ভারতের রাষ্ট্রপতিকে কলকাতার নান্দনিক শ্রদ্ধার্ঘ্য
আরশিনগরবাহার উদ্দিন১৭ জুলাই, ২০১৭ ইং
ভারতের রাষ্ট্রপতিকে কলকাতার নান্দনিক শ্রদ্ধার্ঘ্য
শ্রীপ্রণব মুখোপাধ্যায়। ভারতের ত্রয়োদশ রাষ্ট্রপতি। ২৫ জুলাই পর্যন্ত বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশের সাংবিধানিক প্রধানের দায়িত্ব সামলাবেন। এর পরেও আমাদের বিশ্বাস উপমহাদেশের রাজনীতিতে এক দেশের সঙ্গে আরেক দেশের সৌহার্দ্যের নির্মাণেও তাঁর প্রাসঙ্গিকতা বহাল থাকবে। সম্প্রতি বলেছেন, বিনয়ের সঙ্গে, মানুষের ভেতর থেকে আমি উঠে এসেছিলাম, আবার তাদের মধ্যেই মিশে যাব। কলকাতার আকাদেমি অব ফাইন আর্টসের সভাসদনে অন্য ধরনের সংবর্ধনা সভায় যখন একথা বলছিলেন, বাইরে তখন মেঘলা আকাশ, ভেতরে গুণীজনের আলোকিত উচ্ছ্বাস আর হাততালি। থেমে যাব, অবসর নিয়ে বিশ্রামে দিন কাটাব, বলেননি প্রণববাবু। জীবন আমৃত্যু গতিময়, সে থামতে জানে না, দেহ থামলেও ভাবনা ছুটতে ছুটতে জানাতে থাকে, চরৈবেতি—এই দর্শনই প্রকারান্তরে জানিয়ে গেলেন রাষ্ট্রপতি। আর এ ভাবনার শরিক হয়ে রইল তার হয়ে-ওঠার প্রিয় শহর কলকাতা।

প্রণববাবুর বৈদগ্ধ রাজনৈতিক বিচক্ষণতা ও দূরদৃষ্টি প্রশ্নহীন। এ নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। প্রতিষ্ঠিত মসৃণ ব্যক্তিত্ব। কেউ কেউ তাকে তার সক্রিয় রাজনীতির নানা পর্বে ‘চাণক্য’ বলে সম্বোধন করে এক ধরনের তৃপ্তি অনুভব করেছেন। ব্যক্তি প্রতিভাকে, প্রতিভার দ্যুতি আর বিস্তারকে এভাবে কারো নামের সঙ্গে জড়িয়ে বিশেষায়িত করা কতটা যুক্তিগ্রাহ্য, সংগত এ নিয়ে আমাদের সংশয় রয়েছে। এ বিষয়ে প্রণববাবুর বক্তব্যও কখনো নজরে আসেনি। ৩০ জুন, তার সর্বশেষ কলকাতা সফরে সংক্ষিপ্ত সংযত ভাষণে বললেন, গণতন্ত্রে রাজনৈতিক কর্মীর কোনো পরম্পরা থাকে না, আমিও পরম্পরা রেখে যেতে চাই না। তার মানে নিজস্বতাকে ৬০ বছরের রাজনীতিতে গুরুত্ব দিতে চেয়েছেন। আর এটাই তার সামাজিক পরিচয়ের সুপ্রতিষ্ঠিত চিহ্ন হয়ে থাকবে?

প্রণববাবুকে নিয়ে সংবাদপত্রের বাইরে বিশেষ লেখালেখি হয়নি। তার পড়াশোনা, তার শিল্পপ্রীতি, গানের প্রতি আকর্ষণ, কবিতা প্রেম, আর অসাধারণ স্মৃতিশক্তি নিয়ে আলোচনা হয়। ভবিষ্যতেও হবে। ইতিহাস তাকে বারবার খতিয়ে দেখবে। কিন্তু সমকালে যেকোনো ব্যক্তির গুণাগুণ নিয়ে কথা বলা যেহেতু খানিকটা কঠিন, যেহেতু নিরপেক্ষতা আর নৈর্ব্যক্তিকতাকে ঢেকে দেয় নৈকট্য, সে কারণে জীবিত ব্যক্তির যথাযথ মূল্যায়ন প্রায় অসম্ভব। যাকে কাছ থেকে দেখা যায়, ছোঁয়া যায়, যার সঙ্গে স্বতঃস্ফূর্ত আলাপের দুঃসাহস প্রশ্রয় পায়, তার টানে ইতিহাস পড়ুয়ার দূরবর্তী অবস্থান অনেক সময় পারস্পরিক সম্পর্কের কারণে আবেগতাড়িত হয়ে ওঠে। এই মুহূর্তে প্রণববাবুর রাজনৈতিক উত্তরণ, টানাপড়েন ইত্যাদি বিষয় নিয়ে লেখালেখি এরকম দূষিত, খণ্ডিত হওয়ার আশঙ্কা থেকে যাচ্ছে। তাই অবসর গ্রহণের প্রাক্কালে তার দর্শন, কর্মকৌশল, সাংবিধানিক এক্তিয়ারবোধ, রাজনৈতিক সংযম ইত্যাদি প্রসঙ্গ এড়িয়ে ভিন্নতর, সহজতর বিষয় নিয়ে কথা বলতে ইচ্ছে করছে।

শুরুতেই প্রশ্ন তুলতে হয়, প্রণববাবু কতটা জনচিত্তবিজয়ী? তার জনপ্রিয়তা কি উচ্ছল করে দেয় সাধারণকে? এ প্রশ্ন তোলার কারণ, কারো কারো ধারণা— প্রণববাবু সবসময় রাজনীতির আড়ালের কারিগর। পাইয়ে দেওয়া আর খাইয়ে দেওয়ার, কিংবা চমকের রাজনীতি থেকে নিজেকে বরাবর দূরে রেখেছেন, তাই যতটা জনপ্রিয় হওয়া উচিত, হতে পারেননি। এসব মতামত কিছুটা অসত্য, কিছুটা সত্য। কেন অসত্য, তা কয়েকটি উদাহরণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা জরুরি।

৩০ জুন, ২০১৭। কানায় কানায় পূর্ণ কলকাতা আকাদেমি অব্ ফাইন আর্টসের লেডি রাণু মুখার্জি সদন। প্রাক মধ্যাহ্নে প্রবেশ করলেন প্রণববাবু। সঙ্গে তাঁর রাষ্ট্রপতি ভবনের সামরিক অসামরিক সহযোগীরা। রাষ্ট্রপতি হিসেবে এটাই তাঁর শেষ কলকাতা সফর। নিয়মমাফিক উঠে দাঁড়ালেন শহরের প্রায় সহস্র গুণীজন। হর্ষধ্বনিতে জেগে উঠল সভাকক্ষ। এবার তাঁকে নিয়ে পরপর দুটি কফি টেবিল বই-এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন আর স্বাগত ভাষণের পর বলতে উঠলেন প্রণববাবু। বিনীত আবেগহীন ভাষা। ভাষায় অন্তরস্রোতের গতি। বললেন, জীবনে যতটুকু পেয়েছি, দিয়েছি অনেক কম। আগে যেমন দেশের সব জায়গায় যেতাম, এবার তেমনি যাব। ঘুরব। মানুষের সঙ্গে মিশব, মিশে যাব।’ বাইরে তখন অঝোর বৃষ্টি, ভেতরে বিদায়ী (রাষ্ট্রপতির) ভাষণের অম্লান গাম্ভীর্য। মিনিট দশেকেই শেষ তাঁর ভাষণ, কিন্তু হাত তালি চলছে। গুণীজন উঠে দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানাচ্ছেন। অবসরের প্রাক্কালে, ভারতের প্রথম বাঙালি রাষ্ট্রপতিকে, একজন খাঁটি বাঙালি আর আন্তর্জাতিক নাগরিককে এভাবে অভিবাদন জানানোর উত্স কী? এটা কি নিছক জাতিগত উচ্ছ্বাস? না গভীর শ্রদ্ধাবোধের বহিঃপ্রকাশ? আমাদের মনে হয়, প্রণবের ব্যক্তিস্বরূপ জনচিত্তের ভেতরের ভাবাবেগকে গভীরভাবে ছুঁয়ে আছে। তাই তাঁকে ঘিরে বাইরের উচ্ছ্বাসের চাইতে মননের স্বীকৃতির জোর অনেক বেশি, যা ক্ষণস্থায়ী নয়, যা ইতিহাসকে ভাবতে বাধ্য করবে।

২০১২ সালের রাষ্ট্রপতি ভোটে প্রায় রেকর্ডসংখ্যক ভোট পেয়ে জয়ী হলেন প্রণববাবু। ইউপিএ প্রার্থী। ভোটের আগে, কেউ কেউ ঘোঁট পাকালেন, ফেল করলেন। তখন শোনা গেছে, বিরোধী দলগুলোর বহু জনপ্রতিনিধিও তাঁকে ভোট দিয়েছেন, সম্ভবত এ কারণেই তাঁর জয়ের পর সানন্দ ভাবাবেগ ছড়িয়ে পড়ে দেশজুড়ে। ওই সময় আরম্ভ আর্ট গ্যালারি আর আরম্ভ পত্রিকার পক্ষ থেকে একটি কর্মসূচি নেওয়া হলো। প্রণববাবুর রাজনীতির বিভিন্ন স্তর, তাঁর দর্শন, তাঁর স্বপ্ন নিয়ে ছবি আঁকবেন, ভাস্কর্য গড়বেন দেশের প্রবীণ নবীন শিল্পীরা। প্রস্তাবে আপ্লুত প্রকাশ কর্মকার, সুনীল দাস রবীন মণ্ডল, ধীরাজ চৌধুরী, অনীতা রায়চৌধুরী, ওয়াসিম কাপুর, ইশা মহম্মদ, সুব্রত গঙ্গোপাধ্যায়-এর মতো আন্তর্জাতিক খ্যাতির চিত্রীরা যেমন, ঠিক সেরকম প্রবল উত্সাহ দেখালেন তরুণ চিত্রীরা। পাঁচ বছর জুড়ে তাঁর ছবি আঁকলেন। কেউ কেউ গড়লেন প্রণবের ভাস্কর্য আর বহুত্ববাদী সংস্কৃতির শিল্পকৃতী। এভাবেই জড়ো হয়ে গেল ৭৫ শিল্পীর ৮৫টি শিল্পকর্ম। প্রণববাবু তাঁকে নিয়ে শিল্পীদের কর্মযজ্ঞের খবর জেনে খুশি হলেন। বললেন, রাইসিনা হিলসের রাষ্ট্রপতি ভবনের সংগ্রহশালায় এ প্রদর্শনী করো না। কারণ, ছবি আমাকে নিয়ে, এটা ভালো দেখায় না। কেন্দ্রীয় সংস্কৃতি মন্ত্রী ডা. মহেশ শর্মার সঙ্গে আমরা যোগাযোগ করলাম। নিপাট ভদ্রলোক। প্রণববাবুর গুণমুগ্ধ। বিদ্ধান। মহেশ শর্মা নৈতিক সাহস জুগিয়ে বললেন, সঙ্গে আছি। ঘাবড়াবেন না। আমরা ওঁকে শ্রদ্ধা করি, ভালোবাসি। বটবৃক্ষ।’ মহেশ শর্মা নানাভাবে সহযোগিতা করতে চেয়েছেন, কিন্তু আমাদের মনে হয়েছে, শীর্ষ আসনে অধিষ্ঠিত রাষ্ট্রপতিকে ঘিরে সরকারি সাহায্য গ্রহণ ঠিক হবে না। সংযত থাকতে হলো। কিন্তু শিল্পযজ্ঞ থেমে থাকল না, প্রস্তুতি তখন তুঙ্গে। অর্থ সংকট ভাবাচ্ছে। প্রবল আগ্রহ নিয়ে এগিয়ে এলেন টেকনো ইন্ডিয়া ফাউন্ডেশনের সংগঠক সত্যম রায়চৌধুরী আর আজকাল পত্রিকার সম্পাদক অশোক দাশগুপ্ত। ফোন পেয়ে নৈতিক সমর্থনের অভয় দিলেন ঢাকার দৈনিক ইত্তেফাক-এর দীর্ঘসঙ্গী, প্রণববাবুর গুণমুগ্ধ জনাব আনোয়ার হোসেন মঞ্জু। পাশে দাঁড়ালেন ‘ভজহরি মান্না’র রাজীব নিয়োগী আর ইন্সটিটিউট অব্ পলিটেকনিকের প্রতিষ্ঠাতা জাকির হোসেন। সাহস বাড়ল। শহর জুড়ে, শহরের বাইরেও তখন প্রবল উত্সাহ-প্রণববাবুকে নিয়ে ছবি এঁকেছেন ৭৫ শিল্পী আর ভাস্কর। এ প্রদর্শনী দেখতে আসছেন স্বয়ং রাষ্ট্রপতি, রাজ্যপাল আর খ্যাতিমান শিল্পীরা। প্রদর্শনী শুরু হবার আগেই উত্সাহের প্রধান উত্স অবশ্যই প্রণববাবু। দ্বিতীয় কারণ এটা এক অদ্বিতীয়, ঐতিহাসিক ঘটনা। একথা বলার কারণ, বিশ্বে মাত্র দুবার রাষ্ট্রনেতা কিংবা দেশের সাংবিধানিক প্রধানকে নিয়ে এরকম শিল্পকৃতির প্রদর্শনী হয়েছে। এঁদের একজন কিংবদন্তি নেলসন ম্যান্ডেলা, আরেকজন বারাক হোসেন ওবামা। দ্বিতীয়ত, দার্শনিক রাধাকৃষ্ণন, ড. জাকির হোসেন, ড. এপিজে আব্দুল কালাম ছাড়া ভারতের সব রাষ্ট্রপতি সরাসরি রাজনীতির লোক। প্রণববাবু ভারতীয় ঘরোয়া আবহের কঠিনতম সময়ের প্রথম রাষ্ট্রপতি— যিনি দীর্ঘ ছয় দশক জুড়ে সরাসরি সক্রিয় রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থেকেও বজায় রেখেছেন তাঁর স্বাতন্ত্র্য। দেশের ভেতরে সব দলের মধ্যে গুণগ্রাহী অসংখ্য, বিদেশেও তাঁর গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নাতীত। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র ভাই মোদির দুটি সাম্প্রতিক বিবৃতি প্রসঙ্গত মনে পড়ছে। এক. ‘ওঁর (প্রণববাবুর) সঙ্গে কিছুক্ষণ কাটালে মনে হয়, গোটা একটি বই পড়া গেল। বিস্ময়কর ওঁর প্রজ্ঞা আর অন্তর্মুখী বৈদগ্ধ্য। দুই. শুধু পরামর্শ নয়, ওঁর কাছ থেকে বড়ো ভাইয়ের যথার্থ স্নেহ পেয়ে আমি ধন্য।’ ইতঃপূর্বে, কোনো রাষ্ট্রপতি সম্পর্কে কোনো প্রধানমন্ত্রী এরকম মন্তব্য কখনও করেছেন বলে আমাদের মনে পড়ছে না। আরেকটি কথা, কোনো ইস্যুতেই সরকারের সঙ্গে তাঁর সংঘাত তৈরি হয়নি। তবে অসহিষ্ণুতা, উগ্রতা আর সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা নিয়ে দেশবাসীকে বারবার সতর্ক করেছেন। দেশকে বলা মানে রাষ্ট্রকে বলা। এখানে, বহুত্ববাদের ঐতিহ্য রক্ষায় সাংবিধানিক প্রধান হিসেবে প্রণববাবুর প্রশ্নাতীত আপসহীনতা দেশের রাজনীতিক আর শাসকগোষ্ঠীকে বারবার ঐতিহ্যের পাতা উল্টে দেখতে বাধ্য করেছে। দেশকে তার স্বনির্বাচিত রাস্তা দিয়ে যে এগোতে হবে, একথা বলতে কখনো দ্বিধা করেননি। গণতন্ত্রে তর্ক-বিতর্ক, ন্যায়, সামাজিক পছন্দের গুরুত্ব অপরিসীম, বাগানে নানা ধরনের গাছ হয়, ফুল জন্মায়, এসব বৈচিত্র্যের কথা বলে বারবার বলতে চেয়েছেন, ভারত এখানে অদ্বিতীয়। তার বিকাশ যেমন বৌদ্ধিক, তেমনই লোকায়তিক। এই ধরনের কথা সচরাচর শোনা যায় না, কখনো-কখনো কেউ কেউ বলেন, বলার ভঙ্গি আর আচরণে, কর্মে ও মর্মে বিস্তর তফাত্ ভেসে ওঠে। এখানেই প্রণববাবু ব্যতিক্রম। তাঁর সব অভিব্যক্তি দর্শনজাত আর উর্বর মননভূমির ফসল। তাঁর জনপ্রিয়তা সংযত। সংহত। এর বাইরে উচ্ছ্বাস নেই। আবেগের তরঙ্গ নেই। কিন্তু ভেতরে গভীর সমুদ্রের নিস্তরঙ্গ প্রবাহ। যা শ্রদ্ধায় অবনত। আমাদের অনুমান, প্রণববাবুর জনচিত্তজয়ের মাধুর্য নিয়ে অনেকেই সংশয়াচ্ছন্ন। তাঁর ব্যক্তিকতাকে জড়িয়ে আছে সংযম, স্থিরতা আর দার্শনিক গাম্ভীর্য—তা বহন করে তার বাহক হয়ে ওঠার অনুশীলন কোথায়? এজন্য গভীরকে স্পর্শ করতে হয়। মূল্যায়নে, পুনর্মূল্যায়নে ভাস্বর হয়ে উঠবে প্রণবের রাজনীতি, প্রণবের দর্শন, প্রণবের ঐতিহ্যপ্রীতির সম্পদ। ক্রমাগত আরেক ভারতীয় প্রজ্ঞাকে আবিষ্কার করতে থাকবে দেশবাসী। তথাকথিত জনপ্রিয়তা বলতে আমরা যা বুঝি, তা থেকে প্রণবের সচেতন অবস্থান অনেক অনেক দূরে। মননশীল লেখক, অন্তর্মুখী চিত্রকর যেরকম সজ্ঞানে চমকপ্রিয়তা থেকে সরে থাকতে চান, প্রণববাবুও তাঁর রাজনীতিতে তাত্ক্ষণিকতাকে আমল দেননি। তাঁর ঘরানা ধ্রুপদী, নব্য ধ্রুপদী এবং আধুনিক। এই ঘরানাকে বুঝতে হলে আধুনিক ভারতের সদার্থক রাজনীতির সমস্ত উত্তরণকে, তাঁর অখণ্ডতাকে বুঝতে হবে। প্রণববাবু স্বামী বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথ আর মৌলানা আবুল কালাম আজাদের খাঁটি ভাবশিষ্যের মতো বোঝার চেষ্টা করেছেন—রাজনীতি নয়, দল নয়, সমাজই সব শক্তির উত্স। রাজা যায়,  রাজা আসে। সমাজ থেকে যায়। থেকে যাবে। অতঃপর দিনের শুরুতে অথবা দিবাশেষে সমাজের স্রোতে মিশে যেতে হয়। এই স্রোতে মিশতে চাইছেন বিদায়ী রাষ্ট্রপতি। এখানে তিনি শুধু উজ্জ্বল নন, বিরল এক ব্যতিক্রম। এই ব্যতিক্রমকে নিয়েই দেশের নানা প্রান্তের, বিদেশেরও কৃতী শিল্পীরা ছবি এঁকে, উত্সবের মেজাজে চিত্রমালা আর ভাস্কর্য সাজিয়ে নান্দনিক সংবর্ধনা জানিয়ে বলতে চাইলেন, এ উদ্যোগ কেবল দুটি সংগঠনের নয়, সমাজের সমস্ত অংশের। সামাজিক  চাহিদাকে ন্যায্য স্বীকৃতি জানিয়ে বলতে চাইলেন, প্রণব আমাদের মনীষা। সকলের এ সম্পদ শতবর্ষের দিকে এগোচ্ছেন, তাঁর জায়গা হূদমাঝারে। বাইরেও, তাঁকে আমরা ধরে রাখব, ছুঁয়ে থাকব। অবসর নয়, এবার শুধু তাঁর ভিন্নতর অভিযাত্রা। এক হাতে কলম আর তাঁর অন্য হাতে দেখা যাবে বই, পঠন আর পাঠনের সফরে ঋদ্ধ হব সবাই।

দিনপঞ্জি লেখা প্রণববাবুর শখ। সম্ভবত নিয়ম করে এখন যাপনের ঘটনা লিখে রাখবেন। শোনা যাচ্ছে, বাংলায় আত্মজীবনী লিখবেন। এ কি কেবল তাঁর নিজের স্বপ্ন, না সমাজের এক বড়ো অংশের? পড়তে ভালোবাসেন, তাঁর নির্বাচিত বইসংগ্রহ বিশাল, এ খবর অনেকেই জানি। গান, বিশেষ করে রবীন্দ্রসংগীত একান্ত উপাসনার মতো নিত্যসঙ্গী। এসব তথ্য অজানা নয়। কিন্তু হঠাত্ খবর মিলল, সুচিত্রা মিত্রের গলায় ‘কোন খেলাটি খেলব কখন, ভাবি বসে সেই কথাটি’— গানটিতে জেগে ওঠে তার অন্তরের আকুতি। কেন? নেপথ্যে কী, তাড়াহুড়ো না সংশয়: ব্যক্তিসত্তার মননকে, কাজের প্রস্তুতিকে পছন্দের যে টানাপোড়েন ঘিরে থাকে, সে সহজিয়া অভ্যাসও জানিয়ে দিল প্রণববাবুর প্রিয় গানের নির্বাচন। এখানেও তিনি বিশেষ হয়েও নির্বিশেষের অংশ। ঊর্ধ্বে নন, মিশে আছেন সবার ভেতরে, বৃহত্তরের সমাবেশে। তাঁর মানে লক্ষ্য তাঁর স্বচ্ছ—মানুষের ভেতর থেকেই যাত্রার শুরু। আর জনতার ভিড়ে আবার মিশে যাওয়াই পূর্ণাঙ্গ মানবের (আল ইনসানুল কামিল) এর গন্তব্য। শোনা যাচ্ছে, বাংলার মুখ্যমন্ত্রী গানটি নতুন করে রেকর্ডিং করিয়ে উপহার দেবেন তাঁর প্রিয় প্রণবদাকে। গাইবেন তথ্য সংস্কৃতি মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেন। এটা পূজা নয়, তোয়াজ নয়, গুরুজনকে অনুজজনের বিনম্র শ্রদ্ধার্ঘ্য যা বাঙালির সাংস্কৃতিক স্বভাবের শিল্পিত ধর্ম।

n লেখক :ভারতীয় সাংবাদিক,

সম্পাদক আরম্ভ পত্রিকা

 

 

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
১৭ জুলাই, ২০১৭ ইং
ফজর৩:৫৫
যোহর১২:০৫
আসর৪:৪৪
মাগরিব৬:৫১
এশা৮:১৩
সূর্যোদয় - ৫:২১সূর্যাস্ত - ০৬:৪৬
পড়ুন