ক্যালেন্ডারের ইতিকথা
মাজেদা বেগম মাজু১৪ জানুয়ারী, ২০১৫ ইং
ক্যালেন্ডারের ইতিকথা
নতুন ক্যালেন্ডার দিয়েই শুরু হয় নতুন বছর। অফিস, বাসগৃহের দেয়াল কিংবা টেবিলে শোভা পায় নানান রকমের মনোহারি ক্যালেন্ডার। ক্যালেন্ডার থেকে এক মুহূর্তের মধ্যেই জেনে নেয়া যায় দিন-মাস-বার কিংবা বছরের হিসেব। ক্যালেন্ডার যখন ছিল না তখন সঠিকভাবে সময় নির্ণয় করা ছিল বেশ দুরূহ একটি ব্যাপার। তাই সময় ও ক্যালেন্ডার পরস্পর নিবিড়ভাবে সম্পর্কযুক্ত। সময় হলো মানবজাতির মূল্যবান সম্পদ। এই সময়ের সঠিক ব্যবহারের ওপরই নির্ভর করে মানুষের উন্নতি ও অগ্রগতি। উন্নত দেশ ও জাতি সময়ের সঠিক ব্যবহার করে আজ উন্নতির চরম শিখরে অধিষ্ঠিত।

সঠিক সময় নির্ধারণের জন্য একেক সময় একেক পন্থা অবলম্বন করা হয়েছে। খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ অব্দে মিশরীয় জ্যোতির্বিদরা একটি বিশেষ পদ্ধতির মাধ্যমে দিবসকে ১২ ঘণ্টা ও রাত্রিকে ১২ ঘণ্টা হিসেবে ভাগ করে ২৪ ঘণ্টায় একটি পুরো দিন ধার্য করেন। গ্রিক দার্শনিক প্লেটো একটি বিশেষ পানির ঘড়ি তৈরি করেছিলেন। যা দেখে তিনি তাঁর আশ্রমের ছাত্রদের অধ্যয়ন করতে বলতেন। রোমান সিনেটররা তাদের বক্তৃতার সময় ঠিক রাখার জন্য পানির ঘড়ি ব্যবহার করতেন। এভাবে নতুন মানবসভ্যতার ক্রমবিবর্তনের সাথে সাথে মহাশক্তিশালী ব্রিটিশ নৌশক্তি ও নৌবাহিনী গোটা বিশ্বের এক মেরু থেকে অপর মেরুতে ছড়িয়ে পড়ে আর সেজন্যই ব্রিটেনকে বিশ্ব সময় হিসাবের কেন্দ্রবিন্দু ধরে বিশ্বের সময়সূচি ঠিক করা হয়। এই গ্রীনিচ সময় তত্ত্ব পরবর্তীতে আরো সঠিক হিসাবে আমাদের এই কাল পর্যন্ত এসেছে। ইংল্যান্ড ‘বিশ্বের গ্রীনিচ টাইম’-এর কেন্দ্রবিন্দু হয়েছে তাদের অতীত অসীম শক্তির বদৌলতে।

সময় নির্ণয়ের ইতিহাসের মতো ক্যালেন্ডারের জন্মের ইতিহাসও অতি সুপ্রাচীন। পূর্বে কৃষকরা তাদের ফসল উত্পাদনের নির্দিষ্ট সময় নির্ণয় করার জন্য ক্যালেন্ডারের প্রয়োজনীয়তা সবচেয়ে বেশি অনুভব করতো। রোমানরাই পৃথিবীতে প্রথম ক্যালেন্ডার তৈরির দাবিদার। পণ্ডিত পণ্ডিফোরাই ৭৫৬ অব্দে এটি আবিষ্কার করেন। চাষাবাদের ওপর ভিত্তি করে এ ক্যালেন্ডার প্রস্তুত করা হয় বলে এর মাসের সংখ্যা ছিল ১০। প্রবল শীতে ইউরোপে চাষাবাদ বন্ধ থাকতো বলে শীতের এই দু’মাস এতে ছিল না। শুক্লপক্ষের প্রথম চাঁদ দেখা দিলেই মাস গণনা শুরু হতো। এর নাম দেয়া হয় ‘ক্যালেন্দি’। আর ক্যালেন্ডার শব্দটির আবির্ভাব হয় এই ‘ক্যালেন্দি’ শব্দ থেকেই। ১০ মাসের ক্যালেন্ডারে দিনের সংখ্যা ছিল। ৩০৪। রোমান রাজা নুমপামপিলিয়াস ৭১৩ অব্দে ওই ক্যালেন্ডারে জুড়ে দেন বাকি দুটো মাস। এভাবেই পাওয়া গেল ১২ মাসে এক বছর। তবে বছর গণনা শুরু হতো যেদিন রাত ও দিন সমান অর্থাত্ বর্তমান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী মার্চের ২৫ তারিখ থেকে। (বর্তমান হিসাব অনুযায়ী দিনরাত সমান হয় ২১ মার্চ ও ২৩ সেপ্টেম্বর)। ৪৫১ অব্দে রোমের শাসনভার পরিচালিত হতো ১০ জন ম্যাজিস্ট্রেটের একটি পরিষদ যা ‘দিসেসভিরস’ নামে পরিচিত ছিল। এই পরিষদই প্রথম মার্চের পরিবর্তে জানুয়ারি থেকে বছর গণনা শুরু করার নির্দেশ দেন। এই পদ্ধতি চালু হতে সময় লাগলেও পৃথিবীর সবদেশেই এই পদ্ধতি গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে।

‘লিপইয়ার’-এর প্রচলন হয় রোমান সম্রাট জুলিয়াস সিজারের শাসনামল থেকে। জুলিয়াস সিজার আলেকজান্দ্রিয়া থেকে গ্রীক জ্যোতির্বিদ মোসাজিনিসকে নিয়ে আসেন ক্যালেন্ডার সংস্কারের জন্য। মোসাজিনিস দেখতে পান পৃথিবী সূর্যের চারদিকে প্রদক্ষিণে সময় নেয় ৩৬৫ দিন ৬ ঘণ্টা। ৩৬৫ দিনে বছর হিসাব করা হলে এবং প্রতি চতুর্থ বছরে ৩৬৬ দিনে বছর হিসাব করা হলে কোনো গরমিল থাকে না। মোসাজিনিস অতিরিক্ত একদিন যুক্ত এ বছরটির নাম দেন ‘লিপইয়ার’ এবং সংশোধিত এই ক্যালেন্ডারের নাম দেন ‘জুলিয়াস ক্যালেন্ড’যা দীর্ঘ সময় চালু ছিল। লিপইয়ার বা অধিবর্ষ কিন্তু প্রতি চার বছরেই একবার করে আসে না বরং কেবল সেই সালগুলোই লিপইয়ার বলে গণ্য হয় যেগুলো ৪ দিয়ে নিঃশেষে বিভাজ্য। কিন্তু লিপইয়ার সম্বন্ধে এটিই শেষ কথা নয়। শতবর্ষগুলোকে (যেমন ১৯০০, ২০০০, ২১০০) ৪ দিয়ে নয় ৪০০ দিয়ে নিঃশেষে ভাগ করে গেলেই তবে তা লিপইয়ার বলে গণ্য হবে এবং সালের ফেব্রুয়ারিতে ২৮দিনের বদলে ২৯ দিন হবে।

মূল ৩৪৫ অব্দে রোমান কনসালের কার্যভার গ্রহণের সময় থেকেই জুলিয়াস ক্যালেন্ড-এর কার্যকারিতা শুরু হয়। পরবর্তীকালে রোমান পণ্ডিত এগমাকিউলাস যীশুখ্রিস্টের জন্মের ৫৩২ বছর পর যীশুর জন্মের বছর থেকে সাল গণনার প্রস্তাব দেন। অনেক পরে ১৫৮২ সালে আরেক রোমান পণ্ডিত পোপ ত্রয়োদশ গ্রেগরী হিসাব করে দেখেন একটি বছর পূর্ণ হয় ৩৬৫ দিন ৫ ঘণ্টা ৪৮ মিনিট ৪৭ সেকেন্ডে কিন্তু জুলিয়াস ক্যালেন্ডারে ১১ মিনিট ১৩ সেকেন্ড বেশি ধরা হয়েছে। ফলে ১২৮ বছরে পুরো একটি দিনই হেরফের হয়ে যায়। তাই এই অসুবিধা দূর করতে গ্রেগরী ১৫৮২ খ্রিস্টাব্দের ৪ অক্টোবর তারিখটি পাল্টে ১৫ অক্টোবর নির্ধারণ করে দেন। এই নতুন ক্যালেন্ডারের নাম দেয়া হয় ‘গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার’। পরবর্তীতে ক্যালেন্ডারের এই এই সর্বশেষ সংস্করণ সকল দেশ গ্রহণ করে।

রোমানদের হাতে ক্যালেন্ডারের জন্ম ও বিকাশ হয়েছে বলে এর বারটি মাসের নামে বেশির ভাগই রোমান দেবতা বা সম্রাটের নামে। জানুয়ারি মাসের নাম রোমান দেবতা ‘জানুস’-এর নামানুসারে। ‘জানুস’ অর্থ ‘দুটি মুখ’। যার একটি পেছনে অপরটি সামনের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। অর্থাত্ তিনি পেছনের দিনগুলোর অভিজ্ঞতা ধারণ করে সামনের দিকে দৃষ্টি প্রসারিত করছেন। নববর্ষের সূচনালগ্নটিও অতীত ও ভবিষ্যতের সম্মিলন ঘটায়। ফেব্রুয়া থেকে এসেছে ফেব্রুয়ারি যার অর্থ পবিত্র। রোমান দেবতা মার্সিয়াস মার্শিয়াস, এপ্রিনিস্ত মাইসা ও জুনোর নামে যথাক্রমে মাচ, এপ্রিল, মে এবং জুন মাসের নামকরণ করা হয়। জুলাই ও আগস্ট মাসের নাম ছিল কুইন্টিলিস ও সেক্স টিলিস অর্থাত্ পঞ্চম ও ষষ্ঠ। সম্রাট সিজার কুইন্টিলিসের নাম দিলেন জুলিয়াস যা থেকে পরবর্তীতে জুলাই এসেছে এবং তার পুত্র অগাস্টাস সিজার পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে সেক্সটিলিন মাসটির নাম দিলেন অগাস্টাস যা থেকে হলো আগস্ট মাস। উভয় সম্রাটই মাস দুটিকে ৩০ দিনের পরিবর্তে ৩১ দিনে হিসাব করার নির্দেশ দেন ফলে রোমান পণ্ডিতগণ বাধ্য হয়ে ফেব্রুয়ারি ২৮ দিন করেন। পরবর্তী মাসগুলো সেপ্টেম্বর, অক্টোবর, নভেম্বর ও ডিসেম্বর এসেছে ল্যাটিন সংখ্যা থেকে। এদের মান হলো সপ্তম, অষ্টম, নবম ও দশম। এই ক্রমমান প্রথম দিককার ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ঠিক থাকলেও বর্তমানে প্রচলিত ক্যালেন্ডারের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।বর্তমানে ফেব্রুয়ারি ২৮ দিনে এবং লিপইয়ার ২৯ দিনে হয়। তাছাড়া, জানুয়ারি, মার্চ, মে, জুলাই, আগস্ট, অক্টোবর ও ডিসেম্বর হলো ৩১ দিনে। বাকি মাসসমূহ ৩০ দিনে গণনা করা হয়।

বর্তমানে প্রচলিত গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ১ জানুয়ারিকে নতুন বছরের প্রথম দিন হিসেবে উদযাপন করা হয় ১৫৮২ সালে। এরপর থেকে আস্তে আস্তে ১ জানুয়ারি নববর্ষ হিসেবে জনপ্রিয়তা লাভ করে। ১৭৫২ সাল থেকে আমেরিকা ও ব্রিটেন ১ জানুয়ারিতে নববর্ষ পালন করা শুরু করে। তবে এটি কোনো ইংরেজি নববর্ষ নয়। কারণ ব্রিটিশরা যেহেতু পার্লামেন্টে আইন পাস করে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারকেই নিজেদের ক্যালেন্ডার হিসেবে গ্রহণ করে তাই এ ক্যালেন্ডারকে কোনোভাবেই ইংরেজি ক্যালেন্ডার বলা যাবে না। পরবর্তীকালে আন্তর্জাতিকভাবে বহুদেশে গৃহীত হওয়ার ফলে এর মর্যাদা ও গুরুত্ব ব্যাপ্তি লাভ করে। তবে এটি মূলত রোমান বা গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার। একে ইংরেজি ক্যালেন্ডার বা এর প্রথম দিনকে ইংরেজি নববর্ষ বলা তাই কোনোভাবেই সমীচীন হবে না। ১ জানুয়ারি মূলত রোমান ক্যালেন্ডারের নববর্ষ বা আন্তর্জাতিক নববর্ষ।

বিশ্বের প্রায় সর্বত্র গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার প্রধান হিসেবে চালু থাকলেও নানান জায়গায় আরও প্রায় ৪০ ধরনের ক্যালেন্ডার ব্যবহূত হচ্ছে। এসব ক্যালেন্ডারে কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য থাকলেও মূলত ১২ মাসেই বছর নির্ধারিত হয়ে থাকে। তবে এই ব্যাপারে একটি অবাক করা বিষয় হলো উত্তর-পূর্বে  আফ্রিকার প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র ইথিওপিয়ার ক্যালেন্ডারে। এই ক্যালেন্ডারে বছর পূর্ণ হয় ১৩ মাসে অর্থাত্ ইথিওপিয়া এটি ১৩ মাসের দেশ এবং এটিই তাদের প্রধান ক্যালেন্ডার। এই ক্যালেন্ডারে মিসরের আলেকজান্দ্রিয়া বা কপটিক ক্যালেন্ডারের মতোই প্রতিটি মাস ৩০ দিনে হওয়ায় বছরে ৫ অথবা ৬টি দিন অতিরিক্ত থেকে যায় যা সেখানে তাদের ১৩তম মাসের দিন হিসেবে গণ্য করা হয়।

ব্যবহারের সুবিধার্থে অন্যান্য ক্যালেন্ডারের মত রয়েছে বিভিন্ন ধরনের পকেট ক্যালেন্ডার। প্রায় দশ হাজার বছরের পুরোনো এই ধরনের একটি পকেট ক্যালেন্ডার আবিষ্কৃত হয়েছে পূর্ব সার্বিয়ার স্মেদেরেভস্কা পালাঙ্কায় (Smederevska Palanka) যা মানবসভ্যতার পূর্ব পুরুষ বলে খ্যাত নিওলিথিক সভ্যতার ঐতিহ্যের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। দেখতে কলার মতো বন্য শূকরের দাঁত থেকে তৈরি এই ক্যালেন্ডারে মোট ২৮টি ভাগ আছে যা চাঁদের বিভিন্ন দশার হিসাব রাখতে সাহায্য করে। প্রত্নতত্ত্ববিদদের ধারণা মতে বিশ্বের প্রথম পকেট ক্যালেন্ডার হিসেবে আখ্যায়িত এই ক্যালেন্ডারটি কৃষিকাজের সাথে নির্দিষ্ট এবং আবহাওয়ার গভীর সম্পর্ক থাকায় চাঁদের অবস্থান থেকে আদিম মানুষদের কাছে শস্য বোনার সবচেয়ে ভালো দিনটি হিসাব করে বের করার জন্য তৈরি করা হয়েছিল।

এই পাতার আরো খবর -
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
১৪ জানুয়ারী, ২০১৮ ইং
ফজর৫:২৩
যোহর১২:০৮
আসর৩:৫৭
মাগরিব৫:৩৫
এশা৬:৫২
সূর্যোদয় - ৬:৪২সূর্যাস্ত - ০৫:৩০
পড়ুন