কলকাতায় সেতুর ভাঙন ধসিয়ে দিল অনেক কিছু
সুখরঞ্জন দাশগুপ্ত১৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং
কলকাতায় সেতুর ভাঙন ধসিয়ে দিল অনেক কিছু
কলকাতা বন্দরের কাছেই মাঝেরহাট ব্রিজ। ব্রিজের তলায় রেললাইন এবং কলকাতার চক্ররেল। গত ৪ সেপ্টেম্বর বিকেলবেলা ভেঙে পড়ল এই ব্রিজ। এতে করে বৃহত্তর কলকাতার উত্তর ও দক্ষিণের মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিচ্ছেদ হয়ে গেল। কোনো কোনো মহল থেকে এই সেতুটি ভেঙে পড়া নিয়ে ৪৭ সালের বাংলাভাগ এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বার্লিন ভাগের সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে। কারণ আর পাঁচ সপ্তাহের মধ্যেই দুর্গাপূজা শুরু হচ্ছে। দক্ষিণ এবং উত্তর কলকাতার লক্ষ লক্ষ মানুষ পূজার এই কয়দিন উত্তর থেকে দক্ষিণে দুর্গাপ্রতিমা দেখার জন্য আগ্রহের সঙ্গে অপেক্ষা করে। কিন্তু আসন্ন দুর্গাপূজায় তাদের সব আশাকে জল ঢেলে দিল একটি ব্রিজের পতন।

বৃহত্তর কলকাতায় যাতায়াতের যে দুর্ভোগ শুরু হয়েছে, তা কবে শেষ হবে সে ব্যাপারে কেউ কোনো প্রতিশ্রুতির আশা দেখাতে পারছে না; অথচ সরকার বলছে যে, শুধু মাঝেরহাট ব্রিজই নয় শহরের উত্তর-দক্ষিণ-পূর্ব-পশ্চিমে প্রায় ২০টি ব্রিজই খারাপ। যে কোনো মুহূর্তে ভেঙে পড়তে পারে। এগুলো সারাতে বা মেরামত করতে যে বিপুল অর্থের প্রয়োজন, সরকারের কোষাগারে সেই অর্থ নেই। অথচ ১৯-২০ লোকসভার নির্বাচনকে মাথায় রেখে রাজ্য সরকার এই লেখা যখন লিখছি তখনই ঘোষণা করেছে, ২৮ হাজার পূজা কমিটির জন্য ২৮ কোটি টাকা পূজার চাঁদা দেবে রাজ্য সরকার। রাজনৈতিক মহল মনে করছে, এটা হলো এক ধরনের উপঢৌকন যাতে ২০১৯-এর নির্বাচনে তারা সরকারের পাশে থাকে।

মাঝেরহাট ব্রিজটি যে কোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে ১১ মাস আগে ব্রিজ বিশেষজ্ঞ কমিটি সরকারকে এক রিপোর্ট দিয়েছিল। ১১ মাসেও সরকার ওই রিপোর্টটি খুলে দেখার সময় করে উঠতে পারেনি। এই  অভিযোগ ওই বিশেষজ্ঞদের; বিগত শতকের ১৯৬৪ সালের এই ব্রিজটি তৈরি করা হয়। ব্রিজটি তৈরি করে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পূর্তদপ্তর। রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বও তাদের। বর্তমান পূর্তমন্ত্রী জনাব ফিরহাদ হাকিম প্রকাশ্যে বলেছেন, এই ব্রিজ মেরামত করার জন্য গত ১৩ মাসে ৯ বার টেন্ডার ডাকা হয়েছে কিন্তু ব্রিজ বানানোর বিশেষজ্ঞ কোনো কোম্পানি ব্রিজ তৈরির আগ্রহ প্রকাশ করে দরপত্র দেয়নি। সুতরাং তাদের পক্ষে বেশি কিছু করার ছিল না।

সরকার বাধ্য হয়ে পূর্ব-পশ্চিম, উত্তর-দক্ষিণের যান চলাচল ঘুরিয়ে দিলেও উত্সবের মরশুমে লাখ লাখ মানুষের দুর্ভোগের কোনো সীমা থাকবে না। অঙ্গরাজ্যের সরকার কতগুলো ভারী ট্রাক চলার ব্যাপারে বেশ কিছু নতুন নিয়ম জারি করেছেন, তারমধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, কলকাতার বন্দর এলাকা থেকে নেপাল, ভুটান এবং বাংলাদেশে যেসব পণ্য যায় তা এককথায় নিষিদ্ধ করা। শহরের মধ্যে পণ্য নিয়ে যাওয়া বড় বড় ট্রাক চলাচলও নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে। নেপাল স্বাধীনতার আগে থেকেই  কলকাতার বন্দরই ছিল তাদের লাইফলাইন, ভুটানও তাই, বাংলাদেশে কোটি কোটি টাকার নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য সড়কপথে যাতায়াত করে। সঙ্গে সঙ্গে কাঠমান্ডু থেকে ঘোষণা করা হয়েছে, তারা চীনের বন্দর ব্যবহার করবে। রাজ্য সরকারের ভারী ট্রাক চলাচলের নিষেধাজ্ঞা জারি হবার ফলে কার্যত বাংলাদেশ নেপাল ও ভুটানের ব্যবসাবাণিজ্যে বিপুল ক্ষতিই হলো, কবে যে এই ক্ষতি পূরণ হবে তা কেউ বলতে পারছে না। বৃহত্তর কলকাতা শহরে সব দ্রব্যই আসে গ্রাম থেকে ভারী ভারী ট্রাকে। একদিকে টাকার মান কমে গেছে, অপরদিকে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে, কলকাতার বাজারগুলো এখন তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে।

বামফ্রন্টের রাজত্বের শেষদিকে তারা একটি পরিকল্পনা করেছিল, শহরে প্রবেশের চারিদিকে শহর থেকে ৭-৮ কিলোমিটার দূরে ১০টি ‘মান্ডি’ তৈরি করবে। গ্রামগঞ্জ থেকে বড় বড় ট্রাকে মাছসহ বিভিন্ন দ্রব্য এনে ঐ ‘মান্ডিতে’ খালাস করে তারপর ছোট ছোট ট্রাকে শহরের মধ্যে প্রবেশ করবে। কিন্তু সেটি আর বাস্তবায়িত হয়নি। এখন ‘মান্ডি’ তৈরি করতে অন্তত ৭-৮ বছর লাগবে। ততদিনে বৃহত্তর কলকাতা শহরের বাজারগুলো পথে বসে যাবে। এই সদ্য ভেঙে পড়া মাঝেরহাট ব্রিজের ওপর দিয়েই আসত সুন্দরবন, কাকদ্বীপ, ডায়মন্ড হারবার থেকে পণ্য নিয়ে হাজার হাজার ট্রাক। এসব ট্রাকে যে পণ্য আসত তা বন্ধ হওয়ায় কলকাতার ১ কোটিরও বেশি লোকের যে অপূরণীয় ক্ষতি হলো—তা পূরণ করবে কে?

ব্রিজ ভাঙার দুর্ঘটনার পরে কলকাতাসহ গোটা বাংলা তো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেই এমনকি বাংলাদেশও কম ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। যেমন পেট্রাপোল, বেনাপোল সীমান্ত, ঘোজাডাঙ্গা, সাতক্ষীরা সীমান্ত এবং হিলি সীমান্ত দিয়ে প্রতিদিন গড়ে এক থেকে দেড় হাজার ট্রাক পণ্য নিয়ে বাংলাদেশে যায়। বনগাঁ থেকে পেট্রাপোল যাবার পথে যে ব্রিজ আছে সেটিও যে খুব বিপজ্জনক অবস্থার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে, তা সড়ক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। তারা মনে করে বারাসাত থেকে বসিরহাটে ঘোজাডাঙ্গা সীমান্ত পর্যন্ত কোনো রাস্তাই নেই অথচ ট্রাকগুলো এভাবেই দিনের পর দিন চলছে। হিলি সীমান্তে যাবার পথে মুর্শিদাবাদ ও মালদার মধ্যে ৩৪নং জাতীয় সড়কে ভাঙন দেখা দিয়েছে। ভারত সরকারের সড়ক উন্নয়ন মন্ত্রী ঘোষণা করেছেন—জাতীয় সড়কগুলো শীতের আগেই মেরামত করে দেবেন, কিন্তু তা রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব রাজ্য সরকারের। এখানেও কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক নিয়ে বিতর্ক আছে, কিন্তু একটা কিছু সুরাহা তো করতে হবে। সেই সুরাহা কে করবে, কেন্দ্র না রাজ্য?

n লেখক : ভারতীয় প্রবীণ সাংবাদিকত্

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
১৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং
ফজর৪:২৮
যোহর১১:৫৫
আসর৪:২১
মাগরিব৬:০৮
এশা৭:২১
সূর্যোদয় - ৫:৪৪সূর্যাস্ত - ০৬:০৩
পড়ুন