হারিয়ে যাওয়া বাচ্চা ভূত
আশিক মুস্তাফা২১ এপ্রিল, ২০১৭ ইং
হারিয়ে যাওয়া বাচ্চা ভূত
দুপুর রোদে ঝলসে যাচ্ছে এখলাসপুর বাজার। এই কাঠফাটা রোদে বাজারের ঠিক মাঝখানে কেটলি মাজছে ছেলেটা। উদাস উদাস ভাব। কপালে ঘাম নেই। তবু একটু পরপর বাঁ হাতের পিঠ দিয়ে কপালের ঘাম মোছে। হাতের পিঠ থেকে কালি লেগে যায় কপালে। সেদিকে খেয়াল নেই। কেটলি মেজেই যাচ্ছে আনমনে। দোকানের ম্যানেজার হারুন মিয়া বেশ কিছুক্ষণ তামাশা দেখে বললেন, ‘তুই কেটলি ঘইষ্যা নাই কইরা ফালাইবি নাকি?’ সম্বিত ফিরে পায় তুরং। অবশ্য তার এই নাম জানে না হারুন মিয়া। দোকানের অন্য কেউও না। সবার কাছে সে উদাস কবি নামে পরিচিত। এই বয়সী বাচ্চাদের কেউ কবি ডাকে না। কিন্তু তাকে ডাকে। দূর-দূরান্ত থেকে এই বাচ্চা কবিকে দেখতে আসে মানুষ। ‘ফুঁ দিয়া খা স্টোর’-এ বসে চা খায় আর ছেলেটার দিকে তাকিয়ে থাকে। একজন বলে, ‘আমাদের জাতীয় কবিও রুটির দোকানে কাজ কইরা কবিতা লিখতো। হারুন মিয়া, দেইখো, একদিন তোমার এই পোলাও বড় কবি হইয়া যাইবো। কবিতার লাইসেন্স পাইয়া যাইবো!’

উদাস কবির কবিতা পড়েন হারুন মিয়া—

 

‘ইচ্ছে করে মায়ের গায়ের গন্ধটাকে আকাশ দিয়ে ধরি

বাতাস দিয়ে ধরি

ফড়িং দিয়ে ধরি

ধরে ধরে মনের মতো রাঙিয়ে নিয়ে বুক পকেটে ভরি।’

 

সবাই বাহ্বা দেয়। কেউ কেউ তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে রাখে। তার মায়ের জন্য আফসোস করে। এসব ভালো লাগে না তুরংয়ের। সে এদের ভেতর তার দেশের লোকজন খোঁজে। পায় না। কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকে ফের কাজে লেগে যায়। ফুঁ দিয়া খা স্টোর ঝাড় দেওয়া, কেটলি মাজা, টেবিল মোছা, কাস্টমারদের পানি দেওয়া থেকে শুরু করে প্রায় সব কাজই করে। হারুন মিয়া বলেন, ‘পোলাটারে রাখার পর আমার আয়-উন্নতি হইছে। আগে তিনজন ছিল। তারা যেই কাজ করতে পারতো না, সে একলাই সব কাজ কইরা ফালায়।’

তুরং বোকাসোকা। কাজ ছাড়া কিছুই পারে না। কোথাও গেলে পথ চিনে সেই জায়গা থেকে ফিরতেও শেখেনি। আলাবোলা এই ভূতের বাচ্চা নিয়ে তার বাবা-মায়ের কষ্টের শেষ নেই! গত বৈশাখে এখলাসপুর এসেছিল। আমতলী মেলার সার্কাস দেখতে আর হাতির পিঠে চড়তে। বনের হাতিরা কথা শোনে না। পাগলা হয়ে দৌড়ায়। সার্কাসের হাতিরা পোষ মানা। ওলট-পালট করে না। তাই সে সার্কাসের হাতির পিঠে চড়বে। বাবা-মাকে বলেছিল এই কথা। মা চোখ রাঙিয়ে বলেছিলেন, ‘ওঁ মাঁ, কঁয় কিঁ গোঁ পোঁলা; ভূঁতের বাঁচ্চা হঁয়ে চঁড়বে হাঁতির পিঁঠে? তাঁও সাঁর্কাস তাঁবুতে? তুঁই ভূঁতপুরের মাঁনসম্মান শেঁষ কঁরবি রেঁ বাঁচ্চা, শেঁষ কঁরবি!’

মায়ের কথা শুনে মন খারাপ হয়ে যায় তুরংয়ের। এক রাতে ঠিকই ভূতপুর থেকে পালিয়ে চলে আসে। যেই আমগাছের নিচে মেলা বসে, সেই গাছের মগডালে বসে। দেখে, রাত জেগে শ্রমিকরা দ্য লায়ন সার্কাসের তাঁবু খাটাচ্ছে। আর একটু পরপর সার্কাসের গান গেয়ে উঠছে। ওমা, এর ভেতর কখন সকাল হয়ে গেল খেয়ালই করেনি সে। এখন উপায়? দিনের বেলায় কী করে ফিরতে হয় তা তো জা নে না সে। অদৃশ্য হওয়াও শিখতে পারেনি। তার বয়স হয়েছেই বা কত! সাত বছর এগার মাস নয় দিন। এই বয়সে এত কিছু শেখা যায়? দিনের আলো বাড়তে বাড়তে একেবারে সূর্য চলে এল মাথার ওপর। রোদের ধকল আর পেটের খিদে সামলাতে পারে না তুরং। তাঁবুর কাজ শেষ না হলেও বৈশাখী মেলা শুরু হয়ে যায়। সকাল থেকে নাকে এসে লাগছে ইলিশ মাছের ঘ্রাণ। ইলিশ ভাজা ঘ্রাণ ভূতদের খিদে বাড়িয়ে দেয়। তুরংয়েরও বাড়িয়ে দিলো। কী করবে সে বুঝতে পারছে না। ভয়ে ভয়ে মেলার একেবারে কোনায় ছোট্ট একটা দোকানে যায়। আলাউদ্দিন ভাত ঘর। গরম তাওয়ায় ভাজা হচ্ছে ইলিশ। ভেতরে খাওয়া হচ্ছে পান্তা-ইলিশ। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে একটা খালি চেয়ারে বসে পড়লো সে। পান্তা-ইলিশ খেয়ে হাঁটা ধরল। ম্যানেজার ডাক দিয়ে টাকা চাইল। আর অমনি সে ভ্যাঁ করে কেঁদে দিলো। কাঁদছে তো কাঁদছেই। ম্যানেজারও নাছোড়বান্দা। পরে এক লোক এসে তার টাকা দিয়ে দিলো। লোকটা তাকে নাম জিজ্ঞেস করল। সে কথা না বলে কাঁদতেই থাকল। রাজ্যের মানুষ জড়ো হলো। কেউই তাকে চেনে না। পরে আলাউদ্দিন ভাত ঘরের ম্যানেজার নান্টু মিয়া তার কাছে রেখে দিলো। আস্তে আস্তে তাকে কাজে লাগিয়ে দিলো। সার্কাসে যেতে দেয়নি আর। হাতির পিঠেও চড়া হলো না তার। এর ভেতর বন্ধ হয়ে যায় আলাউদ্দিন ভাত ঘর। দোকানের প্রায় সব কাজই শিখে যায় তুরং। তাতে কি, দোকান তো বন্ধ। খাবার নেই। রাস্তায় রাস্তায় ঘুরলো কয়েকদিন। জমানো কিছু টাকা ছিল, তা-ও শেষ। খাবারের অভাব। এর ভেতর ফুঁ দিয়া খা স্টোরের ম্যানেজার হারুন মিয়া তাকে এখলাসপুর বাজারের টিনের ইশকুলের বারান্দা থেকে তুলে এনে চাকরি দিয়ে দেন। ‘পেটে-ভাতে’ চাকরি। মানে কাজ করবে আর খাবে। কোনো টাকা-পয়সা পাবে না। এতেও শান্তি তুরংয়ের। সে যে বোকা ভূত! কাজ করে আর খায়। আর কবিতা লেখে। মায়ের কবিতা। এই দুপুর রোদে কেটলি মাজতে মাজতেও সে কবিতা বানাচ্ছে। মায়ের কবিতা। সার্কাস আর হাতির কবিতা!

তোমরা এই বোকাসোকা বাচ্চা ভূতটার দেখা পেলে তাকে একটু সার্কাসে নিয়ে যেও। হাতির পিঠে চড়তে দিও। আর? আর তাকে একটু ভূতপুরটা দেখিয়ে দিও!

 

এই পাতার আরো খবর -
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
২১ এপ্রিল, ২০১৮ ইং
ফজর৪:১৪
যোহর১১:৫৮
আসর৪:৩১
মাগরিব৬:২৫
এশা৭:৪১
সূর্যোদয় - ৫:৩৩সূর্যাস্ত - ০৬:২০
পড়ুন