নির্বাচিত অনুবাদ গল্প
দ্য ইনকমপ্লিট কর্পস
জ্যাক ওয়েব
অনুবাদ : শওকত হোসেন২১ জুন, ২০১৭ ইং
দ্য ইনকমপ্লিট কর্পস
পাঁচ মিনিটের ভেতরেই বদলে গেল নরমান রথের জীবন। ঠিক করে বলতে গেলে ব্যাপারটা ছিল মাত্র এক সেকেন্ডের। স্ত্রীকে অজানা, অপ্রত্যাশিত জায়গায় দেখার ভয়ংকর ওই মুহূর্তটিতে। মাত্র একটা সেকেন্ডই লেগেছিল তাতে। সুখী, নিরীহ আর শত্রুহীন মানুষ নরমান রথ, ঘৃণার ঠাঁই ছিল না ওর মনে। কিন্তু মাত্র এক সেকেন্ডের ব্যবধানে স্যাডিস্ট ম্যানিয়াতে রূপান্তরিত হলো সে, দুনিয়ায় প্রতিশোধ ছাড়া আর কিছুই ঠাঁই পেল না ওর মনে। ওই এক সেকেন্ডের মধ্যেই খুন করে বসতে পারত বটে, কিন্তু স্রেফ খুন সন্তুষ্ট করতে পারত না ওকে, খুনই যথেষ্ট ছিল না।

গুরুত্বপূর্ণ পাঁচ মিনিটের সূচনার ক্ষণটিতে বাড়ি থেকে মাত্র তিরিশ মাইল দূরে ছিল সে; সেদিনই শিকাগো থেকে লম্বা পথ পাড়ি দিয়ে ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত। ওর স্ত্রী সিডনি অপেক্ষায় ছিল—আরও চার বা পাঁচ দিন পর ও আসবে বলে ধারণা ছিল তার—তবে অপেক্ষা করছিল। সিডনির কাছে ওর ফেরাটা সুখকর একটা বিস্ময় হওয়ার কথা ছিল। তখন দশটা বেজে গেছে, স্ত্রী ঘুমিয়ে পড়ার আগেই ঘরে ফিরতে উদগ্রীব ছিল সে।

তবে নিজেও ঘুমের বিরুদ্ধে যুঝছিল। বরাবরই গাড়ি চালানোর সময় হুইলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ার আশঙ্কায় ভোগে সে, তখন হয়তো কোনো নর্দমায় গিয়ে পড়তে হবে বা খুঁটির সঙ্গে টক্কর খেয়ে দুমড়ে মুচড়ে যাবে। কিন্তু তেমন কিছু চায়নি ও। বেঁচে থাকার অনেক কারণ আছে ওর। একটা ছোট্ট যাত্রাবিরতি আর এক কাপ কফির প্রয়োজন ছিল।

যে কারণেই হোক এক কাপ কফি মেলার মতো কোনো রোডসাইড ক্যাফের দেখা পাওয়া গেল না। মরিয়া হয়ে শেষে আরও দামী একটা জায়গাই বেছে নিল। ছোট পার্কিং লটে ডজন দুই গাড়ি ঠাসাঠাসি করে পার্ক করা ছিল; কোনোমতে নিজের গাড়ি রাখার একটা ব্যবস্থা করল ও।

গাড়ি থেকে বেরুতেই গানের প্রবল আওয়াজ আঘাত হানল কানে, ওর পছন্দের তুলনায় খানিকটা চড়া। এতে অবশ্য জেগে থাকতে সুবিধা হতে পারে, ভাবল সে। ঠেলেঠুলে ভেতরে ঢুকল। দেখা গেল বাইরের তুলনায় তেমন একটা আলো নেই এখানে। মামুলি রোডসাইড ট্যাভার্ন, জরাজীর্ণ অবস্থা থেকে খানিক ভালো। অর্কেস্ট্রায় চার জন বাদক, ওদের সামনে একটা ছোট ফাঁকা এক চিলতে জায়গা, ওখানে কয়েকজন নাচছে। বুঁদ আর টেবিলও আছে, আর আছে একটা বার। বারটা ফাঁকা দেখে সেটাই বেছে নিল সে।

‘এক কাপ কফি,’ বলল বারটেন্ডারকে ।

‘কফি পাবে কিচেনে,’ বলল লোকটা।

নরমান রথ মারদাঙ্গা টাইপের নয়, স্রেফ অটল। সুবেশী, দেখে গুরুত্বপূর্ণ কেউ বলেই মনে হয়। ‘তুমি কাউকে এক কাপ কফি আনতে বলতে পারো না?’ জানতে চাইল ও।

বিড়বিড় করে সরে গেল লোকটা। এক ওয়েট্রেসের সাথে কথা বলল। ম্লান আলোয় এখন আরও সয়ে এসেছে রথের চোখ। জায়গাটা নিয়ে কৌতূহল বোধ করছে না ও। চোখ বুজে ওগুলোকে বিশ্রাম দেওয়ার প্রয়াস পেল। বেশ ভালো বোধ করছে এখন। সিডনির কাছে ফিরে যাবার তাড়া না থাকলে এখান থেকে বের হয়ে গাড়িতেই এক দফা ঘুমিয়ে নিতে পারত। তবে কফির বুদ্ধিটা বেশ ভালো হয়েছে।

অবশেষে কফি এল। চাঙা করে তুলল তাকে। পিরিচ বিহীন পুরু কাপে হলেও কফি যথেষ্ট কড়া। একটা ডলারের নোট এমনভাবে বারের ওপর রাখল যেন ভাঙতি ফিরে পাবার আশা করছে না। এবার কফিতে চুমুক দিল সে—উত্তপ্ত কফিতে যত দ্রুত চুমুক দেওয়া সম্ভব।

কফি প্রায় শেষ করে এনেছে, আরেকটু হলে বার থেকে বের হয়েই যেত; ঠিক তখনই ওদের দেখতে পেল ও। ওদের দেখার সেই চোখ ঝলসানো মুহূর্ত থেকেই আর কোনো বিভ্রান্তি রইল না ওর  ভেতর। কী দেখেছে তার তাত্পর্য বুঝতে পারল পুরোপুরিই।

দূর প্রান্তের দেয়ালের কাছে একটা বুথে রয়েছে ওরা। সম্ভবত সামনে নৃত্যরত জোড়াগুলোর আনাগোনার কারণেই এতক্ষণ দেখতে পায়নি ওদের : টমি বার্টন আর সিডনি।

টমি বার্টন নেহাতই বাচ্চা ছেলে। বিশালদেহী, চমত্কার দেখতে, পুরুষালী, কিন্তু বাচ্চাই। সিডনির চেয়ে অন্তত পাঁচ বছরের ছোট হবে। কলেজের ডিগ্রিধারী টমি বার্টন অল্পদিন আগে মিলিটারির চাকরি ছেড়ে আসা জাত সেলসম্যান। ছেলেটার মেধা টের পেয়েই ওকে কাজে নিয়েছিল নরমান রথ। যোগ্যতার প্রমাণও দিয়েছে টমি বার্টন। মাত্র তিন বছরেই খালি হাতে রথ অ্যান্ড কোম্পানিকে জাতে তুলে এনেছে। মাত্র দুই মাস আগে তাকে জুনিয়র পার্টনার করে নিয়েছে রথ। ছেলেটা সেই যোগ্যতা রাখলেও কৃতজ্ঞতায়  প্রায় কেঁদে ফেলেছিল। অথচ এখন সিডনির সাথে একটা ট্যাভার্নে রয়েছে সে।

নরমান রথের সিডনি। সুন্দরী, লাবণ্যময়ী সিডনি। সেভাবে দেখতে গেলে সুন্দরী বলা যাবে না ওকে—ওর ঠোঁটজোড়া একটু বেশি পুরু, চেহারাটা যেন সামান্য লম্বাটে ধরনের, বাঁকা। তবে সুন্দরী। চোখ ধাঁধানো। সিডনির বয়স বাইশ বছর, কিন্তু দেখে এখনো সেই বিয়ের দিনের মতোই লাগে। ওর চোখজোড়া গাঢ়, চোখ-ঝলসানো। মাথার কালো চুল সাধারণত টেনে পেছনে বেণি, ঝুঁটি বা খোঁপা করে রাখে। কায়দা বদলালেও ফলাফলটা দারুণ রমণীয়। টমি বার্টন নিশ্চয়ই ওর দিকে নজর ফেলেছিল।

এখনো ওর দিকেই তাকিয়ে আছে সে। পরস্পরের দিকে চেয়ে আছে ওরা, এখানকার লোকজনের উপস্থিতির ব্যাপারে উদাসীন, কফি কাপ হাতে বারে বসা খানিকটা বেটে স্থূলদেহী মানুষটার উপস্থিতি টের পায়নি। কাপটা শূন্যে ঠেকে আছে ওর। ওদের মাঝখানে একজোড়া হাইবল ভর্তি গ্লাস রাখা, কিন্তু গ্লাসগুলো খানিকটা দূরে সরানো, গুরুত্বহীন, বিস্মৃত। সিডনির দুটি হাতই টেবিলের মাঝখানে রাখা, ওর হাতের ওপর টমি বার্টনের হাত। পনি টেইল করে চুল বেঁধেছে সিডনি। ম্লান আলোয় ফিকে আইভরির মতো লাগছে ওর গায়ের রঙ। মাথার চুলের মতোই কালো একটা পোশাক পরনে। এই পোশাকটা এর আগে কখনোই দেখেনি নরমান রথ। শোল্ডারবিহীন পিঠের মসৃণ সৌন্দর্য ফুটিয়ে তুলেছে ওটা।

গল্পে মশগুল ওরা। কিংবা হয়তো জন্ম সেলসম্যান টমিই গল্প করছে। শব্দহীন হাসি বা  মাথা নেড়ে জবাব দিচ্ছে সিডনি, ফলে ওর পনিটেইল নেচে উঠছে। ওর হাসি মাদকতাময়, সম্মোহনী। এখন হ্যাঁ বলছে ও, সত্যি। হ্যাঁ, আরে হ্যাঁ, হ্যাঁ, হ্যাঁ...নরমান রথ দেখতে পাচ্ছে, ওর কাছে বসে থাকা টমি বার্টন তো অবশ্যই দেখছে।

এবার ওয়েট্রেসের দিকে তাকাল বার্টন। পকেট থেকে কয়েকটা নোট বের করে টেবিলে রাখল। ওয়েট্রেস এসে গ্লাসটা এখনো ভরা দেখে চিন্তিত হয়ে পড়ল। হেসে উঠল টমি বার্টন। গ্লাসটা তুলে নিয়ে দুই চুমুকে শেষ করে ফেলল পানীয়টুকু। সিডনি ওর দিকে তাকাচ্ছেই না। বেশ আমোদিত ও, নিজের গ্লাসে স্পর্শ করেনি। এবার ওর হাত ধরল সে, তারপর একসঙ্গে বের হয়ে আসতে পা বাড়াল বাইরে।

ঝট করে কফির দিকে মাথা নামাল নরমান রথ, চেহারা আড়াল করতে বাম হাতটা উঁচু করে রাখল। তবে এমনটা না করলেও চলত। ওকে খেয়াল করার কথা নয় ওদের। পরস্পরের চোখের দিকে তাকিয়ে হাসছে, কথা বলছে ওরা।

ওরা চলে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করল নরমান রথ। তারপর বয়স, শারীরিক অবস্থা আর খর্বাকৃতির তুলনায় বেশ ক্ষিপ্রগতিতে  নড়ে উঠল। সামনের দিকের একটা জানালা খুঁজে বের করে বাইরে তাকাল। বার্টনের নীল-শাদা কনভার্টিবলে উঠতে দেখল জোড়াটাকে। কনভার্টিবলটাকে পিছিয়ে এসে বাঁক নিয়ে আবার পিছোতে দেখল ও। প্রতিবার নুড়ি পাথরে কামড় বসাল ওটার চাকা। অবশেষে বাম দিকে বাঁক নিয়ে রথ যেদিক থেকে এসেছে সেইদিকে শহরের বাইরে চলে গেল।

দৌড়ে বের হয়ে এল রথ, নিজের গাড়িতে ঢুকল। নিপুণ হাতে হুইল ঘোরাল সে, কনভার্টিবলের চেয়ে দ্রুত বেরিয়ে এল পার্কিং লট থেকে। বামে বাঁক নিল, একটু আগেই যে ঘরে ফেরার জন্যে ব্যাকুল ছিল সেটা থেকে দূরে চলল। যতদূর সম্ভব জোরে গাড়ি হাঁকাচ্ছে, তারপরেও বার্টনের গাড়ির টেইল লাইটের নাগাল পেতে বেশ কয়েক মিনিট লেগে গেল। কাছে এগিয়ে গেল ও। নম্বরটা জেনে নিয়েই ফের পিছিয়ে এল, তবে বাতিগুলোকে নজরে রেখে এগোতে লাগল।

ওরা কোথায় যাচ্ছে জানে ও। তাও অনুসরণ করতে হবে। পুরোপুরি নিশ্চিত হতে চায়। তারপর মাশুল গুনতে হবে ওদের। কড়ায় গণ্ডায় পাওনা মিটিয়ে দিতে হবে। আরও বেশি। ওর ভেতরের ঘৃণা এরই মধ্যে পূর্ণাঙ্গ, পরিপক্ক আর ভয়ংকর রূপ নিয়েছে। তবে এটা শীতল ঘৃণা, কী করছে জানে ও, হুট করে কাজ শুরু করবে না, কোনো রকম ভুল করবে না।

কনভার্টিবলটাকে অনুসরণ করে বিশ মাইল দূরে চলে এল সে। তারপর যেমনটা ভেবেছিল তা-ই হলো। ডান দিকে বাঁক নেওয়ার জন্যে জ্বলে উঠল লাল টেইল লাইট। এটাও প্রত্যাশিত। হিসাবমতো গতি কমাল সে। তবে নিজে বাঁক নেওয়ার কোনো প্রস্তুতি নিল না। ওদের চূড়ান্ত গন্তব্য জানতে অনুসরণ করার আর দরকার হবে না। তাছাড়া এখনো সম্পূর্ণ হয়নি ওর পরিকল্পনা।

কোনোমতে বাঁক নিল কনভার্টিবল, বার্টনের পক্ষে স্পষ্টতই অচেনা বাঁক। কেবল সিডনিরই পরিচিত। যতটা দরকার ছিল ততটা গতি কমায়নি কনভার্টিবল। অধৈর্য হয়ে পড়েছে বার্টন। বিপজ্জনকভাবে কাত হয়ে গেল কনভার্টিবল, কিন্তু ভারী এবং দামী বলে উল্টে পড়ল না।

নুড়ি পাথরের ধুলোর মেঘের আড়ালে বার্টনের গাড়ির টেইল লাইটের আলো হারিয়ে যেতে দেখে ধীরগতিতে মোড়টা পার হয়ে এল নরমান রথ। রাস্তার একটা বাঁক, এক সারি গাছ, তারপর হারিয়ে গেল ওটা। ওটা কোথায়, কত দূর যাচ্ছে জানে রথ। কেবিনে। ওর শিকারের কেবিন। ওখানে পুরোপুরি একান্তে থাকতে পারবে ওরা।

জানা সত্ত্বেও এইবার অনিবার্যতা আঘাত হানল ওকে। সহসা নিজের গাড়ির গতি কমাল ও। একপাশে গাড়ি এনে সশব্দে ব্রেক কষে লাফিয়ে বের হয়ে এল। অন্ধকারে একেবারে একা, অসুস্থ বোধ করছে, বমি করে দিল ও।

*

কয়েকদিন আর বাড়ি ফিরল না সে; এই দিনগুলোয় শিকাগোতেই থাকার কথা ছিল ওর। তবে নিজ শহরেই সময়টা কাটাল। একটা সস্তা হোটেলে বানোয়াট নামে উঠল সে, ছোটখাটো নোংরা অভ্যাসের বাইরে রেস্তোরাঁয় খাওয়াদাওয়া সারল, ওকে চিনে ফেলতে পারে কেউ—এমন জায়গাগুলো এড়িয়ে গেল।

বেশির ভাগ সময়ই ভাবনাচিন্তার পেছনে খরচ করল ও। পাবলিক লাইব্রেরিতে মেডিক্যাল বই পড়ে কটিয়ে দিল গোটা একটা দিন। এক কালে ডাক্তার হওয়ার ইচ্ছে ছিল ওর। মেডিক্যাল স্কুলে এক বছর পড়াশোনাও করেছে। বই থেকে জানার বিষয়গুলো টুকে নিল। চার দিনের শেষ নাগাদ পরিকল্পনা খাড়া হয়ে গেল।

সময় পেরিয়ে গেলেও ঘৃণার পরিমাণ এতটুকু কমেনি ওর। কিন্তু এখন ওকে দেখে কেউ বুঝতেই পারবে না যে একটা সর্বগ্রাসী আবেগ আচ্ছন্ন করে রেখেছে ওকে। তবে এখন আর অসুস্থ বোধ করছে না ও। এমনকি হাসতেও পারছে। এসব চর্চা করে শিখেছে বলেই জানে সে। নিজের অনুভূতি পুরোপুরি আড়াল করতে শিখে নিয়েছে। আবার নরমান রথে পরিণত হয়েছে যেন—আন্তরিক, সফল, সন্তুষ্ট, সুখী।

এমনি চেহারা নিয়েই সিডনির কাছে ঘরে ফিরে এল ও। সিডনি ওর দিকে হাত বাড়িয়ে দিলে এগিয়ে গেল সে, চুমু খেল দুজনে। স্বাভাবিক প্রেমময় চুমু। শিকাগোতে থাকার বিশ্বাসযোগ্য বর্ণনা দিল ও।

যেমনটা আশা করেছিল ঠিক তেমনই আচরণ করল সিডনি। তার ব্যবসায়িক অংশীদারের সঙ্গে প্রেম করে বেড়াচ্ছে কেবল, স্বামীর কাছ থেকে পালিয়ে যাচ্ছে না। কারণ টমি বার্টন বয়সে ওর চেয়ে পাঁচ বছরের ছোট আর তার চাকরির নিশ্চয়তা নেই বলে পালানোর কোনো প্রস্তাব দেয়নি। সিডনি হয়তো পরে রাজি করাতে পারবে তাকে, কিন্তু আপাতত বার্টনের ইচ্ছেমতোই চলবে সব। জাত সেলসম্যান, কথায় পটু, মুগ্ধকর ব্যক্তিত্ব। এতটাই মুগ্ধকর যে সিডনিকে কিছুদিনের জন্যে তার স্বামীকে সহ্য করতে রাজি করাতে পারবে।

এভাবে স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের সুবিধা অনুযায়ী আচরণ করে চলল। কেবল স্বামীটিই জানত অভিনয় করছে ওরা।

প্রায় দুই সপ্তাহ ব্যাপারটা এভাবে চলতে দিল নরমান রথ। তারপর একদিন টমি বার্টনকে নিজের অফিসে তলব করল সে। পরিকল্পনা মাফিক কাজে নামল সে।

‘টমি, এখন খরগোশ আর কাঠবেড়ালি শিকারের মুক্ত মৌসুম চলছে। উইকএন্ডে আমার সঙ্গে কেবিনে চলো, কিছু শিকার মেলে কি-না দেখি?’

      এই তরুণ আর সবার মতোই তুখোর অভিনেতা। তবে অজ্ঞতা থেকেই ভান করে গেল সে। ‘জীবনে কোনোদিন শিকার করিনি আমি, মিস্টার রথ।’ এখনো সিনিয়র পার্টনারকে ‘মিস্টার রথ’ই ডাকে সে। চতুর লোক। জুতসই বিনয় আছে।

‘তাহলে শুরু করে দেওয়াই ভালো, টমি। তোমার কোনো শখের কথা আমার জানা নেই। সবারই একটা কিছু শখ থাকা উচিত।’

দুজনই দুই রকম মানে ভেবে হাসল ।

‘আমি বরং ড্রিংক নিয়েই থাকব,’ বলল বার্টন।

‘আরে ধেত্, এ কাজ তো কেবিনেই করতে পারি আমরা,’ আমোদিত, খোশ মেজাজে আছে রথ। তবে তলে তলে প্রতিপক্ষকে মাপছে। বার্টন ওকে ঠিক কেবিন পার্টনার হিসেবে মেনে নেয়নি, বোঝাই যায়। বার্টন জানে, রথ ওখানে শিকার করতে গেলে মিসেস রথের সাথে বাড়িতে সময় কাটাতে সুবিধা হবে তার।

‘এ ব্যাপারে একটু সময় নিতে পারি, বস?’ নাছোড় বার্টন।

আহত দেখাল রথকে। ‘মনে হচ্ছে আমরা ঠিকভাবে মিশতে পারিনি,’ যেন আপনমনেই বিড়বিড় করল সে। ‘সম্ভবত বয়সের বেশি তফাতের কারণেই।’

‘আরে ব্যাপারটা তা নয়...’

‘আচ্ছা ঠিকাছে, টমি। তুমি জানো সিডনিও কেবিনে যেতে খুব একটা পছন্দ করেনি কখনো। শিকারের সাহসই নেই। এমনিতে ম্যাক্স টারেলের সঙ্গে যেতাম আমি। কিন্তু কী জানো, ম্যাক্সের হার্ট অ্যাটাক হওয়ার পর আর ওদিকটায় যাওয়া হয়নি। একা যেতে মোটেই ভালো লাগে না। তবে মনে হচ্ছে শিকার করতে চাইলে...’

ওর চেহারা আর কণ্ঠের হতাশ ভাব উপেক্ষা করার মতো নয়। এই মানুষটার কাছে বার্টনের ঋণ আছে। ‘দেখ, মিস্টার রথ...’

‘না ঠিকাছে, টমি। বুঝতে পেরেছি...’

‘কী করব বলছি তোমাকে, অন্তত চেষ্টা করব। তবে খরগোশের বদলে তোমাকে গুলি করে বসলে আবার আমাকে দুষো না যেন।’

খুশিতে হাসল রথ। বার্টনের কথায় কোনো গোপন হুমকি নেই। রথের জানা আছে খুনি হওয়ার মতো তাগদ বার্টনের নেই। সেজন্যে কী লাগে রথ জানে।

     তো উইকএন্ডে শুক্রবার সন্ধ্যায় একসাথে কেবিনে রওনা দিল ওরা। রথের গাড়িতেই গেল, রথ নিজে গাড়ি চালাল। বার্টন ওখানে যাওয়ার পথ না চেনার ভান করায় মনে মনে সারা পথ হেসে কুটিকুটি হলো রথ। গন্তব্যে পৌঁছার পর জায়গাটা প্রথমবারের মতো দেখার যা অভিনয় করল না সে।

রুটিন মোতাবেক ওকে সবকিছু ঘুরিয়ে দেখানোর কাজ করে গেল রথ। ‘দেখতেই পাচ্ছ, দারুণ জায়গা, টমি। এখানে কাষ্টের কিছু নেই। দুটো রুম, কিচেন-লিভিং রুম আর বেডরুম। বাথও আছে। আমাদের নিজেদের কুয়ো আছে। অনেক লাকড়িসহ ফায়ার প্লেস। আর দেখতেই পাচ্ছ, ব্যায়াম করতে ইচ্ছে হলে, একটা কুড়োলও আছে।’

কুড়োল আর ব্যায়ামের উল্লেখ বেশ শান্তভাবেই নিল বার্টন।

‘আমাদের এখানে গভীর বন যেমন আছে তেমনি আছে খোলা প্রান্তরও। অনেক শিকার। পাহাড়ের ঢালের ওদিকে একটা লেক আছে, অনেক সময় মাছ মেলে ওখানে।’

মালপত্র বের করল ওরা। কাজ শেষে বার্টন বলল সে ক্লান্ত, ঘুমোতে যাচ্ছে। কিন্তু রথ নাছোড়বান্দার মতো বলল যেহেতু ওর মেহমান বলেছে ড্রিংক করাই ওর শখ, তো ওদের খানিকটা ড্রিংক করা উচিত। পরদিন ভোরে ওঠার তো কোনো তাড়া নেই। রেফ্রিজারেটরের কাছে গিয়ে আইসকিউব বের করল রথ, বুরবোঁর একটা বোতল খুলল। তেমন একটা আপত্তি করল না বার্টন।

অবশ্য অ্যালকোহল হজম করার বেশ ভালো ক্ষমতা রয়েছে বার্টনের। ওর মেজবান অবশ্য এমনটাই আশা করেছিল, তো ধৈর্য ধরল ও। নিজে তেমন একটা গিলছে না, তবে এমন ভাব করছে যাতে মনে হয় তরুণের সাথে পাল্লা দেওয়ার চেষ্টা করছে ও। বোতালটা অর্ধেক খালি হওয়ার পর থামার কথা বলল বার্টন। কিন্তু রথ রাজি হলো না।

অবশেষে মাঝরাতের দিকে এলিয়ে পড়ল বার্টন। ‘এবার শুতে যেতে চাই, বস,’ বিড়বিড় করে বলল সে।

জবাবে অতিথিকে আরেক গ্লাস ড্রিংক ঢেলে দিল ও। গ্লাস ধরে রাখতেই কষ্ট হচ্ছে বেচারা বার্টনের। তবে বাধ্যগতের মতো গিলল সে। চোখজোড়া ফাঁকা হয়ে গেছে তার, ঠিকমতো তাকাতেই পারছে না। বাংকে গিয়ে শোয়ার জন্যে উঠে দাঁড়ানোর প্রয়াস পেল সে, কিন্তু ওর পাজোড়া ঠিকমতো সাড়া দিল না, ফের বসে পড়ল। ওর কাছে এসে দাঁড়াল, সমাপ্তি কাছে এসে পড়ায় এখন অধৈর্য হয়ে পড়েছে।

যখন সমাপ্তি এল, অনেকটা আকস্মিকভাবেই এল তা। হঠাত্ একপাশে হেলে পড়ল বার্টনের মাথা। হাত থেকে গ্লাসটা পড়ে চুরমার হয়ে গেল, হুইস্কি আর বরফের টুকরো ছড়িয়ে পড়ল মেঝেতে।

তারপরেও নিশ্চিত হতে চাইল রথ। নিথর দেহটার বগলের নিচে হাত দিয়ে বসানোর ভঙিতে উঁচু করল। ‘বার্টন!’ ছেলেটার কানের কাছে চিত্কার করল। কোনো সাড়া নেই। ছেড়ে দিল শরীরটা, ভাঙা কাচ ভরা মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল ওটা।

চট করে কাজে নামল রথ। ফায়ারপ্লেসের লাকড়ির স্তূপের কাছ থেকে কুড়ালটা নিয়ে এল, পকেটে তৈরি রাখল সার্জনের স্কালপেলটা। দুটোকে কাটার যন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে অপারেশন শেষ করল। পান করা হুইস্কিটুকু একাধারে সাহস জোগাল আর ব্যথা কমাল। বাম হাতের কড়ে আঙুলটা কেটে ফেলল।

এই আঙুলেই মনোগ্রামঅলা আংটিটা ছিল। আংটিসহ আঙুলটা মেঝেতে ফেলে রাখল ও। ক্ষতস্থানে ব্যান্ডেজ বাঁধার সময় বার্টন আর কুড়ালের ওপর অবিরাম রক্ত ঝরে পড়তে দিল। তাতে বার্টনের কোনোই সমস্যা হলো না। নাক ডাকতে শুরু করেছে সে।

এরপর করার আর কিছুই রইল না। কুড়ালের ওপর বার্টনের আঙুলের ছাপ বসাল। বাইরে থেকে কোদাল এনে ওটাতেও রক্ত লাগিয়ে আবার বাইরে ছুড়ে ফেলল। 

রাত একটার বেশ পরে কেবিন ছাড়ল ও। জানে, ছয়টার সময় স্যাম রজার্স এসে দরজায় নক করবে। অনেক আগেই স্যামের সাথে দিন ঠিক করে রেখেছে ও, যাতে শিকারের কুকুরগুলো নিয়ে আসে সে। বার্টন জেগে ওটার আগেই হাজির হবে স্যাম। দরকারি সাক্ষীর কাজ দেবে। বার্টনকে—সকালে যদি তার মাথা কাজ করে—প্রমাণ নষ্ট করার বেলায় বাধা দেবে।

তার আগে প্রচুর সময় পাবে রথ। গাড়িটা কেবিনের সামনে রেখে পায়ে হেঁটে এগোল ও। খুব পরিচিত একটা পথ বেছে নিয়েছে। ভোরে একটা মাঠের ওপর দিয়ে শর্টকাটে আরেকটা রাস্তায় উঠে এল। নাশতার সময় পশ্চিমগামী একটা বাসের টিকেট কিনতে দেখা গেল ওকে। দুপুরের মধ্যেই পৌঁছে গেল আরেক শহরে। বাস থেকে নেমে একটা সস্তা হোটেলে উঠল। এখানে ব্যাথা আর ক্লান্তিতে এলিয়ে পড়ল, ঢলে পড়ল ঘুমে।

*

গোগ্রাসে পত্রিকা গিলে চলল ও। সবই জানতে পারল ওখান থেকে। পত্রিকাওয়ালারা এইসব জিনিসই পছন্দ করে।

ভালো কাজ দেখিয়েছে স্যাম রজার্স। কেবিনের দরজা খোলা পেয়েছে সে, সবকিছু ঠিক যেভাবে রেখে এসেছিল ও, তেমনই ছিল। এমনকি টমি বার্টন তখনো ঘুমে বিভোর ছিল। কোনোকিছুই স্পর্শ করেনি স্যাম, দ্রুত খবর দিয়েছে পুলিশে।

সজাগ গোয়েন্দারা গোটা ব্যাপারটা জোড়া লাগিয়ে নিয়েছে। আংটি আর আঙুলের ছাপ থেকে কাটা আঙুলটা শনাক্ত করা গেছে। কুড়ালটাই নিঃসন্দেহে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। লাশের বাকি অংশ কোথায় এই প্রশ্ন অবশ্যই ধন্ধে ফেলে দিয়েছিল তাদের। দুটো সম্ভাবনা ছিল—লেকে অথবা বনে। কোদাল শেষেরটাকেই নিশ্চিত করেছে। তল্লাশি করতে অনেক সময় প্রয়োজন ছিল, হয়তো সেটা শেষ করা যাবে না। তাই ওরা আদৌ কোনো অপরাধ সংঘটিত হয়েছে কি-না নিশ্চিত হতে পারছিল না।

কিন্তু তারপর মোটিভ নিয়ে মাথা ঘামাতে শুরু করল ওরা, এখানে ওখানে খোঁজ-খবর আর প্রশ্ন করতে লাগল, টুকটাক তথ্য পেল। আস্তে আস্তে টমি বার্টনের একটা চেহারা বের হয়ে আসতে শুরু করল। আগ্রাসী তরুণ, মালিকের সাথে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠায় তাকে ব্যবসায়ে গ্রহণ করা হয়েছিল, অংশীদার করে নেওয়া হয়েছিল তাকে। তারপর মালিকের স্ত্রীর সাথে প্রেম করে সেই উপকারের প্রতিদান দিয়েছে সে। অবশেষে হয় মালিকের সাথে মাতাল অবস্থায় ওই কেবিনে উত্তপ্ত তর্কবিতর্ক থেকে বা তাকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পিত পদক্ষেপ হিসেবে এই কাণ্ড ঘটানো হয়েছে—যদিও এর সাথে স্ত্রীর জড়িত থাকার কোনো প্রমাণ বের করতে পারেনি ওরা। ব্যাপারটা যা-ই হয়ে থাকুক, টমি বার্টনকে খুনের দায়ে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

এইসব বয়ান পড়তে পড়তে হাসল নরমান রথ। বার্টনের মনে কী ভাবনা চলছে বোঝার চেষ্টা করল। সবকিছু অস্বীকার করবে সে। তবে নিশ্চয়ই ভাবনায় পড়ে গেছে। বসের হয়েছে কী? আসলেই কি খুন হয়েছে? আমিই কি কোনোভাবে ওকে খুন করে বসেছি? তারপর আপনমনে হাসল নরমান রথ। এইসব প্রশ্নেরই জবাব দেওয়া হবে। কিন্তু সেই জবাব বার্টনের পছন্দ হবে না।

সিডনিও বেশ প্রচারণা পাচ্ছে বটে। প্রথমে বার্টনের সঙ্গে যেকোনোরকম ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা অস্বীকার গেছে ও। তারপর কথা ঘুরিয়ে বার্টনের প্রতি ভালোবাসার কথা স্বীকার গেছে, স্বামী সম্পর্কে নিন্দাসূচক কথাবার্তা বলতে শুরু করেছে। তবে বার্টন যে তাকে খুন করেনি এ ব্যপারে সে নিশ্চিত।

আবারও না হেসে পারল না নরমান রথ। বেচারা সিডনি। ওর প্রিয় টমি খুনি নয়, নিশ্চিত ও। তাই যদি হয় তবে কেবিনে কী ঘটেছে? টমির কপালে কী আছে এখন?

হাতের কাছে যত কাগজ পেল কিনে চলল নরমান রথ। ঘণ্টার পর ঘণ্টা পড়ল ওগুলো। আর এই অবসরে নতুন জীবন যাপন শুরু করল সে।

এটাও যত্নের সাথে পরিকল্পনা করে রেখেছিল। অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে, কেউ টের পাওয়ার মতো কোনো কাজই করেনি ও। জয়েন্ট চেকিং অ্যাকাউন্ট স্পর্শ করেনি। চোখে পড়ার মতো কিছু বিক্রি করেনি। অবশ্য নিজের সেইফ ডিপোজিট বক্সে সবসময়ই কয়েক হাজার ডলার জমা রাখত সে। এটা জানা ছিল না সিডনির। জানত না ব্যাংকও। এখন সেই টাকাটাই হাতে রয়েছে ওর। এই টাকা—হিসাব করে খরচ করলে—যতদিন দরকার চালিয়ে নেবে ওকে। তো কোনো কাজে যোগ দিতে হয়নি ওকে বা এমন কোনোভাবে জড়িয়ে পড়তে হয়নি যাতে করে কোনোরকম পরিচয়ের প্রয়োজন পড়বে। হোটেলের রেজিস্ট্রারে ওর নাম নরমার জেমস। নিখুঁত অন্তর্ধান।

তবে ওর হাত একটা সমস্যা বটে। ডাক্তারের কাছে যাওয়ার সাহসে কুলোয়নি ওর। নিজেকেই চিকিত্সা করতে হয়েছে। কেমন ঝুঁকি নিচ্ছে জানা ছিল। মারাত্মক ধরনের ইনফেকশন প্রাণ কেড়ে নিতে পারে কিংবা পরিচয় ফাঁস হওয়ার ঝুঁকি নিয়ে ডাক্তারের কাছে যেতে বাধ্য করতে পারে। কিন্তু তেমন মারাত্মক কোনো ইনফেকশন দেখা দিল না। নিজের সামান্য জ্ঞান আর প্রেসক্রিপশন ছাড়া কেনা সম্ভব—এমন ওষুধের সাহায্যে যুঝল সে এবং জয় লাভ করল। আস্তে আস্তে সেরে এল ক্ষতটা।

তবে যন্ত্রণাবিহীন নয়। সময়ে সময়ে অসহনীয় হয়ে উঠল যন্ত্রণা। বিচ্ছিন্নকরণের কাজটা ছিল কর্কশ, অদক্ষ হাতের, অপ্রয়োজনীয় ক্ষতি করেছে। তবে স্বেচ্ছায়ই এই যন্ত্রণা সহ্য করেছে ও। খুশির সঙ্গে। কারণ জানে যতটা যন্ত্রণা ভোগ করছে তার চেয়ে অনেক বেশি যন্ত্রণা সৃৃষ্টি করেছে সে।

এদিকে টমি বার্টনের বিরুদ্ধে ফার্স্ট ডিগ্রি মার্ডারের অভিযোগ আনা হয়েছে। বিচার শুরু হয়েছে। বিচারের কাজ ধীরগতিতে চলছে বলে অধৈর্য হয়ে উঠল নরমান রথ। হঠাত্ করে বার্টনের খবর নাই হয়ে যাওয়ায় খেপে উঠল। তবে বার্টন বা সিডনি খুব একটা ভালো সময় কাটাচ্ছে না জানা থাকায় নিজেকে সান্ত্বনা দিল।

বিচারের সময় এগিয়ে আসার আগে যথেষ্ট খবর পেল ও। ফের আগ্রহী হয়ে উঠল পত্রিকাগুলো। ওদের বয়ান থেকে জানতে পারল মামলার গুরুত্ব কমেনি। মামলার বেলায় সত্যিকারের অর্থে কোনো লাশ না পাওয়া গেলেও খুনের বিষয়টা অনায়াসে প্রমাণ করা সম্ভব। আর খুন হয়ে থাকলে টমি ছাড়া কে করতে যাবে এই কাজ?

বিচারের প্রথম দিন আবার নিজের শহরে ফিরে এল নরমান রথ। কারও নজরে না পড়েই বাসে করে এল সে। অভ্যস্ত হয়ে ওঠা সস্তা দরের একটা হোটেলে নাম লেখাল। তবে এই হোটেল থেকে আদালত দেখা যায়, ওখানেই চলবে বিচারের কাজ।

নিজে অবশ্য বিচার দেখতে গেল না ও। দেখতে পারলে ভালোই হতো, লোভও হচ্ছিল। ওর চেহারা বেশ ভালোরকমই বদলে গেছে। যন্ত্রণা আর নৈঃসঙ্গের ফল। স্বল্প পরিচিত কেউ চট করে চিনতে পারবে না ওকে। কিন্তু অযথা ঝুঁকি এড়িয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল ও। বিশেষত ইতিমধ্যে যথেষ্ট ঝুঁকি নেওয়া গেছে যখন।

বিচারের প্রথম দিন, চারতলার জানালায় বসে বার্টনকে রাস্তার উল্টোদিকের জেলহাউস বিল্ডিং থেকে কোর্টহাউসে নিয়ে যেতে দেখল ও। জানালা থেকে কোনো বাধা ছাড়াই দৃশ্যটা দেখল। সস্তা একটা বাইনোকুলার বেশ কাজ দিল। খুব যত্নের সঙ্গে ছোট দৃশ্যপটের খুঁটিনাটি টুকে রাখল ও।

দুজন শাদা পোশাকের ডিটেক্টিভের মাঝখানে পায়ে হেঁটে রাস্তা পর হলো বার্টন। ওদের একজনের হাতের সঙ্গে হাতকড়া দিয়ে বাঁধা সে। অভিযুক্ত যাওয়ার পথে আনুমানিক শ’দুয়েক লোক তাকে দেখার জন্যে ভিড় করেছে। একেবারে নিখুঁত একটা পরিস্থিতি, ভাবল রথ।

কিন্তু বিচারের তৃতীয় দিনের আগে পরিকল্পনার পরবর্তী অংশটুকু নিয়ে আগে বাড়ার সাহস হলো না। বিচার বেশ ভালোই পত্রিকার কাভারেজ পাচ্ছিল বলে দিনদিনই বেড়ে উঠছিল ছোট জটলাটার আকার। বেশির ভাগই কোর্টহাউস ভবঘুরে আর লোফার, কয়েকজন কেলেঙ্কারির ব্যাপারে আগ্রহী স্টেনোগ্রাফারও আছে, আশপাশে কাজ করে ওরা; আর পথচারীদের একটা অংশ থাকতে পারে।

তৃতীয় দিন সকালে ওদের সঙ্গে যোগ দিল রথ। আস্তে আস্তে জটলার সামনের দিকে এগিয়ে গেল সে। শোরগোল পাকাচ্ছে জটলাটা। সবাই মামলা নিয়েই আলোচনায় মশগুল। জড়িত লোকটাকে নিয়ে তেমন একটা ভাবিত নয়। ওদের কাছে সে খাঁচায় আটক কোনো জানোয়ারমাত্র। কিন্তু বার্টন আর এসকর্টরা উদয় হতেই চুপ করে গেল ওরা। শবযাত্রার নীরবতা নেমে এল ওদের মাঝে।

সাবেক পার্টনারকে এগিয়ে আসতে দেখল বার্টন। সেই আগের দুই নিরাসক্ত শাদা পোশাকের পুলিশের মাঝখানে রয়েছে সে। এদিক ওদিক নজর চালানোর বদলে সোজা সামনের দিকে চেয়ে আছে। আতঙ্কিত, নিজেকে বলল রথ। কাউকে কখনো এতখানি ভয় পেতে দেখিনি আমি। আগের মতো আত্মবিশ্বাসী মনে হচ্ছে না। কষ্টে ছিল সে। তবে আসল কষ্টের তো কেবল শুরু। আগে বাড়ল ওরা তিন জন। পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময় ডিটেক্টিভদের একজনের পোশাকের হাতা নরমান রথের কোটের সাথে লেগে গেল। মুখ খোলার জন্যে এই মুহূর্তটাকেই বেছে নিল রথ। স্বাভাবিক কণ্ঠে মৃদু স্বরে স্পষ্ট কথা বলে উঠল ও।

‘গুড লাক, টমি!’

ঝট করে ঘুরল আসামির মাথা, কাঁধের ওপর দিয়ে তাকাল। উদ্ভ্রান্তের মতো পরিচিত কণ্ঠের খোঁজ করছে। হাত ওঠাল রথ—কাটা তিন আঙুলওয়ালা হাত—নাড়ল।

বার্টনের মুখটা কাগজের মতো শাদা হয়ে যেতে দেখে সন্তুষ্টি বোধ করল রথ। হঠাত্ করে প্রত্যক্ষ করা দৃশ্যটা সত্যি কি-না নিশ্চিত হতে তার আটককারীদের টেনে পিছনে নিয়ে আসার ব্যর্থ চেষ্টা করতে দেখে ভালো লাগল। তার অসংলগ্ন চিত্কার শুনতেও ভালো লাগল। এদিকে দুই এসকর্ট একে বন্দির পালানোর ফন্দি ভেবে ঠেকানোর চেষ্টা করছে। বিরাট হট্টগোল দেখা দিল। দর্শকদের আতঙ্কিত চেঁচামেচির নিচে চাপা পড়ে গেল বার্টনের মরিয়া আর্তনাদ।

শোরগোলের ভেতর ধীরপায়ে নিঃশব্দে সরে এল নরমান রথ। মিশে গেল ভিড়ে। বার্টন কী বলার চেষ্টা করছে সেটা কেউ বোঝার চেষ্টা করার অনেক আগেই উধাও হয়ে গেল। অক্ষত অবস্থায় হোটেলে ফিরে এল ও। এলিভেটরে চেপে চার তলায় উঠে ঢুকে পড়ল নিজের রুমে। কেবল সম্পূর্ণ একাকীত্বে মনের ভাবকে ভাষা দিল। অসীম আনন্দে হাসতে লাগল সে, তবে শব্দ করে নয়।

পত্রিকার দুপুরের সংস্করণে এল খবরটা। খুনের অভিযোগে অভিযুক্ত আসামি কোর্টহাউসের সামনের ভিড়ে তার কথিত শিকারকে দেখার দাবি করেছে। নানারকম মন্তব্য করা হয়েছে নিয়ে : কেউ বলছে নরমান রথ আসলে কোনোদিনই খুন হয়নি, আবার কেউ বলছে অভিযুক্ত আসলে বিচারকদের মনে সন্দেহ সৃষ্টি করার জন্যে কৌশল করছে মাত্র। বার্টনকে কাঠগড়ায় ওঠানোর পর অবশ্যই জুরিকে কথিত মৃত মানুষকে দেখেছে বলে বিশ্বাস করাতে চাইবে সে।

সান্ধ্য পত্রিকায়ও এ নিয়ে খবর এল। একজন পুুুলিশ কর্মকর্তা বলেছে যে ভিড়ের ভেতর কেবল বার্টনেরই নরমান রথের মতো কাউকে দেখার ব্যাপারটা বিস্ময়কর। এটাও বিস্ময়কর যে পুলিশের লোকজন লোকটার খোঁজে যাওয়ার পর দেখা গেছে হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে সে।

হোটেল রুমের নিরাপত্তায় আপনমনে আনন্দ উপভোগ করল রথ। তবে এও বুঝতে পারছে ও, বিশেষভাবে সাবধান থাকতে হবে ওকে। সেদিন সন্ধ্যায় নিজের রুমেই রইল সে। ডিনার বাদ দিয়ে বার্টন কেমন অনিশ্চয়তার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে কল্পনা করে আমোদ বোধ করল। ওর মনে হলো বার্টন বা ঠিক করে বলতে গেলে সিডনির পক্ষে আজ রাতে শান্তিতে ডিনার করা সম্ভব হওয়ার কথা নয়।

পরদিন সকালেও নিজের রুমেই রয়ে গেল ও। বাইনোকুলার হাতে জানালার ধারে বসে কোর্টহাউসের বাইরে বার্টনের আগমনের অপেক্ষায় রইল। গতকালের অভিনয়ের পুনরাবৃত্তি করার পরিকল্পনা ছিল না, তাছাড়া ওখানে একটা ফাঁদ পাতা হতে পারে বলেও আঁচ করেছিল। বার্টন হয়তো ঠিকই বলেছে, নরমান রথ আসলে মারা যায়নি, ফের হাজির হতে পারে, পুলিশ এমনটা ভেবে একটা কিছু করতে পারে।

তো রুমেই রইল নরমান রথ। কোর্টহাউসের সিঁড়িতে বিশাল জটলা দেখতে পেল। নিঃসেন্দহে ওই ভিড়ে গোয়েন্দারা মিশে আছে। ঈশ্বরের মতো ওপর থেকে ওদের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলল ও। ওদের প্রয়াসের ব্যর্থতা আগে থেকেই জানা আছে।

যথারীতি রাস্তার উল্টোদিকের জেলহাউস বিল্ডিং থেকে বেরিয়ে এসকর্টসহ কোর্টহাউসের দিকে এগিয়ে এল টমি বার্টন। বাইনোকুলারে সাবেক অংশীদারের চেহারা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিল রথ। আজ আর সোজা সামনে তাকাচ্ছে না সে। চারপাশে নজর বুলিয়ে চলেছে। তরুণের চোহারায় যেন মরিয়া আশার ছাপ দেখতে পাচ্ছে বলে মনে হলো ওর। অবশ্যই ব্যর্থ আশা। কিছুই ঘটল না। ওখানে নেই নরমান রথ। একটা বিভ্রম, মায়া মরীচিকা ছিল সেটা। ডুবন্ত মানুষের খড়কুটো আঁকড়ে ধরার মতো। বার্টন আর তার দুই এসকর্ট কোর্টহাউসের সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল, তারপর দালানের ভেতর হারিয়ে গেল।

সেদিন বিকেলে চুপিসারে নিচে এসে একটা পত্রিকা কিনল রথ। প্রথম পাতায় ছাপা হয়েছে টমি বার্টনের ছবি, তার নিচে অভিযুক্তের সাহায্যের আবেদন। ‘দয়া করে ফিরে এসো, মিস্টার রথ। তুমি বেঁচে আছো, জানাও। প্লিজ...’

 

বার্টনের মামলার সিদ্ধান্ত নিয়ে বেরিয়ে গেছে জুরি। অনেক মাস পর এই প্রথম ঘরে ফিরছে নরমান রথ।

গোধূলির দিকে বাড়িটার ওপর নজর রাখতে শুরু করে ও। জানে সিডনি ঘরেই আছে, কিন্তু ওর সাথে আর কেউ আছে কি-না, বা ও ছাড়া অন্য কেউ বাড়িটার ওপর নজর রাখছে কি-না জানতে চাইছিল। নাহ, সব পরিষ্কার। অবশেষে সিদ্ধান্তে পৌঁছাল ও। নরমান রথ বেঁচে থাকলে কী করত, আঁচ করার মতো বুদ্ধি খেলেনি কারও মাথায়।

অন্ধকার মেলানোর বেশ পরে দরজার উদ্দেশে পা বাড়াল ও। দেয়ালের গা ঘেঁষে দাঁড়াল, চট করে বাইরে তাকালে ওকে এখানে দেখতে পাবে না সিডনি। কিছু ঘটে গেলে পালানোর জন্যে তৈরি রয়েছে ও। কিন্তু কোনোই ঝামেলা হলো না। বলতে গেলে নিমেষেই দরজার কাছে চলে এল সিডনি, ওকে ঠিকমতো চেনার আগেই ঠেলে ভেতরে ঢুকে পড়ল ও।

ওকে চিনতে পেরে আর্তনাদ শুরু করে দিল সিডনি। কিন্তু আওয়াজ চাপা দিতে ওর মুখের ওপর হাত রাখল ও।

‘আমাকে দেখে অবাক হয়েছ, সিডনি?’ আমোদিত কণ্ঠে জানতে চাইল রথ।

মাথা দোলাল সিডনি, জ্ঞান হারাবে বলে মনে হলো। দেয়ালে ঠেস দিয়ে নিজেকে খাড়া রাখল সে। রথের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।

‘হারিয়ে যাওয়া স্বামীর দেখা পেয়ে খুশি হয়েছ, সিডনি?’

জবাব দিল না সিডনি।

‘চলো লিভিং রুমে গিয়ে বসি? তোমার সাথে কথা বলার ইচ্ছে ছিল, কিন্তু হাতে বেশি সময় নেই।’

ওর হাতের ইশারায় অনুগতের মতো আগে আগে এগোল সিডনি। রথ লক্ষ করল একটু শুকিয়ে গেছে ও। নিজের দিকে খেয়াল করছে না সে। এখনো পেছনে খোঁপা করে চুল বেঁধে রেখেছে, তবে ঢিলেঢালা, অযত্নে আর যেন আগের সেই ঝলক হারিয়ে ফেলেছে। পরনে কুইল্টেড বাদরোব, কোঁচকানো, দলা পাকানো, যেন ওটা মাড়িয়েছে সে।

‘বসো, সিডনি।’

সোফার কাছে গিয়ে উল্টোদিকের চেয়ারে বসে পড়ল সে। রথ ওর চেহারা জরিপ করার সময় ওর দিকে তাকিয়ে রইল সিডনি। এককালে ফিকে আইভরি রঙ থাকলেও এখন তা স্রেফ পাণ্ডুর বর্ণ ধারণ করেছে। ঠোঁটজোড়া রক্তহীন। কেবল ওর চোখজোড়াতেই এখনো আলো বা প্রাণ আছে। ভীষণভাবে জ্বলছে সেই আগুন।

‘তাহলে তোমাকে কোর্টহাউসের সামনে ঠিকই দেখেছে টমি,’ বলল সিডনি।

‘তা তো বটেই। যাতে দেখে সেটাই চেয়েছি। আসলে আমাকে খুন করেনি জানিয়ে ওকে শান্তি দিতে চেয়েছি।’

সিডনির নারীসুলভ ইনটুইশন রথের উদ্দেশ্য বুঝে নিল। ‘কিন্তু পুলিশ দেখে ফেলুক সেটাও চাওনি?’

‘একেবারে ঠিক।’

‘টমিকে খুনের দায়ে ফাঁসিয়ে দিয়েছ তুমি, এখন বেঁচে থাকার কথা জানিয়ে ওকে কষ্ট দিতে চাইছ।’

‘ঠিকই বুঝতে পেরেছ তাহলে।’

‘এখানে কেন এসেছ?’

‘প্রাণপ্রিয় সিডনি আমার, তোমাকেও স্বস্তি দেবো বলে।’

‘কিন্তু এখনো পুলিশের সামনে নিজেকে প্রকাশ করার ইচ্ছে নেই তোমার?’

‘অবশ্যই না।’

আস্তে আস্তে বাম হাতের গ্লাভটা খুলে ফেলল ও। মন্ত্রমুগ্ধের মতো ওর কাজ দেখতে লাগল সিডনি। যদিও ওর চোহারা কঠিন হয়ে উঠেছে, রথের কাটা হাত দেখে মুহূর্তের জন্যে চোখ বন্ধ করে ফেলল ও।

‘এসব করতে নিশ্চয়ই বেশ ঝামেলা পোহাতে হয়েছে তোমাকে, তা-ই না?’ অবশেষে বলল সিডনি।

‘বেশ ভালো ঝামেলা।’

এক মুহূর্ত ওর চেহারা জরিপ করল সিডনি। ‘কারণটা জানতে না চেয়ে পারছি না,’ বলল ও।

‘কারণ তোমাদের দুজনকেই আমি ঘৃণা করি। তোমাদের দুজনকেই খুন করার ভেবেছিলাম, কিন্তু মৃত্যুর যোগ্য নও তোমরা। তোমাদের উপযুক্ত শাস্তি দিতে ঝামেলার মোকাবিলা করাটা পুষিয়ে গেছে।’

‘আমাদের কেন ঘৃণা করো?’

প্রশ্নটা ওকে বিস্মিত করল। ‘কেন?’

‘আমাকে ঘৃণা করার তো কোনো কারণ দেখছি না, নরমান। আমি তোমার প্রতি বিশ্বস্ত নই বলে এত কেন তোমার মাথাব্যথা বুঝতে পারছি না। কারণ তুমি কোনোদিনই আমাকে সেভাবে ভালোবাসনি।’

‘দেখ,’ রাগের সঙ্গে বলল রথ। ‘তুমি আমার মনোভাব বদলানোর চেষ্টা করে থাকলে—’

‘না। তোমার মনের ভাব বদলাবে বলে মনে হয় না। তবে মিলে যাচ্ছে। তোমার সব কাজকর্ম তোমার সাথে মিলে যাচ্ছে, নরমান। আমাকে বিয়ে করেছিলে কারণ আমি সেই রকম মেয়ে যাকে নিয়ে তুমি অহংকার করতে পারবে। ভালোবাসার জন্যে নয়, নরমান। গর্বের জন্যে। টমির সাথে আমার প্রেম তোমার সেই অহমে ঘা দিয়েছে। তবে এখন তোমার সেই অহম আবার জেগে উঠেছে। বদলা নিচ্ছ তুমি। ঈশ্বরের মতো টমি আর আমাকে যন্ত্রণায় কুঁকড়ে গিয়ে আর্তনাদ করতে দেখছ। আমরা ভুল করে থাকতে পারি, কিন্তু এমন কিছু আমাদের পাওনা ছিল না—’

সিডনিকে বাধা দিয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল রথ। ‘মাফ চাইতে চেয়ে থাকলে...’

‘মাফ!’ চিত্কার করে উঠল সিডনিও। মুখ ভেঙচাল ওকে। ‘যে লোক নিজের শরীর নিজে কেটেছে, রক্তের নেশায় যে কি-না নিজের রক্ত ঝরিয়েছে তার কাছে মাফ চাওয়া? না নরমান। আমি হামাগুড়ি দিচ্ছি না, যদি তেমন কিছু দেখবে বলে এখানে এসে থাকো।’

সিডনির দিকে পেছন ফিরে দাঁড়াল রথ, দরজার দিকে পা বাড়িয়ে আবার গ্লাভ পরতে শুরু করল। দোরগোড়ায় থামল সে। ‘আমার ধারণা,’ বলল, ‘এখন তুমি পুলিশের কাছে গিয়ে আমি বেঁচে আছি, তোমার বাড়িতেই আছি, এসব বোঝানোর চেষ্টা করবে।’

ওকে অনুসরণ করে দরজা পর্যন্ত এল না সিডনি। ‘ওদের কোনো কিছু বোঝাতে গিয়ে সময় নষ্ট করছি না আমি, নরমান। তোমার ফন্দি বেশ ভালোই কাজ দিয়েছে।’

রাগের সঙ্গে বের হয়ে গেল রথ। বাড়ি থেকে আধমাইলের মতো দূরে একটা ট্যাক্সি পেল, ওটায় চেপে হোটেল থেকে কয়েক ব্লক দূরে চলে এল। খুশি নয় সে। সাক্ষাত্টা অতৃপ্ত করে দিয়েছে ওকে। ঠিক যেভাবে চেয়েছিল তেমন হয়নি।

তবে পত্রিকার হকারের চিত্কার কানে আসার পর একটু ভালো লাগল ওর।

‘এক্সট্রা! এক্সট্রা! বার্টন দোষী! এক্সট্রা! এক্সট্রা...’

*

সবসময় সিডনির ওপর নজর রাখতে লাগল ও। টমি বার্টনের শাস্তি কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত; আইনি আপিল পর্যন্ত; একের পর এক ব্যর্থ হলো ওগুলো। গভর্নরের ক্ষমা লাভের চেষ্টা পর্যন্ত, সেটাও ব্যর্থ হলো। মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার তারিখ পর্যন্ত।

এভাবেই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার আগের দিন সিডনি যে শিকারের কেবিনে গেছে জানতে পারে ও।

আবার এভাবেই জানতে পেরেছিল যে চূড়ান্ত সন্তুষ্টির আকাঙ্ক্ষা করছে সেটা পাওয়ার একটা পথই আছে। টমি বার্টনের মৃত্যুর মুহূর্তে স্ত্রীর সাথে থাকতে হবে ওকে।

সবগুলো পত্রিকা জানিয়েছে সময়টা হচ্ছে রাত এগারটা। বনে গা-ঢাকা দিয়ে দিনের বাকি অংশ পার করল নরমান রথ। কেবিনের দিকে নজর রাখল। সামনে পার্ক করা রইল সিডনির গাড়িটা। মাত্র একবার কেবিনের বাইরে এসেছিল ও, গাড়ি থেকে একটা প্যাকেজ বের করার জন্যে। তারপর আবার ভেতরে চলে গেছে, ওখানেই রয়েছে এখনো। রেডিওর আওয়াজ শুনতে পাচ্ছে ও। নিঃসন্দেহে খবর শুনছে।

অন্ধকার মেলানো পর্যন্ত তো বটেই, অন্ধকার গভীর না হওয়া অবধি অপেক্ষা করল ও। তারপর পা টিপে টিপে কেবিনের কাছে এসে ভেতরে উঁকি দেওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু পর্দা টানা থাকায় দেখতে পেল না। তবে রেডিওর আওয়াজ বেশ স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে। বেশ কয়েকবার টমি বার্টনের নাম উচ্চারিত হলো।

রাত পৌনে এগারটায় দরজায় টোকা দিল ও। এই বনে ভয় না পাইয়ে সিডনিকে দরজা খোলানো যাবে বলে আশা করেনি ও। ভেতরে ঢোকার জন্যে জানালা ভাঙতে সম্পূর্ণ তৈরি ও। কিন্তু প্রায় সঙ্গে সঙ্গে দরজা খুলল সিডনি।

‘তোমাকেই আশা করছিলাম, নরমান,’ বলল সে।

ফের বিস্ময়ের শিকার হওয়ায় ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল রথ। ‘ভেতরে ঢুকতে দাও,’ রাগত স্বরে বলল সে।

চেইন আলগা করল সিডনি। ভেতরে ডুকল রথ। সিডনির পরনে স্যুয়েটার আর স্ল্যাক্স। ওর বেশ কাছে এসে দাঁড়িয়েছে এখন। সরাসরি দেখছে, ফিকে ঠোঁটে পাগল করে দেওয়ার মতো দরাজ হাসি।

‘দেখলে তো তোমাকে কত ভালো করে জানি আমি, নরমান? আমি জানতাম কোনোভাবে আমাকে অনুসরণ করবে তুমি। এও জানতাম এই চূড়ান্ত ক্লাইমেটিক মুহূর্তটা আমার সাথে কাটাতে চাইবে। সেজন্যেই এখানে এসেছি। মনে হয়েছে এটাই তোমার জন্যে উপযুক্ত মঞ্চ হবে। তোমাকে সবকিছু থেকে বঞ্চিত করতে চাইনি আমি।’

সিডনির কাছ থেকে সরে এসে কেবিনের ভেতরটা জরিপ করল রথ। অনেক আগেই রক্ত আর অন্যান্য জঞ্জাল সাফ করে ফেলা হয়েছে। এখন এখানে মেয়েলি উপস্থিতির ছোঁয়া পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু সিডনি নিজে ঠিক পরিষ্কার নেই। চেয়ার আর সোফায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে ওর কিছু পোশাক। সিঙ্কে আধোয়া থালাবাসন। টেবিলের ওপর আধখালি একটা বোতল ও ইঞ্চিখানেক হুইস্কিসহ একটা গ্লাস দেখা যাচ্ছে।

‘ড্রিংক করছিলে দেখছি,’ শুরু করল ও।

‘তাতে কাজ হয় মানতেই হবে,’ বলল সিডনি।

‘আমরা একসঙ্গে ড্রিংক করতে পারি,’ বলল রথ। ‘তোমার দুর্বলতা আছে এমন কারও বিদায় উপলক্ষে একসাথে ড্রিংক করতে পারি আমরা।’

কাবার্ড থেকে একটা পরিষ্কার গ্লাস বের করে আনল সে। নিজের জন্যে হুইস্কি ঢেলে নিল। তারপর বসে ওর সাথে যোগ দিতে সিডনিকে ইঙ্গিত করল। ওর উল্টোদিকে বসল সে।

‘টমির জন্যে এখনো ক্ষমা করা ঘোষণা হয়নি?’ জানতে চাইল রথ।

‘তেমন কিছু আশা করছি না,’ বলল সিডনি।

অনেকক্ষণ পরস্পরের দিকে নীরবে চেয়ে রইল ওরা। রেডিওতে বাজনা বাজছে, মিষ্টি, কোমল, স্বস্তিকর। বাজনা শুনছে বলে আবিষ্কার করল রথ।

‘আমি ভাবছিলাম,’ অবশেষে বলল সে, ‘টমি মারা যাওয়ার দু-তিন দিন পর কোথাও উদয় হতে পারি আমি। নিজের পরিচয় দাবি করে বসব। কী বলব সেই গল্পটা খাড়া করার চেষ্টা করছি। মনে হয় বিশ্বাসযোগ্য করেই বলতে পারব। টমির সঙ্গে রক্তাক্ত মারপিট হয়েছে আমার। আমি কোনোমতে পালাতে পেরেছিলাম। কেবিন থেকে পালিয়ে গিয়েছিলাম। কিছুদিনের জন্যে স্মৃতি নষ্ট হয়ে গিয়েছিল আমার। তারপর স্মৃতি ফিরে পেয়ে অবাক হয়ে জানতে পেরেছি আমাকে খুন করার দায়ে টমিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। কেমন লাগছে তোমার কাছে?’

‘হয়তো তোমার কথা ওরা বিশ্বাস করবে।’

‘দেখলে, প্রিয় আমার। আমার বিধবা হিসেবে আমার জমানো টাকা ভোগ করা থেকে তোমাকে বিরত রাখতে ভালোই লাগবে।’

সিডনির অভিব্যক্তি দুর্বোধ্য। উঠে সিডনিকে চড় মারতে চাইল সে। যেন সে কেঁদে ওঠে। কিন্তু করল না। তাকে ঠিকমতোই যন্ত্রণা দিতে পারছে । কষ্ট পেতে বাধ্য। পাথরে বানানো তো নয়। প্রকাশ করতে না চাইলেও বোঝা যায় কষ্ট পাচ্ছে।

‘আমরা এমনকি, প্রিয় সিডনি আমার, নতুন করে আমাদের বাধাগ্রস্ত জীবন শুরু করতে পারি। তোমাকে মাফ করে আবার ঘরে তুলে নিতে পারি। জানো, তোমার সামনে খুব বেশি উপায় খোলা নেই। তোমার প্রেমের ব্যাপারটা সবাই জানে এখন। জরিমানা ছাড়াই তোমাকে তালাক দিতে পারব। আমার সাথে থাকার বা রাস্তায় আশ্রয় নেওয়ার ভেতর যেকোনো একটা বেছে নিতে পারো তুমি।’

‘আমাদের নতুন জীবন কি সুখের হবে, নরমান?’

হাসল রথ। ‘নান্দনিক,’ বলল।

এখন ঠিক এগারোটা বাজে, রেডিওতে ঘোষণা হলো।

‘টমি বার্টনের উদ্দেশে,’ গ্লাস উঁচু করে ধরে বলল রথ।

কিছু বলল না সিডনি। কিন্তু রেডিওতে সময়ের সংকেত ঘোষণা করামাত্র তার সারা শরীর প্রবলভাবে কাঁপতে শুরু করল। নিজের গ্লাস তুলে নিয়ে এক চুমুকে শেষ করে ফেলল। সিডনির ভঙ্গি অনুকরণ করে নিজের হুইস্কিটুকুও শেষ করল রথ। টমি বার্টনের উদ্দেশে!

রাত এগারোটায় পনেরো মিনিটের একটা খবর প্রচারিত হয়। খবরের শেষের দিকে এল চমকদার খবরটা। ঠিক নির্দিষ্ট সময়েই স্টেট প্রিজনের ইলেক্ট্রিক চেয়ারে গিয়ে বসেছে টমি বার্টন। প্রিজন ডাক্তার সরকারিভাবে মৃত ঘোষণা করেছে তাকে।

‘বাহ, বাহ,’ বলল রথ। ‘তোমার বন্ধু অক্কা পেয়েছে। এখন আর আমাদের মাঝে কোনো বাধা থাকল না। বেশ কঠিন একটা দিন গেছে আমাদের। এবার কি বিশ্রাম নিতে পারি আমরা?’ সিডনিকে পরিহাস করছে, তবে আসলেও ক্লান্ত বোধ করছিল সে। পরিশ্রান্ত। সব শক্তি আর আবেগ উধাও হয়ে গেছে।

হঠাত্ করে ওর উদ্দেশে হাসতে শুরু করল সিডনি। কারণটা কী, ভাবল রথ। ‘আমার মনে হয় না, বিছানা অবধি হেঁটে যেতে পারবে তুমি, নরমান,’ বলল সে।

‘কী বলতে চাও?’

‘তোমার হুইস্কিতে এমন একটা ওষুধ ছিল যেটা অচল করে দেয়।’

এবার ফের সজাগ হয়ে উঠল রথ। বিপদ সম্পর্কে বিশেষভাবে সতর্ক। কারণ এক অদ্ভুত অনুভূতি ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে ওর শরীর আর পায়ে। মগজ পা-জোড়াকে নড়ার নির্দেশ দিল, কিন্তু মানল না ওগুলো। তবে এখনো ভয় পায়নি ও।

‘তুমিও একই হুইস্কি খেয়েছ,’ বলল সে।

মাথা নাড়ল সিডনি। ‘মনে নেই, তুমি আসার আগেই আমার গ্লাসে মদ ঢালা ছিল? কেবল তুমিই বোতল থেকে ঢেলে খেয়েছ।’

উঠে দাঁড়িয়ে ফায়ারপ্লেসের কাছে ঠেস দিয়ে রাখা কুড়ালটার কাছে গিয়ে নিজের কথা প্রমাণ করল সে। তাকিয়ে তাকিয়ে দেখল রথ।

‘বুঝতেই পারছ, নরমান,’ শয়তানি হাসি নিয়ে শুরু করল সিডনি। ‘তুমি কিন্তু এরই মধ্যে আইনিভাবে মৃত? আমি তোমাকে একাজে সাহায্য করে যথেষ্ট সাবধানে টুকরোগুলোর ব্যবস্থা করতে পারলে কেউই আর তফাত্টা টের পাবে না। আর কেউ কোনো দিন কিছু খুঁজে পেলেও—এই ধরো আরেকটা আঙুল—ধরে নেবে অবশ্যই টমির কাজ।’

ওর দিকে এগিয়ে এল সে। জীবিত, সচেতন ও। পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করার সময় নিজের চোখে দেখতে পাবে।

‘প্রিয়,’ বলল সিডনি, ‘বুদ্ধিটা কিন্তু পুরোটাই তোমার।’ d

 

 

 

 

 

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
২১ জুন, ২০১৮ ইং
ফজর৩:৪৩
যোহর১২:০০
আসর৪:৪০
মাগরিব৬:৫১
এশা৮:১৬
সূর্যোদয় - ৫:১১সূর্যাস্ত - ০৬:৪৬
পড়ুন