উপন্যাস
তৃতীয় পুরুষ
সৈয়দ ইকবাল২১ জুন, ২০১৭ ইং
তৃতীয় পুরুষ
হিথরোতে নামল প্লেন গোটা আটলান্টিক পার হয়ে। মাটি স্পর্শ করার সঙ্গেই সিনথিয়া নাসরিন ব্যাগ থেকে সেল ফোন বের করে হাতে নিল।

প্লেন একেবারে থামতে যাত্রীরা সিট বেল্ট খুলে দাঁড়িয়ে মাথার ওপর থেকে হ্যান্ড লাগেজ গুছিয়ে নামাচ্ছে। অনেকে লাইন দিয়ে নামা শুরু করেছে। সিনথিয়া প্লেনের জানালা দিয়ে দেখল বাইরে। আচমকা তার হাতের সেল ফোন বেজে উঠতে চমকে উঠল। ফোন হাত থেকে প্রায় পড়েই যাচ্ছিল, কোনরকমে সে সামলাল।-ওয়েলকাম টু লন্ডন মাই লাভ। জমীল হোসেন তাপসের কণ্ঠ। প্রতি হপ্তায় দু’চারবার সিনথিয়ার ওর সঙ্গে কথা হয়। তবু কণ্ঠটা শুনে কেমন শিহরণ জাগল। তারা কথা বলত আটলান্টিক মহাসাগরের দু’পাড় থেকে একজন টরন্টো অন্যজন লন্ডন। এখন দু’জনেই লন্ডনে বলেই এ শিহরণ। কে জানে।

- এই মাত্র থামল প্লেন। কাঁপা গলায় উচ্চারণ করল সিনথিয়া।

- নিশ্চিন্তে নামো হিথরো আমার। আমি আছি এয়ারপোর্টে। একসঙ্গে উঠব গিয়ে এয়ারপোর্ট হোটেলে।

- নার্ভাস লাগছে। সিনথিয়ার কণ্ঠে সত্যি নার্ভাস ভাব।

- ছি, মাই লাভ। কী যে বলো! তুমি না আমাকে বললে তুমি এখন একেবারে অন্য মানুষ ড্যাম স্মার্ট, সামনের যে কোনো বাধা ভাঙতে তৈরি।

-তবু কেমন যেন লাগছে এই প্রথম হোটেলে আমরা একসঙ্গে থাকব।

- উফ্, থাকবে তো মাত্র ক’টা ঘণ্টা, নার্ভাসের কী আছে। এই তোমার চুল কী কার্ল করিয়েছ, হাইলাইট দেওয়ায় যা লাগছে না! সিনথিয়া তাপসের প্রশংসা শুনে হেসে ফেল্লো। এরকম হাসিখুশি সময়ে সিনথিয়ার সাবের রেহমানের কথা হঠাত্ মনে পড়ল কেন! চুল কার্ল করার পর প্রথম ছবি ফেসবুকে সাবের দেখে খুব ভালো লাগা জানিয়েছিল তাই তার মনে পড়ে গেল। তা ছাড়া পছন্দ-রুচির ব্যাপারে কিছুটা হলেও সে সাবেরের ওপর নির্ভরশীল। সাবেরই বলেছিল টরন্টো থেকে ঢাকা আসার সময় দু’টি কার্ল চুলের ছবি আমার জন্যে ডিজিটাল বড় প্রিন্ট করে এনো। সিনথিয়া আসার আগের দিন হাজারটা ব্যস্ততার মধ্যে টরন্টোর বাংলা টাউন ডেনফোর্থে ফাত্তা ভাইয়ের প্রিন্টার দোকানে গিয়ে সাবেরের জন্যে তার পছন্দের দু’টো প্রিন্ট করিয়েছে। পহেলা বৈশাখের আগের দিন সে নামবে ঢাকায়। বৈশাখের প্রথম দিন সে ছবিতে সাইন করে সাবেরের হাতে দেবে।

- কী হলো চুপ মেরে গেলে কেন? তাপসের অস্থির স্বর।

- কই নাতো! এক মুহূর্তে মাথাটা কেমন যেন চক্কর দিয়ে উঠেছিল। সে কি তাপসকে বলতে পারে হঠাত্ সাবেরের চিন্তায় ডুব দিয়েছি।

- আমার সামনে এসে দাঁড়ালে আমার বাঙালি মেম সাহেব বউ মাথাটা আরো চক্কর দেবে।

তাপসের গলা। বউ ডাকটি সিনথিয়া খুব পছন্দ করে। তখন তারা সবাই ঢাকায়, গভীর রাতে সাবেরের সঙ্গে ফেসবুকে চ্যাট করতে করতে ধুম করে বলে ফেলেছিল—বুদ্ধিতো আমার মাথায় থাকবেই দেখতে হবে না একজন চার্টার্ড একাউন্ট্যান্টের হবু বউ যে আমি। মুহূর্তে যেন বিষাদের মেঘে ঢেকে ফেলেছিল সব, তত্ক্ষণাত্ থেমে গিয়েছিল সাবের মাত্র দু’তিনটি শব্দ লিখে—গুড নাইট হবু বউ, ঘুমাও গুড নাইট।

সাবের লোকটা খুবই টেলেন্টেড তবে ভীষণ ইমোশনাল। নিজেই সিনথিয়া হাসে। তবে ইমোশনাল না হলে কী ভাবে আর কবি হয়। সাবের রেহমান দেশের একজন পরিচিত কবি। আকাশ-বাতাস আর প্রিয় মানবীকে নিয়ে সারাক্ষণ স্বপ্নের জাল বুনে। সিনথিয়ার এজন্যেই হয়ত ভালো লাগে। সাবের রহমান এক্কেবারে আলাদা অন্যদের সঙ্গে তুলনা করা যায় না। সারা রাত সাবের ঘুমায়নি সেই একটা শব্দের জন্যে। অথচ সকাল ৬টায় গাড়ি নিয়ে হাজির তাদের ফ্ল্যাটের পেছনে সিনথিয়াকে রাজেন্দ্রপুর ব্র্যাক রিসোর্টে সেমিনারে পৌঁছে দিতে সে হাজির। ইচ্ছে করলে রাগ দেখিয়ে নাও আসতে পারত তবে সে তেমন মানুষই না।

আবার ফোনে তাপস ডাক দিল তাকে। বোতল মুখে নিয়ে ঢক ঢক করে ঢালল পানি।

-আসচ্ছিরে, এতো অস্থির হচ্ছো কেন? সিনথিয়া হিথরোর টার্মিনালের তেমন কিছু চেনে না। উফ্ আমার ভয় করছে, সময়মতো ঢাকার ফ্লাইট কী ধরতে পারব! কোনোভাবেই ফ্লাইটটা মিস করা যাবে না। মিস করলে বড়ই মুস্কিল। মামীরা ঢাকা এয়ারপোর্টে তার অপেক্ষায় থাকবে। তা ছাড়া সাবের রেহমান অনেক কষ্টে ফুটবল ফেডারেশনের মালু ভাইকে ধরে এয়ারপোর্টে ইমিগ্রেশন এরিয়া পার হয়ে ভেতরে ঢোকার পাস নিয়েছে। মামীর কাছে পৌঁছার আগেই যাতে প্রথমেই তার সঙ্গে সিনথিয়ার দেখা হয়। সময়মতো ঢাকা না পৌঁছালে টরন্টোতে মাও ভীষণ চিন্তিত হয়ে উঠবেন।

তাপস তাকে অভয় দিচ্ছে ৮ ঘণ্টা অনেক সময় এর মধ্যে কাছেই এয়ারপোর্ট হোটেলে ক’টা ঘণ্টা একসঙ্গে থেকে আবার ফিরবে ঢাকার প্লেন ধরতে। ভিসার প্রবলেম নেই। সিনথিয়ার কানাডিয়ান পাসপোর্ট রয়েছে। এত সব ভেবে সিনথিয়া রাজী হয়েছে হিথরোতে এয়ারপোর্টের কাছেই লাগোয়া হোটেলে উঠবে। তার যে ইচ্ছা করছে না তাও নয়। তাদের সম্পর্ক তো বেশ কয়েক বছরের ফোন, ফেসবুক, ই-মেইলে আদর আর কতটা করা যায়। তবু তাপস চুমু খায় সিনথিয়ার চোখে নাকে কানে তারপর ঠোঁটে ফ্রেঞ্চ কিসে মত্ত হয়। সবই ভার্চুয়াল। আজ তা সত্যি হতে পারে।

একবার হুট করে সাবেরকে জিজ্ঞেস করে বসেছিল—ফ্রেঞ্চ কিস কীভাবে করতে হয় জানো।

সাবের চিন্তায় পড়ে যায়।

- বোকা শিল্পী! কিসের শিল্পী তুমি, কিচ্ছু জানো না। শিল্পীরা তো অনেক কিছু জানে।

- সব শিল্পী কী তেমন প্রতিভাবান, যে সব কিছু জানবে! কেউ কেউ জানে। কেউ আবার আমার মতো স্বপ্ন নিয়ে ডুবে থাকে।

অতি সহজে অভিমান করে ফেলে সাবের। সিনথিয়ার ব্যাপারটা বেশ মজাই লাগে। সাবের চোখের ভ্রূ পেকে গেছে বেশ ক’টা তবে চোখ দুটো ভারি সুন্দর। রমণ শেষে বিছানায় সাবের যখন ক্লান্ত হয়ে চিত্ হয়ে শুয়ে থাকে সিনথিয়া অপলক তার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে।

- তুমি শিল্পী তাই বলে কী তোমার চোখ এতো সুন্দর?

কথাটা শুনে এখন রাগ হয় সাবেরের।

- ছিল কোনোকালে, ভাবীজানরা বলতেন চোখ সুন্দর। এখন তো আমার মারবার দিন।

সিনথিয়া রাগ দেখিয়ে পাঁচ আঙুল একত্রিত করে ঘুষি পাকায়।

- গুষ্টিমারি তোমার যৌবনকালে আসা ভাবীদের। আমি যে এখন বলছি তা গায়ে লাগে না!

সিনথিয়া এমনি, তার চিন্তাও মাতাল হাওয়ার মতো। এক কথা ভাবতে ভাবতে ছুটে আরেক দিকে।

হিথরো এয়ারপোর্ট যে সিনথিয়ার কাছে একেবারে অপরিচিত তা নয়। বেশ কয়েক বারতো হয়ে গেল লন্ডন দেখে ট্রাঞ্জিটে বসেছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, ঘুর-ঘুর করেছে টার্মিনালের দোকান সারির এমাথা-ওমাথা। বেরিয়ে অবশ্য শহরে ঢোকেনি। জমীল হোসেন তাপস তার অপেক্ষায়। তাহলে চিন্তা কীসের। শুধু ঢাকার প্লেন মিস না হলেই হয়। তবে তার কেমন যেন ইচ্ছা করছে প্লেনটা মিস হোক।

জমীল হোসেন তাপস লম্বায় পাঁচ ছয় হবে তবে মুখটা বেশ আকর্ষণীয়। ফিগারও ভালো। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইন্যান্স এর ছাত্র। নিজের বিভাগে অনেক মেয়েই পছন্দ করত তাপসকে। তাপসও বুঝত মেয়েরা তাকে পছন্দ করে। একজনকে লুকিয়ে অন্য জনের সঙ্গে সম্পর্ক যে চালিয়ে যায়নি সে তা নয় কোনো মেয়ের ভেতরেই সে গভীরতা পেত না। সরে যেত তাই অন্য দিকে। তাপস তখন সদ্য যুবক, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। এরই মধ্যে একের পর এক নারী সম্পর্ক। আসলে ভুল বলা হলো, একের পর এক নয় এক সঙ্গে দুই কিংবা তিন সম্পর্ক, কথার মায়াজাল পার হয়ে শরীরে অবতরণ করা তার যেন অহরহ ব্যাপার। সবাই তাকে আপন করে নিতে চায় এটাই ক্লান্ত করে তুলছে তাপসকে।

এরকম একটা সময় সে হরিদাশ সিংহ দাদার শরণাপন্ন হয়। হরিদাশ পাল নামেই সবাই অভ্যস্ত। সিংহ তো সিংহের মতোই হবে। লম্বা চওড়া কুস্তিগীরের মতো দেখতে একটা ঋষি মুনি টাইপের মানুষ, জগত্ ভুলে মোহাচ্ছন্ন থাকতেই ভালোবাসেন বেশটা সময়। তাপস আকৃষ্ট হয়েছিল হরিদার জন্যে যে সে দেখেনি আগে কেউ পিএইচডি করে এরকম জীবন যাপন করতে। তিনি বলেছিলেন ভালো চিন্তার আদান-প্রদানের সময় গাঁজা মগজকে ত্বরান্বিত করে। দ্রুত দৌড়াতে সাহায্য করে। মাথায় একটু ঝিমুনি এলে হরিদা শুরু করেন দেহতত্ত্ব, মনতত্ত্ব নিয়ে কথা মালা।

- হরিদা এত কিছু আপনি কীভাবে জানেন? এত কিছু পারেন।

- তাইতো কিছু করি না!

- কেন করেন না? সর্বোচ্চ ডিগ্রি ধারণ করে কেন কিছু করবেন না?-

পারলে তো করতাম। পারি না বলে করি না। যে ইচ্ছা মানুষের করে না তা করা উচিত না। বুঝলে তাপস।

- ঠিক বলেছেন হরিদা। এখন দু’জন নারীর সঙ্গে আমার সম্পর্ক প্রীতি আর জুমু, তারা ভাবাবেগে ভাসছে। দু’জনই ভাবে তাপস তাকে ছাড়া অন্য কোনো নারীর কথা ভাবতেও পারে না।

- মেয়েদের এই একটা দোষ নিজের মতো ভেবে নেয়। যেমন তোমাকে নিয়ে ওরা ভাবছে। তুমি ঠিক তাদের মতো ভাবছ না।

- ঠিক বুঝলাম না!

- বুঝবেও না। ওই যে তুমি বল্লে ভাবযোগ। যোগের পর ভাব বেগ দেয়। মানুষ তখন অস্থির হয়ে ওঠে প্রিয় পাত্র কিংবা পাত্রীকে একান্ত নিজের করে পেতে। একান্ত নিজের। এই ভাবে একান্ত নিজের বলতে সে নিজে আর কেউ, আর কিছু নেই। নিজের প্রাণ, নিজের আত্মউপলব্ধিই সব! বাদ দাও সে সব অনেক গভীর ভাবের ব্যাপার।

- এর সঙ্গে প্রীতি আর জুমু দুই নারী সম্পর্কের কী?

- আছে বত্স! আছে। ওদের দু’জন কিংবা একজনের ভাবযোগ হয়েছে। তোমার হয়নি ওদের প্রতি। তাই তুমি বুঝতে পারছ না।

-আমার না হওয়াটা কী আমার হাতে। নিজের অজান্তে অন্যের ভাব উত্পত্তির মুখ খুলে দিচ্ছি বলে কী অন্যায় করছি দাদা?

- না, তা কেন! এটাইতো কৃষ্ণলীলা। জাগ্রত কর, নিজে শান্ত থেকো। তাপস মাঝে মাঝে বুঝে উঠতে পারে না এই অদ্ভুত মানুষকে। নিজের বউয়ের টানে না হোক নিজের সন্তানদের টানে তাদের সঙ্গে দেখা করতে পারেন তিনি। তাও করবেন না। বলে ওঠেন-সব মায়া! মায়া। মায়ার সুতো কাট্টি দেয়া খুব কঠিন।

- তাপস, বত্স, যে দু’জন নারীর কথা বল্লে তাদের সঙ্গে কী উপগত হয়েছ তুমি?

- এখনো নয়, কামনা করছি।

- কামনাই সব, দেরি কর না। যথাশীঘ্রই মায়া কাটিয়ে ছিন্ন কর নিজকে। তা না হলে তুমিও মায়ার চক্করে পড়ে যাবে।

- দু’জনের মধ্যে কার আমার প্রতি ভাবযোগ বেশি?

জুমু মেয়েটির মধ্যে। প্রীতির মধ্যে চাতুর্য আছে ছলনার যোগপূর্ণ।

-জুমুর চিত্ত বড় অস্থির আজ। ক্যাম্পাসে কেউ তাকে বলেছে প্রীতির সঙ্গে আমার সম্পর্কের কথা। সে এতই ভাবযোগে পূর্ণ যে বিশ্বাস করেনি সে কথা এক ফোঁটাও। উল্টো ফোনে আমাকে সব জানিয়ে উদাস গলায় ডেকেছে বাসায়। দুপুর থেকে সন্ধ্যা তাদের বাসায় অন্য কেউ থাকবে না। সে একা থাকছে।

- যাও বসসা। জুমুকে গ্রহণ কর। মেয়েটিকে বলো— এই নারী তুমি জিজ্ঞেস কর আকাশ-বাতাস সহ তোমাকে ঘিরে রাখা সব কিছুকে তাপস নামের যুবকটি কার! তারাই উত্তর দেবে। এসব কথা শুনে জুমু বালিকা তোমাকে তার অন্তর গহ্বরে নামতে দেবে। আমি এক ক্ষুদ্র মানুষ আমি আর এর চেয়ে বেশি কী বলব।

তাপস দাদার হাত থেকে অপরূপ ভাবে ভরা সিগারেটটি নিজের হাতে নিয়ে দীর্ঘক্ষণ টেনে ভাব যত অন্তর্গত করল নিজের মধ্যে।

- দাদা টানে টানে খুলতে শুরু করেছে পরতে পরতে দরজা এখন, আমি উড়ব সাত আসমানে। যাই দাদা, ভালো থাইক্যান।

- আমি সদা ভালো থাকি, তুমিও থাকিও।

দুপুর বেলা ফাঁকা সব দিক। অল্প হাঁটতেই রিকশা পেয়ে উঠে বসল। সরকারি বড় অফিসারের বাসা বলেই চার ধারে বাগান আর ফাঁকা জমি। তার কেন মনে হচ্ছে মেঘভর্তি রাস্তা সে আলাদিনের জাদুর কার্পেটের মতো রিকশাসহ উড়ছে। ভাবের ডোজ কি বেশি হয়ে গেছে? কে জানে।

জুমুর বাসায় আগে দুইবার এসেছে। আরো সহপাঠীদের সঙ্গে উত্সবে, জন্মদিন পার্টিতে। বাবার বাড়তি কামাইয়ের জৌলুস বাড়ির সর্বত্র চোখে পড়ে। জুমুকে প্রতিদিন ড্রপ করে আবার নিয়ে যায় একটি গাড়ি, যা তার মায়ের আয়ত্তে থাকে, সরকারি কাজে নিয়োজিত। অন্য গাড়ি বাবার সবসময়।

কুকুর হইতে সাবধান করা বাড়ি। তবে কোথায় যে কুকুরগণ কে জানে। ফোন না করলেও বলত। তবু তাপস জুমুকে কল করল।

- হ্যালো, হ্যালো কে তাপস।

- হ্যাঁ।

ফোনেই বুঝল তাপস মেয়েটির কণ্ঠ ভাবাবেগে কাঁপছে। আবেগ জিনিসটা কী কে জানে কেন যে ইনশাল্লা পুরে দিয়েছেন মনুষ্যের ভেতরে কে জানে?

- তুমি কী কাছাকাছি এসে গেছ?

- হ্যাঁ।

- ঠিক আছে চলে এসো। আমি আর বুয়া আছি বাসায়। সে ও খেয়ে-দেয়ে ঘুমাতে গেছে বোধহয়।

- আমি তোমাদের দরজায়।

- ও মাই গস্। তাই নাকি! দাঁড়াও খুলছি।

দরজা খুলেতো জুমু অবাক চোখে তাকিয়ে রইল তাপসের দিকে।

- ভেতরে আসতে বলবে না?

লাল সিঁদুর কালচে হয়ে পড়লে যেমন ঠিক তেমনি পুরোনো দিনের ফ্লোর। সারাক্ষণ মোছামুছিতে ঝকঝক করছে। এতবড় ঘরে এক কোণে ডাইনিং ছ’টি চেয়ারের সঙ্গে আত্মীয় সহবতে দাঁড়িয়ে আছে অন্য কোণে বসার জন্যে দামি ফরেন সোফা দুই সেট।

- কী যে বলো! আমারতো বিশ্বাসই হচ্ছে না তুমি এলে শেষ পর্যন্ত। ফ্রিজ হয়ে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা জুমু সচল হলো। ভাবছে তার ইচ্ছা মতোই সব হচ্ছে। সকাল থেকেই সে ভাবছিল ফোন করে তাপসকে বলবে-এই আজ থাক, আজ এসো না। একটু কাজ  পড়ে গেছে। আমাকেও জয়েন করতে হবে মার সঙ্গে। চেষ্টা করেও তা বলতে সে পারেনি। উল্টো একের পর এক উদ্ভট বুদ্ধি মৌমাছির মতো এসে বসতে লাগল তার মাথায়। সে তেমন কিছুই রাঁধতে পারে না। শুধু ডাল ভুনা আর ডিম মামলেট পারে ভালো। তাই সে করেছে নিজের হাতে, তাপসকে খাওয়াবে নিজে ও সঙ্গে বসে খাবে দুপুরের খাওয়া। বুয়াকে বলে সব টেবিলে সাজিয়ে রেখে গিয়ে ঘুমাতে বলছে। পৃথিবীর বেশির ভাগ মেয়ে কি সত্যিকার কোনো পুরুষের প্রেমে পড়লে এরকম মগজের অবস্থাকে গুবলেট করে ফেলে।

জুমু অতসব জানে না। জানতেও চায় না। আজইতো ক্যাম্পাসে তার বন্ধুরা ক’জন তাকে তাপস আর প্রীতি সম্পর্কে কী যা-তা বলছিল। এসব যে ফালতু কথা সে জানে তবে এটাও জানে প্রীতি মেয়েটি তাপসের খুব কাছে আসতে চায়। তবে তাপস তাকে ছাড়া কাউকে পাত্তা দিলেতো আসবে কাছে।

জুমু দরজার কপাটে দু’হাত রেখে এত সব কথা ভাবছিল। তাপসের প্রশ্নে নড়ে চড়ে বলে উঠল-কী যে বলো, অপেক্ষায় বসে আছি পথ চেয়ে। এসো, এসো।

- পাগল মেয়েটি কী যে বলে।

মনে মনে তাপস ভাবে উফ্, এরকম চরমভাবে তার মধ্যে ডুবে যাওয়া মেয়েদের ভয় লাগে তার। মনে হয় টাইম শেষ, পালাও তাপস অন্য ডালে।

তাপস সোজা সোফায় গিয়ে বসল। জুমু নিজেই এক গ্লাস ঠান্ডা পানি এনে দিল তার হাতে।

হলুদ টাইট টি শার্ট আর পায়জামা পরে আছে জুমু। এ রকম পোশাকই সে বাসায় পরে ঘুমায়-জাগে, থাকে। তাপসের জন্যে জুমুর এ রূপ নতুন। ক্যাম্পাসে যায় সে সেলওয়ার কামিজ পরে। ব্রাতে আটকে যেন খুব কষ্ট হচ্ছে জুমুর বুক যেন চ্যালেঞ্জ করছে নিজের তীব্র আবির্ভাবের। পা থেকে মাথা পর্যন্ত যতই দেখছে তাপস জুমুকে পুলকিত হচ্ছে।

- জানো, আমি আজ তোমার জন্যে ডাল ভুনা করেছি।

- কী? কেন? পৃথিবীতে এত কিছু থাকতে ডাল ভুনা কেন?

- আমি যে ডাল ভুনা ছাড়া আর কিছু পারি না।

-  ও, তাই বল। খাওয়ার কিন্তু কথা ছিল না।

- খাওয়ার সময় এটি। এ রকম সময় আর কথা-টথা কী?

তাপসকে অলরেডি জানানো হয়ে গেছে তার আর প্রীতি সম্পর্কে সব কিছু জানানো হয়ে গেছে জুমুকে। কই তার কোনো রিএকশনতো সে দেখতে পাচ্ছে না। তাহলে কী বলেনি, নাকি সব শুনেও পাত্তা দেয়নি জুমু। এমন এক সরল প্রাণ মেয়েকে ঠকাতে তার ইচ্ছে করে না। কতবার ভেবেছে ঠান্ডা মাথায় আর কোনো মেয়ের আর বারোটা বাজাবে না। কই যে কুত্তার লেজ সেই। সোজা হওয়ার নাম নেই।

বুয়া টেবিলে সাজিয়ে গেছে সব। জুমু প্লেটে সব তুলে বাড়িয়ে দিল তাপসের দিকে, নিজেও নিল।

তাপস বুঝতে পারেনি তার এতো খিদে লেগেছে। খাইতে বসে টের পেল। সত্যি ডাল ভুনা চমত্কার। জুমু যেন নিজেই মিশে গেছে ডালের সঙ্গে গলে গিয়ে এতোই আন্তরিক। খেয়ে-দেয়ে তারা এসে বসল জুমুর নিজস্ব রুমে। অনেক ধরনের পোস্টার দেয়ালে লাগানো। চে গুয়েভারা এদিকে ঝুলে পড়তে পড়তে অসহায় ভাবে ঝুলে আছেন। পাশেই মেডোনা হাসছে তা দেখে। চের এই অসহায়ত্বে রাগ হচ্ছে তবে কী করার আছে মামা! আপনি এখন দেয়ালে টুপিতে টি শার্টে এমন কী মোজার প্যান্টিতে এখন বন্দি। সরি চে মামা, করার কিচ্ছু নেই। জামানাই এমন। চোখ ঘুরে এসে থামল জুমুর পোস্টার সাইজ ছবিগুলোর উপর। কী সুন্দর নিষ্পাপ হাসছে বালিকা। পৃথিবীর কোনো ঝামেলা থেকে যেন সে অবগত নয়।

এক সময় ফ্লোরে পাতা মোটা জাজিম বিছানো বিছানায় বসল দু’জন।

-গান শুনবে?

- না। তোমার কথা শুনি।

তাপস জুমুর হাত ধরল। তালুতে নিজের আঙুল দিয়ে ঘসতে লাগল।

- তুমি কী হাত দেখতে পারো?

- হ্যাঁ।

-প্লিজ দেখো না আমার হাত।

তাপস জুমুর হাত নিজের হাতে নিয়ে আরো কাছে চলে এলো। হাল্কা। কী সৌরভ মেখেছে জুমু কে জানে, খুবই মাদকতায় ভরপুর। বিছানায় দুই হাঁটু মুড়ে এমনভাবে বসেছে জুমু যে তার টি শার্ট বুকের তীব্রতার সামলাতে হিমশিম। বুকের হাল্কা ছোঁয়া লাগল তাপসের শোল্ডারে।

- উফ্ চুপ করে আছ কেন? বল না? আমার খুব জানতে ইচ্ছে করছে আমার ভবিষ্যত্।

তাপস হাত ধরে আর একটু টানল। জুমু আরো কাছে চলে এলো। এবার বুকটা ভালোভাবে স্পর্শ করছে তার কাঁধ। রাগ করে হাত টেনে ছাড়িয়ে নিতে চাইল, ধ্যাত্! দরকার নেই তোমার কিছু বলার।

- কী বলব? হাত দেখে ভবিষ্যত্! তা তো আমি পারি না। তুমি জুমু সুন্দর হাত দেখিয়ে বল্লে দেখবে আমার হাত! তাই এতক্ষণ খুটে খুটে দেখলাম।

জুমু রাগ দেখিয়ে বালিশ হাতে নিয়ে তাপসকে মারতে তুলল। মারতে গিয়ে ভারসাম্য হারিয়ে দু’জনই বিছানায় কাত হয়ে পড়ল। জুমু পাশ ফিরে চিত্ হতে তাপস বালিশ সরিয়ে নিজের মাথা রাখল জুমুর বুকে। চুপচাপ তেমনি পড়ে থেকে যে স্তব্ধ করে দিল জুমুর চলমান পৃথিবী। ধীরে ধীরে নিজের শরীর তুলে আরো ওপরে মাথা তুলে আনল তাপস। নাকের কাছে নাক আসতে চোখের ওপর চোখ পড়ল। জুমুর উদ্ধত বুকের আর কোনো অস্তিত্ব নেই মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে তাপসের বুকের সঙ্গে।

তাপস নিজের নাকের ডগা দিয়ে নাক ঘষতে লাগল জুমুর।

মানসিকভাবে জুমু চুমুর জন্যে তৈরি ছিল হয়ত। চুমু, দীর্ঘ চুমুতো উত্তাল সাগরের সে াতের চাবিকাঠি। চুমুর ফাঁকে ফাঁকে দু’একবার নরম ভাবে জুমু বলেছিল—উফ্ ছাড়ো! ছাড়ো তো। তা যেন আরো শক্ত ভাবে পরস্পরের মধ্যে ঢোকার ইঙ্গিতের মতোই লাগল। এর পর চুমু দীর্ঘতার আর হিসাব রাখেনি দু’জন। একবার শুধু তাপস হাত দিয়ে বের করে আনল বুক পকেটে হূদয়ের ওপর রাখা চারকোণ মোড়কে আবদ্ধ রাবার খণ্ডটি। সময় বিদ্যুতের মতো চমকে উঠে এগুচ্ছে দ্রুত। পরস্পরকে ছাড়তে ইচ্ছে করছে না। তবে মাথা ঠিক রাখতে হবে। সন্ধ্যার আঁধার নামছে। এরপরই জুমুর বাড়ির সবার একে একে ঘরে ফেরার কথা। ভেতর থেকে ওয়ার্নিং এলো বেরিয়ে পড় তাপস। দেরি হলে আটকে পড়বে। তাপস উঠে এলো। জুমু তখনো পড়ে নিজের বিছানায়। বেসিনে পানি থাকতে তবু ফ্রিজ থেকে ঠান্ডা পানির বোতল বের করে নিয়ে মুখ ঘাড় হাত ধুলো তাপস। যাওয়ার আগে আরো একটু সময় ধরে রাখতে চায় জুমু। এক সময় হু-হু করে কেঁদে ফেল্লো জুমু। এ রকম ঘটনা তার জীবনে ঘটেনি আগে। মাথায় হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দিতে গেলে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল জুমু।

এর পরও সময় গড়িয়েছে। সপ্তা দুই-এক বড়ই কঠিন সময় পার করেছে জুমু। তাপস তারপর থেকে তাকে এড়িয়ে গেছে বার বার।

প্রীতি তাকে দেখে মুচকি হাসি দিয়ে দূর দিয়ে হেঁটে গেছে। রাতের পর রাত শুধু কান্নার ঢেউ অনবরত এসে ঝাঁপিয়ে গেছে তার ভেতরে। প্রায় মনে হতো বেঁচে থাকার কী মানে আছে। ধীরে ধীরে জন্ম নিল নিজের ভেতরেই আরেক প্রতিচ্ছবি। সামনে এসে দাঁড়াল, আয়নার সামনে এসে দাঁড়াল নিজের মতো। চিত্কার করে ধমকে উঠল তাকে—এই মেয়ে কার জন্যে কাঁদো? কোনো পুরুষের জন্যে কাঁদা নারীর মহাপাপ! কাঁদো কেন? এ তো প্রথম পাঠ পুরুষালী পৃথিবীর কাছে সরল-সহজ পুরুষ। বিশ্বাসী নারীর কী হয়েছে এমন? মানুষ তুমিও আনন্দ করেছো দু’জন, ব্যাস! কেঁদো না। যত্ন করে যে মায়ার জগত্ নিজের মনে বানিয়েছিলে পুরুষের জন্যে তা লাথি দিয়ে ভাঙতে থাকো অনবরত। আহারে কপাল জুমুর এরপর কেউ সত্যিকার প্রেমিক পুরুষ যদি আবার জুমুর জীবনে এসে নত হয়, মায়াবী চাদর বিছাতে চায় স্বপ্নের! জুমুতো চিনবে না তাকে।

প্রীতির হাসিও টেকেনি বেশি দিন। তাপস প্রজাপতির মতো উড়ে গেছে অন্যত্র।

একদিন তাপস দাঁড়িয়ে ছিল, খবর নিতে চেষ্টা করছে জুমু অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ট্রান্সফার নিয়ে চলে গেল কিনা। প্রায় নয়দিন আসছে না। ষোলশহর থেকে ছাত্রছাত্রী নিয়ে ট্রেন এসে থেমেছে বিশ্ববিদ্যালয় স্টেশনে। পিঁপড়ার মতো ছাত্রছাত্রী নেমে হেঁটে আসছে।

আচমকা জমীল হোসেন তাপসের গায়ে এসে লাগল আধ খাওয়া একটি আমড়া। চমকে তাকাল সে। আমড়াটি এসেছে ট্রেনের ছাদ থেকে। ট্রেনের ছাদে ওঠা কড়া ভাবে মানা। তবু কিছু সাহসী ছাত্র উঠে পড়ে। তবে কোনো মেয়েকে আজ পর্যন্ত ছাদে চড়তে দেখেনি তাপস। এ কোন কুলের কেমন মেয়েরে বাপ ছাদে দাঁড়িয়ে এসেছে আবার আমড়া খেয়ে ছুড়ে ফেলছে দূরে। কে এ মেয়ে বেশ টমবয় মার্কা? কালো রং তার ক্যামারণ সাহেবের এভাটর (অবতার) সিনেমার নায়িকার মতো রোদে উজ্জ্বল ভাবে ঝকঝক করছে। হাল্কা আকাশি রঙের কামিজ আর টাইট জিন্স প্যান্ট পরা ব্যাকে মেঘে ভরা নীল আকাশ। মাঝে মধ্যে আকাশের সঙ্গে মিলেমিশে হারিয়ে যাচ্ছে মেয়েটি। স্লিম ফিগার বেশ লম্বা অপূর্ব বুকের গড়ন। হেজাব দেয়া মাথা ঘোমটা দেয়া আর সব সাধারণ ছাত্রীর চেয়ে একেবারেই ভিন্ন। দেখেই মনে হয় নিজের মুডে চলে। নিচে নেমে যার সঙ্গে কথা বলছে আলতাফ হোসেন মন্টি, মন্টি তার জুনিয়র ক্লাসে পড়ে। মেয়েটি ভিড়ে মিশে ফ্যাকাল্টির দিকে যেতেই মন্টিকে তাপস ডাকাল।

- জী ভাইয়া।

- তোমার সঙ্গে কথা বল্লো ছাদে দাঁড়িয়ে আসা মেয়েটির নাম কীরে?

- সিনথিয়া নাসরীন ভাইয়া। আমার ক্লাসের।

- ওর কী ভয়-ডর নেই? এতো সাহস পায় কোত্থেকে?

- জানিনা ভাইয়া! ওরকমই সে।

আর কথা বাড়ায়নি তাপস। আধ খাওয়া আমড়াটিকে এক লাথিতে দূরে পাঠিয়ে হেঁটে গেল সে ফ্যাকাল্টির দিকে।

বাসায় ফিরে সে ট্রেড মেশিনে হাঁটে তার পর ফৌজদার হাট জাহাজ ভাঙ্গা বাজার থেকে কেনা বিশাল আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজকে দেখে। পা থেকে মাথা পর্যন্ত নিজকে দেখে নিজেই মুগ্ধ। তার স্টাইলই আলাদা। তিনদিন পর একদিন দাড়ি সেভ করে। নিজের মাঝে ভাব ফোটাতে সর্বদা টাইট ডেনিম জিন্স প্যান্টের সঙ্গে হলুদ বা মেরুন, সাদা টি শার্ট বা হাফ হাতা শার্ট পরে বুকে বেশ ক’টা বোতাম খোলা রাখে। তার ধারণা তার জন্যে পাগল হবে না এমন মেয়ে এখনো জন্মেনি।

ফাইন আর্টসে ফারহানা নামে এক ড্যাম স্মার্ট মেয়ে নাকি ঢাকা থেকে এখানে এসেছে। ঢাকায় তার কাজিনের বন্ধু। কাজিন ঠাট্টা করে বলেছে-ওকে তোর মতো প্লেবয় থেকে বাঁচাতে আমাকেই না আসতে হয় তোদের ওখানে।

আজ তার সঙ্গে পরিচিত হতে যাচ্ছে তাপস, তাই মাঞ্জা মারা হচ্ছে একটু বেশি। বিশাল আয়নায় নিজকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে গিয়ে চমকে উঠল তাপস। এদিকে তার আয়নায় সেই মেঘ বালিকা কেন? সে স্পষ্ট দেখতে পেল কৃষ্ণকলির মত মায়াবী মুখ, হাসলে ঝকঝকে দাঁত ঝিলিক দিয়ে ওঠে।

ধ্যাত্, একি দেখল! কেন দেখল। বুঝে উঠতে পারছে না। কী নাম বলে ছিল মন্টি! সিনথিয়া নাজনীন। এই প্রথম এমন হলো। ফাইন আর্টস ডিপার্টমেন্টে যেতে তার ইচ্ছে করছে না। নিজেই হাসল আজ তাহলে সিনথিয়া ম্যাডামের সামনে গিয়ে দাঁড়ায় ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের হার্টথ্রুব হিরো। সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে নাম জিজ্ঞেস করলে কী ঘাবড়ে যাবে মেয়েটি। এমনিতে জুনিয়র তারপর ক্যাম্পাস সুন্দরী হিসেবে কোনো খ্যাতি নেই এমন কারো সামনে তাপস জীবনে ঘুরেও তাকায়নি। সামনে গিয়ে দাঁড়ালেতো মেয়ের ভাগ্য।

পর দিন সকালের যে ক’টা ট্রেন এসেছে সে খুঁজেছে তাকে। ভেবেছিল স্টেশনেই পাবে। পেলে সামনে গিয়ে দাঁড়াবে। পর পর দুই দিন, এসে খুঁজলো, পেল না। তাহলে কী আসছে না। শালার মেয়েদের এই এক ঝামেলা। নিয়মিত আসে না।

তাপস হাল ছেড়ে সেই মন্টিকে খুঁজতে লাগল। তাকেও পাচ্ছে না। নিজের ওপর রাগ হলো, কেন সে খুঁজছে সাধারণ এই মেয়েটিকে। তার চেয়ে ফারহানার সঙ্গে সে এগিয়ে যেত অনেকটা। প্রায় ফেরত যেতে পা বাড়াতে ফিরতির শেষ ট্রেন এসে থামল। আবার ষোলশহরের দিকে যেতে চলতে শুরু করতে দৌড়ে এসে সিনথিয়া নাজনীন হাতল ধরে ঝুলে উঠে পড়ল। তাপস দেখে জোরে দৌড়ে ট্রেনে উঠতে পারত।

ষোলশহর স্টেশনে নেমে রাগে একটা খালি কোকের ক্যানকে কী হয়েছে তার কোনো মেয়ের সামনে দাঁড়াতে সে এমন অস্থির হয়নি।

পরের দিন মন্টির রুমে গেল তাপস। জিজ্ঞেস করল কই হাওয়া হয়ে গেল মেয়েটা।

- ক্যানো ভাইয়া। খুঁজছেন ক্যানো?

মন্টির পাছায় ঘুরিয়ে একটা লাথি দিতে ইচ্ছে করছে তার। কেন যে এত কথা জানতে চায়। নিজকে সংযত করল।

- না মন্টি তেমন কিছু না। সামনের হপ্তায় একটা ফাংশান আছে। ব্যাক স্টেজে ফুলপাতা কিছু কাগজ কেটে দিলে আর হেডিংটা কাগজ কেটে লাগিয়ে দিতে আর হেডিংয়ে কাগজ কেটে বানিয়ে লাগিয়ে দেখালে খুব ভালো হতো। এই আর কী!

মন্টির মনে পড়ল। সিনথিয়া বেশ ভালো ছবি আঁকত।

- বুঝলে মন্টি দেখা হলে বলো সহসা যেন দেখা করে। আমি কে তাও বলো।

প্রায় তিনদিন পার হয়ে গেল দেখাতো করলোই না এমন কী ফোনও করেনি। মন্টি নিশ্চয় তার নম্বর দিয়েছে তাকে। তাপসের অবাক লাগল এতো স্পর্ধা কীভাবে দেখাচ্ছে একটি নতুন মেয়ে! কেনইবা দেখাচ্ছে।

সেই দিন সন্ধ্যার পর হরিদার কাছে গেল তাপস। নিজের ব্যাপারে হরিদাকে আর কিছু বলেনি। তবে সে জানে হরিদা জেনে গেছেন জুমুর সঙ্গে তার কাণ্ড, প্রীতি থেকেও দূরে সরে যাওয়া সবই তিনি খবর পেয়ে গেছেন। তবু তাকে দেখে বল্লেন-এই যে বত্স্য এসেছো। বল্লে নাতো দুই নারীর খবর।

- কী যে বলেন দাদা! আপনিতো সবই জানেন।

- তা জানি ঠিকই তবে সে পালাতো শেষ তবে এমন অন্যমনস্ক কেন?

- না তেমন কিছু না। তেমন কিছু হলে তো আপনাকেই আগে জানাতাম।

- আমাকে মিথ্যা বলো না বত্স্য। টের পাচ্ছি ঢেউ লাগছে তোমার মনে। জোয়ার আসছে কিনা কে জানে!

- আরে না হরিদা এমন কিছু না। স্পর্ধা দেখে মাথা কেমন করছে একটুকু-আধটুকু। সাধারণ এক লতা-পাতা মেয়ের সঙ্গে দেখা করতে চাইছি যত, ততই সে দূরে সরে যাচ্ছে। হাতিঘোড়া গেল তল পিঁপড়া বলে কত জল! এই আর কী।

-তোমার তো বত্স্য ভাবযোগ হচ্ছে মনে হচ্ছে?

- ধ্যাত্ দাদা। যোগ-বিয়োগ কিছু না।

-বেগ যোগের কীভাবে কখন কেমনে হবে তা বোঝার মতো মন তোমার হয়নি।

- আমাকে আমি বুঝব না, তো অন্যকে বুঝব কীভাবে।

-অন্যকে বুঝতে যেয়ো না। সেতো অনেক পরের ব্যাপার। এই মনুষ্য জনমে মানুষ যদি শুধু নিজকে বুঝতে পারত সঠিকভাবে তাতেই বিশ্বালয়ে হাসি-গানের মেলা বসে যেত বত্স্য।

- আসলাম হরিদা আপনার সঙ্গে একটু শেয়ার করতে! আর আপনি শুরু করে দিলেন জ্ঞান বর্ষণ।

- আরে নারে বাবা! জ্ঞান এতই সস্তা নিজিস মনে কর না যে দু-হাতে মানুষ যাকে তাকে বিলোতে পারে। অনেক সাধনায় অর্জন করতে হয় জ্ঞান।

- ক্ষমা দান করেন গুরু তাহলে এবার যাই।

- যাও! তবে মনে রেখ আমরা প্রায় সাধারণকে মনে করি অসাধারণ। অসাধারণকে মনে করি সাধারণ, হেলায় ফেলায় দূরে সরাতে চাই। তাপস বেরিয়ে এলো হরিদাশ সিংহ ডেরা থেকে। তিনিও বল্লেন কী না তার ভাবাবেগ পেয়েছে। নারী সব করছে রব তার চারপাশে আর তার হবে ঐ লতা-পাতা মেয়ের জন্যে ভাবাবেগ। না! হরিদার মাথা খারাপ হচ্ছে ধীরে ধীরে। আগামীকালই করছি ব্যাপারটা এসপার-উসপার! দেখি কই যায় এই লতা-পাতা। সকালে ট্রেনের বগিতে বগিতে খুঁজবে। না পেলে ক্যাম্পাস এফোঁড়-ওফোঁড় করে বের করবে সে। সামনে পেলে বলবে— এই লতা-পাতা তুই কী রে! এই সামনে দাঁড়িয়ে বল্লাম গুডবাই।

পরের দিন সকালে বিশ্ববিদ্যালয় স্টেশনে এসে থামতে শুরু করল তাপস বগি টু বগি মেয়েটিকে খোঁজা। না পেয়ে মেজাজ যখন তিরিক্ষি তখনি দেখল শেষ বগির জানালায় সিনথিয়ার মুখ। উজ্জ্বল দাঁতে কামড় দিচ্ছে সবুজ একটি আপেল।

তাপস চমকে উঠল হঠাত্ মেয়েটিকে দেখে, এই দেখা যায় এই উধাও! জিন-টিন নাতো আবার। ট্রেনের এ মাথা ও মাথায় খুঁজে পায়নি সে একটু আগে আর এখন মেয়েটি চোখের সামনে সবুজ আপেল কামড়াচ্ছে। আজ মেয়ে তোমার রক্ষা নেই। আমার সামনা-সামনি তোমার হতেই হবে। পাখির মতো সে উড়ে যেন চলে এলো সে একই বগিতে। যাতে মেয়েটি চোখের সামনে থেকে উধাও আর না হতে পারে।

উফ, অবাক কাণ্ড! গেল কই মেয়েটি, সিটে কামড় দেয়া অর্ধেক আপেলটি শুধু পড়ে আছে।

মন্টি ডাক শুনে তাপস দেখল মেয়েটি একশত ধাপের সিঁড়ি পেরিয়ে কখন উপরে উঠে গেছে। ট্রেন থেকে নামলোই বা কখন, দাঁত অতীব সুন্দর বলে কী সারাক্ষণ আপেল আমড়া কামড় দিতে হবে!

তাপসের হঠাত্ হরিদার কথা মনে পড়ল। আসলেই কী তার ভাবাবেগ পেয়ে বসেছে। ধ্যাত্ তা কী করে হয়। এতো সুন্দরী আসল গেল আরো দুইদিন পর তাপস তার কয়েক জন বন্ধু-বান্ধবীসহ সামনে পেল সিনথিয়া নাজনীনকে। তার বন্ধুদের মধ্যে মন্টিও রয়েছে। যথারীতি সিনথিয়ার হাতে কাঁচা আম। ওর বন্ধুরা সব তাপসকে সামনে দেখে কথা থামিয়ে দিল। হাজারহোক সিনিয়র ভাই। তাপস সাহস পেল, ঠিকই আছে, সে সামনে আসলে এমনি সব কিছু থেমে যায়। সে খুবই ক্যাজুয়াল ভাবে শুরু করতে যাচ্ছিল

- এই মেয়ে, নাম কী তোমার?

তবে কথাগুলো  বলার সুযোগই পেল না সে। তার আগেই সিনথিয়া হাল্কাভাবে হেসে জিজ্ঞেস করল-

- আপনি বেশ কয়েকদিন ধরে নাকি আমাকে খুঁজছেন তাপস ভাই? কেন?

তাপস কেন যেন চুপসে গেল। কোনোভাবে বল্লো- কে বল্লো আমি খুঁজছি তোমাকে?

- কেন, আপনি মন্টিকে বার কয়েক বলেছেন।

নিজকে সামলাতে গেল তাপস যাতে কিছু একটা বলে যত তাড়াতাড়ি দূরে সরে যেতে পারে।

- ও, হ্যাঁ মনে পড়েছে এই আগামী ফাংশনে ব্যাকডপে কাগজকাটার কিছু কাজ করে দিতে পারবে কিনা! তাই জানতে? কি ফাংশন, কী লেখা থাকবে, ডিজাইটা বা কী রকম হবে?

- হ্যাঁ, সব বুঝিয়ে দেব। আগে জানিতো কাজটি করতে পারবে কী না!

- অবশ্যই পারব, আপনারা সিনিয়র ভাইরা বলবেন আর পারব না তা কী করে হয়।

মেয়েটির এই সাবলীল কথার ধরনে সে ভেঙে পড়তে যাচ্ছে আর কত গাঁধাবী হওয়ার আগেই পাট্টি মারতে হবে।

- সব বুঝিয়ে দেব পরে দেখা করে। তাপস লম্বা পা ফেলে অন্য দিকে এগিয়ে যেতে চাইলে সিনথিয়া তাকে প্রশ্ন করল।

-আমি এসব কাজ করতে পারি ভাইয়া আপনি জানতে পারলেন কীভাবে?

- ঐ মন্টি বল্লো আর কী। আচ্ছা আজ আমি যাই। জীবনে এই প্রথম এই পুঁচকে মেয়েটির সামনে সে নার্ভাস হয়ে পড়ল! এতো অবাক কাণ্ড।

এভাবেই সিনথিয়া আর তাপসের দেখা আর কথা সম্পন্ন হয়েছিল। তাপসের কেন যেন মনে হতে লাগল এ সাধারণ মেয়ে নয়। এরপর বার বার দেখা হয়েছে। একবার ডিপার্টমেন্ট পিকনিকে গেছেও তারা এক সঙ্গে। তাপস সিনিয়র হয়েও ওদের সবাইকে চা অফার করেছে। তাদের আড্ডায় যোগ দিয়েছে। তাপস চেয়েছে নানা ভাবে নিজকে সিনথিয়ার সামনে মেলে ধরতে। মেয়েটির সে দিকে মোটেই ভ্রূক্ষেপ নেই। অবাক হচ্ছে দিন দিন। তার মতো ক্যাম্পাস কাঁপানো হার্টথ্রুব ছেলের ব্যাপারে কোনো আগ্রহ কেন নেই মেয়ের। ভীষণ ধাক্কা লেগেছে ভেতরে তার। অহংয়ে ফাটল ধরছে যেন। রেগেও লাভ নেই। কী যে করবে তাও বুঝে উঠতে পারছে না। সে যে স্পেশাল একজন মানুষ কোনোভাবে মেয়েটিকে বুঝিয়ে উঠতে পারছে না তাপস। সে জানে হরিদার কাছে গেলে বলবেন- তুমি ভাব যোগে পড়েছ বত্স্য। সাফ জাহির করছ তোমার অন্তর। মনকে তাপস বোঝাতে চেষ্টা করে। কত সুন্দরী তার প্রেমিকা হতে কাছে আসতে কত চেষ্টা করেও পারল না। এই পুঁচকির এমন কী আছে না সুন্দর! না ফর্সা।

সে এক সময় নিজের উপরই ক্ষেপে ওঠে। বুঝতে পারে সে একটা পাগলের মতো বুদ্ধুর মতো ভাবছে। সুন্দর মানুষের রঙ আর মুখাবয়ব দিয়ে বিচার হয় না। তাকে জানতে হবে সিনথিয়া নাজনীন মেয়েটি এতটা অন্তর শক্তি কোথায় পায়। একটি বইয়ের মতো পড়তে চাইল মেয়েটির জীবন। কে তার বাবা মা, কোথায় থাকে কী তার অতীত, কেমন সে ছাত্রী সবই। এক অদ্ভুত জীবন পার করছে সিনথিয়া নাজনীন জেনেও সে দিনের পর দিন তার প্রতি আকর্ষিত হয়ে পায়ে পায়ে এগুতে লাগল। হরিদা ঠিকই বলে দিলেন কখন কার ভাবাবেগ যোগ হবে কেউ জানে না। এমন কী সেই ব্যক্তি নিজেও জানবে না। তাপসের জীবনে এই প্রথম অনুভূতি কারো প্রতি তার টান তৈরি হওয়া। কাচের দেয়ালের মতো ভেঙে পড়ছে তার ইগো। তার ইচ্ছে করছে নতজানু হই কারো কাছে। নিজের যত পাপ প্রায়শ্চিত্ত করি। কেমন যেন বিপর্যস্ত হয়ে উঠছে সে। যখন সে জানতে পারল তার প্রতি বিন্দু প্রীতি আকর্ষণ না থাকার কারণ সিনথিয়ার কৈশোর বয়সে তার জীবনে ঢোকা জয়ন্ত বণিক। এই বণিক তার চারদিকে এক বলয় তৈরি করে রেখেছে। সিনথিয়ার শয়নে জাগরণে জয়ন্ত প্রভাবিত করে ছেয়ে আছে আকাশজুড়ে। এলোমেলো হয়ে গেছে তাপস। হরিদার কাছে গিয়ে উপুড় হয়ে পড়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।

হরিদাশ সিংহ জমীল হোসেন তাপসের চুলে নিজের আঙুল ডুবিয়ে বিলি কেটে সান্ত্বনা দিলেন।

- ধৈর্য ধরো বত্স্য। এটাই এখন খুবই তোমার প্রয়োজন।

 


জয়ন্ত বণিক, নামটি বেশ স্মার্টই বলা যেতে পারে। জয়ন্ত আর বণিকের মাঝে একটা চন্দ্র ছিল তা বাদ দিয়েছে। দেখতে কিন্তু সে নামের মতো নয় শান্তশিষ্ট গোলগাল মুখ, একটু ওজনদার শরীর, হাল্কা ভুঁড়ি লুকোনোর উপায় নেই। ভেতরে বাইরে একেবারে দুই রকম মানুষ। অভাবের চেয়ে স্বভাবের জন্যে টিউশানি করত। নাইন, টেন কিংবা ও লেভেল, এলেভেলের শুধু ছাত্রীদের বাসায় গিয়ে পড়াত। চট্টগ্রাম শহরে এছাড়া এরকম বয়সের মেয়েদের কাছে থাকার উপাত্ততো আর কিছু নেই। ইতিমধ্যে তার সুনাম হয়েছে অঙ্ক আর ইংরেজি পড়ানোর। সে পড়ালে রেজাল্ট ভালো করে তাই বাবা-মা-রা তার জন্যে লাইন দেন। একবার ভুলেও কেউ ভাবে না জয়ন্ত বণিকের কোনো ছাত্র নেই, সবই ছাত্রী। চট্টগ্রামের সম্ভ্রান্ত পরিবারের ব্যবসায়ী বাবার মেয়ে সিনথিয়া নাজনীনও তার ছাত্রী। অঙ্কতে দুর্বল ছিল সিনথিয়া। তার বাবা মা চাইতেন মেয়ে ভবিষ্যতে আর্কিটেক্ট হোক। তাহলে অঙ্কেতে ভালো হতেই হবে।

বাবাই নিজের বন্ধুর কাছে খবর পেয়ে জয়ন্ত বণিকের সঙ্গে যোগাযোগ করে বলে কয়ে রাজী করিয়েছে বাসায় এসে অঙ্কতে ভালো করে তুলতে মেয়েকে। এমনিতে সিনথিয়া মেধাবী মেয়ে, ভালো ছাত্রী। বাবা চান টাকা যাক তাতে কি, তিনি ব্যবসায়ী মানুষ টাকার পাহাড়ে না হলেও টিলায় বিরাজ করেন। তার মেয়ে কোচিং করতে অন্যত্র যাবে তা মানায় না। ভালো গৃহশিক্ষক পেয়েছেন তাতেই খুশি।

সিনথিয়া জয়ন্ত বণিকের পাঁচজন ছাত্রীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি নম্বর পেয়েছে গতবার পরীক্ষায়। বাবা-মা দু’জনই বেজায় খুশি প্রায় জোর করে টাকার অঙ্কও বাড়িয়ে দিয়েছেন তারা। লোকটার ওপর বিশ্বাসও জন্মেছে। সুবিধামতো যে কোনো সময় এসে পড়ানোর অনুমতিও দিয়েছেন।

এসএসসি পরীক্ষায় পাস মানেই মেয়েদের এক পরিবর্তনের জগতে প্রবেশ। নতুন মনে হয় সব কিছু। আশেপাশে সব কিছুর সঙ্গে নিজের শরীরও পাল্টাতে থাকে। জোয়ার আসে দেহে পরিবর্তনের। এরকম সময় গৃহশিক্ষকই তার কাছের মানুষ। যদিও শিক্ষক সমীহ করার মতো সম্পর্ক, তবে পুরুষ তো পুরুষই। সিনথিয়ার বাবা মারা জয়ন্তকে নিয়ে স্বপ্নেও তেমন কিছু ভাবেননি। বয়সেও প্রায় বারো বছর তো বড় হবেই, তারপর তেমন চটকদার স্মার্ট পুরুষও নয়, একটা মোটাসোটা থলথলে চাইপের মানুষ। সিনথিয়াই বড় তারপর বেশ গ্যাপ দিয়ে দুই ভাই। তারা থ্রি ফোরে পড়ে।

জয়ন্ত অন্যদের পড়াত সকাল, দুপুর, রাতে। সিনথিয়ার জন্যে সময় ছিল বিকাল সন্ধ্যা। সে সময় তাদের বাড়িতে লোকই থাকে না। বুয়া আর মাঝে মধ্যে মা থাকতেন শুধু। বাপতো সে সময় বাড়িতে থাকার প্রশ্নই ওঠে না। মা ও বন্ধুদের বাসা তা না হলে মেয়েদের সোশ্যাল ওয়ার্কিং প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত থাকার কারণে মিটিং-টিটিং-এ বেরিয়ে যেতেন। ছোট ভাইরা পাশের মাঠে খেলতে চলে যেত। সিনথিয়া আর জয়ন্তের পড়ানোর সময় বলার কেউ নেই। লোহার গ্রিলের মেইন গেইট পার হয়ে সরাসরি এক তলা ও দোতলায় যাওয়ার সিঁড়ি। ডানপাশ দিয়ে স্টিলের পাত দিয়ে তৈরি আর একটি সিঁড়ি গেছে সব কিছু থেকে বিচ্ছিন্ন পড়ার রুমে, চেয়ার টেবিল বইয়ের র্যাক ছাড়া একটা খাটও পাতা আছে। গ্রাম থেকে কখনো লোকজন বেশি এলে তারা রাতে ঘুমায়। পড়ার রুমে সিনথিয়া আগে থেকে বইপত্র নিয়ে তৈরি থাকে। জয়ন্ত মেইন গেইট পেরিয়ে সোজা সিঁড়ি দিয়ে উপরে চলে আসে। এসএসসির পড়ার চাপ বাড়ায় সময়ও দিতে হয় বেশি। জয়ন্ত তাই একজন ছাত্রী পড়ানো বাদ দিয়েছে। বাকি তিনজন সর্বদাই অভিযোগ করে জয়ন্ত বেশি সময় দেয় সিনথিয়াকে। অন্যরা আদর যত্ন করে জয়ন্তর সময় আর মনোযোগ বেশি পেতে চায়। এসব নিয়ে সিনথিয়ার কোনো মাথাব্যথা নেই। সে মেয়ে হয়েও টমবয় টাইপের। মেয়েলিপনার খুনসুটি তার পছন্দই হয় না। মাঝে মধ্যে জয়ন্ত বলে সিনথিয়াকে অন্যরা তাকে কত যত্ন করে। তুমিতো স্যারের জন্যে কিছুই কর না। নিজের হাতে কেক বানিয়ে স্যারকে খাওয়াতে অপেক্ষা পর্যন্ত করে।

সিনথিয়া শুনে জেলাস হবে দূরে থাক, ওসব বোঝেও না ঠিকমতো। কোনো কিছু বানানো-টানানোতে শখতো নেই আছে সাইকেল চালাতে, স্কুলের দৌড় প্রতিযোগিতায়। স্কুল থেকে পাহাড় জঙ্গলে ক্যাম্পিং হলে সবার আগে নাম লেখায় সিনথিয়া। তার স্লিম শরীরের আবেদনই অন্য রকম। ঘাড় পর্যন্ত ববকাট ঝাঁকড়া চুল। মেদহীন চিকন শরীরে সুগঠিত ভরাট বুক। বেশির ভাগই ওড়না দেয়ার চল থাকলেও সিনথিয়ার অভ্যাস হয়নি। জয়ন্তের সামনে পড়াশোনার সময় ওড়নার বালাই রাখত না। এক খণ্ড কাপড় বুকে পেঁচিয়ে রাখা তার কাছে অস্বস্তিকর লাগত। বিশেষ করে মায়ের ধমকে মাঝে মধ্যে বাধ্য হয়ে রাখতে হতো। কখন যে তার ছোট্ট স্তন দু’টো একটা সলিড আকার ধারণ করেছে সে খেয়ালই করেনি। সুতির সেমিজ যদিও থাকত ভেতরে তার ওপর টাইট কামিজ বা টি শার্ট নিচে টাইটস বা ঢোলা পায়জামা তার ঘোরোয়া প্রিয় পোশাক। এসব পোশাকে তার বুকের উচ্চতার আভাস স্পষ্ট। ওড়নায় না ঢাকলে একটা আবেদন তৈরি হয় যে ব্যাপারে সিনথিয়া তেমন সচেতন নয়। রঙটা কালো হলেও মুখটি ভারি মিষ্টি দেখতে তার চোখেমুখে শরীরের প্রতি বাঁকে এক রহস্যময় আবেদন তৈরি হচ্ছে যা এ বয়সের সব মেয়ের কমবেশি দেখা যায়।

জয়ন্তর চোখ ইচ্ছার বিরুদ্ধেও বার বার চলে যায় সিনথিয়ার বুকের দিকে। সে অপেক্ষায় থাকে কখনো পেনসিল বা রাবার মাটিতে পড়লে সিনথিয়ার হাত নিচু করে তুলতে গেলে স্তনের একটা আভাস দেখা যায়।

সিনথিয়া এসবের কিছুই বোঝে না। এসএসসির পর দেখতে দেখতে এক বছর পার হয়ে গেছে। এর মধ্যে সবাই এক বছর বেড়েছে, সবাই অনেকটা পেকেছে। প্রেমিক বা বয়ফ্রেন্ড সম্পর্কে ধারণা হয়েছে তাদের। এমনকী ফেসবুকে সম্পর্কের শুরু পর্যন্ত করে দিয়েছে কেউ-কেউ। তবে সিনথিয়ার এসব নিয়ে তেমন ধারণা পাকেনি। কারণ হতে পারে সে এতো উচ্ছল-টমবয় টাইপের যে সমবয়সী ছেলে কেউ তাকে ভয়ে প্রপোজও করেনি। যৌবন আসছে অথচ সিনথিয়া এক বালিকাই যেন রয়ে গেছে। তাই এমন একজনের কাছ থেকে কখন প্রপোজাল এলো সে ভীষণ ঘাবড়ে গেল।

বিকেল তখন গড়িয়ে সন্ধ্যার দিকে যাচ্ছে। সিনথিয়া সেদিন পড়তে এসেছে বেশ টাইট ফিট লাল একটা কামিজ পরে। তার ওড়না পড়ে রয়েছে পাশের চেয়ারে। স্তনের আভাস বেশ স্পষ্ট। মগ্ন হয়ে অঙ্ক করছিল সে। টেবিলের কিনারায় তেরছাভাবে চাপ খেয়ে ঊর্ধ্বমুখি ঠেলে উঠে এসেছে তার বুক। জয়ন্ত অপলক সে দিকে তাকিয়ে আছে। অঙ্ক শেষ করে খুশি মনে জয়ন্তের সামনে খাতা মেলে ধরল সিনথিয়া। থমকে গেল সে, বুঝল তার বুকের দিকে অপলক তাকিয়ে আছে জয়ন্ত।

হঠাত্ করে জয়ন্ত হাত বাড়িয়ে সিনথিয়ার দুই হাত ধরল। তারপর বলল—শোন সিনথিয়া, তোমার জীবন সম্পর্কে খুব সিরিয়াস কিছু কথা বলব এখন আমি। বেশ কয়েক মাস ধরে তোমার ব্যাপারে খুবই আপসেট আমি। দিনরাত তোমাকে দেখি জেগে এমনকী ঘুমেও। তোমার প্রতি আমার যে ফিলিং জন্মেছে তা কিন্তু অন্য ছাত্রীদের ব্যাপারে জন্মেনি। এদের মধ্যে সালমা আমাকে বাড়তি পছন্দ করে তা আমি জানি। তবে তার প্রতি এ ফিলিং হয়নি আমার। হয়েছে তোমার জন্যে।

- কী ফিলিং? সিনথিয়ার মুখে যেন এক বড় ব্যাঙ ঢুকে পড়েছে সে কথা বলতে পারছিল না। তবু কোনোভাবে প্রশ্নটি করল।

- এই যেমন আমি তোমাকে আপন করে পেতে চাই। তুমি হবে একান্ত আমার। আমিও থাকব একান্ত তোমার। আমাদের সব কিছু একে অন্যের হয়ে যাবে।

সিনথিয়া ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে পাথরের মূর্তির মতো বসে আছে। কী করবে, কী বলবে কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না। তাকিয়ে আছে টেবিলের মাঝে। জয়ন্ত ওর হাত ছেড়ে দিয়ে বল্লো—এতে এমন ভাবে ঘাবড়ানোর কিছু নেই সিনথিয়া। আমি কয়েক মাস ধরে কথা চেপে রেখে আর পারছিলাম না। নিজকে এই চাপ থেকে মুক্ত করতে হুট করে বলে ফেললাম। তোমার এমন কোনো তাড়াহুড়ো নেই তিন দিনের মধ্যে হ্যাঁ বা না বলতে পার। আগামীকাল সন্ধ্যায় ‘মুংলী’ নামের চাইনিজ রেস্টুরেন্টে গত বছরের এ বছরের সব মিলিয়ে আটজন ছাত্রীকে খেতে ডেকেছি। তুমিও যদি এসো খুশি হব। যদি আস এই লাল কামিজ আর ঠোঁটে লাল লিপিস্টিক চোখে কালো কাজল তবে এসো। আমি আজ যাই। কথাগুলো শেষ করে ঝড়ের মতো দ্রুত জয়ন্ত চলে গেল।

আরো আধঘণ্টা সিনথিয়া যে ভাবে বসে ছিল তেমনি বসে রইল। কেউ যেন নাটবল্টু দিয়ে তাকে চেয়ারের সঙ্গে আটকে দিয়েছে। তার বিশ্বাস হচ্ছে না তার থেকে শুধু বয়সে বড় নয় শরীরেরও দ্বিগুণ লোকটা কী বলে গেল তাকে। জয়ন্তের সামনে দাঁড়ালে তাকেতো পিচ্চি মনে হবে। তার মাথায় তোলপাড় চলছে। এই প্রথম একজন পুরুষ তাকে একজন নারী হিসেবে প্রপোজ করেছে। কী করবে সে এখন! কোনো বন্ধুর কাছে কথা বলে হেলপ চাইবে নাকি! বন্ধুরা জানলে ব্যাপারটা নিয়ে হাসি তামসা করে এক শেষ করে ছাড়বে। তারা রক্ষণশীল মুসলিম সম্ভ্রান্ত পরিবার। তিনি হিন্দু পুরুষ! এই ভয়টা তাকে খুব একলা করে ফেলল। কারো সঙ্গে এ নিয়ে কথা বলার কথা ভাবলেই সামনে ভয় ভূতের মত এসে দাঁড়াতে লাগল। মা বাইরে থেকে এসে পড়ার রুমে মেয়েকে দেখতে উঠে এলেন।

সিনথিয়া চুপচাপ এক ভূতের মতো বসে আছে দেখে কাছে এসে মাথায় হাত রাখলেন।

- কী হয়েছে মা? একা একা এমনভাবে বসে আছো কেন? চলো নিচে চলো।

সিনথিয়া মাকে কিছুই বলতে পারল না। মা-বাবার সঙ্গে জীবনে ভয় ছাড়া অন্য কোনো সম্পর্ক ভালোভাবে গড়ে ওঠেনি। তবু সে মাকে জড়িয়ে ধরে বলল—চলো খুব ক্ষিদা লেগেছে। যদিও তার মোটেই ক্ষিদা পায়নি। পরদিন জয়ন্ত স্যারের লাঞ্চের আমন্ত্রণে যাবে কিনা সারা রাত ভেবেও ঠিক করতে পারেনি। পরদিন মা শুনে তাকে ধমকে বললেন— তুই অবশ্য যাবি। এতগুলো ছাত্রীর মধ্যে উনি তোকে বেশি সময় দেন। কত সুন্দর করে অঙ্ক বুঝিয়ে দেন বলেই তো এতো ভালো নম্বর পেয়েছিলি। সবাই যখন যাবে তুইও যা! ঘুরে আয়।

সিনথিয়া দুপুরে গোছল করে হেয়ার ড্রায়ারে অনেকক্ষণ ধরে চুল শুকালো, হাতে-পায়ে ক্রীম লোশন মাখল। পাতলা সুতির সেমিজের ওপর টাইট লাল কামিজটা পরে এই প্রথম খেয়াল করল নিজের সুন্দর বুকের কথা। আগে কেন কখনো এভাবে খেয়াল হয়নি! নিজেই কেমন যেন লজ্জা পেল। ইচ্ছে করে এক বড় ওড়না বুকে প্যাঁচালো। চোখে কাজল দিয়ে লাল টুকটুক লিপিস্টিক দিয়ে রাঙালো দুই ঠোঁট। সে যেন নিজকেই চিনতে পারছে না আজ। এ যেন তার অপরিচিত কেউ। সব শেষ করে ধপাস করে বিছানায় বসে পড়ল সে। এ কী করছে সে, লোকটা কথামতো সেজে গেলে তো তিনি ভাববেন তার ‘হ্যাঁ’র পাল্লাই ভারী। না! সে যাবেই না।

মা বেরুচ্ছিলেন বাইরে যেতে। তাকে দেখে চিত্কার করে বললেন।

- কী রে তোকে লাঞ্চের নাকি ডিনারের দাওয়াত দিয়েছে রে? মেয়েটা শুধু বড়ই হয়েছে আক্কেল বুদ্ধি এক্কেবারে কিছু হয়নি। আরে আমাকেও বলেছিল ফোনে। আর কারো মা-বাবা যাচ্ছে না ভেবে আমিও না করেছি। কত সম্মান করে আমাদের। ঘরে এসে পড়িয়ে যাওয়ার মানুষ কী আজ আর সহজে পাওয়া যায়। সামনে তোকে আরো ভালো রেজাল্ট করে ইউনিভার্সিটিতে ঢুকতে হবে। লোকটা রাগ করলে মুস্কিল। চল আমি গাড়িতে তোকে সেই রেস্টুরেন্টের কাছে নামিয়ে দিয়ে যাচ্ছি।

নিজের মধ্যে দোটানায় হেরে গেল সিনথিয়া। মায়ের সঙ্গে যেতে পা বাড়ালো।

মা একেবারে রেস্টুরেন্টের গেইটে নামিয়ে দিয়ে গেলেন। পা যেন খুব ভারী লাগছে। খুব শূন্যতায় ভাসছে। কাছের বন্ধু কারো সঙ্গে একবার এ নিয়ে আলাপ করতে পারলে ভালো হতো। ভয়ে সে কাউকে বলতে পারল না। কাউকে বললেই প্রথমে হিন্দু ভদ্রলোক শুনেই বিগড়ে গিয়ে তাকে কি না কি বলা শুরু করে। ভয়ে কাউকে কিছু বলাই হলো না।

হঠাত্ সিনথিয়া মন থেকে ঝেড়ে ফেলল সেই প্রপোজালের কথা। এখনো সময় আছে। আজ শুধু কথা রাখার জন্যে আসার জন্যে আসা। মাও জোর করে নামিয়ে দিয়ে গেলেন। নিজের মধ্যে সাহস বাড়িয়ে ঢুকে পড়ল সে রেস্টুরেন্টের ভেতরে।

আটজন ছাত্রীসহ জয়ন্ত ঘুরে তাকালেন তার দিকে। জয়ন্ত দ্রুত দাঁড়িয়ে এগিয়ে এলো। চোখ খুশিতে যেন জ্বলছে।

- আরে সিনথিয়া, এসো, এসো। দেরি দেখে আমিতো ভেবেছি আর আসবে না। তোমার জন্যে অনেকক্ষণ আমরা সবাই অপেক্ষা করে এই মাত্র খাওয়ার ওয়ার্ডার দিলাম।

সবাই তাকে কেমন অন্য চোখে দেখছে আজ। এমন লাল টুকটুক লিপিস্টিক মাখতে তারা সিনথিয়াকে আগে দেখেনি।

জয়ন্ত নিজের পাশে একটা চেয়ার টেনে এনে বসার জায়গা করে দিল। একে একে খাওয়ার ডিস আসছে আর সিনথিয়া অবাক হচ্ছে। সারাটা বছর তার পছন্দের চাইনিজ যা যা পড়ার ফাঁকে ফাঁকে জয়ন্তকে বলেছে সব তাই। নিজকে কেমন যেন গুরুত্বপূর্ণ লাগছে। যদিও ক্ষিদে বলতে তার বিন্দু মাত্র কিচ্ছু নেই।

তার পছন্দের খাওয়া সবই, তবে সে কিচ্ছুই তেমন খেতে পারছে না। ভেতরে কেমন যেন সব গুলিয়ে আসছে তার। কেন ব্যাপারটা তাকে এত সিরিয়াসলি নিতে হবে, এটাই বুঝে উঠতে পারছে না। তা ছাড়া তিনদিন সময় দিলেও প্রায় প্রতিদিনতো ওনার সঙ্গে দেখা হচ্ছে তার। তিনি কেমন যেন এক অসহায় চোখে তাকিয়ে থাকেন। সিনথিয়ারও সুস্থবুদ্ধি ঘোলা হয়ে উঠছে দ্রুত। তা ছাড়া একদিকে একজন পূর্ণবয়স্ক পুরুষ মানুষ। অন্য দিকে সবে এসএসসি পার করা বালিকা মাত্র। যাও দুই একজন খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের কাছে পরামর্শ নেবে দুই ধর্মের দুই মানুষ ভেবে তাও সাহস হচ্ছে না তার। মাঝে-মাঝে মনে হচ্ছে জয়ন্ত অজগরের মত তাকে তার বুদ্ধি বিচারকে ধীরে ধীরে গিলে ফেলছেন। সে ছোট্ট খরগোশের মতো সম্মোহিত হয়ে চোখ পিট পিট করছে শুধু।

সময় নিচ্ছে সিনথিয়া, অনেকক্ষণ নাড়া-চাড়া করে তার প্রিয় থাই সুপ দু’চার চামচ খেলো মাত্র। সে লক্ষ করল জয়ন্ত দেখছেন তাকে। অন্যরা ব্যাপারটা জানে না বলে তা বুঝতে পারছে না।

খাওয়া শেষে সবাই উঠছে যখন জয়ন্ত বললেন—তুমি আর একটু থেকো। সিনথিয়া আমি তোমাদের ওদিকে যাব, তোমাকে নামিয়ে দেব।

- না, আমি নুসরাতের সঙ্গে যাচ্ছি, পথে একটু কাজ আছে।

নিজের ওড়না টেনেটুনে নুসরাতের সঙ্গে বেরিয়ে এলো সিনথিয়া। রিকশায় যেতে যেতে তার ভেতরটা কেঁপে উঠল। এ কী করছে সে। লোকটা যা বলবে তা করতে হবে নাকি! নিজকে ঠেকাতে পারছে না। এটা কী তার জীবনে প্রথম পুরুষের আহ্বান বলেই এমন হচ্ছে! নাকি সম্পূর্ণ এক নতুন ব্যাপার নতুন শিহরণ তাকে দোলা দিয়ে যাচ্ছে! কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না সিনথিয়া।

সারা রাত সিনথিয়া ঘুমাতে পারল না। দেয়ালের বড় ঘড়িটা যেন তার মগজে ঢুকে পড়েছে। প্রতি সেকেন্ড মগজে শব্দ হচ্ছে টিক টিক। কোনোভাবে এই দোটানা থেকে নিজকে বের করতে পারছে না। ওনাকে না বলে দিলেই তো সব শেষ! বাবাকে বলে দেবে স্যার অন্য কাজ একটা পেয়েছেন। আর পারবেন না আসতে। শেষ হয়ে যায় সব। টেনশন থাকে না আর।

ভাবাটা সহজ তবে সে কেন যেন করতে পারছে না। বেশ ক’বার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ‘না’ বলে দেবে কাল। পর মুহূর্তে তার ভেতরে কে যেন চিত্কার করে উঠছে—এখুনি এমন সিদ্ধান্ত নিওনা মেয়ে! জীবনে এই প্রথম একজন পুরুষ যেমনই হোক সে প্রাণপণ উজাড় করে নিজকে নিবেদন করেছে তোমাকে। সারা রাত ঘুমহীন চোখ, চুলগুলো সব এলোমেলো। সময় পার হতে হতে তাঁর আসার সময় হয়ে গেল।

ঘরে যথারীতি বাবা-মা এমন কী ভাইরাও নেই। ঠিক পৌনে পাঁচটায় মেইন গেইটে বেল বাজল। নিজের রুমে বসে সিনথিয়ার ভেতরে যেন বিশাল হাতুড়ি দিয়ে কেউ আদিকালের ঘণ্টায় বাড়ি দিল। শব্দ বিকট হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে তার শিরায় শিরায়।

সিনথিয়া এক রোবটের মতো পায়ে পায়ে নিজের রুম থেকে বেরিয়ে স্টিলের পাতে সিঁড়িতে পা ফেলে ফেলে পড়ার রুমে এসে ঢুকল। খোঁজ নিয়ে জয়ন্তের সামনের চেয়ারে গিয়ে বসল।

মুখোমুখি দুই হাত মাথায় দিয়ে মুখ নিচু করে বসে থাকা সিনথিয়াকে বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ দেখল জয়ন্ত। তারপর হাত বাড়িয়ে ওর চিবুক ধরে মুখটা উঁচু করল। গত কালের গাঢ় কালো কাজল এখনো অনেকটা চোখে আছে। ঠোঁটে লাল লিপিস্টিকের দাগ নেই। তবে ঠোঁট যেন ভেজা ভেজা লাগছে। হাত সরিয়ে জয়ন্ত বললেন- আমার দিকে তাকাও সিনথিয়া, এত চিন্তিত, বিধ্বস্ত হওয়ারতো কিছু নেই।

- না কিছু নেই। সিনথিয়া যেন জয়ন্তর কথার প্রতিধ্বনি করল মাত্র। হাত বাড়িয়ে আবার নিজের আঙুল সিনথিয়ার মুখে স্থাপন করল। চোখের ভ্রু ঘুরে নাকের ডগায় এলো। তারপর ভেজা ভেজা ঠোঁটে।

সিনথিয়ার ভেতরে এই স্পর্শ এক অন্যরকম শিহরণ জাগাচ্ছে।

- আমার চোখের দিকে তাকাও সিনথিয়া।

সিনথিয়া তার কাজল মাখা চোখ তুলে তাকাল। তার মুখে হাতের আঙুল ঘুরছে, আবার চিবুকে এসে থামল। খুব গম্ভীর কণ্ঠে তিনি বললেন,

- আমি তো শুধু আমার কথা বলেছি। তুমিতো কিছু বলোনি। তাই এত চিন্তায় পড়ে হাবুডুবু খেয়ে নিজের ক্ষতি কর না। আমি বুঝছি তুমি ছোট্ট মানুষ, তোমাকে এক বিশ্রী সিদ্ধান্তের চাপে ফেলে দিয়েছি। আগে ভাবিনি আমাদের ধর্মও এক বাধা। তবু পারছিলাম না। চেপে রাখতে বলে ফেললাম। তুমি খুব ভালো বুঝদার মেয়ে বুঝেছি শুনে তুমি হৈচৈ করে কাণ্ড করে তুলবে না! করওনি তুমি। ধন্যবাদ তোমাকে। তুমি চুপ করে থাকলেও বুঝে নেব, না মুখে বলার দরকার নেই।

সিনথিয়া যথারীতি চুপ। তবে জয়ন্তের চোখের দিকে তাকিয়ে আছে। দেখছে তার মুখে আঙুলের ভ্রমণ।

- তোমার ‘না’ সিদ্ধান্ত হয়তো আর তোমাকে পড়াতে আসা হয়ে উঠবে না। তোমার বাবাকে আমিই বুঝিয়ে বলব, অন্যত্র কাজের চাপের কথা। সামনে পরীক্ষা, ভার্সিটিতে যেতে হবে, তিনি সহসা খুঁজে আনবেন অন্য কাউকে। আর যদি ‘হ্যাঁ’ কর মনে প্রাণে হ্যাঁ কর! পুরোটাই এক্সেপ্ট কর।

পরস্পরের দিকে তাকিয়ে থেকে কিছুটা সময় পার হওয়ার পর জয়ন্ত দেখলেন সিনথিয়ার চোখ দিয়ে অনবরত অশ্রু ঝরছে। চুপ করে তাকিয়ে আছে মেয়েটি তার দিকে।

জয়ন্ত নিজের রুমাল বের করে তার চোখ দু’টো মুছিয়ে দিল। ক’টা মুহূর্ত চুপ থেকে আবার মুখ নিচু করে হু-হু করে কেঁদে ফেলল সিনথিয়া। ভাগ্য ভালো ঘরে কেউ নেই, থাকলে দৌড়ে আসতো জানতে কী হয়েছে। জয়ন্ত দু’-একবার মাথায় হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দিতে চেয়েছিল। ঝটকা দিয়ে সরিয়ে দিয়েছে হাত। জয়ন্ত বুঝছে না বলতে কষ্ট হচ্ছে সিনথিয়ার। চুপ করে বসে থাকল। একজন ক্রন্দনরত মেয়ের সামনে চুপ করে বসে থাকা খুবই কষ্টকর। এবার দাঁড়িয়ে পড়ল জয়ন্ত। আবার মাথায় হাত রাখতে চাইল।

নিজের ডান হাত দিয়ে সরিয়ে দিল সিনথিয়া।

- ঠিক আছে আমি যাই। রাগ কর না, ক্ষমা কর। আমি বুঝে গিয়েছি আমার উত্তর। ধীর পায়ে দরজা খুলে স্টিলের পাতে বানানো সিঁড়ির দিকে পা বাড়াতে। সিনথিয়ার কান্নার উত্তাল আরো বাড়ল। ফুঁপিয়ে উঠছে সে বার বার।

জয়ন্ত ঘুরে দাঁড়িয়ে এক কদম তার সামনে এসে সিনথিয়ার মাথায় আবার হাত রাখল। এবার আর বাধা দিল না। জয়ন্তর আংটি পরা মোটা মোটা আঙুল বিলি কেটে দিতে লাগল সিনথিয়ার এলোমেলো চুলে।

আচমকা হুট করে জয়ন্ত দরজা খুলে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে নামতে বল্লেন—আমি যা বোঝার বুঝে গেছি! ভালো থেকো। নিচে নেমে প্রায় বাইরে যাওয়ার গেইটের কাছাকাছি যখন জয়ন্ত ঠিক তখনি পাখির মতো যেন সিনথিয়া নিচে নেমে এলো। তখনো গেইটে হাত দিয়েছে তবে খোলা হয়নি। হাত চেপে ধরে তার বুকের কাছে এসে থামল সিনথিয়া। কান্না থেমেছে তবে জলপড়া থামেনি। মাঝে মাঝে ফুঁপিয়ে উঠছে তখনো। মুখোমুখি জয়ন্তর শরীরের প্রায় ছুঁই ছুঁই তারা দু’জন। দূর থেকে কেউ দেখলে ভাববে হাতি আর হরিণের মুখোমুখি। তাদের কিন্তু সেসব নিয়ে কোন ভ্রূক্ষেপ নেই। সিনথিয়া ফোঁপাতে-ফোঁপাতে বল্লো— আপনি কী করে বুঝলেন! আমি তো না বলিনি।

জয়ন্ত তার ভারী হাত সিনথিয়ার পিঠে রেখে নিজের দিকে টানল। এবার দু’টো শরীর প্রায় লেপ্টে গেছে। সিনথিয়ার নরম বুক চেপে বসেছে জয়ন্তর শক্ত বুকে। উত্তাপ পাচ্ছে জয়ন্ত। গত কয়েক মাস জয়ন্ত এই বুকের কথা ভেবেছে। কত কল্পনায় বিভোর হয়েছে। জয়ন্ত সিনথিয়ার মুখের কাছে নিজের মুখ নামিয়ে জিজ্ঞেস করল- তাহলে তুমি হ্যাঁ বলছো? সিনথিয়া মুখে কিছু না বলে ঘাড় নাড়ল।

- না তা হবে না! মুখে বলো হ্যাঁ, তোমাকে স্বীকার করে নিলাম।

- না, পারব না!

জয়ন্তর হাতের বাঁধন একটু হাল্কা হলো। চোখের পাতায় বিষাদের ছায়া দেখা দিতে এই প্রথম সিনথিয়া ফিক করে হেসে উঠল।

- আমি সিনথিয়া, স্বীকার করলাম আপনাকে!

এবার জয়ন্তও হেসে ফেলে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরে নিজের ঠোঁট সিনথিয়ার ভেজা ভেজা চিকন ঠোঁটে নামিয়ে এনে চেপে চুমু খেল। সিনথিয়ার এ রকম অভিজ্ঞতা এই প্রথম। সে কবুতরের মতো নিজের ছোট শরীর নিয়ে ছটফট করতে করতে এক ঝটকায় মুখ সরিয়ে নিল।

- তুমি মনে-প্রাণে আমাকে এখনো স্বীকার করে নিতে পারনি সিনথিয়া। তুমিতো আমার, আমি ছাড়া আর কে তোমাকে আদর করবে।

তুমি তো তোমাকে তোমার সব কিছু আমাকে মেলে দেবে অর্ঘ্যের মতো।

- আগে কেউ ঠোঁটে ঠোঁট রেখে এভাবে কিস করেনিতো তাই ঘাবড়ে গিয়েছি। আমার তো কোনো অভিজ্ঞতা নেই।

এবার আর মুখ সরালো না সিনথিয়া। দীর্ঘ চুমুর পর হঠাত্ খেয়াল হলো একী করছে তারা আশেপাশে দালান বিল্ডিং এর জানালা দিয়ে কেউ দেখে ফেললে সর্বনাশ হবে। সিনথিয়া জয়ন্তর হাত ধরে বলল,

- চলেন আবার ঘরে যাই।

ঘরে ঢুকেই তড়িঘড়ি করে জয়ন্ত দরজা বন্ধ করে দিল। আবার টেনে নিল সিনথিয়াকে বুকের মধ্যে। মেয়েটি একটু আগে কাঁদছিল অঝোরে এখন কেমন মায়াবী চোখে চোখ রেখে তাকিয়ে আছে। জয়ন্তর ঠোঁট যেন পিষে ফেলবে সিনথিয়ার নরম চিকন ঠোঁট। এই প্রথম কোনো পুরুষের চুমুর অভিজ্ঞতা সিনথিয়ার। মুহূর্তে মুহূর্তে তাকে পাগল করে দিচ্ছে। শক্তভাবে জয়ন্তকে আঁকড়ে ধরে শরীরটা চেপে ধরতে চায় সে। চুমু দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। অনেকক্ষণ পর পর শুধু শ্বাস নেয়ার জন্যে বিরতি।

আচমকা নিচে মেইন গেইটে শব্দ হতে তাদের হুঁশ হলো। সিনথিয়া বুঝল বাবা ফিরছেন। মায়ের মহিলা সমিতির মিটিং আছে দেরি হবে বলে গেছেন। দ্রুত তারা ঠিকঠাক হয়ে পড়ার টেবিলে বসে পড়লো। সামনে খোলা বই খাতা।

বাবা ঠিকই উপরে উঠে এলেন।

- অঙ্কটা টিকমতো ঢুকছেতো মাথায়?

- হ্যাঁ বাবা। এখন স্যার বুঝিয়ে দেয়ায় অনেক সহজ লাগছে।

- বাহ, ভালো। এই গরমে ঘেমে গেছো তোমরা ফ্যান ছাড়োনি কেন?

- একটু আগে কারেন্ট এসেছে।

- ওহ, তাই! বাবা বুঝলেন না কারেন্ট ফিরে এলেতো পাখা ঘোরে, বন্ধ থাকে না। বাবার পিছু নিয়ে দুই কদম নিচে নামল সিনথিয়া। বাবা পাশের দোতলায় নিজের ঘরে ঢোকার অপেক্ষা করল। তারপর দৌড়ে, ফিরে এলো পড়ার ঘরে।

- এবার যান স্যার! একটুর জন্যে বাঁচলাম। এবার মা আসবেন।

- যান! আর যান নয়! যাও বলো একবার চলে যাব।

- সব কিছু এতো তাড়াতাড়ি পারব না।

-আব্বুতো তোমার এসে গেছেন। উপরে আর আসবেন না।

- কে জানে আসতেও পারেন।

কথাগুলো শেষ হতে না হতে ঝমঝম করে তুমুল বৃষ্টি শুরু হলো।

- দেখেছো, প্রকৃতিও চাইছে আরো একটু থাকি।

বৃষ্টির ছাঁট আসবে ভেবে দরজা-জানালা সব বন্ধ করে দিল জয়ন্ত। বাতি নেভাতে গেলে সিনথিয়া বাধা দিল।

- লাইট নেভানো অন্ধকারে মা ফিরে এসে দেখলে শেষ করে ফেলবে।

- অন্ধকারে বৃষ্টির শব্দ শুনতে চেয়েছিলাম।

- উফ্ কী যে বলেন। টিনের ছাদ উপরে এতো বৃষ্টির শব্দ শুনছেন। জয়ন্ত চোখে চোখ রেখে হাসল। দেয়াল ঘেঁষে সিনথিয়া এক কোণে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। তার ওড়না সোফায় আগে থেকে যেমন পড়ে ছিল তেমনি পড়ে আছে। এত দিন দূর থেকে দেখা সিনথিয়ার নব্য ভরাট হয়ে ওঠা বুক আজ খুব ধরতে ইচ্ছে করল। কাছে গিয়ে ওকে আবার নিজের দিকে টেনে নিতে গেলে সিনথিয়া ঘুরে দাঁড়াল। পেছন থেকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে হাত দু’টো ওর বুকের উপর রাখল। বোঁটায় আঙুলে হাল্কা চাপই বাঁশঝাড়ে বাতাসের শিহরণের মতো সিনথিয়ার সারা শরীরে কাঁপন তুলল। এবার শক্তভাবে দুই স্তনে জোরে চেপে ধরায় সিনথিয়া বাধা দিল না। শুধু মুখ দিয়ে গোঙানির মতো বল্লো- উফ্! এই এসব কী করছেন?

আর কিছু বলার আগেই সিনথিয়ার মুখ জয়ন্ত বন্ধ করে দিল নিজের ঠোঁট দু’টো চেপে।

সিনথিয়ার এতো সুন্দর বুক আজই ধরতে পারবে সে ভাবেনি। সহজে পেয়েছে যখন অনবরত চাপ বাড়ছে।

সিনথিয়ার যেন বাধা দেয়ার ইচ্ছা কিংবা শক্তি কোনোটাই নেই।

সে যেন একটা জাহাজ, তার জীবনের প্রথম পুরুষ ক্যাপ্টেন যেভাবে চালাচ্ছে সে চলছে।

বাইরে বৃষ্টি থামছে না।

 


ফোনের পর ফোন করে যাচ্ছে সাবের। সিনথিয়া ধরছে না। এক থেকে দুইবার রিং হলে যে মেয়ে লাফিয়ে এসে ধরে তার কী হলো!

চার বছর কোনো মানুষের জীবনে একেবারে কম সময় না। সিনথিয়া এক অদ্ভুত ভাবে চলে এসেছিল সাবেরের জীবনে। এর পর থেকে সাবেরের জীবন যেন এক নতুন গতি পায়। এই গতির জোয়ারে তারা শারীরিক এবং মানসিকভাবে ভেসে চলেছে চার চারটি বছর। ইমেইল, ফেসবুক, সেল ফোনে মুহূর্তে মুহূর্তে তাদের মানসিক বার্তা আদান-প্রদান হতো। সপ্তায় অন্তত একবার তাদের শারীরিক উত্তাপ বিনিময় হতো শহরের গোপন কোনো জাগায়। চরম উত্তাপের চূড়োয় উঠেও সাবের কখনো ভুলতে পারেনি সিনথিয়া তার মাত্র একভাগ। আগেই সে দু’ভাগে বিভক্ত দু’জনের। প্রথম প্রেমিক জয়ন্ত বণিকের সম্পর্ক মৃত ঘোষণা কারলেই কী মৃত। সম্পর্ক বড়ই ভয়াবহ জিনিস মরেও মরে না! কখন যে কীভাবে কীরূপে কোন দিক দিয়ে পাশে এসে দাঁড়াবে কেউ জানে না। সিনথিয়ার জীবন্ত সম্পর্কের দু’ভাগে সাবের ও জমীল হোসেন তাপস ঝান্ডা তুলে দাঁড়িয়ে। সাবেরের ক’টা ভ্রু চোখের পাক ধরেছে সিনথিয়া যেন তার হিসেব জানে। মিলনের চরম মুহূর্তেও শেষে ক্লান্তিতে সাবের যখন চিত্ হয়ে শুয়ে থাকে সিনথিয়া তার বুকের ওপর শুয়ে খুবই সযতনে গুনতে চেষ্টা করে চোখের ক’টি ভ্রু পেকেছে সাবেরের। অর্ধেকের চেয়েও কম বয়সের পার্থক্য দু’জনের অথচ কোন ভ্রুক্ষেপ নেই মিলনে দু’জনের ভ্রু গণনা শেষ হলেও সাবেরকে নড়তে দিত না সিনথিয়া গজগজ করে ক্ষেপে উঠত বিছানা ছেড়ে উঠতে গেলে।

- কিছুক্ষণ চুপ করে শুয়ে থাক না!

- ক্যানো?

- দেখি তোমাকে।

- বৃদ্ধ এই সবুজ সাপকে আবার দেখার কী আছে?

- কচু বৃদ্ধ! আমার কাছে তুমি না বৃদ্ধ, না যুবক, না শিশু। তুমি সাবের আমার কাছে শুধু তুমি।

- কী আমি তোমার কাছে? কিছুই না বাতাসে ভরা এক অবয়ব মাত্র যে কোনো দিন যা উড়ে যাবে। হারাতে হবে অবধারিত তোমাকে।

- ধ্যাত্! এই তোমার এক খুবই খারাপ অভ্যাস! ভালো মুহূর্তগুলোতে উল্টাপাল্টা কথা বলে তিতা করে ফেল। এখন কী দরকার কখন ভবিষ্যতে কী হবে! আমি কার কাছে থাকব তার হিসেব-নিকেশ করার।

- সরি, ঠিক।

- চোপ তুমি কিসের শিল্পী? কিসের প্রেমিক! কচু একটা।

সাবেরের সরি বলা ছাড়া আর কী বলার আছে।

- চুপ! ঐ সরি একটা শব্দ ছাড়া আর কিছু বল না!

আবার নিজের নগ্ন শরীর সে সাবেরের উপর স্থাপন করে। নাকের কাছে নাক এনে চোখে চোখ রেখে তাকিয়ে থাকে। সাপের মতো আচমকা জিব বের করে সাবেরের দুই চোখে জমে ওঠা জল চুষে নেয়।

- এই একটা সময় কী অপার্থিব লাগে তোমার মুখ সিনথিয়া। তুমিত না জানো, না বোঝো! যেহেতু তুমিতো তোমার মুখ দেখতে পাওনা তখন। সিনথিয়া সাবেরের ঠোঁটে হাল্কা ভাবে নিজের ঠোঁট ঘষে। শক্ত করে সাবেরকে জড়িয়ে ধরে আবার—তুমি সাবের আসলে আমার একটা বাচ্চা!  সাবের আজো বুঝে উঠতে পারেনি খুব এক্সাইটেন্ট হলে সিনথিয়া কেন তার সঙ্গী পুরুষদের নিজের বাচ্চা বলে! মাঝে মাঝে ভাবে তার অন্য প্রেমিক জমীল হোসেন তাপসকেও হয়তো চরম মুহূর্তে এমনি বাচ্চা বলে ডাকে।

সাবের তার অনেক ছবি এঁকেছে। এর মধ্যে কিছু ছবি তার প্রদর্শনীতেও ছিল। বেশ প্রশংসিত হয়েছে। বিক্রিও হয়েছে। সিনথিয়া কখনো স্বপ্নে ভাবেনি যে মেয়ে ছোট থেকে রঙ কালো বলে অবহেলা পেয়েছে তার ছবি একজন শিল্পী আঁকবে! তাও আবার প্রশংসা কুড়োবে। এ সবই সাবেরের মতো নামি শিল্পীর জন্যেই সম্ভব। তবে এতে করে সিনথিয়া নিজের মধ্যে এক ধরনের সাহস পেয়েছে, নিজের কাছে নিজের সম্মান বেড়েছে।

-সাবের তোমার সঙ্গে দেখা হতে আমি অনেক পাল্টে গিয়েছি। নিজকে নিজে চিনতে শিখেছি।

শুনে সাবের হাসে। মাঝে মাঝে কালো মোটা ফ্রেমে জল লেমন মার্কা সাবেরের চশমা টান দিয়ে খুলে নিজে পরে ভারিক্কি চালে কথা বলা শুরু করে সিনথিয়া।

তার যুবক প্রেমিক এখন লন্ডনে ফাইন্যান্সে মাস্টার্স করছে। সিনথিয়ার পরিবারের কাছে হিরো হয়ে আছে তাপস। সে এসব কিছু করছে শুধু সিনথিয়ার জন্যে। ঢাকায় ভালো চাকরি নিজের ফ্ল্যাট সবই ছিল। তবু সিনথিয়া বোঝালো তার বাবা-মা চায় একটু বিলাতী বড় সার্টিফিকেট। দেখো না পারো যদি। এককালের ইউনিভার্সিটির ডেসিং হিরো তাপস এখন লাট্টু হয়ে যা সিনথিয়া বলে তা অক্ষরে অক্ষরে করতে পাগল। সিনথিয়ার সব কিছুতো সাজানো ছিল তবে কেন সে হাত বাড়ালো তার মতো একজন বৃদ্ধ মার্কা শিল্পীর দিকে।

-একদিন সিনথিয়া তার কথার উত্তরে বলেছিল—তুমি যা আমাকে দিয়েছ তা অন্যরা দিতে পারেনি। হাসিতে ভরিয়ে দিয়েছ। আত্মসম্মান কীভাবে কেড়ে নিতে হয় তা শিখিয়েছ আমি আমার সব গোপন কথা তোমাকে বলতে পারি। এখন আবার আমার ভেতরের বাগানে ফুল ফোটে, প্রজাপতিরা বেড়াতে আসে।

সাবের ঢাকা এয়ারপোর্টে সিনথিয়ার জন্যে সাত সকালে অপেক্ষা করছিল। যে প্লেনে সিনথিয়ার আসার কথা সেটি নেমেছে। যাত্রীরা নিজেদের মালপত্র বুঝে নিয়ে বাসায় ফিরে গেছে। শুধু সাবের গলায় প্রেস কার্ড ঝুলিয়ে শুধু শুধু অপেক্ষা করছে সিনথিয়ার। সাবের এখন বুঝতে পারছে সিনথিয়া ইচ্ছে করে লন্ডনে প্লেন মিস করেছে। যাতে এক রাত একদিন তাপসের সঙ্গে কাটাতে পারে। ঢাকা এয়ারপোর্টে পাস নিয়ে ঢোকা যে কী ব্যাপার তা যারা গেছেন তারাই বোঝেন। এমন ঝামেলাপূর্ণ অবস্থায় সাবের বলেই সম্ভব হয়েছে এয়ারপোর্ট ইনার পাস নিজের নামে নিয়ে ইমিগ্রেশন পার হয়ে সিনথিয়ার জন্যে অপেক্ষা করার। সময় যেন শেষ হতে চায় না। কাতার এয়ারওয়েজ সময় মতো ভোর ছয়টায় নেমেছে। বেল্টে ঘুরপাক খাওয়া লাগেজ নিয়ে এক সময় সবাই চলে গেছে। এর পর এসে নামল টার্কিস এয়ারওয়েজ তাও সব যাত্রী যে যার মতো চলে গেল। ঠাঁয় দাঁড়িয়ে শুধু প্রহর গুনছে সাবের। কখন টরন্টো লন্ডন ঢাকায় বেরিয়ে আসবে সিনথিয়া।

শেষ পর্যন্ত সিনথিয়া এলো না। আগামীকাল পহেলা বৈশাখ ছুটির দিন শুক্রবারের সঙ্গে ছুটিটি মিশে লম্বা ছুটি হয়েছে। ঢাকা ছেড়ে গেছে অনেক মানুষ নিজের গ্রামের বাড়িতে।

সাবেরের খুব অসহায় লাগছে মেয়েটি এমন করল কেন। তার জীবন তার ইচ্ছে যদি লন্ডনে সদ্য পড়তে যাওয়া তার প্রেমিক তাপসের সঙ্গে সে থাকতে চায় তো থাকবে! তাকে শুধু শুধু এয়ারপোর্টে টেনে আনার জন্যে ভুল তারিখ বলার দরকার কী ছিল। পরে নিজেই লজ্জা পেল সিনথিয়া তো তাকে এয়ারপোর্টে আসতে বলেনি। বলেছিল এয়ারপোর্টে খালার গাড়ি যাবে সে অত সকালে ফিরে নাস্তা করে রেস্ট নিয়ে সকাল সকালই কল করবে সাবেরকে। তারপর সারা দিন চারুকলা, মঙ্গলযাত্রা ঘোরাঘুরি। তার অতি আবেগের জন্যেতো সিনথিয়া দায়ী নয়। সে নিজে নিজেই সিনথিয়াকে নিয়ে অনেক কিছু ভেবে নেয়, যা মোটেই বাস্তব সম্মত নয়। অনেক পর সিনথিয়া বিরক্ত হয়ে বলেছে—সাবের তুমি এত কিছু ভাবো কেন আমাকে নিয়ে। মাত্রা ছাড়িয়ে গেলেই তা অস্বস্তিকর হয়ে দাঁড়ায়।

কে শোনে কার কথা সাবের সিনথিয়ার কথায় পাত্তা না দিয়ে হেসে বলে,

- আরে আমার কাজইতো ভাবার, ইমাজিনেশন! স্বপ্ন দেখা। দেখি বলেইতো আঁকতে পারি।

সাবের সোজা সিএনজি নিয়ে চলে আসে তার মনিপুরী চার তলায়। ঘুমিয়ে পড়ে মরার মতো। তার ঘুম ভাঙে বিকেল চারটায়। নিচে নেমে হোটেলে কিছু খেয়ে আবার এসে ইজেলে দাঁড় করানো ক্যানভাসে তরবারি যুদ্ধ করার মতো রঙ মেখে ব্রাশ চালায়। রঙের পরতে রঙ ঢালতে থাকে তৈরি হতে শুরু করে সিনথিয়ার সময়মতো না আসার কষ্টকে তুলি বা ব্রাশের আঁচড়ে প্রশমিত করা। যতই চাইছে সে তা করতে হচ্ছে না। বেড়ে যাচ্ছে কষ্ট। অদ্ভুত এক ঈর্ষা তাহলে লন্ডনে সিনথিয়া ইচ্ছে করে প্লেন মিস করে একদিন থাকল তাপসের জন্যে।

তাপসের গার্লফ্রেন্ড সিনথিয়া। অনেক সাধনার পর পেয়েছে তাপস তাকে। শুধু সিনথিয়ার জন্যে তাপসের মতো অহংকারী ছেলে নিজকে উল্টো করে ভেঙে সাজিয়েছে নিজকে। যেমনটি সিনথিয়া চায়। এর মধ্যে সাবেরের মতো মধ্যবয়স্ক মানুষের ঢুকে পড়া নিয়তি তবে হায়-হুতাশ করা অন্যায়!

গুষ্ঠি মারি ন্যায় অন্যায়। অনেকক্ষণ একটানা ছবি এঁকে ক্লান্ত সাবের। রঙ মাখা ব্রাশ বালতিতে পানির মধ্যে ছুড়ে বিছানায় ধপাস করে পড়ল। ঘুমে বুজে আসছে চোখ। বন্ধ চোখে ভাসছে আগামীকালের সকাল, তীব্র রোদের তাপে চারুকলা থেকে বেরুবে বিশাল হাতি ঘোড়া আর মানুষের অতিকায় মুখোশ। মানুষের ঢল নামবে রমনার বটতলায় ছায়ানটের গান শুনতে। ঘুমে ধীরে ধীরে তলিয়ে যায় সাবের পহেলা বৈশাখের রঙ বাহারি স্বপ্নে।

 


বালিকা সিনথিয়াকে জয়ন্ত সে দিন আসলেই সাপের মতো জড়িয়ে প্যাঁচে ফেলে সম্মোহিত করে ফেলেছিল। বৃষ্টির সেই রাতের পর থেকে সিনথিয়া জয়ন্তর সঙ্গে অনেক পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও নিজের প্রাণপুরুষ মনে করে বসেছিল। জয়ন্ত ঠিক যে রকম দৃশ্য সিনথিয়াকে দেখাতে চাইত সেটাই সে দেখত, বিশ্বাস করত। মাঝে অনেক স্মার্ট শিক্ষিত ছেলেরা তাকে প্রপোজ করে ব্যর্থ হয়েছে। সিনথিয়ার চোখে যেন জয়ন্ত নিজস্ব ফিলটার লাগিয়ে দিয়েছে, অন্য কিছু সে যেন দেখে না।

সময় গড়িয়েছে বছরের পর বছর। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী তখন সিনথিয়া। একান্ত ভাবে লুকিয়ে রেখেছে নিজস্ব গোপন ব্যথার মতো এই প্রেম আর সম্পর্ক তার ভয় হতো ধর্মে পার্থক্যই শুধু নয় বয়সেরও। যে কেউ দেখলে ভাববে বড়ই বেমানান। এসব কারণে সিনথিয়া কারো সঙ্গে শেয়ার করেনি তার জয়ন্তর সঙ্গে এই তুমুল জীবনযাপনের কথা। দু’ একজন খুব কাছের বান্ধবী অনেকটা আন্দাজ করতে পেরে সাবধান করতে চেয়েছে-হিন্দু হোক, বৌদ্ধ হোক ধর্মে যাই হোক তা পরের ব্যাপার আগে মানানসইতো সব দিক দিয়ে হতে হবে। সিনথিয়া এ ব্যাপারে কথা শুনতেই চাইত না। নিজের চারধারে এক কাচের দেয়াল তুলে ভেতরে বসেছিল।

জয়ন্তের হাতেই তার যৌবনের উত্থান, শারীরিক সম্পর্কের শুরু। যৌনতায় ভরপুর এক দেবতার মতো কেউ। যার পূর্ণ অধিকার রয়েছে তাকে যেভাবে ইচ্ছে পাওয়ার।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বছর পুরোটাই পেয়েছে সিনথিয়াকে জয়ন্ত। জয়ন্তের মতো বন্য সঙ্গীর হাতে সিনথিয়ার শরীরের পরিবর্তন সব পূর্ণ হলো। তার যৌবন পূর্ণতা পেল। প্রায় প্রতিদিন তাদের দেখা হতো। কিছু রেস্টুরেন্টের কেবিনে, বন্ধুর ডিজিটাল ফটো স্টুডিওর ভেতরে এমন কী রিকশায় বৃষ্টিতে সামনের পর্দা টেনে শারীরিক আদরে মত্ত হতো তারা। তবে পুরোপুরি মিলন হয়নি তাদের।

তারা ঠিক করে রেখেছিল সামনের দুর্গাপূজার ছুটিতে জয়ন্তের ঘরের সবাই যাবে গ্রামের বাড়িতে। নানা বাহানায় সে যাবে না। তাদের খালি বাড়িতে সিনথিয়া আসবে। কী শাড়ি পরে স্লিভলেস ব্লাউজ সব কলকাতার এক বন্ধুর মাধ্যমে আনিয়ে রেডি রেখেছিল। পরে যা সিনথিয়াকে সে দিয়ে রেখেছে। নিজের বাবা মাকে আগেই বলে রেখেছে পূজার ছুটিতে জয়ন্ত স্যার নিজের বাসায় সব ছাত্রীর পড়া ঝালিয়ে নেবেন। সেও যাচ্ছে। জয়ন্তের ওপর অগাধ বিশ্বাসে সিনথিয়ার মা-বাবার বিন্দুমাত্র দ্বিধা ছিল না। নিজে-নিজে শাড়ি পরতে দেরি হলেও শেষ পর্যন্ত পারল। স্লিভলেস ব্লাউজ যেমন খাটো, তেমনি টাইট, লোকাট হওয়ায় তার বুক যেন বিদ্রোহী পায়রার মতো খাঁচা থেকে বেরুতে চাইছে। লাল লিপিস্টিক ঠোঁটে বুলিয়ে আয়নায় নিজকে দেখে নিজেই লজ্জা পেল। ঠিক চিকনী চামেলী। আইটেম নম্বর লাগছে তাকে। লজ্জা কী সেতো নিজের একান্ত আপনজনের কাছে যাচ্ছে। প্রায় পাঁচ মাস জয়ন্ত তার শরীর একজন ভাস্করের মতো গড়ে তুলেছে। আজ তাদের শরীরের পুরোপুরি মিলন হবে। ভয়ও লাগছে তার থেকে আকারে অনেক বড় হচ্ছেন স্যার। মা-বাবা ঘরে নেই, বুয়া নিজের কাজে ব্যস্ত। বোরকা আগেই জোগাড় করে রেখেছিল। মাথায় সিঁদুর লাগিয়েছে সে নিজের ইচ্ছায়। জয়ন্ত হয়তো দেখে খুশি হতে পারেন ভেবে। চার দিকে পূজোর ঢাকের শব্দ। রিকশায় এসে থামল সিনথিয়া, দরজায় টোকা দিতে খুলে গেল দরজা। সামনে জয়ন্তের মা দাঁড়িয়ে। তিনি দরজার কপাট ধরে বললেন— কে?

সিনথিয়া ঘাবড়ে যায়। তাকে মা দেখেছেন তবে বোরকা পরতে দেখেননি। পেছন থেকে জয়ন্ত এসে মাকে সরিয়ে সিনথিয়াকে ভেতরে নিজের রুমে নিয়ে গিয়ে দরজা বন্ধ করে।

-শেষ মুহূর্তে মায়ের শরীর খারাপ করায় গ্রামে যায়নি। তবে চিন্তার কিছু নেই উনি ওনার মতো ওনার রুমে আছেন। আমার কোনো ব্যাপারে নাক গলান না।

এমনিতে জয়ন্ত খুবই ভালোবাসেন মাকে। জয়ন্তের ছোট বোন বাড়িতে না জানিয়ে পালিয়ে বিয়ে করেছে এক মুসলিম সহপাঠীকে। এসবের পর মায়ের একটা স্ট্রোক হয়েছিল। এ যাত্রায় বেঁচে গেছেন, মুখটি একটু বেঁকে গেছে।

সিনথিয়া বোরকা খুলতেই যেন জয়ন্তের মগজে আগুন জ্বলে উঠল। এরকম একটি দৃশ্য সে কতদিন মাথায় পুষে নিয়ে ঘুরেছে। আজ তার সামনে বাস্তব। লাল শাড়ির সঙ্গে মাথায় সিঁদুর বাড়তি আগুনে করে তুলেছে সিনথিয়াকে।

- আঁচলটা বুক থেকে সরিয়ে হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকো। দু’চোখ ভরে দেখি।

- কী করে যে শাড়ি নিজে নিজে পরেছি নিজেই জানি না!

- তাহলে আবার পরবে কী ভাবে?

- শাড়ি পরে ফিরলেতো ধরা খাব। আমাকে কেউ দেখেনি শাড়ি পরে যে এসেছি। ব্যাগে এনেছি সেলওয়ার কামিজ, সেটাই পরে যাব। জয়ন্তের চোখ ভরে না তার সামনে যে আগুনরূপা আম্রপালী সাক্ষাত্ এসে নেমেছে।

ধীরে ধীরে বাঘের মতো পা ফেলে এগিয়ে গিয়ে জয়ন্ত সিনথিয়াকে নিজের বুকে টেনে নিল। এরপর ঘণ্টাখানেক পেরিয়ে গেছে। কখন যে জয়ন্ত মানুষ থেকে জন্তুতে রূপান্তর হয়ে উঠেছে সিনথিয়া টের পায়নি। মাঝে মধ্যে জয়ন্তের মা সিনথিয়ার ব্যথাভরা করুণ চিত্কার শুনে ঘাবড়ে বার বার দরজায় হাত মেরে জানতে চাইলেন— খোকা কীরে চিল্লায় কেন মেয়ে?

- মা, তুমি রান্না ঘরে গিয়ে লুচি ভাজো! মেয়ে অঙ্ক পারছে, তাই বকা দিলে কাঁদছে। ও কিচ্ছু না।

আরো আধ ঘণ্টা পরে শাড়িটা মেঝে থেকে তুলে কোনো প্রকারে জবুুথবু ভাবে জড়িয়ে সামনের চেয়ারে বসল সিনথিয়া, ঘামে বন্যা বইছে সারা শরীরে। ব্যথা করছে সারা শরীর তবে বিশেষ জায়গায় প্রচণ্ড। সিনথিয়ার তুলনায় জয়ন্ত বেশ বড়। তবু সিনথিয়া সেদিন মানসিক জোরে সব সহ্য করেছে।

এবার দরজায় শব্দ হতে জয়ন্ত দরজা খুলল। জয়ন্তের মা গরম লুচি আর চা নিয়ে ঢুকলেন। টেবিলে রেখে বুঝলেন মেয়েটির ওপর ঝড় বয়ে গেছে। দেখলেন ছেলে হাফ প্যান্টে সিঁদুর মেখে একাকার। সিনথিয়া এমন সময় মাকে ঘরে ঢোকানোর কোনো কারণই বুঝল না। অচেতনভাবেই হোক তবে ইচ্ছে করেই কি মাকে ঘরে ঢুকতে দিয়েছে। নিজের মেয়ে পালিয়ে যাওয়ার দুঃখে রাতের পর রাত কান্না কী জয়ন্তের অন্য রকম কিছু প্রভাব ফেলছে!

মা ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে আবার দরজা বন্ধ করে দেয় জয়ন্ত।

লুচি আর চা শেষ করে আবার সিনথিয়াকে কাছে টেনে নিল। সিনথিয়া যেন এক আনন্দপুতুল।

জয়ন্তর মাঝে মাঝে কেন এরকম হয় সে নিজেই বুঝে উঠতে পারে না। তার পিঠাপিঠি ছোট বোন অবন্তী রমজান আলী খান অয়নের সঙ্গে চলে গেছে বাড়ির কাউকে কিছু না বলে। হাজারো চেষ্টায় সে সবটা মেনে নিতে পারেনি। ছোট থেকে একটা মেয়ের বড় হওয়া মানে মাকড়সার জালের মতো পরিবারের সবার সঙ্গে জালে জড়িয়ে যাওয়া। জয়ন্তর অবন্তীর পর আরো এক ভাই আছে একটি বোনও। ছোট বোন শ্রাবন্তী তখন মাত্র ক্লাস সিক্সে পড়ে। তাকে প্রায় জোর করে কলকাতায় পিসির বাড়ি চিরতরে পাঠিয়ে দেয়া হলো। ওখানেই লেখাপড়া শেষ করে বড় হবে। অনেক কেঁদে-কেঁদে এক সময় শ্রাবন্তী শান্ত হয়ে গেছে। যখনি বাড়িতে ও ফোন করেছে দাদ বা মা বার বার হ্যালো কে অবন? কে অবন্তী?

- না মা আমি কলকাতা থেকে শ্রাবণ, শ্রাবন্তী। জয়ন্ত বুঝে আসলে তার দুই বোনকেই হারিয়েছে।

এসবের পর বাইরে থেকে হয়তো জয়ন্ত আগের মতোই আছে এতে ভেতরে হয়তো অনেকটা বদলে গেছে।

জয়ন্তের যে কয়েকজন ছাত্রী ছিল তার মধ্যে সিনথিয়া একেবারে অন্য রকম বাস্তব জগত্ থেকে দূরে এক স্বপ্নে বিভোর সারল্যে ভরা মুখাবয়বের একটি মেয়ে। বাঙালি মেয়ে জন্ম থেকে জাগতিক আর কূটনৈতিক মারপ্যাঁচ নিয়ে জন্মায়। যাতে নিজে বিপদ মুক্ত থেকে অন্যকে বিপদে ঠেলে দেয়া যায়। সিনথিয়া এরকম মেয়ে একেবারে বিপরীত। কোনো মানুষের কষ্ট দেখলে দিশাহারা হয়ে ওঠে, কী করবে না করবে কূল-কিনারা ভেবে পায় না। অন্যের অন্যায়ের জন্যে সে নিজে কষ্ট মাথা পেতে নিত। অনেক বার ঠকার পরও হারায়নি বিশ্বাস মানুষের ওপর থেকে। এই বিশ্বাসের জায়গা জেনে গেছে জয়ন্ত। সিনথিয়ার জীবনের প্রথম পুরুষ সে। সিনথিয়া যে একটি মেয়ে সেটাই তাকে শিখিয়েছে জয়ন্ত। তাই হয়তো জগত সংসারে জয়ন্ত ছাড়া আর কোনো পুরুষ তার চোখে পড়ে না। কত ছেলে সিনথিয়ার আশেপাশে আসে তার গুণমুগ্ধ হয়ে। সে পায়ে ঠেলে দেয়, তার প্রাণেশ্বর তো একজন তাকে সে পেয়ে গেছে। সে ভেতরে ভেতরে জয়ন্তের জন্যে নিজকে তৈরি করে ফেলল। পূজো অর্চনার সব নিয়ম তার জানা। শাঁখের শব্দে তার ভেতরে শিহরণ বয়ে যায়। ছুটে গিয়ে প্রাণ পুরুষটির বুকে ঝাঁপিয়ে পড়তে তার ইচ্ছে করে। নিজেই ঠিক করে ফেলেছিল বৈধ ভাবে হোক বা অবৈধভাবে হোক সে জয়ন্তকেই বিয়ে করবে। সে এমন কী নিজেদের দোতলা বাড়ির ছাদে একটি তুলসী গাছ পর্যন্ত লাগিয়েছিল।

মা দেখে জানতে চেয়েছিলেন এটা কী?

মাকে সে ভালো করে বুঝিয়েছে এ বৃক্ষের গুণাগুণ। মাও সর্দি কাশিতে নিজের ছোট ছেলেকে তুলসী পাতা বেঁটে খাইয়ে ফল পেয়ে খুশি। সিনথিয়া জয়ন্ত ছাড়া অন্য কিছু ভাবতে পারে না বুঝে বড়ই বেপরোয়া হয়ে উঠেছিল। দু’দিন চরম প্রেমে আনন্দের আকাশে তুললে তৃতীয় দিনে অত্যাচারে পাতালে পুঁতে দিত। সিনথিয়া বুঝে উঠতে পারত না কেন এমন করত জয়ন্ত।

জয়ন্তের মা টের পেলেন ছেলের মাথা খারাপ হচ্ছে মনে হয়। এই মেয়ে সেও যদি পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করে। শান্ত হবে না ওর অন্তর। শান্তি পাবে না কেউ! তার ছেলেও মুসলিম বিয়ে করবে এটা তিনি মেনে নিতে পারবেন না।

মা যে এত শীঘ্রই মেয়ে খুঁজে বের করে ফেলবে তার বিয়ের জন্য সে ভাবতে পারেনি।

সিনথিয়ার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল যেন। তার মা বাবাকে কেউ জানিয়েছে সম্ভবত জয়ন্তের সঙ্গে তার এই সম্পর্কের কথা। সিনথিয়ার বাবা-মা তো জয়ন্তের এত বড় বিশ্বাস ভঙ্গে হতভম্ব। রেগে আগুন। জয়ন্তের তার বাসায় আসা চিরতরে বন্ধ। সিনথিয়ারও শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া ছাড়া সব জায়গায় যাওয়া একেবারে বন্ধ।

জয়ন্তের সঙ্গে খুব কষ্টে একবার দেখা করল সিনথিয়া। জয়ন্ত তাকে টেস্ট করার জন্যে জানতে চাইল ঘর ছেড়ে আমার সঙ্গে পালানোর সাহস আছে?

- হ্যাঁ! আমি হাত বাড়িয়ে আছি। তুমি বাড়ালেই ধরে বেরিয়ে যাবে এই লোকটা যে তাকে অত্যাচারও করে মুহূর্তে সব ভুলে গেল সিনথিয়া। সে যেন অন্ধের মতো শুধু জয়ন্তকে চায়। অন্য কিছুতে ভ্রূক্ষেপ নেই তার।

সিনথিয়া তুইতো আমার। এমনি থাকতে পারবি সারা জীবন আমার হয়ে। সিনথিয়া কিছু বলতে পারে না। নীরবে দু’চোখ দিয়ে জলের ধারা বেরিয়ে আসে। মুখে কিছু না বলে শুধু মাথা নাড়ে। সম্মতি জানায়-হ্যাঁ!

- তা হলে মন দিয়ে শোনো আমার কথা। মায়ের জন্যে হয়তো বিয়ে করতে হতে পারে কোনো হিন্দু মেয়েকে। আমার ছোট বোন যেহেতু পালিয়ে বিয়ে করেছে মুসলিম ছেলেকে আমিও তাই করলে হার্ট এ্যাটাক করে মারা যেতে পারে আমার মা। এমনিতে একবার স্ট্রোক অলরেডি হয়ে গেছে। আমি অন্যকে বিয়ে করি তো কী! আমি তোমার! আমার জন্যে তুমি থাকবে অন্য কারো হবে না! পারবে?

- পারব!

বোকা মেয়ে বুঝতেই পারল না কি বলছে। এরকম হয় নাকি, একজন বিয়ে করে বউ নিয়ে বাড়িতে থাকবে। বাইরে তার জন্যে আরেকজন আজীবন অপেক্ষায় থাকবে। যখন ইচ্ছে তাকেও সে পাবে। একটানা তিন রাত ঘুমাতে পারল না সিনথিয়া। তেমন কিছু মুখে দিতেও পারল না। যে দিন জয়ন্ত বউ দেখতে গেল।

জয়ন্তের অত্যাচার যে মাঝে মাঝে বাড়ত বেধড়ক তাকে মেরে বসত। তা বিয়ের জন্যে থামলেও তার নিজের মায়ের অত্যাচার ভীষণ রকম বেড়ে গেল। প্রায় রুমে বাইরে থেকে তালা মেরে বন্দি করে রাখেন তিনি। চুল ধরে টানাটানি চড় কিল যে নিত্যদিনের বরাদ্দ ব্যাপার সিনথিয়ার জন্যে।

এত পাহারাদারির মধ্যেও এক দুপুরে সিনথিয়া ফাঁকি দিয়ে সবাইকে চলে এলো জয়ন্তের বাড়িতে।

গোটা বাড়ির সাজসাজ অবস্থা, লোকজনের ভিড়। কে আসছে, কে যাচ্ছে খবর নেই কারো।

সিনথিয়া দেখল জয়ন্তের রুমের দরজা খোলা। ঢুকতে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। জয়ন্ত সিল্কের পাঞ্জাবি পরে হাতে জামাইসুতো গিটু বেঁধে বন্ধুদের কাউকে ফোন করে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে। বিয়ে অবশ্যই আসার আবদার।

- আর না দোস্ত! সবাইরে নিয়ে আয় না আমার বিয়েতে। আরে হ্যাঁ। বৌভাতের খাওয়ার পর বন্ধুদের মাস্তি পার্টি তো হবেই।

জয়ন্ত কী ফুর্তিতে আছে, হো-হো করে হাসছে! বন্ধুদের আমন্ত্রণ করছে। এ কী আসল জয়ন্ত নাকি নকল? সিনথিয়া হতভম্ব প্রায়। তার দিকে জয়ন্তের চোখ পড়তে আঁতকে কথা ব্রেক করল। ফোন বন্ধ করে বলল অবাক হয়ে।

- এ কী তুমি এখানে এলে কী ভাবে?

সিনথিয়া কী বলবে বুঝে উঠতে পারছিল না। চোখ দিয়ে শুধু মনের কথা জল হয়ে বেরিয়ে আসছে।

- উফ্! একী করেছ তুমি! এখানে কেউ দেখলে তোমাকে জানো তোমার কী অবস্থা করবে। তোমারই ক্ষতি করবে। এত বড় রিস্ক কেন নিচ্ছ?

- তোমার চেয়ে বড় ক্ষতি আর কে করবে জয়ন্ত! চিন্তা কর না এক্ষুণি চলে যাচ্ছি।

- উফ্ এতো করে বুঝিয়ে বললাম শুধু মায়ের জন্যে এ বিয়ে! তুমি রয়েছ অন্তরে।

হাত ধরে প্রায় জোর করে সিনথিয়াকে ঘরের বাইরে নিয়ে এলো জয়ন্ত। আশেপাশে দেখে নিল, কেউ নেই দেখে সিনথিয়ার কপালে চুমু খেল। মুখ তুলে বলল-যাও সিনথিয়া দেরি কর না তোমার বাড়িতে জানলেই টেনশন শুরু হয়ে যাবে।

এখন সকাল হলেও বিয়ের দিন সিনথিয়ার থাকা নিরাপদ মনে করছে না জয়ন্ত।

সিনথিয়া ভূতে পাওয়া এক ঘোরে ফিরে এলো নিজের বাড়িতে। নিজের রুম বন্ধ করে হাঁটুতে মুখ বুজে  হুহু করে কাঁদতে লাগল। ছয়টা বাজে সন্ধ্যা তখন তবু আঁধার নামেনি পুরোপুরি। সে ছাদে উঠল নিজেদের। দূর থেকে উলুধ্বনি শুনতে পেল। জয়ন্ত এখনি হয়তো মন্ত্র পাঠের আর সাতফেরা নেবে। চুপচাপ তুলসী গাছের পাশে সিনথিয়া দাঁড়িয়ে রইল।

আকাশে জলবতী মেঘেরা জমছে। এক অপরিসীম সহ্য ক্ষমতা তার মধ্যে ধীরে ধীরে জন্ম নিচ্ছে। ভাবছে নিজের জীবনের ঘটনার ঘনঘটা কতটাই বা মানুষ নিজে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। নতুন জন্ম নেয়া এই সহ্যক্ষমতা সিনথিয়াকে বাঁচিয়ে রাখল। দাঁড়া করিয়ে রাখল। সেই প্রথম সে বুঝতে পারছিল স্বপ্নের জগতের চেয়ে বাস্তব কতটা অমিল। বাস্তবে মানুষ শুধু নিজের স্বার্থ রক্ষার জন্যে কত রকম মুখোশ পাল্টায়।

সিনথিয়া নিজের কাছে নিজেই শপথ করল বাইরে থেকে নিজকে সে স্বাভাবিক রাখবে। যথারীতি বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবে, ক্লাস করবে। বাপ-মাকে অনেক ঝামেলায় ফেলেছে, আর নয়।

জীবন্ত লাশের মতো সে তাই করে যাচ্ছিল।

মাঝে মধ্যে তখনো জয়ন্তের ফোন তাকে মনে করিয়ে দেয় এই নামের কেউ তার জীবনে প্রবলভাবে ছিল।

এক মাঝ রাতে জয়ন্ত ফোন করে বলল—বউসহ কক্সবাজার এসেছি, মোটেলের বারান্দায় এসে তোমাকে ফোন করলাম। আমি আসছি আর ক’টা দিন। তোমাকে অনেক আদর করব। তুমিতো আমার কথা দিয়েছ তুমি সারা জীবন আমার থাকবে।

সিনথিয়া কিছু বলতে পারল না। কী বলবে সে। কথা থেমে যেতে শুরু হলো সিনথিয়ার চোখ থেকে নীরবে জলের ধারা। মুখ লুকিয়ে আর মানুষ কত দিন থাকতে পারে।

 

৬.

সিনথিয়ার পরিবর্তন তার বন্ধুবান্ধবরা ভালোভাবেই বুঝল। জমীল হোসেন তাপস-এর মতো এত গভীর ভাবে অন্যরা সবাই বুঝল না। গত এক বছর সে সিনথিয়ার প্রতিটি পদক্ষেপ লক্ষ করে আসছে। কখন যে সে মেয়েটির ভাবযোগে ডুবতে-ডুবতে একেবারে তলিয়ে গেছে তার নিজেরই খবর নেই। তার গুরু হরিদা তাহলে ঠিকই বলে ছিলেন। মানুষ হচ্ছে আকাশে ঘুড়ির মতো কখন কার সঙ্গে পেঁচিয়ে যায় কে বলতে পারে। সিনথিয়া সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন—বত্স্য, কিছু একটা আছে ঐ মেয়ের যা অন্যের নেই। যা তোমাকে টানে তাই তুমি ঘুরছ। দাদা হয়তো সত্যি বলছেন। সিনথিয়ার মধ্যে সে কেমন যেন এক আলোর দিকচিহ্ন দেখতে পায়। নিজকে তার সামনে খণ্ড-বিখণ্ড করতে ইচ্ছে করে। ও কোনোভাবেই সাধারণ কোনো মেয়ে নয়। কত জগত্ সুন্দরী তার পেছনে ঘুরল আর আজ সে বছর খানেক ঘুরছে সিনথিয়ার পেছনে। বত্স, জগত্ সুন্দরী ভরা এজগতে! তবে অন্তর সুন্দরী মেলা ভার। হরিদাদার কথা আবার তার মগজে খেলে গেল। চমকে উঠল তাপস। সিনথিয়ার মধ্যে নিশ্চয়ই ওর অন্তর সুতো বাঁধা। তাই টান পড়ে। চোখ বন্ধ করলেই সে দেখতে পায় কালো জলবতী মেঘে ভরা মেয়েটিকে। কী অপূর্ব ভঙ্গিতে ট্রেনের ছাদে দাঁড়িয়ে সাদা ঝকঝকে দাঁতে সবুজ আপেল সে কামড় দেয়। সেই প্রথম দেখা দৃশ্য তাপসের চোখে যেন গ্লু দিয়ে কেউ এঁটে দিয়েছে। আমার তো আলো দরকার, অন্তরের আলো। জগত্ সুন্দরীদের সঙ্গে খেলাতো অনেক হলো। ওদের নিজস্ব কোনো আলো নেই। ওরা জন্মায় এক জড় পদার্থের মতো, শুধু ভোগের সামগ্রী হতে। আলো ছড়িয়ে আলোকিত করার ক্ষমতা তাদের নেই। যে কোনোভাবে একে তার জীবনে নিয়ে আসতে হবে। ওর এই ভয়াবহ অতীত মুছে দেয়া সম্ভব নয়। তবে ঝাপসা করে দেয়া সম্ভব। যেটুকু ভালোবাসার নামে যন্ত্রণা সে জয়ন্তের কাছে পেয়েছে তা ভুলিয়ে সত্যিকার ভালোবাসায় কানায় কানায় তার ভরিয়ে দিতে পারে। সে নিজের কাছে বদ্ধপরিকর সে তাই দেবে সিনথিয়াকে। পাঁচটি দিন পিছু করার পর একদিন সুবর্ণ সুযোগ এলো। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শহরে ফেরার ট্রেন একটুর জন্যে মিস করল সিনথিয়া। প্রায় ফাঁকা প্লাটফর্মের বেঞ্চে সে একা বসে আছে। মুখ নত, চুল উড়ছে বাতাসে।

অনেকটা হেঁটে প্লাটফর্মে শেষ মাথা থেকে দুই কাপ কফি নিয়ে দুরুদুরু বুকে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল সিনথিয়ার দিকে তাপস। মেয়েটির কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই আশেপাশের জগত্ নিয়ে। পাশে কে এসে দাঁড়িয়েছে সে চোখ তুলে তাকাল না পর্যন্ত।

- এই নাও গরম কফি!

চমকে উঠল সিনথিয়া।

- কে?

- সরি আমি তাপস তোমার দু’ক্লাস সিনিয়র।

- ওহ! থাঙ্কয়ু, কফি খাব না।

- প্লিজ না কর না, কফি নাও। গরম কফি ভালো লাগবে। ছেলেটির গলার মধ্যে এমন কিছু ছিল তাই সিনথিয়া ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল পুরোটা, কে এই মাহাত্ম! আসলেই মন শুকিয়ে গেলে যেন শরীরের যত পানিও হয়তো শুকিয়ে যায়। তা না হলে তার ইদানীং খুব পিপাসা পায় কেন? তার আসলেই খুব ইচ্ছে করছিল এক কাপ চা কিংবা গরম কফির। সিনথিয়া হাত বাড়িয়ে কফির কাপটি হাতে নিয়ে বলল।

- আপনাকে তো সবাই চেনে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে হিরো।

খোঁচাটা তাপস গায়ে মাখল না।

- থাঙ্কস্ কফি হাতে নেয়ার জন্যে সিনথিয়া! মুখে দিলে খুশি হব।

- আপনি আমার নামও মনে রেখেছেন! কিছুটা অবাক হয়ে প্রশ্ন করল, কথা আর না বাড়িয়ে সিনথিয়া কফিতে চুমুক দিল।

- হ্যাঁ তোমার নাম মনে রেখেছি। ভেতরে ভেতরে ভাবল আসলে তোমার নামতো আমি সযত্নে মনে তুলে রেখেছি।

- আমার মতোই একটুর জন্যে ট্রেন মিস করেছেন?

- না ঠিক তা নয়। গত পাঁচ দিন তোমাকে ছায়ার মতো ফলো করে আজ একটু কথা বলার সুযোগ পেলাম।

- কী! পাঁচ দিন আমাকে ফলো করছেন? কেন? সিনথিয়ার চমকে যাওয়ায় হাত থেকে কফি ছলকে পড়ল মাটিতে।

- শুধু তোমার নাম নয়, কোথায় থাকো, কেমন আছো। সব জানি। ৩৬/২ ঘাট ফরহাদ বেগ তোমাদের বাড়ি। স্টিলের পাত কেটে ঝালাই করে বানানো সিঁড়ি উঠে গেছে পড়ার রুমে। দোতলায় তোমার থাকার রুম। নিচে থাকেন তোমার মা-বাবা। তোমার বাবা মায়ের নাম ছোট ভাইদের নাম এমন কী কালো বাদুড়ের মতো নিজের ডানা আড়ালে লুকিয়ে রাখা তোমাকে এক মুখোশধারীর নামও জানি।

এবার বেঞ্চে কফির কাপটি রেখে ত্বরিত গতিতে সিনথিয়া উঠে দাঁড়াল। তার হাত কাঁপছে। তার এতবড় বিপর্যয়ের প্রসঙ্গে আজ পর্যন্ত সে কাউকে কিছু বলেনি। বলার মতো কেউ নেইও তার! মা শুধু কটূ কথা শুনিয়েছেন কিল চড় মেরে হাতের সুখ মিটিয়েছেন। কখনো মাথায় হাত বুলিয়ে বলেননি— মা, বল আমাকে বল তোর সব কিছু। আমি তো তোর মা! কেউ তার পাশে আসেনি। সেও কাউকে কিছু বলেনি। পর্বত সমান কষ্ট সে নিজে একা নিয়ে ঘুরছে। কাউকে শেয়ার করেনি এমন কী নিজের কোনো মেয়ে বন্ধুদেরও না! এ জানল কী ভাবে?

- আপনি এসব জানলেন কী ভাবে, কেন? আমার কোনো সহানুভূতির প্রয়োজন নেই।

- গুড এই না বাঘের বাচ্চার মতো কথা। জানো সিনথিয়া গত একটি বছর ধরে তোমাকে আমার ভালো লাগতে শুরু হয়েছে। ধীরে ধীরে আমার ভেতরে তুমি গাছ-গাছালির মতো ডালপালা মেলে বিস্তার করছ। তোমার সব খবর জেনে আমি স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। দেখলাম তুমি অসম প্রেমে ডুবে নয় তলিয়ে গেছ। নিজ থেকে সেখান থেকে উঠে না এলে ফেরানো মুসকিল তোমাকে। তবে ওর বিয়ের পরে তুমি যেভাবে প্রতি মুহূর্তে দ্রুত ভেঙে পড়ছ তা দেখে আর দূরে থাকতে পারলাম না। আবার তোমাকে জীবনে ফিরিয়ে আনতে চাই।

- আমাকে জীবনে ফিরিয়ে আনতে আমার কারো সাহায্য দরকার নেই।

- তোমার হয়তো নেই! আমার হয়তো আছে। একটি বছর তাই তোমার ছায়ার মতো দূরে হলেও লেগে আছি। এটা আমার এক তর্ফা ভালোবাসা সিনথিয়া। আমি পুষে রেখেছি আমার ভেতরে। তোমার হয়তো কিছু আসে যায় না।

- কারো কিছু আমার দরকার নেই। আমি ঘেন্না করি মানুষ।

- ঠিক, এটাই স্বাভাবিক। নিজের হানিমুনে গিয়ে বউকে লুকিয়ে যদি কেউ তার ডাম্প করা প্রেমিকাকে ফোন করে বলে— ভালোবাসি, তাহলে তো জগত্ সংসারের ওপর ঘেন্না হবেই। তখনতো বলতে পারো নাই আমি তোমাকে ঘেন্না করি বেজন্মার পুত!

এবার সিনথিয়া আবার ধপাস করে সিমেন্টের বেঞ্চে বসে পড়ে। মুখ নিচু কর হুহু করে কেঁদে ওঠে। কাঁদতেই থাকে। তাপস ভাবে ট্রেন আসতে এখনো অনেক দেরি কাঁদুক যতটা সম্ভব। যত কাঁদবে ততই বেরিয়ে যাবে ভেতরে জমানো কষ্ট।

বেশ অনেকক্ষণ পর কান্নার বেগ কমলে তাপস তার ব্যাগ থেকে টিসু পেপার বের করে দিল। যখন চোখ মুছছে সিনথিয়ার আচমকা তার অন্য হাত নিজের হাতে নিল তাপস।

- সরি সিনথিয়া। কেঁদে বের করে ছুড়ে ফেল সব কষ্ট। মনে কর জীবন তোমার ভুল করেছ! আবার ঠিকও করবে তুমি! যেহেতু জীবনটি তোমার।

- ঠিক! কিন্তু পারছি না।

- তোমার এত দিনে ভালোবাসা সব দুঃখে রূপান্তিত হয়ে গেছে। এসব স্মৃতিকে যত তাড়াতাড়ি মুছে ফেলবে ততই ভালো।

- আমার সব শেষ হয়ে গেছে।

- মোটেই না! সবে শুরু হয়েছে। সিনথিয়ার হাতে আরো দু’টি টিসু পেপার দিয়ে তাপস হঠাত্ উঠে দাঁড়াল সিনথিয়ার হাত ছেড়ে। তারপর উল্টোমুখো হয়ে হনহন করে হাঁটা দিলো বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাসের দিকে।

সিনথিয়া হতবাক হয়ে বসে ছিল কতক্ষণ কে জানে। ট্রেন এসে দাঁড়াতে তার বোধ ফিরল। ঠিক বুঝে উঠতে পারছিল না কী হচ্ছে এসব তার সঙ্গে। তবে তাপসের একটা কথা তার ভালো লেগেছিল। তার এরকম অবস্থায় একজন দরকার যাকে সব কিছু বলতে পারে। হাতের টিসু পেপারে নজর যেতে সিনথিয়া দেখল একটা মোবাইল নম্বর লেখা। ফেলতে গিয়েও সিনথিয়া কেন যেন তার ব্যাগে ঢুকিয়ে রাখল টিসুটি। তিনদিন পর আবার তাদের দেখা হলো। বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেনে। পাশাপাশি সিটে বসল তারা। এর মধ্যে সিনথিয়ার মনে হয়নি ফোন করার ব্যাপারে তার মানসিক অবস্থাও সে রকম নেই।

- আগে থেকেই কি আজো ফলো করছিলেন কোন বগীতে উঠব জানতে?

- না আজ কাকতালীয়ভাবে একই বগীতে উঠে পড়েছি। তোমার পাশের সিট খালি ছিল বলে বসে পড়লাম। নম্বর দিলাম তারপরও ফোন করনি, তাহলে আর আগে জানব কীভাবে তুমি আসছো। এ সে ফ চলার পথে দেখা হওয়া।

- ফোন করিনি যেহেতু আমার বলার কিছু নেই।

- ঠিক, বলার কিছু না থাকলে কেন ফোন করবে।

আবার দু’জন অনেকক্ষণ চুপচাপ। ট্রেন বিশ্ববিদ্যালয় স্টপে এসে থামছে সবাই উঠে দাঁড়াচ্ছে, নামবে বলে তাপসও উঠে দাঁড়াল তারপর তখনো বসে থাকা সিনথিয়াকে বলল—ঐ ব্যাটার প্রেমহীন পুতুল ছিলে তুমি এর জন্যে এত দুঃখ ভালো না!

দ্রুত নেমে গেল তাপস। সিনথিয়া রাগে লাফিয়ে উঠেছিল। না পালালে রাগে সে কলার চেপে ধরতো, এত সাহস পায় কোত্থেকে, সবাই নেমে যাচ্ছে, সিনথিয়া বসে থাকল, রাগটা কমুক ধীরে সুস্থে নামবে।

বাইরে থেকে ট্রেনের জানালার কাছে এসে তাপস হাল্কা উচ্চ গলায় বলল—সরি সিনথিয়া। জানি ভীষণ রেগে আছো। ইচ্ছে করে তোমার মগজে হাল্কা ধাক্কা দিলাম। এটাও এক ধরনের থেরাপি মনে কর।

ফেরার সময় রেলস্টেশন থেকে রিকশায় বাসার দিকে যেতে যেতে ভেব  ব্যাপারটা।

এরপর ক্লাস করল দু’টো তবে কি পড়ালেন স্যার মাথায় ঢুকল না। মাথার ভেতরে যেন একঝাঁক মৌমাছি ঢুকে পড়েছে। সারাক্ষণ ভোঁ ভোঁ করছে। বিশেষ করে একটা শব্দ যেন হুল ফোটাচ্ছে। ইচ্ছে পুতুল। ছুটির পর ট্রেনে ফেরার সময় তাপসের ওপর রাগটা কমে গেছে। আবার কেন যেন কান্না পাচ্ছে। রিকশা নিয়ে বাসায় যাওয়ার পথে ঝিরঝির বৃষ্টি এলো। রিকশাওয়ালা প্লাস্টিকের পর্দা টেনে দিল। ঘেরাটোপে সিনথিয়া একা, রিকশা দুলে দুলে চলছে। বেশি দূর যেন ভাবতে কষ্ট হচ্ছে। নিজকে খুব কাছে থেকে দেখার সুযোগ হলো।

অন্যের ইচ্ছেপুতুল হবার তার আর ইচ্ছে নেই। তিন বছর সে যেন অন্য কারো অ্যাকুরিয়ামে মাছ হয়ে ছিল। তাকে এখন বুঝি দেয়ার সময় এসেছে যে সে একজন মানুষ। মাছ নয়। লোকে তাকে ইচ্ছা পুতুল বলবে আর তা সে শুনতে হবে আসরে আসা অতিথিদের। একটা শব্দ এতটা ধাক্কা দেবে ভাবেনি সিনথিয়া।

সে এক ধরনের শাস্তি অনুভব করছে। একান্ত নিজের ভেতরের শক্তি তাপসকে তার ধন্যবাদ দিতে ইচ্ছে করল। আসলে হয়তো কেউ একজন এমন দরকার যে দুমড়ে-মুচড়ে বের করে আনবে তাকে এই কষ্টের সময় থেকে।

ঠিকই আরো দুই দিন পর সিনথিয়া ফোন করে ধন্যবাদ জানায় তাপসকে।

তাপসতো অবাক কীসের এ ধন্যবাদ।

-কীসের ধন্যবাদ তা জানার কী খুব দরকার আছে। আপনার যে কোনো ব্যাপারে আমি উপকৃত হয়েছি, তাই এই ধন্যবাদ।

- আমিতো ভাবলাম, আমাকে একসেপ্ট করছো বলেই এ ফোন।

- কিসের এক্সেপ্ট বুঝলাম না!

- মোটকার সঙ্গে একটা সম্পর্ক ছিল বটে তাই বলে এতটা মোটা মাথার মেয়েতো তুমি নও সিনথিয়া। আমি তোমাকে প্রপোজ করেছিলাম। বলেছিলেম গত এক বছর ধরে তোমার তীব্র টান আমাকে টেনে বেড়াচ্ছে।

- ও হ্যাঁ। বলেছিলেন। তবে সরি বলা ছাড়া আজ কিছু নেই আমার কাছে। বিশ্বাস উঠে গেছে মানুষের ওপর।

- বিশ্বাস তো তৈরি হয় ভাঙার জন্যে। যাতে নতুন বিশ্বাসে আবার বিশ্বাসী হয় মানুষ।

ক্রমাগত তাপসের আলাপ প্রলেপের মতো ধুয়ে দিচ্ছে সিনথিয়ার জমে থাকা কষ্ট। ভেতরে জমে থাকা কষ্টের বাষ্প বেরিয়ে যাওয়ার বড় ফাটল তৈরি না হলেও একটা ছিদ্র হয়েছে। সিনথিয়ার জীবনে ঢুকছে আবার আলোকণা ফাঁকফোকর দিয়ে।

রাতে যখন সিনথিয়ার খুব খারাপ সময় তখনি ফোনে কথা বলা অভ্যাস হয়ে উঠল তাপসের সঙ্গে। বেশ রিলিফ পেত। বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় এক সঙ্গে যাওয়া শুরু হলো। ক্লাসের ফাঁকেও দেখা হতে লাগল দু’জনই দুপুরের ট্রেন ইচ্ছে করে মিস করে সন্ধ্যার ট্রেনে ফিরতে লাগল। মাঝে মধ্যে তাপস জেদ ধরে বসত—সিনথিয়া তুমি এখনো আমার প্রপোজাল এক্সেপ্ট করনি।

- এক্সেপ্ট আবার কী আছে। সারাদিনতো আমরা কথা বলি, গল্প করি, দেখা হয়! তোমার এই আন্তরিক ভাবে বাড়ানো হাত না পেলেতো আবার জীবনের দিকে ফিরে আসতে পারতাম না।

- বুঝলাম সবই! তবে আমি তোমাকে আমার একান্ত আপন করে পেতে চাই। তুমি হ্যাঁ বা না বলবে তো একটা!

- উফ, এটার ওপর এতো জোর দিচ্ছ কেন! আমার ভয় যায়নি এখনো।

- আরো কাছে একান্ত নিজের করে নিলেই তো ভয় পালাবে।

- আমার দ্বিধা তো আমার মধ্যেই জন্মায়। কী করব বলো। তুমি তো ক্যাম্পাসের সুন্দর মানুষ। কত সুন্দরী তোমাকে চায়। কেন তুমি সময় নষ্ট করছ আমার জন্যে!

- একটা উত্তর আমার মন চায় তোমাকে সিনথিয়া।

তাপস আর সিনথিয়া পাশাপাশি বসে আছে ট্রেনে। ট্রেন ছুটছে শহরের দিকে। তাপস মুখ ঘুরিয়ে জানালা দিয়ে দ্রুত সরে যাওয়া বাইরেটা দেখতে লাগল।

পাঁচ সাত মিনিট চুপচাপ সব। এক সময় সিনথিয়া ধীরে ধীরে তাপসের হাত নিজের হাতে নিল। মুখে বলল— সরি! তোমাকে হার্ট করতে আমি কিছু বলিনি। আমি আমার সঙ্গেই খুব বিরক্ত তাই অন্য কারো বিষয় ভাবতে পারি না।

- এজন্যেইতো বলি সিনথিয়া, একবার মনেপ্রাণে আবার যদি মেনে নাও দেখবে শান্তি পাবে। দ্বিধা থেকে মুক্তি মিলবে।

সিনথিয়া মনে মনে ভাবল মানুষ কি চাইলে ইচ্ছেমতো আপন করে নিতে পারে কাউকে। কে জানে। তবে যতটুকু তাপসের সঙ্গে এসেছে তাকেও হারাতে চায় না সিনথিয়া।

আরো চারদিন পর সায়েন্স ফ্যাকাল্টি ক্যান্টিনের পেছনে পাতাহীন বড় গাছটির নিচে সিনথিয়া তাপসকে খুশি করতেই যেন বললে।

- ঠিক আছে তোমার প্রপোজ একসেপ্ট করলাম। তাপস আবেগে সিনথিয়াকে দুই হাতে জড়িয়ে ধরল।

- আরে কর কী! চারপাশে দেখ কত ছেলেপেলে।

মনে মনে সিনথিয়া ভাবল তাপস মুখে বললাম ঠিক যেহেতু তোমাকে কষ্ট দিতে চাই না। তুমি এমন একটা সময় আমার দিকে হাত বাড়িয়েছ যে তোমার হাত ধরে হয়তো আমার পতন আটকে যাবে। তাপস তোমাকে ভালো লাগে তবে এখনি হ্যাঁ বলার মত দ্বিধা কেটে মন তৈরি ছিল না।

- ছাড়ো স্যার আসছেন।

তাপস পড়ি কী মরি করে সিনথিয়ার তিন হাত দূরে সরে গেল। সিনথিয়া অনেক দিন পর আবার বালিকার মতো খিলখিল করে হেসে উঠল। তার সুন্দর দাঁতে শেষ বিকালের রোদ স্পার্কেল তৈরি করছে।

- ধ্যাত্ কই স্যার! তাপস বুঝল সিনথিয়া দুষ্টুমি করল। তবু সে প্রাণ খুলে হাসল এটাই ভালো লাগছে।

তাপস প্রায় সিনথিয়াকে বলছে —এখন ভীষণ শান্তি লাগছে। এত দিন মন বলছে তুমি আমার।

সিনথিয়া বোঝে এত কথা বলার মানে। বালিকা বয়সে বুঝত না এখন বোঝে। পরের বৃহস্পতিবার একটা মাত্র ক্লাশ ছিল। তারা তা বাদ দিল। বাসস্ট্যান্ডে এসে রাঙ্গামাটির বাস ধরল। সন্ধ্যার পর পর ফিরে আসবে। ঘরে সবাই ভাববে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিরছে আর একটু দেরি হয়ে গেলেও অসুবিধা কী! জয়ন্তর বিয়ে হয়ে গেছে শোনার পর সিনথিয়ার মাও অনেকটা শান্ত হয়েছেন। রাস্তা ফাঁকা থাকায় ওরা খুব দ্রুত রাঙ্গামাটি চলে এলো। তাপসের পরিচিত হোটেলটির অর্ধেকটাই লেকের জলে কাঠের মস্ত গুঁড়ি পুঁতে দাঁড় করানো। বেশ ক’টা রুমের কাঠের ফ্লোরের নিচে ছলাত্ ছলাত্ জলের ঢেউ খেলে বেড়ায়। রুম থেকে বেরুলে ছোট্ট বারান্দা লেকমুখী। দূর দূরান্ত যতটুকু দেখা যায় জলরাশির ওপর দিনে সূর্যের আলো রাতে চাদের ঝিলিক খেলে বেড়ায়।

হোটেলটি তাপসের বন্ধু সিপারের বাবার। ম্যানেজারের সঙ্গে খুব খাতির তাপসের। গোপনীয়তা রক্ষা করতে ওস্তাদ এই ম্যানেজার। কষ্টে আসো এবং নো চিন্তা দু ফুর্তি করে বেরিয়ে যাও। গত ছয় মাসে একবারও আসেনি এদিকে তাপস। গুরু ভাই দাদা হরি যখনি প্রমাণ করে দিলেন তার ভাবযোগ হয়েছে তারপর থেকে সব ক্ষান্ত। শুধু যার কথা ভেবেছে এত দিন আজ তাকে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে। এবার সিপারকে বলতে হয়নি ম্যানেজারই তার জন্যে লেক সাইড রুম রেখেছে। সিনথিয়ার জন্যে একেবারে নতুন পরিবেশ। মুগ্ধ চোখে অপলক তাকিয়ে দেখছে অপরূপ এই পাহাড় আর লেকের সম্মিলন। পাহাড় সাগর বৃষ্টি সিনথিয়ার ভীষণ প্রিয়। ছোটবেলায় পরিবারের সবার সঙ্গে পতেঙ্গা বীচে বেড়াতে গিয়েছে তারা। মাসহ অনেক কাজিন দুই ভ্যান ভর্তি মানুষ। হই হই করতে করতে সবাই গাড়িতে ফিরে আসতে মা চিত্কার করে উঠলেন—এই সিন্থী কই? সিনথিয়া ইচ্ছে করে সবার সঙ্গে গাড়িতে ওঠেনি। চুপচাপ একটা পাথরের ওপর বসে সাগরের সঙ্গে কথা বলছিল। ক্লাস ফোরে পড়া মেয়ের কাছে কে আশা করবে এরকম আচরণ।

সিনথিয়ার শরীরের সঙ্গে শরীর মেখে তাপস পেছনে এসে দাঁড়াল।

- আহ্! দারুণ জায়গা ঠিক আমার মনের মতো।

- আমারও ভালো লাগে খুবই নিরাপদ। প্রায় আসতাম। থুক্কো, কী বলে ফেললাম মানে অনেক আগে আসতাম আর কী! সিনথিয়া চোখ বড় করে তাকাল তাপসের দিকে।

-লজ্জার কী! আসতে, আমি তো কিছু জিজ্ঞেস করিনি। এ রকম সুন্দর জায়গায় আসাটাই তো স্বাভাবিক। এই বারান্দায় দাঁড়ালে দূর-দূরান্তেও কোনো মানুষজন দেখা যায় না। দূরে শুধু মাঝে মধ্যে দুই-একটি ইঞ্জিন চালিত বোট ভটভট করে চলে যাচ্ছে।

তাপস ভেতরে ভেতরে সত্যি লজ্জা পেয়েছে। পুরোটা বছর ধরে যে মেয়েটির কথা ভেবেছে আজ তাকে কাছে পেয়ে মুখ দিয়ে তার এসব কী বেরিয়ে যাচ্ছে!

এগিয়ে এসে সিনথিয়াকে জড়িয়ে বুকে টেনে নিল তাপস। সিনথিয়া একবার মাথা ঘুরিয়ে চার দিক দেখে নিল বিশ্বচরাচরে কেউ নেই। তাপস ক্রমশ আরো শক্ত করে টেনে লেপ্টে ফেলছে। সিনথিয়াকে নিজের বুকের সঙ্গে। সরি সিন্থী, আমি ঠিক বোঝাতে পারব না কতটুকু ভালোবাসি তোমাকে। সিনথিয়ার সেই চমত্কার মুহূর্তে বিশ্বাস হলো তাপসের কথা। তাপসের ঠোঁট নেমে এলো সিনথিয়ার ঠোঁটে। নিঃশব্দে দীর্ঘক্ষণ দু’জন পরস্পরকে জড়িয়ে থাকল। দ্বিতীয় তৃতীয় চুমুর সময়সীমা দীর্ঘায়িত হতে লাগল। দু’জনেরই শ্বাস-প্রশ্বাসের লয় দ্রুত হচ্ছে। ঠোঁট থেকে ঠোঁট সরিয়ে তাপস বলল—চলো ভেতরে যাই। ভেতরে গিয়ে বিছানায় ধপাস করে কাটা গাছের মতো পড়ল দুইজন।

- দরজা বন্ধ কর।

- খোলা থাকলেও কেউ আসবে না, কেউ দেখবে না।

- না বন্ধ কর।

তাপস উঠে গিয়ে দরজা বন্ধ করে বিছানায় ফিরে এলো। সিনথিয়া মাথার পেছনে হাত দিয়ে শুয়ে আছে। মাথার পেছনে হাত দেয়ায় তার বুকের অপূর্ব গড়ন ভীষণ ভাবে বেরিয়ে এসেছে। নীল আকাশ ও সাদা মেঘের সঙ্গে ট্রেনের ছাদে যেদিন প্রথম দেখেছিল সেদিন মোহিত হয়েছিল। শরীরের এই অপূর্ব গঠনে।

তাপস পাশে শুয়ে সিনথিয়ার নরম বুকে মাথা রাখল। সিনথিয়া তাপসের মাথাটি আদর করে ঠাঁই দিচ্ছে আরো চেপে রেখে। পাতলা কামিজ আর ব্রার ওপর থেকেই মুখ রাখল সিনথিয়ার নিপলে। হঠাত্ কারেন্টের শক পাওয়ার মতো লাফিয়ে উঠল সিনথিয়া। ছাড় হারামির বাচ্চা আমি তোকে ঘৃণা করি! রাগে দুঃখে বেঁকে যাচ্ছে সিনথিয়ার শরীর। একসময় বিছানায় উঠে বসে হাঁটুতে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করল। তাপস বুঝল সিনথিয়া এখনো জয়ন্তের ট্রমা থেকে বের হতে পারেনি।

তাপস ইচ্ছে করে সিনথিয়াকে সামলাতে এগোয় না। যতই ভেতরে জমে থাকা ক্ষোভ বেরিয়ে যাবে ততই ভালো। শুধু ওর মাথা নিজের আঙুল দিয়ে বিলি কেটে দেয় তাপস।

অনেক সময় পার হয়ে গেছে, ফিরতে হবে চট্টগ্রাম শহরে। সিনথিয়া থেমেছে তাপস তার পিঠে হাত রেখে বলল—ইটস্ অল রাইট। নাও ইউ ওকে? ঐ জন্তুর ট্রমা থেকে সিনথিয়া তোমাকে বেরিয়ে আসতেই হবে। অন্যের জন্যে নিজের সুন্দর সময় নষ্ট করার মানে হয় না।

দু’জনই রেডি হয়ে বের হওয়ার আগে সিনথিয়া তাপসের কাছে এসে দাঁড়ায়। তারপর তাকে নিজের কাছে টেনে নিয়ে বলে—ডোন্ট ওয়ারী বেবী আই এ্যাম অলওয়েজ উইথ ইউ।

 

৭.

জয়ন্ত যেমন দুইয়ে দুইয়ে চার হবে ভেবেছিল তা হয়নি। বিয়ের পর সে প্রায় দূরেই ছিল সিনথিয়ার। মজে ছিল সুন্দরী নতুন বউ অপর্ণার সঙ্গে। শুধু সে মজে থাকলেতো হবে না অপর্ণা যেন এক কাঠের পুতুল। ধীরে ধীরে জয়ন্ত বুঝতে পারল মানুষের প্রতি তীব্র টান থাকলে যেমন তার প্রতি সিনথিয়ার ছিল, সম্পর্কটা কী রকম হয়। অপর্ণার আচরণ তাকে যেন আরো ঠেলে দিচ্ছে সিনথিয়ার সঙ্গে চমত্কার সময়ের দিকে। এমন কী নিজের বউয়ের সঙ্গে মিলনেও যদি অপর্ণা একটা মৃত লাশ হয়ে থাকে তাহলে আর জীবনে থাকে কী? জয়ন্ত ভীষণ মিস করতে লাগল সিনথিয়াকে, ভাবল তার জন্যেতো সিনথিয়া অপেক্ষায় আছেই! প্রায় ফোন করে এখন সে পায় না সিনথিয়াকে। ও কিছু না, অভিমান হবে হয়তো। সামনে গিয়ে দাঁড়ালে সব ঠিক হয়ে যাবে। দ্রুত অবস্থা আরো বিগড়ে গেল। অপর্ণা বাবার বাড়ি যাচ্ছে বলে বেরিয়ে হাওয়া। বাতাসে যেন মিলিয়ে গেছে। থানা-পুলিশ করার পর জানা গেল বাবা জোর করে বিয়ে দিয়েছেন তার। সে ছোটবেলা থেকে ভালোবাসে বজ নাথশীল বলে এক ছেলেকে। ছেলে মেধাবী, শিক্ষিত আধা বিদেশি কোম্পানিতে ইঞ্জিনিয়ারের চাকরি করে। তবে তাদের পৈতৃক কাজ ছিল সেলুন চালানোর। বাবার সেলুনে বজ ও ছোটবেলায় কাজ করেছে। এর জন্যে এখন সে লজ্জা বোধ করে না। তবে মুস্কিলটা হলো তার দীর্ঘদিনের প্রেমিকা অপর্ণাকে নিয়ে। তার বাবা নিজে মেয়েকে মেরে ফেলবেন তাও এক ছোট জাতের ছেলের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে নিজের চৌদ্দপুরুষের বংশ কালো করবেন না। ব্রজ অপর্ণার আইনি সাহায্য নিল, দুইজনই প্রাপ্ত বয়স্ক, পরস্পরকে ভীষণ রকম চায়। জোর করে বিয়ে দিলেই কী তা আটকানো যায়। ডিভোর্স দিতে বাধ্য হলো জয়ন্ত।

এসবের কিছুদিন পর ঝড়ের পর যেমন প্রকৃতি স্বাভাবিক হয় তেমনি অবস্থা হতেই আবার জয়ন্তের সিনথিয়ার শরীরের নেশা তীব্র হলো। তার প্রতি উদাসীনতা দেখে খবর নিতে গিয়ে তো আকাশ থেকে পড়ল। এই মেয়ে যাকে সে অজগরের মতো প্যাঁচিয়ে রেখেছে। তার সাহস কীভাবে হলো নতুন প্রেমিক জোটাতে।

সিনথিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে হাতে-নাতে ধরে সিনক্রিয়েট করতে চাইল। উল্টো নিজেই সিনথিয়া আর তাপসের বন্ধুদের হাতে মার খেতে-খেতে কোনো ভাবে বেঁচে পালিয়ে আসল।

রাগে সে বাঘের মতো গর্জন করছে তার অন্তর। তবে সে কি করতে পারে। এত সাহস মেয়েটির হলো কী ভাবে সে ভেবেই পাচ্ছে না। পথে একা একবার সিনথিয়াকে পেয়ে প্রায় জোর করে রিকশায় তুলে বাসায় নিয়ে আসতে চেয়েছিল। সিনথিয়া সম্ভোগে সে পাগলপ্রায়। যে মেয়ে তার কথায় উঠত বসত সে পথে সবার সামনে তাকে চড় মেরে হন হন করে হেঁটে চলে গেল। রাগে ক্ষোভে পাগলপ্রায় জয়ন্ত। তার কাছে সিনথিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে তোলা ছবি আছে ওর লেখা প্রেম মাখা চিঠি আছে, এ সবই এখন তার অস্ত্র। দেখি এবার মাগী কী ভাবে বাঁচে।

সরাসরি তাপসকে সে ফোন করে ভয় দেখাল। বলল— দূরে সরে যা! ঐ মেয়েটি আমার। কথা না শুনলে এমন সব কথা বলব যে তোর ওকে প্রেম করার সাধ মিটে যাবে।

- যা আপনি বলবেন ভ্রাতে তা আগেই সিনথিয়া আমাকে বলেছে। আমি তাকে সে জঘন্য দিনের স্মৃতি থেকে বের করে সত্যিকার ভালোবাসা দিতে চাই।

- চোপ রোমিওর বাচ্চা। তুই হাওয়া হয়ে যাবি। চিনোস না আমার কানেকশন।

- ওকে জয়ন্ত দাদা, তবে শুরু করে দেন কাজ, আমার হাওয়ায় ভাসতে ভালো লাগে। তাপস হাসছে দেখে জ্বলেপুড়ে ফোন কেটে দিল জয়ন্ত।

প্রথমে সিনথিয়ার বাবার কাছে উড়ো চিঠি এলো মেয়ের অজানা কত কথা জানিয়ে। বাবার পুলিশ কানেকশন ভালো পুলিশ খুঁজে ধরে এক রাত হাজতে ভরে ভালোই ধোলাই দিল জয়ন্তকে। ছাড়া পেয়ে সে আন্ডার গ্রাউন্ডে চলে গেল। তবে সিনথিয়ার দেশি বিদেশি সব আত্মীয়-স্বজনদের কাছে বাণী পাঠাতে লাগল।

সিনথিয়ার বাবা বিজনেসম্যান, শহরে বেশ ক’টা বাড়ি আছে। বউয়ের পরামর্শে কানাডায় ইনভেস্টর ইমিগ্রেশন এ্যাপলাই করে ছিলেন। বছর খানেকের মধ্যেই তা হয়ে যাবে ভাবেননি। এক অর্থে তিনি খুশি হলেন। পরিবার কানাডায় থাকলেই ভালো। ছোট ছেলে দু’টোর পড়াশোনা নিয়েও চিন্তা থাকবে না। সিনথিয়ার মা তো এক পায়ে খাড়া কানাডায় থাকতে।

সিনথিয়ার নতুন ঠিকানা হলো মন্ট্রিয়ল শহর। বাবা একটা ছোট্ট বাড়ি কিনলেন বাঙালি এলাকা পার্ক এভিনিউর কাছেই। সিনথিয়ার ঘনিষ্ঠতা যেন দূরে আসায় আরো ঘন হলো তাপসের সঙ্গে। ভিডিও কলের যুগে রাতকে রাত তারা পার করতে লাগল চ্যাট করে। সিনথিয়া অনুরোধ করল। তাপসকে স্কলার্শিপ হোক যে ভাবে হোক কয়েক বছর লন্ডনে গিয়ে মাস্টার্স শেষ করতে। বাবা মাকে অনেক কষ্ট দিয়েছে সে। এবার পছন্দের পাত্রের মধ্যে যেন শিক্ষায় দীক্ষায় কোনো কমতি না থাকে।

তাপসও কথা রাখল সিনথিয়ার দেশ ছেড়ে যাওয়ার ছয় মাসের মধ্যে আধা স্কলার্শিপ আধা বাপের টাকা দিয়ে লন্ডন পড়তে চলে এসেছিল। তিন বছর থাকতে হবে লন্ডনে। সিনথিয়া বলল, এত আরো আমার কাছে চলে এলে, এই পারে আমি আর ঐ পারে তুমি মাঝখানে শুধু আটলান্টিক মহাসাগর বয়ে যায়।

 

৮.

এতো ঘুম, ঘুমেরা সব কোথায় ছিল, কে জানে। সাবের এয়ারপোর্ট থেকে ব্যর্থভাবে ফিরে এলো। সিনথিয়া আসবে সব কথা ঠিক কিন্তু সে এলো না। ফিরে এসেই সে সন্ধ্যা থেকে সারা রাত ঘুমিয়ে কাটিয়েছে। খিদে পেয়েছে নাস্তা করতে হবে। বৈশাখের প্রথম দিন বাইরে আলো ফুটে গেছে অনেক আগে। ফ্রিজে ডিম আছে রেডিমেইড পরাটা আছে। আজ আর বেরুবে না সে। দু’দিন আগে গুলশান ওযেয়ার হাউজ থেকে এক বোতল টাটকা ম্যাক্সিকান ড্রিঙ্কস এনে ছিল, সঙ্গে ছোট্ট দুইটি শর্ট গ্লাস। হাতের উল্টো পিঠে লবণ মেখে জিব দিয়ে চেটে নিয়ে এক ঘোটে টাটকা গিলতে হয়। মুখে ফেলে লেবুর কাটা ফালি চুষতে হয়। সিনথিয়া তাকে বলেছিল মন্ট্রিয়লের একবারে সে টাকিলা পানের পর মুগ্ধ। এখন এটাই তার প্রিয় ড্রিংকস্। গত রাতে লবণ, লেবু শর্ট গ্লাস ছাড়াই মুখে ঢেলে টাকিলা অর্ধেক বোতল শেষ করেছে। তাই হয়তো এই মরা ঘুম। অর্ধেক বোতল রয়েছে সেটাও শেষ করে দেবে, যার জন্যে আয়োজন সে না এলে রেখে লাভ কি!

ঠিক তখনি মোবাইল পিপপিপ করে উঠল। সাবের দেখল রাতে চার্জ দেয়নি চার্জ শেষ হয়ে আসছে। এসএমএস খুলতে দেখে কবি নির্মলেন্দু গুণ শুভ নববর্ষ জানিয়েছেন। গুণ তার প্রিয় মানুষ সত্তর দশকে আজিমপুরে একই ঘরে থাকত সাবের। ইদানীং গুণ দা প্রায় রবি ঠাকুরে বদলে যাচ্ছেন, তেমনি লম্বা দাড়ি গোঁফ, লম্বা চুল। শুধু সামনের চুল হাল্কা হয়ে এসেছে। সাবের যখন গুণদার সঙ্গে ছিল তখনই তিনি অস্ট্রেলিয়া থেকে আসা মৈত্র রায়ের প্রেমে গভীর ভাবে পড়ে ছিলেন। তখন সে দেখেছে প্রেম কবিদের কী রকম কাতর করে দেয়। ঢাকা থেকে ইন্ডিয়া হয়ে মৈত্রী ইটালি গেল। সেখানে কীটসের কবরে ফোটা গোলাপের শুকনো পাঁপড়ি পাঠাল গুণ দাকে। গুণ দা মানসিক ভাবে তৈরি সহসা তিনি চিরতরে অস্ট্রেলিয়া চলে যাচ্ছেন। প্রায় জিজ্ঞেস করতেন সেখানে পায়জামা পাঞ্জাবি চলবে কী না! নাকি সুট বানাতে হবে।

মাত্র পাঁচ মাসের মধ্যে অস্ট্রেলিয়া ফিরে মৈত্রী রায় গুণদাকে সরি জানিয়ে লিখেছিল তুমি শুধু ভালো কবি নও একজন ভীষণ প্রেমিক মানুষও। তোমার সঙ্গে ঢাকায় সময় খুবই আনন্দায়ক ছিল। ইদানীং ফিরে এসে হঠাত্ এক পাঞ্জাবি মুন্ডার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ আলাপ হয়েছে। খুব ভালো লাগছে তাকে। তোমার সঙ্গে সময় আমিও ভুলব না। গুণদার সঙ্গে সাবেরও তখন কেঁদেছিল। গুণ দা ঢাকা ছেড়ে নেত্রকোনা চলে গিয়েছিলেন বলে গিয়েছিলেন আর ঢাকা ফিরবেন না।

মেয়েরা কেন এমন করে কে জানে। সিনথিয়া যদি বলত আমি একরাত লন্ডনে তার প্রেমিক তাপসের সঙ্গে থেকে পরদিন আসবে তাতে সে কি করতে পারত। পরের দিন এয়ারপোর্টে গিয়ে অপেক্ষা করত। বিশেষ ভাবে এয়ারপোর্টের ঢোকার পাশ নেয়া, টেনশনে রাত জেগে ভোর রাতে গিয়ে দাঁড়ানো কোনো কিছুর দরকার ছিল না।

ফোনটা বন্ধ করে দিতে হাতে নিতে বেজে উঠল।

- সরি সাবের, তোমাকে জানানোর সুযোগ পাইনি, লন্ডনে ফ্লাইট মিস করেছিলাম। আজ এই পহেলা বৈশাখ খুব ভোরে এসে নেমেছি ঢাকায়। ঢাকা কি সুন্দর সেজেছে। তোপখানা রোডে চাচীর বাসায় উঠেছি। তিন রাত ভালো ভাবে ঘুমাইনি তবু আর এখন ঘুমাব না। রমনা বটমূল ঘুরে মঙ্গল শোভাযাত্রা ধরতে হয়তো পারব না! তবে অনেকক্ষণ চারুকলায় থাকব, যারা দেখা করতে চায় ওখানেই আসতে বলেছি।

তুমি এখন কোথায় সাবের? আসতে পারবে তোপখানা রোডে। তারপর এক সঙ্গে বেরুব।

সাবের প্রায় হতবাক হয়ে বসে ছিল। এমন কি ফোনে সিনথিয়াকে উত্তর দিতেও তার মুখ খুলছিল না। আচমকা সে হুঁশে এলো, একবার যদি ফোন কেটে যায় তাহলে আজ গেল সিনথিয়া, আজ তাকে পাওয়া মুস্কিল হবে। তোপখানা চাচীর বাসার নম্বর জানা দরকার আগে।—হ্যাঁ সিনথিয়া যেখানে বলবে আমি উড়ে চলে আসব! সাবেরের ভয় লাগছিল ফোনটা কেটে গেল কী না!

আবার সিনথিয়ার কথা শুনে আশ্বস্ত হলো। তুমি ঢাকায় তাহলে এসে পড়েছ বিশ্বাস হচ্ছে না।

- হ্যাঁ গতকালের জায়গায় আজ ভোরে নেমেছি ঢাকায়। তারপর সোজা চাচীর গাড়িতে ওদের বাসায়। গোসল-টোসল করে বেরুনোর জন্যে রেডি। তুমি কী আসতে পারবে?

- হ্যাঁ পারব! পারব মানে, দিনের পর দিন, রাতের পর রাত তো বসে অপেক্ষা করছি এই আসার জন্যে। আমি আসছি! পাখির মতো উড়ে আসছি। না আসা পর্যন্ত বেরিয়ে যেওনা।

- ঠিক আছে।

হঠাত্ যেন সাবেরের মনে-প্রাণে ঘূর্ণিঝড় উঠল। গোসল করার সময় নেই শুধু সেভ করে সাদা খদ্দরের পাঞ্জাবি পরে নিয়ে দ্রুত ডিম পোজ আর পাউরুটি সেঁকে কোনোমতে গিলে ফেল্লো। তারপর কাঁটাবন পর্যন্ত হেঁটে এসে বুঝল সিনথিয়াকে উড়ে আসছে বলা ঠিক হয়নি। শাহবাগ হয়ে প্রেসক্লাব পর্যন্ত পথে মানুষের ঢল, আজ পহেলা বৈশাখের ভোর এমনইতো হবে। কোনো রিকশা-সিএনজি এই মানুষ সমুদ্রে কীভাবে চলবে। এখন ঘাবড়ালে চলবে না! নিজকে পরিণত করতে হবে কবি সুকান্তের রানার যে রাত ভোর দৌড়ায় চিঠি নিয়ে।

সাবেরের পা যেন দৌড়াচ্ছে না উড়ছে। যদি আজ একবার সিনথিয়া তার সঙ্গে দেখা হওয়ার আগে বেরিয়ে পড়ে খুঁজে পাওয়া অসম্ভব হবে ছুটছে রানার ঊর্ধ্বশ্বাসে। পথে অনেক পরিচিত বন্ধু-বান্ধব তাকে থামাতে চাইল! কী ব্যাপার এই বয়সে ছুটছেন কেন? সাবের তিন-চার শব্দের সহজ উত্তর সবাইকে বলছে হার্ট এ্যাটাক একজনের, যেতে হবে তাই ছুটছি থামার সময়তো নেই।

ঠিক পৌনে এক ঘণ্টায় তোপখানা রোড মোড়ের ঠিক বাঁয়ে গলিতে ঢুকতে ফ্রন্টিয়াল গার্ডেন নামের বিল্ডিংটি পেল। মেইন গেইটের সামনে দাঁড়িয়ে কুকুরের মতো জিব বের করে সাবের হাঁপাতে লাগল। একটু ধীরস্থির হতে না হতেই চোখে পড়ল সিনথিয়া লিফট্ থেকে বেরিয়ে এগিয়ে আসছে। কী অপরূপ লাগছে তাকে টরন্টোতে এই কিছু দিনে নিজকে অনেকটা পাল্টে ফেলেছে। টাইট জিন্সের সঙ্গে লাল সাদা বাটিকের টপস্। চুল কার্ল ও ব্লন্ড হাইলাইট করিয়েছে। মাথা ভর্তি চুল আফ্রিকান মেয়েদের মতো প্রতি পদক্ষেপে দুলছে বুকের সঙ্গে। হাতে মোটা মেটালের ক্যারারিয়ান বালা। যে সিনথিয়া হিল জুতো পরতে চাইত না তার পায়ে আজ হাইহীল সু!

সাবেরের সঙ্গে চোখাচোখি হতে ইশারা করল ফলো করতে। সঙ্গে চাচী মোটা হিজাব পরা বুয়া দিয়েছেন সিনথিয়াকে রিকশা পর্যন্ত তুলে দিতে মানুষের এই ঢলে রিকশা কই! হেঁটে মত্স্য ভবনের সামনে রমনায় ঢোকার লাইনে দাঁড়িয়ে ধীরে ধীরে এগুতে লাগল বুয়াকে বুঝিয়ে চাচীর কাছে ফেরত পাঠাল।

বুয়া দূরে মানুষের মধ্যে না হারিয়ে যাওয়া পর্যন্ত রমনা পার্কে ঢোকার লাইনে একটু করে পায়ে পায়ে এগুচ্ছিল! বুয়া দূরে হারিয়ে যেতে দৌড়ে লাইন ছেড়ে সাবেরের সামনে এসে দাঁড়াল। দু’হাত ধরে দু’জনকে পরস্পর গভীরভাবে দেখতে লাগল। মাত্র কিছুক্ষণ তারপর সিনথিয়া তার সুন্দর দাঁত বের করে ভুবন ভাসানো হাসিতে খেলখিল করে উঠল। সাবের তাকে বুকে জড়িয়ে নিতে যাচ্ছিল।

সিনথিয়া চেঁচিয়ে উঠল— আরে কর কী! কোথায় দাঁড়িয়ে আছো খেয়াল আছে! এটা টরন্টোর নাথানফিলিপস স্কোয়ার নয় মত্স্য ভবন রমনা, হাজারটা চোখ তাদের দেখছে কিম্বা গিলছে!

আসলে সিনথিয়াকে এই নতুন অপরূপ ভাবে দেখে সাবের তার শোধবোধ হারিয়ে বসেছিল। তিনদিন তিন রাতের টেনশনের পর আজ উজ্জ্বল দিনের মতো সিনথিয়া তার সামনে। তার বোধ স্তব্ধ হওয়ারই কথা! সিনথিয়া অনবরত খিলখিল করে হাসছে। কোত্থেকে এত হাসি পায় মেয়েটি কে জানে! সাবেরের বিষণ্নতার মেঘ কেটে যাচ্ছে, ভালো লাগছে তা কী অবাক মেয়ে সিনথিয়া মাছরাঙা পাখির মতো সময়ের জলে ডুব দেয় ঠিক তবে তার গায়ে যেন সময়ের জলে ভেজে না। গত রাতেই হয়ত সে প্লেন ইচ্ছে করে মিস করে প্রেমিক তাপসের সঙ্গে লন্ডনে এয়ারপোর্টের কাছে কোনো হোটেলে ছিল। অথচ আজকের সিনথিয়া একেবারে আজকের ফ্রেশ এক সিনথিয়া। সাবেরের সামনে দাঁড়ানো তার সিনথিয়া। ভেতরে কেউ যেন ভেংচি কেটে বল্লো—তোমার সিনথিয়া! আরে বোকা ওর এই রিচার্জ মুড, অনাবিল হাসি সব ঐ একরাত প্রেমিক তাপসের সঙ্গে থাকার কারণে। তোমার এত উত্ফুল্ল হবার কারণ নেই!

- কী হলো এই আনন্দ সকালে হঠাত্ করে চুপসে যাচ্ছো কেন? আরে বাবা একটা দিন হারালেওতো কথামতো বৈশাখের সকালে তোমার সামনে হাজির। এই মুহূর্তের আনন্দ মনেপ্রাণে উজাড় করে নেয়ার চেষ্টা কর সাবের।

- না মানে! তোমার মজার ব্যাপার হয়তো আমার অজানা হয়ে যায়।

- ধ্যাত্, রাখো তোমার ওসব মানে-টানে! জীবনের কোনো মানে নেই দ্রুত চলা নদীর মতো সামনে কোন দিকে মোচড় দেবে নদী নিজেই জানে না ডু ফুর্তি বা হ্যাপি সাবের! আমার হাত ধর, হীলজুতো পরার এখানে পুরোপুরি অভ্যাস হয়নি। তাও আবার এত ভিড়ে!

সিনথিয়ার হাত ধরে সাবের ওকে সামনে নিয়ে  এগুচ্ছে। সবাই বার বার তাকাচ্ছে সিনথিয়ার দিকে তার ঝাঁকড়া পার্ল করা আফ্রিকান স্টাইলের চুল আর টাইট জিন্সের জন্যে হয়ত। বৈশাখের প্রথম দিনে সবাইতো বাঙালি সাজে সজ্জিত হওয়াই রেওয়াজ। সিনথিয়া করেছে ঠিক তার উল্টো।

ইঞ্জিনিয়ার ইনস্টিটিউট পার হয়ে শিশু পার্কের কোনায় কাঁচা আম ঝাললবণ মাখিয়ে বিক্রি করছে। সিনথিয়াতো লাফিয়ে উঠল—খাব!

— আজই এসেছ সিন্থিয়া, রাস্তার পাশে খোলা এসব খেলে আবার দেখ অসুস্থ হয়ে পড় কী না!

- যা হয় হোক আমি খাব!

সিনথিয়া কোনো কিছু ইচ্ছে প্রকাশ করলে সাবের প্রাণপণ তা পূরণ করতে চেয়েছে সব সময়। তা ছাড়া সিনথিয়া হচ্ছে খুবই মুডি মেয়ে যা ইচ্ছে করে না করে ছাড়ে না।

কাগজের ঠোঙ্গায় কুচিকুচি করা ঝাললবণ মাখানো আম দু’বার শেষ করল সিনথিয়া। একটুকরো সাবেরের মুখের সামনে তুলে ধরল।

- না আমার আম কাঁচা ভালো লাগে না।

- উফ্! আমি দিচ্ছি, একটুকরো, হাঁ কর।

সাবের বাধ্য হলো হাঁ করতে।

শেষ পর্যন্ত তারা মানুষ ঠেলে ঠেলে এসে পড়ে চারুকলা পরিষদের বাউন্ডারির ভেতরে। সকালের মঙ্গল শোভাযাত্রার মিছিলে ফিরে এসো অনেক আগে। বিশাল আকৃতির বাঘ, প্যাঁচা, মুখোশ এদিক ওদিক হেলান দিয়ে দাঁড়ানো। সিনথিয়া তার ক্যানন ক্যামেরায় পাগলের মতো সব কিছুর ছবি তুলতে লাগল। এক সময় হাঁটতে হাঁটতে ক্লাস ভবনের পেছনে জল না ওঠা শূন্য পুকুর দেখেতো সে অবাক। আরে, পেছনে ভাস্কর্য বিভাগের বাইরে ছাত্রছাত্রীদের করা নানা রকম ভাস্কর্য মাঠে শুয়ে বসে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের সঙ্গে সিনথিয়া পুরোনো বন্ধুর মতো গলা জড়িয়ে দাঁড়ালো। সাবেরকে ছবি তুলে দিতে বলল।

সবুজ ঘাসে কালো প্লাস্টারের লাইফ সাইজ স্কাপচার ছোট্ট ছেলে সামনে বাক্স রেখে জুতো পালিশের জন্যে রেডি। সিনথিয়া নিজের লাল হাইহীল স্যান্ডেল খুলে তার হাতে ধরিয়ে দিল নিজে পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুলে দিতে বলল। ছবি তুলতে তুলতে সাবের প্রায় ক্লান্ত। তখনি চারুকলার সদ্য শেষ করা সংগ্রামী নেতা সুব্রত সামনে এসে হাজির। সিনথিয়ার খুব বন্ধু। সিনথিয়াকে প্রভাবিত করতে চায় ঢাকায় নিজের ফ্যাশন লাইনের বুটিক শপ খুলতে। সঙ্গে সেও থাকবে সামলাবে সব।

সুব্রত চিত্কার করে লাফিয়ে এসে জড়িয়ে ধরে সিনথিয়াকে। চারুকলা পরিষদের সীমানার ভেতরে ছেলেমেয়ে জড়িয়ে ধরা জায়েজ। তারা তিনজন গাছের নিচে বসে প্যাকেট করা খিচুড়ি খেল মজা করে। হাসিতে-খুশিতে সিনথিয়া যেন সাঁতরে বেড়াচ্ছে। আসলে পরিবেশটাই সে রকম চার দিকে গান আর রঙের বাহার। তবু সাবেরের কেমন যেন ভয় লাগল বেশ হাসিখুশির পরই বিষণ্নতার সীমানা শুরু হয়।

ঘণ্টা খানেক আড্ডার পর সিনথিয়া বলল— চলো উঠি। আমার আবার সন্ধ্যায় আদাবর ক্লাসমেইট বন্ধু সাথী চাকমার সঙ্গে দেখা করতে যেতে হবে।

- ঠিক আছে আসতে দেরি আছে। চলো তাহলে আমার বাসায় সন্ধ্যা পর্যন্ত রেস্ট করবে, কথা বলব। যত জমানো কথা আছে সব। সাবেরের কথায় সিনথিয়া চকিত একবার তাকাল তার দিকে। পরক্ষণেই খিলখিল করে হাসিতে ডুবে গেল।

হাঁটতে হাঁটতে তারা তিনজন কাঁটাবন মোড়ে এলো। এখান থেকে রিকশা চলাচল করছে।

সুব্রত যাবে নিউ মার্কেটের পেছনে চারুকলা হোস্টেলে। এখনো সেখানে সে থাকে। সিনথিয়াকে নিয়ে সাবের যাচ্ছে পরীবাগে তার বাসায়। এই সময়ে অপেক্ষায় সাবের দিনক্ষণ মুহূর্ত মুহূর্ত করে গুনে গুনে আজ বাস্তবে সময়ের সম্মুখীন হয়েছে।

সুব্রত চলে যেতে সাবের ও সিনথিয়া রিকশা নিল।

- সাবের তোমার বাসায় না গিয়ে চলো না রবীন্দ্র সরোবরে যাই।

- ধ্যাত্, ক্লান্ত এখন, কত কথা তোমাকে বলার জমে আছে, কত আদর করার জমে আছে।

সিনথিয়া হাত পা ছুড়ে কিলঘুষি মারতে লাগল সাবেরকে। তবে যেতে তার বাসায় না করল না!

পরীবাগ একেবারে বাংলা মটরের কাছেই মধ্যবিত্ত টাইপের ছয়তলা বাড়ির চার তলায় সাবের থাকে। সে কবি মানুষ সবাই জানে, প্রায় বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে সে অন্যান্য নামি কবিদের সঙ্গে আবৃত্তি করে নিজের কবিতা। এখনো টিভি চ্যানেলে যাদের দেখা যায় তাদের সাধারণ বাঙালি বেশ সম্মান করে। যেমন সাবেরের বিল্ডিং এর সিকিউরিটি গার্ড, ম্যানেজার সবাই। তার বাসায় অহরহ নারীপুরুষ বন্ধুবান্ধব আসে। কবি হিসেবে পার পেয়ে যায় সে।

সিনথিয়া ম্যাক্সিকান টাকিলা খুব পছন্দ করে সাবের জানে। এর আগেও একবার সাবেরকে দেখিয়েছে কীভাবে হাতের উল্টো দিকে একচিমটি লবণ ও চেটে এক ঢোকে টাকিলা পানের পর এক ফালি লেবু চুষতে হয়।

এবারো বন্ধু ফারুক ফয়সল কানাডার পাসপোর্ট দিয়ে হোমবাউন্ড ওয়ের হাউজ থেকে টাকিলা কিনে দিয়েছে। সঙ্গে রুচির চানাচুর চিপস্ সব রেডি।

বাসায় ঢুকে একেবারে বেড রুমে বিছানার ওপর একটা প্লাস্টিক সিট বিছিয়ে টাকিলার বোতল, ছোট্ট দু’টি শর্ট গ্লাস লেবু ফালি, লবণ নিয়ে তারা দু’জন অনেকটা এগিয়ে গেছে। প্রায় অর্ধেক বোতল শেষ। এক এক জনের চারটার বেশি শর্ট হয়ে গেছে মনে হয়। প্রথম দিকে অনর্গল কথা বলছিল দুজন। হঠাত্ আবার একেবারে চুপচাপ। সিনথিয়া সাবেরের চোখের দিকে তাকিয়ে আছে। সাবেরের চোখ খুবই সুন্দর কোনো মেয়ের হলে বর্তে যেত। চোখ ভরা জল যেন টলমল করছে অথচ দেখা যায় না। দু’জন হঠাত্ দাঁড়িয়ে পরস্পরকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল বুকে। কোত্থেকে মাত্র দুই ফোঁটা জল টুপুস করে গড়িয়ে পড়ল সাবেরের চোখ দিয়ে।

জড়িয়ে থাকা অবস্থায় মুখটা একটু পিছিয়ে সিনথিয়া নিজের জিভ দিয়ে জল দু’ফোঁটা চেটে নিল সিনথিয়া।

- তুমি ইচ্ছে করে একটা রাত থাকলে লন্ডনে! তাই না?

সিনথিয়া সাবেরকে ছেড়ে দু’পা পিছিয়ে বলল— উফ! সাবের তুমি একটা পেইন! কেন তুমি উল্টাপাল্টা এত সব ভাবো। তোমার সামনে তোমাকে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে আছি এটাই সত্যি! আর কিছু এখন সত্যি নয়। যখন হবে তখন সেটা সত্যি! সুন্দর মুহূর্ত নষ্ট করতে তুমি মাস্টার।

সাবের কিছু বলে না। চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে সিনথিয়াকে গভীরভাবে দেখতে থাকে। এ কেমন মেয়ে সিনথিয়া এক গ্লাস সাদা জলের মতো এদিক দিয়েও দেখা যায়, ওদিক দিয়েও দেখা যায়।

আচমকা ঠান্ডা জলে ভরা গ্লাসটি তুলে সাবেরের মুখে ছুড়ে দিল সিনথিয়া তারপর খিলখিল করে হাসতে লাগল। কিছুক্ষণ পর নিজেই বাথরুম থেকে টাওল এনে যত্ন করে সাবেরের চোখমুখ মুছিয়ে দিতে লাগল। ভিজে যাওয়া সাদা খদ্দরের পাঞ্জাবি খুলে নিতে সাবেরকে হাত উপরে তুলতে বলে।

সাবেরের ভিজে যাওয়া খালি বুকে নিজের আঙুল দিয়ে বিলি কাটে। একা সাবেরকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ঠোঁটে ঠোঁট রাখে। ওদের চুমুর সময়সীমা ঠিক থাকে না কখনো। পাঁচ থেকে পঁচিশ কোনো ঠিক নেই। সাবের বোঝে সিনথিয়া শিহরণে কেঁপে কেঁপে উঠছে। চুমুরত অবস্থায় ওরা পিছুতে পিছুতে খাটে বিছানায় ধপাস করে পড়ে। সাবের চিত্ হয়ে পড়ে আছে তার ওপরে সিনথিয়া। দু’জনের চোখে দু’জন কী খুঁজছে কে জানে। ঠোঁটে ঠোঁট, নাকের ডগায় নাক ঘষছে সিনথিয়া। সিনথিয়ার অতীব সুন্দর বুক থেতলে আছে সাবেরের বুকে। এবার ফেরার পর আকারে কিছুটা তার চোখে পড়ছে সাবেরের। কিছুটা বাড়ন্ত ব্যাপারে সিনথিয়াকে জিজ্ঞেস করতে সে বিছানায় দাঁড়িয়ে গুণে গুণে তিনটি কষে লাথি সাবেরের পাছায় মেরে আবার তার পাশে বাটিক টপস খুলে শুয়ে পড়ল। তারপর ঘণ্টাখানেক সময় ঘূর্ণিঝড়ে লেপ্টে যাওয়া দু’জন মানুষ।

 


সন্ধ্যার পর পর আদাবর বন্ধু সাথী চাকমার কাছে যেতে হবে সিনথিয়ার। অক্লান্ত পরিশ্রমের পর গাটা ঘামে চটচট করছে তাই চুল না ভিজিয়ে গা ধুয়ে বেরিয়েছে সিনথিয়া। সাবের তার জন্যে কফি বানিয়ে রেডি। সাবেরের বানানো কফি সিনথিয়ার খুব পছন্দ।

কফি শেষ করে যথাযথ কাপড় পরে তারা আবার পথে নামল। সারা শহর মানুষের ঢল। বিশেষ করে রবীন্দ্র সরোবরে ক’টা অনুষ্ঠান হচ্ছে কে জানে। সিএনজি পাওয়া মুস্কিল। শেষ পর্যন্ত রিকশাই নিতে হলো। দূর হলেও এক সময় পৌঁছানোতো যাবে। মোহাম্মদপুর পার হয়ে জাপান সিটি পার হয়ে সেই আদাবর দূরতো কম না।

পৌঁছে গিয়ে সাবের বুঝল ভুল হয়েছে সিনথিয়ার সঙ্গে আসার। যারা এসেছে সবাই ওর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাশ মেট। এর মধ্যে সে কী করবে। তবে একবার বাসায় ঢুকে পড়লে হুট করে তো আর যাওয়া যায় না। তার কেমন যেন মনে হচ্ছে সবাই যেন আজ এক বিশেষ কিছু নিয়ে কথা বলবে যেখানে তার থাকা বেমানান। এরকম পরিস্থিতি হলে তার খুব খারাপ লাগা শুরু হয়। তুমুলভাবে সাবেরের মাথা ধরল। তারপর শুরু হলো বমি বমি ভাব। গুলিয়ে উঠছে পেটের ভেতরে সব। চোখ লাল টুকটুক।

হঠাত্ দাঁড়িয়ে সাবের বলল—আমি তাহলে আজ ফিরে যাই সিনথিয়া। সবাই যেন এক মিনিট নীরবতা পালন করে এক সঙ্গে বলে উঠল

- ঠিকই আপনাকে দেখেতো খুব অসুস্থ লাগছে।

সিনথিয়া পর পর দুই বার বলল— তোমার কী সত্যি খুব খারাপ লাগছে?

- হ্যাঁ, তবে ঠিক হয়ে যাবে। আমি বাসায় যাই।

রনি বলে ছেলেটি বলল— আমি কি সঙ্গে আসব আপনাকে বাসা পর্যন্ত ছেড়ে আসতে?

- না! চলে যেতে পারব।

বাই বলে বেরিয়ে যেতে যেতে কানে এলো সিনথিয়া বলল— সাবধানে যেও।

চলন্ত রিকশায় বমি করতে যাচ্ছে দেখে রিকশাওয়ালা সাইড করে দাঁড়াল। বার বার বমি হতে লাগল। সারা দিনের খাওয়া সব যেন বেরিয়ে আসবে। এক সময় পেটে আর কিছুই নেই বলে তিতা-তিতা পানি বেরুতে লাগল। তার কী প্রচণ্ড জ্বর আসছে, কে জানে?

রিকশাওয়ালা তাকে ধরে আবার রিকশায় তুলল। রিকশা চলতে শুরু করল আবার। সাবের অনুভব করছে কোথায় যেন কিছুর পতন হতে যাচ্ছে। তার দিকে ধেয়ে আসছে দুঃখবোধের ডানা মেলে তীব্রকষ্ট। পরীবাগে নিজের বাসায় ফিরে সিঁড়ি দিয়ে চারতলায় ওঠা যেন এক খুবই কষ্টকর কাজ মনে হচ্ছিল তার কাছে। তবু নিজের বাসায় ফেরা এক শান্তির ব্যাপার। বমি করার মতো তার পেটে কিছু আর বাকি নেই। ধীরে ধীরে জুতো পরেই বিছানায় ঘুমিয়ে পড়ল সাবের।

খুব ভোরে আলো ফুটছে যখন সেই সঙ্গে তার চোখ খুলে গেল। বমি-বমি ভাব আর নেই। বেশ খিদেও লেগেছে। ঘরের ফ্রিজে রেডি সেই পরটার প্যাকেট আছে। ভেজে ডিম পোজ করে আপাতত খাওয়া যাবে। খাওয়ার পর কিছুটা ভালো লাগছে। ঘুম ঠিক হয়নি বলে অস্বস্তি লাগছে। চিত্ হয়ে ঘুমের অপেক্ষায় আবার চিত্ হয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল। চোখ বন্ধ করতে সিনথিয়ার মুখ ভেসে উঠল। আজ দুপুরে সে চলে যাবে চট্টগ্রামে বাবা মায়ের কাছে।

সাবের ভাবতে চাইল সিনথিয়ার সঙ্গে তার দেখা না হলে কেমন হতো। এত বড় দেশে বাংলাদেশে তাদের দেখা হয়নি। হয়েছে কানাডা টরন্টো শহরে। সেবার টরন্টোর বাংলাদেশ ফ্যাস্টিভালে শহীদুল ইসলাম মিন্টু কবি হিসেবে তাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। যাবে কি যাবে না করে শেষ পর্যন্ত চলে গিয়েছিল। গিয়ে বুঝল কী অস্বস্তিকর ব্যাপার নামি গায়িকা সাবিনা ইয়াসমিন, অভিনেতা ফেরদৌস, মৌসুমীদের মধ্যে সে সামান্য কবি খুব বেমানান লাগছিল।

নামি গায়িকা, অভিনেত্রী অভিনেতারা ছিলেন হোটেলে লেখক সাহিত্যিকরা ভ্যানুর কাছেই এক বড় এ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিং-এ এর ওর বাসায় গেস্ট হিসেবে।

সে রাতে অনুষ্ঠান শেষে সাবের সহ অন্য দু’জন লেখক ভীষণ ক্লান্ত হয়ে এ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিং এর মেইন গেইটে এসে থমকে দাঁড়াল। রাত অনেক এ্যাপার্টমেন্ট রুমের দরজার চাবি তাদের কাছে আছে। তবে মেইন গেইটের নেই। হয় ইন্টারকম বোতাম টিপে পরিচিত কাউকে বললে তারা ফোনের মাধ্যমে খুলে দেবে। নয়তো অপেক্ষা করা কেউ যদি এ বিল্ডিং-এ এসে নিজের চাবি দিয়ে দরজা খুলে ঢোকে ভেতরে তার সঙ্গে ঢুকে পড়া যাবে। অবশ্য রুমের চাবি দেখাতে হবে। আসে না কেউ। অপেক্ষার প্রহর লম্বা লাগে। এমন সময় সিনথিয়া এলো। আমরা তিনজনই ভেবেছিলাম কালো রঙের এই সুন্দরী অবশ্যই শ্রীলঙ্কান। নিজেদের মধ্যে বাংলায় কথা বলে সিনথিয়াকে ইংরেজিতে জিজ্ঞেস করলাম— তোমার কাছে কী চাবি আছে?

সে ইংরেজিতে মুচকি হেসে উত্তর দিল — না তার কাছেও নেই। তবে ইন্টারকমে বোতাম চাপ দিয়ে বললে মা খুলে দেবে মেইন গেইট।

দরজা খুলে গেল। আমরা ভেতরে ঢুকে এলিভেটরের অপেক্ষায়। সিনথিয়া বলল সে সন্ধ্যা থেকে রাত বারোটা পর্যন্ত এক ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্টে কাজ করে। দিনে টরন্টো ফ্যাশন স্কুলে যায়। এলিভেটর এলো। সবাই উঠলাম। আমরা যাব ১৭ ফ্লোর সিনথিয়া ২১ শে। ও স্পষ্ট বাংলায় এবার জিজ্ঞেস করল— আপনারা সব কবি লেখক?

আমরা এক সঙ্গে চমকে ওর দিকে তাকালাম। বুঝলাম আমাদের কথা সে সবই বুঝেছে এতক্ষণ।

- তুমি বাঙালি?

- হ্যাঁ একশ ভাগ। দেখতে অবশ্য সবাই ভুল করে। রঙ কালো বলে ভাবে শ্রীলঙ্কান।

- সরি বালিকা নিজ গুণে ক্ষমা কর। সাবের বলল।

- ক্ষমা করা যেতে পারে যদি একবার আমাদের বাসায় আসেন। আমার মায়ের কাছে আপনার একটি কবিতার বই আছে। তাতে আপনার ছবি দেখেছি শেষ মলাটে।

সাবের তো একেবারে আকাশে চড়ে বসল এক কথায়। অন্য দু’জন গল্পকার ও ঔপন্যাসিক ভেংচি কেটে বললেন— কবিরা তো কবি যান সাবের সাব একদিন ভক্তর বাসায় ঘুরে আসুন। দেশ থেকে এত দূরে ভক্ত পাওয়াতো খেলা কথা নয়! এর মধ্যে ১৭তলা চলে আসতে ওরা নেমে পড়ল। সিনথিয়া ওপরে উঠে গেল।

সিনথিয়া উপরে যেতে যেতে ভাবল কবি সাবেরের বয়স হলেও মুখটা বেশ মায়াবী শিশুসুলভ সারল্যে ভরা। চোখ বড় বড় দেখে মনে হয় জলে ভেজা।

ঘরে ঢুকেই মাকে গিয়ে বলল—তোমার কাছে যে কবিতার বই আছে আজ সেই কবির সঙ্গে আমাদের এলিভেটরে দেখা হলো। ওনারা বাংলাদেশ ফেস্টিভ্যালে আমন্ত্রিত হয়ে এসেছেন এখানে।

- ওমা তাই নাকি! কবি সাবের। একবার বাসায় আসতে বলতি!

- বলেছিতো। দেখি সময় পেলে আসবেন, নয়তো না! ১৭ নম্বর ফ্লোরে আছেন কোনো এ্যাপার্টমেন্টে।

এর মধ্যে কাজের কাজ করেছে সে সাবের সাহেবের ইমেইল এ্যাডরেস জিজ্ঞেস করে মনে করেছে।

কাপড় খুলে হাত মুখ ধোয়ার আগেই সিনথিয়া দৌড়ে নিজের ল্যাপটপ খুলে মেইল লিখল। আজ এলিভেটরে আপনার সঙ্গে দেখা হলো। আমি সিনথিয়া। মাত্র সাত মাস হয় এদেশে নতুন ইমিগ্রান্ট হয়ে এসেছি। শুনেছি কবিরা মানুষের অনেক দুঃখ কষ্টে একটা দিশা দিতে পারেন? কী ভাবে উের যাওয়া যায় এসব। আমার সেল ফোন নম্বর দিলাম।

এরপর খেয়ে দেয়ে ফ্রেশ হয়ে এসে চেক করে দেখল। ইমেইলটি যায়নি ফেরত এসেছে। সম্ভবত মেইল এ্যাডরেস সে ভুল করেছে। ভীষণ আক্ষেপ হলো। কলমটা বের করে লিখে নিলে ভালো হতো। পরের দিন একই সময় সিনথিয়া তাদের দেখে আনন্দে চেঁচিয়ে বলল— আরে আপনি!

অন্য দুইজন ঘাড় ঘুরিয়ে এমনভাবে তাকাল যে সে তাড়াতাড়ি নিজের কথা বদলে আবার বলল— আরে আপনারা?

সাবের বলল— আজোও এক বিউটিব্ল্যাক এঞ্জেলের জন্যে মধ্যরাতে অপেক্ষায় আছি।

কথা শুনে খিলখিল করে হাসতে শুরু করে দিল সিনথিয়া।

বোতাম টিপে বলতে সিনথিয়ার মা গেইটের দরজা খুলে দিলেন। এলিভেটরের জন্যে অপেক্ষা করতে করতে সিনথিয়া বলল

- গত রাতে বাসায় ঢুকেই আপনাকে ই-মেইল করেছিলাম। দুর্ভাগ্য এ্যাডরেসটা ভুল হওয়ায় ব্যাক করেছে।

- তাই নাকি! নো প্রোবলেম আজ এই নাও আমার কার্ড এতে ঠিকঠাক ইমেইল এ্যাডরেস আছে। আর ভুল হবে না।

- থ্যাংস।

১৭ তে নেমে যাওয়ার পর সিনথিয়া উপরে ২৪শে উঠে গেল। সেদিনও ফ্রেশ না হয়ে ছুটে গিয়ে ল্যাপটপ খুলে মেইল করল এবার কার্ড দেখে ঠিকঠাক মেইল এ্যাডরেস লিখেছে। সেন্ড দিতে মেইলটি চলেও গিয়েছে।

খেয়ে দেয়ে ঘুমের আগে সাধারণত সিনথিয়া মেইল চেক করে না। আজ চেক করতে কেন যে তার ইচ্ছে হলো কে জানে। সে অবচেতন ভাবে কি ভাবছিল সাবেরের কোনো উত্তর এসেছে কিনা! তারপর ভাবল ওনার ফোনেতো আর নেট হয়তো নেই। এত তাড়াতাড়ি কীভাবে তিনি উত্তর দেবেন। খুলেতো অবাক। ঠিকই সাবেরের উত্তর এসেছে।

আসলে আমি কিন্তু এক সবুজ সাপ। উল্টে যাই, পাল্টে যাই। উল্টে গেলে লিখি কবিতা। পাল্টে গেলে গল্প উপন্যাস। দেখি আমার স্যুটকেসে যদি থাকে তোমাকে একটি বই দেব। তুমি ছোট মানুষ তোমার আবার দুঃখ কীসের? অবশ্য ছোট্টদের ছোট্ট ছোট্ট দুঃখ জমতে জমতে বড় দুঃখও হতে পারে। দেখা হলে বলো আমাকে যদি বলতে চাও। যে বাসায় উঠেছি সেখানে ডেস্কটপ কম্পিউটারে নেট আছে। আমি বাসায় ঢুকেই সারা দিন পর চেক করি। আজ খুলতেই তোমার একটু আগে করা মেইলটি পেলাম। ভালো থেক এঞ্জেল।’

একজন এমন কবি তাকে প্রথমেই এতো ক’টা লাইন লিখবেন সিনথিয়া স্বপ্নেও ভাবেনি। সে মাকে এসব বিষয়ে কিছু বলল না।

সিনথিয়া মাত্র এক লাইনে উত্তর দিল। ধন্যবাদ সবুজ সাপ, আপনিতো দেশে ফিরে যাবেন দেখা কী হবে?

- বাংলাদেশ ফেস্টিভ্যাল শেষ হবার পর আমি আরো ৭ দিন তোমাদের শহরে থাকব। ফেরা টিকিট বুকিং সেভাবেই দেয়া।

- বাহ! তাহলেতো একবার নয় বেশ কয়েকবার দেখা হবে।

আশা করি হবে। শহরটা ভালো লাগছে, আরো ঘুরে দেখতে ভালো লাগছে।

- আমি কী কিছু কিছু জিনিস ঘুরিয়ে দেখাতে পারি?

- অবশ্যই কেন নয়। তবে আজ রাত হয়েছে, ঘুমাও, আমিও ঘুমাই, শুভ রাত্রি।

- শুভ রাত্রি।

ইমেইলে চ্যাটিং বন্ধ করে সিনথিয়া বিছানায় যেতেই ঘুমিয়ে পড়ল। পরের দিন তাদের দেখা হলো না। তবে ইমেইলে ও সেলফোনে কথা হলো। সাবেরের চাচাতো ভাই তাকে সিমসহ একটা ফোন দিয়েছে, যে ক’দিন আছে ব্যবহার কর সিনথিয়ার নম্বর পেয়ে দিনে বেশ কয়েকবার কথা বলছে তারা। ফেস্টিভ্যাল শেষের একদিন পর প্রায় সব গেস্ট ফিরবে দেশে। সাবের শুধু থাকছে। তাকেও এয়ারপোর্টে সবাইকে সিঅফ করতে যেতে বলা হয়েছে। তবে সে সব ব্যবস্থা করে রেখেছে। সবাই যাওয়ার পরের দিন সিনথিয়ার স্কুল আর কাজের মাঝে দুই ঘণ্টা গ্যাপ রয়েছে। টরন্টো ডাউন টাউনে কোনো ট্রিস হর্টন কফি শপে বা উডবাইন বীচে দেখা করতে পারে। দু’জনের ফোন থাকায় খুঁজে পেতে অসুবিধা নেই।

ঠিকই সে দিন দেখা হলো। মাত্র দুই ঘণ্টায় তারা কত কাছে চলে এলো। কতদিনের যেন চেনা। তাদের বয়সের মাঝে যে এক বিরাট গ্যাপ তা তারা বুঝতেই পারল না।

- আপনার কিছু শপিং করতে হলে উডবাইন বীচে না বসে ডাউনটাউন ইটল সেন্টার মলে যেতে পারি। শত বছর পুরোনো বিরাট মল।

- না আমার কারো জন্যে তেমন কিছু কেনাকাটার স্বভাব নেই।

ইন্ডিগো থেকে কানাডিয়ান কিছু কবির বই নিতে পারতাম তবে অনেক দাম। সঙ্গে আবার ট্যাক্স।

- ট্যাক্সতো থাকবে! দেশে ট্যাক্স দেন না তো তাই অন্যরকম লাগছে। সিনথিয়া হাসে। আপনার সঙ্গে আমার অনেক কিছুর মিল আছে। আমারও শপিং বা শুধু উইন্ডো শপিং অসহ্য লাগে। আমার কাপড়-চোপড় বা অন্যকিছু আমার মা-ই নিজের পছন্দে কিনে আনেন।

- আর কী কী স্বভাবে মিল আছে? সাবেরের প্রশ্ন শুনে সিনথিয়া আবার খিলখিল করে হেসে উঠল।

- সিনথিয়া তুমি কিন্তু কথায় কথায় খিলখিল করে হেসে ওঠো ঠিকই তবে আমি স্পষ্ট বুঝতে পারি তোমার ভেতরে একটা অস্থিরতা বাড়ছে, চাপা দিয়ে রাখতে চাইছ এমন কিছু যা চাপা রাখা ঠিক নয়।

-আপনার বোঝার ভুল কিংবা আমাকে দেখতে ওরকম লাগে।

- হ্যা হতে পারে আমার ভুল। তবে ভুল নাও হতে পারে। মানুষ মাত্র নিজে মাটি চাপা পড়ার আগেই সারা জীবন অনেক কিছু চাপতে চায়। প্রথমে উডবাইন বীচ পরে টিম হর্টন কফি শপে দুই ঘণ্টা কথা বলে তাদের মন ভরল না।

সিনথিয়া কাজে চলে যাওয়ার পর সাবের একা এলোপাতাড়ি ঘুরল অনেক। সে উইকলি টিটিসি পাস কিনেছে। ইচ্ছেমতো বাস, সাবওয়ে, স্ট্রিট কারে যত ইচ্ছা যত বার ইচ্ছা ঘোরা যায়। স্ট্রিট কার মানে ট্রামের মতো পথের মাঝ দিয়ে কারেন্টে চলে। বাসতো বাস সাবওয়ে শূয়ো পোকার মতো মাটির নিচে দিয়েই বেশি যাতায়াত। মাঝে মধ্যে মাটির ওপরেও ওঠে।

প্রথমে স্ট্রিট কারে করে সাবের একেবারে শেষ স্টেশন হাইটপার্কে যেতে শহরের মাঝে এত বড় বন বা পার্ক অবিশ্বাস্য। ভেতরে চলে গেলে বোঝাই যায় না গাছ-গাছালীর বাইরে টরন্টোর মতো এত্তবড় শহর এর যান্ত্রিকতার দাপটে হুলুস্থুল। স্ট্রিট কারে ফিরে এলোডানডায় ওয়েস্ট সাবওয়ে স্টেশন। ঢুকে পড়ল সাবওয়ে চল্লো ডাউন্সভিউ শেষ স্টেশন। সেখান থেকে উল্টো পথে শেষ স্টেশনই ফিঞ্চ। আবার ফিরে পূর্ব পশ্চিম লাইনে শেষ স্টেশন কেনেডী। মাটির নিচ থেকে আবার উঠতে উঠতে মাটির উপরে ব্রিজে চলা আরটিতে স্কারব্রো মলে গিয়ে নামল।

বাসায় ফিরতে বেশ রাত। তখন সে আর সিনথিয়ার সেই বিল্ডিং এ থাকে না। ফেস্টিভ্যালের শেষে চাচাতো ভাইয়ের বাসায় উঠেছে সে। চাচাতো ভাই আর তার বউ জানতে চাইল— ওই অচেনা শহরে এত রাত কোথায় ছিলে?

- অচেনা কই সবইতো চেনা লাগে। পকেটে আছে টিটিসি পাস ইচ্ছেমতো চলাচল। আর পায়কে আমাকে। দেখে যাই যে ক’দিন আছি আমাকে নিয়ে চিন্তা কর না। রাতে খাওয়াও রেখ না।

-সিনথিয়া শুনে বলে আপনি আসলে কবির চেয়ে বেশি গল্পকার। কত কথা বানিয়ে ফেলেন। সিনেমার কথা বলতেন। আপনি না বললেন সেদিন সিনেমার পোকা আপনি।

- হ্যাঁ ওরা জানে আমি সিনেমা পাগল। ইন্ডিয়াতে বড় ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে চলে যাই। কত বছরের স্বপ্ন কোনো দিন সেপ্টেম্বর মাসে টরন্টো আসতে পারলে টরন্টো ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল চুটিয়ে দেখব।

সিনথিয়ার ছুটির আগেই সাবের এখন হাজির হয়ে অপেক্ষা করে তার রাতের কাজ সিন্দাবাদ রেস্টুরেন্টের বাইরে। সিনথিয়া নিজ হাতে বাটার নানে ব্যান্ডেজ করা কাবাব ঝোল রাঙ্গতা পেপারে মুড়ে ওর জন্যে নিয়ে আসত ছুটির পর। ফুটপাতে হাজারো বেঞ্চ পাতা। তারই কোনোটায় তারা বসে খেত মজা করে। সাবেরের হাপুস হুপুস করে খাওয়া দেখে সিনথিয়া জানতে চায় এমন বুভুক্ষের মতো খান কেন আপনি।

- ঢাকায় আমি একা থাকি কোনো বুয়াও রাখি না। লেখার ডিস্টার্ব হয়। তাই ওই রেডিমেইড পরটা আর নুডলসই ভরসা। আর তোমার হাতে বানানো কাবাব রোলতো যেন বেহেস্তের রেসিপিতে বানানো।

- ধ্যাত্, কী যে বলেন এখানে সবার হাতেই একই রকম রোল তৈরি হয়।

- আমার তো আর তা খাওয়ার সুযোগ হয় না।

সে রাতেও সিনথিয়া রেস্টুরেন্টের কাজ শেষে বেরিয়ে এলো হাতে রাঙ্গতা জড়ানো রোল নিয়ে।

- চলেন যে কোনো বেঞ্চে বসে খেয়ে নিয়ে তিন ব্লক ককসল এভিনিউ দিয়ে হাঁটলে একটা চমত্কার কোরিয়ান বার আছে। যে বুড়ি চালান তার নাম ফ্লোরা কীম। আমাকে খুব পছন্দ করেন। মাঝে মধ্যে খুব খিদে থাকলে গিয়ে বসি দুই তিনটা টাকিলা শর্ট নিয়ে ধীরে সুস্থে বাসায় ফিরি। ঘুমও আসে ভালো আর কিছুক্ষণ নিজের হাজারো ঝামেলা থেকে স্কেপও করা যায়।

সাবের ভাবল ভালোই তো বাঙালি মেয়েরা এ শহরে এসে কতটা স্বাবলম্বী, নিজের সব কিছু নিজেই ম্যানেজ করার ক্ষমতা রাখে। কী বা এমন বয়স এই সিনথিয়া মেয়েটির অথচ পড়ছে আবার কাজও করছে মধ্যরাত পর্যন্ত।

- আমার ড্রিংকসে কোনো আপত্তি নেই তবে রেড ওয়াইন পছন্দ করি। কাজের পর টাকিলার মতো হার্ড ড্রিংস তোমার জন্যে হেভি হয়ে যায় না।

- না, আমি টাকিলাতে অভ্যস্ত। অনেকক্ষণ ধরে সিপের পর সিপ দিয়ে ধীরে সুস্থে কোনো হার্ড ড্রিংস আমার গলা দিয়ে নামে না। আমি তাই ছোট্ট গ্লাসে টাকিলার ছোট্ট শর্ট একবারে টুক করে গিলে ফেলি তারপর লেবু মুখে নিয়ে চুষতে থাকি।

- ওকে নো প্রোবলেম। চলো যাই দেখি কোরিয়ান বার।

আসলে কোরিয়ান মধ্য বয়স্ক মালিক কাম বার টেন্ডার মহিলা ফ্লোরা কীম সিনথিয়াকে খুব পছন্দ করেন।

তারা দু’জন বার কাউন্টারের উঁচু রিভলভিং টুলে উঠে বসতে তিনি সামনে এসে দাঁড়ালেন। সিনথিয়ার গালে হাত রেখে বললেন,

- ওহ মাই ডার্লিং, মাই বেবী, হাউ আর ইউ টুডে?

- আই অ্যাম ফাইন মাদাম কীম।

- দ্যাটস গুড! ভেরি গুড। হি ইজ ইউর ফ্রেন্ড?

- ও ইয়েস। হি ইজ পোয়েট কাম ফ্রম লং ফারওয়ে বাংলাদেশ।

- নিউ ইমিগ্রান্ট?

- নো, নো হী ইনভাইটেড হ্যায়ার ফ্রম টরন্টো বাংলাদেশ ফেস্টিভ্যাল। হি ইজ ভেরি নোন পয়েট ইন বাংলাদেশ। মিস্টার সাবের।

- হ্যালো মিস্টার স্যাব! হাউ আর ফিলিং ইন টরন্টো?

- নাইস, ভেরি নাইস হোয়েন সাচয়ে নাইস ইয়াং কম্পানিয়ন লাইক

সিনথিয়া উইথ মী দ্যাট ওয়াজ গ্রেট।

কারেক্ট মিস্টার স্যাব, সিনন্থি মাই ডার্লিং ইজ এমেজিং গার্ল। সো হোয়াট ইউ লাইক ড্রিংস টুনাইট?

রেড ওয়াইন।

সাবেরের একটা রেড ওয়াইন শেষ করতে সিনথিয়া টাকিলার তিনটি শর্ট শেষ করেছে। তার কণ্ঠস্বর একটু ভারি লাগছে। গভীর রাতে মোটা করে মাখা কাজল চোখে, ঠোঁটে লাল টুকটুক লিপিস্টিকের রঙ মেয়েটি আসলে বিচিত্র, অপার্থিব মনে হয়। সাধারণ বাঙালি মেয়েরা এরকম হয় না। হয়তো টরন্টো ফ্যাশন ইনিস্টিটিউটের ছাত্রী তাই কিছুটা অন্য রকম।

- সাবের আমি যদি তুমি করে ডাকি কিছু মনে করবেন। আপনি করে বললে মনে হয় আটলান্টিকের দুই পাড়ে দুই জন বসে কথা বলছি।

- না আমার কোনো আপত্তি নেই। ইনফ্যাক্ট আমি তোমাকে তুমি বলে সম্বোধন করছি শুরু থেকে। তুমি যদি আমাকে তুমি বলে স্বচ্ছন্দ ফিল কর তবে বলো। ইটস ওকে!

ফ্লোলা কীম এসে সিনথিয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন -

- নো মোর শর্ট টুনাইট মাই ডার্লিং।

- ওহ নো ম্যাম! জাস্ট ওয়ান মোর।

- ওকে জাস্ট ওয়ান মোর।

সাবের চিন্তা করছিল যদি ড্রাঙ্ক হয়ে পড়ে তাহলে কী ওর বাসায় কোনো প্রোবলেম হবে কীনা! হাজার হোক বাঙালি ঘরের মেয়ে।

- ওকে আই এ্যাম ফাইন সাবের। আমাকে নিয়ে ভেব না। পথে বেরুলেই একেবারে ঠিক। আমি কখনো ড্রাংক হই না। বাসায় ঢোকার আগে হান্ডরেড পার্সেন্ট ঠিক। মা-বাবা ভাবেন কাজের ক্লান্তি। রেস্টুরেন্টে যখন খেয়ে এসেছে ঘুমাক সোজা নিজের বেডে গিয়ে। তুমি কিন্তু ঠিকই ধরে ফেলেছ একটা চাপা সেডনেস শুধু বাড়ছে দিন দিন ভেতরে। কাউকে কিছু বলতে পারি না।

যখন প্রথম তুমি বলেছিলে তখন টাকিলা শর্ট নি নাই তাই মিথ্যা বলেছিলাম। ড্রিংসের পর মানুষ পবিত্র হয়ে যায়। যা বলে সত্যি বলে।

তোমার ইমাজিনেশন নাকি সত্যি কোনো সত্য ঘটনা পার করেছ তুমি এই ছোট্ট জীবনে?

প্রতি মুহূর্তে মনে হয় আমি ডুবে যাচ্ছি এক অতল গহ্বরে এত চিত্কার করছি অথচ কেউ শুনছে না। সাবের আরেকটা ওয়াইন নিল। হাত বাড়িয়ে সিনথিয়ার বয় কাটের চেয়ে একটু লম্বা চুলে নিজের আঙুল দিয়ে বিলি কেটে দিতে লাগল।

-সিনথিয়া তুমি তো বললে ফ্যাশন গ্রাজুয়েশনের পর ঢাকা ফিরে যেতে চাও। তাহলে মধ্যরাত পর্যন্ত ওয়েটার্সে এই কঠিন কাজ না করলেও পারো। শুনেছি শনিরবি ছুটির দিনে জেরাড মলে এক জুতোর দোকানেও তুমি কাজ কর। কী হবে এতো ডলার দিয়ে। তোমার ফ্যামিলির অবস্থাও তো বেশ ভালো।

—সত্যি শুনতে চাও সাবের কেন করি!

— যদি হাল্কা লাগে তোমার কেন শুনব না!

—জানি না কেন সাবের তোমাকে প্রথম দেখেই মনে হয়েছিল আমি যাকে খুঁজছি তুমি সেই। যে আমাকে বুঝবে যাকে আমি আমার সব চাপা লুকানো কথা ধীরে ধাীরে বলে হাল্কা হতে পারব। যে আমাকে সঠিক এগিয়ে চলার পথ দেখাতে পারবে।

— থ্যাংস সিনথিয়া, আমাকে কাছের মানুষ মনে করার জন্যে।

—ধ্যাত্! এসব ফরমালিটিজ তোমাকে মানায় না সাবের।

তুমি ভাসন্ত বাউল। প্লিজ এসব ফরমালিটিজ দেখিও না।

—ওকে, দেখাব না। বলো কী বলবে।

—দুর্গার অসুরের মতো আমার জীবনের প্রথম প্রেমিককে আমার লুকিয়ে টাকা পাঠাতে হয়। এমন কী আমার বর্তমান প্রেমিক তাপসও তা জানে না। আমার পক্ষেতো সম্ভব না বাবা থেকে টাকা নিয়ে ওকে পাঠানোর। যার সঙ্গে আমার সব সম্পর্ক শেষ। যার জ্বালাতনে আমার পেরেন্ট চট্টগ্রাম ছেড়ে ইমিগ্রেশন নিয়ে কানাডা এলো। যার জ্বালাতনে অতিষ্ঠ হয়ে ডুবে যাচ্ছিলাম আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের দু’বছর সিনিয়র সহপাঠী তাপস এগিয়ে এসে আমার হাত না ধরলে আমি কবে তলিয়ে যেতাম অন্ধকারে। তবু সে যখন ইমেইলে জানাল ব্যবসার ভীষণ ক্ষতিতে পড়ে ভীষণ বেকায়দায় আছে। কিছু ডলার পাঠাতে পারলে উপকার হয়। আমি না করতে পারলাম না। স্কুলের পর কাজ, কাজের পর কাজ করা ছাড়া আর উপায় ছিল না।

অ্যাবসার্ড সিনথিয়া। একি করছ তুমি! তোমাকে দেখে এত বুদ্ধিহীন পাগল তো মনে হয় না।

— জানি সাবের। অনেক চেষ্টা করেও পারলাম না। পাঠাতেই হলো। চলো আজ যাই পরে কথা বলব এ বিষয়ে। রাতের স্ট্রিট কার এবং সাবওয়ে খুব স্লো। একবার মিস করলে আধা ঘণ্টা পরে আবার আসবে। ঘণ্টা খানেকের মধ্যে বাসায় ঢুকতে হবে। আজ একটু দেরি হয়ে গেল। তবে তোমার বলা বলা শুরু করায় শান্তি লাগছে।

—চলো সাবের দাঁড়িয়ে পড়ল। সিনথিয়া দাঁড়াতে গিয়ে একটু টলে উঠতে সাবের তাকে জড়িয়ে ধরল। সিনথিয়া বলল,

—ইটস ওকে। অনেকক্ষণ বসে থেকে পা জমে গিয়েছিল।

—গুড নাইট মাই ডার্লিং, টেককেয়ার। পেছন থেকে ফ্লোরা কীমের আওয়াজ ভেসে আসল।

বাইরে বেরিয়ে এসে সাবের বুঝল সিনথিয়া একটু বেশি দেরি করে ফেলেছে। প্রথমে স্ট্রিট কার তারপর সাবওয়ে আবার বাস ধরে যেতে হবে। জেরাড ইন্ডিয়া বাজার থেকে স্কারব্রো গলফ ক্লাব রোড অনেক দূরে। তার বেশি কেনাকাটা নেই বলে বেশ ডলার পড়ে আছে। খরচা করা দরকার। সাবের হাত তুলে ট্যাক্সিক্যাব থামাল।

সিনথিয়া বার বার না করায় সে বল্লো আমারও আজ তাড়া আছে। চাচাতো ভাই কিছু বলবে বলে তাড়াতাড়ি ঘরে ফিরতে বলেছে। আর কিছু না বলে ক্যাবের পেছনের দরজা খুলে ধরতে সিনথিয়া ধপাস করে বসে পড়ল। পাশাপাশি সাবের বসে ওর হাত নিজের হাতে নিয়ে বলল-তোমাকে নিজের অনেক কিছু বদলাতে হবে সিনথিয়া। সিনথিয়া সাবেরের হাত চেপে ধরে বলল-জানো আমি এখন আওয়ার হিসেবে জীবনকে যেন বেঁধে ফেলেছি। এক ঘণ্টা বাড়তি কাজ মানে বাড়তি ডলার। বেরিয়ে আসতে হবে এই জঞ্জাল থেকে। আগামীকাল সেকেন্ড হাফে কাজ করব না বলে এসেছি আজ। তোমাকে নিয়ে বেড়াব। একা সিনেমা দেখব আর সব শেষে টাকিলা পানের পর বলব আমার প্রাক্তন আর বর্তমান প্রেমিকের কথা। রেস্টুরেন্টের বাইরে নয়। কাল শনিবার মলে জুতোর দোকানে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত কাজ শেষে রাত পর্যন্ত নিজকে ফ্রি রেখেছি। মলের মুখে ডান দিকে টিম হর্টন  কফি শপে তুমি আমার জন্যে অপেক্ষা কর। তুমি চলে গেলে ফাঁকা লাগবে সাবের!

পৃথিবীতে কিছুই ফাঁকা থাকে না সব হিলিং হয়ে যায়। ওকে কাল দেখা হচ্ছে। সিনথিয়া তাদের চব্বিশতলা হাইরাইজ কন্ড বিল্ডিং এর সামনে নেমে বেশ স্বাভাবিক ভাবে হেঁটে মেইন গেইটে গিয়ে মাকে ইন্টারকমের বোতাম টিপছে দরজা খুলতে। ট্যাক্সি সাবেরকে নিয়ে ইউ টার্ন করে মারখানের দিকে তার চাচাতো ভাইয়ের বাসার দিকে এগুতে লাগল।

পরের দিন সাবের প্রথমে বাস তারপর সাবওয়ে শেষে স্ট্রিট কার ধরে সিনথিয়ার জুতোর দোকানের যে মল তার সামনে টিম হর্টনে এসে কফি নিল।

সিনথিয়া এসেই বলল চলো মলের ফুডকোর্টে গিয়ে চাইনিজ সুপ আর কিছু খাই। তারপর ডাউন টাউন সিনেপ্লেক্সে বেনকিংসেল আর পেগ লোপাক্রুজের’ ‘লেগেসি’ সিনেমা দেখতে যাব। সাবের বল্লো আজ বারে না গিয়ে চলো ‘এলসিবিও’ থেকে একটা টাকিলা পাইট কিনে ডলার শপ থেকে দু’টো শর্ট গ্লাস আর গ্রোসারি থেকে ছোট্ট লবণের প্যাকেট আর একটি লেবু নিলেই চলবে। সিনেমা দেখার আগেই তারা সব জোগাড় করে পলিথিনের ব্যাগে নিয়ে ‘লেগেসি’ দেখতে ঢুকল। সিনেমা শেষে ট্যাক্স নিয়ে সোজা কিংস্টন রোডে ব্লাফার্স পার্ক বীচে এসে নামল। হাল্কা শীত এখনো বাতাসে আছে। তাই সন্ধ্যার পর বীচে লোক নেই তেমন। ওন্টারিও লেক দেখে কে বলবে এ এক বিরাট সাগর নয়। সাগরের চেয়ে বড় ঢেউ আছড়ে পড়ছে বীচে। রাত নয়টা বাজে এসময় সামারের অন্ধকার নেমে আসে টরন্টো শহরে। জলরাশির খুব কাছাকাছি একবেঞ্চে গিয়ে বসল তারা। হাতের পলি ব্যাগ থেকে বের করল শর্টের ছোট্ট গ্লাস, চিপসের প্যাকেট ছোট টাকিলার পাইট। এক পাইটে প্রায় ছয়টা শর্ট হবে তিনটা করে ভাগে পড়বে। সিনথিয়াকে না বলেই সাবের একটি নয় দুইটি পাইট কিনেছে ‘এলসিবিও’ থেকে। আজ অনেক দিন পর সাবেরও  টাকিলা নেবে। ‘বারিতো’ ঝাল-ঝাল চিপসের সঙ্গে টাকিলা কী দারুণ জমছে সাবের বুঝতে পারল সবই সঙ্গে সিনথিয়া থাকায়। সামনের উত্থাল-পাত্থাল জলরাশি থেকে হেলেদুলে পূর্ণিমার চাঁদ বেরিয়ে চারদিক ঘোলাটে আলো ছড়াচ্ছে।

- জানো সিনথিয়া, আমার কথাতো কিছু বলিনি তোমাকে আমার জীবনও এক মরুভূমির মতো। আই এ্যাম অলসো  লোনলিম্যান। জানেন সিনথিয়া ঐ পূর্ণ চাঁদ থেকে তুমি যেন আজ এক প্রতিমার মতো আমার জীবনে নেমে এসেছো। আহ্ কী অপার্থিব সময়। চাঁদের আলো সিনথিয়ার চিকন ঠোঁটে চিকচিক করে খেলে বেড়াচ্ছে। সাবের নিজের মুখ নামিয়ে এনে সিনথিয়ার কপালে চুমু খেল। সিনথিয়া চোখ বড় করে সাবেরের সুন্দর চোখ দেখছে। এক মধ্যবয়স্ক কবি তাকে কী আবলীলায় চুমু খাচ্ছে।

- সিন্থী তোমার ঠোঁটে কী চুমু খেতে পারি?

না শব্দটি যেন সিনথিয়ার মধ্যে উধাও হয়ে গেছে। সে মৃদুস্বরে বলে হু! সিনথিয়ার মুখ থেকে একটি শব্দ যেমন চুমুর সম্মতির চাবিকাঠি। একটি চুমু দিয়ে শুরু তো হলো। শেষতো হয় না। একের পর এক দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর চুম্বনের সময়। সময় পেরুচ্ছে ঠিক তারা যেন থমকে আটকে আছে পরস্পরের মধ্যে। একসময় দু’জনের শরীর একেবারে লেপ্টে গেছে। সাবের সিনথিয়ার বুকে হাত রাখতে সে এক ঝটকায় সরে বসল। কিছুক্ষণ পরেই সাবেরের চোখে চোখ রেখে মুচকি হেসে আবার কাছে টেনে সাবেরের হাত নিজের বুকে তুলে ধরল। ভাগ্গিস্ শহরটা টরন্টো, ব্লাফাস বীচ পার্ক। খোলা আকাশের নিচে তারা দু’জন পরস্পরের মধ্যে যেন নিজেকে পুঁতে দেয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করছে। অন্টারিও লেকে জলরাশির গর্জন তাদের অভিবাদন জানাচ্ছে। সাধারণ মানুষতো দূরে থাক পুলিশও কখনো প্রেমিক যুগলদের কিচ্ছু বলে না।

আরো ঘণ্টা খানেক পার হয়ে গেছে, তাদের খবর নেই। সিনথিয়ার বাড়ি ফেরার সময় পেরিয়ে যাচ্ছে। লাফিয়ে উঠে দাঁড়াতে  টাকিলার খালি বোতল মাটিতে পড়ে শব্দ হলো।

- চলো, চলো! দেরি হয়ে গেছে। উফ কখন যে সময় পার হয়ে গেল টেরই পেলাম না। ট্যাক্সি পেতে অনেকটা হাঁটতে হবে। প্লিজ সাবের টাকিলার বোতলের মুখগুলো খুলে আমাকে দেবে, আমি জমাব প্রতিটি মুখের সঙ্গে স্মৃতি লেপ্টানো থাকবে। আজতো শুরু, আজকেরটাতো অবশ্য রাখতে হবে।

অনেকটা পথ হেঁটে কিংস্টন রোডে এসে টেক্সি পেল। ট্যাক্সিতে উঠে সাবের আবার কাছে টেনে নিলো সিনথিয়াকে।

-আমার যাওয়ার আগে আমরা কি কোনো মোটেলে কয়েক ঘণ্টা এক সঙ্গে কাটাতে পারি?

- না। d

 

 

 

 

 

 

এই পাতার আরো খবর -
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
২১ জুন, ২০১৮ ইং
ফজর৩:৪৩
যোহর১২:০০
আসর৪:৪০
মাগরিব৬:৫১
এশা৮:১৬
সূর্যোদয় - ৫:১১সূর্যাস্ত - ০৬:৪৬
পড়ুন