প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধির অন্যতম কারণ দুর্নীতি
বিশ্বব্যাংকের বাজেট প্রতিক্রিয়া চাল আমদানিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত প্রয়োজন, আবগারি শুল্ক বৃদ্ধি ভুল সংকেত দিচ্ছে
ইত্তেফাক রিপোর্ট২১ জুন, ২০১৭ ইং
প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধির অন্যতম কারণ দুর্নীতি
বাংলাদেশের সড়ক নির্মাণে ভারত, চীন, ইউরোপের চেয়েও বেশি ব্যয় হচ্ছে বলে উল্লেখ করেছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির এক তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে, ভারতে চার লেন সড়ক নির্মাণে গড়ে খরচ হচ্ছে ১১ লাখ থেকে ১৩ লাখ ডলার। চীনে খরচ ১৩ থেকে ১৬ লাখ ডলার, ইউরোপে খরচ হচ্ছে ২৫ থেকে ৩৫ লাখ ডলার। অন্যদিকে ঢাকা-মাওয়া চার লেন সড়কের প্রতি কিলোমিটার খরচ হচ্ছে ১ কোটি ১৯ লাখ ডলার, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে ৭০ লাখ ডলার। রংপুর-হাটিকুমরুল সড়কে খরচ হচ্ছে প্রতি কিলোমিটারে ৬৬ লাখ ডলার। তুলনামূলক কম খরচ পড়েছে ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-ময়মনসিংহ চার লেন সড়কে। সেটিও ইউরোপের খরচের সমান অর্থাত্ প্রতি কিলোমিটারে ২৫ লাখ ডলার। গতকাল শেরেবাংলা নগরস্থ বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ে জাতীয় সংসদে প্রস্তাবিত ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেট নিয়ে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ায় এমন তথ্য উপস্থাপন করা হয়। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন প্রস্তাবিত বাজেটের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। কান্ট্রি ডিরেক্টর চিমিয়াও ফান এসময় বক্তব্য দেন।

ড. জাহিদ হোসেন উল্লেখ করেন, ভৌগলিক কারণ ও জমির দাম বৃদ্ধিতে প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় বেশি হতে পারে এটি স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু বিশ্বব্যাংকের গবেষণায় দেখা গেছে দুর্নীতির সূচকের সাথে প্রকল্প ব্যয়ের একটি সম্পর্ক রয়েছে। যেসব দেশে তুলনামূলক বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত সেসব দেশে প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব হয় এবং ব্যয়ও বেশি। এ জন্য ই-টেন্ডারিং এর উপর জোর দেন তিনি। তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশে প্রকল্প গড়ে ২ থেকে ৪ বছর বেশি সময় লাগছে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়ন বাড়াতে মেগা প্রকল্পে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে কিন্তু বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া ধীর। প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোকে দুর্বল রেখে বাস্তবায়ন বাড়ানো সম্ভব নয় বলে তিনি উল্লেখ করেন।

জাহিদ হোসেন বলেন, আগামী বাজেটে সবচেয়ে বড় উদ্যোগ ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন করা। নতুন ভ্যাট আইনের কারণে মূল্যস্ফীতির ওপর বড় ধরনের কোনো প্রভাব পড়বে না। কারণ নিত্য পণ্যের অনেকগুলোতে ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। মূল্যস্ফীতি হলেও সেটি সূচকে শুন্য দশমিক ৫ ভাগ প্রভাব ফেলতে পারে। তবে দাম বাড়বে এমন অপপ্রচারে প্রত্যাশা জনিত মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে। সক্ষমতার অজুহাতে ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন পাঁচ বছর পিছিয়েছে সরকার। আর পেছানো ঠিক হবে না। বাস্তবায়ন শুরু হলে সক্ষমতাও গড়ে উঠবে বলে তিনি মনে করেন।

তিনি বলেন, ব্যাংকের একাউন্টের উপর আবগারি শুল্ক বাড়ানো ব্যাংকিং খাতে সঠিক সংকেত দিচ্ছে না। যখন আমরা আর্থিক ব্যবস্থার সাথে সাধারণ মানুষকে আরো সম্পৃক্ত করতে চাচ্ছি তখন এই ধরনের ভুল সংকেত দেওয়া হচ্ছে।

প্রস্তাবিত বাজেটে ৪টি বড় চ্যালেঞ্জ উল্লেখ করেছে বিশ্বব্যাংক। এর প্রথমটি হলো ব্যাংকিং খাতে মৌলিক সমস্যা দূর করার উদ্যোগ বাজেট বক্তৃতায় নেই। জ্বালানির মূল্য আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয়য়ের কোন দিক নির্দেশনা নেই। তাছাড়া সঞ্চয় পত্রে সুদের হার কিভাবে সমন্বয় হবে সেই নীতি নেই। তাছাড়া বর্তমান সময়ে চালের বাজার স্থিতিশীল করতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানায় বিশ্বব্যাংক।

জাহিদ হোসেন বলেন, চাল আমদানির জন্য সরকারকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সময়টা খুব ‘ক্রিটিক্যাল’। সরকারকে চালের মজুদ বাড়াতে হবে। ভালো হয় যদি এটি করা হয় আমদানির মাধ্যমে। চাল আমদানিতে শুল্ক প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত বিলম্বিত হওয়ায় ব্যবসায়ীদের মধ্যে সিদ্ধান্তহীনতা কাজ করছে। চালের দাম নিয়ন্ত্রণে ভয়ভীতি দেখালে হবে না। এর ফলে বাজার থেকে চাল উধাও হয়ে যেতে পারে।

তিনি আরো উল্লেখ করেন, আগামী বাজেটে ব্যাংকিং খাত সংস্কারে তেমন উদ্যোগ নেই। এমনকি খেলাপি ঋণের বিষয়ে কিছু বলা হয়নি। তিনি বলেন, আগামী অর্থবছরে ৭ দশমিক ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য এবং রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য উচ্চাভিলাষী। এসব লক্ষ্য অর্জন অসম্ভব নয়, তবে লক্ষ্য অর্জন যেসব উদ্যোগ দরকার সেগুলো বাজেটে নেই। বাজেটে আশা দীর্ঘ, আশ্বাস সংক্ষিপ্ত। মূল্যস্ফীতির বিষয়ে তিনি বলেন, প্রবৃদ্ধি বাড়ছে, কিন্তু মূল্যস্ফীতি স্থিতিশীল রয়েছে। এটা স্বাভাবিক নয়, কেননা বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হচ্ছে চাহিদাকে বৃদ্ধি করার মাধ্যমে। তাই মূল্যস্ফীতি কম বেশি হওয়ার কথা। বাংলাদেশের স্বাস্থ্যকর প্রবৃদ্ধি চলছে। তবে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় প্রতিকূল বাতাস বইছে। এ অবস্থায় আগামী বাজেটে আশার ভিত্তিতে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। খরচের দিকে তেমন কোনো চমক নেই, এটি গতানুগতিক। সংস্কারের ক্ষেত্রে স্বীকৃতি আছে কিন্তু পদক্ষেপ নেই।

প্রস্তাবিত বাজেটের মূল্যায়ন করতে গিয়ে চিমিয়াও ফান তিনটি দিকের কথা বলেন, তার মতে প্রবৃদ্ধি অর্জনের যে লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে তা উচ্চাভিলাষী। বাজেটের বিশাল উন্নয়ন ব্যয় বাস্তবায়ন করা সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ হবে। কারণ বাজেট বাস্তবায়নে যে পরিমাণ কাঠামোগত সংস্কার নেওয়া দরকার সেটি হয়নি। রাজস্ব আদায়ের যে লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে সেটি উচ্চাভিলাষী এবং ভ্যাট নির্ভর। তার মতে, অর্থনীতির চ্যালেঞ্জগুলো হলো বিনিয়োগ পরিবেশ নিশ্চিত করা, রপ্তানি বৃদ্ধি, যথাসময়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ ধরে রাখা।

 

 

 

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
২১ জুন, ২০১৮ ইং
ফজর৩:৪৩
যোহর১২:০০
আসর৪:৪০
মাগরিব৬:৫১
এশা৮:১৬
সূর্যোদয় - ৫:১১সূর্যাস্ত - ০৬:৪৬
পড়ুন