কমলগঞ্জে আশঙ্কাজনক হারে কমছে কৃষিজমি গড়ে উঠছে বাড়িঘর-রাস্তাঘাট-দালানকোঠা
১৪ জানুয়ারী, ২০১৮ ইং
কমলগঞ্জে আশঙ্কাজনক হারে কমছে কৃষিজমি গড়ে উঠছে বাড়িঘর-রাস্তাঘাট-দালানকোঠা
g নূরুল মোহাইমীন মিল্টন, কমলগঞ্জ (মৌলভীবাজার) সংবাদদাতা

চা বাগান, বনাঞ্চল, কৃষি ও টিলাঘেরা মৌলভীবাজার জেলার সীমান্তবর্তী কমলগঞ্জ উপজেলায় নাগরিক জীবনের নানা অনুষঙ্গে ও মানবসৃষ্ট কর্মকাণ্ডে কৃষিজমি ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে। ১৯৯৬ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত এক যুগে উপজেলার সাত হাজার ২৭৭ একর আবাদি জমি ভরাট হয়ে গেছে। চলতি ২০১৮ সাল পর্যন্ত এর প্রায় দ্বিগুণ আবাদি জমি ভরাট হয়ে গেছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। নদী সংকোচন, জলাশয়, হাওর, বিল ও সরকারি পুকুরের প্রায় এক-চতুর্থাংশ ভরাট হয়ে গেছে। রাস্তার ধারে আবাদি কৃষিজমি ভরাট করে অপরিকল্পিতভাবে বসতঘর, রাস্তাঘাট, দালানকোঠা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে। ফসলের পরিবর্তে এখন শোভা পাচ্ছে রড সিমেন্টের দালানকোঠা। ফলে কৃষি উত্পাদন, মাছের আবাসস্থল ও পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

উপজেলা পরিসংখ্যান অফিসের তথ্য মতে, ১৯৯৬ সালে এ উপজেলায় আবাদি জমির পরিমাণ ছিল ৪৭ হাজার ৬৮১ একর। ২০০৮ সালে আবাদি জমির পরিমাণ দাঁড়ায় ৪০ হাজার ৪০৪ একর। সেই হিসাবে এক যুগে সাত হাজার ২৭৭ একর আবাদি জমি কমেছে। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমানে যে হারে আবাদি জমি ভরাট করে বাসাবাড়ি ও স্থাপনা তৈরি হচ্ছে, তাতে ২০০৮ সাল পরবর্তী ১০ বছরে বর্তমান সময় পর্যন্ত এর প্রায় দ্বিগুণ জমি ভরাট হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রতিবছর দেশে এক শতাংশ হারে কৃষি জমি হ্রাস পাচ্ছে। তবে লাগামহীনভাবে কৃষি জমি কমার যে প্রবণতা, তাতে ভবিষ্যতে এই কমার হার আরো বহুগুণ কমবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কমলগঞ্জে প্রতিবছর দশমিক ২৫ শতাংশ কৃষি জমি হ্রাস পাচ্ছে। গত কয়েক বছর ধরে প্রবাসী, চাকরিজীবী ও ব্যবসায়ীরা রাস্তার ধারের আবাদি কৃষিজমিতে অব্যাহতভাবে আলিশান দালানকোঠা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করছেন। ফলে কৃষিজমি ভরাটের প্রবণতা মাত্রাতিরিক্ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা গোপাল দেব বলেন, ‘মৌলভীবাজারের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রবাসীদের আয়ের একটি বড় অংশ বাসাবাড়ি, দালান, অট্টালিকা নির্মাণে ব্যয় করা হচ্ছে। এর মধ্যে ৭০ ভাগই রাস্তার ধারের আবাদি কৃষিজমি।’

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, কমলগঞ্জে মোট কৃষিজমির পরিমাণ ৩৭ হাজার ৩৫২ হেক্টর। এর মধ্যে ফসলি জমির পরিমাণ ৩২ হাজার ৭২৮ হেক্টর। এক ফসলি জমির পরিমাণ পাঁচ হাজার ১৬১ হেক্টর, দুই ফসলি জমির পরিমাণ ৯ হাজার ৫০১ হেক্টর, তিন ফসলি জমির পরিমাণ দুই হাজার ৮৫৫ হেক্টর। তবে নানা কারণে উপজেলায় আউস, আমন, বোরো ও রবিশস্য উত্পাদন উত্তরোত্তর হ্রাস পাচ্ছে। অব্যাহতভাবে ভরাট হওয়ায় কৃষিজমি হ্রাস পেয়ে ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তার হুমকি আর পরিবেশ বিপর্যয়েরও আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোঃ শামছুদ্দীন আহমদ বলেন, ‘মানুষের সচেতনতার অভাব ও নীতিমালা কার্যকর না থাকায় কিছু-সংখ্যক মানুষ প্রয়োজনে আবাদি জমি ভরাট করে দালানকোঠা গড়ে তুলছে। তবে এ সব বিষয়ে জনসচেতনতার প্রয়োজন। অন্যথায় ভবিষ্যতে খাদ্য সংকট দেখা দেবে।’

উপজেলা মত্স্য অফিস সূত্র জানিয়েছে, ৯০ দশক পরবর্তী সময়ে উপজেলার নদী, হাওর, খাল-বিল, জলাশয় ও প্রাচীনতম পুকুরের এক-চতুর্থাংশ ভরাট হয়ে গেছে। উপজেলা মত্স্য কর্মকর্তা মোঃ শাহাদত হোসেন হাওর, বিল ও জলাশয় ভরাটের সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, ’৯০ দশক পরবর্তী সময়ে কমলগঞ্জে হাওর, বিল, জলাশয়, নদী অনেকটাই ভরাট হয়ে গেছে। ফলে শুষ্ক মৌসুমে দীর্ঘ মেয়াদি খরা, বর্ষা মৌসুমে ভারি বর্ষণ, অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দিচ্ছে। বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল, বন্যা, পাহাড় ধস ও ভূমি-ফাটলসহ বিভিন্ন কারণে মারাত্মক পরিবেশ বিপর্যয়ের সম্মুখীন হচ্ছে গোটা এলাকা। বদলে যাচ্ছে এ এলাকার প্রাকৃতিক পরিবেশ। ফলে দীর্ঘমেয়াদে এটি বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে টিলা, সমতল, চা বাগান ও বনাঞ্চল বেষ্টিত মৌলভীবাজারেও পরিবেশ বিপর্যয়ের প্রভাব ইতোমধ্যেই পড়তে শুরু করেছে। সাম্প্র্রতিক সময় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ উল্লেযোগ্য হারে হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটছে। বৃষ্টির সময়ে খরা, খরার সময়ে বৃষ্টি, গরমের দিনে ঘন কুয়াশা, পাহাড় ধস, ভূমি ফাটলসহ বিভিন্ন প্রভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। বর্ষা মৌসুমে ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে বন্যায় রাস্তাঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট, ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়ে ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। কৃষিজমি কমে যাওয়ায় হ্রাস পাচ্ছে খাদ্য উত্পাদনও।

বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের সিলেট বিভাগীয় সহকারী বন সংরক্ষক মোঃ তবিবুর রহমান আবহাওয়া পরিবর্তনের কথা স্বীকার করে বলেন, ‘পরিবেশ বিপর্যয়ের প্রভাবে ইতোমধ্যেই আবহাওয়ার পরিবর্তন শুরু হয়ে গেছে। যেখানে অক্টোবর-নভেম্বর মাসে শীত শুরু হওয়ার কথা, সেখানে এখনো মাঝে-মধ্যে বৃষ্টি হচ্ছে। আবহাওয়া পরিবর্তনের প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে বোঝা যাবে।’

 

 

এই পাতার আরো খবর -
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
১৪ জানুয়ারী, ২০১৮ ইং
ফজর৫:২৩
যোহর১২:০৮
আসর৩:৫৭
মাগরিব৫:৩৫
এশা৬:৫২
সূর্যোদয় - ৬:৪২সূর্যাস্ত - ০৫:৩০
পড়ুন