গল্প
সেই ঝড়ের পরের গল্প
মুস্তাফিজ শফি২১ জুন, ২০১৭ ইং
সেই ঝড়ের পরের গল্প
অলঙ্করণ :আল নোমান

এত ভোরে অপরিচিত নম্বরের ফোন সাধারণত সে ধরে না। পরপর তিনবার আসার পর মনে হলো, ফোনটা বোধ হয় জরুরি। এবার ধরল সে।

‘শামীম, তোমার ভাইয়ের অবস্থা খুবই খারাপ। আমরা হেলিকপ্টারে করে ঢাকায় নিয়ে আসতেছি। তুমি একটু সহযোগিতা করো ভাই। হেলিকপ্টার পুরান এয়ারপোর্টে ল্যান্ড করবে। সেখানে অবশ্যই থেকো তুমি।’

এরপর ফোন থেকে শুধু কান্নার শব্দ। শামীম বুঝতে পারছে না ফোনটি কার। তার কোন ভাই অসুস্থ।

‘দেখুন, আপনার ফোনটা আমার কাছে সেভ করা নেই। আমি বুঝতে পারছি না কে অসুস্থ। আমাকে একটু খুলে বলুন।’

‘তুমি আমার কণ্ঠস্বরও ভুলে গেছ শামীম?’

‘এখন অভিমানের সময় নয়। রোগীর অবস্থা যেহেতু খারাপ আগে সব খুলে বলুন। পরে না হয়, যা শাস্তি দেওয়ার দিয়েন। আমারও মনে হচ্ছে আপনি আমার খুব চেনা কেউ। কিন্তু হঠাত্ করে কণ্ঠস্বর চিনতে পারছি না।’

‘আমি তোমার বীথি ভাবি। এবার চিনতে পারলে? নাকি আবার জিজ্ঞেস করবে কোন বীথি ভাবি?’

‘ওহহো...। আমি ক্ষমাহীন অপরাধ করে ফেলেছি ভাবি। সেই ১৫/১৬ বছর আগে শোনা কণ্ঠস্বর কি আর সব সময় কানে থাকে? এবার বলো সোহেল ভাইয়ের কী হয়েছে?’

‘সিভিয়ার হার্ট অ্যাটাক। ডাক্তার ইনজেকশন দিয়ে রেখেছে। আমরা ১০টার দিকে এসে পৌঁছাবো ঢাকায়। হাসপাতালে অলরেডি কথা বলা হয়েছে। এখানকার ডাক্তার রেফার করেছেন। তোমার ফোন নম্বরটি পেতেই দেরি হলো। আমার বড়টা তো দেশের বাইরে, তুমি জানো। আর ছোটটা এখনও দায়িত্ব নেওয়ার মতো বড় হয়নি। এই বিপদের সময় তুমি ছাড়া আর অন্য কাউকে পাশে চিন্তা করতে পারছি না ভাই।’

ভাবির গলা আবার ধরে আসে।

‘কোনো চিন্তা করো না। আমি ১০টার মধ্যে এয়ারপোর্টে থাকবো। হাসপাতালকে বলো অ্যাম্বুলেন্স পাঠাতে।’

‘ওগুলো আগে থেকেই ঠিক করে রাখা আছে। তুমি শুধু আমার পাশে থেকো। ঢাকায় তো আমি বেশি কিছু চিনবো না। আচ্ছা তোমার বউ শম্পা কেমন আছে? আর ছেলেটা, নাম জানি কী?’

‘সবাই ভালো আছে। ঢাকায় আসলে সরাসরিই দেখতে পাবে। এখন তুমি ফোন রাখো, দ্রুত রেডি হতে হবে তোমার।’

‘জানো শামীম, তোমাকে ফোনে পাওয়ার পর আমার সাহস এখন অনেক বেড়ে গেছে।’

‘অবশ্যই মনে সাহস রাখতে হবে। আমি তো টাইম টু টাইম যোগাযোগ রাখবোই। হেলিকপ্টারে উঠে সবশেষ একটা ফোন দিও আমায়।’

ফোন রেখে ধপাস করে ড্রইং রুমের সোফায় বসে পড়ে শামীম। বীথি ভাবির কণ্ঠস্বর সে চিনতে পারেনি, এটা একেবারেই অন্যায় হয়ে গেছে। নিজেকেই প্রশ্ন করে, বছর বছর কি আর বড় মানুষের কণ্ঠস্বর বদলায়? তাহলে কেন সে চিনতে পারেনি? সোহেল ভাইয়ের এই অবস্থায় আজ হয়তো গলাটা একটু ভারী ছিল ভাবির। এবার নিজেকে বিষয়টি বুঝানোরও চেষ্টা করে সে।

ছেলেটার স্কুলে যাওয়ার সময় হয়ে এসেছে। ঘড়িতে অ্যালার্ম বাজছে। এবার উঠে এল শম্পাও।

‘এত ভোরে কার ফোন? বড় কোনো সমস্যা নয় তো?’

‘আরে বীথি ভাবি। ওই যে সোহেল ভাইয়ের বউ।’

‘বীথি ভাবি, সোহেল ভাই—কাউকেই তো চিনতে পারছি না?’

‘আমাদের বিয়ের দু দিন পর খুলনা থেকে তোমাকে দেখতে এসেছিল মামাতো ভাই আর তার বউ। ভাবি অনেক দুষ্টুমি করলো তোমার সঙ্গে, মনে নেই।’

‘সে তো ম্যালা দিন আগের কথা। এবার একটু একটু মনে পড়ছে। তবে নামটা একেবারেই ভুলে গেছি। তো উনাদের কী হয়েছে?’

‘উনাদের সবার না, সোহেল ভাইয়ের সিভিয়ার হার্ট অ্যাটাক। কিছুক্ষণ পরই হেলিকপ্টারে করে ঢাকায় আসছে। আমি এখন দ্রুত রেডি হয়ে এয়ারপোর্টে যাবো। সেখান থেকে অ্যাম্বুলেন্সে করে সরাসরি হাসপাতালে।’

‘আমিও কি রেডি হবো?’

‘তোমাকে তো অনেক কিছুই করতে হবে। তবে এখন থাক। আগে হাসপাতালে নিয়ে যাই আমি। পরিস্থিতি বুঝে তুমি পরে এসো।’

 

২.

হেলিকপ্টার থেকে নামিয়ে অ্যাম্বুলেন্সে করে সোহেল ভাইকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। ডাক্তার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বললেন, ‘কিছু ড্যামেজ হয়ে গেছে ঢাকায় আনতে আনতেই। তারপরও এখনও অনেক কিছু করার সুযোগ আছে। ওষুধ এবং ইনজেকশন দিয়েছি এবার ৪৮ ঘণ্টা অবজারভেশনে রাখবো। পরিস্থিতি বুঝে পরবর্তী সিদ্ধান্ত। মনে হচ্ছে ওপেন হার্ট সার্জারি লাগবে। তবে বডি আগে সেটা পারমিট করতে হবে।’

সোহেল ভাইকে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে হাসপাতালের সিসিইউ কক্ষে। আর রোগীর জন্য নেওয়া কেবিনে থাকছেন বীথি ভাবি। শামীম নিয়মিত সময় দিচ্ছে। মাঝে মাঝে ঘুরে যাচ্ছে শম্পাও। এরপরও যেন সময় কাটতে চায় না। ৪৮ ঘণ্টা পর ডাক্তার কী বলে সেটা নিয়েই যত টেনশন। সিসিইউতে নেওয়ার পর থেকে স্বাভাবিকভাবে দেখারও সুযোগ নেই। শুধু কাচের দরজার এপাশ থেকে দেখা যায় আরও অনেকের সঙ্গে সোহেল ভাইও যন্ত্রের ভেতর ডুবে আছেন। বীথি ভাবির তখন চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়তে থাকে।

ডাক্তারের বেঁধে দেওয়া ৪৮ ঘণ্টা সময় শেষ হচ্ছে আজ। সকালেই নার্স এসে বলে গেছে দুপুরে ডাক্তার এসে পুরো বিষয়টি ব্রিফ করবেন। বিথী ভাবি যেন বাইরে কোথাও বের না হন, কেবিনেই থাকেন।

ডাক্তার এসে ঢুকলেন খুব হাসিমুখেই।

‘হি ইজ আউট অব ডেঞ্জার। রোগীকে আমরা কালকে কেবিনে দিয়ে দেবো। বডি পারমিট করলে তিন দিন পর ওপেন হার্ট সার্জারি।’

ডাক্তারের কথায় এতদিনের টেনশন মুহূর্তেই উবে গেল। বীথি ভাবির মনটা আজ একটু ফুরফুরে। কিন্তু শামীমটা আসছে না কেন? এতদিন মন খারাপের কারণে কোনো খোশগল্পই হয়নি। আজ একটু গল্পে মাততে ইচ্ছে করছে। দেবর সাহেব কি আজ অফিসে খুব ব্যস্ত? ফোনটাও বন্ধ।

সারাদিনের অপেক্ষা শেষে যথারীতি শামীম এল প্রতিদিনের মতোই সেই বিকেল ৪টায়।

‘আজও দেরি করলে? আমি তো সেই দুপুর থেকেই তোমার অপেক্ষায়?’

ভাবিকে আজ একটু অন্যরকম দেখাচ্ছে। সেটা ভালো, না খারাপ বুঝতে পারছে না শামীম।

‘আমি তো অফিসে একটু ব্যস্ত ছিলাম। আর ফোনের চার্জও চলে গিয়েছিল। কেন সোহেল ভাইয়ের কি কোনো অসুবিধা হলো?’

‘আরে না। আজকে ৪৮ ঘণ্টা পার হলো, ডাক্তার বললেন, হি ইজ আউট অব ডেঞ্জার। কালকে কেবিনে দেবে। বডি পারমিট করলে তিন দিন পর ওপেন হার্ট সার্জারি।’

‘ওপেন হার্ট সার্জারি লাগবেই তাহলে? বডির ওপর বেশ চাপ যাবে তো?’

‘দেখো, তুমি ভয় পেলেও কিছু করার নেই, এই যাত্রায় যেহেতু ফিরে এসেছে আমি ওপেন হার্ট সার্জারিটা করাবোই।’

‘অবশ্যই করাবে। আমিও করানোর পক্ষে। তবে মাঝে মাঝে মনে ভয় ঢুকে যায় আরকি।’

‘আমি তো ভয় পাচ্ছি না। গত কয়েক দিনের পর আজ অনেক আনন্দেই আছি। এমনও তো হতে পারত ডাক্তার ডেকে নিয়ে বলতেন, এই রোগীর জন্য আমাদের আর কিছু করার নেই। যে কয়দিন বাঁচে এমনি বাঁচবে। খুলনা থেকে তো আমি অনেকটা সেরকম বিষয় মাথায় নিয়েই এসেছি। সেখানকার ডাক্তাররা তো টানাহেঁচড়া করতে নিষেধ করেছিল প্রথমে। আমি জেদ করে চিকিত্সার শেষটা দেখতে চেয়েছি। তারপর তারা ঢাকায় রেফার করেছে। বলো, এর বেনিফিট পাইনি? যাক এসব বাদ দাও, গত ৪৮ ঘণ্টা শরীর ও মনের ওপর দিয়ে অনেক ধকল গিয়েছে। হয়তো সামনে আরও যাবে। আগে থেকেই ভেঙে পড়ার মানুষ আমি নই। চলো আজ তোমার সঙ্গে বাইরে গিয়ে একটু কফি খাবো। তোমাদের শহর তো আমি খুব ভালো চিনি না। এখানে ভালো কফি পাওয়া যায় কোথায়?’

এবার শম্পাকে ফোন করে শামীম।

‘তুমি গ্লোরিয়া জিন্সে চলে এসো। বীথি ভাবি কফি খেতে চাচ্ছে। আমি নিয়ে যাচ্ছি।’

ফোন রাখার পর ভাবি ফোড়ন কাটেন।

‘একেবারে বউ নেওটা হয়ে গেলে দেখি। সবখানে বউকে ডাকতে হবে? ঠিক আছে অসুবিধা নেই, আসুক। মনে হচ্ছে শম্পা তোমাকে আদর সোহাগে বেশ জড়িয়ে রেখেছে। তো সব কিছু ভালোমতো করতে পারে তো?’

১৫/১৬ বছর আগের বীথি ভাবি যেন তার সামনে এসে দাঁড়ান। সেই সৌন্দর্য, সেই মোহনীয় ফিগার। শামীমের মাথাটা চক্কর দিয়ে ওঠে।

‘তুমি তো ওয়ান পিস। তোমার মতো কি আর পারে?’

এবার ভাবি একটু অপ্রস্তুত হন। তার চোখমুখ লাল হয়ে ওঠে। কথা বলতে বলতে ওরা কফি শপের উদ্দেশে রিকশায় ওঠে।

সোহেল ভাই বিদেশে থাকতেন। আর কলেজে পড়ালেখার সুবাধে শামীমও তখন যশোর ছেড়ে খুলনায়। কলেজ হোস্টেলে থাকলেও ভাবি প্রায়ই ফোন করে বাসায় ডেকে নিয়ে যেতেন। এটা ওটা রান্না করে খাওয়াতেন। আজও মনে পড়ে সেই ঝড়ের রাতের কথা। খাওয়া দাওয়া করে সে হোস্টেলের দিকে রওয়ানা দেবে, ভাবি পথ আগলে দাঁড়ালেন।

‘ঝড়-বৃষ্টির এই অবস্থায় আমি তোমাকে যেতে দিতে পারি না। তুমি আজ এখানেই থাকবে। কাল সকালে এখান থেকে গিয়েই কলেজের ক্লাস ধরো।’

বাধ্য হয়েই সে রাতে থেকে যেতে হয়েছিল তাকে।

অনেক রাত পর্যন্ত খোশগল্পের পর শামীম শুয়েছে ভাবিদের গেস্ট রুমে। সে-রাতেই টের পেলো ভাবি আসলে তার কাছ থেকে অন্য কিছু চান। বাচ্চাগুলো ঘুমিয়ে যাওয়ার পর চুপি চুপি এসে দরজা ধাক্কা দিয়ে ঘরে ঢুকে ভাবি ওর বিছানার পশে বসলেন। তার চোখে তখনও ঘুম আসেনি।

‘আমি আর পারছি না শামীম। তুমি আজ আমাকে শ্বাস বন্ধ করে মেরে ফেলো। ছয় বছর হয় তোমার ভাই বিদেশে গেছে, এর মধ্যে একবারও আসেনি। আমি কিভাবে থাকি বলো?’

ভাবির চোখে কান্না। একপর্যায়ে তিনি শামীমের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়লেন।

‘তুমি যা চাও সব দেবো তোমায়, শুধু আমাকে শান্ত করো শামীম। না হয় আমি গলায় রশি দেবো। আর পারছি না।’

সে-রাতের পরের ঘটনাগুলোতে শামীমের আর কোনো নিয়ন্ত্রণই ছিল না। তারপর সে বারবারই গিয়েছে সেখানে। মহা আদর খেকো বীথি ভাবি আদরে আদরে তাকে পাগল করে তোলেছিলেন। দু বছর পর ঢাকায় চলে এলেও মাঝে মাঝে ছুটিতে সে যশোর না গিয়ে খুলনায় ভাবির কাছে যেত। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে আরও বছর দেড়েক পর—সোহেল ভাই যখন একেবারে দেশে চলে এলেন তখন থেকে। ভাবিও তখন কেমন যেন বদলে গিয়ে পাক্কা গৃহিণী হয়ে উঠলেন।

রিকশায় শামীমের অনেকটা বিচ্ছিন্ন হয়ে বসা দেখে ভাবি ধমক লাগান।

‘কি মিয়া তুমি আজ প্রথম আমার সঙ্গে রিকশায় উঠলা? আরেকটু কাছাকাছি হয়ে বসো।’

তারপরও ইতস্তত করতে থাকে সে ।

 

ঢাকায় যেদিন প্রথম এল সেদিন বীথি ভাবি ছাড়া জীবনটাই অর্থহীন মনে হয়েছিল। সেকেন্ড ইয়ারে উঠে রিয়ার সঙ্গে যখন প্রথম পরিচয়, তখনও তার ভেতর লেপটে আছে বীথি ভাবির ছায়া।

‘আমার একজন স্বপ্নের নারী আছেন, তোমাকে অবিকল তার মতো হতে হবে, তবেই এগুবে রিলেশনশিপ।’

রিয়া প্রথমে বুঝতে না পারলেও পরে কিন্তু ঠিকই বুঝেছিল এই কথাটির মর্মার্থ।

‘আচ্ছা তুমি এত বীথি ভাবি, বীথি ভাবি করো কেন?’

শামীম এই প্রশ্নের কোনো উত্তর দিতে পারে না, আবার পরিস্থিতি পুরোটা খোলেও বলতে পারে না।

‘তোমাকে আজ বলতেই হবে বীথি ভাবির সঙ্গে তোমার কী সম্পর্ক? কী কারণে এই একজনই তোমার জীবনের আরাধ্য নারী?’

‘আমি তোমার এসব নোংরা প্রশ্নের উত্তর দিতে বাধ্য নই রিয়া।’

‘ও তুমি যখন বীথি ভাবি, বীথি ভাবি করে মুখে ফেনা তোলো তখন নোংরামি হয় না, আর আমি যুক্তিসঙ্গত প্রশ্ন তুললেই নোংরামি? ঠিক আছে শামীম, আমার মনে হচ্ছে তোমার সঙ্গে আমার সম্পর্ক না রাখাই ভালো। তুমি তোমার বীথি ভাবিতেই আচ্ছন্ন থাকো।’

চোখের সামনে দিয়ে হন হন করে চলে গেছে রিয়া। আর বীথি ভাবির ছায়ায় কেবলই নিমজ্জিত হয়েছে শামীম। বছরের পর বছর গড়িয়েছে। মাস্টার্স শেষ করে রিয়া বিয়েও করেছে। হলে এসে সেই বিয়ের কার্ডও দিয়ে গেছে। বলেছে, ‘না হয় আমরা একসঙ্গে বেশিদূর হাঁটতে পারলাম না তারপরও ভার্সিটিতে তুমি আমার সবচেয়ে পুরোনো বন্ধু। বিয়েতে এসো অবশ্যই।’

এলাকার মেয়ে শম্পার সঙ্গে মা জোর করে শামীমের বিয়ে দিয়েছেন তারও অনেক পরে। বিয়ের পর ওরা ভালোই ছিল বলা যায়। কিন্তু আজ হঠাত্ করে আবার ঝড় উঠল কেন? গ্লোরিয়া জিন্সে শম্পার সামনে নিজেকে কেমন অপ্রস্তুত লাগছিল। বীথি ভাবিও সেটা লক্ষ করেছেন।

‘কী ব্যাপার শামীম, তোমাকে এমন উদ্ভ্রান্ত দেখাচ্ছে কেন? অফিসে কোনো ঝামেলা হয়নি তো?’

‘না না ভাবি, সে-রকম কিছু না, আমি ঠিক আছি।’

‘তুমি বললেই হলো? এই শম্পা, ওর বোধ হয় মন খারাপ, ওকে একটু বেশি করে সময় দাও। আসলে আমরা এসেও ওর ওপর চাপ বাড়িয়ে দিয়েছি। কী করবো বলো, আর অল্প কয়টা দিন সময় দাও।’

 

৩.

ভাবিকে হাসপাতালে পৌঁছে দিয়ে ওরা ফিরেছে বাসায়। তখনও শম্পার সামনে নিজেকে স্বাভাবিক করতে পারেনি শামীম। ওর মুখের ওপর আজ সে কেবল বীথি ভাবির ছায়া দেখছে। এই ছায়া রিয়ার কাছ থেকে তাকে দূরে সরিয়েছে। এই ছায়া তাকে বছরের পর বছর বিষণ্ন করে রেখেছে। এতদিন পর আজ আবার এই ছায়া নতুন করে এসে দাঁড়িয়েছে তার আর শম্পার মাঝখানে। তার চোখের সামনে দিয়ে এখন কেবল ১৫/১৬ বছর আগের বীথি ভাবি ঘুরে বেড়ান। তার কেবল সেই ঝড়ের রাতের কথা মনে পড়ে।

ফোন বেজে চলেছে। স্ক্রিনে ভেসে ওঠে নাম ‘রিয়াজ ঢাবি’। এটা আসলে রিয়াজ নয়, রিয়ার ফোন। কেমন এক অন্তর্গত টানে ফোন নম্বরটি রেখে দিয়েছিল শামীম। শুধু শম্পার মনে যাতে অহেতুক কোনো প্রশ্ন না জাগে সেজন্য ‘রিয়া’ নামটি ‘রিয়াজ’ দিয়ে সেভ করেছে।

ফোনটা বেজে বেজে অফ হলে তার মনে হয় কলব্যাক করা দরকার। শম্পাকে একটা কিছু বলে এবার তাকে ছাদে যেতে হবে। 

‘শরীরটা আজ কেমন কেমন লাগছে। ছাদে গিয়ে একটু বাতাস খেয়ে আসি। তুমি বরং বাবুকে ঘুম পাড়াও।’

ছাদে গিয়ে পায়চারি করতে করতে  রিয়াকে কলব্যাক করে সে।

‘কেমন আছো রিয়া, কী মনে করে এতদিন পর ফোন?’

‘আছি ভালোই। আজ সকাল থেকেই তোমার কথা মনে পড়ছিল। তুমি তো জানো না, গত মাসে আমাদের ডিভোর্স হয়ে গেছে। বাচ্চাটিকে নিয়ে আমি আলাদা বাসায় থাকি, আর চাকরি করছি আগেরটাই।’

রিয়ার সঙ্গে কথা বলে কেমন যেন আনমনা হয়ে যায় শামীম।

‘আসলে এক সঙ্গে থাকতে হলে অনেক সেক্রিফাইস করতে হয়, আমি সেটা পারিনি। শেষ দিকে নিজেকে খুব টায়ার্ড লাগত, তাই সিদ্ধান্তটা নিয়ে ফেললাম। তোমার সঙ্গেও তো আমি মানিয়ে নিতে পারিনি। হুট করে তোমায় ছেড়ে হাঁটা দিলাম, মনে পড়ে তোমার? আচ্ছা তোমার সংসার এখন কেমন চলছে? তোমার সেই বীথি ভাবি কেমন আছেন?’

রিয়াও এতদিনে ভুলতে পারেনি বীথি ভাবিকে?

শামীমের কাছে এবার ঝড়টাকে একটু গভীরই মনে হয়। বাইরে উথাল পাতাল বাতাস বইতে শুরু করেছে। তার এখন বাসায় না ফিরে হাসপাতালে বীথি ভাবির কাছে যেতে ইচ্ছে করছে। d

 

 

 

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
২১ জুন, ২০১৮ ইং
ফজর৩:৪৩
যোহর১২:০০
আসর৪:৪০
মাগরিব৬:৫১
এশা৮:১৬
সূর্যোদয় - ৫:১১সূর্যাস্ত - ০৬:৪৬
পড়ুন