রাঙ্গামাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস চলছে স্কুলের দুই রুমে
নিয়োগ ভর্তি নিয়ে অজস্র অভিযোগ
একটি বেসরকারি স্কুলের দুটি রুমকে শ্রেণিকক্ষ আর শিক্ষক কোয়ার্টারকে ছাত্রাবাস বানিয়ে গত দুই বছর ধরে চলছে রাঙ্গামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল কার্যক্রম! এটিই দেশের সর্বশেষ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়।

২০১৩  সালে বিশ্ববিদ্যালয়টির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হলেও পাহাড়ের আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলোর তীব্র বিরোধিতা আর স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণে নানাভাবে বাধা দেওয়ার ঘটনার পর ২০১৫ সালে শুরু হয় প্রথম ব্যাচের শ্রেণি কার্যক্রম। কথা ছিল শীঘ্রই নিজস্ব ক্যাম্পাসে চলে যাবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু দুবছরেও নিজস্ব ক্যাম্পাস হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের পর চালু হয়েও একই পরিস্থিতি মোকাবিলা করে রাঙ্গামাটি মেডিক্যাল কলেজ যেখানে ইতোমধ্যেই শক্ত ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে গেছে, সেখানে পাহাড়ের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়টির কার্যত কোনো অগ্রগতি নেই।

ব্যবস্থাপনা ও কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগে একশত শিক্ষার্থী নিয়ে শুরু হওয়া এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতোমধ্যেই দুই ব্যাচে দুইশত শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছে। কিন্তু নেই নিজস্ব কোনো ভবন কিংবা ক্লাস রুম। এদের ক্লাস করতে হয় শাহ উচ্চ বিদ্যালয়ের দুটি ক্লাস রুমে। একটি ব্যাচ ক্লাস করলে অন্য ব্যাচ দাঁড়িয়ে থাকে মাঠে, এরপর আরেক ব্যাচ! আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিস হলো শহরের আরেক প্রান্ত ভেদভেদীতে উন্নয়ন বোর্ড রেস্ট হাউজে। শুধু তাই নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি সংক্রান্ত সকল কাজ হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ অনুষদে।  বিশ্ববিদ্যালয়টি রাঙ্গামাটিতে হলেও এর ভর্তি পরীক্ষা হয় ঢাকায়! একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হলেও এর শিক্ষার্থীদের জীবন অনেকটাই কয়েদিদের মতোই। শাহ উচ্চ বিদ্যালয়ের দুটি শ্রেণিকক্ষে দিনে দুটি বা তিনটি ক্লাস আর বাকিটা সময় স্কুলের শিক্ষক কোয়ার্টারে স্থাপিত অস্থায়ী ছাত্রাবাসে পুলিশ প্রহরায় বন্দী জীবন! কোনো জাতীয় দিবস কিংবা জাতীয় কোনো প্রতিযোগিতা, এমনকি স্থানীয় কোনো বিতর্ক প্রতিযোগিতা আয়োজন কিংবা অংশগ্রহণেও শিক্ষার্থীদের উপর জারি আছে অঘোষিত হুলিয়া।

ভিসির কার্যকম নিয়ে ক্ষোভ

রাঙ্গামাটি  বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষক ও ইউএনডিপির কনসালটেন্ট হিসেবে দীর্ঘদিন কাজ করা ড. প্রদানেন্দু বিকাশ চাকমাকে। কিন্তু তার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ রয়েছে। বলা হয়েছে, অনভিজ্ঞতার কারণে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়টির কাজে গতি আনতে ব্যর্থ হয়েছেন। কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ নিয়েও তার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ করা হয়েছে, নিয়োগের ক্ষেত্রে তিনি একটি বিশেষ জেলা ও সম্প্রদায়ের মানুষকে প্রাধান্য দিচ্ছেন।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, প্রতিষ্ঠার তিন বছর পরও রাঙ্গামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ক্যাম্পাসের যাওয়ার কোনো লক্ষণ নেই। রাঙ্গামাটি-কাপ্তাই সড়কে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ভূমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু ভূমির মালিকদের সঙ্গে ক্ষতিপূরণের টাকার বিষয় নিয়ে আইনী জটিলতার অবসান না হওয়ায় থমকে আছে সব কার্যক্রম। ফলে ঠিক কবে বিশ্ববিদ্যালয়টি তার নিজস্ব ক্যাম্পাসের কাজ শুরু করতে তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই।

রাঙ্গামাটি ত্রিপুরা কল্যাণ ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক ঝিনুক ত্রিপুরা বলেন, স্বপ্নের এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটিকে বিতর্কিত কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রশ্নবিদ্ধ করছেন বর্তমান ভিসি। তিনি একটি সাম্প্রদায়ের ক্রীড়নক হিসেবে কাজ করছেন। আমরা ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর পক্ষ থেকে তার অপসারণ দাবি করছি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল নিয়োগ ত্রিপুরাদের যোগ্যতা অনুসারে নিয়োগের দাবি জানাচ্ছি। মারমা সাংস্কৃতিক সংস্থা (মাসাস) এর কেন্দ্রীয় সভাপতি, কাপ্তাই উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অংসুচাইন চৌধুরী বলেন, পার্বত্য শান্তিচুক্তির আলোকেই পার্বত্য এলাকার সকল নিয়োগে সকল জাতিগোষ্ঠীর জন্য কোটা সংরক্ষণ করা আছে। এর ব্যত্যয় ঘটিয়ে কোনো একটি সম্প্রদায়কে বেশি নিয়োগ দিলে চুক্তি পরিপন্থি কাজই হবে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি প্রতিষ্ঠানে এটা হওয়া উচিত হয়নি। আমি এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি এবং দাবি করছি সমতা ও কোটার ভিত্তিতে যেন সকল নিয়োগ প্রদান ও ভর্তি করা হয়।

রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ সদস্য ও মারমা জনগোষ্ঠীর নেতা অংসুই প্রু চৌধুরী বলেন, এটা উচিত হয়নি। একটি বিশেষ গোষ্ঠী থেকে নিয়োগ না দিয়ে মেধা ও সমতার ভিত্তিতে সকল সম্প্রদায়  থেকে নিয়োগ দেয়া উচিত ছিল। কারণ এটি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্নের বিশ্ববিদ্যালয়।

এই প্রসঙ্গে পার্বত্য নাগরিক পরিষদের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী আলকাচ আল মামুন বলেন, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যেসব পদ থাকে, এই বিশ্ববিদ্যালয়ে তার সবকটিতেই শুধুমাত্র একটি জনগোষ্ঠি থেকে নিয়োগ দিয়ে একটি সুপরিকল্পিত নীলনকশা বাস্তবায়নের পথেই এগোচ্ছেন ভিসি। তাকে বহাল রেখে কোনোভাবেই এই বিশ্ববিদ্যালয়কে এগিয়ে নেয়া সম্ভব নয়। যে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য পার্বত্য বাঙালিরা দিনের পর দিন আন্দোলন-সংগ্রাম করেছে, রক্ত দিয়েছে, সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে আজ বাঙালিরা ‘অস্পৃশ্য’, এটা মেনে নেয়া হবে না।

বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, রাঙ্গামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে সারাদেশ থেকে শিক্ষার্থীরা যেন আবেদন করতে না পারে এবং শিক্ষক কর্মচারী নিয়োগেও বাইরের যোগ্য প্রার্থীদের প্রতিরোধ করার কৌশল হিসেবে নিয়োগ ও ভর্তি বিজ্ঞপ্তি দেশের প্রধান প্রধান প্রচারবহুল জাতীয় দৈনিকগুলোতে না দিয়ে, চট্টগ্রামভিত্তিক স্থানীয় পত্রিকায় এবং প্রচার নেই এমন ইংরেজি পত্রিকায় প্রকাশ করা হয়েছে। এর ফলে প্রথম বছর যে পরিমাণ শিক্ষার্থী আবেদন করেছিল, দ্বিতীয় বছরে তা অনেক কমে যায়। একইভাবে শিক্ষক কর্মকর্তা কর্মচারী নিয়োগেও পার্বত্য এলাকার বাইরের যোগ্য প্রার্থীদের আবেদনই তেমন জমা পড়েনি। মূলত বাইরের শিক্ষার্থী ও আবেদনকারীরা যেন আসতে না পারে, সে জন্যই কৌশলে এই পদক্ষেপ নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। 

হতাশ ক্ষুব্ধ মানুষ

রাঙ্গামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় চালুর জন্য গঠিত হয়েছিল রাঙ্গামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং মেডিক্যাল কলেজ বাস্তবায়ন সংগ্রাম পরিষদ। সংগঠনটি ধারাবাহিকভাবে নানা কর্মসূচি পালন করে দ্রুত বিশ্ববিদ্যালয়টি চালু করতে বাধ্য করে প্রশাসনকে। সেই সংগঠনের আহ্বায়ক সাবেক ছাত্রনেতা জাহাঙ্গীর আলম মুন্না ক্ষুব্ধ ভাষায় বলেন, এই বিশ্ববিদ্যালয়টি একটি ‘সাম্প্রদায়িক খোঁয়াড়ে’ পরিণত হচ্ছে। একে রুখতে হবে।

এ বিষয়ে অন্যদের সঙ্গে কথা বলার সময় বোঝা গেছে তাদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে চলমান কর্মকাণ্ডে নিয়ে ব্যাপক ক্ষোভ রয়েছে। তারা পরিস্থিতির পরিবর্তন না হলে মাঠে নামারও হুমকি দিয়েছেন।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ভিসি ড. প্রদানেন্দু বিকাশ চাকমা। তিনি বলেন, ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়টির নিজ ক্যাম্পাসে যেতে দেরি হচ্ছে। আগামী একমাসের মধ্যেই এ সমস্যার সমাধান হবে। অউপজাতীয় কোটা না থাকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সারাদেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের মতোই সার্কুলার দেয়া হয়েছে। ভর্তি এবং নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি জানান, নিয়োগের জন্য পৃথক কমিটি আছে, যেখানে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সদস্যরাও থাকেন। এখানে আমার কিছুই করার নেই। ভর্তির ক্ষেত্রে কোনো অনিয়ম হয়নি বলেও দাবি করেন তিনি। নিয়োগে খাগড়াছড়িকরণের অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, সেখান থেকে বেশি আবেদন পড়েছে, অন্য দুই জেলা থেকে আবেদন না পড়লে আমার কি করার আছে। একটি বিশেষ জনগোষ্ঠি থেকে প্রায় সব নিয়োগ পাওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মেধার ভিত্তিতে হয়েছে সব।

 

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
১৮ ফেব্রুয়ারী, ২০১৮ ইং
ফজর৫:১৩
যোহর১২:১৩
আসর৪:১৯
মাগরিব৫:৫৯
এশা৭:১২
সূর্যোদয় - ৬:২৯সূর্যাস্ত - ০৫:৫৪
পড়ুন