উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্প
পরিবার পরিকল্পনা গ্রহণে এগিয়ে আসছেন নারীরা
মনোয়ারার বয়স ২৮ বছর আর রহমত খাতুনের ২৭। সম্পর্কে দুই জা। দুইজনই গোপনে নিয়মিত আসেন উখিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্প-১২-এর একশন এইড নারী ও শিশু বান্ধব সেন্টারে। এখান থেকেই তারা জানতে পারেন পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি সম্পর্কে। এর আগে বিষয়টি তাদের জানা ছিল না। ফলে একজন ১০ বছরে ৫ আর অপরজন ১৮ বছরে ৯ শিশুর জন্ম দেন। এখন এই পদ্ধতি সম্পর্কে জেনে তারা তিনমাস অন্তর জন্মনিরোধক ইনজেকশন গ্রহণ করছেন। পিল না খেয়ে কেন ইনজেকশন নিচ্ছেন এমন প্রশ্ন করলে জানান, পিল খেলে স্বামীর কাছে ধরা পড়ার আশঙ্কা আছে। স্বামী জানতে পারলে কী সমস্যা হবে- এমন প্রশ্নের উত্তরে চোখ কপালে তুলে দুইজন এক সঙ্গে বলেন, ‘স্বামী পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি গ্রহণ করতে দিবেন না। উল্টো মারধোরও করতে পারেন।’

আয়েশা বেগমের বয়স ২৫ বছর, ৫ শিশুর মা। ছোট শিশুর বয়স ৫ মাস। এখানেই এই শিশুর জন্ম হয়। তারপর থেকে তিনি জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণ করছেন; কিন্তু আজ অবধি স্বামী এর কিছুই জানেন না। কারণ স্বামী মনে করেন এটি ধর্মীয়ভাবে ঠিক না। তিনি কী তা মনে করেন না- এমন প্রশ্ন করলে বলেন, আগে মনে করতেন, এখন করেন না। কারণ এখানকার আপারা খুব সুন্দর করে বুঝিয়েছেন, এটি ধর্মীয়ভাবে বাধা তো নয় বরং নিজের আর শিশু উভয়ের জন্য মঙ্গলজনক। একই কথা জানালেন সেন্টারে আসা ২৫ বছরের ফাতেমা। তার স্বামীও চান না পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি গ্রহণ করুক স্ত্রী। তাই তিনিও গোপনে এই পদ্ধতি গ্রহণ করছেন।

সম্প্রতি কক্সবাজারের উখিয়া ময়নার ঘোনা ক্যাম্প-১১ ও ১২ ঘুরে জানা গেল, মনোয়ারা-ফাতেমার মতো অনেক নারীই স্বামীকে না জানিয়ে পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি গ্রহণ করছেন। এই ক্যাম্পগুলোতে দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে, কারণ তারা পরিবার পরিকল্পনা সম্পর্কে জানেন না। আবার ধর্মীয়ভাবে বিধি-নিষেধ আছে বলেও মনে করেন অনেকে। স্থানীয় ব্র্যাক স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্রের মিডওয়াইফ (ধাত্রী) ফোয়ারা খাতুন ও শারমিন আক্তার জানান, এলাকার ৩৩ হাজার জনগোষ্ঠীর জন্য তাদের স্বাস্থ্য কেন্দ্র কাজ করছে। গত ২ মাসে তাদের কর্ম-এলাকায় বাড়িতে ৭৪টি শিশু জন্ম নেয়। এই কেন্দ্রে গত জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত ৩২১৩ জন গর্ভবতী মাকে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হয়। শারমিন আক্তার বলেন, শুরুর দিকে কাউন্সেলিং করে রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ উভয়কে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণে আগ্রহী করতে পারলেও এখন পুরুষের হার কমে যাচ্ছে।

এই দুই ক্যাম্পে ৩৬টির মতো বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা কাজ করছে। তাদের নেতৃত্ব দিচ্ছে একশন এইড বাংলাদেশ। সংস্থার কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারহা কবির জানান, তারা শুরু থেকে কাজ করছেন এখানে। তারা (রোহিঙ্গরা) কী পরিমাণ ট্রমার মধ্যে ছিল তা অবিশ্বাস্য। তবে সেই অবস্থা থেকে এখন অনেকটাই বেরিয়ে এসেছে। আশ্রয়, নিরাপদ পানি ও স্বাস্থ্য সেবা পাচ্ছে। তিনি বলেন, এই রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর শিক্ষা ও সচেতনতা সেভাবে ছিল না। পাশাপাশি ধর্মীয় একটি বিষয়ও তাদের মধ্যে আছে। তাই তারা পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতিতে আগ্রহী হন না। আমরা তাদের সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য কাজ করছি। নারীদের মধ্যে এই পদ্ধতি  গ্রহণের হার বেশি।

ব্র্যাকের তথ্যমতে, এ দেশে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মধ্যে ৫ লাখ শিশু রয়েছে। গত এক বছরে ৭০ হাজার রোহিঙ্গা শিশুর জন্ম হয়েছে। এই বিশাল সংখ্যক শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সরকারের ‘মেটারনাল চাইল্ড হেলথ’ এবং ‘ইনফরমেশন এডুকেশন মেডিকেশন’ প্রকল্প কাজ করছে বলে জানালেন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য কর্মসূচি পরিচালক ডা. মোহাম্মদ শরিফ। তিনি বলেন, এখানে কার্যরত জাতিসংঘ সংস্থাগুলোর চাহিদামতো সরকার পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতির ক্ষেত্রে কোনো দীর্ঘ ও স্থায়ী পদ্ধতিতে যাচ্ছে না। এলাকায় ৫০ জন মিডওয়াইফ দেওয়া হয়েছে। ২২ রকমের ওষুধ দেওয়া হচ্ছে, ২৪ ঘণ্টা প্রসবের ব্যবস্থা আছে। রোহিঙ্গা ভাষায় পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি গ্রহণে সচেতনতা বৃদ্ধিমূলক নাটিকা প্রচার হচ্ছে। সরকার ক্যাম্পে দীর্ঘমেয়াদি পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতির প্রর্বতন নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করছে। অদূর ভবিষ্যতে তা কার্যকর হবে বলে তিনি জানান।

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
১৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং
ফজর৪:২৮
যোহর১১:৫৫
আসর৪:২১
মাগরিব৬:০৮
এশা৭:২১
সূর্যোদয় - ৫:৪৪সূর্যাস্ত - ০৬:০৩
পড়ুন