নির্বাচিত অনুবাদ গল্প
দূর সম্পর্কের আত্মীয়
ওরহান পামুক
দূর সম্পর্কের আত্মীয়
অলঙ্করণ :সোহেল আশরাফ

২৭ এপ্রিল ১৯৭৫। বসন্তের সান্ধ্যহাওয়া খেতে খেতে আমরা ভালিকোনাগি অ্যাভিনিউ দিয়ে হাঁটছিলাম। এমন সময় সিবেল একটি দোকানের জানালায় বিখ্যাত ডিজাইনার জেনি কোলনের ডিজাইন করা একটি পার্স দেখতে পেল। আর তখন থেকেই একের পর এক ঘটনা আর আকস্মিক যোগাযোগ ঘটার সঙ্গে সঙ্গে আমার জীবন পুরোপুরি বদলে যেতে শুরু করল। আনুষ্ঠানিকভাবে এনগেজমেন্ট হতে আর বেশি দেরি নেই; কিছুটা মাতাল হয়ে দুজনেই টলোমলো পায়ে হেঁটে চলছিলাম। এইমাত্র নিসানতাসিতে ফুয়া নামে নতুন জমকালো একটা রেস্তোরাঁয় আমার বাবা-মা’র সঙ্গে ডিনার সেরে এসেছি। সেখানে বসেই অনেকক্ষণ ধরে এনগেজমেন্ট পার্টির প্রস্তুতি নিয়ে বিশদ আলোচনা করেছি। পার্টির তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে মধ্য জুনে, যাতে সিবেলের বন্ধু নুরিচান ফ্রান্স থেকে এসে এই পার্টিতে যোগ দিতে পারে। প্যারিসের নটর ডেম ডি সিওঁ হাইস্কুলে পড়ার সময় থেকেই ওদের দুজনের মধ্যে বন্ধুত্ব ছিল। সিবেল অনেক আগেই তার এনেগেজমেন্টের পোশাকের জন্য ইস্তানবুলের সবচেয়ে দামি এবং বিখ্যাত পোশাক নির্মাতা সিল্কি ইসমেতের সঙ্গে কথা বলে বন্দোবস্ত করে রেখেছিল। আর আমার মা তাকে পোশাকের জন্য যে মুক্তাগুলো দিয়েছিলেন, সেগুলো কীভাবে সেলাই করা হবে সেই বিষয়টা নিয়ে সিবেল আর আমার মা সেদিনই সন্ধ্যায় আলোচনা করেছিলেন। আমার ভাবী শ্বশুরমশাইয়ের বিশেষ ইচ্ছা ছিল, তাঁর একমাত্র কন্যার এনগেজমেন্ট পার্টিও যেন একটা বিয়ের আসরের মতোই জাঁকজমকপূর্ণ হয়। তার সেই ইচ্ছা পরিপূর্ণ করতে আমার মাও যথাসাধ্য সাহায্যের জন্য সানন্দে প্রস্তুত। এদিকে আমার বাবাও ‘সোর্বনে পড়া’ একজন পুত্রবধূ পাওয়ার আশায় যারপরনাই আনন্দিত। যেকোনো বিষয়ে পড়াশোনা করার জন্য কোনো মেয়ে প্যারিস গেলে তখনকার ইস্তাম্বুুলের বুর্জোয়া সমাজে তা-ই বলা হতো। 

এখন ব্যাপার হলো কি সেদিন সন্ধ্যায় হাঁটতে হাঁটতে সিবেলকে যখন তার বাড়ি পৌঁছে দিচ্ছিলাম আর অত্যন্ত অনুরাগের সঙ্গে তার গাট্টাগোট্টা কাঁধ এক হাতে জড়িয়ে ধরে বেশ গর্বের সঙ্গে ভাবছিলাম, কী সুখী আর ভাগ্যবান আমি, তখন সে হঠাত্ বলে উঠল, ‘ইশ্, কী সুন্দর একটা ব্যাগ!’ যদিও ডিনারে যে ওয়াইন খেয়েছিলাম, তার প্রভাবে আমার মাথা একটু একটু ঢুলছিল, তা সত্ত্বেও সেই ব্যাগ আর দোকানের নামটা আমি ঠিকই লক্ষ করে রেখেছিলাম। পরদিন ওই দোকানে চলে এলাম। সত্যি বলতে কি, আমি কিন্তু আসলে কখনও সেই ধরনের তথাকথিত পরিশীলিত প্লে-বয়দের একজন ছিলাম না, যারা সব সময় মেয়েদেরকে উপহার কিনে দেবার কিংবা ফুল পাঠাবার অজুহাত খোঁজে। তবে আমার মনে হয় আমিও হয়তো সে-রকম হতে চাইতাম। তখনকার দিনে সিসলি, নিসানতাসি এবং বেবেকের মতো অভিজাত এলাকার পাশ্চাত্য জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত অলস বা একঘেয়েমিতে ভোগা গৃহবধূরা তখনও কিন্তু ‘আর্ট গ্যালারি’ খুলে বসেননি, যা তাঁরা পরবর্তী সময়ে খুলেছিলেন। তবে তাঁরা ঠিকই বুটিক চালাতেন আর প্যারিস অথবা মিলান থেকে ওদের লাগেজে চোরাচালানি করে বিভিন্ন ধরনের ছোটখাটো অলংকার আর মহিলাদের ম্যাচিং পোশাক এনে এসব বুটিক বোঝাই করতেন। এছাড়া ইউরোপ থেকে আমদানি করা ‘এল’ বা ‘ভোগ’ ম্যাগাজিনে যেসব ‘লেটেস্ট’ পোশাকের ছবি তুলে ধরা হতো, সেসব পোশাকের নকল কিনে এনে তাদের মতোই একঘেয়েমিতে ভোগা অন্যান্য বড়লোক গৃহবধূদের কাছে গলাকাটা দামে বিক্রি করতেন।    

সাঁজেলিজের (প্যারিসের বিখ্যাত অ্যাভিনিউয়ের নাম বর্ণান্তরিত করে এই বুটিকের নাম রাখা হয়েছে) মালিক শেনি হানিম ছিলেন আমার মায়ের দিকের একজন দূরসম্পর্কের আত্মীয়। দুপুর বারোটার দিকে আমি যখন এই বুটিকে ঢুকলাম, তখন তিনি সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। আর ভেতরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই ছোট্ট ব্রোঞ্জের দুই নববিশিষ্ট উটের আকৃতির ডোরবেলটা দুই বার টুন টুন শব্দে বেজে উঠল, যা মনে হলে এখনও আমার বুক ঢিপঢিপ করে। বাইরে গরম হলেও দোকানের ভেতরটা বেশ ঠাণ্ডা আর অন্ধকার। প্রথমে আমি ভেবেছিলাম, দোকানে হয়তো কেউ নেই, কারণ বাইরের দুপুরের প্রখর সূর্যের আলো থেকে এসে আমার চোখ তখনও ভেতরের অন্ধকারে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠেনি। তারপর আমি অনুভব করলাম তীরে আছড়ে পড়তে যাচ্ছে এমন একটা বিশাল ঢেউয়ের ধাক্কায় আমার কলজেটা যেন গলায় উঠে এসেছে।

তাকে দেখে আমি একেবারে হতবিহ্বল হয়ে পড়েছিলাম, তারপর কোনোমতে সামলে নিয়ে বললাম, ‘জানালায় ম্যানিকিনের ওপর যে হ্যান্ডব্যাগটা আছে, ওটা আমি কিনতে চাই।’

‘আপনি কি ওই ক্রিমরঙের জেনি কোলনটার কথা বলছেন?’

তারপর ওর সঙ্গে আমার চোখাচোখি হতেই আমি তাকে চিনতে পারলাম।

যেন একটা স্বপ্নের ঘোরে আছি, তেমনভাবে আবার পুনরাবৃত্তি করলাম, ‘জানালায় ম্যানিকিনের ওপরের হ্যান্ডব্যাগটা।’ 

‘ঠিক আছে।’ একথা বলে সে জানালার দিকে হেঁটে গেল। তারপর চোখের নিমিষে হলুদ রঙের উঁচু-হিলের এক পাটি পাম্প স্যু থেকে সুললিত ভঙ্গিতে একটা খালি পা বের করল, পায়ের নখে সযত্নে লাল নেলপলিশ লাগানো রয়েছে। খালি পা-টা একটু উঁচু ডিসপ্লে প্ল্যাটফর্মের ওপর রেখে একটা হাত ম্যানিকিনের দিকে বাড়াল। আমার চোখের দৃষ্টি শূন্য জুতা থেকে উঠে তার লম্বা খালি পায়ের ওপর পর্যন্ত অনুসরণ করল। এখনও মে মাস আসেনি, কিন্তু ইতোমধ্যে রোদ লাগিয়ে তার পা তামাটে করা হয়েছে। 

পায়ের দৈর্ঘ্যের তুলনায় তার লেস লাগানো হলুদ স্কার্টটাকে আরো খাটো মনে হচ্ছিল। হুক থেকে ব্যাগটা নামিয়ে সে আবার কাউন্টারে ফিরে এল। তারপর ওর সরু সরু আঙুলগুলো দিয়ে অত্যন্ত নিপুণভাবে ব্যাগের ভেতর থেকে দলা পাকানো টিস্যু পেপারগুলো ফেলে দিয়ে জিপার লাগানো পকেটগুলো দেখাতে শুরু করল। দুটো ছোট খালি পকেট আর একটা গোপন কম্পার্টমেন্ট থেকে একটা কার্ড বের করল, যার গায়ে খোদাই করা ছিল, ‘জেনি কোলন’। তার পুরো হাবভাব থেকে একটা রহস্যময়তা আর একাগ্রচিত্ততা ফুটে উঠছিল, মনে হচ্ছিল যেন সে অত্যন্ত ব্যক্তিগত কিছু একটা আমাকে দেখাচ্ছে। 

আমি বললাম, ‘তুমি নিশ্চয়ই ফুসুম, অনেক বড় হয়ে গেছ! আমাকে মনে হয় চিনতে পারোনি।’

‘অবশ্যই আপনাকে আমি চিনেছি কামাল স্যার। দেখার সঙ্গে সঙ্গেই চিনেছি, কিন্তু যখন দেখলাম আপনি আমাকে চিনতে পারেননি, তাই ভাবলাম আপনাকে বিরক্ত না করাই বরং ভালো হবে।’  

আবার একটু চুপচাপ। আমি আবার ব্যাগটার ভেতরের একটা পকেটের দিকে তাকালাম, যেটা সে আমাকে দেখিয়েছিল। তার সৌন্দর্য, রূপ না-কি তার স্কার্ট, যেটা আসলে খুবই খাটো ছিল, না-কি  অন্য আর কিছু, এসব মিলিয়ে আমাকে এমন অস্থির করে তুলেছিল যে, আমি স্বাভাবিক আচরণ করতে পারছিলাম না।

‘তো বলো... আজকাল তুমি কী করছো?’

‘ইউনির্ভাসিটিতে ভর্তি হওয়ার পরীক্ষার জন্য তৈরি হচ্ছি। আর এখানেও রোজ আসি। এই দোকানে নতুন নতুন অনেক মানুষের সঙ্গে দেখা হয়।’

‘চমত্কার। আচ্ছা এবার বলো, এই ব্যাগটার দাম কত?’

ভ্রু কুঁচকে সে ব্যাগটার নিচে হাতে লেখা, দামটার দিকে উঁকি দিয়ে তারপর বলল : ‘দেড় হাজার লিরা।’ (সে-সময়ে এই টাকার অংকটি একজন কনিষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তার ছয় মাসের বেতনের সমান) ‘তবে আমার বিশ্বাস শেনি হানিম হয়তো আপনাকে একটা স্পেশাল দাম বলতে পারবেন। কিন্তু তিনি তো লাঞ্চে বাড়ি চলে গেছেন আর হয়তো ঘুমাচ্ছেন, কাজেই এখন আমি তাকে ফোন করতে পারবো না। তবে আপনি যদি সন্ধ্যায় একবার আসতে পারেন...’

পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করতে করতে আমি বললাম, ‘কোনো দরকার নেই।’ আর এমন আনাড়ির মতো নোটগুলো গুনতে শুরু করলাম, যা নকল করে পরবর্তীকালে ফুসুম প্রায়ই আমাকে খেপাত। ফুসুম বেশ সাবধানে পার্সটা কাগজ দিয়ে মোড়াল, তবে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছিল, একাজে সে এখনও  অভিজ্ঞ হয়নি। তারপর একটা প্লাস্টিক ব্যাগে ভরে দিল। পুরো প্রক্রিয়াটি চলাকালীন আমি যে সপ্রশংস দৃষ্টিতে তার দুধে-আলতা রঙের বাহুযুগল আর তার দ্রুত, মার্জিত অঙ্গভঙ্গির দিকে তাকিয়ে ছিলাম সেটা সে জানত। তারপর বেশ ভদ্রতার সঙ্গে শপিংব্যাগটা আমার হাতে তুলে দিতেই আমি তাকে ধন্যবাদ জানালাম। ঠিক সময়মতো তার নামটা স্মরণ করতে ব্যর্থ হয়ে বললাম, ‘নসিবা আন্টি আর তোমার বাবাকে আমার সালাম জানিও।’ তারপর এক মুহূর্তের জন্য একটু বিরতি নিলাম : আমার প্রেতাত্মা তখন আমার দেহ ছেড়ে ঊর্ধ্বাকাশে চলে গিয়েছিল, এবং স্বর্গলোকের কোনো এক কোণে দাঁড়িয়ে ফুসুমকে জড়িয়ে ধরে চুমু দিচ্ছিল। তাড়াতাড়ি দরজার দিকে এগিয়ে গেলাম। আবার বেল বেজে উঠল আর এবার মধুর কম্পিত সুরে একটা ক্যানারি পাখির গান শুনতে পেলাম। রাস্তায় বের হয়ে বাইরের গরম অনুভব করে খুশি হলাম। জিনিসটা কিনে বেশ খুশি হয়েছি; আমি সিবেলকে খুব ভালোবাসি। কাজেই সিদ্ধান্ত নিলাম এই দোকান আর ফুসুমকে ভুলে যাব।

 যা-ই হোক, রাতে খাওয়ার সময় মাকে জানালাম যে, আজ সিবেলের জন্য একটা হাতব্যাগ কিনতে গিয়ে ফুসুম নামে আমাদের এক দূর সম্পর্কের আত্মীয়র সঙ্গে দেখা হয়েছে। 

মা বললেন, ‘হ্যাঁ জানি। নসিবার মেয়েটা শেনির দোকানে কাজ করে, কী লজ্জার কথা! ওরা এখন আর ছুটির দিনেও আমাদের বাসায় আসে না। ওই বিউটি কনটেস্টের পর থেকেই ওরা একটা বিব্রতকর পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছে। প্রত্যেকদিন আমি ওই দোকানটার পাশ দিয়ে যাই, অথচ একবারও ভেতরে গিয়ে বেচারি ওই মেয়েটার সঙ্গে কথা বলে উঠতে পারিনি—অথবা আসলে হয়তো এটা আমার মনেও পড়ে না। তবে যখন সে ছোটটি ছিল, জানো! তখন আমি তাকে খুব আদর করতাম। নসিবা যখন সেলাই করতে আসত, তখন মাঝেমধ্যে ওর মেয়েটাও সঙ্গে আসত। অনেকসময় আমি কাপবোর্ড থেকে তোমার খেলনাগুলো বের করে দিতাম, আর ওর মা যখন সেলাইয়ে ব্যস্ত থাকতো তখন সে চুপটি করে খেলা করতো। নাসিবার মা, মিথরিভার আন্টিও অত্যন্ত চমত্কার একজন মানুষ ছিলেন— আল্লাহ তাঁর আত্মাকে শান্তিতে রাখুন।’

‘ওরা আমাদের ঠিক কীরকম আত্মীয়?’

আমার বাবা তখন টেলিভিশন দেখছিলেন আর আমাদের দিকে তার তেমন মনোযোগ ছিল না, কাজেই এই সুযোগে মা তাঁর বাবাকে নিয়ে এক বিরাট কাহিনি ফেঁদে বসলেন। আতাতুর্কের যে বছর জন্ম হয়, তাঁর বাবার একই বছর জন্ম হয়েছিল আর রিপাবলিকের প্রতিষ্ঠাতার মতো তিনিও সেমসি এফেন্দি স্কুলে পড়েছেন। মনে হয় অনেকদিন আগে, আমার পিতামহ, এথেম কামাল আমার মাতামহীকে বিয়ে করার আগে হঠাত্ খুব তাড়াহুড়া করে, প্রায় তেইশ বছর বয়সে ফুসুমের নানী-মাকে বিয়ে করেছিলেন। তিনি ছিলেন বলকান এলাকার লোক এবং বলকান যুদ্ধের সময় এড্রিন ছেড়ে আসার সময় মারা যান।  হতভাগ্য মহিলাটি এথেম কামালকে কোনো সন্তান দিতে না পারলেও, তাঁর আগের একটি মেয়ে ছিল। এই মেয়েটির নাম ছিল মিথরিভার আর ওর বাবা ছিলেন একজন গরিব শেখ। ওই মহিলাটির খুব কম বয়সে ওই শেখের সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল। অতএব মিথরিভার আন্টি (ফুসুমের দাদি, যাকে অত্যন্ত ভিন্ন ধরনের মানুষ প্রতিপালন করেছিলেন) আর তার মেয়ে নসিবা হানিম (ফুসুমের মা) সম্পর্কে বলা যায় ওরা ঠিক পরস্পরের আত্মীয় ছিলেন না; ওরা বরং অনেকটা কুটুম বা বৈবাহিকসূত্রে আত্মীয়র মতো ছিলেন। যদিও এ ব্যাপারটায় আমার মা সবসময় জোর দিতেন, তা সত্ত্বেও তিনি পরিবারের এই বহুদূরের একটি সম্পর্কের মহিলাকে ‘আন্টি’ বলে ডাকার জন্য আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছিলেন। নসিবারা তেসভিকিয়া এলাকার পেছনের একটা গলিতে থাকত। শেষবার ছুটির দিনে ওরা যখন আমাদের বাড়িতে বেড়াতে এসেছিল, তখন মা এই গরিব আত্মীয়টির সঙ্গে একধরনের অস্বাভাবিক শীতল আচরণ করেছিলেন। আর মায়ের হঠাত্ এরকম ব্যবহারে তিনি মনে বেশ কষ্ট পেয়েছিলেন। কারণ দুই বছর আগে কাউকে কিছু না জানিয়ে নাসিবা আন্টি তাঁর ষোল বছরের মেয়েকে একটা বিউটি কনটেস্টে অংশগ্রহণ করার অনুমতি দিয়েছিলেন। সে তখন নিসানতাসি গার্লস হাইস্কুলে পড়ত। পরে আমার মা জেনেছিলেন যে, আসলে নসিবা আন্টি নিজেই মেয়েকে এ বিষয়ে উত্সাহ জুগিয়েছিলেন, এমনকি এটা করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়ে বেশ গর্বও বোধ করেছিলেন, অথচ এর জন্য তাঁর কেবল লজ্জিত হওয়ারই কথা। এই ঘটনার পর মা নসিবা আন্টির বিরুদ্ধে কঠোর মনোভাব গ্রহণ করেছিলেন, অথচ তাঁকে তিনি একসময় খুব ভালোবাসতেন এবং সবসময় নানাভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করতেন। 

নসিবা আন্টি কিন্তু তাঁর চেয়ে বিশ বছরের বড় আমার মাকে সবসময় শ্রদ্ধা করতেন। যখন তাঁর বয়স কম ছিল, তখন তিনি ইস্তাম্বুলের সবচেয়ে অভিজাত এলাকার বাড়ি বাড়ি ঘুরে সেলাইয়ের কাজ খুঁজে বেড়াতেন আর সে-সময় আমার মা তাঁকে অত্যন্ত সহযোগিতা করেছিলেন।    

মা বললেন, ‘ওরা খুবই গরিব ছিল।’ যদিও মনে হয় তিনি একটু বাড়িয়ে বলেছিলেন। তারপর তিনি বললেন, ‘তবে দেখ বাবা, শুধু ওরাই কিন্তু গরিব ছিল না—পুরো তুরস্কই তখন গরিব ছিল।’ আমার মা তাঁর সকল বন্ধুদেরকে বললেন, ওরা যেন নসিবাকে দিয়ে সেলাইয়ের কাজ করায় আর তিনি নিজে বছরে একবার কিংবা অনেকসময় দুই বার কোনো পার্টি কিংবা বিয়েশাদির ব্যাপার হলে পোশাক সেলাই করার জন্য তাকে বাড়িতে ডেকে পাঠাতেন। 

সেলাই  করার জন্য নসিবা আন্টি যখন আমাদের বাসায় আসতেন, বেশিরভাগ সময় তখন আমি স্কুলে থাকতাম, তাই তাকে খুব একটা আমাদের বাসায় আসতে দেখিনি। তবে ১৯৫৭ সালের আগস্টের শেষদিকে একটা বিয়েতে যাওয়ার জন্য মা’র একটা পোশাকের জরুরি প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। তখন তিনি সুয়াদিয়ায় আমাদের গ্রীষ্মাবাসে নসিবাকে ডেকে পাঠালেন। দোতলার পেছনের কামরায় মা আর নসিবা জানালার ধারে বসে কাজ শুরু করলেন। ওখান থেকে পাম গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে ওরা নৌকা, মোটর বোট আর জেটি থেকে ছেলেদেরকে পানিতে লাফিয়ে পড়ার দৃশ্য দেখতে পাচ্ছিলেন। নসিবা তাঁর সেলাইয়ের বাক্সটা খুললেন, এর ঢাকনায় ইস্তাম্বুলের সুন্দর একটা দৃশ্য আঁকা ছিল। তারপর ওঁরা কাঁচি, পিন, মাপার ফিতা, থিম্বল, লেসের পটি আর অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র চারপাশে ছড়িয়ে তার মধ্যখানে বসলেন। তারপর গরম, মশা আর এরকম অবস্থার মধ্যে সেলাই করতে যে কষ্ট হয়, তা নিয়ে দুই বোনের মতো নানারকম রসিকতা করতে করতে অর্ধেক রাত পর্যন্ত মা’র সিঙ্গার সেলাই মেশিনে কঠোর পরিশ্রমের সঙ্গে কাজ করতেন। ভেলভেটের ধুলা মিশে ওই কামরার গরম হাওয়া ভারী হয়ে থাকত। আমার মনে আছে আমাদের বাবুর্চি বকরি একের পর এক গ্লাস লেমোনেডের শরবত ওই কামরায় নিয়ে আসত, কারণ বিশ বছর বয়সের নসিবা তখন অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন এবং তখন কোনো কিছু পাওয়ার জন্য তিনি অত্যন্ত ব্যাকুল হয়ে পড়তেন। দুপুরে যখন আমরা খেতে বসতাম, তখন মা একটু রসিকতার ভঙ্গিতে বকরিকে বলতেন, ‘একজন গর্ভবতী মহিলা যা চাইবেন তাকে তা-ই দেবে, আর নয় তো বাচ্চাটা দেখতে কুিসত হবে!’ আমার মনে আছে, একথাটা শুনে আমি নসিবার ফোলা পেটটার দিকে বেশ আগ্রহ নিয়ে তাকাতাম। সেটাই হয়তো ফুসুমের অস্তিত্ব সম্পর্কে আমার প্রথম সচেতনতা ছিল, যদিও কেউ জানত না বাচ্চাটা ছেলে না মেয়ে হবে।

এখন কথাটা মনে পড়তেই মা ফুঁসে উঠে বললেন, ‘জানো, নসিবা এমনকি তার স্বামীকেও জানায়নি— সে শুধু তার মেয়ের বয়সের ব্যাপারে মিথ্যা কথা বলে বিউটি কনটেস্টে তার নাম ঢুকিয়েছিল। শুকর আল্লাহর যে সে প্রতিযোগিতায় জিতেনি, আর তাই লোকজনের কাছে বিব্রত হওয়া থেকে বেঁচে গিয়েছিল। স্কুল কর্তৃপক্ষ জানতে পারলে মেয়েটাকে স্কুল থেকে বের করে দিত... আমার মনে হয় এতদিনে সে হয়তো সেখান থেকে পাস করে বেরিয়েছে। তবে মনে হয় না সে আর পড়াশোনা করবে, তবে এখনকার খবর অবশ্য আমি জানি না, কারণ ওরা তো ছুটির দিনে আজকাল আর আমাদের বাড়িতে আসে না। এই দেশে কে না জানে যে, কী ধরনের মেয়ে, আর কোন ধরনের নারী বিউটি কনটেস্টে যোগ দেয়?  আচ্ছা তোমার সঙ্গে মেয়েটা কী ধরনের ব্যবহার করেছে?’    

আর একথা বলেই বা এভাবেই হয়তো মা বোঝাতে চেয়েছেন যে ফুসুম বোধহয় ইতোমধ্যেই লোকজনের সঙ্গে বিছানায় যেতে শুরু করেছে। বিউটি কনটেস্টের অন্যান্য ফাইনেলিস্টদের সঙ্গে ফুসুমের ছবি যখন মিলিয়াত পত্রিকায় ছাপা হলো, তখন একই কথা আমি আমার নিসানতাসির প্লেবয় বন্ধুদের কাছে শুনেছিলাম। তবে পুরো বিষয়টা অত্যন্ত বিব্রতকর মনে হওয়ায় আমি এতে তেমন আগ্রহ দেখাবার চেষ্টা করিনি। তারপর দুজনেই একটু নীরব হওয়ার পর মা আমার দিকে একটা আঙুল উঁচিয়ে বললেন, ‘সাবধান! তোমার কিন্তু খুব সুন্দর, বিশেষ ধরনের এবং চমত্কার একটি মেয়ের সঙ্গে এনগেজমেন্ট হতে চলেছে! ওর জন্য যে পার্সটা কিনে এনেছ, সেটা দেখাও।’ তারপর আমার বাবাকে ডেকে বললেন, ‘মোমতাজ! দেখ! কামাল সিবেলের জন্য একটা পার্স কিনে এনেছে!’ 

বাবা বললেন, ‘সত্যি?’ তার হাবভাব দেখে বোঝা গেল তিনি ইতোমধ্যেই সেটা দেখেছেন এবং এই ব্যাগ কেনাটাকে তিনি তাঁর ছেলে এবং ছেলের প্রেয়সী যে কত খুশি তার একটা ইঙ্গিত হিসেবে সমর্থন করেছেন। তবে একবারও টেলিভিশনের দিক থেকে চোখ ফেরাননি।

আমেরিকার একটা বিজনেস স্কুল থেকে গ্রাজুয়েশন করার পর এবং সামরিক বাহিনীতে বাধ্যতামূলক আমার দায়িত্ব পালন করার পর বাবা চাইলেন, আমি যেন আমার বড় ভাইয়ের পদাঙ্ক অনুসরণ করে তাঁর ব্যবসার একজন ম্যানেজার হই। তাঁর ব্যবসা তখন ফুলে ফেঁপে উঠেছে। কাজেই আমার যখন বয়স খুবই কম তখন তিনি আমাকে তাঁর ডিস্ট্রিবিউশন এবং এক্সপোর্ট ফার্ম, ‘সাতসাত’-এর জেনারেল ম্যানেজার হিসেবে নিয়োগ দিলেন। সাতসাতের অপারেটিং বাজেট ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে দেখানো হতো আর এতে মোটা অংকের লাভ হতো। তবে এতে আমার কোনো অবদান ছিল না। বিভিন্ন ধরনের অ্যাকাউন্টিং চাতুরি খাটিয়ে বাবার অন্যান্য ফ্যাক্টরি আর ব্যবসা থেকে সেখানকার লাভ সাতসাতে টেনে আনা হতো। ইংরেজিতে অনুবাদ করলে এটাকে সেলসেল বলা যেতে পারে। সারাদিন আমার চেয়ে বিশ-ত্রিশ বছরের বড় বুড়ো অ্যাকাউন্টেন্ট আর আমার মায়ের বয়সী বিপুলবক্ষা মহিলা কেরানিদের কাছ থেকে ব্যবসার খুঁটিনাটি ব্যাপারগুলো আয়ত্তে আনার চেষ্টা করতাম। তবে আমি সচেতন ছিলাম যে, মালিকের ছেলে না হলে এখানে আমি জেনারেল ম্যানেজার হতে পারতাম না, তাই কিছুটা বিনয় দেখাবার চেষ্টা করতাম। বিকেলে সমস্ত অফিস ছুটি হয়ে যাওয়ার পর পুরোনো লক্করঝক্কর মার্কা বাস আর ট্রামগুলো রাস্তা দিয়ে ঘর্ঘর করে ছুটে চলত, আর এতে দুই পাশের বিল্ডিংগুলোর ভিত পর্যন্ত কেঁপে উঠত। তখন আমার ভাবী বধূ সিবেল অফিসে এসে আমার সঙ্গে দৈহিক প্রেম করত। অত্যাধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি আর ইউরোপ থেকে নিয়ে আসা নারীর সমঅধিকারের ধারণা সত্ত্বেও সেক্রেটারিদের সম্পর্কে তার ধারণা আমার মায়ের চেয়ে ভিন্ন ছিল না। সে অনেকসময় বলত,  ‘এখানে না। এখানে কিছু করলে আমার নিজেকে একজন সেক্রেটারির মতো মনে হয়!’ তারপর যখন অফিসের চামড়ার গদিওয়ালা সোফাটার দিকে এগিয়ে যেতাম, তখন তার আপত্তি করার আসল কারণটা পরিষ্কার হতো। আসলে তখনকার দিনে তুর্কি মেয়েরা বিয়ের আগে যৌনমিলনে ভয় পেত। ধীরে ধীরে পশ্চিমি ভাবধারায় অভ্যস্ত ধনী পরিবারের অত্যাধুনিক এবং পরিশীলিত যেসব মেয়ে বেশ কিছুদিন ইউরোপে কাটিয়ে এসেছিল, ওরা এই নিষেধ বা টাবু ভাঙতে শুরু করে। বিয়ের আগে ওদের বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে এক বিছানায় শুতে শুরু করল। সিবেলও মাঝে মাঝে নিজেকে ওদের মতো ‘সাহসী’ মনে করত, সেও আজ থেকে এগারো মাস আগে প্রথম আমার সঙ্গে শুয়েছিল। তবে একথাটা বলে সে মনে করে যে, এই ব্যবস্থা যথেষ্ট হয়েছে এবং এবার আমাদের বিয়ে করা উচিত। আমি আমার বাগদত্তার সাহস নিয়ে অথবা মেয়েদের ওপর যৌন নিপীড়নের আলোকে, বিষয়টা সম্পর্কে বাড়িয়ে বলতে চাই না। কারণ সিবেল যখন দেখল, যে আমার ‘উদ্দেশ্য সত্’, আর যখন নিশ্চিত হলো যে, ‘আমি এমন একজন মানুষ যার ওপর আস্থা রাখা যায়’—অথবা অন্যভাবে বলা যায় যখন সে সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিত হলো যে পরিশেষে আমাদের বিয়ে হবে, তখন সে আমার কাছে আত্মসমর্পণ করল। আমি নিজেকে একজন সজ্জন এবং দায়িত্ববান লোক মনে করতাম এবং তাকে বিয়ে করারও আমার সদিচ্ছা ছিল। তবে বিয়ে করার ইচ্ছা না থাকলেও, এক্ষেত্রে আর কোনো উপায় ছিল না, কারণ আমার কাছে সে তার ‘কুমারীত্ব হারিয়েছিল’। আর বিয়ের আগেই দৈহিকভাবে মিলিত হওয়ার কারণে আমাদের মাঝে একটা অলীক ধারণা ছিল যে, আমরা ‘মুক্ত এবং আধুনিক’ আর এটা নিয়ে আমরা বেশ গর্বও করতাম।  তবে কিছুদিন পরই এটা বোঝা হয়ে আমাদের ওপর একটা কালো ছায়া ফেলেছিল। একদিক দিয়ে অবশ্য এ ব্যাপারটা আমাদেরকে পরস্পরের কাছাকাছি এনেছিল।

প্রত্যেকবার উদ্বিগ্ন হয়ে সিবেল যখন ইঙ্গিত করত যে, শিগগিরই আমাদের একটা তারিখ ঠিক করা দরকার তখন আমাদের দুজনের ওপর একটা কালো ছায়া এসে ঢেকে ফেলত। কিন্তু এমন অনেক সময় ছিল যখনই সিবেল আর আমি অফিসের অন্ধকারে আনন্দ উপভোগ করতাম তখন আমরা খুব খুশিই থাকতাম। আর মনে পড়ে অফিসের অন্ধকারে যখন দুই হাত দিয়ে ওকে জড়িয়ে ধরে বসে থাকতাম, বাইরে তখন হালাসকারগাজি অ্যাভিনিউ থেকে ঘর্ঘর শব্দ করে আসা বাসের শব্দ ভেসে আসত আর তখন আমি নিজেকে বলতাম, আমি কত সৌভাগ্যবান আর বাকি জীবন এভাবেই পরিতৃপ্ত হয়ে কাটাব।

যেদিন পার্সটা কিনেছিলাম, সেদিন সন্ধ্যায় ‘ফুয়ায়’ ডিনার টেবিলে আমি সিবেলকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আচ্ছা, এখন থেকে আমরা যদি মেরহামেত অ্যাপার্টমেন্টে আমার মায়ের ফ্ল্যাটে দেখা করি তাহলে কেমন হয়? এর বাইরে সুন্দর একটা বাগানও আছে।’

সে জিজ্ঞেস করল, ‘বিয়ের পর আমাদের নিজেদের বাড়িতে উঠতে কি দেরি হওয়ার আশঙ্কা করছো?’

‘না ডার্লিং, সে-রকম কিছু ভেবে আমি কথাটা বলিনি।’

‘লুকিয়ে লুকিয়ে একজন উপপত্নীর মতো কোনো গোপন অ্যাপার্টমেন্টে আমি দেখা করতে চাই না।’

‘ঠিক বলেছো।’

 ‘ওই অ্যাপার্টমেন্টে দেখা করার ধারণাটা কোথা থেকে পেলে?’

আমি বললাম, ‘সেটা নিয়ে মাথা ঘামাবার দরকার নেই।’ তারপর চারপাশের উত্ফুল্ল লোকজনের ভিড়ের দিকে তাকিয়ে প্লাস্টিক ব্যাগের ভেতর থেকে পার্সটা বের করলাম।

 একটা উপহার এনেছি ভেবে সিবেল জিজ্ঞস করল, ‘এটা কী?’

‘এটা একটা সারপ্রাইজ! খুলেই দেখ।’

‘সত্যিই তা-ই?’ তারপর প্লাস্টিক ব্যাগটা খুলে যখন সে পার্সটা দেখল, তখন তার চেহারায় যে শিশুসুলভ খুশিটা ছিল, তা প্রথমে একটা কৌতূহল তারপর একটা হতাশার রূপ নিল, যা সে লুকাবার চেষ্টা করছিল।

আমি বললাম, ‘তোমার মনে আছে? গত রাতে যখন হেঁটে তোমার বাড়ির দিকে যাচ্ছিলাম, তখন তুমি ওই দোকানের জানালায় এটা দেখে খুব প্রশংসা করছিলে?’

‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, তা-ই তো। সত্যি তুমি কিন্তু অন্যের প্রয়োজনের দিকে খুবই খেয়াল রাখো।’

 ‘তুমি এটা পছন্দ করেছ, সেজন্য আমি খুব খুশি। এনগেজমেন্ট পার্টিতে এটা তোমার হাতে খুব মানাবে।’

সিবেল বলল, ‘কথাটা বলতে আমার কষ্ট হচ্ছে, তবে এনগেজমেন্ট পার্টিতে আমি যে পার্সটা নেব সেটা অনেক আগেই পছন্দ করা হয়েছে। আহা, এত মন খারাপ করো না! এত কষ্ট করে ছুটে গিয়ে এই সুন্দর পার্সটা আমার জন্য কিনে এনেছ... আচ্ছা ঠিক আছে তাহলে শোন, এখন আবার মনে করো না যে আমি তোমার ওপর নিষ্ঠুরতা দেখাচ্ছি। এই পার্সটা আমি কখনও আমাদের এনগেজমেন্ট পার্টিতে আমার হাতে নিতে পারতাম না, কারণ এটা একটা নকল পার্স!’

‘কী বললে?’

‘হ্যাঁ, মাই ডিয়ার কামাল, এটা আসল জেনি কোলন নয়। এটা একটা ইমিটেশন।’

‘তুিম কী করে জানলে?’

‘শুধু একবার দেখে। দেখেছ, লেবেলটা কীভাবে চামড়ার সঙ্গে সেলাই করা হয়েছে? এখন এই আসল জেনি কোলন ব্যাগটার সেলাই দেখ, যেটা আমি প্যারিস থেকে কিনে এনেছি। বিনা কারণে এরা শুধু ফ্রান্স নয় পুরো পৃথিবীতে একটা ব্রান্ড হিসেবে পরিচিত হয়নি। ওরা কখনও এরকম সস্তা সুতা ব্যবহার করবে না।’

আসল সেলাইটার দিকে তাকিয়ে এক মুহূর্তের জন্য আমি ভাবছিলাম, আমার ভাবী বধূ কেন এরকম বিজয়ীর সুরে কথা বলছিল। সিবেল একজন অবসরপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূতের মেয়ে, যিনি বহু আগেই তার পাশা পিতামহের জমি বিক্রি করে দিয়ে এখন কপর্দকশূন্য হয়েছেন। কাজেই এটা তাকে একজন সরকারি কর্মকর্তার মেয়ে বানিয়েছে আর এই সামাজিক অবস্থানটার কথা ভেবে সে অনেকসময় অস্বস্তি আর নিরাপত্তহীনতায় ভুগত। তারপর উদ্বিগ্নভাবটা কেটে গেলেই, সে তার দাদির কথা বলত, যিনি পিয়ানো বাজাতেন কিংবা তার দাদার কথা বলত, যিনি স্বাধীনতা যুদ্ধে লড়াই করেছিলেন। কিংবা অনেকসময় আমাকে জানাত ওর নানা সুলতান আবদুলহামিদের কীরকম ঘনিষ্ঠ ছিলেন। তবে তার এই সলজ্জভাবটা আমার মনে দোলা জাগাত আর এজন্য আমি তাকে আরো ভালোবাসতাম। সত্তর  দশকের প্রথমদিকে টেক্সটাইল আর রপ্তানি বাণিজ্যের প্রসার শুরু হতেই আর ইস্তাম্বুলের জনসংখ্যা তিনগুণ বেড়ে যাওয়ায়, শহর আর আমাদের জমির মতো এর আশেপাশের জায়গাজমির দাম আকাশচুম্বী হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এর সুবাদে গত দশকে আমার বাবার ধনসম্পদ অসম্ভব রকম বেড়ে পাঁচগুণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তা সত্ত্বেও আমাদের বাসমাকি উপাধি অর্থাত্ ‘কাপড়ে ছাপশিল্পী বা নকশাকার’ থেকে নিঃসন্দেহে বোঝা যেত যে প্রজন্মের পর প্রজন্ম কাপড় উত্পাদন করা থেকে আমাদের সম্পদ অর্জিত হয়েছে। কাজেই আমাদের ক্রমবর্ধমান উন্নতি সত্ত্বেও ‘নকল পার্সটা’ দেখে আমি অস্বস্তিবোধ করলাম।

আমার মন খারাপ হতে দেখে, সিবেল আমার বাহুতে হাত বুলিয়ে বলল, ‘এই ব্যাগটার জন্য কত দাম দিয়েছিলে?’

আমি বললাম, ‘দেড় হাজার লিরা। তবে তুমি যদি এটা না চাও, তবে কালই বদলে অন্য কিছু আনবো।’

 ‘এর বদলে আর কিছু এনো না ডার্লিং, তুমি বরং টাকাটা ফেরত চেও। কারণ ওরা সত্যি তোমাকে ঠকিয়েছে।’

আতঙ্কিত হয়ে ভ্রু উঁচু করে আমি বললাম, ‘ওই দোকানটার মালিক শেনি হানিম তো আমাদের দূর সম্পর্কের আত্মীয় হন।’

সিবেল ব্যাগটা হাতে নিল, তারপর একটা কোমল হাসি দিয়ে বলল, ‘তুমি এত কিছু জানো, এত বুদ্ধিমান আর কালচার্ড, অথচ দেখ তোমার কোনো ধারণা নেই যে, মেয়েরা কত সহজে তোমাকে বোকা বানাতে পারে।’

পরদিন দুপুরবেলা আমি একই প্লাস্টিকব্যাগে পার্সটা ভরে আবার সাঁজেলিজে বুটিকে গেলাম। হেঁটে ভেতরে ঢুকতেই আবার টুংটাং ঘণ্টা বেজে উঠল আর আজও দোকানের ভেতরটা এতই অন্ধকার ছিল যে, ভাবলাম হয়তো দোকানে কেউ নেই। আধো অন্ধকার দোকানটির আজব নীরবতার মধ্যে ক্যানারি পাখিটি চিক-চিক-চিক করে গেয়ে উঠল। তারপর একটা ফুলদানির ওপর সুগন্ধি ফুল গাছের পাতার মাঝখানে একটা পর্দার মধ্য দিয়ে ফুসুমের ছায়াটা দেখতে পেলাম। সে তখন মোটামতো একজন মহিলাকে সাহায্য করছিল, তিনি তখন ট্রায়াল রুমে একটা পোশাকের ট্রায়াল দিচ্ছিলেন। এবার ফুসুম কচুরিপানার সঙ্গে লতাপাতায় জড়ানো জংলি ফুলের একটা প্রিন্টেড কাপড়ের তৈরি সুন্দর, ফোলানো ব্লাউজ পরেছিল। পর্দার ফাঁক দিয়ে আমাকে দেখে সে একটা মিষ্টি হাসি দিল।

ফিটিংরুমের দিকে ইঙ্গিত করে আমি বললাম, ‘ব্যস্ত মনে হচ্ছে।’

সে বলল, ‘এখানে আমার কাজ প্রায় শেষ হয়ে এসেছে।’

চোখে পড়ল ক্যানারি পাখিটা একটা খাঁচার মধ্যে ওপর-নিচ লাফালাফি করছে, এক কোণে এক গাদা ফ্যাশন ম্যাগাজিন স্তূপ করে রাখা, আর ইউরোপ থেকে আমদানি করা বিভিন্ন ধরনের জিনিসপত্র এখানে সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে, কিন্তু কোনো কিছুতে আমি মনোযোগ দিতে পারছিলাম না। যতই সাধারণ মনে করে ব্যাপারটা মন থেকে ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করি না কেন, চমকে দেওয়ার মতো সত্য কথাটা স্বীকার না করে পারব না। যখনই ফুসুমের দিকে তাকালাম তখনই মনে হলো খুব চেনা পরিচিত কাউকে যেন দেখছি, এমন কাউকে যাকে আমি বেশ ঘনিষ্ঠভাবে চিনি। আমার সঙ্গে ওর চেহারায় বেশ মিল দেখা যাচ্ছে। একইরকম চুল, যা ছোটকালে কোঁকড়া আর কালো ছিল আর বড় হলেই সোজা হয়ে যায়। ওর গায়ের পরিষ্কার রঙের সঙ্গে এখন ওর চুলটা সোনালি শেড করা হয়েছে, আর এটা ওর পরনের ছাপা ব্লাউজের সঙ্গে খুব ম্যাচ করেছে। আমার মনে হচ্ছিল যেন, আমি বেশ সহজেই নিজেকে ওর জায়গায় বসিয়ে খুব গভীরভাবে তাকে বুঝতে পারব। একটা বেদনাদায়ক স্মৃতি মনে পড়ল : আমার বন্ধুরা ওকে ‘প্লেবয় ম্যাগাজিন থেকে উঠে আসা’ একজন হিসেবে উল্লেখ করত। সে কি আসলেই ওই লোকদের সঙ্গে শুয়েছে? মনে মনে নিজেকে বললাম, ‘পার্সটা ফেরত দিয়ে টাকাটা নিয়ে বেরিয়ে যাও। কারণ শিগগিরই একজন চমত্কার মেয়ের সঙ্গে তোমার এনগেজমেন্ট হতে যাচ্ছে।’ আমি ঘুরে বাইরের দিকে নিসানতাসি স্কোয়ারের দিকে তাকালাম, কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই ধোঁয়াটে কাচের গায়ে ভূতের মতো ফুসুমের প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠল। 

ফিটিং রুমের মহিলাটি একটা স্কার্টে ট্রায়াল দিয়ে সেটা আবার খুলে হাঁপাতে হাঁপাতে বের হলেন এবং কিছু না কিনেই দোকান থেকে বের হয়ে গেলেন। ফুসুম জিনিসটা আবার ঠিকঠাকমতো ভাঁজ করে জায়গামতো রেখে দিল। তারপর ওর সুন্দর ঠোঁটজোড়া ঘুরিয়ে বলল, ‘গতকাল সন্ধ্যায় আপনাকে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যেতে দেখেছি।’ সে একটা হালকা গোলাপি রঙের লিপস্টিক ঠোঁটে লাগিয়েছিল। মিসলিন নামে সাধারণ একটা তুর্কি ব্রান্ড হলেও তার ঠোঁটে এটা দেখতে অত্যন্ত আকর্ষণীয় এবং মোহনীয় মনে হচ্ছিল।  

আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘কখন তুমি আমাকে দেখলে?’

‘কাল সন্ধ্যায়। আপনি সিবেল হানিমের সঙ্গে ছিলেন। আমি রাস্তার অন্যপাশের ফুটপাথ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলাম। আপনারা কি কোথাও খেতে যাচ্ছিলেন?’

‘হ্যাঁ।’

সুখী কোনো তরুণ-তরুণী দেখে খুশি হয়ে বয়স্করা যেমন মন্তব্য করেন সে-রকমভাবে সে বলল, ‘আপনাদের দুজনকে বেশ মানিয়েছে।’ 

 আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম না—সে কীভাবে সিবেলকে চেনে। ব্যাগটা বের করে আমি বললাম, ‘তোমাকে একটা ছোট্ট উপকার করতে হবে।’ একাজটা করার সময় আমার বেশ অস্বস্তি হচ্ছিল। ‘আমরা এই ব্যাগটা ফেরত দিতে চাই।’

 ‘অবশ্যই। এটার বদলে অন্য কিছু আমি দিতে পারলে খুব খুশি হব। আপনি ইচ্ছা করলে এই নতুন দাস্তানাজোড়া আর এই টুপিটা নিতে পারেন। এগুলো সবে মাত্র প্যারিস থেকে আনা হয়েছে। সিবেল হানিমের কি ব্যাগটা পছন্দ হয়নি?’

লজ্জিতমুখে আমি বললাম, ‘এটা আমি বদলাতে চাই না। আমি এর টাকাটা ফেরত চাইতে এসেছি।’

একথা শুনে সে একটা ধাক্কা খেল, এমনকি মনে হলো একটু ভয়ও পেয়েছে। সে জিজ্ঞেস করল, ‘কেন, কী হয়েছে?’

আমি ফিসফিস করে বললাম, ‘আপাত মনে হয় এই ব্যাগটা আসল জেনি কোলন নয়। এটা একটা নকল জিনিস মনে হচ্ছে।’ 

 ‘কী?’

নিরুপায় হয়ে বললাম, ‘আমি আসলে  এসব ব্যাপার ভালো বুঝি না।’

সে একটু রুঢ় স্বরে বলল, ‘এ ধরনের ব্যাপার এখানে কখনও ঘটে না। আপনি কি এখুনি টাকাটা ফেরত চান?’

আমিও বোকার মতো হঠাত্ বলে ফেললাম, ‘হ্যাঁ!’

তাকে দেখে মনে হচ্ছিল, সে মনে খুব কষ্ট পেয়েছে। আমি ভাবলাম, হায় খোদা, কেন আমি ব্যাগটা ফেলে দিয়ে সিবেলকে বললাম না যে টাকাটা ফেরত পেয়েছি? মুখে হাসি আনার ব্যর্থ চেষ্টা করে আমি বললাম, ‘দেখ, এ ব্যাপারে তোমার আর শেনি হানিমের কিছুই করার নেই। আমরা তুর্কিরা, মাশাল্লাহ ইউরোপীয় যেকোনো ফ্যাশনের নকল বানাই। আর আমার নিজের কিংবা ধরো আমাদের নিজেদের বেলায়ও বলা যায়—একটা ব্যাগের কাজ হলো একজন মহিলার হাতে সুন্দরভাবে মানিয়ে যাওয়া, এটা হলেই হলো। কী ব্রান্ড, কে বানিয়েছে আর এটা আসল কি-না তা জরুরি নয়।’ তবে আমার মনে হলো, আমার মতো ফুসুমও আমি যা বলছিলাম তার একটি বর্ণও বিশ্বাস করেনি।

সে একইরকম কর্কশ কণ্ঠে বলল, ‘না, আমি আপনার টাকা ফেরত দিচ্ছি।’ আমি চুপ করে নিচের তাকিয়ে রইলাম। আমার দুর্ভাগ্যের মুখোমুখি হওয়ার জন্য অপেক্ষা করছিলাম আর আমার নিষ্ঠুর এবং বিচার-বিবেচনাহীন আচরণের জন্য লজ্জিত বোধ করছিলাম।

কথায় খুব দৃঢ়প্রতিজ্ঞ শোনালেও, মনে হলো ফুসুম যা করতে চেয়েছে, তা বোধহয় সে করতে পারছে না; ভীষণ অস্বস্তিকর মুহূর্তটার মধ্যে আজব কিছু একটা বিরাজ করছিল। সে এমনভাবে ক্যাশরেজিস্ট্রারের দিকে তাকিয়েছিল, যেন কেউ এতে একটা জাদু করেছে। যেন এটাতে ভূতের আসর হয়েছে এবং সে এটা ছুঁতে পারছিল না। তারপর যখন আমি দেখলাম তার মুখ লাল হয়ে উঠছে, আর দুই চোখে পানি টলটল করছে, আমি আতঙ্কিত হয়ে ওর দিকে দুই পা এগিয়ে গেলাম।

সে নিঃশব্দে কাঁদতে শুরু করল। আমি কখনও বুঝে উঠতে পারিনি ঠিক কীভাবে ব্যাপারটা ঘটল, তবে আমি দুই হাতে তাকে জড়িয়ে ধরলাম আর সে আমার বুকে মাথা রেখে ফুঁপিয়ে চলল। আমি ফিসফিস করে বললাম, ‘ফুসুম, আমি সত্যি দুঃখিত।’ তার নরম চুল আর কপালে হাত বুলাতে বুলাতে বললাম, ‘প্লিজ ব্যাপারটা ভুলে যাও, মনে করো এটা ঘটেনি। এটা একটা নকল পার্স, ব্যস এই। আর কিছু নয়।’

একটা ছোট শিশুর মতো সে একটা গভীর শ্বাস নিল, দু-একবার ফোঁপাল, তারপর আবার কান্নায় ভেঙে পড়ল। তার শরীর আর সুন্দর বাহুযুগল ছুঁয়ে, আমার বুকে চেপে বসা তার স্তন অনুভব করে আর সামান্য সময়ের জন্য হলেও তাকে এভাবে ধরে রাখতে পেরে আমার মাথা ঘুরতে লাগল। সম্ভবত এর কারণ আমি আমার কামনা-বাসনা চেপে রাখার চেষ্টা করছিলাম, যা প্রত্যেকবার তাকে স্পর্শ করার সঙ্গে বেড়ে যাচ্ছিল কিংবা মানসপটে অলীক যে ধারণাটি লালন করছিলাম যে অনেক বছর ধরে আমরা পরস্পরকে চিনি আর খুব ঘনিষ্ঠ ছিলাম। তাকে মনে হচ্ছিল দুঃখে কাতর ছোট্ট মিষ্টি বোনটি, যাকে সান্ত্বনা দিয়েও থামানো যায় না! আর একটা মুহূর্ত আমার মনে হলো, দূর সম্পর্কের হলেও আমরা আত্মীয় আর সম্ভবত সেজন্যই দীর্ঘ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ, নরম হাড় এবং পেলব কাঁধসহ তার শরীর আমার নিজেকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছিল। আমি যদি একটি মেয়ে হতাম আর বারো বছরের ছোট হতাম, তাহলে আমার দেহও এরকম হতো। তার সোনালি চুলে হাত বুলাতে বুলাতে আমি বললাম, ‘এটা নিয়ে মন খারাপ কোরো না।’

এবার সে ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করল, ‘আপনার টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য ক্যাশবাক্সটা খুলতে পারছি না। আমার খুব লজ্জা লাগছে বলতে, শেনি হানিম দুপুরে লাঞ্চে বাড়ি যাওয়ার সময় ক্যাশবাক্স বন্ধ করে চাবিটা সঙ্গে নিয়ে যান।’ আমার বুকে মাথা ঠেকিয়ে সে আবার কাঁদতে শুরু করল আর আমিও বেশ সতর্কভাবে এবং সমবেদনার সঙ্গে তার চুলে হাত বুলিয়ে চললাম। ফুঁপাতে ফুঁপাতে সে বলল, ‘আমি শুধু মানুষজনের সঙ্গে মেলামেশা করার জন্য আর সময় কাটাবার জন্য এখানে কাজ করি। টাকার জন্য নয়।’

আর এদিকে আমিও বোকার মতো নির্মমভাবে বললাম, ‘টাকার জন্য কাজ করার মধ্যে লজ্জার কিছু নেই।’

মনমরা হয়ে একটা ছোট বাচ্চার মতো সে বলল, ‘হ্যাঁ, আমার বাবা একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক... দুই সপ্তাহ আগে আমার বয়স আঠারো হয়েছে। আর আমি তার ওপর একটা বোঝা হয়ে থাকতে চাচ্ছিলাম না।’

আমার ভেতরের পশুটা এখন মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে চাচ্ছে টের পেয়ে, আমি ওর চুল থেকে আমার হাত সরিয়ে নিলাম। সেও মনে হয় সঙ্গে সঙ্গে ব্যাপারটা বুঝতে পেরে নিজেকে সামলে নিল। আমরা দুজনেই একটু পিছু হটলাম।

চোখ মুছতে মুছতে সে বলল, ‘প্লিজ, আমার কান্নার কথা কাউকে বলবেন না।’ 

আমি বললাম, ‘ঠিক আছে কথা দিলাম। দুজন বন্ধুর মাঝে এটা একটা পবিত্র শপথ, ফুসুম। আমাদের গোপন ব্যাপার নিয়ে আমরা পরস্পরকে বিশ্বাস করতে পারি।’

দেখলাম তার মুখে মৃদু হাসির রেখা ফুটে উঠেছে। আমি বললাম, ‘পার্সটা এখানে রেখে যাচ্ছি। পরে এসে টাকাটা নিয়ে যাব।’

‘ব্যাগটা এখানে রেখে যেতে পারেন, এটা আপনার ইচ্ছা। তবে টাকার জন্য আপনার আবার ফিরে না আসাই বরং ভালো হবে। শেনি হানিম কখনও স্বীকার করবেন না যে, এটা একটা নকল জিনিস আর এই কথাটা তোলার জন্য বরং আপনাকে পস্তাতে হবে।’

আমি বললাম, ‘তাহলে এটার বদলে কিছু একটা নিয়ে যাই।’ 

এবার একজন গর্বিত আর রগচটা বালিকার মতো সে বলল, ‘সেটা আর এখন আমি করতে পারবো না।’

আমি বললাম, ‘না, না, সত্যি বলছি এটা করার আর তেমন প্রয়োজন নেই।’

সে দৃঢ়ভাবে বলল, ‘আমার দরকার আছে। শেনি হানিম দোকানে ফিরে এলে আমি তার কাছ থেকে টাকাটা নিয়ে নেব।’

 উত্তরে আমি বললাম, ‘আমি চাই না যে, এবিষয়ে ওই মহিলা তোমাকে কোনো ঝামেলায় ফেলুক।’          

সে একটা ক্ষীণ হাসি দিয়ে বলল, ‘এটা নিয়ে আপনার দুশ্চিন্তা করার দরকার নেই। কীভাবে এটা করতে হবে সে রাস্তা আমি খুঁজে পেয়েছি। আমি তাকে বলব যে, সিবেল হানিমের ঠিক এরকমই একটা ব্যাগ আছে, তাই তিনি এটা ফেরত দিতে চাচ্ছেন। ঠিক আছে না?’

আমি বললাম, ‘অপূর্ব। তবে একথাটা বরং আমিই শেনি হানিমকে বললে হয় না?’

ফুসুম জোর দিয়ে বলল, ‘না, আপনার কিছু বলার দরকার নেই। কারণ তিনি শুধু চালাকি করে আপনার কাছ থেকে ব্যক্তিগত খবর বের করার চেষ্টা করবেন। আপনার দোকানে আসারই দরকার নেই। টাকাটা আমি আসিয়া আন্টির কাছে পৌঁছে দেবো।’

‘উঁহু, আমার মাকে এর সঙ্গে জড়িয়ো না। তিনি আরো বেশি কৌতূহলী হতে পারেন।’

এবার ভুরু উঁচু করে ফুসুম জিজ্ঞেস করল, ‘তাহলে টাকাটা কোথায় আপনাকে দেবো?’  

আমি বললাম, ‘১৩১ নম্বর তেসভিকিয়া অ্যাভিনিউ-এর, মারহামেত অ্যাপার্টমেন্টে আমার মায়ের একটা ফ্ল্যাট আছে। আমেরিকা যাওয়ার আগে আমি ওখানে গিয়ে পড়াশোনা করতাম আর গান শুনতাম। এটা চমত্কার একটা জায়গা, পেছনে একটা বাগান আছে... দুটা থেকে চারটার মধ্যে লাঞ্চের সময় এখনও আমি ওখানে যাই। অফিসের কিছু কাগজপত্র নিয়ে সেখানে কিছুক্ষণ বসে কাজ করি।’

‘হ্যাঁ, তা তো বটেই। ঠিক আছে টাকাটা সেখানেই আপনার হাতে পৌঁছে দেবো। অ্যাপার্টমেন্ট নম্বরটা যেন কত?’

ফিসফিস করে বললাম, ‘চার নম্বর।’ এরপরের শব্দগুলো আমার মুখ থেকে বের হতেই চাচ্ছিল না, মনে হচ্ছিল যেন, গলায় আটকে আছে। ‘দোতলা। এবার চলি।’ 

পুরো ব্যাপারটার একটা ছবি মনে ভেসে উঠতেই বুকটা প্রচণ্ডভাবে ঢিপঢিপ করতে লাগল। ছুটে বাইরে বের হওয়ার আগে, সমস্ত শক্তি সঞ্চিত করে এমন ভাব করলাম যেন অস্বাভাবিক কিছুই হয়নি, তারপর পেছন ফিরে শেষ একবার তার দিকে তাকালাম। রাস্তায় বের হতেই আমার লজ্জা আর অপরাধবোধের সঙ্গে এপ্রিলের সেই দুপুরের অপ্রত্যাশিত উষ্ণতার সেই পরম সুখের ছবিগুলো মিলেমিশে এমন এক অবস্থার সৃষ্টি হলো যে, আমার মনে হলো যেন নিসানতাসি স্ট্রিটের ফুটপাথগুলো রহস্যময় একটা হলুদ আলোয় উদ্ভাসিত হয়েছে। বড় বড় বিল্ডিং-এর ছাদের ঢালু অংশ আর বিভিন্ন দোকানের জানালার নীল-সাদা স্ট্রাইপ দেওয়া চাঁদোয়ার নিচের ছায়াঘেরা ফুটপাথ দিয়ে আমি হেঁটে চললাম। এরকম একটা জানালায় একটা হলুদ জগ চোখে পড়তেই, হঠাত্ অনুভব করলাম যে, এটা আমাকে কিনতেই হবে আর সঙ্গে সঙ্গে ভেতরে গিয়ে জগটা কিনে ফেললাম। গত বিশ বছর ধরে একইরকম একটা হলুদ জগ ডিনার টেবিলে রাখা থাকলেও কেউ কখনও এটার সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করেনি। অথচ এই টেবিলে প্রথমে বাবা আর মা আর তারপর আমি আর আমার মা খাওয়াদাওয়া করতাম। প্রত্যেকবার এই জগটার হাতল ছুঁতেই, আমার সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়ত যখন আমি প্রথম সেই মর্মযন্ত্রণা অনুভব করেছিলাম যা আমাকে যৌনানুভূতি দিয়েছিল।

বাড়ি ফিরে মাকে একটা চুমু দিলাম; আমাকে এত তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে দেখে মা খুশি হলেও সঙ্গে সঙ্গে একটু অবাকও হলেন। আমি তাকে বললাম, হঠাত্ খেয়ালের বশে এই জগটা কিনে ফেলেছি।  তারপর বললাম, ‘মারহামেত অ্যাপার্টমেন্টের চাবিটা একটু দেবে? অনেক সময় অফিসে এত শব্দ হয় যে, আমি ঠিকমতো কাজে মনোযোগ দিতে পারি না। তাই ভাবলাম অ্যাপার্টমেন্টে গিয়ে কাজ করলে হয়তো একটু সুবিধা হবে। আগে যখন বয়স কম ছিল তখন ওখানে বেশ আরামে কাজ করতে পারতাম।’

মা বললেন, ‘ওখানে তো এখন এক ইঞ্চি ধুলা থাকার কথা।’ তবে তিনি সোজা তার কামরায় গিয়ে ওই বিল্ডিং-এর চাবিটা নিয়ে এলেন। অ্যাপার্টমেন্টের চাবির সঙ্গে লাল একটা রিবনে এটা বাঁধা ছিল। চাবিটা আমার হাতে তুলে দিয়ে তিনি বললেন, ‘তোমার সেই লাল ফুল খোদাইকরা কুতাহিয়া ফুলদানিটার কথা মনে আছে? বাড়িতে কোথাও এটা খুঁজে পাচ্ছি না। ওখানে একটু খুঁজে দেখো তো,  জিনিসটা আমি ওখানে নিয়ে গিয়েছিলাম কি-না কে জানে?  আর শোন, বেশি খাটাখাটি করার দরকার নেই... তোমার বাবা সারা জীবন এত পরিশ্রম করেছেন, যাতে তোমরা জীবনে কিছুটা আনন্দ পেতে পারো। তোমাদের সুখী হওয়ার দরকার। সিবেলকেও সঙ্গে নিয়ে যাও আর বসন্তের হাওয়া উপভোগ করো।’ তারপর চাবিটা আমার হাতে গুঁজে দিয়ে এক অদ্ভুত দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘সাবধানে থেকো!’ যখন আমরা ছোট ছিলাম তখন তিনি এইভাবেই আমাদের দিকে তাকিয়ে সাবধান করে বলতেন, জীবনে অনেক অপ্রত্যাশিত বিপদ-আপদ আছে যা অনেক গভীর এবং প্রতারণাপূর্ণ, যেমন একটা চাবি ঠিকমতো সামলে রাখতে ব্যর্থ হওয়া।

(মরিন ফ্রিলি কর্তৃক তুর্কি থেকে ইংরেজিতে অনুবাদের বঙ্গানুবাদ)

 

------------------------

ওরহান পামুক একজন তুর্কি ঔপন্যাসিক, সংলাপ রচয়িতা ও শিক্ষাবিদ। জন্ম ইস্তাম্বুল ৭ জুন ১৯৫২।  ২০০৬ সালে তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। তুরস্কের অন্যতম এই লেখকের রচিত পুস্তকসমূহ ৬৩টি ভাষায় সর্বমোট  ১ কোটি ৩০ লক্ষ কপি বিক্রি হয়েছে।

তাঁর রচিত উপন্যাসগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—দি হোয়াইট ক্যাসেল, দি ব্ল্যাক বুক, দি নিউ লাইফ, মাই নেইম ইজ রেড, দি মিউজিয়াম অব ইনোসেন্স এবং অ্যা স্ট্রেঞ্জনেস ইন মাই মাইন্ড।

তুর্কি ঔপন্যাসিকদের মধ্যে তিনিই প্রথম সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। এছাড়া তিনি আরো অনেক সাহিত্য পুরস্কারে ভূষিত হন। ‘মাই নেইম ইজ রেড’ উপন্যাসটি ২০০২ সালের প্রিক্স ডু মিলার লিভর এ ট্র্যাঙ্গার, একই বছরের প্রিমিও গ্রিনজেন ক্যাভোর এবং ২০০৩ সালের ইন্টারন্যাশনাল ডাবলিন লিটারেরি অ্যাওয়ার্ড অর্জন করে। 

ইস্তাম্বুলের একটি সচ্ছল বনেদি পরিবারে ১৯৫২ সালে ওরহান পামুকের জন্ম। এ পরিবারে বড় হয়ে ওঠার অভিজ্ঞতার কথা তিনি তাঁর রচিত উপন্যাস, দি ব্ল্যাক বুক বা কারা কিতাব এবং সেভডেট অ্যান্ড হিজ সন্স উপন্যাস ছাড়াও তাঁর আত্মচরিত ‘ইস্তাম্বুল’-এ আরো বিশদভাবে তুলে ধরেন।  

১৯৭৪ সাল থেকে তিনি নিয়মিত সহিত্যচর্চা শুরু করেন। ডার্কনেস অ্যান্ড লাইট নামে রচিত তাঁর প্রথম উপন্যাসটি ১৯৭৯ সালে মিলিয়েত প্রেস নভেল প্রতিযোগিতায় পুুরস্কৃত হয়। এই উপন্যাসটি মি. সেভডেট অ্যান্ড হিজ সন্স নামে ১৯৮২ সালে প্রকাশিত হয় এবং ১৯৮৩ সালে ওরহান কামাল নভেল পুরস্কার লাভ করে। এতে ইস্তাম্বুলের নিসানতাসি এলাকার যে অঞ্চলে ওরহান পামুক বড় হয়েছেন, সে জায়গার একটি বনেদি পরিবারের তিন প্রজন্মের কাহিনি তুলে ধরা হয়েছে।    

বর্তমানে তিনি একজন রবার্ট ইক-ফং অধ্যাপক হিসেবে কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে সাহিত্য রচনা এবং তুলনামূলক সাহিত্য বিষয়ে শিক্ষকতা করছেন। d

 

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
২১ জুন, ২০১৮ ইং
ফজর৩:৪৩
যোহর১২:০০
আসর৪:৪০
মাগরিব৬:৫১
এশা৮:১৬
সূর্যোদয় - ৫:১১সূর্যাস্ত - ০৬:৪৬
পড়ুন