উপন্যাসিকা
কিংবদন্তির ভাগীরথী
মনি হায়দার২১ জুন, ২০১৭ ইং
কিংবদন্তির ভাগীরথী
 ‘শ্যাম, ও ঘনশ্যাম?’

মাত্র চোখ লেগে এসেছিল, প্রথম ডাকেই ঘুম ভেঙে যায় ঘনশ্যামের। এত রাতে ফিসফিসিয়ে কে ডাকে! ডাকার মতো এই এলাকায় কেউ আছে? মুহূর্তের মধ্যে ঘনশ্যাম সবক’টা পরিচিত মুখ জরিপ করে, ‘নাহ মোরে এত রাইতে ডাহার মতো কেউ নাই। তয় কেডায় ডাকতেছে?’

‘অ্যাই ঘনশ্যাম?’ গলাটা পরিচিত মনে হচ্ছে কিন্তু মনে আনতে পারছে না। কে হতে পারে?  বিভ্রান্ত ঘনশ্যাম উঠে বসে। কী করবে বুঝতে পারছে না। ডাকে কি সাড়া দেবে? নাকি আর একটু অপেক্ষা করবে?

ঘুটঘুটে অন্ধকার। রাত প্রায় সাড়ে দশটা। ঘুমিয়ে কাদা পিরোজপুর শহরের মুচি ঘনশ্যাম। পাশে ঘুমিয়ে আছে যুবতী  সুন্দরী স্ত্রী ভাগীরথী। ঘনশ্যাম উঠে বসলে ঘুম ভাঙে ভাগীরথীর।

‘কী অইচে?’

ভাগীরথীর মুখে হাত রাখে ঘনশ্যাম, ‘চুপ কইরা থাক! কতা কইস না।’

দুজনের পাশে ঘুমিয়ে আছে চার বছরের ছেলে লালশ্যাম। আর মাত্র তিন দিন দুই রাত—চলে যাবে ঘনশ্যামরা ইন্ডিয়ায়। সব মোটামুটি ঠিক। দুপুরেও নদীর ওপারে গিয়ে কথা বলে এসেছে ঘনশ্যাম। শুরুতে লোকটাকে বিশ্বাস করতে মনে চায়নি। কিন্তু এই বিপদের সময়ে কাউকে না কাউকে তো বিশ্বাস করতেই হয়। তাছাড়া লুত্ফর মিয়ার কাছে পাঠিয়েছে আওয়ামী লীগের নেতা মোজ্জাম্মেল হোসেন। যাকে পিরোজপুরের সবাই ‘মোজাম ভাই’  ডাকে। মানুষও ভালো, দরাজ দিল আর কলিজা ভরা সাহস।

মাসখানেক আগে পিরোজপুরের সবচেয়ে বড় জনসভায় মোজাম ভাই বলেছে, ‘হোনেন আপনেরা। আমার কতা মন দিয়া হোনেন। পাকিস্তানি সৈন্যরা মোগো এই পিরোজপুর শহরে আইলে সবাই মিইল্লা দাও দিয়া কোপাইয়া হালাগো পোনা নদীতে হালাইয়া দিমু। মনে আছে নেতা কইছে, আমরা অগো ভাতে মারমু, পানিতে চুবাইয়া মারমু। আমগো নাম হোনচে চোহে দেহে নাই। একফির পশ্চিম পাকিস্তান দিয়া মোগো এই দ্যাশে আহুক, ধইরা ধইরা এক হালারে পানিতে চুবাইয়া, পানি খাওয়াইয়া মাইরা হালামু। আপনেরা আত তোলেন, কেডা কেডা আমার কতা বিশ্বাস করছেন!’

পুকুরপাড়ের জনসভায় হাজার দশেক মানুষ জমা হয়েছে। একটা হাতও নিচের দিকে নেই, সব হাত উপরে। ঘনশ্যাম কাঁধে ঝুলিয়ে রাখা ব্যাগটা নামিয়ে দুই হাত তোলে। চারদিকে তাকায়—শত শত হাত। হাজার হাজার হাত। অদ্ভুত একটা শক্তি খেলে যায় ওর শরীরে। ‘এতগুলান মানুষ এক লগে অইলে আর কোনো ভয়-ডর থাহে?’ নিজের মনে প্রশ্ন করতে করতে, সাহসে বুক বাঁধতে বাঁধতে জনসভা থেকে বাড়ি আসে। বাড়ি আর কী! কোনো রকমে মাথা গোজার ঠাঁই। দোচালা একটা ঘর। ঘরের মধ্যে একটা পুরোনো দিনের খাট। খাটটা ছিল দাদুর। দাদুর কাছ থেকে পেয়েছে ওর বাবা মুচি ঘটিরাম। ঘটিরামের কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে ঘনশ্যাম। খাটের নিচে গোটা সংসারটাকে লুকিয়ে রেখেছে ভাগীরথী। হাঁড়ি-পাতিলের সঙ্গে পুরোনো ট্রাঙ্ক, দুটি মাটির কলসি খাটের নিচে জড়াজড়ি করে আছে।

উঠানে ঢুকেই দেখে ভাগীরথী রান্না চড়িয়েছে। পাশের পিঁড়িতে বসে ঘনশ্যাম কোচড় থেকে বিড়ির প্যাকেট বের করে দু’হাতে রুটির মতো আলতো ঢলে ঢলে একটা বিড়ি বের করে। ভাগীরথী চুলো থেকে আগুনের একটা কাঠি বাড়িয়ে ধরে। ঘনশ্যাম এক লহমায় বিড়ি ধরিয়ে কষে টান দেয়।

‘কী অইচে আপনের?’ ভাগীরথী জিজ্ঞেস করে।

‘কী অইবে?’

‘আপনে হাসতেছেন যে!’

‘আসতেছি নাহি!’ বলতে বলতে ঘনশ্যামের মুখে সত্যিকারের হাসি দেখা যায়। এতক্ষণ ওর মাথায় ছিল জনসভা। সভার মানুষ আর মুষ্ঠিবদ্ধ হাতের ঐক্য।

চুলোর ভাতে নাড়া দিয়ে ভাগীরথী তাকায়, ‘কইলেন না, আপনে হাসতেছেন ক্যা?’

‘মুই একটা ব্যাপার ভাবতেছি আর হাসতেছি।’

‘কী ভাবতেছেন?’

‘ধরো মোগো এই পিরোজপুর শহরে পাকিস্তানি মিলিটারি আইলো। কত আর আইবে? ধরো পাঁচশো আইবে। আর মোগো পিরোজপুর শহরে কত মানু? দশ বারো হাজার তো অইবেই। হেই পাঁচশো মিলিটারিরে যদি মোরা হক্কলে মিইলালা লড়াইতে থাহি, ওরা হরবেডা কী? ছেঁড়বে কার বালডা? নিজেগো বাল ছেড়তে ছেড়তে দৌড়াইবে আর দৌড়াইবে...’

ঘনশ্যাম হাসি মাখা মুখে এমন মজা করে বলছে, মনে হচ্ছে সে ভাগীরথীকে চমত্কার একটা গল্পের দৃশ্য দেখাচ্ছে। ঘনশ্যামের সঙ্গে ভাগীরথীও সেই দৃশ্য দেখতে পায়। ঘনশ্যামের হাসির সঙ্গে যোগ দেয় ভাগীরথীও, ‘আপনেরে এইসব কেডায় কইচে?’

‘মোজাম ভাই।’

‘মোজাম ভাইয়ে কইচে?’

‘হ। পুহুরপাড়ে তো বিরটা জনসভা। মেলা মানু আইচে। মুই তো অবাক অইচি—মোগো পিরোজপুর শহরে এত মানু অইলো ক্যামনে?’

‘আইবে না?’ ভাগীরথী ভাতের হাঁড়ি তুলতে তুলতে কথা বলে, ‘সবাই যে স্বাধীন অইতে চায়। আর কত কাল পাকিস্তানিগো গোলাম অইয়া থাকবে?’

‘হাসে ঘনশ্যাম, ঠিকই কইচো। পাকিস্তানিগো তাড়াইয়া দেশটা স্বাধীন অইলে আর কেউ মোগো ইন্ডিয়া যাইতে কইবে না। হেরলাইগা জনসভায় মোজাম ভাই কইচে—মিলিটারিগো বাতে মারবে, পানিতে চুবাইয়া মারবে। মুই ভাবতেছি—মিলিটারি অইলে জয় বাংলা কইয়া অগো লড়ান দিমু। লড়ান দিয়া এক্কেরে বলেশ্বর গাঙ্গে হালামু। গাঙ্গে হালাইয়া চুবাইয়া চুবাইয়া ভুরভুরি ছুটাইয়া মাইরা হালামু।’

‘হেরা হাতর জানে না? আপনেরে ছাইড়া দেবে?’

‘আরে মাগী, অগো দেশে গাঙ নাই। খাল নাই। খালি মরুভূমি। চাইর দিকে বালি আর বালি। বালির মইধ্যে হাতর দেবে ক্যামনে?’

‘আপনেরে এইসব কেডায় কইচে?’

‘আমার দোহানে কত মানু আয় পেতেক দিন। বয়, জোতা সেলাই করার সমায়ে কত কতা কয়। হুনি। আর অরা তো মানুষ না, অগো দেশে এহনও মানুরে দাসদাসীর মতো কাম করায়।’

‘হাচাই?’

ঘাড় নাড়ে আর বিড়ির সর্বশেষ অংশে টান দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে ঘনশ্যাম এদিক ওদিক তাকায়, ‘তোমার পোলায় কই? খেলাইতে গেছে?’

‘অ। আপনে বইয়া আছেন ক্যা? পুহুইরে যান। আত মুক ধুইয়া আসেন।’

‘যাইতেছি।’

আড়মোড়া ভেঙে দুদিকে দুহাত ছড়িয়ে উঠে দাঁড়ায় ঘনশ্যাম। চিলতে উঠানে আড়াআড়ি গুনার একটা ছিঁকা টানানো। গুনার উপর ঝুলছে ভাগীরথীর শাড়ি, পেটিকোট, ঘনশ্যামের লুঙ্গি, গামছা। টান দিয়ে গামছাটা কাঁধে নিয়ে ঘনশ্যাম পুকুরের দিকে যায়।

ভাগীরথী আর ঘনশ্যামের এই সুখী বাঙালি জীবনের বিকেল কেটে রাত নামে। পিরোজপুর মহকুমা শহরে মিলিটারি এসেছে এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে। এসেই শহরের কেন্দ্রস্থলের সরকারি হাইস্কুল দখল করে ক্যাম্প বানিয়েছে। ক্যাম্প তৈরির কয়েকদিন পর, রাতের ঘুম ভেঙে যায় ঘনশ্যামের, ভাগীরথীর। দুরে শেয়াল ডাকছে—হুক্কা হুয়া... হুক্কা হুয়া...। শিয়ালের ডাকের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ডাকতে শুরু করেছে কুকুর—হাউ উ...উ হা উ...। আর ভয়ে কাঁপছে ভাগীরথী ও ঘনশ্যাম।

‘অ্যাই ঘনশ্যাম! দরজাটা খোল...’

ঘনশ্যাম তাকায় ভাগীরথীর দিকে। ভয়ে, অন্ধকারে জড়োসড়ো কাঁপছে ভাগীরথী। কুকুরের ডাক আরও তীব্র হয়েছে। বুঝে উঠতে পারে না, আশপাশের কুকুর কেন এত ডাকছে!

‘দেহি কেডায় আইচে?’ খাট ছেড়ে নিচে নামতে যায় ঘনশ্যাম।

পিছন থেকে টেনে ধরে ভাগীরথী, ‘যাইয়েন না। মোর ভয় করতে আচে।’

‘ঘনশ্যাম!’ এতক্ষণে গলাটায় পরিবর্তন এসেছে। শুরু থেকে নরম কণ্ঠে ডাকছিল, এবার গলাটা চড়া হয়েছে। ‘দরজা না খোললে ভাইঙ্গা হালামু কইলো...’

ভাগীরথীর হাত ঝামটা দিয়ে ফেলে ঘনশ্যাম দ্রুত বিছানা থেকে নেমে অন্ধকার হাতড়ে দরজার কাছে যায়। হাতড়ে হাতড়ে দরজার খিল খুলে দিলে, হঠাত্ এক ঝলক ঠাণ্ডা হাওয়া ভিতরে প্রবেশ করে, সেই সঙ্গে পুরো ঘরটা আলোকিত হয়ে যায় গোটা সাতেক তিন ব্যাটারির টর্চের তীব্র আলোয়। ছোটঘরখানা এত আলো সহ্য করতে না পেরে খলবল করে হাসতে থাকে। দরজার সামনে দাঁড়ানো মানুষগুলো সবাই ঘরটার মধ্যে ঢুকেছে। সাতজন মানুষের মধ্যে পাঁচজনই পাকিস্তানি মিলিটারি। দুইজন বাঙালি। একজন সুলতান মাহমুদ। সুলতানের সঙ্গে চ্যালা হামিদ আলী। ধাঁধানো আলোতে চোখ সয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে ভাগীরথী শরীরের আলুথালু কাপড় ঠিক করে লোকগুলোর দিকে ভয়ার্ত চোখে তাকায়।

‘স্যার, এই সেই মাইয়াছেলে।’ ভাগীরথীকে দেখিয়ে সুলতান বলে পাকিস্তানি ক্যাপ্টেন আলী মোহাম্মদকে। ‘স্যার?’ চোখ টিপে সুলতান মাহমুদ, ‘লইয়া লন, মেজর সাব বোঝায় খুশি অইবে।’

পাকিস্তানি ক্যাপ্টেন আলী মোহাম্মদের চোখ লালসায় চকচক করে, মুখের উপর দাঁতাল হাসি, হাসির উপরে এক জোড়া কালো গোঁফ বীভত্সভাবে ঝুলে আছে। ওর পাশে দাঁড়ানো বাকি জওয়ানরাও তাকিয়ে আছে হায়েনার চোখে। দেখছে আলুথালু বিপন্ন ভাগীরথীকে। ভাগীরথী শাড়ি ঠিকই পরেছে কিন্তু ব্লাউজ পরেনি। ফলে স্বাস্থ্যবান সুন্দর শরীরে আলোর তীব্রতায় ওদের চোখ চলসে যায়।

নিজের ঘর কিন্তু দখল হয়ে গেছে। এবং দখল হয়ে যাওয়া ঘরের মধ্যে দাঁড়িয়ে থরথর কাঁপছে ঘনশ্যাম। বুকে তৃষ্ণার ঢেউ। কী করবে বুঝতে পারছে না। পাশে ঘুমিয়ে থাকা ছেলে লালশ্যামের ঘুম নেই। উঠে বসেছে। অবাক ঘরের ভিতরে এত মানুষ, এত আলো, অদ্ভুত পোশাকের মানুষ, হাতে বন্দুক, অজানা ভাষায় কথা বলে।

‘মা?’

ভাগীরথী ছেলেকে ভুলেই গিয়েছিল। লালশ্যামের ডাকে ফিরে তাকায়, বুকের ভিতরে ছেলেকে জড়িয়ে ধরে, ‘লালবাবু, আমার লালবাবু।’

‘ওরা আইচে ক্যা মা?’

‘জানি না লালবাবু, জানি না লালবাবু!’ ভাগীরথী কান্নায় ভেঙে পড়ে।

‘মা!’ লালশ্যামও মায়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কাঁদতে শুরু করে।

‘ছার, এইসব তেলেসমাতি দেইখা কী করবেন। লইয়া লন, ভালো জিনিস।’ এক পাকিস্তানি জওয়ানের কানে কানে বলে চ্যালা হামিদ আলী।

ক্যাপ্টেন আলী মোহাম্মাদ হাত বাড়ায় ভাগীরথীর দিকে। ভাগীরথীর চওড়া কাঁধের উপর আলী মোহাম্মাদ কঠোর হাত রাখে। ঘাড় ফিরে দেখে ভাগীরথী তার কাঁধটা দখল হয়ে গেছে। লালশ্যামকে আঁকড়ে ধরে আরও জোরে, ওকে পিষে বুকের ভেতরে গলিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে। ভাগীরথীর মনে হচ্ছে, জীবনে নেমে আসা হঠাত্ এই দুর্যোগে লালশ্যাম ওকে কোনো না কোনোভাবে রক্ষা করবে।

কিন্তু পাকিস্তানি ক্যাপ্টেন আলী মোহাম্মাদের বলিষ্ঠ থাবায় টার্ন করে ঘুরে যায় ভাগীরথী। বুকের মাঝখানে আঁকড়ে ধরা লালশ্যামকে এক জওয়ান হেঁচকা টানে তুলে এনে মাটিতে ফেলে দেয়। নির্জীব ঘনশ্যাম দৌড়ে এসে সুলতান মাহমুদের দুই পা জড়িয়ে ধরে, ‘সুলতান দাদা, আমার বৌরে ছাইড়া দ্যান। আপনেগো সব জোতা মুই সেলাই কইরা দিমু। আপনেগো সব জোতা কালি কইরা দিমু। মোর বৌরে ছাইড়া দ্যান।’

সুলতান মাহমুদ খুব উপভোগ করে পিরোজপুরের কাঠের পুলের পাশে বসা মুচি ঘনশ্যামের এই আকুল আবেদন। হাসতে হাসতে সুলতান বলে, ‘অ হরো কী রে ঘনশ্যাম? মুই কি ছাইড়া দেওয়ার মালিক? তোর বৌরে ছাড়লে ছাড়তে পারে হুজুরে আর উপরের আল্লায়। তুই আল্লার উপর তোয়াক্কাল রাক, আল্লায় একটা ব্যবস্থা ঠিকই হরবে।’

সুলতান আর ঘনশ্যামের এই সংলাপের মধ্যে ক্যাপ্টেন আলী মোহাম্মাদ হাসতে হাসতে বিপুল বিক্রমে এক বস্তা আটার মতো ভাগীরথীকে নামিয়ে বুকের সঙ্গে ঠেসে ধরে, সবগুলো চোখ অনির্বচনীয় সুখে অনন্য দৃশ্য দেখে। ভাগীরথী দুহাতে প্রাণপণ শক্তিতে পাকিস্তানি ক্যাপ্টেন আলী মোহাম্মাদকে রোখার চেষ্টা করে। কিন্তু ভাগীরথীর সে চেষ্টার সামান্য জোরে ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। বুকের সঙ্গে জাপটে ধরেই আলী মোহাম্মাদ প্রায় পাঁজা কোলে করে ভাগীরথীকে নিয়ে দরজার দিকে যাত্রা করে।

পিছন থেকে ঘনশ্যাম পলকে সুলতান মাহমুদের পা ছেড়ে আলী মোহাম্মাদের পা জড়িয়ে ধরতে যায়, কিন্তু গতির সামান্য হেরফেরের কারণে ঘনশ্যাম পাকিস্তানি হার্মাদ সৈন্যের পা ধরতে পারে না। সে মাটিতে পড়ে যায়। সঙ্গে সঙ্গে পিছনের এক জওয়ান তীব্র লাথি চালায় মিলিটারি বুট পায়ে। ঘনশ্যামের ছোট্ট শরীরটা উড়ে খাটের পায়ার সঙ্গে লাগে। মাথা ফেটে রক্ত পড়তে থাকে। এবং হাতে নিজের শরীরের রক্ত দেখে ঘনশ্যাম জ্ঞান হারায়। এতক্ষণে বীর পাকিস্তানি ক্যাপ্টেন আলী মোহাম্মাদ দরজায় পৌঁছে যায়। পিছনের বাকিরা ছুটতে শুরু করে। দরজা পার হয়ে ভাগীরথীকে নিয়ে ছোট্ট উঠানে নামে। আকাশে বিরাট একটা গোলাকার চাঁদ। জোছনায় ভেসে যাচ্ছে চরাচর। ভাগীরথীকে উঠানে দাঁড় করায় ক্যাপ্টেন আলী মোহাম্মাদ। কিন্তু ভাগীরথী দলামোচা হয়ে উঠানে পড়ে যায়।

মেঝেতে পড়ে যাওয়া ভাগীরথীকে ঘিরে দাঁড়ায় পাকিস্তানি আর্মি এবং বাংলাদেশের রাজাকারেরা। ভাগীরথী বিবশ প্রায়। নিজের প্রিয় উঠানে অনেক চাঁদমাখা রাতে এলিপাতার হোগলা বিছিয়ে গরমের রাতে শুয়েছে ছেলের সঙ্গে। নয়তো ঘনশ্যামের সঙ্গে। এই মুহূর্তে ভাগীরথী কি চাঁদের আলোর রোদন দেখছে; তালের পাখা নাড়তে নাড়তে কি লালশ্যামকে বলছে, ‘এক দেশে আছিল তোর নাহান একটা রাজকুমার।’

‘রাজকুমার কী মা?’

‘রাজকুমার অইলো রাজার পোলা। হের অনেক টাকা। অনেক ঘোড়া। হাতি। রাজকুমার সোনার খাটে শোয়, রূপার থালে খায়।’

‘মা, ওরা কী খায়? মোগো মতো ভাত খায়?’

ভাগীরথী খুব চিন্তায় পড়ে। রাজার বাড়ির মানুষেরা কী খায়? আমাদের মতো সাধারণ মানুষের মতো ভাত-শাকসবজি খায়? নাকি অন্যকিছু খায়? অন্যকিছু খেলে—কী সেটা?

‘মা কতা কও না ক্যা?’

‘অরা কী খায় তোমারে জাইনা আমি কমুআনে। এহন গপ্পটা হোনো।’

‘কও,’ লালশ্যাম ঘন হয়ে মায়ের বুকের সঙ্গে মিশে যায়। একটা পা তুলে দেয় মায়ের উপর। হাই তোলে লালশ্যাম, ‘মা আমার ঘুম আইচে।’

‘আইচ্চা,’ ভাগীরথী ঘুরে শোয় ছেলেকে বুকের সঙ্গে জাপটে ধরে, ‘আইজ ঘুমা। গপ্পোটা কাইল কমুনে।’

কত জোছনামাখা রাত কেটেছে উঠানে। এই মুহূর্তে সেই উঠানটুকুতে কোনো অধিকার নেই। উঠানের অধিকার? অধিকার তো নেই নিজেরই, নিজের উপর।

পাকিস্তানি ক্যাপ্টেন আলী মোহাম্মাদ ইশারা করে একজন দশাসই জওয়ানকে, ‘ওকে তুলে নাও।’

সঙ্গে সঙ্গে জওয়ান এক লহমায় নিজের উঠানের জোছনায় ভূলুণ্ঠিত ভাগীরথীকে তুলে নেয় কাঁধে। বাকিরা করতালি দিয়ে উত্সাহ জোগায়। জওয়ান হাসে জান্তব দাঁতে। সামনে পা বাড়ায়, বাকিরা অনুসরণ করে। কয়েক মুহূর্তে গোটা উঠান ফাঁকা। দরজায় এসে দাঁড়ায় লালশ্যাম।

‘মা? তুমি কোতায়?’

উঠানে কেউ নেই। ভয়ার্ত চোখে শূন্য উঠান দেখে দরজায় দাঁড়িয়ে হাউমাউ কাঁদতে শুরু করে লালশ্যাম, ‘বাবা, ওরা মোর মায়রে লইয়া কই গেছে?’

লালশ্যামের বাবা ঘনশ্যাম তখনও চেতনার ওপারে। শরীর স্থির। অনড়। লালশ্যাম ঘরের মেঝেতে পড়ে থাকা পিতার কোনো সাড়া না পেয়ে পিতার কাছে চারহাত পায়ে ফিরে যায়। কিন্তু পিতার কাছাকাছি হতেই পিতার মাথা ফেটে নেমে আসা রক্তের উপর আছাড় খেয়ে টালমাটাল মাটিতে পড়ে যায়। হতবিহ্বল লালশ্যাম শরীরে পিতার রক্ত নিয়ে দাঁড়িয়ে নাকি সুরে কাঁদছে। কাঁদতে কাঁদতে দাঁড়ায় আবার দরজায় দিকে যেতে থাকে। বাড়ির আশপাশের কুকুরগুলো ফিরে এসে উঠানে দাঁড়িয়ে লেজ নাড়ছে আর থেকে থেকে লালশ্যামের কান্নার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ঘেউ ঘেউ করছে। মনে হচ্ছে কুকুরগুলো লালশ্যামের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কাঁদছে।

মহকুমা শহর পিরোজপুর দখল করে পাকিস্তানি মিলিটারিরা ক্যাম্প স্থাপন করার সঙ্গে সঙ্গে পাকিস্তান সমর্থক জামাতে ইসলামির প্রধান সুলতান মাহমুদ বিকেলের দিকে ক্যাম্পে যায়। মাথায় জিন্না টুপি, সাদা পাঞ্জাবি-পায়জামা পরে, চোখে সুরমা লাগিয়ে সুলতান সামনে সামনে হাঁটছে। পিছনে ত্রিশ থেকে চল্লিশজনের একটি দল গলা ফাটিয়ে চিত্কার করছে—পাকিস্তান জিন্দাবাদ। জিন্দাবাদ- পাকিস্তান। ইয়াহিয়া খান ইয়াহিয়া খান, জিন্দাবাদ জিন্দাবাদ।

গেটের কাছে যেতেই পাকিস্তানি জওয়ানরা থামায় মিছিলটিকে, ‘কিয়া বাত?’

সামনে এগিয়ে যায় সুলতান মাহমুদ, ‘হুজুর আমি খাঁটি মুসলমান। আপনাদের দল জামাতে ইসলামির পিরোজপুরের লিডার আমি। আমার নাম জনাব সুলতান মাহমুদ।’

লোকটার শরীর প্রকাণ্ড হলেও গলায় মেয়েদের স্বর, ‘পাকিস্তানের জন্য জান কোরবান করতে চাই। এই এলাকার অধিকাংশ মানুষ হিন্দু। ওরা আমাগো সাধের পাকিস্তানকে হিন্দুস্থান বানাইতে চায়। আমরা আপনাদের সঙ্গে আছি—জয় পাকিস্তান!’ নিজেই স্লোগান দেয়।

‘বহুত খুব!’ জবাব দেয় জওয়ান মারগুব খান। ‘লেকিন তুমি যে মোসলমান আছ, প্রমাণ কী?’

সুলতান মাহমুদের অবস্থা খারাপ। এত সাধের পাকিস্তানি সৈন্যরা পরনের ইসলামি লেবাস দেখেও বুঝতে পারে না, সে সাচ্চা মুসলমান আর পাক্কা পাকিস্তানি।

‘দেখাও, প্রমাণ দেখাও...’ মারগুব খানের হাতে হালকা মেশিনগান। চোখমুখ ভাবলেশহীন। পিছনে আরও সৈন্য দাঁড়িয়ে রয়েছে। সবারই চোখমুখ পাথরের মতো, নিরেট। প্রত্যেকে প্রস্তত, তীক্ষ, সতর্ক। বাঁশি বাজলে এক মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

এতগুলো লোাকের সামনে এই অপমান! মনে মনে গাল দেয়, ‘হালার পুতগো সামান্য জ্ঞান নাই! এরা শত্রু চেনে না, মিত্র চেনে না। এরা পাকিস্তান আটকাইবে কেমন কইরা? হায় হায়, এই বলদ হালাগো আতে তো পেয়ারা পাকিস্তান বাঁচবে নানে।’

মাথা থেকে জিন্না টুপি হাতে নিয়ে নাড়ায় সুলতান মাহমুদ, ‘হুজুর? ইয়ে হায় জিন্না টুপি। আমাগো জাতির মহান পিতার টুপি। পাকিস্তান হওয়ার পরই আমি এই পবিত্র জিন্ন টুপি মাথায় দিয়া আসছি।’

‘তমিজসে বাতাও বাইনচোত্!’ ঠাস করে গালে থাপ্পর দেয় মারগুব খান, ‘বাতাও কায়েদে আজমকা টুপি...’

পাকিস্তানি জওয়ানের হাতের বিরাশি সিক্কা খেয়ে সুলতান মাহমুদের ব্রহ্মতালু পর্যন্ত টলটল করে নড়ে ওঠে। চোখের তারায় কয়েক সেকেন্ড জোনাক জ্বলতে দেখে দিনদুপুরে। পড়ে যেতে যেতে নিজেকে সামলে নিয়ে সুলতান মাহমুদ টুপিটাকে চুমু দেয়, ‘ইয়ে সহি বাত বল না হায়। ইয়ে হামারা পিতাকা টুপি, জাতির পিতা কায়েদে আজম মোহাম্মাদ আলী জিন্নাকা টুপি।’ বলতে বলতে টুপিটা আবার মাথায় দেয়।

‘কলমা বাতাও...’

‘আমারেও কলেমা কইতে অইবে?’ মনে মনে পাকিস্তান রক্ষাকারী জওয়ান মারগুন খানের চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করে সুলতান মাহমুদ আকন।

পাকিস্তানি মিলিটারিদের ক্যাম্পে আসার আগে বাসার ড্রয়িংরুমে সঙ্গে আসা জামাতের কর্মীদের সঙ্গে অনেক খোশগল্প করেছে। চোখে সুরমা দিতে দিতে বলেছে, ‘আমি সামনে গেলে দেহিস কেমন সোম্মান আমারে করে পাকিস্তানি সৈন্য ভাইরা।’

সবচেয়ে কাছের চ্যালা হামিদ আলী প্রশ্ন করে, ‘ভাইসাব আপনে কি বাংলায় কতা কইবেন হেগো লগে?’

‘আরে না। আমি কমু উর্দ্দু ভাষায়।’

‘উর্দ্দু আপনে কইতে পারেন?’ পিরোজপুর মহকুমা জামাতের সেক্রেটারি হুজ্জত আলী দেওয়ান অবাক গলায় জানতে চায়। মনে হচ্ছে উর্দু জানাটা-বলাটা ফরজের মতো পালনীয় একটা কর্তব্য।

চোখে সুরমা দেয়া বন্ধ করে কটকট করে তাকায় সুলতান মাহমুদ, ‘হোনলা তোমরা? আমারে জিগায় আমি উর্দ্দু কইতে পারি কি না? আরে বেটা, মুই মোর দুলাভাইয়ের লগে পেশোয়ারে ছয় মাস এগার দিন আছিলাম না? হেই ছয় মাস এগার দিনে উর্দ্দু শিকচি না? মুই তো উর্দ্দু ভাষায় চিঠিও লেকতে পারি।’

‘মাশাল্লাহ!’ দক্ষিণ পাড়ার জামাতের কর্মী কেফায়েতউল্লাহ জোরালো কণ্ঠে উচ্চারণ করে, ‘উর্দ্দু হইল মুসলমানদের পবিত্র ভাষা।’

হাসে সুলতান মাহমুদ, ‘মাশাল্লাহ কইলা ক্যা?’

‘আপনে আমাগো পশ্চিম পাকিস্তানের পবিত্র ভাষায় কতা কইতে পারেন, চিডি লেকতে পারেন, মাশাল্লাহ তো কইতেই অইবে। নাইলে আল্লাহপাক বেজার অইবে না?’

‘কতা আরও আছে মেয়ারা,’ ডান কান চুলকাতে চুলকাতে বলল রহিম খান। সবাই ফিরে তাকায় রহিম খানের দিকে। রহিম খান চুপচাপ ধরনের মানুষ। কথা তেমন বলে না। দলের কাজে জান দিয়ে দেয়। মিটিং-মিছিল স্লোগান, সবার আগে রহিম খান। মাঝে মাঝে বন্ধুরা ঠাট্টা করে ডাকে, ‘জেনারেল’। পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে নাকি রহিম খান নামে একজন মেজর জেনারেল আছে। বড়ই কড়া মেজাজের জেনারেল। রহিম খানের খুব ইচ্ছে মেজর জেনারেল রহিম খানের সঙ্গে সাক্ষাত্ করার। গোপন ইচ্ছেটা সে কাউকে বলে না। জানে, বললে সবাই হাসবে।

‘কী খবর মেজর জেনারেল রহিম খান? আইজকাল তোমার দেহা পাওয়া যায় না। থাহো কোন গাবগাছের ডালে?’ মজার ছলে বলে সুলতান মাহমুদ আকন।

‘ডালে থাকমু ক্যা? মুই তো সবসময়ে মাডিতেই থাহি...’

‘হাচ্চোইও?’

রহিম একটু লজ্জা পাওয়ার ভান করে, মুখে হালকা কিন্তু গর্বের একটা জৌলুস নিয়ে তাকায়। ভাবখানা এই রকম, আমি ফেলনা কেউ না। পাকিস্তানের পবিত্র সেনাবাহিনীতে আমার নামে একজন মেজর জেনারেল আছে। যদিও বলছে মেজর জেনারেল কিন্তু কেমন পোস্ট—কত বড় আর্মি অফিসার, কিছুই জানে না।

‘তোমার কতাখান কী?’ প্রশ্ন করে তাকিয়ে থাকে স্কুলের শিক্ষক আমজাদ হোসেন।

‘আমগো নেতায় ছয় মাস এগারো দিন পশ্চিম পাকিস্তানে থাইকা আইচে। হুনচি, পশ্চিম পাকিস্তানে নাহি মরুভূমি। মোগো নবীর দেশেও মরুভূমি। সবই আল্লাহপাকের কুদরত। আরও হুনচি, পশ্চিম পাকিস্তান দিয়া নাহি নবীজীর দেশে যাইতে আডা পোত?’ তাকায় সুলতান মাহমুদের দিকে, ‘কতাটা কি হাচা?’

সুলতান মাহমুদ মেট্রিক পাস করেছে বছর দশেক আগে। মেট্রিক পাস করার আগে মাদ্রাসায়ও পড়েছে কয়েক বছর। সেই সময়ে আরবি-উর্দুর সঙ্গে পরিচয় হয়েছে। সেই পরিচয়টা ফটাফট কথা বলার মতো নয়। বিশেষ করে পবিত্র পাকিস্তান থেকে আসা এই বড় ভাইদের সামনে বলা খুবই লজ্জার। কিন্তু এই নাদান মূর্খদের সামনে সব সত্যি কথা তো বলা যায় না। বললেই পিছনে গিয়ে হাসবে। বাঙালিদের হাড়ে হাড়ে চেনে সুলতান আকন। না চিনে উপায় আছে? ইতিহাসের চরিত্র সে। গজনির পরাক্রমশালী সুলতানের নাম মনে করে দাদাজান নাম রেখেছে, সুলতান মাহমুদ।

সুযোগ পেলেই সুলতান মাহমুদের দাদা ফকিরউদ্দিন পান চিবাতে চিবাতে বলত, ‘গজনির সুলতান মাহমুদ একফির না, দুইফির না, সাতারো ফির ভারত আক্রমণ করেছিল। আর হিন্দুগো হেইকালের সবচাইয়া বড় মন্দির—সোমনাথের মন্দির আক্রমণ কইরা সোনা দানা যা ছিল সব লইয়া গেছে। আমি আমার নাতির নাম রাকছি সেই সুলতান মাহমুদের নামে। দেখবা, নাতি আমার বড় অইয়া একদিন...’

ফকিরউদ্দিনের আশা বা স্বপ্ন কিছুটা হলেও সত্য হয়েছে। নাতি সুলতান মাহমুদ নিজের দেশের বিরুদ্ধে লড়াই করছে। দুর্ভাগ্য বেচারা ফকিরউদ্দিনের নাতির কীর্তি দেখে যেতে পারেনি।

‘কলমা বাতাও!’ খেঁকিয়ে ওঠে মারগুব খান।

‘বলছি বলছি...’ পিছনের সঙ্গীদের দিকে তাকিয়ে একটু হেসে, সামনে তাকায় সুলতান মাহমুদ। খুব তমিজের সঙ্গে নাভির উপর দু’হাত রেখে সুলতান চক্ষু বন্ধ করে বলতে শুরু করে, ‘লা-ইলাহা ইল্লাললাহু...’

কলমা পাঠ শেষে থামে সুলতান।

মারগুব খানের চোখের ইশারায় আরও একজন সেন্ট্রিকে ডাকে। সেন্ট্রি কাছে এলে ইশারা করে সুলতান মাহমুদের পায়জামা খুলে মুসলমানিত্বের চিহ্ন দেখার। সেন্ট্রির মুখে তেরছা হাসি দেখা যায়। ঘটনার আকস্মিকতায় বিমূঢ় সুলতান মাহমুদ আকন। শেষে এই আছে কপালে? পবিত্র পাকিস্তান বাহিনীর সামনে নিজের ইজ্জত দেখাতে হবে? ইজ্জত দেখানোর পর ওরা মনে করবে আমি মুসলমান! আল্লাহর পবিত্র কালেমা পাঠ করার পরও ওরা আমাকে বিশ্বাস করতে পারেনি? কালেমা পাঠে আমি কি কোনো ভুল করেছি? সেই কারণে কি মাশরেকি পাকিস্তানের মহান সৈন্যরা... তারা অনেক দূর দেশ থেকে আসছে, তাদের না হয় ভুল হতে পারে। কিন্তু সঙ্গের এই হারামজাদারা তো কালকের মধ্যে পুরো পিরোজপুর শহরে ঢোল পিটিয়ে জানিয়ে দেবে, সুলতান মাহমুদের ইজ্জত দেখেছে খান ভাইয়েরা।

তখন? তখন কি ইজ্জত থাকবে? বুকের গহীন থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে আসে সুলতান মাহমুদের। এমন বিপদে মহান আল্লাহপাক তাকে কেন ফেলল? নিজের মনে সান্ত্বনা দেয় পিরোজপুর জামাতের নেতা সুলতান মাহমুদ—মহান আল্লাহপাক তার প্রিয় বান্দাদের বিপদের মধ্যে ফেলে পরীক্ষা করে থাকে। নিশ্চয় পাকিস্তানের ইসলামের এই বিপদের সময়ে আমাকেও পরীক্ষা করছেন। দেখেছেন আমার ইমানের তাকদ। সেই কারণে পাকিস্তানের মহান ইসলামের খেদমতদার সৈন্যদের দিয়ে...
‘এই মিয়া পাজামা খোলো!’ আদেশ করে সেন্ট্রি।

ঢোঁক গিলে সোমনাথ মন্দিরের মহান দখলদার অধিপতি পিরোজপুরের সুলতান মাহমুদ। সত্যিই কি তাদের দিলে কোনো রহম নাই? দিন দুপুরে আমার মাইনষের সামনে আমার পায়জামা খুলে গোপন ইজ্জতের মাথা দেখাতে হবে? ইয়া মাবুদ, ইসলাম এখন দাঁড়িয়ে আছে কাটা আর না-কাটা ইজ্জতের উপর? পিছনের লোকগুলো নির্বাক পাথরের মতো তাকিয়ে আছে। মনে হচ্ছে ওদের শরীর থেমে গেছে। শ্বাস-প্রশ্বাস চলছে না। ‘ওই হলারা, তোরা চইলা যা। তোগো দিয়া আমার কেনো কাম নাই। তোরা কেবল সঙ সাইজা ঢং দেখাইতে আইচো!’ মনে মনে চৌদ্দগুষ্টি তুলে গালি দেয় সুলতান মাহমুদ আকন।

‘ওই মিয়া কানে হোনো না? তুমি খাঁটি মুসলমান কি না, আগে দেখতে হবে। খোলো তোমার পাজামা!’ কর্কশ ভাষায় ধমক দেয় সেন্ট্রি।

‘হুজুর আমি তো পবিত্র কলেমা পাঠ করে শুনাইচি। কলেমা পাঠের পর ইজ্জত নিয়ে কেন টানাটানি করছেন?’ খুব মোলায়েম স্বরে বলে সুলতান মাহমুদ।

‘আমাদের ভয়ে অনেক হিন্দু নাকি কলেমা শিখেছে। সেটা মুখস্থ করাও যায়... কিন্তু ইজ্জত কাটা না থাকলে চট করে কাটা যায় না। দেখাও হে সুলতান মাহমুদ তোমার ইসলামের নিশান...’

যুক্তিটা পছন্দ হয়েছে সুলতান মাহমুদের। সে নিজেও শুনেছে, অনেক হিন্দু জান বাঁচানোর জন্য কালেমা শিখছে। মাথায় টুপি পরে হাঁটে। যেহেতু না খুলে উপায় নেই, সেহেতু মুখ কাঁচুমাচু করে সুলতান মাহমুদ পায়জামার গিঁট খুলতে শুরু করে। শরীর কাঁপছে। চোখ দিয়ে পানি নামছে। পায়জামার গিঁট খুলতে খুলতে পিছনে তাকায়। পিছনে দাঁড়ানো কর্মীরা সুলতান মাহমুদের দিকে পিছন দিয়ে পশ্চিমমুখী হয়ে দাঁড়িয়ে গেছে। মনে মনে ওদের উপর খুব খুশি হয় সুলতান মাহমুদ—না হালাগো কিছুটা অইলেও আক্কেল বুদ্ধি আচে। নেতার ইজ্জত দেখার লাইগা চাইয়া রয় নাই।

‘আবি খোলো!’ সেন্ট্রির ধমকে দুই হাতে ধরা পায়জামার ফিতা হাত থেকে ছুটে নিচে পড়ে যায়। কোমরের উপর তোলা পাঞ্জাবি। নিচের দিকটা খোলা মাঠ। হু-হু বাতাস আসছে আর যাচ্ছে। সেন্ট্রি কোমড় বাঁকা করে সুলতান মাহমুদের ইজ্জত দেখছে। অদূরে দাঁড়ানো মারগুব খান গোটা ঘটনা উপভোগ করে মিটিমিটি হাসে। সেন্ট্রি দেখতে পায়, সুলতান মাহমুদের ইজ্জত নেই বললেই চলে। ঘটনার বজ্রপাতে ইজ্জত গুটিয়ে শরীরের ভিতরে ঢুকে গেছে। কেবল একটা শিকড়ের মতো নুয়ে আছে নিচের দিকে, তবে কাটা ইজ্জত। এবং অনেক পুরানো কাটা। সেন্ট্রি দাঁড়িয়ে মারগুব খানকে জানায়, ‘স্যার! ইয়ে আদমির ইজ্জত ঠিকঠাক কাটা হায়।’

‘তুমি উনকো মেজর সাহেবের কাছে নিয়ে যাও।’

‘ওকে স্যার,’ সেন্ট্রি ঘুরে দাঁড়িয়ে জানায় সুলতান মাহমুদকে, ‘চলো হামরা সাত।’

পাকিস্তানি মেজরের সঙ্গে দেখা হবে, শোনার সঙ্গে সঙ্গে সুলতান মাহমুদ হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে সেন্ট্রির পিছু পিছু হাঁটা ধরে, কিন্তু তিন-চার পা হাঁটার পরে অনুভব করে সে ন্যাংটো। পাথরের মতো জমে থাকে কয়েক মুহূর্ত সুলতান। মারগুব খান হাসে, পিছনের সাগরেদরা অবাক হয়ে হুজুরের কাণ্ড দেখে আর জিহ্বায় কামড় দিয়ে মনে মনে উচ্চরণ করে, ‘নাউযুবিল্লাহ।’

সুলতান মাহমুদ দ্রুত সামলে নিয়ে পায়জামা দুহাতে তোলে, পায়জামা তোলার সময়ে কোমর বাঁকা করে নুয়ে যেতে হয়েছে, এই সময়ে ইজ্জতের নিচ ও দুই হাঁটুর মাঝ বরাবর দিয়ে সাগরেদদের দিকে তাকায়, সব সাগরেদ বস্ফািরিত চোখে তাকিয়ে দেখছে হুজুরের কীর্তি।

হালারা, তোরা আমার ইয়ে মানে ইজ্জতের দিহে চাইয়া আছ ক্যা? পশ্চিমে চাইয়া থাক—আপন মনে বলতে বলতে পায়জামার গিঁট কোমরের সঙ্গে শক্ত করে বাঁধে। বাঁধতে বাঁধতে সুলতান মাহমুদ আকন সেন্ট্রির পিছনে পিছনে হাঁটতে থাকে। আরেকটা তৃপ্তির নিঃশ্বাস ছাড়ে, যাক আল্লার রহমতে মেজর সাহেবের সঙ্গে দেখা হচ্ছে! না জানি পেয়ারা পশ্চিম পাকিস্তানের মেজর সাহেব দেখতে কত বড়! আচ্ছা মেজর সাহেবের শরীরের রং কেমন? নিশ্চয়ই ফেরেস্তাদের রং হবে। আহারে কেবল পবিত্র ইসলাম রক্ষা করার জন্য কত দূর থেকে এসেছে। এই ফেরেস্তাদের সেবা না করলে আল্লাহ বেজার হবে না!

মেজর ইসকান্দার হায়াত্ খানের মেজাজ টগবগ করে ফুটছে।

সকাল থেকে পিরোজপুরের গোটা শহর চষে বেড়িয়েছে, একজন মুক্তিও ধরতে পারেনি। অথচ ঢাকার হেড কোয়ার্টার থেকে মেজর জেনারেল কোব্বাদ খান হুঙ্কার ছাড়ছে, ‘এই শালারা তোদের পাঞ্জাব থেকে আনা হয়েছে কি ভ্যারেন্ডা ভাজতে? এই দেশের যত জোয়ান ছেলে আছে সবাইকে ধরে কচুকাটা করবি। আর শোন, কাছে কোনো নদী আছে?’

‘আছে স্যার,’ ফোন হাতে অ্যাটেনশনে দাঁড়িয়ে ইসকান্দার হায়াত্ খান।

‘তোমাদের পিরোজপুর শহর থেকে নদী কত দূরে?’

‘কাছেই স্যার,’ কতটা কাছে নির্দিষ্ট করে বলতে পারছে না। পিরোজপুরে এসেছে চারদিন, মাত্র একবার গাড়িতে বের হয়ে শহরটা চক্কর দিয়েছে। শহরটা খুবই ছোট কিন্তু ছিমছাম। লোকজন বিশ হাজারের মতো। বের হয়ে গোটা এলাকা দেখার সময় কোথায়? প্রভু ইয়াহিয়া খানকে অনুসরণ করে মেজর ইসকান্দার হায়াত্ খান। প্রভু চব্বিশ ঘণ্টা মদ্যপানে ডুবে থাকে অফিসে। মেজর হায়াতেরও মদ্যপান করতে অসম্ভব ভালো লাগে। কিন্তু মদ্যপানের ভালোলাগার কথা তো মেজর জেনারেল কোব্বাদ খানকে বলতে পারে না। জেনারেল কোব্বাত খান আবার খাঁটি মুসলমান। মদ্যপানকে অসম্ভব ঘৃণা করে। এমনকি প্রভুকেও...। লোকজনকে শুনিয়েই বলে, ‘এই রকম মদ্যপানে আসক্ত একজন প্রেসিডেন্টই পাকিস্তানকে ডোবানোর জন্য যথেষ্ট।’

‘কত মাইল দূরে?’ ফোনের অন্যপ্রান্তে জেনারেলের অসহিষ্ণু গলা।

‘স্যার এক মাইল হবে।’

‘এক মাইল?’

‘জি স্যার।’

‘গুড, ভেরি গুড। বাঙালিদের ধরে ধরে, যাকে যেখানে পাও, নারী-পুরুষ আর শিশু সবাইকে ধরে ট্রাকে বোঝাই করে নদীর পাড়ে নিয়ে যাবে।’

‘স্যার!’

‘নদীর পাড়ে নিয়ে এক লাইনে দাঁড় করিয়ে গুলি করবে। এক লাইনে দাঁড় করিয়ে গুলি করলে গুলি খরচ কম হবে। কম গুলি খরচে বাঙালিদের মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেবো। চিরকালের জন্য জলে ভেসে যাবে, শেখ মুজিব সাতই মার্চের ভাষণে কী বলেছিল, মনে আছে?’

‘স্যার!’

‘গর্দভ কোথাকার!’ জেনারেলে কণ্ঠে মৃদু তিরস্কার। ‘শেখ মুজিব নির্দেশ দিয়েছিল বাঙালিদের, আমাদের ভাতে আর পানিতে মারার। আমরা দেখিয়ে দিতে চাই, কারা কাদের ভাতে আর পানিতে ডুবিয়ে মারে। নদীর তীরে দাঁড় করিয়ে গুলি করলে একেবারে সোজা পানিতে পড়বে। তোমাকে আর জোয়ানদের টেনে টেনে সরাতে হবে না। রক্তও থাকছে না। ওদের নদী ওদের রক্ত খেয়ে নেবে।’

‘স্যার!’

‘আরও একটা ব্যাপার মেজর...’

‘বলুন স্যার।’

‘রক্তের দাগ থাকবে না,’ হা-হা হাসিতে জেনারেলের মুখ ভরে ওঠে, মনে হচ্ছে জেনারেল চমত্কার একটা ঠাট্টা করেছে। ‘দেশ-বিদেশের সাংবাদিকেরা এসে দেখবে দেশটা পুতপবিত্র, বাঙালিরা কী যেন বলে, সবুজে শ্যামল দেশ—তাই না?’

‘জি স্যার।’

‘দেশটা সবুজই থাকবে কিন্তু সেই সবুজ দেখার জন্য কোনো লোক থাকবে না,’ জেনারেলের কণ্ঠ ক্রমশ কর্কশ হয়ে উঠছে, ‘মনে আছে তোমার?’

‘স্যার?’

‘আমাদের গর্ভনর মি টিক্কা খান কী বলেছে? বলেছে, পূর্ব পাকিস্তানে কোনো জীবিত মানুষ আমরা চাই না। আমরা চাই মাটি। কেবল মাটি। আমরা ঠিক সেভাবেই এগোবো। জেন্টলম্যান?’

‘স্যার?’

‘মনে রেখো, আমরা কোনো জীবিত বাঙালি চাই না। চাই মাটি।’

‘জি স্যার।’

‘শোনো আরেকটি নির্দেশ...’

‘স্যার?’

‘বাঙালি মেয়েদের—যেকোনো বয়সেরই হোক যদি মনে করো বাচ্চা প্রসব করতে পারবে, তাদের হত্যা করো না। ওদের ক্যাম্পে এনে রাখবে। বুঝতে পারছ তো?’

‘জি স্যার।’

‘ওদের গর্ভে খাঁটি পাকিস্তানি নাগরিক পয়দা দিতে চাই। আমাদের ঔরসে এই মাটিতে যেসব বাচ্চা পয়দা হবে কয়েক বছর পর ওরা আমাদেরকে মান্য করবে। আমাদের নাগরিক হবে, প্রতিবাদ করবে না আমাদের শাসনের কিংবা শোষণের। জেন্টলম্যান আমার কথা আন্ডারস্ট্যান্ড?’

‘জি স্যার।

‘বাই,’ জেনারেল কোব্বাদ খান লাইন কেটে দিয়ে আরেক মহকুমায় কমান্ডিং অফিসারকে ফোন করতে শুরু করে।

২৬ মার্চ অপারেশন সার্চলাইট নামে হত্যাযজ্ঞ শুরু হওয়ার তিন দিন পর রাওয়ালপিন্ডির হেড কোয়ার্টার থেকে মেজর জেনারেল পীরজাদা ইস্টার্ন কমান্ডের হেড কোয়ার্টারে ফোন করে শীর্ষ জেনারেলদের বৈঠকের নির্দেশ জানিয়ে দেয়। সেই নির্দেশ একের পর এক জানিয়ে যাচ্ছে মেজর জেনারেল কোব্বাদ খান।

কোব্বাদ খানের ফোন শেষে গাড়ি নিয়ে বের হয়েছিল মেজর ইসকান্দার হায়াত্ খান। কিন্তু অবাক ঘটনা, গোটা পিরোজপুর শহরে কোনো মানুষ নেই। বিশেষ করে শক্ত সমর্থবান তরুণ নেই বললেই চলে। কোথায় গেল ওরা? মাটির ভিতরে গর্ত করে লুকিয়ে আছে? বাঙালিরা কি এতটা সচেতন? ওরা তো ভেতো বাঙালি। জীবনে কখনও যুদ্ধ করেনি। হাসি পায় মেজর ইসকান্দার হায়াত্ খানের—ছাব্বিশে মার্চের অপারেশন সার্চলাইটের রাতে সে ঢাকায় ছিল। অপারেশনে অংশও নিয়েছিল। অপারেশনের শুরুতে ভীষণ নার্ভাস ছিল ইসকান্দার হায়াত্ খান। মনের খুব গভীরে একটা প্রশ্ন ছিল—পূর্ব পাকিস্তান, হোক না আমাদের দেশ থেকে বারোশো মাইল দূরের এক খণ্ড ভূমি। এখানের মানুষ তো মুসলমান, কেন তাদের হত্যা করব? কিন্তু জেনারেলদের মিটিংয়ের পর ইসকান্দার হায়াত্ খানের সব প্রশ্ন শেষ হয়ে যায়। মিটিংটা হয়েছিল ঢাকার ক্যান্টনমেন্টে লে. জেনারেল আমীর আবদুল্লাহ খান নিয়াজীর দরবার হলে। লে. জেনারেল নিয়াজী নিজেকে টাইগার নিয়াজী বলতে পছন্দ করে।

পূর্ব পাকিস্তানে আসার আগে মেজর ইসকান্দার হায়াত্ খান ছিল উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের একটি ব্রিগেডের ব্রিগেড কমান্ডার। উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ বাঙালিদের মতো স্বাধীন হওয়া খোয়াব দেখতে শুরু করেছে সীমান্ত গান্ধী খান আবদুল গাফফার খানের নেতৃত্বে। সীমান্ত গান্ধীর এখানে অনেক অন্ধ অনুসারী রয়েছে। সেই অনুসারীদের চিরতরে ঠাণ্ডা করতেই সাতটি ব্রিগেট পাঠানো হয়েছিল। সাতটি রেজিমেন্টের একটি রেজিমেন্ট ছিল বালুচ রেজিমেন্ট। উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে মাত্র কয়েক দিন হলো এসেছে, এখনও সব বুঝে উঠতে পারেনি আবার হঠাত্ করেই ডাক আসে পূর্ব পাকিস্তানে যাবার।

পূর্ব পাকিস্তান সম্পর্কে কোনো আগ্রহই ছিল না। ইসকান্দার হায়াত্ খান পাঞ্জাবের মানুষ। পাঞ্জাবের মানুষ হিসেবে গোটা পাঞ্জাববাসীর মতো সেও মনে করে পাঞ্জাব মানে পাকিস্তান। যেহেতু পাঞ্জাব পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় প্রদেশ, লোকসংখ্যাও বেশি, গোটা পাকিস্তান শাসনও করছে পাঞ্জাবের মানুষ। পূর্ব পাকিস্তানে কি একটা গোলমাল চলছে, শুনেছে অনেক দিন আগেই। শেখ মুজিবুর রহমান, আওয়ামী লীগের নেতা নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। মনের কোণে যে প্রশ্নটা উসকে দিয়েছে বিগ্রেডের সেকেন্ড ইন কমান্ডার সাখাওয়াত্ হোসেন খান, সেটাই করোটির ভিতর ঘাঁই মারে—বাঙালির শাসন কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না।

কেন? ওরা তো সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে।

পেয়েছে তো কী হয়েছে, রাতের ডিনার টেবিলে মুরগির রোস্ট খেতে খেতে আলাপ হচ্ছে। বাঙালিরা মানুষ নাকি? আমার দাদা বলেছে, ‘বাঙালিরা যদিও মুসলমান, কিন্তু ওরা এসেছে নিম্নবর্ণের হিন্দু থেকে। উচ্চ বর্ণের ব্রাহ্মণদের অত্যচারে অতীষ্ঠ হয়ে নিম্নবর্ণের হিন্দুরা শত শত বছর আগে দলে দলে মুসলমান হয়েছে। সুতরাং পূর্ব পাকিস্তানের মুসলমানেরা নিম্নবর্ণের মুসলমান। ওদের শাসন করার অধিকার আমাদের আছে।’

‘কিন্তু মুসলমান তো?’ প্রশ্ন করে জুনিয়র অফিসার জাবেদ ‘আখতার। ইসলামে তো সবাইকে সমান অধিকার দেয়া হয়েছে।

বাচ্চে, তোমার কথা ঠিক কিন্তু সবার আগে আমি, আমার দেশ।’ অনেকটা পোড় খাওয়া রাজনীতিবিদদের মতো কথা বলল সাখাওয়াত্ হোসেন খান, ‘পাকিস্তান মুসলমানদের দেশ। দুনিয়ায় সেইসব দেশ সম্মান পায়, যারা কলোনি বানিয়ে কোনো জাতিকে শাসন করতে পারে। আল্লাহপাক আমাদের সেই সম্মান দিয়েছে—বাঙালিদের শাসন করার মধ্যে দিয়ে। এখন তুমি বলো, আমরা কি আমাদের এই গৌরব, এই সম্মান গণতন্ত্রের নামে, সংখ্যাগরিষ্ঠের নামে বিসর্জন দেবো?’

‘মোটেই না,’ ডাইনিং টেবিলে উপস্থিত পঞ্চাশজন জুনিয়র অফিসারদের সবাই সমর্থন করেছে সাখাওয়াত্ হোসেনকে। একজন জুনিয়র অফিসার কাওনাইন রসুল লাফ দিয়ে ডাইনিং টেবিলের উপর উঠে দাঁড়ায়, ‘আমারা বাঙালিদের শাসন করব, শাসন করে ওদেরকে সভ্য বানাব। ফিল্ড মার্শাল আইউব খান বলেছে—বাঙালিরা হাইওয়ান। বন্ধুরা হাইওয়ান মানে জানোয়ার। আর জানোয়ারদের পোষ মানানো, শেখানো আমাদের দায়িত্ব। যেহেতু তারা আমাদের কওমের ভাই। সুতরাং সাখাওয়াত্ স্যারের সঙ্গে আমি এবং আমার বন্ধুরা সম্পূর্ণ একমত—বাঙালিদের যে কোনো উপায়ে হোক দমন করতে হবে। নো গণতন্ত্র। নো সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন—আমরা যেটা বলব সেটাই গণতন্ত্র, সেটাই সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন ব্যস!’ নিজের বক্তব্য শেষ করে কাওনাইন রসুল টেবিলের উপর দাঁড়িয়ে কোমর দুলিয়ে নাচতে থাকে। রসুলের নাচের সঙ্গে সব অফিসার জওয়ান হাততালিতে ফেটে পড়ে। কেউ কেউ থালা-গামলার সঙ্গে চামচ পিটিয়ে নাচের গতিকে বাড়িয়ে দেয়।

সত্যি বলতে কী, সেই রাতটা অসম্ভব উত্তেজনায় কেটেছিল মেজর ইসকান্দার হায়াত্ খানের। যদিও ভারতের চেয়ে অনেক ছোট একটা দেশ পাকিস্তান। সেই ছোট পাকিস্তানের একটা কলোনি আছে, যা ভারতেই নেই। অন্তত এই দিক থেকে পাকিস্তান এগিয়ে আছে ভারতের চেয়ে।

উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের সেনা ক্যাম্পে মাস তিনেক আগের ঘটনা ঘটছে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে। জানুয়ারির মাঝামাঝি। ঢাকা এয়ারপোর্টে এসে বিমান থেকে নামার পর গাড়িতে করে পাশের ক্যান্টনমেন্টে ঢোকার পর বাইরে আর বের হয়নি মেজর ইসকান্দার হায়াত্ খান। গোটা পূর্ব পাকিস্তান আলাদা একটা দেশে পরিণত হয়েছে। অবাক ইসকান্দার, পাকিস্তানি ফৌজেরা এসব মানছে কেন? কেন ঝাঁপিয়ে পড়ছে না বাঙালিদের উপর?

বিগ্রেডিয়ার আরবাব মিয়া জানায়, ‘ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য প্রস্তুতি লাগে বাচ্চা।’

‘আমাদের কি প্রস্তুতি নেই?’

‘আছে,’ হাসে বিগ্রেডিয়ার, ‘কিন্তু আরও প্রস্তুতি দরকার। আমরা অনেক দূরের একটা দেশে আছি—যে দেশের মানুষ শতকরা নব্বই ভাগ আমাদের বিরুদ্ধে। তাদের শায়েস্তা করা তো চাট্টিখানি কথা নয়—আরও সৈন্য, গোলাবারুদ দরকার। সব আসছে...’

‘কোথায় আসছে স্যার? প্রেসিডেন্ট জেনারেলকে টিভিতে দেখলাম ভুট্টোর মতো একটা ব্লাডি সিভিলিয়ানের সঙ্গে লারকানার বাগান বাড়িতে হরিণ শিকারে গেছে। যে লোকটা ক্ষমতা ছাড়া কিছুই বোঝে না। এদিকে আমরা আটকে আছি ঢাকার ক্যান্টনমেন্টের ভিতরে,’ তরুণ মেজরের কণ্ঠে উদ্বেগ, ক্রোধ।

বিগ্রেডিয়ার আরবাব মিয়ার ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে বাসার লনে চা খেতে খেতে কথা হচ্ছে মেজর ইসকান্দার হায়াতের সঙ্গে। চা পরিবেশন করছে বিগ্রেডিয়ারের স্ত্রী মিসেস দিলরুবা খান। সঙ্গে কন্যা নাজিয়া খান। বিগ্রেডিয়ার কোব্বাতের ইচ্ছে মেজর ইসকান্দারকে জামাতা বানানো। ইসকান্দারের পিতা পেশোয়ারের বিশিষ্ট ব্যবাসায়ী আবুল হায়াত্ খানের সঙ্গে স্কুল ও কলেজে পড়াশোনা করেছে।

‘আমি দুপুরে ঢাকা শহর ছদ্মবেশে ঘুরেছি, পূর্ব পাকিস্তানের কোথাও পাকিস্তানের পতাকা নেই। সব জায়গায়—অফিসে বাড়িতে বাংলাদেশের পতাকা উড়ছে। কোথাও চাঁদ তারার পতাকা নেই। ক্রোধে ঘৃণায় আমার শরীর কেঁপে উঠছে স্যার। আমার কাছে আর্মস থাকলে আমি অনেক বাঙালিকে রাস্তার উপর চিরকালের জন্য শুইয়ে দিতাম!’ দুপুরের রাগ এখনও মেজরের কণ্ঠে বাজে। উত্তেজিত মেজর ইসকান্দারের বীরত্বপূর্ণ মুখের দিকে তাকিয়ে আছে নাজিয়া খান।

বিগ্রেডিয়ার কোব্বাদ খান চায়ের উষ্ণ পেয়ালায় চুমুক দিতে দিতে তরুণ মেজরের দিকে তাকিয়ে হাসে, ‘তোমার উত্তেজনা বুঝতে পারি জেন্টালম্যান। আর কয়েকটা দিন অপেক্ষা কর, সব ডাণ্ডা মেরে একেবারে ঠাণ্ডা করে দেয়া হবে।’

চায়ের পেয়ালায় অর্ধেক চুমুক দিয়ে নামিয়ে রাখে মেজর, ‘কিন্তু স্যার কীভাবে? এখানে পাকিস্তানের কোনো শাসন নেই—সব চলছে শেখ মুজিবের নির্দেশে। ওদিকে প্রেসিডেন্ট লারকানা...’

হাত তোলে বিগ্রেডিয়ার, ‘শোন ইসকান্দার, প্রেসিডেন্টকে এত কাঁচা মনে করো না। যেহেতু দেশে একটা ইলেকশন হয়েছে। আমরা জাতির কাছে দুনিয়ার কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ক্ষমতা জনগণের কাছে ফিরিয়ে দেবো। হ্যাঁ দেবো কিন্তু কোন জনগণের কাছে? আমাদের জনগণ মানে পশ্চিম পাকিস্তানের জনগণের কাছে। আর পশ্চিম পাকিস্তানের এই মুহূর্তের নেতা কে? মি. ভুট্টো। আমরা মি. ভুট্টোকে খুব ভালোভাবে চিনি, জানি। ক্ষমতার জন্য লোকটা নিজেকে বিক্রি করে দিতে পারে। প্রশ্ন, কেন প্রেসিডন্ট এই রকম লোকটার কাছে গেছে? ওই যে গণতন্ত্র—জনগণ, জনগণের নেতা—এই কারণে গেছে। শিকারের বাহানায় মূলত নকশা প্রস্তত হচ্ছে।’

‘কীসের নকশা?’

‘চিরকালের জন্য বাঙালিদের ঠাণ্ডা করার নকশা?’ প্রথম মুখ খোলে নাজিয়া খান।

‘ঠিক আছে, বাঙালিদের ঠাণ্ডা করতে হবে, করব। কিন্তু এত সময় ব্যয় করার কী আছে? শেখ মুজিবসহ কয়েকজন প্রথম সারির নেতাদের গ্রেফতার করে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দিলেই হলো। আর এই দেশের জনগণ? ওরা তো ভাতে মরা জাতি। গুলি করে কয়েক হাজার মেরে ফেললেই ওরা চিরকালের জন্য সোজা হয়ে যাবে।’

আবার হাসে ব্রিগেডিয়ার কোব্বাত, ‘তোমার বয়স কম। বাস্তবতা বুঝতে আরও একটু সময় লাগবে। শোনো, পূর্ব পাকিস্তানের ভৌগলিক অবস্থানটা দেখেছ? মাত্র পঞ্চান্ন হাজার বর্গমাইলের দেশ। অবস্থানগত কারণে ঢুকে আছে আমাদের চির শত্রু ভারতের পেটের ভিতরে। তিন দিক দিয়ে ভারত কাঁটাতারের মতো মুখ হা করে আছে। এই অবস্থানের দুটি দিক—এক ভারত যেকোনো সময় পূর্ব পাকিস্তানের উপর হামলা করতে পারে। যদি হামলা করে অধিকার করে নেয়, আর জনগণ যদি লড়াই শুরু করে ভারতের বিরুদ্ধে, ভারত ভয়ানক বেকায়দায় পড়বে। আমরা ঠিক সেইটা চাই...’

মেজর ইসকান্দার হায়াত্ খানের চোখ ছানাবড়া, ‘এটা কীভাবে সম্ভব?’

‘সম্ভব। সে কারণেই মি. প্রেসিডেন্ট লারকানায় ক্ষমতাখাদক মি. ভুট্টোর বাগানবাড়িতে গেছে। প্রেসিডেন্ট একা যায়নি, বেশ কয়েকজন জেনারেলও গেছে,’ বিগ্রেডিয়ার কোব্বাতের মুখে হাসি। মেজর ইসকান্দার হায়াত্ খান তাকিয়ে থাকে কোব্বাত খানের দিকে। তাকিয়ে থাকতে থাকতে গোটা ঘটনার একটা ব্লুপ্রিন্ট ওর মগজে সেঁটে যেতে থাকে। মেজর যে ঘটনাটা বুঝতে পেরেছে, বুঝে হাসে নাজিয়া খান।

‘বুঝলে হায়াত্,’ বলে নাজিয়া, যুদ্ধের নানা রকম কৌশল থাকে। ‘এখন চলছে সময় পার করার কৌশল আর পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সৈন্য, আধুনিক অস্ত্র আনার পালা।’

‘তুমি কী করে জানলে?’

‘বাবার আলোচনা শুনি যে প্রত্যেক দিন। আমি চাই চিরকালের জন্য বাঙালিকে মাটিতে মিশিয়ে দিতে। এতবড় সাহস বাঙালিদের—আমাদের জাতির পিতাকে অসম্মান করে!’ বিগ্রেডিয়ার কোব্বাত খানের কন্যা নাজিয়া খান দাঁতে দাঁত পিষে, মনে হচ্ছে এই মুহূর্তে কোনো বাঙালি পেলে সত্যি মেরে ফেলবে। নাজিয়ার আক্রমণাত্মক রূপ দেখে মেজর ইসকান্দার হায়াত্ খান ভিতরে ভিতরে দারুণ উল্লাসে ফেটে পড়ে। এই রকম একটা জেদি মেয়েই তো আমি চেয়েছি। বিছানায় এরা নিজেদের যেমন সুখী করতে পারে, সুখ দিতে পারে বিপরীত পার্টনারকেও।

‘কথা অনেক হয়েছে, চলো খেতে চলো,’ বলে মিসেস দিলরুবা খান।

‘হ্যাঁ চলো,’ দাঁড়ায় বিগ্রেডিয়ার। সঙ্গে সঙ্গে দাঁড়ায় ইসকান্দার ও নাজিয়া খান। আড়মোড়া ভাঙে ইসকান্দার, ভিতরে চলে যায় মি. ও মিসেস ব্রিগেডিয়ার। চোখের আড়াল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মেজর জড়িয়ে ধরে নাজিয়া খানকে। নাজিয়াও দু’হাতে জাপটে ধরে মেজরকে।

মেজর ইসকান্দার হায়াত্ খানের সামনে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে সুলতান মাহমুদ আকন। পিরোজপুর মহকুমা শহরের বিশিষ্ট ইসলামি নেতা। জামাতে ইসলামির সভাপতি। অদূরে নিজের চেয়ারে বসে আছে মেজর। সামনের টেবিলের উপর ওয়াইনে পরিপূর্ণ গ্লাস। পাশের প্লেটে মুরগির মাংস, বাদাম। সকাল থেকে মদে চুর মেজর ঢুলুঢুলু চোখে তাকায়, ‘কিয়া বাত?’

সেন্ট্রি স্যালুট দিয়ে বুক সোজা করে দাঁড়ায়, ‘স্যার, এই বাঙালি আপনার সঙ্গে দেখা করতে চায়।’

‘কেন?’ মুখে গ্লাস লাগিয়ে তাকায় আকনের দিকে, ‘তুমি কী চাও?’

‘হুজুর, আমি মাশরেকি পাকিস্তানের একজন খাঁটি ইমানদার মুসলমান। জামাতে ইসলামির পিরোজপুর সাব ডিভিশনের আমি সম্মানিত সাধারণ সম্পাদক। আমার নাম জনাব সুলতান মাহমুদ আকন। এই এলাকার সব আমি চিনি। শেখ মুজিবের দল আওয়ামী লীগের সব নেতার ঘরবাড়ি আমি চিনি। আমার দলের লোকেরা চেনে। আমি এবং আমার দলের লোকেরা সবসময় আপনার আর পাকিস্তানের খেদমতে নিজেদের পেশ করে ধন্য হতে চাই।’

‘মারহাবা! পিরোজপুরের আওয়ামী লীগের নেতা কে কে?’

‘স্যার, হুজুর, আমার কাছে সব শালার তালিকা আছে।’ পকেটে হাত ঢুকায়, ‘দেবো?’

‘দাও!’ গ্লাসে একটা চুমুক দিয়ে মুরগির রানে দাঁত বসায় মেজর ইসকান্দার হায়াত্ খান।

সুলতান মাহমুদ আকন পাঞ্জাবির পকেটে হাত ঢুকিয়ে হাতড়াতে থাকে। হাতড়াতে হাতড়াতে একটা কাগজ ঠাহর পায়। দ্রুত বের করে মেজরের দিকে যেতে থাকে।

মেজর সেন্ট্রিকে ইশারা করলে, সেন্ট্রি পলকে সুলতানের সামনে এসে দাঁড়ায়। সুলতান অবাক হয়ে বলে, ‘আমি তো মেজর সাহেবের কাছে যাচ্ছি।’

হাতের কাগজটা এক দমকে কেড়ে নিয়ে আকনকে ইশারা করে পিছিয়ে যেতে। সুলতান মাহমুদ আকন ইসলামের বিশিষ্ট নেতা বাধ্য কুকুরের স্বভাবে পিছিয়ে আগের জায়গায় দাঁড়ায়। সেন্ট্রি কাগজটা এগিয়ে দিলে মেজর ইসকান্দার হায়াত্ খান গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে চোখ বোলায়। চোখ বোলাতে বোলাতে চোখে মুখে এক ধরনের খুশির ঝিলিক দেখা দেয়।

‘তুমি উর্দু জানো?’ সুলতানের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে মেজর।

দু’হাত জড়ো করে সামনের দিকে নুয়ে কুর্নিশ করে সুলতান, ‘থোরা থোরা হুজুর।’

দাঁড়ায় ইসকান্দার, ‘বহুত খুব।’ এগিয়ে আসে কাছে, হাতের লাঠি দিয়ে সুলতান মাহমুদ আকনের পেটের উপর হালকা গুঁতো দিয়ে, ‘তুমি খুব ঈমানদার আদমি আছো। মুক্তিদের খবর কী?’

‘মুক্তি? কীসের মুক্তি? এই এলাকায় হুজুর কোনো মুক্তি নাই।’ ‘পঁচিশে মার্চ রাতের পর, যখন আপনারা পুরো পূর্ব পাকিস্তান খোদার রহমতে দখল করে নিলেন, সেই থেকে শালাদের কোনো খবর নাই। সবাই পলাইচে।’ মিচকি মিচকি হাসে সুলতান আকন। বুঝে গেছে সূদূর পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আসা আল্লাহর পেয়ারা বান্দা উর্দু ভাষায় লিখতে পারায় ভীষণ খুশি হয়েছে। কিন্তু হালারা জানবে কেমন করে, এই তালিকার ত্রিশ চল্লিশটা নাম উর্দুতে লিখতে কত কষ্ট হয়েছে। কোনো রকম উর্দু বর্ণগুলো জানে। পাশের মসজিদের ইমাম খায়রুল হোসেনকে দিয়ে লিখিয়ে এনেছে। সুলতান মাহমুদের মাথায় বুদ্ধি ভালো খেলে। এখন মনে মনে নিজের পাছা চুলকায় আর নিজেকে বাহাবা দিচ্ছে—বুদ্ধি কইরা উর্দ্দু ভাষায় আওয়ামী লীগ নেতাগো নাম লেখানোর কারণে, মেজর সাব খুশি। আর্মি মানুষ। সবসময় থাকে টেনশনে। সেই মেজর খুশি হয়েছে। সুলতান মাহমুদের শরীর আনন্দে নাচতে চায়।

‘মোজাম কোথায়?’

‘মোজাম?’

মাথা নাড়ায় মেজর ইসকান্দার, ‘ইয়েস মোজাম্মেল হক মোজাম। শেখ মুজিবের চ্যালা। পিরোজপুর আওয়ামী লীগের নেতা। কোথায় সে? মোজাম লোকটাই তো এই এলাকায় যুদ্ধ করছে।’

‘কীসের যুদ্ধ স্যার?’ সুলতান মাহমুদ আকন অনেকটা শ্বাপদের মতো চোখ মুখ নাড়ায়, ‘ওরা কয়েকজন লোক মাত্র। ওদের কাছে আপনাদের মতো অস্ত্র আছে? থানা লুট করে কয়েকটি রাইফেল নিয়েছে। আপনাদের মতো আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত বাহিনীর বিরুদ্ধে কয়েকটা রাইফেল দিয়ে কী করবে? আপনাদের সামনে দাঁড়াইতে পারবে?’

‘কিন্তু যাই বলো, লোকটা তো এলাকার নেতা। তাকে তো ধরতে হবে। ধরার পর,’ মেজর থামে। একটু হেঁটে টেবিলের কাছে যায়। মদের গ্লাসটা হাতে নেয়। চুমুক দেয়। গ্লাসটা ঠাস শব্দে রেখে, ডান হাতের উল্টো কবজি দিয়ে মুখ মুছে আবার সামনে আসে আকনের।

‘স্যার! আমাকে কয়েকটা দিন সময় দেন। আমি মোজামের খবর এনে দিবো।’

‘গুড। কিন্তু পুলিশ অফিসার ফজুলর রহমান কোথায়?’

‘স্যার, তার নামও তালিকায় আছে। চার নম্বরে।’

‘জানি। তুমি কি মনে করো আমি এখানে ভেরান্ডা ভাজতে এসেছি? আমি সব জানি। কিন্তু ফজলুর রহমানও এলাকায় নেই। তাকেও খুঁজে বার করতে হবে।’

‘জি স্যার।’

‘লোকটার সাহস দেখেছ? পাকিস্তান সরকারের চাকরি করে আর কাজ করে বিদ্রোহী আওয়ামী লীগারদের সঙ্গে। সরকারের রাইফেল দিয়ে দিয়েছে লোকাল নেতাদের?’ দাঁতে দাঁত ঘষে মেজর ইসকান্দার হায়াত্ খান, একবার হাতের মুঠোয় পেয়ে নিই, দেখিয়ে দেবো ইসলামি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার ফলাফল কত ভয়াবহ!’

‘স্যার!’

‘বলো।’

‘স্যার আমি লোকটাকে বলেছিলাম, আপনি পাকিস্তান সরকারের কর্মকর্তা। আপনি কেন আওয়ামী লীগের এইসব বাচ্চার হাতে সরকারের অস্ত্র তুলে দিচ্ছেন? কী বলল জানেন?’

‘কী বলল লোকটা?’

‘বলল, পাকিস্তান টিকবে না।’

‘বলেছে?’ মেজর হাতের লাঠি দিয়ে বাতাসে সপাং সপাং বাড়ি মারে।

কেনা গোলামের মতো মাথা নাড়ায় সুলতান মাহমুদ আকন, ‘বলেছে হুজুর। আরও ঠাট্টা করে আমাদের পেয়ারে পাকিস্তানকে বলত ফাঁকিস্তান।’

‘মানে?’

‘মানে স্যার ফাঁক, ফাঁক। ফাঁক মানে ভাগ। ভাগ মানে পাকিস্তান ভাগ হয়ে যাবে।’

‘পাকিস্তান ভাগ হয়ে যাবে?’ মেজর ইসকান্দার রক্তচোখে তাকায়, সুলতান মাহমুদ ভয় পায়। ‘শালাদের হাতের কাছে পেয়ে নিই বুঝিয়ে দেবো...’

‘স্যার!’

‘বলো।’

‘স্যার, আমি এখন যাই। আমার অনেক কাজ...’

‘তোমার নামটা কী?’

‘স্যার, আমার নাম সুলতান মাহমুদ আকন।’

‘সুলতান মাহমুদ আকন!’

মাথা নোয়ায় সুলতান মাহমুদ আকন, ‘স্যার আকন বংশের লোকেরা মানুষদের ইসলাম ধর্মের আকিদা বা নিয়মকানুন শেখায়। আমার দাদা ছিল মস্তবড় আকন। এলাকার পরহেজগার মানুষ। অনেক হিন্দুকে মুসলমান বানিয়েছে। মারা না গেলে এই সময়ে আরও অনেকে মুসলমান বানাত।’

‘সবই ঠিক আছে আকন মিয়া,’ মদ ভরা গ্লাস ছোঁয়ায় ঠোটে। ‘তোমাদের এলাকায় এলাম কিন্তু কোনো সুখ পাচ্ছি না।’

‘সুখ? সুখ পাচ্ছেন না স্যার?’

হাতের লাঠি নাড়াতে নাড়াতে মেজর তাকায় সুলতানের দিকে, এগিয়ে যায় মুখের কাছে, ‘হ্যাঁ সুখ। বিদেশে এসে যদি আওরাতের সুখ না পেলাম, তাহলে এসে কী লাভ?’

সুলতান মাহমুদ বলতে যাচ্ছিল, ‘স্যার, এসেছেন ইসলাম রক্ষা করতে আর চাইছেন আওরাত? আল্লাহপাক নারাজ হবেন!’ কিন্তু কিছুই বলে না সুলতান মাহমুদ আকন। বুঝতে পেরেছে, এই মুহূর্তে সুদূর পাকিস্তান থেকে আসা এই জনাবদের সামনে সত্য বলা যাবে না। সত্য বললেই ওরা জানে কিভাবে জিভ টেনে ছিঁড়ে ফেলতে হয়। এটাও তো ঠিক, আওরাত ছাড়া কি সুখ হয়?

মুহূর্তে বুঝে যায় পিরোজপুর মহকুমার ইসলামি নেতা সুলতান মাহমুদ আকন, সুদূর পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ইসলাম রক্ষা করতে আসা এই পেয়ারা বান্দা কী বলতে চায়!

‘হুজুর, হুকুম করলেই আওরাত পৌঁছে যাবে আপনার এই খাস কামরায়।’

‘সত্যি বলছ সুলতান?’

আবার এক হাত পিছনে নিয়ে আর এক হাত দিয়ে কুর্নিশ করে সুলতান মাহমুদ আকন, ‘জি জনাব। এই শালার সব আওয়ামী জানানাদের বাড়িঘর আমি চিনি। সন্ধ্যার পরে আমি আসব। আপনি একটা গাড়ি আর কয়েকজন সেন্ট্রি দেবেন, ঘণ্টা খানেকের মধ্যে আওরাত চলে আসবে।’

‘বহুত খুব বহুত খুব...’ পিঠ চাপড়ে দেয় সুলতান মাহমুদের। আবার গ্লাসে মদ ঢালে। চালান করে দেয় মুখের ভিতরে। তাকায় পিট পিট করে আকনের দিকে, ‘হবে নাকি এক পেগ?’

‘না হুজুর, অভ্যাস নাই।’

‘খাঁটি মুসলমান আছো হে।’

‘তাহলে এখন যাই হুজুর।’

‘যাও,’ আবার কাছে এগিয়ে এসে সুলতান মাহমুদের ঘাড়ের উপর হাত রাখে মেজর ইসকান্দার, ‘সুলতান মাহমুদ, সেই পশ্চিম পাকিস্তান আর পূর্ব পাকিস্তানের মধ্যে দূরত্ব জানো?’

অবাক আকন। মেজর ইসকান্দার ঘাড়ের উপর হাত রেখে নরম স্বরে কথা বলছে! ইয়া আল্লাহ, কী ভীষণ কুদরত আপনার! আবেগে ফুটতে থাকে পিরোজপুর মহকুমার জামাতে ইসলামির নেতা সুলতান মাহমুদ আকন। মনে মনে বলে, আমার সাগরেদরা দেখল আমার অপমান। মেজর সাহেবের আদরটা তো দেখল না! যদি দেখত...

‘জানো?’

ঘাড় নাড়ে সুলতান, ‘না হুজুর।’

‘মাত্র পনেরো শো মাইল।’

‘পনেরো শো মাইল!’ আঁতকে ওঠে আকন।

ঘাড়ের উপর থেকে হাতটা সরিয়ে মুখোমুখি দাঁড়ায় মেজর, ‘তুমি এখন ভেবে দেখো সুলতান। অত দূর থেকে এসেছি পবিত্র ইসলামের জন্য, আর আমি একটু খায়েশ পূরণ করতে পারব না?’

‘বললাম তো আপনাকে, রাতে আপনার কাছে আওরাত এসে যাবে। পিরোজপুর মহকুমার সবচেয়ে সুন্দরী আওরাত। আওয়ামী লীগের নেতা হুমায়ন হোসেন সদ্য বিয়ে করেছে, ডানাকাটা পরী। মাত্র পনেরো দিন আগে। বিয়েতে আমি গিয়েছিলাম। বৌটা দেখে আমারই মাথা খারাপ হয়ে গেছে। সেই আওরাতকে...’

‘তুমি আনবে মুসলমান আওরাত তো?’

‘হ্যাঁ হুজুর।’

‘না, আমি চাই হিন্দু আওরাত। ওদের শরীর নাকি মুসলমান আওরাতের চেয়ে নরম। আরাম অনেক বেশি। খুশবুও অনেক। মুসলমান সৈন্য হিসেবে আমাদের আরও কর্তব্য হিন্দু রমণীদের গর্ভে মুসলমানের সন্তান জন্ম দেয়া। সুতরাং আমি চাই...’ চোখ মটকে মৃদু হাসে মেজর।

 

ভাগীরথীকে এনে গাড়িতে পিছনের খোলা জায়গায় শুইয়ে দেয়। সেন্ট্রি কাঁধে নেয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভাগীরথী জ্ঞান হারায়। মিনিট দশেক পরে গাড়ি এসে থামে পিরোজপুর সরকারি হাইস্কুলের সামনে। সন্ধ্যা পার হয়েছে অনেক আগে। মফস্বল শহর। সামরিক আইনের মধ্যে আবার সান্ধ্য আইন। মানুষ তো ভালো, একটা কুকুরও নেই কোথাও। গাড়ি থামলে সবার আগে দ্রুত নামে সুলতান মাহমুদ।

আর দুজন সেন্ট্রি ধরাধরি করে নামায় ভাগীরথীকে। ভাগীরথীর শাড়ি একেবারে এলোমেলো। গুটিয়ে গেছে শরীরের সঙ্গে। বের হয়ে গেছে বুকের নিচ থেকে নাভির নিচ পর্যন্ত। সুলতান আকন কামাতুর চোখে দেখে। সেন্ট্রি দুজন অতসব দেখে না। দ্রুত চারহাতে তুলে নিয়ে চলে মেজরের রুমের দিকে। মেজর ইসকান্দার বসে বসে মদ খাচ্ছে। ভাগীরথীসহ সেন্ট্রিদের ঢুকতে দেখে দাঁড়ায়। তাকায় এক পলক ভাগীরথীর দিকে। দেখেই শরীরে বিদ্যুত্ খেলে যায়। নিজের অজান্তেই মুখ থেকে বেরোয়, ‘হিন্দু আওরাত আচ্ছা হায়!’

‘হুজুর!’ রুমের মধ্যে এসে দাঁড়ায় পিরোজপুর মহকুমার জামাতে ইসলামির নেতা সুলতান মাহমুদ।

সেন্ট্রি দুজন স্যালুট দিয়ে বের হয়ে গেলে মেজর এসে জড়িয়ে ধরে আকনকে, ‘আচ্ছা জেনানা হায়। ইয়েতো হিন্দু হ্যায়?’

‘জরুর হুজুর। ইয়ে হিন্দু হায়।’

‘সাচ?’

‘হুজুর, আমি ঈমানদার আদমি হায়। মাশরেকি পাকিস্তানের আপনি একজন পেয়ারা বান্দা। আপনার সঙ্গে তো আমি মিথ্যা বা ঝুট বলতে পারি না। ইয়ে জানানা খাঁটি হিন্দু। ওর স্বামী ঘনশ্যাম। মুচির কাজ করে বাজারের পুলের কাছে। সেখানে আমি জুতা সেলাই করাতে গিয়ে কয়েকবার দেখেছি। আর ওদের বাড়িঘরও চিনি। যখন হিন্দু জানানা চাইলেন, তখনই আমি ঠিক করেছি, ওকে নিয়ে আসব।’

‘গুড। বহুত হো গিয়া। আভি তুম যাও।’

‘আচ্ছা হুজুর।’

সুলতান মাহমুদ আকনের দরজা পার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মেজর ইসকান্দার হায়াত্ খান শরীরের সব কাপড় খুলে ফেলে। যায় টেবিলের কাছে। আরও গ্লাস ঢালে গলার ভিতরে। এক গ্লাস মদ নিয়ে দাঁড়ায় অচেতন ভাগীরথীর সামনে। ফ্যানের বাতাসে ভাগীরথীর মুখের কাপড় সরে গেছে। এলোমেলা চুলগুলো কাঁপছে।

জ্ঞানহীন শরীরের পাশে বসে মেজর। চুমু খায় ভাগীরথীর ঠোঁটে। কোনো সাড়া নেই। হাতের গ্লাস থেকে মদ হাতে নিয়ে উপর থেকে ছড়িয়ে দেয় মুখে। একটু নাড়াও দেয় শরীর ধরে। ভাগীরথীর চেতনা ফিরে আসে। ঝট করে তাকায়। প্রথম কয়েক মুহূর্ত কিছুই বুঝতে পারে না। মুখের উপর বিকট গোঁফঅলা খালি গায়ের এই লোকটা কে? মুহূর্তে সব মনে পড়লে ঝট করে উঠে বসতে যায়।

কিন্তু বুকের উপর দ্রুত হাত দিয়ে বিছানার সঙ্গে ঠেস দিয়ে ধরে মেজর ইসকান্দার, তুমি খুব সুন্দর আওরাত আছ। কী নাম তোমার? ঠোঁট নামিয়ে আনে মেজর।

মুহূর্তে মুখ সরিয়ে উঠে বসবার চেষ্টা করে ভাগীরথী, ‘আমারে যাইতে দেন। আমার পোলা আমারে ছাড়া গুমাইতে পারে না। আমারে যাইতে দ্যান...’ শরীরের অগোছালো শাড়ি গুছিয়ে নিতে নিতে খাট থেকে নামতে গিয়ে দেখে, সঙ্গের লোকটা একেবারে ন্যাংটো। ভয়ে, আতঙ্কে গলার ভিতরটা শুকিয়ে যায়।

‘পানি। পানি খামু...’

‘পানি খাবে?’ মেজর উঠে নিজেই টেবিলের উপর থেকে পানির গ্লাস নিয়ে আসে। বাড়িয়ে ধরে ভাগীরথীর দিকে, ‘নাও। পিয়ো।’

ভাগীরথী পানির গ্লাস নিয়ে সবটুকু পানি এক নিঃশ্বাসে পান করার পর গ্লাসটা বিছানার উপর ছুড়ে দিয়ে খাট থেকে নেমে দরজার দিকে দৌড় দেয়। দরজা খুলতে গিয়ে দেখে, দরজা বাইরে থেকে আটকানো। মাত্র ঘণ্টাখানেক সময়ের মধ্যে ভাগীরথীর জীবনের এই অসহ্য দুঃস্বপ্ন, মেনে নিতে পারছে না। দরজা ধাক্কাতে থাকে। দরজা নিরেট। সামনে দাঁড়িয়ে মদ পান করতে করতে উলঙ্গ মেজর দেখছে আর হাসছে।

না, কোনো তাড়া নেই। ধীরে সুস্থে ভোগ করার মধ্যে একটা আলাদা সুখ আছে। মেজর মোটেই তাড়াহুড়ো পছন্দ করে না। ঢাকা থেকে আসার আগে নাজিয়া খানের সঙ্গে যখন সে মিলিত হয়েছিল, তখনও তাড়াহুড়ো করেনি। তারও আগে মেজর যখন পাকিস্তানে নিজের বাড়িতে ছিল, সেখানে চাচাতো ভাবি গুলশান খানমের সঙ্গে বেশ কয়েকবার রমণে লিপ্ত হয়েছিল। না, কোনো তাড়াহুড়ো করতে নেই। বন্দী নারী, যে হাতের মুঠো ছিড়ে কোথাও যেতে পারবে না, তার সঙ্গে জোর করা কেন? একটু রসিয়ে বা একটু খেলিয়ে খেলিয়ে নিলে রমণে অন্যরকম সুখ পাওয়া যায়। মেজর ইসকান্দার হায়াত্ খান আবার গ্লাস ভরে তাকায় ভাগীরথীর দিকে।

ভাগীরথী দরজায় পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়ে। কাঁদছে। কী করবে? কাকে ডাকবে? কে রক্ষা করবে? ঘনশ্যাম যে বলেছিল, পাকিস্তানি আর্মিদের বিরুদ্ধে পিরোজপুর শহরের হাজার হাজার মানুষ নামবে। কই সেই হাজার হাজার মানুষ? তারা তো জানে না...। থেমে যায় ভাগীরথীর চিন্তা। ধীর পায়ে এগিয়ে আসছে ন্যাংটো লোকটা, মুখে বেহায়ার কুিসত হাসি। দু’হাত বাড়িয়ে দিয়ে ডাকছে লোকটা, ‘মেরে বুকে আও মেরে জান...।’

ভাগীরথী মেজরের হাতের নিচ দিয়ে বেরিয়ে যায় এক দৌড়ে। ছোট্ট রুমটার মধ্যে দৌড়ে আর কতদূর যেতে পারে ভাগীরথী? আটকে যায় খাটের সঙ্গে। পেছন থেকে এক লহমায় দুহাতে ঝাপটে ধরে মেজর। খুলতে থাকে একের পর এক শাড়ি, ব্লাউজ...। ভাগীরথী প্রাণপণ চেষ্টায় নিজেকে মুক্ত করার চেষ্টা করে। কিন্তু বলিষ্ঠ পাশবিক দুই হাতের থাবার কাছে হেরে যায় ভাগীরথী। কয়েক মুহূর্ত পর ভাগীরথী আবিষ্কার করে, সে ন্যাংটো। শরীরে এক সুতো কাপড় অবশিষ্ট নেই। নগ্ন আলোয় নিজের নগ্ন দেহ দেখে আতঙ্কিত ভাগীরথী দু’হাতের কনুই দিয়ে দুটো বুক আড়াল করার চেষ্টা করে। আর সেই ফাঁকে মেজর দু’হাতে ভাগীরথীকে ঊর্ধ্বে তুলে বিছানার উপর রাখে কোলবালিশের মতো। আর নিজেই পাশে শুয়ে রক্তমাংসের কোল বালিশটাকে বুকের ভিতরে আঁকড়ে ধরে।

 

সকাল।

না, পবিত্র সকাল নয়। এ সকাল কালো সকাল। অনেক বেলায়, আনুমানিক নটা বা সাড়ে নটার দিকে ঘুম ভাঙে ভাগীরথীর। চোখ মেলেই বুঝতে পারে, এই শয্যা এই কক্ষ নিজের নয়। শরীরে কোনো কাপড় নেই। মনে পড়ে যায়, রাতের ঘটনা। জীবনের এই নিবিড় দুর্বিপাকের মধ্যে ঘুমালো কী করে? সত্যি ঘুমিয়েছিল? সারা শরীরে কামড়ের দাগ। নিচে, দুই উরুর মধ্যেখানে হাত দিয়ে অনুভব করে শুকিয়ে যাওয়া কালো রক্তের মরীচিকা। দূর দিয়ে, অ্যাম্বুলেন্সের চিত্কার শুনতে পায় ভাগীরথী।

সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ে, লালশ্যামকে। লালশ্যামের বাবা ঘনশ্যামকে। দুজনে কি বেঁচে আছে? এই জানোয়ারেরা আমাকে নিয়ে আসার সময় ওদেরকে হত্যা করেছে? ভাগীরথী শোয়া থেকে বসার চেষ্টা করে। সারা শরীর ব্যথায় গোঙ্গাচ্ছে। ধীরে ধীরে দাঁড়ায়। সামনে জানালা। কিন্তু দূরে দেয়ালের কারণে কোনো কিছুই দেখা যাচ্ছে না। ডানে বাঁয়ে তাকিয়ে বুঝতে পারছে, পিরোজপুর শহর। একটা সাইনবোর্ড দেখতে পায় ভাগীরথী—পিরোজপুর মহকুমা সরকারি হাইস্কুল। হ্যাঁ, এটাই হাইস্কুল। কতদিন স্কুলের সামনে দিয়ে হেঁটে গেছে সে স্বামী ঘনশ্যামের কাছে। অনেক সময়ে কোলে থাকত লালশ্যাম।

লালশ্যাম আইসক্রিম খেতে খুব পছন্দ করে। পিরোজপুর শহরে এলেই লালশ্যাম খ্যান খ্যান শুরু করে দেয়, ‘আমারে আইচক্রিম কিইন্না দেও।’

ওর বাবা বলত, ‘একটু সবুর কর। সামনে দিয়াই ছোলেমান ভাই যাইবে আইক্রিম লইয়া। তহন তোরে কিইন্না দিমুনে।’

‘না, আমারে এহন আইসক্রিম দেও...’

‘জুতায় পালিশ লাগাতে লাগাতে জবাব দিত, এহন আইসক্রিম কই পামু বাবা?’

প্রায়ই সময়ই দেখা যেত লালশ্যাম আর ঘনশ্যামের কথা কাটাকাটির মধ্যেই আইক্রিমের বাক্স নিয়ে সামনে থেকে চলে যাচ্ছে ছোলেমান। ছোলেমানকে দেখে বাপ-ছেলে দুজনেই ডাকত, ছোলেমান হাসিমুখে বাক্স নামিয়ে কুলফি আইসক্রিম বের করে লালশ্যামের হাতে ধরিয়ে দেয়। আইসক্রিম হাতে নিয়ে লালশ্যাম হাসত আর মুখের ভিতরে আইক্রিম চালান করে দিত।

‘আপনার নাস্তা...’

মহিলার কণ্ঠস্বরে জানালা থেকে ফিরে তাকায় ভাগীরথী। দেহাতি গড়নের এক মহিলা। শরীরটা মিশমিশে কালো। মুখের নিচের দিকের দাঁত উঁচু। পান খাওয়া মুখ। মুখের উপর বিশাল একটা নাক। আধাপাকা চুল। পড়নে সবুজ রঙের শাড়ি। আর কিছু নেই। ডান হাতে ধরা একটা থালা। অন্যহাতে একটা পানির গ্লাস।

মহিলাকে দেখে ন্যাংটো ভাগীরথী দ্রুত এসে বিছানার পাশে পড়ে থাকা শাড়িটা হাতে নেয়। শাড়িটা হাতে নিয়ে দেখে, বেশ কয়েকটা জায়গা ছিড়ে গেছে। রাতের ক্ষুধার্থ মেজর ইসকান্দার হায়াত্ দ্রুত হাতে শাড়ি খোলায় শাড়ি ছিড়ে গেছে। দরজা থেকে কাছে আসে মহিলা। হাতের প্লেট ও পানির গ্লাস রাখে টেবিলের উপর, ‘শাড়ি পিইন্দা কী করবেন? এইহানে সবাইরে ন্যাংটা রাহে হারামজাদারা।’

‘এইহানে আরও মহিলা আছে?’

ঘাড় নাড়ে মহিলা, ‘আছে। না থাকলে হারামদাজারা থাকবে ক্যামনে? আপনের নাস্তা খাইয়া লন। আবার মেজর সাব ঢোকলে খাওনের টাইম পাইবেন না। জামা-প্যান্ট লইয়া আপনার উপর ঝাপাইয়া পড়বে আনে।’

‘আমার খিদা নাই।’

‘পরথম পরথম খিদা আমারও ছেল না। এইহানে ধইরা আনার পর কয়েকদিন না খাইয়াই আছিলাম। পরে আর পারি নাই। খালি পেটে এত অত্যাচার সহ্য হয় না। মরতে যহন পারুম না তহন খাওনই ভালা।’

‘আপনেরে কবে আনচে?’

‘মাস দুই তো অইবোই। পিরোজপুর যে রাইতে দহল করছে হ্যার দুই তিন পর আমারে ধরছে।’

‘ক্যামনে ধরল?’

‘আমি তো কলেজের মেসে রান্না করতাম। রান্দনের কাম শেষ কইরা যেই বাসায় যাইতেছি, সামনে দেহি মেলিটারির জিপ। মনে মনে কইলাম, মুই কামের মাতারি। মোরে আর কী করবে? ওমা দেহি মোরে পাঁজা কোলে কইরা গাড়িতে উঠাইতেছে এক হারামজাদা মেলিটারি।’ হাসে মহিলা, ‘আমার কি আচে কন? বয়স তো কম না। মোর বড় মাইয়া বিয়া দিছি। ক্যাম্পে আওনের পর বোঝলাম, অগো দরকার ফুডা। যেহান দিয়া অরা ঠুকাইবে। তিন দিন তিন রাইত ওরা আমারে ঘুমাইতে দেয় নাই। কয়দিন পর যহন আরও মাইয়া মানুষ ধইরা আনছে, আমারে কামে লাগাইছে সেবা যতন করার। করতে আছি। আমি সেবা না করলে আপনাগো দেখবে কেডা? নেন, খাইয়া নেন।’

মহিলাকে মনে হয় ভাগীরথীর অনেক দিনের চেনা একজন প্রতিবেশী। কত সহজে জীবনের সর্বনাশের সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছে। হয়তো উপায়ও নেই। ভাগীরথী প্লেট আর পানির গ্লাস নিয়ে বসে।

‘আপনে খাইছেন?’

ঘাড় নাড়ে মহিলা, ‘খাইচি। আমারে সবাই ময়নার মা কইয়া ডাহে।’

‘ময়নার মা?’

‘কন।’

‘এই জায়গাডা কোতায়? পিরোজপুর শহরের মইধ্যে মনে অয়?’

‘হ, এইডা অইলো পিরোজপুর শহরের সরকারি ইস্কুল। ইস্কুল বন্ধ কইরা হারামজা্দারা ক্যাম্প বানাইচে।’

রুটি আর বেগুন ভাজি মুখে দেয় ভাগীরথী। মুখে দিয়েই বুঝতে পারে, সত্যি খিদে পেয়েছে। দুই বার মুখে দিয়ে পানি খায়। সঙ্গে সঙ্গে শরীর জুড়ে একটা চাঙ্গাভাব আসে।

‘আপনেরে কেমনে আনলো?’

‘বাসা দিয়া উডাইয়া আনছে রাইতে।’

‘হারামজাদারা আপনার বাসা চিনল কেমনে?’

‘সুলতান মাহমুদ চিনিয়া দেচে।’

‘এই সুলতান মাহমুদরা অইলো আসল হারামজাদা। হুনচি, পশ্চিমা হিয়ালেরা নাহি আমাগো দেশ দিয়া অনেক দূরে থাহে। অরা তো রাস্তাঘাট বাড়ি চেনে না। আমাগো দেশি হারামজাদারা বাড়িঘর চিনাইয়া দেয়। আপনার স্বামী কী করে?’

‘বড় রাস্তার পাশে মুচির কাম করে।’

‘পোলামাইয়া?’

‘আমার একটাই পোলা, লালশ্যাম...’ মুখে রুটি আর বেগুনভাজি নিয়ে কাঁদতে শুরু করে। ‘জানি না, পোলা আর পোলার বাপে বাঁইচা আছে না মইরা আছে?’

ক্যাম্পের সামনের দিকে গাড়ি আর মানুষের সাড়া পাওয়া যায়।

ময়নার মা বলে, ‘হারামজাদারা আইয়া পড়ছে আরও না জানি কত মাইনষের সর্বনাশ কইরা। আপনে খাইয়া লন। আমি যাই...’

দ্রুত চলে যায় ময়নার মা। সঙ্গে সঙ্গে ঢোকে মেজর ইসকান্দার হায়াত্। চোখে মুখে বিজয়ের উল্লাস। হাতের লাঠিটা টেবিলের উপর রেখে প্যান্টের জিপার খুলতে শুরু করে। কান্নাক্লান্ত চোখে মুখে শুকনো রুটি আর বেগুন ভাজি দিতে দিতে মেজরের প্যান্ট খোলার অভিনব দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে থাকে ভাগীরথী, লালশ্যামের মা।

 

‘বাবা? ও বাবা?’

মাটিতে, গভীর জঙ্গলে ঘুমিয়ে আছে ঘনশ্যাম। ঘনশ্যামের বুকের মধ্যে ঘুমিয়ে ছিল লালশ্যাম। সকালের কড়া রোদ পড়েছে, গাছের ডালাপালা অতিক্রম করে। চোখ মেলে গভীর বাগানের মধ্যে নিজেদের দেখে লালশ্যাম বাপের বুক থেকে বের হয়ে দাঁড়ায়। সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ে মাকে। মাকে নিয়ে লোকগুলো কোথায় গেল? মাকে নিয়ে লোকগুলো চলে যাবার পর বাবা ওকে বুকের ভিতরে দু’হাতে আঁকড়ে ধরে বাগানের দিকে ছোটে। ছুটতে ছুটতে কয়েকবার পড়েও গেছে। ডান পায়ের বুড়ো আঙুলের চামড়া ছিঁড়ে রক্ত পড়ছে, দেখার সময় নেই। ঘনশ্যাম ছেলেকে বুকের সঙ্গে আঁকড়ে ধরে আরও ভিতরে আরও ভেতরে ঢোকে।

ঘন অন্ধকার রাত। কতটা ভেতরে ঢুকেছে বুঝতে পারে না। কিন্তু অনুমান করতে পারে, এখানে আপতত নিরাপদ। লালশ্যামকে মাটিতে নামিয়ে নিজেও বসে পড়ে মাটিতে। চারপাশে বুনোলতা পাতাদের ঝাড়। আসমানে চাঁদ উঠেছে। চাঁদের চুইয়ে পড়া আলোয় চারপাশটা দেখে ঘনশ্যাম তাকায় আকাশের দিকে। গাছের পাতারা হালকা বাতাসে দুলছে। সঙ্গে সঙ্গে দুলছে চাঁদের টুকরো টুকরো আলোও।

ঘনশ্যাম চাঁদের টুকরো টুকরো আলো দেখতে দেখতে অনুভব করছে, ডান পায়ের বুড়ো আঙুলটা জ্বলছে। হাত দিয়ে দেখে, রক্ত পড়ছে। সামনের নখের অর্ধেকটা উড়ে গেছে কোনো গাছের শিকড়ের সঙ্গে আঘাতে। অভ্যস্ত হাতে যশোরের পাতা ছিঁড়ে হাতে নিয়ে ঢলতে থাকে। ঢলতে ঢলতে পাতাগুলোর লেই হয়, এবং সেই লেই, লেইয়ের রস নখ উপড়ানো জায়গায় দিলে, একটা কামড় দেয় নখ ও রক্তের জায়গায়। দাঁতে দাঁত চেপে মাটির উপর শুয়ে পড়ে ঘনশ্যাম। লালশ্যাম কোনো কিছু না ভেবে নিজেকে বাপের কোলের মধ্যে ঠেলে দিয়ে শুয়ে পড়ে। এবং অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে পিতা ও পুত্র গভীর জঙ্গলের মধ্যে ঘুমিয়ে যায়।

ঘুম থেকে জেগে পিতা ও নিজেকে গভীর জঙ্গলে দেখে ঘুমন্ত পিতাকে ডাকে লালশ্যাম, ‘বাবা? ও বাবা?’

লালশ্যামের ডাকে জাগে ঘনশ্যাম। উঠেই চোখ মেলে তাকালেই সব মনে পড়ে, ছেলেকে আবার বুকের সঙ্গে আঁকড়ে ধরে হু-হু কান্নায় ভেঙে পড়ে। গভীর জঙ্গলে পিতা ও পুত্র কাঁদছে। কান্নার রেশ ধরে এলে লালশ্যাম পিতাকে জিজ্ঞেস করে, ‘বাবা মারে কোম্মে লইয়া গেছে? মায় কি আইবে না?’

ঘনশ্যাম একটু আগের চেয়ে আরও তীব্রবেগে কাঁদতে শুরু করে। মনে হয়, গোটা জঙ্গল পিতা ও পুত্রের সঙ্গে কাঁদছে। অতটুকু পুত্রের জবাবে কী বলবে ঘন্যশ্যাম?

‘বাবা?’

কান্না থামিয়ে পুত্রের দিকে তাকায় ঘনশ্যাম, ‘কী বাবা?’

‘মায়রে লইয়া কই গেছে?’

‘তোমার মায়রে লইয়া কই গেছে আমি কইতে পারি না...’ ডুকরে ওঠে আবার ঘনশ্যাম।

‘তোমার মোজাম ভাই কইতে পারবে না?’

দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে পিতা, ‘এই সময়ে কে কোতায় আছে কেমনে কমু?

লও পিরোচপুর শহরে যাই মায়রে খোঁজতে।’

‘পিরোচপুর শহরে তো ঢোকা যাইবে না বাবা।’

‘ক্যান?’

‘পাঞ্জাবিরা পতে পতে পারাহা রাকছে। দেখলেই গুল্লি কইরা দেবে।’

‘তাইলে বাড়ি যাই...’

‘বাড়ি?’

মাথা ঝাঁকায় লালশ্যাম, ‘হয়। মায়ে যদি বাড়ি আইসা থাহে?’

সামনের ঘন গাছপালার দিকে চোখ রাখে ঘনশ্যাম, ‘মনে অয় না তোর মায়ে আর বাড়ি আইতে পারবে।’

‘ক্যা? আইতে পারবে না ক্যা?’

‘জানি নারে বাপ। জানি না...’

আবার চোখ ভিজে ওঠে ঘনশ্যামের। দুহাতের উল্টো পিঠে চোখ মুছে সামনে তাকাতেই চমকে ওঠে ঘনশ্যাম। একবার মনে হয়, উঠে আবার দৌড় দিয়ে এই জঙ্গল থেকে চলে যায়। কিন্তু উঠতে গিয়ে মনে হলো, পা-জোড়া আটকে গেছে মাটির সঙ্গে। কোনোভাবেই পা-জোড়া টেনে তুলতে পারছে না। অন্যদিকে, বিপরীত দিক থেকে আসছে কয়েকজন মানুষ, কারো পরনে লুঙ্গি, গায়ে সাদা স্যান্ডো গেঞ্জি, কারো পরনে প্যান্ট, মাথায় বাঁধা গামছা, কারো পরনে খাকি প্যান্ট, শার্ট—প্রত্যেকের হাতে রাইফেল। ওদের চোখ মুখে কাঠিন্য। কারো মুখে গোঁফ ও দাঁড়ি গজিয়ে এক ধরনের ক্যামোফ্লেজ তৈরি করেছে, কার বয়স কত!

পিতার চোখ অনুসরণ করে পুত্রও তাকায়, কিম্ভুত মানুষগুলোর দিকে তাকিয়ে। কিম্ভুত মানুষগুলো খুব কাছে এসে পড়েছে।

‘বাবা?’

‘কও বাবা?’ ঘনশ্যাম দাঁড়ায় ছেলের হাত ধরে।

‘এরা কারা বাবা? এরা কি আমাগো লইয়া যাইবে?’

দলটা কাছে এসেই পিতা ও পুত্রকে ঘিরে ধরে। সামনের মানুষটা হাতের রাইফেল নামিয়ে তাকায় ঘনশ্যামের দিকে, ‘আমরা মুক্তিযোদ্ধা। আমার নাম হানিফ রহমান। আমি এই দলের কমান্ডার। আপনি কে?’

‘আমি ঘনশ্যাম।’ মুক্তিযোদ্ধা শুনেই ঘনশ্যামের শরীরে সাহসের তরঙ্গ বয়ে যায়, ‘আর এইডা আমার পোলা। গত রাইতে আমার বৌরে লইয়া গেছে।’

‘কারা নিয়েছে আপনার বৌকে?’

‘পাকিস্তানি আর্মিরা গতরাতে আমার বৌকে তুইলা লইয়া গেছে।’

‘আপনার বাড়ি চিনল কেমনে?’

‘পিরোচপুর জামাতের নেতা সুলতান মাহমুদ আকন লইয়া আইছে।’

‘আপনার বাড়ি কোথায়?’

‘এই তো উজানগাঁও গেরামে।’

‘পিরোজপুর শহর থেকে কত দূরে?’

‘ম্যালা দূরে।’

‘এতদূর অরা এলো কেমন করে?’

‘গাড়িতে আইচে।’

‘আপনার নাম কী?’

‘ঘনশ্যাম দাস। আমার পোলা লালশ্যাম দাস।’

‘ঘনশ্যাম দাদা!’ ঘনশ্যামের কাঁধে হাত রাখে কমান্ডার হানিফ, ‘আপনি বুঝতেই পারছেন আমরা একটা গভীর সংকটের সময় পার করছি। বাঙালি মাত্রই আমাদের একে অপরকে সাহায্য করতে হবে। সবচেয়ে কঠিন বাস্তবতা হলো—আমাদের আধুনিক অস্ত্র কম। প্রতিবেশী ভারত আমাদের সাহায্য করছে ঠিকই, কিন্তু আমরা যে পরিমাণ সাহায্য চাই, তুলনায় খুবই কম। কিন্তু দেশ তো আমাদের। আমাদের দেশকে আমাদের রক্ষা করতে হবে। আমরা কি কয়েকদিন আপনার বাড়িতে থাকতে পারি?’

‘আমার বাড়িতে থাকবেন?’ হতবাক ঘনশ্যাম।

মাথা নাড়ে হানিফ, ‘থাকব। কারণ, আপনার বাড়ি মাত্র গতরাতেই পাকিস্তানি আর্মি এসেছিল, খুব শীঘ্র আর আসার সম্ভাবনা নেই।’

‘মেয়াবাই, পাকিস্তানি আর্মি তো লগে দেশি রাজাকাররাও ছেলো।’

‘ওরা তো থাকবেই। পাকিস্তানি আর্মিদের শায়েস্তা করতে পারলে ওই শালাদের ধরা তো সময়ের ঘটনা। কিন্তু শ্যাম দাদা, আপনি তো বলছেন না কিছু?’

‘কী কমু আমি?’

‘আপনার বাড়িতে আমাদের থাকতে দিবেন কি না?’

‘হানিফ ভাই, আমার বাড়িঘরের আসল মালিকই তো নাই। আপনেরা দেশের লাইগা যুদ্ধ করতেছেন, এই যুদ্ধে যদি আমার বাড়ির কোনো উপকারে আহে, দিমু না ক্যান? হাজার ফির দিমু। তয় একখান কতা আমারে দেতে অইবে...’

‘কী কথা?’

‘আমার বৌরে ফেরত দিতে অইবে লগে দেশের স্বাধীনতা আর যদি আর একটা কাম...’ থেমে যায় ঘনশ্যাম।

‘থামলেন কেন? বলুন, আর একটা কী কাম?’

‘দেশ যহন স্বাধীন অইবে রাজাকার সুলতান আকনরে আমার আতে তুইলা দেবেন। অর বিচার মুই করুমু। আপনেরা খালি খাড়াইয়া দেখপেন।’

‘ঠিক আছে, আপনার সব কথা রাখার চেষ্টা আমরা করব। এখন আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে চলুন।’

‘চলেন,’ গতরাতে সব হারিয়ে নিঃস্ব ঘনশ্যাম পুত্রের হাত ধরে নিজের বাড়ির দিকে যেতে যেতে কমান্ডার হানিফ রহমানকে বলল, ‘হানিফ ভাই আমারে আর আমার পোলাডারে আপনাগো লগে যুদ্ধে নেবেন?’

ঘনশ্যামের কাঁধের উপর হাত রাখে তরুণ কমান্ডার, ‘আপনি, আপনার ছেলে আমরা সবাই মিলেই তো যুদ্ধে আছি। নতুন করে নেওয়ার তো কিছু নেই।’

পিরোজপুর থেকে পাড়ের হাটের দূরত্ব আট নয় মাইল। যাওয়ার একটাই রাস্তা। রাস্তাটায় ইট বিছানো এবড়ো-থেবড়ো পথ। গাড়িতে যেতে যেতে পাছা ব্যথা হয়ে যায়। পাড়ের হাট একটা বন্দর এলাকা। আশপাশের কয়েক গ্রামের মানুষজন আসে সওদাপাতি করতে। পুলিশের ছোট্ট একটা ফাঁড়ি আছে। বন্দরটা বিশাল কচানদীর তীরে গড়ে উঠেছে। মেজর ইসকান্দার হায়াত্ খানের কাছে খবর এসেছে পাড়ের হাটে মুক্তিদের আনাগোনা বেড়ে গেছে। দুদিন আগের এক রাতে পাড়ের হাটের বিশিষ্ট রাজাকার মাওলানা মোসলেম আহমদের বাড়ি আক্রমণ করেছে মুক্তিরা। রাজাকার মোসলেমকে পায়নি কিন্তু বাড়িতে লুটপাট করে আগুন দিয়েছে। রাজাকার মোসলেম এসে হাত-পা ধরে কান্নাকাটি করেছে গতকাল।

‘হুজুর, বাঁচান আমারে।’

মেজর ইসকান্দার উঠে মোসলেম মাওলানার গালে থাপ্পর লাগায়, ‘বেয়াকুফ কাহিকা। আমি তোকে বাঁচাবার কে? তোকে বাঁচাবে আল্লাহ।’

মেজরের হাতের গরম থাপ্পড় খেয়ে হতবাক মোসলেম মাওলানা নিজের ভুল বুঝতে পেরে মাথা নিচু করে বলল, ‘হুজুর মুক্তিদের অত্যাচারে মাথা ঠিক নাই। আপনে আমার গালে আরও দুইটা থাপ্পড় দেন।’

‘মুক্তি? কোথায় মুক্তি? আমি তো গত কয়েকদিন ধরে সারা পিরোজপুর শহরে মুক্তি খুঁজতেছি, একটাও পাচ্ছি না। আর তুমি বলছ সব জায়গায় মুক্তি?’

কী জবাব দেবে মোসলেম মাওলানা, দেশের অল্প কিছু আল্লাওয়ালা আমার মতো ঈমানদার ছাড়া সবাই তো মুক্তি, মুক্তিদের সঙ্গে ওঠাবসা করে, সব গোপন খবর পৌঁছে দেয় মুক্তিদের কানে। শোনা যায়, মুক্তিরা বাতাসের বেগে চলে। কেউ দেখতে পায় না।

মেজর খান বিস্মিত। পাকিস্তানে, নিজ মাকানে থাকার সময়ে জেনেছে, বাঙালিরা ভিতুর আণ্ডা। কয়েক হাজার বাঙালিকে গুলি করে হত্যা করলে সব আন্দোলন চিরকালের জন্য ঠাণ্ডা হয়ে যাবে। অথচ মার্চের পর আগস্টের মাঝামাঝি আসতেই বাঙালিরা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। আরও দুর্ভাবনা হলো, বাঙালিরা সামনাসামনি লড়ছে না। গেরিলা যুদ্ধ করছে, হিট অ্যান্ড রান। এই গেরিলা যুদ্ধ খুব খারাপ। আরও খারাপ খবর হলো, অনেক বাঙালি এই গেরিলাদের আশ্রয় দিচ্ছে। গোপন খবরাখবর দিচ্ছে।

পাড়ের হাটের বিশিষ্ট রাজাকার মোসলেম মাওলানাকে কথা দিয়েছে মেজর ইসকান্দার, পাড়ের হাটে একটা সেনা চৌকি বসানো হবে। শুনতে পাচ্ছে, সুন্দরবন এলাকায়ও মুক্তিদের ঘাঁটি গড়ে উঠেছে। না, আর বসে থাকা যায় না। মেজর সেন্ট্রিকে ডাকলেন কলিংবেল টিপে।

‘স্যার!’

‘ক্যাপ্টেন দিলদারকে আসতে বলো।’

‘ওকে স্যার!’

সেন্ট্রি চলে গেলে মেজর নিজের ভাবনায় ডুবে যেতে থাকে। খুব শীঘ্র এবার ঢাকা যেতে হবে। কতদিন হলো, নাজিয়া খানকে আদর করা হয় না। শালার মুক্তিরা...

‘স্যার?’ ক্যাপ্টেন দিলদার এসে দাঁড়ায়।

‘দিলদার, তুমি দশজনের একটা দল নিয়ে দুটো জিপে চড়ে পাড়ের হাট যাও। ওখানে একটা পুলিশ ফাঁড়ি আছে যদিও কিন্তু আমাদেরও একটা ঘাঁটি থাকা দরকার। বিশিষ্ট রাজাকার মোখলেস মাওলানা, দবিরউদ্দিন তোমার সঙ্গে দেখা করবে। ওদের পরামর্শ মতো কাজ করলে মুক্তিদের নিপাত করা যাবে সহজে। আর জায়গাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। সুন্দরবন থেকে কাছে, নদী পথে আমাদের গানবোটগুলোর চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। বাইনচোদ মুক্তিরা আড়াল থেকে গানবোটের উপর হামলা করছে।’

‘ওকে স্যার!’

ক্যাপ্টেন দিলদার আদেশ পেয়ে দশজন জওয়ানকে নিয়ে দুটো জিপে পাড়ের হাটের দিকে যাত্রা শুরু করেছে। দুপুরের আকাশ। চারদিক পরিষ্কার। পাকিস্তান থেকে এখানে আসার পর প্রথম নিজেই কোনো বড় দায়িত্ব পেয়েছে দিলদার। নিজেকে খুব অন্যরকম মনে হচ্ছে। কিন্তু এই অপারেশনের চেয়েও ক্যাপ্টেন দিলদারের কাছে উপাদেয় ছিল ভাগীরথীর সঙ্গ।

যখন ভাগীরথী হিন্দু আওরাত, সঙ্গে সঙ্গে শরীরে একটা জোশ এসেছে। জন্ম থেকে শুনে এবং জেনে এসেছে উপমহাদেশের হিন্দুরা হলো পাকিস্তানের চিরদুশমন। সেই চিরদুশমনের মেয়েকে বলাত্কার করার মধ্যে এক ধরনের জেল্লা আছে, জৌলুস আছে। মনে হয়, ওদের সঙ্গে সহবাস করলে অনেক সওয়াব হয়। শরীরে একটা ইশকের আমেজও অনুভব করা যায়।

মেজর ইসকান্দার হায়াত্ কোনো জানানাকে তিন-চার দিনের বেশি রাখে না। নতুন ধরে বা তুলে আনা বাঙালি আওরাত কাউকে পছন্দ হলেই দিলদারকে ডেকে পুরোনো আওরাতকে উপহার দিয়ে দেয়। দিলদার নিজের পছন্দ না হলে আরও নিচের দিকে চালান করে দেয়। কিন্তু ভাগীরথীকে নিজের কবজায় রেখেছে। দারুণ কাজের মহিলা। ওকে মনে করলেই শরীরের ভিতরে জান্তব উল্লাস খেলা করে। ভাগীরথীকে যত ব্যবহার করছে, ভাগীরথীর জন্য একটা টান অনুভব করে ক্যাপ্টেন দিলদার।

দু’জনে রাতে অনেক গল্পও করে। মনে মনে একটা পরিকল্পনা করেছে দিলদার, ভাগীরথীকে মুসলমান বানিয়ে বিয়ে করবে। একজন হিন্দু আওরাতকে মুসলমান বানানোর মধ্যে অনেক সওয়াব আছে। ভাগীরথী মুসলমান হোক আর যতই ভালো লাগুক না কেন কখনই পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাবে না। পশ্চিম পাকিস্তানে বিবাহিত স্ত্রী নওশীন আছে। পূর্ব পাকিস্তানের আসার মাত্র চার মাস আগে বিয়ে করেছে। বিয়ের পর পূর্ব পাকিস্তানে ট্রান্সফার হওয়ার খবর শুনে নওশীন অনেক কেঁদেছে। এই বাঙাল মুল্লুকে আসতে দিতে চায়নি।

রাতে কাঁদতে কাঁদতে বলেছে, ‘তুমি চাকরি ছেড়ে দাও।’

‘কেন?’ বৌয়ের লাল টুকটুকে মুখে আদর করতে করতে প্রশ্ন করেছে দিলদার।

‘বাঙাল মুল্লুকের মেয়েরা নাকি জাদুটোনা জানে...’

‘তো?’

‘তোমাকে যদি জাদুটোনা করে আমার কাছ থেকে কেড়ে নেয়? তখন আমি কোথায় যাব?’

বুকে আলতো কামড় দিয়ে নওশীনকে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরে দিলদার, ‘বেগম তুমি বুঝতে পারছ না আমি যাচ্ছি পবিত্র ইসলামকে রক্ষা করার জন্য। বাঙাল মুল্লুকে অনেক নাদান মুসলমান আছে, যাদের আমাদের চিরশত্রু ভারতের দুশমনরা হিন্দু বানিয়ে ফেলেছে।’

আঁতকে ওঠে নওশীন, ‘তাই নাকি?’

‘হ্যাঁ জান। পাকিস্তানের একজন সাচ্চা মুসলমান হয়ে আমি অন্য মুসলমানদের এই দুঃসময়ে বসে থাকতে পারি না। মহান পরোয়ারাদিগারের কাছে কি জবাব দেবো? তুমি আমাকে কওমের জন্য আমাকে যেতে অনুমতি দাও।’

নওশীন খান দুচোখ তুলে তাকায় প্রিয় স্বামীর দিকে, হাতের মধ্যে নেয় স্বামীর হাত, ‘যাও। একটা মহত্ কাজে যাচ্ছ, আল্লাহ তোমার হেফাজত করুন। কিন্তু একটা কথা আমাকে দিতে হবে।’

‘বলো কী কথা?’

‘তুমি কখনো বাঙাল রমণীদের দিকে তাকাবে না।’

নওশীন খানের হালকা শরীরটাকে বুকের সঙ্গে জাপটে ধরে দিলদার বেগ, ‘আঙুর ফলের মতো মিষ্টি বৌ থাকতে আমি কেন বাঙাল বেহায়া রমণীদের দিকে তাকাব? আমি যেখানেই থাকি না কেন নওশীন, আমার বিবাহিত স্ত্রী, তুমি সবসময় আমার সঙ্গে থাকবে।’

বাঙাল মুল্লকের অসভ্যদের কাছে প্রিয় স্বামী যাচ্ছে মহান ইসলামের রক্ষা করার জন্য, জাতির খাদেম লে. জেনারেল ইয়াহিয়া খান এই দুর্ভল সুযোগ দিয়েছে স্বামীকে, স্বামীর এই মহান সুযোগের বিরোধিতা করতে পারে না নওশীন খান। সে স্বামীর বুকের উপর মাথা রেখে স্বামীর ডান হাতে ছোট্ট একটা তাবিজ পরিয়ে দেয়। তাবিজ পরিহিত হাতের দিকে তাকিয়ে অবাক দিলদার বেগ, ‘এটা কী? তাবিজ?’

হাসে নওশীন, ‘হ্যাঁ, কোনো মামুলি তাবিজ নয়। পবিত্র কোরআন শরিফ এই তাবিজের মধ্যে আছে। সুতরাং তুমি আমাকে এই তাবিজ হাতে কথা দিয়েছ...’

‘তাবিজ হাতে কী কথা দিয়েছি?’

‘তুমি কোনো বাঙাল রমণীর দিকে তাকাবে না, তাদের কারো কাছে যাবে না, তাদের ব্যবহার করবে না...।’

ক্রোধে শরীরের শিরা-উপশিরা কেঁপে উঠছে দিলদার বেগের। পাকিস্তান আর্মি পৃথিবীর সেরা আর্মি। সেই আর্মির একজন অফিসারকে এতটা নাজুক আর অবিশ্বাসের পাল্লায় ফেলে দেয় নিজের বিবাহিত স্ত্রী! কিন্তু নিজেকে সামলে নেয় বেগ, অবুঝ মেয়ে বোঝে না পাকিস্তান আর্মির লোভ, বিশেষ করে নারী মাংসের প্রতি লোভ কত তীব্র, কত ভয়ানক! স্বয়ং আমাদের জেনারেল আগা মোহাম্মাদ ইয়াহিয়া খান দিনরাত মদ আর মেয়েদের মধ্যে ডুবে থাকে। গুরু যেখানে ডুবে থাকে, সেখানে আমরা তার একনিষ্ঠ কর্মী হিসেবে সাঁতার না কাটলেও চাখতে তো পারি! আর পাকিস্তান আর্মির ঐতিহ্য মদ ও নারী। না, সবটা জানেও না বেচারা নওশীন। মাত্র কলেজ পাস করেছে।

স্ত্রীর কপালে দীর্ঘ চুমু আঁকে দিলদার বেগ, ‘তোমার কথা যথাযথভাবে পালন করা হবে।’

সেই তাবিজ হারিয়ে গেছে ভাগীরথীর বিছানায়। পাড়ের হাটের পথে গাড়ি চলছে মন্থর গতিতে। অলস দুপুর। ভাগীরথীর হাতের রান্নাও চমত্কার। গতকাল ইলিশ মাছের ভুনা খাইয়েছে। আজ রাতে খাওয়াবে মুরগির মাংসের সঙ্গে পাঙ্গাস মাছের পেটি।

ভাগীরথীকে ক্যাম্পের বাইরে যেতে দিয়েছে ক্যাপ্টেন দিলদার বেগ। মাসখানেক আগে, রাতে রমণের পর ঘুমিয়ে গেছে দিলদার। শেষ রাতে ঘুম ভাঙে করুণ কান্নার সুরে। দেখে, বিছানার নিচে মাটিতে বসে কাঁদছে ভাগীরথী। একটু বিরক্ত দিলদার কাছে আসে, ‘কী হয়েছে? কাঁদছ কেন?’

‘কিছু না,’ ভাগীরথী কান্না থামানোর চেষ্টা করছে।

‘মিথ্যা বলো না। কী হয়েছে বলো আমাকে,’ মদের গ্লাস হাতে নেয় দিলদার বেগ।

‘আমার ছেলেটাকে...’

হাতের বোতল হাতেই থেমে যায়, ‘তোমার ছেলে?’

মাথা নাড়ায় ভাগীরথী, ‘আমার ছেলে। লালশ্যাম। মাত্র আট বছর বয়স। ওকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছে।’

‘তোমার ছেলে কোথায়?’

আবার কাঁদতে শুরু করে ভাগীরথী, ‘আমি কী করে বলব? সেই রাতে তোমরা আমাকে তুলে নিয়ে এলে ছেলেকে দেখে এসেছি ঘরের মধ্যে। সেই থেকে তো কোনো খবরই পাই নাই।’

‘এতরাতে ছেলের জন্য কাঁদলে ছেলেকে পাবে?’

নগ্ন শরীরে জড়িয়ে ধরে ক্যাপ্টেন দিলদার বেগকে, ‘আমাকে একবার যেতে দেবে?’

‘কোথায়?’

‘আমার বাাড়ি। যদি ছেলেটাকে পাই, একটু আদর করে চলে আসব।’

‘অসম্ভব!’ ভাগীরথীর বাড়ি যাওয়ার প্রস্তাব এক শব্দে নাকচ করে দেয় দিলদার বেগ। ‘পাকিস্তান আর্মির একটা শৃঙ্খলা আছে। তোমাকে ছেড়ে দিলে আরও অনেককে যেতে দিতে হবে। তাছাড়া তুমি যদি মুক্তিদের সঙ্গে...’

দু পা জড়িয়ে ধরে ভাগীরথী, ‘আমার এই শরীরের কী দাম আছে? কেউ তো আমারে সমাজে নেবে না। শুধু ছেলেটাকে এক নজর দেখে চলে আসব। দুনিয়ায় তো আমার কেউ নাই। স্বামীও আমাকে নেবে না। এই দয়াটুকু করেন আপনি। আপনিও তো এক মায়ের সন্তান!’

বিচলিত বোধ করে দিলদার বেগ। সত্যিই তো এই ভাগীরথীর শরীর ছাড়া কিছুই নেই। একটা দর্শনের গোলাকধাঁধায় পড়ে যায় দিলদার। একটা সামান্য মেয়ে মানুষই তো। কী আর করবে? পাকিস্তান সেনাবাহিনী, পৃথিবীর অজেয় বাহিনী। সেই বাহিনীর একজন অফিসার হয়ে আমি সামান্য নারীর আবেদনে সাড়া দিতে পারব না? মনে মনে সিদ্ধান্ত নেয়, যেতে দিই একবারের জন্য। কী আর হবে? কিন্তু মেজর সিকান্দার হায়ােক জানালে যেতে দেবে না।

‘ঠিক আছে, আমি তোমাকে একবারের জন্য যেতে দিতে পারি... লেকিন এক শর্তে।’

ভাগীরথী উত্সুক মুখে তাকিয়ে, ‘বলুন কী সেই শর্ত?’

‘তুমি মুক্তিদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করতে পারবে না।’

‘মুক্তি আমি কোথায় পাব? কেমন করে মুক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ করব, কিছুই তো জানি না।’

‘ঠিক আছে, তুমি দিনের বেলা যাবে, আবার দিনের মধ্যে ফিরে আসবে। যদি না আসো...’ থেমে যায় ক্যাপ্টেন দিলদার বেগ, ‘তোমার বাড়িঘর মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেয়া হবে। আর তোমাকে খুঁজে বের করে কুকুরের মতো গুলি করে মারব, আমি নিজে।’

‘আপনার সব শর্তে আমি রাজি।’

‘ওকে, কাল সকালে যাবে। দুপুরের আগে ফিরে আসবে।’

পায়ের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে ভাগীরথী, ‘আপনার অনেক দয়া।’

পরের দিন ভাগীরথী গিয়েছিল গ্রামের বাড়িতে। বাড়িতে ছেলেটাকে পেয়েছে। স্বামী ঘনশ্যাম কোথায় বলতে পারেনি ছেলেটা। বাড়ি থেকে আসার সময়ে ডাব-নারকেল আর মুরগি নিয়ে এসেছে। নিজের হাতে রান্না করেছে ভাগীরথী। আসার সময়ে ছেলেটা অনেক কেঁদেছে। বুঝিয়ে রেখে এসেছে। ভাগীরথীর মন খারাপ হলেই দিলদার বুঝতে পারে, ছেলের জন্য ওর মনোবেদনা।

এখন প্রতি সপ্তাহে একবার করে বাড়ি যায় ভাগীরথী। ভাবছে, মুসলমান বানিয়ে ভাগীরথীর নাম রাখবে, আসমাতুন জামিলা।

ঠা ঠা ঠা... সামনের জিপটি পাড়ের হাটের খুব কাছে কাঠের ব্রিজের ওপর উঠে মাঝ বরাবর চলে গেছে। পিছনে ক্যাপ্টেন দিলদার বেগের জিপ। ভাগীরথীকে ভাবতে ভাবতে সামান্য তন্দ্রার মতো এসেছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে রাইফেলের গুলি আর ব্রিজ ভেঙে পড়বার তীক্ষ আওয়াজে চারপাশটা নরকে পরিণত হয়েছে। সামনের জিপে আটজন পাকিস্তানি জওয়ান, ড্রাইভার কর্পোরাল মাকসুদুল হকসহ। রাইফেলের শব্দ পেয়ে ক্যাপ্টেনের জিপের ড্রাইভার ব্র্রিজে ওঠার আগেই গাড়ি দ্রুত ঘুরিয়ে নিতে গিয়ে রাস্তার পাশে নারকেল গাছের সঙ্গে বিকট ধাক্কা খেয়ে থেমে যায়। জিপের ড্রাইভার সিপাহি হোসেনউদ্দিনের কপালে বিরাট ফাটল দেখা দিয়েছে। কপাল ফেটে গলগল রক্ত পড়ছে। বাকিরা দ্রুত নেমে পজিশন নিয়েছে। কিন্তু এই মুহূর্তে রাইফেলের কোনো শব্দ নেই। চারপাশটা নিঝুম। অনেক দূর থেকে ভেসে আসছে জয় বাংলা স্লোগান।

ক্যাপ্টেন দিলদার বেগ বুঝে গেছে, মুক্তিরা গেরিলা আক্রমণ চালিয়ে চলে গেছে। ক্রোধে, অসহায় আক্রোশে দিলদার বেগ দাঁতে দাঁত ঘষে, নেমকহারামের বাচ্চা! ইসলামের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছিস। একবার হাতের নাগালে পেলে তোদের দেখিয়ে দেবো... পজিশন ছেড়ে ব্র্রিজের ওপর এসে দেখতে পায় পাকিস্তানের অজেয় বাহিনীর ক্যাপ্টেন দিলদার বেগ, সামনের জিপটি খালের গভীর পানিতে উল্টো হয়ে ভাসছে। সঙ্গে পবিত্র পাকিস্তানি বাহিনীর চারটে লাশও। ব্র্রিজের মাঝখানটা ভেঙে দু টুকরো হয়ে গেছে। আগুন জ্বলছে। ধোঁয়া উড়ছে।

ভাগীরথী পিরোজপুর মহকুমার পাকিস্তানি আর্মি ক্যাম্পের সামনে দাঁড়িয়ে আছে।

চোখ মুখ ভাবলেশহীন। মেজর ইসকান্দার হায়াত্ খান, ক্যাপ্টেন দিলদার বেগ, স্থানীয় রাজাকার শ্রেষ্ঠ সুলতান মাহমুদ আকন ক্যাম্পে উপস্থিত। আসামি ভাগীরথী। বিচার চলছে। আগস্টের মাঝামাঝি থেকে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে পাকিস্তান আর্মি মুক্তিবাহিনীর তিন-তিনটা সফল অ্যামবুশের শিকার হয়েছে। এগারো জন রাজাকারসহ সতেরো জন পাকিস্তানি আর্মি নিহত হয়েছে। ঢাকার হেড কোয়ার্টারে কৈফিয়ত দিতে দিতে মেজর ইসকান্দার হায়াত্ খান লা-জবাব। মেজর জেনারেল কোব্বাদ খান জানিয়েছে, ‘মেজর তোমাকে আর বাঙাল মুল্লুকে রাখা গেল না।’

‘স্যার!’

‘তোমার পিরোজপুর সাবডিভিশনে একের পর এক পাকিস্তান বাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের অ্যামবুশের শিকার হচ্ছে। তুমি কী করছ, দুদু খাচ্ছ?’

‘স্যার, এই এলাকার মুক্তিরা খুব শক্তিশালী। ভারত সীমান্ত দিয়ে অস্ত্র পাঠাচ্ছে...’

‘তুমি আর তোমার ফৌজ কার বাল ছিঁড়ছ?’ টেলিফোনে চিত্কার করছে কোব্বাদ খান।

মেজর ইসকান্দায় হায়াত্ খান বলতে পারে না, ‘স্যার, আপনি তো ঢাকায় ক্যান্টনমেন্টের নিরাপদ জায়গায় বসে চেটাং চেটাং কথা বলতে পারেন। পিরোজপুরে থেকেও তো খবর পেয়েছি, মুক্তিরা ঢাকার ইন্টারকন্টিনেন্টালে আক্রমণ চালিয়েছে। জোনাকী সিনেমা হলের সামনের হাবিব ব্যাংক থেকে দিনের বেলা টাকা লুট করেছে মুক্তিরা। আপনারা কী করেছেন মুক্তিদের? যতদূর জানি, সবাই ঘরের মধ্যে গর্তে ঢুকে বসে আছেন।’

‘যাহোক, তুমি পাকিস্তান আর্মির উপযুক্ত নও। তোমাকে পকিস্তানে পাঠানোর ব্যবস্থা হচ্ছে,’ খট করে ফোন রেখে দেওয়ার শব্দ কানে আসে মেজরের। সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুত্ চমকের মতো ভাগীরথীকে মনে আসে মেজরের। দিলদারকে ডেকে পাঠায়।

‘তোমার প্রিয় আওরাত ভাগীরথী কোথায়?’

‘স্যার, ওর ছেলেকে দেখতে গেছে।’

‘এতসব ঘটনার পর আবার মহিলাকে বাইরে যেতে দিয়েছ?’ মেজর অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে দিলদার বেগের দিকে। দিলদার মেজরের তীক্ষ চোখের সামনে কুঁকড়ে যায়। কোব্বাদ খানের কাছ থেকে ধার করে বলে, ‘তোমাকে পাকিস্তান আর্মির উপযুক্ত মনে হচ্ছে না।’

‘স্যার!’

‘তুমি ভাগীরথীকে আমাদের আগাম অপারেশনের কথা জানাও?’

‘নাহ স্যার!’

‘তোমার চোখ-মুখ বলছে, তুমি জানাও।’

নিরুত্তর ক্যাপ্টেন দিলদার বেগ। ভাগীরথীকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছে দিলদার। হাসিমুখে রাজি হয়েছে ভাগীরথী। এমনকি নামটাও পছন্দ করেছে। একটা আবেদন জানিয়েছে, বিয়ের পর আমাকে পাকিস্তানে নিয়ে যাবেন। কারণ, এখানে এই দেশে কেউ আর আমাকে গ্রহণ করবে না।

‘সেটা কী করে সম্ভব?’

‘আপনার দেশে যদি আপনার বৌ থাকে, থাকুক। আমি তার দাসী হয়ে থাকব। তবুও এই দেশে আর থাকতে চাই না। আপনারা মুসলমান পুরুষরা যে সুখ দিতে পারেন সেই সুখ হিন্দু পুরুষরা দিতে পারে না। আপনাগো আমার ভীষণ ভালো লাগে...’

‘ঠিক আছে,’ ব্যাপারটা ভেবে দেখার আশ্বাস দিয়েছে ক্যাপ্টেন দিলদার বেগ। একজন হিন্দু নারীকে মুসলমান বানানোর মধ্যে অনেক সওয়াব আছে এবং পাকিস্তান আর্মির বীরত্বগাঁধার বিবরণ দিতে গিয়ে বেশ কয়েকবার আর্মির অ্যাকশনের প্রসঙ্গ বলেছে, বিশেষ আবেগের মুহূর্তে। মনে পড়ে দিলদারের সেই সময়ে ভাগীরথীর আবেগ উথলে উঠত।

‘ভাগীরথী! মালাউন কা বাচ্চা!’ দাঁতে দাঁত পিষে ক্যাপ্টেন দিলদার বেগ। ভিতরে ভিতরে রাগে ফুটন্ত পানির মতো ফুটছে, একটা হিন্দু আওরাতের কাছে এইভাবে হেরে গেলাম? কেবল নিজের পরাজয়? গোটা কওমের পরাজয়। ছিঃ ছিঃ, নিজের গালে নিজের থাপ্পড় মারতে ইচ্ছে করছে দিলদারের, শেষ পর্যন্ত হিন্দু আওরাতের কাছে এই নির্মম পরাজয়? কেবল আমার জন্য সতেরো জন পাকিস্তানি আর্মি মুক্তিদের অ্যামবুশের শিকার হয়েছে। সতেরো জন বেঁচে থাকলে কওমের সেবা করতে পারত। নিজের চুল নিজের ছিঁড়তে ইচ্ছে করছে।

ভাগীরথী বিশ্বাসঘাতক!

বিশ্বাসঘাতক ভাগীরথীর শাস্তির দায়িত্ব দেয়া হয়েছে ভাগীরথীর প্রিয় মানুষ ক্যাপ্টেন দিলদার বেগের উপর। বিকেলের দিকে ভাগীরথী ক্যাম্পে ফিরে আসার সঙ্গে সঙ্গে অন্য মেয়েদের থেকে আলাদা করে একটা রুমে বন্দী করা হয়েছে। রাতে কেউ ডাকেনি। খেতেও দেয়নি। সকাল নটার দিকে দরজা খুলে তিনজন সেন্ট্রি নিতে এসেছে ভাগীরথীকে। ক্যাম্পের সামনে খোলা মাঠ। মাঠটার চারদিকে উঁচু দেয়ালের ঘের। বাইরে থেকে সহজে কিছু বোঝার উপায় নেই। ছোটখাটো জমায়েত। সবাই গম্ভীর। মেজর ইসকান্দার চেয়ারে বসে সামনের টি-টেবিলের উপর বুটসহ পা ছড়িয়ে দিয়েছে, হাতে ছোট লাঠিটা চক্রাকারে ঘুরাচ্ছে।

ভাগীরথীকে দাঁড় করানো হয়েছে সবার সামনে। চোখে চোখ পড়ে সুলতান মাহমুদের। নিমিষে চোখ সরিয়ে নেয় সুলতান মাহমুদ। মাগীটা একটা খবিস। দেখতে তো মনে হয়, ভাজা মাছ খেতে জানে না। অথচ মাশরেকি পাকিস্তানের সতেরো জন পবিত্র সৈন্য মারা পড়েছে মাগীটার কূটচালে! ছেলে দেখার গল্প ফেঁদে বাড়িতে গিয়ে মুক্তিদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে মাগী! এখন তোর মুক্তি আব্বারা কোথায়? কে তোরে বাঁচাবে? পকিস্তানি পবিত্র সৈন্যরা তোকে খাইয়েছে, পরিয়েছে, আদরে রেখেছে, আরে মাগী তুই সেই পবিত্র পাকিস্তানি সৈন্যগো বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করো!

চারদিকে চোখ বুলিয়ে দেখেছে ভাগীরথী, না প্রিয় নাগরকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। উপস্থিত সবাই তাকিয়ে আছে ভাগীরথীর দিকে। ভাগীরথী নির্বিকার। সবকিছুর জন্য প্রস্তুত আমি, নিজের মনে কথা কয় ভাগীরথী। হারামজাদারা, সাত সাগরের ওপার থেকে আইসা আমাগো নদী আমাগো খাল আমাগো জমি দখল করবা আর আমরা প্রতিবাদ করলেই হবে অন্যায়! যা করেছি, বেশ করেছি। বুঝে শুনেই করেছি...ভাগীরথী ভাবনার মধ্যে দিয়ে ক্যাপ্টেন দিলদার বেগ ক্যাম্পের ভিতর থেকে বের হয়ে আসে। মেজরকে স্যালুট করে একেবারে ভাগীরথীর সামনে দাঁড়ায় সিনা টান করে, ‘তুই মুক্তিদের আগাম খবর দিয়েছিস?’

ভাগীরথী নির্বিকার।

চুল ধরে মাথা ঝাঁকায়, ‘কথা বলছিস না কেন? দিয়েছিস মুক্তিদের খবর?’

মাথা নাড়ায় ভাগীরথী, ‘হয় দিছি। বাঁইচা থাকলে আরও দিমু।’

ক্যাপ্টেন দিলদার বেগ ভাগীরথীকে ছেড়ে দিলে, ভাগীরথী মাথা সোজা করে দাঁড়ায়। সঙ্গে সঙ্গে মুখের উপর প্রবল বেগে ঘুষি চালায়। নিজেকে সামলে নেয়ার প্রাণপণ চেষ্টা করে ভাগীরথী। কিন্তু দিলদার বেগের ক্রমাগত ঘুষি আর থাপ্পড়ে মাটিতে পড়ে যায়। সঙ্গে সঙ্গে চালায় বুট পায়ের তীব্র আর অকথ্য লাথি। একের পর এক লাথি। ভাগীরথী চুপ, চিত্কার নয়, নয় কান্নার কোনো শব্দ। নয় করুণা কামনার কোনো আর্তি। ভাগীরথীর এই অসহ্য নীরবতা ক্যাপ্টেন দিলদার বেগকে আবারও পরাজয়ের মুখোমুখি দাঁড় করায়। ভাগীরথীর মুখ থেকে কান্নার শব্দ বের করার জন্য ডান পায়ের বুটের চাপ দিতে শুরু করে বাম গালের উপর। বুটের প্রবল চাপে দু’গাল থেঁতলে মুখের পাশ দিয়ে লাল রক্ত বের হচ্ছে কিন্তু সহ্য করে যাচ্ছে ভাগরথী।

এতগুলো মানুষের সামনে দিলদার বেগ ভাগীরথীর এই উপেক্ষা মেনে নিতে পারে না। মাথার মধ্যে চক্রাকারে ঘুরতে থাকে ক্রোধের বাজপাখি। দোর্দণ্ড প্রভাবশালী পাকিস্তান আর্মির চৌকস ক্যাপ্টেন হেরে যাবে বাঙালি আওরাতের কাছে? মাগী কোনো শব্দ করবে না!

সামনে তাকিয়ে দেখতে পায় জিপ দাঁড়িয়ে আছে। সঙ্গে সঙ্গে মাথার মধ্যে প্ল্যান সাজায়। দ্রুত সেন্ট্রিদের আদেশ করে লম্বা দড়ি নিয়ে আসার জন্য। দৌড়ে ক্যাম্পের ভিতরে যায় দুজন সেন্ট্রি। আর দুজন সেন্ট্রিকে আদেশ করে দিলদার, ওকে দাঁড় করাও।

সেন্ট্রিরা দ্রুত দাঁড় করায় ভাগীরথীকে। আলুথালু ভাগীরথী কোনোভাবে দাঁড়িয়ে থাকে। ভিতর থেকে সেন্ট্রিরা শক্ত দড়ি নিয়ে এলে দিলদার বেগ নিজের হাতে ভাগীরথীর দুহাত শক্ত করে বাঁধে। চোখে মুখে পরাজয়ের ক্রোধ, বিকৃত মুখে জমে উঠেছে ঘাম। ভাগীরথীকে টেনে নিয়ে যায় জিপের কাছে। দড়ির এক প্রান্ত বাঁধে জিপের বনেটের সঙ্গে। তাকায় অপেক্ষারত লোকগুলোর দিকে। মুখে হিংস্র হাসি। এক লাফে উঠে বসে জিপের ড্রাইভিং সিটে। জিপ স্টার্ট দেয়। যন্ত্রদানব চলতে শুরু করে সামনের দিকে। চোখের সামনে এমন ভয়াবহ দুর্লভ দৃশ্য দেখার জন্য ক্যাম্পের সবাই দাঁড়ায়। মেজর ইসকান্দার হায়াতের চোখে কৌতুক, মুখে মৃদু হাসি। বাঙালিদের আত্মায় ভয় ধরিয়ে দেয়ার জন্য ক্যাপ্টেন দিলদারের এই আয়োজন, চমত্কার, নতুন, অভাবনীয়! দুনিয়ায় স্বাধীনতাকামী যে কোনো গোষ্ঠীর জন্য দিলদার বেগের এই শাস্তি হতে পারে শ্রেষ্ঠ উদাহরণ।

কয়েক মুহূর্ত পর হাতে দড়ি বাঁধা ভাগীরথীর দড়িতে টান পরলে সামনের দিকে ছুটতে শুরু করে। জিপের গতি বাড়লে ভাগীরথীও দৌড়ের গতি বাড়াতে বাধ্য হয়। কিন্তু ক্যাম্প থেকে মেইন রাস্তায় উঠে জিপের গতি আরও বাড়লে ভাগীরথী আর দৌড়ুতে পারে না। গতির সঙ্গে পা মিলিয়ে, ইটবিছানো রাস্তার উপর পড়ে যায়, জিপ ছুটতে থাকে, পিছনে ছেঁচড়াতে ছেঁচড়াতে যাচ্ছে ভাগীরথী। ভাগীরথীর কণ্ঠ ছিঁড়ে বের হয়ে আসে আর্তি ও আর্তনাদ। জিপ চালাতে চালাতে উল্লাসে ফেটে পড়ে ক্যাপ্টেন দিলদার বেগ। জিও পাকিস্তান!

পিরোজপুর শহরের পথচারীরা দেখছে পবিত্র সকালে এক বাঙালি নারীর শরীরের মাংস পাশবিক ক্ষয়ে যাবার মর্মান্তিক দৃশ্য। চিত্কার করছে ভাগীরথী। কাঁদছে ভাগরথী। শরীরের মাংস বিন্দু বিন্দু করে লেগে যাচ্ছে কংক্রিটের বিষাক্ত ঘর্ষণে, ইটের পাঁজরের উপর লেগে যাচ্ছে টাটকা রক্তের দাগ, আকাশে বাতাসে ভাগীরথীর চিত্কার ছড়িয়ে পড়ছে। এমন জান্তব চিত্কারের শব্দ শুনে সাধারণ মানুষ রাস্তায় এসে দেখতে পায়, পাকিস্তানি সৈন্য ক্যাপ্টেন দিলদার বেগের নৃশংস উল্লাস আর শুনতে পায় জিপের ঘন ঘন হর্ন বাজানো। হর্নের বিপরীতে ভাগীরথীর বুকফাটা আর্তনাদ। গোটা পিরোজপুর শহরের উপর দিয়ে জিপ ঘুরিয়ে ঘণ্টাখানেক পর যখন বিকৃত দিলদার বেগ ক্যাম্পের সামনে নিয়ে আসে, তখন ভাগীরথীর শরীরে কোনো মাংস নেই। বুকের নিচ থেকে সব মাংস উধাও। দুই হাতের উপর মাথাটা কোনোভাবে টিকে আছে। গোটা কঙ্কাল বীভত্স, ভয়াবহ!

হাড়সর্বস্ব ভাগীরথীর শরীরের প্রাণ এখনও প্রবহমান। অবাক চোখে ভাগীরথী তাকিয়ে দেখছে চারপাশ, বাংলার আকাশ, বাতাস...। ভাগীরথী বুকের দিকে তাকায়, না পেলব স্তন জোড়া নেই। স্তনের মাংস ক্ষয়ে বের হয়েছে কুিসত্ হাড়। যে স্তন জোড়ার মধ্যে মুখ ডুবিয়ে দিত লালশ্যাম...। লালশ্যাম! চিত্কার করে ডাকতে চায়, কিন্তু কণ্ঠ চিরে কোনো শব্দ বের হয় না। এক ধরনের ধাতব শব্দ কণ্ঠস্বরের মধ্যে গড় গড় করে।

মেজর ইসকান্দার হায়াত্, সুলতান মাহমুদ আকন উঠে এসে চোখের সামনে নির্মিত অবাক ভাস্কর্য দেখে। পা দিয়ে নাড়া দেয় মেজর, মেজরের দেখাদেখি সুলতান আকনও পা দেয় ভাগীরথীর শরীরে। জুতার নিচে উঠে আসে চাপ চাপ রক্ত। বিরক্ত মেজর সেন্ট্রিকে ডাকে পানি নিয়ে আসার জন্য।

সুলতান মাহমুদের কর্মী রাজাকার হামিদ মিয়া সেন্ট্রির আগে পানির জগ নিয়ে আসে। মেজর জুতাসহ পা বাড়িয়ে দেয়, হামিদ মিয়া জুতার রক্ত মুছে দিচ্ছে এক হাতে আর এক হাতে পানি ঢালছে। পবিত্র দৃশ্য দেখছে সুলতান মাহমুদ গভীর আগ্রহে। জুতার রক্ত মুছে গেলে মেজর তিনজন জওয়ানকে হুকুম করে, এই কমিনে আওরাতের বডি নদীতে ফেলে দিয়ে এসো।

আবার জিপের পিছনে যেতে যেতে প্রায় আধা মাইল যায় ভাগীরথী। না, ভাগীরথীর প্রাণ তখনও যায় না। চারপাশের লোকেরা অবাক, বধ্যভূমিতে পাকিস্তানি সৈন্যরা প্রতিদিন কত মানুষের লাশ ফেলে দেয়, কত মানুষকে ধরে এনে পানিতে কোমর পর্যন্ত দাঁড় করিয়ে গুলি করে লাশ পানিতে ভাসিয়ে দেয়। সেই পাশবিক পাকিস্তানিরা এ কাকে নিয়ে এসেছে?

হাতদুটো থেকে দড়ি ছাড়িয়ে আধামৃত ভাগীরথীকে তুলে নদীর মধ্যে ফেলে দেয় পাকিস্তানি সেন্ট্রিরা। ঝপাত্ করে একটা শব্দ হয়। চারদিকে পানি ছড়িয়ে পড়ে। ছোট্ট কয়েকটা ঢেউয়ের পর নদীর পানি নিথর। কয়েক মুহূর্ত ভেসে থেকে টুপ করে ডুবে যায় ভাগীরথী। পানি আবার সমান। মনে হয় না, কয়েক মুহূর্ত আগে একজন ভাগীরথীকে গিলে খেয়েছে নদী! d

 

 

 

 

 

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
২১ জুন, ২০১৮ ইং
ফজর৩:৪৩
যোহর১২:০০
আসর৪:৪০
মাগরিব৬:৫১
এশা৮:১৬
সূর্যোদয় - ৫:১১সূর্যাস্ত - ০৬:৪৬
পড়ুন