্দা ধরে এগোনোর সময় কানে এল ছেলেমেয়েদের এসব কথা। আগের দিনের ফ্লাইং সসার দেখা নিয়ে বলাবলি করছে সবাই।

লাঞ্চরুমে এসে আমার তিন বন্ধু রিচি, বিড আর মুসার সঙ্গে আমিও ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনা করতে লাগলাম।

‘আমি বলছি এটা সম্ভব। লেকের কাছে এই যে লোকে প্রায়ই অদ্ভুত সব জিনিসের আনাগোনা দেখছে, এর কী ব্যাখ্যা দেবে?’ বিড ওয়াকারের প্রশ্ন।

বিড ওয়াকার সায়েন্স ফিকশন ভালোবাসে। সায়েন্স ফিকশনের ওপর লেখা বই আর সিনেমার বিখ্যাত চরিত্রদের নিয়ে রীতিমতো গবেষণা করে ও। স্টার ট্রেক ছবির প্রতিটি চরিত্র, মহাকাশযানের নাম, কোনটা দেখতে কেমন, সব জানে।

‘বাবা বলে, লোকে উদ্ভট জিনিস নিয়ে পাগলামি করতে ভালোবাসে,’ বলল ও। ‘কিন্তু আমার ধারণা, সত্যিই কিছু ঘটছে ওই লেকটার কাছে। নইলে লোকে বলে কেন? তাছাড়া, একজনে তো দেখেনি, রকি বিচের বহু লোকে দেখেছে। সবাই মিথ্যে বলে, কিংবা মাতাল, এটা মেনে নেয়া যায় না।’

‘তা ঠিক,’ মুসা আমান বলল। ‘কাল রাতে ইউএফও দেখার কথা পত্রিকা অফিসকে কে ফোন করে জানিয়েছিল, জানো? মিসেস মুলিগান।’

‘তা-ই নাকি?’ অবাক হলাম। স্কুলের পাশের ক্যাফেটোরিয়াটার মালিক মিসেস মুলিগান। কেউ ইউএফও দেখেছে বললেই হাসতেন, বিশ্বাস করতেন না। বলতেন, সব গাঁজা, মাতালের প্রলাপ। তিনি যেহেতু দেখেছেন দাবি করেছেন, তারমানে কথাটা সত্যি।

‘হ্যাঁ,’ মাথা ঝাঁকাল মুসা।

‘ওসব রহস্যময় আলোর কারণ ভিনগ্রহবাসীদের ঘাড়ে চাপিয়ে না দিয়ে অন্যভাবে ভাবা উচিত,’ রিচি বলল। ‘আমার মনে হয়, এসবের পিছনে যুক্তিসঙ্গত কোনো ব্যাখ্যা রয়েছে। হয়তো, বায়ুমণ্ডলের বিশৃঙ্খলাই এর কারণ।’ সব কিছুতেই বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা খোঁজে ও।

‘কিন্তু যখনই কোনো রহস্যময় আলো দেখা যায় ওখানে, তখনই অদ্ভুত কিছু না কিছু ঘটে শহরে, এটার কী ব্যাখা দেবে?’ আমি প্রশ্ন করলাম। ‘এই যেমন, যে রাতে শহরের প্রায় সবাই রহস্যময় আলো দেখেছিল, তার পরদিন রকি বিচ হলের ভিডিও টার্মিনাল-সহ সমস্ত কম্পিউটারগুলো যেন পাগল হয়ে গেল। তারপর, গত গ্রীষ্মের কথাই ধরো। আলো দেখা যাওয়ার পরদিন রহস্যময়ভাবে হারিয়ে গেল কিশোর পাশা।’

গম্ভীর ভঙ্গিতে মাথা ঝাঁকিয়ে সবাই একমত হলো আমার কথায়। বিডদের প্রতিবেশি ছিল কিশোর। ‘এক্স-ফাইল’-এর ভক্ত ছিল। আর ঠিক এক্স-ফাইলের কাহিনির মতোই কোনো সূত্র না রেখে রহস্যময়ভাবে উধাও হয়ে গেল। ওর এই নিখোঁজ হওয়াটা প্রচণ্ডভাবে নাড়া দিয়েছিল শহরবাসীকে।

‘হয়তো অন্য কোনো গ্রহ থেকে আসা বিজ্ঞানী ওরা,’ বিড বলল। ‘আমাদের গ্রহ থেকে নমুনা নিতে আসে। কুকুর, বিড়াল, মুরগি, ঘাস... ’

‘তোমার কি ধারণা কিশোরকে ওরাই তুলে নিয়ে গেছে?’ রিচির প্রশ্ন।

‘হ্যাঁ, হতেই পারে, অসম্ভব কিছু না,’ বিড জবাব দিল।

‘তা-ই যদি হয়ে থাকে, জনি ড্রিলম্যানকে চোখে পড়ল না কেন ওদের?’ বিড়বিড় করে ক্ষোভ প্রকাশ করল মুসা। ‘পড়ল কি না কিশোরের মতো ভালো একটা ছেলেকে।’

স্কুলচত্বরের দিকে তাকালাম। জনি আর ওর বন্ধুরা আবার টেনিস বল ও র্যাকেট নিয়ে খেলছে।

সকালে যা ঘটেছে, সেটা আমার বন্ধুদের বলব কি-না ভাবলাম। যেভাবে পিছন থেকে বল আসার ব্যাপারটা টের পেলাম, ঘুরে দাঁড়িয়ে লুফে নিলাম, প্রচণ্ড শক্তিতে ছুড়ে দিলাম, সেটা আমার নিজের কাছেই অস্বাভাবিক লেগেছে।

মনে হলো না বলাই ভালো। তা ছাড়া পুরো ব্যাপারটা কল্পনা কি-না এখনো বিশ্বাস করতে পারছি না। হয়তো কমিক বুক আমার মগজকে মোহাচ্ছন্ন করে রেখেছে।

‘আমার মনে হয় তোমার ধারণা ঠিক না, বিড,’ রিচি বলল। ‘ভিনগ্রহবাসীরা যদি নমুনা চায়, তাহলে পৃথিবীতে এমন অনেক জায়গা আছে, যেখানে প্রাণী-বৈচিত্র্য আর গাছপালা অনেক বেশি, সেখান থেকে নেয়াটাই যুক্তিসঙ্গত হতো, রকি বিচের মতো একটা প্রায় নিরস জায়গায় কেন এল? তাছাড়া, এগুলো ভিনগ্রহবাসীদেরই কাজ, এমন কোনো প্রমাণ নেই আমাদের হাতে। ওই যে, যা বলেছিলাম, যুক্তিসঙ্গত অন্য কোনো ব্যাখ্যা আছে এর, যেটা বাস্তবসম্মত, বৈজ্ঞানিক...’

গুঙিয়ে উঠলাম। একটু আগে বিজ্ঞান পরীক্ষা দিয়ে এসে এখন আবার সেই বৈজ্ঞানিক কচকচানি সহ্য হচ্ছে না আমার।

গাছের সারির দিকে তাকালাম, যেটা স্কুল-চত্বরের কিনারে বেড়া দিয়ে রেখেছে। মনে হলো, নিষিদ্ধ অঞ্চলের দিকে তাকিয়েছি, যেখানে কেউ ঢুকতে সাহস করে না। কেন যেন ওই এলাকাটা হাতছানি দিয়ে ডাকে আমাকে। বিড়বিড় করলাম, ‘কিন্তু রিচি, ভিনগ্রহবাসীরা নেই, এ ব্যাপারেই বা শিওর হলে কী করে তুমি?’

 

চার.

স্কুল ছুটির পর চিবা-কেনের কারাতে স্কুলে যাওয়ার কথা আমার। রকি বিচ মলের একটা বড় ঘরকে স্কুল বানিয়েছেন। কীভাবে যাব ভাবতে লাগলাম।

স্কুল বাসে করে যেতে পারি, মলের পাশ দিয়েই যায় বাসটা। কিন্তু তাহলে জনি আর ওর বন্ধুদের সঙ্গে এক বাসে চড়তে হবে আমাকে। সারাটা পথ আমাকে জ্বালিয়ে মারবে ওরা। দ্বিতীয় আরেকটা রাস্তা আছে, শর্টকাটে বনের ভিতর দিয়ে হেঁটে যাওয়া। রহস্যময় লেকটার পাশ দিয়ে ঘুরে বন থেকে বেরোলেই সামনে পড়বে মলটা।

দ্বিধা করতে করতে বাসের সামনে এসে দাঁড়ালাম। বাসে ওঠার জন্য সারি দিয়ে দাঁড়িয়েছে ছেলেমেয়ের দল। হাসাহাসি করছে, একে অন্যকে খোঁচা মারছে, অনর্গল কথা বলছে। জনি আর ওর বন্ধুদের ওপর চোখ পড়তে নিজের অজান্তে মুখ বাঁকালাম। নাহ্, এরচেয়ে ভিনগ্রহবাসীদের সামনে পড়াও ভালো। হয়তো ডেথ-রে গান থাকবে ওদের হাতে, যার সাহায্যে ডেথ রশ্মি ছুড়ে নিমেষে বাতাসে মিলিয়ে দেয়া যায় মানুষকে। তবে ওই মারাত্মক অস্ত্রও জনির ধারাল জিভের খোঁচার চেয়ে ভালো।

তবে দ্বিধা যাচ্ছে না। ওই নিষিদ্ধ এলাকায় ঢুকেছি জানলে বাবা আমাকে আস্ত রাখবে না।

ওই লেকের কাছে না যেতে বার বার আমাকে সাবধান করে বাবা। আমার মনে হয় না ইউএফও-তে করে আসা ভিনগ্রহবাসীদের ভয়ে বারণ করে। হয়তো বনের ভিতর মানুষ-অপরাধীরা লুকিয়ে থাকতে পারে, এই ভয়ে যেতে নিষেধ করে। কিংবা হয়তো বিপজ্জনক লেকটা পছন্দ করে না বাবা, ভাবে, পানিতে পড়ে গিয়ে বিপদ ঘটতে পারে আমার। কোনটা ঠিক, আমি জানি না। তবে ওই বনে যেতে বাধা দেয়ার ব্যাপারটা অবাক করে আমাকে।

‘অ্যাই, জনি। দেখো, দেখো, ছুঁচোটা!’ সারির সামনে থেকে ডেকে বলল টম।

আমার দিকে ঘুরল জনি। চোখের দৃষ্টি ইস্পাত কঠিন। ভয়াবহ একটা দৃশ্য ভেসে উঠল আমার মনের পর্দায় : বাসের জানালা দিয়ে আমার মাথাটা বাইরে ঠেসে ধরেছে জনি, আর একটা ট্র্যাকটরের ট্রেইলার পাশ কাটানোর সময় বাড়ি দিয়ে আমার মাথাটাকে ছিঁড়ে ধড় থেকে আলাদা করে ফেলছে।

উধাও হয়ে গেল আমার দ্বিধা। ডেথ-রে’র ঝুঁকি নেয়াও ভালো।

বইয়ের ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে, পা টেনে টেনে রাস্তা পেরোলাম। ঢুকে পড়লাম তারের বেড়ার একটা ছেঁড়া ফোকর দিয়ে।

দুই গজ এগোতেই বন। ঢুকে পড়লাম। ছেলেমেয়েদের পরিচিত গুঞ্জন শুনতে পাচ্ছি না, বাসের ডিজেল ইঞ্জিনের ধোঁয়ার গন্ধও আর নাকে আসছে না। শান্ত, স্তব্ধ হয়ে আছে বনটা। স্বাভাবিক নয় মোটেও, ভূতুড়ে লাগছে।

বাঁয়ে লেকের কালো পানির দিকে ঢালু হয়ে নেমে গেছে পথ। আমার ডানে, গাছ আর কাঁটাঝোপ যেন হামাগুড়ি দিয়ে উঠে গেছে ছায়াঢাকা কালো পাহাড়ে। আমার সামনে, একটা পায়েচলা পথ লেকের পাশ দিয়ে ঘুরে চলে গেছে।

বনের তাপমাত্রা বাইরের চেয়ে কম। মাথার ওপরে পাতার চাঁদোয়া রোদ আসায় বাধা দিচ্ছে। ভেজা শেওলার মতো গন্ধ বাতাসে। চারপাশে অদ্ভুত নীরবতা। একটা পাখির ডাক শুনলাম না। এমনকি বাতাসের শব্দও নেই। শুধু আমার পায়ের চাপে পাতা মচমচ করছে।

হঠাত্ আমার পিছনে একটা ডাল ভাঙার শব্দ হলো।

আমার পায়ের শব্দ অদ্ভুত প্রতিধ্বনি তুলল।

তারপর মনে হলো, ওগুলো কি সত্যিই প্রতিধ্বনি? নাকি আমাকে অনুসরণ করছে কেউ, তার পায়ের শব্দ শুনতে পাচ্ছি?

আমার ঠিক পিছনে মট করে ভাঙল আরেকটা ডাল।

নিশ্চয় কেউ আছে। আমাকে লক্ষ করছে।

আতঙ্ক পেট খামচে ধরল আমার। ঘাড়ের লোম দাঁড়িয়ে গেল। ভারী হয়ে গেল নিঃশ্বাস।

আবার শব্দ। ভি-৮ ইঞ্জিনের মতো যেন চলতে শুরু করল হূিপণ্ড। বনতলে আপনাআপনি দৌড়াতে শুরু করল আমার রিবক জুতো পরা পা দুটো।

প্রাণপণে দৌড়াচ্ছি। প্রতি পদক্ষেপে গতি আরও বাড়ানোর চেষ্টা করছি। কিন্তু পিছনে অনুসরণ করে আসা পদশব্দকে খসাতে পারছি না। প্রতি মুহূর্তে মনে হচ্ছে, যেকোনো সময় পিছন থেকে সরু, লম্বা কতগুলো আঙুল কিংবা নখরওয়ালা থাবা খামচে ধরবে আমাকে, কিংবা লম্বা লিকলিকে শুঁড় দিয়ে কোমর পেঁচিয়ে ধরবে।

আমি যদি কার্টুনের নাইটক্রলার হতাম, তাহলে টেলিপোর্ট করে চোখের পলকে নিজেকে সরিয়ে নিতে পারতাম এখান থেকে। কিংবা আমার যদি থাকত স্টর্ম-এর ক্ষমতা, বজ রশ্মি ছুড়ে অনুসরণকারীকে বাষ্প বানিয়ে উড়িয়ে দিতে পারতাম।

কেন বাসে করে গেলাম না? গাধার মতো এদিকে এলাম? মনে মনে গালমন্দ করতে লাগলাম নিজেকে।

সেন্ট্রাল অ্যাভেনিউর রকি বিচ মলের দিকে দ্রুত ছুটে চলেছি। সামনে পাতলা হয়ে এল গাছপালা। বনের কিনারে এসে গাছের ফাঁক দিয়ে এমনভাবে ছুড়ে দিলাম দেহটাকে, যেন জালে আটকা পড়া প্রাণী জাল ভেদ করে বেরোতে চাইছি।

বন থেকে বেরোলাম।

যাক, অবশেষে আমি মুক্ত!

গতি কমালাম। তবে মেইন রোডে না ওঠা পর্যন্ত পিছন ফিরে তাকালাম না।

গাছপালা আর কাঁটাঝোপগুলোর ভিতর তন্নতন্ন করে খুঁজল আমার চোখ। কিছুই চোখে পড়ল না। কোনো শুঁড় বেরিয়ে এল না কোনোখান থেকে। গাছের ডাল থেকে নেমে এল না অ্যাসিডঝরা লকলকে জিভ। পাথরের আড়াল থেকে বাড়িয়ে দিল না নখওয়ালা আঁশে ঢাকা থাবা। একটা স্বাভাবিক বন।

মাথা ঝাড়া দিয়ে আপনমনে হাসলাম। ফোঁস ফোঁস করে হাঁপাচ্ছি।

হতচ্ছাড়া ইউএফও-র গল্প আমার মাথা গরম করে দিয়েছিল।

কিন্তু পিছনে ডাল ভাঙার শব্দ তো মিথ্যে নয়। নাকি ভুল শুনেছি? নাহ্, আজকাল আমার কল্পনা খুব বাড়াবাড়ি শুরু করেছে।

রাস্তা ধরে এগিয়ে চললাম। মিস্টার চিবা-কেনের কারাতে ক্লাস শুরু হতে এখনো কয়েক মিনিট বাকি। তাই আমি ‘প্ল্যানেট এক্স’-এর সামনে দাঁড়ালাম। মলের শেষ মাথার মস্ত একটা কমিক বুকের দোকান।

এই দোকানটা আমার সবচেয়ে প্রিয় জায়গা। প্লাস্টিকের কভারে মোড়া কমিক বইয়ে ঠাসা দেয়ালজোড়া বইয়ের তাকগুলোর দিকে তাকালে মনের ভিতরে অদ্ভুত এক ভালো লাগা তৈরি হয়। কিছু তাকে রয়েছে সায়েন্স ফিকশনের পেপারব্যাক বই। ‘আর্ক অ্যাঞ্জেল’ থেকে শুরু করে ‘জ্যাফড বিবলব্রক্স’ পর্যন্ত আধুনিক যত অলীক চরিত্র রয়েছে, সব রয়েছে এখানে।

জায়গাটা আমি ভালোবাসি। বাতাসে নতুন-পুরোনো কাগজের মিশ্র গন্ধ। দেয়ালে লাগানো সায়েন্স ফিকশনের সুপারহিরোদের উজ্জ্বল রঙের পোস্টার। থেকে থেকে মিস্টার জনসনের শুকনো কাশির শব্দ কানে আসে। সেটাও ভালো লাগে। যেন মানিয়ে গেছে জায়গাটার সঙ্গে।

দোকানের মালিক মিস্টার জনসন খুব ভালো মানুষ। তবে তাঁকেও আমার একটা কার্টুন চরিত্র মনে হয়। অনেকটা ‘এলমার ফাড’-এর মতো। সেই একই রকম ময়দার তালের মতো তুলতুলে মুখ, টমেটোর মতো লাল নাক, আর চকচকে গোল টাক।

এ শহরে আমিই একমাত্র কিশোর, যাকে তিনি দোকানের ভিতর ইচ্ছেমতো ঘোরাফেরা করতে দেন। বিরল কমিকের ওপর আমার অসাধারণ জ্ঞানই সম্ভবত আমার প্রতি তাঁকে আগ্রহী করে তুলেছে। পরস্পরের কথা বুঝি আমরা, কমিক নিয়ে আলোচনা করতে ভালোবাসি।

প্রতি সপ্তাহে আমি এখানে আসি, দোকানের ভিতর ঘুরে ঘুরে বই দেখি, মিস্টার জনসনের সঙ্গে আলোচনা করি, আর লোভাতুর চোখে তাকিয়ে থাকি ছাপাখানা থেকে সরাসরি আনা আনকোরা নতুন ‘দ্য এক্স ম্যান-১’ কমিক বইটার দিকে।

রিচি আমাকে মাঝে মাঝেই মনে করিয়ে দেয় : টাকা জমানো শেষ করে ওই কমিক কিনতে কিনতে দেখা যাবে তোমার বয়স অনেক বেড়ে গেছে, তখন আর কমিক পড়তে ভালো লাগবে না; তাছাড়া ততদিনে ওই কমিকের কদরও আর থাকবে না। এখনই তো ওই ধরনের কমিকে পাঠকের আগ্রহ কমে গেছে। এসব কথা আমি জানি। শুনেও চুপ করে থাকি। কারণ, ও জানে না, কিছু কমিক যত পুরোনো হয়, ততই দাম বাড়ে; বিশ বছর পর এই কমিকটার দাম হয়তো দ্বিগুণ হয়ে যাবে।

তবে ‘দ্য এক্স ম্যান-১’-এর প্রতি আমার আগ্রহের বড় কারণ, ওই কমিকের মধ্যেই জন্ম নিয়েছে আমার কল্পিত সব হিরোরা। এর চরিত্রগুলো আমাকে চুম্বকের মতো টানে। আর মিস্টার জনসন সেটা বোঝেন। অন্যান্য দামি সংস্করণগুলোর মতো সেফে নিরাপদ জায়গায় না রেখে সামনের ডিসপ্লেতে রেখে দিয়েছেন বইটা। তাতে, যখনই আসি, তখনই ওটাকে দেখতে পাই আমি।

কিন্তু আজ দেখলাম না।

গেল কোথায়?

ভালো করে তাকালাম।

না, সত্যিই নেই। ওটা রাখার ধাতব স্ট্যান্ডটা শূন্য।

তারমানে বিক্রি করে ফেলেছেন!

মিস্টার জনসন কোথায়?

দোকানের ভিতরে কাউন্টারের দিকে তাকালাম।

এদিকে পিছন করে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি, ‘স্টার ওঅরস’ সিনেমার রোবট সিথ্রিপিও-র কার্ডবোর্ডে তৈরি একটা মডেলের কাছে। তাঁর পাশে বিজনেস স্যুট পরা আরেকজন লোক উঁচু কাউন্টারে বিছানো একটা কমিকের বইয়ের ওপর ঝুঁকে রয়েছে। পাতা উল্টে যাচ্ছে। দূর থেকেও আমার প্রিয় কমিক বুকটা চিনতে এক মুহূর্ত দেরি হলো না।

লোকটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে অদ্ভুত এক অনুভূতি হলো। ভিতর থেকে কে যেন লোকটার ব্যাপারে সতর্ক করে দিতে লাগল আমাকে। কেন, বুঝলাম না।

দেখতে একেবারেই সাধারণ মানুষ মনে হচ্ছে। লম্বা। কালো চুল। গোঁফ। তবু, কে যেন ভিতর থেকে ডেকে বলছে আমাকে, লোকটা ভালো না। হয়তো ওর পাতা ওল্টানোর ঢংটা আমার স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না। উল্টে যাচ্ছে, অথচ একটিবারের জন্য তাকাচ্ছে না ছবিগুলোর দিকে। কমিকে আগ্রহী কেউ ছবির দিকে না তাকিয়ে পারে না। ওর চিবুকের নিচে বাঁধা টাইয়ের নটটাও আমার পছন্দ হচ্ছে না, একপাশে বেশি কাত হয়ে রয়েছে। যেন বেশি তাড়াহুড়ো করে বেঁধেছে।

সোজা কথা, যে জন্যই হোক, লোকটাকে বিপজ্জনক মনে হচ্ছে আমার কাছে।

মিস্টার জনসনের সঙ্গে কথা বলছে লোকটা। কী বলে শোনার জন্য পায়ে পায়ে এগোলাম।

‘সাড়ে চার শ ডলার?’ লোকটা বলল। ‘তাহলে এটাই আপনার শেষ কথা?’

‘হ্যাঁ, এটাই আমার শেষ কথা,’ মিস্টার জনসন বললেন। ‘হয় নিন, নয়তো রেখে যান।’

তেলতেলে হাতের তালু দিয়ে গাল ঘষল লোকটা। ‘বেশ, নেব। তবে আজ সঙ্গে টাকা নেই, কাল আবার আসতে হবে।’

আমার কমিকটা বিক্রি করে দেবেন মিস্টার জনসন?

অসম্ভব!

‘সকাল দশটায় দোকান খুলি,’ মিস্টার জনসন বললেন। ‘আরেকটা কথা, চেক নিই না। নগদে বিক্রি করি।’

বইটা মিস্টার জনসনের হাতে তুলে দিল লোকটা। ‘ভাববেন না। নগদই আনব আমি।’

ভুল কি-না জানি না, লোকটার কণ্ঠটাও রহস্যময় মনে হলো আমার কাছে।

আমার প্রায় গা ঘেঁষে চলে গেল লোকটা। ও পাশ কাটানোর সময় মেরুদণ্ডের মধ্যে শিরশির করে উঠল আমার। অদ্ভুত কিছু রয়েছে লোকটার মধ্যে। আর আমার মধ্যে যেন স্পাইডারম্যানের অস্বাভাবিক ক্ষমতাশালী অনুভূতি তৈরি হয়েছে। সেই অনুভূতিই আমাকে সাবধান করে দিচ্ছে : লোকটার ব্যাপারে সতর্ক থাকো।

সংকল্প নিয়ে ফেললাম, ওই কমিক বুকটা ওকে আমি কিছুতেই কিনতে দেবো না।

‘অ্যাই, রবিন!’ ঘুরে দাঁড়িয়ে আমার দিকে চোখ পড়তে বললেন মিস্টার জনসন। ‘কেমন কাটছে আজকাল? নতুন কিছু পড়লে নাকি?’

‘মিস্টার জনসন, ওর কাছে কমিকটা বেচবেন না, প্লিজ!’ প্রায় ককিয়ে উঠলাম।

‘স্যরি, বয়। ওটার ওপর তোমার নজর আছে, জানি। কিন্তু আমার ব্যবসাটাও তো দেখতে হবে, তা-ই না?’

‘টাকার কথা বলছেন তো? দেবো। কালই টাকা দিয়ে কিনে নিয়ে যাব ওটা। আমাকে কথা দিন, আর কারও কাছে বেচবেন না?’

আমার দিকে একটা মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে হেসে মাথা নাড়লেন মিস্টার জনসন। ‘না, বেচব না। তবে তোমাকে ওই লোকটার আগে আসতে হবে।’

‘আসব,’ আমি বললাম। ‘কোনো সমস্যা নেই। থ্যাংকস, মিস্টার জনসন।’

বললাম বটে সমস্যা নেই, কিন্তু এক রাতের মধ্যে এত টাকা আমি পাব কোথায়?

 

পাঁচ.

চিবা-কেনের কারাতে স্কুলটা মলের অন্যপ্রান্তে। মস্ত একটা জিমনেসিয়াম সাইজের ঘর, দেয়ালজোড়া আয়না, মেঝেতে গাঢ় সবুজ রঙের ম্যাট পাতা, একটা দরজা, আর একদিকে একটা বিশাল জানালা।

হলঘরের রিং ঘিরে সিটের সারি। বাহ, চমত্কার। যে কেউ সামনের সিটে বসে আমার কারাতের কেরামতি উপভোগ করতে পারবে।

স্টুডিওতে ঢুকেই প্রথম যেটা লক্ষ করলাম, এখানকার শিক্ষার্থী অন্য সমস্ত ছেলেদের চেয়ে আমি বয়েসে বড়। ওদের দেখে মনে হচ্ছে, মার্শাল আর্ট শেখার চেয়ে রূপকথার সিনেমা দেখায় বেশি আগ্রহী হবে ওরা।

আর দ্বিতীয়টা হলো, মিস্টার চিবা-কেনের বয়স অনেক। কত, ঠিক অনুমান করা যাচ্ছে না, তবে এক শ-র কাছাকাছি হলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই। আমার সমান লম্বা, ধবধবে সাদা চুল। মুখের চামড়ায় অসংখ্য ভাঁজ, দোমড়ানো কাগজের মতো। কারাতের স্কুল না চালিয়ে বাড়িতে বসে চিনি ছাড়া চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে ডিটেকটিভ গল্পের সিনেমা দেখলেই বেশি মানাত।

‘এসো, এসো,’ আমাকে দেখেই বলে উঠলেন মিস্টার চিবা-কেন। ‘মিলফোর্ডের ছেলে তুমি, তা-ই না? আমাদের ক্লাসে তোমাকে স্বাগতম।’

সামান্য মাথা নুইয়ে আমাকে বাউ করলেন তিনি, তারপর একটা পোশাক বাড়িয়ে দিলেন, অন্য ছেলেগুলো যে ধরনের পোশাক পরেছে, সেরকম। সাদা সুতির জ্যাকেট, ঢোলা পাজামা আর সাদা সুতোয় বোনা বেল্ট। সবারই খালি পা। জুতো কিংবা স্যান্ডেল পরে ম্যাটে ওঠা নিষেধ।

কাপড় বদলানোর জন্য বাথরুমে ঢুকলাম। বেরিয়ে এসে চারপাশের আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব দেখলাম। পাজামাটা অতিরিক্ত ঢোলা। অদ্ভুত দেখাচ্ছে আমার হালকা-পাতলা শরীরে। একসারি নিনজা টার্টল মার্কা স্নিকারের পাশে রেখে দিলাম আমার জুতোজোড়া।

‘কোন ক্লাসে পড়ো, খোকা?’ পাশে দাঁড়ানো একটা ছেলেকে জিজ্ঞেস করলাম। শূন্য চোখে আমার দিকে তাকিয়ে থেকে জবাব না দিয়ে অন্যদের কাছে চলে গেল ও। আজকালকার বাচ্চারা ভদ্রতা জানে না, দুঃখের সঙ্গে ভাবলাম।

মিস্টার চিবা-কেনের নির্দেশে হেঁটে গিয়ে ম্যাটের ওপর বাচ্চাগুলোর সঙ্গে সারি দিয়ে দাঁড়ালাম ।

‘আরে দেখো দেখো! ফিডারখাওয়া শিশুদের সঙ্গে লড়াই করতে কে এসেছে, দেখে যাও! হা হা হা!’ জানালার কাছ থেকে শোনা গেল পরিচিত চিত্কার।

দমে গেলাম। একেবারে দমে গেলাম। আমার দুর্ভাগ্যই যেন কাকতালীয়ভাবে এখানে টেনে এনেছে জনি ড্রিলম্যানের দুই চামচাকে। বড় জানালাটা দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে ওরা। কাচে নাক চেপে ধরায় নাকমুখ চেপ্টে গিয়ে বিকৃত, কুিসত দেখাচ্ছে চেহারা। খোলা দরজা দিয়ে ভেসে আসছে ওদের হাসি।

বাচ্চাদের আড়ালে লুকানোর চেষ্টা করলাম। কিন্তু পারলাম না। সবাই আমার তুলনায় এত ছোট, ওদের মাঝখানে আমাকে টাওয়ারের মতো লাগছে। শেষ পর্যন্ত এমন একটা জায়গায় এসেছি, যেখানে সবার চেয়ে আমি বড়—আর সেটাই হয়েছে কাল। শরীরটাকে যথাসম্ভব কুঁকড়ে নিয়েও ওদের চেয়ে নিচু হতে পারছি না।

সারি দিয়ে জানালার দিকে মুখ করে দাঁড়ানো ছেলের দল ডিক ও হ্যারির দিকে নজর দিচ্ছে না। হঠাত্ একটা ভয়ানক ভাবনা খেলে গেল মনে। যদি এমন হয়, ওই বাচ্চাদের কারও সঙ্গে আমাকে লড়াই করতে বলেন মিস্টার চিবা-কেন, আর আমাকে হারিয়ে দেয় ও, তাহলে আত্মহত্যা করা ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না আমার।

কী করা যায়? বিকল্প কিছু ভেবে বের করার আগেই আমাদের সামনে এসে দাঁড়ালেন মিস্টার চিবা-কেন। বাউ করলেন—ক্লাস শুরু হওয়ার ইঙ্গিত। জবাবে ছাত্ররাও বাউ করল।

‘নিজের চারপাশের শক্তিকে অনুভব করো,’ তিনি বললেন, স্টার ওঅরসের ওবি-ওয়্যান কেনোবির মতো মনে হলো তাঁকে। ‘প্রকৃতির শক্তিকে কাজে লাগাও।’

সবাই একসঙ্গে হাত ঘুরিয়ে, এক পা উঁচু করে লাথি মারার মতো সামনে ছুড়ে দিয়ে হুউউ হুউউ চেঁচাতে লাগল। কিম্ভূত নাচ জুড়েছে যেন সবাই। যতক্ষণ পারলাম, সবার সঙ্গে তাল মেলালাম।

পাগলের মতো হাসছে জনির বন্ধুরা।

কেউ লক্ষ করছে না সেটা, মিস্টার চিবা-কেনও না। জানালার বাইরে দাঁড়ানো দর্শকদের দেখে দেখে অভ্যস্ত হয়ে গেছেন বোধহয়।

‘প্রকৃতির শক্তিকে অনুসরণ করো,’ মিস্টার চিবা-কেন বললেন।

মসৃণ ভঙ্গিতে হাত-পা ছোড়া চলতে থাকল, অন্যদের তুলনায় আমার নড়াচড়া আড়ষ্ট।

এই বাচ্চাগুলো কতখানি গুরুত্ব দিয়ে কারাতে শিখছে, দেখে মুগ্ধ হলাম। কেউ কথা বলছে না, হাসছে না, চর্চায় ফাঁকি দিচ্ছে না।

ওদের দেখে শিক্ষা নেয়া দরকার দুই চামচার, আমার মনে হলো। হয়তো এই বাচ্চারাই দু-চারটে শিক্ষা দিয়ে আসতে পারে ওদের।

ছাত্রদের সারির এ-মাথা ও-মাথায় ঘুরছেন মিস্টার চিবা-কেন। শান্তকণ্ঠে নির্দেশ দিচ্ছেন। কোচ হেনরির মতো তর্জন-গর্জন কিংবা উত্তেজিত স্বরে চিত্কার করছেন না।

‘বাঘের মতো হও,’ সুর করে বললেন মিস্টার চিবা-কেন।

নিজের অজান্তেই হাতটা উঁচু হয়ে গেল আমার। হাতের আঙুলগুলো সোজা রেখে সবার সঙ্গে সুর মেলালাম, ‘ওরা সাংঘাতিক!’

‘বাজের মতো হও।’

কী বোঝাতে চাইছেন তিনি? দুই হাত ডানার মতো ছড়িয়ে নাচাব?

‘ড্রাগনের মতো হও।’

তা-ই? মনে হলো, মুখ দিয়ে আগুন ছোড়া শিখতে পারলে সত্যিই একটা কাজের কাজ হতো।

‘বানরের মতো হও।’

নাহ্, হাসিয়েই মারল। বানরের মতো হয়ে কী করব? লাফাব?

অবশেষে প্রথম পর্ব শেষ হলো। চুপ করে দাঁড়ালাম আমরা।

‘এখন,’ মিস্টার চিবা-কেন বললেন, ‘খালি হাতের ক্ষমতা দেখাব আমরা।’

‘ইইইআআআহ্!’ সমস্বরে চিত্কার করে উঠল সমস্ত ক্লাস। এতটাই চমকে গেলাম, মনে হলো ঢোলা পোশাকের ভিতর থেকে লাফিয়ে বেরিয়ে যাবে আমার দেহটা।

গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে বাতাসে ঘুষি মারতে লাগল ছেলেগুলো। শূন্যে লাফিয়ে উঠছে ওদের পা, একই সঙ্গে মগজ-কাঁপানো চিত্কার করে চলেছে।

ইইইআআআহ্! ইইইআআআহ্!

কল্পনাই করতে পারিনি খুদে এই কারাতে শিক্ষার্থীরা এতটা ক্ষিপ্র। ওদের অনুকরণ করার সাধ্যমতো চেষ্টা করতে লাগলাম। তবে বাইরে থেকে আসা জনির বন্ধুদের হাসির শব্দই বুঝিয়ে দিল, আমার নাচাকোঁদা কতটা হাস্যকর লাগছে।

হায়রে আমার জন্মদিনের উপহার। আমার সবচেয়ে বড় শত্রুদের সামনে একটা ঘন্টা ধরে অসহ্য মানসিক যন্ত্রণা দিয়ে আমাকে হেনস্থা করে ছাগল বানানো হলো। কোথায় ‘দ্য এক্স ম্যান’ ফার্স্ট এডিশন কমিক বুক আর কোথায় কারাতে শেখা।

এ সময় বুদ্ধিটা মাথায় এল আমার। ক্লাসের পর কোনো একটা কৈফিয়ত দিয়ে আমার টাকাটা ফেরত চাইব মিস্টার চিবা-কেনের কাছে, কারাতে শেখার ফি হিসেবে যেটা দিয়ে গেছে বাবা। তাতে করে মিস্টার জনসনের কমিক বুকের টাকা জোগাড় হয়ে যাবে। বাবা শুনলে প্রচণ্ড খেপে যাবে আমার ওপর, জানি, তবে আশা করি তাকে বোঝাতে পারব।

এটাই হবে আমার প্রথম এবং শেষ কারাতে ক্লাস। খালি হাতে আত্মরক্ষা শেখার কোনো তাগিদ নেই আমার। তবে ক্লাস শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। তাই, যতখানি পারলাম, সবার সঙ্গে চর্চা চালিয়ে গেলাম।

কারাতে ক্লাসে আমার মন নেই, বুঝতে পারলেন মিস্টার চিবা-কেন। হাত নেড়ে ডাকলেন।

‘আঘাত করার সময় চিত্কার করবে,’ আমি তাঁর কাছে গেলে বললেন। ‘মুখ দিয়ে শব্দ বেরোবে, একই সঙ্গে হাত চলবে। করো আবার। জোরে চিত্কার দিয়ে ঘুষি মারো।’

উহ্, কী যন্ত্রণা!

‘ইয়াহু!’ চেঁচিয়ে উঠে সামনে হাত ছুড়লাম।

‘হয়নি। এত দুর্বল গলায় নয়। এভাবে। ইইইআআআহ্! করো, করো।’

‘ইয়া।’

‘হলো না। ঠিক এখান থেকে শব্দটা বের করে আনো,’ আমার পেটে আঙুল দিয়ে গুঁতো দিলেন তিনি। ‘ইইইআআআহ্!’

‘ইআআহ্!’

‘গুড। অনেকটা ভালো হয়েছে।’

এ সময় দুজন তাগড়া জোয়ান লোক ঘরে ঢুকল। আমাদের মতো একই ধরনের পোশাক পরেছে। তবে কোমরের বেল্ট কালো রঙের। ওদের দিকে তাকিয়ে মাথা ঝাঁকালেন মিস্টার চিবা-কেন। চলে গেল লোকগুলো। আবার ফিরে এল বড় একটা ইট নিয়ে। মিস্টার চিবা-কেনের পাশে একটা কাঠের টুকরোর ওপর নামিয়ে রাখল।

মনে হলো, শক্তির পরীক্ষা নেয়া হবে। হয়তো হাতের এক পাশ দিয়ে কোপ মেরে ভেঙে ফেলা হবে ইটটা।

হাততালি দিলেন মিস্টার চিবা-কেন। সঙ্গে সঙ্গে চর্চা থামিয়ে ম্যাটে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল ছাত্ররা।

‘ব্রুস লি’র গল্প শোনাবে নাকি বাচ্চাগুলোকে!’ জনির এক চামচা চেঁচিয়ে বলল।

উহ্, এখনো এখানে রয়েছে! যায় না কেন?

আমার চারপাশে বসা খুদে কারাতিদের মুখের দিকে তাকালাম। এই যে এতসব কাণ্ড করছে ওরা, সত্যি কি এতে কোনো উপকার হবে? জনি ড্রিলম্যানের মতো শয়তানদের হাত থেকে নিজেদের বাঁচাতে শিখতে পারবে?

তবে পারবে কি না পরীক্ষা করে দেখতে চাই না। আমার চেয়ে অন্তত পাঁচ বছর কম বয়সী একটা বাচ্চা আমাকে কারাতের প্যাঁচ মেরে ম্যাটে আছড়ে ফেলুক, দুঃস্বপ্নেও চাই না এটা।

যদি কারও সঙ্গে লড়াইয়ের প্র্যাকটিস করতেই হয় এখানে, মিস্টার চিবা-কেনের সঙ্গে করব। হয়তো একমাত্র ওই বুড়ো মানুষটাকেই আমি হারাতে পারব।

‘সাপের মতো হও,’ সুর করে বললেন বুড়ো। বুড়ো হাতটাকে লড়াইয়ের ভঙ্গিতে বাড়িয়ে ধরলেন তিনি। ‘চুপচাপ থাকো। সংযত রাখো নিজেকে। তারপর সুযোগ বুঝে ছোবল হানো।’

আচমকা বিদ্যুত্গতিতে জুতোহীন একটা পা বাড়িয়ে আঘাত হানলেন ইটের গায়ে। চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেল ইটটা।

নাহ্, মিস্টার চিবা-কেনের সঙ্গে লাগতে যাওয়ার ভাবনাটা আমার কল্পনাতেও আনা উচিত না। হাড়গোড় সব গুঁড়ো করে দেবেন। সিদ্ধান্ত নিলাম, কারাতে বিদ্যা শেখা আমার কর্ম নয়, তাতে ইস্তফা দেয়াই ভালো।

*

‘মিস্টার চিবা-কেন, আপনার সঙ্গে একটু কথা বলতে পারি?’ ক্লাসের শেষে জিজ্ঞেস করলাম। ‘আমার একটা সমস্যা হয়েছে। স্কুলের ক্লাস সেরে কারাতে শিখতে আসার সময় বের করা আমার জন্য কঠিন। তাছাড়া হাঁটুতে ব্যথা পেয়েছি। আপনি কি আমার ফি’র টাকাটা ফেরত দেবেন?’

‘হ্যাঁ,’ একটুও অবাক না হয়ে জবাব দিলেন তিনি। ‘এসো আমার সঙ্গে।’ যেন একদিনেই তিনি বুঝে গেছেন, আমাকে দিয়ে কারাতে শেখা হবে না। ভালোই হলো। বেশি ব্যাখ্যা করতে হলো না আমাকে।

ঘরের কোণের লম্বা একটা টেবিলের কাছে আমাকে নিয়ে এলেন। ছোট একটা ধাতব বাক্স খুলে এক তাড়া বিশ ডলারের নোট বের করে গুণতে আরম্ভ করলেন।

আমার বাড়ানো হাতের তালুতে টাকাগুলো রাখতে গিয়ে থেমে গেলেন হঠাত্। আমার হাতটা তুলে নিয়ে তীক্ষ দৃষ্টিতে দেখতে লাগলেন। গম্ভীর হয়ে গেছেন। তার সদাহাস্যময় মুখে হাসির জায়গায় ঠাঁই নিল উদ্বেগ।

কী করেছি আমি?

‘এসো আমার সঙ্গে,’ অবশেষে আমার হাতটা ছেড়ে দিয়ে বললেন তিনি। বুঝলাম, তর্ক করে লাভ নেই।

কাচ লাগানো একটা দরজা দিয়ে আমাকে আরেকটা ঘরে নিয়ে এলেন তিনি। ভিতরে, নয়-দশজন লোক কারাতে লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। অবিশ্বাস্য গতিতে ওরা হাত ঘোরাচ্ছে, পা ছুড়ছে, লাফিয়ে উঠছে, আর এত জোরে চিত্কার করছে, ঘরের মেঝে কাঁপিয়ে দিচ্ছে।

দলটার সামনে দাঁড়িয়ে আছে একজন পেশিবহুল লোক। চিনতে পারলাম। ইট বয়ে নিয়ে গিয়েছিল যে দুজন, এই লোকটা তাদের একজন। তার পিছনে দেয়ালে ঝোলানো রয়েছে বিচিত্র সব অস্ত্র।

‘ও আমার ছেলে, সুমু,’ লোকটার দিকে এগোতে এগোতে মিস্টার চিবা-কেন বললেন।

আমার দিকে ঘুরে মার্জিত ভঙ্গিতে বাউ করল সুমু। আমিও বাউ করে জবাব দিলাম।

‘সুমু কারাতের মাস্টার,’ মিস্টার চিবা-কেন বললেন আমাকে। ‘ব্ল্যাক-বেল্টের ক্লাস নিচ্ছে।’

নিচুস্বরে ছেলেকে কিছু বললেন মিস্টার চিবা-কেন। ভয়াবহ চিত্কারের মধ্যে কী বলছেন তিনি, শুনতে পেলাম না। তারপর সুমু চিত্কার করে নির্দেশ দিল তার ছাত্রদের, এক কোণে রাখা মস্ত একটা ঘণ্টা বাজাল। মুহূর্তে থেমে গেল লড়াই। প্রথমে পরস্পরকে বাউ করে, তারপর মিস্টার চিবা-কেন ও সুমুকে বাউ করে, বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।

‘তোমাকে একটা প্রস্তাব দেবো, রবিন,’ আমার দিকে তাকিয়ে মিস্টার চিবা-কেন বললেন, ‘তোমার টাকা যদি ফেরত চাও, সুমুর সঙ্গে ফাইট করতে হবে।’

‘কী?’ শব্দটা যেন ছিটকে বেরিয়ে গেল আমার মুখ থেকে।

মনে হলো, ঠিকমতো শুনিনি! কিংবা আমি কারাতের ক্লাস করতে চাই না শুনে অপমানিত হয়েছেন মিস্টার চিবা-কেন। তবে তারজন্য এতটা শাস্তি দেবেন, আশা করিনি।

বিশ্বাস করতে পারছি না।

অপেক্ষা করতে লাগলাম। হয়তো এখনই হেসে উঠে বলবেন, ‘তোমার সঙ্গে রসিকতা করেছি।’

কিন্তু হাসলেন না তিনি। ছেলের হাত থেকে ঘণ্টা বাজানোর দণ্ডটা নিলেন। দুই হাত সামনে বাড়িয়ে লড়াইয়ের ভঙ্গিতে দাঁড়াল সুমু। ওদের মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝলাম, রসিকতা করছে না দুজনের কেউই।

‘মিস্টার চিবা-কেন, আমি ওঁর সঙ্গে ফাইট করতে পারব না।’

আমার দিকে এমন ভঙ্গিতে তাকিয়ে রইলেন তিনি, যেন আমি দুর্বোধ্য কিছু বলেছি। কোনো সন্দেহ রইল না আমার, দুটো বদ্ধ পাগলের পাল্লায় পড়েছি।

‘হ্যাঁ, মিস্টার চিবা-কেন,’ যতটা সম্ভব ধীরে আর স্পষ্টভাবে তাঁকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম, ‘সুমু একজন বড় মানুষ আর খুব ভালো কারাত জানেন, তা-ই তো? আর আমাকে দেখুন, তেরো বছরের একজন কিশোর, শরীরে হাড্ডিগুলো ছাড়া কিছুই নেই। তাঁর সঙ্গে আমার কোনো তুলনাই চলে না, ফাইট করা তো দূরের কথা।’

পাথরের মতো কঠিন হয়ে গেছে মিস্টার চিবা-কেনের মুখ।

‘তাছাড়া তাড়াতাড়ি আমাকে বাড়ি যেতে হবে।’

কোনো প্রতিক্রিয়া নেই তাঁর।

‘বেশ, টাকাটা এখন দিতে যদি অসুবিধে হয়, পরে একসময় এসে নিয়ে যাব। মলে প্রায়ই আসি অমি। কমিক বুকের দোকানটাতে... ’

‘টাকার কথা ভাবছি না আমি। আসলে সত্যিটা জানতে চাই!’ গম্ভীর স্বরে বললেন মিস্টার চিবা-কেন। ‘সুমুর সঙ্গে তোমাকে ফাইট করতে হবে। তোমার ক্ষমতা প্রমাণ করতে হবে। তারপর জেতো বা হারো, তোমার টাকা তুমি পেয়ে যাবে।’

বুঝলাম। আসলে আমার পরীক্ষা নিতে চান মিস্টার চিবা-কেন। কারাতে শেখার যোগ্যতা আমার আছে কি-না। না থাকলে টাকাটা দিয়ে বের করে দেবেন। আর তা না হলে, সুমু যদি সত্যিই আমার সঙ্গে লড়াই করে, ধরেই নেয়া যায় আমার শরীরে একটা হাড়ও আর আস্ত নেই, স্ট্রেচারে করে আমাকে বের করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে হাসপাতালে। তখন আমার টাকা ফেরত দিলেই কী, আর না দিলেই কী।

‘ঠিক আছে,’ আর কোনো উপায় না দেখে মিন মিন করে বলে সুমুর পেশিবহুল বাহুর দিকে তাকালাম।

‘গুড। পজিশন নাও। ঘণ্টা বাজলে শুরু করবে।’

কয়েক পা পিছিয়ে গিয়ে ঘণ্টায় বাড়ি দিলেন মিস্টার চিবা-কেন।

 

ছয়.

‘ইইইআআআহ্!’

চোখের পলকে লাফ দিয়ে আমার সামনে চলে এল সুমু। হাত-পা ছুড়ে আমাকে আঘাত হানার চেষ্টা করল।

পিছিয়ে আসতে গিয়ে কীসে যেন পা আটকে গিয়ে উল্টে পড়লাম।

‘নিজের সহজাত প্রবৃত্তিকে কাজে লাগাও!’ চেঁচিয়ে বললেন মিস্টার সুমু।

কিন্তু সহজাত প্রবৃত্তি আর পাব কোথায়? ওটা তো পালিয়েছে আমাকে ছেড়ে।

‘তোমার অতীত ট্রেনিংয়ের কথা মনে করো,’ হাল ছাড়তে রাজি নন মিস্টার চিবা-কেন। ‘তোমার ভিতরের জন্তুটাকে বের করে আনো!’

ঠিক। ঠিক। সিংহ হও। সিংহের মতো সাহসী। চিতাবাঘের মতো ক্ষিপ্র। হও। হও। হও। কে যেন কথা বলে উঠল আমার ভিতরে। আপনাআপনি নিজের মগজে খেলে যাচ্ছে কথাগুলো।

আক্রমণের ভঙ্গিতে দুই হাত সামনে বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে সুমু। আমার উঠে দাঁড়ানোর অপেক্ষা করছে।

আমি জানি না, আমি কী করছি।

যেই উঠে দাঁড়ালাম, বিদ্যুেবগে তার একটা পা উড়ে এসে আমার মাথার পাশে আঘাত করল।

আবার পড়ে গেলাম।

চোখের সামনে বনবন করে ঘুরছে ঘরটা। মগজ ব্যথা করছে।

আরে! সুমু তো দেখি সত্যি সত্যি আঘাত করছে আমাকে। আমার সঙ্গে সত্যিকারের লড়াই করছে। এ রকম আর দুটো আঘাত। পলকা কাঠির মতো ভেঙে যাব আমি।

‘তোমার ভিতরের দানবটাকে জাগিয়ে তোলো! ওটার কথা শোনো!’ চিত্কার করে বললেন মিস্টার চিবা-কেন।

মেঝেতে পড়ে মোচড়াচ্ছে আমার শরীর। মনে হচ্ছে বমি হয়ে যাবে। মিস্টার চিবা-কেনের কথাগুলো কানে আসতে আমার অনেক গভীরে কোথায় যেন কী ঘটে গেল।

শক্তিশালী, ভীষণ ক্ষমতাশালী মনে হলো নিজেকে।

সুমুর মুখের দিকে তাকিয়ে আছি। ঠাণ্ডা। শীতল। কোনো ভাবান্তর নেই সে-চেহারায়। আমার ভিতরটা যেন খুলে বেরিয়ে আসতে শুরু করল।

এ ভারি অদ্ভুত। ব্যাখ্যা করে ঠিক বোঝাতে পারব না। মনে হলো, আমার ভিতরের দানবটা সামনে আসছে, আর আসল রবিন চলে যাচ্ছে ওটার পিছনে। হঠাত্ আমার সমস্ত ভয় যেন নিঙড়ে বেরিয়ে গেল। আর কিছু ভাবছি না। অন্তত স্বাভাবিকভাবে আমি যেসব কথা ভাবি।

লাফিয়ে উঠে দাঁড়ালাম। সুমুর মুখোমুখি। সব কিছুই অন্য রকম লাগছে। বিশ্বাস করা কঠিন। মনে হচ্ছে, নিজের দৃষ্টিশক্তি বেড়ে গেছে অনেক গুণ। চওড়া হয়ে গেছে। মুখ না ঘুরিয়েও আমার বাঁয়ে মিস্টার চিবা-কেনকে দেখতে পাচ্ছি এখন। ডানে দরজা। আমার সামনে মাথা তুলে দাঁড়ানো সুমু। এমনকি নিজেকেও দেখতে পাচ্ছি, আমার দেহের সামনের অংশ। হাত সামনে বাড়িয়ে দিয়ে পা বাঁকিয়ে দাঁড়িয়েছি। আশ্চর্য! এভাবে দেখছি কী করে?

হাতের তালু ছড়িয়ে আঙুলগুলো সোজা রেখে লাফ দিল সুমু। ছুরি দিয়ে খোঁচা দেয়ার মতো করে খোঁচা মারতে এল আমার গলায়।

আমার ছড়ানো দৃষ্টিশক্তির সামনে সময় যেন স্থির হয়ে গেল। আমার ভিতরের কোনো নিরাপদ জায়গা থেকে যেন আমার দেহটাকে সুমুর সামনে থেকে সরে যেতে দেখল স্বাভাবিক রবিন। সুমুর বাড়ানো হাতের কব্জি চেপে ধরে মোচড় দিয়ে ওকে আছাড় মেরে ফেলে দিতে দেখল।

না, রসিকতা করছি না। সত্যিই বলছি।

বিড়ালের মতো নিঃশব্দ মসৃণ পায়ে লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল সুমু। আবার এক পা লম্বা করে অন্য পায়ের গোড়ালিতে ভর দিয়ে ঘুরে লাথি চালাল।

ঝট করে মাথা নিচু করে আঘাতটা এড়ালাম। পরক্ষণে ওকে জুডোর প্যাঁচে ছুড়ে ফেললাম আমার মাথার ওপর দিয়ে।

আমার ইম্যাক্স ভিশন দিয়ে পিছনে সুমুকে দেখলাম। লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল, চরকির মতো পাক খেয়ে ঘুরল, আমার দিকে এগোল, হাত দুটো হেলিকপ্টারের পাখার মতো যেন বনবন করে ঘুরছে।

ঘুরে দাঁড়ালাম ওর দিকে।

‘ইইইআআআহ্! ইইইআআআহ্!’ চিত্কার করে উঠল।

ওর ঘুষি আটকে দিলাম। কীভাবে, জানি না।

তারপর, যেই আমার কাছে এল ও, সামনে লাফ দিয়ে পড়ে ওর পেট সই করে লাথি চালালাম।

পাশে সরে গিয়ে লাথি চালাল সুমু। আবার হাত-পা ছুড়তে ছুড়তে এগিয়ে এল আমার দিকে।

ওর প্রতিটি আঘাত হয় আটকে দিচ্ছি, নয়তো এড়িয়ে যাচ্ছি সুকৌশলে। এরই মাঝে সুযোগ পাওয়ামাত্র আঘাত হানছি। তবে আমিও লাগাতে পারছি না। সরে যাচ্ছে ও।

বহুক্ষণ ধরে একইভাবে লড়াই চালিয়ে গেলাম আমরা। দুজনেই দুজনকে পরাস্ত করার চেষ্টা করছি। অতি আশ্চর্য এই ঘটানাটা কীভাবে ঘটছে আমি জানি না। বিশ্বাস করতে পারছে না আমার রবিন-মন।

স্বয়ংক্রিয় ভঙ্গিতে লড়াই করছে আমার দেহটা, মনে হচ্ছে যেন বহুকাল ধরে এ কাজে অভ্যস্ত। অন্ধকার অতীতের কোনো এক সময় যেন ভয়ংকর লড়াইয়ের উপযুক্ত করে প্রোগ্রামিং করে দেয়া হয়েছে দেহটাতে। আপনাআপনি সামনে ছুটে যাচ্ছে আমার হাত-পাগুলো।

‘ভিতরের শক্তিকে খোঁজো! ওটাকে সামনে আসতে বলো!’ চেঁচিয়ে উঠলেন মিস্টার চিবা-কেন। মুখ না ঘুরিয়েও দূরে ঘরের কোণে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম তাঁকে।

আমার এই ক্ষণিকের অমনোযোগিতার সুযোগও কাজে লাগাল সুমু। লাফ দিয়ে সামনে এসে হাতের একপাশ দিয়ে দা চালানোর মতো কারাতে-কোপ মারল আমার গলার পাশে। তীক্ষ ব্যথা বোমার বিস্ফোরণের মতো ছড়িয়ে পড়ল যেন মগজে।

তবে এই ব্যথা আমাকে ক্ষিপ্ত করে তুলল। প্রতিপক্ষকে আঘাত হানার প্রচণ্ড ইচ্ছে তৈরি করল।

চাবুকের মতো পা চালালাম। সুমুর পাঁজরে লাগল লাথিটা।

পিছনে ছিটকে পড়ল ও, ধাক্কা খেল গিয়ে দেয়ালে। হাত বাড়িয়ে কিছু একটা ধরে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করতে গিয়ে হাতে ঠেকল চ্যাপ্টা গোল একটা ধাতব বস্তু, কিনারে করাতের মতো দাঁত।

আমার মাথার ডান পাশ লক্ষ করে যখন অস্ত্রটা ছুড়ল সুমু।

বরফের মতো জমাট বেঁধে যেন দাঁড়িয়ে গেলাম। তীব্র গতিতে আসছে অস্ত্রটা, কিন্তু আমার প্রচণ্ড ক্ষমতাশালী দৃষ্টি দিয়ে স্লো-মোশন ভিডিও ছবির মতো ধীরে ধীরে আসতে দেখলাম ওটাকে।

সময়মতো সরে গেলাম। আমার মাথার পাশ দিয়ে ঘুরতে ঘুরতে চলে গেল জিনিসটা। বাতাসে ওটার শিস কাটার শব্দ কানে এল। তারপর দেয়ালে গেঁথে থ্যাঁক করে উঠল।

ফিরে না তাকিয়েও সুমুর নড়াচড়া লক্ষ করতে পারছি। ওর ছুড়ে দেয়া একই ধরনের আরও দুটো অস্ত্র উড়ে আসতে দেখলাম।

মাথা নিচু করে ও দুটোও এড়িয়ে সুমুর কাছে দৌড়ে এলাম।

‘ইইইআআআহ্!’

পা ঘুরিয়ে আমাকে লক্ষ্য করে লাথি চালাল ও।

‘হাইইইআআআহ্!’

লাথিটা এড়িয়ে আমি ওর কিডনি লক্ষ করে হাতের আঙুলের খোঁচা মারলাম।

ব্যথায় বিকৃত শব্দ বেরিয়ে এল সুমুর মুখ থেকে। দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে পড়ে, সামলে নিয়ে, হাত বাড়িয়ে দেয়ালে ঝোলানো খাপ থেকে বাঁটে অলংকরণ করা একটা ছুরি খুলে ডান হাতে নিয়ে মারতে এল আমাকে।

চার ইঞ্চি লম্বা ফলাটা আমার দিকে বাড়িয়ে খোঁচা মারতেই এমনভাবে লাফ দিয়ে সরে গেলাম, যেন সার্কাসের দড়াবাজিকরের খেলা জানি।

ছুরি উঁচু করে মাথার ওপর তুলে ভয়ানক শক্তিতে বসিয়ে দিতে এল সুমু। ঝট করে এক হাত উঁচু করে আমার বাহুতে ঠেকিয়ে দিলাম ওর কব্জি। অন্য হাতে থাবা মেরে ওর হাত থেকে ছুরিটা ফেলে দিলাম।

খটাং করে মেঝেতে পড়ে পিছলে সরে গেল ছুরিটা। ওটার দিকে তাকিয়ে থেকে আবার অমনোযোগী হলাম, আর সঙ্গে সঙ্গে সুমুর কনুইয়ের গুঁতো খেয়ে উল্টে পড়লাম দেয়ালে।

ঝটকা দিয়ে মাথা সোজা করে, চোখ তুলে তাকাতেই চোখে পড়ল দেয়ালে ঝোলানো একটা লম্বা, বাঁকা ফলাওয়ালা সামুরাই সোর্ড।

কোনো কিছু ভাবলাম না, আপনাআপনি আমার হাতটা উঠে গেল ওপরে, বাঁট ধরে টান দিয়ে খাপ থেকে খুলে আনলাম ভারী তলোয়ারটা। দুই হাতে বাঁট চেপে ধরে লম্বা ফলাটা চালালাম সুমুর একপাশ থেকে।

মনে হলো ঘোরের মধ্যে রয়েছি। কিংবা স্বপ্ন। হাতের মধ্যে বড়ই পরিচিত ঠেকল অস্ত্রটা। যেন কোনো সুদূর অতীতে বহুবার ব্যবহার করেছি আমি এ জিনিসটা। অতি অভিজ্ঞ তলোয়ারবাজ।

তলোয়ারের চোখা মাথাটা বিপজ্জনকভাবে আসতে দেখল সুমু, কয়েক ইঞ্চি দূরে থাকতে ঝাঁপ দিল মেঝেতে, দেহটাকে কুণ্ডলী পাকিয়ে একটা মানব-চাকার মতো গড়াতে গড়াতে এগিয়ে এল আমার হাঁটু লক্ষ করে।

হাঁটুতে লাগার আগেই শূন্যে লাফিয়ে উঠে ওর ওপর দিয়ে পার হয়ে এলাম। চোখের পলকে ঘুরে দাঁড়ালাম।

উল্টো হয়ে গেছে এখন আমাদের পজিশন। সেটা দেখতে গিয়ে যেটুকু সময় নষ্ট করলাম, তাতেই সুযোগ পেয়ে গেল সুমু। দেয়ালে ঝোলানো আরেকটা তলোয়ার টান দিয়ে খুলে নিয়ে ঘুরে দাঁড়াল। শাঁই করে একপাশ থেকে চালাল আমার পেট লক্ষ করে।

তলোয়ার বাড়িয়ে ঠেকালাম।

ধাতুর সঙ্গে ধাতুর আঘাত। ঝনঝন শব্দ। আগুনের ফুলকি ছুটল।

চোখে চোখ আটকে গেল আমাদের।

কয়েকটা মিনিট পাগলের মতো লাফালাফি করলাম আমরা, তলোয়ার বাড়িয়ে সামনে এগোলাম, বাতাসে ফলা চালালাম, পিছিয়ে এলাম, পাক খেয়ে ঘুরছি ঘরের মাঝখানে দুটো রক্তলোলুপ প্রাণীর মতো।

তারপর যেই আমি সুমুকে ঘরের এককোণে নিয়ে গিয়ে কোণঠাসা করে ফেললাম, পাল্টা আঘাত হানল ও। তলোয়ার ঘুরিয়ে এমন করে কোপ মারল আমার তলোয়ারে, ফলায় লেগে হাত থেকে ছুটে গেল তলোয়ারটা, উড়ে গিয়ে পড়ল মেঝেতে।

অসহায় হয়ে পড়লাম।

আতঙ্কে চিত্কার করে উঠল আমার ভিতরের রবিন-অংশটা।

তবে আমার দানব-অংশটা ধমক দিয়ে রবিনকে থামিয়ে দিল।

তারপর যেটা করলাম, রীতিমতো পাগলামি মনে হলো আমার নিজের কাছেই। লাফ দিয়ে পাখির মতো শূন্যে উঠে দেহটাকে পিছনে ছুড়ে দিলাম, বিড়ালের মতো শরীর মুচড়ে কয়েক ফুট দূরে গিয়ে নামলাম। আলতোভাবে মেঝে ছুঁলো আমার পা। ডিসপ্লে ওয়ালে আরেকটা অস্ত্র খুঁজছে আমার সুপারওয়াইড ভিশন। একটা নানচাকু ঝুলতে দেখলাম। তলোয়ার তুলে আমাকে গেঁথে ফেলতে আসছে সুমু।

‘হাইইইআআআহ্!’

লাফ দিয়ে গিয়ে পড়লাম দেয়ালের কাছে। এক টানে নানচাকুটা খুলে নিয়ে অবিশ্বাস্য গতিতে ঘুরে দাঁড়ালাম। জীবনে কখনো নানচাকু স্পর্শ করিনি, কিন্তু ধরে মনে হলো, কতই না পরিচিত। ভাবার সময় নেই। সুমুর তলোয়ার লক্ষ করে নানচাকু ছুড়লাম।

তারপর আমাদের লড়াই আরও ভয়ংকর হয়ে উঠল। বাতাসে শিস কাটছে তলোয়ারের ফলা। তার জবাব দিচ্ছে নানচাকু। অনন্ত লড়াই শুরু হয়েছে যেন, কোনোদিন থামার নয়।

হঠাত্ তীক্ষ একটা কানফাটা শব্দ বাতাস কাঁপিয়ে দিল যেন, লড়াইয়ের মাঝপথে চুরমার করে দিল আমাদের মনোযোগ।

ঢঅঅঅং! ঢঅঅঅং!

আমাদের পিছনে দাঁড়িয়ে ঘণ্টা বাজাচ্ছেন মিস্টার চিবা-কেন।

হঠাত্ করেই আবার নিজের মাঝে ফিরে এলাম। দানবটা আমার ভিতরে গভীর কোনো জায়গায় ঢুকে গিয়ে যেন সেখান থেকে হামাগুড়ি দিয়ে বেরিয়ে এল আবার রবিন। সুমুও যেন ঘোর থেকে জেগে উঠল।

মেঝেতে পড়ে খট-খটাং শব্দ তুলল আমাদের হাতের অস্ত্র। ধপ করে বসে পড়লাম মেঝেতে। ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত। হাঁপাচ্ছি। আমার অনুভূতিগুলো আবার স্বাভাবিক হয়ে গেছে—কানের ভিতর ভোঁ ভোঁ শব্দ, মাথাটা দপ্ দপ্ করছে; সুপারভিশন আর চিতার ক্ষিপ্রতা দূর হয়ে গিয়ে আবার একটা দুর্বল কিশোরে পরিণত হয়েছি।

কী ঢুকেছিল আমার মধ্যে?

জবাব পেলাম না।

এতই ক্লান্ত হয়ে পড়েছি যে ঠিকমতো ভাবতেও পারছি না।

আমার হাত চেপে ধরে টান দিয়ে মেঝে থেকে তুলে নিল সুমু, বাউ করল সশ্রদ্ধ ভঙ্গিতে। আমিও বাউ করলাম। স্থির হয়ে দাঁড়াতে পারছি না। পা কাঁপছে।

তারপর মিস্টার চিবা-কেন এসে আমার কাঁধে হাত রাখলেন। ‘তুমি একটা স্পেশাল সৃষ্টি,’ এত মোলায়েম আর নিচুস্বরে কথা বললেন তিনি, প্রায় শোনাই যায় না। ‘কোনালির শিষ্য। তোমার গুরুকে আমি চিনি।’

আগের ঘটনাটা যদি অবিশ্বাস্য হয়ে থাকে, এখনকার কথাটা মুণ্ডুঘোরানো। প্রায় তুতলে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী-কী-ক্বী বলছেন? কোন কোনালি? তাঁকে চেনা তো দূরের কথা, নামটাও এই প্রথম শুনলাম।’

স্থির দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন বুড়ো মানুষটি, ভাঁজ পড়া কুঁচকানো চামড়ার ভাঁজের মাঝখানে বসানো চোখ মেলে।

‘যা জানেন, বলুন আমাকে,’ অনুরোধ করলাম। কেঁপে উঠল গলা। ‘পুরো ঘটনাটা আমার জানা দরকার। কোনালি কে?’

জবাব না দিয়ে ঘুরে দাঁড়ালেন মিস্টার চিবা-কেন। দরজা দিয়ে বেরিয়ে চলে গেলেন সামনের ক্লাসরুমে। পিছনে অনুসরণ করে গেল সুমু।

টলতে টলতে আমিও এগোলাম, তবে বড়ই দুর্বল ভঙ্গিতে। অসংখ্য প্রশ্ন ও সন্দেহ ঘুরপাক খাচ্ছে মনে। দ্বিধান্বিত হয়ে পড়েছি। ভীত, উত্তেজিত।

সামনের ক্লাসরুমে এসে আমার জামাকাপড় আর জুতো তুলে নিলাম ।

আস্তে ঘুরে দাঁড়ালেন মিস্টার চিবা-কেন। আমার কাছে এসে দাঁড়ালেন। অনেকগুলো নোট আমার হাতে গুঁজে দিলেন। উদ্বেগভরা দৃষ্টি।

‘ভয়ানক বিপদের মধ্যে রয়েছ তুমি,’ ফিসফিস করে বললেন তিনি। ‘এখন থেকে চুপচাপ লুকিয়ে রেখো নিজেকে, সাপের মতো। সতর্ক থেকো। মনে রেখো, মহাবিপদের মধ্যে রয়েছ তুমি। তোমার দিকে লোকের নজর পড়ে এমন কিছু কোরো না। শোনো, নিজেকে সংযত করে লুকিয়ে রাখতে পারাটাও একটা মহা অস্ত্র।’

তারপর আর কোনো কথা না বলে ছেলেকে নিয়ে ‘প্রাইভেট’ লেখা ছোট অফিস ঘরটায় ঢুকে গেলেন তিনি।

দেয়ালে লাগানো আয়নার ভিতরে নিজেকে দেখলাম। দেখে বোঝার চেষ্টা করলাম, কোথায় আমার পরিবর্তনটা হয়েছে।

কিন্তু সেই পুরোনো রবিনই রয়েছি আমি। পাতলা, রোগাটে শরীর। এই দেহ নিয়ে সুমুর মতো একজন পেশিবহুল কারাতে মাস্টারের সঙ্গে মারামারি করেছি, আয়নায় নিজের দিকে তাকিয়ে বিশ্বাসই হতে চাইল না।

শুনেছি, কেউ যদি মনেপ্রাণে কিছু চায়, সেটা পায়। সত্যিই কি মনের জোরে কমিক বইয়ের হিরোদের মতো ক্ষমতাশালী হয়ে উঠছি?

 

সাত.

আমি বাড়ির সামনের দরজা দিয়ে ঢুকতেই আমার দিকে তাকিয়ে চিত্কার করে উঠল মা।

‘কী হয়েছে রবিন! এত ঘামলে কেন?’ দৌড়ে এল মা। আমার কপালে হাত রেখে জ্বর আছে কি-না দেখল।

অকারণেই কাশি দিলাম। চোখের পাতা নামিয়ে নিলাম।

‘খুব খেটে এসেছ, অ্যাঁ, সন?’ আমার কাঁধে জোরে এক চাপড় মারল বাবা। দিলখোলা হাসি হাসছে।

‘হ্যাঁ, তা খেটেছি,’ জবাব দিলাম।

মা আমার পিছন থেকে ঠেলে নিয়ে চলল ডাইনিং রুমে। ‘এসো, বসে পড়ো টেবিলে। তোমার জন্যে দুশ্চিন্তা হচ্ছিল আমাদের।’

‘হ্যাঁ,’ মা’র কথায় সুর মিলাল বাবা। নিজের চেয়ারে জাঁকিয়ে বসল।

মোটেও খিদে নেই আমার। কেমন শূন্য লাগছে নিজের ভিতরটা। মিস্টার চিবা-কেনের স্কুলে ঘটা ঘটনাগুলো আমাকে এতটাই ক্লান্ত আর অবশ বানিয়ে দিয়েছে, সোজা গিয়ে কোনো নিরাপদ আরামদায়ক জায়গায় শুয়ে ঘুমিয়ে পড়তে ইচ্ছে করছে। মনে হলো, সাপের মতো যদি পাথরের নিচে অন্ধকার ছায়ায় পড়ে থাকতে পারতাম, ভালো হতো।

‘মিস্টার চিবা-কেনের কথা বলো,’ আমার প্লেটে মাখন মাখানো একগাদা গাজর তুলে দিতে দিতে বলল মা। ‘ভালো লেগেছে?’

‘আসলে... আমি কী চাই, তিনি বুঝতে পারেননি।’

‘মানে?’ বাবার প্রশ্ন।

‘অনেক বুড়ো হয়েছেন তো। এক শ বছরের একজন মানুষ।’

‘বয়স হলেই সব মানুষ বুড়িয়ে যায় না, কিংবা অকেজো হয় না।’ গাজরের পাশে ভাতের স্তূপ তৈরি করতে করতে বলল মা। ‘বিশেষ করে মিস্টার চিবা-কেনের মতো মানুষরা।’

‘আমাকে এক অদ্ভুত পরিস্থিতিতে ঠেলে দিয়েছিলেন তিনি। কীভাবে বোঝাব... ইয়ে... উচ্চমানের লড়াই বলা যেতে পারে।’

‘ভালো!’ বাবা বলল। ‘তারমানে তোমাকে তিনি শিখিয়েই ছাড়বেন।’

‘আমাকে সিংহ হতে বললেন। সাপ হতে বললেন।’

‘ভালোই তো,’ মা বলল।

‘কিন্তু মানুষ কি আর জন্তু হতে পারে?’

‘জন্তু হতে বলেননি তিনি,’ বাবা বলল। ‘এসব বলে বোঝাতে চেয়েছেন সিংহের মতো সাহসী আর সাপের মতো নিঃশব্দ, ক্ষিপ্র হও।’

‘রবিন, খাবার তো ছুঁয়েও দেখছ না,’ মা বলল। ‘ঠাণ্ডা হয়ে যাবে যে। খাও।’

প্লেটের দিকে তাকালাম। গাজরের চেহারা পানসে লাগছে। ভাত কেমন থকথকে আঠালো।

এই মুহূর্তে কোনো কিছু চিবোতে পারব কি না সন্দেহ আছে। শুধু খাবারগুলোকেই অখাদ্য মনে হচ্ছে না, মুখের মধ্যে আমার দাঁতের অনুভূতিও অন্য রকম। মাঢ়ী থেকে একধরনের শিরশিরে অনুভূতি চলে যাচ্ছে দাঁতের ডগায়।

‘আমার খিদে নেই, মা,’ কাঁটা চামচটা ঘোরাতে লাগলাম টেবিলের ওপর।

‘বুঝেছি,’ বাবা বলল। ‘ফুটবল খেলার পর আমারও মাঝে মাঝে এমন হতো, ঘণ্টার পর ঘণ্টা খিদে লাগত না।’

মুরগির মাংসের বড় একটা টুকরোয় ঘ্যাঁচ করে কাঁটা চামচ গাঁথল বাবা। কারাতের ক্লাসে যা ঘটেছে সেটা বললে কীভাবে নেবে বাবা, ঠিক বুঝতে পারছি না। বিশ্বাস করবে না জানা কথা। হয়তো আমাকে পাগল ভাববে। তাই বললাম না।

আসলে কী ঘটেছিল আমি নিজেও তো বুঝতে পারছি না। কারাতের একজন ব্ল্যাক বেল্টধারীর সঙ্গে লড়াই করাটা তো আর সোজা ব্যাপার নয়। এত মারামারি কোথায় শিখলাম? কবে? কীভাবে? এতসব মারাত্মক অস্ত্রের ব্যবহারই বা জানলাম কী করে? মনের মধ্যে একটা বিশাল প্রশ্নবোধক চিহ্ন কাঁটা হয়ে রয়েছে।

ভীষণ বিপদের মধ্যে রয়েছি আমি, একথা বলে কী বোঝাতে চেয়েছেন মিস্টার চিবা-কেন?

ব্যাখ্যা খুঁজে বের করা অসম্ভব। ঠিকমতো ভাবতেও পারছি না।

বারবার মগজে প্রতিধ্বনি তুলছে যেন বুড়ো মানুষটার কথাগুলো : ‘তুমি একটা স্পেশাল সৃষ্টি... তোমার গুরু কোনালিকে আমি চিনি...’

‘বাবা, কোনালি নামে কাউকে চেনো?’

ঝনঝন শব্দ হলো!

মা’র হাত থেকে চায়ের কাপটা পিরিচের ওপর পড়ে গেছে। মাংসের টুকরোয় কামড় দিতে গিয়ে মাঝপথে থেমে গেছে বাবার হা। পুরো একটা সেকেন্ড দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে রইল। উদ্বেগে ভরা চোখ। স্তব্ধ হয়ে গেছে।

‘ইয়ে, না,’ অবশেষে নড়েচড়ে উঠল বাবা। মাংসের টুকরোটা প্লেটে রেখে দিল। ‘ওই নাম কোথায় শুনলে?’ বাবার অস্বস্তিবোধটা নজর এড়াল না আমার।

‘মিস্টার চিবা-কেনের কাছে। আমাকে বলল, আমার গুরু নাকি কোনালি।’

অসহায় ভঙ্গিতে পরস্পরের দিকে তাকিয়ে রয়েছে আমার বাবা-মা।

‘ভুল করেছে,’ বাবা বলল।

‘হ্যাঁ, ঠিক,’ লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল মা। ন্যাকড়া দিয়ে টেবিলে পড়া চা মুছতে লাগল। আমার দিকে তাকাল না। ‘বুড়ো মানুষ তো, সব সময় মাথার ঠিক থাকে না, উল্টোপাল্টা কথা বলে। আমার তো মনে হচ্ছে, শিক্ষা দেয়ার ক্ষমতাও এখন আর নেই ওর।’ এঁটো প্লেটগুলো একটার ওপর আরেকটা রাখছে মা। ‘বিধ্বস্ত বানিয়ে ছেড়েছে তোমাকে... মাত্র গেছ ওখানে। এখনই এত খাটানোর দরকারটা কী ছিল?’

‘ওর কাছ থেকে ফি’র টাকাটা ফেরত নিয়ে আসব কি-না ভাবছি,’ বাবা বলল।

‘তোমাকে আর যেতে হবে না, বাবা,’ বাধা দিয়ে বললাম। ‘আমি নিজেই ফেরত চেয়েছিলাম। টাকাটা দিয়ে দিয়েছেন।’

‘ভালো করেছ। ওটা দিয়ে এখন নিজের জন্য পছন্দমতো কিছু কিনে নাও। ওই কারাতে ক্লাস করার তোমার দরকার নেই,’ মা বলল। টেবিল মুছতে মুছতে।

মা আর বাবার পরিবর্তন দেখে, ওদের কথা শুনে রীতিমতো তাক লেগে যাচ্ছে আমার।

‘মা, আমি শুতে যাচ্ছি। শরীর ভালো লাগছে না।’

প্রায় উড়ে এসে মা’র একটা হাতের তালু আমার কপাল চেপে ধরল, আরেকটু হলেই তার হাতের মাখন লাগানোর ছুরির খোঁচা লাগত আমার বাঁ চোখে। ‘অসুস্থ হয়ে পড়লে নাকি? ঘরে যখন ঢুকলে, তখনই দেখে বুঝেছিলাম কিছু একটা হয়েছে। ইস্! কী করল ছেলেটাকে! রোজার, ওই বুড়োর ব্যাপারে তোমার খোঁজ নেয়া উচিত।’

‘শান্ত হও, কোরি। এত চিন্তার কিছু নেই। ঘুমালেই সব ঠিক হয়ে যাবে।’

উঠে দাঁড়িয়ে সিঁড়ির দিকে রওনা হলাম। ফিরে না তাকিয়েও টের পাচ্ছি, ওদের চোখ অনুসরণ করছে আমাকে। দম আটকানো নীরবতা।

কোন কারণে ভয় পাচ্ছে ওরা, আর সেটা বুঝে অবাক লাগছে আমার।

*

ঘুম আসছে না আমার। ঘুমাতে পারছি না। কানে আসছে মা’র তীক্ষ কণ্ঠ আর বাবার তর্জন-গর্জন। নিচতলায় তর্ক করছে দুজনে।

কথাগুলো বোঝা যাচ্ছে না এখান থেকে, তবে এটা বুঝতে পারছি, তর্কটা আমাকে নিয়েই। তাতে কোনো সন্দেহ নেই আমার।

যতই আরাম করে শুচ্ছি, লাভ হচ্ছে না, শান্ত হচ্ছে না আমার শরীর। ঘরটাকে অতি উজ্জ্বল দেখাচ্ছে। গায়ের ওপর তিনটা কম্বল চাপিয়েছি, শীত যাচ্ছে না তাতেও। আর দাঁতের অদ্ভুত শিরশিরানি অনুভূতিটা রয়েই গেছে।

অবশেষে কানে বালিশ চাপা দিয়ে গুটিসুটি হয়ে শোয়ার পর নিদ্রার কোলে ঢলে পড়লাম...

*

লেকের কাছে ফিরে এসেছি আমি। দৌড়াচ্ছি। সমস্ত শরীরটা যেন সীসায় মোড়ানো।

আমার পিছু নিয়েছে কোনো কিছু। পিছনে শোনা যাচ্ছে অদ্ভুত পদশব্দ আর ফোঁসফোঁসানি। গাছপালার ফাঁক দিয়ে ছুটছি। কিন্তু পা এত ভারী, তুলতেও কষ্ট হচ্ছে। মনে হচ্ছে আমি একটা দীর্ঘদিনের ফেলে রাখা মরচে পড়া রোবট।

পিছনের শব্দ বাড়ছে। যে আমাকে তাড়া করেছে, সে দ্রুত এগিয়ে আসছে। পায়ের ওজন ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করছি। কোনোই লাভ হচ্ছে না। যেন অদৃশ্য সীসার সুতো দিয়ে বানানো জালে আটকা পড়েছি।

হঠাত্, কাছেই একটা ঘণ্টা বাজল। সামনে রাস্তার মাথায় দেখা দিলেন মিস্টার চিবা-কেন। হাতে ঘণ্টা বাজানোর দণ্ড। আমার দিকে তাকিয়ে বাউ করে দণ্ডটা তাক করলেন।

মুহূর্তে ছিন্ন হয়ে গেল সীসার জাল। ভার কেটে গেল আমার দেহ থেকে। দৌড়াতে আর অসুবিধে হচ্ছে না।

আমার ঠিক পিছনে চলে এসেছে পদশব্দ। দৌড়ানো থামিয়ে ঘুরে তাকালাম। লম্বা একটা লোককে ছুটে আসতে দেখলাম আমার দিকে। পরনে কালো পোশাক। কালো মাথা হুডে ঢাকা।

চোখের পলকে আমার গায়ের ওপর এসে পড়ল ও। হাত-পা ছুড়তে শুরু করল কারাতে যোদ্ধার মতো। মাথা নুইয়ে, লাফিয়ে সরে গিয়ে, নানাভাবে ওর আঘাত এড়াতে থাকলাম। সুযোগমতো নিজেও পালটা আঘাত হানার চেষ্টা করলাম। টের পাচ্ছি, ক্রমেই নিস্তেজ হয়ে আসছে শরীর।

আবার ঘণ্টার শব্দ শুনলাম। হঠাত্ করেই আবিষ্কার করলাম, শুধু স্পর্শ করেই যেকোনো জিনিসকে মারাত্মক অস্ত্রে রূপান্তরিত করে ফেলতে পারছি আমি। যেমন, ডালকে ছুঁলেই সেটা তলোয়ার হয়ে যাচ্ছে। পাথরকে ছুরি। ওগুলো দিয়ে আঘাত করতে চাইছি কালো হুড পরা রহস্যময় লম্বা লোকটাকে। কিন্তু আশ্চর্য ক্ষিপ্রতায় সহজেই আমার আঘাতগুলোকে এড়িয়ে যাচ্ছে ও।

অনন্তযুদ্ধের পর যেন অবশেষে আমাকে কাবু করে অস্বাভাবিক লম্বা হাত দিয়ে মাটিতে চেপে ধরল লোকটা। ছটফট করে নিজেকে সরানোর চেষ্টা করতে করতে আচমকা হাত বাড়িয়ে ওর হুডের কিনার ধরে টান মেরে ওপরে তুলে দিলাম।

কিন্তু মানুষ নয় ও। বিজাতীয় অচেনা একটা মুখ। চোখ দুটোতে মণি নেই, সাদা অংশ নেই, পুরোটাই কালো। গোল একটা পিরিচের মতো।

*

ঝাঁকি দিয়ে ঘুম ভেঙে গেল। নিজের গোঙানি শুনতে পাচ্ছি। চোখ মেলে দেখি, বাতাসে ঘুষি মারছি।

দেহের সমস্ত পেশি টান টান হয়ে গেছে। মাথা দপ্দপ্ করছে। উঠে বসে আলো জ্বালাতে হাত বাড়িয়ে থেমে গেলাম। কারণ আলোকিতই হয়ে আছে ঘর।

অদ্ভুত দেখাচ্ছে সব কিছু। চারপাশে তাকাতে গিয়ে বুঝলাম, আবার ফিরে এসেছে আমার সুপারভিশন, ২৭০-ডিগ্রি দৃষ্টিশক্তি। মধ্য রাত। ঘরের আলো নিভানো। কিছু কিছু জিনিস থেকে ফসফরাসের মতো অদ্ভুত আভা বেরোতে দেখছি।

কিছুদূরে ডেস্কে রাখা আমার কম্পিউটারের গা থেকে অদ্ভুত নীলচে আলো বিচ্ছুরিত হচ্ছে। অন করা রয়েছে যন্ত্রটা। ঘরের কোণে ঘর গরম রাখার জন্য বসানো রেডিয়েটরটা টেলিভিশনের ছবিহীন স্ক্রিনের মতো ঝিরঝির করে জ্বলছে। নিচে তাকিয়ে, বিছানার বৈদ্যুতিক কম্বলের ভিতরের কয়েলগুলোও দেখতে পাচ্ছি, থিরথির করে কেঁপে কেঁপে যেন জ্বলছে। এমনকি আমার নিজের দেহ থেকেও নীল-সাদা আভা বেরোচ্ছে।

হচ্ছেটা কী? অবাক হয়ে ভাবলাম। এখনো কি স্বপ্ন দেখছি?

টেবিল ল্যাম্পটা জ্বেলে দিলাম।

ঢাকনার ভিতর থেকে আলোটা যেন দপ্ করে জ্বলে পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটাল আমার চোখে। এত উজ্জ্বল লাগল, সইতে না পেরে ঝট করে চোখ সরিয়ে নিলাম। তাড়াতাড়ি নিভিয়ে দিলাম আবার।

নিভে গেছে ল্যাম্প। কিন্তু গরম হয়ে ওঠা বাল্বটা থেকে নীলাভ-সবুজ আভা বেরোতে দেখলাম। যখন ঠাণ্ডা ছিল, তখন আভাটা দেখা যায়নি।

চারপাশে তাকালাম।

হয়তো আবহাওয়ার আজব কোনো পরিবর্তন হয়েছে, কার্টুনের কাহিনির মতো আকাশে লাল মেঘ জমেছে কিংবা হলুদ বৃষ্টি হচ্ছে। কিংবা বাড়ির ইলেকট্রিক ওয়্যারিংয়ে গোলমাল হয়েছে। রাত কি এখন অনেক? রিচিকে ডাকা উচিত হবে? ও হয়তো এ সবের কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারবে।

দরজা খুলে বারান্দায় বেরোলাম। গাঢ় অন্ধকারে হাঁটছি। হঠাত্ নীলচে-সাদা একটা প্রাণী আমার পায়ের কাছ দিয়ে ছুটে চলে গেল। আলোটা যেন ওটার গা থেকে বৈদ্যুতিক আলোর মতো বেরোচ্ছে। প্রাণীটা আমাদের পোষা বিড়াল, জর্ডান।

জোনাকিরা গা থেকে আলো জ্বালায়, জানি। গভীর সাগরের অনেক প্রাণীর গা থেকেও আলো বেরোয়। কিন্তু বিড়ালের গা থেকে আলো বেরোতে দেখা তো দূরের কথা, বেরোয় বলে শুনিওনি কখনো। খুবই অদ্ভুত লাগল।

বিড়ালটার পিছু নিয়ে বারান্দা ধরে এগিয়ে এসে বাথরুমে ঢুকলাম। রাতে বাবা কলের মুখ সামান্য খুলে রাখে, যাতে সারাক্ষণ পানি চোয়ায়, তাতে পাইপের ভিতর পানি স্থির হয়ে থাকে না বলে জমে বরফ হয়ে যায় না।

বাথরুমের আলো জ্বালার জন্য সুইচের দিকে হাত বাড়িয়েও নামিয়ে নিলাম। টেবিল ল্যাম্পটার কথা মনে পড়ল। অতি উজ্জ্বল আলোর দিকে তাকিয়ে চোখের কর্নিয়া পোড়ানোর কোনো মানে হয় না। তাছাড়া, বিড়ালটাই রোমশ একটা মশালের মতো আলো বিকিরণ করছে। সেই আলোয় সব দেখতে পাচ্ছি।

সিংকের দিকে এগোলাম। ঠাণ্ডা, গরম, দুটো কলেরই মুখ খোলা। ঠাণ্ডা পানি পড়ছে, দেখতে না পেলেও জর্ডানের খাওয়ার শব্দ শুনেই বুঝতে পারছি। যে কলটা দিয়ে গরম পানি পড়ছে, সেটার পানি দেখতে পাচ্ছি। নীল লাভার মতো।

বুঝে গেলাম ব্যাপারটা। অন্ধকারে গরম জিনিস দেখতে পায় আমার পরিবর্তিত চোখ। বড়ই অদ্ভুত কাণ্ড! বিশ্বাস করতে পারছি না। বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি, রেডিয়েটর, জর্ডান, গরম পানি... আমার নিজের দেহ—যেগুলোতে উত্তাপ আছে, সবই দেখছি। তারমানে তাপদর্শী ক্ষমতা রয়েছে আমার চোখের।

মেডিসিন ক্যাবিনেটের আয়নায় নিজের দিকে তাকালাম। হ্যাঁ, দেখছি। নীল আভা বেরোচ্ছে আমার গা থেকে। মুখটাকে ভূতুড়ে লাগছে। তবে সবচেয়ে অদ্ভুত হলো চোখ দুটো। স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না মোটেও।

ভালো করে দেখার জন্য চোখ বুজে হাত বাড়িয়ে আলোর সুইচ টিপলাম। আস্তে করে সামান্য ফাঁক করলাম চোখের পাতা। ধীরে ধীরে চোখে সইয়ে নিলাম তীব্র আলো। চোখ মিটমিট করতে করতে আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকালাম। যা দেখলাম, রক্ত যেন জমে গেল আমার শিরার ভিতরে। কোথায় আমার চোখ! তার জায়গায় কালো গোল গোল দুটো ছোট আকারের পিরিচ। মণি নেই। কয়লার মতো কালো। অদ্ভুত ভঙ্গিতে তাকিয়ে আছে আমার দিকে।

না না, এ বাস্তব নয়, স্বপ্ন! চিত্কার করতে গেলাম। স্বর বেরোল না। মাথার ভিতরে দপ্ দপ্ করছে। দম নেয়ার জন্য হাঁসফাঁস করছি।

দুঃস্বপ্নের মধ্যে রয়েছি আমি। তফাত্টা, হলো এই স্বপ্নটা আমি জেগে জেগে দেখছি, ঘুমের মধ্যে নয়।

অসাড় হয়ে গেছে যেন সারা দেহ। নড়ার ক্ষমতা নেই। বিমূঢ় হয়ে তাকিয়ে দেখছি আয়নার ভিতরের ভয়ংকর চেহারাটাকে। নিজেকে আর পৃথিবীর মানুষ মনে হচ্ছে না। তাহলে কোথাকার মানুষ? অচেনা কোনো গ্রহের?

মনের ভিতরে পরিবর্তন শুরু হলো। মিস্টার কোটোর স্কুলে মারামারি বন্ধ করার পর যেমন হয়েছিল। ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করল চোখ দুটো। মণি তৈরি হলো। চারপাশে সাদা। মিনিটখানেকের মধ্যে পুরো স্বাভাবিক হয়ে গেল আমার চোখ। দৃষ্টিশক্তির অস্বাভাবিক ক্ষমতাটাও চলে গেল। তীব্র আলো স্বাভাবিক দেখছি এখন।

চোখেমুখে ঠাণ্ডা পানির ঝাপটা দিলাম। তারপর আলো নিভিয়ে বাথরুম থেকে বেরিয়ে নিজের ঘরে ফিরে চললাম।

নীল আলোর আভা উধাও হয়েছে।

হামা দিয়ে বিছানায় উঠে চুপচাপ পড়ে রইলাম গাঢ় অন্ধকারে।

ভয়ংকর সব ভাবনা চলেছে মগজে। আমার শরীরটা কী দিয়ে তৈরি? আমি কি আসলে মানুষ, না কোনো ধরনের রোবট?

 

আট.

পরদিন খুব সকালে ঘুম থেকে উঠলাম। সব কিছু স্বাভাবিক লাগছে আবার। আগের রাতের সমস্ত ঘটনা এখন অবাস্তব মনে হচ্ছে।

বাইরে রোদ ঝলমলে দিন। তাছাড়া শনিবার। কিছু নিয়মিত কাজ করি এদিন।

প্রথমে চকোলেট দেয়া পপ-টার্ট আর দুধ দিয়ে তাড়াহুড়া করে নাস্তা সেরে, কয়েকটা গেম কার্ট্রিজ পকেটে পুরে, রিচিদের বাড়িতে ছুটি। সেখানে কিছুক্ষণ ভিডিও গেম খেলি। তারপর টেলিভিশনে আমাদের প্রিয় সিরিজ শুরু হয়। কোনোদিন ‘স্পাইডারম্যান’, কোনোদিন ‘দ্য এক্স ম্যান’, আবার কোনোদিন ‘সুপারম্যান’।

ছবিগুলো পুনঃপ্রচার করা হলে আর দেখি না, তখন ক্লাসিক কোনো কার্টুন দেখি। পাঁচ বছর বয়েসে এসব কার্টুন দেখে খুব মজা পেতাম, এখন আর তেমন পাই না। তা-ও দেখি।

নাস্তা সেরে সাইকেল নিয়ে রিচিদের বাড়ি চললাম। রাতে ভালো ঘুম হয়নি। এত বড় বড় হাই তুলছি, মনে হচ্ছে, চোয়াল ফাঁক হয়ে আটকে যাবে।

‘এসো, রবিন,’ লিভিং রুমে ঢুকতেই আমাকে স্বাগত জানাল রিচি। তারপর নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল, ‘মরার জন্য প্রস্তুত হও।’

ওর পাশে বসে এক সেট কন্ট্রোল তুলে নিলাম। দুশ্চিন্তা ভুলিয়ে দেয়ার জন্য নিনটেনডো গেমের তুলনা নেই। টেলিভিশনের স্ক্রিনে মর্টাল কমব্যাট গেমের ওপেনিং পার্ট চলছে।

‘আজ আর হারাতে পারবে না, রিচি। আজ আমি কেমন যেন হয়ে গেছি,’ বললাম ওকে।

হাসিমুখে আমার দিকে তাকাল রিচি। ‘তা-ই নাকি? বেশ, হারাও।’

শুধু বিজ্ঞানেই যে ওর মগজ খোলে তা নয়, মর্টাল কমব্যাটেও রিচি চ্যাম্পিয়ন। সত্যিই বিস্ময়কর। এই একটি খেলায় কম্পিউটারও ওর সঙ্গে পেরে ওঠে না। আমার জানামতে একটিবারের জন্যও কেউ ওকে হারাতে পারেনি।

যার যার খেলোয়াড় বেছে নিয়ে খেলা শুরু করলাম আমরা।

‘দেখি, খাও তো আমার প্লেয়ারটাকে, কেমন পারো!’ আমার খেলোয়াড়ের ওপর মাকড়সার জালের মতো আঠালো জাল ছুড়ে দিল রিচি।

জাল কাটার জন্য ফায়ারবল ছুড়লাম আমি।

সাধারণত যা করে থাকে, তা-ই করল রিচি। তীব্র গতিতে বাতাস ছুড়ে, হাতুড়ি দিয়ে বাড়ি মেরে, টেলিপোর্টিংয়ের সাহায্যে প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়কে কাবু করার চেষ্টা চালাল। ওসবে কাজ না হওয়ায় ওর অ্যানড্রয়ড যোদ্ধাকে দিয়ে আমার সৈনিকের ওপর মিসাইল ছুড়ল।

ঝট করে আমার যোদ্ধাকে সরিয়ে ফেলে ওটাকে দিয়ে কারাতে লাথি চালালাম।

ঠিকই লাগিয়ে দিলাম লাথিটা। অন্যদিন পারতাম না।

লড়াই চলল। জমে উঠল খেলা। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছি না। ধীরে ধীরে জিততে শুরু করেছি। গেমটা বড় বেশি সহজ মনে হচ্ছে আজ আমার কাছে। এর খুঁটিনাটি সব যেন আমার মুখস্থ। রিচি কখন কী করবে বা করতে যাচ্ছে, কী করে যেন আগে থেকেই জেনে যাচ্ছি। যার ফলে ওর যোদ্ধাকে আঘাত করা সহজ হয়ে যাচ্ছে আমার জন্য। দুজনের কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই দেখা গেল ওর এনার্জি বার শক্তি হারিয়ে ফেলেছে। ওর যোদ্ধাকে আমি মেরে ফেললাম।

‘ঘটনাটা কী?’ চেঁচিয়ে উঠল রিচি। ‘কী হয়েছে তোমার আজ? আলাদিনের জাদুর চেরাগ পেলে নাকি?’

‘জানি না!’ মাথা নাড়লাম। ‘হয়তো ঠিকমতো মনোযোগ দিতে পেরেছি আজ। সকালে পপ-টার্ট বেশি খেয়েছি, সেজন্যে মগজটাও বেশি খুলে থাকতে পারে।’

নতুন রাউন্ড শুরু করলাম। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই আমার কারাতে মাস্টার রিচির জাদুকরকে কাবু করে ফেলল।

‘করছটা কী, বলো তো!’ চেঁচিয়ে উঠল রিচি। অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে ও। ‘কে তুমি? আসল রবিনকে কী করেছ?’

হেসে উঠলাম। ভিতরে ভিতরে আমিও অবাক। নিজেকে ঠিক আগের মতো দুর্বল লাগছে না আর। অনেক বেশি ক্ষমতাশালী হয়ে উঠেছি তেরোতম জন্মদিনের দিন থেকেই।

হতাশ ভঙ্গিতে গুঙিয়ে উঠে রাগ করে কন্ট্রোল প্যাড ছুড়ে ফেলে দিল রিচি।

দুই রাউন্ড খেলা হয়েছে। দু’বারই আমি জিতেছি। আমার দুই পয়েন্ট। রিচির শূন্য।

হেরে গিয়ে সহ্য করতে পারছে না ও। আবার প্যাড তুলে নিল। আবার খেলা শুরু করলাম আমরা। তবে এবার আমি ইচ্ছে করেই দেরি করতে লাগলাম। ঝুলিয়ে রাখলাম খেলাটাকে। যেকোনো মুহূর্তে ওর খেলোয়াড়কে মেরে শেষ করে দিতে পারি।

মেজাজ ঠিক রাখতে পারছে না রিচি। আরও রেগে যাচ্ছে।

ওর দিকে তাকিয়ে আছি। ওর চোখ কুঁচকে উঠেছে। কাঁধ শক্ত। সারাক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থেকে গভীর মনোযোগে হিসাব করে চলেছে।

ভুল করছে ও, একটা কণ্ঠ যেন বলে উঠল আমার ভিতর থেকে। শান্ত থাকো। নিজের বোধকে অনুসরণ করো। ও তোমার সঙ্গে কোনোমতেই পারবে না।

আশ্চর্য তো! আমি মিস্টার চিবা-কেনের মতো ভাবছি।

আগের রাতের ঘটনাগুলোর কথা ভাবলাম। পেটের ভিতর একধরনের খামচে ধরা অনুভূতি হলো, ভয় পেলে যা হয়।

‘আচ্ছা, রিচি, তাপ কি চোখে দেখা যায়? এই ধরো, অন্ধকারে গরম কোনো জিনিসের?’

‘হিট-সেনসিং ভিশন?’ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থেকে মাথা ঝাঁকাল ও। ‘একটা সায়েন্স ফিকশন ম্যাগাজিনে পড়েছি। তাপ উত্পাদনকারী কিছু দেখতে চাইলে স্পেশাল গগলস পরতে হয়। সেনাবাহিনীর স্পেশাল ফোর্সের লোকেরা লুকানো শত্রুকে দেখার জন্য এই গগলস ব্যবহার করে।’

‘সত্যি? স্পেশাল গ্লাস দিয়ে দেখা যায়?’

‘যায়। সরীসৃপেরাও তাপ দেখতে পায়। থার্মোএনার্জি দেখার জন্য বিশেষভাবে তৈরি ওদের চোখ। যেহেতু ওরা ঠাণ্ডা রক্তের প্রাণী, দেহ গরম রাখার জন্য তাপ শোষণ করতে হয়, আর সেটা করতে হয় চোখ দিয়েই।’

‘কিন্তু মানুষের কি সেরকম দৃষ্টিশক্তি থাকা সম্ভব? মানে, গগলস ছাড়া খালি চোখে দেখার ক্ষমতা?’

‘না,’ সামান্য অসহিষ্ণু মনে হলো ওকে। ‘যদি তুমি সুপারম্যান না হও। কেন?’

‘না, এমনি। মনে পড়ল হঠাত্, তাই।’

‘নিশ্চয় কমিক বুক পড়ে এসব ভাবনা মাথায় ঢুকেছে। ইস্, তোমাকে নিয়ে আর পারা যায় না! খেলো, খেলো!’ ইজেক্টের ওপর ঝুঁকল ও। ‘ওহেহা, সিনেমার সময় হয়ে গেছে। পুরোনো সুপারম্যান দেখাবে আজ। তারচেয়ে বরং বাগ সিরিজটা দেখি, কি বলো? মার্ভিন দা মার্শান কার্টুনে চরিত্রগুলো কীভাবে মহাকাশে দম নেয়, সেটা নিয়ে গবেষণা করছি আমি। একটা যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা খুঁজে বের করা দরকার।’

দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকালাম। ন’টা-তিরিশ বাজে। ‘সরি। আজ আর বসতে পারছি না। মলে যেতে হবে আমাকে এখুনি।’

‘মল? পরে গেলে হয় না?’

‘না। কমিক-বুকের দোকানটা খোলার সঙ্গে সঙ্গে ঢুকতে হবে আমাকে।’

‘ইস্, আবার সেই কমিক-বুক! তোমাকে নিয়ে আর পারা যায় না!’ একই কথা দ্বিতীয়বার বলল রিচি। ‘কিন্তু এখনো আমার মাথায় ঢুকছে না, কী করে হারালে আমাকে! বিশ্বাস করতে পারছি না!’

উঠে দাঁড়ালাম। রসিকতার ঢঙে হাসলাম, ‘ওই যে বললাম, আজ আমি মহাক্ষমতাশালী হয়ে গেছি। তবে ক্ষমতাটা কী, সেটা তোমার কাছে ফাঁস করছি না। হাহ্ হাহ্!’ দরজার দিকে এগোলাম।

বেরোনোর আগে ফিরে তাকিয়ে দেখলাম, রিচি হাসছে না। চিন্তিত ভঙ্গিতে তাকিয়ে আছে আমার দিকে।

বাইরে বেরিয়ে দরজাটা লাগিয়ে দিলাম। মনে হলো, কোনো কিছুই বাস্তবে ঘটছে না। গভীর এক দুঃস্বপ্নের মধ্যে রয়েছি। আমার এই পরিবর্তন অদ্ভুত এক অস্থিরতার মধ্যে ফেলে দিয়েছে আমাকে।

*

যত দ্রুত সম্ভব প্যাডেল ঘুরিয়ে মলের দিকে চললাম। মিস্টার জনসন দোকান খোলার আগেই ওখানে পৌঁছাতে হবে আমাকে। দেরি করলে হয়তো আমার আগেই এসে সেই রহস্যময় লোকটা কমিকের বইটা কিনে নিয়ে যাবে। কিছুতেই সেটা হতে দেবো না।

হঠাত্ করেই মনে হচ্ছে, জীবনটা বড়ই মধুর। গতকাল মিস্টার চিবা-কেনের ক্লাসে তাঁর ব্ল্যাকবেল্টধারী ছেলের সঙ্গে লড়াই করলাম। আজ রিচিকে মর্টাল কমব্যাট খেলায় হারালাম। তারপর, এখন চলেছি আমার এতকালের স্বপ্ন পূরণ করতে। পকেটে টাকা আছে। অবশেষে ‘দ্য এক্স ম্যান-১’ কমিকটা আমার হবে।

আমাদের এলাকা পেরিয়ে এসে সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউতে পড়লাম। বাইক লেনে ঢুকতেই কথা নেই বার্তা নেই, আচমকা বসে গেল সাইকেলের চাকা। ব্রেক কষে থামালাম।

প্রথমে রাগ, তারপর খুব হতাশ লাগল। মুহূর্ত আগের আনন্দটা উবে গিয়ে তার জায়গায় ঠাঁই নিল উদ্বেগ। সাইকেলটা এখন মল পর্যন্ত ঠেলে নিয়ে যেতে হবে। লোকটা আসার আগে পৌঁছাতে পারব কি-না সন্দেহ।

বইটা নিয়ে গেলে আফসোসের আর সীমা থাকবে না। দুই বছর ধরে আমি ওটা কেনার অপেক্ষায় ছিলাম। নিয়মিত দোকানে গিয়ে বইটা দেখে এসেছি এতটা কাল। আর এখন কি-না...

ভেবে সময় নষ্ট না করে তাড়াতাড়ি সাইকেলটা ঠেলে নিয়ে চললাম। বিশ মিনিট পর মলের পার্কিং লটে ঢুকলাম।

মিস্টার জনসনের ভ্যানটা দেখে দুরুদুরু শুরু হলো বুকের ভিতর।

‘খোদা, দয়া করো আমাকে,’ ফিসফিস করে বললাম। ‘লোকটা যেন আমার আগে চলে না আসে।’

সাইকেলটা তালা দিয়ে রেখে মলের দিকে দৌড়ালাম। বারান্দায় উঠে ছুটে এসে দাঁড়ালাম প্ল্যানেট এক্স-এর সামনে। দোকানের ভিতরে এখনো আলো জ্বালানো হয়নি, স্প্রিং লাগানো শাটার অর্ধেকটা ওপরে তোলা।

এসে গেছি! সময়মতই পৌঁছে গেছি আমি!

পকেট থেকে টাকার তোড়া বের করলাম। কমিক বইটা হাতে নেয়ার জন্য তর সইছে না।

‘মিস্টার জনসন!’ নিচু হয়ে শাটারের ভিতর মাথা ঢুকিয়ে দিয়ে চিত্কার করে বললাম। ‘আমি এসে গেছি। টাকা নিয়ে এসেছি।’

‘গুড। সময়মতোই এসেছ,’ জবাব দিল একটা কণ্ঠ।

মিস্টার জনসনের নয়।

সামনের কাউন্টারের দিকে এগোলাম। আবছামতো দুটো লোককে ক্যাশ রেজিস্ট্রারের কাছে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম। মৃদু আলোয় মিস্টার জনসনকে চিনতে পারলাম।

আমার দিকে ঘুরে তাকিয়ে কুটিল হাসি হাসল দ্বিতীয় লোকটা। কালো গোঁফ, বাঁকা হয়ে থাকা টাই-এর নট।

কালকের সেই লোকটা!

মিস্টার জনসনের কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। কমিকটা না বেচতে অনুরোধ করতে যাচ্ছিলাম, ঠিক এই সময় একটা হাত আমার গলা পেঁচিয়ে ধরল।

লোকটার অন্য হাতে একটা মারাত্মক চেহারার ছুরি। ফলার চোখা মাথাটা আমার পাঁজরে চেপে ধরেছে।

বুঝলাম, লোকটা ডাকাত।

‘দাও, তোমার টাকাগুলো দাও!’ ছুরির চাপ বাড়াল লোকটা।

‘ও যা করতে বলছে, করো, রবিন,’ মিস্টার জনসন বললেন। ‘দিয়ে দাও টাকাগুলো।’

আবছা অন্ধকার চোখে সয়ে এসেছে আমার। দেখলাম, টাকা রাখার ড্রয়ারটা খোলা। পুরো খালি করে ফেলা হয়েছে। মিস্টার জনসনের হাতের সোনার ঘড়িটা নেই। আর কাউন্টারে রাখা বড় একটা চামড়ার ব্যাগ থেকে খুব দামি কয়েকটা কমিক বইয়ের কোণা বেরিয়ে রয়েছে।

ভয় প্রজাপতির ডানা নেড়ে যেন সুড়সুড়ি দিচ্ছে আমার পেটের ভিতর।

ডিসপ্লে কেসটার দিকে তাকালাম।

‘দ্য এক্স ম্যান-১’ বইটা রাখার বেদিটা শূন্য। বুঝলাম অন্য দামি কমিকগুলোর সঙ্গে ওটাও ব্যাগে ভরেছে লোকটা।

আচমকা চিত্কার করে উঠলাম।

ডাকাতটার ওপর লাফিয়ে পড়ে ওকে চিত করে ফেললাম। কল্পনাও করেনি লোকটা, আমি এভাবে আঘাত হানতে পারি। কয়েকটা সেকেন্ড আমার পায়ের কাছে পড়ে রইল ও।

‘রবিন! কী করছ! সাবধান!’ চেঁচিয়ে উঠলেন মিস্টার জনসন।

ঠিক আগের দিনের মতো একটা দানব যেন মাথাচাড়া দিতে শুরু করল আমার ভিতরে। আর আসল আমিটা ঢুকে পড়ল দেহের গোপন কোনো জায়গায়।

আমার বিশেষ দৃষ্টিশক্তি চালু হয়ে গেল। তার সাহায্যে ডাকাতটাকে হাঁচড়ে-পাঁচড়ে উঠে দাঁড়াতে দেখলাম। ছুরিটা আমার দিকে তুলে ধরেছে। ও কাছে আসার আগেই মেঝেতে বিছানো গালিচা ধরে হ্যাঁচকা টান মারলাম। তাল সামলাতে না পেরে উল্টে পড়ে গেল ও। উঠে দাঁড়াল আবার।

আমিও উঠে ওর মুখোমুখি হলাম। আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আতঙ্ক দেখলাম ওর চোখে।

‘তোমার চোখ!’ প্রায় ফিসফিস করে বলল ও।

ধীরে ধীরে আমার কাছ থেকে পিছাতে গিয়ে একটা বুকশেলফে হোঁচট খেল। বেশ কিছু ছোট ছোট শো-পিস বৃষ্টির মতো ঝরে পড়তে লাগল আমাদের ওপর। ফুটবলের সমান একটা বাজপাখির মূর্তি খপ করে ধরে ফেলে ছুড়ে মারলাম ডাকাতটার ছুরি ধরা হাতটাকে লক্ষ করে।

এত জোরে মারলাম, ভারী পাখিটা বুলেটের মতো ছুটে গিয়ে ওটার একটা চোখা ডানা লোকটার জ্যাকেট ভেদ করে ঢুকে গেল পাঁজরে। ব্যথায় আর্তচিত্কার দিয়ে আবার উল্টে পড়ল লোকটা। ছুরিটা ছাড়ল না হাত থেকে।

আক্রমণের ভঙ্গিতে ছুটে গেলাম ওর দিকে।

আমার দিকে তাকাল ও। লাফিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে ছুরি তুলল।

আমার একপাশের পাঁজরে ফলা গেঁথে যাওয়ার তীক্ষ যন্ত্রণা টের পেলাম। মাথার একপাশে প্রচণ্ড বাড়ি লাগল।

তারপর সব অন্ধকার।

 

নয়.

মানুষের চিত্কার-চেঁচামেচি কানে এল। সাইরেন, অ্যাম্বুলেন্সের শব্দ। জোরাল স্বরে কথাবার্তা। আরও নানারকম শব্দ। সব ছাপিয়ে মা’র কান্না কানে এল। জোরে জোরে হুকুম দিচ্ছে বাবা। উজ্জ্বল আলো...

একটা মহিলা কণ্ঠ শোনা গেল, মাথায় জখমের কথা কী যেন বলছেন।

মা’র কথা শুনলাম। কান্নাজড়িত কণ্ঠে কাকে যেন বকাবকি করছে।

মা’র সঙ্গে কথা বলতে ভীষণ ইচ্ছে করল আমার। আমি ভালো আছি, জানাতে চাই। চুপ করাতে চাই, কারণ চেঁচামেচি, কান্নার শব্দ আমার মাথায় লাগছে।

কিন্তু নড়তে পারলাম না। মনে হলো, লোহার চাদর দিয়ে মুড়ে দেয়া হয়েছে আমাকে।

মনে হলো, মারা যাচ্ছি আমি! সেজন্যই এ রকম লাগছে।

এক-এক করে মনে পড়ল সব। ডাকাতি হচ্ছিল। মারামারি করছিলাম। ছুরি... আমাকে ছুরি মারা হয়েছে।

কোনোমতেই মরা চলবে না আমার। বাবা-মা ভীষণ কষ্ট পাবে। তাছাড়া, এখন আমার বেঁচে থাকাটা খুবই জরুরি। মরে গেলে কমিক বুকটার মালিক হতে পারব না। মিস্টার চিবা-কেনের কাছ থেকে অনেক প্রশ্নের জবাব জানা প্রয়োজন। সুমুর সঙ্গে লড়াইয়ের ক্ষমতা কোথায় পেলাম, কী করে মর্টাল কম্ব্যাট গেমের ওস্তাদ হয়ে গেলাম, কোনালি কে, কোথায় থাকেন, তাপদর্শী হয় কীভাবে আমার চোখ, এ রকম অসংখ্য প্রশ্নের জবাব জানতে হবে আমাকে। নইলে মরেও শান্তি পাব না।

‘আমি মরিনি!’ চেঁচিয়ে উঠতে গেলাম। স্পষ্ট হলো না কথাগুলো। ভোঁতা শব্দ বেরোল মুখ থেকে।

অপরিচিত মহিলা কণ্ঠটাকে বলতে শুনলাম, ‘মগজে আঘাত পাওয়াতে ওর কথা স্পষ্ট হচ্ছে না।’

‘ডাক্তার,’ বাবার গলা শুনলাম, ‘ওর হুঁশ ফিরছে।’

মাকে দেখলাম। আমার মুখের ওপর ঝুঁকে এল তার মুখ। বলল, ‘আমরা চলে এসেছি, রবিন। আমি। তোমার বাবা। আর কোনো ভয় নেই তোমার। কথা বলো। কী হয়েছিল, বলো আমাদের।’

‘আমি মরতে চাই না, মা,’ বললাম।

‘না না, তুমি মরবে না!’ সাদা অ্যাপ্রন পরা একজন মহিলার দিকে উদ্বিগ্ন চোখে তাকাল মা।

কাছে এলেন মহিলা। টর্চের আলো ফেললেন আমার চোখে। ‘হ্যালো, রবিন, আমি ডক্টর মিরা মরগান। এখন কোথায় আছো, বলো তো?’

‘জানি না।’

‘তুমি এখন হাসপাতালে। চিন্তা নেই, ভালো হয়ে যাবে। পাঁজরে কিছু কালশিরে, মাথায় একটা বাড়ির দাগ আর খানিকটা জায়গার চামড়া কেটেছে শুধু। এ ছাড়া পুরোপুরি সুস্থ আছো তুমি।’

‘কিন্তু আমাকে ছুরি মারা হয়েছিল।’ দুর্বল কণ্ঠে বলে বিছানায় উঠে বসলাম।

শঙ্কিত দৃষ্টিতে তাকাল আমার দিকে বাবা-মা।

‘না, রবিন, তোমাকে ছুরি মারা হয়নি। তবে মাথায় জোরে একটা বাড়ি খেয়েছ, ব্যস,’ ডাক্তার মরগান বললেন।

আমার বিছানার পাশে এসে দাঁড়াল বাবা। চোখ-মুখ বসে গেছে। ‘তোমার কাছাকাছি কোনো ছুরি পাওয়া যায়নি। মিস্টার জনসনও ছুরির কথা বলেছেন। ঘটনাটা কী ঘটেছিল, খুলে বলো তো।’

‘বললাম তো, আমাকে ছুরি মারা হয়েছিল। এখানে, আমার এ পাশে,’ বলে হাসপাতালের গাউন তুলে বাঁ পাশের পাঁজরের কাছটায় হাত রেখে দেখাতে গেলাম। অবাক হয়ে দেখলাম, বেগুনি একটা গোল কালশিরে ছাড়া আর কোনো কাটাকুটির দাগ নেই।

কী করে এটা সম্ভব? ছুরিটার কথা স্পষ্ট মনে আছে আমার। মনে আছে, ছুরির ফলা আমার জ্যাকেট ভেদ করে শরীরের ভিতর ঢুকে গিয়েছিল। প্রচণ্ড যন্ত্রণা হয়েছিল। তারপর জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলাম। এত তাড়াতাড়ি ক্ষত শুকাল কী করে!

‘আমি মিথ্যে বলছি না,’ জোর দিয়ে বললাম। ‘আমার পরিষ্কার মনে আছে।’

আবার বাবা-মা উদ্বিগ্ন চোখে ডাক্তার মরগানের দিকে তাকাল।

‘মাথায় বাড়ি খেলে অনেক সময় হ্যালুসিনেশন দেখে মানুষ। সাময়িকভাবে সেটাই ঘটেছে ওর মগজে। আজকের রাতটা অন্তত ওকে হাসপাতালে রেখে দেখতে চাই,’ ডাক্তার বললেন।

‘রাতে হাসপাতালে থাকব কেন?’ বাধা দিলাম। ‘আমি তো ভালোই আছি।’

আমার কপালে হাত রাখল মা। ‘রবিন, বাবা, ডাক্তার তোমার ভালোর জন্যই বলছেন। তিনি শিওর হতে চান। একটা রাতই তো শুধু।’

‘মিস্টার মিলফোর্ড,’ ডাক্তার বললেন, ‘হাসপাতালে ভর্তির কাগজপত্রগুলো সই করে দিয়ে যাবেন। আমি পরে এসে আবার রবিনকে দেখে যাব।’ বলে চলে গেলেন তিনি।

‘রবিন,’ বাবা বলল, ‘কমিক-বুক স্টোরে সত্যি সত্যি কী ঘটেছিল, জানতে চাই আমি। মিস্টার জনসনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পুলিশ, স্টোরের ভিডিও মনিটরও দেখেছে। যা দেখেছি, অবিশ্বাস্য লেগেছে।’

‘তুমি কি সত্যি সত্যি ওই ছুরিওয়ালা লোকটার সঙ্গে মারামারি করেছ?’ মা জিজ্ঞেস করল।

‘লোকটা ডাকাতি করে মিস্টার জনসনের টাকা-পয়সা আর কমিক বুক নিয়ে যাচ্ছিল,’ আমি বললাম।

‘আর তুমি তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লে,’ কঠিন হলো বাবার কণ্ঠ। ‘কাজটা ঠিক করনি। ওই লোকটা ছুরি মেরে তোমাকে মেরেও ফেলতে পারত।’

‘তা-ই তো, কপাল ভালো, তাই বেঁচে গেছ,’ বাবার কথায় সুর মেলাল মা।

ছুরিটা আমার বুকে ঢুকেছে। তারপর মুহূর্তে জখমটা মেরামত হয়ে গেছে। কমিকের উলভারিন চরিত্রটার মতো—ভাবলাম।

হাসপাতালের গাউনটা আবার তুলে বেগুনি দাগ হয়ে থাকা জায়গাটা টিপে দেখলাম। সামান্য ব্যথা লাগল। তবে ওখানে ধারাল কিছু ঢুকেছে বলে মনে হলো না।

এখান থেকে বেরোতে হবে আমাকে। মিস্টার চিবা-কেনের সঙ্গে দেখা করে আমার প্রশ্নের জবাব জানতে হবে। নইলে এই রহস্য মাথা খারাপ করে দেবে আমার। ভাবতে ভাবতে পাগল হয়ে যাব।

‘মিস্টার মিলফোর্ড?’ দরজায় মাথা ঢুকিয়ে জিজ্ঞেস করল একজন অল্পবয়সী নার্স। বোধহয় হাই স্কুলে পড়ে, লেখাপড়ার ফাঁকে ফাঁকে হাসপাতালে নার্সের কাজ শেখে। বেশ সুন্দরী ও। কালো চুল। কালো চোখ। নীরস কণ্ঠ, চেহারার সঙ্গে বেমানান। কমিকের মুখোশবিহীন ক্যাটউয়োম্যানের কথা মনে করিয়ে দিল আমাকে।

‘হ্যাঁ,’ বাবা জবাব দিল।

‘কয়েকটা ফর্ম নিয়ে এসেছি, পূরণ করে দিতে হবে।’ বাবার হাতে একটা ক্লিপবোর্ড তুলে দিল মেয়েটা। তারপর আমার দিকে ফিরল।

‘তুমি রবিন?’ নিচুস্বরে জিজ্ঞেস করল ও।

‘অ্যাঁ, ইয়ে, উঁ... ’

‘উঁ-আঁ করছ কেন?’

‘হ্যাঁ, আমি রবিন।’

বিছানার কাছে এসে আমার পাশে একটা মলাটের বাক্স রাখল মেয়েটা। ‘ডেস্কে রেখে যাওয়া হয়েছে এটা। তোমার জন্য।’

‘থ্যাংকস,’ মেয়েটার পটলচেরা চোখের দিকে তাকিয়ে বললাম।

‘ইউ আর ওয়েলকাম। আমার নাম জুলিয়া, জুলিয়া বেকার। তোমার রুমে ডিউটি পড়েছে আমার, তোমার দেখাশোনা করার জন্য। কোনো কিছুর দরকার হলে বিছানার পাশের ওই কমলা বোতামটা টিপবে।’ তারপর ঘুরে দাঁড়িয়ে যেন বাতাসে ভাসতে ভাসতে চলে গেল মেয়েটা।

রাতে হাসপাতালে থাকাটা এখন আর তেমন বিরক্তিকর মনে হলো না আমার কাছে।

‘কে দিয়েছে?’ বাক্সটা দেখিয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করল বাবা।

হাতে নিয়ে দেখলাম। ওপরে আমার নামটা শুধু লেখা। আর কিছু নেই। বুঝতে পারলাম না কিছু।

‘কী জানি,’ জবাব দিলাম।

‘খুলে দেখো,’ মা বলল। ‘তোমার কোনো বন্ধু পাঠিয়েছে হয়তো।’

ওপরের ঢাকনা তুলতেই ছোট একটা সাদা কার্ড পেলাম। তাতে লেখা :

রবিনকে—

অনেক অনেক শুভেচ্ছা আর ধন্যবাদসহ। রবিন, তুমি আমার সুপারহিরো।

— মিস্টার জনসন।

বাক্সের ভিতর থেকে টিস্যু পেপারে মোড়ানো চারকোণা একটা জিনিস বের করে আনলাম। না খুলেও বুঝতে পারলাম, ওটার ভিতরে কী আছে।

খুব সাবধানে ওপরের মোড়ক ছিঁড়ে ভিতরে তাকালাম।

ঝলমলে হাসি নিয়ে যেন আমার দিকে তাকিয়ে রইল বইটা।

‘দ্য এক্স ম্যান-১’!

*

সেদিন অনেক রাতে, অবশেষে কমিকটা পড়ার সুযোগ পেলাম।

বিকেল থেকে অনর্গল কথা বলতে হয়েছে আমাকে। বাবা-মা, ডাক্তার মরগান, পুলিশ অফিসার, সবাই আমাকে দিয়ে কথা বলিয়েছে। শেষমেশ আরেকজন ডাক্তার এসে আমার চোখের সামনে একটা লাল রঙের বলপয়েন্ট পেন ধরে এদিক ওদিক সরিয়ে বার বার জিজ্ঞেস করেছেন কোনদিকে সরছে কলমটা।

ক্লান্ত, বিরক্ত, উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলাম। কেবলই মনে হচ্ছিল, যায় না কেন সবাই। আমার কমিক বইটা পড়তে চাই, প্রতিটি পৃষ্ঠা রসিয়ে রসিয়ে উপভোগ করতে চাই, কিন্তু সুযোগই দিচ্ছিল না ওরা।

যা-ই হোক, জুলিয়া এসে আমাকে বাঁচাল। আমার বিশ্রাম দরকার, বলে, সবাইকে প্রায় জোর করে তাড়াল। মাকে টেনে বের করে নিয়ে গেল বাবা। যাওয়ার সময় কথা দিয়ে গেল মা, ভোরের আলো ফোটার আগেই চলে আসবে। জুলিয়াকে বার বার বলে গেল আমার অবস্থার কোনোরকম হেরফের হলে যেন সঙ্গে সঙ্গে ফোন করে জানায়।

‘ঘুমানোর চেষ্টা করো,’ বলে সুইচ টিপে আলোটা নিভাতে গেল জুলিয়া।

‘না না, নিভিয়ো না, আমি কমিক পড়ব।’

‘ও-কে, মিস্টার হিরো।’ আমাকে মিষ্টি হাসি উপহার দিয়ে নিঃশব্দে বেরিয়ে গেল ও।

ভালোই লাগল আমার। আমাকে হিরো ভাবছে সবাই। হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে গিয়ে একটা আলখেল্লা আর মুখোশ বানিয়ে নিলে কেমন হয়? দুষ্টের দমন আর শিষ্টের পালনের জন্য? দস্যু রবিনহুডের মতো। আধুনিক যান্ত্রিক যুগে অবশ্য রবিনহুড হওয়া কঠিন। ‘কমব্যাট কিড’ হতে পারি। কিংবা ‘এক্স ম্যান’ জাতীয় কিছু।

মিস্টার চিবা-কেনের কথাগুলো মনে পড়ল : ‘এখন থেকে সাপের মতো চুপচাপ লুকিয়ে রেখো নিজেকে। সতর্ক থেকো। মনে রেখো, মহাবিপদের মধ্যে রয়েছ তুমি। তোমার দিকে লোকের নজর পড়ে এমন কিছু কোরো না। শোনো, নিজেকে সংযত করে লুকিয়ে রাখতে পারাটাও একটা বিরাট অস্ত্র।’

কমিকটা তুলে নিলাম। অতি যত্ন করে প্রতিটি পাতা উল্টে চললাম, যাতে পাতাগুলোর সামান্যতম ক্ষতি না হয়, দৃষ্টি দিয়ে যেন শুষে নিতে থাকলাম ছবিগুলোর সৌন্দর্য। এগুলো এখন আমার। একেবারেই আমার! আপাতত আর কিছু পাওয়ার বাসনা নেই আমার। আমি এখন পুরোপুরি সুখী।

হঠাত্ লক্ষ করলাম, হাতের ঘাম লাগছে বইয়ের পাতায়।

সর্বনাশ!

তাড়াতাড়ি বইটা ওটার প্লাস্টিকের কভারে ভরে রাখলাম। হাত ধুয়ে, তোয়ালে দিয়ে ভালমতো মোছার পর আবার খুলব। ততক্ষণ কভারের ভিতরেই থাক।

ঘুম আসছে না। উল্টো দিকের দেয়ালে ব্র্যাকেটে রাখা আছে ছোট একটা টেলিভিশন। সময় কাটানোর জন্য রিমোট টিপে ওটা চালু করলাম। একটা সিনেমা চলছে, দানবের ছবি। শেষ পর্যায়ে চলে এসেছে।

দানবটাকে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে রক্তাক্ত, কাপড়-চোপড় ছেঁড়া, সারা গায়ে কাদামাখা নায়ক-নায়িকা।

লাল একটা কনভার্টিবল গাড়িতে উঠে বসেছে দুজনে। গাড়ি স্টার্ট দিয়েছে নায়ক। হঠাত্ পিছন থেকে ভয়ংকর একটা নখরওয়ালা থাবা এসে ওর শার্ট খামচে ধরল। আবার ফিরে এসেছে দানবটা। মরেনি।

রক্ত পানি করা চিত্কার। তার সঙ্গে বেহালার সুর যেন তীক্ষ বিলাপের মতো বাজছে। আবার কাবু হয়ে যাচ্ছে নায়ক-নায়িকা।

বিরক্ত লাগল। সস্তা এসব হরর ছবির পরিচালকরা দর্শককে খুব বোকা ভাবে। ইচ্ছে করেই নায়ক-নায়িকাকে পিছনের সিটের দিকে তাকাতে দেয়নি। গাড়িতে উঠল, অথচ পিছনে চোখ পড়ল না, এতবড় দানবটাকে দেখল না, এ হতে পারে না। ছবিটাকে লম্বা করার জন্য যেন ইচ্ছে করেই দানবটাকে ওদের চোখে পড়ায়নি পরিচালক।

বোতাম টিপে চ্যানেল বদল করলাম। দশটার সংবাদ শুরু হলো। নিষ্প্রাণ যান্ত্রিক কণ্ঠে রকি বিচবাসীকে ধন্যবাদ জানাল সংবাদ পাঠক।

ধূর!

আবার বোতাম টিপে সরিয়ে দিতে যাব, কথাটা কানে ঢুকতেই বোতামের ওপর স্থির হয়ে গেল আঙুল।

‘প্রিয় দর্শক, আমাদের প্রধান খবরটি শুনে চমকে যাবেন আপনারা,’ ভূমিকা করল সংবাদ পাঠক। ‘বিস্ময়কর এই ঘটনাটি ঘটিয়েছে আমাদেরই শহরের একটা কিশোর ছেলে, খালি হাতে, একা, একটা সশস্ত্র ডাকাতের সঙ্গে লড়াই করে ডাকাতি ঠেকিয়ে দিয়েছে, তারই ভিডিও ফুটেজ দেখাব এখন আপনাদের।’

বলে কী?

হঠাত্ টেলিভিশনের পর্দায় দেখতে পেলাম নিজেকে।

‘তেরো বছর বয়সী রবিন মিলফোর্ড,’ সংবাদ পাঠক পড়ছে, ‘রকি বিচের দা ডেইলি রকি বিচ স্টারের চিফ এডিটর রোজার মিলফোর্ডের ছেলে, আজ সকালে রকি বিচ মলের প্ল্যানেট এক্স কমিক-বুক স্টোরে বই কিনতে ঢুকেছিল। সেখানে দেখে একজন লোক স্টোরের মালিক মিস্টার মরটি জনসনের গায়ে ছুরি ঠেকিয়ে রেখেছে। অস্ত্রধারী লোকটার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে রবিন। চরম দুঃসাহসিক এই ঘটনার দৃশ্য স্টোরের ভিডিও টেপে রেকর্ড হয়ে গিয়েছিল, সেটারই ফুটেজ দেখতে পাবেন এখন।’

স্টোরের মনিটরে ধারণ করা দৃশ্য ফুটল টেলিভিশনের স্ক্রিনে। অল্প আলো আর দূরত্বের কারণে ছবি কিছুটা ঝাপসা হলেও আমাকে চেনা যাচ্ছে। ডাকাতটাকে জুডোর প্যাঁচে ঘুরিয়ে আছাড় মারলাম, ময়দার বস্তার মতো ধড়াস করে পড়ল মেঝেতে, দেখে নিজেরই বিশ্বাস করতে কষ্ট হলো আমার। তারপর ঝিলিক দিয়ে উঠল লোকটার হাতের ছুরির ফলা।

সরে গেল ক্যামেরার চোখ। আবার যখন ফিরে এল, পরের কয়েকটা সেকেন্ড আমাকে বাকহীন করে দিল দৃশ্যটা। ছুরির খোঁচা খেয়ে বেহুঁশ হয়ে যাওয়ার পর কী ঘটেছে জানা ছিল না আমার। এখন দেখলাম। ব্রুস লি কিংবা জ্যাকি চ্যান অভিনীত মুভির দৃশ্য বললেও ভুল হবে না, তফাত্টা শুধু প্রাপ্তবয়স্ক অভিনেতার জায়গায় একজন হালকা-পাতলা কিশোর। ওদের মতোই তীক্ষ চিত্কার দিয়ে পর পর কয়েকটা লাথি আর ঘুষি চালালাম লোকটাকে লক্ষ করে— ওস্তাদি কারাতে মার।

বিস্ময়কর! অবিশ্বাস্য! অদ্ভুত!

হেরে যাচ্ছে লোকটা। টলতে টলতে পিছিয়ে যাচ্ছে। মাথায় প্রচণ্ড এক লাথি মেরে ফেলে দিলাম ওকে।

দুঃখিত, মিস্টার চিবা-কেন—মনে মনে বললাম—আপনার কথা মেনে চলতে পারিনি, লুকিয়ে রাখতে পারিনি নিজেকে, মহা অন্যায় করে ফেলেছি।

ক্যামেরা ফিরে এল সংবাদ পাঠকের ওপর।

‘রবিন আর ডাকাতটাকে রকি বিচ মারসি হসপিটালে চিকিত্সার জন্য নিয়ে যাওয়া হয়েছে। হাসপাতাল সূত্র থেকে জানা গেছে, রবিনের জখম খুবই সামান্য, দ্রুত সেরে উঠছে। সন্দেহজনক লোকটার পরিচয় জানা গেছে, ওর নাম রিকি কলিনস, চুরি-ডাকাতি আর জালিয়াতির অপরাধে তিনটে রাজ্যের পুলিশ ওকে খুঁজছে। দর্শক, এ ব্যাপারে নতুন কিছু জানার সঙ্গে সঙ্গে আপনাদের জানানো হবে।’

অবিশ্বাস্য! বার বার এই একটি শব্দই ব্যবহার করতে হচ্ছে আমাকে, কারণ আর কোনো শব্দ খুঁজে পাচ্ছি না। আমি এখন টেলিভিশন-তারকা হয়ে গেছি। হিরো।

আবার কানে বাজল মিস্টার চিবা-কেনের কথাগুলো :তুমি একটা স্পেশাল সৃষ্টি! ভাবলাম, এখান থেকে বেরিয়ে প্রথমেই যাব তাঁর কাছে। আমি আসলে কে, স্পেশাল করে কারা বানাল, না জানা পর্যন্ত আমার স্বস্তি নেই।

কিন্তু আবার চমকে দিল সংবাদ পাঠক। পরের খবরটা শুনে স্তব্ধ হয়ে গেলাম। বলল, ‘এখন একটি শোক সংবাদ। অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে জানাতে হচ্ছে, রকি বিচের বহুকালের নাগরিক, কারাতে মাস্টার, মিস্টার চিবা-কেন আর নেই। গতরাতে ঘুমের মধ্যে রহস্যময়ভাবে মারা গেছেন তিনি। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ১০০ বছর।’

 

দশ

সোমবার সকালে যখন স্কুলে গেলাম, ভিন্ন লোক মনে হলো নিজেকে। সারা গায়ে লড়াইয়ের ক্ষতচিহ্ন। একটা অতি মূল্যবান, দুষ্প্রাপ্য কমিক বুকের একজন গর্বিত মালিক।

এবং ভীষণ জনপ্রিয়।

বাসে, আমার সিটে এত বেশি ছেলেমেয়ে বসার জন্য ভিড় করে এল, মনে হলো সিটটা ভেঙে পড়বে। সবাই যেন আমার সঙ্গে টেলিভিশন ক্যামেরায় ছবি তুলতে ব্যগ্র।

‘কেমন আছো, রবিন!’ স্কুলের সামনের সিঁড়ি বেয়ে বারান্দায় উঠলে আমাকে স্বাগত জানাল আমাদের ক্লাস প্রেসিডেন্ট ম্যাট হ্যাম।

‘তোমাকে যা সুন্দর লাগছে না আজ!’ মিষ্টি হাসি দিয়ে বলল স্কুলের হেড চিয়ারলিডার সুন্দরী পলি অ্যান্ডারসন।

‘তুমিই তাহলে সেই কিশোর, রকি বিচের হিরো!’ বলে উঠল আমার পুরো অপরিচিত দুটো ছেলে।

চারদিক থেকে এই অতি মনোযোগ বিব্রত করে তুলল আমাকে। দম আটকে আসছে।

চোখ পড়ল জনি আর ওর বন্ধুদের ওপর। চত্বরের বেড়ার কাছে দাঁড়িয়ে আছে ওরা। একমাত্র ওরাই আমাকে অভিনন্দন জানাল না, কোনো কথা বলতে এল না আমার সঙ্গে।

আমি ওদের হাতছাড়া হয়ে গেছি, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। নিশ্চয় আরেকটা দুর্বল বোকা ছেলেকে খুঁজে বের করতে চায় এখন, যাকে যন্ত্রণা দিয়ে মজা পাবে।

আমার তিন বন্ধুর খোঁজে ক্যাফিটিরিয়ায় ঢুকলাম। এক কোণে বসে আছে রিচি, বিড আর মুসা, নিয়মিত যেখানে বসি আমরা। তেলতেলে বার্গার খেতে খেতে আলোচনার নামে তর্ক বাধিয়েছে, রোজই যা করে ওরা। এই পরিবেশ আমার কাছে অদ্ভুত লাগল আজ। মনে হলো, কত বছর পর ওদের দেখছি। অথচ কোনো পরিবর্তন হয়নি ওদের, সেই তেমনই আছে, কিন্তু আমার কাছে অন্য রকম মনে হলো।

ওদের কাছে এসে বসলাম। কাছেই আরেকটা টেবিলে মেয়েরা বসেছে, বার বার আমার দিকে তাকাচ্ছে আর ফিসফাস করে কথা বলছে। একটা মেয়ে আমার উদ্দেশে হাত নাড়ল। আমিও হাত নেড়ে জবাব দিলাম।

‘এই যে, হিরো,’ রিচি বলল।

‘রবিন, সবাই আজ শুধু তোমার কথা বলছে,’ বিড বলল। ‘ভাবসাব দেখে মনে হচ্ছে, ব্রুস লি’র ওস্তাদ হয়ে গেছ তুমি।’

‘কাল হাসপাতালে দেখা করতে যেতে চেয়েছিলাম,’ মুসা বলল। ‘কিন্তু তোমার মা বললেন, ডাক্তাররা নাকি ভিজিটরদের ঢুকতে নিষেধ করেছেন। তোমার বিশ্রাম দরকার।’

‘তা বলেছেন,’ জবাব দিলাম। ‘তবে মা-ও কিছু কম নয়। নিজের বানানো মটরশুঁটির সুপ আর আপেলের রস খাওয়াতে খাওয়াতে মেরে ফেলেছে আমাকে।’

‘কী ঘটেছিল, বলো তো সব,’ রিচি বলল।

এক কথা বলতে বলতে বিরক্ত হয়ে গেছি। আর বলতে ভালো লাগছে না। কিন্তু ওরা আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। না বললে মাইন্ড করবে। তাই আরেকবার বলতে হলো পুরো ঘটনাটা। সবই বললাম, শুধু আমাকে ছুরি মারার ঘটনাটা বাদ দিয়ে। যেহেতু আমার গায়ে কোনো খোঁচার দাগ নেই, প্রমাণ করতে পারব না। ওরা ভাববে আমি বানিয়ে বলছি।

‘একটা সশস্ত্র ডাকাতকে পিটিয়েছ তুমি, বিশ্বাস করতে পারছি না,’ আমার কথা শেষ হলে রিচি বলল। ‘বোকামি করেছ। ভাগ্য ভালো, বেঁচে গেছ। এভাবে ঝুঁকি নেয়া উচিত হয়নি।’

‘তবে ঝুঁকি নিয়ে ভালোই করেছ,’ বিড যোগ করল। ‘নইলে হিরো হতে পারতে না।’

‘কিন্তু এই মারামারি কোথায় শিখলে?’ মুসার প্রশ্ন। ‘কারাতে মার! বাপরে!’

প্রশ্নটা এড়িয়ে গেলাম। জবাবটা আমি নিজেও জানি না।

‘নিশ্চয় কমিক বুক থেকেই শিখেছ,’ মুসা বলল। ‘সাহসটাও ওখান থেকেই পেয়েছ।’

‘তা ঠিক,’ জবাব দিতে হলো না বলে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। ‘থাক ওসব কথা। কী এনেছি, কল্পনাও করতে পারবে না।’

ব্যাকপ্যাকের জিপার খুলে সাবধানে চারকোণা একটা প্যাকেট বের করলাম ভিতর থেকে। দুই পরত টিসু পেপারের মোড়ক ও তিন পরত প্লাস্টিকের আবরণ খুলে, উল্লসিত ভঙ্গিতে উঁচু করে ধরলাম।

‘দ্য এক্স ম্যান-১! শেষ পর্যন্ত পেলে!’

‘কত দাম নিল?’

‘দেখি তো?’

হাতে দেয়ার আগে ওদের আঙুলগুলো ভালমতো দেখে নিলাম ময়লা লেগে আছে কি-না। কীভাবে পেয়েছি, জানালাম।

‘এমনিতেই দিয়ে দিলেন তোমাকে মিস্টার জনসন!’ বলল অবাক মুসা। ‘ম্যান! পরের বার কাউকে বাঁচানোর সময় আমাদেরও সঙ্গে নিয়ো। বস্তা ভরে উপহার নিয়ে আসব।’

‘বার বার এভাবে হিরোইজম দেখাতে থাকলে,’ বিড বলল, ‘দুটো ব্যাপারের একটা ঘটবে—হয় কবরে যাবে, নয়তো জিততে জিততে সুপারম্যানের মতো কমিক বইয়ের হিরো হয়ে যাবে।’

ওর শেষ কথাটা আমার মনে ধরল। হাসিমুখে চুপ করে তাকিয়ে রইলাম।

এ সময় সেখানে হাজির হলেন আমাদের লাইব্রেরিয়ান মিসেস ক্রিমসন।

‘এক্সকিউজ মি, বয়েজ।’ আমার দিকে তাকালেন তিনি। ‘তুমিই কি রবিন মিলফোর্ড? কমিক বইয়ের দোকান থেকে ডাকাত ধরেছিলে?’

‘হ্যাঁ,’ জবাব দিলাম।

‘একটা সাংঘাতিক কাজ করেছ তুমি। আমাদের শহরে এ রকম একজন ছেলে আছে, ভাবতেও ভালো লাগছে। তোমার বাবা-মা নিশ্চয় তোমাকে নিয়ে ভীষণ গর্বিত।’

আসলে, আমার বাবা-মা আমাকে প্রচুর বকাবকি করেছে, বাড়ি থেকে বেরোতে নিষেধ করে দিয়েছে—শুধু স্কুলে আসা ছাড়া আর কোথাও যেতে পারব না, ছুরি যে কী ভয়ানক জিনিস, তার ওপর দীর্ঘ বক্তৃতা দিয়েছে। পুরো ব্যাপারটায় তারা গর্বিত কতখানি জানি না, তবে ভীষণ অখুশি।

সেটা চেপে গিয়ে জবাব দিলাম, ‘নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই, খুবই গর্বিত।’

‘তা-ই তো হওয়ার কথা।’ যাওয়ার জন্য ঘুরে দাঁড়াতে গিয়েও হঠাত্ কী মনে পড়তে থেমে গেলেন তিনি। ‘এই যে বিড ওয়াকার।’

‘বলুন, ম্যাম’, বিড বলল।

‘লাইব্রেরি থেকে বই নিলে ফেরত দিতে চাও না কেন?’ তিরস্কারের সুরে বললেন তিনি। ‘শোনো, এই শুক্রবারের মধ্যে যদি ‘ইন সার্চ অব বিগফুট’ বইটা না দাও, পঞ্চাশ ডলার জরিমানা করা হবে। বুঝেছ?’

*

সেদিন মিস্টার গ্রেগরির বিজ্ঞান ক্লাসে মনোযোগ দিতে পারলাম না। মটরশুঁটির ওপর ভিত্তি করে জিন গবেষণার বর্ণনা দিচ্ছেন তিনি।

হাই তুলতে তুলতে রিচির দিকে তাকালাম।

গভীর মনোযোগে শুনছে ও। নোট নিচ্ছে।

হঠাত্ ‘মিউটেশন’ শব্দটা কানে আসতেই কান খাড়া করে ফেললাম। মিউটেশন থেকে মিউট্যান্ট-দের প্রতি মন চলে গেল আমার। যেমন, দ্য এক্স ম্যান, একটা মিউট্যান্ট।

লেকচার চলল। কিছুই কানে ঢুকছে না আমার। আমি ভাবছি, সারা সকাল আমাকে নিয়ে ছেলেমেয়েদের মাতামাতির কথা। স্কুলের অতি মেধাবী আর বিশিষ্ট ছেলেমেয়েরা পর্যন্ত আমার প্রশংসায় উদ্বেলিত হয়ে ছিল। যে মেয়েগুলো ফিরেও তাকাত না আমার দিকে, হঠাত্ করেই ওরাও প্রবল মনোযোগী হয়ে উঠেছে আমার প্রতি। টিচাররা আমাকে ‘আদর্শ ছেলে’ ধরে নিয়ে সবাইকে সেরকম হওয়ার পরামর্শ দিতে দিতে মুখে ফেনা তুলে ফেলেছেন। শুরুতে বিব্রত হলেও এসব আমাকে প্রভাবিত করেছে।

আমার মধ্যে একটা গোপন ক্ষমতা আছে, বুঝে গেছি আমি। সেটাকে যদি সময়মতো বের করে এনে ব্যবহার করাটা রপ্ত করতে পারতাম, তাহলে এক্স ম্যান কিংবা অন্য যেকোনো মিউট্যান্ট-এর চেয়ে কম কিছু হতাম না। কিন্তু বের করার উপায়টা কী?

মিস্টার চিবা-কেন হয়তো বলতে পারতেন। কিন্তু তিনি তো নেই। তাঁর মৃত্যুসংবাদ শুনে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। এক শ বছরের একজন বুড়ো মানুষ, মারা যাওয়াটা স্বাভাবিক, কিন্তু মেনে নিতে পারলাম না তাঁর মৃত্যুটা। মনে হলো, খুন করা হয়নি তো তাঁকে? তবে খুন হোন আর যা-ই হোন, এখন কে আমার প্রশ্নের জবাব দেবে? আমার আজব ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করার উপায় শেখাবে কে? আমার গুরু কোনালি কোথায় আছে, তা-ও হয়তো আর কোনোদিনই জানতে পারব না।

একঘেয়ে লেকচার দিয়েই চলেছেন মিস্টার গ্রেগরি।

মিস্টার চিবা-কেন আমাকে লুকিয়ে থাকতে বলেছিলেন, লোকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে নিষেধ করেছিলেন। কেন? আমি তো আমার নতুন রূপটাকে পছন্দই করছি। ‘স্পেশাল’ কিছু হতে কার না ভালো লাগে?

গতকালকের আগে কেউ কখনো ফিরেও তাকায়নি আমার দিকে। বরং তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করেছে, যেন সমাজে আমি জাতিচ্যুত।

বক্তৃতা থামিয়ে বোর্ডের দিকে ঘুরে দাঁড়ালেন মিস্টার গ্রেগরি। বোর্ডে একটা বড় বর্গক্ষেত্র আঁকলেন। নড়েচড়ে উঠল সারা ক্লাস, সবাই এতক্ষণ আমার মতো দিবাস্বপ্ন দিচ্ছিল, রিচি বাদে। যখনই মিস্টার গ্রেগরি বোর্ডে কিছু আঁকেন, বাজি রেখে বলা যায়, পরীক্ষার সময় সেটা আসবেই।

আমার কাগজে ছবিটা এঁকে নিচ্ছি, এ সময় ঘরের দরজায় টোকা পড়ল।

‘বাধা দেয়ার জন্য দুঃখিত,’ দরজায় উঁকি দিয়ে প্রিন্সিপাল রবার্টসন বললেন, ‘আমি রবিন মিলফোর্ডের সঙ্গে কথা বলতে এসেছি। ওকে একবার আমার সঙ্গে আমার অফিসে যেতে হবে।’

প্রথমে কমিক বুকের মালিক হলাম। তারপর বিখ্যাত। তারপর মিস্টার গ্রেগরির ক্লাস থেকে বের করে নিয়ে যাওয়া। আমার পরিস্থিতির ক্রমেই উন্নতি হচ্ছে।

বইখাতা তুলে নিয়ে প্রিন্সিপাাল রবার্টসনের পিছন পিছন বারান্দায় বেরিয়ে এলাম।

‘তোমার সঙ্গে একজন দেখা করতে এসেছেন,’ চওড়া হাসি হেসে আমাকে বললেন তিনি।

‘বাবা?’

‘না।’

‘মা?’

‘না।’

একটা মুহূর্ত ভাবলাম। ‘কোনো মেয়ে, নাম জুলিয়া?’

‘গেলেই দেখতে পাবে,’ মুচকি হেসে জবাব দিলেন প্রিন্সিপাল।

বুঝতে পারছি, যে আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছে, তাকে দেখিয়ে আমাকে সারপ্রাইজ দিতে চান তিনি।

লকারগুলো পার হবার সময় আমাকে বললেন, ‘তোমার জিনিসপত্র লকারে রেখে এসো। আমার অফিস থেকে সোজা লাঞ্চে চলে যেয়ো। ও, ব্যাকপ্যাক থেকে তোমার লাঞ্চ বক্সটা বের করে নাও।’

লাঞ্চ বক্স? সত্যি শুনছি তো?

বইখাতা ভরা আমার ব্যাকপ্যাকটা লকারের চারকোণা খোপে ঢোকালাম ঠেলেঠুলে। মরচে পড়া লকটা লাগিয়ে, প্রিন্সিপালের পিছন পিছন এগোলাম।

তাঁর ঘরে ঢুকতেই, একটা উজ্জ্বল হাসিমুখ আমার দিকে ফিরল, এ-কান ও-কান হাসিতে পুরোপুরি বেরিয়ে পড়েছে দুই পাটি দাঁত। একটা সেকেন্ডের জন্য চোখ ধাঁধিয়ে দিল আমার, তারপর পুরো চেহারাটা নজরে এল।

‘মার্টিন নরটন, চ্যানেল থ্রি-র রিপোর্টার,’ পরিচয় দিয়ে আমার দিকে হাত বাড়াল লোকটা।

‘হাই,’ নির্বিকার ভঙ্গিতে বলে ওর হাতটা ধরলাম। ঘামে ভেজা ওর হাতের তালু।

‘ডাকাতের সঙ্গে তোমার লড়াইয়ের অসাধারণ স্টোরিটা কভার করতে চায় আমাদের চ্যানেল। সত্যি বলতে কী, সবাই আমরা অভিভূত।’

‘হ্যাঁ, রবিন এখন আমাদের সবার হিরো,’ মাথা ঝাঁকালেন প্রিন্সিপাল। ‘আসলে, আমিও ঠিক করেছি স্কুল থেকে সাহসিতকার জন্য ওকে একটা স্পেশাল সার্টিফিকেট দেবো।’

ন্যাকা! সার্টিফিকেট দিয়ে আমি কী করব?

‘তা-ই নাকি। খুব ভালো হবে!’ এমন ভঙ্গিতে নরটন বলল, যেন কোহিনূর হিরা আমাকে উপহার দেয়ার কথা বলেছেন প্রিন্সিপাল। তারপর আমার মুখের কয়েক ইঞ্চি দূরে নিয়ে এল ওর মুখ।

‘তাহলে,’ কণ্ঠস্বরটাকে যতটা সম্ভব মিষ্টি করে তুলে বলল ও, ‘এখন যদি ঘটনাটা সম্পর্কে তোমাকে কয়েকটা প্রশ্ন করি, জবাব দিতে আপত্তি আছে?’

‘না... নেই।’

‘গুড!’

প্রথমে আমার সঙ্গে আমাদের ‘গর্বিত প্রিন্সিপাল’-এর কিছু ছবি নেয়ার জন্য একজন ক্যামেরাম্যানকে নির্দেশ দিল নরটন। প্রিন্সিপালের মুখ দেখে মনে হলো, আমেরিকার প্রেসিডেন্টের তরফ থেকে তাঁকে দশ লাখ ডলারের চেক উপহারের ঘোষণা দেয়া হয়েছে। আমার হাত ধরে ভয়ানক ঝাঁকি দিতে দিতে মুখ ফিরিয়ে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে পোজ দিলেন তিনি। বললেন, ‘আজ আমাদের রকি বিচ জুনিয়র হাইয়ের জন্য একটা অতি গর্বের দিন।’

এরপর প্রিন্সিপাল রবার্টসনকে ধন্যবাদ দিয়ে, আমার সঙ্গে একা তাঁর অফিসটা ব্যবহারের অনুরোধ জানাল নরটন।

‘কোনো সমস্যা নেই। যতক্ষণ খুশি থাকুন।’ দরজার দিকে পা বাড়ালেন তিনি।

ক্যামেরাম্যানকেও বেরিয়ে যেতে ইশারা করল নরটন।

দুজনেই বেরিয়ে গেলে, আমার দিকে ফিরল ও। দেঁতো হাসিটা উধাও করে দিয়ে গম্ভীর হলো।

‘তারপর,’ শুরু করল ও, ‘রকি বিচে কতদিন ধরে আছো, রবিন?’

‘জন্মের পর থেকে।’

‘আর তোমার বাবা-মা’র পরিচয়... ’

‘রোজার মিলফোর্ড ও কোরি মিলফোর্ড। আমার বাবা দা ডেইলি রকি বিচ স্টারের চিফ এডিটর, সেটা তো ভালো করেই জানেন, যেহেতু আপনিও মিডিয়ার লোক... ’

‘জানি। তবু, তোমার মুখ থেকে শুনে আরও শিওর হয়ে নিচ্ছি,’ গম্ভীর মুখে জবাব দিল নরটন।

অদ্ভুত কিছু একটা রয়েছে নরটনের মধ্যে। চুলের ছাঁট, চামড়ার রঙ, এসব ছাড়াও অন্য কিছু।

সেটা কি ওর চোখ?

‘রবিন, বলো আমাকে,’ ও বলল। ‘তুমি কি সব সময়ই ওরকমভাবে মারামারি করতে পারতে? মানে, খালি হাতে আত্মরক্ষা জাতীয় মারপিট?’

‘না। আমার দ্বিগুণ বড় কোনো মানুষকে তুলে যে আছাড় মারার ক্ষমতা আছে আমার, কল্পনাও করিনি কোনোদিন।’

‘হুঁ,’ গম্ভীর হয়ে আছে নরটন। তার ঝলমলে হাসি উধাও হওয়ার পর থেকে একটিবারের জন্যও আর হাসি ফুটছে না মুখে।

খটকা লাগছে। আমার জবাবগুলো লিখে নিচ্ছে না কেন ও? কিংবা ভিডিও করছে না কেন? তাছাড়া অন্যদেরকে এখান থেকে বেরই বা করে দিয়েছে কেন?

হঠাত্ সতর্ক সংকেত যেন দপ্ করে জ্বলে উঠল আমার মগজে। সেই একই ধরনের অনুভূতি, কমিক বুকের দোকানে ডাকাতটাকে প্রথম দেখার পর যে রকম লেগেছিল। নরটনের প্রশ্নগুলোও অদ্ভুত। আমার দিকে ওর তাকানোর ভঙ্গিটা ভালো লাগছে না। মনে হচ্ছে যেন দৃষ্টি দিয়ে বিদ্ধ করছে আমার মগজকে।

‘ভাবছি, ইন্টারভিউ দেয়ার আগে আমার বাবা-মা’র অনুমতি নেয়া দরকার,’ ওকে এড়ানোর জন্য বললাম।

‘কেন? নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেয়ার মতো যথেষ্ট বড় কি তুমি হওনি? তেরো বছর বয়স তোমার।’ তীক্ষ দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে ও।

অবাক হলাম। ও কী করে জানল এ কথা?

আমার ভিতরে সতর্ক-ঘন্টা বেজে উঠল। লাল বাতি জ্বেলে সংকেত দিতে আরম্ভ করল যেন। হূিপণ্ডের গতি বেড়ে গেল। দেহের সমস্ত পেশি টানটান হয়ে উঠল। নাহ্, আর কোনো প্রশ্নের জবাব দেয়া ঠিক হবে না। মুখ বন্ধ রাখতে হবে।

সামনে ঝুঁকে আমার চোখে চোখে তাকাল নরটন। ‘রবিন... ইদানীং অস্বাভাবিক কোনো পরিবর্তন লক্ষ করেছ তোমার মধ্যে?’

ক্রিইইইংংংংং!

অ্যালার্ম বেলের প্রচণ্ড শব্দ বাড়ি মারল যেন আমার মাথার মধ্যে। পরক্ষণে বুঝলাম, এটা আমার ভিতরে নয়, বাইরে বাজছে। স্কুলের ইন্টারকম। লাঞ্চ শুরুর ঘোষণা দিচ্ছে।

‘মিস্টার নরটন, আপনার সঙ্গে কথা বলে খুব ভালো লাগল,’ তাড়াতাড়ি বললাম। ‘আরও বলতে পারলে খুশি হতাম, কিন্তু লাঞ্চের সময় হয়ে গেছে... তাছাড়া... তাছাড়া এখন আমার মাথাব্যথার ওষুধ খেতে হবে। ডাক্তার বলে দিয়েছেন, ওষুধটা খাবারের সঙ্গে না খেলে পাকস্থলি ফুটো হয়ে যাবার ভয় আছে। আমি যাই। গুড-বাই।’

বলে ছুটে বেরিয়ে এলাম অফিস থেকে।

*

নরটনের কথা কোনোমতেই মন থেকে ঝেড়ে ফেলতে পারলাম না। স্কুল ছুটির পরও সেটা রয়ে গেল। ওর ব্যাপারে সাবধান থাকতে হবে, নিজেকে বোঝালাম।

কতগুলো প্রশ্ন খচখচ করছে মনের ভিতর। আমার পরিবার সম্পর্কে এত আগ্রহ কেন ওর? যা জানতে চেয়েছে, টেলিভিশনের স্টোরি তৈরি করার জন্য ওসব জানার কোনো প্রয়োজন নেই। তাছাড়া ওসব প্রশ্নের জবাব আগে থেকেই জানা আছে ওর, আবার আমাকে জিজ্ঞেস করল কেন? আমার জন্মদিন কবে, বয়স কত, সেটাই বা জানল কীভাবে? কীভাবে জানল আমার দেহের পরিবর্তনের কথা?

সুপারহিরো হলে যেমন জনপ্রিয় হওয়া যায়, নানারকম ঝামেলাও তেমনি পোহাতে হয়, এ আমি জানি।

‘রবিন, মার্টিন নরটন নাকি তোমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল?’ হঠাত্ বিডের কণ্ঠ চমকে দিল আমাকে।

‘হ্যাঁ, এসেছিল। মিস্টার গ্রেগরির ক্লাস করা থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছে।’

‘যা-ই বলো, মিস্টার গ্রেগরির ক্লাস ফাঁকি দেয়ার জন্য তোমার মতো ছুরির খোঁচা খেতেও রাজি আছি আমি,’ বিড়বিড় করল মুসা।

‘তুমি যা-ই বলো, তাঁর আজকের লেকচারটা খুবই মজার ছিল,’ রিচি বলল। ‘রবিন, তুমি কি জানো, দীর্ঘকাল ধরে চলা স্বাভাবিক বিবর্তনপ্রক্রিয়ার তুলনায় যেকোনো মহাবিপর্যয় অনেক সময় অনেক কিছুর খুব দ্রুত রূপান্তর ঘটিয়ে দেয়?’

‘নিশ্চয়, রিচি। যেমন আমাদের স্কুল বাসটার ঘটিয়েছে,’ জবাব দিলাম। ‘এই সেদিন দেখলাম নতুন ঝকঝকে, এখন একেবারে ঝরঝরে।’

‘ধূর! বিজ্ঞান নিয়ে তোমার সঙ্গে কথা বলাই বেকার। ইচ্ছে করলে আমার নোটটা দেখতে পারো, তাহলে মিস্টার গ্রেগরির লেকচারের মানে বোঝা সহজ হবে।’

স্কুল-চত্বরের বাইরে একটা বেঞ্চে বসে কথা বলছি আমরা। চত্বরের ভিতর খেলছে জনি ড্রিলম্যান আর ওর চামচারা। মাঝে মাঝে আমার দিকে ফিরে তাকাচ্ছে জনি, ঠোঁট উল্টে বাঁকা হাসি হাসছে।

আমার সঙ্গে গোলামাল বাধানোর কথা দুঃস্বপ্নেও ভেবো না আর, জনি, মারা পড়বে—মনে মনে বললাম।

‘বিবর্তনপ্রক্রিয়া, না?’ মিন মিন করে বলল বিড। ‘রিচি, তোমার কি ধারণা, এভাবে বদলাতে বদলাতে কোনো একদিন সব প্রাণীই মানুষের মতো কথা বলা শুরু করবে?’

মাথা নাড়ল রিচি। ‘না, সেটা সম্ভব নয়। এতটা উন্নতি যদি হয়েই যায় ওদের, তাহলে আর এখনকার চেহারা থাকবে না। দেহের এতই পরিবর্তন হয়ে যাবে, কুকুর-বিড়াল-ঘোড়া-ইঁদুর বলে আর চেনা যাবে না ওদের।’

লেকটাকে ঘিরে থাকা বনের দিকে চোখ পড়ল আমার।

সত্যিই কি কিছু আছে ওখানে? যদি কোনো ভিনগ্রহবাসীর মুখোমুখি হয়ে যাই, তো কী করব? একে অন্যের ভাষা তো বুঝব না। কথা বলব কী করে?

আমার ভাবনায় বাধা দিল মুসা। ‘দেখো! ওই রিপোর্টারটা। আমাদের ছবি তুলছে।’

ওর কথায় ফিরে তাকিয়ে দেখি, সামনের রাস্তায় একটা সাদা ভ্যান। ওটার সামনে দাঁড়ানো নরটন। হাতের প্যাডে কিছু লিখছে, আর পাশে দাঁড়ানো ক্যামেরাম্যানকে নির্দেশ দিচ্ছে। তবে স্কুল বিল্ডিংয়ের ছবি তুলছে বলে মনে হচ্ছে না। বরং চত্বরের দিকেই ওর নজর, মাঝে মাঝে একটা করে ছেলেকে ধরছে, কথা বলছে, মনে হয় কিছু জিজ্ঞেস করছে।

কী করছে ও?

হঠাত্ ঘুরে আমাদের দিকে তাকাল নরটন। মুহূর্তে সতর্ক হয়ে গেলাম। ওর চোখে কিছু একটা রয়েছে, যেটা আমার ভালো লাগে না। হিংস্র জানোয়ারের চোখের ঠাণ্ডা দৃষ্টির মতো।

পিছনে চিত্কার শুনে ঘুরে তাকালাম। একটা টেনিস বল নাচতে নাচতে ছুটে এসে আমার পায়ের কাছে থেমে গেল।

নিচু হয়ে তুলে নিলাম। ছুড়তে যাব, এ সময় চিত্কার করে বলল কেউ, ‘অ্যাই, সাবধান! ও এখন কারাতের ওস্তাদ! মাথা নামাও, মাথা নামাও!’

‘হ্যাঁ,’ জবাব দিল আরেকজন, ‘বলটা হয়তো তোমার গলা দিয়ে ঠেসে ঢোকাবে!’

চারপাশের মুখগুলোর দিকে তাকালাম। সবার চোখ আমার দিকে। বলটাকে বুলেটের মতো ছুড়ে দিই কি-না দেখতে চাইছে ওরা। দেখলাম, নরটনের শীতল দৃষ্টি আমার ওপর স্থির।

মিস্টার চিবা-কেনের সাবধান বাণী মনে পড়ল : মনে রেখো, মহাবিপদের মধ্যে রয়েছ তুমি... লোকের নজরে পড়ে যাও, এমন কিছু কোরো না...

‘কী হলো, বলটা ছুড়ছ না কেন? তোমার ক্ষমতা দেখাও আমাদের!’ চেঁচিয়ে বলল একজন।

নিজেকে সংযত রাখতে পারাটাও একটা বিরাট অস্ত্র—মিস্টার চিবা-কেন বলেছিলেন।

বলটা ছুড়তে গিয়েও থেমে গেলাম। আর আমি সুপারহিরো হতে চাই না। নিজেকে প্রকাশ করতে চাই না। জনপ্রিয় হওয়ার যন্ত্রণা অনেক। ব্যাটম্যান কেন মুখে মুখোশ পরে থাকে, বুঝতে পারছি এখন। সারাক্ষণ ভক্তরা পিছে লেগে থাকে। একটানা বাহাদুরি দেখানোর অনুরোধ করতে থাকে। যন্ত্রণা দিয়ে মারে।

বলটা ছুুড়ে দিলাম জনির দিকে। জোরে মারলাম না। আস্তে করে গিয়ে ওর কাছে পড়ল বলটা।

ছেলেমেয়েরা যারা অবাস্তব কিছু দেখার আশায় আমার দিকে তাকিয়ে ছিল, হতাশ হলো ওরা। মাথা নাড়তে নাড়তে চলে গেল নিজেদের কাজে। খেলায় মনোযোগ দিল।

নরটনকেও হতাশ মনে হলো। ওর ক্যামেরাম্যানকে যন্ত্রপাতি গুছিয়ে গাড়িতে ওঠার নির্দেশ দিল।

 

এগারো.

স্কুল ছুটির পরও কিছুক্ষণ দেরি করতে হলো আমাকে, প্রিন্সিপালের কাছ থেকে আমার সাহসিকতার পুরস্কার হিসেবে বিশেষ সার্টিফিকেটটা নেয়ার জন্য। কম্পিউটারে লিখে, সস্তা কাগজে প্রিন্টআউট বের করা হয়েছে। নিচে সোনালি রঙের একটা চকচকে স্টিকার আটকানো। এমন ভঙ্গিতে আমার হাতে সার্টিফিকেটটা তুলে দিলেন তিনি, যেন নোবেল প্রাইজ দিচ্ছেন।

আমি তাঁকে ধন্যবাদ দিয়ে অফিস থেকে বেরিয়ে এলাম। বারান্দায় এসে ভাঁজ করে প্যান্টের পিছনের পকেটে গুঁজে রাখলাম কাগজটা। এটার কোনো মূল্যই নেই আমার কাছে।

তারপর, কোচ হেনরির অ্যাথলেটিক রুমে ঢুকে তাঁর সঙ্গে কথা বলতে হলো। ও’হারা ডেইভ জানিয়ে দিয়েছে, আর এখানে কাজ করবে না। ওর জায়গায় দায়িত্ব নিতে বললেন আমাকে কোচ। তাঁর ভঙ্গি দেখে মনে হলো, আমি যে আর আগের মতো নেই, সেটা তিনি এখনো জানেনই না। কিছুই শোনেননি।

সাফ জানিয়ে দিলাম, কুস্তিগির হওয়ার আর বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই আমার। আমি জানি, এখন লড়তে গেলে কেউ আমার সঙ্গে পারবে না, আরও বেশি চোখে পড়ে যাব সবার; লুকিয়ে থাকা আর হবে না তখন।

লকারের কাছে এসে দেখি, দরজাটা খোলা। মরচে পড়া তালা ভেঙে খুলে ফেলেছে কেউ।

কে করল কাজটা?

আমার ব্যাকপ্যাকে তো মূল্যবান কিছু নেই...

আচমকা দ্রুত হয়ে গেল হূিপণ্ডের গতি। এতই বেশি, মনে হলো বুকের খাঁচা ভেঙে বেরিয়ে চলে আসবে।

আমার কমিক বুক!

ছেঁড়া বড় খামটা লকারের নিচে মেঝেতে পড়ে আছে। বারান্দার দিকে তাকালাম। ছেঁড়া টিসু পেপারের টুকরো দলামোচড়া হয়ে পড়ে রয়েছে একটু পর পর।

তেতো পানি উঠে এল মুখের ভিতর। ঢোক গিলে নামানোর চেষ্টা করলাম।

লকারের সামনে থেকে বারান্দাটা কিছুদূর সোজা এগিয়ে মোড় নিয়ে চলে গেছে জিমনেসিয়ামের দিকে। বারান্দা ধরে এগিয়ে এসে মোড় ঘুরলাম। কাগজের টুকরো শেষ। সামনে কয়েক গজ পর্যন্ত কিছু নেই, আর তারপর...

‘নাআআআ!’ চিত্কারটা আপনাআপনি বেরিয়ে এল আমার গলা চিরে।

কমিক বুকের ছেঁড়া পাতাগুলো টিস্যু পেপারের মতোই দলামোচড়া করে ফেলে রাখা হয়েছে। সাইক্লপসের দোমড়ানো রঙিন মুখটা যেন বিকৃত চোখে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। কয়েক ফুট দূরে কয়েক টুকরো করা আইসম্যানের দেহ।

রাগ যেন গরম লাভার মতো আমার শিরা বেয়ে উঠতে শুরু করল। চোয়াল দুটো সিমেন্ট দিয়ে জোড়া লাগানোর মতো শক্ত হয়ে গেল। মুঠোবদ্ধ হয়ে গেল আঙুলগুলো।

যে এ কাজ করেছে ওকে আমি ছাড়ব না! ওই কমিকের মতোই দলামোচড়া করে ভর্তা বানিয়ে রাস্তায় ছুড়ে ফেলব। জিভ টেনে ছিঁড়ব। কার লেজে পা দিয়েছে ও, বোঝেনি!

এক্স ম্যানের ছেঁড়া পাতাগুলোকে অনুসরণ করে জিমনেসিয়ামের দিকে এগিয়ে চললাম। একটা করে পাতা পড়ে থাকতে দেখছি, আর রাগ আরও বাড়ছে। হ্যাঁচকা টান দিয়ে যখন জিমনেসিয়ামের ভারী লোহার দরজাটা খুললাম, টের পাচ্ছি, শিরার ভিতর বয়ে যাওয়া রক্তের মধ্যে যেন আগুন ধরে গেছে।

ভিতরে আবছা অন্ধকার। কাগজের টুকরো শেষ। চোরটাকেও চোখে পড়ছে না।

‘অ্যাই, কোথায় তুই?’ চিত্কার করে ডাকলাম। কথাগুলো দেয়ালে প্রতিধ্বনি তুলল। ‘সাহস থাকলে বেরিয়ে আয়!’

‘এটা খুঁজছ?’ পরিচিত ব্যঙ্গভরা কণ্ঠে জবাব এল।

অন্ধকার ছায়া থেকে বেরিয়ে এল জনি ড্রিলম্যান। দরজার নিচ দিয়ে আসা আলোয় দেখতে পাচ্ছি ওকে। মুখে বাঁকা হাসি। কমিক-বুকের কভারটা বাড়িয়ে ধরল আমার দিকে।

‘দে ওটা!’ গর্জে উঠলাম।

‘আহা, এত রাগছ কেন? এখনো কি দুদু খাও, যে এসব ছাইপাঁশ নিয়ে মেতে থাকবে? যাকগে, ছেঁড়া কাগজ পড়ে বারান্দাটা ময়লা হয়ে আছে, দারোয়ানকে বলতে হবে সেগুলো পরিষ্কার করে ফেলার জন্য,’ আত্মতৃপ্তিতে হাসল জনি। তারপর আমার চোখের সামনে কভারটা টেনে ছিঁড়ে কুটি কুটি করতে লাগল।

রাগ ফেটে পড়ল আমার।

জনির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এলোপাতাড়ি ঘুষি মারতে লাগলাম। আমার মনে হলো, বছরের পর বছর ওর ওপর জমে থাকা রাগ আর ক্ষোভের যেন বিস্ফোরণ ঘটল।

পাল্টা আঘাত হানার কোনো সুযোগই পেল না জনি। আমার চেয়ে অনেক বড় বড় পা আর হাত নিয়েও এখন আমাকে কিছুই করতে পারল না ও। এক লাথিতে ওকে ফেললাম দেয়ালের গায়ে। পেটে আরেক লাথি মারতে সামনের দিকে বাঁকা হয়ে গেল ওর দেহটা।

এখানেই থেমে যাওয়া উচিত ছিল আমার। কিন্তু পারলাম না।

ভয়ানক রাগ থামতে দিল না আমাকে। নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছি।

‘থামো! প্লিজ!’ কাতর অনুনয় করল ও। দুই হাত তুলে আমার ঘুষি থেকে মুখ বাঁচানোর চেষ্টা করছে।

ওর অনুনয়ে কান দিলাম না। বলতে খারাপই লাগছে, আমার ভিতরে যে দানবটা বাস করে, ওটা জনির কষ্ট দেখে যেন আনন্দ পাচ্ছে।

দুই হাতে ওর গলা চেপে ধরলাম। যেন আমার নির্দেশে নয়, হাত দুটোর নিজেরই মগজ আছে।

বিচিত্র ঘড়ঘড় শব্দ করে দুই হাতে আমাকে ঠেলে সরানোর চেষ্টা করল জনি।

আরও জোরে চেপে ধরলাম।

বেগুনি হয়ে যাচ্ছে ওর মুখের চামড়া।

হাতের চাপ আরও বাড়াল। যদিও আমার মগজ চাইছে না হাত দুটো চাপ বাড়াক।

দু’দিকে ঝুলে পড়ল ওর হাত দুটো। আমার চোখে চোখে তাকিয়ে আছে।

ছেড়ে দিতে চাইছি। বুঝতে পারছি, বাড়াবাড়ি করে ফেলছি। কিন্তু হাত দুটোকে থামাতে পারছি না।

‘মারো ওকে! মেরে ফেলো! খুনের নেশা তো তোমার রক্তে রয়েছে!’ কে যেন বলল।

ঠাণ্ডা, অমানবিক কণ্ঠটা অবশেষে আমার ঘোর কাটিয়ে দিল।

জনির গলা থেকে ঝটকা দিয়ে হাত সরিয়ে লাফিয়ে সরে এলাম। এমন ভঙ্গিতে তাকালাম, যেন ও-ই আমার গলা টিপে ধরেছিল।

‘ওকে মারব?’ কম্পিত কণ্ঠে বলে আশপাশের ছায়ার দিকে তাকালাম।

‘... তোমার দিকে লোকের নজর পড়ে এমন কিছু কোরো না। শোনো, নিজেকে সংযত করে লুকিয়ে রাখতে পারাটাও একটা বিরাট অস্ত্র।’ কানে বেজে উঠল যেন মিস্টার চিবা-কেনের কণ্ঠ।

বেহুঁশ হয়ে মেঝেতে পড়ে গেছে জনি।

ওর দিকে তাকিয়ে আছি, আবার বলে উঠল সেই ভয়ানক কণ্ঠটা, ‘চুপ করে আছো কেন? মারো না ওকে! মারো, খুন করে ফেলো!’

পরিচিত লাগল কণ্ঠটা।

ফিরে তাকালাম। ছায়ায় রাখা বেঞ্চের ওপাশ থেকে বেরিয়ে আসছে একটা ছায়ামূর্তি।

নরটন বার্মিংয়ের মতো দেখালেও একটা মস্ত পরিবর্তন হয়েছে ওর। দেহ, চুলের ছাঁট ওর মতো হলেও চোখ দুটো অন্য রকম, মানুষ তো নয়ই, অন্য কোনো প্রাণীর চোখের মতোও নয়। গোল গোল দুটো কালো ছোট পিরিচের মতো।

‘প্রিন্সিপালের অফিসে তুমি ভেবেছিলে আমার প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে গিয়ে তুমি আমাকে বোকা বানাতে পারবে,’ বলল ও। ‘পারলে কি?’

সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে ওর মুখোমুখি হলাম।

‘নিজেকে প্রকাশ করে দিয়ে বোকামি করেছ,’ নরটন বলল। ‘সহজেই তোমাকে চিনে ফেলেছি আমি।’

কথা বলতে বলতে আমার দিকে এগোচ্ছে ও। আমাকে অন্যমনস্ক করার চেষ্টা করছে, বুঝতে পারছি। ও কী চায়, আমি বুঝে গেছি।

আমার মনের স্বাভাবিক চিন্তা-ভাবনা উধাও হয়েছে, তার জায়গায় বন্বন্ করে ঘুরছে যেন অন্য একটা প্রচণ্ড ক্ষমতাশালী মন। ওটার ক্ষমতা, ওটার ক্ষিপ্রতা অনুমানের চেষ্টা করছি। আমি এখন বাঘের মতো সতর্ক। অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করতে প্রস্তুত।

‘তোমার বাবার ক্ষমতা পেয়েছ কি-না তুমি, দেখতে চাই,’ বলেই স্প্রিংয়ের মতো লাফ দিল আমাকে লক্ষ করে।

আমিও তৈরি।

ও আমার দিকে উড়ে আসতেই ঝট করে বসে পড়লাম। ওর নিজের গতিকে ওর বিরুদ্ধে ব্যবহার করে ঠেলে দিলাম। মাটিতে আছড়ে পড়ল ও। কিন্তু কিছুই হলো না। মূহূর্তে গড়ান দিয়ে লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল।

আবার ঝাঁপ দিল আমাকে লক্ষ করে। তবে এবার সাবধান রইল, আগের বারের মতো এত ওপর দিয়ে না এসে অনেক নিচু দিয়ে উড়ে এল। এড়াতে পারলাম না। আমার পেটে গুঁতো মেরে আমাকে চিত করে মাটিতে ফেলে দিল।

সামনের দিকে বাঁকা হয়ে গেছে আমার দেহ। দম নিতে পারছি না। মনে হচ্ছে শরীরের সমস্ত অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো প্রচণ্ড ঝাঁকিতে জায়গা থেকে সরে গেছে।

ভয়ংকর চোখ দুটো ঝুঁকে এল আমার চোখের সামনে। তাড়াতাড়ি গড়িয়ে সরে গেলাম ওর নিচ থেকে, হাঁচড়ে-পাঁচড়ে উঠে দাঁড়ালাম।

গোড়ালিতে ভর দিয়ে চরকির মতো পাক খেয়ে ঘুরে দাঁড়াল ও। আবার আমাকে লক্ষ করে মাথা নিচু করে ছুটে এল।

প্রচণ্ড লড়াই শুরু হলো। সমানে হাত-পা চালাচ্ছে ও, এতই দ্রুত, কোনটা যে পা আর কোনটা হাত আলাদা করে বোঝা কঠিন। আমি শুধু ঠেকিয়ে চললাম আর ওর দুর্বলতার সুযোগ খুঁজতে লাগলাম যাতে মোক্ষম জায়গায় আঘাত হানতে পারি।

কিন্তু কোনো সুযোগই পেলাম না। ওর তুলনায় মিস্টার চিবা-কেনের ছেলে সুমুকে কারাতের শিক্ষানবিস মনে হলো। আমি মোটেও ওর সমকক্ষ নই। নিখুঁত ওর গতিবিধি। একটুও ক্লান্তি নেই। ওর তুলনায় কিছুই না আমি।

ধীরে ধীরে কোণঠাসা হয়ে পড়ছি। পেটের ভিতর খামচে ধরা অনুভূতি হচ্ছে। অবশ হয়ে আসছে হাত-পা, ক্ষিপ্রতা কমে যাচ্ছে। আর ওর যেন আরও বাড়ছে।

পারব না ওর সঙ্গে। পালাতে হবে।

জনি ড্রিলম্যান সুযোগটা করে দিল আমাকে।

গুঙিয়ে উঠল ও।

থেমে গেল নরটন। শব্দ লক্ষ করে এগোল এক পা।

আমার দিক থেকে ওর মনোযোগ সরে যেতেই ঝট করে ওর বাহুর নিচ দিয়ে গিয়ে কাঁধ দিয়ে পেটে ধাক্কা মেরে দেয়ালের গায়ে ফেলে দিলাম। তারপর দিলাম দৌড়।

আমাকে ধরতে থাবা মারল নরটন। আমার শার্টের পিছনে পিছলে গেল ওর আঙুলগুলো।

জিমনেসিয়াম থেকে দৌড়ে বেরিয়ে এসে ছেলেদের লকার রুমে ঢুকলাম। ভারী একটা ইস্পাতের বেঞ্চ ঠেলে দিলাম দরজার গায়ে, আড়াআড়ি বসিয়ে এমনভাবে অবরোধ সৃষ্টি করলাম, যাতে ভিতর থেকে পাল্লাটা ঠেলে খুলতে বাধা পায়।

আমি জানি একটা বেঞ্চ ওকে ঠেকাতে পারবে না। তবে সামান্য সময় পাব, আর সেটুকুকেই কাজে লাগাতে চাই আমি।

লকার রুম থেকে বেরোনোর আরেকটা দরজা আছে উল্টোদিকে। ওটা দিয়ে বেরিয়ে, সুড়ঙ্গের মতো একটা বারান্দা ধরে এগোলে ফুটবল মাঠে বেরোনো যায়।

মাঠে বেরোতে পারলেই মুক্ত হয়ে যাব। কিংবা কারও সাহায্য পাব।

ধ্রাম করে শব্দ হলো।

ইস্পাতের বেঞ্চে বাড়ি খেয়েছে জিমনেসিয়ামের ভারী পাল্লাটা। খোলার চেষ্টা করছে নরটন। আমার ভাগ্য ভালো, বেঞ্চটা আটকে গেছে। তাকিয়ে দেখতে গিয়ে সময় নষ্ট করলাম না। লকারগুলোর পাশ দিয়ে দৌড়ে পিছনের দরজাটা দিয়ে বেরিয়ে এলাম।

ঢুকে পড়লাম সুড়ঙ্গে। গা ছমছমে জায়গা। লম্বা সরু একটা বারান্দা, দু’পাশে দেয়াল যেন দু’দিক থেকে চেপে আসছে, মাথার ওপর ছাতে ঝোলানো অল্প পাওয়ারের বাল্ব। আমার জুতোর শব্দ প্রতিধ্বনি তুলছে দু’পাশের দেয়ালে বাড়ি খেয়ে, গা ছমছমে শব্দ। নানারকম খেলার সরঞ্জাম পড়ে আছে মস্ত বারান্দাটায়। কখনো সেগুলোর পাশ কাটিয়ে, কখনো বা লাফিয়ে ডিঙিয়ে ছুটতে থাকলাম।

অবশেষে বারান্দাটার শেষ মাথায় পৌঁছালাম। ঠেলা দিলাম দরজার পাল্লায়।

নড়ল না ওটা।

কাঁধ দিয়ে ধাক্কা দিতে শুরু করলাম। কিন্তু যত জোরেই ধাক্কাই না কেন, খুলল না পাল্লাটা। বাইরে থেকে বন্ধ, তালা দেয়া। পুরোপুরি একটা কানাগলি।

ঘুরে দাঁড়ালাম। মরিয়া হয়ে দৌড়ে ফিরে চললাম বারান্দা ধরে। বেরোনোর কোনো একটা পথ আমাকে খুঁজে বের করতেই হবে। কিন্তু লকার রুমের দরজার কাছে পৌঁছাতেই আত্মা-কাঁপানো শব্দ করে দরজার কাছ থেকে সরে গেল ইস্পাতের বেঞ্চটা।

আমার অবরোধ সরিয়ে ফেলেছে নরটন। ফাঁদে পড়ে গেছি আমি।

সুড়ঙ্গের দেয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়ালাম। কী করব ভাবছি। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই আমাকে দেখে ফেলবে নরটন। আমার কাছে কোনো অস্ত্র নেই। শরীরের শক্তি শেষ হয়ে এসেছে। সাহায্য করার কেউ নেই।

তোমার ভিতরের জানোয়ারটাকে অনুভব করো, আমার মগজে বেজে উঠল যেন মিস্টার চিবা-কেনের কণ্ঠস্বর।

হ্যাঁ। ঠিক। অনেক ধন্যবাদ। তাঁর উদ্দেশে মনে মনে বললাম।

সাপের মতো হও।

হ্যাঁ, এ কাজটাই করতে হবে।

কে যেন একটা পুরোনো ভাঙা ব্যাডমিন্টন র্যাকেট ফেলে গেছে বারান্দায়। ছোঁ মেরে ওটা তুলে নিয়ে বাড়ি মেরে ভাঙতে লাগলাম ঝোলানো বাল্বগুলো। গাঢ় অন্ধকারে ঢেকে গেল সুড়ঙ্গ।

মাঠে বেরোনোর দরজাটার কাছে ফিরে গিয়ে একটা ট্যাকলিং ডামির আড়ালে ঘাপটি মেরে থেকে অপেক্ষা করতে লাগলাম। চুপচাপ। নিঃশব্দ। সাপের মতো।

মুহূর্ত পরেই অন্য প্রান্তের দরজার পাল্লা খুলে গেল। আবছা ছায়ামূর্তির মতো দেখা গেল নরটনকে। পরক্ষণে দড়াম করে লেগে গেল পাল্লাটা। আবার গাঢ় অন্ধকারে ঢেকে গেল সুড়ঙ্গ।

উবু হয়ে বসে আছি অন্ধকারে। নরটনের পায়ের শব্দ শুনছি।

মরিয়া হয়ে আমার থার্মাল ভিশন তৈরি হওয়ার অপেক্ষা করছি। চোখ কুঁচকে, শক্ত করে, বার বার আকুতি জানাচ্ছি আমার ভিতরের দানবটাকে জেগে ওঠার জন্য।

মুহূর্ত পর চোখ মেললাম। আগের মতোই আছে দৃষ্টি, অন্ধকারে দেখতে পাচ্ছি না।

নরটনের পায়ের শব্দ জোরাল হচ্ছে। কাছে আসছে। ওর নিঃশ্বাসের শব্দ শুনতে পাচ্ছি। চোখে কিছু দেখছি না।

‘তোমার উপস্থিতি টের পাচ্ছি আমি, কোনালির শিষ্য,’ ডেকে বলল ও। ‘কেন অহেতুক অনিবার্যকে এড়াতে চাইছ? এই পৃথিবী তো তোমার জন্য নয়।’

কথাগুলো কেমন রহস্যময় লাগল আমার কাছে।

হঠাত্ কোনো রকম আগাম সংকেত না দিয়ে আমার তাপদর্শী দৃষ্টিশক্তি চালু হয়ে গেল।

ট্যাকলিং ডামিটার আড়াল থেকে মুখ বাড়িয়ে উঁকি দিয়ে দেখলাম আমার দিকে এগিয়ে আসছে নরটন। সুড়ঙ্গটাকে ভূতুড়ে আলোয় আলোকিত করে তুলেছে ওর দেহের আলো। আমার বিশেষ দৃষ্টিশক্তির কারণে এই আলো দেখতে পাচ্ছি আমি। আমাদের বিড়ালটার গা থেকে যেমন বেরোতে দেখেছি।

ঠিক আমার সামনে চলে আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করলাম। তারপর যতটা সম্ভব জোরে ট্যাকলিং ডামিটা ঠেলে দিলাম ওর ওপর। এর জন্য তৈরি ছিল না ও। প্রচণ্ড ধাক্কায় চিত হয়ে পড়ে গেল। হাঁচড়ে-পাঁচড়ে ওঠার চেষ্টা করছে, টান দিয়ে একটা সকার নেট তুলে ওর গায়ে ছুড়ে দিলাম।

আবার দৌড় দিলাম সুড়ঙ্গ ধরে। পৌঁছে গেলাম লকার রুমের দরজার কাছে। কিন্তু ওটা খোলার চেষ্টা করেই থেমে গেলাম, নড়ছে না। দড়ি দিয়ে বাঁধা।

ভাগ্যিস, আমার নিজের হাতটাই জ্বলতে দেখছি, সেই আলোয় দড়ির গিঁটটা দেখতে পাচ্ছি। দ্রুতহাতে সেটা খুলতে লাগলাম। আমার সুপারপেরিফেরাল দৃষ্টি পিছনে নড়াচড়া দেখতে পেল।

দড়িটা খোলার জন্য বড়জোর এক সেকেন্ড সময় পাব। আমার হাত কাঁপছে, পেশি ব্যথা করছে, দাঁতে দাঁতে বাড়ি খাচ্ছে। তবে সময়মতোই গিঁটটা খুলে ফেলতে পারলাম।

কিন্তু পাল্লাটা খুলতে যেতেই পিছন থেকে আমার কাঁধ খামচে ধরল নরটন।

তারপর কী ঘটল, ঠিক বলতে পারব না। ভয় আর প্রচণ্ড ক্লান্তি কয়েকটা সেকেন্ড আমার মাথাটাকে ঘোলাটে করে রাখল।

তবে একটা কথা বলতে পারব : নরটনের হাতে কামড়ে দিয়েছি।

মনে আছে, ব্যথায় চেঁচিয়ে উঠে আমার কাঁধ ছেড়ে দিয়েছিল ও।

আরও মনে আছে, কামড়ানোর সময় আমার দাঁতে যেন আগুনের ছ্যাঁকা খেয়েছি।

তারপর সরে গিয়ে প্রায় যেন ছিটকে পড়লাম লকার রুমের ভিতর। আমার নতুন দৃষ্টিতে ছাতের মৃদু আলোগুলোও যেন সূর্যের তীব্রতা নিয়ে চোখে লাগছে। ছোটার গতি কমালাম না। লকারগুলোর পাশ কাটিয়ে এসে, উল্টে পড়া বেঞ্চটা লাফিয়ে ডিঙিয়ে, ধাক্কা দিয়ে খুলে ফেললাম জিমনেসিয়ামের দরজা।

নরটনের দৌড়ে আসার শব্দ শুনতে পাচ্ছি। পায়ে যতখানি জোর আছে, সবটা নিঙড়ে নিয়ে দৌড়াতে থাকলাম।

আমি দরজার কাছে পৌঁছানোর আগেই, পিছন থেকে আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল নরটন।

‘পালাতে তুমি পারবে না, কোনালির শিষ্য,’ হাঁপাতে হাঁপাতে বলল ও।

আমাকে মেঝেতে পেড়ে ফেলে, বুকে বসে গলা চেপে ধরল। ওর হাত দুটো বরফের মতো শীতল। যেন মানুষ নয়।

রূপান্তরিত হতে শুরু করল ও।

মাখানো ময়দার তালের মতো হয়ে গেছে যেন দেহটা, চামড়া টেনে লম্বা করে ফেলা হচ্ছে হাতে বেলা রুটি টেনে ছড়ানোর মতো, মুখটা বদলে যাচ্ছে—পুরোপুরি অন্য চেহারা হয়ে গেল, চামড়ার রঙ চকের মতো সাদা। শুধু কয়লার মতো কালো পিরিচের মতো চোখ দুটো তেমনই রইল।

‘তুমি যার শিষ্য, সেই কোনালি এই গ্যালাক্সির সবচেয়ে বড় যোদ্ধাদের একজন,’ ও বলল। ‘আমি জানতাম, কিশোর পাশার মতোই তুমিও সহজে পরাস্ত হতে চাইবে না... একেকটা বিচ্ছু তোমরা, অতি পিচ্ছিল খুদে শয়তান... ’

ও কী বলছে, কিছুই বুঝলাম না। মেঝেতে পড়ে মৃত্যুর অপেক্ষা করতে লাগলাম।

তারপর হঠাত্ করেই প্রবলভাবে কাঁপতে শুরু করল ওর শরীর।

আমার গলায় ঢিল হয়ে গেল ওর আঙুল।

গড়িয়ে সরে গেলাম ওর নিচ থেকে।

চোখে অবিশ্বাস নিয়ে তাকিয়ে দেখছি, মুখটা দুমড়ে গেল ওর। সামনে ঢলে পড়ে গেল। পা দুটো কয়েকবার ঝাঁকি দিয়ে নিথর হয়ে গেল।

চিত করলাম ওকে। চোখের দিকে তাকালাম। কালো পিরিচ দুটো ধীরে ধীরে বদলে গিয়ে স্বাভাবিক চোখ হয়ে গেল। তবে প্রাণ নেই সে-চোখে।

*

বাবার অফিসে ফোন করলাম।

‘দা ডেইলি রকি বিচ স্টার।’ অন্যপাশ থেকে জবাব এল।

স্কুল বিল্ডিংয়ের সামনের পে ফোনটার কাছে দাঁড়িয়ে, রিসিভার কানে ঠেকিয়ে, থরথর করে কাঁপছি আমি। বাবাকে চাইলাম। মুহূর্ত পরেই রিসিভারে তার গলা ভেসে এল।

‘বাবা, আমি রবিন।’

‘রবিন! কোথায় তুমি? তোমার মা চিন্তায় অস্থির।’

‘বাবা, আমি স্কুলে। এখুনি চলে এসো, বাবা।’

‘কী হয়েছে? আসতে অসুবিধে হচ্ছে? গাড়ি পাচ্ছ না?’

‘একটা অ্যাম্বুলেন্স দরকার, বাবা।’

 

বারো.

ডাক্তার মরগানের মতে, একবার হাসপাতালের ইমার্জেন্সি রুম থেকে বেরিয়ে দ্বিতীয়বার মারামারি করে দ্রুততম সময়ে ফিরে আসার রেকর্ড সৃষ্টি করেছি আমি। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, এবার আর জখম হয়ে আসিনি।

জনিকে দেখে মনে হলো, জুসার মেশিন থেকে বের করে আনা হয়েছে ওকে। হাসপাতালে ওর বেডের পাশে চেয়ারে বসে পুলিশের তদন্তকারী অফিসারদের জেরার জবাব দিচ্ছি। একের পর এক প্রশ্ন করে যাচ্ছেন আমাকে, এই যেমন, ‘মৃত লোকটার সম্পর্কে তোমার কী ধারণা? ওকে কবে থেকে চেনো? স্কুল ছুটির পর জিমনেসিয়ামে কী করছিলে?’—ইত্যাদি, ইত্যাদি।

ও কে, পুলিশ জানে না। ওর কাছে কোনো পরিচয়পত্র পাওয়া যায়নি, পুলিশের রেকর্ডে আঙুলের ছাপ নেই। অন্য কেউ ওকে স্কুল বিল্ডিংয়ে ঢুকতে দেখেনি। তবে তদন্তকারী অফিসারেরা একটা ব্যাপারে একমত, কিশোর পাশার নিখোঁজ হওয়ার পিছনে লোকটার হাত থাকতে পারে। নিশ্চয় স্কুল থেকে ফেরার পথে রহস্যময় লোকটার শিকার হয়েছিল কিশোর।

‘ও কে, কী চায়, জানিয়েছে কিছু?’ আমাকে জিজ্ঞেস করলেন একজন পুলিশ অফিসার।

‘না,’ জবাব দিলাম।

‘কিশোরের কথা কিছু বলেছে? কোথায় আছে? বেঁচে আছে ও?’ আরেকজন জিজ্ঞেস করলেন।

‘জানি না।’

‘ওর হাত থেকে বাঁচলে কী করে?’ বাবা জিজ্ঞেস করল।

‘দৌড়ে গিয়ে লুকিয়ে পড়েছিলাম।’ আর কিছু ফাঁস করলাম না। ছদ্মবেশি নরটন আমাকে একটা ভালো শিক্ষা দিয়েছে, মরতে মরতে বেঁচেছি। এখন থেকে মিস্টার চিবা-কেনের পরামর্শ অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলব। কোনোমতেই খ্যাতিমান হয়ে নিজেকে লোকের চোখে পড়তে দেবো না।

‘জনি, লোকটার ব্যাপারে তুমি কিছু জানো?’ বাবা জিজ্ঞেস করল।

জনি বলল, জানে না। স্কুল ছুটির পর কী ঘটেছে, কিছুই ওর মনে নেই; এমনকি লকারের তালা ভেঙে কমিক-বুক বের করা, ছিঁড়ে ফেলা, জিমনেসিয়ামে আমার সঙ্গে মারামারি করা—কোনো কথাই ওর মনে নেই।

‘কিছুই মনে করতে পারছি না আমি, সব কেমন ধোঁয়াটে,’ এমন ভঙ্গিতে জবাব দিল ও, যেন নেশার ঘোরে রয়েছে।

ওকে ওভাবে পিটানোর জন্য এখন খারাপই লাগছে আমার। তবে রক্ষে যে বেঁচে রয়েছে এখনো। যেভাবে গলা টিপে ধরেছিলাম... আরও কয়েক সেকেন্ড ধরে রাখলে... আর ভাবতে চাইলাম না।

সময়মতো যে দেখা দিয়েছিল নরটন, এর জন্য বরং ওর প্রতি কৃতজ্ঞই হলাম, অন্তত জনিকে আমার হাত থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছে ও।

অফিসারেরা ধরে নিলেন, অচেনা লোকটাই জনিকে পিটিয়েছে। আমার সব মনে আছে, কিন্তু কাউকে জানালাম না। মিস্টার চিবা-কেনের কথা অমান্য করার সাহস নেই আর।

‘লোকটা কীভাবে মারা গেছে সত্যিই জানো না তুমি?’ এই নিয়ে পাঁচবার প্রশ্নটা করলেন আমাকে একজন অফিসার।

‘না।’

‘হুঁ,’ ফোঁস করে জোরে নিঃশ্বাস ফেললেন তিনি। ‘যদি তোমাদের কখনো কোনো কথা মনে পড়ে,’ জনির দিকে তাকিয়ে আবার আমার দিকে ফিরলেন অফিসার, ‘ফোন করে আমাকে জানিয়ো।’ বাবার সঙ্গে হাত মিলিয়ে, জনি আর আমার দিকে তাকিয়ে সামান্য মাথা ঝাঁকিয়ে উঠে চলে গেলেন তিনি।

‘জনির বিশ্রাম দরকার,’ আমার দিকে তাকিয়ে বাবা বলল। ‘কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে ওর।’

‘হ্যাঁ।’ চেয়ার থেকে উঠে বাবার পিছন পিছন দরজার দিকে এগোলাম।

‘বাই,’ কোলাব্যাঙের স্বর বেরোল জনির কণ্ঠ থেকে। ‘স্কুলে দেখা হবে।’ ঘনিষ্ঠ বন্ধুর মতো কথাগুলো বলল ও। শত্রুতা ভুলে গেছে। পিটুনি খেয়ে বিরাট পরিবর্তন হয়েছে।

বাবার সঙ্গে বারান্দা দিয়ে হেঁটে এসে ওয়েইটিং রুমে ঢুকলাম।

‘আমাকে কয়েকটা ফর্ম পূরণ করতে হবে এখন,’ বাবা বলল। ‘তোমার মাকেও ফোন করতে হবে। গত কয়েকটা দিন তোমাকে নিয়ে ভীষণ অস্থির হয়ে আছে ও। আমরা দুজনেই দুশ্চিন্তায় আছি।’ সেটা বোঝানোর জন্যই যেন জোরে আঙুল মটকাল বাবা, অন্যমনস্ক, অস্থির ভঙ্গিতে।

‘জানি,’ ওর চোখে চোখে তাকিয়ে বললাম। ‘তবে আর দুশ্চিন্তা করার দরকার নেই। সব ঝামেলা শেষ হয়ে গেছে।’

ভুরু জোড়া সামান্য উঁচু হলো বাবার। কপালে ভাঁজ পড়ল। দীর্ঘ একটা মুহূর্ত আমার দিকে চিন্তিত ভঙ্গিতে তাকিয়ে রইল। আমার কথার মানে বোঝার চেষ্টা করছে যেন।

‘যা বলছি ঠিকই বলছি, বাবা। আর দুশ্চিন্তা করতে হবে না আমাকে নিয়ে। এখন থেকে আমার নিজেকে বাঁচানোর ব্যবস্থা নিজেই করতে পারব আমি,’ আগের কথার সঙ্গে যোগ করলাম।

‘তা পারবে,’ বাবা জবাব দিল। তারপর জোরে আমার বাহু চাপড়ে দিয়ে সামনের ডেস্কের দিকে এগোল।

আমার শরীরে ওর রক্ত নেই, তবে ওকে আমি ভালোবাসি।

*

কয়েক মিনিট অপেক্ষা করলাম। খিদে পেয়েছে। এগিয়ে গেলাম একটু দূরের ভেনডিং মেশিনটার কাছে। রেড লিকারিস আর চকলেট বারের মধ্যে কোনটা খাব ভাবছি, একটা হাত হঠাত্ কাঁধ খামচে ধরল আমার।

ফিরে তাকালাম। হাসিমুখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে মার্টিন নরটন।

‘আউউউউ!’ করে গলা ফাটিয়ে চিত্কার করে উঠলাম। শুনেছি, অতিরিক্ত ভয় পেলে মানুষের চুল সাদা হয়ে যায়, আমার সব চুল যে ওই মুহূর্তে সাদা হয়ে যায়নি সেটাই আশ্চর্য।

‘হাই, রবিন, আমি মার্টিন নরটন, চ্যানেল থ্রি নিউজের রিপোর্টার। আমার ধারণা, অতি চমত্কার একটা সন্ধ্যা কাটিয়েছ তুমি। একটা সাক্ষাত্কার দেবে?’

ওর চোখের দিকে তাকালাম। অস্বাভাবিক কিছু দেখলাম না। সত্যি। কিচ্ছু না। একেবারেই নিরীহ একজন মানুষ। তবে কি এই নরটন, আর জিমনেসিয়ামের অদ্ভুত প্রাণীটা এক নয়?

‘না, দেবো না,’ মিন মিন করে বললাম।

মেকি হাসি হাসল নরটন। ‘তুমি একটা সাংঘাতিক ছেলে। তোমার সঙ্গে লাগতে যাওয়ার আগে দশবার চিন্তা করা উচিত, কী বলো?’ বক্সারের মতো সামনে ঝুঁকে দু’বার বাতাসে ঘুষি চালাল ও। হাসিটা চওড়া হলো আরও। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলল, ‘এমনি, দুষ্টুমি করলাম। তো, তোমার অ্যাডভেঞ্চার সম্পর্কে দু-চারটা কথা বলো না, রুদ্ধশ্বাসে শুনবে সমস্ত রকি বিচবাসী।’

ওর হাসি আর ন্যাকা কথার ধরন পিত্তি জ্বালিয়ে দিল আমার। ইচ্ছে করল ওকে তুলে ছুড়ে ফেলে দিই ক্যান্ডি মেশিনটার ওপর, তারপর মুখে দুটো প্ল্যাস্টিকের কাপ ঠেসে ঢোকাই, যাতে কথা বলতে না পারে। কিন্তু কিছুই করলাম না। কারণ এখন থেকে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা শিখছি আমি।

‘জাহান্নামে যান!’ বলতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু এই সময় পিছন থেকে ওর শার্টের কলার চেপে ধরল একটা হাত।

ওর পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে বাবা। কঠিন কণ্ঠে বলল, ‘অ্যাই মিস্টার, এক্ষুনি ভাগো এখান থেকে। তোমার ক্যামেরা, মাইক্রোফোন, লোকজন নিয়ে যাও। নইলে পুলিশকে জানাব।’

‘এখানে পুলিশ এসেছে? কেন?’ খবরের গন্ধ পেয়ে শিকারি কুকুরের মতো খাড়া হয়ে উঠেছে নরটনের কান।

‘সেটা ওদেরকেই জিজ্ঞেস করোগে।’ আমাকে দেখাল বাবা। ‘দয়া করে ওকে আর বিরক্ত কোরো না।’

আমার কাছ থেকে তথ্য আদায় করতে না পেরে হতাশ মনে হলো নরটনকে। হাসল। বোকার হাসির মতো দেখাল হাসিটা। বাবা ওর কলার ছেড়ে দিতেই তাড়াতাড়ি পিছিয়ে গেল ও। এসময় ওয়েইটিং রুমে ঢুকলেন ডাক্তার মরগান।’

‘মিস্টার মিলফোর্ড, আপনার সঙ্গে একটু কথা আছে,’ বললেন তিনি। চেহারা সামান্য ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। ‘এইমাত্র ল্যাবরেটরিতে সন্দেহজনক লোকটাকে পরীক্ষা করে এলাম। মৃত্যুর কারণটা জানতে পেরেছি।’

‘কী কারণে মারা গেছে?’ বাবা জিজ্ঞেস করল।

‘প্রাথমিক ময়নাতদন্তে জানা গেছে, বিষক্রিয়া। নিউরোটক্সিন— প্রোটিন্যাজ, অ্যাডিনোসিন ট্রাইফসফেটাস, ফসফোডায়েস্টেরাস... ’

‘সহজ করে বলুন?’ বাধা দিয়ে জিজ্ঞেস করল বাবা।

বাবার দিক থেকে আমার দিকে তাকালেন ডাক্তার, তারপর আবার বাবার দিকে। ‘আমাদের ধারণা, ওকে সাপে কামড়েছে। বিজ্ঞানীদের কাছে অচেনা ভয়ানক বিষাক্ত জাতের কোনো সাপ।’ পরক্ষণে আমার দিকে তাকিয়ে এমন ভঙ্গি করলেন, যেন আমি জানি ওটা কী সাপ ছিল।

চোখ ফিরিয়ে নিলাম।

*

ওয়েইটিং রুমে কতক্ষণ ধরে স্তব্ধ হয়ে আমি দাঁড়িয়েছিলাম জানি না। ডাক্তার কখন ওখান থেকে চলে গেছেন, তা-ও বলতে পারব না। বাবা আমার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করছে, কিন্তু কিছুই কানে ঢুকছে না আমার।

সাপ। বিজ্ঞানীদের কাছে অচেনা ভয়ানক বিষাক্ত জাতের কোনো সাপ।

এ হতেই পারে না। ওদের পরীক্ষায় ভুল হয়েছে, নিজেকে বোঝালাম।

নকল নরটনের হাতে কামড়ে দিয়েছিলাম, মনে আছে আমার। কিন্তু আমি তো সাপ নই।

আনমনে মাথা নাড়তে নাড়তে ঘোরের ভিতর থেকে যেন টেনে তুললাম নিজেকে। ব্যাপারটা আমার ভুলে যাওয়া উচিত। গত কয়েক দিনে অদ্ভুত, মুণ্ডুঘোরানো যেসব কাণ্ড ঘটেছে, মন থেকে মুছে ফেলতে পারলেই ভালো। এখন থেকে আমি একজন অতি সাধারণ রবিন। সুপারম্যানের ক্ষমতা দেখিয়ে আর কারও চোখে পড়তে রাজি নই।

‘হাই, রবিন!’ একটা মেয়েকণ্ঠ ডাকল।

আমার পাশ কাটাল জুলিয়া, ভুবন ভোলানো একটা মিষ্টি হাসি উপহার দিয়ে।

সঙ্গে সঙ্গে মনে হলো : আহা, কোনো বিপত্তি না ঘটিয়ে যদি আমার বিশেষ ক্ষমতাটা অন্তত কিছু মানুষকে দেখাতে পারতাম, এই যেমন জুলিয়াকে...

‘রবিন, চলো, দেরি হয়ে যাচ্ছে,’ পিঠে আলতো চাপড় দিয়ে বলল বাবা। ‘তোমার মা খাবার নিয়ে বসে আছে।’

হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে, পার্কে রাখা বাবার অফিসের গাড়িটার দিকে এগোলাম আমরা। অন্ধকারে তারার মৃদু আলো চমকাচ্ছে ওটার চকচকে ছাতে।

বাড়ি ফেরার পথে চুপচাপ রইলাম দুজনেই।

কোনালির কথা ভাবছি আমি।

ও কে? কোথায় থাকে? কী করে? আর ওই ছদ্মবেশি নরটনটাই বা কে? মানুষ, নাকি অন্য কিছু? আমাকে খুন করতেই বা চেয়েছিল কেন? জবাব দিতে পারতেন একমাত্র মিস্টার চিবা-কেন। কিন্তু তিনি তো এখন মৃত। আর কার কাছে আমার প্রশ্নের জবাব পাব?

হঠাত্ খড়খড় করে উঠল গাড়ির রেডিও।

কথা বলে উঠল খসখসে কণ্ঠ, ‘কলিং কার ফোরটিন! কলিং কার ফোরটিন!’

‘ফোরটিন বলছি। ওভার।’

‘মিস্টার মিলফোর্ড, লেকের ওপর আবার আজব আলো দেখা গেছে।’

‘উফ্, আবার!’ গুঙিয়ে উঠল বাবা।

‘এবার কি দেখতে যাবেন?

‘না!’ রুক্ষস্বরে জবাব দিয়ে লাইন কেটে দিল বাবা।

জানালা দিয়ে রাতের আকাশের দিকে তাকালাম।

মনে পড়ল নরটনের কথাগুলো : ‘কেন অহেতুক অনিবার্যকে এড়াতে চাইছ? এই পৃথিবী তো তোমার জন্য নয়।’

বাস্তবতাকে মেনে নিতে ভয় লাগছে, কিন্তু মনে মনে স্বীকার করতে বাধ্য হলাম, ঠিকই বলেছে ও। গত কয়েক দিনে আমার আচার-আচরণে নিজের কাছেই পরিষ্কার হয়ে গেছে, পৃথিবীর স্বাভাবিক মানুষদের মতো নই আমি। আমার যে অসাধারণ ক্ষমতা, তা পৃথিবীর মানুষের থাকে না।

তাহলে আমি কে?

অন্য কোনো গ্রহ থেকে আসা মানুষের চেহারার প্রাণী?

কিশোরের কী হয়েছে?

জবাবগুলো জানতেই হবে আমাকে। নইলে স্বস্তি নেই। d

 

 

 

 

 

 

 

 

 

এই পাতার আরো খবর -
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
২১ জুন, ২০১৮ ইং
ফজর৩:৪৩
যোহর১২:০০
আসর৪:৪০
মাগরিব৬:৫১
এশা৮:১৬
সূর্যোদয় - ৫:১১সূর্যাস্ত - ০৬:৪৬
পড়ুন