অপরাধ জগত্
কোকেইন সম্রাট পাবলো এসকোবার
আশেক-এ-ইলাহী অনি২১ জুন, ২০১৭ ইং
কোকেইন সম্রাট পাবলো এসকোবার
পুরো নাম পাবলো এমিলিও এসকোবার গ্যাভিরিয়া। পাবলো এসকোবার নামেই পরিচিত ছিল সে। কেউ ডাকত ডন পাবলো, কেউ ডাকত মেডেলিন-এর রবিনহুড। ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর, দুঃসাহসী ড্রাগ লর্ড বা মাদক সন্ত্রাসী। কলম্বিয়ার এই দুর্ধর্ষ ড্রাগ স্মাগলার একাই নাড়িয়ে দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের সমাজকাঠামো। কোকেইনে ছেয়ে গিয়েছিল সে-সময়ের আমেরিকা। পাবলো এসকোবারের ব্যবসা যখন তুঙ্গে, তখন সে একাই যুক্তরাষ্ট্রে পাচারকৃত কোকেইনের ৮০% নিয়ন্ত্রণ করত। তখন বছরে তার রোজগার ছিল ২২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। তাকে ডাকা হতো কোকেইনের রাজা বা ‘The King of Cocaine’। সে ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে ধনী অপরাধী। ১৯৯০ দশকের শুরুতে যাঁর সম্পত্তির পরিমাণ অনুমান করা হয় ৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, বর্তমানে যা প্রায় ৫৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমান। শুধু অপরাধ জগতেই নয়, সারা বিশ্বের অন্যতম ধনী ব্যক্তি ছিল পাবলো এসকোবার।

কলম্বিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মেডেলিন-এর কাছে রিওনিগ্রো নামক স্থানে জন্ম নেন পাবলো এসকোবার। ইউনিভার্সিদাদ অটোনোমা ল্যাটিনোআমেরিকানা অব মেডেলিন (Universidad Autónoma Latinoamericana of Medellín) থেকে ডিগ্রি নেয়ার আগেই এসকোবার পড়াশোনার পাট চুকিয়ে ফেলে, জড়িয়ে পড়ে নানা ধরনের অপরাধে। নিষিদ্ধ সিগারেট বিক্রি, ভুয়া লটারির টিকেট বিক্রি কিংবা গাড়ি চুরির মতো পাতি অপরাধে তার হাতেখড়ি। এরপর ১৯৭০-এর দশকে সে বিভিন্ন নিষিদ্ধ চোরাচালানকারীদের সাথে জড়িয়ে পড়ে। এছাড়াও কোকেইন বিক্রি কিংবা ১৯৭৫ সালে প্রথম যুক্তরাষ্ট্রে কোকেইন পাচার শুরু করার আগে অপহরণ এবং মুক্তিপণ আদায়ের মতো অপরাধেও যুক্ত ছিল পাবলো। তত্কালীন যুক্তরাষ্ট্রে কোকেইনের চাহিদা ব্যাপক মাত্রা পায়। ফলে যুক্তরাষ্ট্রে কোকেইন ব্যবসায় সে-সময়েই ফুলে ফেঁপে ওঠেন পাবলো এসকোবার। ১৯৮০ সাল নাগাদ প্রতি মাসে যুক্তরাষ্ট্রে কলম্বিয়া থেকে ৭০ থেকে ৮০ টন কোকেইন পাচার করা হতো। এই চালানের কমপক্ষে ৮০ ভাগ নিয়ন্ত্রণ করত পাবলো এসকোবার-এর নেতৃত্বাধীন মেডেলিন কার্টেল। এবং এই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য যখন যেই সামনে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে তাকেই সরিয়ে দিয়েছে পাবলো এবং তার দল। নির্দয়, নির্মম ও নৃশংসভাবে দেশি-বিদেশি স্মাগলার দল, পুলিশ অফিসার, বিচারক, স্থানীয় লোক কিংবা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের খুন করেছে।

এত কিছুর পরেও তার এলাকার দরিদ্র মানুষের কাছে এসকোবার ছিল একজন জনদরদি, একজন রবিনহুড। গরিব মানুষের মাঝে দুই হাতে টাকা বিলাতো সে। তাদের জন্য গৃহনির্মাণ, ফুটবল মাঠ নির্মাণ, চার্চ তৈরি করে দেয়ার মতো জনহিতকর সব উদ্যোগ নিয়েছে সবসময়। পপুলার ক্লাসের কাছে সে ছিল ভীষণ জনপ্রিয়। ১৯৮২ সালে এসকোবার চেম্বার অব রিপ্রেজেন্টেটিভস্ অব কলম্বিয়ার একজন অলটার্নেটিভ মেম্বার নির্বাচিত হন। তত্কালীন কলম্বিয়াকে পৃথিবীর খুনের রাজধানী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন পাবলো। প্রতিদিন গড়ে ৭৪টি নৃশংস খুনের ঘটনা ঘটত তখন কলম্বিয়ায়, যার সিংহভাগের দায় পাবলো এসকোবার এবং তার দলের। ১৯৯২ সালেই ২৭০০০ খুনের ঘটনা ঘটে যা প্রায় অবিশ্বাস্য।

১৯৯৩ সালে, তার ৪৪তম জন্মদিনের একদিন পরে নিজের শহরে কলম্বিয়ান ন্যাশনাল পুলিশের এক অভিযানে পাবলো এসকোবার মারা যান।

 

রক্তাক্ত লা ভায়োলেন্সিয়ার সন্তান এসকোবার

কলম্বিয়ায় মারামারি, হানাহানি, রক্তপাতের ইতিহাস অনেক কালের পুরোনো। ভৌগলিক চরিত্রগত সীমাবদ্ধতার কারণে কেন্দ্রীয়ভাবে পুরো দেশকে নিয়ন্ত্রণ করা ছিল সব সময়ই কঠিন। দুর্গম পাহাড়, হিংস্র জঙ্গল পুরো দেশের এক জনপদকে অন্য জনপদ থেকে আলাদা করে রেখেছে। যাতায়াত ও যোগাযোগব্যবস্থা এবং আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ সবসময়ই ছিল এক বড় চ্যালেঞ্জ। পাশাপাশি উত্তর এবং মধ্য আমেরিকার মাঝে একটা সংযোগ সেতু হিসেবে কাজ করে কলম্বিয়া। এছাড়াও কলম্বিয়া প্রশান্ত ও আটলান্টিক মহাসাগরের পাড়ে অবস্থিত। ভৌগোলিক অবস্থান, দুর্বল কেন্দ্রীয় সরকার ব্যবস্থা এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে নাজুক আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা দেশটিকে ডাকাতি কিংবা নিষিদ্ধ চোরাকারবারের মতো অপরাধপ্রবণ করে তুলেছিল অনেক আগে থেকেই।

গ্রামাঞ্চলের ধনী লোকেরা তখন রাষ্ট্রীয় বিচারব্যবস্থার ওপর আস্থাশীল ছিল না। তারা নিজেদের ভাড়া করা বাহিনী দিয়ে তাদের সম্পত্তি রক্ষা করত। বিশেষত গ্রমাঞ্চলে এলিটরাই আইন তৈরি করত এবং তাদের নিজস্ব বাহিনী সেই আইন প্রতিষ্ঠায় কাজ করত। সুবিচার প্রতিষ্ঠা এবং নিজেকে রক্ষা করার জন্য আইন নিজের হাতে তুলে নেয়ার ইতিহাস কলম্বিয়ায় অনেক পুরোনো। সাধারণ চোর, কিংবা চোরাকারবারিরা কলম্বিয়ার সহিংসতার একটা খুবই ছোট অংশ হিসেবে বিবেচিত। এসব কিছুর চেয়েও সহিংসতার বড় কারণ শত বছর ধরে চলে আসা অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা, অস্থিতিশীলতা, রেশারেশি। লিবারেল ও কনজারভেটিভদের দীর্ঘদিনের কোন্দল দেশজুড়ে একটা অস্থির ও সহিংস আবহ তৈরি করে রাখত সবসময়।

বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে কলম্বিয়ার জনগণ রাজনৈতিক দলীয় মতাদর্শ দ্বারা প্রচণ্ডভাবে বিভক্ত ছিল। দলীয় আনুগত্য অথবা সমর্থন প্রতিটি পরিবারের পরম্পরায় পরিণত হয়েছিল। ছোট শিশুদেরকেও পরিবার এবং প্রতিবেশী দ্বারা হয় লিবারেল অথবা কনজারভেটিভ হিসেবে দীক্ষিত করা হতো। এক দলের সমর্থক অন্য দলের সমর্থকদের ঘৃণা করতে শেখাত। তদুপরি বিশ শতকের শুরুর দিকে কলম্বিয়ায় দুই রাজনৈতিক দলের হাজার দিনের গৃহযুদ্ধ (Thousand Days’ War) পুরো দেশকে অস্থিতিশীল করে তোলে এবং কনজারভেটিভ পার্টির প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয় কয়েক দশকের জন্য। এর অনেকদিন পরে ১৯৩০ সালে যখন আবার লিবারেল পার্টি থেকে রাস্ট্রপতি নির্বাচিত হয়, তখন প্রত্যন্ত অনেক অঞ্চলে লিবারেল পার্টির অনেক সমর্থক কনজারভেটিভ পার্টির সমর্থকদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে ওঠে, এবং অনেক অঞ্চলে কনজারভেটিভরা নতুন রাষ্ট্রপতিকে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করে। ফলে রক্তক্ষয়ী সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে দেশজুড়ে। ছোট-বড় নানান কারণে সশস্ত্র লড়াই নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়। ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত লিবারেল শাসনব্যবস্থাকে এ ধরনের নিয়মিত সহিংসতা ও মারামারি নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যস্ত থাকতে হতো। যদিও এর পরবর্তী সময়ে যা ঘটেছে সে তুলনায় এসব ঘটনাকে ছোট বলেই গণ্য করা যায়।

১৯৩০ এবং ১৯৪০ দশকে জর্জ এলিয়েসার গাইটান নামের একজন লিবারেল পলিটিশিয়ান সাধারণ মানুষের মধ্যে যথেষ্ট জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। মজুরদের অধিকার এবং কলম্বিয়ার রাজনীতির দুরবস্থা নিয়ে সোচ্চার হয়ে গাইটান সর্বপ্রথম জনপ্রিয়তা পান ১৯২০-এর দশকে। ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন তিনি, কিন্তু নিজের দলের বিভক্তির কারণে পরাজিত হন। এ নির্বাচনের নির্বাচিত হন কনজারভেটিভ পার্টির প্রেসিডেন্ট মারিয়ানো অসপিনা পেরেজ। এই নির্বাচনের পরে রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অসহিষ্ণুতা নতুন মাত্রা পায়। কলম্বিয়া জুড়ে ছড়িয়ে থাকা সহিংসতা বাড়তে শুরু করে। ১৯৪৬ সালের নির্বাচনী বছরকে কলম্বিয়ার ইতিহাসের অন্যতম কালো এক অধ্যায়ের সূত্রপাত হিসেবে গণ্য করা হয়। অকারণ ও সীমাহীন রক্তপাতের এই সময়কে নামকরণ করা হয় ‘লা ভায়োলেন্সিয়া’ (la Violencia)। লা ভায়োলেন্সিয়ার আপাতদৃষ্টিতে অকারণ সহিংসতা বিগত দিনের সব সহিংসতাকে হার মানায়। অনুসন্ধানে দেখা যায় কেবলমাত্র রাজনৈতিক দলীয় আগ্রাসন আর শ্রেণিসংঘাতের দোহাই দিয়ে অসংখ্য ধর্ষণ, নির্যাতন ও খুনের ঘটনা ঘটতে থাকে চারদিকে। এক হিসাবে দেখা যায় আনুমানিক ২,০০,০০০ মানুষকে হত্যা করা হয় এ সময়ে। ১৯৪৬ থেকে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত অন্তত ২০% কলম্বিয় সরাসরি সহিংসতার শিকার। আর এ সময়ে ক্ষমতায় থাকা সরকারের দমন-পীড়ননীতি এই সহিংসতা না কমিয়ে বরং এ আগুনে আরও ঘি ঢেলেছে।

নির্বাচনের পরে বিজয়ী কনজারভেটিভ-রাই যে কেবল প্রতিপক্ষের ওপর আক্রমণ করেছে তা-ই নয়, অনেক এলাকায় লিবারেলরাও নির্বাচিত কনজারভেটিভ প্রেসিডেন্টকে মেনে না নিয়ে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করেছে। এর জবাবে কনজারভেটিভরা দেশের পুলিশ ও সেনাবাহিনীকে দলীয়করণের মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে দমনে ব্যবহার করেছে। লিবারেল-রা তখন ছোট ছোট গেরিলা বাহিনী গঠন করে সরকারকে নানাভাবে বেকায়দায় ফেলতে চেষ্টা করেছে। এমন সময় লিবারেল নেতা গাইটান হত্যাকাণ্ড নতুন আরেক সহিংসতার ঢেউ ছড়িয়ে দেয় গোটা কলম্বিয়া জুড়ে—যার নাম ‘এল বোগোটাজো’ (el Bogotazo)। এই ঘটনা দেশটির ইতিহাসকেই বদলে দেয়। গাইটান-এর হত্যাকারী হুয়ান রোয়া সিয়েরা-কে কনজারভেটিভদের ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে ধরে নিয়ে লিবারেলরা উত্তেজিত হয়ে রোয়াকে মেরে ফেলে এবং পুরো বোগোটা শহর জুড়ে আগুন, লুট আর ধ্বংসে মেতে ওঠে। পরেরদিন ভোর পর্যন্ত এ নারকীয় তাণ্ডবে পুরো শহর ধূলিসাত্ হয়ে যায় এবং শত শত, হয়তো হাজার হাজার মানুষ এ হত্যাকাণ্ডের নির্মম শিকার হয়। দুঃখজনকভাবে রাজধানী বোগাটার সহিংসতা থামলেও কলম্বিয়ার অন্যান্য শহর এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিদ্যুতের গতিতে তা ছড়িয়ে পড়ে। এই সহিংসতা আরও নানান ধরনের সহিংসতাকে উস্কে দেয়। ক্ষমতাসীন সরকার তখন লড়ছে গেরিলা আর প্যারামিলিটারিদের সাথে, শিল্পপতিদের লড়াই শ্রমিক ইউনিয়নের সাথে, কনজারভেটিভ ক্যাথলিকদের যুদ্ধ লিবারেলদের সাথে। চারদিকের এই রক্তক্ষয়ী অনর্থক সহিংসতার সুযোগে সমাজের একদল লোক চারদিকে ডাকাতি করতে শুরু করে। গাইটানের এই হত্যাকাণ্ড কলম্বিয়ার সমাজে অসংখ্য মানুষরূপী রাক্ষসকে মুক্ত করে দেয় যেন। যাদের আধুনিক বিশ্বের আধুনিক চিন্তাভাবনা নিয়ে ভাববার মানসিকতা নেই। আছে কেবল কলম্বিয়ার সহিংস ইতিহাসকে ইস্যু বানিয়ে দেশজুড়ে অরাজক পরিস্থিতি তৈরি করার অসুস্থ চেষ্টা।

অবরুদ্ধ কলম্বিয়াকে স্থিতিশীল করতে পরবর্তী নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত কনজারভেটিভ প্রেসিডেন্ট দেশজুড়ে বেসামরিক একনায়কতন্ত্র চালু করেন। কিন্তু তাঁর শাসনামলে সহিংসতার মাত্রা আরও বেড়ে যায়। আর তা মোকাবিলা করতে তিনি যেকোনো ধরনের রাজনৈতিক প্রতিবাদকেই ডাকাতি হিসেবে বিচারের আওতায় আনতে শুরু করেন। ১৯৫৩ সালে জেনারেল গুস্তাভো রোজাস পিনিলা ক্ষমতা নিয়ে রাজনৈতিক সহিংসতা কমিয়ে আনতে সক্ষম হলেও বড় বড় ডাকাতির ঘটনা আগের মতোই চলতে থাকে। পিনিলা তখন সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করলে গেরিলা বাহিনীগুলো অস্ত্র জমা দিয়ে আত্মসমর্পণ করতে শুরু করে। ১৯৫৩ থেকে ১৯৫৫ সাল নাগাদ লা ভায়োলেন্সিয়ার চরিত্র রাজনৈতিক থেকে বদলে অর্থনৈতিক রূপ নেয়। গেরিলারা তখন ডাকাত দলে পরিণত হতে শুরু করে। আগোছালো সরকারব্যবস্থা আর দুর্বল আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়, ডাকাতি, ফসল চুরি কিংবা ফসলের একটা ভাগ জোর করে কেড়ে নেয়ার মতো অরাজনৈতিক অপরাধে মেতে ওঠে ডাকাত দলগুলো। একপর্যায়ে পুরো দেশের ওপর নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে লিবারেল ও কনজারভেটিভরা ১৯৫৮ সালে এক হয়ে ন্যাশনাল ফ্রন্ট গঠন করে।

দুই পক্ষের সমঝোতার ভিত্তিতে কলম্বিয়া মোটামুটি একটা স্থিতিশীলতা খুঁজে পেলেও গ্রামাঞ্চলের সহিংসতা চলছিলই। সেইসাথে FARC এবং ELN-এর মতো বামপন্থি দলগুলোর প্রতিরোধে দীর্ঘদিন ধরে অনুপস্থিত স্থিতিশীলতা বাধাগ্রস্ত হচ্ছিল। জোট সরকার কঠোরভাবে এদেরকে প্রতিরোধ করলে সহিংসতা কিছুটা কমে আসে। কিন্তু তখনও কলম্বিয়া ছিল সব দিক দিয়ে বিভক্ত এক ভূখণ্ড। এরকম অরাজক এবং সহিংস একটা সমাজেই পাবলো এসকোবারের জন্ম ও বেড়ে ওঠা। সে-সমাজে সাধারণ মানুষ নিপীড়িত, বঞ্চিত। গ্রামের হাজার হাজার মানুষ বাধ্য হয়েছে বাড়িঘর ছেড়ে শহরের বস্তিতে এসে কোনোমতে জীবনধারণ করতে। দেশের শাসনব্যবস্থার ওপর এই মানুষগুলোর বিন্দুমাত্র কোনো বিশ্বাস, আশা, ভরসা ছিল না। যে সরকার তাদের জন্য কিছু তো করেইনি বরং বারবার তাদেরকেই শিকার হতে হয়েছে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার। এ কারণেই যখন পাবলো এসকোবারের মতো একজন ভয়ংকর মাদক সন্ত্রাসীও তাদের পাশে দাঁড়ায়, তার মাঝেই তারা খুঁজে পায় তাদের ত্রাতা, নায়ক কিংবা রক্ষাকর্তাকে। কলম্বীয় সমাজের নিচের দিকে জন্ম নেয়া, শূন্য থেকে অপরিসীম সম্পদের মালিক বনে যাওয়া এসকোবার দু হাতে তার অবৈধ টাকা বিলিয়ে তাদের কাছে পেয়ে যায় কলম্বীয় রবিনহুডের মর্যাদা।

 

মেডেলিন এবং কলম্বিয়ায় মাদক ব্যবসার পত্তন

ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে মেডেলিন (MEDELLÍN) কলম্বিয়ার অন্যসব জায়গা থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন, আলাদা। সেখানে এক নিজস্ব ভিন্ন সংস্কৃতি ছিল, আর ছিল চোরাচালানের ঐতিহ্য। মেডেলিনবাসী ছিল আপাতদৃষ্টিতে ভদ্র, কিন্তু আগ্রাসী, উচ্চাভিলাসী, পরিশ্রমী মানুষ—যারা অর্থ এবং সামাজিক অবস্থান পেতে উদগ্রীব ছিল। বোগাটার লোকেদের কাছে তারা ছিল সেকেলে, গেঁয়ো। তাদের ভাষা অদ্ভুত, তারা মূলত চোরাকারবারি এবং বাস্তবসম্মত জ্ঞানহীন। কিন্তু পরবর্তীকালে এসকোবারের সময়ে মেডেলিন একটি আকর্ষণীয়, আধুনিক শহরে পরিণত হয়। এবং এর বাসিন্দারা সৃষ্টিশীল কিন্তু ধূর্ত ব্যবসায়ী হয়ে ওঠে। মেডেলিনে প্রতিটি সন্তানকে অর্থ উপার্জনে উচ্চাভিলাসী হয়ে উঠতে অনুপ্রেরণা দেয়া হতো তখন। একটা প্রবাদ তখন চালু ছিল মেডেলিন সমাজে—‘যদি সফল হও, টাকা পাঠাও। যদি ব্যর্থ হও, বাড়ি ফিরে এসো না।’

১৯৭০ দশকে মেডেলিন ইতোমধ্যেই সংগঠিত অপরাধ চক্রদের ঘরবাড়ি হয়ে উঠেছিল—যারা মূলত মাদকসহ নানান ধরনের নিষিদ্ধ পণ্যের চোরাচালান করত। একটা লম্বা সময় ধরে মাদকের মধ্যে গাঁজা ছিল চোরাচালানের মূল পণ্য। ১৯৭৩ সালের আগ পর্যন্ত কলম্বিয়া কিংবা মেডেলিন কোকেইন-এর ব্যবসা করত না বললেই চলে। তখন মূলত পেরু ও বলিভিয়া থেকে কোকা পাতা সংগ্রহ করে চিলি কোকেইন উত্পাদন করত। কলম্বিয়ান চোরাকারবারিরা ছিল মূলত তাদের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সংযোগের মাধ্যম। তখন পর্যন্ত কোকেইনের জনপ্রিয়তা ততটা ছিল না। তাই কোকেইনের চাহিদা কিংবা বাজার বেশ ছোটই ছিল। পরবর্তী সময়ে ১৯৭৩ সালে জেনারেল অগাস্টো পিনোচেট চিলির ক্ষমতা নিয়ে নেয়ার পর, সে চিলিতে কোকেইনের ব্যবসা পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়। ঠিক তখনই কলম্বিয়ান চোরাকারবারিরা কোকেইনের ব্যবসার পুরো নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। চিলিয়ানদের মতো তারাও পেরু ও বলিভিয়া থেকে কোকা পাতা সংগ্রহ করে কোকেইন তৈরি করতে শুরু করে। কলম্বিয়ার আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর উদাসীনতায় গাঁজা পাচারের জন্য ইতোমধ্যেই প্রতিষ্ঠিত ও ব্যবহূত রুট ব্যবহার করে তারা কোকেইনের ব্যবসায় মনোনিবেশ করে। শুধু তা-ই নয়, গাঁজার তুলনায় কোকেইন ওজনে কম, কম গন্ধযুক্ত ও অধিক মুনাফা দেয়ায় এ ব্যবসা জনপ্রিয় হয়ে যায় খুব দ্রুত।

হঠাত্ করেই ১৯৭০ দশকের শেষের দিকে আমেরিকায় ফ্যাশনেবল ড্রাগ হিসেবে কোকেইন ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। যুবসমাজের সবচেয়ে পছন্দের ড্রাগ হয়ে ওঠে কোকেইন, ছড়িয়ে পড়ে সবখানে। খুব অল্প সময়ের মধ্যে কোকেইনের চাহিদা আকাশ ছুঁয়ে যায়। এবং কলম্বিয়ানরা তখন এই চাহিদা পূরণের সবচেয়ে সুবিধাজনক জায়গায় ছিল। আর কলম্বিয়ান স্মাগলারদের সেদেশের প্রশাসনকে নিয়ে তেমন কোনো দুশ্চিন্তাই করতে হয়নি। কারণ সে-সময়ে যে কাউকেই খুব সহজে ঘুষ দিয়ে কিনে ফেলা যেত। মেডেলিনের মতো শহরগুলোতে তখন সাধারণ মানুষের বসবাস বেড়ে যায় অনেক গুণ। শহরময় পাবলো এসকোবারের মতো বেপরোয়া যুবকরা ছড়িয়ে পড়ে, যাদের সামনে বড় হওয়ার খুব একটা সুযোগ ছিল না, কিন্তু জীবনে সফল হওয়ার বাসনা ছিল ষোল আনা। কলম্বিয়ার অন্যান্য শহরের তুলনায় মেডেলিন-এ বেকারত্বের হার বেশি ছিল। সে সুযোগে ড্রাগ কার্টেলগুলো খুব সহজেই এসব যুবকদের দলে ভিড়িয়ে ড্রাগ স্মাগলার হিসেবে চাকরি দিয়ে দিত।

 

এসকোবারের ছেলেবেলা

পাবলো এসকোবার ১৯৪৯ সালের ১ ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করে। বাবা আবেল ডি জেসাস দারি এসকোবার ছিলেন কৃষক এবং মা হারমিল্ডা গ্যাভিরিয়া ছিলেন একজন স্কুলশিক্ষক। সাত ভাই-বোনের মধ্যে পাবলো ছিল তৃতীয়। রিওনিগ্রোতে জন্ম নিলেও পাবলো বেড়ে ওঠে পার্শ্ববর্তী শহর মেডেলিনে। টিনএজ বয়সেই অপরাধে জড়িয়ে পড়ে পাবলো। কবর থেকে গ্রেইভস্টোন চুরি করে সেটার ওপর থেকে লেখাগুলো মুছে আবার অন্য চোরাকারবারিদের কাছে বেঁচে দিত।

এরপর পাবলো এসকোবার অসকার বেনেল অ্যাগুয়েরা নামের এক ক্রিমিনালের সাথে আরও নানান ধরনের অপরাধমূলক কাজে জড়িয়ে পড়ে। তার একসাথে নিষিদ্ধ সিগারেট, ভুয়া লটারির টিকেট বিক্রি, গাড়ি চুরি ইত্যাদি করতে থাকে। মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ার আগে পাবলো ছিল একজন চোর এবং বডিগার্ড। এর মধ্যেই পাবলো একজন মেডেলিন এক্সিকিউটিভকে অপহরণ করে ১,০০,০০০ মার্কিন ডলার মুক্তিপণ আদায় করে। এরপর সে কাজ করতে শুরু করে মেডেলিনের আরেক চোরাকারবারি আলভেরো প্রিয়ের্তোর সঙ্গে। ছোটবেলায় বন্ধুদের কাছে প্রায়ই পাবলো বলত যে যদি ৩০ বছর বয়সের মধ্যে সে এক মিলিয়ন কলম্বীয় পেসো উপার্জন না করতে পারে তাহলে সে আত্মহত্যা করবে। প্রিয়ের্তোর দলে যখন সে যোগ দেয় তখন তার বয়স ২২ বছর। ২৬ বছর বয়স হতে না হতেই এসকোবারের ব্যাংক ডিপোজিটের পরিমাণ দাঁড়ায় ১০০ মিলিয়ন কলম্বীয় পেসো।

কলম্বীয় জীবনধারা বিচারে পাবলো মোটামুটি সচ্ছল মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। কিন্তু লা ভায়োলেন্সিয়া তাদের জীবন থেকে কখনোই দূরে সরে যায়নি। লা পারাবোলা ডি পাবলো (La Parábola de Pablo) বইটির লেখক আলোনসো সালাজার বর্ণিত এক ঘটনায় বোঝা যায় যে পাবলো এসকোবারের ছেলেবেলা লা ভায়োলেন্সিয়ার নির্মম সহিংসতার সাথে ওতোপ্রতোভাবে জড়িত ছিল। তার মা হারমিল্ডা সপরিবারে তিতিরিবি নামের ছোট একটা গ্রামে চলে যান, সেখানে একটি স্কুলে পড়াবেন বলে। কিন্তু সে অঞ্চলের কনজারভেটিভরা ভেবে নেয় যে, একজন লিবারেল মহিলা শিক্ষক হয়ে তাদের বাচ্চাদের লিবারেল মতাদর্শে দীক্ষিত করে তুলছে। রাতের অন্ধকারে হঠাত্ তারা সে ছোট স্কুলটিতে আক্রমণ করে এবং আগুন জ্বালিয়ে দিতে চেষ্টা করে। সে স্কুলেই তখন এসকোবারের মা তাঁর পরিবার নিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন। কোনো এক অজানা অলৌকিক কারণে সে-রাতে উত্তেজিত কনজারভেটিভ জনতা স্কুলে আগুন লাগাতে ব্যর্থ হয়, এবং তারা প্রাণে বেঁচে যায়। এরপর সকালে যখন সেনাবাহিনী এসে তাদের উদ্ধার করে তখন দেখা যায় সে রাতের ধ্বংসের চিহ্ন ছড়িয়ে আছে চারদিকে। স্কুলঘর থেকে বাইরে বেরিয়েই তারা এমন এক দৃশ্য দেখে যা কখনো ভোলার নয়। অসংখ্য লিবারেল সমর্থক কৃষকের ক্ষতবিক্ষত মৃতদেহগুলো ঝুলছে স্কুলের বিমগুলোতে। রক্ত, কালো থকথকে রক্ত, পুরো হলঘর মাখামাখি, হাঁটতে গেলেও পায়ে লেগে যাচ্ছে। সেনাবাহিনী এসকোবার পরিবারকে দ্রুত সে স্থান ছেড়ে চলে যেতে পরামর্শ দেয়। এরপর পরিবারটি মেডেলিন-এ পালিয়ে গিয়ে বসত গাড়ে।

সমবয়সীদের চেয়ে এসকোবার যে খুব বেশি আলাদা ছিল তা নয়। ফুটবল খেলতে পছন্দ করত, ফাস্টফুড আর পপুলার মিউজিকের ভক্ত ছিল। ছোটবেলায় প্রায়ই সে তার মাকে বলত যে সে অনেক বড় হতে চায়। স্কুলে পড়াশোনায় ভালোই করছিল। এরপর ১৩ বছর বয়সে সে স্কুলের ছাত্র সংসদের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয় এবং দরিদ্র ছাত্রদের যাতায়াত ও খাবারের দাবি আদায়ে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়। সে ছিল বিপ্লবী বামপন্থি ধারায় বিশ্বাসী। সে একইসাথে বমপন্থিও হতে চেয়েছিল আবার ধনীও হতে চেয়েছিল। তার পকেটে একটা চিরুনি থাকত। এবং মাঝে মাঝেই জানালার শার্শিতে নিজের চেহারাটা দেখে নিত সে। এরপর যখন সে বড় হয়, তখন তার প্রিয় গ্যাংস্টারদের মতো সাজ পোশাকে ছবি তুলত।

এসকোবারের নানা, রবার্তো তাঁর শহরের মেয়র ছিলেন। কিন্তু মেয়র হওয়ার আগে তিনিও ছিল একজন চোরাকারবারি। এসকোবারের মা হার্মিল্ডা প্রায়ই তাকে গল্প বলতেন কীভাবে তাঁর বাবা প্রশাসনের চোখে ধুলা দিয়ে চোরাকারবারি করত। নানা পার্শ্ববর্তী দেশ পানামার খুব কাছের শহর উরাবা থেকে কফিনের বাক্সে করে হুইস্কির বোতল নিয়ে আসত। সে কফিনের সাথে কালো পোশাক পরা লোকজন থাকত যাতে কারও সন্দেহ না হয়। কফিন এনে সে মাটি চাপা দিয়ে দিত। তারপর রাতের আঁধারে এসে সে কফিন থেকে তার মালামাল বের করে নিত। একবার কেউ একজন শত্রুতা করে নানার এই চালাকির কথা জানিয়ে দিয়েছিল পুলিশকে। সে-বার কফিন সমেত নানাকে পুলিশ আটক করলেও, কফিন খুলে কেবল পাথর ছাড়া কিছুই পায়নি। এতে করে প্রশাসন এসকোবারের নানা রবার্তোকে পাগল আখ্যা দিয়ে চলে যেতে বাধ্য হয়।

ছোটবেলা থেকেই এসকোবার গাঁজা খেত, যা সে সারাজীবন ধরে চালিয়ে গেছে। দুপুর পর্যন্ত ঘুম এবং বাকি সময়টা গাঁজা খেয়ে বুঁদ হয়ে থাকত সে। এরপরে সে তার চাচাত ভাই গুসতাভো গ্যাভিরিয়াকে নিয়ে শহরের বিভিন্ন বারগুলোতে সময় কাটানো শুরু করে এবং অর্থ আর আনন্দের জন্য নানান ধরনের পাতি অপরাধ করতে থাকে। অন্য মেডেলিনবাসীর মতো এসকোবারও ছিল এক সাধারণ দস্যু যার স্বপ্ন ছিল প্রচুর অর্থ আর সামাজিক অবস্থান। তবে তার উচ্চাভিলাস এবং নৃশংসতা তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তুলেছিল। পাবলো তার আত্মবিশ্বাস ও বেপরোয়া চরিত্রের জন্যও পরিচিত হয়ে ওঠে। পাবলো ছিল অত্যন্ত সাহসী। হয়তো গাঁজার কারণেই সে প্রচণ্ড ভীতিকর পরিস্থিতেও নিজের মধ্যে শান্ত, স্থির এমনকি ফুরফুরে মেজাজে থাকার এক ক্ষমতা আবিষ্কার করে। সবমিলিয়ে ধীরে ধীরে সন্ত্রাসী অপরাধীদের নেতা হয়ে ওঠে।

পরবর্তী সময়ে পাবলো এসকোবার গাড়ি চুরি করতে শুরু করে। কখনো কখনো দিনের বেলাতেও গাড়ির চালককে টেনে নামিয়ে গাড়ি নিয়ে পালিয়ে যেত এবং সে গাড়িগুলো খুলে পার্টস হিসেবে বিক্রি করে দিত। সে এবং তার গ্যাং খুব তাড়াতাড়ি কোনো ধরনের প্রমাণ ছাড়াই অপরাধ ঘটিয়ে সেখান থেকে লাভ তুলে নিতে পারত। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই এসকোবার ঘুষ দিয়ে মিউনিসিপ্যালিটি অফিসিয়ালদের হাত করে ফেলে। এরপর চুরি করা গাড়িগুলোর নতুন কাগজপত্র বানিয়ে আবার বিক্রি করা শুরু করে। যেসব গাড়ি সে চুরি করত না—এমনকি সেসব গাড়ি থেকেও রোজগারের একটা পথ সে বের করে ফেলে। তার নিজস্ব গাড়িচোর বাহিনীর হাত থেকে রক্ষা পেতে তাকে মাসোহারা দিত গাড়ি মালিকরা।

খুব দ্রুত সে কিডন্যাপিং, খুন এবং মাদক চোরাচালানের মতো বড় বড় অপরাধ করতে শুরু করে। ব্যবসায় তার দ্রুত উন্নতি হতে শুরু করে, মুনাফা বাড়তে থাকে। টাকা দিয়ে কেনা যায়—এমন সবকিছুই তার আয়ত্তের মধ্যে চলে আসে। অন্যান্য মাদক ব্যবসায়ীদের মতো এসকোবারের জীবন যাপন ছিল অবিশ্বাস্য রকম বর্ণাঢ্য, রঙিন। ৭,৪০০ একর জমির ওপরে সে একটি খামারবাড়ি নির্মাণ করে—যার নাম সে দেয় হ্যাসিয়েন্ডা লস ন্যাপোলেস (Hacienda Los Nápoles)। এ খামারবাড়িতে নিজস্ব এয়ারপোর্ট-সহ প্রয়োজনীয় সব বিলাসিতার আয়োজন ছিল। ছিল একটি চিড়িয়াখানা, যাতে পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে আনা সিংহ, হাতি, ষাঁড়, জেব্রা, জলহস্তী ইত্যাদি প্রায় ১০০ ধরনের প্রাণী ছিল। বন্ধুদের আনন্দ দেয়ার জন্য নিজস্ব মাঠে ফুটবল খেলা, কিংবা সুন্দরী নারীদের ভাড়া করে নানান ধরনের পার্টির আয়োজন করত সে নিয়মিত। যা সে টাকা দিয়ে কিনতে পারত না, সেটা হুমকি দিয়ে আদায় করে নিত। তার শীতল এবং ভয়ংকর চারিত্রিক পরিচিতির কারণে কেউই তার হুমকি হালকাভাবে নিত না। এসকোবার একবার যেটা চাইত, কোনো না কোনো উপায়ে সেটা সে নিজের করে ছাড়ত।

 

একইসাথে একজন অপরাধী ও ব্যবসায়ী হয়ে বেড়ে ওঠা

যেহেতু এসকোবার একজন অপরাধী এবং ব্যবসায়ী হিসেবে বেড়ে উঠছিল, তাকে যেন সবাই ভয় পায় এবং একইসাথে সম্মান দেয় সেই নিশ্চয়তাও তার প্রয়োজন হয়ে পড়ে। প্রতিদ্বন্দ্বী দল এবং নিজের দলের লোকজনের কাছে এমন একটি ইমেজ তৈরি করার প্রয়োজন হয়ে পড়ে যে এসকোবার যেকোনো কিছুই করতে পারে। এবং একইসাথে এসকোবারের সাথে কোনো ধরনের দ্বন্দ্বে জড়ানো নিছক বোকামি। যারা এসকোবারকে হালকাভাবে নিত তাদেরকে কিডন্যাপ করে মুক্তিপণ আদায় করে, তাদেরকে এই বোকামির শাস্তি দিত সে। এসব অপরাধের জন্য এসকোবার ভাড়াটে লোক ব্যবহার করত যাতে কোনোভাবেই সে নিজে ফেঁসে না যায়। মুক্তিপণ দিতে কেউ অস্বীকার করলে সে ব্যক্তিকে খুন করতে দ্বিধা করত না। এমনকি কখনো কখনো মুক্তিপণ আদায় করার পরেও সে ব্যক্তিকে নির্মমভাবে মৃত্যুবরণ করতে হতো। কাউকে খুন করার নির্দেশ দিতে এতটুকুও বিবেকের তাড়না অনুভব করেনি সে কখনো। এটা তার ব্যবসারই অংশ এবং এর সর্বোচ্চ ব্যবহারই নিশ্চিত করেছিল পাবলো এসকোবার।

১৯৭১ সালে তার ক্যারিয়ারের উঠতি সময়ে সে তার অপরাধী চরিত্রের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উন্মোচন করে। নিজের একটি সামাজিক বিচারব্যবস্থা প্রণয়নের মাধ্যমে সে সাধারণ মানুষের সমর্থন আদায় করতে সমর্থ হয়। ডিয়াগো এচাভেরিয়া নামের একজন কনজারভেটিভ কারখানা মালিক ছিলেন, যাকে গরিব শ্রমিক শ্রেণি ভীষণভাবে অপছন্দ করত। ডিয়াগো অসংখ্য শ্রমিককে ছাঁটাই এবং নিজের হাউজিং ব্যবসার স্বার্থে অনেক গরিব মানুষকে ঘরছাড়া করেছিলেন। ডিয়াগোকে এসকোবার অপহরণ করে ৫০,০০০ মার্কিন ডলার মুক্তিপণ আদায় করে। আর পরবর্তী সময়ে তার মৃতদেহ খুঁজে পাওয়া যায় এসকোবারের বাড়ির কাছেই একটি মাঠের ভেতরে একটি গর্তে। যদিও কোনো প্রমাণ খুঁজে পাওয়া যায়নি, তবুও সবাই এসকোবারকেই এই হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী করতে থাকে। আর এসকোবার এ অভিযোগের বিপরীতে তেমন একটা মাথাই ঘামায়নি। কিন্তু এলাকার গরিব মানুষদের কাছে এ ঘটনার পর সে একজন জীবন্ত কিংবদন্তির মর্যাদা পেতে শুরু করে। শুরু থেকেই এসকোবার তার পক্ষে জনসমর্থন আদায় করতে সক্ষম হয়। নিজেকে গণমানুষের ডন, একজন সম্মানীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে দেখেতেই পছন্দ করত সে।

পাবলো এসকোবারের জায়গায় অন্য কেউ থাকলেও তার এই সময়ে মাদক চোরাচালানের দিকে ঝুঁকে যাওয়াই স্বাভাবিক ব্যাপার। ১৯৭৬ সালে এসকোবার তার চাচাত ভাই গুস্তাভো-সহ ইকুয়েডর থেকে কলম্বিয়ার বর্ডার পেরোনোর সময় অ্যারেস্ট হন। সাথে ছিল ৩৯ পাউন্ড কোকেইন। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে প্রশাসন আগে থেকেই ওত পেতে ছিল এসকোবারের জন্য। এর আগেও কয়েকবার এসকোবার জেল খেটেছে। তবে সেগুলো অল্প অল্প সময়ের জন্য। কিন্তু এই পরিমাণ কোকেইন নিয়ে ধরা পড়া মানেই বড়সড় ঝামেলায় জড়িয়ে পড়া। এসকোবারের এই মামলার বিচারকাজে নিয়োগ করা হয় মারিয়েলা এসপিনোসা নামক একজন মহিলা বিচারককে। এসকোবারের প্রস্তাবিত ঘুষ তিনি প্রত্যাখ্যান করলে, খোঁজ-খবর নিয়ে জানা যায় যে এই বিচারকের ভাই একজন আইনজীবি। এবং ভাইবোনের সম্পর্ক অত্যন্ত তিক্ত। এসকোবার তার পক্ষে লড়াই করার জন্য সেই বিচারকের ভাইকেই নিয়োগ দেন যাতে বিচারক এই মামলা থেকে সরে যান। এসকোবারের এই বুদ্ধি কাজে দেয়। আগের বিচারকের জায়গায় নতুন যে বিচারক মামলার দায়িত্ব পান তাকে খুব সহজেই ঘুষ দিয়ে কিনে ফেলে এসকোবার। মামলায় এসকোবার এবং তার দল মুক্তি লাভ করে। আপিল বিভাগের একজন বিচারক যখন আবারও এসকোবারকে গ্রেফতার ও পুনর্বিচারের চেষ্টা করেন, বার বার আপিলের মাধ্যমে সেটা বিলম্বিত হতে থাকে। এবং বছর না পেরুতেই যে দুজন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য এসকোবারকে কোকেইন সহ গ্রেফতার করেছিল তাদেরকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। মামলার প্রথম বিচারক মারিয়েলা এসপিনোসার কথাও পাবলো ভোলেনি। তাঁকে মেরে না ফেললেও সারাজীবন যেন পায়ে হেঁটে চলতে ফিরতে হয় সে ব্যবস্থা করেছিল সে। যখনই সে গাড়ি কিনত, সে গাড়ি চুরি হয়ে যেত এবং হয় পাহাড়ের চূড়া থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়া হতো, কিংবা পুড়িয়ে দেয়া হতো। আসলে দেশের প্রশাসনের সাথে মোকাবিলা করার একটা প্যাটার্ন পাবলো এসকোবার তৈরি করছিল যা হবে তারই ট্রেডমার্ক। খুব অল্প সময়ের মধ্যে এই প্যাটার্ন প্ল্যাটা ও প্লোমো (plata o plomo) নামে পরিচিতি পেয়ে যায়। এর অর্থ হয়—তুমি এসকোবারের প্ল্যাটা অর্থাত্ ঘুষ নাও কিংবা প্লোমো অর্থাত্ গুলি হজম কর।

এই স্ট্র্যাটেজি খুব ভালো কাজে দিয়েছিল। কয়েক বছর পর এসকোবার যখন সরকারের বন্দি বিনিময় চুক্তির বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধ ঘোষণা করে, সে-সময়ে এই পরিমাণ বিচারক এবং তাদের পরিবারের লোকজনকে সে হত্যা করে যে এরপর কোনো বিচারকই তার মামলার বিচারকাজে নিজেদের জড়াতে চাইত না। খুব দ্রুত অভিযোগগুলো উঠে যেত এবং মামলার সব কাগজপত্র হারিয়ে যেত। কেননা, কোনো বিচারক কিংবা পুলিশ এই ঝামেলায় পড়ে নিজেদের জীবন হুমকির মুখে ফেলতে চাইত না। মাদক চোরাচালান ব্যবসা বাড়তে বাড়তে লাভের পরিমাণ আকাশে উঠে যায়। কোকা চাষি, কোকেইন প্রস্তুতকারক সবার ওপরে এসকোবারের খুব শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ ছিল। এবং সে সবার সুরক্ষার জন্য বেশ অর্থ খরচও করত। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু সদস্য তবুও বাধা হয়ে দাঁড়াতে চাইত। কিন্তু তাদের জন্য সামনে দুটি পথই খুলে রেখেছিল এসকোবার। হয় ঘুষ নাও কিংবা গুলি। বড় বড় চালান পার করিয়ে, এসকোবার মাঝে মাঝে ছোট ছোট চালান ইচ্ছাকৃতভাবে আটক করাতো যাতে সবাই মনে করে যে আইন প্রয়োগকারী লোকেরা তাদের কাজ ঠিকমতোই করছে। ধরা পড়া এসব ছোট চালানের লোকসান সে বড় চালানগুলো থেকে খুব ভালোভাবেই পুষিয়ে নিত। ১৯৭৬ থেকে ১৯৮০ সালের মধ্যে কলম্বিয়ার প্রধান চারটি শহরে ব্যাংকে ডিপোজিটের পরিমাণ দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে যায়। বেআইনি আমেরিকান ডলারে পুরো দেশ ভাসতে শুরু করে। প্রেসিডেন্ট আলফনসো লোপেজ মিশেলসেন-এর প্রশাসন সে-সময়ে যেকোনো পরিমাণ ডলারকে কলম্বীয় পেসোতে পরিণত করার সুযোগ করে দেয়। এ সময় কলম্বিয়ার অনেক ধনীর লুকানো টাকা বের হয়ে আসতে শুরু করে।

১৯৮১ সালের ১৩ নভেম্বর এসকোবারের মাদক ব্যবসায় দীর্ঘদিনের বন্ধু এবং অত্যন্ত সম্মানীয় ব্যক্তি হোর্হে লুইস অচোয়া এসকোবারকে জানান যে তাঁর বোনকে অপহরণ করা হয়েছে। এম-১৯ নামের একটি বামপন্থি গেরিলা দল ১২ মিলিয়ন ডলার মুক্তিপণের দাবিতে এ কাজ করেছে। এসকোবার তার বিজনেস পার্টনারদের বিরুদ্ধে এমন কাজকে তার নিজের অপমান হিসেবে গণ্য করে—যেটা সে কখনোই বরদাস্ত করেনি। হ্যাসিয়েন্ডা ন্যাপোলস-এ দেশের সব প্রান্ত থেকে আসা ২০০ মাদক চোরাকারবারিদের নিয়ে একটি সভা করে। এ সভায় তারা এই গেরিলাদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেয়ার জন্য নিজস্ব প্যারামিলিটারি বাহিনী গঠনের সিদ্ধান্ত নেয় এবং হেলিকপ্টার থেকে ফুটবল মাঠে গেরিলা নেতাদের ছবিসহ লিফলেট ছড়িয়ে এর ঘোষণা দেয়। যদিও এসকোবার এবং আরও কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় পর্দার আড়ালে থেকে যায়। তারা প্রায় ১,০০০ মানুষ এক হয়ে পুলিশ ও মিলিটারির সঙ্গে এম-১৯ গেরিলাদের খুঁজতে বেরিয়ে পড়ে। দুই মাসের মধ্যে অন্তত ৪০০ গেরিলা এবং তাদের আত্মীয়স্বজনকে মেরে ফেলে। ১৯৮২ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি হোর্হে লুইস অচোয়ার বোনকে মুক্তি দেয় এম-১৯। এসকোবার কেবল আরেকবারের মতো নিজের শক্তি ও সামর্থ্য প্রদর্শন করেছিল। পাশাপাশি এক অংশ কলম্বিয়ানদের কাছে বামপন্থি গেরিলাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে মাদক চোরাকারবারিরা একধরনের বৈধতা পেয়ে গিয়েছিল। কেননা সে-সময়ে এসব মাদক ব্যবসায়ীদের চেয়ে গেরিলারা সামাজিক শৃঙ্খলার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সর্বোপরি কোকেইনের প্রায় পুরোটাই ভোগ করত আমেরিকার সমাজ, কলম্বিয়া ভোগ করত শুধু সেখান থেকে আসা অর্থ।

 

এসকোবারের শীর্ষোত্থান

দেখতে দেখতে আমেরিকায় কোকেইনের চাহিদা আকাশচুম্বী হয়ে পড়ে। এ সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে এসকোবার আরও বেশি চালান, চোরাচালানের পথ এবং ডিসট্রিবিউশন নেটওয়ার্ক তৈরি করতে থাকে। দক্ষিণ ফ্লোরিডা, ক্যালিফোর্নিয়া এবং দেশের অন্যান্য অংশে পাবলো তার কোকেইন ছড়িয়ে দিতে থাকে। ফ্লোরিডা থেকে ৩৫০ কিলোমিটার দূরে বাহামা দ্বীপপুঞ্জের একটি দ্বীপ নরম্যানস কে। দ্বীপটি কিনে ফেলে এসকোবার ও তার পার্টনার কার্লোস লেহডার। সে-দ্বীপে তারা ১ কিলোমিটার লম্বা একটি এয়ার স্ট্রিপ, একটি বন্দর, একটি হোটেল, ঘর-বাড়ি, নৌকা এবং প্লেন জড়ো করে। একইসাথে সেখানে একটি রেফ্রিজারেটেড গুদাম তৈরি করে কোকেইন মজুদ করার জন্য। এই দ্বীপটিকে তারা ব্যবহার করত একটা ট্রান্স-শিপমেন্ট পয়েন্ট হিসেবে। ১৯৭৮ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত এই দ্বীপকে কেন্দ্র করেই মাদকব্যবসা পরিচালনা করত মেডেলিন কার্টেল। অবিশ্বাস্য রকমের মুনাফার টাকা দিয়ে খুব তাড়াতাড়ি এসকোবার এনটিওকুইয়া শহরে ৭.৭ বর্গ মাইল জমি কিনে সেখানে তার বিখ্যাত বাড়ি হ্যাসিয়েন্ডা ন্যাপোলেস (Hacienda Nápoles) নির্মাণ করে। এ বাড়িতে নিজস্ব চিড়িয়াখানা, একটি লেক, একটি ভাস্কর্য বাগান, নিজস্ব ষাঁড়ের লড়াইয়ের মাঠসহ প্রয়োজনীয় সবকিছুই ছিল।

একপর্যায়ে ধারণা করা হতো যে, প্রতি মাসে কলম্বিয়া থেকে ৭০ থেকে ৮০ টন কোকেইন আমেরিকায় চালান করা হতো। ১৯৮০ দশকের মাঝামাঝির দিকে মেডেলিন কার্টেল এক-একটি চালানে গড়ে ১১ টন কোকেইন আমেরিকায় পাচার করত। এ কাজে তারা জেট লাইনার ব্যবহার করত। প্লেনের চাকার ভিতরে বিশেষ কৌশলে এই কোকেইন পাচার করা হতো। আর যে সমস্ত পাইলট এই প্লেনগুলো চালিয়ে নিয়ে যেত তাদের এক-একটি ট্রিপে ৫,০০,০০০ মার্কিন ডলার পর্যন্ত বেতন দেয়া হতো। প্লেনের পাশাপাশি কোকেইন পাচারের জন্য এসকোবার দুটি ছোট সাবমেরিনও ব্যবহার করত। পাবলো এসকোবারের ভাইয়ের দেয়া তথ্যমতে এক চালানে সর্বোচ্চ ৫১,০০০ পাউন্ড (২৩,০০০ কেজি) পর্যন্ত কোকেইন সে আমেরিকায় পাচার করেছিল। এই চালানটি অবশ্য করা হয়েছিল সমুদ্রপথে।

 

রবিনহুড ও রাজনীতিবিদ এসকোবার

সামাজের গরিব শ্রেণির মানুষের কাছে এসকোবার অত্যন্ত জনপ্রিয় এক ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়। ১৯৭৬ সালে সে মারিয়া ভিক্টোরিয়া হেনাওকে বিয়ে করে। হেনাও-এর পরিবার এ ঘটনায় অবশ্য আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। কেননা বিয়ের সময় কনের বয়স হয়েছিল মাত্র ১৫ বছর। পরের বছরই তাদের প্রথম ছেলে হুয়ান পাবলো জন্মগ্রহণ করে। যদিও পরবর্তী সময়ে বাবার কৃতকর্মের ভয়ংকর ফলাফল থেকে বাঁচতে সে নাম পরিবর্তন করে আর্জেন্টিনায় পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। পরিবার এবং বন্ধুদের প্রয়োজনে পাবলো কখনো কোনো কমতি রাখেনি। তার পাহাড়সমান সম্পদ সে একা ভোগ না করে, সবাইকে নিয়েই ভোগ করত। পরিবারের চেয়ে কোনো কিছুই তার কাছে বেশি গুরুত্ব পেত না। একজন দায়িত্বশীল বাবা হিসেবেও সে ছিল অনুকরণীয়। গাঁজা খাওয়ার সময় সে তার বাচ্চাদের কাছ থেকে লুকিয়ে খেত। জীবনের শেষের দিকে যখন সে প্রশাসনের কাছ থেকে সপরিবারে পালিয়ে বেড়াচ্ছে, তখন কোনো এক রাতে তার মেয়ে ম্যানুয়েলার শীত লাগছিল বলে প্রায় ২ মিলিয়ন ডলারের নোট পুড়িয়ে আগুন জ্বেলে মেয়েকে উষ্ণতা দিয়েছিল।

অপরিসীম সম্পদসহ নিজেকে সে নিয়োজিত করেছিল মেডেলিন-এর গরিব মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য। এ কাজে তার প্রথম প্রজেক্ট ছিল সিভিজমো এন মারচা নামের একটি রেডিও অনুষ্ঠান এবং সামাজিক উন্নয়নের উদ্যোগ। এসকোবার তার চাচা হার্নান্ডো গাভিরিয়াকে সাথে নিয়ে ১৯৭৯ সালে এটি শুরু করে। এ প্রকল্পে রাস্তার ধারে গাছ লাগানো, খেলাধুলার সুযোগসুবিধা তৈরি এবং স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য একটি মেডিক্যাল অফিস নির্মাণ করা হয়।

প্রায় একশটি ফুটবল মাঠে সে আলোকস্তম্ভ বা লাইটিং টাওয়ার নির্মাণ করে দেয়। এবং এর প্রতিটি উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সে উপস্থিত থাকত। তার চাচার খবরের কাগজ মেডেলিন সিভিকো (Medellín Cívico) তাকে নিয়ে ‘In the public neighborhoods night became day’ শিরোনামে একটি স্টোরি ছাপায়। এসকোবার মূলত নিজের একটা পজেটিভ ইমেজ তৈরির জন্য সচেষ্ট ছিল।

এসকোবারের সবচেয়ে বিখ্যাত সামাজিক উন্নয়ন প্রকল্প ছিল বস্তিমুক্ত মেডেলিন (Medellín sin tugurios) প্রকল্প। এর অংশ হিসেবেই ব্যারিও পাবলো এসকোবার নির্মিত হয়। মোরাভিয়া নামক এক স্থানে ময়লার স্তূপের ওপরে একটি বস্তির অবস্থান ছিল। এই ময়লার পাহাড়েই এ বস্তির লোকেরা থাকত এবং গারবেজ ট্রাকের ফেলে যাওয়া ময়লা থেকে স্ক্র্যাপ সংগ্রহ করে তাদের সংসার চলত। এই হতদরিদ্র মানুষগুলোর জীবনযাপনের এই দুরবস্থা পাবলো এসকোবারকে নাড়া দেয়। একটা সময় এই বস্তিতে আগুন লেগে সব ঘরবাড়ি পুড়ে যায়। এরপর খুব দ্রুত পাবলো একটি পরিকল্পনা করে এই বস্তির মানুষের জন্য এক হাজার ঘর নির্মাণ করে দেয়ার ঘোষণা দেয়।

ব্যারিও পাবলো এসকোবার এখনো আছে। যেখানে ১২,৭০০ মানুষের বসবাসের জন্য ২,৮০০ বাড়ি তৈরি করে দিয়েছিল এসকোবার। এখানকার বাসিন্দাদের কাছে পাবলো এসকোবার এক হিরো, একজন ত্রাতা বা রক্ষাকর্তা।  এই প্রকল্পের একটি দেয়ালে আজও পাবলো এসকোবারের ছবিসহ একটি ম্যুরাল আঁকা রয়েছে যাতে লেখা ‘ব্যারিও পাবলো এসকোবার যেখানে শান্তি বিরাজমান’। এছাড়াও আরও অনেক দেয়ালে পাবলোর ছবি স্প্রে পেইন্ট করা আর লেখা ‘San Pablo’ (Saint Pablo) বা সাধু পাবলো। পাবলো এসকোবারকে নিয়ে নির্মিত একটি ডকুমেন্টারি ছবির জন্য এখানকার এক বৃদ্ধার সাক্ষাত্কার নিতে গেলে, সে পাবলোর একটি বাঁধাই করা ছবি দেখিয়ে বলে যে, জীবনে যে দুজন মানুষের প্রতি সে সবচেয়ে বেশি কৃতজ্ঞ তাদের একজন হলো তার মা যে তাকে জীবন দিয়েছে এবং অন্যজন হলো পাবলো এসকোবার যে তাকে ঘর দিয়েছে।

এসকোবারের এসব সামাজিক প্রকল্পে ক্যাথলিক চার্চ পূর্ণ সমর্থন দিত। এসব বস্তিতে সে যখন হেঁটে বেড়াত তখন সাথে দুজন ধর্মযাজক তাকে সঙ্গ দিত। রাস্তা নির্মাণ, বিদ্যুতায়ন ইত্যাদি কাজেও পাবলো অর্থ অনুদান দিত। তার নিজের এলাকার উন্নয়নে এসকোবার দেশের সরকারের চেয়েও বেশি অর্থ খরচ করত। কখনো কখনো এরকম কোনো উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এসে পাবলো এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে নগদ অর্থ বিতরণ করত। জনসমক্ষে কিংবা কোনো মিডিয়ায় কথা বলার সময় সে তার বিনয়ী চরিত্র, সাধারণ মানুষের সাথে তার সুসম্পর্ক এবং তার দেশপ্রেমকে হাইলাইট করত।

তার এই জনসমর্থনকে সে কাজে লাগিয়েছিল কলম্বিয়ার বন্দি বিনিময় চুক্তির বিরুদ্ধে আন্দোলনে। এক সভায় ১৯৭৯ সালে কলম্বিয়া এবং আমেরিকান সরকারের মধ্যে স্বাক্ষরিত এই চুক্তিকে পাবলো নিন্দা জানায়। সে বলে যে, এই চুক্তি কলম্বিয়ার সার্বভৌমত্ব নষ্ট করেছে। জন প্রতিনিধি হিসেবে তার নির্বাচনী প্রচারণায় এটিকেই সে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছিল। সে সচেতনভাবে সব ধরনের বেআইনি কাজে তার যুক্ত থাকার সব প্রমাণ মুছে ফেলতে শুরু করে। সে জনগণের কাছে দরিদ্র মানুষের একজন দয়ালু এবং উদার বন্ধু হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠার জন্য পাবলিসিস্ট নিয়োগ করে এবং কিছু সাংবাদিকদের তার হয়ে লেখার জন্য ভাড়া করে। নিজের একটি ভালো ইমেজ তৈরিতে সে তার চাচার পত্রিকার সর্বোচ্চ ব্যবহার করেছিল। এসকোবারের একজন ভক্ত এই পত্রিকায় তার একটি লেখায় বর্ণনা করে যে, ‘হ্যাঁ, আমি তাকে চিনি। তার হাত দুটো যে সাধুর হাত, যা বাতাসে বন্ধুত্ব আর দয়ার এক বৃত্ত আঁকে। হ্যাঁ, আমি চিনি তাকে। তার চোখ দুটি জলে ভিজে ওঠে কারণ দেশের সব ডাইনিং টেবিলের জন্য যথেষ্ট রুটি নেই। আমি তার মর্মবেদনা দেখেছি, যখন সে দেখে পথের শিশুদের হাতে খেলনা নেই, তাদের কোনো বর্তমান নেই, নেই কোনো ভবিষ্যত্।’

১৯৮৩ সালের এপ্রিল মাসে কলম্বিয়ার অন্যতম প্রধান পত্রিকা সেমানা ম্যাগাজিন এসকোবারকে নিয়ে ‘A paisa Robin Hood’ শিরোনামে একটি স্টোরি প্রকাশ করে। এই স্টোরিতে সামাজিক উন্নয়নের জন্য এসকোবারের প্রচেষ্টা, তার বিভিন্ন বণ্যপ্রাণীর সংগ্রহ এবং বন্দি বিনিময় চুক্তি নিয়ে তার প্রচারণার গল্প উঠে আসে।

পিছনের ইতিহাসকে জনগণের মন থেকে মুছে ফেলে, তার বিরুদ্ধে অভিযোগের ফাইলগুলোকে ধুলো চাপা দিয়ে এসকোবার ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে নেয়। ১৯৭৮ সালে সে মেডেলিন সিটি কাউন্সিল-এ নির্বাচিত হয়। ১৯৮০ সালে জনপ্রিয় প্রগতিশীল রাজনীতিবিদ লুইস কার্লোস গালানকে নিউ লিবারেল পার্টি গঠনে সমর্থন প্রদান করে এসকোবার। ১৯৮২ সালে নিউ লিবারেল পার্টির টিকেটে সে এনভিগাদো প্রতিনিধি জাইরো ওর্তেগার পরিবর্তে নির্বাচিত হয়। যদিও এটি একটি বিকল্প পদ ছিল, কিন্তু সে একজন কংগ্রেসম্যান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং সব ধরনের কূটনৈতিক সুবিধাদির আওতায় চলে আসে। যেমন—কলম্বিয়ার আইন অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে মামলা করা যবে না এবং তার পাসপোর্ট হবে কূটনৈতিক পাসপোর্ট। এই পাসপোর্ট নিয়েই সে আমেরিকায় যায় এবং মায়ামিতে একটি ম্যানসন কেনে।

এসকোবারের এই রাজনৈতিক উত্থান বেশিদিন টেকেনি। তত্কালীন কলম্বীয় বিচারমন্ত্রী রড্রিগো লারা সকলের সামনে পাবলোকে অপমান করে, তাকে মাদক ব্যবসায়ী, খুনি ও সন্ত্রাসী হিসেবে নিন্দা করে। এতে করে পাবলো এসকোবার বাধ্য হয় তার পদ ছেড়ে দিতে। কিন্তু এই অপমান পাবলো ভুলতে পারেনি। কিছুদিন পরে নিজের অফিস থেকে বের হয়ে গাড়ি করে যাবার পথে আততায়ীদের গুলিতে লারা মারা যান। যদিও আগেই আমেরিকান দূতাবাস লারাকে সাবধান করেছিল এবং একটি বুলেট প্রুফ জ্যাকেট দিয়েছিল নিরাপত্তার জন্য। কিন্তু এসব কিছু এসকোবারের হাত থেকে তাকে বাঁচাতে পারেনি।

তার মাদকচক্রের কুখ্যাতির জন্য এসকোবার আন্তর্জাতিকভাবেও পরিচিতি লাভ করে। আমেরিকায় পাচার হওয়া কোকেইনের ৮০%-এরও বেশি নিয়ন্ত্রণ করত মেডেলিন কার্টেল। এছাড়াও মেক্সিকো, পুয়ের্তো রিকো, ডমিনিকান রিপাবলিক, ভেনিজুয়েলা এবং স্পেনের মাদক বাজারের নিয়ন্ত্রণও ছিল তাদের হাতে। ইতোমধ্যে কোকেইনের উত্পাদন পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আনা হয়। পেরু ও বলিভিয়ার কোকার বদলে স্থানীয়ভাবে চাষকৃত নিম্নমানের কোকার ব্যবহার শুরু হয়। কোকেইনের ক্রমবর্ধমান চাহিদার সাথে পাল্লা দিয়ে এসকোবার আমেরিকার অন্যান্য দেশ, ইউরোপ—এমনকি এশিয়া পর্যন্ত নিজের নিয়ন্ত্রণ ছড়িয়ে দিয়েছিল।

রুপা কিংবা সিসা (Plata o plomo)

এসকোবারের জন্য দুর্নীতি এবং ভীতি এই দুই ছিল কলম্বীয় প্রশাসনকে নিয়ন্ত্রণ করার প্রধান অস্ত্র। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং সরকারি লোকজনের জন্য সে একটি খুবই কার্যকর পলিসি বের করে—যার নাম হয়ে যায় ‘প্লাটা ও প্লোমো’ (Plata o plomo)। যার আভিধানিক অর্থ ‘রৌপ্য কিংবা সিসা’, আর প্রচলিত অর্থ হলো ‘টাকা নাও নইলে গুলি খাও’। এই পলিসির শিকার হয়ে ৩ হাজারেরও বেশি মানুষ এসকোবারের নির্দেশে হত্যার শিকার হয়। এদের মধ্যে একজন প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী, একজন বিচারমন্ত্রী, একজন অ্যাটর্নি জেনারেল, ২০০-র বেশি বিচারক, হাজারেরও বেশি পুলিশ কর্মকর্তা-সহ যখনই সামনে যে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে সেই এই তালিকায় নিজের নাম লিখিয়েছে। এর পাশাপাশি অসংখ্য সরকারি ও আইন প্রয়োগকারী কর্মকর্তাকে ঘুষ দিয়ে কিনে রেখেছিল এসকোবার।

১৯৮৯ সালে পরবর্তী রাষ্ট্রীয় নির্বাচনে (১৯৯০) সবচেয়ে জনপ্রিয় প্রার্থী লুইস কার্লোস গালান হত্যার দায় এসকোবারকেই দেয়া হয়। এছাড়াও আরেক প্রার্থী সিজার গ্যাভিরিও ট্রুজিল্লোকে হত্যার উদ্দেশে একশরও বেশি যাত্রী-সহ একটি প্লেন বোমা মেরে উড়িয়ে দেয়ার অভিযোগ পাওয়া যায় তার বিরুদ্ধে। যদিও যাকে মারার উদ্দেশ্যে এত বড় একটা ঘটনা ঘটানো হয় সে বেঁচে যায় এবং পরবর্তী সময়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়। এসকোবার ও তার মেডেলিন কার্টেলের আরেকটি ভয়ংকর আক্রমণ ছিল গাড়ি বোমা দিয়ে জাতীয় নিরাপত্তার প্রধান কার্যালয় উড়িয়ে দেয়া। প্রতিষ্ঠানের পরিচালক মিগুয়েল মাজা মার্কেজকে হত্যার উদ্দেশে পরিচালিত এক বোমা হামলায় ৫০০ কেজি ডিনামাইট ব্যবহার করা হয়। ৫২ জন মানুষ মৃত্যুবরণ করে এদিন, এবং হাজারেরও বেশি মানুষ আহত হয়, কমপক্ষে ৩০০ বাণিজ্যিক স্থাপনা স্রেফ ধ্বংস হয়ে যায়। যদিও মিগুয়েল মাজা অক্ষত অবস্থায় বেঁচে যায়।

 

বিচারভবন আক্রমণ

অভিযোগ আছে যে ১৯৮৫ সালে কলম্বিয়ার সুপ্রিম কোর্টে বামপন্থি গেরিলা দল এম-১৯-এর আক্রমণের পেছন থেকে কলকাঠি নেড়েছে পাবলো এসকোবার। কলম্বিয়া এবং আমেরিকার মধ্যে স্বাক্ষরিত বন্দিবিনিময় চুক্তি বন্ধ করতে এই আক্রমণ চালানো হয় এবং প্রায় অর্ধেক বিচারককে হত্যা করা হয়। এসকোবার এম-১৯-কে টাকা দিয়েছিল সে ভবনে ঢুকে লস এক্সট্র্যাডিট্যাবলস্ (Los Extraditables) প্রকল্পের সব কাগজপত্র পুড়িয়ে ধ্বংস করে ফেলতে। লস এক্সট্রাডিট্যাবলস্ ছিল একটি তালিকা সেখানে পাবলো এসকোবারসহ আরও অনেক কলম্বীয় কোকেইন ব্যবসায়ীদের আটক করে আমেরিকার হাতে তুলে দেয়ার পরিকল্পনা ছিল। এর অংশ হিসেবে বেশ কিছু বিচারককে অপহরণ করে আটকে রাখা হয় যাতে এই লস এক্সট্র্যাডিট্যাবলস্ না ঘটে।

 

ক্ষমতার শিখরে এসকোবার

কোকেইন ব্যবসা যখন রমরমা, তখন মেডেলিন কার্টেল প্রতিদিন ৭০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি আয় করত। যার পরিমাণ বছরে দাঁড়ায় ২২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। প্রতিদিন গড়ে ১০-১৫ টন কোকেইন পাচার  হতো আমেরিকায়। এসকোবার কিংবা মেডেলিন কার্টেলের আয়কৃত এই অর্থ মূলত গুদামে রাখা হতো। এই টাকা বেঁধে সাজিয়ে রাখার জন্য প্রতি সপ্তাহে গড়ে ১,০০০ মার্কিন ডলার মূল্যের রাবার ব্যান্ড ব্যবহার করতে হতো। ইঁদুরের আক্রমণে প্রতি বছর কমপক্ষে ৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার নষ্ট হতো। এছাড়াও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগে নষ্ট হতো আরও ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

১৯৮৯ সালে ফোরবস্ ম্যাগাজিন বিশ্বের ৭ম ধনী ব্যক্তি হিসেবে ঘোষণা দেয় পাবলো এসকোবারকে। তার ও তার নিয়ন্ত্রিত মেডেলিন কার্টেল-এর অর্থের পরিমাণ ধারণা করা হয়েছিল ৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। যা প্যারাগুয়ের ২০১৬ সালের জিডিপি-র সমান; আমেরিকার মায়ামি রাজ্যের ৪,২৩,৫৭৪টি গৃহস্থালি আয়ের যোগফল; একজন আমেরিকান নাগরিকের এসকোবারের একদিনের আয়ের সমান আয় করতে লাগবে ১,১৫৫ বছর। আজকের দিনে ফরচুন ৫০০ তালিকায় মেডেলিন কার্টেল-এর অবস্থান হতো ১২৯তম।

১৯৮০-র দশকের শেষের দিকে কলম্বিয়া সরকার এসকোবারের কিছু স্থাবর সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে যাতে ছিল ১৪২টি উড়োজাহাজ, ২০টি হেলিকপ্টার, ৩২টি ইয়ট, ১৪১টি বাড়ি ও অফিস।

 

লা ক্যাটেড্রাল জেল

লুইস কার্লোস গালান হত্যাকাণ্ডের পর সিজার গ্যাভিরা সরকার এসকোবার এবং অন্যান্য ড্রাগ কার্টেলগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া শুরু করে। অবশেষে সরকার এসকোবারের সঙ্গে আলোচনা করে তাকে সকল অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বন্ধ করে আত্মসমর্পণের জন্য রাজি করায়, কম শাস্তি এবং বন্দি অবস্থায় বিশেষ ব্যবস্থার (এসকোবারের নিজস্ব কারাগার) প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে। ১৯৯১ সালে এসকোবার আত্মসমর্পণ করে। কিন্তু এর আগে আমেরিকার সঙ্গে কলম্বিয়ার বন্দিবিনিময় চুক্তি রদ করা হয়। যদিও ধারণা করা হয় এসকোবার এবং অন্যান্য মাদক ব্যবসায়ীরা ঘুষ দিয়ে সরকারি নীতিনির্ধারকদের মাধ্যমে এটা করিয়েছিল নিজেদের স্বার্থে। শর্ত অনুযায়ী এসকোবার তার নিজের কারাগার ‘লা ক্যাটেড্রাল’ (La Catedral)-এ তথাকথিত বন্দিজীবন শুরু করে। এই কারাগারে ফুটবল মাঠ, জায়ান্ট ডল হাউজ, বার, জাকুজ্জি ও ঝরনার মতো প্রয়োজনীয় সবকিছুই ছিল। পাশাপাশি যখন তখন যে কেউ এখানে এসে এসকোবারের সাথে দেখা করতে পারত। এবং এসকোবারও এই কারাগারে বসেই তার ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছিল। সবকিছু ভালোই চলছিল তার পরিকল্পনা অনুযায়ী। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তার এই বিলাসী বন্দিজীবন এবং মাদক ব্যবসা পরিচালনার খবর মিডিয়াতে চলে আসায় কলম্বিয়া সরকার বাধ্য হয় তাকে একটি সাধারণ কারাগারে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নিতে। ১৯৯২ সালের ২২ জুলাই সরকার তাকে তার নিজস্ব কারাগার থেকে স্থানান্তর করার আগেই এসকোবার পালিয়ে যায়। সরকারি বাহিনীর ভেতরে থাকা এসকোবারের চর আগেই সে-খবর পৌঁছে দিয়েছিল এই কোকেইন সম্রাটের কানে। এরপর সে যতদিন বেঁচে ছিল পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে বেরিয়েছে এখানে সেখানে, পাহাড়ে জঙ্গলে।

 

সার্চ ব্লক ও লস পেপেস

এসকোবার পালিয়ে যাবার পর যুক্তরাষ্ট্রের জয়েন্ট স্পেশাল অপারেশন্স কমান্ড (Joint Special Operations Command) যুক্ত হয় তাকে খুঁজে বের করার জন্য। কলম্বিয়া পুলিশের একটা বিশেষ দলকে তারা পরামর্শ ও ট্রেনিং দেয় যাদের নামকরণ হয় সার্চ ব্লক (Search Bloc)। পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও কলম্বীয় সরকারের পাশাপাশি আরেকটি দল গঠিত হয় যাদের নাম লস পেপেস (Los Perseguidos por Pablo Escobar, 'People Persecuted by Pablo Escobar')। পাবলো এসকোবার দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত লোকদের নিয়ে এ দলটি তৈরি করতে অর্থায়ন করে পাবলোর প্রতিপক্ষ দলগুলো—যার মধ্যে কালি কার্টেল (Cali Cartel) এবং ডানপন্থি প্যারামিলিটারিরা অন্যতম। প্রতিশোধের নেশায় লস পেপেস এক রক্তক্ষয়ী অভিযানে মেতে ওঠে। এসকোবারের তিনশ’রও বেশি সহযোগী, তার আইনজীবী এবং আত্মীয়স্বজনকে হত্যা করে তারা। মেডেলিন কার্টেলের সম্পত্তির একটা বড় অংশ ধ্বংস করে দেয়।

সার্চ ব্লকের সদস্যরা এবং কলম্বীয় ও যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা এসকোবারকে খুঁজে বের করার চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকে। সরকারি বাহিনী লস পেপেসকে গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সহায়তা করত যাতে এসকোবারের অবশিষ্ট সহযোগীদেরকেও নিশ্চিহ্ন করে দেয়া যায়। এমনটা শোনা যায় যে লস পেপেস-এর এসব রক্তক্ষয়ী অভিযানে সরকারি বাহিনীর লোকজনও সরাসরি অংশগ্রহণ করত।

 

অবশেষে মৃত্যু

লা ক্যাথেড্রাল থেকে পালানোর ১৬ মাস পরে ১৯৯৩ সালের ২ ডিসেম্বর সার্চ ব্লকের এক অভিযানে মারা যান পাবলো এসকোবার। বয়স হয়েছিল ৪৪ বছর। ব্রিগেডিয়ার হুগো মার্টিনেজ-এর নেতৃত্বাধীন কলম্বিয়ার একটি ইলেক্ট্রনিক সার্ভেল্যান্স টিম রেডিও ট্রায়াঙ্গুলেশন প্রযুক্তির ব্যবহার করে এসকোবারের রেডিওটেলিফোন ট্রান্সমিশন অনুসরণ করে তার অবস্থান খুঁজে পায়। সে তখন মেডেলিনে লস অলিভস নামের একটি মধ্যবিত্ত এলাকায় লুকিয়ে ছিল। সার্চ ব্লকের উপস্থিতি টের পেয়ে পাবলো এসকোবার ও তার দেহরক্ষী এল লিমন এক ছাদ থেকে অন্য ছাদে লাফিয়ে লাফিয়ে পেছনের রাস্তায় পৌঁছানোর চেষ্টা করে। কিন্তু দুজনেই গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায়। এসকোবারের পা, গলা এবং কানের ভেতরে গুলি লাগে।

কার গুলিতে এসকোবার মারা গেছে সেটা কখনোই নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে এসকোবারের দুই ভাই এবং ছেলের মতে, তাকে কেউ গুলি করার আগেই এসকোবার নিজেই নিজেকে গুলি করেছে। কেননা সে প্রায় প্রতিদিনই তাদেরকে বলত যে, যদি সে পালানোর মতো কোনো উপায় খুঁজে না পায়, তাহলে সে তার কানের ভেতর গুলি করে আত্মহত্যা করবে।

 

পরিশেষে

এসকোবার মারা যাওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই মেডেলিন কার্টেল টুকরা টুকরা হয়ে যায়। কোকেইন মার্কেটের কর্তৃত্ব চলে যায় কালি কার্টেলের কাছে। এবং ১৯৯০ দশকের মাঝামাঝি সময় এই কার্টেলের লোকজনকে কলম্বিয়া সরকার দমন করে ইতিহাসের এক কালো অধ্যায়ের ইতি টানে। পাবলো এসকোবারের রবিনহুড ইমেজ সত্যিই মেডেলিনবাসীর কাছে তাকে ভালোবাসার এক নাম হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত করেছিল। তার মৃত্যুতে বহু লোক শোকাতুর হয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েছিল। তার শেষকৃত্যে ২৫,০০০-এরও বেশি লোক যোগ দিয়েছিল।

পরবর্তী সময়ে এসকোবারের হ্যাসিয়েন্ডা ন্যাপোলেস-এর খামার বাড়ি, চিড়িয়াখানা এবং দুর্গ কলম্বিয়া সরকার নিম্ন আয়ের মানুষদেরকে দিয়ে দেয়। আর পুরো প্রোপার্টিতে একটি থিমপার্ক নির্মাণ করা হয় যাকে ঘিরে আছে চারটি বিলাসবহুল হোটেল। d

 

 

 

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
২১ জুন, ২০১৮ ইং
ফজর৩:৪৩
যোহর১২:০০
আসর৪:৪০
মাগরিব৬:৫১
এশা৮:১৬
সূর্যোদয় - ৫:১১সূর্যাস্ত - ০৬:৪৬
পড়ুন