আত্মহত্যা প্রতিরোধে কী করা উচিত
অধ্যাপক ডা. মোহিত কামাল১৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং
আত্মহত্যা প্রতিরোধে কী করা উচিত
পৃথিবীজুড়ে প্রায় ৬০ হাজার মানুষ প্রতিদিন নানাভাবে আত্মহত্যার চেষ্টা করে থাকেন। এক জরিপে দেখা গেছে,  প্রতি ৪০ সেকেন্ডে একজন করে  বিশ্বে বছরে প্রায় ৮ লাখ মানুষ আত্মহত্যার মাধ্যমে মৃত্যুবরণ করেন। বাংলাদেশে বড় মাপের গবেষণা না হলেও বিভিন্ন গবেষণা আর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, বছরে প্রায় ১০ হাজার মানুষ আত্মহত্যা করেন। এর দশগুণ বেশি প্রতি বছর আত্মহত্যার চেষ্টা করেন আর তারও দশগুণ মানুষ আত্মহত্যার চিন্তা করে থাকেন। সামপ্রতিক সময়ে বাংলাদেশে আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে গেছে আত্মহত্যাকারীর সংখ্যা। সাধারণত দু’ভাবে আত্মহত্যা সংঘটিত হয়ে থাকে। অধিকাংশ ব্যক্তিই পরিকল্পনার মাধ্যমে আত্মহত্যা করে। আর একটি হলো তাত্ক্ষণিক উত্তেজনা বা তাড়নায় ইমপালসিভ আত্মহত্যা। পরিকল্পনাকারীদের মনে প্রথমে আত্মহত্যার ইচ্ছা জাগে, ইচ্ছার পর পরিকল্পনা করে সে, তার পর আত্মহত্যার জন্য অ্যাটেম্পট গ্রহণ করে— বড় ধরনের বিষণ্নতা রোগের শেষ পরিণতি হচ্ছে পরিকল্পনার মাধ্যমে আত্মহত্যা।

পুলিশ সদর দপ্তরের কয়েক বছর আগের এক হিসাব থেকে দেখা যায়, প্রায় ৫৩ হাজার মানুষ গলায় ফাঁস দিয়ে কিংবা বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করেছে। বাংলাদেশে প্রজননক্ষম বিবাহিত নারীদের মধ্যে শহরের ১৪ শতাংশ ও গ্রামের ১১ শতাংশ নারী আত্মহত্যার কথা চিন্তা করে। চিন্তাকারীদের মধ্যে শহরের ২৬ শতাংশ ও গ্রামের ৯ শতাংশ নারী আত্মহত্যা করে। প্রজননক্ষম নারীদের শতকরা ৪০ ভাগ শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন, বিবাহিত জীবনে যৌন নির্যাতনের পাশাপাশি শহরের ৪৪ শতাংশ ও গ্রামের ৩১ শতাংশ নারী মানসিক নির্যাতনেরও শিকার হন (আইসিডিডিআরবি, ২০১০)। আরও একটি সার্ভেতে দেখা যায়, দাম্পত্য জীবনে কোনো না কোনো সময়ে বিবাহিত পুরুষদের ৬০ শতাংশ স্ত্রীকে শারীরিক নির্যাতন করেন (বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক ও হেলথ সার্ভে, ২০০৭)। ইভটিজিংয়ের কারণেও আত্মহত্যার সংখ্যা বাড়ছে।

পশ্চিমা বিশ্বে পুরুষদের মধ্যে আত্মহত্যার হার বেশি। আর বাংলাদেশসহ দক্ষিণ পূর্বএশিয়ার দেশগুলোতে নারীদের মধ্যে আত্মহত্যার হার বেশি। আত্মহত্যা একটি প্রতিরোধযোগ্য স্বাস্থ্য সমস্যা।  বিষণ্নতা, ব্যক্তিত্বের বিকার, বাইপোলার ডিজঅর্ডার, সিজোফ্রেনিয়া, মাদকাসক্তিসহ নানা রোগের কারণে মানুষ আত্মহত্যা করে থাকে। আত্মহত্যা প্রবণতার বিষয়ে ও মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা অর্জন করা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যারা চেষ্টা করে ব্যর্থ হচ্ছে তাদের বেশিরভাগই কোনো না কোনো মানসিক রোগে আক্রান্ত। যথাযথ মনোচিকিত্সার মাধ্যমে আত্মহত্যার পথ থেকে তাদের ফেরানো সম্ভব। অতিমাত্রায় বিষণ্নতায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা আত্মহত্যার দিকে ধাবিত হন। তরুণ প্রজন্ম সবচেয়ে বেশি আত্মহত্যার ঝুঁকিতে রয়েছে।

আত্মহত্যার ক্ষেত্রে বৈবাহিক অবস্থা ও শ্বশুরবাড়ির পরিবেশ গুরুত্বপূর্ণ। পরীক্ষায় আশানুরূপ ফল অর্জন করতে ব্যর্থ হওয়া, ফেল করা কিংবা সম্পর্কের টানাপোড়েন, সন্দেহ-অবিশ্বাস, নৈতিক অবক্ষয়, সামাজিক হতাশা, অর্থনৈতিক দুরবস্থা, বেকারত্ব, যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ না পাওয়া, আশাহীনতা, বৈষম্যের শিকার হওয়া, ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হওয়া মানুষের মনে হতাশা তৈরি করছে। হতাশা থেকে বিষণ্নতার সীমানার দিকে এগিয়ে যায় মানুষ। মনে গুরুতর বিষণ্নতা হানা দিলে বেড়ে যায় আত্মহত্যার ঝুঁকি। এ ধরনের ঝুঁকিতে আছে দেশের বিরাট সংখ্যক জনগোষ্ঠী। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, ঢাকার যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত ন্যাশনাল সার্ভের রিপোর্ট থেকে দেখা যায়, দেশের ৪.৬ শতাংশ এডাল্ট জনগোষ্ঠী গুরুতর বিষণ্নতা রোগে ভুগছে। অর্থাত্ এই বিপুলসংখ্যক মানুষ আত্মহত্যার ঝুঁকি নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে সমাজে। দেশে হতাশাগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর সংখ্যা আরো বেশি। হতাশা ও বিষণ্নতা রোগ এক নয়। ২০১৬ সালের জরিপে দেখা যায়, বিষণ্নতার হার ১২.৭ শতাংশে এসে দাঁড়িয়েছে। আর এ কারণেও আত্মহত্যার হার আশঙ্কাজনক হারে বেড়েই চলেছে।

বাংলাদেশ জার্নাল অব সাইকিয়াট্রিতে প্রকাশিত এক মৌলিক গবেষণা রিপোর্টে দেখা যায়,  আত্মহত্যার চেষ্টাকারীদের ৬৫.৪ শতাংশ মানসিক রোগে ভুগছিল। এদের মধ্যে ৭০ শতাংশ ছিল গুরুতর বিষণ্নতার রোগী। পঁচিশ বছরের নিচের তরুণ বয়সীদের হার ছিল সর্বোচ্চ। পুরুষের তুলনায় মহিলাদের হার ছিল বেশি (৫৪.৪%), বিবাহিত মহিলা ৫৫.৯%। পারিবারিক সমস্যা (৪১.২%)। পরীক্ষায় খারাপ করা, ভালোবাসার ব্যর্থতা ও জটিলতা, বৈবাহিক অশান্তি, অবৈধ প্রেগনেন্সি ইত্যাদি বিষয়গুলোও ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশে সুইসাইডের হার প্রতিবছর প্রতি লাখে ৮-১০ জন। পক্ষান্তরে বিশ্বজনীন এই হার প্রতিবছর প্রতি লাখে ১৪.৫। বাংলাদেশে ঝিনাইদহ ও যশোর জেলাকে আত্মহত্যাপ্রবণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ঝিনাইদহে আত্মহত্যাকারীদের ৬৭.২৮% ছিল গৃহবধূ, ৭৩.৪৫% মহিলা, ৬৯.৫৬% অশিক্ষিত, ৭৪.৬১% শতাংশের বয়স ছিল ১১-২৫ বছরের মধ্যে। বাংলাদেশ জার্নাল অব সাইকিয়াট্রিতে রিভিউ আর্টিকেল হিসেবে প্রকাশিত এই গবেষণাপত্র থেকে আরো দেখা যায়, ৩৭-৫৯% আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে পারিবারিক সমস্যার কারণে।

বাংলাদেশে আত্মহত্যার কারণ হিসেবে বিভিন্ন গবেষণায় যে বিষয়গুলো উঠে এসেছে তার সারাংশ হলো:

যৌতুক ও পারিবারিক নির্যাতন,দাম্পত্য কলহ, উত্ত্যক্ত করা ও প্ররোচিত আত্মহত্যা, প্রেম ও পরীক্ষায়  ব্যর্থতা, দারিদ্র্য ও বেকারত্ব, আত্মহত্যার উপকরণের সহজপ্রাপ্যতা, বিষণ্নতা রোগ ও অন্যান্য মানসিক অসুস্থতা, জটিল শারীরিক রোগযন্ত্রণা থেকে আত্মহত্যা, নগরায়ন ও পরিবারতন্ত্রের বিলুপ্তি, নৈতিক অবক্ষয় ও সামাজিক অস্থিরতা।

আত্মহত্যা একটি প্রতিরোধযোগ্য সমস্যা। ফলে একটু মনোযোগ দিলেই আত্মহত্যার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিকে চিহ্নিত করা যায় এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিলে তাদের জীবন বাঁচানো যায় ।

আত্মহত্যার জন্য যারা ঝুঁকিপূর্ণ :

সবসময় মৃত্যুর কথা বলে, মৃত্যুচিন্তা করে, সরাসরি বা ঘুরিয়ে আত্মহত্যা/ মৃত্যুর কথা বলছে, আগে একা থাকত না কিন্তু এখন একা থাকে, কারো সঙ্গে মেশে না, সব বিষয়ে উত্সাহ হারিয়ে ফেলেছে, কান্নাকাটি করে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মৃত্যুইচ্ছা ব্যক্ত করে, পুরাতন বন্ধু-স্বজনদের  কাছ থেকে বিদায় নিচ্ছেন, আত্মহত্যা বিষয়ক ওয়েভপেইজ ঘাঁটাঘাঁটি করে, আত্মহত্যার  উপকরণ সংগ্রহ করে, যারা নেশা করে, কোনো নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, ইদানীং বেশি বেশি রেগে যাচ্ছেন, রাস্তাঘাটে ঝুঁকিপূর্ণভাবে চলাচল করছেন , নিজের যত্ন নিচ্ছেন না, নিজের বিষয়-সম্পত্তি অন্যদের বিলিয়ে দিচ্ছেন, কোনো উপযুক্ত কারণ ছাড়াই উইল করছেন, খুব বেশি ঘুমাচ্ছেন বা কম ঘুমাচ্ছেন, হাতপা কাটাকাটি করছেন, বেশি বেশি ঘুমের ওষুধ খাচ্ছেন।

আত্মহত্যা প্রতিরোধে কী করা উচিত্? কারো মধ্যে আত্মহত্যার ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ দেখা গেলে তাকে উপহাস করা যাবে না। সবসময় বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে। ‘আরে ধুর’ বলে উড়িয়ে দেওয়া  যাবে না। তার মনের কথা সহমর্মিতা দিয়ে শুনতে হবে। প্রয়োজনে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সঙ্গে যোগাযোগ  করিয়ে দেবার ব্যবস্থা করতে হবে। মানসিক সমস্যা/নেশার সমস্যা থাকলে লুকিয়ে না রেখে চিকিত্সার ব্যবস্থা নিতে হবে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কোনো বন্ধুর এ ধরনের পোষ্ট দেখা গেলে তত্ক্ষণাত্ তার সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাত্ করতে হবে বা ফোনে কথা বলতে হবে। তাকে একা রাখা চলবে না। প্রয়োজনে হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে এবং  আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা অভিভাবকের সাহায্য নিয়ে তাকে নিবৃত্ত করতে হবে।

বর্তমান সময়ে সমাজে আত্মহত্যা সংঘটিত হলে ঝাঁপিয়ে পড়ে মিডিয়া। মিডিয়ার কারণে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বহমান আত্মহত্যার নির্মম ঘটনাগুলো জানতে পারছি আমরা। কী কারণে আত্মহত্যা ঘটছে, পারিবারিক, সামাজিক কী অবক্ষয়ের কারণে আত্মহত্যার জন্য প্ররোচিত হচ্ছে আত্মহননকারী, জেনে সহানুভূতি নিয়ে আমরা দাঁড়াচ্ছি আত্মহত্যাকারীর পাশে। দরদি মনের ব্যাকুলতার কারণে এমনটি করে থাকে মিডিয়াকর্মী কিংবা জনগোষ্ঠী। কিন্তু আত্মহত্যার পর সহানুভূতি দেখানো যাবে না আত্মহত্যাকারীকে। যদি আত্মহত্যাকারীকে হিরো কিংবা হিরোইন বানিয়ে তোলা হয় মিডিয়াতে, যে বিশাল জনগোষ্ঠী আত্মহত্যার ঝুঁকিতে আছে (৭৮ লাখ), তারা প্ররোচিত হবে আত্মহত্যার জন্য। সামাজিক ও পারিবারিক জীবনে অবক্ষয়ের পাশাপাশি এটাও আত্মহত্যার হার বেড়ে যাওয়ার একটি বড় কারণ। হ্যাঁ। দাঁড়াতে হবে ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তির পাশে। আত্মহত্যার ঝুঁকি শনাক্ত করতে হবে স্বজনদের। ঝুঁকি শনাক্ত করে আত্মহত্যার আগেই ভূমিকা রাখতে হবে।

স্বজনদের মনে রাখতে হবে, যারা ঝুঁকিতে আছে, সবধরনের সাপোর্ট দিতে হবে তাদের। ঝুঁকি শনাক্ত করার পর চিকিত্সার উদ্যোগ নিতে হবে। এটাই হবে যথাযথভাবে পাশে দাঁড়ানো। তবে এটা ঠিক, কী কারণে প্ররোচিত হয়েছে সে, সেই ঘটনার প্রতি ঘৃণা জানাতে হবে। সমাজ থেকে সেইসব কারণ দূর করার ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ জোরদার করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে হবে। প্ররোচনাকারীর শাস্তি নিশ্চিত করা না গেলে আত্মহত্যার হার কমবে না। এ বিষয়টিও আত্মহত্যা প্রতিরোধের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে মনে রাখা জরুরি, প্ররোচনাকারীর শাস্তি চাইতে গিয়ে যেন আত্মহত্যাকারীর প্রতি অনুকম্পা না দেখানো হয়। কারণ সামাজিক যেকোনো ক্ষতের কারণেই সে আত্মহত্যা করুক না কেন, নিজেকে খুন করে আরও গুরুতর অপরাধ করে ফেলেছে সে। ধর্মীয় অনুশাসন লঙ্ঘন করেছে। ধর্মীয় অনুশাসন ও আইন লঙ্ঘনকারী আত্মহত্যাকারীকে অনুকম্পা দেখানোর সুযোগ নেই কারো।

n লেখক: মনোচিকিত্সক


 

এই পাতার আরো খবর -
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
১৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং
ফজর৪:২৮
যোহর১১:৫৫
আসর৪:২১
মাগরিব৬:০৮
এশা৭:২১
সূর্যোদয় - ৫:৪৪সূর্যাস্ত - ০৬:০৩
পড়ুন