সপ্তাহের বিশেষ প্রতিবেদন
প্রাকৃতিক চাষাবাদের প্রত্যয়ে ‘মুক্তকৃষি’
বারেক কায়সার১৮ ফেব্রুয়ারী, ২০১৭ ইং
প্রাকৃতিক চাষাবাদের প্রত্যয়ে ‘মুক্তকৃষি’
গ্রামের আর দশটা সাধারণ ছেলের মতোই শৈশব কেটেছে মাটি আর ফসলের সঙ্গে। পুরোদস্তুর গৃহস্থ পরিবাবের ছেলেটি প্রাইমারি স্কুলে থাকতেই বাড়ির পাশের জমিতে দাদার সঙ্গে কাজ করেছে সবিজক্ষেতে। ধানের ক্ষেতে ‘কামলার’ খাবার পৌঁছে দিতে গিয়ে পৌষের শীতে নেমে পড়েছে এক হাঁটু কাদায়। গরু চরিয়েছে রাখাল বালকের মতো। বলছিলাম তপু রায়হানের কথা।

সেই থেকেই কৃষির প্রতি ভালোলাগা, কৃষিকাজে আগ্রহ। তবে স্কুল বাদ দিয়ে ওই সময় মাটির ভালোবাসায় ততোটা সাড়া দেওয়ার সাহস হয়নি তার। আর আট-দশটা নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানের মতোই ছুটতে হয়েছে স্কুলে, কলেজে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে। তবে শিক্ষাজীবনে ছুটি পেলেই গ্রামে কেটেছে তার সময়। মৌসুমী সব ফসলেরই কোনো না কোনো সময়ে কিছু না কিছু কাজ করা ছিলো তার নেশা।

গত শতকের শেষ দশকে যখন দেখেছে ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে চিরচেনা কৃষির ধরণ, পদ্ধতি– সে বিচলিত হয়েছে। ভেবেছে কি করা যায়! এই ভাবনার এক পর্যায়ে কলেজের গণ্ডি পেরিয়ে সাংবাদিক হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে ভর্তি হওয়া। মানুষের জন্য, দেশের জন্য কিছু করার তাগিদে যুক্ত হয় একটি ছাত্র সংগঠনে। কিন্তু কিছুদিন পর বুঝতে পারে সত্যিকারের জনকল্যাণ এ দিয়ে সম্ভব নয়। বিভাগের বন্ধুপ্রতিম বড়ভাই দেলোয়ার জাহান, সুদীপ্ত শর্মার সঙ্গে ভাবনা বিনিময় শুরু হয়। অনেক আড্ডা আর বৈঠক। তাদের সেইসব আড্ডার বিষয় বাংলাদেশের গণমাধ্যম ও তার চরিত্র, গণমাধ্যমে প্রান্তিক মানুষের উপস্থাপন, যে কৃষির ওপর দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশ সেই কৃষিকে কিভাবে সংবাদমাধ্যমে তুলে ধরা হচ্ছে এসব নিয়ে। সত্যিকারের কোনো কিছু করার আগেই ফুরিয়ে গেল ক্যাম্পাসের সময়। এরপর  গতানুগতিক স্বপ্নের হাত ধরে একটি জাতীয় দৈনিকে চাকরি শুরু। কিন্তু দিনে দিনে প্রান্তিক মানুষের জন্য কিছু করার তাগিদ জোরালো হয়। একটা প্ল্যাটফর্ম দাঁড়ায়।

রাসায়নিক সার আর কীটনাশকের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে কৃষিকে রক্ষার আন্দোলন হিসেবেই শুরু হয় সংগঠন ‘প্রাকৃতিক কৃষি’। এই সংগঠনের সঙ্গেই মানিকগঞ্জ, ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে শুরু হয় কাজ। কাজের স্বার্থে ঢাকার সাংবাদিকতা ছেড়ে দিয়ে ২০১৪ সালে তপু রায়হান চলে যান গ্রামে। গ্রামে গ্রামে ঘুরে কৃষকের সঙ্গে ভাবনার বিনিময় করে বুঝতে পারেন প্রাকৃতিক চাষাবাদেই ফিরতে হবে আমাদের সকলকে। তবে সংগঠন ‘প্রাকৃতিক কৃষি’ যখন দাঁড়াচ্ছে, তপু রায়হান দৌঁড়ে বেড়াচ্ছেন দেশের এ জেলা, সে জেলায় তখনই প্রতিবন্ধকতা আসে। ‘প্রাকৃতিক কৃষির’ কাজ বাদ দিয়ে ২০১৫ সালের মাঝামাঝি চলে যান চট্টগ্রামে। সেখানেই শুরু হয় তার নতুন স্বপ্ন, নতুন উদ্যোগ ‘মুক্তকৃষি’।

চট্টগ্রামে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠী মোস্তাফিজুর রহমান, বড়ভাই সুদীপ্ত শর্মা, বন্ধু অর্ণব চৌধুরী, আসবাবির রাফসানকে নিয়ে কাজ শুরু হয় নতুন উদ্যমে। রাঙামাটির বেতবুনিয়ায় শুরু হয় প্রথম মাঠ পর্যায়ের কাজ। উপত্যকার এক টুকরো জমিতে বোনা হয় ‘মুক্তকৃষির’ স্বপ্নের বীজ। সংগঠনে যুক্ত হন আরো নতুন সদস্য। উদ্যমী সদস্য জাকের আহমেদের উদ্যোগে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে গড়ে তোলা হয় নতুন খামার। শুরু হয় চট্টগ্রামের রাসায়নিক সার ও বিষমুক্ত ফসলের বিপণন। বড় পরিসরে না হলেও বিপণন চলছে সেখানে।

বাস্তবতার সঙ্গে যুদ্ধে পেরে না ওঠা তপু রায়হান আবার ফেরেন ঢাকায়। সাংবাদিকতার চাকরি শুরু করেন নতুন করে। তবে কৃষি নিয়ে স্বপ্ন দেখা থামেনি। চেষ্টা কমেনি। ২০১৬ সালের শেষের দিকে ঢাকায় শুরু হয় ‘মুক্তকৃষির’ কাজ। ঢাকার অদূরে কেরানীগঞ্জ উপজেলার কলাতিয়ায় বন্ধকী জমিতে প্রাকৃতিক চাষাবাদ শুরু হয় আবার। আগের সংগঠনের কর্মী বাদশা আর দারুলও যুক্ত হয় কাজে। কলাতিয়ার সেই জমিতে এখন চলছে নতুন স্বপ্ন নির্মাণের আপ্রাণ চেষ্টা। পাশের জমির মালিকরাও উত্সাহিত হচ্ছেন প্রাকৃতিক চাষাবাদে। সেখানে জৈব কৃষি করা কয়েকজন উদ্যোক্তার মধ্যেও এসেছে নতুন উদ্যম। ‘মুক্তকৃষির’ উদ্যোগে রাসায়নিক সার ও বিষমুক্ত ফসলের বিপণনও হচ্ছে ঢাকায়।

‘মুক্তকৃষি’ কোন ধরনের সংগঠন? উদ্যেক্তা তপু রায়হান জানান, ‘মুক্তকৃষি’ কৃষি, কৃষি সংস্কৃতি, কৃষি বিপণন নিয়ে কাজের জায়গা। প্রাকৃতিক ফসলের উত্পাদন, বিপণন ও সমপ্রসারণের প্রচেষ্টা। এক কথায়, প্রাণ ও প্রকৃতি রক্ষার সামাজিক উদ্যোগ, অলাভজনক প্রতিষ্ঠান। একে আমরা কৃষি আন্দোলন হিসেবেই দেখি।

‘মুক্তকৃষির’ কাজের ধরন

ঢাকার কলাতিয়ায় ‘মুক্তকৃষি’ খামারে একজন খামার পরিচালক ও মাসিক পারিশ্রমিকের বিনিময়ে একজন কৃষিশ্রমিক রয়েছেন। তারা সেখানে প্রাকৃতিক ব্যবস্থাপনায় ফসল ফলানোর চেষ্টা করে যাচ্ছেন। কেঁচো সার, গোবর, জীবামৃত নামের তরল সার, মেহগনি বীজ, নিমের পাতা ও ছাল, সরিষার খৈলসহ প্রকৃতিতে পাওয়া নানা উপাদান ব্যবহার করছেন ফসল ফলাতে ও রক্ষা করতে। মূলত নানা হারে সদস্যের চাঁদার টাকায় চলছে সংগঠন। ‘মুক্তকৃষি’ নিয়মিত তার কাজের এলাকার কৃষকদের সঙ্গে বৈঠক করে। সেখানে কৃষকদের সঙ্গে কৃষিজ্ঞানের বিনিময় হয়, তর্ক হয়। নতুন সম্ভবানা বেরিয়ে আসে।

 তপু রায়হান এবং তার সংগঠনের সদস্যরা বিশ্বাস করেন, সংগঠন একসময় অবশ্যই সফল হবে, হয়তো এক বছরের জায়গায় দুই বছর লাগবে। কেন করছেন এই ধরনের চাষাবাদ? তপু রায়হান বললেন, আগেই বলেছি মুক্তকৃষি প্রাণ ও প্রকৃতি রক্ষার সামাজিক উদ্যোগ। গত শতকের শেষভাগে এসে সারাবিশ্বেই রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার ব্যাপক হারে বেড়েছে। রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহারে প্রকৃতির ভারসাম্য যেমন নষ্ট হয়েছে তেমনি মানবস্বাস্থ্যের জন্য তা হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশে এখন যে ফসল উত্পাদন হয় তার প্রায় ৯০ শতাংশের বেশিই হয় রাসায়নিক সার ও কীটনাশক দিয়ে। আর এই ফসল খেয়ে নানা ধরনের শারীরিক সমস্যায় পড়ছে মানুষ।

কৃষি গবেষকদের মতে, আরো কয়েক দশক ধরে যদি ‘কনভেনশনাল কৃষি’ চলতে থাকে তবে মাটি পুরোপুরি উর্বরা শক্তি হাবারে। তখন বাড়তি রাসায়নিক সার ও কীটনাশক দিয়েও আর ফসল ফলানো সম্ভব হবে না। তখন সারা বিশ্বের খাদ্য নিরাপত্তা চরম হুমকির মুখে পরবে।

আমাদের দেশে ৫০-৬০ বছর আগে কৃষিতে কীটনাশকের ব্যবহার ছিল অকল্পনীয়। কিন্তু ২০১৬ সালের শেষর দিকে এক গবেষণায় দেখা গেছে, রাজধানীতে যেসব ফসল ও ফলমূল আসে তার মধ্যে ৩৫ শতাংশ ফল ও ৫০ শতাংশ শাক-সবিজর নমুনাতে বিষাক্ত কীটনাশক আছে। আমাদের কৃষির যখন এই অবস্থা তখন প্রকৃতির জন্য, প্রাণের জন্য ভালোবাসা আর দায় থেকেই প্রাকৃতিক চাষাবাদের এই উদ্যোগ।

প্রাকৃতিক চাষাবাদে যেহেতু ‘কনভেনশনাল কৃষি’র তুলনায় উত্পাদন অনেক কম তাই এই ব্যবস্থায় কৃষি করলে তা দিয়ে দেশের বিপুল মানুষের খাদ্য চাহিদা মেটানো সম্ভব? প্রাকৃতিক চাষাবাদে তুলনামূলক উত্পাদন কম তা ঠিক। তবে তার মানে এই নয় যে তা আমাদের চাহিদা মেটাতে পারবে না। দেশে বর্তমানে চাষযোগ্য জমির মধ্যে তিন দশমিক ২৩ লাখ হেক্টর জমি পতিত আছে। এই জমিতে কম পরিমাণে ফসল উত্পাদন হলেও তা অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাহিদা পূরণে ভূমিকা রাখতে পারে। এছাড়া দেশের মোট আবাদি জমির ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ জমি লবণাক্ত। এই সমস্ত জমিতে ভাসমান পদ্ধতিতে চাষাবাদ  করলে খাদ্য উত্পাদন বাড়বে।

তাছাড়া দেশের নদী এলাকায় হাজার হাজার হেক্টর জমি পতিত আছে। পাহাড়ি এলাকায় রয়েছে লাখো হেক্টর জমি। জৈব প্রযুক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে এইসব জমিতে উচ্চ ফলনশীল জাত চাষ করলেও তাতে খাদ্য উত্পাদন অনেকটা বাড়বে। আমাদের দেশে এক কোটি ১৮ লাখ বসতভিটা আছে। এসব বসতভিটার প্রতি ইঞ্চি জায়গায় চাষ করা সম্ভব। তাই বাড়ির আঙিনায় চাষাবাদ করেও খাদ্য নিরাপত্তার হুমকি মোকাবেলা করা সম্ভব। কৃষক কি এই অল্প উত্পাদন করে টিকে থাকতে পারবে? কৃষক টিকে থাকবেন। কারণ প্রাকৃতিক চাষাবাদে ফসল কম আসলেও খরচও কম। যেমন ‘কনভেনশনাল কৃষিতে’ ৩৩ শতাংশ জমিতে বোরো জাতের ধানচাষের খরচ গড়ে ১২ থেকে ১৪ হাজার টাকা। ধান আসবে ২০ থেকে ২২ মণ। অথচ প্রাকৃতিক ব্যবস্থায় মাত্র ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা খরচে ১৫ মণের মতো ধান উত্পাদন হতে পারে। আবার প্রাকৃতিক চাষাবাদের ফসল সাধারণ রাসায়নিক চাষাবাদের ফসলের তুলনায় গড়ে ১৩০ থেকে ১৫০ শতাংশ বেশি দামে বিক্রি হয়। ‘মুক্তকৃষির’ মতো সংগঠন সেটা কৃষকদের থেকে ক্রয় ও বিক্রয়ের ব্যবস্থা করছে। এই ব্যবস্থায় চাষ করে সাকুল্যে কৃষকের লাভই হবে। সার ও কীটনাশক কোম্পানির চক্র থেকে কৃষককে বাঁচাতে হলে প্রাকৃতিক চাষাবাদেই আসতে হবে, সেটি কৃষকরাও এখন বুঝতে শুরু করেছেন। ‘মুক্তকৃষি’ চট্টগ্রাম, ঢাকা, ফরিদপুর, ঝিনাইদহ আর টাঙ্গাইলের ১২টি গ্রামের প্রায় ১২০ জন কৃষক ও কৃষাণিকে  প্রাকৃতিক চাষাবাদের ধারণা বোঝাতে সক্ষম হয়েছে। তারা অল্প অল্প করে এই ব্যবস্থায় চাষাবাদ করছেন।

‘মুক্তকৃষি’ প্রাকৃতিক ফসলের বিপণন করছে কীভাবে? মুক্তকৃষি এখনও কৃষকের কাছ থেকে ফসল সংগ্রহ করে সরাসরি ভোক্তার হাতে পৌঁছে দিচ্ছে। এতে করে মধ্যস্বত্ত্বভোগীদের কবল থেকে কৃষক ও ভোক্তা দুইজনেই লাভবান হচ্ছেন। এছাড়া ‘মুক্তকৃষি’ কৃষকের সঙ্গে ভোক্তার সরাসরি যোগাযোগ করিয়ে দিচ্ছে। ফলে ভোক্তার পক্ষে সম্ভব হলে তিনি সরাসরি কৃষক থেকে ফসল সংগ্রহ করতে পারছেন।  মধ্যস্বত্ত্বভোগীরা যে মুনাফা করতো তা এখন কৃষক ও ভোক্তা দুইজনে পাচ্ছেন। আসলে শুধু উত্পাদনেই নয়, প্রাকৃতিক ফসল বিপণনেও বিকল্প বাজারব্যবস্থা চালু করার চেষ্টা করছে মুক্তকৃষি।

 

এই পাতার আরো খবর -
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
১৮ ফেব্রুয়ারী, ২০১৮ ইং
ফজর৫:১৩
যোহর১২:১৩
আসর৪:১৯
মাগরিব৫:৫৯
এশা৭:১২
সূর্যোদয় - ৬:২৯সূর্যাস্ত - ০৫:৫৪
পড়ুন