ঢাকা শনিবার, ১৯ জানুয়ারি ২০১৯, ৬ মাঘ ১৪২৫
২৩ °সে

সম্ভাবনার বাংলাদেশ ও একটি মহাসতর্কবার্তা

সম্ভাবনার বাংলাদেশ ও একটি মহাসতর্কবার্তা

গত ১ জানুয়ারি (২০১৯) একটি দৈনিক পত্রিকায় খ্যাতনামা লেখক আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী লিখেছেন: ‘নির্বাচনে এই বিশাল ও অভাবনীয় বিজয়ে আওয়ামী লীগের অতি উল্লসিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। এই বিজয় তাদের সামনে যে বিরাট চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে, সেই চ্যালেঞ্জ তারা কীভাবে মোকাবিলা করবে, তা বিনম্র চিত্তে বিবেচনা করতে হবে। তৃতীয়বারের মতো দেশ শাসনে জনগণের বিশাল ম্যান্ডেট পাওয়ার পর নতুন আওয়ামী লীগ মহাজোট যদি জনগণের বিশাল প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারে, দলের ভেতরে ও বাইরে দুর্নীতির রাঘব বোয়ালদের দমন করতে না পারে, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের সন্ত্রাসী অংশকে সংযত করতে না পারে, লোভী এবং ক্ষমতার অপব্যবহারকারী সংসদ সদস্যদের যে অংশ হাসিনা-ক্যারিশমার জোরে পুনর্নির্বাচিত হয়ে এসেছে, তাদের সংশোধন করা না যায়, সর্বোপরি দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব না হয়, তাহলে এই বিজয়ের ফসল ধরে রাখা বেশিদিন সম্ভব হবে না। এই মহাবিজয়ের দিনে আওয়ামী লীগের জন্য এই মহাসতর্কবাণী উচ্চারণ করে রাখছি।’ এই সর্বজন শ্রদ্ধেয় লেখকের প্রত্যাশার সঙ্গে আমরা একমত পোষণ করি। আর আওয়ামী লীগকে তার অতীতের দোষত্রুটি শোধরানোর প্রচেষ্টা নিয়ে সামনের দিকে এগোতে হবে এটা শেখ হাসিনার চেয়ে বেশি কেউ উপলব্ধি করেন বলে আমরা মনে করি না। কারণ তিনি নির্বাচনের আগে-পরে সরাসরি বলেছেন, দুর্নীতিকে তিনি কখনো প্রশ্রয় দিবেন না এবং কেউ দোষী বলে চিহ্নিত হলে সেই ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গৃহীত হবে। অতীতে তিনি নিজে বারবার জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। তাঁর জীবন বিপন্ন করার উদ্দেশ্যে সেই ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার ঘটনা আমাদের সকলের মনে আছে। তিনি ২০০১ সালের নির্বাচনোত্তর জামায়াত-বিএনপি কর্তৃক খ্রিস্টান-বৌদ্ধ-হিন্দু ও আওয়ামী সমর্থিত জনগোষ্ঠীর ওপর হামলা-মামলা-নির্যাতনের কথা কখনো ভুলেননি। তিনি সেসময় থেকে আজ পর্যন্ত তাঁর স্মৃতিতে অম্লান নির্মম ঘটনাগুলো স্মরণ করে বারবার আমাদের সতর্ক করে দিয়েছেন।

মূলত একাদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার জন্য প্রচারণায় ধর্মকে ব্যবহার করেছিল ঐক্যফ্রন্ট। নির্বাচন কমিশনের গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ অনুযায়ী নির্বাচনে ধর্মকে ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে মনে রাখতে হবে, অতীতে বিএনপি-জামায়াত নির্বাচনে ধর্মের কথা বলে জয়ী হয়েছিল। এজন্য নতুন সরকারকে আগামী মার্চের (২০১৯) স্থানীয় নির্বাচনে সতর্ক থাকতে হবে। মানুষ নির্বাচন চায় তবে বিএনপি-জামায়াত চিরাচরিত অভ্যাসের মতো আগামী নির্বাচনী প্রচারণায় ধর্মকে ব্যবহার করে সংবিধান পরিপন্থী কাজ করতে পারে। একসময় ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টি করে মানুষকে বিভ্রান্ত করেছে তারা। এমনকি নির্বাচনের আগে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীকে খতম করার হুমকি দেওয়া হয়েছিল। সহিংস রাজনীতির পরিপোষক এই কুচক্রীরা দেশের উন্নয়নে শেষ পর্যন্ত অবদান রাখতে সক্ষম হবে না বলেই একাদশ নির্বাচন থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। পক্ষান্তরে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ব্যবহার করে আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের অস্তিত্ব স্বীকার করে এগিয়ে চলেছে। বিশ্বসভায় মর্যাদার আসনে বাংলাদেশকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছে। নতুন সরকার বাঙালির আবহমান চেতনাকে স্বীকার করে। যার যার ধর্ম তার তার, এ মতবাদে বিশ্বাসী আওয়ামী সমর্থিত মানুষ।

নতুন সরকারের আমলে অগ্রসরমান অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আরো বেগবান হবে বলে সকলে মনে করছেন। প্রধানমন্ত্রীর শপথ গ্রহণের দিনই (৭জানুয়ারি) সংবাদ এসেছে, ২০৩৩ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ বিশ্বের ২৪তম অর্থনীতিতে পরিণত হবে বাংলাদেশ। যুক্তরাজ্যভিত্তিক ‘সেন্টার ফর ইকোনমিকস অ্যান্ড বিজনেস রিসার্চ’ কর্তৃক প্রকাশিত ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক লিগ টেবিল ২০১৯’ -এ কথা বলা হয়েছে। মহাজোট সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার ছিল সার্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। ২০০৯ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পরে বিশ্বমন্দার প্রভাব থেকে দেশকে রক্ষার জন্য বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের কাছ থেকে নীতি-পরামর্শ গ্রহণ করেছিলেন শেখ হাসিনা। সেই অঙ্গীকার অনুসারে তথ্য ভাণ্ডার গড়ে তুলে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য জরুরিভিত্তিতে একটি টাস্কফোর্স গঠন করা হয়। বিনিয়োগ, জ্বালানি নিরাপত্তা, মুদ্রামান সুরক্ষা ও রফতানি সহায়তা এবং জনশক্তি রফতানি অব্যাহত রাখার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের ফলে দ্রব্যমূল্যের চাপ দুঃসহ হয়ে ওঠেনি। তাছাড়া দুর্নীতিমুক্ত সামাজিক ন্যায়বিচার, নারীর অধিকার ও সুযোগের সমতা, আইনের শাসন, মানবাধিকার, সুশাসন, দূষণমুক্ত পরিবেশ বজায় রাখার দৃঢ় সংকল্প ও প্রয়োজনীয় উদ্যোগ দেশের অর্থনীতিকে গতিশীল করেছে। উন্নয়নশীল দেশ হয়েও বাংলাদেশ বিপুল বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিয়ে শক্ত আর্থিক ভিত গড়ে তুলেছে। পদ্মা সেতুসহ বৃহত্ প্রকল্পসমূহের বাস্তবায়ন নতুন ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নকে বড় করে তুলেছে।

বাংলাদেশ এখন আর দুর্নীতিতে প্রথম স্থানে নেই; এখন একটি সম্ভাবনাময় রাষ্ট্র। গত ১০ বছরে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের পরিচালিত কার্যক্রমের ফলেই উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়েছে। সিলেটসহ অনেক জায়গায় তেল-গ্যাস পাওয়া গেছে; একটি পর্যায় পর্যন্ত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কার্যক্রম শেষ হয়েছে; মাদক, সন্ত্রাস আর জঙ্গিবাদ সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করার চেষ্টা চলছে। বিএনপি-জামায়াতের হঠকারী ও অপরাজনীতির কথা বাদ দিলে বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের মডেল এবং সফল একটি রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত। ২০৪১ সালের মধ্যে এদেশকে একটি উন্নত দেশে পরিণত করতে দলমত নির্বিশেষে (মৌলবাদী-জঙ্গিবাদে) সকলকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

n লেখক : অধ্যাপক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
১৯ জানুয়ারি, ২০১৯
আর্কাইভ
 
বেটা
ভার্সন