ঐতিহাসিক সেই ভাষণের আগে ও পরে
আসিফুর রহমান সাগর০৭ মার্চ, ২০১৬ ইং
ঐতিহাসিক সেই ভাষণের আগে ও পরে
১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ। সফেদ পাজামা-পাঞ্জাবি আর হাতকাটা কালো কোট পরে দৃঢ়তার সঙ্গে হেঁটে এসে মঞ্চে দাঁড়ালেন দীর্ঘদেহী এক বাঙালি। তিনি সঙ্গে নিয়ে এসেছেন সাড়ে সাত কোটি বাঙালির ভবিষ্যত্, আত্মসম্মান ও অধিকার আদায়ের মন্ত্র। পুরো জাতি তাঁর বজ্রনির্ঘোষ সেই উচ্চারণ শোনার প্রতীক্ষায় উদগ্রীব। সেই ভাষণ শুনতে ঢাকার প্রতিটি বাড়ির প্রতিটি ছেলে এসে উপস্থিত রেসকোর্স ময়দানে। ধারণা করা হয়, সেদিন রেসকোর্সে তথা আজকের সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ১০ লাখ মানুষের সমাগম হয়েছিল। শুধু ঢাকা নয় সারাদেশের মানুষ উন্মুখ হয়ে বসেছিল সেই ভাষণের প্রতীক্ষায়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সেদিনের সেই ভাষণ শুধু বাংলার নয়, পৃথিবীজুড়ে মানবমুক্তির আন্দোলনের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী অধ্যায়। আর বঙ্গবন্ধু মানুষের সেই মুক্তির আন্দোলনের চিরপ্রেরণার প্রতীক। বাঙালির অবিসংবাদিত এই নেতা ৭ই মার্চের ভাষণে কী বলেছিলেন, যে ভাষণের দিক-নির্দেশনায় বাঙালি জাতি মরণপণ মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে বিজয় ছিনিয়ে এনেছিল– তা আজ আর কারো অজানা নয়। কিন্তু সেদিন এই ভাষণের আগে তার প্রস্তুতি কি ছিল। কেমন কাটছিল ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে স্বপ্নদ্রষ্টা, জাতির জনকের মুহূর্তগুলো?

রুদ্ধদ্বার বৈঠক:সেদিন সকাল থেকেই ৩২ নম্বরে নেতাকর্মীদের ভিড় জমে ওঠে। বঙ্গবন্ধু লাইব্রেরি রুমে সৈয়দ নজরুল ইসলাম, এ এইচ এম কামরুজ্জামান, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, খন্দকার মোশতাক আহমেদ, তাজউদ্দিন আহমদ ও ড. কামাল হোসেনকে নিয়ে রুদ্ধদ্বার বৈঠকে মিলিত হন। দীর্ঘ বৈঠক শেষে বেরিয়ে এসে ঢুকেন বসার ঘরে। অপেক্ষমান নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে বলেন, তারা ঐকমত্যে পৌঁছেছেন এবং বিকালে রেসকোর্সের সভায় দেশে বিরাজমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়ে চার দফার ঘোষণা দেয়া হবে। এরপর সবাই যে যার বাড়িতে চলে যান। দুপুরের খাবার শেষে বঙ্গবন্ধু যখন বিশ্রাম নিচ্ছিলেন তখন ড. কামাল হোসেন ঘোষণাপত্রের খসড়া দেখিয়ে নিয়ে যান। এসময় বঙ্গবন্ধু এম এ ওয়াজেদ মিয়াকে টাইপ কপির সঙ্গে মূল কপিটি মিলিয়ে দেখার নির্দেশ দেন।

কী ছিল সেই ঘোষণা পত্রে :‘রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেবো। এই দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাহআল্লাহ। এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম...’ — বঙ্গবন্ধুর ৭ ই মার্চের ভাষণে মন্ত্রের মত সেইসব উচ্চারণ আজো প্রতিটি বাংলাদেশিকে উদ্বেলিত করে। যে কোনো আন্দোলনে তাঁর সেই জলদগম্ভীর কণ্ঠস্বর প্রেরণা জোগায়। অথচ সেদিন যখন ভাষণের ঘোষণাপত্র তৈরি হচ্ছিল সেখানে বঙ্গবন্ধুর ভাষণের এসব  কোনো কথাই ছিল না।

এই ঘোষণাপত্র প্রসঙ্গে বিস্তারিত উঠে এসেছে এম এ ওয়াজেদ মিয়ার ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে নিয়ে কিছু ঘটনা ও বাংলাদেশ’ শীর্ষক স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থে। সেদিন ৭ই মার্চে ঘোষণাপত্রের চূড়ান্ত কপিটি মিলিয়ে দেখার এক পর্যায়ে তিনি খন্দকার মোশতাককে জিজ্ঞেস করেন, ‘ইশতেহারে স্বাধীনতার ঘোষণার কথা উল্লেখ করা হয়েছে কিনা।’ জবাবে মোশতাক বলেন,  ‘সামরিক শাসনের ক্ষমতাবলে জারীকৃত আইনগত কাঠামোর অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়ে ঢাকায় বসে পাকিস্তানের অখণ্ডতা লঙ্ঘন সংক্রান্ত বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করার ব্যাপারটি খুব ঝুঁকিপূর্ণ। সুতরাং, এই ব্যাপারটা ইশতেহারে লেখা হয়নি।’

সেদিনের ইশতেহারে ইয়াহিয়া খানের নিকট দাবি করা হয়: ১. সমস্ত সামরিক বাহিনীর লোকদের ব্যারাকে ফিরিয়ে নিতে হবে। ২. পহেলা মার্চ হতে আন্দোলনে যে সমস্ত ভাই-বোনকে হত্যা করা হয়েছে, সে বিষয়ে একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত কমিশন গঠনের মাধ্যমে তদন্ত করে দায়ী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করতে হবে। ৩. সামরিক আইন অবিলম্বে প্রত্যাহার করে নিতে হবে। ৪. অবিলম্বে জনগণের দ্বারা নির্বাচিত পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতাপ্রাপ্ত দলের নেতার কাছে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে।

রেসকোর্সের পথে: সাধারণত ৩২ নম্বর থেকে বের হয়ে বর্তমান রাসেল স্কোয়ার দিয়েই বের হতেন বঙ্গবন্ধু। কিন্তু সেদিন  সে পথে যাননি। বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত সহযোগী গোলাম মোরশেদ গাড়ি চালাচ্ছিলেন। তাকে বঙ্গবন্ধু বলেন, সাত মসজিদ দিয়ে চলো। তখন সাত মসজিদ রোড দিয়ে জিগাতলা হয়ে রেসকোর্সে রওয়ানা হন তিনি। রওয়ানা হওয়ার আগে বঙ্গবন্ধু কয়েকজন নেতাকর্মীকে ডেকে বলেন, ‘ইশতেহারটি সাংবাদিকদের মাঝে বিলি করবে।’ তার গাড়ি যখন জিগাতলার কাছে তখন গোলাম মোরশেদ বঙ্গবন্ধুকে জিজ্ঞেস করেন, ‘আজ কী বলবেন?’ উত্তরে বঙ্গবন্ধু জানিয়েছিলেন, ‘আল্লাহ আমাকে দিয়ে যা বলাবেন, তাই বলব।’

ভাষণ সম্প্রচার হঠাত্ বন্ধ :সেদিন রেসকোর্সে নৌকা আকৃতির সভামঞ্চটি স্থাপন করা হয়েছিল বর্তমান শিশুপার্কের দক্ষিণ-পূর্ব অংশে। বঙ্গবন্ধু বেরিয়ে যাওয়ার পর একটি গাড়ি নিয়ে শেখ হাসিনাসহ অন্যদের নিয়ে যাত্রা করেন ওয়াজেদ মিয়া। মঞ্চের কাছাকাছি পৌঁছে শেখ হাসিনা রেডিও অন করতে বলেন। বঙ্গবন্ধুর ভাষণ সম্প্রচারের কথা এ সময় রেডিওতে বারবার ঘোষণা করা হচ্ছিল। কিন্তু ভাষণ শুরু হওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই রেডিও নিস্তব্ধ। সম্প্রচারের অনুমতি থাকলেও সরকারের তাত্ক্ষণিক  নির্দেশে ভাষণ সম্প্রচার বন্ধ করে দেয়া হয়। সেদিন রাতে ইকবাল বাহার চৌধুরীর নেতৃত্বে রেডিও পাকিস্তান কেন্দ্রের সকল কর্মকর্তা ৩২ নম্বরের বাসায় এসে বঙ্গবন্ধুকে জানান যে এ ভাষণ সম্প্রচার করতে না দেয়া পর্যন্ত তারা কাজে যোগ দেবেন না। এদিন রেডিও পাকিস্তানের সকল অনুষ্ঠান বন্ধ ছিল। ৮ মার্চ সকাল ৮টায় পাকিস্তান রেডিও ঢাকা কেন্দ্র থেকে ঘোষণা করা হয় যে ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানের ভাষণ হুবহু সকাল ৯টায় প্রচার করা হবে।

‘আজ থেকে তোমরা প্রতিদিন দুবেলা আমার সঙ্গে খাবে’:৭ মার্চ রাত, বঙ্গবন্ধুর বাসভবন। পুরো পরিবার নিয়ে খেতে বসেছেন বঙ্গবন্ধু। এ সময় বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব, শেখ হাসিনা, ওয়াজেদ মিয়া, শেখ কামাল, শেখ জামাল, রেহানা, রাসেল, শেখ শহীদ উপস্থিত ছিলেন। তিনি এ সময় গম্ভীর কণ্ঠে বলেন, ‘আমার যা বলার ছিল আজকের জনসভায় তা প্রকাশ্যে বলে ফেলেছি। সরকার এখন আমাকে যে কোনো মুহূর্তে গ্রেফতার করতে পারে। সে জন্য আজ থেকে তোমরা প্রতিদিন দুবেলা আমার সঙ্গে খাবে।’ সেদিন থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত প্রতিদিন পুরো পরিবার তার সঙ্গে খেয়েছেন।

ভাষণ রেকর্ড হলো যেভাবে: বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ক্যামেরায় ধারণের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছিলেন পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম করপোরেশনের চেয়ারম্যান এ এইচ এম সালাহউদ্দিন এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম আবুল খায়ের এমএনএ। তারা আগেই সিদ্ধান্ত নেন, যেভাবেই হোক ভাষণের রেকর্ডিং করতে হবে। একই সঙ্গে দৃঢ় ছিলেন সরকারের ফিল্ম ডিভিশনের (ডিএফপি) কর্মকর্তা (পরে অভিনয়শিল্পী হিসেবে খ্যাত) মরহুম আবুল খায়ের। তিনি ভিডিও ক্যামেরা বিশেষজ্ঞ ছিলেন। তার সঙ্গে তখন অভিজ্ঞ টেকনিশিয়ান ছিলেন এনএইচ খন্দকার। সিদ্ধান্ত হয় যে আবুল খায়ের এমএনএ-র তত্ত্বাবধানে এনএইচ খন্দকার মঞ্চের নীচে তার যন্ত্রপাতি নিয়ে বক্তৃতা ধারণ করবেন এবং আবুল খায়ের মঞ্চের এক পাশে ক্যামেরা নিয়ে চিত্র ধারণ করবেন। কিন্তু ক্যামেরার আকার বড় থাকায় তিনি খুব বেশি নড়াচড়া করতে পারছিলেন না। সে কারণে তিনি একটা দূরত্বে থেকে একই অবস্থানে দাঁড়িয়ে বক্তৃতার দৃশ্য যতটুকু পেয়েছেন ততটুকুই ধারণ করেছেন। ফলে দেখা যায় বক্তৃতার ভিডিও দৃশ্যটি মাত্র ১০ মিনিটের। অন্যদিকে আবুল খায়ের এমএনএ-র তত্ত্বাবধানে মঞ্চের নীচে এএইচ খন্দকার সম্পূর্ণ ভাষণের কথাই রেকর্ড করতে সক্ষম হলেন। বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শেষে ফিল্ম করপোরেশনের চেয়ারম্যান এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক ভাষণটির একটি রেকর্ড প্রকাশের ব্যবস্থা দ্রুত সম্পন্ন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে আবুল খায়ের এমএনএ ভাষণের একটি রেকর্ড নিয়ে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে হাজির হন। তিনি এর একটি কপি উপহার দিলে বঙ্গবন্ধু অভিভূত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুই এত বড় কাজ কীভাবে করলি?’

‘পুরাতন পাকিস্তানের ইতি’: দ্বি-জাতি তত্ত্বের ওপর প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তানের অখণ্ডতা থাকছে না এবং সামরিক জান্তাদের হস্তক্ষেপের ফলে জিন্নাহর সৃষ্ট এই রাষ্ট্রটির মৃত্যু যে অনিবার্য তা একাত্তরের মার্চের প্রথম সপ্তাহেই ভবিষ্যত্ বাণী করেছিলেন সাংবাদিক ডেভিড লুসাক। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের মাত্র এক দিন পর একাত্তরের ৮ মার্চ লন্ডনের ‘দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফ’ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘পুরাতন পাকিস্তানের ইতি’ শিরোনামে একটি রিপোর্টে তিনি এই মন্তব্য করেন।

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
৭ মার্চ, ২০১৭ ইং
ফজর৫:০০
যোহর১২:১০
আসর৪:২৬
মাগরিব৬:০৮
এশা৭:২০
সূর্যোদয় - ৬:১৫সূর্যাস্ত - ০৬:০৩
পড়ুন