ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২১ মার্চ ২০১৯, ৭ চৈত্র ১৪২৫
২৩ °সে

ইসলামে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার অধিকার

ইসলামে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার অধিকার

বিশ্বশান্তি ও সম্প্রীতির ধর্ম ইসলামে শাসকদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যেন কোনো অবস্থাতেই রাষ্ট্রের সংখ্যালঘু অমুসলিম নাগরিকদের জানমালের নিরাপত্তা লাভের অধিকার বিঘ্নিত না হয়। কেননা সংখ্যালঘু অমুসলিমদের জানমাল মুসলমানদের নিজের জানমালের মতো পবিত্র আমানত ও নিরাপত্তাযোগ্য। তাছাড়া বিভিন্ন ধর্ম ও সমপ্র্রদায়ের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠা না করলে এবং জনগোষ্ঠীর মধ্যে সমপ্র্রীতি ও ভ্রাতৃত্ববোধ সৃষ্টি না হলে জনগণের সার্বিক কল্যাণ সাধিত হওয়া সম্ভব নয়। তাই মদিনা সনদে যে উন্মাহর কথা বলা হয়েছে তা শুধু মুসলমান সমন্বয়ে সংগঠিত নয়, বরং তা সর্বধর্মের সমন্বয়ে গঠিত। সনদের ২৬ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘বনু আউফের ইহুদিরা মুমিনদের সঙ্গে একই উম্মাহ। ইহুদিদের জন্য তাদের ধর্ম আর মুসলমানদের জন্য তাদের ধর্ম, তাদের মাওয়ালী বা আশ্রিত এবং তারা নিজেরাও। অবশ্য যে অন্যায় বা অপরাধ করবে সে নিজের এবং তার পরিবার-পরিজনের ক্ষতিই করবে।’ যেমনভাবে মহানবী (স) কে উদ্দেশ করে পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘(বলুন!) তোমাদের ধর্ম তোমাদের এবং আমার ধর্ম আমার।’ (সূরা আল-কাফিরূন, আয়াত:৭)

মদিনা সনদে মহানবী (স) ইহুদি ও খ্রিস্টানদের সঙ্গে যে মৈত্রী চুক্তি স্বাক্ষর করেন এর মূল বিষয়বস্তু ছিল যথাক্রমে: ১. অমুসলিমরা শত্রু কর্তৃক আক্রান্ত হলে মুসলমানেরা তাদেরকে রক্ষা করবেন। ২. তাদেরকে ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করা হবে না। ৩. তাদেরকে সকল প্রকার নিরাপত্তা দেওয়া হবে। ৪. তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য, সম্পত্তি ও অধিকারের নিরাপত্তা প্রদান করা হবে। ৫. তাদের ধর্ম, ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও গির্জা বা উপাসনালয়ের কোনো ক্ষতি করা হবে না। ৬. তাদের কোনো অধিকার ক্ষুণ্ন করা হবে না। ৭. তাদের বিরুদ্ধে সামরিক বাহিনী প্রেরণ করা হবে না। ৮. ধর্মীয় ও বিচার ব্যবস্থায় তাদের সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হবে।

নবী করিম (স)-এর সঙ্গে অমুসলিম পৌত্তলিক, ইহুদি ও খ্রিস্টানরা গোপনে বা প্রকাশ্যে শত্রুতা ও বিরোধিতা করতে শুরু করলেও তিনি অসহিষ্ণুতা প্রদর্শন করেননি। ইসলাম প্রচার করতে গিয়ে তায়েফবাসীর প্রস্তরের আঘাতে নিজের গায়ের রক্ত ঝরালেন, উহুদের ময়দানে নিজের দাঁত মোবারক শহীদ হলো; কিন্তু তিনি ক্ষোভ প্রকাশ বা অভিশাপ না দিয়ে স্বজাতিকে মাফ করে দিলেন এবং তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করলেন। যে বিধর্মী মক্কাবাসী একদা তাঁকে বিভিন্ন দিক দিয়ে নির্মম নির্যাতন করে মদিনায় হিজরত করতে বাধ্য করেছিল, মক্কা বিজয়ের পর তিনি সবার প্রতি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছিলেন। তাঁর সমগ্র জীবন জুড়ে এমন অতুলনীয় ক্ষমা ও মহানুভবতার উদাহরণ ভরপুর। তিনি কখনো অমুসলিমদের সঙ্গে অসদাচরণ করেননি, বরং তাঁর সদ্ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে বহু অমুসলিম ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন।

তাই অমুসলিমদের সঙ্গে অসদাচরণ, সংখ্যালঘু সমপ্রদায়ের ওপর হামলা-নির্যাতন, ঘর-বাড়িতে অগ্নিসংযোগ, জানমালের নিরাপত্তা বিনষ্টকরণ এবং সামাজিক দুর্বৃত্তায়ন, মানবিক বিপর্যয় ও অনিষ্ট সাধনকে সমাজে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিহত করা দরকার। রাসূলুল্লাহ (স) মুসলমানদের সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ যদি কোনো অমুসলিমের প্রতি অন্যায় করে, তবে আমি কিয়ামতের দিন সেই মুসলমানের বিরুদ্ধে সাক্ষী হব।’ (আবু দাউদ)। সুতরাং কোনো ধরনের সংঘাত, উগ্রতা বা সহিংসতা নয় সমঝোতা, সাম্প্রদায়িকতা নয় সহমর্মিতা, যুদ্ধ নয় শান্তি, শত্রুতা নয় বন্ধুত্ব, পরশ্রীকাতরতা নয় ভ্রাতৃত্ব, জবরদস্তি নয় ন্যায়পরায়ণতা, অমঙ্গল কামনা নয় সমবেদনা, অনিষ্ট বা ক্ষতিসাধন নয় পারস্পরিক কল্যাণকামিতা এবং হিংস্রতা ও বর্বরতা নয় সদাচরণ ও মানবতা; অন্যান্য ধর্মের প্রতি ইসলামের এহেন উদারতার প্রকৃত মর্মবাণী সর্বত্র প্রতিফলিত হোক!

lলেখক : প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, ইনস্টিটিউট অব ল্যাংগুয়েজ স্টাডিজ। প্রফেসর ও এডভাইজার, ইসলামিক স্টাডিজ ও ইসলামের ইতিহাস বিভাগ, ইউনিভার্সিটি অব কুমিল্লা। সাবেক পরিচালক, এশিয়ান ইনস্টিটিউট, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
২১ মার্চ, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন