নারীদের জন্য নিরাপদ হোক গণপরিবহন
মোহাম্মদ অংকন১৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং
নারীদের জন্য নিরাপদ হোক গণপরিবহন

উত্তরা হতে মিরপুর যাওয়ার পথে সেদিন বাসে আমার পাশে একজন শিক্ষিকা বসেছিলেন। তিনি আমার সম্পর্কে জানতে চাইলে বলি, ‘আমি পড়াশোনা করি। পাশাপাশি কলাম লিখি।’ ‘ও তুমি কলামিস্ট!’ একটি পত্রিকাতে লেখা দেখাতেই তিনি আমাকে গণপরিবহনে নারীদের অনিরাপত্তাসহ সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে লিখতে অনুরোধ করলেন। আমি তার আগ্রহ দেখে প্রশ্ন করলাম, ‘গণপরিবহনে আপনি কেমন স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন?’ তিনি উত্তর করলেন,‘গণপরিবহনে যাতায়াত করাটা নারীদের জন্য যে আর নিরাপদ নয়, এটা বলার অপেক্ষা রাখে না। আমাদের ভয়ে ভয়ে গন্তব্যে পাড়ি জমাতে হয়। আর সব তো আপনারা জানেনই।’

হ্যাঁ, আমরা সবাই সবকিছুই জানি। বর্তমানে দেশে পরিবহন খাত এক বিশৃঙ্খলার রাজত্ব কায়েম করতে উঠেপড়ে লেগেছে। তাদের যখন যা খুশি তাই করছে। বাস চাপা দিয়ে মানুষ হত্যা করছে, দুর্ঘটনা ঘটিয়ে মানুষ হত্যা করছে। এগুলো যেন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর গণপরিবহন নারীদের জন্য এক আতঙ্কের নাম। নারীরা গণপরিবহনে যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছে। চালক ও সহকারীর হিংস্রতায় পরিবহনে নারীরা ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। পত্র-পত্রিকায় প্রতিনিয়ত এমন খবরা-খবর আসছে। এছাড়া বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সংগঠনের পরিসংখ্যানেও বিষয়টি স্পষ্ট। তারপরেও প্রতিকার না পেয়ে ও নানা অপ্রতুলতার কারণে নারীদের প্রতিনিয়ত গণপরিবহন ব্যবহার করতে হচ্ছে। একাকী দূরপাল্লার পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে।

বর্তমানে দেশে শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে নারীর পদচারণা বেড়েছে। তাদের প্রতিদিন স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা কর্মস্থলে যেতে হয়। এ ছাড়া সংসারের নানা ধরনের প্রয়োজনে নারীদের ঘরের বাইরে বের হতে হয়। হাট-বাজার, হাসপাতালে যেতে হয়। তাদের অনেকের যাতায়াতের জন্য গণপরিবহণই ভরসা। অথচ গণপরিবহনে যাতায়াত করতে গিয়ে তারা প্রতিনিয়ত হেনস্থা ও যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছে। পুরুষ যাত্রীরা তো আছেই, পাশাপাশি চালক ও সহকারীরাও এ ধরনের অপকর্মে অংশ নিচ্ছে। দেখা যাচ্ছে, কোনো তরুণী বাসে একা হলেই ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। এরকম চলতে থাকলে এ দেশের নারীরা গণপরিবহনে কীভাবে যাতায়াত করবে?

আমি সপ্তাহে পাঁচদিন গণপরিবহনে যাতায়াত করে থাকি। এ সময় অনেক কিছুই চোখ দিয়ে দেখে থাকি। এসব নিয়ে নারীদেরকে কম-বেশি প্রতিবাদ করতে দেখি। আমরাও সচেতনরা প্রতিবাদ করি। কিন্তু ঐসব অমানুষদের মুখ থেকে গালিগালাজ শুনতে হয়।

দেখুন, আমাদের দেশে গণপরিবহনে চালক ও সহকারী নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো নিয়ম-কানুন মানা হয় না। মালিকপক্ষ তাদের ইচ্ছামতো পরিবহণ শ্রমিক নিয়োগ করে থাকে। গাড়িতে চালক ও সহকারী নিয়োগের বিষয়টি শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে না পারলে তারা যেমন দুর্ঘটনা ঘটাবে, তেমনি নারীদেরকে যৌন হয়রানি করবে। তাদের নিয়োগপত্র দিয়েই নিয়োগ দিতে হবে। আর এতে বিভিন্ন শর্তের কথা উল্লেখ থাকতে হবে। তাদের পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে এবং অতীতের কর্মকাণ্ড যাচাই করে ছবি ও দরকারি সব তথ্য নিয়ে তবেই কাজে নিয়োগ দিতে হবে।  যাতে কোনো অপরাধ করলে তাদের দ্রুত শনাক্ত করা যায়। এছাড়া মালিকদের উচিত যাত্রীদের সঙ্গে চালক ও সহকারীর আচরণ কেমন হবে, সে ব্যাপারে পরিবহণ কর্মচারীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া। এ বিষয়টি লাইসেন্সপ্রাপ্তির সময়ও যাচাই করা দরকার।

আমরা জেনেছি, গণপরিবহনে নারীদের আসন প্রাপ্তি নিশ্চিতকরণে ও ভোগান্তি কমাতে পরিবহনে সংরক্ষিত আসন রাখার জন্য সকল পরিবহনকে তাগিদ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু লক্ষ্য করে দেখেছি, অধিকাংশ পরিবহনেই নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসন নাই। আর দু’্একটি পরিবহনে আসন থাকলেও তা থাকে পুরুষদের দখলে। যদিও নারীদের সংরক্ষিত আসনে পুুরুষ যাত্রী বসলে জেল-জরিমানার বিধান রেখে আইন পাস করেছে সরকার। কিন্তু বেশিরভাগ পুরুষই এ আইন মানছে না। তাই বলি, শুধু আইন করলে হবে না এর বাস্তবায়নে জনসচেতনতা তৈরি করতে হবে। গাড়িতে গাড়িতে আইনের বিধানগুলো উল্লেখ করতে হবে যাতে সবাই জানতে পারে। সর্বোপরি, আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে হবে।

গণপরিবহনে নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে বা সংরক্ষিত আসনের বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে পরিবহন স্টপেজগুলোয় ভ্রাম্যমাণ আদালতের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রতিটি গাড়িতে মালিকের নাম্বারের পাশাপাশি পুলিশ-প্রশাসনের মোবাইল নাম্বার দিতে হবে। এর ফলে যেকোনো জায়গা থেকেই নারীরা এ ধরনের পরিস্থিতিতে পড়লে পুলিশকে জানাতে পারবে এবং দায়িত্বরত ট্রাফিক সার্জেন্টরা সেই গাড়ি চিহ্নিত করতে পারবে।

n লেখক: শিক্ষার্থী, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজি (বিইউবিটি), ঢাকা।

 

 

এই পাতার আরো খবর -
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
১৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং
ফজর৪:২৮
যোহর১১:৫৫
আসর৪:২১
মাগরিব৬:০৮
এশা৭:২১
সূর্যোদয় - ৫:৪৪সূর্যাস্ত - ০৬:০৩
পড়ুন