আলোর ইশারা
জিএমবি আকাশ২৭ ডিসেম্বর, ২০১৫ ইং
আলোর ইশারা
আমার উনিশ বছরের ফটোগ্রাফির পথচলার প্রতিটি মুহূর্তে নিজের ‘অসম্ভব স্বপ্নগুলোকে’ বাস্তবতায় রূপ দেওয়ার চেষ্টা করে চলেছি। ‘অসম্ভব স্বপ্ন’ বলছি এ কারণে যে, যাত্রার শুরু থেকেই সবাই বলত আমার পথ আমাকে কখনো কোথাও নিয়ে যাবে না। বন্ধু আর পরিচিতদের প্রাপ্তির মাপকাঠি ছিল ‘ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার অথবা ব্যারিস্টার’ হওয়ার ডিগ্রিগুলো। কিন্তু এ মুহূর্তে আমি জানি, কত অসংখ্য স্বপ্নের দরজায় আমি পা রেখেছি, কতটা পথ পেরিয়ে আমি মানুষের হূদয় স্পর্শ করেছি। জানি, যে ক্যামেরাকে সবাই তুচ্ছ করত; তা আজ কত মানুষকে ভাবাতে, ভালোবাসতে অনুপ্রাণিত করে। আমার পথ চলা শুধু আমার পথচলায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। তাতে হাজারো মানুষের স্পর্শ আর অকৃত্রিম আবেগের মিশেল রয়েছে।

আমি একটি অতিসাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারে বড় হয়েছি, মুক্তিযোদ্ধা বাবার দেশ নিয়ে দেখা স্বপ্নের ভিতর বড় হয়েছি, আমার মায়ের রাতভর শোনানো গল্পের নায়ক হয়ে বড় হয়েছি। কোটি মধ্যবিত্ত পরিবারের মতো আমাদেরও সবচেয়ে বড় ক্ষমতা ছিল—স্বপ্ন দেখার ক্ষমতা। বাবা সরকারি চাকরি করতেন। একজন ফটোগ্রাফার হিসেবে ভ্রমণ পিপাসার শুরুটা হয় বাবার সরকারি চাকরি ও তার স্থান বদল দিয়ে।

ফটোগ্রাফি নিয়ে আমার মুগ্ধতার শুরু ১৯৯৬ সালে। তখনই প্রথম বুঝতে পারি, কোনো মানুষের সঙ্গে মিশে গিয়ে সেই সম্পর্কটা ছবিতেও একভাবে তুলে আনা সম্ভব। প্রচণ্ড উত্সাহে ছবি তোলার শুরু তখন থেকেই। শুরুর সেই দিনগুলো থেকে ধীরে ধীরে বুঝতে শিখলাম, মানুষ ও সমাজের ওপরে ছবির প্রভাব কতটা গভীর হতে পারে। একসময় নিশ্চিতভাবেই বুঝে গেলাম যে, এই জগতটাই হয়ে উঠবে আমার বাকি জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ফটোগ্রাফি ও এর নানা দিক নিয়ে পড়াশোনা শুরু করলাম। এই পড়াশোনার শুরুটা হয়েছিল বাংলাদেশেই, তারপর ফিলিপাইনে গিয়ে সেখানকার Ateneo de Manila University থেকে মাল্টিমিডিয়া জার্নালিজমে ডিপ্লোমা ডিগ্রি নিই।

আমি সেসব মানুষের প্রতিচ্ছবি তুলে আনতে শুরু করলাম যারা সমাজে নিগৃহীত। Third Gender নিয়ে কাজ করার সময় যে সামাজিক ও মানসিক সঙ্কটের মুখোমুখি হই, তা যেন আমাকে আরও দায়বদ্ধ করে আমার স্বপ্নের কাছে। Third Gender বোঝার জন্য এক বছর সম্পূর্ণভাবে সময় কাটাই তাদের সঙ্গে। ক্যামেরা হাতে নিই এক বছর পর, যখন তারা বন্ধু হয়ে আমার ফ্রেমে বাস্তবিক আদলে প্রকাশিত হয়। মধ্যবর্তী সময়টুকুতে আত্মীয় ও পরিচিত মানুষদের লাগামহীন মন্তব্য আমাকে একটিবারের জন্য নিবৃত করতে পারেনি। একইভাবে পতিতা পল্লীতে আমি রাতের পর রাত জেগে কাজ করি। হারিয়ে যাওয়া বোনদের বেদনার গল্প দিনভর শুনি তাদের ভাই হয়ে। সেসব বোনেরা আমাকে দেখলেই ছুটে এসে হাত ধরে। আমার জন্য জমিয়ে রাখা তাদের বাতাসা আর মিষ্টিগুলো এ জীবনে পাওয়া সবচেয়ে মূল্যবান ভালোবাসা বলতে হয়।

মানুষের ভেতরের সত্যিকার সৌন্দর্যই ছবিতে তুলে ধরতে চাই। আমার ছবির মানুষেরা নির্মম কিংবা পথভ্রষ্ট সব পরিবেশে দুঃসাধ্য পরিশ্রমের কাজ করে জীবিকানির্বাহ করলেও চমকপ্রদ ব্যক্তিত্ব ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। সমাজের কাছে অবহেলিত এসব মানুষকে কাছ থেকে দেখলে, তাদের সঙ্গে বসে এক কাপ চা খেলে উপলব্ধি করা যায়, নির্মম এক দুনিয়াতে বাস করেও কীভাবে হূদয়ে মমতা ধারণ করা সম্ভব।

একজন ফটোগ্রাফার ও শিল্পী হিসেবে নিজের চারপাশের জীবনযাত্রার ক্ষুদ্রতম অস্তিত্বটির কথাও তুলে ধরতে চাই আমার কাজে। চারপাশে যে দারিদ্র্য, বঞ্চনা কিংবা সংগ্রাম দেখি, তা সবাইকে আরও কাছ থেকে দেখানোর প্রচণ্ড তাগিদ অনুভব করি নিজের ভিতরে। আমি মনে করি, এসব দেখেও মুখ ঘুরিয়ে চলে যাওয়া একজন ফটোগ্রাফারের জন্য অপরাধ ছাড়া আর কিছু নয়।

জীবনের গল্প খুঁজতে ফটোগ্রাফি আমাকে ৩০টি দেশে নিয়ে গেছে। শত শত পথঘাট আর সে স্মৃতি তুলে এনেছি ক্যামেরায়। এখন পর্যন্ত আমি নব্বইটির বেশি আন্তর্জাতিক সম্মাননা অর্জন করেছি। ১০০টির বেশি আন্তর্জাতিক পত্রিকা ও ম্যাগাজিনে আমার কাজ প্রকাশিত হয়েছে। আমার ছবির প্রদর্শনী হয়েছে অসংখ্য দেশে অসংখ্য বার। প্রতিবার মুগ্ধ হয়ে দেখেছি, কীভাবে প্রদর্শনীতে আমার দেশের মানুষদের গল্প ও ছবি আলোড়িত করেছে বিদেশিদের।

আমার ছবিগুলো খুবই সাধারণ, কিন্তু সেগুলো অসাধারণ করে দেয় ছবিতে থাকা মানুষেরা। এমন মানুষদের আমরা সবসময় চারপাশে দেখলেও কখনোই সেভাবে তাদের দিকে নজর দিই না। কিন্তু তাদেরও প্রত্যেকেরই আলাদা জীবন আছে, আছে বহু না বলা গল্প। আমার ছবির বিষয়বস্তুও এমনই সাধারণ। একেবারে খুবই সাদামাটা বা অনাকর্ষণীয় একজন মানুষও কীভাবে অনুপ্রেরণার উত্স হতে পারে, সেটাই কাছ থেকে দেখাতে চেষ্টা করি।

যদিও আমি ছবি তোলা শুরু করি সাদাকালোতে। কিন্তু তারপর সময়ের সঙ্গে নানাভাবে বুঝতে পারি কালার ফটোগ্রাফি কতটা গুরুত্বপূর্ণ। সেই থেকে রং আমাকে মোহিত করেছে সবসময়। রং দিয়েই তাই ছবিতে গভীরতা দেওয়ার চেষ্টা করে যাই। পৃথিবীর বহু সুন্দর জায়গায় বিভিন্ন রকম পরিবেশে ছবি তোলার সুযোগ হয়েছে আমার। কিন্তু একসময় বুঝতে পারলাম প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে বেঁচে থাকা একজন মানুষের চেয়ে রঙিন আর কিছুই হতে পারে না। তখন থেকে এই রঙগুলো তুলে আনাই হয়ে ওঠে আমার সবচেয়ে বড় যুদ্ধ। সবকিছুর পরেও তারা ঠিকই হাসতে জানে, জানে বাঁচতে। পথশিশুটির হাতে থাকা হলুদ বেলুন কিংবা ভিখারির লাল থালাটিও তাই আমাকে টানে। রং নিয়ে আমার এই মুগ্ধতাই আমার কাজের শক্তি। বাস্তব দুনিয়ার রঙহীন সব পথই আমাকে নিয়ে যায় রঙিন সব মানুষের কাছে।

আমি বড় হয়েছি উন্নয়নশীল একটি দেশে, যার একটি বড় অংশে নাগরিক সুবিধাবঞ্চিত অজস্র মানুষ আর অবহেলিত শিশুদের বসবাস; এই সুবাদে সমাজের বহু অন্ধকার দিকের সঙ্গে আমারও পরিচয় ঘটে যায়। ছবিতে এসব মানুষদের জীবন তুলে আনার পাশাপাশি তাদের জন্য কিছু করবার প্রচণ্ড তাড়না আমার ভেতরে কাজ করেছে সবসময়। ঠিক করেছিলাম অস্ফুট এই স্বরগুলোকেই আমি আওয়াজ দিয়ে পৌঁছে দেব সবার কাছে। কিন্তু একসময় উপলব্ধি করতে শুরু করলাম যে, শুধু ছবির মাধ্যমে এই মানুষদের বঞ্চনা তুলে ধরাই যথেষ্ট নয়। বারবার নিজেকেই শুধু প্রশ্ন করতাম, আমার ছবিতে উঠে আসা মানুষদের কষ্টের জীবনে ছবিগুলো কি আদৌ কোনো পরিবর্তন আনতে পেরেছে? বুঝতে পারলাম, একজন ফটোসাংবাদিক হিসেবে সত্যগুলো তুলে আনা যেমন আমার দায়িত্ব, ঠিক তেমনি একজন মানুষ হিসেবে অনাচার আর দারিদ্র্যক্লিষ্ট ওই মানুষগুলোর জীবন একটু হলেও স্বাভাবিক করে দেওয়া আমার নৈতিক দায়িত্বের ভিতরে পড়ে। এই লক্ষ্যে তখন থেকেই যে কাজটি শুরু করেছিলাম, সেটিই আজ প্রায় দশ বছরেরও বেশি সময় পরে রূপ নিয়েছে ‘Survivors’ বইটিতে। দুনিয়ার শত বাধাবিপত্তির মুখেও মানুষের সংগ্রামী অজেয় রূপটিই হলো স্বপ্রকাশিত আমার এই ছবির বইয়ের মূল প্রতিপাদ্য। এই বই ও বই সম্পর্কিত চিত্রশালা থেকে উপার্জিত অর্থ চলে যায় এই বইয়ের পাতায় উঠে আসা মানুষদের সাহায্যার্থে। এমনভাবে তাদের সহযোগিতা করার চেষ্টা করি যাতে তারা নিজেরাই নিজেদের ক্ষুদ্র ব্যবসা দাঁড় করিয়ে স্বাবলম্বী হয়ে উঠতে পারে। এসবের ভিতরেও বিভিন্ন এনজিও, মিডিয়া ও আমার এজেন্ট প্যানোস পিকচার্সের মাধ্যমে পাওয়া কাজ চালিয়ে গিয়েছি; যা এখনো চলমান। ২০১৩ সালে ঢাকার অদূরে নারায়ণগঞ্জে প্রতিষ্ঠা করেছি ফার্স্ট লাইট ইনস্টিটিউট অব ফটোগ্রাফি।

দক্ষ অতিথি আলোকচিত্রীদের সঙ্গে আমিও এখানে নবীনদের ছবি তোলা শেখাই। এই শিক্ষালয় থেকে উপার্জিত অর্থও ব্যয় হয় সত্যিকার উদ্দেশ্য—পথশিশু, শিশু যৌনকর্মী ও শিশু শ্রমিকদের প্রাথমিক শিক্ষায়।

সহকর্মী ফটোগ্রাফারদের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখে বলতে চাই, বাণিজ্যিক কাজ আসলে আমাকে সেভাবে টানে না কখনোই; বাণিজ্যিক কাজ সম্পূর্ণই আলাদা। একজন স্বাধীন ফটোসাংবাদিক (freelance photojoualist) কখনোই জানেন না পরের কাজটা তার হাতে কবে আসবে, কিন্তু বাণিজ্যিক কাজের ক্ষেত্রে উপার্জনের চাকা বলতে গেলে প্রায় সবসময়ই চলমান থাকে। এদিকে ফটোগ্রাফি ইন্ডাস্ট্রিতে টিকে থাকাও দিন দিন দুরূহ হয়ে উঠছে; প্রতিযোগিতার চেয়েও যার দায় অনেকাংশেই স্বজনপ্রীতির। সবকিছু মিলিয়ে একজন মানবিক ফটোগ্রাফারকে তার নিজস্ব কর্ম-পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে আর্থিক ও মানসিকভাবে ক্রমাগত বিপর্যস্ত হতে হয়, যা সামাল দেওয়া খুব সহজ কথা নয়। নিজের বিভিন্ন প্রজেক্টের জন্য কয়েকভাবে অর্থ জোগাড়ের চেষ্টা করি। নিজের ফটোগ্রাফি স্কুুলে (www.firstlightphotoschool.com) আমি একটি বিশেষ কোর্স চালু করেছি, যেখানে একবারে শুধু একজন ব্যক্তিই অংশ নিতে পারেন। এছাড়াও অনলাইন ফটোগ্রাফি শিক্ষালয় The Compelling Image-এ আমি একজন শিক্ষক হিসেবে সক্রিয় আছি।

আমার যাত্রা চলছে, আমার স্বপ্নের পথে। বলতে চাই, জীবনে হার মেনে নেওয়া যাবে না কখনোই। একটুখানি সময় নিয়ে ভেবে দেখুন আপনি কতটা সৌভাগ্যবান। নিজের যা আছে তাই নিয়ে সন্তুষ্ট হতে শিখুন। প্রচুর টাকা, জনপ্রিয়তা, উচ্চশিক্ষিত হওয়া কিংবা ধোপদুরস্ত হয়ে থাকাটাই জীবনের সত্যিকার অর্থ নয়। সততা, নম্রতা ও দৃঢ়তায় আর সবার সঙ্গে মিশে সবকিছু ভাগাভাগি করে নেওয়াটাই হচ্ছে সত্যিকারের জীবন। শুধু তখনই আমাদের জীবন আনন্দ আর পরিতৃপ্তিতে ভরে উঠবে। আসুন আমরা সবাই মানবতার খাতিরে এক হই! আমাদের কাজেকর্মে যেন অন্তরের গভীরতা প্রকাশ পায়। যাদের আর কোথাও যাওয়ার নেই, কিছুই বলার উপায় নেই, তারা কিন্তু আমাদের দিকেই তাকিয়ে আছে; আমরা যেন তাদের হয়েই কথা বলে যেতে পারি!

 

জিএমবি আকাশ :আলোকচিত্রী

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
২৭ নভেম্বর, ২০১৭ ইং
ফজর৫:১৮
যোহর১২:০০
আসর৩:৪৪
মাগরিব৫:২৩
এশা৬:৪১
সূর্যোদয় - ৬:৩৯সূর্যাস্ত - ০৫:১৮
পড়ুন