অংশগ্রহণমূলক না হলে নির্বাচন বিতর্কিত হবে
কর্মকর্তাদের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠকে সিইসি
সাইদুর রহমান১৭ ফেব্রুয়ারী, ২০১৭ ইং
দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই কাজে নেমে পড়েছেন কে এম নুরুল হুদার নেতৃত্বাধীন পাঁচ সদস্যর নির্বাচন কমিশন (ইসি)। নির্বাচনী কর্মকর্তাদের নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন তারা। নবনিযুক্ত ইসির সদস্যরা বলেছেন, নির্বাচন এক ধরনের মুক্তিযুদ্ধ, জনগণকে স্বস্তি দেওয়ার যুদ্ধ। অংশগ্রহণমূলক না হলে নির্বাচন বিতর্কিত হবেই। এক্ষেত্রে আগামী সংসদ নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণও আশা করছেন তারা। একই সঙ্গে অতীতে অংশগ্রহণমূলক না হওয়ায় ভোট বিতর্কিত হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন তারা।

প্রথম কর্মদিবসেই কমিশন সদস্যদের পক্ষ থেকে রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি পৌরসভা নির্বাচনের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে পাঠানো হয়েছে কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শাহাদত্ হোসেন চৌধুরীকে। আগামীকাল শনিবার সেখানে ভোট নেওয়া হবে। বুধবার শপথ নেওয়ার পরপরই কমিশনের সদস্যরা ইসি কার্যালয়ে গিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করলেও গতকাল ছিল তাদের প্রথম কর্মদিবস।

গত বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টায় আগারগাঁওস্থ নির্বাচন ভবনের সম্মেলন কক্ষে কর্মকর্তাদের নিয়ে বৈঠক করেন নতুন ইসি। এসময় ইসি সচিবালয় সার্বিক অগ্রগতি, কাজের পরিধি-কাঠামো ও পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে একটি ধারণাপত্রও তুলে ধরেন ইসি সচিব মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ। ইসি সচিবালয়ের দক্ষ জনবল নিয়ে সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দেওয়ার ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের উদ্দীপ্ত করতে এবং মনোবল বাড়াতে নানা নির্দেশনাও দিয়েছেন কমিশনের নতুন সদস্যরা।

বৈঠক শেষে কমিশন সদস্য শাহাদত্ হোসেন চৌধুরী বলেন, ১৮ ফেব্রুয়ারি রাঙামাটির বাঘাইছড়ি পৌরসভা নির্বাচনকে সামনে রেখেই তিনি চট্টগ্রাম যাচ্ছেন। সেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ নির্বাচনী কাজে জড়িত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম নির্বাচন হিসেবে কমিশন এই নির্বাচনকে অধিক গুরুত্ব দিচ্ছে।

কমিশনের সঙ্গে কর্মকর্তাদের বৈঠকে উপস্থিত একাধিক কর্মকর্তা ইত্তেফাককে জানান, দেশের ভঙ্গুর নির্বাচন ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে করণীয় সম্পর্কে কমিশন সদস্যরা তাদের মতামত নিয়েছেন। তারা বলেছেন, একতরফা নির্বাচন হলে সেখানে নির্বাচন সুষ্ঠু করা সম্ভব হয় না। কোনো নির্বাচনে একাধিক যোগ্য প্রার্থী থাকলে তাদের কর্মী সমর্থকরাও ভোট সুষ্ঠু করতে তাদের সর্বশক্তি প্রয়োগ করে। এতে ইসির কাজ অনেকটাই সহজ হয়।

বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, কর্মকর্তাদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে সিইসি কে এম নুরুল হুদা বলেন, বিগত যে নির্বাচনগুলো বিতর্কিত ছিল, কেন বিতর্কিত ছিল, সে বিশ্লেষণে আমি যাব না। শুধু একটি কথা বলতে পারি। সেগুলো ইনক্লুসিভ (অংশগ্রহণমূলক) নির্বাচন ছিল না। এখন বিভিন্ন সুশীল সমাজ ও গণমাধ্যম উপলব্ধি করছে শুধু ইসির ওপর নির্বাচনের সাফল্যের দায়িত্ব চাপিয়ে দিলে হবে না। কারণ রাজনৈতিক দল যদি সহযোগিতা না করে, তারা যদি নির্বাচনে অংশ না নেয়; নির্বাচন যদি প্রতিযোগিতামূলক না হয়, সব দলের অংশগ্রহণে না হয়, সেক্ষেত্রে নির্বাচন বিতর্কিত হবেই। তাই আমরা আশা করব, সব দল নির্বাচনে অংশ নেবে। সিইসি বলেন, এরআগে এতবেশি আর কোনো নির্বাচন কমিশন নিয়োগ নিয়ে আলোচনা হয়নি, দেশের মানুষের এত আগ্রহও দেখা যায়নি। পুরো বিশ্ব, ঢাকাস্থ বিভিন্ন দূতাবাস ও দেশবাসী আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। সবাইকে নিয়ে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দিতে পারব বলে আমরা আশাবাদী। ইসি কার্যালয়ের অনেক যোগ্য কর্মকর্তা রয়েছেন। ইসির সাবেক অতিরিক্ত সচিব জেসমিন টুলীর নাম উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে তিনি যে দৃঢ়তা দেখিয়েছিলেন তা দেশের মানুষ এখনও মনে রেখেছে। তার সিদ্ধান্ত থেকে কেউ তাকে বিব্রত বা বিচলিত করতে পারেনি। এরপর আপনাদের দক্ষতা ও সক্ষমতা নিয়ে সন্দেহ থাকার অবকাশ নেই।’ সিইসি বলেন, আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ। দলমত সবকিছুর ঊর্ধ্বে থেকে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করব। সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে আমরা বদ্ধপরিকর। অত্যন্ত সতর্কতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করব, নির্বাচন অনুষ্ঠানে আমরা জিরো টলারেন্সে নীতিতে থাকব। কাউকে কোনোভাবেই রেহাই দেওয়া হবে না।

ইসির দিকে তাকিয়ে আছে বিশ্ব: মাহবুব তালুকদার

বৈঠকে নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার বলেন, সমগ্র পৃথিবীর দৃষ্টি এখন আমাদের দিকে। কেবল বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষ নয়, বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ বাংলাদেশের আগামী জাতীয় নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে আছে। জাতির প্রত্যাশা পূরণে তাদের কাজ করার অঙ্গীকার করেন তিনি। আমাদের কাছে দেশবাসীর যে প্রত্যাশা তা আমরা পূরণ করবো। ভারতের নির্বাচন কমিশনের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ভারতের নির্বাচন কমিশনার সুকুমার সেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্য সচিব ছিলেন। নেহেরু তাকে ডেকে নিয়ে যখন ভারতে নির্বাচন কমিশনার হওয়ার প্রস্তাব দিলেন, তখন তিনি বলেছিলেন, যদি স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেন, তাহলে অবশ্যই দায়িত্ব নেব। সুকুমার সেন নির্বাচন করলেন, ওই নির্বাচনে তত্কালীন ভারত সরকারের বাঘা বাঘা নেতাদের অনেকেই পরাজিত হলেন। সুকুমার সেন ভারতের প্রথম পদ্মভূষণ হয়েছেন। আমলাদের নিয়ে নতুন ইসি গঠন হয়েছে বলে অনেকের অভিযোগের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভারতের আরেক বিখ্যাত নির্বাচন কমিশনার টিএন সেশন এবং সুকুমার সেন উভয়েই আমলা ছিলেন। আমলা হিসেবেই তারা যোগ্যতার প্রমাণ করেছেন। একজন আমলা হিসেবে আমিও গৌরববোধ করছি।

বৈঠকে বাকি নির্বাচন কমিশনারের মধ্যে মো. রফিকুল ইসলাম, বেগম কবিতা খানম ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শাহাদত্ হোসেন চৌধুরী সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন।

স্মৃতিসৌধে নতুন কমিশন সদস্যরা

চার নির্বাচন কমিশনারকে সঙ্গী করে গতকাল সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নুরুল হুদা। নির্বাচন কমিশনের নতুন সদস্যদের স্বাগত জানান ঢাকা জেলা পুলিশ সুপার শাহ মিজান শাফিউর রহমান ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মজিবুর রহমান। বেদীতে শ্রদ্ধা জানানো শেষে জাতীয় স্মৃতিসৌধের পরিদর্শক বইতে স্বাক্ষর করেন সিইসি।

সিইসি সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, আগামী পাঁচ বছর সুষ্ঠু ভোট আয়োজনে নির্বাচন কমিশনের নেতৃত্ব দেওয়ার দায়িত্বকে চ্যালেঞ্জিং হিসেবেই দেখছেন তিনি। দায়িত্বকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছি, যাতে আমরা সার্থক হতে পারি। বিএনপির বিভিন্ন অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, এটা তাদের ব্যাপারে। কেন তারা এ ধরনের মন্তব্য করছেন, তা তারাই ভালো বলতে পারবে।

উল্লেখ্য, বর্তমান কমিশনের মেয়াদ হবে ২০২২ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি। এ সময়ের মধ্যে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ছাড়াও প্রায় ৬ হাজারের মতো স্থানীয় নির্বাচন সম্পন্ন করবে নুরুল হুদা কমিশন। দেশের দ্বাদশ কমিশন হিসেবে গত ৬ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপতি মো. আব্দুল হামিদ তাদের নিয়োগ দেন।

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
১৭ ফেব্রুয়ারী, ২০১৮ ইং
ফজর৫:১৪
যোহর১২:১৩
আসর৪:১৮
মাগরিব৫:৫৮
এশা৭:১১
সূর্যোদয় - ৬:৩০সূর্যাস্ত - ০৫:৫৩
পড়ুন