গণহত্যা সত্ত্বেও এদেশের মানুষের মনোবল দৃঢ় ছিল
১৩ ডিসেম্বর, ২০১৭ ইং
 

আবুল কাসেম ফজলুল হক

 

বিজয়ের মাস চলছে। ১৬ ডিসেম্বরে ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধের পরে বাংলাদেশ হানাদার মুক্ত হয়। পাকিস্তানী সেনাবাহিনী সেদিন রমনা রেসকোর্স ময়দানে আত্মসমর্পণ করে। মুক্তিবাহিনী এবং জেনারেল অররার নেতৃত্বে যুক্ত কমান্ড কদিন আগে থেকেই আত্মসমর্পণের আহ্বান জানিয়ে আসছিল। সেই আহবানের পরিপ্রেক্ষিতে পাক-বাহিনীর প্রধান নিয়াজী আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে। সেদিন সকাল থেকেই স্বাধীন বাংলার বেতার কেন্দ্র থেকে সব্যসাচীর কণ্ঠে প্রচার হচ্ছিল কবি নজরুলের ‘আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে’ কবিতাটি।

আত্মসমর্পণের অন্তত আট ঘণ্টা আগে থেকেই প্রায় অবিরাম সব্যসাচীর কণ্ঠে এই কবিতার আবৃত্তি আমরা শুনেছি। আত্মসমর্পণের ঘটনাবলী দেখার কোনো সুযোগ ছিল না আমাদের, কোনো টেলিভিশন মাধ্যমেও সেটা তখন প্রচার করা হয়নি। আমরা খবর শুনেছি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে এবং আকাশবাণী কলকাতা ও দিল্লী থেকে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের অনেক রেডিও থেকে খবর প্রচারিত হয়। ৯ মাস ধরে যে গণহত্যা ও নির্যাতন চলছিল তার মধ্যেও এদেশের মানুষের মনোবল দৃঢ় ছিল।

বিজয় আমাদের অবিসম্ভাবী এই উপলব্ধি সকলের মনে ছিল। কবি নজরুলের কবিতা আমাদের মনে নবচেতনা সৃষ্টি করে। আমরা সেদিন আশা করেছিলাম আমরা নতুন এক ভবিষ্যত্ সৃষ্টির দিকে এগিয়ে যাবো। সেদিন বিকেলবেলা ঢাকা শহরে খুব কম লোকই রাস্তায় বেরিয়েছিল, আমি আজিমপুর কলোনির ভেতরের রাস্তা দিয়ে ঘুরে-ফিরে দেখেছি ছাত্ররা কলোনির ভেতরে রাস্তা দিয়েই জয় বাংলা শ্লোগান দিয়ে মিছিল করছে। বিজয়ের আনন্দের মধ্যেও তখন ভীতি ছিল পাকহানাদার বাহিনী আক্রমণ করতে পারে। এই কারণেই আমি যতটা জেনেছি সেদিন ছাত্র তরুণরাও রাস্তায় আসেনি। ৯ মাসের যুদ্ধে পরিচিত-অপরিচিত অগণিত মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। বিজয়ের সংবাদ নিয়ে আনন্দ ও বিষাদের মধ্যে রাত কাটিয়েছি। পরদিন সকালে রাস্তায় অনেক লোক বেরিয়ে এসেছে, আমিও এসেছি। আমি বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় এসে অনেক শিক্ষকের সঙ্গে দেখা করেছি এবং বেদনা ভারাক্রান্ত মনে জানতে পারি যে, মুনীর চৌধুরী, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, আনোয়ার পাশা, ডা. মুর্তজা এবং আরও অনেক শিক্ষকের খুব প্রিয়জনের শহীদ হওয়ার কথা। বাঙালি চেহারার লোকেরাই ১৩-১৪ ডিসেম্বর তাদের বাড়িতে বাড়িতে এসে তাদেরকে ধরে নিয়ে যায়, পরে তাদের লাশ পাওয়া যায়।

বিজয়ের আনন্দ আমাদের মনে ছিল, সেই সঙ্গে শহীদদের জন্য বেদনাও আমাদের মনকে ভারাক্রান্ত করে রেখেছিল। সাংবাদিক, চিকিত্সক, লেখক, প্রগতিমনস্ক অনেক লোককে বাঙালি চেহারার এই হত্যাকারীরা বাসা থেকে তাদের ধরে নিয়ে গিয়ে হত্যা করেছে।

আমাদের সংগ্রামের মধ্যদিয়ে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। ভারত আমাদের সহায়তা করেছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন আমাদের সহায়তা করেছে, সেজন্য তাদের প্রতি আমাদের চিরকৃতজ্ঞতা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তাজউদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে পরিচালিত সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমরা স্বাধীন বাংলাদেশ লাভ করেছি। শেরে বাংলা একে ফজলুল হক, মওলানা ভাষানী ও আরও অনেক নেতার নেতৃত্বের কথা আমরা শ্রদ্ধাভরে নতচিত্তে স্মরণ করি, স্মরণ করি দল-মত নির্বিশেষে সকল শহীদকে এবং নির্যাতিত মানুষকে। বিজয় আমাদের সফল হোক। বাংলাদেশ জনগণের শক্তিশালী রাষ্ট্র রূপে গড়ে উঠুক।

[ লেখক: অধ্যাপক ও রাষ্ট্রচিন্তক]

এই পাতার আরো খবর -
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
১৩ নভেম্বর, ২০১৮ ইং
ফজর৫:১১
যোহর১১:৫৩
আসর৩:৩৮
মাগরিব৫:১৭
এশা৬:৩৪
সূর্যোদয় - ৬:৩২সূর্যাস্ত - ০৫:১২
পড়ুন