বিনোদন
সুন্দরতম ম্যারিলিন গোপন অধ্যায়
এম এ মোমেন২১ জুন, ২০১৭ ইং
সুন্দরতম ম্যারিলিন গোপন অধ্যায়
ম্যারিলিন মনরো মৃত, পাশে শূন্য কৌটা

বিশেষ প্রতিবেদন

হলিউড ক্যালিফোর্নিয়া, আগস্ট ৫, ১৯৬২

হলিউডের ইতিহাসে সবচেয়ে বিখ্যাত তারকা ম্যারিলিন মনরোকে লস অ্যাঞ্জেলেসের ব্রেন্টউডের বাড়িতে শোয়ার ঘরে আজ সকালে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে। তার বয়স ছিল ৩৬ বছর।

বিছানার পাশে একটি শূন্য কৌটা এতে ঘুমের ওষুধ ছিল। খাটের পাশে ছোট টেবিলে চৌদ্দটি ওষুধের বোতল ও ট্যাবলেট ছিল।

মিস মনরোর মৃত্যুর প্রতিক্রিয়া বিশ্ব জুড়ে। চলচ্চিত্রে তার যে অবদান তার চেয়ে অনেক বেশি ছিল তার খ্যাতি। নারী হিসেবে তাকে মনে করা হতো যৌনতার প্রতীক। সাবেক ইয়াঙ্কি বাস্কেটবল তারকা জো ডিমাজ্জিয়ো এবং পুলিত্জার বিজয়ী নাট্যকার আর্থার মিলারের সাথে বিয়ে ও তালাক লাখ লাখ মানুষের মতে একালের ভেনাসের এ অবস্থার জন্য দায়ী।

মজা করার যে মেধা এবং যে জীবনোচ্ছ্বাস নিয়ে মেরিলিন ‘সেভেন ইয়ার ইচ’ এবং ‘সাম লাইক ইট হট’-এ অভিনয় করেছেন যে পরিস্থিতি তাকে মৃত্যুর দিকে নিয়ে গেছে তা এর ঠিক উল্টো।

মিস মনরোর চিকিত্সক তাকে তিনদিনের জন্য ঘুমের ওষুধ ব্যবস্থাপত্রে লিখে দিয়েছিলেন। সাধারণত কৌটাতে চল্লিশ থেকে পঞ্চাশটি ট্যাবলেট থাকে। এই অভিনেত্রী গত এক বছর ধরে মনোবিশ্লেষকের চিকিত্সাধীন ছিলেন। তিনি গতরাতে মনোবিশ্লেষককে ডেকেছিলেন। তিনি মিস মনরোকে কিছুক্ষণ গাড়ি চালিয়ে ঘুরে এসে আয়েশ করে বিশ্রাম নেবার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি বাড়ি থেকে বের হননি।

ময়না তদন্তের পর লস অ্যাঞ্জেলেসের কোরোনার জানিয়েছেন এটি ‘স্বাভাবিক মৃত্যু নয়’। মৃত্যু ড্রাগজনিত বলে তিনি উল্লেখ করেছেন। আগামী আটচল্লিশ ঘণ্টার মধ্যে বিষক্রিয়াজনিত পরীক্ষা সম্পন্ন হলে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাবে। তিনি বলেন, তার আগে মিস মনরো আত্মহত্যা করেছেন কিনা বলা সম্ভব নয়।

কোরোনার ডাক্তার থিওডোর কার্ফির কথা শোনার পর লস অ্যাঞ্জেলেস পুলিশ এই মৃত্যুকে তখন আত্মহত্যা বলতে অস্বীকৃতি জানায়। পুলিশ বলেছে মিস মনরো কয়টা ট্যাবলেট খেয়েছেন তা সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণা নেই, আদৌ ওভারডোজ হয়েছে কিনা কিংবা তা হয়ে থাকলে ভুলক্রমে কিনা তা বলা যাচ্ছে না। পুলিশ জানায় মিস মনরো কোনো নোট রেখে যাননি।

শারীরিক ময়না তদন্ত ছাড়াও লস অ্যাঞ্জেলেস পুলিশ মনস্তাত্ত্বিক তদন্ত করে থাকে। দু’জন বিশেষজ্ঞ মিস মনরোর মনস্তাত্ত্বিক ইতিহাস পরীক্ষা করে দেখবেন। অবশ্য অ-শরীরী (নন ফিজিক্যাল) পরীক্ষা থেকে তিনি আত্মহত্যা করেছেন কিনা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছা সম্ভব হবে না, বিষক্রিয়া পরীক্ষায়ও এর কোনো গুরুত্ব নেই।

গত কয়েক বছর মিস মনরোকে কয়েকটি বাধাবিপত্তির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। তার শেষ দুটো ছবি ‘লেউস মেইক লাভ’ ও ‘দ্য মিসফিটস’ বক্স অফিস হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মিস্টার মিলারের লেখা ‘মিসফিটস’-এর শুটিং শেষ হবার পর তিনি নাট্যকার আস্টার মিলার, মেরিলিনের তৃতীয় স্বামী তাকে তালাক দেন।

‘সামথিঙ্গস গট টু গিভ’ ছবির শুটিংয়ের অযৌক্তিক অনুপস্থিতির কারণে ৮ জুন টুয়েন্টিথ সেঞ্চুরি ফক্স তাকে বরখাস্ত করে। এতে তিনি অভিনেত্রী ছিলেন, এই ছবির শুটিং আর শুরু হয়নি। বরখাস্ত হবার অল্প আগে তিনি শিল্পীদের ওপর অযাচিত দোষারোপের কথা বলে সাংবাদিকদের কাছে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, ‘সামথিঙ্গস গট টু গিভ’ ছবিতে কখনো অভিনয় করতে চাননি।

‘চলচ্চিত্রের জন্য যা ভালো আমরা তাই করে থাকি, ভুল যা কিছু তা ব্যবস্থাপকদের হলিউডের সমস্যার দায় তারকাদের ওপর চাপানো বরং মূর্খতা। চলচ্চিত্রের যারা সম্পদ নির্বাহীদের তাদের ঘাটানো উচিত নয়। কয়েক সপ্তাহ পর মিস মনরোর বিরুদ্ধে পাঁচ লাখ ডলারের ক্ষতিপূরণ মামলা দায়ের করা হলে, মিস মনরো টুয়েন্টিথ সেঞ্চুরি ফক্স-কে বলেন, তাকে শুটিংয়ে গিয়ে ছবিটি শেষ করতে দেওয়া হোক।

হতোদ্যম হয়ে তিনি বেভারলি হিলস হোটেলের বিলাসিতাপূর্ণ স্যুট ছেড়ে উচ্চ-মধ্যবিত্ত শ্রেণির একতলা রঙিন প্লাস্টার করা বাড়িতে গিয়ে উঠেন। ১২৩০৫ ফিফথ হেলেনা ড্রাইভিং এই বাড়িতে তিনি মারা যান। 

হাউস কিপার তাকে শেষবারের মতো দেখেছেন

মিস মনরোকে জীবিত অবস্থায় যিনি সর্বশেষ দেখেছেন তিনি তার বাড়ির হাউস কিপার মিসেস ইউনিস মারে। তিনি তার সাথে থাকতেন। তিনি পুলিশকে বলেন, মিস মনরো গত রাত আটটায় বেডরুমে চলে যান।

ভোর তিনটা পঁচিশে হাউসকিপার দেখলেন মিস মনরোর দরজায় নিচ দিয়ে আলো আসছে। তিনি তাকে ডাকলেন কোনো সাড়া পেলেন না। বেডরুমের দরজা দিয়ে ডাকাডাকি ও শোনার চেষ্টা করলেন, কিন্তু দরজা ভেতর থেকে তালাবদ্ধ।

মিস মারে বাইরে গিয়ে বন্ধ ফ্রেঞ্চ উইনডো দিয়ে উঁকি মেরে দেখার চেষ্টা করলেন (রুম থেকে সরাসরি বাগান কিংবা করিডোর যাবার দরজা এটাকে জানালা ও দরজা হিসেবে ব্যবহার করা যায়)। মিসেস মারে, পুলিশকে বলেন, মিস মনরোকে ‘অদ্ভুত’ দেখাচ্ছিল। একটি বাহু বিছানার ওপর অন্য হাতটি টেলিফোনের ওপর ঝুলছিল। হাউসকিপার দ্রুত বাড়ির ভেতরে গিয়ে মিস মনরোর এনালিস্ট ডাক্তার রালফ আর গ্রিনসনকে ফোন করলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি এসে ফ্রেঞ্চ উইন্ডোর কাচ ভেঙ্গে এটি খুলে ফেললেন। তিনি দ্রুত এই তারকাকে পরীক্ষা করলেন। দেহে প্রাণ নেই।

তিনি মিস মনরোর ব্যক্তিগত চিকিত্সক ডাক্তার হাইতেন ইন্টেলবার্গকে ফোনে জানালেন। তিনি এসে পুলিশকে ফোন করলেন। তখন ভোর চারটা কুড়ি মিনিট, হাউসকিপার ডাক্তার গ্রিনসকে ডাকার প্রায় এক ঘণ্টা পর পুলিশকে ডাকা হলো।

লস অ্যাঞ্জেলেস পুলিশের ইন্সপেক্টর অ্যাডওয়ার্ড ওয়াকারকে জিজ্ঞেস করা হলো—এতো দেরিতে পুলিশকে জানানো অস্বাভাবিক ঘটনা বলে তার মনে হয়েছে কি না? তিনি বলেছেন তার সে রকম মনে হয়নি।

ডাক্তারদের ব্যাপারে অপরাধের কোনো  সাক্ষ্য নেই, কারণ প্রথম ডাক্তার তাকে মৃত অবস্থায়ই পেয়েছেন। ইন্সপেক্টর বলেন, ডাক্তারদের ব্যাপারে সমালোচনা করার মতো কিছু নেই।

সারি সারি দক্ষশোভিত এই পাড়াতে খবর পেয়ে দু’জন রেডিও পেট্রোলম্যান এবং একজন সার্জেন্ট এসে পৌঁছেন। এর কিছুক্ষণ পরই ডিটেকটিভ সার্জেন্ট আর ই বায়রণ এই মামলার দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

সার্জেন্ট বায়রন বলেন, মিস মনরোর বেডরুম বেশ পরিচ্ছন্ন এবং সাধারণভাবে সাজানো। তার অনুমান রুমটি ১৫ ফুট স্কোয়ার (১৫–১৫)। ‘আমার যদ্দুর মনে পড়ে রুমে ছিল একটি বিছানা, একটি ছোট ড্রেসিং টেবিল আর একটি নাইট টেবিল, আর তার টেনে নেওয়া টেলিফোনটি বিছানায়।’

পুলিশের (তাত্ক্ষণিক) তদন্ত শেষ হলে মৃতদেহ ওয়েস্ট্রড ভিলেজ মর্গে নিয়ে যাওয়া হয়। বাড়িটি সিল করে পাহারা মোতায়েন করা হয়।

তারপর মৃতদেহ ময়না তদন্তের জন্য কাউন্টি মর্গে নিয়ে যাওয়া হয়। ডাক্তার সুলেটমি ননুচি, প্যাথোলজিস্ট ময়না তদন্ত করেন। গত দু’বছর ধরে মিস মনরো হলিউডে বিভিন্ন ধরনের বিতর্কের কারণ হয়ে দাঁড়ান। কেউ কেউ তার সিরিয়াস অভিনেত্রী হবার বাসনা নিয়ে ঠাট্টা করেন। তিনি নিউইয়র্কে লি স্ট্রচবার্গের কাছে শিক্ষাগ্রহণ করতে যাবেন—এটা অনেকের কাছে হাস্যকর মনে হয়েছে।

মিস মনরোর যারা পক্ষে তারা মনে করেন মিস মনরোর মেধাকে অবমূল্যায়ন করে সিনেমা ভক্তদের কাছে তাকে কেবল যৌনতায় অভিষিক্ত করা হচ্ছে। এই মতানৈক্যের আর একটি দিক হচ্ছে একদল মনে করেন তিনি সনাতন তারকাদের মতো শুটিং সেটে গিয়ে তার প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধার অপব্যবহার করছেন।

আর এ মতের বিরোধীরা মনে করেন, হলিউড কিভাবে মেধাকে কেবল আর একটি পণ্যের মতো মনে করে মিস মনরো তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।

(টুয়েন্টিথ সেঞ্চুরি) ফক্স-এর নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট অবশ্য বলেছেন, তার জমিজমা বেচে ক্ষতিপূরণ আদায়ের জন্য তারা চাপ দেবেন না। শেষ পর্যন্ত মিস মনরোকে একাকীত্বই বেছে নিতে হয়। মিস মনরোর প্রতিবেশীরা তাই মনে করেন। হলিউড মানে খুব সাধারণ এই দুই বেডরুমের বাংলোতে আসার ছয় মাসের মধ্যে তার প্রতিবেশীদের কেউই তাকে দু’একবারের বেশি দেখেননি।

ম্যারিলিন মনরো আশাবাদী মানুষ ছিলেন। আশা ও আনন্দ চারদিকে ছড়িয়েছেন। বলেছেন : ‘হাসতে থাকুন, কারণ জীবনটা খুব সুন্দর, হাসার মতো এতকিছু চারদিকে।’

এতকিছু থাকতে, এত পরিচিতি, এত সম্মান, তার হাঁটার জন্য তার পদচিহ্ন ধরে রাখার জন্য রাস্তায় বুক পেতে পড়ে থাকা শ্রেষ্ঠ যুবকরা পড়ে থাকার পরই তাকে কেন আত্মহত্যা করতে হবে?

অভাবটা কিসের?

‘ম্যারিলিন সম্ভবত সে জবাবও দিয়ে গেছে : ‘আমি যা চেয়েছি তা কেবলই ভালোবাসা—আমার জন্য, আমার মেধার জন্য।’

কেমন ছিল ম্যারিলিনের জীবন? অসমাপ্ত!

ম্যারিলিন বলেছেন, ‘জীবনটা তুমি যতক্ষণ যাপন করবে না, তুমি জানবে না জীবন কেমন।’

ম্যারিলিন মনরো কি জেনেছেন? ছত্রিশ বছরের অসমাপ্ত জীবন!

[তারকালোকে মেধাদীপ্ত উপস্থিতি ও ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি

৬ আগস্ট ১৯৬২ নিউ ইয়র্ক টাইমস-এ প্রকাশিত আরেকটি বিশেষ প্রতিবেদনের অংশবিশেষ]

তার বন্ধুদের কেউ একাডেমি এওয়ার্ডের জন্য কখনো মনোনয়ন পাননি। তবুও অনেকেই তিক্ততা নিয়ে ম্যারিলিন মনরোর মৃত্যুতে সাড়া দিয়েছেন, হলিউডের অনাকাঙ্ক্ষিত চাপকে দায়ী করেছেন। অন্যরা বলছেন, তিনি হলিউডের কাছে আঘাত পেয়েছেন, বিষণ্নতায় ভুগছিলেন এবং হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলেন।

পরিচালক যশুয়া লোগান বলেছেন :

‘তিনি ছিলেন পৃথিবীর সবচেয়ে অপ্রশংসিত মানুষ।’

হলিউডে ক্লার্ক গ্যাবলের বিধবা স্ত্রী প্রার্থনা সভায় যোগ দিয়েছেন, ম্যারিলিন মনরোর জন্য প্রার্থনা করেছেন।

ইতালিতে সোফিয়া লোরেন কান্নায় ভেঙে পড়েছেন। লন্ডনে স্যার লরেন্স অলিভিয়ার বলেছেন :ম্যারিলিন অতিরঞ্জিত প্রচারণার শিকার।

প্যারিস থেকে কবি ও নাট্যকার জ্য কঁকভো বলেছেন : ম্যারিলিন মনরোর ট্রাজিক মৃত্যু তাদের জন্য একটি ভয়ঙ্কর শিক্ষা হওয়া উচিত যাদের মূলকাজ গোয়েন্দাগিরি করা আর চিত্র তারকাদের ওপর নির্যাতন চালানো। এই ধরনের রিপোর্টারদের কেউ কেউ তার বাড়ির ওপর দিয়ে হেলিকপ্টার নিয়ে ঘুরঘুর করে গোয়েন্দা বৃত্তি চালিয়েছে। এটা অত্যন্ত কলঙ্কজনক।

কানেক্টিকাট রাজ্যের উড বাড়িতে ম্যারিলিন মনরোর মৃত্যু নিয়ে তার তৃতীয় স্বামী নাট্যকার আর্থার মিলারের কোনো মন্তব্য আছে কি-না জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন ‘সত্যিই আমার কোনো মন্তব্য নেই।’

মিস মনরোর দ্বিতীয় স্বামী সাবেক বেসবল তারকা জো ডিম্যাজ্জিওকে মন্তব্যের জন্য ধরা সম্ভব হয়নি। তবে তার প্রথম স্বামী জেমস ই ভোগার্টি পুলিশ বিভাগে কর্মরত। নর্থ হলিউডে টহলরত অবস্থায় মন্তব্যের জন্য যোগাযোগ করা হলে তিনি ‘আমি দুঃখিত’ বলে নীরব হয়ে থাকেন।

এমনকি সম্প্রতি তিনি যেসব শো বিজনেস অ্যাসোসিয়েটসয়ের সাথে কাজ করেছেন, তারাও তেমন কিছু বলেনি। ‘সেভেন ইয়ার্স ইচ’ কাহিনির চিত্রনাট্যকার জর্জ অ্যাক্সেলরভ বলেন, প্যারিসে যখন তিনি দুঃসংবাদটি পান, হতভম্ব হয়ে পড়েন। মিস মনরোর ঘনিষ্ঠজন সুসান স্ট্র্যাসবার্গ রোমে কয়েক মুহূর্তের জন্য নির্বাক হয়ে পড়েন এবং বলেন, ‘তিনি অত্যন্ত মেধাবী একজন নারী-নিজের পছন্দমতো কেবল কাজ শুরু করেছিলেন। তিনি থিয়েটারের কাজ করতে চেয়েছিলেন... এরপর বাষ্পরুদ্ধ হয়ে তিনি আর কথা বলতে পারেননি।

সুসান স্ট্র্যাসবার্গের বাবা লি এবং পাওলা স্ট্র্যাসবার্গ, এ সপ্তাহে মিস মনরোকে নিউ ইয়র্কে আশা করছিলেন।

এক্টর্স স্টুডিওর এই পরিচালক দম্পতি বলেন, ‘এখন তো সব শেষ হয়ে গেল, আমরা আশা করি তার মৃত্যু একজন সংবেদনশীল শিল্পী ও নারী যিনি পৃথিবীকে আনন্দ ও সুখ দিয়েছেন তার মৃত্যু আমাদের সহানুভূতিকে নাড়া দেবে। ইতালির চিত্রপরিচালক আলেসান্দ্রো ক্লাসেতি বলেন, ‘যৌন আবেদনের ওপর সিনেমা জগতে আসা একজন শিল্পী যিনি তার রসবোধ দিয়ে এর ব্যবহার করেছেন। যখন আমেরিকান সিনেমার জন্য রয়ে গেল কেবল অড্রে হেপবার্নের হাসি।’

শুধু M. M (ম্যারিলিন মনরো) প্রতীকেই হলিউড জেগে উঠত। গ্রেটা গার্বো, ক্যাথরিন হেপবার্ন, ভিভিয়ান লি প্রত্যেকেই উজ্জ্বল তারকা, কিন্তু নারীত্বের প্রলোভন, একটি সুন্দর শরীর, একটু থমথমে সুরেলা কণ্ঠ, প্রশস্ত চোখ, পুষ্ট ঠোঁট এবং বালিকাসুলভ শব্দচয়ন ম্যারিলিন মনরোকে শত নায়িকার একজন হিসেবে শনাক্ত করে রেখেছে। আগের রাতের অতিথি প্যাট্রিসিয়া নিউকম্ব ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলেন, ৭টার সময় আমরা ডিনার করেছি, তারপর আমি চলে আসি, আপনার সবেচেয়ে প্রিয়বন্ধু যখন নিজেকে খুন করে তখন আপনি কেমন অনুভব করতেন?

ম্যারিলিন মনরোর অ্যাটর্নি মিলটন রুডন বলেন, ম্যারিলিনের শরীরে কোনো সমস্যা ছিল না। এটা নিশ্চয়ই একটা দুর্ঘটনা। আজ বিকেলে আমাদের একসাথে সিনেমা দেখতে যাবার কথা ছিল।

নগ্ন ও নিষ্প্রাণ

নীল কম্বলে ম্যারিলিন মনরোকে পেঁচিয়ে স্ট্রেচারের স্ট্র্যাপে আটকে ৭৫,০০০ ডলারে কেনা কেবল অর্ধসজ্জিত সেন্টউডের বাড়ি থেকে বের করে বাড়িটি সিল করে দেওয়া হয়েছে।

শিশু নোরমা থেকে ম্যারিলিন মনরো

শিশু নোরমা জিন মর্টেনসন হয়ে উঠলেন সমকালের এবং উত্তরকালের সবচেয়ে আলোচিত সেলিব্রেটি সুন্দরতম ম্যারিলিন মনরো। জন্ম ১ জুন ১৯২৬ সকাল সাড়ে ৯টায় লস অ্যাঞ্জেলস জেনারেল হসপিটাল। মা গ্ল্যাডিস গার্ল মনরো। বাবা কে?

জন্ম সনদে বাবার নাম লেখা হয়েছে এডওয়ার্ড মর্টেনসন। কিন্তু জন্মের সময় গ্ল্যাডিসের সাথে তার সম্পর্কের কাল এসব বিবেচনা করলে মর্টেনসনের বাবা হবার কোনো কারণ নেই। ডোনাল্ড হল ‘দ্য লাস্ট ডেজ অব ম্যারিলিন মনরো’তে দেখিয়েছেন তার প্রকৃত পিতা স্ট্যানলি গিফোর্ড। ‘কনসোলিডেশন ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিজ’ নামক একটি প্রতিষ্ঠানে ফিল্ম কাটার কাজ করতেন আরো অনেকের সাথে গ্ল্যাডিস ও স্ট্যানলি-২ জন শ্রমিক। দু’জনের মধ্যে স্বল্পকালীন সম্পর্ক গ্ল্যাডিসকে গর্ভবতী করে। পেটে যখন সন্তান গ্ল্যাডিস বুঝতে পারলেন তার পুরুষ সটকে পড়েছে। এটি তার তৃতীয় সন্তান নোরমা জিন। গ্ল্যাডিসের আগে একটি বিয়ে হয়েছিল, স্বামী জেসপার বেকার স্ত্রী মাদকাসক্তের কারণে এক পুত্র এবং এক কন্যাকে নিজের কাছে রেখে গ্ল্যাডিসকে তালাক দেন। গ্ল্যাডিস মার্টিন মোর্টেনসনকে বিয়ে করে চার মাস সংসার করে আবার রাস্তায় নামেন। নোরমা সামাজিক ভাবে অবৈধ সন্তান হিসেবে বেড়ে উঠেন। নোরমার ৩৬ বছরের জীবনে তার এই সত্ ভাইবোনের সাথে কখনো দেখা হয়নি। প্রতিবেশীদের বাড়িতে রেখে গ্ল্যাডিস কাজে যেতেন, কিন্তু মানসিক অসুস্থতার কারণে তাকে প্রায়ই হাসপাতালে থাকতে হতো। নোরমা যখন নয় তখন তার মা গ্ল্যাডিসকে স্থায়ীভাবে নরওয়ার্ক স্টেট মানসিক রোগ হাসপাতালে স্থানান্তর করতে হলো। গ্ল্যাডিসের বান্ধবী গ্রেইস ম্যাককি নোরমাকে লালন-পালন করতে এগিয়ে এলেন, কিন্তু আর্থিক অসামর্থ্যের কারণে তাকে লস অ্যাঞ্জেলেস এতিমখানায় দিয়ে দেন। কিছু সময় পালক পরিবারে, কিছু সময় এতিমখানায় তার জীবন কাটে। এ সময় তিনি একাধিকবার ধর্ষণের শিকার হন। একটি সাক্ষাত্কারে শৈশব স্মৃতির কথা জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, ‘আমার সবচেয়ে আগের স্মৃতি... এতো টিকে থাকার জন্য জীবন সংগ্রামের স্মৃতি। আমি তখনো খুব ছোট, ছোট্ট বিছানার ছোট্ট শিশু আর আমি তখন টিকে থাকার লড়াই করছি... এটা খুব নির্মম গল্প।’ শৈশবের যৌন নিপীড়ন নিয়ে তিনি বলেছেন, ‘সেজন্য আমাকে নিশ্চয় সাজা দেওয়া হবে না, কিংবা চাবকানো হবে না, আমাকে ভালোবাসা হবে না কিংবা নরকে পাঠানো হবে এমন তো নয়। ১৯ জুন ১৯৪২, বয়স তখন ১৬। বিয়ে করলেন, জেমস ভোগার্টিকে, বিয়েটি টেকসই হয়নি।

রেডিও প্লেইন মিউনিশন ফ্যাক্টরির কর্মচারী হিসেবে ক্যামেরায় তোলা একটি ছবি ১৯৪৫-এ ইয়াঙ্ক ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হলে দরজা খুলে যায়। তিনি মডেল হবার সুযোগ পান। তারপর সিনেমা বেন লিয়ন হলিউডের চর্চা অনুযায়ী নোরমা জিন মোর্টেনসনের নামের ওপর কাঁচি চালিয়ে তাকে ম্যারিলিন মনরো করে তুলেন।

১৯৪৯ সালে ক্যালেন্ডারের ছবির জন্য নগ্ন পোজ দিয়ে ৫০ ডলার কামাই করেন আর ১৯৫৩-তে যখন হিট হেফনার সম্পাদিত প্লেবয়তে ন্যুড মডেল হলেন, পেলেন ৫০০ ডলার। আলোচনার মোড় ঘুরে গেল এত সুন্দর নগ্ননারী পৃথিবীতে আর একজনও কি আছে? নেই।

১৯৪৯-এ ‘লাভ হ্যাপি’ প্রথম ছবি।

জেমস ভোগার্টি তাকে মডেল হতে দেবেন না, সিনেমা  করতেও না। ম্যারিলিন তাকে তালাক দিলেন। তারপর জো ডিম্যাজ্জিও। এটিও কাজ করল না। তারপর আর্থার মিলার, তিনি তো ধীরে ধীরে তাকে মৃত্যুর দিকেই ঠেলে দিলেন।

একটি একটপিক প্রেগন্যান্সি এবং চারটি গর্ভপাতের রেকর্ড থাকলেও নরমান মেইলার দাবি করেছেন ২৯ বছর বয়স পর্যন্ত ম্যারিলিনকে ১২টি গর্ভপাত মেনে নিতে হয়।

পিতার অভাব তাকে সারাজীবন তাড়া করেছে। চার্লস স্ট্যানলে গিফোর্ডের সাথে সরু গোঁফের নায়ক ক্লার্ক গ্যাবলের হয়তো কোনো মিল থাকতে পারে, নাও থাকতে পারে, কিন্তু ম্যারিলিন ভাবতেন ক্লার্ক গ্যাবলই বাবা। ‘ক্লার্ক গ্যাবল যখন মারা গেলেন, আমি একটানা দু’দিন কেঁদেছি, খেতে পারিনি, ঘুমাতে পারিনি।

ম্যারিলিন শেষ পর্যন্ত বিশাল পৃথিবীতে একটি ছোট্ট নগ্ন বালিকাই রয়ে গেছেন।  

ষাটের দশকের শুরুতে

পঞ্চাশের দশকের শেষার্ধে ১৯৫৬, ১৯৫৭ এবং ১৯৫৮ প্রতি বছর একবার গর্ভপাত ম্যারিলিনের আবাল্য লালিত মা হবার স্বপ্নটিকে ম্লান করে দিতে থাকে। তারপরও তিনি উঠে দাঁড়ান। নিজের বেদনা লুকিয়ে আনন্দের ঝর্ণাধারা বইয়ে দেন। ১৯৫৯-এর সেপ্টেম্বরে সোভিয়েত নেতা নিকিতা ক্রুশ্চেভের সম্মানে দেওয়া মধ্যাহ্ন ভোজে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৬০-এর মার্চে ‘সাম লাইক ইট হট’-এ অভিনয় তাকে এনে দেয় গোল্ডেন গ্লোব অ্যাওয়ার্ড।

ম্যারিলিন তখনো আর্থার মিলারের স্ত্রী। এর মধ্যে নিকে মিনারভোস, গ্রিক-আমেরিকান অভিনেতা ছাড়াও ফরাসি ইভস মনটাড-এর সাথে ম্যারিলিনের বিয়ে বহির্ভূত সম্পর্ক অব্যাহত থাকে। এদিকে তার মনোলোক আচ্ছন্ন করে রেখেছেন জন এফ কেনেডি, আগামী দিনের আমেরিকান প্রেসিডেন্ট।

৫ আগস্ট ১৯৬০ ইভস-এর সাথে ম্যারিলিনের সম্পর্ক ও ডেটিং নিয়ে আর্থার মিলার তার সাথে দুর্ব্যবহার করেন। ২৬ আগস্ট ম্যারিলিন আত্মহত্যার উদ্দেশ্যে বহুসংখ্যক ঘুমের বড়ি খান। দ্রুত হস্তক্ষেপ ঘটায় ম্যারিলিন রক্ষা পান। আর্থার মিলার বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে যান। ১৯ নভেম্বর ম্যারিলিন আর্থার মিলারের সাথে তার তালাকের ঘোষণা দেন। ২৪ জানুয়ারি ১৯৬১ তালাক চূড়ান্ত হয়।

১৯৬১-র জানুয়ারিতে জন এফ কেনেডির প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ গ্রহণের ক’দিন আগে ম্যারিলিন ঘনিষ্ঠজনের কাছে স্বীকার করেন যে তার সাথে তিনি শয্যা গ্রহণ করেছেন। ৩০ মার্চ সাবেক স্বামী জো ডিম্যাজ্জিওর সাথে ফ্লোরিডার রেডিংটন সমুদ্র সৈকতে অবস্থান করেন।

এপ্রিলে লস অ্যাঞ্জেলেসে ফিরে এসে ফ্রাঙ্ক সিনাত্রার সাথে থাকেন। ৮৮২ নর্থ ডোহেলি ড্রাইভ, ওয়েস্ট হলিউডে একটি অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া করেন। ১৯৫৩ সালেও তিনি এই ভবনের ৬৪৮ বর্গফুট একটি এক বেডরুম অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া নেন এবং জো ডিম্যাজ্জিওকে নিয়ে বসবাস করেন।

১৯৬১-র এপ্রিলে ছয় সন্তানের জনক, যুক্তরাষ্ট্রের তরুণতম অ্যাটর্নি জেনারেল, প্রেসিডেন্ট  জন এফ কেনেডির ভাই রবার্ট এফ কেনেডির সাথে তার সখ্য গড়ে ওঠে। দুজনের অন্তরঙ্গ সময়ও কাটে।

ফ্রাঙ্ক সিনাত্রাকে বিয়ে করবেন ভেবে নিয়ে আগস্টে তার সাথে এক সপ্তাহ উষ্ণ সমুদ্রে সময় কাটান। সিনাত্রা তাকে এমারেল্ডের কানের রিং উপহার দেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সম্পর্কটি বিয়ে পর্যন্ত গড়ায়নি। অক্টোবরে সান্তা মণিকা বিচ হাউসে তারকা পরিবেষ্টিত জন এফ জেনেডির সাথে ডিনার। বছরের শেষে ক্রিসমাস ছুটি কাটান প্রেমিক ইভ মোতাদ এবং সাবেক স্বামী জো ডিম্যাজ্জিও-র সাথে। নিজের চলচ্চিত্র জীবন উপেক্ষিত হতে থাকে। ড্রাগ আসক্তি ও সিডিউল রক্ষায় ব্যর্থতা তাকে চলচ্চিত্রে বিনিয়োগকারীদের কাছে অপ্রিয় করে তুলতে থাকে। টুয়েন্টিথ সেঞ্চুরি ফ্লক্স-এর লিয়ন পর্দায় আনার সময় যে নোরমাকে ম্যারিলিন মনরো করে তুলেছিলেন, সেই ম্যারিলিনের সামনে আরো বড় সংকট।

 

(তিন)

‘আমার বুক ৩৭, কোমর ২৩.৫ এবং নিতম্ব ৩৭.৫ ইঞ্চি’ -ম্যারিলিন

 

কী সব অদ্ভুত কথা বলতেন ম্যারিলিন মনরো! যখন ম্যারিলিন ‘সেক্স সিম্বল’ হিসেবে সর্বত্র উদ্ধৃত হতে থাকেন : ‘পুরুষ মানুষের যৌনতার প্রতীকে কী দরকার? আমি একটি বালিকা!’ তিনি বলেন, ‘শিশু হিসেবে আমি কেবল হাঁটতে শিখেছি, এর পর আর কোনো শিক্ষা গ্রহণ করিনি।’ ‘পুরুষমানুষই আপনাকে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে আপনাকে সন্তুষ্ট করে কারণ আপনি নারী।’ ‘সেন্সরের সমস্যা দুই স্তনের মধ্যবর্তী উপত্যকাটি দেখা; অথচ এটা না থাকলেই বরং উদ্বিগ্ন হবার কথা।’ ‘আমার দর্শক আমার সাথেই বড় হচ্ছে। আমি তো এখন আর উনিশ নই, যদি কেবল যৌনতা ধরে রাখি তাহলে আমি যখন পঞ্চাশ হব পকেটের টাকা খরচ করে কে আমার সিনেমা দেখবে।’ আমি চাই গোটা পৃথিবী আমার শরীরটা দেখুক।’ ‘আমি তাহলে কিসে ভালো-আমি বাচ্চা নিতে পারছি না, আমি রাঁধতে পারি না, তিনবার আমার তালাক হয়েছে। কে আমাকে চাইবে?’

১৯৫৪-র জানুয়ারি সংখ্যা মোশন পিকচার ম্যাগাজিনে একটি সাক্ষাত্কার প্রকাশিত হয়। প্রশ্নগুলো পাঠকদের। সঞ্চালক হিসেবে এগুলোই ম্যারিলিন মনরোর দিকে ছুড়ে দিয়েছেন হেলেন হোভার।

প্রশ্ন: এটা কি সত্য যে আপনি পুরুষমানুষের নজর কাড়তে পোশাক-আশাক পরে থাকেন?

মনরো : অধিকাংশ নারীই কি পুরুষের জন্য পোশাক পরে না? এটা কি সত্য নয় যে পুরুষ ও নারীর পরস্পরের প্রতি সপ্রশংসই হবার কথা?

প্রশ্ন: আপনি লো-কাট গাউন কেন পরেন?

মনরো : ব্যাপারটা আমি ঠিক লক্ষ করিনি।

প্রশ্ন: অবসর সময়ে আপনি কী করেন?

মনরো : একজন অভিনেত্রী যখন ছায়াছবিতে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে যাচ্ছেন তখন তার অতি সামান্যই অবসর সময়। যত কমই হোক আমার সময়টা আমি পড়াশোনা করে কাটাই।

প্রশ্ন: নায়েগ্রাতে আপনি যখন বিছানায় আপনার গায়ে ছিল কেবল একটি চাদর নিচে কোনো কাপড় ছিল কি?

মনরো : আমি যে কোনো উপলক্ষের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ পোশাক পরি।

প্রশ্ন: আপনার চোখে আদর্শ পুরুষমানুষ কেমন?

মনরো : ভদ্র ও সহানুভূতিপ্রবণ একজন-তবে আমি কখনো আদর্শ পুরুষের কথা ভাবিনি, এ ধরনের মানুষ আছে কিনা আমি সন্দিহান।

প্রশ্ন: হলিউডের ‘সেক্সিয়েস্ট  গার্ল’ হিসেবে আপনি কেমন বোধ করেন?

মনরো : এটা কি একটা বহুমুখী প্রশ্ন নয়?

প্রশ্ন: আপনার শরীরটাকে এত সুন্দর রাখতে কী করেন?

মনরো : হাঁটি, ব্যয়াম করি, শরীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে পড়াশোনা করি।

প্রশ্ন: ছবিতে আপনাকে অনুকরণ করার চেষ্টা করছে এমন মেয়েদের সম্পর্কে আপনার কী ধারণা?

মনরো : এটি অবাধ ও গণতান্ত্রিক দেশ। কোনোকিছুর ওপর কারো একচেটিয়াত্ব নেই।

প্রশ্ন: আপনার বয়স, জন্মস্থান ও জাতীয়তা?

মনরো : আমার জন্ম লস অ্যাঞ্জেলেস-এ, ১ জুন। আমি আমেরিকান।

প্রশ্ন: সপ্তাহে আপনি ক’জন বয়ফ্রেন্ডের সাথে মেলামেশা করেন?

মনরো : মনে হচ্ছে আপনি আজকাল বড্ড বেশি গপসপ কলাম পড়ছেন।

প্রশ্ন: আপনি যে ধরনের তাতেই খুশি না, নাকি অ্যান ব্লিথ কিংবা জিন ক্রেইনের মতো হলে বেশি খুশি হতেন?

উত্তর : আমি আমার সাধ্যমতো ম্যারিলিন মনরো হয়েই বেশি তৃপ্ত। নিজের মতো হয়ে থাকতে পারাটা দিনে চব্বিশ ঘণ্টার কাজ, তাই নয় কি?

প্রশ্ন: আপনার সবচেয়ে বাজে দোষ কোনটি?

মনরো : আমার অনেক দোষ, কিন্তু সবচেয়ে খারাপ হচ্ছে ৬০ মিনিটে যে এক ঘণ্টা তা ভুলে যাওয়া। আমার দেরি হবেই, এটা কাটিয়ে উঠতে পারছি না।

প্রশ্ন: রাতের বেলার কোনো লৌকিক অনুষ্ঠানে সেজেগুজে যেতে পছন্দ করেন?

মনরো : আমি লৌকিক অনুষ্ঠানে তেমন যাই না। আমি যেমনটি থাকতে চাই সেভাবে বেরোতেই পছন্দ করি, মাঝে মাঝে স্টুডিওর কারো সাথে বের হই। যেভাবেই হোক না কেন আমার লৌকিক অনুষ্ঠানগুলো সরাসরি কাজের সাথে জড়িত।

প্রশ্ন: আপনাকে দেখে যদি কেউ শিস দেয় আপনি কি তা পছন্দ করেন না এটাকে রূঢ় আচরণ মনে করেন?

মনরো : শিস নিয়ে যে মেয়ে ক্ষুব্ধ তার কোনো নির্জন দ্বীপে বসবাস করা উচিত।

প্রশ্ন: আপনার শরীরের মাপ কি?

মনরো : আমার বুক ৩৭, কোমর ২৩.৫ এবং নিতম্ব ৩৭.৫ ইঞ্চি।

প্রশ্ন: এটা কি সত্য যে আপনি ক্যালেন্ডারের জন্য পোজ দিয়েছেন?

মনরো : হ্যাঁ।

প্রশ্ন: পর্দায় যেমন অভিনয় করেন, পর্দার বাইরেও কি তা-ই করেন?

মনরো : আমি যখন কাজ করি, তখনই অভিনয়; যখন বাসায়, অভিনয় করি না। অফিসের সেক্রেটারি, সেলস গার্ল, শিক্ষক, কেরানি কিংবা অন্য যে কেউ-তারা কি একই কাজ বাসায় করে? কাজ বাসায় আনবে কেন?

প্রশ্ন: সময় কাটাতে সবচেয়ে প্রিয়কাজ কোনটি?

মনরো : হাঁটা। আমি ঘণ্টার পর ঘণ্টা হাঁটতে পারি এবং উপভোগ করি।

প্রশ্ন: আপনি কি স্কুলে জনপ্রিয় ছিলেন?

মনরো : আমি জনপ্রিয়তার কোনো পুরস্কার পাইনি, তবে স্কুলে আমার অনেক ভালো বন্ধু ছিল।

প্রশ্ন: সপ্তাহে আপনি ক’বার ডেট করেন?

মনরো : আমি যখন কোনো ছবিতে কাজ করি, আমার বাইরে যাবার কোনো সময় নেই। তা ছাড়া সপ্তাহে ক’বার-এ ধরনের হিসেব আমি করি না; এটা বোকামি। যদি কেউ আমাকে তার সাথে বাইরে যেতে বলে এবং তার সঙ্গ উপভোগ্য বলে আমার মনে হয় আমি তার সাথে যাই। তা না হলে আমি বাড়িতেই থাকি।

প্রশ্ন: আপনি যদি অভিনেত্রী না হতেন, তাহলে কী হতেন?

মনরো : মজার প্রশ্ন! আমি তো অভিনেত্রী ছাড়া অন্য কিছু হবার কথা কখনো চিন্তাও করিনি।

প্রশ্ন: নায়েগ্রাতে যেমন করেছেন বাস্তবজীবনে কি এভাবে হাঁটেন?

মনরো : কিভাবে আমি হাঁটি তা নিয়ে কখনো ভাবিনি। যেহেতু এই ছবিতে আমাকে একটি নির্দিষ্ট ধরনের মেয়ের অভিনয় করতে হয়েছে তার মতো করে হাঁটার ওপর জোর দিয়েছি। বাস্তব জীবনের হাঁটা নিশ্চয়ই এরকম নয়।

প্রশ্ন: আপনি যে ধরনের প্রচারণা পাচ্ছেন তাতে কি সন্তুষ্ট নাকি ‘ফিগার’ ছাড়াও অন্যকিছুর জন্য আপনি পরিচিত হতে চান?

মনরো : ভালো অভিনেত্রী হিসেবে পরিচিত হতে চাই।

প্রশ্ন: কে আপনার প্রথম প্রেম?

মনরো : আপনাদের চেনাজানা কেউ নয়।

প্রশ্ন:প্রকৃতিগতভাবে আপনি কি উষ্ণ এবং সেক্সি-আপনার কি এই ধরনটাই পছন্দ?

মনরো : কিসের আবার ধরন? আমি আমিই-ম্যারিলিন মনরো।

প্রশ্ন: আপনার প্রিয় হবি কী?

মনরো : গানের রেকর্ড সংগ্রহ করা, পড়া এবং সাঁতার কাটা-যদি সময় পাই।

প্রশ্ন: জো ডিম্যাজ্জিও’র সাথে আপনার রোমান্সের ব্যাপারটি কতটা সত্য?

মনরো : খুব ভালো বন্ধু, ভদ্রলোক এবং আমি তার অনুরক্ত।

প্রশ্ন: আপনি কি মেজাজি? কিসে মেজাজ বিগড়ে যায়?

মনরো : আমি কিছুটা মেজাজি। যখন কেউ আমার সম্পর্কে মিথ্যে কিছু লিখে তখন।

প্রশ্ন: পুরুষমানুষের কোন দিকটা আপনাকে আকর্ষণ করে- চেহারা না ব্যক্তিত্ব?

মনরো : নির্ভর করে সে মানুষটির ওপর-আমার কাছে ব্যক্তিত্বের গুরুত্ব বেশি। ব্যক্তিত্ব পরিমাপের সাথে তার রসবোধও আমি বিবেচনা করি।

প্রশ্ন: আপনার সবচেয়ে প্রিয় বান্ধবী কে?

মনরো : সবচেয়ে প্রিয় বান্ধবী নেই। আমার অনেক ভালো বন্ধু আছে যাদের সান্নিধ্য আমার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ।

প্রশ্ন: যখন ‘জেন্টলম্যান প্রেফার ব্লন্ড’ চলচ্চিত্রটি নির্মিত হচ্ছিল আপনার সাথে জিন রাসেলের দ্বন্দ্ব চলছিল?

মনরো : মোটেও না। এই গুজবটি কেন সৃষ্টি হলো জানি না-দুজন নারী একসাথে শান্তিপূর্ণভাবে কাজ করতে পারে এটা কি তারা বিশ্বাস করে না? আমার চেনা চমত্কার মানুষদের একজন জেন। আমি সানন্দে বলি জেন আমার বন্ধু।

প্রশ্ন: ডেটিং-এর জন্য আপনার কাছে ভালো সময় কোনটি?

মনরো : আমার পছন্দ  সন্ধ্যেবেলা-সাথে কেউ একজন যার ব্যক্তিত্ব ও কথোপকথন আমাকে আকৃষ্ট করে।

প্রশ্ন: আপনার লোকাট গাউন নিয়ে সমালোচনা আপনি কিভাবে নেন?

মনরো : আমি অন্যায় সমালোচনা কখনোই পছন্দ করি না। আপনি কি করেন? আমি অনুভব করি কিছু সমালোচনায় আমার প্রতি অন্যায় হয়েছে।

প্রশ্ন: আপনি কোন ধরনের পুরুষমানুষ বিয়ে করতে চান?

মনরো : কেমন করে বলি? এই মুহূর্তে বিয়ে করার কথা ভাবছি না। তবে আমি অবশ্যই কখনো বিয়ে করতে ও সন্তান নিতে চাইব।

প্রশ্ন: তারকা হবার আগে আপনি কোন ধরনের জীবন যাপন করতেন?

মনরো : সংকটাপন্ন দিন যেমন ছিল, আনন্দময় দিনও ছিল। স্কুলে গিয়েছি অনেক ধরনের চাকরি করেছি, ছবির জগতে ঢোকার সুযোগ খুঁজেছি, ভয়াবহ অনেক হতাশাও ছিল, শেষ পর্যন্ত কিছুটা সাফল্য তো এসেছেই।

প্রশ্ন: পর্দায় সুন্দরী নারীর ভূমিকা ছাড়া আর কিছু করার কথা কখনো কি ভেবেছেন?

মনরো : অবশ্যই বিভিন্ন ধরনের চরিত্রে অভিনয় করতে চাই; একই ধরনের ও একঘেয়ে হয়ে যাওয়া ঠিক নয়।

অফুরন্ত জীবন যার হাতের মুঠোয়, সেই ম্যারিলিন মনরো জন লেননকে মৃত্যুর কিছুদিন আগে লিখেছেন: আমার ইচ্ছেশক্তি বড় দুর্বল, আমি কোনোকিছুর ওপর দাঁড়াতে পারছি না। আমাকে পাগল মনে হচ্ছে, কিন্তু আমি সত্যি সত্যি পাগল হয়ে যাচ্ছি। আমি যখন ক্যামেরার সামনে দাঁড়াই আমার অভিনিবেশ এবং আমার শেখার  এতদিনকার তাড়না আমাকে ছেড়ে যায়। তখন আমার মনে হয় মানব জাতির মধ্যে আমার যেন আর কোনো অস্তিত্ব নেই।

 

(চার)

আত্মজীবনী মাই স্টোরির  একটি এপিসোড

(জোয়ান ক্রুফোর্ড মঞ্চের নৃত্যশিল্পী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে শেষ পর্যন্ত হলিউড মাতিয়ে রাখেন। মিলড্রেড পিয়ার্স ছবির নাম ভূমিকায় অভিনয় করে ১৯৪৫ সালের অস্কার জিতে নেন। মার্কিন চলচ্চিত্রের সর্বকালের শ্রেষ্ঠ ১০ নায়িকার তালিকায় জোয়ান ক্রুফোর্ড যেমন আছেন, তেমনি ম্যারিলিন মনরোও। জোয়ান ক্রুফোর্ড-অভিনীত কয়েকটি আলোচিত ছবি : পজেসড, গ্র্যান্ড হোটেল স্ট্র্যাঞ্জ কার্গো, ফ্ল্যামিঙ্গো রোড হোয়াটএভার হ্যাপেন্ড টু বেবি জেন, আই স হোয়াট ইউ ডিভ।  অগ্নাশয়ের ক্যান্সারে ১০ মে ১৯৭৭ জোয়ান ক্রুফোর্ডের মৃত্যু হয়। অভিনেতা ক্লার্ক গ্যাবলের সঙ্গে জোয়ান ক্রুফোর্ডের প্রণয়ের সম্পর্ক ছিল। দীর্ঘদিন ম্যারিলিনও তার প্রতি অনুরক্ত ছিলেন, ক্লার্কের মধ্যে নিজের পিতাকে খুঁজতেন।

জোয়ানের সঙ্গে ম্যারিলিনের দেখা-সাক্ষাত্ স্বল্প সময়ের। কিন্তু সম্পর্কটি প্রীতিকর হয়নি। এই নিয়েই ম্যারিলিন মনরোর আত্মজীবনী ‘মাই স্টোরি’ এই এপিসোডটি অনূদিত।)

জো-শেঙ্ক-এর বাড়িতে জোয়ান ক্রুফোর্ড-এর সাথে আমার দেখা। তিনি মনে দাগ কাটার মতো একজন নারী। ডিনারে আমি তার গুণমুগ্ধ হয়ে রইলাম। ভাবলাম আমি যখন তার বয়সী হব, তখন তার মতোই চেহারাটা ধরে রাখতে পারব।

চিত্রাভিনেতা-অভিনেত্রীদের সঙ্গে দেখা হলে তাদের কাউকে কাউকে পর্দায় দেখে যেমন মনে হয়, সামনাসামনি দেখে ঠিক তা মনে হয় না। আবার কাউকে কাউকে মনে হয় বাস্তবে যে পর্দার চেয়েও বেশি। এর মধ্যে কোন ধরনেরটা ভালো আমি জানি না। তবে মিস ক্রুফোর্ড নিঃসন্দেহে দ্বিতীয় ধরনের। উত্তেজনাপূর্ণ-কোর্টরুম ড্রামায় মিস ক্রুফোর্ড যেমনটি হতেন জো শেঙ্ক-এর খাবার টেবিলে তিনি তার চেয়ে কম মুভিস্টার নন, বরং একটু বেশিই।

আমিও খুশি হলাম যে আমি মিস ক্রুফোর্ডের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পেরেছি। ডিনারের পর তিনি আমাকে বললেন, ‘তুমি যদি আমাকে সুযোগ দাও, তাহলে তোমাকে অনেকটাই সাহায্য করতে পারব। যেমন ধর, তুমি আজ যে সাদা সেলাই করা পোশাকটা পরেছ, এ ধরনের ডিনারের জন্য এই পোশাকটি সম্পূর্ণ অনুপযুক্ত।’

এটাই ছিল তখনকার দিনে আমার সবচেয়ে ভালো পোশাক। আমি যখন গুরুত্বপূর্ণ কোনো জায়গায় যাই, দিনের বেলা হোক কি সন্ধ্যেবেলা, আমি এ পোশাকটাই পরি। প্রতিদিন নিজের হাতে এটা পরিষ্কার করি। আমি মিস ক্রুফোর্ডের সুন্দর সান্ধ্য গাউনের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারি তিনি আসলে কী বোঝাতে চাচ্ছেন।

মিস ক্রুফোর্ড বলে চললেন, ‘দেখতে কেমন, ফিগারটা কেমন এর সাথে একইরকম গুরুত্বপূর্ণ রুচি কেমন?’ আমার দিকে তাকিয়ে সদয় হাসি দিয়ে বললেন, ‘লক্ষ্মীসোনা, আমি কি তোমাকে সাহায্য করতে পারি?’

আমি বললাম, তার এই সদয় ইচ্ছার কথা শুনে আমি খুবই বিগলিত। রোববার সকালে চার্চে আমাদের সাক্ষাত্কার ধার্য হলো। দেখা গেল আমি আর মিস ক্রুফোর্ড একই চার্চে যাই। চার্চের বয়ান শেষে আমাদের দেখা, বেরোবার পথে তিনি বললেন, ‘তোমাকে দেখে আমি খুব খুশি হয়েছি। কিন্তু এরকম ফ্ল্যাট হিল জুতো আর কালো পাড়ের ধূসর জামা পরে চার্চে আসতে নেই। তুমি যদি ধূসরই পরো তবে এর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ পাড় তো লাগাবে, কালো কখনো নয়।’

কিন্তু আমার যে এটিই একমাত্র স্যুট, এ যুক্তিতে তার সাথে লড়াই করার মানে নেই।

মিস ক্রুফোর্ড বললেন, ‘তুমি কি আমার বাড়িতে আসতে চাও?’

আমি বললাম, ‘খুব চাই।’

সিদ্ধান্ত হলো আমার গাড়ি তাঁরটাকে অনুসরণ করবে। কী ঘটতে যাচ্ছে তা ভেবে আমি উদ্দীপিত হয়ে পড়ি। আমি নিশ্চিত অনুভব করলাম, তিনি নিশ্চয়ই বাড়ি গিয়ে তার পুরনো কিছু বল-গাউন আমাকে দিতে চাইবেন, এগুলো দেখে দেখে তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন।

তাঁর বাড়িটা বেশ সুন্দর ও জাঁকালো। মিস ক্রুফোর্ডের সাদা পশমি কুকুর আর চার সন্তানের সাথে লাঞ্চ সেরে নিলাম। খাবার পর মিস ক্রুফোর্ড আমাকে উপর তলায় তার রুমে আসতে বলেন।

তিনি বললেন, ‘বাদামি রঙে তোমাকে খুব ভালো দেখাবে। আমার সেলাইয়ের কাজগুলো তোমাকে অবশ্যই দেখতে হবে।’ বাদামি রঙের বিভিন্ন শেডের সেলাই করা পোশাক আমাকে দেখিয়ে ব্যাখ্যা করলেন কেন বাদামির বিভিন্ন সেডের কাপড় পরা দরকার।

মিস ক্রুফোর্ড ব্যাখ্যা করলেন, ‘ভালো করে পোশাক পরার মানে তুমি যা পরবে তা-ই সঠিক মানিয়ে যাবে। তোমার জুতো, মোজা, গ্লাভস, ব্যাগ-সবই পোশাকের সাথে মানিয়ে নিতে হবে। আমি এখন যা চাই তা হচ্ছে তুমি তোমার ওয়ারড্রবের সব পোশাকের একটি তালিকা করবে। আর তোমাকে কী সব জিনিসপত্র কিনতে হবে তার তালিকা করে দেব। আর তুমি যাতে ঠিক জিনিসটাই কিনতে পার আমি তার নির্দেশনা দিয়ে দেব।’

আমি তাঁকে কিছু বলিনি। লোকজন আমাকে কপর্দকহীন বলে বলুক, তাতে কিছু মনে করি না, এমনকি তাদের কাছে কিছু ডলার ঋণ চাইতেও আমার বাধে না। কিন্তু কোনো কারণে মিসেস ক্রুফোর্ডকে কিছু বলতে পারিনি, কারণ তিনি আমার ওয়ারড্রোব দেখেছেন, ভুল সাদা সেলাইয়ের জামা এবং বেমানান ধূসর স্যুট দেখেছেন।

আমি যখন ফিরে আসছি মিস ক্রুফোর্ড আমাকে আশ্বস্ত করে বললেন, ‘নিজেকে অশ্লীল দেখানো ঠেকানোর ব্যাপারটা তেমন কঠিন কাজ নয়। তোমার কাপড়চোপড়ের একটা তালিকা তৈরি করে দেখাও, কিভাবে এগোতে হবে আমি দেখিয়ে দেব। ফলাফল দেখে তুমি যেমন অবাক হবে, অন্যরাও তেমনি।’

মিস ক্রুফোর্ডকে বলেছিলাম, আবার আসব। এছাড়া তার সাথে কেন দেখা করতে গেলাম জানি না। হয়তো আমি তখনও আশা করছি তিনি তাঁর বাতিল হয়ে যাওয়া ক’টি বল-গাউন আমাকে দেবেন। আমার মনে হয় অভাবের কারণে যে সৌখিন  কাপড় কিনতে পারছি না, এই সত্যটিও তাকে বলতে চেয়েছি। আমি আগে যেমন করেছি তার সাথে ফালতু কথা বলতে শুরু করি। আমি কি ওয়াড্রোবের কাপড়ের তালিকা করতে শুরু করেছি? না, করিনি। আমি এমনই অলস, আমি জানি। ঠিক আছে কয়েকদিনের মধ্যেই তালিকা তৈরি করে আবার ফোন দেব।

মিস ক্রুফোর্ড বললেন, ‘বেশ তাহলে তোমার ফোনের প্রতীক্ষায় রইলাম। আমি তাঁকে আর ফোন দিইনি। এরপর তাঁকে পাই খবরের কাগজের পাতায় আরো এক বছর পর। আমি টুয়েন্টিয়েথ সেঞ্চুরি ফক্স-এর সাথে আবার কাজ করতে যাই। ততদিনে ম্যারিলিন মনরোর নামডাক ছড়াতে শুরু করেছে। আমি তখন সর্বত্রই, ম্যাগাজিনের চলচ্চিত্র কলামে। স্টুডিও ভক্তদের ট্রাকভর্তি চিঠি আসছে।

আমার ওপর একের পর এক সম্মান বর্ষিত হচ্ছে। তার মধ্যে একটি হচ্ছে অ্যাকাডেমির বার্ষিক উত্সবে একজন বিজয়ীর হাতে অস্কার তুলে দেওয়া। অ্যাকাডেমি পুরস্কার প্রদানের উত্সবে আমি ভয়ে অসাড় হয়ে আছি। আমি কম্পমান অবস্থায় প্ল্যাটফর্মের দিকে যাব এবং পুরস্কার তুলে দেব। আমি প্রার্থনা করছি আমার পা যেন মাটি আঁকড়ে ধরে না রাখে, আমি পড়ে না যাই আর দু’পঙক্তি বলার আছে, আমার কণ্ঠ যেন স্বর হারিয়ে না ফেলে। যখন আমার পালা এলো আমি ঠিকঠাকভাবেই প্ল্যাটফর্মে পৌঁছলাম, আমার যেটুকু বলার তা বলে কোনো ধরনের দুর্ঘটনা ছাড়াই আমার টেবিলে ফিরে আসি।

তখন অথবা তারপর জোয়ান ক্রুফোর্ডকে ফিরে পাই পরদিন সকালের খবরের কাগজে তাঁর মন্তব্যে। কাগজের ক্লিপিংগুলো আমি রাখিনি, কিন্তু তিনি কী বলেছিলেন তা মনে আছে। তিনি লিখেছেন, অ্যাকাডেমির অনুষ্ঠানে ম্যারিলিন মনরোর নিজেকে কুরুচিপূর্ণ উপস্থাপনা সমগ্র হলিউডকে কলুষিত করেছে। পবিত্র গ্রন্থ হাতে নিয়ে মঞ্চে যাবার সময় অত্যস্ত আটোসাঁটো পোশাক যার পশ্চাদ্দেশ কুঁচকানো, ম্যারিলিনের অশ্লীলতার পরিচয় দেয়। আমি বিস্মিত হই। যা পড়ছি তা বিশ্বাস করতে পারছি না। যারা অস্কার অনুষ্ঠানে আমাকে দেখেছেন, এমন ক’জনকে জিজ্ঞেস করি, তিনি যা লিখেছেন তা কি সত্য? তারা হেসে উড়িয়ে দিল। তাদের একজন বলল, বয়স্ক ভদ্রমহিলাকে ক্ষমা করে দাও। তিনি যখন তার যৌবনে তখন তিনিও যুবতী ছিলেন, সম্মান ছিল তার।

তার সাথে আমার দ্বন্দ্বের এই অংশটুকুর বিবরণ লিখলাম। এসব এমনই হয়ে থাকে- টিপিক্যাল। দ্বন্দ্বটি এমন কারো সাথে যাকে আমি রহস্যজনকভাবে আঘাত করেছিলাম। আসলে আমার টাইট পোশাক এবং পেছনে কুঁচকানোর ব্যাপারটা ছিল জোয়ান ক্রুফোর্ডের মনে। তখন তিনি নিশ্চয়ই আমার সম্পর্কে বড্ড বেশিরকম লেখালেখি পড়ছিলেন। কিংবা এমনও হতে পারে তিনি আমার ওপর খুব বিরক্ত ছিলেন, কারণ আমি কখনো তাকে আমার ওয়াড্রোবের পোশাকের তালিকা দিইনি।

 

ম্যারিলিন-কেনেডি অ্যাফেয়ার

১৯৫৪-র শেষভাগ থেকে শুরু করে ১৯৫৬-র ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ম্যারিলিন জনতার চোখ থেকে নিরুদ্দিষ্ট রইলেন। উদ্দেশ্য-ক্যালিফোর্নিয়ার ঝামেলাপূর্ণ জীবন থেকে পালিয়ে থাকা। সাময়িকভাবে কিছুদিন বন্ধুদের সাথে কানেকটিকাটে রইলেন তারপর নিউইয়র্কের একটি অ্যাপার্টমেন্টে। এটাই ছিল তার নিজের জীবনের ঘটনাগুলো তলিয়ে দেখার এবং নিজেকে পুনরাবিষ্কার করার একটি বড় সুযোগ।

স্টুডিওতে শুটিংয়ের চাপ থেকে বেরিয়ে এসে ম্যারিলিন ও তার বন্ধু মিল্টন গ্রিন ম্যারিলিন মনরো প্রোডাকশনস গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নিলেন। এই সিদ্ধান্তটি তখনকার যখন একঘেয়ে নির্বোধ স্বর্ণকেশির ভূমিকায় অভিনয় করার প্রস্তাব তিনি একটার পর একটা ফিরিয়ে দিচ্ছেন এবং নিজের তারকাজীবনে আরো গভীর ও চ্যালেঞ্জ নেওয়া চরিত্রে অভিনয় করতে ব্যাকুল হয়ে উঠেছেন।

স্ব-আরোপিত এই নির্জনবাসের দিনগুলোতে নাট্যকার আর্থার মিলারের সাথে ম্যারিলিন মনরোর সম্পর্ক আরো নিবিড় হয়ে ওঠে এবং ২৯ জুন ১৯৫৬ দুজন বিয়ে করেন। বিয়ের পরের সপ্তাহগুলো তাদের ইংল্যান্ডে কাটে। কিন্তু এই সুখ বড় স্বল্পস্থায়ী ছিল। দু’জনের মধ্যে ঝগড়া শুরু হয়ে যায়, মিলার এক পর্যায়ে বলে ফেলেন ম্যারিলিনও তার সাবেক স্ত্রীর মতোই, যাকে তিনি ঘৃণা করতেন।

সুখ ম্যারিলিনের জন্য আলেয়ার মতো হলেও খ্যাতির বেলায় কিন্তু তিনি সকলকে ছাড়িয়ে গেছেন। ম্যারিলিন টুয়েন্টিথ সেঞ্চুরি ফক্সের সাথে বিবাদ মিটিয়ে সমঝোতা করেন, পরের কয়েক বছরে ‘সামওয়ান লাইক ইট হট’ এবং ‘দ্য মিসফিডস’-এর মতো ব্লকবাস্টার ছবির নায়িকা হয়েছেন এবং দর্শকদের সম্মোহিত করে রেখেছেন। ম্যারিলিন মনরো প্রোডাকশন্স-এর ‘বাস স্টপ’ ‘দ্য প্রিন্স অ্যান্ড দ্য শো গার্ল’সহ আরো কয়েকটি ছবিতে অভিনয় করেন।

১৯৬০ থেকে ম্যারিলিনের জীবনের মোড় খারাপের দিকে ঘুরে গেল। একাধিক নার্ভাস ব্রেকডাউন, সন্তান ধরে রাখতে না পারায় কয়েকটি গর্ভপাত হলো, বিয়েতেও চিড় ধরল। তার নিজস্ব পৃথিবীটা ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।

যে মানসিক চাপ তার জীবন ও সুখকে প্রভাবিত করছে তিনি ঠিকভাবে সে চাপ সামাল দিতে পারলেন না। দেরি করে শুটিংয়ে আসা এবং এমনকি শুটিংয়ে না আসার কুখ্যাতি তাকে তাড়া করল। বিয়ের মতোই তার পেশাগত খ্যাতিতেও দুর্ভাগ্যের টান পড়ল। ১১ নভেম্বর ১৯৬০ আর্থার মিলার ও ম্যারিলিন নিজেদের বিয়ে বিচ্ছেদের ঘোষণা দিলেন। এরপর ক্রমেই তিনি পিছিয়ে পড়তে থাকলেন।

পরের দেড় বছর ম্যারিলিন মনরো পার্সোনালিটি ডিজ অর্ডারের একেবারে প্রান্তদেশে। চিকিত্সার জন্য মনস্তাত্ত্বিক ক্লিনিকে যাওয়া-আসা একটি নিত্যকার বিষয় হয়ে উঠেছে। তিনি অতিমাত্রায় বার্বিচুয়েট ও অ্যালকোহল সেবন করছেন—একসময় ইনসমনিয়া ঘুম না আসার রোগ ও আবেগময় যন্ত্রণা থেকে নিজেকে রক্ষা করতে ডাক্তারের পরামর্শে স্বল্পমাত্রায় এসব খেতে শুরু করেন। এ সময় ডাক্তার রালফ প্রিনসন নামের একজন সাইক্রিয়াট্রিস্টের সাথে পেশাগত সম্পর্কের বাইরে অস্বাভাবিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং সাধারণ মেডিক্যাল প্র্যাকটিসের বাইরে এসব ওষুধের ব্যবস্থাপত্র তাকে দিতে থাকেন। এ সময় শিল্পী ফ্রাঙ্ক সিনাত্রার সাথে বহুল প্রচারিত কিন্তু স্বল্পকালীন একটি প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠে। ম্যারেলিন ভেবেছিলেন তাদের বিয়ে হবে, কিন্তু তা হয়ে উঠেনি।

এ সময় বেশ ক’জন হাই প্রোফাইল ব্যক্তিত্বের সাথে ম্যারিলিনের সখ্য গড়ে উঠে। তাদের মধ্যে রয়েছে পিটার লফোর্ড ও তার স্ত্রী প্যাট্রিসিয়া কেনেডি। প্যাট্রেসিয়া কেনেডিদের বোন। আরো একজন প্যাট্রিসিয়া নির্ভকম্ব তার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু হয়ে ওঠেন। সবাই দলে বলে লফোর্ডের সৈকত ঘেঁষা বাড়িতে কিংবা কেনেডিদের বাড়িতে অনেক পার্টিতে অংশগ্রহণ করেছেন হলিউডের কেউকেটাদের সাথে তখন তার উঠাবসা, বড় কর্মকর্তা বিশেষ করে অ্যাটর্নি জেনারেল রবার্ট এফ কেনেডি এবং প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির সাথেও ডিনারের আমন্ত্রণ পাচ্ছেন।

ম্যারিলিন মনরো :দ্য এফ বি আই ফাইলস-এ টিম কোটস লিখেছেন ষাটের দশকের গোড়ার দিকের পার্টিগুলোতে কেনেডি তাদের সাথে ম্যারিলিনের রোমাঞ্চকর সূচনা। ম্যারিলিনের ঘনিষ্ঠজনদের মতে ম্যারিলিন একইসঙ্গে দুই ভাইয়ের সাথে সম্পর্ক চালিয়ে যাচ্ছিলেন, এমন দুজন সেলিব্রেটিকে সামাল দেবার মতো দক্ষতাও তার ছিল। পার্টিতে ববি ও জন-দুজনের সাথেই অন্তরঙ্গ অবস্থায় তাকে দেখা গেছে, তবে তার ঘনিষ্ঠতম একজন বন্ধুর মতে তিনি ভালোবাসতেন জন এফ কেনেডিকে। তখনই ম্যারিলিন সম্পর্কে এফ বি আই ফাইল ক্রমেই পুরু হতে থাকে। বিশেষ করে কেনেডি ভাইদের সাথে সম্পর্কের কারণে অপরাধীদের সংগঠন বিশেষ করে মাফিয়া তার ওপর দৃষ্টি রাখতে শুরু করে। ম্যারিলিন বুঝতে পারেননি তার মতো প্রায় বুভুক্ষু একজন নারীর পক্ষে বোঝার কথাও নয় তিনি কেমন ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের সাথে সম্পর্ক রক্ষা করছেন।

১৯৬২-তে ম্যারিলিন ক্যালিফোর্নিয়ার ব্রেন্টউডে ম্যাক্সিকান স্টাইল বাংলোতে উঠলেন। মনে করা হয় তিনি পরিকল্পিতভাবে এখানে এসেছেন, কারণ কাছেই কেনেডিদের বোন প্যাট্রিশিয়া এবং ডাক্তার গ্রিনসনের বাড়ি। একটিতে আকর্ষণ দুই কেনেডি আর ডাক্তার গ্রিনসন তার নিত্যকার প্রয়োজন-প্রতিদিন যেন তিনি তার বিষণ্নতা ও উদ্বেগের চিকিত্সা করতে পারেন। তিনি একাধিকবার ঘুমের ওষুধ প্রমাণ মাত্রার চেয়ে বেশি সেবন করেছেন। এর মধ্যে একবার পাম্প করে পাকস্থলি ওয়াশও করতে হয়েছে।

ম্যারিলিনের চিকিত্সা ডাক্তার গ্রিনসনের ফুলটাইম চাকরি হয়ে উঠল। তিনিও তার ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে উঠলেন। ডাক্তার ম্যারিলিনের জন্য আবাসিক সার্বক্ষণিক একজন সঙ্গী ইউনিস মারেকে নিয়োগ দিলেন। গ্রিনসন-ম্যারিলিন সম্পর্ক পেশাগত সম্পর্কের স্তর ছাড়িয়ে গেল। তিনি তত্কালীন প্রধান সেলিব্রেটিকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করলেন কেউ কেউ মনে করেন তার লক্ষ্য ছিল ম্যারিলিন মনরোর টাকার দিকে।

কেনেডি ভাইদের সাথে তার সম্পর্ক নিয়ে গ্রিনসন উদ্বিগ্ন ছিলেন। তিনি মনে করতেন এই সম্পর্কের চাপ ম্যারিলিনের জন্য মানসিকভাবে ক্ষতিকর হচ্ছে, শেষ পর্যন্ত তা ভয়ঙ্কর আত্মক্ষয়ী হয়ে উঠতে পারে। বছরের শুরুর দিকে কেনেডিদের সাথে সম্পর্ক তুঙ্গে। মনে করা হয় ববি তার প্রেমে পড়ে যায় এবং তার সাথে যৌনসম্পর্ক রক্ষা করে চলে। অন্যদিকে মনরোর মৃত্যুর বাইশ বছর পর লফোর্ডপত্নী কেনেডিদের বোন প্যাট্রিশিয়া জানান (অ্যান্থনি সামার্সের সাথে সাক্ষাত্কার) তাদের বাড়ির একটি শাওয়ারে জন এফ কেনেডি ও ম্যারিলিন কয়েকবার যৌনসম্পর্ক স্থাপন করেছেন। এমনকি ১৯৬২-র মার্চে ফ্লোরিডার পাম স্প্রিংসে এ দুজন একটি উইক এন্ডও কাটিয়েছেন। ১৯৬২-র মাঝামাঝি সময়ে কেনেডি তাকে একটি ব্যক্তিগত ফোন নম্বরও দিয়েছিলেন যাতে জাস্টিস ডিপার্টমেন্টের মাধ্যমে তাকে পেতে পারেন। এক পর্যায়ে ম্যারিলিন বিশ্বাস করতে শুরু করলেন জন এফ কেনেডি তার স্ত্রী জ্যাকুলিন কেনেডিকে তালাক দিয়ে তাকে বিয়ে করবেন। ম্যারিলিনের বন্ধু টেরি মুর জানান ‘ম্যারিলিন নিজেকে আগামীর ফার্স্টলেডিও ভাবতে শুরু করেছিলেন।’

১৯৬২-র এপ্রিলে ম্যারিলিন আবার পর্দায় ফিরে আসার প্রস্তুতি নিয়ে ‘সামথিঙ্গস গট টু গিভ’-এর শুটিংয়ে এলেন। ম্যাডিসন স্কোয়ার গার্ডেনে জন এফ কেনেডির জন্মদিনে উদ্ভাসিত ম্যারিলিন গাইলেন ‘হ্যাপি বার্থ ডে’। তার আগমন, পরিবেশন এবং কেনেডির মুগ্ধ দৃষ্টি চারদিকে প্রণয়ের বার্তা পাঠাতে শুরু করল। ‘এত মিষ্টি এবং এত পরিপূর্ণভাবে একটি গান উপহার দেবার জন্য প্রেসিডেন্ট তাকে ধন্যবাদ দিলেন। কেউ কেউ উল্লেখ করেছেন, প্রেসিডেন্ট ম্যারিলিনকে বলেছেন এ গানের পর প্রেসিডেন্টের পদ থেকে পদত্যাগ করা যায়। জবাবে ম্যারিলিন বললেন, আমার প্রথম স্বামী চায়নি আমি সিনেমায় থাকি।

ম্যারিলিন এর মধ্যে জ্যাকুলিনকে ফোন করেন এবং প্রেসিডেন্টের সাথে তার সম্পর্কের কথা জানান। জ্যাকুলিন শান্তভাবে জবাব দেন, তাহলে তো আমাকে বেরিয়ে তোমাকে স্থান করে দিতে হবে। জ্যাকুলিন কেনেডি (পরে ওনাসিস)-র জীবনীকার জানান প্লেবয় প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির সাথে বহু নারীর সম্পর্কের বিষয়টি জ্যাকুলিনের পুরোপুরি জানা ছিল, তবে ভয় পেতেন একমাত্র ম্যারিলিন মনরোকে।

জন এফ কেনেডি ও ম্যারিলিনের সম্পর্কের কাহিনি এতটাই জড়িয়ে পড়ে যে গোয়েন্দা সংস্থা হস্তক্ষেপ করে। ১৯৬২-র গ্রীষ্মে ম্যারিলিনকে জানিয়ে দেওয়া হয় তিনি ‘সিকিউরিটি রিস্ক’-নিরাপত্তার হুমকি। দুই কেনেডির সাথে যোগাযোগ রক্ষা করার প্রশ্নে তার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি হয়।

আকস্মিকভাবে একটি লালিত স্বপ্নের মৃত্যু ঘটে। ম্যারিলিনের হূদয় চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায়।

রোনাল্ড ওলফ লিখেছেন প্রেসিডেন্ট কেনেডি ফ্রাঙ্ক সিনাত্রার মাধ্যমে ক্যাল-নেভা লজে কোনো এক উইকএন্ডে ম্যারিলিনকে আনানোর চেষ্টা করেছিলেন। তার সাথে ম্যারিলিনের সম্পর্কের বিস্তারিত তথ্য যেন তিনি ফাঁস না করেন সে অনুরোধ জানাবেন। এটাও দেরি হয়ে যায়।

ম্যারিলিন মনরো ততদিন হলিউডের তারকা থেকে মহাকাশের তারকা হয়ে যান। পরের বছর জন এফ কেনেডিও। এবার নিরাপত্তা ঝুঁকি কে ছিলেন?

 

মেরিলিনের শেষ উইল

মাত্র ৩৫ বছর বয়সে কারো জীবনের শেষ উইল সম্পাদন করার কথা না। কিন্তু ম্যারিলিন তা-ই করেছেন।

নাট্যকার আর্থার মিলারের সাথে তালাক চূড়ান্ত হবার ১০ দিন আগে ১৪ জানুয়ারি ১৯৬১ ম্যারিলিন মনরো তার শেষ উইল ও টেস্টামেন্ট চূড়ান্ত করেন। উইলের সাক্ষী নিউ ইয়র্কের অ্যাটর্নি অ্যারন ফ্রস এবং লুইস হোয়াইট। এই উইলের বৈধতা নিয়ে ম্যারিলিনের বিজনেস ম্যানেজার ইনেজ মেলসন মামলা করেন কিন্তু ১৯৬২-র অক্টোবরে আদালত এটিকে বৈধ ঘোষণা করে।

উইলের সার-সংক্ষেপ :

১. ম্যারিলিনের সেবান বার্নিস মিরাকল ১০,০০০ ডলার পাবেন।

২. ম্যারিলিনের ব্যক্তিগত সচিব লে রিস ১০,০০০ ডলার পাবেন।

৩. ম্যারিলিনের বন্ধু নরম্যান ও হেড্ডা রোস্টেন পাবেন পাঁচ হাজার ডলার। যদি তারা ম্যারিলিনের আগে মারা যান তবে এই টাকা পড়াশোনার জন্য তাদের মেয়ে প্যাট্রিসিয়া রোস্টেন পাবে। 

৪. ম্যারিলিন মনরোর সকল ব্যক্তিগত জিনিসপত্র ও কাপড়-চোপড় তার গুরু ও অভিনয় প্রশিক্ষক লি স্টামবার্গের কাছে যাবে।

৫. ম্যারিলিনের মা গ্ল্যাডিস বেকারের কল্যাণের জন্য ১,০০০০০ ডলারের একটি ট্রাস্ট ফান্ড গঠন করা হবে। ম্যারিলিনের বন্ধু ও অভিনয় প্রশিক্ষক প্রয়াত মাইকেল শেখভের স্ত্রী জেনিয়া শেখভও এই ট্রাস্ট তহবিলের সুফল ভোগ করবেন। গ্ল্যাডিসকে প্রতিমাসে ৫,০০০ ডলার এবং জেনিয়াকে ২৫,০০ ডলার জীবনধারণ সহায়তা অর্থ প্রদান করা হবে। তাদের মৃত্যুর পর বাকি অর্থ ম্যারিলিন মনরো সাইকিয়াট্রিস্ট নিউইয়র্কের ডাক্তার মারিয়ান ক্রিস তার এবং অনুরূপ প্রতিষ্ঠানের কল্যাণে ব্যয় করবেন।

(মিসেস শেখভ ডিসেম্বর ১৯৭০ এবং গ্লাডিস বেকার মার্চ ১৯৮৪ পর্যন্ত জীবিত ছিলেন)।

৬. অবশিষ্ট সম্পত্তি এমনভাবে বণ্টন করা হবে যে তার একান্ত সচিব মে রিস অতিরিক্ত ৪০,০০০ ডলার পাবেন। অবশিষ্ট সম্পদের ২৫% ডাক্তার মারিয়ান ক্রিস সাইকিয়াট্রিক প্রতিষ্ঠানের জন্য পাবেন। তারপর যা অবশিষ্ট থাকবে তা চলে যাবে লি স্ট্রাসবার্গের কাছে।

গ্লাডিস বেকার ও জেনিয়া শেখভের জন্য গঠিত ট্রাস্টের বাস্তবায়নকারী ও ট্রাস্টি হবেন অ্যাটর্নি ভ্যারন ফ্রশ।

ডাক্তার মারিয়ান ক্রিস লন্ডনে আনা ক্লয়েভ সেন্টার স্থাপন করেন। উদ্দেশ্য ‘শিশু ও তরুণদের আবেগময় সুস্থতা রক্ষা—’ এখানে তার স্থাবর সম্পদের ২৫ ভাগ দেওয়া হয়।

৯. লি স্টামবার্গ ১৯৮২ সালে মারা যান। তিনি তার সম্পদের ৭৫ ভাগ স্ত্রী আনা স্ট্রামবার্গকে দিয়ে যান।

ম্যারিলিনের জমিতে ৫০ মিলিয়ন ডলার মূল্যমানের জন্য স্টেট অব ম্যারিলিন মনরো প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০১১-১২ সালে এই সম্পত্তির আয় ছিল ১৫ মিলিয়ন ডলার।

কাকতালীয় মনে হতে পারে—ম্যারিলিন কি তার আসন্ন মৃত্যুর কথা জানতেন? নতুবা এত কম বয়সে শেষ উইল কেন?

 

নগ্নতা যৌনতা নারীবাদ ও ম্যারিলিন মনরো

ক্যাথরিন হেপবার্নকে যেমন নারীবাদী হিসেবে তার পর্দার চরিত্রেই শনাক্ত করা যায়, অড্রে হেপবার্নকে ততটা নয়, ম্যারিলিন মনরোকে তো নয়ই।

এমন কি নারী সমালোচকরাও ম্যারিলিনের নিন্দা করেছেন—ম্যারিলিন পুরুষশাসিত পৃথিবীতে নিজেকে আরো পুরুষভোগ্য করে উপস্থাপন করেছেন। কিন্তু যে নারী তিনি হতে চেয়েছেন, নারীর জন্য যে বিশ্ব তিনি কল্পনা করেছেন তা কিন্তু তার সিনেমার পৃথিবীর নয়। 

নারী ও নারী জীবন নিয়ে তার কিছু স্মরণীয় বচন :

* আমার জীবনের সবচেয়ে ভালো একটি ঘটনা হচ্ছে আমি নারী। সব নারীরই এটা অনুভব করা উচিত।

* একটি মেয়েকে সঠিক মাপের জুতো দিন, সে বিশ্বজয় করতে পারবে।

* একটি স্মার্ট মেয়ে পরিতৃপ্ত হবার আগে নিজেই পরিত্যাগ করে চলে যায়।

* পুরুষ মানুষের পৃথিবীতে বসবাস করতে আমার আপত্তি নেই—যতক্ষণ না আমি আমার নারীসত্তা ধরে রাখতে পারি।

* নারীর জন্য কোনটা সবচেয়ে ভালো নারী তার নিজের সংজ্ঞা বা ইন্দ্রিয় দিয়েই তা বুঝতে পারে।

* বিয়ের আগে একজন পুরুষকে ধরে রাখার জন্য তার সাথে সঙ্গম করতে হয় আর বিয়ের পর তার সাথে সঙ্গম করার জন্য তাকে ধরে রাখতে হয়।

* যৌনতা হচ্ছে প্রকৃতির অংশ। আমি প্রকৃতির সাথে মিলে থাকি।

* আমি বিছানায় কি পরে থাকি? কেন, চ্যানেল ফাইভ (পারফিউম) অবশ্যই।

* যে নারী পুরুষের সমান হতে চায় তার উচ্চাকাঙ্ক্ষার ঘাটতি রয়েছে।

* সৌন্দর্য ও নারীত্ব—এগুলো যুগ যুগান্তরের কৌশলে এসব আবিষ্কার করা যায় না; কথাটা উত্পাদনকারীরা পছন্দ করবেন না, সত্যিকারের গ্ল্যামার কখনো উত্পাদন করা যায় না। এটা নির্ভর করে নারীত্বের ওপর।

* অনুভূতি প্রকাশের প্রশ্নে পুরুষ নারীর চেয়ে বেশি খোলামেলা এবং অকৃত্রিম। আমরা মেয়েরা, আমাকে বলতে হচ্ছে, আমাদের লুকোচুরির প্রবণতা রয়েছে।

* আমি অত্যন্ত নিশ্চিত আমি একজন নারী এবং আমি নারী হওয়াটা উপভোগ করি।

* তুমি যেমন পুরুষ মানুষের প্রবণতা ঠিক সেভাবেই তোমাকে গ্রহণ করা। কিন্তু নারী শুরু থেকেই তোমার দোষ খুঁজতে থাকবে এবং তোমাকে বদলাবার চেষ্টা করবে। 

* একজন সত্যিকারের সবল পুরুষের তো নারীর ওপর আধিপত্য দেখাবার প্রয়োজন নেই। তোমাকে ভালোবেসে যে নারী দুর্বল হয়ে আছে তার বিরুদ্ধে পুরুষের শক্তি বেমানান। সে তার শক্তি পৃথিবীকে বুঝিয়ে দিক।

* আমি মনে করি যৌনতা তখনই কেবল আকর্ষণীয় যখন তা স্বাভাবিক ও স্বতঃস্ফূর্ত।

* সেক্স সিম্বল একটা জিনিস। আমি কোনো জিনিস হওয়াটা ঘৃণা করি।

* শরীর তো দেখাবার জন্য, সবটা ঢেকে রাখার জন্য নয়।

* আসল সত্য হচ্ছে আমি কখনো কাউকে বোকা বানাইনি। তবে তারা যাতে নিজেদের বোকা বানাতে পারে সে সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছি।

* আমি বড় হবার সাথে সাথে আমার দর্শক বাড়ছে। আমি তো আর উনিশ বছরের মেয়ে নই— আমি যদি এখনো সেক্স আঁকড়ে পড়ে থাকি তাহলে পয়সা খরচ করে কে আমাকে দেখতে আসবে?

* গর্ব করার মতো আমার একটা বিষয় আছে—আমি কখনো কারো রক্ষিতা নারী ছিলাম না।

* আমার শরীর সমস্ত পৃথিবীকে দেখাতে চাই।

* আমি চাই না সবাই দেখুক আমি ঠিক কোথায় থাকি, আমার সোফা কিংবা ফায়ারপ্লেস দেখতে কেমন?

* আমি দেখেছি তুচ্ছ বিষয় পুরুষ মানুষকে বিরক্ত করে না, (নারীকে করে)।

* আমার বয়স যখন চৌদ্দ তখন থেকেই অন্য মেয়ে মানুষদের বিরক্ত করার মতো মেধা আমার ছিল।

* মেকআপ ও হাসির তলদেশে আমি একজন সাধারণ মেয়ে যে পৃথিবীতে অনেককিছু প্রত্যাশা করে।

* একটি মেয়েকে যার প্রয়োজন নেই, মেয়েটিরও তাকে প্রয়োজন নেই।

* একটি মেয়ে একটি ছেলের কাছে চায় যে সে প্রমাণ করুক সে আর সবার মতো নয়।

 

ম্যারিলিন মনরোর জীবন ও জীবনের কথা

ম্যারিলিন মনরোর নিজের জীবন ও জীবনের কথা

* আমি স্বার্থপর এবং খানিকটা নিরাপত্তাহীন। আমি ভুল করি, কিন্তু নিয়ন্ত্রণের বাইরে নই, কখনো নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিনই। কিন্তু তুমি যদি আমাকে তোমার সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় সামলাতে না পারো, তাহলে তুমি আমাকে আমার সর্বোত্তম অবস্থায় পাবার আশা করতে পারো না।

* অযথার্থতা সুন্দর, পাগলামিতে মেধার প্রকাশ—এটা বরং সম্পূর্ণ হাস্যকর ও সম্পূর্ণ একঘেয়ে হওয়ার চেয়ে অনেক বেশি ভালো।

* অন্য কাউকে নিয়ে অসুখী হবার চেয়ে নিজে নিজে অসুখী হওয়া বেশি ভালো।

* আমি যখন নিঃসঙ্গ আমি নিজেকে পুনরুদ্ধার করি।

* আমরা সবাই তারকা, আমাদের মিটিমিটি করে জ্বলার অধিকার আছে।

* কখনো কখনো কারো সাথে থাকাটাই যথেষ্ট। তাদের স্পর্শ করার প্রয়োজন নেই, এমনকি কথা বলারও। দু’জনের মধ্যে একটি অনুভূতির আদান-প্রদান হয়, আর তখন তুমি একা নও।

* আমি যখন ছোট ছিলাম কেউ কখনো বলেনি আমি সুন্দর। এমন কি সুন্দর না হলেও ছোট্ট মেয়েদের বলতে হবে তারা সুন্দর।

* আমি জানি না হাই হিল কে আবিষ্কার করেছে। সমস্ত নারী জাতির তার কাছে কৃতজ্ঞ থাকা উচিত।

* আতঙ্ক বোকামি, অনুতাপও তাই।

* হলিউড এমন একটি জায়গা যেখানে একটি চুম্বনের জন্য হাজার ডলার দেয় আর আত্মার জন্য মাত্র পঞ্চাশ সেন্ট। আমার জন্য সবচেয়ে চমত্কার ব্যাপার হচ্ছে ঘুমানো, তখন আমি অন্তত স্বপ্ন দেখতে পারি।

* আমি যদি সব আইন-কানুন মেনে চলতাম তাহলে কোথাও আসতে পারতাম না।

* ক্যারিয়ার যত চমত্কারই হোক শীতের রাতে একে তো আঁকড়ে ধরে থাকা যায় না।

* কুকুর কখনো কামড়ায় না, মানুষ কামড়ায়।

* যদি সত্যিই বন্ধু হয় তাহলে তুমি যেমন সে তোমাকে ঠিক সেভাবেই গ্রহণ করবে।

* খ্যাতি কখনো কাউকে পরিপূর্ণতা দেয় না কিঞ্চিত্ উষ্ণতা দেয় যার উষ্ণতা ক্ষণস্থায়ী।

* বেশি বুড়ো হয়ে যাবার আগে আমাদের বাঁচতে শেখা উচিত।

* কখনো কখনো আমি ভাবি বুড়ো বয়সটাকে এড়াতে যৌবনে মরে যাওয়াটাই ভালো, কিন্তু তাহলে তো জীবনটা পরিপূর্ণ হলো না—তাহলে কখনো নিজেকে পুরোপুরি জানা হবে না।

* কখনো আমার মনে হয় আমার গোটা জীবনটাই একটা বিশাল প্রত্যাখ্যান।

* আমি জানতাম আমি জনতার, আমার বিশ্বের, আমি মেধাবী কিংবা সুন্দর বলে নয়, আমি কিছুর কিংবা অন্য কারোর নই বলে।

* আমি যখন জীবন থেকেই দেখেছি যখন একজন অন্যজনকে সত্যিকারের ভালোবাসা দিতে পারে না, কারো স্ত্রী হবার কথা মনে হলে ভয়ঙ্কর আতঙ্কিত হই।

* আমি আবেগময় দ্বন্দ্বের শিকার। আমি যে মানুষ।

* কেউ একজন আমাকে জিজ্ঞেস করেছে, যদি হলিউড বিশেষজ্ঞদের শতকরা ৫০ ভাগ যদি বলে আমি মেধাহীন, আমার ছেড়ে দেওয়া উচিত, তাহলে আমি কী করব? তখন আমার যে উত্তর ছিল এখনো তাই : শতকরা একশ ভাগও যদি একথা বলে, তাহলে একশ ভাগই ভুল।

* তুমি যদি সারাজীবন ব্যবসায়ীদের সাথে প্রতিযোগিতা করে বেড়াও তাহলে তোমার কী থাকবে? ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট আর আলসার।

* পুরুষ মানুষ যখন তার স্ত্রীর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে থাকে তখনই তারা প্রেমিক হিসেবে সবচেয়ে ভালো।

* কোনোদিন আমি সন্তান পেতে চাই—যে ভালোবাসা আমি কখনো পাইনি, আমি সব তাদের দেব।

* আসলে আমার জনপ্রিয়তা সম্পূর্ণভাবে পৌরুষের প্রপঞ্চের সৃষ্টি।

* আমি স্বাভাবিক গড়পড়তা আমেরিকান শিশুদের চেয়ে ভিন্নভাবে লালিত হয়েছি, কারণ তারা সুখী হবে এ আশায় লালন করা হয়।

* আপনি যখন বিখ্যাত, আপনার সকল দুর্বলতাই অতিরঞ্জিতভাবে প্রকাশ করা হয়।

* আমি যদি বোকা স্বর্ণকেশি হতাম তাহলে আর্থার মিলার আমাকে বিয়ে করত না।

* আমি যদি তারকা হয়ে থাকি তাহলে মানুষ আমাকে তারকা বানিয়েছে।

* আমার কাজই হচ্ছে আমার একমাত্র ভিত্তি যার ওপর আমাকে দাঁড়াতে হবে। আরো খোলামেলাভাবে বললে, কোনো ভিত্তি ছাড়া আমার একটি উপরি কাঠামো রয়েছে, আমি এখন ভিত্তি গড়ার কাজ করছি।

ম্যারিলিন মনরোর ভালোবাসার কথা

 * আমি ভালো, কিন্তু আমি দেব শিশু নই, আমি পাপ করি কিন্তু আমি শয়তান নই। বিশাল পৃথিবীতে আমি একটি ছোট্ট মেয়ে ভালোবাসার জন্য কাউকে খোঁজার চেষ্টা করে যাচ্ছি।

* আমারও অনুভূতি আছে, আমি এখনো মানুষ। আমি ভালোবাসা পেতে চাই আমার নিজের জন্য আমার মেধার জন্য।

* সত্যিকারের প্রেমিক সে-ই যে কেবল তোমার মাথায় স্পর্শ করে, কিংবা চোখের দিকে তাকিয়ে কিংবা শূন্যের দিকে চেয়ে তোমার মধ্যে শিহরণ জাগাতে পারে।

* রোমাঞ্চ বিশেষজ্ঞরা বলেন সুখী বিবাহিত জীবনের জন্য আবেগময় ভালোবাসার চেয়েও বেশি কিছু চাই, দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের জন্য চাই পরস্পরের জন্য সত্যিকারের পছন্দ। আমার বইয়ে বন্ধুত্বের এটাই ভালো সঙ্গী।

* মনে আছে যখন আমি হাইস্কুলে পড়তাম বিভিন্ন উত্সবের সাথে মিলিয়ে পড়ার মতো ড্রেস আমার ছিল না। মেয়েরা ব্যাপারটা আমার দৃষ্টিতে আনে, কখনো হয়তো রূঢ়ভাবেই। কিন্তু ছেলেরা এসব নিয়ে মাথা ঘামাত না। আমার ওয়ারড্রবের আকারের কারণে নয়, ছেলেরা আমাকে পছন্দ করত বলেই তারা আমার বন্ধু।

* পুরুষমানুষ কেন ভালো বন্ধু হয় তার বড় কারণ তারা দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

* একজন নারী সেসব পুরুষকে ভালোবাসে তাদের জন্য পৃথক পৃথক ভালোবাসা নিয়ে আসতে পারে, তবে এ সংখ্যা খুব বেশি হলে চলবে না।

* যেসব পুরুষ মনে করে নারীর পূর্ব প্রণয় তাদের জন্য শরীর ভালোবাসা কমিয়ে দিয়েছে, তারা আহাম্মক ও দুর্বল।

* বিয়ে দুজন চমত্কার মানুষের সঙ্গে আমার সম্পর্ক নষ্ট করে দিয়েছে।

সত্যিই কি আত্মহত্যা?

সাংঘর্ষিক বক্তব্য : ৪ আগস্ট ১৯৬৯ শনিবার রাত ৭টা পনের মিনিটে তিনি জো ডিম্যাজ্জিও জুনিয়রের সাথে কথা বলেন। তখন তিনি উত্ফুল্ল ছিলেন। ঠিক আধঘণ্টা পর পিটার লফোর্ড যখন ফোন করলেন তখন তিনি ড্রাগের ঘোরে, বিড়বিড় করে যা বলেন তাকে আত্মহননের পূর্ণকথন বলে ধরে নেওয়া যায়। লফোর্ড আতঙ্কিত হয়ে তার বন্ধু মিল্ট ইবিনসকে ফোন করেন। মিল্ট ম্যারিলিন মনরোর অ্যাটর্নি মিল্ট রুডিনকে ফোন করে ম্যারিলিনের বাড়িতে ফোন করে সব ঠিকঠাক আছে কি-না জানাতে অনুরোধ করেন।

রুডিন বলেন তিনি সাড়ে আটটায় ফোন করে ম্যারিলিন কেমন আছেন তা চেক করার জন্য কেয়ারটেকার ইউনিসকে বলেন। ইউনিস তাকে জানান তিনি চেক করেছেন এবং ম্যারিলিন ঠিক আছেন। লফোর্ড সন্তুষ্ট না হয়ে রাত ১১টার দিকে তার বন্ধু জো নারকে ফোন করেন। তার বাড়ি থেকে ম্যারিলিনের বাড়ি খুব দূরে না হওয়ায় তিনি নিজে গিয়ে দেখে আসতে সম্মত হলেন— ম্যারিলিন অতিরিক্ত মাত্রার ওষুধ সেবন করেছেন কি-না? জো নার যখন তার বাড়ি থেকে বের হতে যাচ্ছেন তখন মিল্টন রুডিন তাকে যেতে নিষেধ করলেন এবং বললেন, ডাক্তার গ্রিনসন তাকে ঘুমের ওষুধ দিয়েছেন।

যে সময় পিটার লফোর্ডের মনে হয়েছে ম্যারিলিন অতিরিক্ত মাত্রার ওষুধ সেবন করেছেন ততক্ষণে আরো দু’জন বন্ধু ম্যারিলিনের সাথে ফোনে কথা বলেছেন।

‘দ্য অ্যাসাসিনেশন অব ম্যারিলিন মনরো’ গ্রন্থের গবেষক ও লেখক ডোনাল্ড এইচ ওলফের মতে ম্যারিলিন তার হেয়ার ড্রেসার সিডনি গিলারফের সাথেও কথা বলেছেন। এই হেয়ারড্রেসার দাবি করেছেন ম্যারিলিন তাকে বলেছেন যে, তিনি কেনেডিদের সম্পর্কে বিপজ্জনক গোপনীয় বিষয় জানেন। সেই সন্ধ্যায় তিনি আরো কিছু ফোন কল পান। ম্যারিলিনের খণ্ডকালীন প্রেমিক হোসে বোলানোসকে ফোন করেন।

বোলানোস দাবি করেছেন রাত সাড়ে ন’টার দিকে তিনি ম্যারিলিনের সাথে কথা বলেছেন এবং পৃথিবী কাঁপিয়ে দেবার মতো কিছু গোপন কথা ম্যারিলিনও তার কাছে প্রকাশ করেছেন। আলাপ চলাকালে দরজায় বিচলিত হবার মতো কোনো শব্দ শুনে তাকে কথা শেষ করার জন্য ঝুলিয়ে না রেখে ফোন রেখে দেন। তিনি আর ফোন করেননি।    

ওলফ লিখেছেন : রোববার সকাল সাড়ে ৫টা থেকে ৬টার মধ্যে যে লোকটি ম্যারিলিনকে মর্গে নিতে এসেছেন। তিনি হিসেব করে দেখেছেন রিগর মর্টিস (মৃত্যুজনিত কারণে শরীর শক্ত  হওয়া) অনুযায়ী রাত সাড়ে ৯টা থেকে রাত সাড়ে ১১টার মধ্যে ম্যারিলিনের মৃত্যু হয়েছে।

ইউনিস বলেছেন রাত তিনটার দিকে জেগে ওঠে দেখেছেন ম্যারিলিনের দরজার নিচ দিয়ে আলো আসছে, দরজা তালাবদ্ধ। তিনি ডাক্তার গ্রিনসনকে ডাকলেন। রাত ৩টা ৫০ মিনিটে ম্যারিলিনের ঘরে গিয়ে তাকে মৃত ঘোষণা করলেন।

ওলফের মতে ডিপ পাইল কার্পেটিংয়ের কারণে রুমের ভেতর থেকে দরজার নিচ দিয়ে আলো আসার ব্যাপারটি সম্পূর্ণ অসম্ভব। কাজেই ইউনিসের এই কথাটি বানোয়াট! অধিকন্তু দরজার কোনো ফাংশনাল লক না থাকায় তালাবদ্ধ থাকার বিষয়টিও সত্য নয়।

বাড়িতে সে রাতে ইউনিস এবং তার জামাতা নরমান জেফ্রিস ছিলেন। জেফ্রিস দাবি করেছেন রাত সাড়ে ৯টা থেকে দশটার মধ্যে তিনি রবার্ট কেনেডি এবং অপরিচিত অপর দুজনকে ম্যারিলিনের দরজা পর্যন্ত আসতে দেখেছেন। তারা তাকে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাবার নির্দেশ দেন। জেফ্রিসের কথা অনুযায়ী তিনি এক প্রতিবেশীর বাড়িতে চলে আসেন এবং তারা চলে না যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করেন। সাড়ে দশটায় ফিরে এসে জেফ্রিস দেখলেন ম্যারিলিন উপুড় হয়ে আছেন, নগ্ন, হাতে কিছু একটা ধরে আছেন, মনে হয় ফোন। জেফ্রিস বললেন, মনে হলো ম্যারিলিন মৃত। ইউনিস আগে অ্যাম্বুলেন্সের জন্য ফোন করে গ্রিনসনকে ডাকেন। জেফ্রিস দেখেছেন লফোর্ড এবং প্যাট্রিশিয়া নির্ভকম্ব এসে পৌঁছলেন এবং হতবাক হয়ে গেলেন।

সামার্স লিখেছেন কেম হান্টার নামে একজন অ্যাম্বুলেন্স ড্রাইভার বলেছেন অতিভোরে ম্যারিলিনের দেহ পাবার পরই তিনি আদেশ পেয়ে চলে আসেন। অ্যাম্বুলেন্স কোম্পানি প্রধান বলছেন, ম্যারিলিন জীবিত ছিলেন তবে কোমাতে। তাকে সান্তা মনিকা হাসপাতালে আনা হলে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তারপরই তার মরদেহ আবার বাড়িতে নিয়ে আসা হয়।

আরো একজনের বক্তব্যের সাথে জেফ্রিসের কথার কিছু মিল পাওয়া যায়, কিন্তু তা তদন্তে রেকর্ড করা হয়নি।

ম্যারিলিন মনরোর প্রতিবেশী এলিজাবেথ পোলার্ড বলেছেন, তার অপরিচিত দু’জন মানুষের সাথে তিনি রবার্ট কেনেডিকে ম্যারিলিনের বাড়ির দিকে যেতে দেখেছেন। তার সময়টি ভিন্ন সন্ধ্যা ৬টা থেকে ৭টার মধ্যে। অপরিচিত একজনের হাতে মেডিক্যাল ব্যাগ ছিল।

ডোনাল্ড ওলফের মতে পোলার্ডের কথা পুলিশ আদৌ আমলে নেয়নি। কিন্তু কেবল পোলার্ডই নয়, আরো অনেকেই দেখেছেন। পোলার্ড অন্যদের সাথে বাইরে কার্ড খেলছিলেন। সবাই রবার্ট কেনেডিকে চিনতে পেরেছেন।

সাংঘর্ষিক ময়না তদন্ত

ম্যারিলিন মনরোর শরীরে পাওয়া চেতনা নাশক ঘুমের ওষুধ, প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী কৌটার উপস্থিতি, শরীরে কোনো আঘাতের অনুপস্থিতি, তার আত্মহত্যার পূর্বচেষ্টা এবং ডাক্তার গ্রিনসনের মতামতের ওপর ভিত্তি করে করোনার কার্ফে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে ম্যারিলিন আত্মহত্যা করেছেন।

ওদিকে বিতর্কের বিষয় হচ্ছে তার পাকস্থলিতে কিংবা অন্ত্রনালীতে নেমবুটালের কোনো চিহ্নও পাওয়া যায়নি। নেমবুটাল হয়ে থাকলে এর হলুদ ক্যাপসুলের চিহ্ন পাবার কথা; তা তো পাওয়া যায় নি, এমনকি পাকস্থলিতে কোনো হলুদ রঙও না।

রক্ত পরীক্ষায় বলা হয়: ব্লাড কাউন্টে আট মিলিগ্রাম ক্লোরাল হাইড্রেট এবং সাড়ে চার মিলিগ্রাম নেমবুটান পাওয়া গেছে; কিন্তু লিভারে তেরো কিলোগ্রাম—অনেক বেশি মাত্রার নেমবুটাল। লিভারের তুলনায় রক্তে প্রাপ্ত নেমবুটালের অনুপাত থেকে মনে হয় ড্রাগ গ্রহণের পর অনেক ঘণ্টা তিনি বেঁচেছিলেন। সারাদিন বিপাকক্রিয়ার মধ্যদিয়ে তা লিভারে পৌঁছেছে, বার্বিচুয়েট গ্রহণ করা হয়েছে মিনিট নয় অনেক ঘণ্টা আগে— যা মৃত্যুকে প্রতিষ্ঠিত করে না। দুটো কারণে বার্বিচুয়েট ইনজেকশনের ধারণাটি প্রত্যাখ্যান করতে হয়। প্রথমত, অত্যন্ত নিবিড় পরীক্ষার পরও তার শরীরে সুঁই ফোটানোর কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি; দ্বিতীয়ত, ইনজেকশন নেওয়া হলে তাত্ক্ষণিক মৃত্যু ঘটত এবং শরীরে চিহ্ন থাকত।

যদি তিনি ড্রাগ মুখে সেবন না করে থাকেন যদি ইনজেকশন না নিয়ে থাকেন, তাহলে আত্মহত্যার জন্য পায়ুপথে প্রবিষ্ট করানোর ধারণাটি অবশ্যই হাস্যকর মনে হয়।

ম্যারিলিন মনরোর মৃত্যুর তদন্তে অনেক বিষয় বিবেচনায় আনা হয়নি, তাড়াহুড়া করে তদন্ত গুটিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ অনুযায়ী প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে বলে মনে করা হয়।

ম্যারিলিন মনরোর মৃত্যুতত্ত্ব

তিনটি তত্ত্ব সামনে রেখে ম্যারিলিন গবেষকরা সামনে এগিয়েছেন : আত্মহত্যা তত্ত্ব, দুর্ঘটনা তত্ত্ব, হত্যা তত্ত্ব।

আত্মহত্যার তত্ত্ব : এটিই হচ্ছে ম্যারিলিন মনরোর জীবনের শেষ অধ্যায়ের দাপ্তরিক উপসংহার। এমনিতেই তিনি মানসিক রোগের জন্য সার্বক্ষণিক চিকিত্সাধীন ছিলেন। তার মা গ্ল্যাডিস মর্টেনসনকে পাগলাগারদেই থাকতে হয়েছে, নানাকেও, মামা আত্মহত্যা করেছে। মুভ সুইং—মানসিক অবস্থার দ্রুত পরিবর্তন তাকে আত্মহত্যায় প্ররোচিত করেছে। তা ছাড়া আগেও অনেকবার ঘুমের ওষুধের ওভারডোজ গ্রহণ করেছেন। একবার পাম্প করে পাকস্থলি ধুয়ে তাকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচানো হয়েছে।

এই তত্ত্বের দুর্বলতা হচ্ছে ফরেনসিক সাক্ষ্যে পরস্পর বিরোধী বক্তব্য পাওয়া গেছে। যেহেতু সে সময় সাবেক স্বামী জো ডিম্যাজ্জিও-র সাথে আবার বিয়ের কথা হচ্ছিল, তিনি সেজন্য উত্ফুল্লই ছিলেন। মৃত্যুর জন্য মরিয়া হয়ে উঠবেন এমন কোনো পরিস্থিতি তার তখন ছিল না।

দুর্ঘটনা তত্ত্ব : হতে পারে ভুলবশত তিনি অধিক পরিমাণ নেমবুটাল সেবন করেছেন। প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষা ও দেহে আপ্ত নেমবুটাল এবং এর প্রতিক্রিয়াকাল দুর্ঘটনা তত্ত্বকে সমর্থন করে না।

হত্যা তত্ত্ব : সিআইএ, এফবিআই কিংবা রবার্ট কেনেডি ও দুজন হোয়াইট হাউসকে কেলেঙ্কারি মুক্ত রাখতে তাকে হত্যা করেছে। হত্যা তত্ত্বেই যুক্তি প্রবল।

দাপ্তরিক প্রতিবেদনে আত্মহত্যা বলা হলেও এখনো ম্যারিলিন ভক্তরা মনে করেন তাদের সুন্দরতম নারী ক্ষমতাসীনদের হত্যাকাণ্ডের শিকার। ম্যারিলিন মনরো হয়ে উঠাই তার মৃত্যুর কারণ।

“আমি কখনো ম্যারিলিন হতে চাইনি’ ম্যারিলিন হচ্ছে নোরমা জিনকে ঢেকে রাখা একটি অবগুণ্ঠন যা আমি পরে আছি।

জবাবদিহি : এই রচনাটির উল্লেখযোগ্য অংশই অনূদিত। অনেক লেখকের রচনা থেকে তা অনুবাদ করা হয়েছে। আপাতত সূত্র উল্লেখিত হয়নি, গ্রন্থ প্রকাশের সময় তা করা হবে। d

 

 

 

 

 

 

 

 

এই পাতার আরো খবর -
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
২১ জুন, ২০১৮ ইং
ফজর৩:৪৩
যোহর১২:০০
আসর৪:৪০
মাগরিব৬:৫১
এশা৮:১৬
সূর্যোদয় - ৫:১১সূর্যাস্ত - ০৬:৪৬
পড়ুন