ঢাকা বুধবার, ২০ মার্চ ২০১৯, ৬ চৈত্র ১৪২৫
২৩ °সে

চাক্ষুষ

অন্যরকম ভিয়েতনাম

অন্যরকম ভিয়েতনাম

কিছুদিন আগেই ঘুরে এসেছি ভিয়েতনাম। যুদ্ধের দেশ ভিয়েতনাম। ১৭ বছর ধরে তারা স্বাধীনতা যুদ্ধ করেছে। তাদের স্বাধীনতা খুব সহজে আসেনি। ধ্বংসপ্রাপ্ত ঘর-বাড়ি ছাড়া অন্যকিছুই তাদের আর অবশিষ্ট ছিল না। আর এখন? এয়ারপোর্ট থেকে যেতে যেতে ভাবছিলাম, এ কোন ভিয়েতনামে এসে পড়লাম। বড় বড় অট্টালিকা, বড় বড় রাস্তা, আবার ছোট ছোট অট্টালিকা। সাজানো-গুছানো ছিমছাম শহর। দারিদ্র্যতার কোনো চিহ্ন নেই কোথাও। কোথায় গেল তাদের যুদ্ধ-বিগ্রহের চিহ্ন, ক্ষয়-ক্ষতির চিহ্ন, ধ্বংসের চিহ্ন? একেবারেই কিছু নেই। মনে হলো, এশিয়ার অন্যতম একটি উন্নত শহরে এসে পড়েছি। ভিয়েতনামে যাবার আগে তাদের ইতিহাসের দিকে, তাদের যুদ্ধের নানা দিকে আলোকপাত করেছিলাম এবং মনে মনে ভাবছিলাম— কেমন ভিয়েতনাম দেখব। যুদ্ধবিধ্বস্ত, চারদিকে বস্তি এবং দুর্ভাগা মানুষের আহাজারি— এমনটাই ছিল আমার কল্পনার মধ্যে। কিন্তু তার তো কিছুই নেই! রাস্তার পাশে বস্তি নেই, না খাওয়া মানুষ নেই, ভিক্ষুক নেই। কেমন করে এটা সম্ভব হলো? গাইড এবার মুখ খুললেন। এই যে রাস্তাটি দেখতে পাচ্ছ, ঠিক ৪০ বছর আগে এখানে ছিল পুরোটাই বস্তি। না-খাওয়া মানুষের যত্রতত্র অবস্থান। প্রস্রাব-পায়খানায় ছড়াছড়ি। সর্বত্র ছিল হাহাকার। কারো কোনো ঘর ছিল না, বাড়ি ছিল না, অফিস ছিল না। সবকিছু ছিল লণ্ডভণ্ড। মুখ ফসকে বলে ফেললাম, তাহলে কি আলাদিনের দৈত্য এসে সব ঠিক করে দিল? হ্যাঁ, এমনটাই বটে। অসম্ভবকে সম্ভব করা ভিয়েতনামের যোদ্ধারা একদিন যেভাবে পরম পরাক্রমশালী আমেরিকানদের পরাজিত করেছিল, ঠিক একইভাবে একদিন তারা অভাবকে পরাজিত করেছে, বস্তিকে তাড়িত করেছে, দুর্ভিক্ষকে বিতাড়িত করেছে। যেখানে পুরোটা দেশই ছিল বস্তি, সেখানে মাত্র ৪০ বছর পর কোথাও একটি বস্তি নেই, একটি ভিক্ষুক নেই। ম্যাজিক আর কী! না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। কিন্তু বাস্তবতা এমনটাই। গাইড গর্ব করে বললেন, কিছুই অবাস্তবভাবে হয়নি। শুধু পরিকল্পনা ছিল, দেশপ্রেম ছিল, সততা ছিল—তাতেই হয়েছে। পুরো দেশের বস্তি এলাকায় নতুন নতুন বিল্ডিং হয়েছে এবং মানুষ বস্তি ছেড়ে দিয়ে অট্টালিকায় চলে গিয়েছে। সরকার শুধু শুরুতে মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে সাহায্য করেছে। অঞ্চলে অঞ্চলে সরকার বস্তিবাসীদের জন্য সরকারি অর্থে অট্টালিকা তৈরি করে দিয়েছে। বস্তিবাসী ধীরে ধীরে তার বাসস্থানের খরচটি সরকারকে পরিশোধ করেছে। অর্থ অপচয় হয়নি, নষ্ট হয়নি, দুর্নীতিও হয়নি। তাতে সফলতা এসেছে একশ’ ভাগ। পুরো দেশের সকল বস্তি বদলে গিয়ে সেখানে তৈরি হয়েছে ছোট-বড় পাকা বাড়ি, অট্টালিকা। আজকের ভিয়েতনাম তাই বস্তিহারা, দুর্ভিক্ষবিহীন একটি আধুনিক রাষ্ট্র। যেখানে পুরোটাই বস্তি ছিল, সেখানে আজ পুরোটাই পাকা দালানকোঠা। সাম্যের বাণীতে, দেশপ্রেমের উত্সাহে, সততার বহ্নিশিখায় ভিয়েতনাম আজ ঘুরে দাঁড়িয়েছে মাথা উঁচু করে। বস্তির ভিয়েতনাম আজ বস্তিবিহীন ভিয়েতনাম। ধ্বংসস্তূপের ভিয়েতনাম আজ সম্পদশালী সুখী ভিয়েতনাম।

ভিয়েতনামের এই ছবিটি শুধু ক্যামেরায় কিংবা চোখেই ছিল না। বুকে করে বাঁধিয়ে নিয়ে এসেছি। আর মনে মনে ভেবেছি, আমরা কেন পারলাম না! আমরা তো ঠিক একই সময়ে তাদের মতোই যুদ্ধ করে স্বাধীনতা পেয়েছি। তারা এত দ্রুত পারল, আমরা কেন পারলাম না? তবে আমাদেরও হবে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন নগরীর বস্তিগুলো বহুতল ভবনে প্রতিস্থাপিত হবে। সব ঠিকভাবে হলে, ভিয়েতনাম দেখে যতটা শান্তি পেয়েছিলাম তার চেয়েও অধিক হারে শান্তি পাব আমার দেশের বস্তিবাসীদের বহুতল ভবনের ফ্ল্যাটে বসবাস করা দেখে। অপেক্ষায় রইলাম এমন একটি মহান উদ্যোগের শুরু দেখতে।

n লেখক: অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
২০ মার্চ, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন