সামরিক শাসন জারি করতে চেয়েছিলেন জেনারেল মঈন
রাষ্ট্রপতির সাবেক উপদেষ্টা মোখলেসুর রহমানের সাক্ষাত্কার
লন্ডন প্রতিনিধি৩০ নভেম্বর, ২০১৪ ইং
সাবেক রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমেদের উপদেষ্টা এম মোখলেসুর রহমান চৌধুরী বলেছেন, ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর লগি-বৈঠার যে তাণ্ডব হয়েছিলো সেটি ছিলো তত্কালীন সেনাপ্রধান জেনারেল মঈন উ আহমেদের পূর্ব পরিকল্পনা। ওই তাণ্ডবে রাজনৈতিক শক্তির পাশাপাশি অরাজনৈতিক শক্তিও যোগ দিয়েছিলো। মঈন উ আহমেদের একটিই উদ্দেশ্য ছিলো—দেশে একটি পরিস্থিতি তৈরি করে সামরিক শাসন জারি করা। একইসঙ্গে রাষ্ট্রপতিও হতে চেয়েছিলেন তিনি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং জাতিসংঘের কঠোর আপত্তির কারণে সামরিক শাসন জারি করতে ব্যর্থ হন মঈন। পরে তিনি জরুরি অবস্থা জারি করিয়ে কৌশলে সকল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা তার নিয়ন্ত্রণে নেন। মঈন ছিলেন ধূর্ত ও উচ্চভিলাষী। ক্ষমতা দখলের বাসনা ছিলো তার দীর্ঘকালের। দুই রাজনৈতিক দলের কলহের সুযোগেই তিনি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ তার হাতে রাখতে পেরেছিলেন। ইত্তেফাকের লন্ডন প্রতিনিধিকে দেয়া সাক্ষাত্কারে এসব কথা বলেন এম মোখলেসুর রহমান চৌধুরী।

২০০৬ সালের ২৯ অক্টোবর গঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আগে রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব ছিলেন মোখলেসুর রহমান চৌধুরী। ২৯ অক্টোবর তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের পর তাকে প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় রাষ্ট্রপতির উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। তত্কালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে বিভিন্ন ঘটনার প্রত্যক্ষ সাক্ষী তিনি। মোখলেসুর রহমান চৌধুরী বর্তমানে যুক্তরাজ্যে বসবাস করছেন। লন্ডনে ইত্তেফাককে দেয়া সাক্ষাত্কারে তিনি প্রকাশ করেছেন সেই সময়ের অনেক অজানা তথ্য।

ইত্তেফাক: ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর বাংলাদেশের রাজনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিন। সেদিন ঢাকার রাজপথে প্রকাশ্যে পিটিয়ে মানুষ হত্যা করা হয়েছিলো। সেটি কি পূর্ব পরিকল্পিত ছিল?

মোখলেসুর রহমান চৌধুরী: লগি-বৈঠার তাণ্ডব অবশ্যই পূর্ব পরিকল্পিত ছিল। সেদিন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে রাজপথের কর্মসূচিতে রাজনৈতিক শক্তির পাশাপাশি অরাজনৈতিক শক্তিও যোগ দিয়েছিল। রাজনীতির বাইরে একটি অপশক্তি সেদিন ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের মত ক্ষমতা দখলের জন্য ওত্ পেতে ছিল। সে অনুযায়ী তাদের পক্ষ থেকে ক্ষমতা দখলের নিমিত্তে নিয়ে রাখা হয়েছিল অনেক প্রস্তুতি। তত্কালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুত্ফুজ্জামান বাবর এবং পুলিশের মহাপরিদর্শক আনোয়ারুল ইকবাল যিনি সেনা প্রধান লে. জেনারেল মঈন উ আহমেদের বেয়াইও বটে, তাদের যোগসাজশে ২৮ অক্টোবর রাতে লগি-বৈঠার ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ প্রত্যাহার করে নেয়া হয়েছিল। এই ঘটনাস্থলকে পরবর্তী সময়ে যাতে সেনা প্রধানের ক্ষমতা দখলের ব্যাকগ্রাউন্ড হিসাবে ব্যবহার করা যায়, সেই জন্যই এটি করা হয়েছিল। ২৮ অক্টোবর লগি-বৈঠার পর ব্যাপকভাবে সেনা প্রধানের দৃশ্যমান ষড়যন্ত্র আঙ্গুল দিয়ে দেখানোর পরও সংশ্লিষ্ট উচ্চ পর্যায় থেকে তার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহনের উদ্যোগ নেয়া হয়নি। 

ইত্তেফাক: অরাজনৈতিক শক্তি বলতে আপনি কাদের বোঝাতে চাচ্ছেন?

মোখলেসুর রহমান চৌধুরী:তত্কালীন সেনাপ্রধান জেনারেল মঈন উ আহমদ ক্ষমতা দখলের জন্য ২০০৫ সাল থেকে গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলেন। বলতে গেলে ওই লগি-বৈঠার তাণ্ডব ছিল তার ষড়যন্ত্রের চূড়ান্ত পরিণতি। তিনি এমন-ই একটি ক্ষণের অপেক্ষায় ছিলেন। নির্দেশিত হয়ে সেদিন লগি-বৈঠার তাণ্ডবে গোয়েন্দা সংস্থা অংশ নিয়েছিল। রাজপথে পিটিয়ে হত্যাকাণ্ডের পর লাশের উপর নৃত্যের ছবি তোলার জন্য আগে থেকেই প্রস্তুুত ছিল ওই গোয়েন্দা সংস্থার ক্যামেরা ইউনিট। ওই চিত্র বিশ্বব্যাপি বাজারজাত করার জন্য তাদের একটি ইউনিট কাজ করেছে। যাতে পরদিন ২৯ অক্টোবর জরুরি অবস্থা জারির ষড়যন্ত্র চূড়ান্ত রূপ দেয়া যায়। সেই দিনই ক্ষমতা দখলের সকল আয়োজন ছিল জেনারেল মঈনের। বিদায়ী চারদলীয় জোট সরকারের মাধ্যমে জরুরি অবস্থা জারি করিয়ে ক্ষমতা দখল করতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু তার সেই পরিকল্পনা বঙ্গভবনের সতর্ক পদক্ষেপের কারণে সেদিন ভণ্ডুল হয়ে যায়। ২৯ অক্টোবর ক্ষমতা হাত করতে না পেরে জেনারেল মঈন চরম আশাহত হয়েছিলেন, তবে হাল ছাড়েননি।

ইত্তেফাক: আপনি বলছেন বিদায়ী সরকারের মাধ্যমে জরুরি অবস্থা জারি করে ক্ষমতা দখল করতে চেয়েছিলেন মঈন। আরেকটু পরিস্কার করবেন কি?

মোখলেসুর রহমান চৌধুরী: দেখেন, ২৮ অক্টোবর লগি-বৈঠার তাণ্ডবের পর সবার মধ্যে উত্কণ্ঠা বেড়ে যায়। সেদিন সেনাপ্রধান নিজের ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে বিদায়ী প্রধানমন্ত্রীর অফিসে অবস্থান করে জরুরি অবস্থা জারির সকল কার্যক্রম সম্পন্ন করেন। তিনি ফন্দি করেছিলেন বিদায়ী সরকারের মাধ্যমে জরুরি অবস্থা জারি করে ক্ষমতা দখল করবেন। ওই সময় তত্কালীন বিদায় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুত্ফুজ্জামান বাবর, বিদায়ী প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী এ ব্যাপারে খুবই সক্রিয় ছিলেন। বিদায়ী আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, বিদায়ী প্রধানমন্ত্রীর আইন বিচার ও সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টা সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী বিষয়টি পুরোপুরি উপলব্ধি না করে এ কাজে অংশ নিয়েছিলেন। তারাও সেদিন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ছিলেন সারাদিন। জরুরি অবস্থা জারির প্রস্তুুতি হিসাবে প্রয়োজনীয় বিধিমালা তৈরি করতে তলব করা হয়েছিল সাবেক আইন সচিব বিচারপতি আবদুল কুদ্দুস চৌধুরীকে। যিনি বাংলাদেশের সকল আমলের ‘কালাকানুন সেক্রেটারি’ হিসাবে সুপরিচিত। তাকে ২৮ ও ২৯ অক্টোবর বিদায়ী প্রধানমন্ত্রীর দফতরে এনে জরুরি অবস্থা জারির সকল আইন কানুন ও বিধিমালা তৈরি করা হয়। কিন্তু তখন জরুরি অবস্থা জারি করা সম্ভব হয়নি বঙ্গ ভবনের সতর্ক পদক্ষেপের কারণে। বঙ্গভবন থেকে আমরা জরুরি অবস্থা জারি করতে বিদায়ী সরকারকে বারন করি । মঈন উ আহমদের চক্রান্ত ছিল চার দলীয় জোট সরকারকে ব্যবহার করে ক্ষমতা দখলা করা। যাতে বলতে পারেন তিনি জরুরি অবস্থা জারি বা ক্ষমতা দখল করেননি। বিদায়ী সরকার তার উপর এই দায়িত্ব অর্পন করেছে। জেনারেল মঈন সেদিন প্রধানমন্ত্রীর দফতরে উপস্থিত থেকে জরুরি অবস্থা জারি শুধু নয়, সেনা বাহিনীর ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার চেয়েছিলেন জোরালোভাবে। জরুরি অবস্থা জারির জন্য প্রস্তুত করা নথিপত্রও সে অনুযায়ী তৈরি হয়েছিল।

ইত্তেফাক: মঈন উ আহমদ সব সময় দাবি করছেন তিনি কখনো ক্ষমতা দখল করতে চাননি। চাইলে সামরিক শাসন জারি করার সুযোগ ছিল।

মোখলেসুর রহমান চৌধুরী: এ কথা বলে তিনি মানুষকে ধোকা দিতে চান। তিনি অত্যন্ত চতুর প্রকৃতির লোক। তিনি ক্ষমতা দখলের জন্য তিন ধরনের পরিকল্পনা করেছিলেন। এই কৌশলের মধ্যে ছিল ইমিডিয়েট, শর্ট টার্ম ও লংটার্ম পরিকল্পনা। এছাড়া তিনি সামরিক শাসন জারি করার প্রস্তুতিও নিয়েছিলেন। বঙ্গভবন আগেই বিষয়টি জেনে যায়। ফলে পাল্টা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল।

ইত্তেফাক: সামরিক শাসন জারির পরিকল্পনা ও বঙ্গভবনের পক্ষ থেকে তা ঠেকানো প্রসঙ্গে একটু বিস্তারিত বলবেন কি?

মোখলেসুর রহমান চৌধুরী: ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি জরুরি অবস্থা জারির আগে মঈন উ আহমদ সামরিক শাসন জারি করতে প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। ৭ জানুয়ারি থেকে ১২ জানুয়ারির মধ্যে তিনি ক্ষমতা দখল করবেন এ বিষয়ে নানা আশঙ্কার কথা আমাদের কানে ছিল। এরই মাঝে এমন একটি পরিকল্পনার বিষয়ে কাউন্টার ইন্টেলিজেন্সও বঙ্গভবনকে অবহিত করে। বিষয়টি সঙ্গে সঙ্গে শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্বকে অবহিত করা হয়েছিল। তারা সেদিন অবিশ্বাস করেই হোক আর অন্য যে কোন কারণেই হোক কোন দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেননি। তবে বঙ্গভবনের কূটনৈতিক তত্পরতায় মইনের সে অপচেষ্টা ভণ্ডুল হয়ে যায়। ৭ এবং ৮ জানুয়ারি দুটি প্রভাশালী দেশের রাষ্ট্রদূত মঈন উ আহমদের সাথে দেখা করে সেদিন হুশিয়ার করে দিয়েছিলেন। তাকে সতর্ক করে বলা হয়েছিল সামরিক আইন জারি করা হলে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী মিশন থেকে সকল সৈন্য প্রত্যাহার করা হবে। বাংলাদেশের বিরুদ্ধে আরোপ করা হবে আন্তর্জাতিক অবরোধ। এছাড়াও বলা হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রসহ মিত্রদের সমর্থন থাকবে না সামরিক সরকারের প্রতি। এরপর-ই সামরিক শাসন জারির প্রক্রিয়া থেকে সরে যান মঈন উ আহমদ। সামরিক শাসন জারির উদ্যোগ থেকে সরে এসে ১১ জানুয়ারি জরুরি অবস্থা জারির পদক্ষেপ নেন তিনি। এতে সাকসেসফুল হন। সেদিন রাজনৈতিক নেতৃত্বের তাত্ক্ষনিক সিদ্ধান্ত পাওয়া গেলে এবং প্রেসিডেন্টের সামরিক সচিব বিশ্বসঘাতকতা না করলে সেটিও প্রতিহত করা সম্ভব ছিল।

ইত্তেফাক: মঈন উ আহমদ একা এই ষড়যন্ত্র করছিলেন? নাকি তার সাথে আরো কোন শক্তি ছিল?

মোখলেসুর রহমান চৌধুরী: তার এসব পরিকল্পনায় রাজনৈতিক শক্তির সমর্থন অবশ্যই ছিল। পাশাপাশি একটি দেশেরও সক্রিয় সমর্থন ছিল। জেনারেল মঈনের সামরিক শাসন ঠেকাতে বঙ্গভবনের পক্ষ থেকে তখন দফায় দফায় তত্কালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত বিউটেনিসের সাথে বৈঠক করি। শুধু তাই নয় জাতিসংঘের আন্ডার সেক্রেটরি নিকোলাস বার্নস মোবাইলে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তখন গণতন্ত্র এবং সংবিধানের বিরুদ্ধে মঈনের সকল ষড়যন্ত্রের বিষয়ে অবহিত করার চেষ্টা করি। এমনকি জাতিসংঘের তত্কালীন মহাসচিব কফি আনানের সাথেও তখন যোগাযোগ করা হয় বঙ্গভবনের পক্ষ থেকে। উদ্দেশ্য ছিল একটাই জেনারেল মঈনের সামরিক শাসন জারির উদ্যোগ প্রতিহত করা। তারাও সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। তবে বিতর্কিত ভূমিকায় ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ইউএনডিপি’র কান্ট্রি রিপেজেন্টেটিভ ও ঢাকায় জাতিসংঘের সমন্বয়কারী রেনাটা লক ডেসানিয়েল। তার একটি বিতর্কিত চিঠির সূত্র ধরে শেষ পর্যন্ত মঈন উ আহমদ জরুরি অবস্থার নামে ক্ষমতা নিজের আয়ত্বে নেন। তার এই কাজে সক্রিয় সহযোগিতা করেছেন চার দলীয় জোট সরকারের নিয়োগ করা জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ড. ইফতেখার আহমদ চৌধুরী। মঈন ২০০৫ সাল থেকেই তার পরিকল্পনা অনুযায়ী কার্যক্রম শুরু করেছিলেন। এক হাজার লোকের তালিকা তৈরি করা হয়েছিল। তার ভাষায় তারা হলেন দুর্নীতিবাজ, সন্ত্রাসী এবং গডফাদার। এই তালিকায় ছিলেন দুই বড় রাজনৈতিক দলের নেতা, সাবেক মন্ত্রী, সাবেক ও বর্তমান সচিব, সাংবাদিক, আইনজীবী, ব্যবসায়ী, শিল্পপতিসহ বিভিন্ন শ্রেনী পেশার মানুষ। এই তালিকায় একশ সাংবাদিকও ছিলেন। যাদের ব্যাংক একাউন্টে কোটি কোটি টাকা লেন-দেনের প্রমাণ তাদের হাতে ছিল। সেনা প্রধান হিসাবে মঈন উ আহমদ প্রায়ই ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তাদের সাথে আলাপকালে বলতেন, ‘এভাবে দেশ চলতে পারে না। দেশে একজন মাহাথির দরকার।’ তিনি একদিকে চার দলীয় জোট সরকারকে ব্যবহার করে ক্ষমতা দখলের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলেন। আরেক দিকে তত্কালীন সরকারের ঊর্ধ্বতন মহলের সামনে ‘আমাদের জাতীয়তাবাদী সরকার, আমাদের জাতীয়তাবাদী দল’ ইত্যাদি বলতেন। বোঝাতে চাইতেন তিনি খুবই অনুগত। এমনকি সাবেক রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে কখনো বঙ্গবন্ধু বলতেন না। অথচ জরুরি অবস্থা জারির পর তিনি নিজেই প্রথম সুযোগে ৭ নভেম্বর জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের সরকারি ছুটি বাতিল করেন। জরুরি অবস্থা জারির পর শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতির পিতা হিসাবে স্বীকৃতির বিষয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘আমাদের দুর্ভাগ্য আমার এখনো জাতির পিতার স্বীকৃতি দিতে পারিনি’।

ইত্তেফাক:মঈন উ আহমেদকে যখন সেনাপ্রধান বানানো হয় আপনি তো তখন বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব ছিলেন। এমন সুচতুর লোক সেনাপ্রধান হলেন কেমন করে?

মোখলেসুর রহমান চৌধুরী: অতি ধূর্ত লোক ছিলেন তিনি। নানা তদবির করে সেনাপ্রধান হয়েছিলেন। নয়জনকে ডিঙ্গিয়ে সেনাপ্রধান করা হয়েছিল তাকে। তার বিষয়ে একটি কথা চাউড় রয়েছে। স্বাধীনতার পর সেনাবাহিনীতে কমিশন র্যাঙ্কে ঢুকেছিলেন দুর্নীতির মাধ্যমে। নিয়োগ বিধি অনুযায়ী তাঁর শারিরীক উচ্চতা কম ছিল। সেনাবাহিনীর চাকরিতে যোগদানের পর ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে অভ্যুত্থানে অংশ নেন মঈন উ আহমদ। বঙ্গভবনে তখন তার দায়িত্ব ছিল তত্কালীন রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমদকে বন্দি করে রাখা। পাল্টা বিপ্লবে খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থান ব্যর্থ হলে অতি চতুর মঈন বঙ্গভবনের দেয়াল টপকে রাজপথে জনতার সঙ্গে মিশে যান। ভবিষ্যতে বঙ্গভবনে আসবেন এই চিন্তা তখন থেকেই তাঁর মাথায় ঢুকে। শুধু তাই নয়, সেনা প্রধান হওয়ার আগে তাঁর চ্যালেঞ্জ হতে পারে এমন একজন জেনারেলকে চাকরি থেকে অবসরে পাঠানো হয়েছিল তাঁরই ষড়যন্ত্রে। মেজর জেনারেল ফজলে এলাহি আকবর তখন জাতিসংঘ শান্তি মিশনে বাংলাদেশের একমাত্র মেজর জেনারেল হিসাবে কমর্রত ছিলেন। তাঁকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল তখন। মইনের ষড়যন্ত্রে তাঁকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হলে বাংলাদেশ এই পদটি হারায়। তাকে সেনাপ্রধান মনোনীত করার পর সিনিয়র দুই জনকে রাষ্ট্রদূত হিসাবে চাকরি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করতে হয়েছিল। তাঁর জন্য চ্যালেঞ্জ হতে পারে এমন সিনিয়র ২জন সেনা কর্মকর্তাকে চাকুরিচ্যুত করেন জরুরী আইন জারির পর। তারা হলেন মেজর জেনারেল শরীফ উদ্দিন আহমদ ও মেজর জেনারেল রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী (জুনিয়র রাজ্জাকুল)। বঙ্গভবনকে দখলে নেয়ার উদ্যোগে যাতে কোন বড় বাঁধা না আসে সেই ব্যবস্থাও তখন-ই করেন তিনি। তত্কালীন রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিব মেজর জেনারেল আমিনুল করিমকে তিনি নিজের আয়ত্বে নেন। মেজর জেনারেল আমিনুল করিম ছিলেন পুরোপুরি জেনারেল মইনের অনুগত। জরুরী অবস্থা জারির শেষ উদ্যোগটি সফল হয় আমিনুল করিমের সার্বিক সহযোগিতায়।

ইত্তেফাক: সংবিধান অনুযায়ী সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি হিসবে কে এম হাসান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শপথ নেয়ার কথা ছিল। তিনি কখন অপরাগতার বিষয়টি জানিয়েছিলেন?

মোখলেসুর রহমান চৌধুরী: বিচারপতি কে এম হাসান ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রস্তুত ছিলেন। পূর্ব প্রস্তুুতি হিসাবে প্রধান উপদেস্টার শপথ গ্রহনের সকল আয়োজন সম্পন্ন করে রেখেছিল বঙ্গ ভবন। তাঁর পিএস, ব্যক্তিগত স্টাফও চুড়ান্ত করা হয়েছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বিদেশী কুটনৈতিকরাও দায়িত্ব গ্রহনের বিষয়ে তাদের নিজ নিজ সরকারের কাছে ডিপ্লোমেটিক নোট পাঠিয়েছিলেন। একেবারে চুড়ান্ত পর্যায়ে এসে বিচারপতি কে এম হাসান হঠাত্ করে দায়িত্ব গ্রহনে অপারগতার কথাটি বঙ্গ ভবনকে অবহিত করেন। যদিও ২৮ অক্টোবর সন্ধ্যায় এটি প্রেস রিলিজ আকারে প্রকাশিত হয়। সেদিন সন্ধ্যায় তাঁর বাসভবনের সামনে অপেক্ষমান সাংবাদিকদেরও একটি প্রেস রিলিজ বিতরণ করা হয়। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৪ দলীয় জোটের ৩১ দফা দাবী ছিল। শেষ পর্যায়ে এসে তা এক দফায় পরিণত হয়। এটি ছিল বিচারপতি কে এম হাসান। কোন ভাবেই আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা তাকে মানতে রাজি ছিলেন না। বিএনপি মহাসচিব আবদুল মান্নান ভূইয়া এবং আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিলের মধ্যে একটি সংলাপ হয়েছিল। এই সংলাপের পর থেকেই এক দফায় রুপ নেয় তাদের দাবী। এর কারন কে এম হাসান এক দিকে ছিলেন খন্দকার মোশতাক আহমদের আত্মীয়। আরেক দিকে ছিলেন কর্ণেল সৈয়দ ফারুক রহমান (অব) এবং কর্ণেল আবদুর রশিদের (অব) ভায়রা। তারপরও ২৯ অক্টোবর বিচারপতি কে এম হাসান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসাবে দায়িত্ব নিলে কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারত না। কিন্তু তিনি অন্তিম মূহুর্তে অপরাগতা প্রকাশ করেন।

ইত্তেফাক: কে এম হাসান অপরাগতার বিষয়টি অবহিত করার পর বঙ্গভবন থেকে আপনাদের ভূমিকা কি ছিল?

মোখলেসুর রহমান চৌধুরী: তাঁর অপরাগতার বিষয়টি অবহিত করার পরপরই আমরা প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের সাথে যোগাযোগ করি। বিএনপি’র তত্কালীন মহাসচিব আবদুল মান্নান ভুইয়া ও আওয়ামী লীগের তত্কালীন সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিলকে বঙ্গ ভবনে আসার আমন্ত্রণ জানাই। টেলিফোনে আমন্ত্রণ জানানোর পর তাদের বঙ্গভবনে পৌছাতে চাহিদামত প্রটেকশনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল সেদিন। তারা দুই জন বঙ্গ ভবনে পৌছার পর রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমেদ-এর নেতৃত্বে উভয়ের উপস্থিতিতে বৈঠক হয়। তখন বিচারপতি কেএম হাসানের অপারগতা প্রকাশের বিষয়টি তাদের আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করা হয়। সেখানে প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিল একটি প্রস্তাব করেন। রাষ্ট্রপতিকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, স্যার-আমাদের দলে তোফায়েল আহমদসহ আপনার অনেক ছাত্র রয়েছেন। আপনি যখন কিছু দিন আগে অসুস্থ ছিলেন তখন বিএনপি ও হাওয়া ভবন আপনাকে সরিয়ে দিতে চেয়েছিল। আমাদের নেত্রী এবং আমরা সবাই আপনার পাশে দাড়িয়েছিলাম। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেস্টার বিষয়ে সৃস্ট সমস্যার সমাধান না হওয়ায় সংবিধানের অংশ অনুযায়ী আপনি রাজি হয়ে গেলে সকল সমস্যার সমাধান হয়ে যায়, ল্যাটা চুকে যায়। তখন প্রেসিডেন্ট বলেন আমি অসুস্থ। এখনো পুরোপুরি সুস্থ হইনি। ডাক্তারদের পরামর্শ হচ্ছে দিনের একটা সময় আমাকে বিশ্রামে থাকতে হবে। আবদুল জলিল আবারো অনুরোধ করেন। তখন প্রেডিসেন্ট ড, ইয়াজউদ্দিন আহমেদ বলেন, আমি চাই না। তারপরও আপনারা রাজনীতিবিদরা সমস্যার সমাধান করতে না পারলে দেশ ও জাতির স্বার্থে I could offer myself।

ইত্তেফাক: সাবেক প্রধান বিচারপতি মাহমুদুল আমিন চৌধুরীকে প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগের বিষয়ে একটি প্রস্তাব ছিল। যেটি আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে করা হয়েছিল।

মোখলেসুর রহমান চৌধুরী: বাংলাদেশের সংবিধানে তখন নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধানটিতে ৬টি অপশন ছিল। ৬টি অপশনের মধ্যে প্রথমটি ছিল সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি। এই অপশন অনুযায়ী বিচারপতি কে এম হাসান দায়িত্ব নেয়ার কথা। কিন্তু তিনি অপরাগতা প্রকাশ করায় দ্বিতীয় অপশন ছিল তাঁর ইমিডিয়েট আগে অবসর নেয়া বিচারপতি মাইনুর রেজা চৌধুরী। তিনি এর আগেই ইন্তেকাল করেছিলেন। তৃতীয় অপশন ছিল আপিল বিভাগ থেকে সর্বশেষ অবসর নেয়া বিচারপতি এম এ আজিজ। তিনি প্রধান নির্বাচন কমিশনারের দায়িত্বে ছিলেন। এই দায়িত্বে থাকায় তার প্রতি আগে থেকে আওয়ামী লীগের অনাস্থা ছিল। তার নাম আসলে আওয়ামী লীগ প্রচন্ড আপত্তি দেয়। চতুর্থ অপশনে ছিলেন আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি হামিদুল হক। যিনি বিচারপতি এম এ আজিজের ইমিডিয়েট আগে অবসরে গিয়েছিলেন। তিনি সরকারের একটি লাভজনক পদে (বিচার প্রশিক্ষণ ইন্সস্টিটিউটের চেয়ারম্যান) অধিষ্ঠিত ছিলেন এবং বিএনপি’র আপত্তি ছিল তাকে নিয়ে। এছাড়া বিএনপি’র আপত্তি থাকায় তিনি নিজেও লিখিত আকারে অপরাগতা প্রকাশ করেছিলেন। পঞ্চম অপশন ছিল প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দল গুলোর কাছে গ্রহনযোগ্য কোন ব্যক্তিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসাবে দায়িত্ব গ্রহনের জন্য আমন্ত্রণ জানানো। এই অপশন নিয়ে যখন আলোচনা হয়, তখন মাহমুদুল আমিন চৌধুরীর নাম উঠে এসেছিল। কারন তিনি বিচারপতি মাইনুর রেজা চৌধুরীর ইমিডিয়েট পরে প্রধান বিচারপতির পদ থেকে অবসরে গিয়েছিলেন।

ইত্তেফাক: তাঁকে নিয়োগ দেয়া হল না কেন?

মোখলেসুর রহমান চৌধুরী: আমি সেই দিকেই আসছি। বিচারপতি কে এম হাসানের অপারগতার বিষয়টি আনুষ্ঠানিক ভাবে নিষ্পত্তি হওয়ার পর প্রথমে দুই বড় দলের মহাসচিবকে বঙ্গভবনে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। যেটি আমি আগে একটি প্রশ্নের জবাবে উল্লেখ করেছি। এই দুই জনের সঙ্গে আলোচনার পর সংবিধান অনুযায়ী রাজনৈতিক দল গুলোর সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নেয়া হয়। সেই লক্ষ্যে একটি ক্রাইটেরিয়া নির্ধারণ করা হয়। সর্বশেষ জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈতিক দল গুলোর প্রতিনিধিদের বঙ্গ ভবনে আমন্ত্রণ জানানো হল। ২৯ অক্টোবর সকাল থেকে দফায় দফায় বিএনপি, আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি এবং জামায়াতে ইসলামীর প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন রাষ্ট্রপতি। কারন এই ৪টি দলই মূলত তত্কালীন সংসদে প্রতিনিধিত্ব করেছে। প্রত্যেকটি বৈঠকেই আমার উপস্থিতি ছিল। সংবিধানের পঞ্চম অপশন অনুযায়ী মাহমুদুল আমিন চৌধুরীর নাম উঠে আসলে আওয়ামী লীগ সমর্থন জানায়। কিন্তু তাঁর বিষয়ে প্রথমে আপত্তি জানায় বিএনপি’র সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী। সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর আপত্তি কার্যকর না হলেও সিলেটের লোক হিসাবে বিএনপি নেতা হারিছ চৌধুরী জোরালো আপত্তি কাজে লাগে তখন। মাহমুদুল আমিন চৌধুরীর বাড়ি হচ্ছে সিলেট। হারিছ চৌধুরীর বাড়িও সিলেট। তখন হারিছ চৌধুরী সর্বশক্তি নিয়োগ করে মাহমুদুল আমিন চৌধুরীর বিষয়ে দলের ভেতরে বাঁধা সৃষ্টি করেন। এক পর্যায়ে তিনি সফল হন। হারিছ চৌধুরী বিএনপি’র শীর্ষ নেতৃত্বকে এই বিষয়ে প্রভাবিত করার পর বিএনপি’র পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক আপত্তি জানানো হল। বিএনপির আপত্তির সঙ্গে জাতীয় পার্টি এবং জামায়াতে ইসলামী সায় দেয়। এর পর সংবিধানের সর্বশেষ অপশন ছিল রাষ্ট্রপতিকে অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেস্টা পদ গ্রহন করা। আর কোন বিকল্প না থাকায় রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমদ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহন করতে বাধ্য হন। এই বিষয়ে বিএনপি, জাতীয় পার্টি এবং জামায়াতে ইসলামী একমত হয়ে সমর্থন জানায়।

ইত্তেফাক: তারপরেও ২২ জানুয়ারির নির্বাচন করতে পারলেন না কেন?

মোখলেসুর রহমান চৌধুরী: সবকিছু বলতে গেলে অনেক দীর্ঘ হয়ে যাবে। সংক্ষেপে যতটুকু বলা যায় সেটা হল তখন এরশাদের মনোনয়নপত্র বাতিল করা ছিল প্রচন্ড ভুল। এ বিষয়ে একটি চক্রান্ত কাজ করেছে পর্দার আড়াল থেকে। এখানেও জেনারেল মঈনের একটি বিশেষ খেলা ছিল। তিনি চাইতেন না নির্বাচনটি হোক। তাঁর লক্ষ্য ছিল একটি পরিস্থিতি তৈরি করে ক্ষমতা দখল করা, যেটা আমি আগে বলেছি। এরশাদের মনোনয়নপত্র বাতিলের পরই তারা হাতে অস্ত্র পেয়ে যায়। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৪ দলীয় জোট মনোনয়ন পত্র প্রত্যাহারের শেষ দিনে এক যোগে সকল মনোনয়ন পত্রপ্রত্যাহার করে নেয়। আওয়ামী লীগ পল্টন ময়দানে জনসভার আয়োজন করে নির্বাচন বর্জনের চূড়ান্ত ঘোষণা দেয়। এই জনসভায় এরশাদ আওয়ামী লীগের মঞ্চে ওঠেন এবং বদরুদ্দোজা চৌধুরী, কর্ণেল অলি আহমদ (অব), ড. কামাল হোসেন সবাই এক বাক্যে বলেন ‘নো এরশাদ, নো ইলেকশন’। এটাই ছিল একটি বড় টার্নিং পয়েন্ট।

ইত্তেফাক: তখন তো চারজন উপদেষ্টাও পদত্যাগ করেছিলেন। তাদের বক্তব্য ছিল প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্বে নিয়োজিত রাষ্ট্রপতি তাদের সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই সেনা বাহিনী মোতায়েন করেছে।

মোখলেসুর রহমান চৌধুরী: তারা আসলে জেনারেল মঈন উ আহমদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সহযোগিতা করতেই পদত্যাগ করেছিলেন। পদত্যাগকারীদের মধ্যে কেউ কেউ এটা বুঝতে পেরে আবার ফিরেও আসতে চেয়েছিলেন। ততক্ষনে তাদের পদত্যাগপত্র বঙ্গভবনে গৃহীত হয়ে যায়। এছাড়া কয়েকজন উপদেষ্টা পদত্যাগ করতে পারেন এই আভাস পাওয়ার পরই বঙ্গ ভবনে বিকল্প প্রস্তুতি নিয়ে রাখা হয়েছিল। পদত্যাগ করলে স্থলাভিষিক্ত করার জন্য বিকল্প নামও প্রস্তুত রেখেছিল বঙ্গভবন। আর সেনা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছিল বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী। সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবে রাষ্ট্রপতি সিআরপিসি অনুযায়ী ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার সারা দেশে সেনাবাহিনী মোতায়েন করেছিলেন। ৪ উপদেষ্টা সেদিন ভুল করেছিলেন। তারা জেনারেল মঈনকে সহযোগিতা করতেই এটা করেছেন। এদের মধ্যে দুইজন পরবর্তী সময়ে জরুরি অবস্থার আমলে পুরস্কৃত হন। মন্ত্রীর পদ মর্যাদায় একজনকে দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান এবং আরেকজনকে একটি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান করা হয়েছিল। এতেই প্রমান করে তারা মঈনের ষড়যন্ত্রের সঙ্গে ছিলেন।

ইত্তেফাক: ১১ জানুয়ারি কিভাবে জরুরি অবস্থা জারি হল সেই বিষয়ে কি আমাদের বলবেন?

মোখলেসুর রহমান চৌধুরী: দেশের আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে ওই দিন দুপুরে আমরা বঙ্গভবনে উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে ছিলাম। রাষ্ট্রপতির ও প্রধান উপদেষ্টা ড. ইয়াজউদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে বৈঠক চলছিল। রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিব (এমএসপি) আমিনুল করিম (যিনি মঈনের মূল সহযোগী ছিলেন) এক পর্যায়ে বৈঠক বন্ধ করে দেয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করেন। তিনি জানান, তিন বাহিনী প্রধান বঙ্গভবনে আসছেন। কিন্তু রাষ্ট্রপতি তিন বাহিনী প্রধানকে ওই দিন বঙ্গভবনে ডাকেননি। এমনকি তাদের সাথে পূর্ব নির্ধারিত কোন বৈঠকও ছিল না। জেনারেল মঈন নিজে বিমান ও নৌবাহিনীর প্রধানকে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে কোন যোগাযোগ ছাড়াই বঙ্গ ভবনে নিয়ে আসছিলেন। তাদের দুজনকেই আগেই র্যাঙ্ক বৃদ্ধি ও চাকরির মেয়াদ বাড়ানোর আশ্বাস দেয়া হয়েছিল। মঈন পরবর্তী সময়ে তাদের সাথেও বেইমানি করেছিলেন। সামরিক সচিবের চাপে এক পর্যায়ে মিটিং থেকে উঠে রাষ্ট্রপতি এবং আমি রাষ্ট্রপতির অফিস কক্ষে যাই। সেখানে বসে উচ্চ পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতৃত্বের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করি। দুর্ভাগ্য বশত কোন কোন পর্যায় থেকে সেদিন আমাদের ফোন রিসিভ করা হয়নি। এমনকি জরুরি অবস্থা জারির আগ পর্যন্ত ফোন ব্যাকও করা হয়নি। এই অবস্থায় প্রায় ৬ ঘন্টা নানা কৌশলে তাদের জরুরি অবস্থা জারির বিষয়ে আটকে দেয়া হয়েছিল। অপেক্ষা করা হয়েছিল রাজনৈতিক নেতৃত্ব থেকে কোন পরামর্শ পাওয়ার। সেনা প্রধান সেদিন সকালে সকল ক্যান্টনমেন্টে কিছু গুজব ছড়িয়ে দেন। এর মধ্যে একটি ছিল সেনা প্রধান থেকে জেনারেল মঈনকে বরখাস্ত করা হচ্ছে। মেজর জেনারেল রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরীকে (জুনিয়র রেজ্জাকুল) সেনা প্রধান করা হচ্ছে। এটি ছিল সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। এমনকি মেজর জেনারেল রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী অনেক জুনিয়র ছিলেন। তাঁকে সেনা প্রধান করা সম্ভবও ছিল না তখন। গুজবের মধ্যে আরো ছিল সেনা প্রধান যাতে বঙ্গ ভবনে পৌঁছাতে না পারেন সেজন্য ঢাকার রাস্তায় ট্রাফিক জ্যাম তৈরি করা হয়েছে। ওয়ারলেস যোগাযোগে জ্যাম তৈরি ইত্যাদি গুজব ছড়ানো হয় ক্যান্টনমেন্টগুলোতে। এছাড়া ২৯ অক্টোবর থেকে দুই নেত্রী জরুরি অবস্থা জারি করতে রাজি, কিন্তু বঙ্গভবন থেকে রাষ্ট্রপতির উপদেষ্টা সেটা করতে দিচ্ছে না বলে গুজব রটানো হয়। জরুরি অবস্থা জারির জন্য রাষ্ট্রপতিকে যখন চাপ দেয়া হল তখনো বলা হয়েছে দুই নেত্রী রাজি আছেন। তারপরও সেনা প্রধানের নেতৃত্বে বঙ্গ ভবনে আসা সামরিক অফিসারদের গেইটে আটকে দেয়া হয়েছিল। রাষ্ট্রপতির গার্ড রেজিমেন্টের প্রধান (পিজিআর) আমার কক্ষে বৈঠক করেন। তিনি সেনা প্রধানের বঙ্গভবনে প্রবেশ প্রতিরোধ করার পক্ষে ছিলেন। কিন্তু রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিব (এমএসপি) মেজর জেনারেল আমিনুল করিম এক পর্যায়ে তিন বাহিনী প্রধানের নেতৃত্বে বঙ্গভবনে আসা অফিসারদের গেইট থেকে ভেতরে তার রুমে নিয়ে আসেন। এমএসপি’র রুমে এসএসএফ-এর মাধ্যমে ৩টি পিস্তল মঈনসহ সংশ্লিষ্টদের দেয়া হয়। কারন বঙ্গভবনে প্রবেশের সময় কোন অস্ত্র বহন করা আইন অনুযায়ী নিষিদ্ধ। তাই তারা নিজেরা কোন অস্ত্র নিয়ে আসতে পারেননি। এমএসপি বেআইনিভাবে এসএসএফ-এর মাধ্যমে তাদের পিস্তল সরবরাহ করেন। এই অবস্থায় রাষ্ট্রপতির ইনস্যুলিন নেয়া এবং লাঞ্চ করার দরকার বলে আমি রাষ্ট্রপতিকে স্টেট ডাইনিং রুমে নিয়ে আসি। নানা কৌশলে বিভিন্ন রুমে নিয়ে যাই রাষ্ট্রপতিকে। সময় ক্ষেপনের চেষ্টা হিসাবে এই কৌশল অবলম্বন করা হয় তখন। সেদিন সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী অনেক সাহসি ভূমিকা পালন করেছিলেন। বিকাল চারটায় উপদেষ্টা পরিষদের পূর্ব নির্ধারিত বৈঠক ছিল। এক পর্যায়ে এমএসপি আমিনুল করিম নিজেই উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠক বাতিল করে দেন। এখানে আরেকটি বিষয় বলে রাখতে চাই। রাষ্ট্রপতি প্রধান উপদেষ্টা হিসাবে দায়িত্ব নেয়ার পর এমএসপি আমিনুল করিম চেয়েছিলেন তাঁর পছন্দের কিছু লোককে উপদেষ্টা নিয়োগ করতে। সেটা করতে না পেরে তিনি হুমকি দিয়ে বলেছিলেন এখন থেকে সামরিক কায়দায় সবকিছু করব।

ইত্তেফাক: তারা কি পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রপতির স্টেট ডাইনিং রুমে প্রবেশ করেছিল?

মোখলেসুর রহমান চৌধুরী: না, তারা সেখানে প্রবেশ করেননি। রাষ্ট্রপতি ডাইনিং রুম থেকে বেডরুমে যাওয়ার পথে জোর করে রাষ্ট্রপতিকে ভেতরের সিটিং রুমে নিয়ে যায় তারা। সেখানে তিন বাহিনী প্রধান, পিএসও, এসএসএফ ডিজি, ডিজিএফআই-এর ভারপ্রাপ্ত ডিজিসহ কয়েকজন সামরিক অফিসারকে অপেক্ষমান রাখেন এমএসপি আমিনুল করিম। সিটিং রুমে নিয়ে রাষ্ট্রপতিকে জোর করে কয়েকটি কাগজে সাক্ষর করানো হয়। এর মধ্যে ছিল রাষ্ট্রপতির প্রধান উপদেষ্টা পদ থেকে পদত্যগ, জরুরি অবস্থা জারি ও জাতির উদ্দেশ্যে রাষ্ট্রপতির ভাষণ। এই ভাষণে রাষ্ট্রবিরোধী কয়েকটি লাইন ছিল। এই কঠিন অবস্থায়ও আমি এগুলো কেটে দিয়েছি। বলেছি রাষ্ট্রপতির ভাষনে এ ধরনের আপত্তিকর শব্দ যাবে না । তাদের ভাষায় রাষ্ট্রপতিকে দিয়ে এই কাজ গুলো সারতে আমি ৬ ঘন্টা বিলম্ব করিয়েছি। এরপর যা হওয়ার সবই হয়েছে। সময় সুযোগ হলে বাকী কথা গুলো আরেকদিন বলব।

 

এই পাতার আরো খবর -
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
৩০ নভেম্বর, ২০১৮ ইং
ফজর৫:০২
যোহর১১:৪৭
আসর৩:৩৫
মাগরিব৫:১৪
এশা৬:৩১
সূর্যোদয় - ৬:২২সূর্যাস্ত - ০৫:০৯
পড়ুন