সড়ক দুর্ঘটনা রোধে কি কিছুই করার নাই
মীর আব্দুল আলীম১৭ জুলাই, ২০১৭ ইং
সড়ক দুর্ঘটনা রোধে কি কিছুই করার নাই
কেউ আইন মানতে চায় না। তাই সড়ক দুর্ঘটনা রোধ হয় না। ড্রাইভার, হেলপার, আমলা, সাংবাদিক থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ সড়কে এসে আইন ভঙ্গ করে। যে যার মত রাস্তায় চলে। তাই চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে এক হাজার ৯৮৩টি সড়ক দুর্ঘটনায় দুই হাজার ২৯৭ জন নিহত ও পাঁচ হাজার ৪৮০ জন আহত হয়েছেন। গতবছরের তুলনায় চলতি বছর এ সময়ে সড়ক দুর্ঘটনা ও হতাহতের সংখ্যা বেড়েছে। ২০১৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত সড়কে এক হাজার ৯৪১ জন নিহত এবং চার হাজার ৭৯৪ জন আহত হন। যা গতবছরের তুলনায় দ্বিগুণ। এভাবে কেন সড়ক দুর্ঘটনা বাড়ছে? সড়কে আইনের প্রয়োগ নেই। পথে আসলেই আইন মানতে চায় না এদেশের মানুষ। অশিক্ষত চালক আর সাধারণ মানুষের কথা কি বলবো শিক্ষিত উচ্চবর্গীয় মানুষ আইন না মেনে উল্টোপথে চলে।

আমাদের সড়ক-মহাসড়কের সর্বত্রই যেন চলছে বিশৃঙ্খলার মহোত্সব! এতে প্রাণ যাচ্ছে অকাতরে। ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-ময়মনসিংহসহ কয়েকটি মহাসড়ক চারলেনে উন্নীত হয়েছে। যমুনাসহ অসংখ্য সেতু নির্মিত হয়েছে। বাধায় আটকে থাকা স্বপ্ন পদ্মাসেতু আজ বাস্তবে রূপ নিচ্ছে। এমনই আরও অনেক উন্নয়ন হয়েছে দেশের সড়ক খাতে। সড়ক মন্ত্রীকেও প্রতিনিয়ত দেখা যায় সড়কে। এত কিছুর পরও সড়ক দুর্ঘটনা কমছে না কেন? সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুই যেন আমাদের নিয়তি হয়ে উঠছে। সড়ক-মহাসড়কে মৃত্যুর মিছিল থামাতে হলে ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, বেপরোয়া চালক ও বেপরোয়া গতি নিয়ন্ত্রণে আনা ছাড়া গত্যন্তর নেই। কিন্তু বিড়ালের গলায় ঘণ্টা পরাবে কে? দিনের পর দিন এ অবস্থা তো চলতে পারে না। এভাবে সমাজ ও রাষ্ট্র মুখ বুঁজে থাকতে পারে না। দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের অবশ্যই শাস্তি পেতে হবে। দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলোতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হলে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই। সড়ক দুর্ঘটনার মূল অনুষঙ্গ বেপরোয়া গতি। চালকরা  বেপরোয়া গতিতে এবং একের পর এক পাল্লা দিয়ে যান চালানোর কারণেই দুর্ঘটনাগুলো ঘটেছে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) মতে, মহাসড়কে গড়ে প্রতি মিনিট পরপর একটি গাড়ি আরেকটি গাড়িকে ওভারটেকি-এর চেষ্টা করে। একটি গাড়ি আরেকটি গাড়িকে পাশ কাটাতে গিলেই দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হয়। এটি প্রতিরোধে মহাসড়কে কার্যকর  কোনো ব্যবস্থা নেই।

এক গবেষণায় দেখা যায়, নানা কারণে দেশে প্রতি ১০ হাজার মোটরযানে ১০০টি ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটছে। উন্নত দেশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী এক হাজার মোটরযানে দুর্ঘটনা ঘটে সর্বোচ্চ তিন দশমিক পাঁচ ভাগ। অন্যদিকে আমাদের বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রতি এক হাজার যানবাহনে ১৬৩ জন দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন। বুয়েটের এক্সিডেন্ট রিসার্স ইনস্টিটিউট (এআরআই) পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিবছর ১২ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হচ্ছে। নিহতের ৮০ শতাংশের বয়স পাঁচ থেকে ৪৫ বছর। নিহতদের মধ্যে ৫৩ শতাংশ পথচারী। যাদের ২১ শতাংশের বয়স ১৬ বছরের নিচে। দুর্ঘটনায় আহত ১৫ শতাংশ লোক মারা যায় ঘটনার ১৫ মিনিটের মধ্যে। দেশে ১৬ লাখ রেজিস্টার্ড গাড়ি রয়েছে আর লাইসেন্স পাওয়া ড্রাইভার রয়েছে মাত্র ১০ লাখ। চার লাখ ড্রাইভারের ঘাটতি রয়েছে। সুতরাং ড্রাইভিং ট্রেনিং দেয়া ও তাদের জন্য লাইসেন্সের দরকার আছে। তা নাহলে প্রতিনিয়তই এভাবে অকাতরে ঝরবে আমাদের প্রাণ।

কতটাই না অসভ্য আমরা। মানুষ মরবে আর ১০-২০ হাজার টাকার বিনিময়ে সব মীমাংসা হবে; একি ভাবা যায়? সরকারি হিসাব মতে, ১৯৯৯ সালে চার হাজার ৯১৬ জন, ২০০০ সালে চার হাজার ৩৫৭ জন, ২০০১ সালে চার হাজার ৯১ জন, ২০০২ সালে চার হাজার ৯১৮ জন, ২০০৩ সালে চার হাজার ৭৪৯ জন, ২০০৪ সালে তিন হাজার ৮২৮ জন, ২০০৫ সালে তিন হাজার ৯৫৪ জন, ২০০৬ সালে তিন হাজার ৭৯৪ জন, ২০০৭ সালে চার হাজার ৮৬৯ জন, ২০০৮ সালে চার হাজার ৪২৬ জন, ২০০৯ সালে চার হাজার ২৯৭ জন, ২০১০ সালে পাঁচ হাজার ৮০৩ জন, ২০১১ সালে তিন হাজার ৬৮৮ জন, ২০১২ সালে পাঁচ হাজার ৯১১ জন, ২০১৩ সালে চার হাজার ৮৬৫ জন এবং ২০১৪ সালে তিন হাজার ৯৭৫ জন, ২০১৫ সালে তিন হাজার ৮৬২, চলতি ২০১৬ সালের আগষ্ট পর্যন্ত আনুমানিক দুই হাজারেরও বেশি মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে। প্রতিবছরই এভাবে সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষ মরছে আর তা রোধ করা যাচ্ছে না। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে পরিবহণ মালিক ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছ থেকে সমন্বিত আন্তরিকতা, সচেতনতা, দৃঢ় ও দায়িত্বশীল ভূমিকা আমরা আশা করি।

n লেখক :গবেষক

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
১৭ জুলাই, ২০১৭ ইং
ফজর৩:৫৫
যোহর১২:০৫
আসর৪:৪৪
মাগরিব৬:৫১
এশা৮:১৩
সূর্যোদয় - ৫:২১সূর্যাস্ত - ০৬:৪৬
পড়ুন