শোয়েব আলীর বিশ্বকাপ
দেবব্রত মুখোপাধ্যায়২৭ জানুয়ারী, ২০১৫ ইং
শোয়েব আলীর বিশ্বকাপ
গত বছর চার-পাঁচেক ধরে যারা বাংলাদেশের খেলা টেলিভিশনে বা মাঠে গিয়ে সরাসরি দেখেন, তারা জানেন, মাঠে খেলোয়াড়ের বদল হতে পারে; দর্শক সারিতে একজনের কোনো পরিবর্তন নেই। তাকে ছাড়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ম্যাচ এখন কল্পনাই করা যায় না। পাকিস্তান বা ভারতের যেমন ‘আইকন’ সমর্থক আছেন—জলিল চাচা বা সুধীর; বাংলাদেশের আইকন সমর্থক এখন শোয়েব আলী।

হ্যাঁ, আমাদের ‘টাইগার’ শোয়েব আলী। বাংলাদেশের প্রতিটা খেলার সময়, অনুশীলনের সময় বাঘের মতো সারা শরীর অলঙ্কৃত করে অবিরাম চিত্কার করে চলা শোয়েব আলী বুখারী।

এই শোয়েব আলী বিশ্বকাপ দেখতে অস্ট্রেলিয়ায় যেতে চান; বিশ্বকাপের প্রতিটা খেলায় দলের পাশে থেকে চিত্কার করতে চান। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড ও আইসিসির ব্যবস্থায় খেলা দেখার একটা ব্যবস্থা হয়েছে। কাগজপত্রের দায়িত্বটাও বিসিবি নিয়েছে। কিন্তু কিছুতেই অস্ট্রেলিয়ায় যাতায়াত ও থাকা-খাওয়ার টাকাটা জোগাড় হচ্ছে না। শোয়েবের পাশে দাঁড়ানোর আহবান জানিয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট সাপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিসিএ টাইগার্স) একটা সংবাদ সম্মেলনও করেছে। তাতে এখন পর্যন্ত তেমন কোনো সাড়া মেলেনি।

শোয়েবের ক্রিকেট দেখার শুরুটাই খানিকটা পাগলামি থেকে।

ফরিদপুরের ছেলে শোয়েব পেশায় একজন মোটর মেকানিক। নিজেই একগাল হেসে বলেন, ‘লেখাপড়া কিছু জানি না।’ লেখাপড়া না জানলে কী হবে, মেকানিকের কাজ করতে করতে খেলার প্রেমে ঠিকই পড়ে গিয়েছিলেন। শোয়েব যতদূর মনে করতে পারেন, বাংলাদেশের খেলা নিয়ে তার নেশাটা পাগলামিতে পরিণত হয় ২০০৩ সালে বাংলাদেশের পাকিস্তান সফরের সময়।

এর আগেও খেলাটা নিয়ে তার উন্মাদনা ছিল। কিন্তু সেবার বিশেষত মুলতান টেস্টে দলের খেলা দেখে, বলা যায় পরাজয়টা দেখে তিনি প্রেমে পড়ে যান বাংলাদেশ দলের। তার মনে হচ্ছিল, মুলতানে যদি গ্যালারিতে বাংলাদেশের হয়ে কেউ চিত্কার করতে পারতো, তাহলে ১ উইকেটের ওই ট্রাজিক হারটা সহ্য করতে হত না।

শোয়েব প্রথম মাঠে গিয়ে খেলা দেখেন ২০০৪ সালে; নিউজিল্যান্ডের বাংলাদেশ সফরের সময়। আফতাব আহমেদ ৫ উইকেট নিলেন, কিন্তু ম্যাচ হেরে গেল বাংলাদেশ। সে সময়ও তার মনে হয়েছে, গ্যালারিতে বসে এমন কিছু করা দরকার, যাতে খারাপ সময়েও খেলোয়াড়রা উত্সাহ পান।

একটা উপায় আছে চিত্কার করা; সেটা সবাই করেন। শোয়েবই বলছিলেন পরের উপায়টা মাথায় আসার কথা, ‘আমার মনে হল, একটা কিছু করা দরকার, যাদের খেলোয়াড়রা দূর থেকে দেখে শক্তিটা পায়। ভাবলাম যে, শরীরে জাতীয় পতাকার রং করবো। আর মুখটা বাঘের মতো করে আঁকবো। তাহলে আমার চিত্কার শুনে খেলোয়াড়রা উত্সাহ পাবে।’

এই ভাবনা কাজে লাগাতে অবশ্য সময় লাগলো। ২০১১ সালের এশিয়া কাপে প্রথমবারের মতো এমন সাজে গ্যালারিতে হাজির হয়েছিলেন শোয়েব। সে অভিযানেই সফল। সারা বিশ্বকে চমকে দিয়ে, দুই বিশ্বকাপ জয়ী দলকে ছিটকে দিয়ে ফাইনালে বাংলাদেশ!

অবশ্য কাজটা সহজ ছিল না শোয়েবের জন্য। 

প্রথমে চারুকলায় গিয়ে এক শিল্পীকে খুঁজে বের করলেন। তিনি শোয়েবের চাহিদা মতো শরীরে রং করে দিলেন। প্রতিবার রং করতে ১৫০০ টাকা। শোয়েব হেসে বলেন, ‘পকেটে নাই টিকিট কেনার টাকা! এতো টাকা কি করে রোজ দেব। তাই রং কিনে আয়নার সামনে বসে নিজেই এরপর থেকে একে ফেলা শুরু করলাম।’সেই শুরু। এরপর থেকে বাংলাদেশের খেলা মানেই মাঠে শোয়েব আছেন, টাইগার আছে। বাংলাদেশের খেলা দেখতে জীবন হাতে নিয়ে, প্রায় সর্বস্ব বিক্রি করে শ্রীলঙ্কা গেছেন। সেখানে গ্যারেজে থেকেছেন, খেলোয়াড়দের দেয়া টাকায় খাওয়া চলেছে। জিম্বাবুয়ে গেছেন খেলোয়াড়দের দেয়া টাকায়। বাঘ সাজার আগেই ২০০৬ সালে ডিসকভারীর মতো করেই ভারতে গিয়েছিলেন চ্যাম্পিয়নস ট্রফির খেলা দেখবেন বলে।

শোয়েবের উত্সাহ, শোয়েবের পাগলামি নিয়ে বলতে গেলে মহাকাব্য হয়ে যাবে।

শরীরে একশ’ পাঁচ ডিগ্রি জ্বর নিয়ে খেলা দেখেছেন, প্রবল শীতের দিনে খুলনায় খালি গায়ে খেলা দেখতে গিয়ে নিউমোনিয়া বাধাতে বসেছিলেন, সস্তা রং দিয়ে শরীর রাঙাতে গিয়ে চর্মরোগ বাধিয়ে বসেছিলেন। যে খালুর কাছে মানুষ হয়েছেন, সেই খালুর মৃত্যু খবর পেয়েও খেলা ছেড়ে যাননি। তার খালি একটা কথাই মনে হয়, ‘আমি না থাকলে চিত্কার করবে কে? বাংলাদেশের কোনো খেলোয়াড় চার-ছয় মারলে, উইকেট পেলে তো সবাই চিত্কার করে। কিন্তু জানেন, যখন আউট হয় আমাদের কেউ বা কেউ চার-ছয় হজম করে; তখন গ্যালারি পুরো চুপ হয়ে যায়। এই সময়ে আমি চিত্কার করে চেষ্টা করি, সবাইকে চাঙ্গা রাখার।’

শোয়েবের কথার সত্যতা মেলে মাশরাফি, তাসকিনদের কণ্ঠে। তারা জানান দেন, খারাপ সময়তে অন্তত এই টাইগারের চিত্কার তাদের প্রাণশক্তিটা টিকিয়ে রাখে।

কিন্তু এখন কী হবে?

অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডে কী তাহলে বাংলাদেশের পাশে শোয়েব থাকবেন না! শোয়েবের কণ্ঠ তাঁতিয়ে তুলবে না মাশরাফিদের। মাশরাফি নিজেই অবশ্য শোয়েবকে নাকি বলেছেন, একটা ব্যবস্থা করার চেষ্টা করছেন। সে ব্যবস্থা হোক আর নাই হোক, শোয়েব বাঘের মতো গর্জন করে ওঠেন, ‘আমি কিচ্ছু বুঝি না। আমি অস্ট্রেলিয়ায় যাবো।’

অবশ্যই, শোয়েব। আপনার নাম বাঘ। বাঘেরা চাইলে সব হয়।

 

এই পাতার আরো খবর -
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
২৭ জানুয়ারী, ২০১৮ ইং
ফজর৫:২২
যোহর১২:১২
আসর৪:০৬
মাগরিব৫:৪৫
এশা৭:০০
সূর্যোদয় - ৬:৪১সূর্যাস্ত - ০৫:৪০
পড়ুন