বাংলাদেশের বাজেট
মামুন রশীদ২০ ফেব্রুয়ারী, ২০১৭ ইং
বাংলাদেশের বাজেট
তাজউদ্দিন আহমেদকে দেখার সৌভাগ্য আমার হয়নি। তাঁর সম্পর্কে আমার যতটুকু জ্ঞান তা এসেছে প্রয়াত কফিলউদ্দিন মাহমুদ, মতিউল ইসলাম এবং বন্ধুবর জ্যেষ্ঠজন সৈয়দ রেজাউল করিম থেকে। এই তিনজনই তাঁর সঙ্গে কাজ করেছেন। তাঁরা আমাকে বলেছেন, তিনি ছিলেন চিন্তা-চেতনায় অনেক শক্তিধর এবং ফোকাস্ড একজন এক্সট্রা অর্ডিনারি মানুষ। তিনি সবসময় দরিদ্র মানুষের পক্ষে ছিলেন। পাশাপাশি দাতা গোষ্ঠীকে নিয়ে তাঁর ছিল বিবিধ জটিল হিসাব নিকাশ।

আজকের দিনে আমাদের বেশিরভাগ বাজেট যেখানে দাতাদের কথা মেনে করা হচ্ছে, দাতাদের প্রভাব কিংবা সমর্থন যেখানে মুখ্য হয়ে উঠছে, আমি অবাক হয়ে যাই তাজউদ্দিন আহমেদ কিভাবে তার মন্ত্রণালয় চালিয়ে নিয়েছেন অত সুন্দর করে। সদ্য স্বাধীন দেশটির জন্য তিনি প্রথম ৭৮৬ কোটি টাকার বাজেট পেশ করেছিলেন। তার ১৯৭৪-৭৫ সালের বাজেট পরিসরের দিক থেকে বেড়ে গিয়ে হয় ১০৮৪ কোটি টাকা। এরপর মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের সময়ে তথা ১৯৭৬ সালের বাজেটের আকৃতি গিয়ে দাঁড়ায় ১৯৯০ কোটি টাকা। এরপর ১৯৯১ সালে মো. সাইফুর রহমানের সময়কালে বাজেট গিয়ে দাঁড়ায় ১৫৫৮৪ কোটি টাকায়। এরপর ২০০৬ সালে প্রয়াত অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমানের শেষ বাজেট ছিল ৬৯৭৪০ কোটি টাকার। এরপর জাতির এক সংকটকালে এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলামের সময় এই বাজেট গিয়ে দাঁড়ায় ৯৯৯৬২ কোটি টাকায়।

আমরা এদিক থেকে চিন্তা করলে মুহিত সাহেবের বাজেটকে একটু গঠনমূলক সমালোচনার দৃষ্টিতে দেখতেই পারি। এই ভদ্রলোক  প্রায় সাড়ে তিনগুণ করে ফেলেছেন পূর্বতন বাজেটকে। ২০১৬ সালে যা বেড়ে গিয়ে প্রায় ৩৪০৬০৫ কোটি টাকায় ঠেকেছে। তবে এই বাজেটের যা অর্জন তা অনেক কারণেই সবার প্রত্যাশাকে অতিক্রম  করতে পারেনি। এদিক থেকে চিন্তা করতে গেলে এই বাজেটে ব্যয় যেভাবে বেড়েছে আয়ের খাত তার বিপরীতে অনেকটা যেনো সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। গত বছরগুলোতে দেখা যাচ্ছে, উন্নয়ন বাজেটও বেড়ে গিয়েছে চিন্তার বাইরে। অন্যদিকে উন্নয়নের জন্য যে সহায়তা দেওয়ার কথা তা গত কয়েক বছরে অনেক কমে গিয়েছে। এক্ষেত্রে স্থানীয় সম্পদের স্থানান্তরকরণের মধ্য দিয়ে এর বেশিরভাগ যোগান নিশ্চিতকরণে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

নব্বইয়ের দশকে যে ছকে বাঁধা বাজেট পেশ করা হতো, ইদানীংকালে সেই ধারণা থেকে বেরিয়ে আসার একটা প্রবণতা লক্ষ করা গেছে।  অন্যদিকে বিশ্বব্যাংক থেকেও মিড টার্ম বাজেটকে সমর্থন দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে পুরো প্রক্রিয়াকে সুষ্ঠুভাবে এগিয়ে নেওয়ার একটা সুযোগ যেমন সৃষ্টি হয় পাশাপাশি নীতিনির্ধারকরা সহজেই তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ কিংবা গৃহীত সিদ্ধান্ত বাতিলের একটা সুযোগ পেয়ে যান। বিগত বছরগুলোতে উপযুক্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টির সূত্র ধরে জিডিপিও বেড়েছে বেশ। এক্ষেত্রে উদ্দিষ্ট প্রকল্পগুলোর মধ্যে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে তেমন বৃদ্ধি লক্ষ্য করা যায়নি। স্থানীয় সরকার, যোগাযোগ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মত বেশি খরচে মন্ত্রণালয়গুলোতে এখন প্রয়োজন উপযুক্ত পরিকল্পনা প্রণয়ন। এসব ক্ষেত্রে উপযুক্ত অডিট ব্যবস্থা এমনকি সিএফও তথা চিফ ফিনান্সিয়াল অফিসার পর্যন্ত নাই। তারা প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রণীত বাজেট সংশোধনের জন্য একটি সুযোগ রাখতে আগ্রহী। শিক্ষা  ও স্বাস্থ্যখাতের বাজেট এখন একটি সম্পৃক্ত বিন্দুতে গিয়ে ঠেকেছে যা কিছুতেই কর সংগ্রহের গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন এবং প্রতিরক্ষা বাজেটের ব্যালেন্সিং বাদে আর যেন আকাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নেওয়া সম্ভব নয় । তবে যেকোনো সরকারের জন্য প্রতিরক্ষা বাজেট সংশোধন একটি চ্যালেঞ্জিং বিষয় হয়ে উঠতে পারে। সবথেকে বাজে বিষয় হচ্ছে বাজেট নিয়ে সংসদে তেমনভাবে আলোচনা হতেও দেখা যাচ্ছে না। বেশিরভাগ জনপ্রতিনিধি বাজেট নিয়ে কিভাবে আলোচনা করতে হবে সে বিষয়ে এখনো পুরোপুরি সক্ষমতা অর্জন করে উঠতে পারেননি। তাদের মধ্যে শুধু গুটিকয়েককে দেখা যায় এই বিষয়ে এক আধটু আগ্রহ দেখাতে।

এ বিষয়গুলোকে নিয়ে চিন্তা করতে গেলে দেখা যাচ্ছে, বাজেট এখন পর্যন্ত পুরোপুরি অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকাণ্ড হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সঙ্গে মিল রেখে এই মন্ত্রণালয় বার বার সাজাতে দেখা যায়। সেখানে মন্ত্রীরা রাজনৈতিকভাবে নির্বাচিত না হলে এখানে পুরোপুরি আমলাতান্ত্রিক প্রভাব স্পষ্ট হতে পারত। সাবেক অর্থসচিবদের মধ্যে আকবর আলি খান, জাকির আহমেদ খান কিংবা মোহাম্মদ তারিক বাজেট দর্শনের ধারাবাহিকতা রক্ষা করে স্ব স্ব অবস্থানে থেকে কাজ করেছেন। তাঁরা বাজেট প্রকাশের আগে এমনকি পরেও তাঁদের মতামত ব্যক্ত করেছেন। এক্ষেত্রে অবশ্য প্রতিটি ক্ষেত্রে দেখেছি বাজেট ইউটিলাইজেশন নিয়ে তেমন কোনো কাজ হয়নি। অন্যদিকে বাজেট তৈরির আগে পলিসি প্ল্যানারদেরও উপযুক্ত বক্তব্য প্রদান ও মত প্রকাশের খুব একটা সুযোগ থাকে না।

ধীরে ধীরে বাজেটের সঙ্গে মিল রেখে জিডিপিকেও বেশ বড় করে দেখানো হচ্ছে। তারপরেও আমাদের জিডিপির মাত্র ১৮ শতাংশ এর আওতাভুক্ত হচ্ছে। বিশ্বের অনেক দেশে দেখা যাচ্ছে, এই পরিমাণ বেড়ে গিয়ে জিডিপির ২০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছেন, তিনি এই পরিমাণ এগিয়ে নিতে চেষ্টা করবেন অন্ততপক্ষে জিডিপির ২০ শতাংশ পর্যন্ত। তবে তিনি রাজস্ব ক্ষেত্রে অবনমনের জন্য প্রতিটি ক্ষেত্রে দুর্বল কর সংগ্রহ প্রক্রিয়াকে দুষছেন। পাশাপাশি অনেকগুলো গৃহীত প্রকল্প শেষ অবধি কাঙ্ক্ষিতমানে বাস্তবায়ন করা যায় না। সেটার দোষকে তিনি চাপাতে চাইছেন দুর্বল রাজস্ব সংগৃহীত হওয়ার উপর। যেখানে আমাদের উন্নয়ন বাজেট ধরে রাখা হচ্ছে ২০ বিলিয়ন ডলারের পর্যায়ে। সেখানে অবশ্য উপযুক্ত প্রকল্প ব্যবস্থাপনা করতে ব্যর্থ হওয়ায় আমাদের পক্ষে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে বৈশ্বিক অবস্থা মাথায় নিয়ে একটি প্রকল্পের সঠিক বাস্তবায়ন করতে পারে এমন মানুষেরও বেজায় অভাব রয়েছে আমাদের দেশে।

বাংলাদেশের মতো গতিশীল অর্থনীতির দেশে বাজেট প্রণয়নের ক্ষেত্রে অনেকগুলো বিষয় মাথায় রাখা উচিত। বেসরকারি খাতের অনেক প্রতিনিধিকে সরকারি সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি স্থানীয় সরকারে যারা আছেন তাদেরকেও উপযুক্ত কর্মভূমিকার মাধ্যমে স্ব স্ব অবস্থান থেকে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলা যেতে পারে। এর বাইরে বাণিজ্য বা ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদগুলোর যাঁরা শিক্ষক আছেন তাদেরকেও যুক্ত করা যেতে পারে। বাজেট প্রস্তুতি, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও প্রকাশের ক্ষেত্রে তাঁরা স্ব স্ব অবস্থান থেকে ভূমিকা রাখতে পারেন।  আমরা যদি একটি গতিশীল বাজেট চাই তবে সংশ্লিষ্ট সকলের গুরুত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। নীতিনির্ধারক, সাংসদ, ইন্টারন্যাশনাল ক্রিটিক থেকে শুরু করে উন্নয়নখাতে নিয়োজিত ব্যক্তিরা পর্যন্ত এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। এমনকি আমরা চায়ের টেবিল থেকে যে আলোচনা করি সেটাও যদি কোনোভাবে অর্থ মন্ত্রণালয় পর্যন্ত পৌঁছানো সম্ভব হয় তার থেকেও ভালো কিছু হওয়া সম্ভব।

n লেখক :ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিশ্লেষক

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
২০ ফেব্রুয়ারী, ২০১৮ ইং
ফজর৫:১২
যোহর১২:১৩
আসর৪:২০
মাগরিব৬:০০
এশা৭:১৩
সূর্যোদয় - ৬:২৮সূর্যাস্ত - ০৫:৫৫
পড়ুন